top of page
Search

মৃণাল সেন...

নীল আকাশের নীচে রাত ভোর দাঁড়িয়ে থাকা পদাতিক...

একশ বছরের তরুণ, যাকে খারিজ করা যায় না, সেই মহান পরিচালক। না, তেমন যুৎ সই কিছু হল কই! প্রায় নীরবে নিভৃতেই তো চলে গেল, জন্মদিনটা। শহরের দু’একজন যেটুকু এগিয়ে এলেন, তাতেই পূর্ণ হল একশ বছরের জন্মদিন। এমনটাই কি হওয়ার কথা ছিল? তাঁর ভাবনা, কৃষ্টি, সৃষ্টি কি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের একেবারে সমৃদ্ধ করেনি? করেনি কি বাংলার সংস্কৃতিকে আলোড়িত! জন্মশতবর্ষে বাংলা চলচ্চিত্রের অনন্য পরিচালক শ্রীযুক্ত মৃণাল সেনকে রোজকার অনন্যার পক্ষ থেকে প্রণাম জানাচ্ছেন সমীর চট্টোপাধ্যায়



সেই কবেকার কথা। ছোট্ট আমি’র তখন মায়ের হাত ধরে সিনেমা হলে ঢোকা। সিনেমার নাম ‘নীল আকাশের নিচে’। এর আগে অবশ্য গুপী গায়েনের সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে আমার। হীরক রাজাকেও দেখে ফেলেছি। তখন তো এতটা বুঝতাম না, কিন্তু ‘নীল আকাশের নিচে’ আমার খুব ভালো লেগেছিল। শুনেছিলাম, এই ছবির পরিচালক মৃণাল সেন। সেই থেকে মৃণাল সেনের সঙ্গে পরিচয় আমার। এরপর দেখতাম, সিনেমার প্রসঙ্গ উঠলেই সবাই বলতেন, সত্যজিৎ-মৃণাল...! অর্থাৎ সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেন। ঋত্বিক ঘটক, তপন সিনহারা অনেক পরে এসেছেন আমার জীবনে।

তিনি সিনেমা বানাতেন। নানান ভারতীয় ভাষায় ছবি করেছেন। মৃণালবাবুর শিরদাঁড়াটা বেশ দৃঢ়। কনফিডেন্স চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ত। তিনি বলতেন, ‘আমি দারিদ্র্য নিয়ে ছবি করি। আফ্রিকাতে গিয়ে সোয়াহিলি ভাষায় ছবি করতেও আমার কোনও অসুবিধে হবে না...।’ দারিদ্র্যকে ধরতে নগর উপকণ্ঠের অলিগলিতে মুখ বাড়িয়েছেন। ছুটে গেছেন গ্রামের পথে। ঘুরে বেরিয়েছেন। ‘বাইশে শ্রাবণ’ থেকেই আমরা পেয়েছি গ্রামকে, গ্রামের মানুষজনকে। আমরা একাত্ম হয়েছি তাঁদের সঙ্গে। তাঁদের দারিদ্র্য, জীবনযাপন, সম্পর্কের ওঠা-পড়া আমাদের হৃদয়কে ছুঁয়ে যায়।

১৯২৩ সালের ১৪ মে। মৃণাল সেন পৃথিবীতে এলেন। বাংলাদেশের ফরিদপুরের একটি শহরে তাঁর জন্ম। এখানেই কেটেছে মৃণাল সেনের ছেলেবেলা। পড়াশোনা। উচ্চবিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষে উচ্চ শিক্ষার জন্য সপরিবারে কলকাতায় পাড়ি দিলেন ওঁরা। সেই সময় দেশে ভাগাভাগি, ভাঙাভাঙির খেলা চলছে। ফিজিক্সের ছাত্র। স্কটিশ চার্চ কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েই তাঁর পড়াশোনা। ছাত্রাবস্থায় তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হলেন। সরাসরি রাজনীতি করলেন না। পার্টির সাংস্কৃতিক শাখার সঙ্গেই কাজ করতে লাগলেন। কখনই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হননি। চল্লিশের দশকে আইপিটিএর (ইন্ডিয়ান পিপ্লস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন)সদস্য হলেন। চলার পথটা খুব সহজ ছিল না। অনেক চড়াই-উতরাই, অনেক বাঁক পেরিয়ে চলতে হয়েছে তাঁকে, জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় থেকেই উপার্জনের উপায় খুঁজতে শুরু করেন। বেশ কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছেন। করেছেন ওষুধ বিপননকারীর কাজ। সিনেমাশিল্পের সঙ্গে যোগ চলচ্চিত্রে শব্দকুশলী হিসেবে। তখন ছিল চাকরি। তারপর একদিন নিজেই দাঁড়ালেন ক্যামেরার পিছনে। ‘অ্যাকশান’, ‘কাট’ যে বলতেই হবে। এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মৃণাল সেন ছবি করবেন। করবেনই তো! উনি তো আর অন্য কিছু করতে আসেননি। ১৯৫৫ সালে মৃণাল সেনের প্রথম পরিচালিত ছবি ‘রাতভোর’ মুক্তি পেল। ছবিটি তেমন সাফল্য পায়নি।

তা হোক, জীবনের প্রথম ছবি বলে কথা! সব প্রথমের প্রতিই মানুষের একটা আলাদা টান থাকে। আবেগ, ভালোবাসা থাকে৷ নিজের প্রথম ছবি সম্পর্কে কথা বলতে ভালোবাসেন প্রায় প্রত্যেকেই৷ মৃণাল সেন কিন্তু সেদিক থেকে ব্যতিক্রম৷ তিনি তাঁর প্রথম ছবির স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলতে চান৷ কোনও জায়গায় তিনি এই ছবির কথা বলতেন না। উত্তমকুমারের মৃত্যুর পর টেকনিশিয়ান্স স্টুডিয়োতে হওয়া স্মরণসভায় উত্তমকুমার প্রসঙ্গে মৃণাল সেন অনেক কথা বললেও কখনওই ‘রাত-ভোর’ ছবিটির কথা উল্লেখ করেন নি। প্রসঙ্গত বলি, ‘রাত-ভোর’ ছবিতে উত্তমকুমার অভিনয় করেছিলেন৷ কখনও কোনও ক্ষেত্রে এই ছবির কথা উঠলে তিনি খুব সহজেই বলতেন এখানে অনেক গণ্ডগোল আছে।

‘রাত-ভোর’…

‘রাত-ভোর’-এ ঠিক গণ্ডগোলটা কোথায়?

মৃণাল সেন বলতেন, ‘সিনেমার যে একটা টেকনিক্যাল দিক আছে এবং ছবি করতে গেলে সে সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা দরকার, তা আমার জানা ছিল না৷ আর গল্পটা বড়ো বেশি দুর্বল ছিল, বড়ো বেশি আবেগ সর্বস্ব৷ গল্পটা আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল এ কথা বলা ঠিক হবে না৷ কেননা সাহিত্য আমার ভালোই পড়া ছিল৷ তবুও আমার মনে হয়েছিল এই গল্প থেকে ছবি হতে পারে৷ সুতরাং গণ্ডগোলটা ছিল আমারই। একটা বাজে গল্প আর ফিল্মের টেকনিক সম্পর্কে কোনও জ্ঞান না থাকায় ব্যাপারটা কোথাও দাঁড়ায়নি৷ আমি ছবিটার নামও উচ্চারণ করতে চাই না৷ আমার এতটাই খারাপ লাগে৷ ছবিটা করে আমি এতটাই বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে ভাবতে শুরু করেছিলাম আমার সিনেমা ছেড়ে অন্য কিছু করা উচিত৷’

ছবির প্রযোজক ছিলেন সুনন্দা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দিক থেকে কিন্তু কোনও ত্রুটিই ছিল না। তিনি যা যা করার, সবটাই করেছিলেন। বাংলা ছবির বাণিজ্যের সেরা সময় পুজোতেই ছবির মুক্তির ব্যবস্থা করেছিলেন৷ ধরেছিলেন ছবি মুক্তির সেই সময়ের সেরা চেন, রূপবাণী-অরুণা-ভারতী৷ ‘রাত-ভোর’ মুক্তি পেল, ২১ অক্টোবর, ১৯৫৫৷ এর ঠিক দু’মাস আগে মুক্তি পেয়েছে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’। তখনও চলছিল৷ ‘রাত-ভোর’-এর সঙ্গে মুক্তি পেল, রাজ কাপুরের ‘শ্রী৪২০’৷ ভি শান্তারামের ‘ঝনক ঝনক পায়েল বাজে’, দিলীপকুমার অভিনীত ‘আজাদ’, দেবকীকুমার বসুর সুচিত্রা সেনের ‘ভালবাসা’৷ এরা প্রায় প্রত্যেকেই খানিক কল্কে পেলেও কেবল ‘রাত-ভোর’-এর শিকেটাই ছিঁড়ল না। ছবিটা সুপারফ্লপ হল৷ ছবির অভিনেতা উত্তমকুমারের সে বছর আটটি ছবি মুক্তি পেল। এরমধ্যে যথেষ্ট বাণিজ্যসফল ছবিও তো ছিল। তপন সিনহার ‘উপহার’, অগ্রদূতের ‘সবার উপরে’, চিত্ত বসুর ‘কঙ্কাবতীর ঘাট’, সুবোধ মিত্রের ‘রাইকমল’, হরিদাস ভট্টাচার্যের ‘দেবত্র’, সুধাংশু মুখোপাধ্যায়ের ‘সাঁঝের প্রদীপ’, সুধীর মুখোপাধ্যায়ের ‘শাপমোচন’। এদের মধ্যে কয়েকটা ছবি তো ভালো পয়সা দিয়েছিলো। বক্স অফিস হিটও করেছে। কিন্তু এই ছবিটার ক্ষেত্রে যে কী ঘটল! মাত্র ২১ দিন চলেছিল ছবিটা৷ ১০ নভেম্বর, ১৯৫৫-তেই ‘রাত-ভোর’ উঠে যায়। আর কখনও ফিরে আসেনি। মৃণাল সেনের সৃজনশীল চন্দ্রের কলঙ্ক এই ‘রাত-ভোর’ ছবিটি।

এই ছবি নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে। আপনারা জানেন, মৃণাল সেন বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছিলেন টেকনিশিয়ান হিসেবে। তারপরই পরিচালক হিসেবে প্রথম ছবি, ‘রাত-ভোর’।

১৯৫৪ সালে উত্তমকুমার নায়ক হিসেবে রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত৷ আপনারা তো এর আগেই দেখলেন, এই ছবির মুক্তির বছর অর্থাৎ ১৯৫৫-তে কতগুলো হিট ছবি বেরল। যখন ‘রাত-ভোর’ ছবিতে উত্তমবাবু সাইন করছেন তখন তাঁর চারটি ছবি মুক্তি পেলেও, পরের বছর অর্থাৎ ১৯৫৪-তে যখন ছবির শুটিং হচ্ছে, তখন নায়ক উত্তমের মুক্তি পেয়ে গেছে ১১ টা ছবি৷ যার মধ্যে আছে ‘অগ্নিপরীক্ষা’-র মতো সুপারহিট ছবিও৷ ‘অগ্নিপরীক্ষা’-ই উত্তমকুমারকে বাংলা ছবির সুপারস্টার বানিয়ে ছিল৷ এই ছবিতে উত্তমকুমার পারিশ্রমিক নিয়েছিলেন ১০ হাজার টাকা৷ পরিচালক মৃণাল সেন সেদিক থেকে খুব ভুল কিছু করেননি। উত্তমকুমার ততক্ষণে বাংলা ছবির দর্শকের কাছে যথেষ্ট পরিচিত নাম হয়ে গেছে। সুপারস্টারও হয়ে গিয়েছেন। অদ্ভুত ব্যাপার, সেই সময় উত্তমকুমার কিন্তু এই ছবির জন্য সেই পারিশ্রমিক নেননি। ‘রাত-ভোর’ ছবির সহকারী পুনু সেন জানাচ্ছেন, ‘রাত-ভোর’-এ উত্তমকুমারের পারিশ্রমিক ছিল মাত্র তিন হাজার টাকা৷


‘রাত-ভোর’ এক নজরে

১৯৫৫ সালে মৃণাল সেন তাঁর প্রথম ছবি ‘রাত-ভোর’ তৈরি করেন৷ এস বি প্রোডাকসন্সের ছবি। প্রচার পরিকল্পনা ও তার প্রয়োগের দায়িত্বে ছিল ক্যাপস নামে একটি প্রচার সংস্থা৷ তাদেরই দায়িত্বে ছবিটির বুকলেট বা প্রচার পুস্তিকাটি তৈরি হয়েছিল যার প্রকাশক হিসেবে নাম ছিল এস বি প্রোডাকসন্স-এর৷ রমন ব্রাদার্স থেকে মুদ্রিত ডিমাই সাইজের বুকলেটটির প্রচ্ছদ রঙিন না করে সাদা-কালোয় ছাপা হয়েছিল৷ না, এটা অর্থাভাব বা অযত্নের কারণে তৈরি হয়নি। একটা ইন্টেলেকচুয়াল ভাবনা তো ছিলই। বুকলেটের প্রচ্ছদটিতে একটা ইঙ্গিত ছিল। ভালো করে দেখলে বোঝা যায়, এটা দুঃখের অমানিশা অবসানে আসন্ন সুখ-শান্তিতে ভরা ভোর হয়ে আসার কথাই ঘোষণা করে৷ ছবিটি চলেনি। কিন্তু এই গল্পটা মৃণাল সেন পরে নানা ফিল্মে বলতে চেয়েছেন।

নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায় (প্রথম দিন থেকেই মৃণাল সেনের বন্ধু,‘ন্যাপা দা’ নামে সকলেই চেনেন) বলেছিলেন, ‘তখন আমাদের আড্ডা ছিল হাজরার কাছে প্যারাডাইস ক্যাফে-তে৷ মৃণাল, ঋত্বিক, সলিল এরা সবাই নিয়মিত আসত৷ বংশী (চন্দ্র গুপ্ত) মাঝে-মধ্যে আসত৷ মৃণাল আর ঋত্বিক তো পকেটে সিনেমার চিত্রনাট্য আর বাজেট রেখেই দিত সব সময়৷ ভাবটা এমন, যেন যে-কোনও সময়ে একজন প্রযোজক এসে পড়তে পারে৷’ বোঝা যাচ্ছে, প্যারাডাইস ক্যাফে-ই ছিল ‘রাত-ভোর’ তৈরির আঁতুড়ঘর৷ এখন তা নেই। এক সময় ছিল। এই ১১৩/২ হাজরা রোডই ছিল মৃণাল সেনের প্রথম ছবি ‘রাত-ভোর’-এর প্রি-প্রোডাকশন সেন্টার৷

রমেশ সেন (যিনি পুনুদা নামে পরিচিত। পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায়ের সহকারী৷ ‘পথের পাঁচালী’ থেকে ‘আগন্তুক’ পর্যন্ত) বললেন, ‘ক্যালকাটা কেমিক্যালের পাশের বাড়ির দোতলায় থাকতেন মৃণালদা৷ সেখানেই আমাকে নিয়ে গিয়েছিল ন্যাপাদা৷ ছোট্টো ঘর৷ কোনওমতে থাকতেন৷ কিন্তু অনেক অভাবের মধ্যেই রসিকতা বোধটা ছিল প্রখর৷ ‘রাত-ভোর’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল ম্যুর অ্যাভিনিউ-এর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি স্টুডিয়োতে৷ সেট বানিয়ে শুট হয়েছিল৷’ সে স্টুডিও এখন নেই। মৃণাল সেন তাঁর প্রথম ছবিকে কমার্শিয়ালি সফল করার কথা কিন্তু ভেবেছিলেন। তিনি কাস্ট করেছিলেন উত্তমকুমার এবং সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়কে। সঙ্গে নিয়েছিলেন দু’জন দক্ষ সহ অভিনেতা-অভিনেত্রী, ছবি বিশ্বাস এবং শোভা সেনকে৷ সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, সলিল চৌধুরী। স্বরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প৷ গল্পে সত্যি তেমন কোনও জোর ছিল না। চোদ্দো বছরের লোটন৷ গ্রামের কিশোর ছেলে৷ গ্রামের ছেলে শহরে আসছে৷ শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না। এক মর্মান্তিক পরিণতিতে তার মৃত্যু হচ্ছে৷ কিশোর যন্ত্রণা নিয়ে আবেগঘন সিনেমা তৈরি করলে দর্শককে টানা যাবে ভেবেছিলেন প্রযোজক। কিন্তু যেমন ভাবা তেমনটা তো হয়নি। সেই সময়ের এক সংবাদপত্রে সমালোচক লিখছেন, ‘কাহিনিতে এমন কিছু নেই যা দিয়ে একটি সফল চিত্রনাট্য তৈরি হতে পারে, এই চিত্রনাট্যটি এতই দুর্বল যে সিনেমাতে কোনও কিছুই কাজ করেনি৷ ছবির প্রথমার্ধ্ব গ্রামে, এবং দ্বিতীয়ার্ধ্ব শহরে৷ কিন্তু একটিই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্প ঘুরে চলেছে৷ ছবির গল্প ভালো না হলেও চিত্রগ্রহণ এবং সঙ্গীত ভালো৷ শব্দগ্রহণ অত্যন্ত নিম্নমানের, ছবির অর্ধেক সংলাপ ভালো করে বোঝাই যায়নি৷ ছবির শেষে এটাও বোঝা যায়নি ছবির নাম কেন রাতভোর…৷’ ছবির চিত্রনাট্য তো লিখেছিলেন, মৃণাল সেন নিজেই।

নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায় কিন্তু অন্য কথা বললেন। বললেন, ‘এই গল্পটাই কিন্তু মৃণাল একের পর এক ছবিতে পরবর্তী সময়ে বলতে চেয়েছে৷ গ্রাম এবং শহরের সামাজিক ফারাক, শ্রেণির ফারাক৷ হয়তো পরে যেভাবে বলতে পেরেছে, এই ছবিতে সেভাবে বলতে পারেনি, কিন্তু কী বলতে চায় ওর ছবির মাধ্যমে সেটা কিন্তু প্রথম দিন থেকেই ওর মধ্যে স্থির ছিল৷’

আসলে একটা ছবির সাফল্য ব্যর্থতা অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। প্রোডাকশন হাউস বা প্রযোজক সংস্থার ইচ্ছে, মর্জির উপরও অনেক কিছু দাঁড়িয়ে থাকে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে পরিচালকের ইচ্ছের উপরও কাঁচি চালানো হয়। যদি ইন্ডাস্ট্রির আপনি মহাপরিচালক হন, ঝুলিতে খান কতক জাতীয় পুরস্কার একটা দুটো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকে, তাহলে পরিচালকের ভাবনার খানিক সম্মান আছে, নাহলে নিজের অল্প ভাবনার সঙ্গে প্রযোজকের বেশি ভাবনার মিশেলে ছবি করতে হবে। লোকেশন থেকে আর্টিস্ট নির্বাচন, গল্প চালনা থেকে সঙ্গীত পরিচালনা—সবটাতেই বাবুর মতামত নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাতে থাকতেই পারে খানিক কম্প্রোমাইজ, অনেক বেশি স্যাক্রিফাইজ। আর নতুন পরিচালক হলে তো কোনও কথাই নেই। ফলে ব্যর্থতার সব দোষ পরিচালকের অ্যাকাউণ্টে দিলে ভুল হবে। রামানন্দ সেনগুপ্ত (ছবির চিত্রগ্রাহক) এক জায়গায় বলেছেন, মৃণাল বলেছিলেন, ‘রাতভোর’ ছবিটা সস্তায় করতে হবে, নইলে ছবিটাই হবে না৷ এটা পরিচালকের সিদ্ধান্ত না প্রযোজকের, সেটা বলতে পারব না৷ কিন্তু মৃণালের কথায় আমি রাজি হয়ে গেলাম৷ ইস্ট ইন্ডিয়া স্টুডিয়ো-র সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল৷ ওদের মিচেল ক্যামেরা ছিল না৷ ফলে, এক্লেয়ার ক্যামেরায় কাজ করতে হল৷ এই ক্যামেরার সমস্যা হল থ্রু-ফিল্ম দেখতে হয়, ফলে সেটল করতে সময় লাগে বেশি৷ এটা হল আমার দিক থেকে সবচেয়ে মেজর কম্প্রোমাইজ৷ এর ফলে চেষ্টা সত্ত্বেও মনোমত কাজটা দিতে পেরেছি মনে হয়নি৷ ল্যাবরেটরির কাজও যে সব সময় পছন্দ হয়েছে তাও নয়৷ একটা জায়গায় গিয়ে থামতে হয়েছে৷ হ্যান্ডিক্যাপড অবস্থায় যে আমাদের প্রত্যেককে কাজ করতে হয়েছে সেটা পরিচালকও বুঝতে পেরেছিলেন৷ তাই মৃণালও আর ছবিটা নিয়ে পরবর্তীকালে বদার করেননি৷ ভুলে যেতে চেয়েছেন, এই ছবির ব্যর্থতায় মৃণালের কোনও দোষ নেই৷ কম্প্রোমাইজ তাঁকেও করতে হয়েছে৷ সবই কপাল৷ ছবিটা দেখেছিলাম মুক্তির পর৷

ছবিতে উত্তম ছিল৷ ও তো তখন স্টার হয়ে গিয়েছে৷ একটা ঘটনা মনে আছে৷ শুটিং চলাকালীন মৃণালের বাবার মৃত্যু হয়েছিল৷ তা সত্ত্বেও তিনি শুটিং করতে এসেছিলেন৷ উত্তম এই খবর পেয়ে মৃণালকে বললেন, ‘আপনি আজ এসেছেন কেন? আমার ডেট-এর জন্যে ভাববেন না৷ শুটিং বন্ধ রেখে বাড়ি যান৷’ ছবিতে সাবিত্রীও ছিলেন৷ সাবিত্রী তো প্রভাদেবীর মাপের অভিনেত্রী৷ ভালো করেছিল৷ ছবি বিশ্বাসও ছিলেন৷ তবে এটা মনে আছে, উত্তম, সাবিত্রী, ছবি বিশ্বাস- তাঁদের প্রত্যেককে প্রযোজক নিজেই জোগাড় করেছিলেন, এ ব্যাপারে পরিচালকের কোনও মতামত ছিল কি না, জানি না৷ যিনি প্রযোজনা করেছিলেন, তাঁর স্বামীর জাহাজ কোম্পানির মাল ভর্তি-খালাস করার ব্যবসা ছিল৷ তাঁর টাকাতেই সম্ভবত কাজটা হয়েছে৷ আরও একটু বেশি অর্থ যদি খরচ করতেন ছবিটার জন্যে, তা হলে ভালো হত৷ আমরাও ছবিটা বানিয়ে আনন্দ পেতাম৷



নীল আকাশের নীচে...

মৃণাল সেনের দ্বিতীয় ছবি নীল আকাশের নীচে তাঁকে স্থানীয় পরিচিতি এনে দেয়।

কলকাতা শহরের লাইটহাউস এবং অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহে (রাধা-পূর্ণ-প্রাচী) ‘নীল আকাশের নীচে’ হইহই করে চলছে। মুক্তি পেয়েছিল ২০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৯। একটা রাজনীতি সচেতন সিনেমা, সে বিষয়ে কোনও সংশয় নেই। ১৯৫৪ সালের এপ্রিল মাসে তিব্বতে বাণিজ্য ঘিরে জওহরলাল নেহরু এবং চৌ-এন লাই দু’জনেরই সম্মতিক্রমে চিন-ভারতের মধ্যে পঞ্চশীল শান্তি চুক্তি হয়েছে৷ ঐতিহাসিকের মতে দলাই লামার তিব্বত থেকে চিনা আক্রমণের কারণে পালিয়ে আসা ইতিহাসে ‘অন্যতম নিষ্ক্রমণ’ হিসেবে চিহ্নিত৷ রাজনীতি সচেতন মৃণাল এই বিষয়গুলো অনুধাবন করতেন।

তিব্বতের বিদ্রোহ দমনের প্রেক্ষিতে এবং পঞ্চশীল-চুক্তির প্রেক্ষিতে চিনা সরকারের ঘটনা মৃণাল সেন বিলক্ষণ জানতেন৷ অতএব, ১৯৫৮ সালের কোনও এক সময় মহাদেবী ভার্মা-র চার পাতার ছোটো গল্প ‘চীনি ফেরিওয়ালা’ নির্ভর (মৃণাল সেন অবিশ্যি ‘গল্প’ শব্দটি ব্যবহার করেননি তাঁর এক সাক্ষাত্কারে৷ বলেছেন ‘মেমোয়ারস’ অর্থাত্‍, স্মৃতিকথা) ‘নীল আকাশের নীচে’-র চিত্রনাট্যটি খুব সচেতন হয়েই লিখছেন ধরে নিতে হবে৷ সেই হিসেবে ‘নীল আকাশের নীচে’ মৃণাল সেনের প্রথম প্রত্যক্ষ-রাজনৈতিক সিনেমা হিসেবে চিহ্নিত৷

১৯৩০ সালের কলকাতার প্রেক্ষিতে এই ছবির কাহিনি৷ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কাবুলিওয়ালা’ গল্প বা ১৯৫৭ সালে তৈরি তপন সিংহ’র ছবির সঙ্গে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায় এই কাহিনির সঙ্গে৷ চিন দেশ থেকে ওয়াংলু নামের এক চিনে ফেরিওয়ালা কলকাতায় আসছে শহরের রাস্তায়-রাস্তায়, বাড়ির দরজায়-দরজায় ফিরি করতে৷ মনে থাকবে, ‘কাবুলিওয়ালা’তে আফগান রহমত বিক্রি করত কাজু-পেস্তা-কিসমিস আখরোট। কলকাতার ছোট্টো মেয়ে মিনি-র মধ্যে রহমত খুঁজে পেয়েছিল তাঁর মেয়েকে। চিনি ওয়াংলু ফিরি করে চিনা সিল্কের কাপড়৷ আর ওয়াংলু খুঁজে পায় বিবাহিতা বাসন্তীর মধ্যে তার দিদিকে৷ দু’জনের মধ্যে একটা বন্ধন তৈরি হয়, যে-বন্ধনই ছবির কাহিনির মূল চালিকা শক্তি৷ ছবির শেষে জাহাজে চেপে দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ নিতে ওয়াংলু ফিরে যায় চিনে৷ সেই রহমতের মতই। এই সিনেমার সাবপ্লট হল বাসন্তীর স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে গোপনে জড়িত থাকা এবং এ কারণে ব্রিটিশ পুলিশের তাকে গ্রেপ্তার করা এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া৷ কাহিনি শেষ হচ্ছে ১৯৩৮ সালে৷ জাপানের আক্রমণের কারণে বিশ্বের দরবারে চিনা জনসাধারণের আবেদনে এবং সাম্রাজ্যবাদের পররাজ্য লিপ্সার তীব্র নিন্দায় রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য দিয়ে৷ দেশের মানুষের ডাকে দেশকে স্বাধীন করার বাসনা নিয়ে ওয়াংলু দেশে ফেরত চলে যায়৷

‘নীল আকাশের নীচে’ ছবিটি কি কেবলই সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী, ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ছবি? ছবিতে সমান্তরাল ভাবে বলা হয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং জাপানি সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বক্তব্য৷ ১৯৩০ সালের প্রেক্ষিতের গল্প হলেও বলছেন কিন্তু মৃণাল সেন ১৯৫৯ সালে, যখন চিন সাম্রাজ্যবাদ আগ্রাসন চালাচ্ছে তিব্বতে৷ মৃণাল সেন চিন দেশের সেই ভূমিকা নিয়ে পরবর্তীকালে কিচ্ছুটি বলেননি। একেবারেই নিরুত্তর থেকেছেন৷ শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালে চিন-ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষিতে তাঁর এই ছবি নিষিদ্ধ করা হলে স্বয়ং জওহরলাল নেহরু মনে করেন ছবিটিকে চিনের ১৯৬২ সালের ভূমিকার প্রেক্ষিতে বিচার করা ঠিক নয়৷ তিনি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন৷ অথচ, চিন-ভারত এই যুদ্ধের কারণেই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্দরমহলে সোভিয়েত পথ-চিনা পথের বিভাজনের ফলে দল ভেঙে যায়৷ চিনা পথের সমর্থকরা মনে করতেন চিন কখনওই ভারত আক্রমণ করেনি৷ মৃণাল সেনও তাই মনে করতেন৷

ছবিটির সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী রাজনীতি তা হলে কি সীমাবদ্ধ ১৯৩০ সাল পর্যন্তই? তার পর অবশ্য চিনের ভূমিকা নিয়ে মৃণাল সেন এই ছবিটির পরিপ্রেক্ষিতে আর কোনও কথা বলেননি৷ পরবর্তী সময়ে মৌন থাকা অর্থই মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির চিন-সম্পর্কে মতামতকেই সমর্থন করা৷ নৃপেন চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘মৃণালদার ওপিনিয়ন ছিল চিন ভারত আক্রমণ করেনি৷ শুধু মৃণালদা নয়, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ও সে সময় এই মতবাদেই বিশ্বাসী ছিল৷’ ‘নীল আকাশের নীচে’-র রাজনৈতিক মতবাদ তাই ১৯৩০-এই শুধু সীমাবদ্ধ নয়, ১৯৫৯ এবং তার পরবর্তী সময়েও তা বিস্তৃত৷ কারণ, ১৯৫৮ সালের শেষ দিকে তিনি যখন এই ছবির চিত্রনাট্য লিখছেন, তখন তিনি চিন দেশের সমসাময়িক রাজনীতির প্রতি এতটাই শ্রদ্ধাশীল এবং বিশ্বাসী যে, সে-দেশের কুড়ি বছর আগের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী এবং ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষিতটাকেই বড়ো করে তুলে ধরেছেন ছবিতে৷ তাকে সমান্তরালে রেখেছেন ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের সঙ্গে৷ অর্থাৎ এ ছবিতে মৃণাল সেন যা করেছেন, তা তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকেই করেছেন৷ এই বিশ্বাসেই তিনি আজীবন অটুট থেকেছেন৷ ছবিটি ভালো চলেছে সন্দেহ নেই। আজও মনে আছে ছবিটিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে এবং কণ্ঠে দু’টি গান৷ ‘ও নদীরে’ এবং ‘নীল আকাশের নীচে এই পৃথিবী’৷ মৃণাল সেনের ছবিতে গান? তিনি তো ছবিতে গান খুব একটা পছন্দ করতেন না। নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, ‘গান ব্যবহার করা মৃণালদার পছন্দ ছিল না৷ লক্ষ্য করে দেখবে, গান দুটো যেন বিবেকের কণ্ঠস্বর, কাহিনির সঙ্গে কোনও যোগসূত্র নেই৷ মৃণালদা গদ্য করে গানের সারবস্তু লিখে দিয়েছিলেন, সেটাই গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার গানে রূপান্তরিত করেছিলেন৷’ তাহলে এই গানদু’টি কি মৃণাল সেন প্রযোজকের চাপে ছবিতে রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন? ছবির প্রযোজক ছিলেন স্বয়ং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়৷ এটিই তাঁর প্রথম প্রযোজিত ছবি৷



১৯৫৭ সালে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বোম্বাইতে রীতিমতো প্রতিষ্ঠিত সঙ্গীতকার৷ তিনি ঠিক করলেন বাংলা ছবি প্রযোজনা করবেন৷ পরিচালক হবেন সলিল চৌধুরী৷ স্ত্রী বেলার নাম যুক্ত করে তৈরি হল ‘হেমন্ত-বেলা প্রোডাকশনস’৷ হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের সক্রিয় পরামর্শে ছবির গল্প ঠিক হল, ‘চীনে ফেরিওয়ালা’৷ লেখিকা মহাদেবী ভার্মা, হিন্দি ভাষার প্রখ্যাত কবি, সাহিত্যিক এবং স্বাধীনতাসংগ্রামী৷ পরিচালক সলিল চৌধুরী চাইলেন ছবির চিত্রনাট্য লিখুন মৃণাল সেন৷ কিন্তু সে যাত্রায় শেষ অবধি ছবিটা হল না৷ এর বেশ কিছুদিন পর হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আবার মৃণাল সেনকে বলেন, ছবিটি আপনিই পরিচালনা করুন৷ শর্ত একটাই, এই ছবির নায়ক হবেন উত্তমকুমার৷ আবার উত্তমকুমার? হেমন্তবাবু তাঁর শর্ত থেকে সরতে রাজি হচ্ছিলেন না৷ শেষ অবধি মৃণাল সেনকে বাঁচিয়ে দেন স্বয়ং উত্তমকুমারই৷ তিনি ব্যস্ততার কারণে ছবির নায়ক হতে রাজি হলেন না৷ শেষে মৃণাল সেনের ইচ্ছেতেই নায়ক হন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়৷ মৃণাল সেন চিত্রনাট্যটি আমূল সংশোধন করে ছবির কাজ শুরু করেন কলকাতাতেই৷ ‘নীল আকাশের নীচে’ সফল ব্যবসা করে৷ এরপর থেকে আর প্রযোজক পেতে অসুবিধা হয়নি মৃণালের৷ যদিও মৃণাল সেন বলেছেন, ‘এই ছবিটা এখন আর আমার ভালো লাগে না৷’ মুক্তির প্রায় দু’বছর পর কিছু আমলার বুদ্ধিতে ছবিটি নিষিদ্ধ হয়৷ চিন-ভারত যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে৷ দু’বছর পর সুচেতা কৃপালিনীর সক্রিয়তায় তত্কায়লীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ছবিটি দেখেন৷ তাঁর আদেশেই ছবিটিকে মুক্ত করা হয়৷

মৃণাল সেনই বলেছেন,‘প্রথমে আমাকে চিত্রনাট্য লিখতে বলা হয়েছিল৷ পরে পরিচালনার দায়িত্বও আমার উপর আসে৷ গল্পের নায়িকা একনিষ্ঠ কংগ্রেসি৷ খদ্দর ছাড়া কিছু পরেন না৷ তার সঙ্গে এই চিনে ফেরিওয়ালার দেখা৷ পাক্কা সেলসম্যান, বলিয়ে-কইয়ে৷ তখন ও রকম অনেক চিনে কলকাতায় দেখা যেত৷ এই ফেরিওয়ালা মহিলাকে কিছু গছাবেই৷ চাইনিজ সিল্ক বা ওই জাতীয় কিছু। মহিলা তাকে বোঝালেন, ‘দেখো, আমি বিদেশি কাপড় পরি না৷’ ফেরিওয়ালা প্রতিবাদ করে বলল, ‘কে বলে আমি বিদেশি? দেখো আমার চোখ নীল নয়, আমার নাক চ্যাপ্টা, টিকোলো নয়- আমি কেন বিদেশি হব৷’ অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই বিদেশি, অন্যেরা নয়৷ এখান থেকেই তাদের অন্তরঙ্গতা শুরু৷’ মৃণাল সেন স্বীকার করেন, ছবিটি সেন্টিমেন্টাল, ছবির কাঠামোতেও অনেক গণ্ডগোল আছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে তিনি এখনও একমত৷ ‘আমি বলতে চেয়েছিলাম যে আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম পৃথিবীর অন্যান্য দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে একসূত্রে বাঁধা৷ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ আর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম মূলত এক৷ আমার এখনও মনে হয় আমার চিন্তাধারা ভুল ছিল না৷’

মৃণাল সেনের ‘নীল আকাশের নীচে’ ছবিতে তৎকালীন বাংলা সিনেমার মূল স্রোতের শিল্পীরাই সব অভিনয় করলেন৷ যেমন কালী বন্দ্যোপাধ্যায়, মঞ্জু দে, বিকাশ রায়, স্মৃতিরেখা বিশ্বাস, সুরুচি সেনগুপ্ত, মঞ্জু মুখোপাধ্যায় প্রমুখ৷ একজন চিনা মানুষ এই ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন৷ তিনি লি চিউ ফং৷ ইনি ছিলেন তত্কামলীন কলকাতার চিনাপট্টি টেরেটি বাজারের বাসিন্দা৷ একে অবশ্য খুঁজে বার করেছিলেন মৃণাল সেনই৷ খুবই ছোটো এক ভূমিকায় ছিলেন লি চিউ ফং৷ সমস্যা হয়েছিল কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে কী করে মেক আপে চিনা ফেরিওয়ালা তৈরি করা যায়! তাই নিয়ে। কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানতে পারি, ‘এই ব্যাপারে মৃণাল সেন তখন দারুণ খেটেছিলেন৷ শুধু আমার মেকআপের জন্যেই তিনি মাদ্রাজ অবধি ছুটেছিলেন৷ শেষ অবধি অবশ্য আমার মেকআপ করেছিলেন টালিগঞ্জের শক্তি সেনই৷’


ছবিতে ওয়াংলুর ফ্ল্যাশব্যাকে চিনা মুলুকের শানটুং গ্রাম, খরস্রোতা নদী, পিছনে পাহাড় ভারি চমৎকার লেগেছিল। ছবিতে প্রখ্যাত পরিচালক ইন্দর সেন ছিলেন সহকারী৷ সেটাই তাঁর সিনেমায় প্রথম কাজ৷ বললেন, ‘ছবির শুটিং হয়েছিল নিউ থিয়েটার্স-১ স্টুডিয়োতে৷ কিন্তু এই আউটডোরটা হয়েছিল উত্তরবঙ্গে৷ নদীটা তিস্তা৷’

মৃণাল সেনের চিত্রনাট্যটি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের এত পছন্দ হয়, যে শেষ পর্যন্ত মৃণাল সেনকেই তিনি কন্ট্রাক্ট সই করানোর জন্য বম্বে ডেকে পাঠান৷ তবে ছবির শুটিং চলাকালীন একটি দিনের জন্যেও হেমন্ত স্টুডিয়োতে আসেননি৷

প্যারাডাইস ক্যাফে-তে কালী বন্দোপাধ্যায় আসতেন নিয়মিত৷ মৃণাল সেন ওঁকেই ওয়াংলুর চরিত্রে নির্বাচন করেছিল৷ টেরিটি বাজারে নানকিং রেস্টুরেন্টের কাছে এক চিনে ভদ্রলোক থাকতেন৷ তিনি হলেন ওয়াংলু’র মডেল৷ তিনিও ফিরি করতেন এই শহরেই৷ মৃণালদা এবং কালী দু’জনেই চিনে কায়দাকানুন রীতি-নীতি সব তাঁর কাছ থেকেই শেখে৷ অসম্ভব পরিশ্রম করেছিল দু’জনেই এই ছবিটার জন্যে৷’ ইন্দর সেন জানাচ্ছেন, ‘এই প্রথম পুরুষ চরিত্রের জন্যে দু’জন মেকআপ আর্টিস্ট ব্যবহৃত হল টালিগঞ্জে৷ শক্তি সেন এবং অনন্ত দাস৷ দু’জনেই কালী বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেকআপ করেছিলেন৷ স্টুডিয়োতে তখন অনেকেই কালী বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘চিনে-কালী’ বলে ডাকত৷’

নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ‘কিছুতেই ছবির শুটিং-এর সময়ে একটা স্বদেশিদের মিছিলে পুলিশের লাঠি চালানোর দৃশ্যটা তুলতে পারা যাচ্ছে না৷ আমি ছবির পরিচালককে বললাম আমার হাতে একটা জাতীয় ফ্ল্যাগ দাও, আর ক্যামেরাকে বলো আমাকে ফলো করতে৷ ক্যামেরা চালু হয়ে গেল৷ আমি ফ্ল্যাগ নিয়ে দৌড়চ্ছি, আমাকে দেখে অন্যরাও আমার পিছনে দৌড়চ্ছে। তার পিছনে পুলিশ তাড়া করেছে৷ ব্যাস, এক শটে ওকে৷ পরে দেখি এই শটটাই বিভিন্ন ডকুমেন্টারিতে স্বাধীনতা আন্দোলনের আসল ফুটেজ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে৷ বোঝো কাণ্ড!’ শুটিংটা হয়েছিল ভবানীপুর লেডিজ পার্ক-এ৷ মৃণাল সেন ‘নীল আকাশের নীচে’ প্রসঙ্গে তথ্যচিত্র ‘সেলফ অ্যান্ড সিনেমা: মৃণাল সেন’-এ বলেছেন, ‘টেকনিক্যালি হোপলেস’৷ প্রসঙ্গত, এই তথ্যচিত্রটি পরিচালনা করেছেন নৃপেন গঙ্গোপাধ্যায়৷ তিনিই বলছিলেন, ‘ছবি তো রমরম করে চলছে৷ তখন আমরা পূর্ণ সিনেমার কাছেও আড্ডা মারতাম৷ মণীশ ঘটক, প্রেমেন্দ্র মিত্র-র পাশাপাশি এই আড্ডায় প্রযোজক বিজয় চট্টোপাধ্যায়ও আসতেন৷ এক দিন বিজয়বাবু বললেন, তিনি মৃণাল সেনকে দিয়ে পরের ছবিটা করাতে চান৷ খুব দ্রুত মৃণালদা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন পরের ছবি ‘বাইশে শ্রাবণ’ নিয়ে৷’


মুক্তিযুদ্ধ ও মৃণাল সেন

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ান মৃণাল সেন। ছুটেও গিয়েছিলেন বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে। বাড়িয়ে দিয়েছিলেন সহযোগিতার হাত। কবি জসীমউদ্দীনের সঙ্গে মৃণাল সেনের গভীর সম্পর্ক ছিল। মৃণাল সেন বলেছিলেন, তাঁর ছোট বোন রেবা ছিল তাঁদের পরিবারের সবচেয়ে আদরের। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে সেই ছোট্ট বোনটি বাড়ির পুকুরের জলে ডুবে মারা যায়। তাঁকে সমাহিত করা হয় তাদের বাড়ির মাটিতেই। রেবার মৃত্যুতে ভেঙে পড়ে তাঁদের গোটা পরিবার। ওই সময় কবি জসীমউদ্দীন রেবার উদ্দেশে একটি কবিতা লিখে তা তুলে দেন মৃণাল সেনের হাতে। একেবারে অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত।

সিনেমা তৈরির কারিগর মৃণাল সেন ১৮টি ছবির জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পেয়েছিলেন ১২টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। বাংলা, হিন্দি, ওড়িশি ও তেলেগু ভাষায় ছবি করেছেন। তিনি ২৬টি ছবি তৈরি করেছেন। তৈরি করেছেন ১৪টি স্বল্পদৈর্ঘ্যের ছবি আর চারটি প্রামাণ্য চিত্র। আবার মৃণাল সেনকে নিয়ে কলকাতায় তৈরি হয়েছে পাঁচটি তথ্যচিত্র।

মৃণাল সেনের নির্মিত ছবির মধ্যে রয়েছে ‘কলকাতা ৭১’, ‘ইন্টারভিউ’, ‘পদাতিক’, ‘একদিন প্রতিদিন’, ‘মৃগয়া’, ‘আকালের সন্ধানে’, ‘তাহাদের কথা’, ‘কোরাস’, ‘ভুবন সোম’, ‘খারিজ’, ‘পরশুরাম’, ‘খন্দহর’ ইত্যাদি। তাঁর নির্মিত ছবি মস্কো, বার্লিন, কান, শিকাগো, মন্ট্রিল, ভেনিস, কায়রো, চেকোশ্লোভাকিয়া, স্পেন, ইতালি, তিউনিসিয়া ও কলম্বোর চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছে। তিনি ভারতের বিনোদন জগতের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (২০০৫) পান। পান ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মশ্রী (১৯৮১)। ফরাসি সরকারের দেওয়া ‘কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব আর্টস লেটারস’ সম্মানও পেয়েছেন মৃণাল সেন।


আমি দারিদ্র্য নিয়ে ছবি করি

সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের পাশাপাশি একমাত্র মৃণাল সেনই নানান ভারতীয় ভাষায় ছবি করেছেন। মৃণালবাবু বলতেন, ‘আমি দারিদ্র্য নিয়ে ছবি করি। আফ্রিকাতে গিয়ে সোয়াহিলি ভাষায় ছবি করতেও আমার কোনও অসুবিধে হবে না...।’ এই দারিদ্রকে ধরতে নগর উপকণ্ঠের অলিগলি ছাড়িয়ে বারবার গ্রামের দিকে মুখ ফিরিয়েছেন মৃণাল। বাংলার গ্রাম তো বটেই, বাদ যায়নি অন্য প্রদেশও।

‘মাটির মনিষ’ করার জন্যে ওড়িশার গ্রামে, ‘ভুবন সোম’ করার সময়ে গুজরাতের গ্রামে, ‘ওকা উড়ি কথা’ বা ‘কফন’ করার সময়ে তেলেঙ্গানার গ্রামে গিয়েছিলেন মৃণাল সেন। তেলেঙ্গানায় তাঁকে সর্বক্ষণ সাহায্য করার জন্যে থাকতেন কৃষ্ণমূর্তি। ভদ্রলোককে একদিন চিত্রনাট্যের অংশ পড়ে শোনাচ্ছেন মৃণালবাবু, সেখানে একটা চরিত্র সম্পর্কে লেখা ছিল, লোকটা সারাদিন খায়-দায় আর মোষের মতো পড়ে-পড়ে ঘুমোয়। শুনেই কৃষ্ণমূর্তি খেপে আগুন, বললেন ‘আপনি শহরের লোক, গ্রামের কিস্যু জানেন না। এখানকার গ্রামের লোকেদের জিজ্ঞাসা করে দেখুন তো, ওরা কখনও মোষকে অলস বা অকর্মা দেখেছে কি না। মোষ আমাদের সব রকম কাজের নিত্যসঙ্গী।’ চিত্রনাট্য বদলে ফেললেন মৃণাল সেন।



‘বাইশে শ্রাবণ’

তাঁর তৃতীয় ছবি বাইশে শ্রাবণ থেকে তিনি আর্ন্তজাতিক পরিচিতি পান। পঞ্চাশের দশকের শেষে তৈরি ‘বাইশে শ্রাবণ’ এক মাঝবয়সী মানুষের সঙ্গে তার থেকে বয়সে খুব ছোট একটি মেয়ের দাম্পত্য নিয়ে ছবি। কলকাতা থেকে অনেক দূরের একটা গ্রামে ওই ছোট্ট সংসারে একদিন ঘনিয়ে এল ১৯৪৩-এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। কিন্তু দুর্ভিক্ষে কত লোক অনাহারে মারা গেল তা নিয়ে তাঁর ছবি নয়। তাঁর ছবি এই কর্কশ দুর্ভিক্ষ কখন কীভাবে ওই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্কটাকে তিক্ত করে তুলল তা নিয়ে। পরস্পরের মধ্যে যেন তখন নরকের পরিবেশ, অবস্থার চাপে পারস্পরিক সম্ভ্রমটুকুও হারিয়ে ফেলল তারা। সময়টা ছিল বড় নিষ্ঠুর। নিয়ম ভেঙে চলচ্চিত্র নির্মাণেই যিনি সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিলেন। তিনি পাল্টে দিয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের ধারা ও গতি-প্রকৃতি।

১৯৪১, ৭ই আগস্ট। ১৩৪৮-এর ২২ শে শ্রাবণ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেহাবসান হয়। ভিড়, ভীষণ ভিড়। বিরাট শোকযাত্রা। যেন মানুষের ঢল। মৃণাল সেনও ওই শোভাযাত্রায় ছিলেন। বেশ কিছুদূর শোকযাত্রার সঙ্গে পা মেলানোর পর ঠিক করেন, শোকযাত্রা শ্মশানে পৌঁছনোর আগেই তিনি শ্মশানে পৌঁছবেন। শোকযাত্রা শ্মশানে পৌঁছনোর আগেই তিনি শ্মশানে চলে যান। দেখেন অনেক লোকের মধ্যে একজন সুঠাম দেহী মধ্যবয়সী ব্যক্তি মৃত শিশুকে কোলে করে সৎকারের জন্য উপস্থিত হয়েছেন দাহ করবেন বলে। হঠাৎ পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙে ওই শোকযাত্রা শ্মশানে পৌঁছায়। ওই ভিড়ে শিশু সমেত ভদ্রলোকটিও হারিয়ে গেলেন, চারিদিকে লোকারণ্য, দিশাহারা। পদপিষ্ট হয়েছেন কত লোক জানা নেই। তার ভেতর শিশু কোলে ওই লোকটাও আছে, হয়তো পদপিষ্ট হয়েছেন, কে জানে। মৃণাল সেনের লেখা থেকে পাচ্ছি, ‘years later, I called my third film Baise Sravana, the wedding day of middle aged man, married to a sweet sixteen, sweet but unlettered except the bare knowledge of a just Bengali Alphabet. She was a Woman of grace and was no villain. The film was just about the ups and down of the relationship, just that.’

বাদ সাধলো তারিখ। তারিখটা যে ২২শে শ্রাবণ। যদিও ওই তারিখে কতলোকের মৃত্যু হয়েছে তার ঠিক নেই। মৃণাল সেনের কথায় ‘But the simple reason they were married on the same date like the child was probably smashed in the stampede.’ সেন্সর বোর্ড এই তারিখটার পরিবর্তন চাইলেন। তারা বলল, ওই ছবির তারিখ এবং বিয়ের দিন ২১শে বা ২৩শে শ্রাবণ করুন। তারিখটা না বদলালে সেন্সর সার্টিফিকেট দেওয়া যাবে না। কারণ ২২শে শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিন। অতএব তারিখ পালটাতে হবে। মৃণাল সেন যথারীতি রাজি হননি। তিনি এই নির্দেশের বিরুদ্ধে সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেন। চেয়ারম্যানের নিযুক্ত কমিটি ছবিটি দেখেন এবং মৃণাল সেনের বক্তব্য শোনেন। ওঁর বক্তব্যের সঙ্গে সহমত হয়ে ২২শে শ্রাবণ-কে সেন্সর সার্টিফিকেট দেয় সেন্সর বোর্ড।

২২শে শ্রাবণ একটি উল্লেখযোগ্য ছবি। দেশে বিদেশে বেশ নাম হয়। মৃণাল সেনও একজন গুরুত্বপূর্ণ পরিচালক হিসাবে গ্রহণযোগ্যতা পেলেন। ২২শে শ্রাবণ তৈরি করে মৃণাল সেন খুশি হয়েছিলেন। তিনি এই ছবি সম্বন্ধে বলেছেন “I would not collect great personally I tell great.” ২২শে শ্রাবণ ছবিতে পরিচালক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করেছেন, যেগুলো ওঁর আগে এদেশের কোনও পরিচালক ছবিতে আনার চেষ্টাই করেননি। মৃণাল সেন এই ছবি সম্পর্কে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘‘২২শে শ্রাবণে দেখবেন অল্প বয়সের একটি মেয়ের সঙ্গে মাঝবয়সী একজন পুরুষের বিয়ে হয়। পুরুষটি সুদর্শন নয়। মেয়েটির সঙ্গে পুরুষটির সম্পর্কের জন্য ইরোশন ঘটে সম্পর্ক, যখন ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তখন সেটা ঘটে যুদ্ধের ভেতর, দুর্ভিক্ষের সময়। যেখানে মেয়েটা বলে, না খেয়ে থাকাটা আমার কাছে বড় কথা নয়, আমি অনেকদিন না খেয়ে থেকেছি, যেটা আমাকে ভাবায়, আমাকে পীড়িত করে, তা হলো মানুষটা এখন পালটে গেছে। আমি আমার শুভদৃষ্টির সময় ভেঙে পড়িনি কিন্তু আজ আর সহ্য করতে পারছি না মানুষটাকে। ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে পড়ে একটি সত্য কথা বেরিয়ে পড়লো মেয়েটির মুখে। She has been denied of a woman existence. সেটা সে পরে বুঝতে পেরেছে।’’ ২২শে শ্রাবণ একটি প্রতিবাদী ছবি, নারীবাদী মৃণাল সেনের রাজনৈতিক মতাদর্শের ছবি। রাজনৈতিক চেতনার ছবি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে মৃণাল সেন পরবর্তীকালে যে রাজনৈতিক মতাদর্শকে ছবিতে ব্যবহার করেছেন তারই সূচনা হলো এই ২২শে শ্রাবণ ছবি দিয়েই।



যেন বিশ্বদর্শন...

বাংলা চলচ্চিত্রের আধুনিক রূপরেখা সংযোজন করা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই পরিচালকের প্রতিটি ছবিতে ক্ষুদ্র গলি থেকে রাজপথ, বস্তি থেকে অট্টালিকার চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন যা আর শেষ পর্যন্ত শুধু কলকাতার মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি, পেয়েছে বৈশ্বিক রূপ। আর এখানেই মৃণাল সেন নির্মাতা হিসেবে অনন্য, আর সবার থেকে আলাদা। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের বিশেষ বন্ধু মৃণাল সেন ছবি করেছেন বিদ্রোহী মেজাজে।

বাঙালির ইতিহাসে, বাংলার সংস্কৃতির শেকড়ে আবদ্ধ থেকে, যে কজন নিজেকে বিশ্বময়, নিরহংকার, যাদের কাজে আমাদের অহংকার হয়; মৃণাল সেন তাঁদের মধ্যে একজন। ‘জীবনে যদি কখনও অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে, তবে আমরা বলি, একেবারে সিনেমার মতো। কারণ, সিনেমার গল্পটা স্বাভাবিক জীবনের গল্প হবে না। অধিকাংশ সময়ই আমাদের মাথায় তা ডিফল্ট হিসেবে সেট করা থাকে। সেই ডিফল্ট ভাবনার বাইরে গিয়ে আমরা তাই ভাবতেও চাই না। কারণ, আমরা চাই একটা নির্ঝঞ্ঝাট ও সমান্তরাল জীবন…’। কথাগুলো মৃণাল সেনের। সত্যিই যিনি আদর্শ বাঙালির জন্য, বর্তমানের নির্মাতাদের জন্য আর ভবিষ্যৎ নির্মাতাদের ঠিকানা।আজন্ম মার্কসবাদে বিশ্বাসী হলেও তিনি রুদ্ধ কমিউনিস্টের জীবনদর্শনে বিশ্বাসী নন। আর তাই সারা জীবন ধরে তিনি স্পষ্টভাবে সবকিছু বলে গিয়েছেন। জীবনে দেশে বিদেশে অজস্র পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন মৃণাল সেন একথা আগেও বলেছি। ১৯৮১ সালে তিনি পদ্মভূষণ পান। ২০০৫ সালে তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার পান। তিনি ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ অবধি ভারতীয় সংসদের সাম্মানিক সদস্যপদ লাভ করেন। ফরাসি সরকার তাঁকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান কম্যান্ডার অফ দি অর্ডার অফ আর্টস অ্যান্ড লেটারস (Ordre des Arts et des Lettres ) সম্মানে সম্মানিত করেন। ২০০০ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ‘অর্ডার অফ ফ্রেন্ডশিপ সম্মানে ভূষিত করেন। তার পরিচালিত চলচ্চিত্রগুলি প্রায় সবকটি বড় চলচ্চিত্র উৎসব থেকে পুরস্কার জয় করেছে। তিনি ইন্টারন্যাশন্যাল ফেডারেশন অফ দি ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভারত এবং ভারতের বাইরের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে।

প্রতিনিয়ত নিয়ম ভেঙে নতুন নিয়ম সৃষ্টিতে ওঁর ছিল অদম্য নেশা। দক্ষিণ কলকাতার পদ্মপুকুরের কাছে এক বহুতলের পাঁচতলার ফ্ল্যাটে মৃণাল সেন থাকতেন।


প্রতিবাদের ভাষা...

উপন্যাস, কবিতা, নাটক, চিত্রকলার মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমেও বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবাদ। রাজনীতিমনস্ক চলচ্চিত্রকাররা নিজেদের কাজে কখনও সরাসরিভাবে, কখনও রূপকের মাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সমালোচনা তুলে ধরেছেন। চলচ্চিত্র ব্যবহৃত হয়েছে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে, সমাজে টিকে থাকা অন্যায় আর শোষণের জটিল রূপ সম্পর্কে দর্শকদের মনে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য। বাণিজ্যিক উদ্দেশে তৈরি বিনোদনধর্মী ছবি বহু দর্শকের কাছেই প্রিয় এবং এই ধরনের ছবির প্রয়োজনীয়তাও অস্বীকার করার যুক্তি নেই। তবে অনেকে মনে করেন বিনোদন প্রদানই হলো চলচ্চিত্রের মূল কাজ। মনে করা হয় কোনো চলচ্চিত্র যদি দর্শককে বিনোদনের মাধ্যমে আকৃষ্ট করতে না পারে তাহলে সেই চলচ্চিত্রের বক্তব্যের প্রতিও দর্শক মনোযোগী হবে না। এমন ধারণার সাথে যৌক্তিকভাবে দ্বিমত পোষণ করা যায়। বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্র তৈরি হবে তা স্বাভাবিক কিন্তু সব চলচ্চিত্রেই যে বিনোদনধর্মী উপাদান থাকতে হবে এমন ধারণা অগ্রহণযোগ্য। বিনোদননির্ভর বাণিজ্যিক ছবিতে সমাজের জটিল সমস্যাগুলো থেকে দর্শকের মনোযোগ অন্য দিকে সরিয়ে রাখা হয়। কারণ আনন্দ প্রদানই এই ধরনের ছবির মূল লক্ষ্য, দর্শককে বিচলিত বা ক্ষুব্ধ করা নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলো কখনও সেখানে উপস্থাপিত হলেও আনন্দদায়ক উপাদান প্রাধান্য দেওয়ার কারণে দর্শক-মনে তা যথেষ্ট অস্বস্তি তৈরি করতে পারে না। আবার কখনও খুবই শক্তিশালী কোনও নায়কের অশুভ শক্তিকে পরাজিত করার অতিরঞ্জিত ঘটনা দেখানোর মাধ্যমে তুলে ধরা হয় সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার অবাস্তব সমাধান।

কিন্তু সমাজে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান গ্রহণে মানুষকে আগ্রহী করে তোলা সমাজের স্বার্থেই জরুরি। রুশ কবি মায়াকোভস্কি যেমন বলেছিলেন, ‘শিল্পকলায় মানুষের ঐতিহাসিক সংগ্রামের বিবরণই শুধু প্রতিফলিত হয় না, শিল্পকলা মানুষের সংগ্রামে একটি হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করে।’ আর রুশ বিপ্লবের পর বিপ্লবী চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য কাজ করা প্রসঙ্গে লেনিন সেই সময়ের সাংস্কৃতিক কমিশার লুনাচারস্কিকে বলেছিলেন সব ধরনের আর্টের মধ্যে চলচ্চিত্রই তাদের কাছে সেই সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করার ব্যাপারে চলচ্চিত্রের সক্ষমতা লেনিন অনুধাবন করেছিলেন সঠিকভাবে। রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তৈরি চিন্তাশীল চলচ্চিত্রে বিনোদন দেওয়ার চেষ্টা গুরুত্ব পায় না কারণ বিনোদনের আধিক্য দর্শককে নিষ্ক্রিয়ভাবে আনন্দ উপভোগেই মগ্ন করে তুলবে। বিনোদনের সুখানুভূতির কারণে সামাজিক অন্যায়ের কদর্য এবং অনুভূতিহীন দিকগুলো দর্শককে পীড়িত করতে পারবে না। আর সমাজে টিকে থাকা সমস্যার উপস্থাপন দর্শককে আঘাত করতে কিংবা উৎকণ্ঠিত করতে সক্ষম না হলে সেই সমস্যাগুলোর বিরুদ্ধে দর্শকের সক্রিয় বিরোধিতা তৈরি হবে তাও আশা করা যায় না। কোনো ছবিতে যদি সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমস্যার সমালোচনা উপস্থাপন করাই মূল উদ্দেশ্য হয়, সে ক্ষেত্রে দর্শককে গতানুগতিকভাবে বিনোদন দেওয়া হলে সেই ছবির উদ্দেশ্য এবং বক্তব্য যথেষ্ট কার্যকর না হওয়াই স্বাভাবিক। ফলে বক্তব্য ও নির্মাণশৈলীর দিক থেকে চিন্তাশীল চলচ্চিত্র এবং শুধুই আর্থিক মুনাফা অর্জনের জন্য তৈরি বিনোদনধর্মী চলচ্চিত্রের মধ্যে দেখা যায় সুস্পষ্ট পার্থক্য।

স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী এবং স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে বিভিন্ন দশকে বাংলাদেশের মানুষ প্রত্যক্ষ করেছে রাজনৈতিকভাবে অস্থির এবং অনিশ্চিত পরিস্থিতি। টিকে থাকা রাজনৈতিক শোষণ এবং দুর্নীতি মানুষকে পীড়িত এবং ক্ষুব্ধ করেছে। মানুষ হয়েছে প্রতিবাদমুখর, বিদ্যমান শোষণমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আমরা দেখেছি তাদের তীব্র প্রতিবাদ। স্বাধীনতার আগে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যখন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের ক্ষোভ এবং আন্দোলন বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তখন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি চলচ্চিত্রকাররা নিজেদের ছবিতে বর্তমান সময়ের বিপজ্জনক রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি। ১৯৬০-এর দশকে সারা বিশ্বেই ধীরে ধীরে তীব্রতর হয়ে উঠছিল প্রতিবাদী আন্দোলন। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সেই সময় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে, কিউবায় সফল হয় ফিদেল ক্যাস্ট্রোর বিপ্লব এবং ১৯৬২ সালে কিউবানরা রুখে দেয় সিআইএ-সমর্থিত বে অফ পিগ্স্ হামলা, ভিয়েতনামের মানুষ তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে প্রবল শক্তিধর মার্কিন সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। রাজনীতি বিশ্লেষক জেরার্ড শালিঅ্যান্ড উল্লেখ করেছেন ষাটের দশকে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তৈরি হয়েছিল এক বিপ্লবী উচ্ছ্বাসদীপ্ত পরিস্থিতি। কেবল তৃতীয় বিশ্বেই নয়, সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদ উদ্দীপিত করেছিল শিল্পোন্নত বিভিন্ন দেশের তরুণদেরও। সেখানেও শুরু হয় বিদ্যমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র বিক্ষোভ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে তৈরি হয় নিজেদের অধিকার সম্পর্কে নতুন সচেতনতা, ফ্রান্সে ১৯৬৮ সালে সূচিত হয় ছাত্রদের আন্দোলন, উন্নত দেশের সচেতন মানুষ সোচ্চার হয় ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে।

এমন প্রতিবাদী আবহ বিভিন্ন দেশে শিল্পীদেরও বৈপ্লবিক চেতনায় অনুপ্রাণিত করে, এবং তাদের কাজে দেখা যায় সেই চেতনার প্রভাব। বিভিন্ন দেশে চলচ্চিত্রকাররা এই সময় নতুন ধরনের ছবি নির্মাণে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। নতুন ছবিতে সচেতনভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয় গতানুগতিক নির্মাণশৈলী এবং সেসব ছবির বিষয়বস্তুতেও লক্ষণীয় হয় রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার স্পষ্ট আগ্রহ। ব্রাজিলের সিনেমা নোভো, আর্জেন্টিনায় নুয়েভা ওলা, চিলিতে সিনেমা অফ পপুলার ইউনিটি, ভারতে মৃণাল সেনের ভুবন সোম (১৯৬৭) ছবির মাধ্যমে সূচিত হওয়া নিউ ইন্ডিয়ান সিনেমা প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ নতুন চলচ্চিত্র আন্দোলন শুরু হয় ষাটের দশকেই। তৃতীয় বিশ্বের মতো শিল্পোন্নত দেশগুলোর পরিচালকরাও এই সময়ে বক্তব্য ও নির্মাণশৈলীর দিক থেকে ভিন্ন ধরনের ছবি নির্মাণ করতে থাকেন। ষাটের দশকের প্রতিবাদী বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তৈরি হয় জিল্লো পন্টেকর্ভোর দ্য ব্যাটল অব আলজিয়ার্স (১৯৬৬), জ্যঁ-ল্যুক গদারের লা শিনোয়াজ (১৯৬৭), টমাস গ্যেতিরেজ আলিয়ার মেমোরিজ অব আন্ডারডেভেলপমেন্ট (১৯৬৮), মিগুয়েল লিটিনের দ্য জ্যাকল অব নাহুয়েলটোরো (১৯৬৯), গ্লবার রোশার ব্ল্যাক গড হোয়াইট ডেভিল (১৯৬৪) আর র্তেরা এম ত্রানযি (১৯৬৭), ওসমান সেমবেনের মান্দাবি (১৯৬৮), জর্জ সানজিনের ব্লাড অব দ্য কনডর (১৯৬৯) প্রভৃতি ছবি যেখানে পরিচালকরা প্রদান করেছেন নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্য। রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের আলোচনায় উল্লিখিত এই ছবিগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্টুডিও সিস্টেমের মধ্যেও নির্মিত কিছু ছবির বক্তব্য আর বিশেষ করে নির্মাণশৈলীতে লক্ষ করা যায় ভিন্নতা। আর্ট সিনেমা ধারার ছবি না হলেও এই ছবিগুলোতে পরিচালকের সৃজনশীল নির্মাতা বা অত্যুর হিসেবে তাদের স্বকীয়তা টিকিয়ে রেখেছেন যে সুযোগ অতীতে স্টুডিও সিস্টেমের মধ্যে তৈরি চলচ্চিত্রে পাওয়া যেত না। এই ধারার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ছবি হলো, আর্থার পেনের বনি অ্যান্ড ক্লাইড (১৯৬৭), মাইক নিকোলসের দ্য গ্র্যাজুয়েট (১৯৬৭), ডেনিস হপারের ইজি রাইডার (১৯৬৯), জন শ্লেসিঞ্জারের মিডনাইট কাউবয় (১৯৬৯) প্রভৃতি। অর্থাৎ ষাটের দশকে সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিবেশে যে বিপ্লবী পরিবর্তন সূচিত হয়েছিল তা স্পর্শ করে হলিউডের দৃষ্টিভঙ্গিকেও।

লক্ষ্যনীয়, ১৯৬০-এর দশকে পশ্চিম বাংলার তিনজন গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক আর মৃণাল সেনও একের পর এক আকর্ষণীয় নির্মাণশৈলীর ছবি তৈরি করেছেন। সেই সাথে নিজেদের ছবিতে প্রদান করেছেন রাজনৈতিক বক্তব্য। সত্যজিৎ রায়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা (১৯৬২) আর মহানগর (১৯৬৩) ছবিতে আমরা দেখি ক্ষমতাশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্বলের সাহসী প্রতিবাদ। এই দশকে ঋত্বিক ঘটক তৈরি করেছেন তাঁর বিখ্যাত দেশভাগ ত্রয়ীর ছবিগুলো। দেশভাগের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ঋত্বিকের ক্ষোভ আর সমালোচনা স্পষ্ট প্রতীয়মান এই ছবিগুলোতে। ভুবন সোম ছবিতে মৃণাল সেন ব্যবহার করেছিলেন অভিনব এবং এক্সপেরিমেন্টাল নির্মাণশৈলী এবং সেই সঙ্গে ছবিতে তিনি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন সামাজিক সমালোচনা। সত্তরের দশকের শুরুতে নিজের কলকাতা ত্রয়ীর ছবিগুলোতে মৃণাল সেন খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করেছিলেন নিজের রাজনৈতিক বক্তব্য। এই ছবিগুলোর নির্মাণশৈলীকে বৈপ্লবিক করে তোলার লক্ষ্যে মৃণাল সেন ইন্টারভিউ (১৯৭০) আর কলকাতা ৭১ (১৯৭২)-এ ব্যবহার করেছিলেন জার্মান নাট্যকার বের্টোল্ট ব্রেখ্ট্ প্রবর্তিত ‘ডিসট্যানসিয়েশন’ কৌশল। এই ছবিগুলোর কয়েকটি দৃশ্যে ছবির মূল চরিত্ররা সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দর্শকের উদ্দেশ্যে কথা বলে। চলচ্চিত্রের কাল্পনিক জগৎ গতানুগতিকভাবে যে বিভ্রম তৈরি করে, তা ভেঙে দিয়ে দর্শকের মনে তীব্র অভিঘাত তৈরির মাধ্যমে তাদের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে সচেতন করার এই বিশেষ কৌশলটি মৃণাল সেনই প্রথম ভারতীয় ছবিতে ব্যবহার করেন।

১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি বৈষম্য আর শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রতিবাদের ফলে যে রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল সেই পরিস্থিতি তুলে ধরার কোনো চেষ্টা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তৈরি বাংলা চলচ্চিত্রে দেখা যায়নি। হয়তো স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের নিয়ন্ত্রণের কথা চিন্তা করেই বাঙালি চলচ্চিত্রকাররা নিজেদের ছবিতে সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে অনাগ্রহী ছিলেন। সেই ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে সেই সময়ের বাঙালি চলচ্চিত্রকাররা নিজেদের চলচ্চিত্রে প্রভাবশালী আইডিওলজি ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেননি। প্রতিবাদী চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে চলা নিরাপদ ছবিই তাঁরা তৈরি করেছেন। এমনকি রূপকের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমালোচনা প্রদানেও তাঁরা সচেষ্ট হননি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি চলচ্চিত্রে সেই সময় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন দেখা গিয়েছিল তা পূর্ব পাকিস্তানে তৈরি বাংলা ছবিকে প্রভাবিত করেনি বললেই চলে। ছবির ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তা নান্দনিকভাবে উদ্ভাবনী করে তোলার ক্ষেত্রেও পরিচালকদের আগ্রহ ছিল না। সেই সময়ে সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সাহসী সমালোচনা তুলে ধরা হয়েছিল কেবল জহির রায়হানের জীবন থেকে নেওয়া (১৯৭০) ছবিতেই। রূপকধর্মী এই ছবিতে জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা, চরিত্রদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক, হাস্যরস, মেলোড্রামা, অতি অভিনয়, সঙ্গীত প্রভৃতি বাণিজ্যিক ছবির উপাদান অন্তর্ভূক্ত করা হলেও সেগুলো দর্শককে বিনোদন দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়নি। পরিচালক দক্ষতার সাথে এই উপাদানগুলো রূপান্তরের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন পাকিস্তানি শাসনবিরোধী বক্তব্য। দর্শককে রাজনৈতিক চেতনায় অনুপ্রাণিত করা ছিল ছবির মূল উদ্দেশ্য।

একটি গণযুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল আর তাই স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন ছিল পুরনো উপনিবেশী সমাজকাঠামোতে গুরুত্ব পাওয়া চিন্তাগুলো প্রত্যাখ্যান করা। স্বাধীন সমাজে নতুন চিন্তা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শিল্পকলার বিভিন্ন শাখা বিশেষ করে চলচ্চিত্রও ভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবহার করা জরুরি ছিল। বাণিজ্যিক ইন্ডাস্ট্রির বাইরে চিন্তাশীল, প্রথাবিরোধী ছবি নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিচালকদের সাফল্য কতটা তা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বাংলা চিন্তাশীল এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন ছবি বিশ্বে পরিচিত। যে প্রশ্নটি জরুরি হয়ে ওঠে তা হলো নান্দনিকভাবে উদ্ভাবনী নির্মাণশৈলী এবং সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যার তীক্ষ্ণ সমালোচনা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গত চার দশকে কতটা গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে? বাংলাদেশি সমাজসচেতন ছবির ফর্ম কি যথেষ্ট প্রথাবিরোধী হয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে? সমাজে টিকে থাকা রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর মূল কারণ সম্পর্কে দর্শকদের সচেতন করে তোলার কতটা আন্তরিক চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে।

রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য এবং উপাদান সম্পর্কে পাওয়া গেছে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা। কোনও কোনও তাত্ত্বিক এমন মত দিয়েছেন যে, সব চলচ্চিত্রই রাজনৈতিক। এই বক্তব্যটির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণের সুযোগ থাকে। বিভিন্ন চলচ্চিত্র বিভিন্ন উদ্দেশ্যে তৈরি হয়, বিভিন্ন চলচ্চিত্রের বক্তব্য আর নির্মাণশৈলী ভিন্ন যার কারণে চলচ্চিত্রের প্রকারভেদ আমরা দেখতে পাই। কিন্তু সেই সব ধরনের চলচ্চিত্রই কি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসেবে বর্ণনা করা যৌক্তিক? সের্গেই আইজেনস্টাইনের দ্য ব্যাটলশিপ পোটেমকিন (১৯২৫), আকিরা কুরোশাওয়ার রশোমন (১৯৫০), সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী (১৯৫৫), সালাহ্উদ্দিনের রূপবান (১৯৬৬), জ্যঁ-ল্যুক গদারের ওয়ান প্লাস ওয়ান (১৯৬৮), জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), জহিরুল হকের রংবাজ (১৯৭৩), মনসুর খানের কেয়ামত সে কেয়ামত তক (১৯৮৮), স্পাইক লির ডু দ্য রাইট থিং (১৯৮৯), জেমস ক্যামেরনের টারমিনেটর টু : জাজমেন্ট ডে (১৯৯১) এই ছবিগুলো একটি থেকে অন্যটি নির্মাণশৈলী, বক্তব্য আর পরিচালকের লক্ষ্যের দিক থেকে ভিন্ন ধরনের ছবি। কিন্তু সব ছবিই যদি রাজনৈতিক ছবি হয় তাহলে উপরে উল্লিখিত এই ভিন্ন ধরনের প্রতিটি ছবিই রাজনৈতিক ছবি হয়ে উঠেছে এমন দাবি করা কতটা গ্রহণযোগ্য?

দেখুন, এই নিয়ে নানা মানুষের নানা ধরনের মতামত থাকবে। তবে প্রতিটি ছবিই নির্মাতার দর্শন আর চিন্তারীতি অনুযায়ী তৈরি হয়। ফলে প্রতিটি ছবিই একটি নির্দিষ্ট ভাবাদর্শ বা আইডিওলজি তুলে ধরে। রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে কিন্তু ব্যবসায়িক সাফল্য পরিচালকের মূখ্য উদ্দেশ্য নয়। মানুষের বিভিন্ন মনোগত সমস্যা নিয়ে আলোচনাও এখানে গুরুত্ব পায় না! বরং পরিচালকের মূল লক্ষ্য হয়, সমাজে টিকে থাকা সমস্যা সরাসরি বা রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরে এই সমস্যাগুলোর মূল কারণ বিশ্লেষণ করা। পাশাপাশি যারা এই ধরনের সমস্যা টিকিয়ে রাখার জন্য দায়ী তাদেরকে চিহ্নিত করা।


রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে পরিচালকের একটি অবস্থান গ্রহণ করা অবধারিত হয়ে ওঠে, এই অবস্থানটি নিতে হয় সমাজের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে। কোনও বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শ বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করা হলে তা হয়ে ওঠে প্রোপাগান্ডা বা প্রচারণামূলক চলচ্চিত্র। প্রোপাগান্ডা চলচ্চিত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা হলেও তা কখনো রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নয়। ১৯৩৫ সালে জার্মান চলচ্চিত্রকার লেনি রাইফেনস্টাল হিটলারের নির্দেশে তৈরি করেছিলেন তাঁর ছবি ট্রায়াম্প অব দ্য উইল। ছবিটিতে পরিচালক ব্যবহার করেছিলেন নতুন ধরনের নির্মাণশৈলী। ফলে নান্দনিকতার দিক থেকে ছবিটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই ছবিতে মূলত জার্মান নাৎসি পার্টি আর হিটলারের প্রশংসা করা হয়েছিল। কিন্তু একটি সফল রাজনৈতিক চলচ্চিত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক মত এবং অবস্থান পাশাপাশি উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে কোন মতটি অধিকতর গ্রহণযোগ্য দর্শককে তা বিবেচনার সুযোগ দেওয়া হয়। স্পাইক লির গুরুত্বপূর্ণ ছবি ডু দ্য রাইট থিং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিবরণ যেমন তুলে ধরেছে, তেমনি ছবিটিতে কৃষ্ণাঙ্গদের আচরণের বিভিন্ন নেতিবাচক দিকও প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে ছবিটি পক্ষপাতদুষ্ট প্রচারমূলক চলচ্চিত্র হয়ে ওঠেনি, বরং তা সমাজের জটিল একটি সমস্যা সম্পর্কে পরিচালকের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সমালোচনা তুলে ধরেছে যা দর্শকের সচেতনতা বৃদ্ধি করে। মৃণাল সেন তাঁর ‘পদাতিক’ ছবিতেও একদিকে যেমন সামাজিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্য বামপন্থী আন্দোলনকে সমর্থন করেছেন, তেমনি নকশালপন্থী রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন ভুল পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনাও তুলে ধরেছেন। এই ছবিতে বামপন্থী বিপ্লবের প্রতি মৃণাল সেন নিজের আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখলেও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা বামপন্থী সংগঠনের নেতাদের মানসিকতার নেতিবাচক দিকগুলো প্রকাশ করতে তিনি দ্বিধা করেননি। আকালের সন্ধানে ছবিতেও মৃণাল সেন সামাজিক সমালোচনা প্রকাশের ক্ষেত্রে শহর এবং গ্রাম দু’জায়গার মানুষদেরই মানসিকতার কিছু নেতিবাচক দিক স্পষ্ট করেছেন। কোনও নির্দিষ্ট মতের প্রতি অন্ধভাবে পক্ষপাত দেখাবার পরিবর্তে এই ছবিগুলোতে সমাজে বিদ্যমান সমস্যা সংকুল পরিস্থিতি যথার্থভাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে দর্শককে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেছে। ফলশ্রুতিতে এই ছবিগুলো ভিন্ন হয়ে উঠেছে প্রচারণামূলক চলচ্চিত্র থেকে এবং কার্যকর হয়েছে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র হিসেবে।

অবশ্য রাজনৈতিক চলচ্চিত্রও বিভিন্ন রকমের হতে পারে। গদার তাঁর বেশির ভাগ ছবিতেই জটিল চলচ্চিত্র ভাষা ব্যবহার করেছেন। চলচ্চিত্র বিষয়ে গভীর ধারণাসম্পন্ন দর্শক ছাড়া অন্যদের পক্ষে গদারের ছবিতে বিভিন্ন দৃশ্য কী অর্থ নির্মাণ করেছে তা বোঝা সহজ নয়। নতুন এবং এক্সপেরিমেন্টাল নির্মাণশৈলী ব্যবহার করার পাশাপাশি তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক সমালোচনা প্রদানের কারণে গদারকে চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চলচ্চিত্রকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তেমনই মৃণাল সেনের ছবিতে এমন কিছু বক্তব্য থেকেই যায়। দর্শককে ভাবায়। চেতনা সঞ্চার করে। প্রতিবাদে মুখর করে তোলে।


‘নিওরিয়েলিজম’ এবং ‘নিউওয়েভ’…

সমকালীন ছবির ব্যাপারে মৃণাল সেনের একটা সুস্পষ্ট ধারণা ছিল। আজকের দিনের সামাজিক বা অর্থনৈতিক কিম্বা রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে ছবি করলেই সেটা সমকালীন ছবি হবে, এটা ঠিক নয়। মৃণাল সেন এ ব্যাপারে একটা উদাহরণ দিয়েছেন তাঁর একটা নিবন্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘‘ ‘অ্যান্ড্রক্লিস্ ও সিংহে’র গল্প আজকের নয় গল্পটি প্রাচীন ও অতিপরিচিত। সেই গল্পটি নিয়ে বার্নার্ড শ একটি নাটক লিখলেন। নাম Androcles and Lion. নাটকটি যখন জার্মানির কোথাও মঞ্চস্থ হয় খুব সম্ভবত বার্লিনেই। তখন এক ডাকসাইটে রাজপুরুষ অভিনয় দেখতে দেখতে এতই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন যে নাটক শেষ হওয়ার আগে এক সময় তিনি হল থেকে বেরিয়ে যান। শ’ শুনে আশ্বস্ত হয়েছিলেন, বলেছিলেন যাক ভদ্রলোক তা হলে আমাকে বুঝতে পেরেছেন। শাসকের নোংরা অস্বাস্থ্যকর চেহারাটা দেখানোই নাট্যকারের উদ্দেশ্য। এখানে এসেই গোটা কাহিনিটা একটা তাৎপর্য পেল। সঙ্গে সঙ্গে রাজ প্রতিনিধি নিজেকে দেখতে পেলেন শাসনযন্ত্রের রূপটি তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। সে মঞ্চে এতগুলো লোকের সামনে তাকে বিদ্রূপ করতে লাগলো এবং শেষপর্যন্ত ভয়ে রাগে ও লজ্জায় ভদ্রলোক পালিয়ে বাঁচলেন এবং এ যুগের নাট্যকার শ’ আশ্বস্ত হলেন। পুরানো কোনো গল্প আজকের মানুষকে আজকের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে আজকের কথা ভাবিয়ে তুলতে পারে। আজকের বাস্তব জীবনের সঙ্গে একটা যোগসূত্র খুঁজে বার করে দিতে পারে তবে সেটা হবে সমকালীন।’’

বর্তমান ও অতীতকে একসঙ্গে সংযুক্তিকরণ, মৃণাল সেনের এক অনবদ্য কাজ বলে স্বীকৃত। সিনেমায় গল্প বলার ক্ষেত্রে সেনের অতীত ও বর্তমানের সংযুক্তিকরণ এক নতুন অবদান। ‘মৃগয়া’ ছবি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। যেটা আমরা ট্রাডিশনাল ছবিতে দেখতে পাই না। মৃণাল সেনের এই অতীত ও বর্তমানের সংযুক্তিকরণ ওঁর একটি অভিজ্ঞতার ফসল। তিনি বলছেন, Connecting the Past with the Present an experience comes to mind of the consequence but deep wither me it was something that caught me unawares and suddenly opened the door between the past and the present.

সাউন্ড এবং অপটিক্স এর যন্ত্রপাতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সিনেমার ভাষাতেও উন্নত করেছে। বদলাচ্ছে। পালটাচ্ছে। এর ফলে সিনেমার ব্যাকরণেরও বদল ঘটচ্ছে। মৃণাল সেন এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘‘যুদ্ধোত্তর যুগে দুটি ধারা ‘নিওরিয়েলিজম’ এবং ‘নিউওয়েভ’ বিশ্বের চলচ্চিত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। নিওরিয়েলিজমের যেমন একটা সামাজিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল যেটা যুদ্ধের পরেই ইতালিতে এসেছিল, নিউওয়েভের সে রকম সামাজিক বা রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল না। নিওরিয়েলিজম যেমন বিদ্রোহ, সামাজিক অব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এবং একই সঙ্গে সে সিনেমার প্রথাসিদ্ধ নিয়মের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। সেই সময় ইতালির স্টুডিওগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত। কুছ পরোয়া নেই। স্টুডিও ছেড়ে ক্যামেরা নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লেন। বসতবাড়িতে শুটিং করলেন, সিনেমা তৈরি করলেন। নিউওয়েভও সেনের মতে একটা প্রতিবাদ এবং অনেকটা দাপটের সঙ্গে যাবতীয় নিয়ম ভেঙেই এরা এগিয়ে এলেন এবং বুঝিয়ে দিলেন সিনেমাটা কারও কুক্ষিগত নয়। হতে পারে না। নিউওয়েভ পরিচালকদের মধ্যে একমাত্র স্যাব্রল ছাড়া আর সবাই সিনেমার লোক নন, সাংবাদিক। তাই এঁদের কোনো মতাদর্শ ছিল না, ওঁরা তাই সিনেমার নিয়মগুলো ভাঙতে শুরু করলেন। এবং খুবই কম পয়সায় ছবি করতে আরম্ভ করলেন।’’ এই বিষয়ে উনি বললেন, Call it Italian neorealism or French newwave or Cinema of Britain. They are all labeled by the jounalists for their convenience. They come and go but what remains is the Genuineness of feelings coupled with Genuineness of things. সাহিত্যই বলুন বা যেকোনও আর্ট ফর্মই বলুন, এরা কোনও বাধা ধরা নিয়মের মধ্যে আটকে থাকে না। প্রতিটি আর্ট ফর্মের সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। এদের প্রভাবেই বা পরিবর্তনে আর্টফর্মগুলির পরিবর্তন হয়। মৃণাল সেন যে পরিবর্তন তাঁর ছবিতে এনেছেন, তার অন্যতম কারণ এগুলোর প্রভাব। মৃণাল সেনের মতে ফিল্ম তৈরির ক্ষেত্রে মন কাজ করে। কিন্তু সেটা কিসের ওপর ভিত্তি করে? ফিজিক্সের দুটো ইমপর্টেন্ট ব্রাঞ্চ, অপটিক্স এবং সাউন্ড। এই দুটোর ওপর নির্ভর করে নানারকম যন্ত্র তৈরি হচ্ছে এবং ক্রমে যন্ত্র বেড়ে যাচ্ছে। এই যন্ত্রের প্রবল দাপটের সঙ্গে সঙ্গে ফিল্মের সিনট্যাক্স পালটাচ্ছে। ফিল্মের চেহারা পালটাচ্ছে, ফিল্মের রঙ ঢঙ পালটাচ্ছে। বিদেশের পরিচালকের তৈরি ছবি দেখলেই বোঝা যায়।

সোলানাসের তিনটে পার্টের ছবি ‘আওয়ার অব ফারনেস্’ দেখুন, সেখানে সোলানাস একেবারে প্রবন্ধকার হয়ে গিয়েছেন। গদার-এ যখন দেখেন, ফিল্মের সমস্ত সিনট্যাক্স কীভাবে পালটে গিয়েছে। নিউওয়েভ সিনেমা হলো conventional cinema against dominant cinema. একটা বিদ্রোহ, একটা প্রতিবাদ। মৃণাল সেন এক সাক্ষাৎকারে নিউওয়েভ পরিচালক বিষয় বলেছিলেন, ‘‘ফ্রান্সের এই ফিল্ম করিয়েরা মনে করতেন, এই যে ফিল্ম তৈরি, কারও সম্পত্তি নয়। ফিল্ম যে শুধু কতকগুলি প্রথাসিদ্ধ নিয়ম নিয়ন্ত্রিত থাকবে, নিয়মের বাইরে যাবে না এর প্রতিবাদ করলেন। অনেকটা প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে যাবতীয় নিয়ম ভেঙেই এঁরা এগিয়ে এলেন। এবং বুঝিয়ে দিলেন সিনেমাটা বিশেষ কোনো দলের কুক্ষিগত নয়।’’

মৃণাল সেন যেমন নিয়ম ভেঙেছেন আবার নিয়মের মধ্যে থেকেও সৃষ্টিশীল কাজও করেছেন। ‘মৃগয়া’ ছবিতে উনি Time and Space এর সুন্দর ব্যবহার করেছেন। এখানে সময়টাকে Sketch করা হয়েছে। তির মারার দৃশ্যটি ভাবুন, দর্শক জানে সাঁওতাল যুবকটি তির মেরে বোতলটি ভাঙবে। কিন্তু দর্শক এটা জানে না যে পরিচালক বোতল ভাঙার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসে চলে যাবে। সেন এখানে সময়টাকে বাড়িয়ে নিলেন, তারপর যেই তির দিয়ে সাঁওতাল যুবকটি বোতলটা ভাঙলো, কাচ ভাঙার আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে সাঁওতাল বিদ্রোহের ইতিহাসে চলে গেলেন। এটা কিন্তু আমরা ট্র্যাডিশনাল ছবিতে দেখতে পাই না। সৃষ্টিশীল অসামান্য আরেকটি কাজ, ‘জেনেসিস্’। এই ছবিতে টাইম এবং স্পেসের ব্যবহার অতুলনীয়। এই ছবিতে টাইম অ্যান্ড স্পেসের ব্যবহার নিয়ে পরিচালক বলছেন, ‘‘আমার নতুন ছবিতে ‘জেনেসিস’- এ এই স্পেস-টাইমের ব্যাপারটা আগাগোড়াই ভেঙেছি, ভাঙতে হয়েছে, ভাঙতে গিয়ে মজা পেয়েছি। হয়তো খানিকটা সাহসের পরিচয় দিয়েছি। ব্যাপারটা বলি, রাজস্থানের মরুভূমির যে অঞ্চলে আমরা কাজ করেছি তা এক বিশাল পরিত্যক্ত গ্রাম। বিশাল ছড়ানো, কোনকালে জমজমাট ছিল। বর্তমানে হতশ্রী শ্মশান ... সেখানে তিনটি মাত্র চরিত্রের বাস আমাদের ছবিতে। দুই পুরুষ এক নারী, একমাত্র জলাধার একটা বিশাল কুয়ো অনেক দূরে। তিনজনের বাস তিনটে ঘরে। ফারাক অনেকখানি। অথচ তিনজনেই থাকে একসঙ্গে। রান্নাঘরও দূরে। একসঙ্গে থাকে বলেই খাওয়াদাওয়াও একসঙ্গে। জলতোলা খাওয়া দাওয়া কাজ করা সবকিছুর মধ্যেই এক ধরনের physical compactness আনতে হবে, অথচ অসম্ভব ছড়ানো ব্যাপারটাকেও দর্শকের চোখে ধরিয়ে দিতে হবে। এই দুটোর মধ্যে একটা বিরোধ বা বৈপরীত্য পরিষ্কার physical compactness and sprawling topography এবং এই দুটোকেই ছবিতে তুলে ধরা এবং ঘটনা ও চরিত্র তিনটের মধ্যে একটা ঘনত্ব আনা আমার কাছে একটা রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মতোই হয়ে দাঁড়িয়েছিল এবং তা সম্ভব হয়েছে ছবি তোলা, কম্পোজিশন নেওয়া আর সম্পাদনা এই তিনের ব্যবহারে।’’


ভুবন সোম...

১৯৬৯ সালে মৃণাল সেন পরিচালিত ছবি ‘ভুবন সোম’ মুক্তি পায়। এই ছবিতে উৎপল দত্ত অভিনয় করেছিলেন। ছবিটি অনেকের মতে মৃণাল সেনের শ্রেষ্ঠ ছবি। এই ছবিতেই অমিতাভ বচ্চন কাজ করলেন। তখন কলকাতায় সেলসের চাকরি করেন অমিতাভ বচ্চন। ১৯৬৯ সাল। পরিচালক মৃণাল সেন তাঁর ছবির জন্য খুঁজে বেড়াচ্ছেন এমন একজনকে, যাঁর কণ্ঠস্বর গোটা ভুবনকে মোহিত করবে। সেলসের চাকরির ফাঁকে স্টুডিও পাড়ায় তাঁর যাতায়াতের কথা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে আগেও বলেছেন বচ্চন সাহেব। তিনিই ভুবন সোম ছবির ভয়েস ওভার দিলেন। এটাই বিগবি-র ভয়েস ওভারের প্রথম কাজ।

‘ভুবন সোম’-এ তিনি আমলাতন্ত্রকে আঘাত করতে চেয়েছেন। আমলাতান্ত্রিকতার ভেতরের ফাঁপা দিকগুলো উন্মোচন করতে চেয়েছেন পরিচালক। বনফুলের একটি বড় গল্প থেকে নির্মিত ছবি ‘ভুবন সোম’ এর নায়ক ভুবন সোম রেল বিভাগের উর্ধতন, ডাকসাইটে একজন কর্মকর্তা। অবিবাহিত। অত্যন্ত সৎ। সততার কারণে নিকট আত্মীয়কেও বরখাস্ত করতে দ্বিধাবোধ করেন না। তাই রেলের একজন অসাধু টিকিট কালেক্টার যাদব প্যাটেলের ঘুষ নেওয়ার কারণে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি করে তার শাস্তির ব্যবস্থা করেন। ১৯৬৯ এ বনফুলের কাহিনী অবলম্বনে হিন্দি ভাষায় তৈরি হয় ভুবন সোম। ‘ভুবন সোম’ স্বল্প বাজেটের ছবি। এই ছবি তৈরির ইতিহাসটা ভারি চমৎকার।এই ছবির চিত্রনাট্যের খসড়া লেখা হলো মাত্র ৩ ঘণ্টায়। কেন না ফিল্ম ফিন্যান্স করপোরেশনকে দেখাতে হবে প্রপোজাল স্ক্রিপ্ট। ইন্দিরা গান্ধী অল্প বাজেটের সিনেমার ভক্ত ছিলেন। ফলে একটা নিরীক্ষামূলক চেষ্টা হিসেবেই কাজটা অনুমোদন পেল আর একমাত্র পুত্র কুনাল সেনের চতুর্দশ জন্মবার্ষিকীতেই পেলেন দুই-তৃতীয়াংশ টাকা। এ ছবিতে প্রথমবারের মতো ‘দেড় থেকে দুই মিনিট’ গলা দিলেন অমিতাভ বচ্চন। টাকা পেলেন ৩০০। মাত্র ২ লাখ টাকায় ফিল্মটা হল। ছবির বিষয় একজন আমলা এবং গ্রাম্য যুবতী আর প্রকৃতি। সুহাসিনী মূলের শরীরটাই যেন একটা প্রকৃতি, বিশদ অর্থে।


ছবির কোলাজ

পরিচালকের মুখে ছবির কথা।

আমাদের শেষ শুটিংটা হল কলকাতায়৷ আমরা পাঁচ দিন স্টুডিয়োতে শুটিং করেছিলাম৷ তাছাড়া পুরোটাই বাইরে৷ শেষ শুটিং হয়ে যাওয়ার পর সবাই চলে গেছে, সেট খোলা হচ্ছে৷ গীতা আর আমি বসে চা খাচ্ছি৷ সেই সময় গীতা বলল, ‘বলো তো, কী হবে?’

ছবির শেষটা মনে আছে তো? শাবানার চরিত্র বরাবরই বলত যে ছেলেটা (যে ওকে বিয়ে করবে বলেছিল) যে আসবে না, সে যে ইতিমধ্যেই বিয়ে করেছে, কলকাতায় থাকে, কখনওই আসবে না- এ কথা যদি সে মাকে বলে তো মা সেই মুহূর্তে কোলাপস্ করবে৷ সেই জন্যই সত্যি কথাটা তার মাকে বলা হয়নি৷ মা জানে যে ছেলেটা আসবে৷ ছবির শেষের দিকে যখন সকলে চলে গেছে তখন একটা জায়গায় মা বারবার প্রশ্ন করছে, ‘তোর সঙ্গে কথা হয়েছে? তোকে কিছু বলেছে?’ শাবানা উত্তর দিচ্ছে না৷ মা তখন খেপে ওঠে৷ ‘তোর কী হয়েছে? তুই বোবা কেন? কথা বলতে পারছিস না?’ মেয়ে তার দৈনন্দিন কাজ করছে- মাকে সে চান করাবে, খাওয়াবে৷ হঠাৎ সে চিত্কা’র করে উঠল৷

এই দৃশ্যের শেষে মেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলে, ‘আমি তোমাকে বলতে পারিনি... আমি মিথ্যে বলেছিলাম, আমাকে মাফ করে দাও।’

হ্যাঁ, আমি বরাবরই ভেবেছি যে ‘খন্ডহর’ একটা হোপফুল ছবি- ছবিটা একটা আশার কথা বলে৷ কেন এ রকম ভাবতাম আমি জানি না৷ যাই হোক, গীতা আমাকে প্রশ্ন করল, ‘এর পর কী হবে? ওরা কী করবে?’ আমি বললাম আমি জানি না, তুমি বল৷ গীতা বলল, ‘এর পর হয়তো দু’তিন দিন মা মেয়ের সঙ্গে কথা বলবে না৷ চুপচাপ থাকবে৷ মেয়ে মাকে চান করাবে, খাইয়ে দেবে- সব করবে কিন্তু কেউ কারও সঙ্গে কথা বলবে না৷ চার দিন-পাঁচ দিন পরে হয়তো মা-ই বলবে, ‘যামিনী, যা কাগজ নিয়ে আয় তো, পেন্সিল নিয়ে আয়৷ লেখ, আমরা যাব না৷’

এটা বড় মেয়েকে লিখবে? যে বারবার সব ছেড়ে তার সঙ্গে থাকতে বলে?

হ্যাঁ৷ গীতা যখন ওই কথাটা বলে তখন আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে৷ আমি গীতাকে জড়িয়ে ধরলাম৷ মা যে এটা বলে- এটা কতো বড়ো আশার কথা৷ এটা এমন একটা সময় যখন ইউ হ্যাভ ফেসড্ দ্য রিয়ালিটি৷ যামিনী ভয় পেয়েছিল যে সত্যিটা জানলে মা হয়তো কোলাপস করবে৷ কিন্তু তা হবে না, মা বলে, ‘লেখ, আমরা যাব না৷ এইখানে- উই স্টার্ট লাইফ ওভার এগেন৷’ এটা কিন্তু স্পিকস্ অফ এ ড্রিম- দিস পারহ্যাপস্ ইজ আওয়ার ওন এফর্ট টু সারভাইভ৷



টেনশন তো থাকেই! যেমন আকাশ কুসুমে…

‘আকাশকুসুম’-এর শুটিং। একটা আনসার্টেনিটি! এটা সব সময়েই একটা ফ্যাক্টর৷ সব সময়েই একটা অনিশ্চয়তা থাকে, একটা টেনশন থাকে৷ এখানে একটা কথা বলি৷ ডাক্তাররা আমার অসুখবিসুখ হলে বলে, ‘টেনশন করবেন না৷’ আমি ডাক্তারকে বলি, ‘টেনশন কিপস্ মি ইউথফুল৷’ টেনশন আমাকে ভয়ঙ্কর সাহায্য করে- টেনশন না থাকলে মরেই যাব৷ টেনশন আছে, আর তার সঙ্গে আছে ভয়ঙ্কর একটা সাহস৷ আমি জানি যে এই শুটিংগুলো যদি বরবাদ হয়ে যায় তা হলে আমি কী করব৷ ভয় রয়েছে, অনেকগুলো আনসার্টেন ফ্যাক্টরস রয়েছে৷ কিন্তু এ সবের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো সার্টেন ফ্যাক্টর হল তুমি নিজে৷ তুমি এবং তোমার লোকজন আর লোকেশান৷ আমি অভিনেতাকে জানি, চরিত্রকে চিনি৷ এগুলো আমার চেনা৷ আমার মনে হয়… রাত্রিবেলা ঘুম ভেঙে গেছে- ছবির কতগুলো চরিত্র যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে- ভেরি ভেরি একজ্যাক্টিং- আমার পাওনা আমায় মিটিয়ে দাও, এ ছবিতে আমার যা বলবার আমায় বলতে দাও৷ পাওনা বলতে আমাকে কী করতে হবে বল৷ তখন মনে হয় দৃশ্যটা এ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না৷

মৃণাল সেনের ‘আকাশ কুসুম’ ছবি নিয়ে সত্যজিৎ রায় চাঁচাছোলা মন্তব্য করেন। যার জবাবে ‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় চিঠি পাল্টা-চিঠিতে শুরু হয় দু’জনের জীবনব্যাপী এক দীর্ঘ দ্বৈরথ।

ফরাসি চিত্রনির্মাতা ফ্রাঁসোয়া ট্রুফোর দ্বারা প্রভাবিত মৃণাল সেন ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাসে ‘আকাশ কুসুম’ বানাতে শুরু করেন। অভিনয়ে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও অপর্ণা সেন। প্রকাশের পর এই ছবির ভাষাভঙ্গি নিয়ে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মাঝে সাড়া পড়ে যায়। তার আত্মজীবনী থেকে জানা যায় যে এই ছবির সমালোচকদের একজন ছিলেন সত্যজিৎ রায়।

আশীষ বর্মণের গল্প নিয়ে ছবি। ‘আকাশ কুসুম’-এর গল্পটা এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির যুবককে নিয়ে, যে যেন-তেন উপায়ে রাতারাতি বড়লোক হয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতো। মৃণাল সেন চিত্রনাট্যে গল্পের ভেতর কিছু কিছু জায়গা বদলে দেন। ফলে গল্পের নায়ক অজয়ের চরিত্র হয়ে ওঠে স্বপ্নালু ও ভাবুক, যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধ বাস্তবতার ভেতরে বসেও আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখতো, যার প্রবল বিশ্বাস ছিল যে শুধু স্বপ্নের জোরেই সে একদিন বিরাট ধনী হতে পারবে। শেষ পর্যন্ত সে চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয় এবং তার যা সহায়সম্পদ ছিল সেটাও খুইয়ে বসে। অজয়ের চরিত্রকে সমালোচকেরা ভালোভাবে নিতে পারলেন না। ছবির পরিচালক বেশ উদ্বিগ্নই হলেন। শেষে বিজ্ঞাপনে একটা বাক্য জুড়ে দিলেন, “অজয় কোন ধোঁকাবাজ নয়, সে উচ্চাকাঙ্খী”। এর কিছুদিন আগে ‘স্টেটসম্যান’-এ ছবির সমালোচনা ছাপা হয়েছিল। তার প্রতিক্রিয়ায় সম্পাদকের কাছে চিঠির পাতায় চিঠি লিখে পাঠালেন পাঠকেরা। প্রতিক্রিয়ার কারণ হলো স্টেটসম্যানের সমালোচক তার লেখায় বলেছিলেন যে এই ছায়াছবির সমাপ্তিটা ডন কিহোতের সমাপ্তির মতো – হাস্যরসে মেশানো করুণ। যে কারণে দর্শকেরা ছবি শেষ করে নায়কের পরিণতিতে সমব্যথী হবে। এর জবাবে গল্পকার আশীষ বর্মণ বলেছিলেন যে গল্পটা মোটেও এভাবে শেষ হয়নি। কারণ ওভাবে শেষ করলে তা শুধু ভুলই হতো না, দর্শকদের কাছেও সেটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হতো না।

মৃণাল সেনের আরেক ছবি, যেমন ‘মৃগয়া’। মিঠুন চক্রবর্তী নায়ক। মিঠুন চক্রবর্তীর প্রথম ছবি। ‘ইন্টারভিউ’ ছবিটা যে কেউই বলবেন রঞ্জিত মল্লিকের সেরা সিনেমা। তার আবিষ্কারকও মৃণাল সেনই। কী অপূর্ব অভিনয়ই না করেছিলেন রঞ্জিতবাবু! ম্যানিকুইনের শোকেস ভাঙার সময় তার যে ক্রোধ, তার সঙ্গে কিছুরই তুলনা চলে না। ইন্টারভিউ দেখার পর একজন অধ্যাপক বলেছিলেন, ‘দ্যাট ওয়াজ এ নোভেল ওয়ে অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং দ্য টাইমস অ্যান্ড হিস্ট্রি’।

কলকাতা ট্রিলোজি অর্থাৎ ইন্টারভিউ (১৯৭১), ক্যালকাটা ৭১ (১৯৭২) এবং পদাতিক (১৯৭৩)-- এই ছবি তিনটির মাধ্যমে তিনি তৎকালীন কলকাতার অস্থির অবস্থাকে তুলে ধরেছিলেন।

পদাতিক। কলকাতা শেষ সিনেমা। দর্শককে এবারে নড়েচড়ে বসতেই হয়। দর্শক বুঝে যায়, এ কোনো সাধারণ সিনেমা নয়। নিত্যকার হাসি কান্নার গল্পের উৎস ভুমির এর সজোর বন্ধন। সঙ্গে কিছুটা অস্বস্তিও। মৃণাল সেন এভাবেই অস্বস্তি টেনে আনতেন দর্শকের সামনে। চলচ্চিত্র যে শুধু বিনোদন নয়, তা বোঝাতে ব্যবহার করেছেন সমস্ত প্রকরণ। এই সিরিজের অন্য দুই চলচ্চিত্র ‘ইন্টারভিউ’ ও ‘কলকাতা ৭১’ থেকে ‘পদাতিক’ আলাদা। ‘ইন্টারভিউ’তে মৃণাল সেন কথা বলেছেন দর্শকের চোখে চোখ রেখে, একেবারে সরাসরি। ‘কলকাতা ৭১’ তুলে ধরেছেন মধ্যবিত্তের এড়িয়ে চলা বাস্তবতাকে। তাকে সজোরে আঘাত করেছেন। পদাতিক তুলে ধরেছে সংগ্রাম ও পলায়নের এক জটিল আখ্যান। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্প নিয়ে করা ‘খণ্ডহর’-এ উঠে এসেছে অন্তর্গত পলায়নপ্রবণতার মতো বিষয়া। মৃণাল সেন বরাবরই গল্প নির্মাণের বদলে দর্শকের চোখে চোখ রেখে মোদ্দা কথাটি বলে যেতে চেয়েছেন। এমন নয় যে, তিনি গল্পের আশ্রয় নেননি। নিয়েছেন। তাঁর চলচ্চিত্রে গল্প এসেছে অবধারিতভাবেই। তবে তা সবসময় প্রচলিত পথ মেনে নয়। ষাটের দশকে বিশেষত কলকাতা ট্রিলজি তৈরির সময় থেকেই তিনি ঝুঁকে পড়েন পুরোপুরি নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্রের দিকে। এই পর্যায়ে গল্পের চেয়ে তাঁকে দৃশ্যে বেশি বুঁদ হতে দেখা যায়। প্রচলিত পথ ডিঙিয়ে এই সব দৃশ্যই তিনি নির্মাণ করেন দর্শককে একটি ঝাঁকি দিয়ে সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে। এই প্রবণতা ও এর সাফল্যের কারণেই মৃণাল সেনের চলচ্চিত্রগুলো হয়ে উঠেছে একেবারে অন্যরকম। ভীষণভাবে রাজনৈতিক।

মধ্যবিত্ত সমাজের নীতিবোধকে তুলে ধরেন তাঁর খুবই প্রশংসিত দুটি ছবি একদিন প্রতিদিন (১৯৭৯) এবং খারিজ (১৯৮২)- এ। খারিজ ১৯৮৩ সালের কান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছিল। ১৯৮০ সালের ছবি ‘আকালের সন্ধানে’। ছবিতে দেখানো হয়েছিল, একটা সিনেমার ইউনিট একটি গ্রামে গিয়ে ১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষের উপর একটি চলচ্চিত্র তৈরির কাহিনী। কিভাবে ১৯৪৩ এর দুর্ভিক্ষের কাল্পনিক কাহিনী মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সেই গ্রামের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে সেটাই ছিল এই ছবির সারমর্ম। আকালের সন্ধানে ১৯৮১ সালের বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ জুরি পুরস্কার পেয়েছিল। মৃণাল সেনের পরবর্তী ছবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মহাপৃথিবী (১৯৯২) এবং অন্তরীন (১৯৯৪)। আমার ভুবন মুক্তি পায় ২০০২ সালে। ভারত এবং ভারতের বাইরের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে। তিনি ইন্টারন্যাশন্যাল ফেডারেশন অফ দি ফিল্ম সোসাইটির প্রেসিডেন্টও নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বাকি থেকে গেল অনেক কথা

তবু শেষ কথাটি যাই বলে...

নিজেকে ‘প্রাইভেট মার্কসিস্ট’ বলতেন মৃণাল সেন। তাই হেগেলের সূত্রে মার্কসবাদের প্রবেশ করা দার্শনিক দ্বান্দ্বিক বিচারকে নিজের শিল্প সৃষ্টির এক অন্যতম হাতিয়ার করে নিয়েছিলেন তিনি। ছবি বলতেই তিনি বুঝতেন ‘ডায়ালেকটিকস’। যেখানে দর্শক ভিজুয়াল ও ওরাল পারসেপশনের ভিতর দিয়ে একটা ইন্টেলেকচুয়াল পারসেপশনে পৌঁছবে। এই চিন্তা মৃণাল সেন পেয়েছেন সম্ভবত সোভিয়েত চিত্রপরিচালক আইজেনস্টাইনের কাছ থেকে। তিনি মনে করতেন, দর্শক চোখে দেখা ও কানে শোনার মধ্য দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, চৈতন্য দিয়ে একটি দৃশ্যের মর্মার্থ উদ্ধার করবে। ‘কবিতার পাঠক যেমন তাঁর বুদ্ধি খাটিয়ে, তাঁর সৃজনী শক্তি দিয়ে, তাঁর হৃদয়ের উত্তাপ দিয়ে বইয়ের পাতার সেই আক্ষরিকতার আড়ালে আত্মিক আবহাওয়াটির আমেজ পেয়ে থাকেন, ঠিক তেমনি সিনেমার দর্শকও তাঁর বুদ্ধি ও হৃদয় দিয়ে ছবি ও শব্দের সীমানা পেরিয়ে ‘চৈতন্যে’র রাজ্যে প্রবেশ করেন। মৃণাল সেন তাঁর ছবিতে দ্বান্দ্বিকতাকে উপস্থাপন করেছেন। এটা সবাই পারেন না। তিনি যেভাবে সমকালের রাজনীতি ও সমাজকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে জারিত করতে পেরেছেন, তা বিরলই বটে। ওঁর জগৎকে দেখার একটা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। যা একেবারেই ওঁর নিজের। স্রেফ গল্প বলার লোভ থেকে তিনি ছবি তৈরি করেননি। চলচ্চিত্র পরিচালক হয়ে খ্যাতি অর্জনেও তাঁর মোহ ছিল না। একটা লক্ষ্য ছিল। সেদিকেই এগিয়ে গিয়েছেন। কোনও অবস্থাতেই তাঁকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা যায়নি। শেষ পর্যন্ত মৃণাল সেন দর্শকদের স্বস্তি দেওয়ার বদলে, অস্বস্তিই উপহার দিয়েছেন। সেটাই তো তিনি করতে চেয়েছিলেন। চেয়েছিলেন দর্শকরা যেন জড় পদার্থের মতো তাঁর ছবি না দেখেন। তাঁরা যেন ছবি দেখে চিন্তার দিক থেকে। যাতে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। আজকে তেমন দর্শক ও পরিচালক কোথায়!




Comments


bottom of page