top of page
Search

উপন্যাস - কবি ও এক নারী

বিনোদ ঘোষাল

(কথামুখ- আমরা জানি কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বিদ্রোহী কবি। তাঁর লেখার মধ্যে বারংবার আছড়ে পড়েছে বিদ্রোহের আগুন। ব্রিটিশবিরোধী কবিতা লেখার কারণে তিনি একবছরের কারাদন্ডও ভোগ করেছিলেন, বাস্তবেই জীবনের নানাক্ষেত্রে নজরুলের এই বিদ্রোহী সত্তাকে আমরা প্রত্যক্ষ করলেও কবির যে গভীর একটি প্রেমিক সত্তা ছিল তা আমাদের অনেকেরই অজানা। নজরুল যেমন ঐশরিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তেমনই ছিল তাঁর মনোমুগ্ধকর রূপ, এর ফলে জীবনের নানা পর্যায়ে কবির প্রেমে পড়েছেন অসংখ্য নারী আবার অপরদিকে নজরুল নিজেও প্রণয়ে ডুবেছেন একাধিকবার, সেই কৈশোরকাল থেকে শুরু করে চিরকালের মতো অসুস্থ হয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত বহু রমণীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। গভীর প্রেমের সেইসব আখ্যান এক অচেনা প্রেমিক নজরুলের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটায়। কিন্তু প্রেমে যেমন থাকে সুখ তেমনই থাকে দুঃখ, যেমন থাকে মিলন তেমনই থাকে বিচ্ছেদ। যেমন থাকে অভিসার, তেমন থাকে প্রতীক্ষা। নজরুলের জীবনের বহু প্রেমকাহিনির মধ্যে যে প্রেমপর্বটি সবথেকে বেশি আলোচিত তা হ’ল নার্গিস। নজরুল এবং নার্গিসের প্রেমকাহিনি এমনই ঘটনাবহুল, গভীর এবং ট্রাজিক যা কোনও বিয়োগান্তক উপন্যাসকেও হার মানায়। এই কাহিনি তাদের দুজনের সেই প্রেম ও বিচ্ছেদকে নিয়ে লেখা। প্রিয় পাঠক, কল্পনা করুন এমন একটি দৃশ্য যখন শেষ বয়সে কবি নজরুল বৃদ্ধ, অসুস্থ, একাকী । এবং তার মনোজগতে এসে উপস্থিত হয়েছেন কিশোরী নার্গিস । কবি স্মৃতি রোমন্থন করছেন, ফিরে গেছেন সুদূর অতীতে।)

ঢাকা শহরের ধানমণ্ডির কবিভবনে তার নিজের বিছানায় কবি বসে রয়েছেন। সমস্ত শরীর স্থির। শুধু শ্বাসটুকু চলছে। বৃদ্ধ, স্থবির, জীর্ন শরীরটিতে যা অবশিষ্ট রয়েছে তা শুধুমাত্র অশ্রু। সেই অশ্রুই কুঞ্চিত গন্ডদ্বয় হতে আকাবাঁকা পথে বেয়ে জড়ো হচ্ছিল চিবুকে। তারপর গড়িয়ে নামছিল কন্ঠদেশ থেকে বুকে। তাঁর মনে পড়ছে প্রিয়তমা নার্গিসের কথা। আহ নার্গিস...হা নার্গিস বড় ভুল করে ফেলেছি, বড় অন্যায় করে ফেলছি আমি... এতকাল পর অভিব্যক্তিহীন অন্তরের এই আর্তনাদ শেষ রাতকে মথিত করে তুলছিল। ঘুম হয়নি এতটুকু। নার্গিসের সঙ্গে তাঁর মনোজগতের এই যাত্রাপথ যত না সুখের তার থেকে অনেক বেশি যন্ত্রনার। ঘন অন্ধকার ভরা ঘরে একাকী নিঃসঙ্গ কবি ফুঁপিয়ে উঠলেন। আহহহ...আজ এত বছর পরেও সেই যন্ত্রণা তার পিছু ছাড়েনি। সহসাই তিনি দেখতে পেলেন  ঘরে খাটের মুখোমুখি রাখা চেয়ারটিতে বসে রয়েছে এক কিশোরী। আহ! সেই প্রতিমার মতো অপরূপ মুখমন্ডল, তীক্ষ্ণ নাসা, ঈষৎ স্ফিত গাল, রক্তাভ চিকন ওষ্ঠাধর, পেলব তনু...সেই পূর্ণবয়স্ক দাঁড়াশ সাপের মতো বিনুনী, পরনে ডুরে শাড়ি...নার্গিস প্রিয়তমাসু! অস্ফুটে বলে উঠলেন কবি।



প্রিয়তমাসু! শব্দটি উচ্চারণ করে হেসে উঠল নার্গিস।

কুন্দফুলের মতো সেই দাঁতগুলির দিকে তাকিয়ে আজ এতকাল পরেও সেই মুগ্ধতা অনুভব করলেন নজরুল। হ্যাঁ নার্গিস, প্রিয়তমা আমার। তুমি এসেছ আমার কাছে! আমার এই পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া কঙ্কাল দেখাতে লজ্জা করছে নার্গিস। কেন এলে?

আমি স্বেচ্ছায় তো আসিনি কবি। আমার ইচ্ছে অনিচ্ছে নিয়ে আপনি কবেই বা ভেবেছেন? আপনি চিরকালই আত্মহারা। নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। আপনার কাছে চিরকালই আপন ইচ্ছেই শেষকথা। আজ থেকে ছাপ্পান্ন বছর আগে যেমন আপনার ইচ্ছেতে আপনার সহধর্মিনী হতে রাজি হয়েছিলাম আপনি আবার আজ এতবছর পর আপনার ইচ্ছেতেই ফিরে এলাম।

ছাপ্পান্ন বছর...! সত্যিই কি এতদিন পেরিয়ে গেছে?

হ্যাঁ গিয়েছে তো পেরিয়ে। বহুকাল পেরিয়ে গিয়েছে। বদলে গিয়েছে কতকিছু। সেই দৌলতপুরও আর আগের মতো নেই।

কিন্তু তুমি...তুমি কী করে সেই একইরকম রয়ে গেলে! যেদিন তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম সেই একই রকম রয়ে গেলে কীভাবে?

আবার হেসে উঠল নার্গিস। আলোকণার মতো সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল ঘরময়। এটাও আপনার ইচ্ছেতেই কবি। আপনি চাননি আমার বয়স বাড়ুক, তাই আমি একইভাবে থেকে গেলাম। 

নার্গিস...নার্গিস আবার নিজের মনে নামটা উচ্চারণ করলেন কবি। কী অপূর্ব আনন্দ হচ্ছে এই নামোচ্চারণে। ঘরময় যেন বেলফুলের গন্ধে ভরে গিয়েছে। হ্যাঁ তাই তো নার্গিস কাছে এলে এই ফুলেরই গন্ধ পেতেন কবি। নার্গিস তুমিই সেই নারী যার কাছে আমি প্রথম প্রেমের পাঠ নিয়েছিলাম। জানি...হ্যাঁ আমি বুঝি অন্যের অন্যায়ের শাস্তি আমি তোমাকে দিয়েছিলাম, তোমার মামা আলী আকবরের বিশ্বাসঘাতকতার সাজা আমি তোমাকে দিয়েছিলাম তোমার বিশ্বাস ভেঙেচুরে দিয়ে...পাপ করেছিলাম আমি…বড় পাপ। আর আজীবন সেই পাপেরই শাস্তি আমি বহন করে চলেছি। 

ছি ছি এমন বলবেন না দোহাই আপনার। 

ঠিকই বলছি নার্গিস, তোমার প্রতি যে অন্যায় আমি করেছি তার শাস্তি আমার প্রাপ্য ছিল। সেই শাস্তিই আমি পেয়েছি। কিন্তু এইটুকু বিশ্বাস করো, তোমাকে হারানোর যন্ত্রণা আমি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারিনি। আমার প্রতিটি সুখের মুহূর্তে, যন্ত্রণায়, ব্যার্থতায় তোমার ভাবনা থেকে আমি বিচ্যুত হইনি, হতে পারিনি। জীবনে বহু নারীকে ভালবেসেছি নার্গিস, তাদের কাছে এসেছি, কিন্তু তোমার মতো কাউকে মনের এত গভীরে টেনে নিতে পারিনি।

কবির চোখের দিকে তাকিয়ে নার্গিস বলে উঠল, আর সেই জন্যই বুঝি আমাকে সতেরোটি বছর অপেক্ষা করিয়ে রেখেছিলেন আপনি? সেই যে সেই রাতে আপনি বলে গেলেন আসছে মাসে আমাকে এসে নিয়ে যাবেন আপনি, আমি কিন্তু সত্যিই বিশ্বাস করেছিলাম আপনাকে। 

নজরুল চুপ করে মাথা নীচু করে বসে রইলেন। অশ্রুধারা তার কোলের ওপর পড়ছে। কবির মনে পড়ল পুরনো স্মৃতি। মনে পড়ল নার্গিসের সঙ্গে তার প্রথম দেখা হওয়ার কথা।

তখন তিনি কলকাতায় মুজফফর আহমেদের সঙ্গে একটি মেস বাড়িতে থাকেন। লেখালেখি শুরু করেছেন। অল্পবিস্তর নাম-ডাকও হচ্ছে। পরিচয় হ’ল এক তরুণ প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে। লোকটি ধুর্ত ব্যবসায়ী। অল্প পরিচয়েই সে বুঝে গিয়েছিল নজরুলের কাব্যপ্রতিভা অসামান্য। একে যদি কোনওভাবে বাগে নিয়ে আসা যায় তাহলে এর লেখা বই ছাপিয়ে ভাল টাকা রোজগার করা যাবে। মুজফফর আহমেদ এই আলী আকবর খানকে পছন্দ করতেন না, তিনি নজরুলকে বারণও করেছিলেন এই লোকটির সঙ্গে বেশি মেলামেশা না করতে। কিন্তু তরুণ, ছটফটে নজরুল কোনওদিনই কারও কথায় কান দেয়নি। সে সকলকেই সরলমনে বিশ্বাস করেছে। একদিন মুজফফএর অনুপস্থিতিতে তাকে কিছু না জানিয়েই নজরুল আলী আকবর খানের সঙ্গে রওনা হয়ে গেলেন সেই দৌলতপুরে উদ্দেশে। উদ্দেশ্য আলী আকবরের গ্রামের বাড়িতে, খোলামেলা পরিবেশ কিছুদিন কাটানো। সেখানে গিয়ে নজরুলের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল আলী আকবরের আলী আকবরেরে ভাগ্নী সৈয়দা খাতুনের সঙ্গে। অল্পবয়সে পিতৃহারা সৈয়দা তার মা আসমাতুন্নেসার সঙ্গে থাকে, মামাবাড়ির আশ্রয়ে। মামাই তার অভিভাবক। সকলে তাকে ডাকে দুবি নামে। নজরুল যখন খানবাড়ি পৌঁছেছে তখন দুলির সঙ্গে তার দেখা হয়নি, তবে মামাবাড়িতে ওর বোনের কাছে শুনেছে মামার এক পাগল বন্ধু এসেছে সে নাকি সারাক্ষণ হো হো করে হাসে, খোলা গলায় গান করে, ছোটদের সঙ্গে খেলা। দারুন মজার লোক। তার একমাথা চুল। সে আবার বন্দুক চালাতেও জানে। সে খানবাড়িতে আসার পর থেকে সবাইকে মাতিয়ে রেখেছে। বোনের কাছে এমন গল্প শুনে দুবিরও ইচ্ছা করে লোকটাকে দেখার। একদিন সেই সুযোগ এসেও গেল। খানবাড়িতে দুবির বয়সি এক আত্মীয়ার বিয়ে। তার নাম মানিক। সেই উপলক্ষ্যে আত্মীয়স্বজনে বাড়ি ভর্তি। ওই কবি তো রয়েছেনই। রোজ দুইবেলা বসছে গানের আসর। মধ্যমনি সেই কবি। সেদিনও বসেছে আসর।



মস্ত বৈঠকখানা ভর্তি মানুষ। পুরুষ আর শিশুরা বসেছে নজরুলকে ঘিরে আর মহিলারা ওই ঘরেই তবে পর্দার আড়ালে। আজকের আসরটি বসেছে বাড়ির মেয়েদের অনুরোধেই। কিন্তু খানবাড়ি রক্ষণশীল। পর্দার কড়াকড়ি রয়েছে। মেয়েরা অনাত্মীয় পুরুষের সামনে বসে গান শুনবে তা হতে পারে না। সুতরাং ঐ বৈঠকখানার ঘরেই আড়াআড়ি পর্দা টাঙিয়ে একদিকে বসল মেয়েরা অন্যদিকে নজরুল আর আলী আকবর এবং বাড়ির কয়েকজন শিশু। সাদা ধপধপে পাঞ্জাবি, ধুতি পরে, পরিপাটি চুল আঁচড়ে বসেছে নজরুল। হারমোনিয়ামে আঙুল চলছে কখন ধীরে কখনও দ্রুত। দু’চোখ অর্ধনিমিলিত , সুরের জগতে মনে মনে প্রবেশ করছে কাজী। উপস্থিত শ্রোতারাও ওপ্রান্তে প্রস্তুত। নজরুলের পাশে রাখে চায়ের পেয়ালা, পানের ডিবে। আলী আকবরের দিকে তাকিয়ে নজরুল হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতেই জিজ্ঞাসা করল, আজ আপনার ফরমায়েস দিয়েই আসর শুরু করি, বলুন খান সাহেব কী গান শুনবেন?

আলী আকবর বেজায় খুশি হয়ে বললেন ওই যে সেই গানটা, বরিশালে লিখেছিলেন যেটা, ক’দিন আগে মোসলেম ভারতে বেরিয়েছে...মরমি মরমি।

আচ্ছা বেশ, মৃদু হেসে নজরুল লম্বা শ্বাস টেনে মুখ উঁচু করে গলা ছাড়ল-

কোন মরমীর মরম ব্যথা আমার বুকে বেদনা হানে,

জানি গো, সে জানেই জানে।

আমি কাঁদি তাইতে যে তার ডাগর চোখে অশ্রু আনে,     

বাইরে বাঁধি মনকে যত

ততই বাড়ে মর্ম-ক্ষত

মোর সে ক্ষত ব্যাথার মতো

বাজে গিয়ে তারও প্রাণে

কে কয়ে যায় হিয়ার কানে।...

ঘর ভর্তি মানুষ কোন জাদুমন্ত্রে যেন স্থির। শিশুরাও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তাদের কাজীদাদার দিকে। সারাক্ষণ হুল্লোর করতে থাকা এই দাদাটা যখনই গান গায় তখনই কেমন যেন অচেনা অন্য মানুষ হয়ে যায়।

...দুইটি হিয়াই কেমন কেমন

বদ্ধ ভ্রমর পদ্মে যেমন,

হায় অসহায় মূকের বেদন

বাজল শুধু সাঁঝের গানে,

পুবের বায়ুর হুতাশ তানে।

গান থামল। সকলে চুপ, কেউ কোনও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল না। নজরুল সবে পরের গানে যেতে যাবে। পর্দার ওদিকে থেকে খান বাড়ির এক মহিলা বেরিয়ে এলেন। আলী আকবরের কানে ফিসফিস করে কী যেন বললেন?

তার কথা শুনে গম্ভীর মুখ করে অল্প মাথা নাড়লেন আলী আকবর। তারপর বললেন, হুম বেশ। মহিলা চলে যেতে আলী আকবর জোর গলায় বললেন, উপস্থিত সকলকে একটা কথা জানাই। গায়ক, ভারত বিখ্যাত কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের এই গরিবখানায় আতিথ্য গ্রহণ করে শুধু আমাদের নয় গোটা দৌলতপুরকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন। আজকের আসরে অনেক শ্রোতা রয়েছেন যারা এই প্রথমবার কাজীর সঙ্গীত সুধা পান করলেন এবং মুগ্ধ হলেন। যে অলৌকিক সুর কাজীর কন্ঠে রয়েছে তার স্পর্শে যে কেউ মোহিত হয়ে পড়বে এটাই স্বাভাবিক, সেই কারণে আমার কাছে অনুরোধ এসেছে শ্রোতারা সেই গায়ককে স্বচক্ষে দেখে গান শুনতে চান। অনুরোধটি সামলানো আমার পক্ষে একটু কঠিনই ছিল কারণ তা খান পরিবারের রীতিবিরুদ্ধ, কিন্তু...বলে একটু থামলেন আলী। তারপর আবার বললেন কিন্তু নজরুল কোনও অপরিচিত ব্যক্তি নন, আমাদের সৌভাগ্য যে তিনি খানপরিবারের একজন সদস্য হয়ে উঠেছেন। তাকে আমরা সকলে আমাদেরই একজন মনে করার বিরল সম্মান অর্জন করতে পেরেছি। তাই আমি আমার পরিবারের পক্ষ থেকে মহিলাদের অনুরোধ রক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। পর্দা সরিয়ে দেওয়া হোক।

খান পরিবারের সর্বময় কর্তা, একমাত্র বিএ পাস আলী আকবরের এহেন লেখ্য সাধুভাষা প্রয়োগ সমেত ঘোষণায় পর্দার ওইপ্রান্তে বসে থাকা মহিলামহলে উচ্ছ্বাসের গুঞ্জন শুরু হল। সরে গেল পর্দা। এই প্রথমবার খান পরিবারের রীতি ভাঙা হল। আর এতক্ষণ আড়ালে বসে থাকা দুবি অবাক দৃষ্টিতে দেখল একুশ বছর বয়েসি এক তরতাজা যুবককে, তামাটে গায়ের রঙ, চওড়া কাঁধ, বলিষ্ঠ দুই হাত, তীক্ষ্ণ নাসা, ঘনকালো একমাথা ঝাঁকড়া চুল আর মায়াভরা দুটি গভীর চোখ-যেন রূপকথার এক দিব্যকান্তি রাজকুমার! এ কে? যেমন রূপ তার তেমনই মন আকুল করে দেওয়া কন্ঠ!

নজরুল সকলের দিকে তাকাল। হয়তো দেখল কিংবা দেখল না, তার মন এখন সুরের রাজ্যে। গান ধরল, এবার রবিঠাকুরের গান-

সে কোন বনের হরিণ ছিল আমার মনে।

কে তারে বাঁধল অকারণে।।

শুনে কী যে হল দুবির সবকিছু গুলিয়ে গেল। রাতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়ার পরেও সেই অস্থিরতা কমল না। অন্ধকার ঘর। মেঝেতে লম্বা চাটাই পাতা। একতলার একটি ঘরে পাশাপাশি শুয়ে রয়েছে দুবি, হেনা, মানিক, জটি। ওপরে খাটের ওপরে শুয়ে মা, মাসি। সকলে গভীর ঘুমে। শুধু ঘুম আসছে না দুবির। অনেকক্ষণ ধরে এপাশ ওপাশ করে চলেছে। একবার মনে হচ্ছে এপাশ ফিরে শুলে ঘুম আসবে, একটু পরে মনে হচ্ছে নাহ ওপাশে ফিরলে। কোনও পাশেই ঘুম নেই। বাইরে একটানা ঝিঁঝি পোকার দল ডেকে চলেছে। ঝিঁঝির ডাক যেন রাতের বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। কানে তালা ধরিয়ে দিচ্ছে যেন, অসহ্য!

অস্থির হয়ে এপাশ ওপাশ করছিল যুবি। কত রাত হয়ছে কে জানে?

হঠাৎই কানে এল বাঁশির সুর। খুব বেশি দূর থেকে নয়, কাছেপিঠেই কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে। কান পেতে শুনল সৈয়দা। আহ কী অপূর্ব সুর! কিন্তু এত রাতে কে এমন বাঁশি বাজাচ্ছে? এ কি সত্যি নাকি স্বপ্ন? কে বাজাচ্ছে...কে? একবার মনে হল তা জেনে কী দরকার? চুপচাপ শুয়ে শুনলেই তো হয়, তারপরেই মনে হল নাহ জানতেই হবে, এত রাতে কেন এমন করুণ সুর বাজাচ্ছে সে বাঁশিওলা। সাবধানে উঠল সৈয়দা। কেউ যেন জেগে না যায়। পা টিপে টিপে অন্ধকারে আন্দাজ করে গেল দরকার সামনে। দরজা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে। বিয়ে বাড়ির হ্যাজাকবাতিগুলোর কয়েকটা তখনও নিভুনিভু। তাদের সামান্য আলো ছড়িয়ে রয়েছে দালানে। ওই আলোয় বাইরের অন্ধকারের কিছুই এসে যাচ্ছে না। কোনদিক থেকে বাঁশির সুর ভেসে আসছে সেটা বোঝার চেষ্টা করল। আমতলার বড়পুকুরের দিক থেকে আসছে। ওদিকে ঘন অন্ধকার। যাওয়া উচিত হবে না। কিন্তু সেই তীব্র মন খারাপ করা সুর এই গভীর রাতে যুবিকে নিশির মত টানতে থাকল। কার বাঁশিতে এত বেদনা ভরা রয়েছে তাকে একবার দেখার তীব্র বাসনা উদ্বেল করে তুলল ওকে। নিজেকে শতবার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও পারল না। ওই অন্ধকারেই খালি পায়ে হাঁটতে থাকল পুকুরের দিকে। ঘোর লেগে যাচ্ছে সেই সুরে...কে বাজাচ্ছে এমন বাঁশি?

পুকুর ঘাটের কাছে আসতেই সহসা তার মনে পড়ল মানিকের কথা। হ্যাঁ বাঁশি বাজানোর কথাও তো শুনেছিল ও। তাহলে কি সেই কবিই বাজাচ্ছে এইভাবে? নিজের বেখেয়ালেই হাঁটতে হাঁটতে কখন যে সৈয়দা পৌঁছে গেল পুকুরঘাটে। ঘন অন্ধকার চিরে মন ভারি করা সেই সুর আচ্ছন্ন করে তুলল সৈয়দাকে। এক অচেনা কষ্টে, কিছু একটা না পাওয়ার বেদনায় বুকের ভেতরটায় যেন পাক দিতে থাকল। এত হাহাকার কেন এই সুরে? কতক্ষণ সময় পেরিয়ে গেল কোনও হুঁশ নেই। গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ওই অন্ধকারের মধ্যে দুবি দেখতে থাকল পুকুর ঘাটে বসে এক ছায়ামুর্তি পুকুরের দিকে মুখ করে আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছে। এই নিবিড় অন্ধকারে এক অদ্ভূত ব্যথাজড়ানো মায়াজালে যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল দুবি। যেন অনন্তকাল কেটে গেল খেয়াল থাকল না, বাঁশির ওই দুঃখবোধটিকেই পরম বরণীয় মনে হল, দু’হাতে আলিঙ্গন করতে ইচ্ছে হল সেই সুরকে।


কতক্ষণ যে এইভাবে কেটে গেল কে জানে সহসাই সম্বিত ফিরল সৈয়দার। ছি ছি এ কি কান্ড করেছে ও! কেউ যদি দেখে ফেলত! দ্রুত পায়ে ফিরে এল ঘরে। কিন্তু মন তোলপাড় করতে থাকল একটিই ভাবনায়, অমন করুণ সুর কেন? সে কি আহত? কারও কথায়, আচরণে?

# # #

রাত কাটল বিনিদ্র। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই আবার বাড়িতে উৎসবের মেজাজ ফিরে এল। মানিক আজ শ্বশুরবাড়ি যাবে। যদিও খুব বেশি দূরে নয়, আর সেই বাড়িও আত্মীয় বাড়িই, কিন্তু তবু নিজের জন্ম, বেড়ে ওঠা যেখানে তা চিরকালের জন্য ছেড়ে অন্য ঠিকানায় চলে যাওয়ার মধ্যে একটা চিরন্তন কারুণ্য, বিচ্ছেদভাবনা রয়েছে। মানিকও বিদায় নেওয়ার কালে খান মঞ্জিলে তেমনই একটা পরিবেশ রচিত হল। সকলেরই মন ভার, বেদনাসিক্ত। কিন্তু সৈয়দার মন অস্থির। নিদ্রাহীনতার কারণে ঈষৎ রক্তাভ চোখদুটি আজ বড় চঞ্চল। বার বার এদিক ওদিক দেখছে, খুঁজছে একজনকে, সে কোথায়? দেখা হলে একটি প্রশ্ন করতে হবে তাকে, করতেই হবে। কিন্তু গতকালকের মতো আজও সকাল থেকে তার দেখা নেই। কী হল? মানিকের সংগে আজ যুবিরাও ফিরে যাবে। তারই তোড়জোর চলছে। জলখাবার সেরে বেরোবে সকলে। দুবি অন্যমনস্ক হয়ে তাকে এঘর ওঘর খুঁজতে থাকল। নাহ কোথাও নেই। মানিক ওকে বারবার ডাকছে। যুবি কাছে গিয়েও আবার সরে সরে যাচ্ছে। কোথাও নেই কেন সে? সহসা মনে পড়ল আচ্ছা আরেকবার সেই পুকুরঘাটে গিয়ে দেখলে হয় না? ভাবামাত্র আর অপেক্ষা করল না দুবি। প্রায় উর্ধ্বশ্বাসে পৌঁছল পুবের সেই পুকুরঘাটে। হ্যাঁ ওই তো ঠিক ওখানেই...গতকাল রাতের মতো আজও সেই একইভাবে চুপ করে পুকুরের দিকে তাকিয়ে বসে রয়েছে সে। দুবি একটু থামল। ভাবল এইভাবে যাওয়া কি ঠিক? তারপরেই মনে হল যদি এই মুহূর্তে কথা না বলে তাহলে আরও অস্থিরতায় কাটবে। হনহন করে পুকুরঘাটের দিকে এগিয়ে গেল দুবি। নজরুলের খেয়াল নেই কেউ যে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

আপনি কি কাল রাতে বাঁশি বাজিয়েছিলেন? প্রশ্নটা করেই ফেলল সৈয়দা।

সামন্য চমকে উঠেই তাকাল নজরুল। তারপরেই একগাল হাসি। আরে তুমি! হ্যাঁ আমিই বাজাচ্ছিলাম। কিন্তু সে তো অনেক রাতে। তুমি শুনেছ?

হুঁ শুনেছি।

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শুনছিলে বুঝি? বলেই হো হো করে হেসে উঠল নজরুল।

ওই হাসি দেখে যেমন মন ভাল হয়ে গেল, তেমনই একটু রাগও হল। বলে ফেলল, মোটেই না, আমি এখানে এসেই শুনেছি।

সত্যি!  ওই রাতে তুমি এখানে এসেছিলে!

মাথা নিচু করে ডানপায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে মাটিতে আঁচড় কাটতে থাকল দুবি। ঝোঁকের মাথায় কথাটা বলে ফেলে এবার বেশ লজ্জা লাগছে।

কী হল মাথা নিচু করে ফেললে যে?

আমি যাই।

না যেও না, দাঁড়াও।

থমকে গেল দুবি। বুকের ভেতর অসম্ভব জোরে জোরে শব্দ হচ্ছে। নিশঃশ্বাস ভারি লাগছে খুব।

তোমার বাঁশি শুনে ভাল লেগেছে?

না।

লাগেনি? কেন?

আপনার বাঁশি বড্ড করুণ সুরে বাজে? কেন অমন বাজবে?

আবার হো হো করে হেসে উঠল নজরুল। অমন আকাশ কাঁপানো হাসিতে দুবির বুক আরও কেঁপে উঠল। এমন প্রবলভাবে হাসতে পারে যে লোক তার বাঁশি এমন কষ্টের কেন?

তুমি কি জানো না রাধা-বিরহে কাতর কৃষ্ণের বাঁশি ঠিক এমনই করুণ হত।

নজরুলের কথা কিছু বুঝতে না পেরে আবার নজরুলের দিকে। তাকাল। তাকিয়ে চোখ সরাতে ভুলে গেল। নজরুলও অপলক তাকিয়ে রইল সৈয়দার দিকে। কী রূপ! আহা! পৃথিবীর শেষপ্রান্তে এই শান্ত ছোট অচেনা গ্রামখানিতে যে এমন এক আশ্চর্যরূপময়ী থাকতে পারে তা যেন নজরুলেরও কল্পনাতীত ছিল। ওই দুই চাহনির মধ্যে কত সহস্র রূপকথার জন্ম হল কে জানে...

চোখ নামিয়ে নিল সৈয়দা। এত অস্থির কেন লাগছে?

নজরুল জিজ্ঞাসা করল, তোমার নামটাই আমার জানা হয়নি। কী নাম তোমার?

সৈয়দা খাতুন। প্রায় ফিসফিস করেই বলল যুবি। এখনই এখান থেকে ছুটে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কী এক আকর্ষণ তাকে শক্ত করে বেঁধে রেখেছে মাটিতে।

সৈয়দা...সৈয়দা। বারকয়েক নামটা উচ্চারণ করল নজরুল তারপর ঠোঁট উলটে বলল, উঁহু, যিনি তোমার নাম রেখেছিলেন তিনি কিন্তু খুব রসিক মানুষ নন, তা না হলে এমন ফুলের মতো যার রূপ তার নাম হওয়া উচিত ছিল ফুলের নামে তা না হয়ে এইসব নাম...উঁহু এটা ঠিক হয়নি। বলেই আবার হা হা করে হেসে উঠল।

সৈয়দা কী বলবে না ভেবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল নজরুলের দিকে।

নজরুল যেমন, নিজের খেয়ালের রাজা। সামনে দাঁড়ানো অচেনা কিশোরীটি কি মনে করছে তার দিকে কোনও খেয়ালই নেই। বলল, আমি ভাবছি আজ থেকে তোমার একটা নাম দেব। নতুন নাম।

নতুন নাম! আবার চমকে উঠল দুবি।

হ্যাঁ, পারস্য দেশে এক কবি ছিলেন তার নাম হাফিজ, আমার প্রাণের কবি। তার কবিতায় একটি ফুলের নাম বার বার ঘুরে ফিরে আসে, ভারি সুন্দর সে নাম, তোমাকে সেই ফুলের নামটি আমি দিতে চাই, নেবে তুমি?

কপাল, গলা, কানের দুইপাশে স্বেদবিন্দু জমে উঠেছে দুবির। কপালের সামনের চুলের কুচি সিক্ত।

আমার নাম?

হ্যাঁ, সেই ফুলের নাম হল নার্গিস। শুনেছি সেই ফুল দেখতে এমন অপুর্ব তেমনই তার সুবাস, আর লতানে গাছটির পেলবতাও অসামান্য হয়তো ঠিক তোমার মতই। আজ থেকে তোমার নতুন নাম দিলাম আমি নার্গিস।

গা সিরসির করে উঠল সৈয়দার। কান্না পেল, আচমকাই কী ভীষন কান্না পেল ওর।

টি টি টি টি টি টিইই করে একটানা পাখি ডেকে চলেছে কোনও গাছের আড়াল থেকে।

পছন্দ হয়নি তোমার নামটা?

সৈয়দা কিছু না বলে একছুটে পালাতে যাচ্ছিল তখনই দেখতে পেল ছোটমামা এই পুকুরের দিকেই আসছে। সর্বনাশ! এবার কী হবে? ছি ছি কী ভাববে মামা! পুকুরঘাটে ওরা দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই, নিশ্চয়ই বুঝে যাবে কবি আর ও মিলে এখানে গল্প করছিল। তারপর? খুব বকবে মামা সকলের সামনেই? বেশরম বলবে দুবিকে? আশংকায় বুক গুরগুর করে উঠল সৈয়দার।

কিন্তু নজরুল বরং আলী আকবরকে দেখে উল্লসিতই হয়ে উঠল। হাত তুলে বলে উঠল এই তো খাঁ সাহেব আসুন আসুন এইমাত্র একটা যুগান্তকারী ঘটনা ঘটিয়ে ফেললাম।

যুগান্তকারী? কী? বলে মৃদু হেসে একবার দুবির দিকেও তাকালেন আলী আকবর।

আরে আপনার ভাগ্নী এমন অপরূপ সুন্দরী আর তার নাম কিনা সৈয়দা খাতুন। আচ্ছা বলুন তো এমন ফুলের মত সুন্দর মেয়ের নাম সৈয়দা হওয়া উচিত নাকি কোনও ফুলের নামে? তাই আমি হাফিজের প্রিয় ফুলের নামে ওর নতুন নাম দিয়েছি নার্গিস। কেমন হল নামটা বলুন?

আলী আকবর স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি নজরুল এই কথা বলতে পারে। কয়েক মুহূর্তের জন্য একবার নজরুলের মুখের দিকে আরেকবার সৈয়দার মুখের দিকে তাকালেন। মুখ দেখে বোঝাই যায় তিনি বেশ বিব্রত। সৈয়দার লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। ইস কেন যে মরতে এখানে আসতে গিয়েছিল...!

কিন্তু আলী আকবর পরক্ষণেই হাসি মুখে বলে উঠলেন, বাহ সুন্দর, খুব সুন্দর নাম। বেশ তো আমি সকলকে বলে দিচ্ছি আজ থেকে যুবিকে সবাই নার্গিস বলেই ডাকবে। কী রে নতুন নাম পছন্দ হয়েছে তো তোর

সৈয়দা কোনও উত্তর দিল না। মাথা নিচু। মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।

আপনার ভাগ্নী তো লজ্জাতেই শেষ, বোঝার উপায় নেই পছন্দ হয়েছে কি না।

না না আপনার দেওয়া নাম পছন্দ না হওয়ার কোনও কারণ তো নেই বরং ওর সাতজন্মের সৌভাগ্য ওর নতুন নামকরণ করলেন আপনি।

সৈয়দা বুঝল কবির সবকিছুই ছোটমামার কাছে প্রশংসনীয়।

যা তুই যা, মানিক খুঁজছে তোকে।

এই অনুমতিটুকুরই অপেক্ষায় ছিল দুবি। একছুটে চলে এল বাড়িতে। প্রচন্ড হাঁফাতে লাগল। দম যেন বন্ধ হয়ে আসছে অথচ আশ্চর্যরকম হালকা লাগছে গোটা শরীর, যেন হাতদুটো ডানার মত মেলে দিলেই উড়তে পারবে এই গ্রামের ওপর দিয়ে, আকাশে মেঘের ভেতরে। নার্গিস...নার্গিস ফিসফিস করে উচ্চারণ করল সৈয়দা। কেমন যেন অচেনা লাগছে নিজেকে, অদ্ভূত ভাললাগায় জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে নার্গিসকে। নার্গিস...নার্গিস! কবির দেওয়া নাম।

 

কতকাল আগের সেই প্রথম দর্শনের সুখস্মৃতি মনে পড়ায় কাতর হয়ে উঠলেন কবি। দীর্ঘ অসুস্থতার কারণে তার দৃষ্টি ঝাপসা, চোখদুটি জলে ভরে ওঠায় কিছুই প্রায় দেখতে পাচ্ছিলেন না। ফুঁপিয়ে উঠলেন কবি। বলে উঠলেন, আমি...আমি...আমারই দোষ, কিন্তু বিশ্বাস করো নার্গিস আমি তোমাকে ভালবেসেছিলাম, সত্যিই অন্তর থেকে ভালবেসেছিলাম তোমাকে। সেই ভালবাসায় আমার এতটুকু ফাঁকি ছিল না।

নার্গিস বলল, জানি কবি। আপনি ফাঁকি দিতে জানেন না সে আমার অজানা নয়। আপনি ভালবাসেন যেমন নিখাদ, প্রত্যাখ্যানেও আপনার কোনও ফাঁকি থাকে না।

নার্গিসের এই কথার কী উত্তর দেবেন ভেবে পেলেন না কবি। কিছু তো ভুল বলেনি নার্গিস। নজরুল আগ্রহেই নার্গিস সেই সম্পর্কে জড়িয়েছিল, এবং তারপর বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল আলী আকবরের কাছে। আলী আকবর খানও ঠিক এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। তিনি খুব ভাল করেই বুঝতে পেরেছিলেন নজরুল তার ভাগ্নির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। এবং এই প্রেম যাতে আরও গাঢ় হয় সেই পরিবেশও তিনি বাড়িতে তৈরি করে ফেলেছিলেন। যদিও নার্গিসের মা আসমাতুন্নেসার মনে একটা আশংকা ছিল নজরুল যতই ভাল কবি হোক না কেন, একেবারেই বাউন্ডুলে স্বভাবের। কাজ কর্মও তেমন কিছুই করে না, এই ছেলের সঙ্গে নার্গিস সম্পর্কে জড়ালে নার্গিসের জীবন নষ্ট হবে না তো!

কিন্তু বিধবা বোনকে আশ্বস্ত করেছিলেন আলী আকবর। বলেছিলেন নজরুল একটি সোনার টুকরো। সে এখন রোজগার না করলেও অদূর ভবিষ্যতেই প্রচুর টাকা রোজগারের ক্ষমতা রাখে, এবং তার থেকেও বড় কথা ভবিষ্যতে এই ছেলেটি ভারতবিখ্যাত কবি হবে। সুতরাং খানপরিবারের সৌভাগ্য যে নজরুল নার্গিসকে ভালবেসেছে। এর কিছুদিন পর নজরুল নিজেই আলী আকবর খানকে প্রস্তাব দিলেন যে সে  নার্গিসকে বিয়ে করতে যায়। আলো আকবর তো এটাই চাইছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজি। বিয়ের ব্যবস্থা করে ফেললেন তিনি। তখন দেশে অসহযোগ আন্দোলন চলছে পুরোদমে। অবরোধ, পিকেটিং, মিছিল, বনধ, হরতাল দেশ টালমাটাল। নজরুল চাইল বিয়ের খবর কলকাতায় তার বন্ধুদের জানাতে। কিন্তু আলী আকবর মোটেও সেটা চাইলেন না। বিশেষ করে মুজফফর আহমেদকে তিনি মোটেও ভরসা করেন না। লোকটা খুবই বুদ্ধিমান। সে এই বিয়ের কথা জানতে পারলেন নিশ্চয়ই বাধা দেবে। এবং নজরুল যেহেতু মুজফফরকে খুবই বিশ্বাস করে সে হয়ত মুজফফরের কথা মেনেও নিতে পারে। তাই আলী আকবর নজরুলকে বোঝালেন এই পরিস্থিতিতে কলকাতার কাউকে কিছু জানানোর দরকার নেই। বিয়ে হয়ে যাক তারপর সকলকে জানালেই হবে।

সরল নজরুল আলী আকবরকে বিশ্বাস করলেন। স্থির হয়ে গেল বিয়ে। আর বিয়ের দিনেই...

নার্গিস জিজ্ঞাসা করল, আপনার মনে পড়ে কবি সেই দিনটার কথা? সেই প্রবল বর্ষণের দিনতার কথা। যেদিন আপনি আমাকে নিঃস্ব করে, মাঝপথে ফেলে রেখে চলে গিয়েছিলেন?

কখনও ভুলিনি নার্গিস। মনে রয়েছে। সবকিছু মনে রয়েছে। বলতে বলতে কবি আবার ফিরে গেলেন সেই দিনটায় যেদিন নার্গিসের সঙ্গে তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল। দৌলতপুরে খানবাড়ি গ্রামের অভিজাত পরিবার। আলী আকবর খান ঢালাও ব্যবস্থা করেছেন। বিয়ের কয়েকদিন আগে থেকেই প্রতিদিন দুই বেলা কয়েকশো লোকের পাত পড়ছে। আত্মীয়স্বজনে বাড়ি জমজমাট। আলী আকবর কাহেন্র বন্ধু কুমিল্লার সেনগুপ্ত বাড়ি, যেখানে আলী আকবর নজরুলকেও নিয়ে গেছিলেন সেই সেনগুপ্ত পরিবারের আটজন মানুষ চলে এসেছেন বিয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। হৈ হৈ চলছে। বিয়ের দিন সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। বিকেল হতেই নামল আকাশ ভেঙে বৃষ্টি, সঙ্গে তুমুল ঝড়। সবকিছু ওলোটপালোট। অমন প্রয়লঙ্করী ঝড় আগে কখনও দেখেনি দৌলতপুরবাসী। বিয়ে বুঝি পণ্ড হয়!

মানিক আর হেনা মিলে সাজিয়ে তুলছিল নার্গিসকে। পাকা গমের মতো গায়ের রঙ আর নিটোল, কিশোরী দেহলতাটি আরও ঐশর্যময়ী হয়ে উঠছিল অঙ্গরাগে। হলুদ মেখে স্নান করার পর জড়ি পার নতুন শাড়ি, ব্লাউজ, মুখে সামান্য স্নো পাউডার, চোখে গাঢ় কাজল, লম্বা চুল পরিপাটি আঁচড়ে খোঁপা করে সেই খোঁপায় গোল করে দেওয়া হয়েছে বেলি ফুলের মালা। গয়নার মধ্যে কপালে টিকলি, গলায় মায়ের বিয়ের হারগাছি, আর মামাদের দেওয়া নাকে নথ, কানে ঝুমকো, দুইহাতে একজোড়া বালা। সাজনো হয়ে যাওয়ার পর মানিক নার্গিসের শাড়িতে কিছুটা বেলফুলের আতর ঢেলে দিয়ে বলল তোকে আজ যা সাজিয়ে দিলাম না, দেখে তোর কবির মাথা পুরো ঘুরে যাবে। 

যাহ কী যে বলিস! লজ্জা পেয়ে বলে উঠল নার্গিস।

হুঁ ঠিকই বলি। নিজের চোখেই দেখ তাহলে। বলে এক হাতে ছোট আয়নাখানি ধরে অন্য হাতে লন্ঠন তুলে ধরল মানিক। বাইরে প্রবল বর্ষণের কারণে ঘরের দরজা জানলা সব বন্ধ। মানিকের ধরে থাকা লন্ঠনের নরম আলোতে আয়নার দিকে তাকাল নার্গিস। অবাক হয়ে গেল। এত সুন্দর লাগছে! নিজেরই গালে হাত রাখতে ইচ্ছে করল। 

কী কেমন লাগছে? হুঁ হুঁ আজ ভাইজান তোকে সারারাত আদর করবে। তৈরি থাক। হি হি।

মানিকের কথায় গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল নার্গিসের। চুউউপ বলে ওর মুখ চেপে ধরল।

মানিক আবার নিজের মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল সে আমার মুখ যতই চাপিস, আজ যা বললাম তাই সত্যি হবে দেখিস। 

উফ এই মেয়েটাকে নিয়ে আর পারা গেল না! কিন্তু ওর কথাগুলো শুনতে এত ভাল লাগছে। ভেতরে ভেতরে কেঁপে উঠছে নার্গিস। আর কতক্ষণ পর দেখা হবে কবির সঙ্গে। কখন সে নিজে হাতে আমার  চিবুকটি ধরে নিজের মুখের সামনে মেলে ধরে বলবে নার্গিস, প্রিয়তমাসু, তোমার হৃদয়ই আমার দেশ, তোমার ওষ্ঠাধরই আমার শ্রেষ্ট কবিতা। 

নার্গিস এইসব কথার মানে সবটা বোঝে না, অনেককিছুই অস্পষ্ট থেকে যায়। কিন্তু কবির সঙ্গে যে কয়েকবার আন্তরিক মুহূর্ত কাটিয়েছে তখন নজরুলের বলা এই লাইনগুলো কেন কে জানে মনে গেঁথে গিয়েছে। দিনে কতবার যে নিজের কানে বাজতে থাকে কথাগুলো!

কিন্তু বাইরে আজই কেন এমন প্রলয়? বাজের আর ঝড়ের শব্দে ঘরের বন্ধ জানলা সব থরথর করে কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছে আজই যেন পৃথিবীর অন্তিম লগ্ন। উঠোনের বাঁশ আর কাপড়ের প্যন্ডেল ভেঙে পড়েছে মাটিতে। বাড়ির সকলে ঘরের ভেতর বারান্দায় বৃষ্টির প্রকোপ থেকে বাঁচতে জড়োসড়ো। বাজনদারদের গানবাজনা, তাদের জন্য তৈরি মঞ্চ ভেঙে পড়েছে। সব আয়োজন লন্ডভন্ড। মনে কেমন যেন কু ডাকছে নার্গিসের। সবকিছু শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক হবে তো? কিছুক্ষণ আগে মানিক ঘরের বাইরে বেরিয়েছিল প্রকৃতির অবস্থা বুঝতে। ঘরে ফিরল মুখ কালো করে। নার্গিস জিজ্ঞাসা করতে বলল, বৃষ্টি এবার কমে যাবে। 

তাহলে তোর মুখ কালো কেন?

মানিক মুখে বলল, ও কিছু নয় এমনিই। কিন্তু মন তার খুব খারাপ হয়ে গিয়েছে। বারান্দা পেরিয়ে যাচ্ছিল। কানে এল ভাইজানের সেই পাতানো মা, কী যেন নাম ওহ বিরজাদেবী আর তার শাশুড়ি গিরিবালা মিলে আলোচনা করছেন, সত্যিই নুরু আর বিয়ে করার জন্য মেয়ে পেল না! এমন অজগাঁ তারপর মেয়ের লেখাপড়া প্রায় কিছুই নেই। বাংলাদেশে কি নুরুর মেয়ের অভাব ঘটত যে এখানে শ্বশুরঘর করতে গেল। ওর বন্ধুরা পর্যন্ত অতদূরে বসে এই  আলীর এই চক্রান্ত বুঝতে পারছে, আর এই বোকা ছেলে বুঝল না!

গিরিবালার কথায় বিরজাসুন্দরী বললেন, আমাকে ওর বন্ধু চিঠি লিখে বলছে আমরা যেন একটু চেষ্টা করি, যদি নুরুকে বুঝিয়ে শুনিয়ে থামানো যায় ...আচ্ছা আমরা কী চেষ্টা করব? আর বিয়ে আটকাতে আমরাই বা যাব কেন বাপু? তারপর সব দোষ নুরু আমাদের দেবে। তবে নুরুর বন্ধুর কথাই ঠিক, মহা ধুরন্ধর বটে আলী। 

মানিক ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনে ঘেমে উঠছিল। এ কেমন কথা! ভেতরে ভেতরে এই বিয়ে আটকানোর এমন চক্রান্ত চলছে নাকি! কে দিয়েছে চিঠি? কাজীদাদার কোন বন্ধু বিরজাদেবীকে চিঠি পাঠিয়েছে বিয়ে ভাঙার জন্য? হে আল্লাহ সবকিছু যেন ভালভাবে মিটে যায়। কুমিল্লার এই পরিবারটির বড্ড নাক উঁচু। সবেতেই একটা অপছন্দের ভাব। এত খাতিরদারি করেও এদের মন পাওয়া যাচ্ছে না। কী অভিসন্ধি রয়েছে কে জানে...

# # #

ঝড়-বৃষ্টি থামল একসময়। শান্ত হল প্রকৃতি। বিয়ে বাড়ি আবার নিজের মেজাজে ফেরার আয়োজন শুরু হল। ফের বাঁশ পুঁতে টাঙানো হল শামিয়ানা। গান বাজনার মঞ্চ তৈরি হল নতুন করে। অতিথিদের বসার আয়োজন। উঠোনে নালা কেটে জমা জল বার করার কাজে লেগে পড়ল ছেলের দল। আকদের কাজও শুরু হয়েছে। আর কিছুক্ষণের অপেক্ষা। 

সন্ধে নামতে খান মঞ্জিল একশো হ্যাজাকের আলোতে ঝলমল করে উঠল। বিকেলের বৃষ্টির পর ভ্যাপসা গরমভাব একেবারেই আর নেই। বরং ফিনফিনে নরম মিষ্টি হাওয়া দিচ্ছে। হাওয়াতে ভেজা মাটির গন্ধ। আকাশ ঝকঝকে পরিস্কার। দুর্যোগ কেটে গিয়েছে। নজরুলও নতুন পায়জামা আর পাঞ্জাবিতে সেজেছে আজ। পরিপাটি করে আঁচড়েছে একমাথা ঝাঁকড়া চুল। গায়ে আতরের সুগন্ধ ভুরভুর করছে। একেবারে রাজপুত্রের মতো দেখতে লাগছে। আজ আকদ মিটে যাওয়ার পর রাতে যখন নার্গিসকে একান্তে পাবে তখন প্রথমেই  যে কবিতাটি শোনাবে তাকে সেটি মনে মনে লিখে রেখেছে নজরুল। একুশ বছরের যৌবন আজ সত্যিই বাঁধনহারা।

আজ বিয়ে পড়াবেন নার্গিসের বড়ভাই মুন্সি আবদুল জব্বার। বিয়ের উকিল হবেন আলী আকবরের বড় ভাই আলতাফ আলী আর বরের পক্ষের সাক্ষী হবেন সাদাত আলী ও কনের পক্ষের সাক্ষী সৈয়দ আলী।  

বিয়ের কাবিননামা তৈরি হয়ে গিয়েছে। আলী আকবর মনে মনে ভয়ঙ্কর উত্তেজিত। চুক্তিপত্রে কাজীর স্বাক্ষরটুকু চাই, ব্যাস তারপর আর চিন্তা নেই। কাবিনের চুক্তিতে বরপক্ষের কাছে পঁচিশ হাজার দেনমোহর ছাড়া যে একটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে সেটা নিয়েই যাবতীয় চিন্তা আলী আকবরের। ওই শর্তটুকুর জন্যই এতদিনের এইসব পরিকল্পনা। নজরুল যেমন খোশ মেজাজে রয়েছে তাতে আশা করা যায় সানন্দে কাবিননামায় সই করে দেবে। কিন্তু তবু একটা সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এই দোলাচল বুকে নিয়েই হাতে কাবিনের কাগজটি হাতে নিয়ে নজরুলের ঘরের দরজায় টোকা দিলেন আলী আকবর।                                                  

দরজা খুলল নজরুল               

কাজী সাহেব আসব নাকি? জিজ্ঞাসা করলেন আলী আকবর।

আরে আসুন আসুন। দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়াল নজরুল। তার চোখে মুখে খুশি উপচে পড়ছে। 

আপনিও তৈরি, বাহ! একেবারে সম্রাটই লাগছে বটে বলে হা হা করে হেসে উঠলেন আলী আকবর। 

নজরুল সামান্য লজ্জা পেল। কথা ওকে যে আজ সত্যিই সুন্দর লাগছে আজ কিছুক্ষণ আগে আয়নাই জানিয়েছে সে কথা। নজরুল সেই প্রসঙ্গ সলাজে এড়িয়ে গিয়ে বলল, দুর্যোগ কেটে গিয়েছে আলী সাহেব।

সে তো কাটবেই। বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ তরুণ কবির শুভপরিণয় পণ্ড করে এমন এমন দুঃসাহস প্রকৃতিরও নেই। যাই হোক আমি আপনার এখন সময় নষ্ট করব না। এইটেতে একটি স্বক্ষর করে দিন কাজীসাহেব। বলে কাগজ আর কলম বাড়িয়ে দিলেন আলী আকবর। 

কী এটা?

কিছুই না, কাবিননামা। সামান্য নিয়ম আর কী?

ওহ আচ্ছা। বলে নজরুল কাগজটায় চোখ বোলাতে লাগল। দেনমোহর পঁচিশ হাজার টাকা লেখা রয়েছে। তার একটি টাকাও এখনও জোগার হয়নি। কবে হবে তাও জানা নেই। তার নিচের শর্তটিতে চোখ পড়তে থমকে গেল নজরুল। ভুরু কুঁচকে গেল তার। আলী আকবর অপলক নজরুলের দিকে তাকিয়ে তার প্রতিটি মুহূর্তের অভিব্যক্তি নজর করছেন। 

কী হল কাজীসাহেব? কোনও সমস্যা?

এটা কী লেখা হয়েছে?

ওহ ওটা...তো...

বিয়ের পর নার্গিসকে নিয়ে আমাকে এই দৌলুপুরেই থাকতে হবে? এ কেমন শর্ত? কে লিখেছে এটা? আচমকাই গলা চড়ে গেল নজরুলের।

আলী আকবর প্রমাদ গুনলেন। যা আশঙ্কা করা হয়েছিল ঠিক তাই-ই হল। জল অন্যদিকে গড়াতে শুরু করেছে। শীঘ্রই সামাল দেওয়ার জন্য বলে উঠলেন, কিছু ভুল হয়ে গেছে নাকি কাজীসাহেব? আসলে আপনি এই বাড়ির ছেলের মতই, মানে খান মঞ্জিলে আপনাকে তো কেউ বাইরের লোক ভাবে না, আর এতদিন এখানে থেকে...

হ্যাঁ এতদিন এখানে রয়েছি তার কী মানে করতে করতে চাইছেন আপনি? যে নার্গিসকে বিয়ে করে আমাকে এই বাড়িতে ঘরজামাই হয়ে থাকতে হবে? আমাকে কি খানবাড়ির পোষ্য বানিয়ে রাখতে চান? মেজাজ এবং গলা দুটোই সপ্তমে উঠে গেল নজরুলের। রাগে কাঁপতে শুরু করে দিয়েছে ও। আমাকে কেনা গোলাম বানানোর ফন্দি করছেন আপনি!

ছি ছি এ আপনি কী বলছেন কাজীসাহেব! বলতে বলতে নজরুলের হাত ধরলেন আলী আকবর। আপনি শান্ত হোন।

হাত ছাড়ুন বলে এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে গর্জে উঠল, আমার এই বাড়িতে আসাই ভুল হয়েছে।  আহমদ সাহেব ঠিকই বলেছিলেন...ছি ছি আপনি আমাকে বিয়ের ফঁদে ফেলে বন্দি বানাতে চান লজ্জা করে না আপনার? কি ভাবেন আমাকে? টাকা পয়সা নেই বলে আমার মনটাও এত দরিদ্র যে দুইবেলা দুমুঠো অন্নের জন্য আমাকে এখানে পড়ে থাকতে হবে? এত সাহস আপনি পেলেন কীভাবে?

দোহাই কাজিসাহেব আমার ভুল হয়েছে আপনি দয়া করে শান্ত হোন, দুইহাত জড়ো করে অনুনয় করলেন আলী আকবর। পরিস্থিতি যে তার নিয়ন্ত্রণে নেই বেশ বুঝতে পারছেন। চালে মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে। 

এটা ভুল নয়, এটা চক্রান্ত। ভুল হয়েছে আমার। আমি এই মুহূর্তে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। 

আপনার পায়ে পড়ি কাজীসাহেব, দয়া করে এই কাজটি করবেন না। আমার বাপ মরা ভাগনিটার কথা অন্তত একটু ভাবুন, আমার দোষে ওকে এতবড় সাজাটা দেবেন না। 

নজরুলের চিৎকারে ততক্ষণে বিয়েবাড়িতে ফিসফাস শুরু হয়ে গিয়েছে। কাবিননামার শর্তে বর বেজায় ক্রুদ্ধ হয়েছে এবং সে এই মুহূর্তে খানমঞ্জিল ছেড়ে চলে যেতে চায়। সেই কথা কানে পৌঁছনমাত্র কেঁপে উঠল নার্গিস। হে আল্লাহ! ঠিক ভয়টাই পাচ্ছিল নার্গিস। চাচা কেন যে এমন অন্যায় শর্ত কাবিননামায় রাখতে গেল! দেশ জুড়ে যে কবির এত নামডাক সে কেন বিয়ে করে বউ নিয়ে পড়ে রইবে এই অজ পাড়া গাঁয়ে? যে কোনও পুরুষের কাছেই এমন শর্ত অপমানজনক...কিন্তু এবার কী হবে? সে কি সত্যিই চলে যাবে। লন্ঠনজ্বলা ঘরে একাকী বসে আকদের জন্য অপেক্ষারতা নার্গিস কী করবে বুঝতে পারল না। মনেপ্রাণে আল্লাহকে ডাকতে থাকল। 

আমি গরিব হতে পারি খানসাহেব, কিন্তু আমাকে কিনে নিয়ে তার পোষা গোলাম বানিয়ে রাখবে এমন আমীর এই দুনিয়ায় এখনও জন্মায়নি- বলে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল নজরুল। মাথায় যেন আগুন জ্বলছে। এক মুহূর্ত আর এখানে নয়, কী করা উচিত ভাবতে ভাবতে ছুটে গেল বিরজাসুন্দরীর কাছে। তাঁর কাছেও ইতোমধ্যে এই খবর পৌঁছে গিয়েছে। নজরুলকে দেখেই তিনি বললেন, কী হয়েছে নুরু?

আমি এখানে আর এক মুহূর্তও থাকব না মা। এখনই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। 

এত অস্থিরতা কেন করছিস? কী হয়েছে মাকে বল বাবা। বস একটু।

বিরজাসুন্দরী একটি চেয়ারে বসেছিলেন নজরুল তার পায়ের কাছে ধপ করে বসে পড়ল। উত্তেজনায় হাঁফাচ্ছে। 

নজরুলের মাথায় হাত রাখলেন ইনি। কী হয়েছে বল তো?

আমাকে ঠকানো হয়েছে মা। চুড়ান্তভাবে অপমান করা হয়েছে। আমি ভিখিরি, আমার চালচুলো, অর্থ কিছুই নেই তা আমি জানি কিন্তু আত্মসম্মানটুকু রয়েছে সেটা কোনও মূল্যেই বিকিয়ে দিতে পারব না। এর জন্য জীবনে অনেককিছু ছেড়েছি ভবিষ্যতেও ছাড়তে প্রস্তুত। 

কিন্তু বাবা এইভাবে কি বেরিয়ে যাওয়া আয় এখন? একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাব। আমি আলীর সঙ্গে কথা বলছি।

না মা তুমি ওই লোকটার সঙ্গে একটা কথাও বলবে না। আমারই মানুষ চিনতে ভুল হয়েছে।  আহমদ সাহেবের কথা যদি সেদিন শুনতাম...

মুজফফরের কথা উঠতেই বিরজাসুন্দরী ও গিরিবালা পরস্পরের দিকে একপলক তাকালেন। ইশারায় কিছু একটা কথা হয়ে গেল যেন। নজরুলের সেইদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই।

কী চাস তুই এখন? জিজ্ঞাসা করলেন বিরজা।

আমি এখনই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাই।

কিন্তু মেয়েটার কী হবে নুরু? ও যে...

আমি যাচ্ছি তার সঙ্গে কথা বলতে। বলেই উঠে দাঁড়াল নজরুল। যেমন উদভ্রান্তের মতো ঘরে এসেছিল তেমনই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। বিয়ে বাড়িতে তখন গান বাজনা থেমে গিয়েছে। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে জটলা, ফিসফাস। নজরুল কারও দিকে তাকাল না। সোজা ঢুকে গেল নার্গিস যে ঘরে বসেছিল সেখানে। নজরুলকে এমন রূপে দেখে ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়াল নার্গিস। নজরুল কাছে এল। নাহ আজ নার্গিসকে এমন অপূর্ব সাজে সজ্জিত দেখেও সামান্যতম মুগ্ধ হল না নজরুল। যেন দেখতেই পেল না। নার্গিস ভয়ে ভয়ে তাকাল নজরুলের দিকে। সেই প্রেমীক ডাগর চোখদুটি ধিকিধিকি জ্বলছে, চুল উস্কোখুস্কো পরনের সাদা নতুন পাঞ্জাবি আর পায়জামাটিও নিস্প্রভ। এ কোন অচেনা মানুষ!

আমি এই মুহূর্তে এই বাড়ি ছাড়ার পরিকল্পনা নিয়েছি। তুমি কি আমার সঙ্গে যেতে চাও? তাহলে এখনই চলো।

নার্গিস সহসা এমন প্রস্তাবে বিহ্বল হয়ে গেল। কিছু বলতে পারল না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল নজরুলের দিকে। 

নজরুল আবার জিজ্ঞাসা করল, তুমি যদি না যেতে চাও তাহলে আমি একাই চলে যাব। 

এখনই...কিন্তু আমাদের যে...

ওসব পরে হবে। যদি আমার সঙ্গে তুমি সত্যিই থাকতে চাও তাহলে এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে বেরিয়ে পড়তে হবে। 

নার্গিস আবারও ভয়ে কেঁপে উঠল। এ কী শুনছে ও! এমনও সম্ভব! বাড়িভর্তি লোক। এখনও আকদের অনুষ্ঠানও হয়নি। নার্গিস আর কিছু ভাবতে পারল না ঝপ করে নজরুলের পা দু’খানি চেপে ধরল। আমাকে দয়া করুন, আমার বাবা নেই, মামাদের আশ্রয়ে বড় হয়েছি। লেখাপড়া করারও সুযোগ পাইনি, আমার বুদ্ধি কম...আপনি আমাকে নিজের স্ত্রীরূপে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এ আমার জন্ম জন্মান্তরের সৌভাগ্য, কিন্তু এই বাড়ির প্রতি আমি ঋনী। আমার বিধবা মা, দাদা, আর মামাদের সম্মান রক্ষার জন্য আপনার কাছে হাতজোড় করে আমি অনুরোধ করছি দোহাই এইভাবে চলে যাবেন না, অন্তত আজকের অনুষ্ঠানটা হয়ে যাক। রাতটূকু কাটুক। কাল আপনি আমাকে যেখানে নিয়ে যেতে চাইবেন আমি সেখানে চলে যাব। 

নজরুল নার্গিসকে দুইহাতে ধরে দাঁড় করাল। নার্গিস থিরথির করে কাঁপছে। কাজলপরা চোখদুটি অশ্রজলে সিক্ত, ওই চোখের দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের জন্য দুর্বল হয়ে পড়ছিল নজরুল, তখনই অন্যদিকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে বলল না না এ হতে পারে না...কখনও না। এসবই ষড়যন্ত্র, আমাকে বন্দি করার চক্রান্ত। তুমি...

আপনি আমার দিকে তাকান। দয়া করে আমার কথা একটু ভাবুন...আমাকে এইভাবে ফেলে চলে যাবেন আপনি! আপনি আমাকে ভালবাসেন না?

ফেলে তো যেতে চাইছি না, আমার সঙ্গে এখনই বেড়িয়ে যেতে বলছি।

এই দুর্যোগে, এত রাতে আমরা কোথায় যাব বলুন? 

যেখানে খুশি। তোমার মামা কী ভেবেছেন তার ভাগ্নির সঙ্গে বিয়ে দিয়ে আমাকে এই বাড়িতে গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবেন? যদি তুমি যেতে চাও তাহলে এখনই চলো।

আমার দিকে তাকান, আমার মামা অন্যায় করেছেন, হ্যাঁ কাবিননামায় এমন শর্ত যদি লিখে থাকেন তবে মামা সত্যিই অন্যায় করেছেন, কিন্তু আমাকে অন্তত আপনার স্ত্রী হওয়ার সময়টুকু দিন। আপনাকে কোনও সর্ত মানতে হবে না। আমি আপনার পাশে রয়েছি কিন্তু দোহাই আমি হাতজোড় করছি আমাকে এইভাবে এই অবস্থায় ফেলে চলে যাবেন না...কথাগুলো বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠল নার্গিস। 

নজরুল এক মুহূর্ত কী যেন ভাবল, তারপর বলল আমি এখনই আসছি। বলেই দ্রত পায়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। 

নার্গিসের বুকের ভেতরটা যেন ফেটে যাবে মনে হচ্ছে। হে আল্লাহ আমার প্রতিই কেন তুমি এমন নির্দয় হলে? বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল নার্গিস। দম আটকে আসছে। ইচ্ছে করছে বহুদূরে একা কোথাও পালিয়ে যেতে যেখানে কোনও মানুষ নেই। কালবৈশাখীর মতো ওলোট পালট হচ্ছে ভেতরটা...আচ্ছা যদি কবির দুটি পা জড়িয়ে বসে থাকি তাহলে কি সে জোর করে নিজের পা ছাড়িয়ে চলে যেতে পারবে? কবি যে ভালবাসে নার্গিসকে।...হয়তো পারবে। আজ নজরুলের যে রূপ সে প্রত্যক্ষ করছে তা নার্গিসের অচেনা, এমন রুদ্রমূর্তি সে কখনও দেখেনি। এ এক অচেনা লোক, যার মনে ভালবাসা নয়, ক্রোধের, অপমানের আগুন টগবগ করছে। নার্গিসের সাধ্য নেই সে আগুন নেভায়। সমস্ত অলংকার, ফুলের মালা খুলে ফেলল চোখের জলে কাজল ধুয়ে অমন চাঁদের মতো মুখখানি হয়ে উঠল অসুন্দর, কলঙ্কময়। অপেক্ষা করতে থাকল নার্গিস। 

নজরুল আবারও এল ঝড়ের বেগে। নার্গিস নার্গিস... উচ্চকন্ঠে ডাকল।

সচকিত হয়ে আবার উঠে দাঁড়াল নার্গিস।

শোনো আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।আমি আজ রাতেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমাকে এখন যেতে হবে না। তুমি এখন এই বাড়িতেই থাকো। আমি পরে এসে তোমাকে নিয়ে যাব।

আবার কেঁপে উঠল নার্গিস। আমাকে ছেড়ে যাবেন না...আমি আপনার সঙ্গেই যাব। বলুন কোথায় যেতে হবে, আমি রাজি। আমি আপনাকে ছেড়ে...

নজরুল নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল না না এখন তুমি কীভাবে যাবে? তুমি এই বাড়ির মেয়ে? কোন অধিকারে তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাব? তবে...আমার ওপর বিশ্বাস রাখো নার্গিস, সামনের মাসে আমি তোমাকে নিয়ে যাব। এই ক’টাদিন কষ্ট করো। জানি তোমার ওপর হয়তো অন্যায় করছি, কিন্তু আমার ওপরও যে কী ঝড় যাচ্ছে তা যদি তোমাকে বোঝাতে পারতাম...আমি যাচ্ছি। কথাগুলো এলোমেলোভাবে বলতে বলতে নার্গিসের হাতদুটো নিজের মুঠিতে শক্ত করে ধরল নজরুল। আরও কী যেন বলতে গেল, কিন্তু কিছুই না বলে হন হন করে ঘর ছেড়ে চলে গেল। নার্গিস পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ঘরের মাঝখানে।

 

আলী আকবর সহ বাড়ির অনেকেই নজরুলকে শান্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা করে বিফল হলেন। অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের মধ্যে দৌলতপুরের পাশে বাঙ্গোরার জমিদার রায় বাহাদুর রূপেন্দ্রলোচন মজুমদারের মতো বিশিষ্ট কিছু মানুষও উপস্থিত হয়েছেন। তারাও সকলে নজরুলের এমন আচরণ দেখে হতবাক। নার্গিসের মা আসমাতুন্নেসা অঝোরে কাঁদছেন। মানিক একবার গেল ভাইজান নজরুলকে বোঝাতে, সেও ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল। 

নজরুল বিরজাসুন্দরীর কাছে গিয়ে বলল, মা আমি চলে যাচ্ছি। তোমাদের বাড়ি গিয়ে উঠব। আমাকে অনুমতি দাও।

বিরজাসুন্দরী বুঝলেন এই ছেলেকে ফেরানো যাবে না। আর নার্গিস? জিজ্ঞাসা করলেন তিনি।

ও এখন যেতে পারবে না।

হুঁ, বেশ যা তাহলে। তবে তুই বাইরের ছেলে। রাস্তাঘাট ঠিকমতো চিনিস না। একা যাস না, রাঙা তোর সঙ্গে যাবে। 

নজরুল দেখল বিরজাদেবীর পাশে রাঙাদা মানে বীরেন্দ্রকুমার কাঁধে ঝোলা নিয়ে রওনা দেওয়ার জন্য প্রস্তুতই রয়েছে। 

বেশ, আমরা যাচ্ছি তবে।

দীর্ঘ দশ-এগারো মাইল পথ, বৃষ্টির কারণে কর্দমাক্ত, পিচ্ছিল তাছাড়া বিয়ের রাতে বর মজলিশ ছেড়ে উঠে গিয়েছে গ্রামবাসীর কাছে এই চাপা অসন্তোষ ও সেই কারনে পথিমধ্যে সম্ভাব্য প্রতিকুল পরিস্থিতিকে পরোয়া না করে শেষ রাতে পায়ে হেঁটেই রওনা দিল নজরুল। সঙ্গে বীরেন্দ্রকুমার। এই ক’দিনে কত সুখস্মৃতি, গান-কবিতা, হৈ হৈ আর এক ষোড়শী কিশোরীর সঙ্গে হৃদয়ের লেনদেন এক মুহূর্তে সবকিছু যেন মিথ্যে হয়ে গেল নজরুলের কাছে। বিশ্বাসঘাতকতার যন্ত্রনা তাকে এতটাই কাতর করে তুলল যে একটিবারের জন্যও আর মনে পড়ল না এই বিশ্বাসভঙ্গতা, মান অপমান, তার যোগ্য জবাবের মাঝে একটি নিষ্পাপ মেয়ের জীবনটিও এক মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল, পারস্যের এক ফুলের নামে নজরুল যার নাম রেখেছিল নার্গিস। সমগ্র রাত্রি জুড়ে সেই নির্দোষ, অপাপবিদ্ধা মেয়েটি যে অসহনীয় যন্ত্রণার দীর্ঘশ্বাস ফেলল তার প্রতিটি প্রশ্বাসের উত্তাপের দহনজ্বালা থেকে নজরুলের মুক্তি নেই।

নার্গিস তার দীর্ঘদিনের জমানো অভিমান যা কখনও প্রকাশ করার সুযোগ পায়নি আজ আগলহীনভাবে বলে যেতে থাকল। আমি তো জানতাম কবি যোগ্যতায় আমি আপনার পায়ের ধুলিকনার যোগ্যও নই, তাই আপনার প্রতি আমি মুগ্ধ হলেও আপনার কাছে আসার সাহস আমি স্বপ্নেও দেখিনি। বরং আপনিই আমাকে কাছে টেনেছিলেন কবি, আমাকেও আপনাকে ভালবাসার অধিকার দিয়েছিলেন, কিন্তু একটা কথা আমাকে বলুন তো আমার মামার করা অপরাধের শাস্তি আপনি আমাকে জীবনভোর কেন দিলেন? আপনাকে মনেপ্রাণে ভালবাসাটুকু ছাড়া আর কী কোনও অন্যায় করেছিলাম আমি? কাবিননামায় কী শর্ত লেখা হয়েছিল তা যে আমার অজ্ঞাত ছিল সেকথা নিশ্চয়ই আপনি অবিশ্বাস করবেন না। আপনি রাগলেন মামার ওপর অথচ শাস্তি পেলাম আমি...আর জীবনভোর শাস্তি...এমন চুড়ান্ত শাস্তি যেন আমার চরম শত্রুও কখনও না পায়...বলে থামল নার্গিস। আমি একেক সময় ভাবতাম কবির হৃদয় শুনেছি বড় কোমল হয় কিন্তু এ যে পাষানের চেয়েও কঠিন...তাহলে কি আমিই ভুল বুঝেছিলাম, চিনতে ভুল হয়েগিয়েছিল আমারই? হতে পারে অজ গ্রামের এক অশিক্ষিত কিশোরী মেয়ের দুনিয়াদারি সম্পর্কে কতটুকুই বা জ্ঞান ছিল বলুন?

নজরুল মুখ তুললেন, এভাবে বোলো না নার্গিস, বড় কষ্ট হচ্ছে আমার।

কষ্ট! কষ্ট কাকে বলে আপনি জানেন কবি? দৌলতপুরে বেশ কিছুদিন থাকার পর যখন শুনলাম আপনার বন্ধু মুজফফর সাহেব আপনাকে কলকাতায় ফেরত নিয়ে চলে গিয়েছেন, আর আপনিও নাকি সব কিছু ভুলে গিয়েছেন, আবার আগের মত হৈ হুল্লোর করতে শুরু করে দিয়েছেন তখন আমি ভাবতাম যদি সত্যিই ভালবাসেন তাহলে এত দ্রুত কী করে ভুলে গেলেন আমাকে? তাহলে আমার ভালবাসা কি স্পর্শ করতে পারেনি আপনাকে? অথচ দৌলতপুরে থাকতে আপনার আমাকে নিয়ে লেখা প্রতিটি কবিতা, প্রতিটি গান, আপনার প্রতিটি কথা আর আপনার প্রতিটি আদর আমার শরীর মনে সারাক্ষণ ছুঁয়ে থাকত। আপনার গায়ের গন্ধ টের পেতাম প্রতি মুহূর্তে। অথচ আপনি নেই। মামা আমাকে নিয়ে গেল ঢাকায়। ভর্তি করে দিল কলেজে। আমিও ঐ দৌলতপুর ছাড়তে চাইছিলাম। ওই বাড়িটা, বাড়ির-গ্রামের মানুষগুলোর দৃষ্টি আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। ওই বাগান, পুকুর, আপনার সেই ঘর আমাকে প্রতিনিয়ত পাগল করে দিচ্ছিল। আমি পালাতে চাইছিলাম এইসব থেকে, এমন একটা জায়গায় চলে যেতে চাইছিলাম যেখানে সকলের আমার অচেনা, কেউ আমাকে কোনও প্রশ্ন করবে না। তাই নিঝুম দৌলতপুর থেকে মামার সঙ্গে চলে গেলাম ঢাকার জনঅরণ্যে। কত মানুষ, কত ব্যস্ততা। ভাবলাম রেহাই পেলাম বুঝি।।কিন্তু আমার যেমন ভাগ্য! আমি যে ভারতবিখ্যাত কবির সঙ্গে আমার নামও যে ততদিনে সর্বত্র জুড়ে গিয়েছে। কয়েকদিনের মধ্যে ওখানেও কীভাবে যেন চাউড় হয়ে গেল আমিই সেই দুর্ভাগা যাকে বিয়ের আসরে কবি ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন... ওহ সেকি দুঃসহ অভিজ্ঞতা। কলেজের মাস্টারমশাই, বন্ধুবান্ধবদের শুধু একটাই প্রশ্ন, আপনিই কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী? আচ্ছা আপনাদের কি বিয়ে হয়েছিল? বাসর? হয়নি? আচ্ছা আপনাদের বাড়িতে যখন থাকতেন উনি কী কী করতেন? আমার সহ্য হত না কবি? এইসব প্রশ্ন আমাকে সারাক্ষণ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিত। একা একা থাকতাম, ভয়ে কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব করতাম না, কারণ জানতাম দুটো কথার পরেই তারা জিজ্ঞাসা করবে, আচ্ছা তোমরা কি বিয়ের রাত একসঙ্গে কাটাওনি? উনি সত্যিই কি বিয়ের আসর থেকে উঠে চলে গিয়েছিলেন? ইসস তোমার কি কষ্ট...ভাবতে পারেন কবি? একদিন বা দুইদিন নয়, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর আমাকে এমন শত শত প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে, হাজার হাজার কৌতুহলী চোখের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে। কলেজে দুই একজন একটু কাছের বন্ধু হয়েছিল তাদের মধ্যে একজন ছিল ইন্দু, একদিন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল হ্যাঁ রে এমন সুপুরুষ তার ওপর আবার কবি, খুব আদর খেতিস তাই না? বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, শরীরের প্রতিটি রোমকূপ অতদিন পরেও আমার শিহরিত হত, সেই আশ্চর্য সুখের মুহূর্তগুলো নির্লজের মতো মনে পড়ত। 

এতটুকু বলে থামল নার্গিস।

নজরুল দুইহাত জড়ো করে বলল, আমাকে ক্ষমা করো নার্গিস, আর বোলো না দয়া করো। আমি আর পারছি না নিতে।

না কবি, আমাকে ডেকে যখন এনেছেন তখন আমার কথাগুলোও আজ শুনুন। বহুযুগ ধরে এই কথাগুলো আমার মধ্যে গুমড়েছে। জীবনে আপনার কাছে থাকার সুযোগটুকু তো পাইনি, নিজের কষ্টটুকু অন্তত প্রকাশ করার অনুমতি দিন আমাকে।

নজরুল কী বলবেন ভেবে পেলেন না। নীরব সম্মতিতে আবার মাথা নিচু করে ফেললেন। 

আমি জানি কবি শিল্পীরা অনুভবী হয়, সেই ঘটনা আপনার মনে কতখানি আঘাত করেছিল তা আমি জানি কবি। তাই ওই ঝড়জলের রাতে আপনি দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে পরেরদিন পৌঁছলেন কান্দিরপাড়ে বীরেনমামাদের বাড়িতে। আর কয়েকদিন পর আমার মামাকে বাবা শ্বশুর সম্বোধন করে যে চিঠিটি লিখেছিলান তা আমার স্পষ্ট মনে রয়েছে। লিখেছিলেন আপনি সাধ করে পথের ভিখিরি পথের ভিখিরি সেজেছেন বলে লোকের পদাঘাত সইবার মতো ক্ষুদ্রআত্মা অমানুষ হয়ে যাননি। 

আপনাকে পদাঘাত করার সাধ্য এই ভারতে কার রয়েছে কবি? ওই চিঠিরই শেষে লিখেছিলেন, বাকি উৎসবের জন্য যত শীঘ্র পারবেন আপনি ব্যবস্থা করবেন। মানে? যে বিয়ের আসর থেকে আপনি রাগ করে সেদিন উঠে গিয়েছিলেন সেই বিয়ে আপনি সম্পন্ন করবেন তাই তো মানে দাঁড়ায়, তাই না? আর শেষ লাইনটা কি আপনার মনে রয়েছে কবি? সকলের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করার পর লিখলেন, তাকেও ক্ষমা করতে বলবেন, যদি এ ক্ষমা চাওয়া ধৃষ্টতা না হয়। তাকেও মানে, আমাকেই তো?

মামা সেই চিঠি পড়ে আমার কাছে ছুটে এসেছিল। আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিল, এই দেখ নুরুর রাগ কেমন পড়তে শুরু করেছে, তুই ভাবিস না। ও বেশিদিন রেগে, অভিমান করে থাকার ছেলে নয়। অত্যন্ত সৎ। দেখিস ও কয়েকদিন পরেই ফিরে আসবে। নিয়ে যাবে তোকে। আর আমিও বোকার মতো বিশ্বাস করে ফেলছিলাম জানেন...অপেক্ষা করে রইলাম। করতে করতে সতেরোটা বছর পেরিয়ে গেল কবে। ততদিনে আপনার স্ত্রী পুত্র নিয়ে ভরা সংসার, জগতজোড়া আপনার খ্যাতি। আর অন্যদিকে আমি শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। এই সতেরো বছরে চারবার চিঠি লিখেছি আপনাকে। আর উত্তর পেয়েছি দুইবার। আপনার মনে পরে কবি আমাকে একটা সময়ে আমাকে নিয়ে কত অসংখ্য কবিতা আপনি ওই দৌলতপুরে বসেই লিখেছিলেন। ওই যে ওই কবিতাটা মনে রয়েছে আপনার?

তুমি আমায় ভালবাস তাই তো আমি কবি

আমার এ রূপ-সে যে তোমার ভালবাসার ছবি।।

আপন জেনে হাত বাড়ালো

আকাশ বাতাস প্রভাত-আলো,

বিদায় বেলায় সন্ধ্যা- তারা পূবের অরুণ রবি,-

তুমি ভালোবাস ব’লে ভালোবাস সবি।

আপনি আমাকে এই কবিতাগুলো পড়ে শোনাতেন আর আমি ভাসতে থাকতাম মেঘের মধ্যে দিয়ে। ভাবতাম আমার মতো সুন্দর, আমার মতো সৌভগ্যবতী বোধহয় দুনিয়াতে দুটি নেই। কী বোকাটাই না ছিলাম আমি ভাবতাম আপনি বুঝি সত্যিই আমাকে আপনার জন্মজন্মান্তরের রানি করেই রাখবেন। অহংকারে সত্যিই মাটিতে পা পড়তে চাইত না আমার। আর সেই আমি আপনাকে শুধু দেখার করার আকুতি নিয়ে চিঠি লিখব সত্যিই ভাবিনি। প্রথম চিঠির উত্তরই দিলেন না। দ্বিতীয় চিঠির উত্তরে একটি গান লিখে পাঠালেন-

যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই

কেন মনে রাখ তা'রে?

ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে।

আবার মুখ তুললেন কবি। ভুলিনি, নার্গিস বিশ্বাস করো এক মুহূর্তের জন্য আমি ভুলতে পারিনি। আমার অন্তর্জামী জানেন, তোমার জন্য আমার হৃদয়ে কী গভীর ক্ষত, কী অসীম বেদনা। কিন্তু সে বেদনার আগুনে আমিই পুড়েছি। তা দিয়ে তোমায় কোনওদিন দগ্ধ করতে চাইনি।

নজরুলের কথা শুনে আবারও হেসে উঠল নার্গিস। বলল আজ এতকাল পরেও আপনি যে কথাটি বললেন কবি সেটাও আমাকে লেখা আপনার প্রথম ও শেষ চিঠিরই লাইন। আমি আপনাকে চিঠিতে লিখেছিলাম আপনি প্রমীলাকে বিয়ে করেছেন তার জন্যও আমার মনে কোনও ক্ষোভ নেই, কিন্তু একটিবার শুধু ঢাকায় এসে আমার সঙ্গে দেখা করুন। আপনাকে একবার শুধু চোখের দেখা দেখতে চাই। তা না হলে আমি আর থাকতে পারছি না, এই জীবন আমি নষ্ট করে ফেলব, সেই কথাও আপনাকে বিচলিত করল না কবি! আর এই আপনি আমাকে একটা সময় এক মুহূর্ত না দেখতে পেলে দিশেহারা হয়ে যেতেন। আপনি চিঠিতে লিখলেন উপদেশ, আত্মহত্যা মহাপাপ। আত্মা অবিনশ্বর, তাকে কেউ হত্যা করতে পারে না...আরও কত কঠিন কঠিন কথা...কিন্তু কবি আমি আপনার কাছে বাণী চাইনি, একটু দেখতে চেয়েছিলাম। আমাকে আবার বিয়ে দেওয়ার জন্য বাড়ির লোক উঠে পড়েছিল। আমি ভেবেছিলাম এতগুলো বছর যখন পেরেছি বাকি জীবনটাও নাহয় আপনার প্রতীক্ষাতেই কাটিয়ে দেব। বয়সও ততদিনে আমার অনেকটাই গড়িয়েছে। আমি জানতাম ইহজীবনে আপনাকে পাবার আর কোনও আশাই নেই আমার, আপনি লিখেওছিলেন

আমি ফিরি পথে, তাহে কার ক্ষতি

তব চোখে কেন সজল মিনতী

আমি ভুলেও কোন দিন এসে

দাঁড়িয়েছি তব দ্বারে।।

ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে।।

কিন্তু ভুলতে আর পারলাম কই? বরং আপনার এই অবহেলা, এই উপেক্ষা আমাকে যেন আরও প্রতীক্ষার সর্বনাশা নেশায় মাতিয়ে তুলেছিল। আপনি আমাকে শুনিয়েছিলেন কবি কিটস আর ফ্যানির কথা। আমিও সেই ফ্যানি হতে চেয়েছিলাম। 

কিন্তু আমিও তো তোমার জীবনে কখনও বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাইনি নার্গিস। বললেন নজরুল। তুমি যখন চিঠিতে জানালে যে তুমি বিয়ে করতে চলেছ, আমি...

জানি জানি সব মনে রয়েছে আমার, নজরুলকে থামিয়ে দিল নার্গিস। আপনি লিখেছিলেন, তুমি যদি স্বেচ্ছায় সয়ম্বরা হও আমার তাতে কোনও আপত্তি নেই। এই কথাই লিখেছিলেন তো?

নজরুল অবাক হলেন। সেই কতকাল আগে লেখা চিঠি, কী লিখেছিলেন কিছুই আর স্মরণে নেই অথচ নার্গিস এত বছর পরেও সেই চিঠির প্রতিটি শব্দকে আগলে রয়েছে।

আপনার মনে নেই জানি, থাকার কথাও নয়, আপনি তখন কত ব্যস্ত, দেশ জোড়া নাম, আমার মতো এক অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ের জন্য আপনার ভাবার সময় কোথায়? আর মনেপ্রাণে যে ভুলতে চেয়েছিলেন তা বুঝেছিলাম আপনার ওই চিঠিটিতেই। নইলে আপনার লেখা তো আমি কিছু কম পড়িনি কবি, এত নিস্পৃহতা ছিল সেই চিঠিখানিতে যে আমি আর নিতে পারিনি, বিয়েটা করেই ফেললাম, আর করলাম তো করলাম সেই একজন কবিকেই! আপনারই স্নেহাষ্পদ অনুজ আজিজুলকে। আপনার সেই একমাত্র চিঠিটির সঙ্গে একটি গানও পাঠিয়েছিলেন আমাকে মনে পড়ে কি আপনার? ওই যে সেই স্তবকটি...

তোমার বঁধু পাশে যদি রয়,

মোর-ও প্রিয় সে, করিও না ভয়,

কহিব তা’রে, ‘আমার প্রিয়ারে

আমারো অধিক ভালবাসিও’। 

ওই গানটি পড়েই বুঝতে পেরেছিলাম সত্যিই আমি আপনার মন থেকে একেবারে মুছে গিয়েছি। ভাবলাম আপনি যদি মনে প্রাণে আমাকে এমন কঠিন উপেক্ষায় সরিয়ে দিতে পারেন আমিও বা কেন পারব না? চেষ্টা করলাম। চেষ্টা করতেই থাকলাম। আজও করে যাচ্ছি। একদিন ঠিক পারব। আপনি সেই গানখানি লিখেছিলেন কবি-

পরজনমে দেখা হবে প্রিয়

ভুলিও মোরে হেথা ভুলিও।

এই জন্মে আমাকে ভোলার জন্য কী আর্তি আপনার! আর আমি জন্মান্তরেও...কথা অসমাপ্ত রেখে মাথা নিচু করল নার্গিস। নজরুল দেখল নার্গিসের দুই চোখের কোল বেয়ে জল নামছে। তরল হিরের মতো স্বচ্ছ আর উজ্জ্বল সেই জলকনা। বেদনায় কাতর হয়ে উঠলেন কবি। আফশোস করলেন কেন তিনি তার এই স্মৃতিজগতে নার্গিসকে ডেকে আনলেন...। কিন্তু উপায় নেই, আজ জীবনের বহু বছর অতিক্রান্ত, এমন একটি দিন যায়নি যে প্রিয়তমা নার্গিসের সেই কিশোরী মুখখানি তার মনে পড়েনি। বেদনায় কাতর হয়ে ওঠেননি তিনি। নিজের সেই যন্ত্রণাকে বার বার ঢেলে দিয়েছেন নার্গিসকে উদ্দেশ্য করে লেখা গানে কবিতায়...ক্ষণেক রেহাই মিলেছে তারপর আবার গ্রাস করেছে কষ্ট।

নার্গিস ঠিক তখনই বলে উঠল, হ্যাঁ আমিও আপনার মতো চেষ্টা করলাম শেষে। ভাবলাম আপনি যদি সত্যিই আমাকে ভালবেসে থাকেন তাহলে এই বিচ্ছেদ অন্তরে নিশ্চয়ই আপনাকেও অস্থির করে তুলছে। আপনার লেখাগুলোকে পড়তাম আর বুঝতে পারতাম হ্যাঁ আপনিও কষ্ট পাচ্ছেন, আর সেই কষ্টকে নিজের লেখায় ঢেলে দিয়ে বিরহযন্ত্রণাকে লাঘব করছেন...কিংবা শুধু বিরহের যন্ত্রণাই নয়, কিন্তুটা নিজের প্রতি কৈফিয়তও থাকত, লেখাগুলি পড়তে পড়তে আমার একসময় মনে হল তাহলে আমিও আপনার পথই নিই, এই অসহ্য দহন থেকে পরিত্রানের একমাত্র রাস্তা বুঝি ওই লেখা। আমিও শুরু করলাম লিখতে।

হ্যাঁ পড়েছি, আমি পড়েছি তোমার লেখা। ওই সেই কবিতাটিও আমার পড়া।

আপনি পড়েছেন! অবাক হ’ল নার্গিস।

হ্যাঁ নার্গিস। এই বিশ্ব সংসারে এমন কোনও কবিতা নেই যা আমার অপঠিত। শুনবে তোমার কবিতাটি?

তুমি তো বলেছিলে চিরদিন সাথী হয়ে থাকবে।

কুড়িয়ে পাওয়া এই বনফুল মালা করে রাখবে।

হে পথিক, তুমি ভালবেসে

এই তো তুমি সেদিন জড়ালে এসে

আজ তুমি হায় ছিঁড়িলে বাঁধন

আর কি গো কাছে সে নাম ধরে ডাকবে।...

এই পর্যন্ত বলেই নজরুল থেমে গেলেন। 

নার্গিস বলল, আপনার এখনও মনে রয়েছে! তবে এখানি কিন্তু কবিতা নয়, গান। কলেজে আমার সঙ্গে পড়ত ইন্দু ঘোষ। একমাত্র ওই কিছুটা বুঝত আমাকে। ওকে বলতাম নিজের কথা। একদিন সত্যিই লিখলাম। লিখে ভেবেছিলাম শান্তি পাব, কিন্তু শান্তির বদলে এল সংশয়। আদৌ কি এটা লেখা হয়েছে? কে বলবে? কাকে পড়তে দেব? যাকেই দেব সে হাজার প্রশ্ন করবে আপনাকে নিয়েই নিয়েই লিখেছি কি না, কেন কষ্ট পাচ্ছি...তাই ওকেই দিলাম। ও পড়ে বলল, বাহ খুব সুন্দর লিখেছ তো! তারপরেই আমার এই ডানহাতের আঙুলগুলোকে নিজের মুঠিতে নিয়ে কী বলল জানেন কবি? বলল, তোমার এই হাত যে পরশপাথরের স্পর্শে সোনা হয়ে উঠেছে নার্গিস, কবির স্পর্শ পাওয়া হাত। তুমি আরও লেখো। 

হ্যাঁ লিখে ফেললে তহমিনা উপন্যাস। সেখানে বীর রুস্তমকে করলে প্রবঞ্চক প্রেমিক যে তহমিনাকে ফিরে আসার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যুদ্ধে চলে গিয়েছিল। আমি জানি সেই রুস্তম আসলে কে?

আপনি আমার উপন্যাসও পড়েছেন! আবারও অবাক হল নার্গিস। আমি ভাবতাম...

তোমার তহমিনার ভূমিকাটি আমার আজও মনে রয়েছে নার্গিস। তুমি লিখেছিলে- ‘পাঠক! তোমরা যে কেহ তহমিনার দুঃখ জাগানিয়া কাহিনী পড়বে, তার দুঃখে দু’ফোঁটা অশ্রু ফেলো যেন-তাতেও যদি জন্মদুঃখিনী তহমিনার স্বান্তনা হয়। আর তার মতো দুঃখিনী কখনো যদি কাহারো নজরে পড়ে তাকে মানুষের চোখ দিয়ে দেখো যেন'। শেষ লাইনটা আমি যতবার পড়েছি ততবারই মনে হয়েছে তোমার চোখে আমি সত্যিই একটা অমানুষ হয়ে গিয়েছি। 

নার্গিস কী যেন একটা বলে উঠতে গেল। সে সুযোগ দিলেন না নজরুল। তার পরের উপন্যাস ধূমকেতুর ভূমিকাতেও লিখলে ‘শুধু আকাশেই ধূমকেতুর উদয় হয় না, মানুষের হৃদয়াকাশেও হয়- যাতে করে কত হৃদয় পুড়িয়ে ছারখার করিয়ে দেয়। আর তোমার শেষ উপন্যাস পথিক হাওয়া। সেটিতেও তুমি আমাকে আঁকলে এক বোহেমিয়ান চরিত্রে। যে ঘর বাঁধতে পারে না। 

নার্গিস চুপ করে শুনছিল আর অবাক হয়ে যাচ্ছিল এই ভেবে কবি তার প্রতিটি লেখাই পড়েছেন! বুঝতে পারল কেন নজরুল চিঠিতে তাকে চক্রবাক কবিতা বইয়ের কবিতাগুলো পড়তে বলেছিলেন। কবি লিখেছিলেন ‘আমার চক্রবাক নামক কবিতা-পুস্তকের কবিতাগুলো পড়েছ? তোমার বহু অভিযোগের উত্তর পাবে এতে। তোমার কোনো পুস্তকে আমার সম্বন্ধে কটুক্তি ছিল’।

হায় রে কটুক্তি! কবি কী করে লিখতে পেরেছিলেন এই শব্দটি! মরে গেলেও তার সম্পর্কে যে একটি কটুক্তি নার্গিস ব্যবহার করতে পারেনি, এমনকি তার সামনেও যদি নজরুলের সম্পর্কে কোনওপ্রকার অপ্রীতিকর কথা বলতে যেতেন তাকেও চুপ করতে বলত নার্গিস। সহ্য হত না। আর নজরুল আবারও ভুল বুঝলেন, ভাবলেন নার্গিস তাকে দোষারোপ করেছে। দোষারোপ আর অভিমানের অনুযোগ যে এক নয় সেটাও কি কবি বুঝতে পারেননি? চক্রবাক বইয়ের বেশ কয়েকটি কবিতা যেন শুধুই আত্মপক্ষ সমর্থনে লেখা। হিংসাতুর কবিতাটির কথা মনে পড়ল নার্গিসের। চিঠি পাবার পর ভারতী লাইব্রেরিতে গিয়ে বইটি নিয়ে এসেছিল ও। হিংসাতুর কবিতা যে কবি তহমিনা উপন্যাসের ভূমিকার উত্তরে লিখেছিলেন তা বুঝতে এতটুকু অসুবিধা হয়নি।

কবি অমানুষ, মানিলাম সব, তোমার দুয়ার ধরি

কবি না মানুষ কেঁদেছিল প্রিয় সেদিন নিশীথ ভরি।

দেখেছ ঈর্ষা, পড়ে নাই চোখে সাগরের এত জল

শুকালে সাগর দেখিতেছ তার সাহারার মরুতল।

সেই কবিতার কয়েকটি লাইন মনে পড়তেই নার্গিস বলে উঠল আমি কখনও স্বপ্নেও আপনার মধ্যে হিংসা কল্পনা করতে পারিনি কবি। অভিমান করেছি, অপেক্ষা করেছি, হতাশ হয়েছি কিন্তু আপনার প্রতি হিংসাতুর ইত্যদি কখনও ভাবিনি। 

এত মহৎ নাই বা হলে নার্গিস! আচমকাই যেন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন কবি। তুমিও রক্ত মাংসের মানুষ, আমিও তাই। আমাদের মনে যেমন প্রেম-ভালবাসা-মায়া রয়েছে তেমনই অসহায়তা রয়েছে, লোভ, ঈর্ষা, ক্রোধ কোনও কিছুর থেকেই আমরা মুক্ত নই। হ্যাঁ আমি স্বীকার করছি আমি সেদিন তোমাকে ওইভাবে ফেলে এসে অন্যায় করেছিলাম, আমার বয়সও ছিল অল্প। সবকিছু বিবেচনা করার মানসিকতা আমারও ছিল না। আগামী মাসে এসে তোমাকে নিয়ে যাব ঝোঁকের মাথাতেই বলে ফেলেছিলাম তখন...কিন্তু কিন্তু আমি...বিশ্বাস করো নার্গিস আমি তোমার সঙ্গে প্রতারণা করতে চাইনি। এমনকি তুমি যেবার কলকাতায় এলে শুধু আমার সঙ্গে দেখা করবে বলে, শিয়ালদা হোটেলে তুমি উঠেছিলে, আমি বহু দ্বিধা নিয়েও গিয়েছিলাম তোমার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তোমার অনুরোধ ফেরাতে পারিনি।

এই কথা শুনে আবারও হিহি করে হেসে উঠল নার্গিস। হ্যাঁ মনে রয়েছে, অনেক অনুনয়ের পর আপনি অবশেষে দয়া করে দেখা করতে সম্মত হয়েছিলেন। হোটেলের রুমে আপনি এলেন। আমি জানেন ভুলেই গিয়েছিলাম আপনার অপেক্ষায় ততদিনে আমি সতেরোটি বছর পার করে ফেলেছি। অপেক্ষার কী মজা জানেন কবি? আপনি যার জন্য অপেক্ষা করছেন তার তো বয়স বাড়ে না। তাই সতেরো বছর ধরে আপনার সেই কুড়ি –একুশ বছর বয়সের ছটফটে, দামাল আর পেটানো চেহারার ছেলেটিকেই ভেবে রেখেছি, কিন্তু সামনে যে এল তাকে প্রথম দর্শনে চিনতে বেশ কষ্ট হয়েছিল আমার। চেহারা অনেক স্থুল, লাল ছিট লাগা আয়ত চোখদুটিতে আর সেই আগের মতো অস্থিরতা নেই, বরং কিছুটা ক্লান্তি, বিষন্নতার ছাপ। চোখের কোলে মেদ জমেছে। এ যেন প্রাজ্ঞ, স্থিতধী, বয়স্ক এক মানুষ! জানি আমিও ততদিনে আর সেই পনেরো বছরের কিশোরীটি নই, তবু ধাক্কা খেয়েছিলাম মনে। এই মুরতি তো আমার ধ্যানে ছিল না। হোটেলের রুমে এসে আমার খাটের একপ্রান্তে এসে বসলেন আপনি। আমি আবেগে বাকরুদ্ধ।

দু’জনেই বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলাম। আমি বিহ্বল, আপনি যেন কেমন অস্বস্তিতে। কিছুক্ষণ স্তব্ধতার পর আপনি জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন রয়েছ নার্গিস?

আমি অনেককিছু বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু কিছুই পারলাম না বলতে। শুধু বললাম হ্যাঁ ভাল। আবার কিছুক্ষণ নিরবতা। আমি জানতাম না আপনাকে কী বলব অথচ সতেরো বছর ধরে আপনার জন্য অযুত নিযুত কথা জমিয়ে রেখেছিলাম। আপনার মনেও আমার জন্য কোনও কথা জমেছিল কি না জানি না কিন্তু সহসাই আপনি বলে উঠলেন, তুমি ফিরে যাও নার্গিস, আমি ইমিডিয়েটলি ঢাকা আসছি। তখন একটা ব্যবস্থা করব। প্রমীলা আর ওর মা কিছুতেই তোমাকে সহ্য করবে না। 

আপনার মুখে এমন কথা শুনে আমার সত্যিই সেদিন হাসি পেয়ে গিয়েছিল জানেন কবি। সতেরো বছরে যে আপনি আমার জন্য কোনও ব্যবস্থাই করেননি আর আমাকে দেখামাত্র বললেন ঢাকায় ইমিডিয়েট এসে কিছু একটা ব্যবস্থা করবেন। এই প্রবোধের আর কি কোনও প্রয়োজন ছিল? আর আপনি কি ভয় পাচ্ছিলেন যে আপনার ভরা সংসার আমি তছনছ করতে এসেছি? নইলে কেন বললেন প্রমীলা আর তার মায়ের কথা? কিন্তু জানেন ঐ অতগুলো বছর বৃথাই অপেক্ষার পরেও যখন আপনি বললেন আপনি ইমিডিয়েট ঢাকায় আসবেন, আমি আবারও বিশ্বাস করে ফেললাম আপনাকে। বোকার মতো জিজ্ঞাসা করে ফেললাম, সত্যি আসবেন?

আর আপনি তখনই উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হ্যাঁ। আজ আমি আসি। বলে আপনি ধীর পায়ে হেঁটে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। আপনাকে কোনওদিন এমন ধীরস্থিরভাবে হাঁটতে দেখিনি। আপনার সেই বিব্রত, অসহায় রূপটি দেখে আমার সত্যিই কষ্ট হচ্ছিল। মনে হয়েছিল হয়তো আপনাকে এইভাবে জোর করে না ডাকলেই ভাল হত, আসলে তো আমাকে করুণা করেই এসেছিলেন সেদিন। আর...থেমে গেল নার্গিস। শুনতে পেল কবি মাথা ঝুঁকিয়ে আপনমনে বিরবির করছেন-

...হারানো সে দিন পাব না গো আর ফিরে

দেখিতে পাব না আর সেই কিশোরীরে।

তবু মাঝে মাঝে আশা জাগে কেন

আমি ভুলিয়াছি, ভোলেনি সে যেন

গোমতীর তীরে পাতার কুটীরে

(সে) আজও পথ চাহে সাঁঝে।।

হ্যাঁ রয়েছি কবি, আপনার মনে বড় কষ্ট ছিল যে আপনার জন্য কেউ কোথাও অপেক্ষায় নেই বলে, তাই খোদা আমাকে এই দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন শুধু আপনার জন্য আজীবন প্রতীক্ষা করব বলে। তাই আপনি ভুলে গেলেও আমি আর ভুলতে পারলাম না।

জীবনে তোমাকে পেয়ে হারালাম, তাই মরণে পাব,- সেই বিশ্বাস ও স্বান্তনা নিয়ে বেঁচে থাকব। প্রেমের ভুবনে তুমি বিজয়িনী, আমি পরাজিত। আজ আমি অসহায়। বিশ্বাস করো, আমি প্রতারণা করিনি। আমাদের মাঝে যারা এ দূরত্বের সৃষ্টি করেছে-পরলোকেও তারা মুক্তি পাবে না...

হ্যাঁ ঠিক এই কথাগুলোই চিঠিতে লিখেছিলেন। আমার বিয়ের ঠিক নয়দিন আগে এসে পৌঁছেছিল হলুদ খামে ভরা আপনার এইকথাগুলো লেখা চিঠি আর একটি কবিতা। জীবনে আমাকে হারিয়েছেন তাই মরনে পাবেন কেন লিখেছিলেন কবি? তাই আমাকে আজও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অন্য জীবনে পৌঁছেও আমাকে গোমতীর তীরে পাতার কুটীরে সত্যিই অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। আমার জন্য আপনি শুধু অপেক্ষাই রেখে দিয়েছেন। 

মাথা নীচু করে চুপ করে বসে রইলেন কবি। নার্গিসও চুপ। নিশ্চুপ ঘরটি জুড়ে শুধু শ্বাস নেওয়ার শব্দ, দীর্ঘশ্বাস। কেটে গেল কিছুক্ষণ সময়। কিংবা অনন্তকাল।

আপনি কিছু বলবেন না?

নার্গিসের প্রশ্নে মুখ তুলে নজরুল বললেন, কী বলব নার্গিস? জীবনে যা কিছু রচনা করেছি আসলে সবই তো তোমাকে বলব বলে। আমার সকল গান, সকল কবিতার প্রতিটি শব্দ শুধু তুমি। তুমি কি টের পাওনি নার্গিস? দান্তের জীবনে বিয়াত্রিচ যেমন, শেলীর জীবনে এমিলিয়া, কীটসের জীবনে যেমন ফ্যানি ঠিক তেমনই ইতিহাস একদিন বলবে কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে নার্গিস।

আমি এত কঠিন কঠিন কথা বুঝি না কবি, আগেও বুঝিনি, আজও বুঝি না। শুধু একবার জীবনে আপনাকে বুঝেছি ভেবে খুব অহংকার হয়েছিল আমার, তাতে খুব শিক্ষা হয়েছে, বাকি জীবনে আর কখনও...আচ্ছা আপনার ওই যে গানখানি খুব শুনি ওই গানটিও আমাকে আর আপনাকে নিয়েই লিখেছিলেন না?

নজরুল তাঁর দুই ভুরুর মাঝে প্রশ্ন রেখে তাকালেন নার্গিসের দিকে।

মিহি কন্ঠে গুনগুন করে উঠল নার্গিস-

মনে পড়ে আজ সে কোন জনমে বিদায় সন্ধ্যাবেলা

আমি দাঁড়ায়ে রহিনু এপারে তুমি ওপারে ভাসালে ভেলা...

সেই সে বিদায়ক্ষণে

শপথ করিলে বন্ধু আমার রাখিবে আমারে মনে,

ফিরিয়া আসিবে খেলিবে আবার সেই পূরাতন খেলা...

আজো ফিরিলে না হায়,

মোর অশ্রুর লিপি বনের বিহগী দিকে দিকে লয়ে যায়

তোমারে খুঁজে না পায়...

চুপ...দোহাই চুপ করো তুমি! বলে উঠলেন নজরুল। এই গান তাঁর সহ্য হচ্ছে না।

নার্গিস হাসল। ক্লান্ত সেই হাসি। বলল, আমি জানি আপনি সৎ, আপনি প্রেমীক, আপনি বিদ্রোহী, কিন্তু আপনার প্রেমে নিজেকে বেঁধে রাখার রশি নেই। আপনি নিজেও বাঁধনহারা, কেউ বাঁধা পড়তে চাইলেও তার থেকে সরে আসেন, নইলে আমার প্রতি এত প্রেমই যদি থাকবে, যদি আমার জন্য আপনার এতই অনুভব থাকবে তাহলে সেদিন রাতে সেই যে আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন তার কিছুদিনের মধ্যেই দুলিকে ভালবেসে ফেললেন কীভাবে? অবুঝ কিশোরীর বহুযুগ ধরে জমিয়ে রাখা অভিযোগ ঝরে পড়ল নার্গিসের কন্ঠ থেকে।

ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন নজরুল। শুধু বললেন, ক্ষমা করো, ক্ষমা করো। যে অন্যায় সেদিন না বুঝেই তোমার সঙ্গে করেছিলাম তার প্রায়শ্চিত্ত আমি আজীবন করে যাচ্ছি নার্গিস। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি যেন এই অন্তর্দাহ থেকে মুক্তি না পাই এই প্রার্থনাটুকু কোরো।

বিদায় কবি। অনন্তকাল যেন আপনার প্রতীক্ষাতেই থাকতে পারি এই আশীর্বাদ করবেন।

Comments


bottom of page