Search

ভয় পাবেন না, সচেতন হোন...করোনার দ্বিতীয় তরঙ্গের শেষ কবে? কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা? কারা কারা বিপদের মুখে?

প্রায় দু’বছর আমরা প্রায় প্রত্যেকে গৃহবন্দী। এটা শুধু কোনও পরিবারের গল্প নয়, নগর, রাজ্য, দেশের গল্প নয়। এটা গোটা বিশ্বের গল্প। পৃথিবী জুড়ে একই ছবি। করোনা নামে ছোট্ট একটা ভাইরাস। গোটা পৃথিবীর জীবনযাপনকে একেবারে বদলে দিল। এখন যাঁরা বেঁচে আছেন, তাঁদের প্রত্যেকের কাছে এ অভিজ্ঞতা প্রথম। প্রথম ঢেউ সামলাতে না সামলাতে দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঝড়। এতেই কুপকাত সকলে। ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলছে করোনার তৃতীয় ঢেউ। এর থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়? কি বলছেন, বিশেষজ্ঞরা? দেখে শুনে বুঝে তারই বিশ্লেষণে সাংবাদিক

সমীর চট্টোপাধ্যায়




বিশেষজ্ঞমহল

ডাঃ রবীন চক্রবর্তী, হার্ট স্পেশালিষ্ট

ডাঃ তুষারকান্তি ঘোষ, ইএনটি সার্জন

ডাঃ অমিতাভ ভট্টাচার্য, ইএনটি

ডাঃ কুশলনারায়ণ চক্রবর্তী, দাঁত ও মুখের চিকিৎসক

ডঃ কে বিজয় রাঘবন, ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োলজিকাল সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক ও ভূতপূর্ব ডিরেক্টর

ডাঃ গৌরি আগরওয়াল, চিকিৎসক, দিল্লি

ডাঃ শ্যাম আগরওয়াল, গঙ্গারাম হাসপাতাল, দিল্লি

ডাঃ গিরিধর আর বাবু, কর্ণাটকের জাতীয় কোভিড-১৯ টাস্ক ফোর্সের পরামর্শদাতা ও বেঙ্গালুরুর ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক হেলথ’-এর অধ্যাপক

অধ্যাপক মাথুরকুমাল্লি বিদ্যাসাগর, চেয়ার অফ কোভিড সুপারমডেল কমিটি অন ‘সুত্রা’ মডেল

রণদীপ গুলেরিয়া, AIIMS ডিরেক্টর

রাখী চট্টোপাধ্যায়, ডায়াটেশিয়ান

ডাঃ অনিরুদ্ধ কর, অ্যাপলো হাসপাতালের বিশিষ্ট চিকিৎসক হোম হেল্থকেয়ার ইউনিট অ্যাস কনসালটেন্ট পিজিকাল থেরাপিস্ট

ডাঃ অক্ষয় নায়ার, চক্ষু চিকিৎসক, মুম্বই

ডাঃ রেনুকা ব্রাদু, নাক-কান-গলা বিভাগের প্রধান, মুম্বইয়ের সিওন হাসপাতাল

ডাঃ রঘুরাজ হেগড়ে, চিকিৎসক, বেঙ্গালুরু

ডাঃ রাহুল বক্সি, ডায়াবেটোলজিস্ট, মুম্বই

ডাঃ বিপিএস ত্যাগী, প্রধান, হার্ষ ইএনটি হাসপাতাল, গাজিয়াবাদ, উত্তর প্রদেশের

* রোজকার অনন্যার বিশেষ কৃতজ্ঞতা বিশেষজ্ঞদের প্রতি



কোভিড-১৯ সম্পর্কে এখনো বিজ্ঞানীরা সব জানেন না। কারণ এর চরিত্র ক্রমশই বদল হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে এটি দুর্বল হয়ে পড়বে নাকি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে, আমরা কেউ জানিনা। ভ্যাকসিন তো এসেছে। কিন্তু তাঁর ফল সম্পর্কে আমরা একেবারেই ওয়াকিবহাল নই। ভ্যাকসিন থাকলেও এটা সবাইকে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ভ্যাকসিনের অপ্রতুলতা, কিছু ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন নিয়ে ভীতি। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভ্যাকসিন ছাড়া এর থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই। ভ্যাকসিন নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও ধোঁয়াশায়।

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে স্প্যানিশ ফ্লুর তিনটি ঢেউ বা ওয়েভ দেখা গিয়েছিল। এর মধ্যে দ্বিতীয় ঢেউটা ছিল প্রথমটির তুলনায় মারাত্মক। তাই পুরোপুরি নিশ্চিন্ত বসে থাকার কোনও উপায় নেই। ইতিমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন করে সংক্রমণের হার বাড়ছে। কোনও কোনও দেশ তো আবার কঠোর লকডাউনের কথা ভাবছে। সংক্রমণ আকস্মিক হারে বাড়তে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে। বাড়ছে ভারতেও। প্রথম ঢেউ যখন একটু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে মানুষের বাইরে যাওয়াও বেড়েছে, বেড়েছে রেস্তরাঁয় খাওয়া দাওয়ার ধুম। জনসমুদ্র যেন। খুলে দেওয়া হয়েছে আরও অনেক কিছু, সে কারণে সংক্রমণের হার বাড়তেই পারে। বেড়েওছে। যাঁরা আগে বের হননি, তাঁরাও বের হতে শুরু করেছিলেন। কিছু ক্ষেত্রে মাক্সের ব্যবহার একেবারেই ছিল না। আর যারা ব্যবহার করছিলেন, তাঁদের অনেকেই রক্ষাকবচ ভেবে গলায়, বা থুতনিতে রাখছিলেন। শিশু-কিশোরেরাও বের হচ্ছিল। অনেক দেশে তো স্কুল-কলেজও খুলে গেছিল। ফলে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ায় অবাক হওয়ার কিছু নেই। বিশেষ করে অপেক্ষাকৃত তরুণ জনগোষ্ঠী, শিশু-কিশোরেরা উপসর্গহীন বাহকে (ক্যারিয়ার) পরিণত হচ্ছে, তারা আবার অন্যদের মধ্যে নিজের অজান্তেই সংক্রমণ ছড়াচ্ছে।

শহর ও গ্রামে মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করছে। কেউ বা কারা যেন বলেছিল, ২০২১ এসে গেছে। আমরা করোনা মুক্ত। ফলে যা খুশি তাই করতে পারি, যেথা খুশি যেতে পারি। অনেকেই অপ্রয়োজনে এবং স্বাস্থ্যবিধি না মেনেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্কুল না খুললেও শিশুদের নিয়ে বাবা–মায়েরা বাইরে যাচ্ছেন। এক বছর ধরে বন্দিদশা কাটিয়েছেন তো, এবার যে একটু না বেরলে চলছিল না, শিশুরা সতর্ক থাকতে পারে না বলে বাহকে পরিণত হয়। নিজেদের উপসর্গ না হলেও পরিবারে বয়স্কদের সংক্রমিত করছে তারা।


কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?

সময়ের সঙ্গে ভাইরাসের মিউটেশন (পরিবর্তন) ঘটে। স্প্যানিশ ফ্লুর বেলায় দ্বিতীয় সংক্রমণ ঢেউয়ে মিউটেটেড বা পরিবর্তিত ভাইরাসের শক্তি ছিল বেশি। আবার কোনও কোনও সময় ভাইরাস পরিবর্তন হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। করোনার ক্ষেত্রে কিন্তু এই ভাইরাস দুর্বলের জায়গায় অনেক সবলই হয়েছে। টিকা এসেছে। তা নিতে কোনও গড়িমসি করা উচিত নয়। সবারই এই ভ্যাকসিনটা দেওয়া জরুরি। সঙ্গে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলাই সবচেয়ে ভালো প্রস্তুতি। আসন্ন তথাকথিত সংক্রমণ ঢেউ মোকাবিলা করতে কিছু বিষয় এখনই পরিষ্কার হওয়া দরকার। নাহলে সারা দেশে মৃত্যুর মিছিল ক্রমশই বাড়বে।

মনে রাখতেই হবে,

দ্বিতীয় তরঙ্গে আবার খানিকটা স্বাভাবিক হতে চলেছে। আগের মতো। তার মানে এই নয় যে, করোনা সংক্রমণ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এমন প্রমাণ কিন্তু আমরা কোথাও পাচ্ছি না। সামাজিক–অর্থনৈতিক কারণে, জীবন–জীবিকার কারণে এসব খুলে দেওয়া হয়েছে, মহামারি শেষ হয়ে গেছে বলে নয়।

অতএব,

  • এই স্বাভাবিক মানেও কিন্তু স্বাভাবিক নয়। জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে কিছু মানুষকে বের হতে হচ্ছে বৈকি, তাই বলে সব আগের মতো স্বাভাবিক হয়েছে, এমনটা ভেবে নেওয়া খুব ভুল হবে। এখনও বেড়ানো, উৎসব, সামাজিকতা, জনসমাগম করার ভাবনা ভাবাটাও দুঃসাহস ছাড়া আর কিছু নয়।

  • অনেকেই বলবেন, মৃত্যুহার তো কমে গেছে। কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের ঝুঁকি কমেনি মোটেও। পরিবারের বয়স্ক ব্যক্তিটি বা এমন কেউ যাঁর ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ বা জটিল সমস্যা আছে তাঁদের হেলাফেলা করবেন না।

  • বাচ্চাদের অনেক সাবধানে রাখতে হবে। তৃতীয় তরঙ্গ আসন্ন প্রায়। এতে কিন্তু শিশুরাও রেহাই পাবেন না।


যা মানতেই হবে

  • অপ্রয়োজনে বাইরে যাবেন না। কাজ শেষে দ্রুত বাড়ি ফিরে আসুন। আপনার পরিবারের কাছে আপনি সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি। তাই অকারণে ঝুঁকি নেবেন না।

  • বাইরে গেলে সর্বোচ্চ সতর্কতা মেনে চলুন। যথাসম্ভব দূরত্ব মেনে চলুন। ঘরের বাইরে অবশ্যই মুখে ডবল মাস্ক পরবেন। ভুলেও মাস্ক খুলবেন না। হ্যাঁ, একই রকম মাস্ক নয়।সার্জিকাল মাস্ক ব্যবহার করলে সঙ্গে সুতির কাপড়েরও একটা মাস্ক ব্যবহার করবেন। উপরে, পাশে বা নিচে যেন কোনও ফাঁক না থাকে।

  • বারবার হাত ধোয়ার অভ্যাস অব্যাহত রাখুন। হাঁচি–কাশির আদব কায়দা মেনে চলুন।

  • অসুস্থবোধ করলে, জ্বর, কাশি বা গলাব্যথা, স্বাদহীনতা দেখা দিলে উপসর্গ যত মৃদুই হোক, নিজেকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে ফেলুন। পরীক্ষা না করা বা চিকিৎসকের পরামর্শ না নেওয়া পর্যন্ত বের হবেন না।

  • বাড়ির সবার কাছ থেকেও দূরে থাকুন। এখন অনেকেরই মৃদু উপসর্গ হচ্ছে, আর তা নিয়েই সবাই বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এটা অন্যায়।

  • যেকোনওরকম জনসমাগম, উৎসব, অনুষ্ঠান, ভিড় এড়িয়ে চলুন। উৎসব অনুষ্ঠান করতেই হলে সীমিত পরিসরে অল্পসংখ্যক মানুষ নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে করুন।

  • নিয়ম শিথিল হয়ে গেলেও এই মুহূর্তে শিশুদের নিয়ে অকারণে বাইরে যাবেন না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনও বন্ধ। সেটা শিশু-কিশোরদের স্বাস্থ্যের কথা ভেবেই করা। তাই বলে তাদের নিয়ে সমুদ্রসৈকতে, রিসোর্টে বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো যাবে না। শিশুরা নীরব বাহক হিসেবে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ছড়াতে পারে। নিজেরাও আক্রান্ত হতে পারে।

  • পরিবারে যিনি বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা, ডায়াবেটিসের রোগী, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগে বা ফুসফুসের জটিলতায় ভুগছেন, তাঁকে আলাদা রাখুন। তিনি বাইরে তো যাবেনই না, যাঁরা বাইরে থেকে আসেন, তাঁরাও তাঁর কাছে যাবেন না।


করোনার দ্বিতীয় ওয়েভে

শুধু স্বাদ চলে যাওয়া নয়, মুখগহ্বরে দেখা দিচ্ছে আরও ৪ সমস্যা।

৬০ শতাংশ রোগীর মধ্যে উপসর্গ গুলি প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। সেই উপসর্গের তালিকায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউ-এ সংযোজন হয়েছে আরও একাধিক লক্ষণ।

করোনা হয়েছে তা বোঝার প্রাথমিক উপসর্গ এতদিন ছিল শুধুমাত্র স্বাদ, গন্ধ চলে যাওয়া।পাশাপাশি, জ্বর-সর্দি কাশি তো রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে মুখগহ্বরে আরও একাধিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

অ্যাসিমটোমেটিক রোগীদের ক্ষেত্রে উপসর্গগুলির দিকেই মূলত নজর দেওয়া হয়। দেখা গিয়েছে, ৬০ শতাংশ রোগীর মধ্যে উপসর্গগুলি প্রকট। সেই উপসর্গের তালিকায় করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংযোজন হয়েছে আরও একাধিক লক্ষণ।

শুকনো মুখগহ্বর : মুখের ভিতর ক্রমশ শুকিয়ে যাচ্ছে। ঠোঁট শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে। মুখের ভিতর যে লালাক্ষরণ হয়, যা মুখের ভিতরের বাজে ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে দেয়, সেই ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। লালাক্ষরণ হচ্ছে না। যার ফলে মুখের ভিতর শুকিয়ে যাচ্ছে। এই লক্ষণ যদি আপনারও দেখা দেয় তাহলে দ্রুত কোভিড পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া বাঞ্ছনীয়।

মুখের ভিতর ঘা: যদি মুখের ভিতর গালের উপর ঘা হয় ও তার দরুণ বাজে গন্ধ হয় মুখে, তাহলেও খুব সম্ভাবনা রয়েছে দ্বিতীয় করোনার ঢেউয়ে আক্রান্ত আপনি। কারণ, করোনার মিউটেন্টের ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, এই মারাত্মক ভাইরাস মুখের ভিতর মাসেল ফাইবার গুলোকে আঘাত করছে। শুধু ঘা নয়, মুখের ভিতর বেশ কিছু অংশ ফুলে উঠেছে ও ব্যথা অনুভব হচ্ছে। মুখের ভিতর আলসার হয়েছে বলে অবজ্ঞা করবেন না। যথাযথ সাবধানতা অবলম্বন করুন।

জিভের উপর জ্বালা: করোনা হলে জিভের উপর জ্বালা ভাব দেখা দিচ্ছে। ত্বকের উপর সমস্যা আসছে।

জিভের রঙ বদল: করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে যে যে সমস্যা হচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম জিভের রঙ বদল। সাধারণত, শরীরে রোগ বাসা বাঁধলে জিভ তার রূপ বদলায়। এক্ষেত্রেও তাই হয়। পাশাপাশি মুখের ভিতর সমস্যা অনুভুত হচ্ছে। এক্ষেত্রে শরীরে যদি কোনও অসুবিধা না থাকে, কিন্তু জিভের রঙ বদলে যায়, তাহলে খেয়াল রাখুন। দ্রুত কোভিড পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া যথাযথ।

নাক-কান-গলা

করোনার দাপটে মানুষ যখন ঘরবন্দি তখন যদি কেউ অসুস্থ হন বা দুর্ঘটনা ঘটে তাহলে চিকিৎসা করানোটাই দুশ্চিন্তার। বেশিরভাগ হাসপাতালে সাধারণ চিকিৎসা এখন বন্ধ। মানে বহির্বিভাগে কোনও রোগীকে দেখা হচ্ছে না। আপৎকালীন যেকোনও অপারেশনের আগে কোভিড টেস্ট এবং তার রিপোর্ট দেখে অপারেশনের আয়োজন, সব মিলিয়ে খরচের বহরও অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে।

আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, হু (ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন)-এর তথ্য অনুযায়ী কোভিড ১৯-এর মতো ভাইরাস সবচেয়ে বেশি ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে নাক-কান-গলা অর্থাৎ ইএনটি ও দাঁতের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলিতে। গোটা বিশ্বজুড়েই এই ধরনের হাসপাতাল ও ক্লিনিকে সবচেয়ে বেশি সাবধানতা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছিল করোনা ছড়াতে শুরু করার সময় থেকেই। জেলাস্তরে বহু ইএনটি বা ডেন্টাল ক্লিনিক বন্ধ রেখেছিলেন চিকিৎসকেরা। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন যে সব রোগীদের, বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছিল তাঁদেরও।

যদিও হু’এর তথ্য মেনেই ইএনটি সার্জন বলেন, ‘‘কোভিড-১৯ ছড়ানো নিয়ে আমাদের এখানে চিকিৎসকদের মধ্যেও কিছু ভুল ধারণা আছে। যার শিকার হচ্ছেন রোগীরা। ভাল মাস্ক, যা মুখ ও নাককে এমনভাবে ঘিরতে পারে যাতে বাইরের কোনও কণা প্রবেশ না করে, সেটাই আমাদের সকলের জন্য যথেষ্ট। কোভিড ভাইরাস আসে মূলত থুতু থেকে। উল্টোদিকের মানুষের মুখ ও নাক দিয়ে তা প্রবেশ করতে পারে। আমরা যদি মাস্কটা ঠিকমতো ব্যবহার করি তাহলেই সুরক্ষিত থাকা যায়।’’

দাঁত ও মুখের চিকিৎসকরা বলেন, ‘‘পিপিই মোটেও সব চিকিৎসকদের জন্য প্রযোজ্য নয়। ভাল মাস্কই যথেষ্ট। সহজ পন্থা হল যাবতীয় বিষয় ফোনে জেনে নিয়ে মূল চিকিৎসা যদি হাসপাতালে বা চেম্বারে করা হয় এবং চিকিৎসক নিজে যদি তাঁর ঘরটি স্যানিটাইজ করেন নিয়ম মেনে তাহলেই অনেকটা সুরক্ষিত থাকা যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে সময় মতো চেম্বার বা হাসপাতালে আসতে হবে এই সময়। বয়স্ক ও শিশুদের জন্য আলাদা সময় রাখলেই ভাল। মাস্ক যথেষ্ট, তবে স্যানিটাইজের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।’’

করোনা ভাইরাসের ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়ান্টের কারণে দ্বিতীয় ঢেউ ভয়ঙ্কর হয়েছে

গত মার্চ মাসে করোনাভাইরাসের যে 'ডাবল মিউট্যান্ট ভ্যারিয়ান্ট'-এর অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল আমাদের দেশে, সেটির কারণেই দেশে ভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ অনেক বেশি প্রাণঘাতী হয়েছে।

বিবিসি নিউজ অনলাইনের এক খবরে বলা হয়েছে, বি.১.৬১৭ ভ্যারিয়েন্ট আমাদের দেশ, ভারতের কয়েকটি রাজ্যে অনেক বেশি সংখ্যায় পাওয়া গেছে।

ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের এক কর্মকর্তা অবশ্য জানিয়েছেন, ডাবল মিউট্যান্ট-এর সাথে করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের সম্পর্ক পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একটি ভাইরাসের মধ্যে যখন দুই ধরণের পরিবর্তন এক সঙ্গে মিলে যায়, তখন তাকেই ডবল মিউট্যান্ট বলে।

ভারতের একজন শীর্ষ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলছেন, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ অবশ্যম্ভাবী। কে বিজয় রাঘবন স্বীকার করেছেন যে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ এতটা ভয়ঙ্কর হবে, সেটি বিশেষজ্ঞরা অনুমান করতে পারেননি। ভাইরাস বেশি মাত্রায় সংক্রমিত হবার ফলে তৃতীয় ঢেউ অবশ্যম্ভাবী। তবে তৃতীয় ঢেউ কখন আসতে পারে সে বিষয়টি এখনও পরিষ্কার নয়।




বয়স্কদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা করোনায় আক্রান্ত নতুন প্রজন্মের উপসর্গ! আসছে না জ্বর

করোনায় আক্রান্ত হলে বয়স্কদের চেয়ে নতুন প্রজন্মের উপসর্গ বেশ কিছু ক্ষেত্রে একেবারে আলাদা। করোনায় এতদিন যে যে উপসর্গ দেখা দিচ্ছিল প্রকট আকারে সেগুলো জেনারেশন ওয়াইয়ের মধ্যে নেই বললেই চলে। দিল্লির এক ডায়গনস্টিক সেন্টারের বিশেষজ্ঞ জানাচ্ছে, করোনায় সংক্রমিত নতুন প্রজন্মের উপসর্গ সাধারণ ভাইরাল রোগের থেকে পৃথক।

ডাঃ গৌরি আগরওয়াল বলেন, 'রোগীদের মধ্যে অনেকেই, শুষ্ক মুখ, গ্যাসের সমস্যা, পেট খারাপ, লাল চোখ, ও মাথা ব্যাথা নিয়ে এসেছিল। তাদের কোভিড পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, করোনায় আক্রান্ত তাঁরা। প্রসঙ্গত, প্রত্যেকেই নতুন প্রজন্মের। এদের কারও জ্বর আসেনি'।

মহারাষ্ট্রে কোভিড-১৯-এর কোপে স্বাস্থ্যপরিকাঠামো কোন অবস্থায় রয়েছে, তা পর্যালোচনা করার জন্য যে টাস্ক ফোর্স গঠন করা হয়েছে তাদের কথায়, ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে অনেকে ভর্তি রয়েছে হাসপাতালে, যেখানে গত বছর কোনও শিশুই করোনা নিয়ে ভর্তি ছিল না।

ভাইরোলজিস্টদের মতে করোনা মিউটেন্ট করবে, খুব শীঘ্রই এর হাত থেকে মুক্তি নেই। সুতরাং মাস্ক পড়ুন, করোনা বিধি মেনে চলুন। এড়িয়ে চলুন জমায়েত।

দিল্লির গঙ্গারাম হাসপাতালের ডাঃ শ্যাম আগরওয়ালের কথায়, করোনা নিয়ে গবেষণা করে দেখা গিয়েছে, ৬০ শতাংশ স্ট্রেন ডবল মিউটেন্ট। আর যা খুবই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। একাধিক রাজ্য করোনা থেকে বাঁচতে সপ্তাহান্তে বা রাতে জনতা কার্ফু জারি করেছে। কিন্তু তাঁর মতে লম্বা লকডাউন জারি না করলে চেন ভাঙা যাবে না।


আসতে পারে তৃতীয় ঢেউ?

করোনার (Coronavirus) দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত দেশ। এহেন পরিস্থিতিতে আশঙ্কায় উঠে আসছে তৃতীয় ঢেউয়ের (Third wave of Covid-19) কথাও। যা কমবয়সিদের, বিশেষ করে শিশুদের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে চলেছে। এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, কবে আসতে পারে মারণ ভাইরাসের তৃতীয় ঢেউ? বিশেষজ্ঞদের অনুমান, সম্ভবত বছরের শেষদিকে শীতকালেই ফের ভয়াবহ হয়ে উঠবে সংক্রমণ।

কর্ণাটকের জাতীয় কোভিড-১৯ টাস্ক ফোর্সের পরামর্শদাতা ও বেঙ্গালুরুর ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পাবলিক হেলথ’-এর অধ্যাপক ড. গিরিধর আর বাবু জানাচ্ছেন, ‘‘শীতকালে, বলতে গেলে নভেম্বরের শেষ থেকে ডিসেম্বরের শুরুর মধ্যেই আসতে পারে তৃতীয় ঢেউ। তাই দেওয়ালির আগে ঝুঁকিবহুল ব্যক্তিদের টিকাকরণ হয়ে যাওয়া দরকার। তাহলে অনেক প্রাণকেই রক্ষা করা সম্ভব। ডিসেম্বর পর্যন্ত অনেকগুলো ফ্যাক্টর রয়েছে। কতজনকে টিকা দেওয়া হল, ‘সুপার স্প্রেডার ইভেন্ট’গুলিকে আটকাতে পারা গেল কিনা ও কত দ্রুত নয়া স্ট্রেনগুলিকে আমরা চিহ্নিত করতে পারলাম সেগুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ।’’

অধ্যাপক এম বিদ্যাসাগরের মতে, ‘‘দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় বহু মানুষই আছেন, যাঁরা সংক্রমিত হয়েছেন।কিন্তু যেহেতু লক্ষণহীন, তাই ধরা পড়েনি। ফলে নিজের অজান্তেই এই বিপুল সংখ্যাক মানুষও ‘ইমিউন’ হয়ে গিয়েছেন। আগামী অন্তত ৬ মাস তাঁদের এই প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকবে। কিন্তু তারপর থেকে তাঁরা ফের সেই ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবেন। ফলে ওই সময়ের মধ্যেই টিকাকরণের হার বাড়িয়ে ফে‌লতে হবে। যাতে ওই সব ব্যক্তিরও টিকা নেওয়া হয়ে যায়।যদি আগামী ৬ মাসের মধ্যে টিকাকরণের (Vaccination) গতি বাড়িয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে মানুষকে টিকা দিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে হয়তো তৃতীয় ঢেউ এলেও তা দ্বিতীয় ঢেউয়ের মতো বিপজ্জনক ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারবে না।”


স্বাস্থ্যমন্ত্রকের নতুন গাইডলাইন

করোনায় আক্রান্ত হয়ে যাঁরা বাড়িতে আছেন, তাঁদের জন্য

মাস্ক নিয়ে নতুন গাইডলাইন জারি করল স্বাস্থ্যমন্ত্রক। যাতে উল্লেখ আছে, যেসব কোভিড রোগী বাড়িতে নিভৃতবাসে রয়েছেন, তাদের মাস্ক ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক। মূলত তাদের জন্যই নতুন করে এই নির্দেশিকা জারি করেছে। সবসময় ৩ স্তরের মেডিক্যাল মাস্ক ব্যবহার করতে বলছে কেন্দ্র। আট ঘণ্টার বেশি একটি মাস্ক ব্যবহার করা একেবারেই উচিত নয়। ৮ ঘণ্টা পর বদলে ফেলুন ব্যবহার করা মাস্ক। অথবা যদি গরমের কারণে আপনার মাস্ক ঘামে ভিজে যায় বা কাশি সর্দির কারণে নোংরা হয়ে যায়, তাহলে দ্রুত সেই মাস্ক চেঞ্জ করুন। তবে খেয়াল রাখবেন সেই মাস্ক যেন অন্য কিছুর সঙ্গে সংস্পর্শে না আসে। অবশ্যই সেই মাস্ক ধুয়ে ফেলুন। যদি একবার ব্যবহারের মাস্ক পড়েন, তাহলে সেই মাস্ক ফেলে দেওয়ার সময় সম্ভব হলে একবার জলে ধুয়ে তবেই যথাস্থানে ফেলবেন। কোভিড আক্রান্ত হয়ে যাঁরা নিভৃতবাসে আছেন, তাঁদের n95 মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্যমন্ত্রক।

এই সময় অত্যধিক মাত্রায় তরল খাবার ও জল খাওয়ার পাশাপাশি যতটা বেশি সম্ভব বিশ্রাম নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে গাইডলাইনে।

কোভিড আক্রান্ত হয়ে হোম আইসোলেশনে আছেন? হঠাৎ শ্বাসকষ্ট হলে কী করণীয়?

কোভিড সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে অক্সিজেনের জন্য হাহাকার পড়ে গেছে। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ যে, সুস্থ মানুষও ভবিষ্যতের কথা ভেবে গোপনে নিজের বাড়িতে অক্সিজেনের সিলিন্ডার মজুত করে রাখছেন। এই কারণে বহু করোনা রোগী অক্সিজেন না পেয়ে মারা যাচ্ছেন। প্রতিদিনের কাগজ খুললেই অক্সিজেন না পেয়ে রোগীর মৃত্যুর ছবিগুলো দেখলে নিজেদের বড় অসহায় মনে হয়। করোনায় আক্রান্তদের ফুসফুস কমজোর হয়ে যাচ্ছে। ফলে অক্সিজেন নেওয়ার গতিও কমছে। এই বছরে নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে 'অক্সিজেন স্যাচুরেশন' বা অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া। সেই সঙ্গে পালস রেটও অনেকটা বাড়ছে। তবে, এখন থেকে যদি সচেতন না হওয়া যায় ভবিষ্যতে আরও ভয়ঙ্কর পরিণতি হতে পারে।

আগের বছর এবং এই বছরের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। গত বছরের ভাইরাসটা এতটা ব্যাপক হারে ছড়ায়নি, যেহেতু লকডাউন শুরু হয়ে গিয়েছিল। তাতে, সংক্রামিত রোগী ও সুস্থ মানুষের মধ্যে কমিউনিকেশন অনেকটা কম ছিল। কিন্তু এই বছর মানুষের মধ্যে একটা গাছাড়া ভাব দেখা গিয়েছিল শুরুর দিকে। মাস্ক না পরা, সেনিটাইজ করার গাফিলতি, দূরত্ববিধি মেনে না চলা এবারের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ। যাহোক, শ্বাসকষ্ট হলে কিছু ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতে হবে। এটি করেও যদি দেখা যায় অক্সিজেনের মাত্রা ৯০-এর কম চলে এসেছে সে ক্ষেত্রে একটা অক্সিজেনের সিলিন্ডার অবশ্যই বাড়িতে রাখা উচিত, যাতে অক্সিজেনের ঘাটতি না হয়। যদিও কিছু অক্সিজেন পার্লার তৈরি হয়েছে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় জেলায় তথাপি এখন যে সহজেই অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে, তা তো নয়, সেক্ষেত্রে সকলেরই একটু এক্সারসাইজ করা উচিত। যোগা, মেডিটেশন এগুলি করলে আমাদের অনেকটাই অক্সিজেনের ঘাটতি মিটিয়ে দিতে পারবে। যাঁরা কোমরবিটির রোগী অর্থাৎ যাদের সুগার বা পেশার থাকলে সেক্ষেত্রে অগ্রিম সতর্কতা নেওয়া দরকার।

করোনা রোগীদের ক্ষেত্রে অধিকাংশের ফুসফুসকে কমজোর করে দিচ্ছে এই ভাইরাস। অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের কাছাকাছি রাখতেই চলছে চেষ্টা। তাই কৃত্রিম অক্সিজেনের প্রয়োজন বাড়ছে। কৃত্রিম অক্সিজেন দেওয়া হয় সি-প্যাপ বা বাই প্যাপের মাধ্যেমে। বাড়িতে অবশ্য এটি সম্ভব নয়, এক্ষেত্রে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা করাতে হবে। যদি কারোর ফুসফুসের কোনও সমস্যা থাকে যেমন, সিওপিডি বা ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা থাকে তাহলে বাড়িতে একটা বাইপ্যাপ মেশিন রাখা দরকার। বাই প্যাপের মাধ্যমে আমরা অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে তুলতে পারি।

ধূমপান করলে কোভিড সংক্রমণের আশঙ্কা এবং তার ভয়াবহতা বেশি বলেই মনে করছে হু। ধূমপায়ীদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কম। ফুসফুসের দুরাবস্থা তো হয়ই। এর আগে দেখা গিয়েছে যাঁরা ধূমপান করেন, তাঁদের শরীরে করোনার প্রভাব মারাত্মক। কারণ করোনা ভাইরাসের কবলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস। আমাদের ফুসফুসের মধ্যে অ্যালভিওলি থাকে। অ্যালভিওলির মধ্যে যদি কেউ ধূমপান করেন, তাহলে সংক্রমণ তাড়াতাড়ি ছড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। করোনা লাং-এর মধ্যে দিয়ে ফুসফুসে সরাসরি আক্রমণ করে, প্রথমে ব্রংকিয়াসকে অ্যাটাক করে তারপর আস্তে আস্তে ফুসফুসে চলে যায়। ধূমপানের পাশাপাশি মদ্যপান করাও উচিত নয়। কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন, সপ্তাহে একদিন হয়তো করা যেতে পারে, তবে নিয়মিত একেবারেই নয়।

অতিমারির কারণে এখন বাড়ি থেকে বেরোনোর পরিমাণ কমে গেছে। এই অবস্থায় বাড়ির ভিতরের পরিবেশে দূষণের মাত্রা বাড়ছে। কারণ দীর্ঘক্ষণ একই ঘরে কাটানো তাই ঘরের বাতাস যাতে দূষিত না হয়, সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। বদ্ধঘর একেবারেই নয়। যতটা সম্ভব AC কম ব্যবহার করা উচিত। ঘরের জানালা-দরজা খুলে রাখতে হবে। ঘরে যেন পর্যাপ্ত সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে। যদি কোনও ব্যক্তি সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে হোম আইসোলেশনে থাকেন তবে তাঁর ঘরের জানালা খুলে রাখা উচিত। মনে রাখতে হবে আক্রান্ত ব্যক্তি যেন বোর ফিল না করেন। আমরা স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের সঙ্গে বেশি করে যোগযোগ রাখার চেষ্টা করি। এতে রোগীরপক্ষে ভালো, দ্রুত সেরে উঠতে পারবেন। যত কম ঘুম তত কিন্তু সমস্যা বেশি। তাই ঘুম আর ভেন্টিলেশন দু'টোই দরকার।


হোম আইসোলশনে সাবধানতা একটা আলাদা ঘরে রাখা দরকার, যাতে আর কারোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস আছে এমন ঘরে থাকতে হবে। দরকার হলে এসি চালাবেন হালকা করে। অন্য সময় ঘরে বাতাস চলাচল করতে দিন। ঘরে বাতাসবাহিত হলে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা কমে। এছাড়া একটু করে স্টিম নিন, দুধের সঙ্গে একটু হলুদ দিয়ে পান করতে হবে। হালকা গরম জল খান। রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে। অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে। হালকা জ্বর-সর্দি-কাশি হলে প্যারাসিটামল, ভিটামিনের ডোজ নেওয়া যেতে পারে। প্রথম সাতদিন যদি বাড়িবাড়ি না হয় তবে, বাড়ি থেকেই চিকিৎসা করা যেতে পারে। রোগীকে সময় সময় খাওয়া উচিত। দিনে একটা করে ডিম খাওয়া দরকার। ভেজিটেরিয়ান হলে বেশি করে দুধ, শাকসবজি, সাইট্রাস ফল খাওয়া দরকার।


পোস্ট অ্যাকিউট কোভিড সিনড্রোম

অবহেলা নয়, প্রয়োজন চিকিৎসার

করোনা সেরে যাওয়ার পরও ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে করোনার প্রভাব। কোভিড মুক্ত হলেও আপনি সুস্থ নন। চিকিৎসা আরও দীর্ঘমেয়াদি হতে চলেছে। AIIMS ডিরেক্টর রণদীপ গুলেরিয়া এমনটাই জানালেন। করোনা মুক্ত হলেও বিশ্রাম এবং প্রয়োজন যথাযথ চিকিৎসার। তা না হলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, সতর্ক করলেন গুলেরিয়া।

অনেকক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, করোনা মুক্ত কিন্তু জ্বর কমছে না। শ্বাসকষ্ট বহাল রয়েছে। হাতে ধরার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। ক্লান্তিতে মাথা তোলা দায় হচ্ছে। সারা শরীর যন্ত্রণা করছে। অনেকে মনে করছেন কোভিড শরীরে ছিল বলে তাই এই অসুস্থতা রয়ে গিয়েছে। সম্পূর্ণ সঠিক নয় এই ধারণা। কোভিড আপনার শরীরে তেমন এফেক্ট ফেলতে না পারলেও আপনাকে অসুস্থ করে দিয়েছে। তাই, সেই রোগের জন্য যথাযথ চিকিৎসা করাতে হবে।

প্রসঙ্গত, করোনা থেকে সেরে উঠলেও দীর্ঘদিন ধরে শরীরে নানা উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। যদি উপসর্গ, সুস্থ হওয়ার পরেও ৪-১২ সপ্তাহ ধরে দেখা যায় তখন তাকে ‘পোস্ট অ্যাকিউট কোভিড সিনড্রোম’ বলা হচ্ছে। আর যদি উপসর্গ তিন মাসের বেশি সময় ধরে শরীরে দেখা যায়, তাহলে তাকে ‘লং কোভিড সিনড্রোম’ বলা হয়ে থাকে। কোভিড মুক্ত ব্যক্তি কোন দলে পড়েন, আদৌ পড়েন কিনা সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। যদি তেমন কিছু ঘটেই তাহলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের নজরে আনতে হবে।

গুলেরিয়ার কথায়, 'করোনা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠার পরে সুস্থ ব্যক্তির মূল যে সমস্যা হচ্ছে, তাহল শ্বাসকষ্ট। বুক ধরফর করা। কথা বলতে গেলে হাঁপিয়ে ওঠা। পালস রেট অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া বা কখনও কমেও যেতে পারে। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যে উপসর্গগুলি দেখা যায় তার মধ্যে অন্যতম হল শ্বাসকষ্ট'।

ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম দেখা দিচ্ছে বেশ কিছু রোগীর ক্ষেত্রে, যাতে কাজ করতে গিয়ে অল্পেতেই হাঁফিয়ে উঠছেন সুস্থ হওয়া ব্যক্তিরা। এই ধরণের উপসর্গগুলি টানা দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসা করান। পরীক্ষা করান শরীরের।

করোনা থেকে বাঁচতে জোড়া মাস্ক ! কিন্তু কীভাবে পরবেন?

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ঝাপটায় লন্ডভন্ড হয়েছে দেশ। দৈনিক সংক্রমণ ৪ লাখ। সংক্রমণের সঙ্গে মৃত্যুর হারও চিন্তা বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মাস্ক পরার জন্য বারবার করে বার্তা দিচ্ছে সরকার। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ডবল মাস্ক ব্যবহারের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু ডবল মাস্ক কীভাবে পরবেন?

মাস্ক পরার ক্ষেত্রে কী কী মনে রাখতে হবে?

* ডবল মাস্ক পরলে, একটা অবশ্যই সার্জিক্যাল মাস্ক পরতে হবে। সঙ্গে দুই বা ত্রিস্তরীয় কাপড়ের মাস্ক পরুন।

* নাক-মুখ ঢাকা থাকে যেন

* তবে খেয়াল রাখতে হবে মাস্ক পরার পর শ্বাস-প্রশ্বাসে যেন কোনও সমস্যা না হয়।

* কাপড়ের মাস্ক নিয়মিত পরিষ্কার করুন।

*একই মাস্ক দু-ধরণের পরবেন না। নাক এবং মুখের সঙ্গে লেগে থাকা মাস্কটি সুতির হলেই সবচেয়ে ভাল।

* একই মাস্ক না পরিষ্কার করে পরবেন না। সার্জিক্যাল মাস্ক একবারের বেশি ব্যবহার করা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা যেভাবে রূপ বদলেছে, তাতে মারণ ভাইরাসকে রুখতে জোড়া মাস্ক পরা অত্যন্ত জরুরি। তবে মাস্ক খোলা পরার সময় সতর্ক হতে হবে। মাস্ক হাত থেকে সরিয়ে রাখার পর হাত ভাল করে স্যানিটাইজ করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

কেন ডবল মাস্ক পরার কথা বলা হচ্ছে? রূপ বদলেছে করোনার।কিন্তু রূপটা যে কত ভয়ঙ্কর তা বোঝা যাচ্ছে না। বায়ুতে ভেসে থাকা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণার মাধ্যমেও ছড়াতে পারে করোনা সংক্রমণ (Covid19)। তাই একমাত্র মাস্কই আপনাকে বাঁচাতে পারে।

কোভিড-এর সঙ্গে লড়তে প্রয়োজন সুস্থ ও শক্তিশালী ফুসফুস, ডায়েটে রাখুন ৪ ভেষজ পানীয়

ফুসফুসের স্বাস্থ্য ভাল রাখলেই আপনি অনেকটা বিপদমুক্ত থাকতে পারবেন। কোভিড কেটে গেলেও ফুসফসে মারাত্মক সংক্রমণ কেড়ে নিয়েছে হাজারো প্রাণ। তাই আগেই সাবধান হন। আমাদের শরীরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ফুসফুস এবং হৃদযন্ত্র। যা একেবারে ঘড়ির কাটার মতো কাজ করে। যাদের মধ্যে একটির স্বাস্থ্য বিগড়ে গেলেই ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলে বিপদ। WHO অর্থাৎ World Health Organization-র বিবৃতি অনুযায়ী ৯২ শতাংশ দূষণ বায়ু আমরা নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করি। ছোট ছোট বিষাক্ত ধুলিকণা প্রবেশ করে যায় আমাদের শরীরে। যা ক্রমান্বয়ে ক্ষতি করছে আমাদের ওই দুটি অঙ্গের। এখান থেকে বাঁচার উপায় একমাত্র স্বাস্থ্যকর ডায়েট।

হলুদ জল বা দুধ (Turmeric water or milk)

প্রতিদিন হলুদ খেলে আপনার শ্বাসকষ্ট দূর হবে। এতে কারকুমিন নামে একটি উপাদান রয়েছে যা ফুসফুসকে সুস্থ রাখে এবং প্রাকৃতিকভাবে শক্তিশালী করে তোলে। এটি শরীরে উপস্থিত টক্সিনগুলিকে সরিয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাই ঘুমাতে যাওয়ার আগে আপনি প্রতি রাতে জল বা দুধে হলুদ দিয়ে পান করা উচিত।

পিপার্মেন্ট চা (Peppermint tea)

পিপার্মেন্ট চা স্বাভাবিকভাবেই শ্বাসকষ্টের সমস্যা দূর করে। এটি শ্লেষ্মা পরিষ্কার করে এবং গলা ব্যথা হ্রাস করে। এরসঙ্গে এটি ফুসফুসের সংক্রমণকেও নির্মূল করে।

আদা চা (Ginger Tea)

আদা চায়ে আছে শক্তিশালী অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরির বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য যা সাধারণ কাশি এবং সর্দি নিরাময়ে সহায়তা করে। এরসঙ্গে এটি শ্বাসনালীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এবং জিঙ্ক সমৃদ্ধ হওয়ায় আদা চা খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। এর সঙ্গে আবহাওয়া বদলে যে জ্বর আসে বা সর্দি কাশি হয়, তাও নির্মূল হয়ে যায়।