কৃষ্ণকথা | তালের নানা পদ | শিল্প ও পটচিত্রে কৃষ্ণলীলা | দেশ জুড়ে জন্মাষ্টমী | রবিবারের গল্প: জগাইয়ের লেখক খোঁজা

কৃষ্ণকথা
ভারতীয় সংস্কৃতির দীর্ঘ ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের ঘিরে কেবল ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, গড়ে উঠেছে এক সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক জগৎ। শ্রীকৃষ্ণ তেমনই এক অনন্ত চরিত্র। তাঁকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা যায় না। তিনি যেমন মথুরার কারাগারে জন্ম নেওয়া দেবশিশু, তেমনই গোকুলের দুরন্ত কানাই; তিনি যেমন বৃন্দাবনের বাঁশিওয়ালা, তেমনই রাধার হৃদয়ের প্রিয়তম; তিনি যেমন মাখনচোর, তেমনই কুরুক্ষেত্রের রণাঙ্গনে অর্জুনের সারথি ও জ্ঞানগুরু। তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্ব যেন মানুষের জীবনের এক একটি অনুভূতি, এক একটি শিক্ষা। কোথাও আছে মাতৃস্নেহ, কোথাও বন্ধুত্ব, কোথাও প্রেম, কোথাও সংগ্রাম, কোথাও কর্তব্য, আবার কোথাও জীবনের গভীরতম দর্শন। তাই জন্মাষ্টমীর রাতে কৃষ্ণের জন্মস্মরণ আসলে শুধু একটি পৌরাণিক ঘটনার স্মরণ নয়; এটি অন্ধকারের মধ্যে আলোর জন্ম, অন্যায়ের মধ্যে ন্যায়ের প্রত্যাশা এবং সংশয়ের মধ্যে সত্যের সন্ধানের এক চিরন্তন প্রতীক।

শ্রীকৃষ্ণের জন্মকথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের কাহিনি। যদুবংশীয় বসুদেবের সঙ্গে কংসের বোন দেবকীর বিবাহের পর এক আকাশবাণীতে ঘোষণা হয়েছিল—দেবকীর অষ্টম সন্তানই হবে কংসের মৃত্যুর কারণ। সেই ভবিষ্যদ্বাণীতে আতঙ্কিত কংস দেবকী ও বসুদেবকে কারাগারে বন্দি করেন এবং তাঁদের সন্তানদের একে একে হত্যা করতে থাকেন। কিন্তু নিয়তির লেখা অন্যরকম। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির গভীর রাতে, যখন চারদিক নিস্তব্ধ, তখন কারাগারের অন্ধকারের মধ্যেই জন্ম নিলেন কৃষ্ণ। বৈষ্ণব বিশ্বাসে তাঁর আবির্ভাব কোনও সাধারণ শিশুর জন্ম নয়, বরং ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য পরমেশ্বরের অবতরণ। জন্মের পর বসুদেব নবজাতক কৃষ্ণকে নিয়ে মথুরা থেকে গোকুলের উদ্দেশে যাত্রা করেন। যমুনার উত্তাল স্রোত পেরিয়ে, ঝড়-বৃষ্টির সেই অন্ধকার রাতে শিশুকে মাথায় নিয়ে তাঁর যাত্রা ভারতীয় পুরাণের অন্যতম আবেগময় দৃশ্য। গোকুলে নন্দ ও যশোদার ঘরে সদ্যোজাত কন্যাশিশুর সঙ্গে কৃষ্ণকে বদলে দিয়ে বসুদেব ফিরে আসেন কারাগারে। কংস যখন সেই শিশুকে হত্যা করতে উদ্যত হন, তখন শিশুটি তাঁর হাত থেকে মুক্ত হয়ে দেবী রূপে প্রকাশিত হয়ে জানিয়ে দেন—যাকে ভয় করছ, সে ইতিমধ্যেই অন্যত্র জন্ম নিয়েছে। এই জন্মকথার মধ্যেই জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে বড় প্রতীকটি লুকিয়ে আছে—অত্যাচারের অন্ধকার যত গভীরই হোক, তার মধ্যেই নতুন আলোর জন্ম হয়।

কৃষ্ণের ঐতিহাসিক অস্তিত্ব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও গবেষণা হয়েছে। মহাভারত, হরিবংশ, বিষ্ণু পুরাণ, ভাগবত পুরাণ-সহ ভারতীয় ধর্ম ও মহাকাব্য সাহিত্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থে তাঁর জীবন, কর্ম ও চরিত্রের নানা বিবরণ পাওয়া যায়। তবে কৃষ্ণের জীবনের কোন অংশ ঐতিহাসিক এবং কোন অংশ পরবর্তী পুরাণ, লোকবিশ্বাস ও ভক্তি-পরম্পরায় সমৃদ্ধ হয়েছে, তা নিয়ে পণ্ডিত ও গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কৃষ্ণচরিত্র আসলে বহু শতাব্দী ধরে নানা স্তরে বিকশিত হয়েছে। মহাভারতের কৃষ্ণ একজন অসাধারণ রাজনৈতিক বুদ্ধিসম্পন্ন নেতা, কূটনীতিক, যাদববংশীয় নায়ক ও পাণ্ডবদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। অন্যদিকে ভাগবত পুরাণে তাঁর বাল্যলীলা, বৃন্দাবনের জীবন ও ঈশ্বরত্ব বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। মধ্যযুগে বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ হয়ে উঠেছেন প্রেম, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের সর্বোচ্চ প্রতীক। ফলে কৃষ্ণকে কেবল একজন পৌরাণিক চরিত্র হিসেবে দেখলে তাঁর পূর্ণতাকে ধরা যায় না। তিনি ভারতীয় সভ্যতার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে ক্রমশ নতুন নতুন অর্থ অর্জন করেছেন।
মথুরার রাজপরিবারের অন্ধকার থেকে গোকুলের নন্দালয়ে কৃষ্ণের জীবন যেন সম্পূর্ণ অন্য এক রূপ নেয়। যশোদার কোলে বড় হতে থাকা কৃষ্ণ হয়ে ওঠেন গোপাল, রাখাল, সবার আদরের কানাই। তাঁর শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গল্পগুলি আজও ভারতীয় ঘরে ঘরে সমান জনপ্রিয়। মাখনচুরি, গোপীদের সঙ্গে দুষ্টুমি, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, যশোদার কাছে বকুনি খাওয়া সব মিলিয়ে কৃষ্ণ এখানে কোনও দূরবর্তী দেবতা নন; তিনি ঘরের সন্তান। তাঁর মধ্যে দেবত্বের পাশাপাশি শিশুর স্বাভাবিক দুরন্তপনা। এই কারণেই কৃষ্ণভক্তির একটি বিশেষ রূপ হল বাৎসল্যভাব ভক্ত ঈশ্বরকে নিজের সন্তানের মতো অনুভব করেন। যশোদার সঙ্গে কৃষ্ণের সম্পর্ক সেই ভাবনার সবচেয়ে সুন্দর প্রতীক। কৃষ্ণের মুখে মাটি দেখার পর যশোদা যখন তাঁর মুখের ভিতর সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের দর্শন পান, তখন দেবত্ব ও মাতৃত্ব যেন একই মুহূর্তে মিলেমিশে যায়। আবার উখলের সঙ্গে কৃষ্ণকে বেঁধে রাখার ‘দামোদর’ লীলায় দেখা যায়, অসীম শক্তির অধিকারী ঈশ্বরও মায়ের ভালোবাসার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন।

কৃষ্ণের বাল্যলীলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাঁর অসুরবিনাশের কাহিনি। পুতনা, তৃণাবর্ত, বকাসুর, অঘাসুরসহ নানা অশুভ শক্তির বিনাশের গল্পে কৃষ্ণকে দেখা যায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক শক্তি হিসেবে। কালীয়দমন লীলায় বিষাক্ত নাগের কবল থেকে যমুনাকে মুক্ত করার কাহিনি বিশেষভাবে স্মরণীয়। কালীয়ের ফণার উপর কৃষ্ণের নৃত্য ভারতীয় শিল্পকলায় অসংখ্যবার চিত্রিত হয়েছে। একইভাবে গোবর্ধনধারণের কাহিনিও কৃষ্ণচরিত্রের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। বৃন্দাবনের মানুষকে কৃষ্ণ বোঝান, তাঁদের জীবনের সঙ্গে প্রকৃতি, গোবর্ধন পর্বত, গবাদি পশু ও ভূমির সম্পর্ক কত গভীর। ইন্দ্রের প্রবল বৃষ্টির হাত থেকে বৃন্দাবনবাসীকে রক্ষা করতে কৃষ্ণ গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরেন পুরাণের এই কাহিনি পরবর্তীকালে গোবর্ধন পূজার সঙ্গে যুক্ত হয়। এইসব লীলাকে শুধু অলৌকিক ঘটনা হিসেবে না দেখে মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হিসেবেও দেখা যায়, যেখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, সমষ্টিগত নিরাপত্তা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহসের নানা প্রতীক খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু কৃষ্ণের যে রূপটি মানুষের হৃদয়ে সবচেয়ে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে, তা হল বৃন্দাবনের বাঁশিওয়ালা কৃষ্ণ। যমুনার তীর, কদমতলা, গোপীদের দল আর বাঁশির সুর এই চিত্র ভারতীয় শিল্প, সাহিত্য ও সংগীতে অমর হয়ে আছে। কৃষ্ণের বাঁশি যেন শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়; তা এক আহ্বান। সেই আহ্বানে গোপীরা সংসার, সামাজিক পরিচয়, দৈনন্দিন কর্তব্য ভুলে ছুটে আসেন কৃষ্ণের কাছে। এই প্রেমের কাহিনি পরবর্তী বৈষ্ণব সাহিত্যে গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য লাভ করে। রাধা ও কৃষ্ণের প্রেম তাই কেবল নারী-পুরুষের পার্থিব প্রেমের গল্প নয়; বৈষ্ণব দর্শনে তা হয়ে ওঠে জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলনের প্রতীক। রাধার বিরহ, অপেক্ষা, অভিমান ও আত্মসমর্পণের মধ্যে ভক্তির এক গভীরতম রূপ প্রকাশ পায়। বাংলার পদাবলি কীর্তন এই প্রেমকে এমন এক আবেগময় ভাষা দিয়েছে, যার প্রভাব আজও বাংলা সংগীত ও সাহিত্যে অমলিন।

রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মতোই কৃষ্ণের রাসলীলা ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্য অধ্যায়। রাসের মধ্যে আছে নৃত্য, সংগীত, প্রেম ও ভক্তির মিলন। বৃন্দাবনের এই লীলাকে কেন্দ্র করে শত শত বছর ধরে গড়ে উঠেছে গান, পদ, নৃত্যনাট্য, চিত্রকলা ও লোকশিল্পের অসংখ্য ধারা। বাংলায় চৈতন্যদেবের বৈষ্ণব আন্দোলন কৃষ্ণভক্তিকে এক নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শক্তিতে পরিণত করে। নামসংকীর্তন, হরিনাম, পদাবলি, রাসোৎসব, দোলযাত্রা সবকিছুর মধ্যেই কৃষ্ণচেতনা ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস, গোবিন্দদাস প্রমুখ কবির রচনায় রাধাকৃষ্ণের প্রেম বাংলা সাহিত্যে পেয়েছে এক অনন্য কাব্যিক রূপ। কৃষ্ণ তখন আর শুধু পুরাণের চরিত্র নন; তিনি বাংলার গান, কবিতা, কীর্তন, পটচিত্র, মৃৎশিল্প, লোককথা এবং মানুষের দৈনন্দিন ভক্তির অংশ হয়ে ওঠেন। বৃন্দাবনের সেই আনন্দময় দিন একসময় শেষ হয়। কৃষ্ণকে ফিরে যেতে হয় মথুরায়। কংসের অত্যাচারের অবসান ঘটানোর সময় এসে যায়। কৃষ্ণ ও বলরামের হাতে কংসের পতনের মধ্য দিয়ে মথুরায় অন্যায়ের অবসান ঘটে। এরপর কৃষ্ণের জীবনে শুরু হয় আরও বড় দায়িত্বের পর্ব। যাদবদের নিরাপত্তার জন্য তিনি দ্বারকায় নতুন নগর প্রতিষ্ঠা করেন বলে পুরাণে বর্ণিত হয়েছে। বৃন্দাবনের রাখাল কৃষ্ণ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন একজন রাষ্ট্রনায়ক, কূটনীতিক ও সমাজসংগঠক। মহাভারতের কাহিনিতে তাঁর এই রূপই সবচেয়ে স্পষ্ট। পাণ্ডবদের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব, দ্রৌপদীর প্রতি তাঁর সহমর্মিতা, শান্তির জন্য কৌরবদের কাছে দূত হয়ে যাওয়া এবং যুদ্ধের আগে বারবার সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা সবকিছুর মধ্যে কৃষ্ণের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মানবিক বোধ প্রকাশ পায়।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে কৃষ্ণের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি সামনে আসে। অর্জুন যখন যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের আত্মীয়, শিক্ষক ও প্রিয়জনদের দেখে অস্ত্রধারণে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তখন কৃষ্ণ তাঁর সারথি হিসেবে তাঁকে জীবনের গভীরতম সত্যের কথা বলেন। সেই উপদেশই পরবর্তীকালে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা নামে অমর হয়ে ওঠে। গীতায় কৃষ্ণ কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি, আত্মসংযম ও কর্তব্যের কথা বলেছেন। তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হল—মানুষের কর্তব্য থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং নিজের দায়িত্বকে উপলব্ধি করে সঠিক কর্মের পথে এগিয়ে চলা। ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে দুর্বল করে; কর্মের মধ্যেই মানুষের অধিকার। এই দর্শন কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য নয়, জীবনের প্রতিটি সংকটের ক্ষেত্রেই প্রাসঙ্গিক। সংশয়ে ভেঙে পড়া মানুষকে নিজের ভিতরের শক্তি চিনতে শেখানোর জন্যই আজও গীতার কৃষ্ণ এত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষ্ণের মাহাত্ম্য এখানেই যে, তিনি কোনও একটি সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ নন। তিনি একই সঙ্গে সন্তান, বন্ধু, প্রেমিক, গুরু ও পথপ্রদর্শক। একজন মা তাঁকে সন্তানের মতো ভালোবাসতে পারেন, একজন ভক্ত তাঁকে বন্ধুর মতো ডাকতে পারেন, প্রেমিক হৃদয় তাঁকে রাধার কৃষ্ণ হিসেবে অনুভব করতে পারে, আবার একজন জ্ঞানসন্ধানী তাঁকে গীতার গুরু হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। কৃষ্ণের এই বহুরূপী সত্তাই তাঁকে অন্য অনেক পৌরাণিক চরিত্রের তুলনায় মানুষের এত কাছে এনে দিয়েছে। তাঁর জীবনে যেমন আনন্দ আছে, তেমনই আছে বেদনা; যেমন প্রেম আছে, তেমনই বিচ্ছেদ; যেমন বাঁশির সুর আছে, তেমনই যুদ্ধের কঠিন বাস্তবতা। তিনি জীবনকে অস্বীকার করেননি; বরং জীবনের আনন্দ, দুঃখ, দায়িত্ব, সম্পর্ক ও দ্বন্দ্ব সবকিছুর মধ্য দিয়েই সত্যকে খুঁজেছেন।

ভারতীয় শিল্পকলায় কৃষ্ণের উপস্থিতিও তাই অসীম বৈচিত্র্যময়। পটচিত্রে কখনও দেখা যায় মাখনচোর কৃষ্ণ, কখনও কালীয়দমন, কখনও গোবর্ধনধারী কৃষ্ণ, কখনও রাধার সঙ্গে বৃন্দাবনের রাসলীলা। মন্দিরের ভাস্কর্য, টেরাকোটা, মৃৎশিল্প, কাঠের পুতুল, লোকচিত্র, আলপনা সবখানেই কৃষ্ণের গল্প নতুন নতুন রূপ পেয়েছে। সংগীতে কৃষ্ণ কখনও ভজনের সুর, কখনও কীর্তনের আবেগ, কখনও শাস্ত্রীয় সংগীতের বন্দিশ। নৃত্যে তাঁর রাসলীলা, কালীয়দমন কিংবা রাধাকৃষ্ণের প্রেম অসংখ্যবার মঞ্চস্থ হয়েছে। সাহিত্যে তিনি কবিদের অনন্ত অনুপ্রেরণা। অর্থাৎ কৃষ্ণকথা কেবল ধর্মীয় আখ্যান নয়; ভারতীয় শিল্প ও সৃজনশীলতার এক বিশাল ভাণ্ডার। জন্মাষ্টমীর উৎসব সেই দীর্ঘ কৃষ্ণকথাকে প্রতি বছর নতুন করে মানুষের ঘরে ফিরিয়ে আনে। মধ্যরাত্রিতে মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি, শঙ্খনাদ, কীর্তনের সুর, কৃষ্ণনাম, প্রদীপের আলো এবং ভক্তদের অপেক্ষা—সব মিলিয়ে জন্মাষ্টমীর রাত যেন মথুরার সেই অন্ধকার কারাগারের স্মৃতিকে আবার জীবন্ত করে তোলে। কোথাও কৃষ্ণের জন্মক্ষণে বিশেষ পূজা হয়, কোথাও ছোটদের কৃষ্ণ-রাধার সাজে সাজানো হয়, কোথাও দধিহান্ডি বা কৃষ্ণলীলা অভিনীত হয়, কোথাও আবার সারারাত চলে ভাগবত পাঠ ও নামসংকীর্তন। বাংলায় জন্মাষ্টমী ও নন্দোৎসবের সঙ্গে ঘরোয়া ভোগ, মাখন-মিছরি, ক্ষীর, নাড়ু এবং নানা মিষ্টির আয়োজনও যুক্ত। উৎসবের এই বহুরূপী আয়োজনের মধ্যেও মূল সুর একটাই কৃষ্ণের আগমন মানে আনন্দের আগমন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আশার আগমন।

আজকের ব্যস্ত, প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতেও কৃষ্ণকথা মানুষের কাছে এত প্রাসঙ্গিক কেন? কারণ মানুষের মৌলিক প্রশ্নগুলি বদলায়নি। অন্যায়ের সামনে কীভাবে দাঁড়াব, সংকটের সময়ে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেব, সম্পর্কের টানাপোড়েন কীভাবে সামলাব, কর্তব্য ও ব্যক্তিগত আবেগের মধ্যে ভারসাম্য কোথায়, ভালোবাসার অর্থ কী, জীবনের সাফল্য ও ব্যর্থতাকে কীভাবে গ্রহণ করব এই প্রশ্নগুলির প্রতিধ্বনি কৃষ্ণের জীবন ও বাণীতে পাওয়া যায়। তাঁর বাঁশি আমাদের আনন্দের কথা মনে করায়, তাঁর লীলা শেখায় জীবনের সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে, তাঁর সংগ্রাম শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং তাঁর গীতা শেখায় কঠিনতম পরিস্থিতিতেও নিজের কর্তব্য থেকে বিচ্যুত না হতে। কৃষ্ণকথার তাই কোনও শেষ নেই। যুগ বদলায়, মানুষের জীবনযাত্রা বদলায়, সমাজ বদলায়, কিন্তু কৃষ্ণের গল্প নতুন প্রজন্মের কাছে নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। এক শিশুর কাছে তিনি হয়তো মাখনচোর কানাই, এক কিশোরীর কাছে বাঁশিওয়ালা কৃষ্ণ, এক প্রেমিকের কাছে রাধার প্রিয়তম, এক ভক্তের কাছে পরম ঈশ্বর, আর এক সংশয়গ্রস্ত মানুষের কাছে কুরুক্ষেত্রের সেই সারথি, যিনি অন্ধকারের মধ্যে পথ দেখান। মথুরার কারাগারে যে শিশুর জন্ম হয়েছিল, তাঁর কাহিনি তাই কেবল কয়েক হাজার বছরের পুরোনো একটি পুরাণ নয়; তা ভারতীয় মননের এক জীবন্ত ধারাবাহিকতা। জন্মাষ্টমীর মধ্যরাত্রিতে যখন প্রদীপ জ্বলে, শঙ্খ বাজে, কীর্তনের সুর ওঠে এবং উচ্চারিত হয় ‘হরে কৃষ্ণ’ তখন যেন সেই প্রাচীন কাহিনিই আবার নতুন করে জন্ম নেয়। অন্ধকারের ভিতর থেকে আলো, ভয় থেকে সাহস, সংশয় থেকে জ্ঞান এবং বিচ্ছেদের মধ্য থেকে প্রেমের যে পথ কৃষ্ণ দেখিয়েছেন, সেই পথই তাঁকে যুগে যুগে মানুষের আপন করে রেখেছে। তাই কৃষ্ণ শুধু পুরাণের নায়ক নন, তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির এক অনন্ত অনুভব একটি বাঁশির সুর, একটি শিশুর হাসি, একটি মায়ের স্নেহ, একটি প্রেমের অপেক্ষা এবং জীবনের কঠিনতম মুহূর্তে উচ্চারিত এক চিরন্তন বাণী।

তালের নানা পদ
জন্মাষ্টমী মানেই কৃষ্ণের জন্মের আনন্দ, ভক্তির আবেশ আর বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়া এক চেনা মিষ্টি গন্ধ। আর এই সময়ে শরতের আগমনী হাওয়ার সঙ্গে পাকা তালের গন্ধ যেন উৎসবেরই আর এক নাম। তাল শুধু একটি ফল নয়, বাঙালির ঋতুচক্র, রান্নাঘর আর স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আপন স্বাদ। কৃষ্ণের জন্মতিথিতে বাংলার বহু ঘরে নিরামিষ রান্না ও নানা মিষ্টান্নের আয়োজন হয়। সেই আয়োজনে তালের উপস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পাকা তালের রসালো শাঁস, তার স্বতন্ত্র সুগন্ধ আর মিষ্টি স্বাদ দিয়ে তৈরি হয় বড়া, পায়েস, ক্ষীর, পিঠে থেকে শুরু করে কত না ঘরোয়া পদ। কোথাও ঠাকুরের ভোগে, কোথাও পরিবারের সকলের জন্য, তালের পদে মিশে থাকে উৎসবের আন্তরিকতা।

তাল আনা থেকে শুরু করে তাল ছাড়ানো, তার রস বের করা, তারপর যত্ন করে রান্না, পুরো প্রক্রিয়াটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে বাংলার পুরোনো রান্নাঘরের গল্প। মায়ের হাতের তালের বড়া কিংবা ঠাকুমার বানানো তালের পিঠের স্বাদ তাই শুধু রসনার নয়, স্মৃতিরও। জন্মাষ্টমীর দিনে সেই চেনা স্বাদ ফিরে আসে নতুন করে। এই সংকলনে তালের সেই চিরপরিচিত পদগুলির পাশাপাশি থাকছে কিছু নতুন স্বাদের আয়োজন। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মেলবন্ধনে তালকে ঘিরে তৈরি হবে নানা রকম মিষ্টি ও মুখরোচক পদ। কৃষ্ণজন্মের পবিত্র উৎসবে তাই এবারের রান্নাঘর ভরে উঠুক পাকা তালের সুবাসে, ভোগের থালা থেকে পরিবারের ভালোবাসার পাতে, প্রতিটি পদেই থাকুক উৎসবের মাধুর্য।
তাল খাগড়া বা তাল ঘাগড়া
সুপর্ণা মন্ডল

কী কী লাগবে
গোবিন্দভোগ চালের গুঁড়ো দেড় কাপ, ময়দা আধ কাপ, চিনি বা গুড় ৩ টেবিল চামচ, কুচি করা নারকেল ২ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, কুচি করা বাদাম ১ মুঠো, ঘি/ Shalimar's Sunflower তেল ১ কাপ, তালের পাল্প ১ কাপ (প্রয়োজন অনুযায়ী একটু কম-বেশি হতে পারে)।

কীভাবে বানাবেন
ঘি বাদে সমস্ত উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে রুটির আটার মতো নরম করে মেখে নিন। প্রয়োজন হলে আরও একটু তালের পাল্প দিয়ে মাখুন। এবার এক টেবিল চামচ ঘি মাখিয়ে মাখা ময়দা কিছুক্ষণ ভেজা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখুন। এরপর আটাটি রুটির মতো পাতলা করে বেলে নিন। কুকি কাটার দিয়ে পছন্দমতো আকারে কেটে নিন। কড়াইয়ে ঘি গরম করে কেটে রাখা তাল খাগড়াগুলি মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে ভেজে নিন, যতক্ষণ না সেগুলি সুন্দর মচমচে ও সোনালি হয়ে ওঠে। ঠান্ডা হলে বায়ুরোধী পাত্রে সংরক্ষণ করুন। এই তাল খাগড়া বেশ কয়েক দিন পর্যন্ত ভালো থাকে এবং খেতে অনেকটা তালের কুকিজের মতো মচমচে ও সুস্বাদু।
তালের পান্তুয়ার পায়েস
ছবি দত্ত

কী কী লাগবে
তালের পাল্প পরিমাণমতো, গুড় পরিমাণমতো, Shalimar's Sunflower তেল পরিমাণমতো, ঘি পরিমাণমতো, সুজি তালের পাল্পের ১ ভাগ, দুধ বেশি পরিমাণে, চিনি পরিমাণমতো।

কীভাবে বানাবেন
তালের পাল্প ও গুড় একসঙ্গে নিয়ে ভালো করে জ্বাল দিয়ে একটি নরম ও ঘন মিশ্রণ তৈরি করে নিন। এবার সেই মিশ্রণের সঙ্গে এক ভাগ সুজি মিশিয়ে ভালো করে মেখে নিন। মিশ্রণটি দিয়ে ছোট ছোট গোল করে পান্তুয়ার আকারে গড়ে নিন। কড়াইয়ে সাদা তেল ও ঘি একসঙ্গে গরম করে তাতে তালের পান্তুয়াগুলি দিয়ে বাদামি করে ভেজে নিন। অন্য একটি পাত্রে পর্যাপ্ত পরিমাণ দুধ নিয়ে তাতে চিনি দিয়ে ফুটিয়ে ঘন ক্ষীরের মতো করে নিন। এবার ঘন দুধের মধ্যে ভেজে রাখা তালের পান্তুয়াগুলি দিয়ে পাত্রটি ঢেকে কিছুক্ষণ রেখে দিন, যাতে পান্তুয়াগুলি দুধ ভালোভাবে শুষে নেয়। এরপর নামিয়ে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন সুস্বাদু তালের পান্তুয়ার পায়েস।
তালের লুচি
শর্মিষ্ঠা মিত্র

কী কী লাগবে
ময়দা ২ কাপ, তালের পাল্প ১ কাপ, চিনি ২ চা চামচ, লবণ ১/৪ চা চামচ, ভাজার জন্য Shalimar's Sunflower তেল পরিমাণমতো।

কীভাবে বানাবেন
রিফাইন্ড তেল বাদে সমস্ত উপকরণ একসঙ্গে নিয়ে প্রয়োজনমতো জল দিয়ে ভালো করে মেখে নরম মণ্ড তৈরি করে নিন। এবার মণ্ড থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে নিন। প্রতিটি লেচি লুচির মতো বেলে নিন। কড়াইয়ে রিফাইন্ড তেল গরম করে লুচিগুলি একে একে দিয়ে ফুলিয়ে সোনালি করে ভেজে নিন। গরম গরম পরিবেশন করুন। তালের ক্ষীরের সঙ্গে পরিবেশন করলে তালের লুচির স্বাদ আরও বেড়ে যায়।
তালের ক্ষীর
শর্মিষ্ঠা মিত্র

কী কী লাগবে
তালের পাল্প ১ কাপ, দুধ আধ কাপ, নারকেল কোরা ২ টেবিল চামচ, চিনি ২ টেবিল চামচ, কাজুবাদাম ৪টি (অর্ধেক করে নেওয়া)।
কীভাবে বানাবেন
একটি পাত্রে তালের পাল্প, দুধ ও নারকেল কোরা একসঙ্গে মিশিয়ে গ্যাসে বসিয়ে দিন। অনবরত নাড়তে থাকুন, যাতে তলার দিকে লেগে না যায়। ফুটতে ফুটতে মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে চিনি দিয়ে ভালোভাবে নাড়তে থাকুন। আরও কিছুক্ষণ জ্বাল দিয়ে যখন মিশ্রণটি ঘন হয়ে ক্ষীরের মতো হয়ে আসবে, তখন গ্যাস বন্ধ করে দিন। ঠান্ডা হলে ওপর থেকে নারকেল কোরা ও অর্ধেক করা কাজুবাদাম দিয়ে সাজিয়ে পরিবেশন করুন সুস্বাদু তালের ক্ষীর।
তালের ভাজা মালপোয়া
পাপিয়া সান্যাল চৌধুরী

কী কী লাগবে
তালের রস ১ কাপ, ময়দা ১ কাপ, সুজি ১/৪ কাপ, চিনি আধ কাপ (বেশি মিষ্টি চাইলে ৩/৪ কাপ), নারকেল কোরা আধ কাপ, পাউডার দুধ ১/৪ কাপ, কাজুবাদামের গুঁড়ো ২ টেবিল চামচ, দুধ ১ কাপ, এলাচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, কেশর ১/৪ চা চামচ, বেকিং পাউডার ১/৪ চা চামচ, ভাজার জন্য Shalimar's Soyabean তেল বা ঘি পরিমাণমতো।

কীভাবে বানাবেন
প্রথমে ১ টেবিল চামচ গরম জলে কেশর ভিজিয়ে ৫ মিনিট রেখে দিন। একটি পাত্রে ময়দা, সুজি, পাউডার দুধ, কাজুবাদামের গুঁড়ো, নারকেল কোরা ও এলাচ গুঁড়ো ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এবার তালের রস, চিনি ও দুধ দিয়ে ঘন ব্যাটার তৈরি করুন। এর মধ্যে কেশর ভেজানো জল ও বেকিং পাউডার মিশিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। পাত্রটি ঢেকে ৩০ মিনিট রেখে দিন, যাতে সুজি ভালোভাবে ভিজে নরম হয়ে যায়। ৩০ মিনিট পর ব্যাটারটি দেখে নিন। বেশি ঘন হয়ে গেলে সামান্য জল দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। এবার কড়াইয়ে তেল বা ঘি গরম করে এক হাতা করে ব্যাটার দিয়ে দিন। মাঝারি আঁচে দু’পিঠ সোনালি ও ফুলকো করে ভেজে নিন। তৈরি হয়ে যাবে সুস্বাদু তালের ভাজা মালপোয়া।
তালের সন্দেশ
বিনীতা হাজরা গুপ্ত

কী কী লাগবে
ছানা ২০০ গ্রাম, চিনি পরিমাণমতো, তালের পাল্প ১ কাপ, ড্রাই ফ্রুট ২ চা চামচ, গুঁড়ো দুধ আধ কাপ, ঘি/ Shalimar's Soyabean তেল ১ চা চামচ।

কীভাবে বানাবেন
একটি প্যানে ছানা ও চিনি দিয়ে অল্প আঁচে নাড়াচাড়া করুন। এবার এতে তালের পাল্প ও গুঁড়ো দুধ দিয়ে ভালোভাবে নাড়তে থাকুন। মিশ্রণটি যখন মাখো মাখো হয়ে প্যানের গা ছেড়ে আসতে শুরু করবে, তখন ঘি দিয়ে আরও কিছুক্ষণ নেড়ে নিন। এরপর মিশ্রণটি একটি প্লেটে ঢেলে সমান করে ছড়িয়ে দিন। ওপর থেকে ড্রাই ফ্রুট ছড়িয়ে দিয়ে কিছুটা ঠান্ডা হতে দিন। ঠান্ডা হলে পছন্দমতো আকারে কেটে নিলেই তৈরি সুস্বাদু তালের সন্দেশ।
খোয়া ক্ষীর তাল মোদক
পৌলমী পান্ডে

কী কী লাগবে
খোয়া ক্ষীর (মাওয়া) ১০০ গ্রাম, তালের পাল্প ২০০ গ্রাম, সুজি ২ টেবিল চামচ, দুধ ১ কাপ, চিনি ৫ টেবিল চামচ।
কীভাবে বানাবেন
একটি ভারী তলার কড়াইয়ে অল্প আঁচে সুজি শুকনো ভেজে নিন। সুজি হালকা সোনালি রং হয়ে সুন্দর গন্ধ বের হলে নামিয়ে আলাদা করে রাখুন। একই কড়াইয়ে দুধ দিয়ে ফুটতে দিন। এবার তালের পাল্প দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে ৪–৫ মিনিট রান্না করুন, যতক্ষণ না দুধের সঙ্গে তাল ভালোভাবে মিশে যায়। এবার খোয়া ঝুরঝুরে করে দিয়ে দিন। দুধ ও তালের মিশ্রণের সঙ্গে খোয়া ভালোভাবে মিশে যাওয়া পর্যন্ত নাড়তে থাকুন। এরপর ধীরে ধীরে ভাজা সুজি দিয়ে ক্রমাগত নাড়তে থাকুন, যাতে কোনও দলা না হয়। চিনি দিয়ে ভালোভাবে নাড়তে থাকুন। মিশ্রণটি ঘন হয়ে কড়াইয়ের গা ছেড়ে এলে গ্যাস বন্ধ করে দিন। মিশ্রণটি কিছুটা ঠান্ডা হতে দিন। তবে মোদক তৈরির সময় মিশ্রণটি হালকা গরম থাকা প্রয়োজন। মোদকের ছাঁচে সামান্য ঘি মাখিয়ে নিন। অল্প অল্প করে মিশ্রণ নিয়ে ছাঁচে ভরে চাপ দিয়ে মোদকের আকার দিন। ছাঁচ থেকে সাবধানে বের করে ঘরের তাপমাত্রায় সেট হতে দিন। সেট হয়ে গেলে পরিবেশন করুন সুস্বাদু খোয়া তাল মোদক।
তালের ক্ষীর
নবনীতা ব্যানার্জী

কী কী লাগবে
পাকা মাঝারি মাপের তাল ১টি, নারকেল কোরা ১ কাপ, দুধ আধ লিটার, কনডেন্সড মিল্ক আধ কাপ, চিনি ১ কাপ।

কীভাবে বানাবেন
প্রথমে পাকা তাল থেকে ভালোভাবে পাল্প বের করে নিন। নারকেল কুরিয়ে আলাদা করে রাখুন। একটি পাত্রে দুধ ফুটিয়ে ঘন করে নিন। অন্য একটি কড়াইয়ে তালের পাল্প দিয়ে অল্প আঁচে জ্বাল দিতে থাকুন। পাল্প কিছুটা শুকিয়ে এলে তাতে ঘন করে রাখা দুধ ও নারকেল কোরা দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
মিশ্রণটি নাড়তে নাড়তে কিছুটা শুকিয়ে এলে চিনি দিয়ে দিন। অনবরত নাড়তে থাকুন, যাতে মিশ্রণটি কড়াইয়ের তলায় লেগে না যায়। চিনি সম্পূর্ণ গলে গেলে কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। আরও কিছুক্ষণ নাড়তে থাকুন। মিশ্রণটি যখন ঘন হয়ে মাখামাখা অবস্থায় চলে আসবে, তখন গ্যাস বন্ধ করে দিন। তালের ক্ষীর ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ঠান্ডা হতে দিন। এরপর ১–২ ঘণ্টা ফ্রিজে রেখে ভালোভাবে ঠান্ডা করে নিন। পরিবেশনের আগে ওপর থেকে কিশমিশ, কুচোনো আমন্ড, পেস্তা ও নারকেল কোরা ছড়িয়ে দিন। ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন সুস্বাদু তালের ক্ষীর।
তালের পাটিসাপটা
কেয়া দত্ত গুহ

কীভাবে বানাবেন
তালের পাল্প, চালের গুঁড়ো, ময়দা, সুজি, দুধ, চিনি বা গুড়, নারকেল কোরা, খোয়া ক্ষীর, এলাচ গুঁড়ো, নুন, ঘি বা Shalimar's Sunflower তেল পরিমাণমতো।
কীভাবে বানাবেন
প্রথমে চালের গুঁড়ো, ময়দা ও সামান্য সুজি একসঙ্গে মিশিয়ে তাতে তালের পাল্প, দুধ, সামান্য নুন ও চিনি দিয়ে পাতলা ও মসৃণ ব্যাটার তৈরি করে নিন। ব্যাটারটি কিছুক্ষণ ঢাকা দিয়ে রেখে দিন, যাতে সুজি ভালোভাবে ভিজে যায়। এবার একটি প্যানে সামান্য ঘি বা তেল মাখিয়ে এক হাতা করে ব্যাটার ঢেলে পাতলা করে ছড়িয়ে দিন। দু’দিক ভালোভাবে সেঁকে নিন। আলাদা একটি পাত্রে নারকেল কোরা, গুড় বা চিনি, ক্ষীর ও এলাচ গুঁড়ো দিয়ে পুর তৈরি করে নিন। এবার তৈরি করা তালের পাটিসাপটার মধ্যে পুর দিয়ে রোল করে নিন। এভাবেই সবকটি পাটিসাপটা তৈরি করে গরম বা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।
তালের পায়েস
শুভ্রা সাহা

কী কী লাগবে
তালের পাল্প ১ কাপ, দুধ ১ লিটার, গোবিন্দভোগ চাল ১০০ গ্রাম, চিনি ১৫০ গ্রাম, কাজু, কিশমিশ ও আমন্ড কুচি আধ কাপ।

কীভাবে বানাবেন
প্রথমে দুধ ভালোভাবে ফুটিয়ে নিন। গোবিন্দভোগ চাল ধুয়ে জল ঝরিয়ে ফুটন্ত দুধের মধ্যে দিয়ে দিন। অল্প আঁচে নাড়তে নাড়তে চাল ভালোভাবে সেদ্ধ হতে দিন। চাল ফুটে নরম হয়ে এলে চিনি, তালের পাল্প, কাজু, কিশমিশ ও আমন্ড কুচি দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে আরও কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিন। পায়েস ঘন হয়ে এলে গ্যাস বন্ধ করে দিন। পরিবেশনের সময় ওপর থেকে আমন্ড কুচি ছড়িয়ে দিন। তৈরি সুস্বাদু তালের পায়েস।
তালের পোলাও
মালা রায়

কী কী লাগবে
গোবিন্দভোগ চাল ২ কাপ, তালের ক্বাথ বা রস ১ বাটি, ঘি বা Shalimar's Sunflower তেল পরিমাণমতো, কাজু ও কিশমিশ পরিমাণমতো, এলাচ ৪টি, দারচিনি ২ টুকরো, তেজপাতা ২টি, স্টার অ্যানিস ১টি, চিনি আধ বাটি (স্বাদমতো), নুন স্বাদমতো, ঈষদুষ্ণ জল ৪ কাপ।
কীভাবে বানাবেন
প্রথমে গোবিন্দভোগ চাল ভালোভাবে ধুয়ে জল ঝরিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। কড়াইয়ে ঘি গরম করে কাজু ও কিশমিশ হালকা ভেজে তুলে রাখুন। ওই একই ঘিয়ের মধ্যে তেজপাতা, এলাচ, দারচিনি ও স্টার অ্যানিস দিয়ে ফোড়ন দিন। এবার জল ঝরানো চাল দিয়ে মৃদু আঁচে ২–৩ মিনিট ভালোভাবে ভেজে নিন। চাল ভাজা হয়ে গেলে তাতে এক বাটি তালের ক্বাথ, পরিমাণমতো চিনি ও সামান্য নুন দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এরপর ৪ কাপ ঈষদুষ্ণ জল দিয়ে নেড়ে কড়াই ঢেকে মাঝারি আঁচে রান্না হতে দিন। জল কিছুটা শুকিয়ে চালের সমান সমান হয়ে এলে ঢাকনা খুলে ভেজে রাখা কাজু ও কিশমিশ ছড়িয়ে দিন। আঁচ একেবারে কমিয়ে ঢেকে ১০–১২ মিনিট দমে রাখুন। চাল সম্পূর্ণ সেদ্ধ হয়ে ঝরঝরে হয়ে গেলে গ্যাস বন্ধ করে দিন। তৈরি সুগন্ধী ও সুস্বাদু তালের পোলাও। গরম গরম পরিবেশন করুন।
শিল্প ও পটচিত্রে কৃষ্ণলীলা
ভারতীয় সংস্কৃতির আকাশে শ্রীকৃষ্ণ এমন এক চরিত্র, যাঁকে ঘিরে ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য ও চিত্রকলার অসংখ্য ধারা যুগে যুগে বিকশিত হয়েছে। কখনও তিনি বৃন্দাবনের দুরন্ত বালক, কখনও গোপীদের প্রাণের কানাই, কখনও মথুরার অত্যাচার-বিরোধী নায়ক, আবার কখনও কুরুক্ষেত্রের সারথি ও গীতার দার্শনিক। কৃষ্ণের জীবনের নানা পর্ব অর্থাৎ ‘কৃষ্ণলীলা’ শুধু ধর্মীয় আখ্যান নয়, ভারতীয় শিল্পভাবনারও এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। মন্দিরের দেওয়াল থেকে রাজদরবারের চিত্র, লোকশিল্পের পট থেকে আধুনিক শিল্পীর ক্যানভাস সর্বত্র কৃষ্ণ তাঁর নানা রূপে ধরা দিয়েছেন। কৃষ্ণকে নিয়ে শিল্পচর্চার অন্যতম আকর্ষণ হল তাঁর চরিত্রের বহুমাত্রিকতা। একই মানুষ কখনও শিশুর সারল্যে মাখা, কখনও প্রেমিক, কখনও কূটনীতিক, কখনও যোদ্ধা, আবার কখনও জ্ঞান ও কর্তব্যের পথপ্রদর্শক। তাই শিল্পীর কাছে কৃষ্ণ কেবল একটি পৌরাণিক চরিত্র নন; তিনি হয়ে ওঠেন সৌন্দর্য, প্রেম, আনন্দ, বেদনা, সংগ্রাম এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। কৃষ্ণলীলার প্রতিটি অধ্যায় যেন শিল্পীর হাতে একটি আলাদা রঙ ও অনুভূতির জন্ম দেয়।

কৃষ্ণের জন্মকাহিনি ভারতীয় চিত্রকলায় বিশেষভাবে জনপ্রিয়। কারাগারের অন্ধকারে দেবকীর কোলে কৃষ্ণের আবির্ভাব, কংসের অত্যাচারের আশঙ্কায় বাসুদেবের শিশুকৃষ্ণকে নিয়ে যমুনা পার হওয়া, ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে শেশনাগের ফণা দিয়ে শিশুকে রক্ষা করা এই দৃশ্যগুলির মধ্যে নাটকীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে গভীর প্রতীকী তাৎপর্য। অন্ধকার কারাগারে শিশুকৃষ্ণের আবির্ভাবকে শিল্পীরা বহু সময় আলো ও অন্ধকারের বৈপরীত্যে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিপদের মধ্যেও নতুন আশার জন্ম এই ভাবটিই সেখানে প্রধান হয়ে ওঠে।
শিশুকৃষ্ণের লীলাচিত্র ভারতীয় শিল্পের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অধ্যায়গুলির একটি। যশোদার কোলে কৃষ্ণ, মাখনচুরি, গোপালদের সঙ্গে খেলাধুলো, হামাগুড়ি দিয়ে চলা, দইয়ের হাঁড়ি ভাঙা কিংবা মায়ের কাছে ধরা পড়ে দুষ্টুমির জন্য শাসন খাওয়া এসব দৃশ্যের মধ্যে ঈশ্বরের মহিমার চেয়ে শিশুর স্বাভাবিক সারল্যই বেশি গুরুত্ব পায়। শিল্পীর তুলিতে কৃষ্ণের মুখে ফুটে ওঠে হাসি, চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক, হাতে মাখনের দলা। এইসব চিত্র মানুষের কাছে দেবত্বকে আরও আপন করে তোলে। ‘মাখনচোর’ কৃষ্ণের ছবি ভারতীয় শিল্পে বিশেষ জনপ্রিয়। গোপিনীদের ঘরে ঢুকে মাখন চুরি করা, বন্ধুদের নিয়ে সেই মাখন ভাগ করে খাওয়া কিংবা মাখনের হাঁড়ি ভাঙার দৃশ্য লোকশিল্প থেকে শাস্ত্রীয় চিত্রকলায় বারবার ফিরে এসেছে। এখানে কৃষ্ণের দুষ্টুমি আসলে ভালোবাসার এক রূপ। তিনি ভক্তের ঘরে প্রবেশ করেন, তাদের সঞ্চিত মাখন চুরি করেন, কিন্তু বিনিময়ে রেখে যান আনন্দ। এই কারণেই কৃষ্ণের মাখনচুরি ভারতীয় লোকসংস্কৃতিতে নিছক হাসির গল্প নয়, ভক্তি ও ঈশ্বরের ঘনিষ্ঠতার প্রতীকও।
কৃষ্ণলীলার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব হল কালীয়দমন। বিষাক্ত সর্প কালীয়ের ফণার উপর কৃষ্ণের নৃত্য ভারতীয় শিল্পীদের কাছে অসাধারণ একটি দৃশ্যরচনার সুযোগ তৈরি করেছে। একদিকে রয়েছে কালীয়ের বিশাল ফণা, অন্যদিকে তার উপর নির্ভীক কৃষ্ণের নৃত্যরত অবয়ব। চারপাশে আতঙ্কিত বৃন্দাবনবাসী, যমুনার জল, সর্পের কুণ্ডলী—সব মিলিয়ে এই দৃশ্যে গতি ও নাটকীয়তা প্রবল। শিল্পীর কাছে এটি শুধু পৌরাণিক বীরত্বের ছবি নয়; অশুভের উপর শুভের জয় এবং বিষাক্ততার উপর জীবনের প্রতিষ্ঠার প্রতীক। গোবর্ধনধারণ কৃষ্ণচিত্রের আর একটি চিরন্তন বিষয়। ইন্দ্রের প্রবল বৃষ্টির হাত থেকে বৃন্দাবনের মানুষ ও গবাদি পশুকে রক্ষা করতে কৃষ্ণ যখন কনিষ্ঠ আঙুলে গোবর্ধন পর্বত তুলে ধরেন, সেই দৃশ্য অসংখ্য শিল্পীর কল্পনাকে আলোড়িত করেছে। পাহাড়ের নিচে আশ্রয় নেওয়া মানুষ, গরু-বাছুর, কৃষ্ণের শান্ত মুখ এবং আকাশজুড়ে বৃষ্টির দৃশ্য—সব মিলিয়ে একটি বিশাল সামাজিক ছবির জন্ম হয়। এখানে কৃষ্ণ শুধু দেবতা নন, তিনি হয়ে ওঠেন আশ্রয়দাতা। মানুষের বিপদের সময়ে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতীক হিসেবেও এই লীলার ব্যাখ্যা করা যায়।

তবে কৃষ্ণলীলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিল্পিত হয়েছে বৃন্দাবনের প্রেম ও রাধাকৃষ্ণের সম্পর্ক। রাধা ও কৃষ্ণ ভারতীয় শিল্পে প্রেমের এমন এক আদর্শ নির্মাণ করেছেন, যেখানে পার্থিব প্রেম ধীরে ধীরে আধ্যাত্মিকতার দিকে পৌঁছে যায়। বাঁশি হাতে কৃষ্ণ, তাঁর দিকে আকৃষ্ট রাধা, কদমগাছ, যমুনার তীর, গোধূলির আকাশ, ফুলে ভরা বৃন্দাবন—এইসব উপাদান মিলিয়ে ভারতীয় চিত্রকলায় তৈরি হয়েছে এক স্বপ্নময় জগৎ। রাধার অপেক্ষা, অভিমান, বিরহ, মিলন প্রেমের প্রতিটি অনুভূতিই শিল্পীর তুলিতে পেয়েছে আলাদা ভাষা। ‘রাসলীলা’ কৃষ্ণচিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিষয়। শরৎরাত্রির চাঁদের আলোয় বৃন্দাবনে কৃষ্ণ ও গোপীদের নৃত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বহু শতাব্দীর শিল্পঐতিহ্য। রাসচিত্রে বৃত্তাকার বিন্যাস, নৃত্যের ছন্দ, কৃষ্ণের বহুরূপী উপস্থিতি এবং গোপীদের আবেগ এক বিশেষ দৃশ্যসঙ্গীত তৈরি করে। এখানে কৃষ্ণের সঙ্গে প্রতিটি গোপীর সম্পর্ক যেন ব্যক্তিগত, অথচ সেই ব্যক্তিগত প্রেমই বৃহত্তর ভক্তির অংশ। তাই রাসলীলা ভারতীয় শিল্পে প্রেম, ভক্তি ও আত্মসমর্পণের এক অনন্য প্রতীক।
কৃষ্ণের বাঁশিও শিল্পীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। বাঁশির সুরে বৃন্দাবনের মানুষ, গোপী, পশুপাখি—সবাই যেন মোহিত। চিত্রকলায় তাই বাঁশি হাতে কৃষ্ণের পাশে প্রায়ই দেখা যায় রাধা, গোপী, ময়ূর, গরু কিংবা বৃন্দাবনের বৃক্ষরাজি। বাঁশি এখানে শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়; এটি এমন এক আহ্বানের প্রতীক, যা মানুষের অন্তরের গভীরে পৌঁছে যায়। কৃষ্ণের বাঁশির সুর যেন আত্মাকে তার চিরপরিচিত উৎসের দিকে ফিরে যাওয়ার ডাক। এই কৃষ্ণভাবনা বাংলার পটচিত্রেও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলার পটশিল্প মূলত লোকজ আখ্যানকে দৃশ্য ও গানের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক প্রাচীন মাধ্যম। পটুয়ারা লম্বা পটে একের পর এক ছবি আঁকেন এবং সেই ছবির সঙ্গে মিলিয়ে গান বা পটের কথা পরিবেশন করেন। কৃষ্ণের জন্ম, বাল্যলীলা, কালীয়দমন, গোবর্ধনধারণ, রাধাকৃষ্ণের প্রেম, রাসলীলা—কৃষ্ণকেন্দ্রিক নানা আখ্যান বাংলার পটচিত্রে স্থান পেয়েছে।
বাংলার পটচিত্রে কৃষ্ণকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটাই আলাদা। এখানে রাজদরবারের পরিশীলিত সৌন্দর্যের বদলে দেখা যায় মাটির কাছাকাছি মানুষের জীবনবোধ। পটুয়ার কৃষ্ণের চোখ বড়, মুখাবয়ব স্পষ্ট, শরীরের রেখা দৃঢ় এবং রঙ সাধারণত উজ্জ্বল। লাল, হলুদ, সবুজ, নীল, কালো প্রভৃতি রঙের ব্যবহার ছবিকে সহজেই চোখে পড়ার মতো করে তোলে। প্রতিটি দৃশ্যের মধ্যে থাকে গল্প বলার স্পষ্টতা। ফলে যাঁরা পড়তে জানতেন না, তাঁরাও ছবি দেখে এবং পটুয়ার গান শুনে কৃষ্ণের কাহিনি বুঝতে পারতেন। পটচিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার ধারাবাহিকতা। একটি পটে কৃষ্ণের জীবনের একাধিক ঘটনা পাশাপাশি দেখা যেতে পারে। এক অংশে কৃষ্ণের জন্ম, পরের অংশে যমুনা পার হওয়া, অন্য অংশে গোকুলের দুষ্টুমি, আবার কোথাও কালীয়দমন বা গোবর্ধনধারণ। ফলে পট হয়ে ওঠে যেন একটি চলমান চিত্রকথা। পটুয়ার গান সেই ছবিগুলিকে প্রাণ দেয়। দৃশ্য ও শব্দের এই মিলিত শিল্পরূপ কৃষ্ণলীলাকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের পটচিত্রে কৃষ্ণের নানা রূপ দেখা যায়। বিশেষত মেদিনীপুরের পটুয়ারা পৌরাণিক আখ্যানকে নিজেদের লোকজ ভাষা ও শিল্পরীতিতে প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ছবিতে কৃষ্ণ কখনও শিশুরূপে, কখনও বীরের বেশে, আবার কখনও রাধার সঙ্গে প্রেমের মুহূর্তে উপস্থিত। স্থানীয় শিল্পরীতির প্রভাব থাকলেও মূল আখ্যানের সঙ্গে যুক্ত থাকে ভক্তি ও লোকবিশ্বাস। এভাবেই কৃষ্ণলীলা উচ্চাঙ্গ শিল্পের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামবাংলার মানুষের দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। ভারতের অন্যান্য লোকশিল্পেও কৃষ্ণের উপস্থিতি অত্যন্ত শক্তিশালী। ওড়িশার পটচিত্রে জগন্নাথ সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষ্ণভাবনার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রাজস্থানের ক্ষুদ্রচিত্রে কৃষ্ণ-রাধার প্রেম, বৃন্দাবনের প্রকৃতি এবং রাসলীলা অসাধারণ সূক্ষ্মতায় ফুটে উঠেছে। পাহাড়ি চিত্রকলায় কৃষ্ণের প্রেমলীলা পেয়েছে কোমল, রোম্যান্টিক ও প্রকৃতিনির্ভর রূপ। মথুরা ও বৃন্দাবনের চিত্রশিল্পে কৃষ্ণের বাল্যলীলা ও ভক্তির নানা দৃশ্যও বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
কৃষ্ণচিত্রে প্রকৃতির উপস্থিতিও লক্ষণীয়। কদমগাছ, যমুনা, ময়ূর, গরু, পদ্ম, ফুল, চাঁদের আলো—এসব শুধু ছবির অলংকার নয়। এগুলি কৃষ্ণের সঙ্গে যুক্ত এক সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য তৈরি করে। বৃন্দাবন তাই শিল্পীর কাছে শুধু একটি স্থান নয়; এটি প্রেম, আনন্দ ও ভক্তির মানসিক পরিসর। রাধাকৃষ্ণের ছবিতে প্রকৃতি যেন তাঁদের অনুভূতিরই সম্প্রসারণ। বিরহের দৃশ্যে গাছ ও নদীও যেন বিষণ্ণ, আর মিলনের দৃশ্যে চারপাশের প্রকৃতিও হয়ে ওঠে উজ্জ্বল। সময়ের সঙ্গে কৃষ্ণের শিল্পরূপও বদলেছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় মন্দিরশিল্প থেকে রাজদরবারের চিত্রকলায় কৃষ্ণের যে রূপ দেখা যায়, আধুনিক শিল্পীরা তাঁকে অনেক সময় ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। কারও কাছে তিনি প্রেমের প্রতীক, কারও কাছে মানবতার, কারও কাছে সংগ্রামের, আবার কারও কাছে অন্তরের মুক্তির প্রতীক। আধুনিক ক্যানভাসে কৃষ্ণের বাঁশি, ময়ূরের পালক, নীল অবয়ব কিংবা শুধু চোখ ও মুখের রেখা দিয়েও শিল্পীরা তাঁর উপস্থিতি অনুভব করিয়েছেন।
কৃষ্ণের নীলবর্ণও শিল্পীদের কল্পনায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আকাশ ও সমুদ্রের মতো অসীম নীল রঙ কৃষ্ণের অসীম সত্তার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাঁর মাথায় ময়ূরের পালক, হাতে বাঁশি, গলায় মালা এবং হলুদ পীতাম্বর—এই চেনা বৈশিষ্ট্যগুলি তাঁকে শিল্পে সহজে শনাক্তযোগ্য করে তোলে। কিন্তু শিল্পীর কল্পনায় এই পরিচিত প্রতীকগুলিই বারবার নতুন অর্থ লাভ করে। কৃষ্ণলীলা তাই কেবল পৌরাণিক কাহিনির চিত্রায়ণ নয়; এটি ভারতীয় সমাজের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক স্মৃতির দৃশ্যমান দলিল। মন্দিরের ভাস্কর্য, রাজদরবারের ক্ষুদ্রচিত্র, লোকশিল্পের পট, কাঁথার নকশা কিংবা আধুনিক শিল্পীর ক্যানভাস—প্রতিটি মাধ্যমে কৃষ্ণ নতুনভাবে জন্ম নিয়েছেন। কোথাও তিনি দুষ্টু গোপাল, কোথাও প্রেমিক, কোথাও রক্ষাকর্তা, কোথাও দার্শনিক।
সবচেয়ে বড় কথা, কৃষ্ণের শিল্পরূপ কখনও এক জায়গায় থেমে থাকেনি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিল্পী তাঁকে নিজেদের সময়, সমাজ ও অনুভূতির সঙ্গে মিলিয়ে নতুন করে এঁকেছেন। বাংলার পটুয়ার সরল রেখায় যেমন কৃষ্ণ প্রাণ পেয়েছেন, তেমনই রাজস্থানের সূক্ষ্ম ক্ষুদ্রচিত্রেও তিনি হয়ে উঠেছেন প্রেমের অনন্ত প্রতীক। আধুনিক শিল্পীর বিমূর্ত রঙেও তাঁর উপস্থিতি অনুভূত হয়েছে। এই বহুরূপিতাই কৃষ্ণকে ভারতীয় শিল্পের অন্যতম চিরন্তন বিষয় করে রেখেছে। কৃষ্ণলীলা আসলে মানুষের জীবনেরই নানা অনুভূতির শিল্পরূপ—শৈশবের আনন্দ, প্রেমের আকুলতা, বিরহের যন্ত্রণা, বিপদের সময়ে আশ্রয়ের প্রয়োজন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং শেষ পর্যন্ত সত্য ও কর্তব্যের পথে এগিয়ে চলা। তাই যুগ বদলায়, শিল্পের মাধ্যম বদলায়, রঙ ও রেখার ভাষা বদলায়, কিন্তু কৃষ্ণের গল্পের আবেদন ফুরোয় না। পটুয়ার পট থেকে আধুনিক গ্যালারির দেওয়াল—যেখানেই কৃষ্ণ আসেন, সেখানেই তাঁর বাঁশির অদৃশ্য সুর যেন মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হল মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা।
দেশ জুড়ে জন্মাষ্টমী
ভারতবর্ষ উৎসবের দেশ। এ দেশের প্রতিটি ঋতু, প্রতিটি মাস, এমনকি প্রতিটি অঞ্চলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা আচার, বিশ্বাস ও উৎসবের গল্প। সেই উৎসবের ভুবনে জন্মাষ্টমী এক বিশেষ আবেগের নাম। ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পালিত হয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি। কোথাও তিনি লাড্ডুগোপাল, কোথাও কানাই, কোথাও গোপাল, আবার কোথাও দ্বারকাধীশ—নাম ও রীতির বদল হলেও তাঁকে ঘিরে মানুষের ভালোবাসা একই রকম। জন্মাষ্টমী তাই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং ভারতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, লোকাচার, সঙ্গীত, খাদ্য, শিল্প ও পারিবারিক আবেগের এক অনন্য মিলনমেলা। পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের কারাগারে দেবকী ও বসুদেবের অষ্টম সন্তান হিসেবে জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ। কংসের অত্যাচার থেকে তাঁকে রক্ষা করতে জন্মের পর গভীর রাতে বসুদেব তাঁকে নিয়ে যাত্রা করেন গোকুলের উদ্দেশে। প্রবল বর্ষণ, উত্তাল যমুনা এবং অন্ধকার রাত পেরিয়ে শিশুকৃষ্ণকে পৌঁছে দেওয়া হয় নন্দ ও যশোদার ঘরে। সেই অলৌকিক জন্মকাহিনিই আজও জন্মাষ্টমীর মূল আবেগ। মধ্যরাত্রিতে শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টার আওয়াজ, উলুধ্বনি ও নামসংকীর্তনের মধ্যে যখন কৃষ্ণের জন্মমুহূর্ত উদ্যাপিত হয়, তখন মনে হয় বহু শতাব্দী পেরিয়েও সেই রাতের গল্প যেন জীবন্ত হয়ে আছে।
বাংলায় জন্মাষ্টমীর আবহে মিশে থাকে ঘরোয়া ভক্তি ও শৈশবের স্মৃতি। অনেক বাড়িতে ছোট্ট কৃষ্ণের জন্য সাজানো হয় বিশেষ দোলনা। পিতল, কাঠ বা মাটির দোলনায় বসানো হয় গোপালকে। ফুল, তুলসীপাতা, আলপনা, প্রদীপ ও নানা সাজসজ্জায় তৈরি হয় ছোট্ট এক বৃন্দাবন। পরিবারের ছোটরা নতুন পোশাক পরে কৃষ্ণের সাজে সেজে ওঠে। কারও মাথায় ময়ূরের পালক, হাতে বাঁশি, পরনে হলুদ ধুতি। কোথাও আবার শিশুদের নিয়ে তৈরি হয় কৃষ্ণলীলা। মধ্যরাতে কৃষ্ণের জন্মের পর তাঁকে দোলনায় দোলানো এবং প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিনের প্রধান পর্ব। জন্মাষ্টমীর সঙ্গে বাংলার ঘরোয়া রান্নারও রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। অনেক পরিবারে এই দিন নিরামিষ বা ফলাহার পালন করা হয়। ফল, মাখন, দুধ, দই, ক্ষীর, ছানা, নাড়ু, মিষ্টি দিয়ে সাজানো হয় ভোগের থালা। কোথাও তৈরি হয় পায়েস, কোথাও মাখন-মিছরি, আবার কোথাও কৃষ্ণের প্রিয় বলে পরিচিত নানা মিষ্টান্ন নিবেদন করা হয়। উপবাসের পর মধ্যরাতে পুজো শেষ করে প্রসাদ গ্রহণের রীতিও বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এই খাদ্যসংস্কৃতির মধ্যেও কৃষ্ণের বাল্যজীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গোপালক-সংস্কৃতির স্মৃতি যেন ফিরে আসে।
তবে জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে বর্ণময় রূপ দেখা যায় ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে। উত্তরপ্রদেশের মথুরা ও বৃন্দাবনে এই উৎসবের আবেগ অন্য মাত্রা পায়। কারণ এই অঞ্চলকে কৃষ্ণের জন্ম ও শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত ভূমি হিসেবে দেখা হয়। মন্দিরগুলি ফুল, আলো ও নানা সাজে সেজে ওঠে। ভক্তরা দূরদূরান্ত থেকে এসে অংশ নেন কীর্তন, ভজন ও বিশেষ পুজোয়। জন্মভূমি মন্দিরকে ঘিরে থাকে বিপুল উৎসাহ। মধ্যরাত্রিতে কৃষ্ণজন্মের মুহূর্তে মন্দিরের পরিবেশ হয়ে ওঠে গভীর আবেগময়। ঘণ্টা, শঙ্খ, কীর্তন এবং ‘হরে কৃষ্ণ’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে চারদিক। বৃন্দাবনের জন্মাষ্টমীতে মন্দিরসজ্জার পাশাপাশি কৃষ্ণের বাল্যলীলা ও রাসলীলার নানা উপস্থাপনাও দেখা যায়। কৃষ্ণ ও রাধার কাহিনি, গোপীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, বৃন্দাবনের কুঞ্জবন—সবকিছুই শিল্প ও ভক্তির মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। রাসলীলা শুধু ধর্মীয় অভিনয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উত্তর ভারতের লোকনাট্য, সঙ্গীত ও নৃত্যের দীর্ঘ ঐতিহ্য। ছোট-বড় শিল্পীরা বহুদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে এই পরিবেশনায় অংশ নেন।
মহারাষ্ট্রে জন্মাষ্টমী মানেই ‘দহি হান্ডি’র উত্তেজনা। কৃষ্ণের মাখনচুরির বাল্যকাহিনিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই জনপ্রিয় লোকউৎসব। রাস্তার মাঝখানে অনেক উঁচুতে ঝোলানো হয় দই বা মাখনে ভরা হাঁড়ি। তরুণেরা দল বেঁধে মানবপিরামিড তৈরি করে সেই হাঁড়ি ভাঙার চেষ্টা করেন। চারপাশে তখন বাজতে থাকে ঢাক, তাশা ও নানা বাদ্যযন্ত্র। দর্শকদের উল্লাস, দলের স্লোগান এবং জল ছোড়ার আনন্দে তৈরি হয় উৎসবের নিজস্ব উত্তেজনা। মুম্বই ও মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে দহি হান্ডি এখন শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবেরও একটি বড় অংশ।
গুজরাতে জন্মাষ্টমীর সঙ্গে যুক্ত হয় লোকনৃত্যের ছন্দ। কৃষ্ণের প্রতি ভক্তি সেখানে গান ও নাচের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মন্দিরে পুজোর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত হয় ভজন, কীর্তন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রঙিন পোশাক, সঙ্গীত ও নৃত্যের মধ্যে কৃষ্ণভক্তির এক প্রাণবন্ত রূপ ফুটে ওঠে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের উচ্ছ্বাসও বাড়তে থাকে। দক্ষিণ ভারতেও জন্মাষ্টমী পালনের নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে। তামিলনাড়ুতে অনেক বাড়িতে কৃষ্ণের ছোট ছোট পায়ের ছাপ আঁকা হয়। দরজা থেকে পুজোর ঘর পর্যন্ত চালের গুঁড়ো বা অন্য উপকরণ দিয়ে আঁকা সেই পদচিহ্ন দেখে মনে হয়, ছোট্ট গোপাল যেন সদ্য ঘরে প্রবেশ করেছেন। শিশুরা কৃষ্ণের সাজে সেজে ওঠে এবং বাড়ির মহিলারা বিশেষ আলপনা ও রান্নার আয়োজন করেন। এই ঘরোয়া রীতির মধ্যে জন্মাষ্টমী হয়ে ওঠে একেবারে পরিবারের নিজস্ব উৎসব।
কেরলেও কৃষ্ণভক্তির নানা আচার দেখা যায়। মন্দিরে বিশেষ পুজো, ভজন ও প্রদীপসজ্জার পাশাপাশি অনেক পরিবারে ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি হয়। কর্ণাটকের উড়ুপি কৃষ্ণ মন্দিরে জন্মাষ্টমীর উৎসব বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কৃষ্ণকে ঘিরে সেখানে বহু পুরনো মন্দির-সংস্কৃতি ও ভক্তিরীতি রয়েছে। জন্মাষ্টমীর সময়ে মন্দির ও আশপাশের এলাকা সেজে ওঠে উৎসবের সাজে। ওড়িশার জন্মাষ্টমীতেও কৃষ্ণভক্তির সঙ্গে মিশে আছে সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। জগন্নাথ সংস্কৃতির সঙ্গে কৃষ্ণতত্ত্বের গভীর যোগ থাকায় কৃষ্ণজন্মের কাহিনি এখানে বিশেষভাবে উদ্যাপিত হয়। মন্দিরে পুজো, ভজন, কীর্তন এবং ধর্মীয় পাঠের পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গায় কৃষ্ণের জীবনকাহিনি নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। কৃষ্ণকে কখনও দেবতা, কখনও ঘরের আদরের সন্তান হিসেবে ভাবার যে ভারতীয় ঐতিহ্য, ওড়িশার জন্মাষ্টমীতেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।
অসম ও মণিপুরেও জন্মাষ্টমীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক রূপ রয়েছে। বৈষ্ণব সংস্কৃতির প্রভাবিত অঞ্চলে নামসংকীর্তন, ভজন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়। মণিপুরে কৃষ্ণ-রাধার প্রেমকাহিনি এবং বৈষ্ণব পদাবলির সঙ্গে যুক্ত নৃত্য ও সঙ্গীত এই উৎসবকে আরও শিল্পময় করে তোলে। ভক্তি সেখানে শুধু পুজোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; নৃত্যের অঙ্গভঙ্গি, গানের সুর এবং মঞ্চের পরিবেশনাতেও প্রকাশ পায়। দেশের নানা প্রান্তে রীতির এত বৈচিত্র্য থাকলেও জন্মাষ্টমীর মূল বার্তা এক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জয়, অন্ধকারের মধ্যে আলোর আগমন এবং সংকটের মধ্যেও আশার জন্ম—কৃষ্ণের জন্মকাহিনির মধ্যে এই চিরন্তন ভাবনাগুলিই নিহিত। কংসের অত্যাচার থেকে শুরু করে কুরুক্ষেত্রের ধর্মযুদ্ধ পর্যন্ত কৃষ্ণের জীবনকাহিনি ভারতীয় সংস্কৃতিতে ন্যায়, কর্তব্য, বুদ্ধি ও মানবিকতার নানা প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। তাই জন্মাষ্টমী শুধু অতীতের একটি পৌরাণিক ঘটনার স্মরণ নয়; বর্তমান জীবনেও তার তাৎপর্য রয়েছে।
আধুনিক সময়ে জন্মাষ্টমীর উদ্যাপনের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। শহরের আবাসনগুলিতে ছোট পরিসরে পুজোর আয়োজন হচ্ছে, শিশুদের নিয়ে কৃষ্ণ সাজানোর প্রতিযোগিতা হচ্ছে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কীর্তনের আয়োজন করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দৌলতে দেশের এক প্রান্তের জন্মাষ্টমীর ছবি পৌঁছে যাচ্ছে অন্য প্রান্তে। কোথাও বিশাল মন্দিরসজ্জা, কোথাও দহি হান্ডি, কোথাও আবার একেবারে ঘরোয়া দোলনায় বসে থাকা গোপাল—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে এক বৃহৎ সাংস্কৃতিক ছবি। তবে প্রযুক্তি ও আধুনিকতার মধ্যেও জন্মাষ্টমীর সবচেয়ে সুন্দর দিকটি এখনও সেই ঘরোয়া আবেগ। মায়ের হাতে তৈরি ভোগ, ঠাকুমার মুখে শোনা কৃষ্ণের গল্প, বাবার সঙ্গে মন্দিরে যাওয়া, ছোট্ট শিশুর কৃষ্ণসাজ, মধ্যরাতে ঘণ্টাধ্বনির অপেক্ষা—এই ছোট ছোট মুহূর্তেই উৎসবের আসল প্রাণ। প্রজন্ম বদলায়, বাড়ির সাজ বদলায়, পুজোর আয়োজন বদলায়; কিন্তু কৃষ্ণকে ঘরের সন্তান করে নেওয়ার সেই অনুভূতি বদলায় না।
জন্মাষ্টমী আসলে ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের একটি সুন্দর ছবি। মথুরার মন্দির থেকে বাংলার ঘরোয়া ঠাকুরঘর, মহারাষ্ট্রের দহি হান্ডি থেকে দক্ষিণ ভারতের পদচিহ্ন, গুজরাতের নৃত্য থেকে মণিপুরের বৈষ্ণব সঙ্গীত—প্রতিটি অঞ্চলে কৃষ্ণকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা আলাদা উৎসব-ভাষা। কোথাও তিনি দুষ্টু কানাই, কোথাও মাখনচোর, কোথাও প্রেমের কৃষ্ণ, কোথাও আবার গীতার সারথি। তবু প্রতিটি রূপের কেন্দ্রেই রয়েছে মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক। তাই দেশ জুড়ে জন্মাষ্টমী কেবল একটি তিথির উদ্যাপন নয়। এটি ভারতীয় সংস্কৃতির বহুরঙা ক্যানভাসে আঁকা এক চিরন্তন ছবি—যেখানে ধর্মের সঙ্গে মিশে যায় লোকসংস্কৃতি, পুরাণের সঙ্গে মিশে যায় পারিবারিক স্মৃতি, আর ভক্তির সঙ্গে মিশে যায় আনন্দ। মধ্যরাত্রির সেই শুভক্ষণে যখন উচ্চারিত হয় কৃষ্ণের নাম, তখন যেন প্রতিটি ঘরে নতুন করে জন্ম নেয় ভালোবাসা, আশাবাদ ও শুভের প্রত্যয়। এই কারণেই শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও জন্মাষ্টমীর আবেদন এতটুকু ম্লান হয়নি; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আরও নতুন রূপে, আরও নতুন গল্পে ফিরে আসে আমাদের প্রিয় কানাই।
রবিবারের গল্প: জগাইয়ের লেখক খোঁজা
সিদ্ধার্থ সিংহ
ঋককে দেখেই হাতকাটা জগাই চিৎকার করে উঠল, আই ঋকা, ঋকা, এ দিকে শোন তো... এ দিকে শোন।
হাতকাটা জগাইয়ের কথা অমান্য করবে এ তল্লাটে কেন, আশপাশের কোনও তল্লাটের কারও সাধ্য নেই। তাই হাজার তাড়া থাকলেও বড় বড় পা ফেলে ঋক এসে হাজির হল ওর সামনে।
আগে ওর নাম ছিল জগাই। পার্টি-পলিটিক্স করত। দাদাদের হাত ছিল মাথার ওপরে। সেটা ভাঙিয়েই দাদাগিরি করত। তাই সচরাচর কেউ ওকে ঘাঁটাত না। ইলেকশনের আগে রেল লাইনের ধারে কোন ঝুপড়িতে বসে কয়েক জন মিলে বোমা বাঁধছিল। কী থেকে যে কী হয়ে গেল, কিচ্ছু বোঝা গেল না। হঠাৎ বিস্ফোরণ। উড়ে গেল ঝুপড়ি। স্প্লিন্টার বুকে নিয়ে লুটিয়ে পড়ল একজন। একজনের চোখ গেল চিরজীবনের জন্য। একজনের মুখ গেল ঝলসে। আর জগাইয়ের উড়ে গেল একটা হাত।
সেই থেকে লোকের মুখে মুখে জগাই হয়ে গেল--- না, হাত-ওড়া নয়, হাতকাটা জগাই। যদিও ওর সামনে কেউ ওই নামে ওকে ডাকে না। বলে জগাইদা। আর এই হাত উড়ে যাওয়ার পর থেকেই ও যেন কেমন পাল্টে গেল। মস্তান থেকে সোজা সমাজসেবী। কার মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না, কার ছেলে সামান্য নম্বরের জন্য ক্লাসে উঠতে পারেনি, কোথায় বসে আঁকো প্রতিযোগিতা, কোথায় রক্তদান শিবির, কার বাড়িওয়ালা ভাড়াটে তুলতে পারছে না, কোন কেরোসিন তেলের ডিলার প্রকাশ্য দিবালোকে পাচার করে দিচ্ছে ড্রামকে ড্রাম তেল, কোন মেয়েকে কোন ছেলে খারাপ ইঙ্গিত করেছে--- সব জায়গায় ও। না, এখন ওর আরাধ্য দেবতা আর মার্ক্স-লেনিন নন, একমাত্র আরাধ্য--- স্বামী বিবেকানন্দ।
সেই হাতকাটা জগাইকে ঋক জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে গো?
--- এই, তুই তো ওকালতি করিস। প্রচুর লোকের সঙ্গে তোর যোগাযোগ। আমাকে একটা লেখক জোগাড় করে দে না...
--- লেখক? লেখক দিয়ে তুমি কী করবে?
একটু লজ্জা পেয়ে হাতকাটা জগাই বলল, আসলে আমরা একটা বইমেলা করছি...
--- বইমেলা? তুমি?
--- কেন? আমি কি বইমেলা করতে পারি না?
ঋক বলল, না না, তা না। আসলে তুমি আর বইমেলা তো... ঠিক মেলাতে পারছি না।
--- কিচ্ছু মেলাতে হবে না। তুই শুধু আমাকে একটা লেখক জোগাড় করে দে। পারবি?
--- কেন পারব না জগাইদা?
--- তা হলে যত তাড়াতাড়ি পারিস, একটা জোগাড় করে দে।
--- তাকে দিয়ে তুমি কী করাতে চাও, সেটা তো বলো।
হাতকাটা জগাই বলল, আরে, আমি না হয় লেখাপড়া করিনি। তোরা তো করেছিস। এটা বুঝতে পারলি না? তাকে দিয়ে তো আর মাঠের ঘাস ছেঁড়াব না। প্যান্ডেলও বাঁধতে বলব না...
--- আমি তো সেটাই জানতে চাইছি।
--- তাকে দিয়ে ফিতে কাটাব। বইমেলা তো! নেতা-ফেতা দিয়ে হবে না। একজন লেখক চাই।
ঋক বলল, ও তাই বলো। আসলে যাঁকে বলব, তাঁকে তো বলতে হবে কী অনুষ্ঠান, কবে, ক'টায়? তাঁকে কী করতে হবে। তাই আর কি...
--- বলবি, বইমেলার ফিতে কাটতে হবে। সন্ধে ছ'টা নাগাদ আসলেই হবে। দরকার হলে আমরা গাড়ি করে নিয়ে আসব। আবার গাড়ি করেই পৌঁছে দিয়ে আসব। জাস্ট আধ ঘণ্টার ব্যাপার। ফুলের তোড়া দেব। গলায় যেটা দেয়, উত্তরের... না কী একটা বলে না... সেটা দেব। মিষ্টির প্যাকেট দেব। প্রচুর ছবি উঠবে। মিডিয়ারা থাকবে। লোকাল চ্যানেলে লাইভ টেলিকাস্ট হবে। উনি শুধু ফিতেটা কেটে দেবেন, ব্যস...
ঋক চুপ করে কথাগুলো শুনল। তার পর বলল, লেখক তো প্রচুর আছে। তোমার কী রকম লেখক চাই, বলো।
--- কী রকম! কী রকম! কী রকম! আমতা আমতা করে বলল, আরে বাবা, লেখক হলেই হল, তার আবার রকমসকম!
--- না... তাও...
--- তা হলে ভাল লেখকই দে। এটা তো তোরও পাড়া, নাকি? পাড়ার নাম হলে তো তোরও ভাল, তাই না? বেশিক্ষণ তো লাগবে না। আসবে। ফিতে কাটবে। চলে যাবে। এই তো... তার জন্য আবার এত কী!
--- না, মানে ওনাকে কি মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে হবে?
হাতকাটা জগাই বলল, যদি বলতে চায়, বলবে। বসেও বলতে পারে।
--- আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি কথা বলে তোমাকে জানাব, কেমন?
--- কবে জানাবি?
--- আজকালের মধ্যেই জানিয়ে দেব।
--- ঠিক আছে, পাক্কা। তা হলে ওই কথাই রইল।
ঋক চলে যাওয়ার পরেই হাতকাটা জগাই ফোন করল মনিরুলকে। মনিরুলই হচ্ছে এই বইমেলা কমিটির সভাপতি। এক কথায় বলতে গেলে এটা ওরই ব্রেনচাইল্ড। ওই এই প্রপোজালটা দিয়েছিল জগাইকে। বলেছিল, তুই যতই বস্ত্র বিতরণ কর বা খোঁড়াদের ক্র্যাচ দে, পনেরোই আগস্ট পদযাত্রা বের কর, যতই ধুমধাম করে স্বামীজির জন্মদিন পালন কর, টপ লোকদের টানতে গেলে কিন্তু তোকে একটা বইমেলা করতেই হবে।
কথাটা শুনেই হাতকাটা জগাইয়ের চোখ চকচক করে উঠেছিল। ও যত যা-ই করুক, অনুষ্ঠানের দিন যত হোমরা-চোমরাই মঞ্চ আলো করে থাকুক, পাড়ার মেয়ে-বউ-দাদারা যতই এসে ভিড় জমাক, অনুষ্ঠানের পরের দিনই কেউই যেন ওকে আর চিনতে পারে না। ও নিজে যেচে কথা বলতে গিয়ে বুঝতে পারে, তারা আসলে ওকে এড়িয়ে চলতে চায়। তাই বইমেলা করার প্রস্তাবটা ও সঙ্গে সঙ্গে একেবারে লুফে নিয়েছিল।
পর দিনই জরুরি মিটিং ডেকে হাতকাটা জগাই দলবল নিয়ে বসেছিল। গঠন করা হয়েছিল বইমেলা কমিটি। প্রধান উপদেষ্টা করা হয়েছিল ক্লাবের একটানা এগারো বছর ধরে সভাপতি থাকা জনাব নুরুল ইসলামকে। সম্পাদক করা হয়েছিল স্থানীয় কাউন্সিলার আনন্দদাকে। আর মনিরুল যেহেতু প্রপোজালটা দিয়েছিল, তাই ওকেই করা হয়েছিল সাধারণ সম্পাদক। সবাই তো সব পদ পেয়ে গেল, তা হলে হাতকাটা জগাই কি বসে বসে আঙুল চুষবে! তাই তার জন্য নতুন একটা পদ সৃষ্টি করেছিল ওরা। নাম দিয়েছিল--- প্রধান অভিভাবক।
ওকে প্রধান অভিভাবক করার উদ্দেশ্য একটাই। ও থাকলে প্যান্ডেলওয়ালা থেকে ইলেকট্রিকের লোকেরা নামমাত্র খরচায় সব কাজ সুষ্ঠুভাবে করে দেবে। ব্যানার-পোস্টার, এমনকী যারা মেলার মাঠে কাজ করবে, স্বেচ্ছাসেবক থেকে অতিথি, শিল্পী, নেতানেত্রী--- সবার খাবারের প্যাকেটের স্পনসরও জোগাড় করে দেবে ও।
শুধু তাই নয়, নাচ, গান, আবৃত্তি করার বিখ্যাত লোকদের নিয়ে আসা দিয়ে আসার জন্য গাড়ির ব্যবস্থাও করে দেবে। ওর লাভ শুধু একটাই--- টপ লোকেদের পাশে বসে ছবি তুলবে, আর সেই সব ছবি প্রিন্ট করে নকশাদার বড় ফ্রেমে বাঁধিয়ে বসার ঘরে সাজিয়ে রাখবে।
সে দিন মনিরুল ওকে বলেছিল, বইমেলা তো! মনে রাখবি, এখানে কিন্তু নেতা-নেত্রী চলবে না। একজন লেখককে দিয়ে উদ্বোধন করাতে পারলে খুব ভাল হয়। সঙ্গে সঙ্গে ওর মুখের কথা টেনে নিয়ে হাতকাটা জগাই বলেছিল, কোনও চিন্তা নেই। একবার যখন মুখ ফুটে বলেছ, ব্যস হয়ে যাবে।
বলে তো ফেলেছে, হয়ে যাবে। কিন্তু ও লেখক পাবে কোথায়! কাকে বলবে! না, পাড়ার কাউকে বলা যাবে না। পাড়ায় যদি ভাল কোনও লেখক থেকেও থাকে, তাকে দিয়ে আর যা-ই করানো যাক না কেন, এ রকম একটা মেলা, বইমেলার ফিতে তাকে দিয়ে কিছুতেই কাটানো যাবে না। তার চেয়ে যদি একটু কম দামি লেখকও হয়, তো হোক। তাও ভাল। তাকে শুধু অন্য পাড়ার হতে হবে, ব্যস, তা হলেই হল।
একজন লেখকের জন্য কাকে ধরা যায়! কাকে ধরা যায়! কাকে ধরা যায়! এ সব ও যখন ভাবছে, ঠিক তখনই ওর চোখে পড়ে গেল ঋক। ঋক পাড়ারই ছেলে। ওকালতি করে। বিভিন্ন লোক বিভিন্ন কেস নিয়ে ওর কাছে আসে। সে সব লোকের মধ্যে কি একজনও লেখক নেই! নিশ্চয়ই আছে। থাকতেই হবে। অন্তত তার জন্য থাকতে হবে। তাই সঙ্গে সঙ্গে ও চিৎকার করে উঠেছিল, আই ঋকা, ঋকা, এ দিকে শোন তো... এ দিকে শোন।
মনিরুল ফোন ধরতেই হাতকাটা জগাই বলল, দাদা, পেয়ে গেছি। বইমেলার ফিতে কাটার জন্য লেখক পেয়ে গেছি। এক্ষুনি কথা হয়ে গেল। লেখকের সঙ্গে আমি ডাইরেক্ট কথা হলে নিয়েছি। লেখক বলল, আপনি যখন নিজে বলছেন, আমি যাব না, তা কখনও হয় দাদা? আমি যাব। অবশ্যই যাব। যখন যেতে বলবেন, তার অন্তত আধ ঘণ্টা আগেই আমি মেলার মাঠে পৌঁছে যাব। আসলে আমাকে চেনে তো, তাই...
ও প্রান্ত থেকে মনিরুল বলল, তাই নাকি? এ তো খুব ভাল খবর।
--- হ্যাঁ দাদা, সব নাম যখন ঠিক হয়ে গেছে তা হলে আর দেরি করব না, কাল কিংবা পরশুই পোস্টার ছাপতে পাঠিয়ে দেব।
--- আমার নামটা কিন্তু ওপর দিকে দিস।
--- এ আর বলতে! দেব গো দাদা, দেব। শুধু ওপর দিকে না। বড় বড় অক্ষরে সবার উপরে দেব, দেখে নিয়ো।
--- বলছিস?
হাতকাটা জগাই বলল, বলছি দাদা, বলছি। আর একটা কথা বলার ছিল দাদা...
--- বল না...
--- বলছিলাম কি, আমাকে না একজন ধরেছে।
--- কী ব্যাপারে?
--- ওই বইমেলায় একটা বোর্ড বসাতে চায়।
--- কীসের বোর্ড?
ইতস্তত করে হাতকাটা জগাই বলল, ঝান্ডা মুকুটের।
একটু দমে গেল মনিরুল--- ঝান্ডা মুকুটের! সে তো জুয়াখেলা...
--- আরে বাবা, 'জুয়াখেলা' থেকে 'জুয়া'টা বাদ দিয়ে দাও না...
--- তাতে লাভ?
--- 'খেলা' পড়ে থাকবে।
নিজের ঘাড়ের ওপর থেকে যাবতীয় দায় ঝেড়ে ফেলার জন্য মনিরুল বলল, দ্যাখ, যা করবি, ভেবেচিন্তে করবি। পরে যেন এই নিয়ে কোনও কথাকথি না হয়...
--- দাদা, আমাদের মাথার ওপরে তুমি আছ, কে কী বলবে? কার ঘাড়ে ক'টা মাথা? বসিয়ে দিই? কী বলো?
--- কী বলি বল তো!
--- বসিয়ে দিই, বসিয়ে দিই... আর তোমার নামটা শুধু পোস্টারেই নয়, বড় বড় যে ফ্লেক্সগুলো হচ্ছে, সেখানেও আরও বড় বড় করে দিয়ে দিচ্ছি, কেমন?
--- ঠিক আছে, বলছিস যখন... দিয়ে দে...
মোড়ে মোড়ে ব্যানার পড়ে গেছে। দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার। মাইকিং করে গোটা এলাকা প্রচার করা হচ্ছে। কলকাতার কলেজ স্ট্রিট থেকে বেশ কয়েক জন প্রকাশক আসছে। আসছে বিভিন্ন জেলা থেকে লিটল ম্যাগাজিনগুলোও। চারিদিকে সাজ সাজ রব। পাড়ার কচিকাঁচাদের নিয়ে বেলা তিনটের সময় শোভাযাত্রা হবে। সঙ্গে থাকবে ব্যান্ডপার্টি। রণ-পা। ছৌ-নৃত্য। ঢোল-হরতাল, মিকি মাউস, চার্লি চ্যাপলিন, মনীষীদের সাজে বাচ্চারা--- সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে হাতকাটা জগাই। শুধু ওই সময় ও নিজে থাকতে পারছে না। কারণ, সে সময় ঋকের জোগাড় করে দেওয়া ওই লেখককে আনতে যাবে ও। গাড়িতে করেই নিয়ে আসবে। আর যাওয়ার সময় ওই গাড়িরই ড্রাইভার তাঁকে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসবে। না, বেশিক্ষণ লাগবে না। যেতে আসতে খুব বেশি হলে এক ঘণ্টা আর উনি হয়তো থাকবেন মেরেকেটে বড়জোর আরও এক ঘণ্টা।
ঋক এসে হাজির হয়েছে একটু আগেই। জগাই তো চেনে না, তাই ঋকই নিয়ে যাবে। চা খেয়ে ওরা দু'জন পিছনের সিটে পাশাপাশি বসে রওনা হয়ে গেল সেই লেখকের বাড়ির উদ্দেশে। যেতে যেতে জগাই বলল, এখন এখানে বসেছিস, ঠিক আছে। কিন্তু লেখককে নিয়ে আসার সময় না... তুই ড্রাইভারের পাশে সামনের সিটে চলে যাস। আমি আর লেখক এখানে বসব, কেমন?
ঘাড় কাত করল ঋক। গাড়ি রুদ্ধশ্বাসে ছুটে চলেছে। ঋক তখন সেই লেখকের প্রশংসায় একেবারে পঞ্চমুখ। এত সুন্দর লেখে না... যে কী বলব! সবাই একবাক্যে স্বীকার করে। লেখা তো নয়, যেন মুক্তোর দানা। এত বড় লেখক এ দেশে খুব কমই জন্মেছে। একবার আলাপ হলেই বুঝতে পারবে।
গাড়ি চলছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে লেখকের প্রশংসা। গাড়ি এ গলি ও গলি পেরিয়ে অবশেষে এসে দাঁড়াল সেই লেখকের বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নামতেই ঋক আঙুল তুলে লেখকের বাড়ির দরজাটা দেখিয়ে বলল, ওই দেখুন, লেখকের নাম কী রকম জ্বলজ্বল করছে।
জগাই দরজাটার দিকে তাকিয়ে দেখল, দরজার গায়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে তার নাম। আর তার ঠিক নীচে একটু ছোট ছোট হরফে লেখা--- দলিল লেখক।
ওটা দেখে একেবারে গদগদ হয়ে গেল জগাই। ও দেখেছে, ডাক্তারদের নামের পাশে নানান রকম ডিগ্রি লেখা থাকে, এর নামের পাশে লেখা আছে--- লেখক। না, শুধু লেখক নয়, দলিল লেখক। তার মানে ইনি নিশ্চয়ই আরও বড় লেখক। অনেক বড় মাপের লেখক। তাই একগাল হেসে ঋকের দিকে তাকিয়ে হাতকাটা জগাই বলল, বাঃ, এত দিনে তুই একটা কাজের মতো কাজ করেছিস। আমি চেয়েছিলাম, এমনি একজন লেখক। কিন্তু তুই যে তার চেয়েও বড়, একেবারে দলিল লেখক জোগাড় করে দিবি, আমি তা কল্পনাও করতে পারিনি। কী বলে যে তোকে ধন্যবাদ দেব! চল চল, ভেতরে চল। আগে গিয়ে ওনাকে ধরি।
ওরা দু'জন দরজা ঠেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।








Comments