top of page

কোফতা কাহিনী | প্রোটিনে ভরপুর জলখাবার | রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যায়াম | রবিবারের গল্প: এলেভূতের সন্ধানে


কোফতা কাহিনী


অরিন্দম সরকার

(ফুড ব্লগার)


মোঘলরা না আসলে আমাদের ভারতবর্ষের খাওয়া দাওয়া কেমন হতো সেই নিয়ে একটা বড় প্রশ্ন সবসময়ই থেকে যায়। বেশিরভাগ সময় যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও তাদের খাবারদাবারের প্রতি আগ্রহ প্রায় পাঁচশো বছর পরেও মানুষের রুটি রুজির বন্দোবস্ত করে চলেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের সীমানা ছেড়ে আজ গোটা বিশ্বের মানুষের কাছে মোগলাই খানার স্বাদ পৌঁছে গেছে পরিব্রাজক থেকে সৈন্য সামন্ত শাসকের হাত ধরে। মূলতঃ পারস্য মোগলাই খাবারের উৎস হলেও এর মধ্যে বেশ কিছু মৌলিকত্ব ছিল। প্রচুর খাবার কাশ্মীর বা দিল্লীতেও তৈরি করেছিলেন বাদশাহদের বাবুর্চি, খানসামারা। কাশ্মীরি নার্গিসি কোফতা নিয়ে একটু রসিয়ে কটা গল্প বলি।



সহজ ভাষায় কোফতা হলো মাংসের মন্ড বা দেশী meat loaf বললে বোধহয় অত্যুক্তি করা হবে না। পারস্যের "কাফতা" থেকে কোফতা শব্দটি আসে এবং ইরাক, ইরান, আর্মেনিয়ার লোকজন কিন্তু এই কাফতা খেয়ে আসছে মাখা মাখা ঝোলের সাথে রুটি দিয়ে। আমরা তো ভাত, রুটি, মুড়ি যা পাই সেটা দিয়েই মেরে দি। কদিন আগে দমদমের ঢাকাই হান্ডিতে চিংড়ির কোফতা সাবড়ে দিলাম তেহারি দিয়ে। লোকে অনেক কিছু বলবে এটা দিয়ে ওটা চলে না, ওটা দিয়ে সেটা খেয়ে হয়। আমার বাপু মেরী বিস্কুট ভাতের সাথে মেখে ভালো লাগলে আমি সেটাই খাবো। যাই হোক, সে সব কথায় না গিয়ে নার্গিসি কোফতার গল্পে আসা যাক।


নার্গিসি কোফতা আমি প্রথম খাই হ্যাংলাথেরিয়ামের লেকগার্ডেন্স আউটলেটে। ওদের ওখানে দেখলাম দুরকমের ভ্যারাইটি আছে। গ্রেভি দেওয়াটার নাম নার্গিসি কোফতা আর গ্রেভি ছাড়া শুকনোটার নাম নার্গিসি কাবাব। আমি রেঁস্তোরাতে গেলে দুটো নিয়ম মেনে চলি-



১। খাবার দিতে দেরি হচ্ছে, মানে একদম টাটকা বানিয়ে দিচ্ছে, আগের বানানো জিনিস দিচ্ছে না।


২। খাবার যখন দিতে দেরি হচ্ছে তখন যে খাবারটা অর্ডার করেছ সেটা নিয়ে একটু পড়াশুনা করে সময় কাটাও। এটা অনেকটা সুন্দরী প্রেমিকাকে জেনে বুঝে নিয়ে বিয়ে করার মত। নাড়ি, নক্ষত্র, ইতিহাস, ভূগোল জেনে নেবার মত। একলাফে ফুলশয্যা ব্যাপারটা ঠিক জমে না। খাবারের সাথে প্রেম সখ্যতা না হলে কি খাবারের আসল রস আস্বাদন করা যায়!!! আমি দলবল নিয়ে খুব একটা খেতে যাই না, গেলে এসব করা যায় না, তাদের সাথে সেল্ফিতেই সঙ্গ দিতে হয়।



সেল্ফি বলতে মনে পড়লো সেল্ফি তোলাটা কিন্তু একপ্রকার Narcissm. আর এই Narcissm এর সাথে নার্গিসি কোফতার একটা সুন্দর সংযোগ আছে। যারা আমার বাজে বকার লিখিত সংস্করণের এত দূর অবধি পড়ে ফেলেছেন, দয়া করে এটা ভেবে চলে যাবেন না বাবুর্চি রান্নার সময় সেল্ফি তুলে Narcissm দেখাতো বলে তার বানানো কোফতার নাম নার্গিসি কোফতা। বাজে না বকে এবার আসল গল্পে আসা যাক।



গল্পের শুরুটা গ্রীস থেকে। গ্রীক মাইথোলজি অনুসারে মধ্য গ্রীসের Boeotia অঞ্চলে এক প্রাচীন শহর ছিল যার নাম Thespiae, যা বর্তমান Mount Helicon পাহাড়ের কাছে Thespies গ্রামের অনতিদূরে অবস্থিত। এই শহরে থাকতেন এক শিকারি, নাম Narcissus, বাবা Cephissus, নদীর দেবতা, থাকতেন Athens এর কাছে Cephissus নদীতে আর মা Liriope ছিলেন Thespiae এর এক অশরীরী আত্মা, যাকে জলাশয়ের ধারে, ঝর্ণার ধারে বা কুয়োর ধারে পাওয়া যেত। Cephissus এবং Liriope এর কিন্তু বিয়ে হয় নি, Cephissus Liriope এর অবৈধ সন্তান এই Narcissus ছিলেন অসম্ভব সুন্দর একজন পুরুষ। Byzantine কবি John Tzetzes এর লেখা থেকে জানা যায় তিনি বাহ্যিক প্রণয়মূলক সমস্ত আকর্ষণ পরিত্যাগ করে ঝিলের জলে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেন। ঠিক যেমন আজকের যুবসমাজ Tiktok, Insta reels করে খানিকটা ওই রকমই বলতে পারেন। সে যাই হোক, তাদের মোবাইল, তাদের ইন্টারনেট , তারা করতেই পারে - আমার আপনার কি! ফেরা যাক গল্পতে। এই Narcissus ভদ্রলোকের কার্যকলাপ থেকেই Narcissism শব্দটির উদ্ভব। এর সাথে এখনো নার্গিসি কোফতার সংযোগ এখনো স্থাপন হয় নি, আপনাদের আরেকটু ধৈর্য ধরতে হবে। Narcissus এর মৃত্যুর পর ওখানকার মানুষ লক্ষ্য করেন, উনি ঝিলের পাড়ে যেখানে বসে নিজেকে দেখতেন সেই জায়গায় এক ধরনের ফুলের গাছের ঝোপ হয়েছে। সেই ফুলের নাম দেওয়া হয় Narcissus। একটু সহজ করে বললে, আমরা যারা ছোটবেলায় William Wordsworth এর I Wandered Lonely as a Cloud পড়েছি,


I wandered lonely as a cloud

That floats on high o'er vales and hills,

When all at once I saw a crowd,

A host, of golden daffodils;

Beside the lake, beneath the trees,

Fluttering and dancing in the breeze.


এই Narcissus হলো সেই Daffodil ফুল। এর বাইরের দিকটা সাদা আর ভেতরের দিক হলুদ। মোঘলরা Narcissus কে বলতো নার্গিস। আমার মতোই কোনো খাদু পাবলিক যে প্রকৃতির romantisim এর মধ্যেও খাবার খুঁজে পায় সেরকমই কেউ একজন এই বাইরে সাদা , ভেতরে হলুদ daffodil দেখে সেদ্ধ ডিমকে মিস করেছেন। ব্যস, রসুইঘরে গিয়ে ডিমের কোফতা বানালেন আর নাম হয়ে গেল নার্গিসি কোফতা।


মোঘল সাম্রাজ্যের পড়ন্ত বিকেলের দিকে এসেছিল ইংরেজরা। এখান থেকেই বিভিন্ন মহাদেশে বিভিন্ন নাম নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে এই নার্গিসি কোফতা। 1700 শতাব্দীর মাঝামাঝি ইংরেজ সৈন্যরা দেশে ফেরার সময় জিভে স্বাদ আর মনে আকাঙ্খা নিয়ে ঘরে ফিরে তাদের মত করে কিছু একটা বানান, যেখানে ঝোল বা সুরুয়া ছিল না - ছিল Tomato Puree, ডিম সিদ্ধর বাইরের পুরে আমাদের যেমন মাংসের কিমা থাকে ওদের সেখানে সসেজের মাংস, ফিশ পেস্ট ইত্যাদি দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চলছে। ইতিহাস ঘেঁটে যা পেলাম, তাতে লন্ডনের Fortnam and Mason নামের departmental store থেকেই নার্গিসি কোফতার প্রথম ইংরেজি সংস্করণ বিক্রি করা শুরু হয়েছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি Yorkshire এর William J Scott & Sons রেস্তোরাঁ নার্গিসি কোফতা বানিয়ে বেশ সুনাম করেন এবং মনে করা হয় তার এই Scott নাম থেকেই Scotch Egg নাম আসে। এখন ইংরেজদের যেমন চুরির স্বভাব। টিক্কা বাটার মাসালার মতো Scotch Egg ও হয়ে গেল ওদের রেসিপি। আর আমরা ওদের থেকে নাকি এটা কপি করেছি। আমার ছোট ভাইয়ের স্বভাবটা এমনই - আমার জিনিস নিয়ে নিজের নামে চালায়। ব্রিটিশদেরও ওই ছোটভাই বলে ক্ষমা করতে হয়। এখন, ঝগড়া তো করা যায় না UN এ গিয়ে নার্গিসি কোফতা বা টিক্কা বাটার মাসালার জন্য।


এবার এই কোফতা আমেরিকা গিয়ে নাম নিল কোথাও Stuffed Egg , কোথাও Angel Egg আবার কোথাও salad দিয়ে খাওয়া হয় বলে Salad Egg। এবারে যখন ব্রিটিশদের হাত ধরে নার্গিসি কোফতা পরাধীন ভারতের রাজধানী কলকাতাতে ফিরে এলো বিলেত ফেরত খাবার হয়ে। পুরো খোল নোলচে পাল্টে, গ্রেভি হাওয়া করে এক sophisticated ব্যাপার স্যাপার। রুটি দিয়ে খাবার জিনিস এখন ছুরি কাটাচামচ দিয়ে খেতে হয় আর সাথে থাকে কাসুন্দি, টমেটো সস, শসা কুচি, পিঁয়াজ কুচি ইত্যাদি। তবে বাঙালিদের স্বাদকোরকে এটি খুব একটা দাগ কাটতে পারে নি। বাঙালিরা আবার এখানে আরেকটু কিছু নিজেদের মতন করে সংযোজন করে, কারন ইংরেজরা বেশি মশলাদার খাবার খেত না, আর আমাদের মশলা ছাড়া খাবার চলে না, তাই বাইরের পুরে যোগ হল গোলমরিচ, লংকার ঝাল আর দেশীয় মশলাপাতি। বিখ্যাত লেখক Samuel Johnson যাকে আমরা Dr. Johnson নামে চিনি, ওনার বায়োগ্রাফির লেখক James Boswell এই অতিরিক্ত মশলা দেওয়া Scotch Egg খেয়ে এমন ঝাল লাগলো যে উনি এর নাম দিয়ে দিলেন Devil Egg।


কলকাতার বহু জায়গায় এখন এই egg devil পাওয়া যায়। তবে খাসির মাংসের কিমা দিয়ে যত্ন করে বানানোর জায়গা খুব কম। দামে পোষাতে পারবে না, লোকে অত দাম দিয়ে খাবে না। তাই ওই বাজার চলতি একটা বড় ডিমের চপ egg devil নামে চলছে।


এই হল আমার আজকের গল্প যেখানে গ্রীক মাইথলজিকাল চরিত্র কখন আমার পাড়ার বাবলুদার ডিমের চপ হয়ে গেছে নিজেও জানতে পারিনি।


প্রোটিনে ভরপুর জলখাবার

স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে সকালের জলখাবারে লুচি-পরোটার পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছে ওট্‌স। কেউ খান স্মুদি, কেউ ওট্‌স অমলেট, আবার কেউ বেছে নেন ওট্‌সের চিলা। কিন্তু প্রতিদিন একই খাবার খেতে খেতে একঘেয়েমি আসতেই পারে। তার উপর সকলের ওট্‌স পছন্দও নয়। তাই সকালের জলখাবারে স্বাদ ও পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে তৈরি করে নিতে পারেন প্রোটিনে ভরপুর কয়েকটি সহজ পদ।


মুগ ডালের ইডলি



কী কী লাগবে:

মুগ ডাল ১ কাপ, টক দই ১/২ কাপ, আদা ১ চা-চামচ, কাঁচালঙ্কা ২টি, কারিপাতা ৮–১০টি, গাজর কুচি ১/৪ কাপ, ধনেপাতা কুচি ২ টেবিল-চামচ, নুন স্বাদমতো, Shalimar's সর্ষের তেল ১ চা-চামচ, হিং ১ চিমটি, সর্ষে ১/২ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১/৪ চা-চামচ, ফ্রুট সল্ট বা বেকিং সোডা ১/২ চা-চামচ



কীভাবে বানাবেন:

মুগ ডাল ২ ঘণ্টা অথবা রাতভর জলে ভিজিয়ে রেখে জল ঝরিয়ে নিন। দই, আদা, কাঁচালঙ্কা ও কারিপাতা দিয়ে অল্প জল ব্যবহার করে মিহি করে বেটে নিন। এর সঙ্গে নুন, গাজর কুচি ও ধনেপাতা মিশিয়ে রাখুন। কড়াইয়ে Shalimar's সর্ষের তেল গরম করে হিং ও সর্ষের ফোড়ন দিন। উনুন বন্ধ করে হলুদ গুঁড়ো মিশিয়ে ফোড়নটি ডালের মিশ্রণে দিয়ে দিন। সবশেষে ফ্রুট সল্ট বা বেকিং সোডা মিশিয়ে তেল মাখানো ইডলির ছাঁচে ঢেলে ১০–১২ মিনিট ভাপে রান্না করুন। টম্যাটো-রসুনের চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।



পনির চিলা



কী কী লাগবে:

পনির ২০০ গ্রাম, Shalimar's Sunflower তেল ১ চা-চামচ, চিজ় ২ টেবিল-চামচ, ধনেপাতার চাটনি ২ টেবিল-চামচ, টম্যাটো কুচি ১/৪ কাপ, অ্যাভোকাডো ১/২টি, গোলমরিচ গুঁড়ো ১/৪ চা-চামচ, নুন স্বাদমতো



কীভাবে বানাবেন:

তাওয়ায় সামান্য Shalimar's Sunflower তেল ব্রাশ করে গরম করুন। আঁচ কমিয়ে পনির গ্রেট করে তাওয়ার উপর গোল ও পাতলা করে ছড়িয়ে দিন। মিনিট দুয়েক ঢাকা দিয়ে রান্না করুন। উপর থেকে চিজ়, ধনেপাতার চাটনি, টম্যাটো কুচি ও অ্যাভোকাডো দিন। নুন ও গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে পনিরের স্তরটি আড়াআড়ি ভাঁজ করে নিন। অ্যাভোকাডোর বদলে হালকা ভাজা মাশরুমও ব্যবহার করতে পারেন।



সবুজ চিঁড়ের পোলাও




কী কী লাগবে:

মোটা চিঁড়ে ১ ১/২ কাপ, ধনেপাতা ১ কাপ, পুদিনাপাতা ১/২ কাপ, রসুন ৩ কোয়া, কাঁচালঙ্কা ২টি, জিরে ১/২ চা-চামচ, নারকেল কোরা ২ টেবিল-চামচ, পাতিলেবুর রস ১ টেবিল-চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১ চা-চামচ, Shalimar's Soyabean তেল ১ ১/২ টেবিল-চামচ, কাজুবাদাম ২ টেবিল-চামচ, সর্ষে ১/২ চা-চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১/২ কাপ



কীভাবে বানাবেন:

চিঁড়ে ভাল করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, রসুন, কাঁচালঙ্কা, জিরে, নুন, নারকেল কোরা ও পাতিলেবুর রস দিয়ে মসৃণ সবুজ মশলা তৈরি করুন। কড়াইয়ে Shalimar's Soyabean তেল গরম করে কাজুবাদাম হালকা ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে সর্ষের ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ ভেজে সবুজ মশলা দিন। মিনিট দুয়েক রান্না করে চিঁড়ে মিশিয়ে আরও ৪–৫ মিনিট রান্না করুন। উপর থেকে কাজুবাদাম ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।



ডিম-পনির ভুর্জি র‍্যাপ



কী কী লাগবে:

ডিম ২টি, পনির ৭৫ গ্রাম, আটার রুটি ১টি, Shalimar's সর্ষের তেল ১ চা-চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১/৪ কাপ, টম্যাটো কুচি ১/৪ কাপ, কাঁচালঙ্কা ১টি, ক্যাপসিকাম কুচি ১/৪ কাপ, ধনেপাতা কুচি ১ টেবিল-চামচ, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো ১/৪ চা-চামচ, নুন স্বাদমতো, শসা কুচি ১/৪ কাপ



কীভাবে বানাবেন:

ডিম ফেটিয়ে রাখুন। Shalimar's সর্ষের তেল গরম করে পেঁয়াজ, টম্যাটো, কাঁচালঙ্কা ও ক্যাপসিকাম ভেজে নিন। ডিম দিয়ে নাড়তে থাকুন। ডিম অল্প জমে এলে ভেঙে নেওয়া পনির, নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো ও ধনেপাতা দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে নিন। আটার রুটি হালকা গরম করে তার উপর ডিম-পনিরের পুর ছড়িয়ে শসা কুচি দিয়ে রোল করে নিন।



ছোলা-সবজি চিলা



কী কী লাগবে:

কাবলি ছোলা ১ কাপ, পেঁয়াজ কুচি ১/৪ কাপ, গাজর কুচি ১/৪ কাপ, ক্যাপসিকাম কুচি ১/৪ কাপ, কাঁচালঙ্কা ২টি, ধনেপাতা কুচি ২ টেবিল-চামচ, জিরে ১/২ চা-চামচ, নুন স্বাদমতো, জল প্রয়োজনমতো, Shalimar's Sunflower তেল ১–২ চা-চামচ, টক দই ১/২ কাপ



কীভাবে বানাবেন:

ছোলা ৬–৮ ঘণ্টা জলে ভিজিয়ে রেখে জল ঝরিয়ে মিহি করে বেটে নিন। এর সঙ্গে পেঁয়াজ, গাজর, ক্যাপসিকাম, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা, জিরে ও নুন মিশিয়ে প্রয়োজনমতো জল দিয়ে ব্যাটার তৈরি করুন। তাওয়া গরম করে অল্প Shalimar's Sunflower তেল ব্রাশ করুন। এক হাতা ব্যাটার ঢেলে পাতলা করে ছড়িয়ে দু’পিঠ ভাল করে সেঁকে নিন। টক দই বা পুদিনা-ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।



মুগ ডাল-পনির পরোটা



কী কী লাগবে:

আটা ১ কাপ, মুগ ডাল ১/২ কাপ, পনির ১০০ গ্রাম, পেঁয়াজ কুচি ১/৪ কাপ, ধনেপাতা কুচি ২ টেবিল-চামচ, কাঁচালঙ্কা কুচি ২টি, জিরে ১/২ চা-চামচ, আদা কুচি ১ চা-চামচ, নুন স্বাদমতো, জল প্রয়োজনমতো, Shalimar's Soyabean তেল ১ টেবিল-চামচ, টক দই ১/২ কাপ


কীভাবে বানাবেন:

মুগ ডাল সেদ্ধ করে ভাল করে চটকে নিন। এর সঙ্গে ঝুরঝুরে পনির, পেঁয়াজ, ধনেপাতা, কাঁচালঙ্কা, জিরে, আদা ও নুন মিশিয়ে পুর তৈরি করুন। আটা মেখে লেচি কেটে তার মধ্যে পুর ভরে বেলে নিন। তাওয়ায় অল্প Shalimar's Soyabean তেল দিয়ে দু’পিঠ ভাল করে সেঁকে নিন। টক দই বা ধনেপাতার চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।



সকালের জলখাবার দিনের শুরুতে শরীরকে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগানোর পাশাপাশি দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতেও সাহায্য করে। তাই প্রতিদিনের খাবারে প্রোটিনসমৃদ্ধ উপকরণ যেমন ডাল, ছোলা, ডিম, পনির ও দই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে রাখা যেতে পারে। স্বাদের সঙ্গে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রেখে তৈরি এই পদগুলি ওট্‌সের একঘেয়েমিও কাটাবে। অল্প তেলে, তাজা উপকরণে তৈরি এমন জলখাবারেই জমে উঠুক দিনের শুরু।

মাত্র এক মিনিটের প্ল্যাঙ্কে কি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে উচ্চ রক্তচাপ? জানুন কী বলছে গবেষণা।


নিজস্ব প্রতিনিধি


উচ্চ রক্তচাপ এখন আর শুধু বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা নয়। অনিয়মিত জীবনযাপন, অতিরিক্ত নুন খাওয়া, ওজন বৃদ্ধি, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব এবং শরীরচর্চার ঘাটতি—সব মিলিয়ে কম বয়সেও অনেকের রক্তচাপ বেড়ে যাচ্ছে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তাই নিয়মিত শরীরচর্চার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞেরা। তবে শরীরচর্চা মানেই প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে কাটাতে হবে, এমনটা নয়। বরং অল্প সময়ের কিছু নির্দিষ্ট ব্যায়ামও শরীরের জন্য উপকারী হতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হল ‘প্ল্যাঙ্ক’।


প্ল্যাঙ্ক আসলে এক ধরনের আইসোমেট্রিক ব্যায়াম। এই ধরনের ব্যায়ামে শরীরের পেশিগুলিকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থানে শক্ত করে ধরে রাখা হয়। অর্থাৎ পেশিতে চাপ তৈরি হলেও অস্থিসন্ধিতে খুব বেশি নড়াচড়া হয় না। প্ল্যাঙ্ক ছাড়াও ওয়াল সিট কিংবা নির্দিষ্ট সময় হাতের মুঠো শক্ত করে ধরে রাখার মতো কিছু ব্যায়াম এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।



রক্তচাপের উপর কী প্রভাব পড়ে?


প্ল্যাঙ্ক করার সময়ে শরীরের একাধিক পেশি একই সঙ্গে সক্রিয় থাকে। পেটের পেশির পাশাপাশি কাঁধ, পিঠ, কোমর, নিতম্ব এবং পায়ের পেশিকেও শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখতে কাজ করতে হয়। কিছু সময় ধরে এই অবস্থায় থাকার ফলে পেশিতে সংকোচন তৈরি হয়। ব্যায়াম শেষ হওয়ার পরে রক্তনালির রক্তপ্রবাহের উপর এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।


আইসোমেট্রিক ব্যায়াম নিয়ে হওয়া গবেষণাগুলিতেও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় ফল পাওয়া গিয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে বিভিন্ন ধরনের শরীরচর্চার সঙ্গে আইসোমেট্রিক ব্যায়ামের তুলনা করে দেখা হয়। সেখানে বিশ্রামের সময়ে মাপা সিস্টোলিক এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ কমানোর ক্ষেত্রে আইসোমেট্রিক ব্যায়ামের উল্লেখযোগ্য প্রভাবের কথা উঠে আসে।


তবে এর অর্থ এই নয় যে আজ এক মিনিট প্ল্যাঙ্ক করলেই আজই রক্তচাপ কমে যাবে। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমেই শরীরচর্চার সুফল পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ ‘৬০ সেকেন্ড প্ল্যাঙ্ক’কে কোনও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।


এক মিনিট না পারলে?


শুরুতেই একটানা ৬০ সেকেন্ড প্ল্যাঙ্ক ধরে রাখা অনেকের পক্ষেই কঠিন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ড দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে ধীরে সময় বাড়ানোই ভাল। নিয়মিত অনুশীলন করাটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


প্ল্যাঙ্ক করার সময়ে শ্বাস বন্ধ করে রাখা একেবারেই উচিত নয়। স্বাভাবিক ও ধীর গতিতে শ্বাস নিতে হবে। পেটের পেশি শক্ত রেখে মাথা, পিঠ, কোমর এবং গোড়ালি যেন মোটামুটি একই সরলরেখায় থাকে, সেদিকেও নজর দিতে হবে।



সঠিক ভাবে প্ল্যাঙ্ক করবেন কী করে?


প্রথমে উপুড় হয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ুন। তার পর দুই কনুই মেঝেতে রেখে শরীরের উপরের অংশ তুলে ধরুন। কনুই দু’টি যেন কাঁধের ঠিক নীচে থাকে। এবার পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে শরীরটিকে মেঝে থেকে তুলে ধরুন। মাথা থেকে গোড়ালি পর্যন্ত শরীরকে যতটা সম্ভব সোজা রাখুন। কোমর বেশি নীচে নামিয়ে বা উপরের দিকে তুলে রাখা উচিত নয়। পেটের পেশি সক্রিয় রেখে স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নিতে নিতে নির্দিষ্ট সময় ধরে অবস্থানটি বজায় রাখুন।

যাঁদের একটানা এই ভঙ্গিতে থাকা কঠিন, তাঁরা প্রয়োজনে হাঁটু মেঝেতে রেখেও সহজ সংস্করণ দিয়ে শুরু করতে পারেন।

কারা সতর্ক থাকবেন?


ব্যায়াম করার সময়ে শরীরে তীব্র ব্যথা, মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট কিংবা অস্বাভাবিক অস্বস্তি হলে সঙ্গে সঙ্গে থেমে যেতে হবে। বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাঁরা নতুন ধরনের ব্যায়াম শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে ভাল।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্ল্যাঙ্ক কখনও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের বিকল্প নয়। চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ চললে নিজের সিদ্ধান্তে তা বন্ধ করা উচিত নয়। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি খাবারে নুনের পরিমাণ কমানো, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং ধূমপান এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে দীর্ঘ সময় শরীরচর্চা করার সুযোগ না থাকলেও অল্প সময়ের নিয়মিত ব্যায়াম দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। এক মিনিটের প্ল্যাঙ্ক হয়তো কোনও জাদুকাঠি নয়, কিন্তু সঠিক ভাবে এবং নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তুলতে এটি হতে পারে সহজ একটি পদক্ষেপ।


রবিবারের গল্প: এলেভূতের সন্ধানে..


তপন বন্দ্যোপাধ্যায়


নতুন খড় দিয়ে মরাই ছাইতে ছাইতে গল্পটা শুনিয়েছিল পঞ্চু ঘরামি৷ এলেভূতের গল্প৷ এলেভূত যে কী জিনিস তখনও জানতাম না৷ কিন্তু পঞ্চু ঘরামির গল্প বলার ধরন এমনই যে ভূতপ্রেত সব জ্যান্ত হয়ে ঘোরে চোখের সামনে৷ শিরশির করে ওঠে গা–হাত–পা–শরীর৷


এখন ঘোর শীতকাল৷ ‘পৌষের শীত মোষের গায়/ মাঘের শীত বাঘের গায়’ এরকম একটা প্রবচন আমাদের প্রায়ই বলতেন ঠাকমা৷ এখন পৌষের শেষে সেই শীত কাঁপ ধরিয়ে দিচ্ছে দুশো বত্রিশখানা হাড়ে৷ তার মধ্যে একটু আগেই এই সাতসকালে দু–গেলাস নলেন রসে পাটকাঠি ডুবিয়ে চোঁ চোঁ করে সাবাড় করেছি৷ তাতে শীতের দাঁত আরও ধারালো আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ফোটাচ্ছে সারা গায়ে৷ একটা ছোটমোটো শাল জড়িয়ে রেহাই পেতে চাইছি শীত থেকে৷ শালে কুলোচ্ছে না বলে বইখাতা ফেলে ছুটেছি পুকুরপাড়ে রোদ পোহাতে৷ পুকুরের চারপাশে নতুন চামরমণি ধানের গোছ ডাঁই হয়ে জমে আছে ক’দিন ধরে৷ একপাশে ঝাড়াই মাড়াই হচ্ছে সেই ধানের গোছ৷ তার খড় টাল হয়ে জমা হচ্ছে খামারের পাশে৷ আর সোনালি ধান মাথায় মাথায় চলে যাচ্ছে মরাইতে৷


পুকুরের চারপাশে তাই নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ৷ সেই গন্ধের ওম নাকের লতিতে নিয়ে বসে পড়ি একগলা রোদের মধ্যে৷ মরাইয়ের ধার ঘেঁসে৷ নতুন মরাইটা বেশ বড়সড় করে বাঁধা হচ্ছে এবার৷ সেখানে পঞ্চু ঘরামি মরাইয়ের উপর বসে, আর নীচে থেকে নতুন খড় জোগান দিচ্ছে তার ছেলে ফড়িং৷



তার মধ্যেই আবার ভূতের গল্প তাতে তো শরীরের কাঁপ আরও বেড়ে যাওয়ার কথা৷ কিন্তু তা হল না পঞ্চু ঘরামির গল্প বলার ভঙ্গিতে৷ বরং রক্ত আরও চলকে ওঠে, গায়ের লোম খাড়া হয়৷


পঞ্চু ঘরামি এ তল্লাটের নামকরা ঘরামি৷ তার চেহারাটা যেমন দশাসই, তেমনি তার হাতের বাইসেপ৷ তার বুকটাই শুধু বিয়াল্লিশ ইঞ্চি৷ তার জন্যে পঞ্চু ঘরামিকে কখনও ডনবৈঠক দিতে হয়নি বা বার্বেল ভাঁজতে হয়নি৷ হাতে–পায়ের বেশ কিছু শিরা নারকেলের দড়ির মতো পাকিয়ে রয়েছে যা অনেক দূর থেকেই দৃশ্যমান৷


পঞ্চু ঘরামি সম্পর্কে নানা গল্প লোকমুখে প্রচারিত, তার মধ্যে একটা হল গাঁয়ে ডাকাত পড়া ও একচড়ে ডাকাত সর্দারের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি৷ সেবার চারপাশে হইচই ফেলে ডাকাতরা যে–বাড়িতে ঢুকছে, লুটপাট করে নিঃস্ব করে দিচ্ছে মনের সুখে৷ তাদের বাধা দেবে তেমন পুরুষমানুষ কই গাঁয়ে৷ এক পঞ্চু ঘরামি আছে কিন্তু সে তো ঘুমিয়ে পাহাড়৷ পঞ্চু ঘরামি রাতে ঘুমোলে নাকি কেটে ফেললেও উঠতে পারে না৷ ডাকাত পড়ায় সেবার কীভাবে যেন তার কানের মধ্যে জল ঢেলে ডেকে তোলে গাঁয়ের মানুষ৷ পঞ্চু ঘরামির গায়ের জোর কত সে–গল্প পাঁচগাঁয়ের মানুষ জানে, জানে ডাকাতরাও৷ কিন্তু লোকে এও জানে তার কুম্ভকর্ণপ্রতিম ঘুমের গল্পও৷ ডাকাতরাও সেই কাহিনি সম্পর্কে সচেতন বলেই এ গাঁয়ে ডাকাতি করার সাহস পেয়েছে৷ কিন্তু তারা ভাবতে পারেনি পঞ্চু ঘরামি জেগে উঠবে মধ্যরাতে৷ পঞ্চু ঘরামি জেগে উঠে কিছুক্ষণ সময় নিল ব্যাপারটা বুঝতে৷ তারপর এক হুঙ্কার দিয়ে ছুটল সেই বাড়িটার দিকে যেখানে তখনও লুটপাট চলছে ঘোরতরভাবে৷ ডাকাতরা হঠাৎ ঘটনাস্থলে পঞ্চু ঘরামিকে আবির্ভূত হতে দেখে বেশ থতমত৷ নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করে লুটপাটের মাল ফেলে ছুট লাগাল পড়িমরি করে৷ পঞ্চু ঘরামির চোখে তখনও কিছু ঘুম৷ নইলে ডাকাতদের ধরতে তার দু মাইল ছুটতে লাগে শেষে ডাকাতদের সর্দারকেই জাপটে ধরতে পারল আর এমন একখানা থাপ্পড় লাগাল যে তাতেই স্বর্গলাভ হয়ে তার৷ তারপর থানা–পুলিশ হয়ে কী ছিরকুট্টি কাণ্ড



সেই গল্প আমাদের শোনাতে শোনাতে পঞ্চু ঘরামি হেসে বলে, সে সব কী দিনকাল ছেল, দা’ঠাকুর লোহা চিবিয়ে খেতে পারতাম৷


সেই পঞ্চু ঘরামির বয়স এখন কত হবে তা আর জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠে না৷ কিন্তু এখনও তার চেহারা দেখে ডাকাত দল কেঁপে উঠবে নিশ্চিত৷


শুধু যে ডাকাত মারার গল্পই তার ঝুলিতে তা কিন্তু নয়৷ মাঝেমধ্যে কাজে বা অকাজে এসে কত যে গল্প শোনায় তার সীমাসংখ্যা নেই৷ কখনও শ্মশানকালিতলার মামদো ভূতের গল্প, কখনও সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের মুখে পড়ার গল্প, কখনও কখনও বাজি ধরে এক ধামা নাড়ু এক আসনে বসে খাওয়ার গল্প, কখনও এক পাগলা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বিপত্তির গল্প৷


সেই পঞ্চু ঘরামি আজ হঠাৎ মরাই ছাইতে ছাইতে বলতে শুরু করল এলেভূতের গল্প৷ তখন ভোরের শীত পেরিয়ে দিনের রোদ ঢুকে পড়ছে তার ফনা তুলে৷ শীত কমতে শুরু করেছে গা থেকে৷ তবু শালের ওম গায়ে নিয়ে আমি বলি, এলেভূত সে আবার কী?


–এলেভূত কী তা কি আমিই জানতাম? শুনেছিলাম আমাদের গাঁয়ের লক্ষ্মণখুড়োর কাছে৷


কে লক্ষ্মণখুড়ো তা জিজ্ঞাসা করলে এখন আবার সেই কাহিনি সাতকাহন শোনাতে বসবে পঞ্চু ঘরামি৷ তাতে এলেভূতের গল্পটা মাঠে মারা যাবে৷


কিন্তু পঞ্চু ঘরামি সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে দিল না, বলল, কে লক্ষ্মণখুড়ো তা জানতে চাইলে না তো, দা’ঠাকুর


বাধ্য হয়ে বলতে হল, কে ছিলেন তিনি?



–সে এক ভারী রগুড়ে লোক৷ থাকত আমাদের গাঁয়ে৷ আমাকে দেখলে বলত, পঞ্চু, তোর এরকম পাহাড়ের মতো শরীর তুই ঘর ছেয়ে নষ্ট করলি জীবনটা তোর হওয়া উচিত ছেল মস্ত ব্যায়ামবীর৷ রেবা রক্ষিতের মতো বুকে হাতি তুলতে পারতিস৷ তাতে তোর বাড়িতে পয়সা রাখার জায়গা হত না


রেবা রক্ষিত যে একজন শক্তিমতী মহিলা, সার্কাসে বুকের উপর হাতি তুলে শিহরিত, রোমাঞ্চিত করতেন দর্শককে সে কথা বহুবার শুনেছি আমাদের বাবা–কাকাদের মুখেও৷


রেবা রক্ষিতের প্রসঙ্গ তুললে হয়তো তাকে নিয়েই এখন দশকাহন ফাঁদতে বসবে পঞ্চু ঘরামি৷ তার চেয়ে এলেভূতেই ফিরে যাওয়া যাক এই ভেবে বলি, তারপর পঞ্চুদা, এলেভূতের কী হল?


–তো লক্ষ্মণখুড়োর কথা বলছিলাম না? আমার কাছে আর কী শোনছ তেনার কাছে গল্প শুনলে তিন জনম কেটে যাবে, বুঝলে, দা’ঠাকুর তিনি নাকি সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে একবার গোটা একটা বাঘ মেরে ছিলেন বলে খুব গর্ব ছিল তেনার৷


বাঘের গল্প আমার কাছে যদিও খুব প্রিয়, কিন্তু এখন এলেভূতটা আমাকে এমন উসকোচ্ছে যে, সুন্দরবনের বাঘকেও ঠেলে সরিয়ে দিই একপাশে৷ বলি, তুমি এলেভূতের গল্পটাই আগে বলো, পঞ্চুদা৷


–তো সেই লক্ষ্মণখুড়োর কাছেই শুনেছিনু এলেভূতের কথা৷ বলে পঞ্চু ঘরামি একটু থামে৷ তার গল্পে আবার সেই লক্ষ্মণখুড়োর কথাই ঘুরেফিরে আসে দেখে মুখ কিসমিস করে তাকিয়ে থাকি৷ কার গল্প শুরু হবে এবার, লক্ষ্মণখুড়োর, না এলেভূতের


না, এল দুজনেই৷ একজনের পিঠে আর একজন চড়ে৷


–বুঝলে, দা’ঠাকুর, সেই লক্ষ্মণখুড়ো বলেছিল এলেভূত নাকি জলের মধ্যে থাকে৷ এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়, এক একবার ভুস করে ঠেলে ওঠে উপরে, দপ করে আগুন জ্বালায়, আবার আগুন নিবিয়ে ভুস করে ডুবে যায়৷ আগুনটা নাকি তার নিশ্বাস৷ কখনও জলের মধ্যে একলা মানুষ বাগে পেলে তার ঘাড় ঠেসে ধরে জলের তলায়৷ তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না৷



এতক্ষণে বুকের মধ্যে হাপিসটিপিস করতে থাকে৷ কী জানি কেমন সেই এলেভূত


–বুঝলে, দা’ঠাকুর, এলেভূতের নাম জানতাম, কখনও চোখেও দেখিনি তাকে, সেই এলেভূতের পাল্লায় পড়ব তা স্বপনেও ভাবিনি৷


চমকে উঠে বলি, এলেভূতের পাল্লায় পড়লে? কী সর্বনাশ


–সব্বোনাশ বলে সব্বোনাশ যাকে বলে সাড়ে সব্বোনাশ


–তা কোথায় পেলে সেই এলেভূতকে?


–বুঝলে, সেবার লালতাকুঁড়ি গাঁয়ে গেছি ষাঁড়ের লড়াই দেখতে৷ সে যদি দেখতে ষাঁড়ের লড়াই, তুমি নিশ্চিত ভিরমি খেয়ে যেতে


এলেভূতের মধ্যে ষাঁড়ের লড়াই ঢুকে যাক তা আমি একেবারেই চাই না, কিন্তু পঞ্চু ঘরামির কাছে গল্প শুনতে গেলে মাঝেমধ্যে বেলাইন হবেই তার গল্প৷ আসলে গল্পের পেটে গল্প থাকে পঞ্চু ঘরামির ঝুলিতে৷ কিন্তু না, এবার ষাঁড়ের লড়াইকে রেহাই দিয়ে ফিরে এল এলেভূতের গল্পে৷


–ষাঁড়ের লড়াই দেখে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল সেবার৷ অন্তত পাঁচক্রোশ পথ ফুরুতে হবে জোর পায়ে হেঁটে৷ হয়তো পৌঁছোতে ভোর হয়ে যাবে৷ তাই বড় রাস্তা দিয়ে নয়, সরাসরি মাঠ ভেঙে পেরোচ্ছি অতখান পথ৷ সঙ্গে গাঁয়ের আরও জনাছয়েক ছেলে৷ সবারই জোয়ান বয়স৷ হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই চেনাই দহের বিল৷ সেই বিলের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে কে যেন বলল, ‘পঞ্চুদা, এখেনে বাবলাঘাঁটি গাঁয়ের তিনু সর্দারের লাশ পাওয়া গিয়েছিল না?’ শুনে মনে পড়ে গেল গল্পটা৷ না, ঠিক গল্প নয়, সত্যি ঘটনা৷ পা–দুটো উপরে ভেসে আছে, মুণ্ডসহ শরীরটা নীচে৷


সেই তিনু সর্দারের লাশের গল্প শুরু হবে ভেবে আঁতকে উঠি৷ যদিও জানি পঞ্চু ঘরামি যে–গল্পই শুরু করবে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত দম বন্ধ হয়ে থাকবে৷ কিন্তু তিনু সর্দারের লাশ থেকে গল্প ঘুরে গেল এলেভূতের দিকে৷


–বুঝলে, চেনাই দহের বিলের ধারে কতবার এসেছি দিনমানে৷ বিলের জলও আমাদের তন্নতন্ন চেনা৷ এর মধ্যে বড়বড় রুই আর কাতলায় ভরা৷ এক একটার ওজন হবে পনেরো–কুড়ি কেজি৷ বিয়ের লগনশায় কত–কত যে জাল পড়ে বিলের জলে তার ইয়ত্তা নেই৷ সাতগাঁয়ের মানুষ চেনাই দহের মাছ খেয়ে ধন্য ধন্য করে৷


চেনাই দহ থেকে পঞ্চু ঘরামি কখন যে এলেভূতের গল্পে ঢুকবে আমি সেই প্রত্যাশায় অপেক্ষা করি৷ গল্প তখন ঘাই দিতে থাকে চেনাই দহের জলে৷ লাফিয়ে উঠতে থাকে সেই বিশাল আকারের মাছগুলো৷ শরৎচন্দ্রের কার্তিক আর গণেশদের দেখতে ইচ্ছে হয় মনে মনে৷ কিন্তু সেই লোভ সামলে আমি শুনতে থাকি পঞ্চু ঘরামির গল্প৷


–বুঝলে, তখন চারদিক জনমানবহীন৷ সুনসান করছে গোটা চত্বর৷ ঘুরঘুট্টি আঁধারে কোথাও আলো বলতে নেই৷ হাওয়ায় শব্দ উঠছে শোঁ শোঁ করে৷ এক একটা হাওয়া দমকা মেরে মিলিয়ে যাচ্ছে কোথায় না কোথায় বিলের জল তখন সমুদ্দুরের মতো৷ তার আদ্যন্ত কিছুই বোঝা যায় না আঁধারে৷ চোখে দেখা যায় না তার জল৷ শুধু একটা কালো চাদরের মতো শুয়ে আছে সাত মাইল লম্বা হয়ে৷ আর বিলের ধার ঘেঁসে ফুটে আছে অজস্র নালফুল৷ তার বড় বড় পাতার মধ্যে থিকথিক করছে নালগুলো৷ কিন্তু অন্ধকারে দেখাই যাচ্ছে না তার রং৷ মেঠোপথ এক্কেবারে নির্জন৷ লোকজন দূরের কথা, একটা ঝিঁঝি পর্যন্ত রা কাড়ছে না কোনও দিগরে৷


বললাম, বেশ সংঘাতিক জায়গা, তাই না?


–বেজায় সাংঘাতিক৷ এ সব তল্লাটে সন্ধে হতে না হতেই নিশুত৷ রাতে লোকজন চলাফেরা করে না৷ লোকে বলে সন্ধের পর চেনাই দহের বিলের ধারে নিশি হাতছানি দেয়৷ ডেকে নিয়ে যাবে সুন্দরী মেয়ের রূপ ধরে৷


অধৈর্য হয়ে বলি, তারপর? এলেভূতের কী হল?


–সেইটে বলার জন্যিই তো এত তোড়জোড়৷


–তোমার ভয় করছিল না?


–ভয় পঞ্চু ঘরামি হেসে ওঠে আমার অজ্ঞতায়, বলে, ছোটবেলা থেকে আমার শরীরে ভয়ডর বলতে নেই৷ তা ছাড়া আমরা তো তখন সাতজন আমার একা যেতেও ভয় করত না৷ ভূতের ভয় তো নেইই৷ কতবার বাজি ধরে রেতের বেলা শ্মশানে গেছি মাঝরাতে৷ একবার বাজি ধরার লোকেরা বলল, ‘তুমি যাওনি৷ মিথ্যে বলছ৷’ বলি, ‘তাইলে একটা পাঁচটাকার নোট সই করে রেখে এসো চিতার উপর৷ দেখো ঠিক গে নে আসব’খনে৷’ ব্যস, যে কথা সেই কাজ৷ সই করা নোট নে এসে তাক লাগিয়ে দিছি সবাইকে৷ আর মানুষের ভয় মানুষও আমাকে দেখলে ডরায়৷


আমি শুধু একটা কথা বেফাঁস বলে ফেলতে অমনি আর একটা গল্প পেড়ে ফেলল পঞ্চু ঘরামি৷ তৎক্ষণাৎ গল্পের মুখ ঘুরিয়ে দিতে বলি, তারপর? এলেভূতের কী হল, ও পঞ্চুদা? এল নাকি তোমাদের পথের উপর?


–ওই দ্যাখো, এলেভূত পথের উপর আসবে কী করে? তেনারা তো থাকে জলের মধ্যি৷ তোমারে তো আগেই বললাম৷ তো এলেভূত সত্যিই এল৷


–এল আমার বুকের ভিতর কাঁপ ধরে৷


–হ্যাঁ৷ বিলের ধার দে সাতজনে জোর পায়ে হাঁটছি৷ হঠাৎ দেখি মাইলখানেক দূরে একটা আগুনের ডেলা দপ করে জ্বলে উঠল৷ আমাদের মধ্যে কে একজন বেশ বলল, পঞ্চুদা, ওই দ্যাখো–


আমি দম বন্ধ করে বলে উঠি, কী দেখলে?


–দেখি কি, আগুনের ডেলাটা ভাসছে জলের উপর৷ কিন্তু একসঙ্গে সবাই দেখছে আগুনর ডেলাটা৷ এ নিশ্চয় চোখের ভুল নয়৷ এত দূর থেকেও দেখতে পাচ্ছি আগুনের ডেলাটা ভেসে ভেসে এগোচ্ছে এদিকেই৷ বাকি সবাই তো ভয়ে আটখানা৷ ততক্ষণে জোর পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেছি বিলের মাঝ বরাবর৷ দলের অন্যেরা তখন দৌড় দে পালাতে চাইছে৷ কিন্তু আমি তাদের থামিয়ে বলি, রোসো, ব্যাপারটা কী তা ভালো করে বুঝতি দে৷


একটু পরেই দেখি আগুনের ডেলাটা ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে৷ বেশ জোরেই এগোচ্ছে দপদপ করতে করতে৷ আমাদের পটলা ভয় পেয়ে গোঙাতে থাকে, কী হবে পঞ্চুদা? আজ রেতে নির্ঘাত আমাদের এলেভূতে ধরবে৷


তাদের বুক থেকে ভয় তাড়াতে বলি, অত ভয় কীসের? ভূত সামনে এলে কষে ধমক দিবি৷ যাক গিয়ে, এখন তাড়াতাড়ি পা চালা৷


–নিজের জন্য নয়৷ ভূতে আমাকে কখনও কাবু করতে পারবে না৷ ভূতদের যা হাড়গিলে চেহারা, তাতে আমার নিরানব্বই সিক্কার ঘুষি সামলাতে দম বেরিয়ে যাবে ব্যাটাদের৷ কিন্তু দলের বাকি ছ’জন এমন হুড়তাড় করছে যে জায়গাটা পার হতে পারলেই যেন বাঁচে৷ পা চালিয়ে ছুটছে সবাই৷ উদ্দেশ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এলেভূতের আওতা থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়া৷ কিন্তু হল কি, হঠাৎ সাঁইসাই করে একটা দমকা হাওয়া লাফিয়ে চলে এল আমাদের ঘাড়ের উপর৷ তখন সামনে বিশাল জল কালো রং মেখে ভুষ হয়ে আছে, তার মধ্যে রাশ রাশ নালফুল ফুটে আছে, সেগুলোর রংও তখন মিশকালো, আমরা হাওয়া সামলে হাঁটছি এলোমেলো পায়ে, সে সময় দেখি কি আগুনের ডেলাটা ভুস করে নিভে গেল৷ যেই না হাঁপ ছেড়ে ভাবছি, যাক, বোধহয় নিস্তার পাওয়া গেল এলেভূতটার হাত থেকে৷ বোধহয় জানতে পেরেছে দলটার সঙ্গে পঞ্চু ঘরামি আছে৷ বেশি জারিজুরি খাটবে না৷ কিন্তু সে বোধহয় কিছুক্ষণ, হঠাৎই দেখি আগুনের ডেলাটা ভেসে উঠল আমাদের একেবারে কাছে৷ বলতে গেলে হাতার মধ্যে৷ তক্ষুনি বিশে নামের একটা ছেলে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠে প্রায় ভিরমি খাবার জোগাড়৷ তাকে এক ধমক গিয়ে বলি, চুপ, চুপ৷ যে–ছোঁড়া ভয় পাবে তার গা বেয়ে উঠে পড়বে এলেভূত৷


–কিন্তু তাতেও কারও ভয় ভাঙে না, কেউ কেউ অন্ধকারে দৌড় লাগাল বিলের পাশে পাশে চলতে থাকা মেঠেপথ ধরে৷ কিন্তু এলেভূতের আওতা থেকে রেহাই পাওয়া যে অত সহজ কাজ নয় তারও প্রমাণ পাওয়া গেল পরক্ষণেই৷ আগুনের ডেলাটা নিভে গিয়ে যেদিকে ছেলেগুলো দৌড়োচ্ছিল সেখানেই গিয়ে ভেসে উঠল৷ তারা সে–দৃশ্যে এত ভয় পেয়ে গেল যে, পরক্ষণে যতটা এগিয়েছিল ততখানি পিছিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে, ‘পঞ্চুদা, বাঁচাও৷’ তখন বললাম, ‘ধুস, ভূতফুত বলে কিছু নেই৷ চল, আমরা এলেভূতটারে তেড়িয়ে ধরি৷ আয়, জলে নামি৷ দেখবি পালিয়ে পথ পাবে না’৷ তাড়িয়ে ধরার প্রস্তাবে সবাই তো আরও থতমত৷ বলল, ‘তা কী করে হবে, পঞ্চুদা? এলেভূত তো গা বেয়ে ওঠে শুনেছি৷’ তাদের বুকে সাহস ভরতে বললাম, ‘একটা বুদ্ধি বার করেছি৷ সবাই মিলে রামনাম করবি৷ তাহলে আর এলেভূত গা বেয়ে উঠতে পারবে না৷ রামের কাছে ব্যাটারা জব্দ৷ আর সেই ফুরসতে আমরা ভূতটারে ধরব৷ কাউকে ওর গায়ে হাত লাগাতে হবে না৷ সে কাজটা আমার৷’ তো যে কথা সেই কাজ৷ কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিলের জলে৷ নালফুল সরিয়ে পৌঁছে যাই আগুনের ডেলাটার কাছে৷ তাকে ঘিরে এগোতে থাকি৷ সবাই তখন রামের পায়ে তেল মাখাচ্ছে৷ কিন্তু চোখে মুখে যেমন আতঙ্ক, তেমনই কৌতূহল৷ কী হবে আগুনের ডেলাটার কাছে গেলে তা ভেবে সবাই রুদ্ধশ্বাস৷ কিন্তু বরাত এমনই যে, যেই মাত্তর আগুনের ডেলাটার কাছে পৌঁছে গেছি, অমনি দপ করে নিভে গেল আগুনটা৷ আমরা বোকার মতো এ ওর দিকে তাকিয়ে থাকি৷ পরক্ষণে দেখি আর একটু দূরে ভেসে উঠেছে আগুনটা৷ বলি ‘দ্যাখ, কেমন ভয় পেয়েছে এলেভূত’ অমনি কে যেন বলল, ‘ঠিক বলেছ, পঞ্চুদা৷ কী’রম ঘাবড়ে দিয়েছি বলো?’ কথাটা সবার মনে ধরে৷ অমনি সবাই হইহই করে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার চারদিক ঘিরে৷ এগোচ্ছি সবাই৷ গোল হয়ে ঘিরে ধরছি আগুনের ডেলাটাকে৷ ভয়ও কেটে গেছে৷ যেই না তার কাছে পৌঁছেছি, অমনি আবার নিভে গেল আগেরবারের মতো৷ ছেলেদের সাহস দিতে বলি, ‘দেখলি তো, কী ভয় পেয়েছে ব্যাটা?’ তখন সবাইকার মধ্যে একটা বিপুল উত্তেজনা৷ পরক্ষণে যেই না একটু দূরে জ্বলে উঠেছে আগুনটা, অমনি আবার এগোতে থাকি তার চারপাশ ঘিরে৷ বলি, আজ রেতে ধরবই ব্যাটাকে৷ চল্ রে, বিশে–


এই পর্যন্ত শুনে আমার আর ধৈর্য থাকে না, বলি, তারপর? ধরা পড়ল এলেভূত?


–কী আর বলি, দা’ঠাকুর? সে এক ভারী আজব গল্প৷


–কী আজব গল্প, পঞ্চুদা?


–সারারাত ক’জনে মিলে কী তাড়াই না করলাম এলেভূতটারে৷ তারপর বুঝলাম এলেভূতটা আমাদের চেয়েও ঢের বুদ্ধিমান৷


–বুদ্ধিমান আমার ঠিক প্রত্যয় না পঞ্চুদার কথায়৷ ভূতের আবার বুদ্ধি থাকে নাকি?


পঞ্চু ঘরামি হাসে, থাকে না আবার? সাত–সাতটা ছেলেকে সারাটা রাত ধরে লণ্ডভণ্ড করে দিল ধোঁকা দিয়ে কী ঘোরানটাই না ঘোরাল তাইলে রগড়টা শোনো মন দে৷


বলে আবার শুরু হয় তার গল্প, বুঝলে, তো এরকম তেড়িয়ে নে যাচ্ছি তারে এক–একবার, আর এলেভূতটা পালিয়ে যাচ্ছে বারবার৷ তো আমার ছেলেরা তখন মরিয়া৷ ততক্ষণে ভোরের রং দেখা দিচ্ছে পুব আকাশে৷ ফরসা হয়ে আসছে পৃথিবী৷ কিন্তু এলেভূতটা তখনও চোর–পুলিশ খেলে যাচ্ছে একনাগাড়ে৷ শেষে এমন হল আমরা একেবারে এলেভূতের হাতার মধ্যে৷ আমার হাতদুটো তো প্রায় আঁকশির মতো সিঁড়িঙ্গে৷ যেই না তারে বাগে পেয়েছি, অমনি একটা লম্বা লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আগুনের ডেলাটার ঘাড়ে৷ আর–


–আর? তখন আমারও শ্বাস রুদ্ধ, পেলে এলেভূত?


পঞ্চু ঘরামি হাসে, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসল মিটিমিটি, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সে এক রগড়ের কাণ্ড


–কী রগড়? আমারও তর সইছে না শেষটা জানতে৷


–আগুনের ডেলাটা নিভে গেল দপ করে৷ কিন্তু আমিও ছাড়বার পাত্র নই৷ আগুনটার সাথে সাথে আমিও দিলাম ডুব যাতে ফসকে না যায় ব্যাটা৷ কিন্তু হাতড়ে মাতড়ে কী পেলাম জানো?


–কী?


–একটু ফুটো মালসা৷


সারারাত এলেভূতের পিছনে এক কোমর জলে ছুটে বেড়িয়ে শেষে একটা ফুটো মালসা পেয়েছে শুনে আমার ঠিক মন ভরে না৷ এত কষ্ট শেষে সব বৃথা?


পঞ্চু ঘরামি তখন মিটমিট করে হাসছে৷ বুঝলে দা’ঠাকুর, আসলে কী জানো, ভূতটুতকে যত ভয় পাবে তত সে চেপে বসবে গাড়ে৷ তারে যদি তুমি টুঁটি ধরে চেপে ধরতে চাও তো দেখবে লেজ গুটিয়ে চোঁ চাঁ দৌড় দেবে উল্টোমুখো৷


পঞ্চু ঘরামির গল্পটা শুনে ঠিক তৃপ্তি হয় না কেন যেন৷ পরদিন স্কুলে গিয়ে মাস্টারমশাইকে বলি গল্পটা৷ শুনে মাস্টারমশাই তো হেসে বাঁচেন না, বললেন, পঞ্চু ঘরামি বলেছে এই গল্প? আর তুমি তা বিশ্বাস করলে?


ঠিক বিশ্বাস করিনি, আবার অবিশ্বাসও করিনি, কেন না পঞ্চুদা এর আগেও তার নির্ভীকতার গল্প আরও অনেক শুনিয়েছে৷ তা ছাড়া এলেভূতের কাণ্ডকারখানা শোনার পরেও তার পিছনে ধাওয়া করেছে, সেই ধরার মধ্যেও তো এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ৷


পরদিন মাস্টারমশাইয়ের কথা মতো পঞ্চুদাকে গিয়ে বলি, পঞ্চুদা, আসলে কী জানো, এলেভূত বলে কিছু নেই৷ আসলে ওটা মিথেন গ্যাস৷ অনেকদিনের জমে থাকা জলের মধ্যে এই গ্যাসের সৃষ্টি হয়৷ সেই গ্যাস বুদবুদ কেটে ওঠে জলের নীচে থেকে৷ সেই গ্যাস যখন জলস্তর পেরিয়ে উপরে বাতাসের সংস্পর্শে আসে তখনই জ্বলে ওঠে আগুন৷ গ্যাস ফুরিয়ে গেলেই আগুন নিভে যায়৷ তখন অন্য জায়গায় গ্যাস উঠতে থাকে৷ সেখানে আবার আগুন ধরে৷


কথাটা শুনে অনেকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে৷ তার অভিব্যক্তি দেখে অনুমান করি কথাটা পছন্দ হয়নি পঞ্চু ঘরামির, বলল, তোমরা লেখাপড়া শিখে কী যে সব বলো, দা’ঠাকুর....


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page