Search

রোজকার অনন্যা লাইফঃ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ভ্যালেন্টাইন্স ডে ফ্যাশনিস্তা , থ্রিলার উপন্যাস প্রাক্তন













প্রাক্তন

-আবীর গুপ্ত

(এক)

বিপাশা বেড়াতে ভালোবাসে, অ্যাডভেঞ্চারও ভালবাসে, তাই দু তিন মাস অন্তর অন্তর বেরিয়ে পড়ে ঘুরতে, অ্যাডভেঞ্চারের লোভে। বসে আছে ছিটকুল্ বলে একটা গ্রামে, নদীর পাশে একটা কাঠের বেঞ্চিতে। ছিটকুল গ্রামটা হিমাচল প্রদেশের কিন্নৌর জেলায় অবস্থিত। এই গ্রামের পর আর কোন গ্রাম নেই, চিনের সীমান্ত শুরু হয়ে যাচ্ছে। মাত্র চারটি দোকান, তার মধ্যে একটি ধাবা, যার সাইনবোর্ডে লেখা আছে “হিন্দুস্তান কি আখরি ধাবা”। এই চারটি দোকান ক্রস করে বেশ খানিকটা পায়ে চলা পথ অতিক্রম করে তারপর নদী। প্রচন্ড স্রোত, সমানে জলের কুলকুল আওয়াজ, তার সঙ্গে নাম-না-জানা পাখির ডাক। ওর কাঁধের ব্যাগপ্যাকে একটা ডি. এস. এল. আর. পেনট্যাক্স ক্যামেরা, যার বডিতে 100 থেকে 600 জুম লেন্স লাগানো । আরো একটা ক্যামেরা আছে, যেটা ওর সবচেয়ে প্রিয়, নিকন পি 900। পেনট্যাক্স ক্যামেরায় যা জুম হয় তার থেকে অনেক অনেক গুণ বেশি জুম হয় এতে। এটি সেমি ডি এস এল আর ক্যামেরা যার জুমিং পাওয়ার 83 এক্স। ব্যাগ থেকে ছোট্ট নিকনের স্পোর্টসস্টার বার্ড ওয়াচিং বাইনোকুলারটা বার করে চোখে লাগালো, বহুদূরে গাছের মাথায় যে পাখিটা ডাকছে চিনতে পারল - এশিয়ান গোল্ডেন ওরিওল। পাখিটা পুরুষ পাখি । ব্যাগ থেকে থার্মোস্টিল ফ্লাস্কটা বার করে কাগজের কাপে চা ঢেলে চুমুক দিল। এখানে ভয়ঙ্কর ঠান্ডা, হোটেল থেকে বলেছে আর কয়েকদিন পরেই নাকি বরফ পড়া শুরু হয়ে যাবে।

চা খেতে খেতে চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল, লোকজন অর্থাৎ টু্রিস্ট প্রায় নেই বললেই চলে। ধাবায় বসে দুজন লোকাল আর একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক চা খাচ্ছেন। সম্ভবত ওই টুরিস্ট ভদ্রলোকের স্ত্রী, পুত্র আর কন্যা দূরে একটা বেঞ্চিতে বসে আছে কারণ বাচ্চা মেয়েটি বারবার “ড্যাডি ড্যাডি” করে ভদ্রলোককে ডাকছে কিন্তু খরস্রোতা নদীর জলের আওয়াজে উনি শুনতে পাচ্ছেন না। বিপাশার এরকম ধারণা হয়েছে এই কারণে যে ভদ্রলোক উল্টো দিকে তাকিয়ে একমনে কিছু একটা দেখছেন। উনি কি দেখছেন? বিপাশা ওই দিকে তাকিয়ে বহুদূরে তিন জন মানুষকে কথা বলতে দেখল। দুজন পুরুষ আর একজন মহিলা, ড্রেস দেখে এরকমই ওর মনে হল। কৌতুহলবশে বাইনোকুলারে চোখ লাগালো। মহিলা অল্পবয়সী আর বেশ অ্যাকট্রাক্টিভ, ড্রেসটা যা করেছে তা ছেলেদের মাথা ঘোরানো পক্ষে যথেষ্ট। এবারে ছেলে দুজনের দিকে নজর দিল। প্রথমজনের মুখ ওর দিকে ফেরানো, মাঝবয়সী আর মুখে দাড়িগোঁফ আর সানগ্লাস। বাকি অংশ উলেন গার্মেন্টসে ঢাকা। দ্বিতীয়জনের পিছনটা দেখতে পাচ্ছে কারণ মানুষটি ঐ দাড়ি-গোঁফ সানগ্লাস পরা লোকটির সঙ্গে কথা বলছে। হঠাৎ মানুষটি মাথা ঘোরালো, নদীর দিকে তাকালো। বিপাশা চমকে উঠল, বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেল – এ তো শ্রীকান্ত! মুহুর্তের মধ্যে ওর মন চলে গেল অতীতে, তিন বছর আগে। ধীরে ধীরে ওর মুখে নেমে এলো বিষাদের ছায়া – এই অতীত মোটেই সুখকর নয়।ও ভুলতে চায়, কিন্তু পারছে কোথায়?



(দুই)

বিপাশা গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করেছিল কলকাতার এক নামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে। পড়াশোনায় খুব যে ভালো তা নয়, আসলে ভালো অ্রাথলেট্। তাছাড়া সুন্দর দেখতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকেছিল প্লেয়ারস কোটায়। এম. এস. সি. পড়বে বলে ভর্তিও হয়েছিল ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কিন্তু পোস্ট গ্রাজুয়েশনটা করার আগেই হঠাৎই মডেলিংয়ে সুযোগ পেয়ে গেল। আর সেখান থেকে সিনেমার পর্দায়। অতি দ্রুত উত্থান। ওর চরিত্র কিন্তু বদলালো না, একই রকম রইল। প্রতি মাসে অথবা প্রতি দু-মাসে একবার বেরিয়ে পরতো ঘুরতে। যেখানে ট্রেকিং আছে, অ্যাডভেঞ্চার আছে, সেই সব জায়গা ওকে আকর্ষণ করতো।ছাত্রাবস্থায় বাবা-মার দেওয়া হাত খরচের টাকায় যা করতে পারত না, মডেলিংয়ের টাকায় সেই সব ইচ্ছা পূরণ করা শুরু করল। বিশেষ করে বেড়ানোর ইচ্ছা।

মডেলিংয়ের অ্যাসাইনমেন্ট ওকে যেতে হল নর্থ বেঙ্গলের নেওরা ভ্যালিতে কোলাখাম বলে একটা গ্রামে। অত্যন্ত সুন্দর গ্রাম। ন্যাচারাল বিউটি ওকে মুগ্ধ করল। এখানেই চার কিলোমিটার দূরে একটা ওয়াটার ফলসয়ের সামনে শুটিং হচ্ছিল। দুপুর বেলায় লাঞ্চ সেরে একাই হাঁটতে হাঁটতে চলে গিয়েছিল জঙ্গলের ভিতর। সেইখানে হঠাৎই দেখলো ওর বয়েসী অথবা ওর থেকে দুই এক বছরের বড়ো একটা ছেলে সিগারেট মুখে চারপাশ দেখতে দেখতে বেরিয়ে আসছে। ওকে দেখে একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞাসা করলো-

- আপনি কি জঙ্গলের আরো ভিতরে যাবেন! আপনি একা না সঙ্গে লোকজন আছে?

বিপাশা একটু হেসে জবাব দিল –

- একাই এসেছি। আরো একটু ভিতরে ঢুকে ব্যাক করবো। আসলে জায়গাটা এত সুন্দর।

- বেশি ভিতরে যাবেন না, এখানে ভালুক আছে। আমি অবশ্য বেশি ভিতরে যাই নি, একজন লোকাল লোকের সঙ্গে দেখা হল, সে আমাকে যেতে নিষেধ করল। চলুন আমি আপনার সঙ্গে যাচ্ছি, তারপর আপনাকে হোটেলে পৌঁছে আমার ছুটি।

বিপাশা প্রথমে ভেবেছিলো ওকে নিষেধ করবে তারপর কি ভেবে কিছু না বলে হাঁটা লাগালো। ছেলেটি কোন কথা না বলে চুপচাপ ওর পিছনে হেঁটে আসছিল। বেশ খানিকটা এগিয়ে পিছন ফিরে দেখল ছেলেটাও ওর পিছনে আসছে। ওকে পিছন দিকে তাকাতে দেখে ছেলেটি বলল –

- ম্যাডাম, আর না এগোনোই বোধহয় বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

বিপাশা কোন কথা না বলে ব্যাক করে হাঁটা লাগালো। শ্যুটিং স্পট ওবধি ছেলেটি পিছনে ছিল। শুটিং স্পটে পৌছে বিপাশা বলল –

- থ্যাঙ্কস্। আমি বিপাশা। আসছি।

-অধম শ্রীকান্ত হাজরা। কোন দরকার হলে জানাবেন। আমি আপনার হোটেলেই উঠেছি।

এই হল ওদের দুজনের প্রথম আলাপ এর গল্প।


(তিন)

বিপাশার সঙ্গে শ্রীকান্ত ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকলো কারণ দুজনে একই হোটেলে উঠেছে। প্রতিদিনই সকালে মর্নিং ওয়াকে দেখা হয়, বিকালে বা সন্ধ্যার সময় যখন হোটেলে ফেরে দেখে শ্রীকান্ত ব্যালকনিতে বসে আছে। তারপর আড্ডা চলে ঘন্টার পর ঘন্টা। শ্রীকান্ত একটা নিউজ চ্যানেলের সঙ্গে যুক্ত। ও ক্রাইম রিপোর্টার। কথায় কথায় এটাও শ্রীকান্ত জানালো ওই চ্যানেলের অর্ধেক মালিক ও নিজেই। শ্রীকান্ত কোলাখামে মাসখানেক ধরে আছে, আরও নাকি মাসখানেক থাকবে। শুটিং শেষ হওয়ার পরে বিপাশা কলকাতা ফেরত এলেও ফোনে যোগাযোগ থাকলো। তারপর, কলকাতায় ফিরে শ্রীকান্ত বিপাশার সঙ্গে দেখা করতে চাইলো। বিপাশা ওর ব্যস্ত শিডিউলের মধ্যেও সময় বার করে চলে গেল ঢাকুরিয়া লেকে। দীর্ঘ এক মাস বাদে দুজনের দেখা, দুজনেই কোলাখামের, নেওরা ভ্যালির সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলতে বলতে চলে গেল ওদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে। সে সময়, হঠাৎ-ই, শ্রীকান্ত বিপাশাকে প্রোপোজ্ করে বসল। বিপাশা এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। দু'দিন সময় চাইল। একটা কথা বিপাশার মনে ধরেছিল - শ্রীকান্তকে কাজের সূত্রে প্রতি মাসেই আট দশ দিনের জন্য নানা জায়গায় যেতে হয় যেগুলো অনেকের কাছেই দুর্গম জায়গা। শ্রীকান্তর ইচ্ছা, বিপাশাও সেই সমস্ত জায়গায় শ্রীকান্তর সঙ্গে থাকলে দুজনের বেড়ানো, অ্যাডভেঞ্চার যেমন হবে তেমনই শ্রীকান্তর কাজটাও সহজ হয়ে যাবে। কী কাজ? ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে খবর সংগ্রহের কাজ। বান্ধবী বা স্ত্রীর সঙ্গে অর্থাৎ বিপাশাকে ওর সঙ্গে দেখলে ওকে কেউ ক্রাইম রিপোর্টার হিসেবে সন্দেহ করতে পারবে না।

দুদিন বাদে বিপাশা ওকে ওর বাড়িতে ডিনারে ইনভাইট করলো। শ্রীকান্ত এলে ডিনারের পর বিপাশা ওর ডিসিশন জালাল। শ্রীকান্তকে বিয়ে করতে ওর আপত্তি নেই তবে সেটা আরো বেশ কিছুদিন বাদে। এ-কদিন ওরা এক সঙ্গে ঘুরবে, বেড়াবে, পরস্পরকে আরো ভালো করে চিনবে। যদি দুজনেই মনে করে ভবিষ্যতে ওরা একসঙ্গে স্বামী-স্ত্রী হিসাবে বিবাহিত জীবন কাটাতে পারবে তবেই বিয়ে করবে। তা নাহলে, ভাল বন্ধু হিসাবেই বাকি জীবন কাটিয়ে দেবে। আসলে ওর বাবা-মার বিবাহিত জীবন সুখের নয়, পাঁচ বছর পর ওর বাবাকে ছেড়ে মা চলে যায় ওর বাবার এক বন্ধুর সঙ্গে। ডিভোর্স হয়নি, ইনফ্যাক্ট মা করতে চায় নি। করতে চায় চায় নি বলাটা ঠিক হবে না, উনি পাঁচ-ছয় মাস ছোট্ট তিন বছরের বিপাশার খোঁজ খবর নিয়েছিলেন তারপর আর কোনরকম যোগাযোগ করেন নি। বিপাশার বাবা আবার বিয়ে করেন এবং বিপাশাকে পাঠিয়ে দেন কালিম্পংয়ের একটি রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে। প্রতি মাসে টাকা পাঠিয়ে উনি ওর দায়িত্ব ঠিকই পালন করতেন। তাই, বাবা-মার ভালোবাসা কি তা ও জানে না।


(চার)

প্রতি মাসে দিন দশবারোর জন্য শ্রীকান্তকে নানা জায়গায় যেতে হত। কখনও নর্থ বেঙ্গলের বা নর্থইস্টয়ের নানান দুর্গম অঞ্চলে, কখনো বা হিমাচল প্রদেশের বর্ডার অঞ্চলে, এমনকি কাশ্মীর বা লেহ্ লাদাখেও। সবসময় বিপাশা ওর সঙ্গে যেত। প্রথম ওর সঙ্গে ঘুরতে গিয়েছিল সিকিমের জুলুক গ্রামে। গ্রামটি রিমোট জায়গায় পাহাড়ের মাথায়। কোনো হোটেল নেই। একজন গ্রামবাসীর বাড়িতে হোম-স্টের ব্যবস্থা আছে। সেখানেই উঠেছিল। ওই বাড়িতে আরো বেশকিছু ঘরে প্রচুর ফরেনারের দেখা পেয়েছিল। সবাই টুরিস্ট। একটা ডাবল বেডেড রুম শ্রীকান্ত বুক করেছিল। বিপাশা বুঝতে পেরেছিল শ্রীকান্ত কী চায়। সেক্সের ব্যাপারে বিপাশার অভিজ্ঞতা যে নেই তা নয়। ১৬ বছর বয়সে ওর প্রথম প্রেমিক একটি নেপালি ছেলের সঙ্গে সহবাস করেছিল। তারপর, মডেলিং-এ যোগ দেওয়ার পর ওকে দু-তিনবার কাজ পাওয়ার জন্য দুজনকে খুশি করতে হয়েছে। কিন্তু, ও বিষয়টাকে এড়িয়ে চলে। দৈহিকভাবে কুমারী না হলেও মনের দিক থেকে কুমারী। তাই, শ্রীকান্তর সঙ্গে অ্যাডজাস্ট করতে অসুবিধা হল না। কিন্তু, জুলুকে সমস্যা হল। ও কোন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়নি, বিষয়টা বুঝতে পারেনি বলে। অনুমানও করে নি। তাই, জুলুক থেকে ফেরার পর কলকাতায় মডেলিংয়ের শুটিং এর সময় প্রথম অসুবিধা টের পেল। প্রেগনেন্সি টেস্ট করে বুঝতে পারল প্রেগন্যান্ট। এই সময় বাচ্চাকাচ্চা কেউই চায় না, বিপাশা তো নয়ই কারণ সে সময়ে ও একটা সিনেমায় প্রথম চান্স পেয়েছিল। তাই, অ্যাবরশন করাতে বাধ্য হল। প্রতি মাসে শ্রীকান্তর সঙ্গে ঘুরতে ওর খুবই ভালো লাগতো। প্রতি ক্ষেত্রেই ওর সবচাইতে বিরক্তিকর লাগতো যখন শ্রীকান্ত ওকে হোটেলে রেখে একাই ঘন্টা পাঁচ ছয়ের জন্য নিজের কাজের সূত্রে বেরিয়ে যেত। কখনও কখনও এমনও হয়েছে, ওকে পাহাড়ের মাথায় বা জঙ্গলের মধ্যে কোথাও বসিয়ে শ্রীকান্ত চলে গিয়ে ফিরেছে ২-৩ ঘন্টা বাদে। কিছু বলতে গেলে হেসে বলতো, ও নাকি বিপাশাকে কোন রিস্কের মধ্যে ফেলতে চায় না। ধীরে ধীরে বিপাশার কাছে এটা অভ্যাসের মধ্যে এসে গিয়েছিল। এই টুকু বাদ দিয়ে শ্রীকান্ত ছিল পারফেক্ট জেন্টলম্যান। ওর বিরুদ্ধে কোন মেয়ের কোন অভিযোগ থাকতেই পারে না। বয়ফ্রেন্ড হিসাবে এত কেয়ারী পুরুষ পাওয়া খুবই মুশকিল। এতকিছুর পরও সমস্যা হল। শেষবার কাশ্মীরের গুলমার্গয়ের গন্ডোলায়। কেবল্ কারে চেপে দুজনে পাহাড়ের মাথায় ওঠার পর যথারীতি ওকে ফেলে শ্রীকান্ত চলে গিয়েছিল। ওর ফিরতে দেরী হচ্ছে দেখে বিপাশা যখন চারপাশে ঘুরে ঘুরে প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখছিল তখনই চোখে পড়েছিল সেই দৃশ্য। শ্রীকান্ত সঙ্গে একটি মেয়েকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায়। দুজনের ঠোঁটে ঠোঁট দিয়ে চুমু – দৃশ্যটা আজও ওকে ভয়ঙ্কর কষ্ট দেয়। সেই মুহূর্তে, সেখান থেকে ফিরতি কেবল্ কারে চেপে নীচে। তারপর, প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে হোটেল আর সেই রাতেই ফ্লাইটে দিল্লি হয়ে কলকাতা। তারপর, শ্রীকান্ত একবার ফোন করেছিল কিন্তু ও ফোন না ধরে হোয়াটস্ অ্যাপে সম্পর্ক রাখতে চায় না জানানোর পর ও আর কোনদিন ফোন করে নি।


(পাঁচ)

বিপাশার মন ফিরে এলো বর্তমানে। শ্রীকান্তর সঙ্গে থাকা ছেলেটি হাত টাত নেড়ে কিসব বোঝাচ্ছে। আঙুল দিয়ে নদীর উল্টোদিকের জঙ্গলে কিছু একটা দেখালো। তিনজনের মধ্যে কোন কিছু নিয়ে তর্কাতর্কি চলছে, ওদের হাবভাব দেখে সেরকমই মনে হলো। বিপাশার মনে হচ্ছিল শ্রীকান্তদের বাইনোকুলারে দেখা বন্ধ করে ওর সামনে থাকা সুন্দর প্রকৃতি, এতটাই সুন্দর যে ওর মনে হচ্ছিল কাশ্মীরের বিউটিও এর কাছে তুচ্ছ, এই সৌন্দর্য মন প্রাণ ভরে উপভোগ করবে। কিন্তু মেয়েলি কৌতূহল, তাই, ইতস্তত করেও বাইনোকুলার থেকে চোখ সরাতে পারল না। এবারে তিনজন হাঁটতে হাঁটতে যে জায়গায় গেল সেটা একেবারে নির্জন, তিন দিকে উঁচু আগাছায় ঢাকা পাথরের কৃত্রিম ওয়াল। যেদিকটা ফাঁকা সেদিক থেকেই একটা অ্যাঙ্গেলে বিপাশা বাইনোকুলার দিয়ে দেখছে। এই অ্যাঙ্গেলে, নদী আর বেঞ্চ ছাড়া আর কিছু পড়ে না। আর দূরত্বটা এতটাই বেশি যে অটোমেটিক্যালি এই অঞ্চলের সবচেয়ে নির্জন জায়গা ওটাই। ওরা তিনজনে একটা ঝোপের কাছে গেল। ঝোপের ভেতর থেকে শ্রীকান্ত লম্বা কী একটা টেনে বার করে ছেলেটির হাতে দিল। বিপাশার লম্বা জিনিসটাকে ভালো করে দেখে একটা বন্দুক জাতীয় কিছু বলে মনে হল। পুরোটা দেখা যাচ্ছে না, কারণ অর্ধেকটা মেয়েটার শরীরের পিছনে চলে গেছে। হঠাৎ মেয়েটা সরে গিয়ে ঝোপের ভেতর হাত ঢোকালো। এবারে ওই লম্বা বন্দুক জাতীয় জিনিসটাকে দেখা যাচ্ছে, ওর হাতল ট্রিগার সবই দেখা যাচ্ছে। এই বস্তুটির ছবি আর মডেল বিপাশা স্টুডিও পাড়ায় দেখেছে। সিনেমাতে ব্যবহার করা হয়। এটা এ কে ফরটিসেভেন রাইফেল। বিপাশার প্রাথমিকভাবে ধারনা হল এটা সিনেমায় যেমন ব্যবহার হয় সেরকম নকল বন্দুক। মেয়েটার হাতে দুটো রিভলভার। একটা নিজে জ্যাকেটের ভিতরে ঢুকালো অন্যটা ছেলেটাকে দিল। ছেলেটা সেটা জ্যাকেটের ভিতরে ঢুকালো। এবারে যেগুলো ঝোপ থেকে বার করলো সেগুলো একটু লম্বাটে বলের মত, প্যাঁচানো - সম্ভবত গ্রেনেড। বিপাশা, প্রাথমিক হতভম্ব ভাব কাটিয়ে হাতে নিকন পি-৯০০ ক্যামেরাটা তুলে নিয়ে জুমিং করে ফটাফট ছবি তুলে যাচ্ছে। শ্রীকান্তর দুই হাতে দুটো রিভলবার, একটা কোমরে গুঁজে দ্বিতীয়টা জ্যাকেটের ভিতরে ঢোকালো। তিনজনেই ঝোপ থেকে দুটো করে গ্রেনেড বার করে জ্যাকেটে ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে ঝোপের আশপাশ থেকে বেশ কিছু ডালপালা এনে জায়গাটা ভালো করে ঢেকে ওখান থেকে চলে এল। ছেলেটা চলে গেল। শ্রীকান্ত মেয়েটার কোমর জড়িয়ে হাজবেন্ড ওয়াইফের স্টাইলে হাঁটতে-হাঁটতে এসে ধাবার বেঞ্চিতে বসে পড়ল। বিপাশার ততক্ষণে গোটা ২২-২৩ ছবি তোলা হয়ে গেছে। বিপাশা হতভম্ব হয়ে ভাবছে – শ্রীকান্তর যা পেশা তাতে একটা রিভলভার সঙ্গে রাখাটা জরুরি যদিও অতীতে কখনও তা ওকে রাখতে দেখেনি। তাহলে এত আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ওরা কি করছে! কোথাও যুদ্ধ করতে যাচ্ছে!



(ছয়)

বিপাশা বেঞ্চে বসে ডিসিশন নিলে শ্রীকান্তকে শেষ অব্দি ফলো করে দেখবে ও কি করতে চাইছে। একজন ক্রাইম রিপোর্টারের এত অস্ত্রের প্রয়োজন হয় নাকি! সম্ভবত ওর অন্য কোন প্ল্যান আছে। সেটা খারাপ না ভালো তা জানা দরকার। যদি ভাল হয় তাহলে চুপচাপ ওকে জানতে বা বুঝতে না দিয়ে চলে যাবে। আর যদি খারাপ উদ্দেশ্য থেকে থাকে তাহলে সেই উদ্দেশ্যটাকে নষ্ট করে দিতে হবে। সেটা কীভাবে তা ও জানে না, তবে এটুকু বোঝে ওর যা বুদ্ধি আছে, তাতে বিপদে পড়লে বিপদ থেকে বুদ্ধি খাটিয়ে বেরিয়ে আসতে পারবে। তাছাড়া ওর একটা প্লাস পয়েন্ট হচ্ছে ও এখন তো সেলিব্রিটি। দু-দুটো সিনেমা রিলিজ্ করেছে যার একটাতে ও নায়িকা। বেঞ্চে বসে চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে দূরের গাছের মাথার পাখি দেখার ভান করলেও আঢ় চোখে কিন্তু ধাবায় বসা শ্রীকান্ত কি করছে তা দেখছিল। শ্রীকান্ত ওই মেয়েটির সঙ্গে চা খেতে খেতে গল্প করছিল। চায়ের দোকানে যে দুজন লোকাল মানুষ ছিলেন তারা উঠে চলে গেছেন। মাঝবয়সী ভদ্রলোকও চলে এসেছেন ফ্যামিলির কাছে। বেঞ্চে বসে স্ত্রী, পুত্র আর মেয়ের সঙ্গে গল্প করছেন। ওদের চা খাওয়া হয়ে গেলে ওরা উঠে দাঁড়ালো। শ্রীকান্ত পেমেন্ট করে মেয়েটিকে নিয়ে ধাবা থেকে বেরিয়ে চারপাশে দেখা শুরু করলো বিপাশা বাইনোকুলারটা ব্যাগে ঢুকিয়ে সানগ্লাসটা পড়ে নিল। সানগ্লাস পড়া অবস্থায় দূর থেকে ওকে চেনা সম্ভব নয়। ওরা দুজনে জঙ্গলের দিকে হাঁটা লাগালো। বিপাশা যথেষ্টই হতভম্ব হয়ে গেল কারণ ওই ঘন জঙ্গলে ওরা কেন যাচ্ছে! এই দিকটা নদীর অন্য দিক। নদী অতিক্রম করে একটা পর্বতের সারি আর তারপরেই চিনের সীমান্ত। জঙ্গলের বিস্তার বিশাল। জঙ্গলের পর যে পর্বতের সারি রয়েছে তাতেও এই জঙ্গল বিস্তৃত। ভালুক, চিতাবাঘ, স্নো লেপার্ড, হাতি ছাড়াও এই জঙ্গলে অন্য হিংস্র প্রাণী আছে। ছিটকুলে আসার আগে ছিটকুলের আশেপাশের বন্যপ্রাণী সম্বন্ধে জানতে গিয়ে ইন্টারনেট থেকে এসব তথ্যই পেয়েছে।

বিপাশা মনে মনে ঠিক করেছে গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে ছবি তোলার ভান করতে করতে জঙ্গল অব্ধি যাবে, তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। ও যেতে যেতে, যে বেঞ্চিতে মাঝবয়সী ভদ্রলোক তাঁর স্ত্রী, পুত্র আর কন্যার সঙ্গে বসে আছেন, তার পাশ দিয়ে যাবার সময় “এই যে শুনছেন” কথাগুলো শুনে বেঞ্চির দিকে তাকালো। ভদ্রমহিলা ঈশারায় ওকে ডাকছেন। ভদ্রমহিলা কথাগুলো বলেছেন হিন্দিতে, তাই বিপাশার ধারনা হল ভদ্রমহিলা হিন্দিভাষী। ও কাছে যেতেই ভদ্রমহিলা হেসে পরিষ্কার বাংলায় জিজ্ঞাসা করলেন –

- আপনি কি টুরিস্ট? আসলে অনেক্ষণ থেকে দেখছি আপনি একা একা ঘুরছেন, বাইনোকুলারে চারপাশ দেখছেন, ক্যামেরায় ছবি তুলছেন, তাই জিজ্ঞাসা করলাম।

বিপাশা প্রথমে ভাবল এভয়েড্ করে চলে যাবে, তারপর মত বদলালো। হেসে জবাব দিল –

- হ্যাঁ, টুরিস্ট। একাই ঘুরতে বেরিয়েছি। অর্নিথোলজি আর ফটোগ্রাফি আমার হবি। তাছাড়া, অ্যাডভেঞ্চার ভালো লাগে। তাই, কাজের মাঝে, প্রতি দু-মাসে একবার ছুটি নিয়ে সব ভুলে বেরিয়ে পড়ি। দুর্গম স্থানে যেতে বেশি ভালো লাগে তাতে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দর সঙ্গে অ্যাডভেঞ্চার, অর্নিথোলজি, ফটোগ্রাফি - সবই করা যায়। আপনারা টুরিস্ট তো?

বিপাশা কথা বলতে বলতে আরো চোখে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে দেখেছিল ভদ্রলোক হাতের সেলফোন নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ওর ছবি তুলে নিলেন। বিপাশা সাবধান হল। ওর ছবি কেন তোলা হল! মুখে কিছুই বলল না।

ভদ্রমহিলা হেসে বললেন –

- ঐ একরকম টুরিস্ট বলতে পারেন। বসুন না ভাই, একটু গল্প করা যাক। আমার স্বামী সরকারি চাকরি করেন, কাজের সূত্রে এখানে এসেছেন। জায়গাটা দারুণ সুন্দর, তাই আমরাও সঙ্গে এসেছি। ওঁর অফিসের কাজও হবে, আমাদেরও বেড়ানো হবে। তুমি কি করো ভাই? স্যরি, আপনি না বলে তুমি বলে ফেললাম।

- আমি অভিনেত্রী। আগে মডেলিং করতাম, এখন সিনেমায় ঢুকে পড়েছি। মাস তিনেক আগে “রাতের গাড়ি” নামে যে সিনেমাটা রিলিজ্ করেছে আমি তার নায়িকা।

ভদ্রলোক চুপ করে আছেন কিন্তু ভদ্রমহিলা বক্বক্ করেই চলেছেন। বিপাশা মাঝে মধ্যে দু একটা উত্তর দিচ্ছে ঠিকই কিন্তু মন পড়ে আছে অন্যত্র। হঠাৎ একটা কথায় সম্বিত ফিরল, ভদ্রমহিলা ওকে ও কি কি ছবি তুলেছে তা দেখাতে বলছেন। ও নিকন পি-৯০০ ক্যামেরাটা বার করে ছবিগুলো দেখাতে শুরু করলো। শুধুই দৃশ্য আর নানা প্রজাতির পাখির ছবি।



(সাত)

বিপাশার মনে হল ভদ্রমহিলা ছবি দেখে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। একটু ইতস্তত করে বললেন –

- আপনার ব্যাগে আরো একটা ক্যামেরা দেখলাম, ওটা কি ক্যামেরা?

-ওটা ডি. এস. এল. আর. ক্যামেরা। পেনট্যাক্স কে-১০০ ডি সুপার। ওটাতে ১০০-৬০০ মিলিমিটার জুম লেন্স লাগানো আছে।

- তাই নাকি, বাহ্! ওটাতে নিশ্চয়ই আরো ভালো ছবি ওঠে। ওটাতে তোলা ছবি দেখানো যাবে?

বিপাশা ক্যামেরাটা বার করে ছবিগুলো দেখানো শুরু করল। উনি মনোযোগ সহকারে প্রতিটি ছবি দেখে মন্তব্য করলেন –

- আপনি বেঞ্চে বসে গাদা গাদা ছবি তুললেন, অথচ এখানে সেগুলো দেখতে পাচ্ছি না কেন!

বিপাশা মুচকি হেসে জবাব দিল –

- ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে চোখ লাগালেই কি ছবি ওঠে নাকি! আমি সেসব ছবিই তুলি যাতে ওয়াইল্ড লাইফ যেমন পাখি বা বন্য জন্তুর ছবি পরিষ্কার আসছে। অনেকবার ক্যামেরা তাক করেছিলাম ঠিকই কিন্তু শাটার টিপি নি। আসলে ছবি তোলার সময় ব্যাটারিতে কতটা চার্জ আছে যেমন দেখতে হয় তেমনই এস.ডি. মেমারি কার্ডে কতটা জায়গা আছে সেটা দেখাও জরুরী। আমার কার্ডে যা জায়গা আছে তাতে আজে বাজে ছবি তুললে অসুবিধা আছে।

ভদ্রমহিলার মুখ দেখে মনে হলো উনি বিপাশার উত্তরে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। ভদ্রলোক পাশে দাঁড়িয়ে চুপ করে ওদের কথা শুনছিলেন, হঠাৎ বললেন –

- ম্যাডাম আপনার সঙ্গে একটা জরুরী কথা আছে, আপনি বসুন, তারপর বলছি।

বিপাশা বেঞ্চের একধারে বসতেই উনি বললেন –

- আমার নাম সুবিমল রায়। আমি ক্রাইম ব্রাঞ্চ যুক্ত। এখানে একটা সমস্যার তদন্তের জন্য আমাকে পাঠানো হয়েছে। ভাবলাম, এখানে যখন আসতেই হচ্ছে তখন পরিবারও সঙ্গে নিয়ে আসি। আমার স্ত্রী, পুত্র-কন্যাকে নিয়ে চলে এলাম।

বিপাশা একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞাসা করল –

- আপনার স্ত্রীও কি ক্রাইম ব্রাঞ্চের সঙ্গে যুক্ত?

- না না, ও হাউস ওয়াইফ্। তবে কলকাতায় বাড়িতে বসেও তো টুকটাক বিজনেস করা যায়, ও তাই করে। হ্যা, যা বলছিলাম। এখানে এসে একটা দলের সন্ধান পাই যারা চোরাচালান করছে অর্থাৎ স্মাগলার। আজ ফ্যামিলি নিয়ে ঘুরতে এসে আপনাকে দেখে কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হল তাই আপনাকে ডেকে এত কথা জিজ্ঞাসা করছি। আপনি বাইনোকুলারে যে তিনজনকে সারাক্ষণ ওয়াচ করছিলেন, সম্ভবত ছবিও তুলেছেন, তাদের কাউকে কি চেনেন?

বিপাশা জোর গলায় সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল –

- আপনারা আমার ক্যামেরায় তোলা ছবি দেখেছেন, আমি ওদের কোন ছবি তুলিনি কারণ ওদের ছবি তোলার প্রবৃত্তি আমার নেই। ওদের একজনকে আমার চেনা মনে হয়েছিল তাই বাইনোকুলারে বারবার করে দেখছিলাম। এমন একজন যাকে আমি ঘৃণা করি, যে আমার সঙ্গে প্রেমের অভিনয় করেছে দু'বছর ধরে, যার জন্য আমি প্রেগন্যান্ট হয়েও পড়েছিলাম। আশা করি বোঝাতে পেরেছি। এই চ্যাপ্টারটা আমি শেষ করতে চাই। প্লিজ, এ বিষয়ে আমায় আর কিছু জিজ্ঞাসা করবেন না।

বিপাশা ভয়ঙ্কর রাগে ব্যাগ তুলে নিয়ে গট্ গট্ করে হাঁটা লাগালো, একটু দূরে গিয়ে হেসে ফেলল, অভিনয়টা দারুন হয়েছে।



(আট)

বিপাশা বেশ কিছুটা দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল, ইতস্তত করছিল শ্রীকান্তর পিছু নিয়ে জঙ্গলে ঢুকবে কিনা বুঝতে পারছিল না। সুবিমল রায় সত্যি সত্যিই ক্রাইম ব্রাঞ্চের লোক কিনা তা নিয়ে বিপাশার সন্দেহ আছে। আবার, ক্রাইম ব্রাঞ্চের সঙ্গে যুক্তও থাকতে পারেন। যেটাই হোক, উনি যেভাবে চারপাশে নজর রাখছেন তাতে ওঁকে এড়িয়ে জঙ্গলে ঢোকা যাবে না। তার জায়গায়, ধাবায় বসে চা খাওয়া বেটার। ধাবাটায় বসার ব্যবস্থা মানে বেশ কয়েকটি লাল, নীল রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার আর গোটা তিনেক বেঞ্চি। কয়েকটি টেবিলও আছে তবে সেগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা। বিপাশা বেঞ্চে বসে পাশে ক্যামেরার ব্যাগটা রেখে চায়ের অর্ডার দিয়ে ধীরেসুস্থে চারপাশ দেখে নিয়ে ছোট্ট একটা সাদা প্যাকেট বার করলো ব্যাগের সাইড পকেট থেকে। মুচকি হেসে প্যাকেটটা প্যান্টের পকেটে রাখা মানিব্যাগ খুলে তার মধ্যে রাখা টাকার বান্ডিলের মধ্যে এমন ভাবে ঢোকালো যাতে কেউ মানিব্যাগ খুললেও ভিতরে প্যাকেটটা দেখতে পাবে না। এই প্যাকেটের মধ্যে আছে একটা এস.ডি. মেমারি কার্ড যাতে রয়েছে বেঞ্চে বসে তোলা শ্রীকান্তদের অজস্র ফটো। ও ভবিষ্যতের কথা ভেবেই সাবধানতার জন্য বেঞ্চিতে বসে থাকাকালিনই ক্যামেরা থেকে খুলে ক্যামেরাতে সেকেন্ড একটি চার জিবি মেমারি কার্ড ঢুকিয়ে রেখেছিল। এতে আগে তোলা ভাগ্যিস কিছু ছবি ছিল, যা ওকে সুবিমল রায়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

এক কাপ চা নিয়ে কতক্ষণ বসে থাকা যায়! তাও প্রায় আধঘন্টা বসে থেকেও যখন শ্রীকান্তদের দেখা পেল না তখন উঠে পড়ল। সুবিমল রায় বেঞ্চে স্ত্রী, পুত্র-কন্যার সঙ্গে এখনো বসে আছেন। যখন চায়ের দাম দিচ্ছে তখন ধাবার মালিক, বয়স্ক ভদ্রলোক, একটু ইতস্তত করে ওকে বললেন –

- ম্যাডাম একটু সাবধানে থাকবেন। এই জায়গাটা শান্তিপ্রিয় হলেও আজকাল কিছু আজেবাজে বাইরের লোককে দেখা যাচ্ছে। আপনি একা ঘুরতে বেরিয়েছেন তো তাই বললাম।

বিপাশা দোকান থেকে বেরোতে বেরোতে ভাবছিল ও যে একা ঘুরতে বেরিয়েছে তা একমাত্র সুবিমল রায়কে বলেছে আর কাউকে বলেনি। এই ধাবার মালিক জানলেন কিভাবে! স্ট্রেঞ্জ!

বিপাশা দোকান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল মার্কেটে। মার্কেট নামেই মার্কেট, মাত্র পাঁচ ছয়টা দোকান। ও ছিটকুলে উঠেছে একটা হোটেলে। হোটেলটা মাঝারি মানের। এই মার্কেটের পাশেই হোটেলটা। এখনো দু-একজন টুরিস্টের দেখা পাওয়া যাচ্ছে, এরপর আর টুরিস্ট পাওয়া যাবে না কারণ মাসখানেকের মধ্যেই ভয়ঙ্কর ঠান্ডা পড়ে যাবে। টেম্পারেচার এত নেমে যায় যে জল জমে বরফ হয়ে যায়, তাতে নাকি হোটেলের প্লাম্বিং লাইন খারাপ করে সব পাইপ ফাটিয়ে দেয়। তাই, হোটেল সে সময়ে বন্ধ থাকে। বিপাশা নিজের হোটেলে ফিরল, রিসেপসনিস্টের কাছে চাবি চাইল, উনি চাবি দিলেন, বিপাশা হেঁটে দোতলায় উঠে নিজের রুমের দরজা চাবি দিয়ে খুলে ভেতরে ঢুকে আতঙ্কে শিউরে উঠলো।



(নয়)

রুমে ঢুকেই দু-সেট ডাবল্ সিটের সোফা, মাঝে সেন্টার টেবিল। তারপর একটা ডাবল বেডেড খাট। সোফায় দুজন বসে আছে, একজন মাঝবয়সী পুরুষ আর অন্যজন অল্পবয়সী মহিলা, দুজনের হাতেই রিভলভার, ওর দিকে তাক করা। মহিলা একটু জোরের সঙ্গেই বললেন –

- হ্যান্ডস্ আপ্। দুহাত তুলে সোফায় এসে বসুন। কোন চালাকি করলে গুলি চালাতে বাধ্য হব।

বিপাশা প্রথমে ঘাবড়ে গিয়েছিল, তারপর একটু ধাতস্থ হলে হাত তুলে সোফায় বসে জিজ্ঞাসা করল –

- পিঠের ব্যাগপ্যাকটা নামিয়ে, হাত নামিয়ে, কথা বলতে পারি?

- ঠিক আছে নামান, তবে বেচাল দেখলে কিন্তু –

- ম্যাডাম, আমি জানি গুলি করবেন। আমার কাছে কোন রকম অস্ত্র নেই আর আমি কুংফু ক্যারাটেও জানি না।

বিপাশা ব্যাগটা নামানোর পর ভদ্রলোক ব্যাগ খুলে প্রতিটি খোঁপ চেক করে শেষে ব্যাগটা বন্ধ করে বললেন –

- আমরা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাই। যা যা জিজ্ঞাসা করবো তার সঠিক জবাব দেবেন।

- আপনারা কাঁরা, কি প্রয়োজনে এসেছেন না জানালে উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে ভেবেচিন্তে দিতে হতে পারে।

ভদ্রলোক এই কথার জবাব না দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন –

- সুরিন্দর থাপাকে চেনেন? কতদিন ধরে চেনেন?

- সুরিন্দর থাপা! সে কে?

- আপনি সুরিন্দার থাপাকে চেনেন না! তাহলে নদীর ধারে বেঞ্চে বসে অত কথা কি বলছিলেন!

- উনি তো সুবিমল রায়। সঙ্গে ওর স্ত্রী আর পুত্র-কন্যা ছিল।

- উনি বুঝি ওর নাম সুবিমল রায় বলেছেন?

- হ্যা। উনি ক্রাইম ব্রাঞ্চের লোক, সস্ত্রীক পুত্র-কন্যা নিয়ে স্মাগলারয়ের পিছু ধাওয়া করে এসেছেন।

- তাই বুঝি। ওঁর নাম সুরিন্দর থাপা আর সঙ্গের মহিলা বাঙালি তবে ওর স্ত্রী নয়। ছেলে-মেয়ে দুটিও ভাড়া করা। ওঁরা আপনাকে কি জিজ্ঞাসা করছিলেন?

- আমি কী কী ছবি তুলেছি তা জোর জবরদস্তি করে আমার ব্যাগ খুলে ক্যামেরা বার করে দেখলেন।

- কিছু পেলেন?

- না। তাতেই তো অসন্তুষ্ট হয়ে গেলেন। ওদের ধারণা আমি দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি ছেলে আর একটি মেয়ের ছবি তুলেছি।

- তাহলে বাইনোকুলার লাগিয়ে ওদের দেখছিলেন কেন? হ্যাঁ, আমাদের পরিচয়টা দিয়ে দেওয়া ভালো তাহলে কথা বলতে সুবিধা হবে। আমরা দুজনেই সি. বি. আই. তে চাকরি করি। আমি রঞ্জন আর আমার সঙ্গে ও রিটা। আমাদেরকে পাঠানো হয়েছে এখানে একটা স্মাগলিং গ্যাং অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে উঠেছে - সেটার খবর নেওয়ার জন্য। আপনার সুবিমল রায় একজন ঝানু স্মাগলার আর সেই গ্যাংয়ের লিডার হল ওই দাঁড়ি ওলা ছেলেটি যার ছবি আপনি তুলেছেন।

- আমি কারো ছবি তুলিনি। ওই ছেলেটিকে বারবার করে বাইনোকুলারে দেখে কনফার্ম হতে চাইছিলাম ওই ছেলেটিই আমার প্রাক্তন প্রেমিক শ্রীকান্ত কিনা।

- তা কি বুঝলেন, ছেলেটি শ্রীকান্ত তো?

- আমি কনফার্ম নই। আসলে শ্রীকান্ত আমার জীবনটাকে শেষ করে দিয়েছিল, আমি প্রেগন্যান্টও হয়ে পড়েছিলাম। আমি ওকে ঘৃণা করি। যদি কনফার্ম হতাম তাহলে তো গিয়ে দুটো থাপ্পড় না মারতে পারি, গালাগাল তো দিতে পারতাম। এখন আমি সেলিব্রিটি, ও আমার গায়ে হাত তুলতে সাহস পেত না। আপনারা যে সি. বি. আই. য়ের গোয়েন্দা তার প্রমাণ কি?

ভদ্রলোক নিজের আই. কার্ডটা বার করে দেখালেন। বিপাশা ঠিক বুঝতে পারল না আই. কার্ডটা আসল না নকল। একটু ইতস্তত করে ডিসিশন নিল সত্যিটা এখনই কাউকে বলবে না। দুজনে আরো অনেক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে চলে গেল। বিপাশা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, বিছানায় শুয়ে পড়ল। কম্বলের তলায় কিছু একটা পিঠের নিচে ওর অসুবিধার সৃষ্টি করছে। হাত দিয়ে যেটা টেনে বার করলো সেটা একটা ওষুধের স্ট্রিপ, ওষুধটা একটা কন্ট্রাসেপটিভ, যা এই বিছানায় পাওয়া যথেষ্ট অস্বাভাবিক কারণ ওর নিজের কন্ট্রাসেপটিভ খাওয়ার দরকার হয় না।



(দশ)

স্ট্রিপটা থেকে একটা ট্যাবলেট খাওয়া হয়েছে। ও দ্রুত ভেবে যাচ্ছিল, ও কতক্ষণ বাইরে ছিল, সব মিলিয়ে প্রায় তিন ঘন্টা। এই দুজন অথবা তার আগে অন্য কেউ সম্ভবত দুজন এই ঘরে ঢুকে ছিল এবং এই বিছানায় শুয়েছিল। বেরোনোর আগে এই বিছানায় ও যখন শুয়েছিল ও নিশ্চিত তখন এই স্ট্রিপটা ছিল না কারণ কম্বল পায়ের নিচে ভাঁজ করে রাখা ছিল। ঘরে ঢুকে, লাগেজ রেখে, ধবধবে সাদা বিছানায় কম্বল টেনে গায়ে চাপা দিয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে তারপর বেরিয়েছিল। ওরা দুজন যাওয়ার আগে ওদের ফোন নম্বর দিয়ে জানিয়ে গেছে শ্রীকান্তর দেখা পেলে ওদের ফোন করে জানাতে। হঠাৎ, ওর ভীষন ঘেন্না লাগতে শুরু করলো, বিছানার চাদর আর কম্বলটা তুলে ছুড়ে এক কোণে ফেলে দিয়ে রিসেপশনে ফোন করে বিছানার চাদর আর কম্বলটা চেঞ্জ করে দিতে বললো। ধীরে ধীরে ওর মগজটা খুলছে, আর যত খুলছে তত বুঝতে পারছে অজান্তেই ও একটা ভয়ঙ্কর বিপদ জড়িয়ে পড়েছে।

কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে লাঞ্চ করে নিল। ঘরেই খাবার আনিয়ে নিল। তারপর কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। প্রথমে ভেবেছিল লোকাল পুলিশ স্টেশনে যাবে কিন্তু পরে ডিসিসন চেঞ্জ করল। লোকাল পুলিশকে ইনফর্ম করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। চিন্তিত মুখে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল নদীর ধারে। এখন ধাবাটা খোলা থাকলেও কোন কাস্টমার নেই। মালিক রয়েছে দোকানে তবে একা নয়, একজন লোকের সঙ্গে কথা বলছে। লোকটির মুখ দেখা যাচ্ছে না, বিপাশা শুধু ওর পিঠটাই দেখতে পাচ্ছে। চা খাওয়ার ইচ্ছা নেই, অথচ ধাবায় একবার ঢোকা দরকার। ধাবায় ঢুকে একটা লাল রংয়ের চেয়ার টেনে বসে মালিককে জিজ্ঞাসা করল –

- রাতে আপনার এখানে কটা অবধি খাবার পাওয়া যায়?

- সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা অবধি। তবে- ওই সময়ে চা আর টুকটাক কেক বিস্কুট জাতীয় জিনিস ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। তবে, অর্ডার দিলে বানিয়ে দেওয়া হয়।

- কি কি আইটেম অর্ডার দেওয়া যেতে পারে?

- রুটি, একমাত্র হাতরুটি পাবেন। এছাড়া সবজি, মাটনকারি, মাটনকিমা ছাড়া আর কিছু পাবেন না। বুঝতেই তো পারছেন, বাজারের অবস্থা ভালো নয়। কাস্টমার না থাকলে কি করব।

- ডিমের ওমলেট পাব? খাবার হোটেলে ডেলিভারি দেওয়া যাবে?

- হ্যাঁ। কিন্তু, আপনি যে হোটেলে উঠেছেন সেটা তো বেশ ভালো, ওদের নিজস্ব রেস্টুরেন্ট আছে। সেখানে না খেয়ে আমার এখান থেকে খাবার পাঠাতে বলছেন!

- ওদের খাবার ঠিক পছন্দ হচ্ছে না। আপনি রুটি, মাটনকারি আর ডিমের ওমলেট রাত সাড়ে সাতটার পর যদি পাঠিয়ে দেন ভালো হয়। সঙ্গে যেন স্যালাড থাকে।

- আমি ধাবা বন্ধ করে বাড়ি ফেরার সময় আপনাকে পৌঁছে দেব।

উঠে গিয়ে নদীর ধারে বেঞ্চে বসলো, চারপাশে কোন লোকজন নেই। বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে চারপাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখতে পেল শ্রীকান্তকে, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে। গট্ গট্ করে হেঁটে ধাবার পাশ দিয়ে চলে গেল। ধাবার লোকটিও দোকান থেকে বেরোলো।




(এগারো)

রাত আটটা বাজে। বিপাশা ক্যামেরা থেকে বার করে মানিব্যাগে রাখা এস.ডি. মেমারি কার্ডটা বার করে ছবিগুলো ল্যাপটপে ট্রানস্ফার করে ফেলেছে। সেলফোনের হটস্পট অন করা আছে। একটা ইমেইলও করে ফেলল। এমন সময় দরজায় মৃদু টক্ টক্ আওয়াজ শুনলো। দরজার বাইরে কলিংবেলের সুইচ দেখেছে আর সেটা কাজ করে কারণ রুম বয়রা যতবার আসে ওই বেল বাজায়। একটু অবাক যেমন হল তেমনই ভয়ও পেল। আবার নতুন উৎপাত নয়তো? দরজার কাছে গিয়ে ভিউফাইন্ডারে চোখ লাগালো। ধাবার মালিক, বয়স্ক ভদ্রলোক, একটা খাবারের প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। বিপাশা দরজা খুলল, উনি প্যাকেটটা বিপাশাকে না দিয়ে দরজার পাশে থাকা টেবিলের উপর রেখে বললেন –

- ম্যাডাম, আপনি যা যা বলেছেন সব আছে। আপনি আমাকে টোটাল ২০০ টাকা দেবেন। কেমন খেলেন, আগামী কাল জেনে নেব।

বিপাশা টাকাটা দিতেই উনি হেসে বললেন – “গুডনাইট”। ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর বিপাশা খাবারের প্যাকেটটা তুলে সেন্টার টেবিলে রাখার সময় একটা কথাই মনে হল, খাবার অনুযায়ী প্যাকেটটার যা ওজন হবার কথা তার তুলনায় অনেক অনেক গুণ বেশি ভারী। বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে খাবারের প্যাকেট টা খুলেই চমকে উঠলো, একটা বাদামী ছোট খাম। খামের উপর পরিষ্কার বাংলায় লেখা “আগে ভিতরে চিঠিটা পড়ে খাবার খাবেন। চিঠিটাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাথরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে চিঠিটা পড়বেন তা নাহলে বিপদ আছে”। বিপাশা একটু ইতস্তত করে ডিসিশন নিল চিঠিটা পড়ে দেখবে, এতে মনে হয় না কোন সমস্যা হতে পারে। লেখা আছে বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে চিঠিটা পড়তে। আসে পাশে তাকিয়ে দেখে নিল জানালা দিয়ে কোনরকমভাবে কেউ ওকে গুলি করতে পারে কিনা। সেই সমস্যা নেই কারণ এখান থেকে কোন জানালাই দেখা যাচ্ছে না। খামটা ছিড়ে ভিতর থেকে চিঠিটা বার করল, পরিষ্কার বাংলায় গোটা গোটা অক্ষরে হাতে লেখা চিঠি। চিঠিটা পড়া শুরু করল –

- ম্যাডাম, আপনি ভয়ঙ্কর এক বিপদের মধ্যে আছেন। এই ঘরের সর্বত্র ক্যামেরা লাগানো আছে। আসলে এই ঘরটা ওরা নিউলি ম্যারেড কাপল্ দেয়। তারপর তাদের অন্তরঙ্গ দৃশ্যের ভিডিও ব্লু ফিল্ম হিসাবে বাজারে বিক্রি করে। এমনকি বাথরুমেও ভিডিও ক্যামেরা লাগানো আছে। আপনার দেহে কোথায় কটা আঁচিল আছে সেটাও ওরা জানে। আপনি রিভলভার চালাতে জানেন কিনা আমরা জানি না কিন্তু আপনার সেফটির কথা ভেবে খাবারের প্যাকেটের ভিতরে একটা মিষ্টি বাক্সে একটা ০.২২ ক্যালিভারের রিভলভার পাঠালাম। ওটা লোডেড। বাক্স খুলে রিভলভারটা বাবার করতে যাবেন না, তাহলে ওরা ক্যামেরার সাহায্যে জেনে যাবে। আপনি বাক্সটা ক্যামেরার ব্যাগ বা ভ্যানিটি ব্যাগে ঢুকিয়ে খেতে বসুন। খাবার খেয়ে, জরুরি মালপত্র নিয়ে রাতেই হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে পড়ুন। আপনার আরো দুদিনের টাকা এ্যাডভান্স দেওয়া আছে তাই মনে হয় না হোটেলওলা দেখতে পেলেও আপনাকে আটকাবে। হোটেলের বাইরে, বাঁদিকে, রাস্তার উপর একটা কালো রঙের মারুটি জেন রাখা আছে। গাড়ির নম্বর হল “HP 04D 3997”। চাবি লাগানো আছে। গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়ে সোজা বেরিয়ে যান, বাকি ইনস্ট্রাকশন সময় মত পেয়ে যাবেন। চিঠিটা পুড়িয়ে ফেলবেন।

-আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী”।




(বারো)

বিপাশা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিল, এই খেলায় ও অংশ নেবে, শেষ অবধি দেখবে। জড়িয়ে যখন পড়েছে তখন এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনো উপায় নেই। চিঠির নির্দেশমতো চিঠিটা ছিড়ে টুকরো টুকরো করে বাথরুমের কমোডে ফেলে ফ্লাশ টানার সময় ইচ্ছা করে “উঃ” বলে বসে পড়ল যেন কোমড়ে হ্যাঁচকা টান লেগেছে। বাথরুমের ভিতর হাত তুলে কখনো কোমড়ে হাত দিয়ে কোমর নাড়াতে নাড়াতে চারপাশে তাকিয়ে দেখতে দেখতে অবশ্য খুঁজে পেল ক্যামেরার লেন্স। একটা নয় দুটো। একটা আয়নার উপরে ল্যাম্পশেডের ভিতরে আর অন্যটা বাথটাবের এক ধারে। ছোট্ট ক্যামেরা, না জানা থাকলে বোঝার কোন উপায় নেই। বাথরুমে বাইরে এসে খাবারের প্যাকেট থেকে মিষ্টির বাক্সটা কাঁধের ছোট্ট ব্যাগে ঢুকিয়ে খাবারটা খেয়ে নিল। বেশ টেস্টি। কিন্তু টেস্ট উপভোগ করে খাওয়ার মত মানসিক অবস্থা ওর ছিল না। খেতে খেতে এদিক-ওদিক ঘাড় ঘুড়িয়ে আরো কয়েকটা ক্যামেরা খুঁজে পেয়েছে। একটা তো সিলিংয়ে লাগানো। এর মানে একটাই, চিঠিতে যা লেখা আছে তার প্রথম অংশটুকু সত্যি। বাকিটা সত্যি না মিথ্যা তা অবশ্য জানে না। তবে, একটা জিনিস বুঝতে পেরেছে, ওর ক্ষতি করতে চাইলে খাবারের সঙ্গে লুকিয়ে রিভলভার পাঠাতো না। ধাবার মালিক তার মানে শ্রীকান্তদের বিরোধী পক্ষ। এখন কারা সমাজের শত্রু তা অবশ্য জানে না, শুধু একটাই বুঝতে পেরেছে, প্রাণ বাঁচাতে গেলে এক্ষুনি ওকে পালাতে হবে।

ঠিক রাত বারোটার সময় চুপি চুপি সমস্ত মালপত্র নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলো। রিসেপশনে দুটি লোক সোফায় কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছে। কাঁচের সদর দরজা ভেতর থেকে বন্ধ, হ্যাচবোল্টটা টানা। নিঃশব্দে হ্যাচবোল্টটা খুলে ফেলল। দরজাটা টেনে একটু ফাঁক করে দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে অর্ধেকটা খুলল। দেখে নিল লোক দুটি কি করছে। একই রকমভাবে নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে। মালপত্র বলতে একটা ছোট ১৮ ইঞ্চির ভি.আই.পি. স্কাই ব্যাগ, ক্যামেরার ব্যাগ আর ছোট্ট কাঁধে ঝোলানো লেডিস ব্যাগ। বাইরে মালপত্র নিয়ে বেরিয়ে দরজাটা টেনে বন্ধ করে বাইরে যে হ্যাচবোল্টটা আছে সেটা টেনে বন্ধ করে দিল। এখন চট্ করে কেউ বের হতে পারবে না। বাঁদিকে রাস্তা দিয়ে একটু এগোতেই মারুটি জেনটাকে দেখতে পেল। গাড়ির নম্বর প্লেট এর লেখা ঠিকমত বোঝা যাচ্ছে না, কারণ রাস্তায় আলো নেই। স্মার্ট ফোনের আলোয় দেখলো নম্বরটা মিলে যাচ্ছে HP-04D- 3697। সামনের দরজা খুলে ড্রাইভারের পাশের সিটে মালপত্র গুলো রেখে ঘুরে এসে ড্রাইভারের পাশের দরজা খুলে ড্রাইভারের সিটে বসে পড়ল। চাবিটা লাগানো আছে। স্টার্ট দিয়ে একটু এগোতেই পিছন থেকে কেউ বলল –

- ম্যাডাম, গাড়ি দাঁড় করাবেন না, সোজা এগিয়ে চলুন। আমি যেভাবে বলব সেভাবেই গাড়ি চালান। কোনো ভয় নেই। আমাদের পুরো ফোর্স পিছনে আছে।

(তেরো)

পুরো ফোর্স! এরা কারা! বিপাশা মনে মনে ভাবতে থাকলেও মুখে কিছু বলল না। পিছন থেকে দেওয়া নির্দেশমতো চলতে চলতে অবশেষে বুঝতে পারল পাহাড়ি রাস্তা ঘুরে ঘুরে ওপর দিকে উঠছে, সম্ভবত কোন পাহাড়ের টপে উঠছে। অন্ধকারের মধ্যে হেডলাইটের আলোয় অত্যন্ত সাবধানে ধীরে ধীরে গাড়ি চালাতে হচ্ছে কারণ একটু এদিক ওদিক হলেই সোজা খাদে গাড়ি গড়িয়ে পড়বে। অবশেষে, যেখানে গাড়ি থামানোর আদেশ এল সেটা একটা ফ্ল্যাট গ্রাউন্ড, সম্ভবত সিমেন্টে বাঁধানো। গাড়ি থামিয়ে উইন্ডস্ক্রিনের মধ্য দিয়ে সামনের বিশাল বাড়িটার গায়ে জ্বলতে থাকা আলোয় মনে হল ওটা একটা মনাস্ট্রি। তারপর, গেটের কারুকার্য দেখে বুঝতে পারলো, এটা সাংলার একটা মনাস্ট্রি, এখানে ও দুদিন আগেই ঘুরতে এসেছিল। গাড়ি থেকে নামতেই দুজন লামা আর চার জন মানুষ ওর দিকে এগিয়ে এলেন। একজন ভদ্রলোক দু-হাত জড়ো করে নমস্কার করে বললেন –

- আমি অনিল ঠাকুর। আপনার বিধ্বস্ত চেহারা দেখে বুঝতে পারছি আপনি ক্লান্ত। তার মধ্যে অন্ধকারে এতটা পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালিয়ে আসা - নট আ ম্যাটার অফ জোক্। আসুন, ভিতরে আরাম করে বসে কফি খেতে খেতে কথা বলা যাবে।

যিনি নিজেকে “অনিল ঠাকুর” বললেন তাঁকে বিপাশা চেনে, হিন্দুস্তান কি আখরি ধাবার মালিক। বিপাশার মালপত্র একটা ঘরে দিয়ে গেছে। এটি মনাস্ট্রির নাকি গেস্টহাউস! ঘরের মধ্যে একটা খাট, খাটের উপর একটা বালিশ আর গোটা দুয়েক মোটা কম্বল ভাঁজ করে রাখা আছে। খাটের পাশে একটা চেয়ার আর দেয়ালের গায়ে ফায়ার প্লেস – ব্যাস, এ ছাড়া আর কিছু নেই। মিস্টার অনিল ঠাকুর চেয়ারে বসেছেন, বিপাশা খাটে। একজন অল্প বয়সী লামা আরো দুটো সস্তা পিভিসি চেয়ার দিয়ে গেল। দুজন অল্পবয়সী ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন, একজনের হাতে একটা ছোট্ট টেবিল। টেবিলটা খাটের পাশে রেখে দুজনেই চেয়ারে বসলেন। অনিল ঠাকুর হেসে বললেন –