Search

শতবর্ষে সত্যজিৎ- বিশেষ সংখ্যা পড়ুন অনলাইনেই!

Updated: May 7

এ যাবৎ এই মানুষটিকে নিয়ে কম চর্চা হয়নি। দেশ-বিদেশের অসংখ্য গুণী পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ সত্যজিৎ সম্পর্কে সব বলে ফেলেছেন। নতুন কিছু বলার নেই হয়ত বা। কিন্তু বিশ্লেষণ, অনুভব—সে তো অনেক নতুনেরই জন্ম দেয়। তাই এই বড় মানুষদের চর্চা ও চর্যা চলতেই থাকে। তথ্য হয়ত জানা। ভাবনা ও বিশ্লেষণী ধারা বিবরণী ব্যক্তি বিশেষে পালটে যায়। হয়ে ওঠে নতুন আরেক ধারাভাষ্য। নতুন

আরেক সত্যজিৎ।

আমার সত্যজিৎ।

জন্ম শতবর্ষে

তাঁকে স্মরি বারবার।



ওঁর সঙ্গে আমার তেমন অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠার সুযোগ হয়নি। উনি যখন এই জাগতিক পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তখনও আমি বানিজ্যিক কোনও পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হতে পারিনি। লিটল ম্যাগাজিন করি। সঙ্গে আঞ্চলিক সাময়িক পত্রের সম্পাদনায় সহযোগী। ফলে সেই সময়কার সংস্কৃতির দাদা ও জ্যাঠামশাইদের হাত ধরে সংস্কৃতি ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্যে আসা। তেমনই এক সংস্কৃতির দাদা, অভিনেতৃ সংঘের অন্যতম সদস্য সমর মিত্রের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে আসা। অনেক লোকের মধ্যে আমি একজন। লোক নয়, রথী মহারথী। ঠিক উপলক্ষ কী ছিল, আজ আর মনে নেই। সেদিন কাছ থেকে দূরদর্শন ঘটেছিল। পরে যখন ওঁকে চিনেছি, খানিকটা জেনেছি তখন মনে হয়েছে উনি তো একজন সংস্কৃতির বনস্পতি।

যদি এক কথায় প্রশ্ন করা যায়, কে এই সত্যজিৎ রায়? অনেক পরিচিতিতে সমৃদ্ধ সত্যজিৎ রায়।চলচ্চিত্র পরিচালক, সঙ্গীতকার, চিত্রনাট্যকার, আলঙ্কারিক, কবি ও লেখক। সব ক্ষেত্রেই যথেষ্ট প্রশংসিত হলেও সত্যজিৎ রায়ের প্রথম এবং শেষ পরিচয় কিন্তু বাংলা সিনেমার পরিচালক হিসেবে। ভারতের একমাত্র অস্কারজয়ী তিনি। তিনি কী কী করেছেন, তা আমরা প্রায় সবাই-ই জানি। কখনওই তিনি বাণিজ্যকে সর্বস্ব করে সিনেমা তৈরি করেননি। তার সব ছবিতেই ধরা পরে রুচিশীল নান্দনিক ভাবনা।

তিনি মোট আটাশটি পূর্ণ-দৈর্ঘ্যের ছবি করেছেন। তথ্যচিত্র বানিয়েছেন পাঁচটি।দূরদর্শনের জন্য তিনটি। এছাড়া অন্যের ছবিতে সত্যজিৎ রায় কখনও চিত্রনাট্যকার, কখনওবা ধারাভাষ্যকার হিসেবেও কাজ করেছেন। দুই বিশ্ববন্দিতের মধ্যে ছিল নিবিড় সুসম্পর্ক। রবি ঠাকুরের থেকে সত্যজিৎ রায় ষাট বছরের ছোট। গুরুদেবের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের প্রথম দেখা। সত্যজিৎ তখন খুবই ছোটো। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতেই উত্তরায়ণে যাওয়া। সে সময় ছোট্ট সত্যজিতের ইচ্ছে হল, অটোগ্রাফ নেওয়ার। বালক সত্যজিৎ ওই বয়সেই জানতেন, রবীন্দ্রনাথ কে। তাই ওঁর অটোগ্রাফ সংগ্রহের খাতায় রবীন্দ্রনাথের অটোগ্রাফ নেওয়ার ইচ্ছে। বালক সত্যজিৎ রায়কে ‘মানিক’ নামেই চিনতেন রবীন্দ্রনাথ। বিশ্বকবির সামনে কিছুটা ইতস্তত।অটোগ্রাফের খাতাটা নিয়ে দাঁড়ালেন। কবিগুরু দেখলেন। পরম স্নেহে কাছে টেনে নিলেন। তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, খাতা নিয়ে সে কেন এসেছে? ছোট্টো মানিক খাতাটা এগিয়ে দিয়ে তাঁর ইচ্ছের কথাটা জানালেন। কবি তাঁর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন। তারপর পরম স্নেহে বললেন, ‘এটা থাক আমার কাছে। কাল সকালে এসে নিয়ে যেও।’ বালক সত্যজিৎ মাথা ঝুঁকিয়ে চলে গেলেন।




কবিগুরুর আশীর্বাদ নিতে মানিক পরদিন এলেন উত্তরায়ণে। টেবিলের ওপর চিঠি-পত্র, খাতা-বইয়ের ডায়েরির পাহাড়। তার পেছনে বসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মানিককে দেখতে পেয়েই তাঁর ছোট্টো বেগুনি রঙের খাতাটি বের করে সত্যজিতকে দিলেন। মা সুপ্রভা রায়ের দিকে চেয়ে কবিগুরু বললেন, ‘এটার মানে ও আরেকটু বড়ো হলে বুঝবে।’ খাতা খুলে বালক সত্যজিৎ আট লাইনের একটি কবিতা দেখল। ভুবনজয় করা সেই কবিতা। বিশ্বকবির ঘর থেকে বেরিয়ে উত্তরায়ণের সামনের বিশাল আমগাছের নিচে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে আবৃত্তি করছেন মানিক-

‘বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছে সিন্ধু।/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের উপরে/ একটি শিশিরবিন্দু।’

সেই প্রথম সত্যজিতের জীবনে রবির ছটা পড়ল। অদ্ভুত বিষয় হল, সত্যজিৎ রায় যার জন্য জগত খ্যাত, সেই সিনেমা করার প্রেরণা কিন্তু রবীন্দ্রনাথ। ‘পথের পাঁচালী’ সত্যজিৎ রায়ের প্রথম ছবি।‘পথের পাঁচালী’ রবীন্দ্র-উত্তর কথা সাহিত্যিক, ত্রয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়ের অগ্রজ বিভূতিভূষণের কাহিনি। অনেকে বলেন, বিভূতিভূষণের কাহিনিই নাকি সত্যজিতের প্রথম পছন্দ ছিল।কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে চলার পথ দেখিয়েছেন। ইতিহাস বলে সে কথা।

১৯৪৬ সাল। ডি.জে.কিমারে কাজ করছেন তখন। সেই সময়ই তিনি ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। কিন্তু কোনও কারণে সেই ছবি করা সম্ভব হল না। সেই সময় তাঁকে ভাবায় ‘আম আঁটির ভেঁপু’ বইয়ের অলঙ্করণ। এরই ফলশ্রুতি ‘পথের পাঁচালী’ ছবি।

এই ছবি নিয়েও নানা সমালোচক নানা কথা বলেছেন। কেউ কেউ বলেন, বিভূতিভূষণের উপন্যাসটাই ‘পথের পাঁচালী’ ছবির প্রত্যক্ষ রুপ। অথচ উপন্যাসটা পড়লে অপু-দুর্গার যে অনাবিল স্বপ্নময়তা পাওয়া যায়, সেটা ছবিতে কিন্তু একদম নেই।

সত্যজিৎ সিনেমার প্রয়োজনে যেসব ঘটনা, চরিত্র রাখা প্রয়োজন মনে করেছিলেন ‘পথের পাঁচালী’তে সেটাই রয়েছে। প্রয়োজনে অনেক ঘটনা, চরিত্র সংযোজনও করেছেন তিনি। বাদও দিয়েছেন অনেকটা।‘পথের পাঁচালী’তে সত্যজিৎ মূল উপন্যাসের উনত্রিশ পরিচ্ছেদের কিছুটা পর্যন্ত নিয়েছেন। ছবিতে যতটা নেওয়া হয়েছে, বাদ গেছে তার অনেক বেশি। ইন্দিরা ও দুর্গার ট্র্যাজেডি ধরে অপুর মতো এই ছবিতে অপরাজিত সত্যজিৎও। বিশ্ব চলচ্চিত্রে অনেক বড় বড় পরিচালক এসেছেন, তাঁদের সৃষ্টি মানুষ মাথায় করে রেখেছেন। ফেদেরিকো দোমেনিকো মার্সেলো ফেলিনি, ডেভিড ফিঞ্চার, জেমস ক্যামেরন, পিটার জ্যাকসন, স্টিভেন স্পিলবার্গ, ক্রিস্টোফার নোলান। আপনারা যারা বার্গম্যানের ‘সেভেন্থ সিল’ ছবিটা দেখেছেন, তাঁদের নিশ্চয়ই মনে আছে শেষ দৃশ্যের কথা। মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলার দৃশ্য কিংবা ফেলিনির ‘লা দোলচে ভিতা’র শুরুর দৃশ্যটিও যেমন ক্লাসিক, ঠিক তেমনই সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’-তে অপু-দুর্গার কাশফুলের বন পেরিয়ে রেলগাড়ি দেখতে যাওয়ার দৃশ্যও আজ ঐতিহাসিক, আইকনিক। কোনও কোনও জায়গায় যেন সত্যজিৎ কোথাও এগিয়ে। আপনাদের আবারও বলি, অনেক পণ্ডিত, ব্যক্তিত্ব সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে অনেক কথা বলেছেন, কিন্তু আমি আমার উপলব্ধিটা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিচ্ছি মাত্র। আমি পণ্ডিত নই। কিন্তু আমার দেখা, আমার সত্যজিৎ আমার মত। এতে কারোর পছন্দ নাও হতে পারে। নানা বক্তব্য থাকতে পারে। কিন্তু কেন উনি সেরা পরিচালক, তা আমার চেতনায় যেভাবে ধরা পড়েছে, তাই-ই বলছি।



‘অপরাজিত’(১৯৫৬)ছবিতেও কিন্তু বিভূতি ভূষণের উপন্যাসের স্বপ্নময়তা নেই। চিহ্নিত হয়েছে সর্বজয়ার সঙ্গে অপুর মধুর অথচ নির্মম সম্পর্কের স্বরূপ। ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে ‘অক্রুর সংবাদ’ থেকে ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের নবম পরিচ্ছেদের ঘটনাসমূহ-ই এই ছবিতে স্থান পেয়েছে। পরিমার্জিত হয়েছে, বোর্ডের পরীক্ষার অপু জেলার মধ্যে প্রথম (উপন্যাসে) হলেও সত্যজিৎ রায় দ্বিতীয় করেছেন। কলা নয়, ছবিতে অপু বিজ্ঞানের ছাত্র হয়ে গেল। সর্বজয়ার মৃত্যুর পর মনসাপোতা গ্রামে শ্রাদ্ধ করার পরিকল্পনা করলেও ছবিতে সে দাদুকে জানিয়েছে মাতৃশ্রাদ্ধ করবে কালীঘাটে। দুটো ছবিতেই বিভূতিভূষণ ও সত্যজিতের অপুর মধ্যে বড্ড দুরত্ব লক্ষ করা যায়। তবে হ্যাঁ, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সত্যজিৎ রায় খুব জানতেন। কাছ থেকে চিনতেন। ভালো লাগত তাঁর উপন্যাস। তাই তো ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’-তে দুই স্রষ্টার সৃষ্টি ভাবনার খানিক দুরত্ব থাকলেও ‘অপুর সংসার’-এ দুজন যেন মিশে গেছেন এক মোহনায়।

সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’(১৯৫৯)-এ আমরা পেলাম বিভূতিভূষণের অপুকে। অপরাজিত উপন্যাসের শেষাংশ নিয়েই এর চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল। এখানেও সত্যজিৎ উপন্যাসের ঘটনাবলীকে অন্যভাবে সাজিয়েছেন। অপুকে তিনি সম্পূর্ণরূপে নগরকেন্দ্রিক করেছেন। ফলে মনসাপোতায় নয়, অর্পণা ও অপুর ঘর সংসারের ছবি দেখতে পাই মূলত কলকাতায়। উপন্যাসের পুলু, ছবিতে কিন্তু বিলেত ফেরত ইঞ্জিনিয়ার। রাজশাহির জেলে থাকার ঘটনা যদি সত্যজিৎ এই ছবিতে রাখতেন, তবে বোধহয় অপুর কাছে পুলুর বিশ্বাসযোগ্যতা অনেকটাই খাটো হত। অপুর স্কুলে কাজ করার প্রসঙ্গ তো একদমই নেই ছবিতে। তাঁর লেখা উপন্যাসের পাতাগুলোও একে একে মহাকালে বিসর্জন দিয়েছেন সত্যজিৎ| অপু অপর্ণার দাম্পত্য প্রেমের করুণ পরিণতি হলেও জীবনবোধে উজ্জ্বল এই ছবিটি। অপুর বিবাহপর্ব তো বাঙালি জীবনের শাশ্বত অঙ্গ।

রবীন্দ্রনাথ একসময় বলেছিলেন যে, চলচ্চিত্রের একটা নিজস্ব ভাষা দরকার। ‘পথের পাঁচালী’ ছবি থেকেই সেই ভাষা পেল বাংলা সিনেমা। চিত্রনাট্যে সাহিত্য গুণ থাকবে, আবার তা পড়ে সিনেমার স্বাদ পাওয়া যাবে। সত্যজিৎ রায় যখন চিত্রনাট্য রচনা করতেন, তখন সংলাপের পাশেই ছবি আঁকতেন, নোটেশন তৈরি ক