দধি-মঙ্গল(একডজন রান্না), দার্জিলিং-এর ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ ও খাবারের গল্প,পাহাড়ে উষ্ণ পানীয় , রবিবারের গল্প: মাফলার
- রোজকার অনন্যা

- 4 days ago
- 22 min read
Updated: 2 days ago
দধি-মঙ্গল..
নিরামিষ থেকে আমিষ, ভাজা থেকে ঝোল এই একটি উপকরণের ছোঁয়ায় প্রতিটি রেসিপিই পায় আলাদা মাত্রা। এই সংকলনে রইলো দই দিয়ে তৈরি নানা রকম সুস্বাদু রান্নার সহজ ও ঘরোয়া পাক-প্রনালী।

দই দিয়ে বেগুনের ঝাল
মৌমিতা কুণ্ডু মল্ল

কী কী লাগবে
গোলাকার বেগুন ২টি (গোল করে কাটা), লবণ স্বাদমতো, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা-চামচ, কালো সর্ষে ১ চা-চামচ, সাদা সরষে ১ টেবিল-চামচ, পোস্ত ২ টেবিল-চামচ, কাঁচা লঙ্কা ২–৩টি, Shalimar's Chef Spices লাল লঙ্কা গুঁড়ো ১/৪ চা-চামচ, দই ১/৪ কাপ (ভালো করে ফেটানো), Shalimar's সরষের তেল পরিমাণমতো, ধনেপাতা কুচি ২ চা-চামচ, গরম জল প্রয়োজনে সামান্য।
কীভাবে বানাবেন
বেগুনে লবণ ও হলুদ গুঁড়ো মেখে ১০ মিনিট রেখে দিন। কড়াইতে সরষের তেল গরম করে বেগুন সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন। সাদা সরষে, পোস্ত ও ১–২টি কাঁচা লঙ্কা ভিজিয়ে মিহি বেটে নিন। কড়াইতে তেল গরম করে কালো সর্ষে ও কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দিন। সরষে–পোস্ত বাটা দিয়ে নাড়তে থাকুন, লবণ, সামান্য হলুদ ও লাল লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে ২–৩ মিনিট কষে নিন। আঁচ কমিয়ে ফেটানো দই দিয়ে ক্রমাগত নাড়ুন যাতে দই না কাটে। প্রয়োজনে অল্প গরম জল দিয়ে পছন্দমতো ঘনত্ব আনুন। ঝোল ঘন হলে ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। ভাজা বেগুনের উপর ঝোল ঢেলে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

দই দিয়ে ডিম
সুতপা বৈদ্য

কী কী লাগবে
সিদ্ধ ডিম ৬টি (অর্ধেক কাটা), আদা ১ ইঞ্চি, কাঁচা লঙ্কা ৩–৪টি, কাজুবাদাম ১২–১৫টি, কিসমিস ১ টেবিল চামচ, পোস্ত ১ টেবিল চামচ, টকদই ১/২ কাপ (ফেটানো), দুধ ১/২ কাপ, জল ১/৪ কাপ, গোটা গরম মসলা (দারচিনি ১ টুকরো, এলাচ ২টি, লবঙ্গ ২টি), Shalimar's Chef Spices কাসুরি মেথি ১ চা চামচ, Shalimar's Sunflower তেল/ঘি ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো
কীভাবে বানাবেন
আদা, কাঁচা লঙ্কা, কাজু, কিসমিস ও পোস্ত একসঙ্গে মিহি পেস্ট করুন। কড়াইতে তেল/ঘি গরম করে গোটা গরম মসলা ফোড়ন দিন। পেস্টটি দিয়ে হালকা ভাজুন। আঁচ কমিয়ে ফেটানো দই মিশিয়ে নাড়ুন। দুধ ও অল্প জল দিয়ে গ্রেভি তৈরি করুন, লবণ দিন। ফুটে উঠলে ভাজা অর্ধেক কাটা ডিম দিন। কয়েক মিনিট রান্না করে শেষে কাসুরি মেথি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। ভাত, পোলাও বা রুটির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

দই চিকেন
সঞ্চিতা দাস

কী কী লাগবে
মুরগির মাংস ৫০০ গ্রাম, টকদই ১ কাপ (ফেটানো), পেঁয়াজ বাটা ২ টেবিল চামচ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৩–৪টি, কাজুবাদাম বাটা ২ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices লাল লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মসলা গুঁড়ো আধ চা চামচ, গোটা গরম মসলা (দারচিনি ১ টুকরো, এলাচ ২টি, লবঙ্গ ২টি), Shalimar's Mustard তেল/ঘি ৩ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি এক চিমটি, Shalimar's Chef Spices কাসুরি মেথি ১ চা চামচ
কীভাবে বানাবেন
মাংস দই, আদা-রসুন বাটা, লবণ ও অল্প হলুদ দিয়ে ৩০ মিনিট মেরিনেট করুন। কড়াইতে তেল/ঘি গরম করে গোটা গরম মসলা ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ বাটা দিয়ে কষান। এবার মেরিনেট করা মাংস দিয়ে নেড়ে ঢেকে দিন। ধনে গুঁড়ো, লাল লঙ্কা গুঁড়ো ও কাজু বাটা দিন। ঢেকে মাঝারি আঁচে রান্না করুন। প্রয়োজনে অল্প জল দিন। মাংস সেদ্ধ হলে গরম মসলা গুঁড়ো, চিনি ও কাসুরি মেথি ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। পোলাও, ভাত বা রুটির সঙ্গে দারুণ লাগে।
দই চিংড়ি
সুতপা দাস

কী কী লাগবে
চিংড়ি ৫০০ গ্রাম, গোটা গরমমশলা ১০ গ্রাম, তেজপাতা ২টি, পেঁয়াজ বাটা ১ কাপ, আদা-রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা বাটা ১ টেবিল চামচ, গোটা কাঁচালঙ্কা ৩টি, টকদই ১ কাপ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরমমশলা গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল পরিমাণমতো
কীভাবে বানাবেন
চিংড়ি মাছে নুন আর সামান্য হলুদ মাখিয়ে হালকা করে ভেজে তুলে রাখুন। সেই তেলেই গোটা গরমমশলা ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ, আদা-রসুন, কাঁচালঙ্কা বাটা দিয়ে ভাল করে কষিয়ে নিন। এ বার একটি পাত্রে দই নিয়ে তার সঙ্গে ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, গরমমশলা গুঁড়ো আর চিনি, নুন দিয়ে ভাল করে ফেটিয়ে নিন। পেঁয়াজ লালচে হয়ে এলে দইয়ের মিশ্রণ ঢেলে ভাল করে কষিয়ে নিন। তার পর সামান্য জল দিয়ে গোটা কাঁচালঙ্কা আর চিংড়ি মাছগুলি দিয়ে ভাল করে ফুটিয়ে নিন মিনিট পাঁচেক। গরমাগরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন দই চিংড়ি।

দই ইলিশ
প্রিয়াঙ্কা সামন্ত

কী কী লাগবে
ইলিশ মাছ ৬ পিস, টকদই ২৫০ গ্রাম, কালো সরষে ২ টেবিল চামচ, সাদা সরষে ২ টেবিল চামচ, পোস্ত ৩ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৭-৮টি (চেরা), কালোজিরা ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি স্বাদমতো, Shalimar's সর্ষের তেল পরিমাণমতো।
কীভাবে বানাবেন
ইলিশ মাছ নুন, হলুদ ও সর্ষের তেল মাখিয়ে ১৫ মিনিট রেখে দিন। এরপর জল ঝরানো টক দই, সরষে বাটা ও পোস্ত বাটা দিয়ে মাছ মেরিনেট করে আধঘণ্টা রেখে দিন। কড়ায় সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে মেরিনেট করা মাছ ঢেলে ঢাকা দিয়ে ১৫ মিনিট রান্না করুন। তেল ছাড়তে শুরু করলে উপর থেকে সামান্য সর্ষের তেল ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে আরও ৫ মিনিট ফুটিয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
ঠাকুরবাড়ির সফেদ কোর্মা
ঐন্দ্রিলা ভট্টাচার্য

কী কী লাগবে
মাংস ১ কেজি, টকদই ৫০০ গ্রাম, দুধ ১ লিটার (অর্ধেক করে ঘন করা), রসুন ১ গোটা, আদা সামান্য, পেঁয়াজ ৪টি (বড়, কুচি), কাঁচা লঙ্কা ৪-৫টি (চেরা), দারচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৪টি, ঘি / Shalimar's Sunflower তেল ৪ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো
কীভাবে বানাবেন
দুধ জ্বাল দিয়ে অর্ধেক করে ঘন করে নিন। মাংস দই ও আদা বাটা দিয়ে মেখে রাখুন। কড়াইতে ঘি গরম করে থেঁতো করা গরম মশলা ফোড়ন দিন। রসুন বাটা দিয়ে ভেজে নিন। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে হালকা ভাজুন, রং যেন সাদা থাকে। মেরিনেট করা মাংস দিয়ে ভালো করে কষান। কাঁচালঙ্কা ও লবণ দিয়ে ঢেকে দমে বসান যতক্ষণ না মাংস সেদ্ধ হয়। শেষে ঘন দুধ মিশিয়ে নামিয়ে পরিবেশন করুন। নরম, সুগন্ধি এই সফেদ কোরমা রুটি বা পোলাওয়ের সঙ্গে অপূর্ব লাগে।

দই কাতলা
সুস্মিতা দে দাস

কী কী লাগবে
পাকা কাতলা মাছ ৩ পিস/২০০ গ্রাম, টক দই ২০০ গ্রাম, কাজু বাদাম ৭–৮ টি, পোস্ত ১ টেবিল চামচ, মৌরি ১ টেবিল চামচ, ছোট এলাচ ২টি, লবঙ্গ ২টি, দারুচিনি ১ টুকরো, তেজ পাতা ১টি, শুকনো লঙ্কা ২টি, আদা-রসুন ও কাঁচা লঙ্কা বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৪–৫টি, Shalimar's Sunflower তেল প্রয়োজন মতো, লবণ স্বাদমতো, সামান্য চিনি, অল্প হলুদ, Shalimar's Chef Spices ধনে ও জিরে গুঁড়ো ১+১ চা চামচ, পিঁয়াজ বাটা ১টি (বড়)
কীভাবে বানাবেন
মাছ ধুয়ে লবণ, হলুদ ও তেল মেখে ৪–৫ মিনিট রাখুন। কাজু, পোস্ত ও মৌরী জল দিয়ে মিহি পেস্ট তৈরি করুন। আদা-রসুন ও ৩টি কাঁচা লঙ্কা একসাথে বেটে রাখুন। কড়াইয়ে তেল গরম করে মাছ দুইপিঠ হালকা ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন, পিঁয়াজ বাটা ভেজে নিন। তারপর আদা-রসুন বাটা, বাদাম-পোস্ত পেস্ট, ধনে-জিরে গুঁড়ো ও লঙ্কা বাটা মিশিয়ে নাড়ুন। ফেটানো টকদই, লবণ ও চিনি দিয়ে নাড়তে থাকুন। ঝোল শুকিয়ে আসলে জল দিয়ে ফুটান। ঝোলে মাছ দিয়ে গ্রেভি ঘন হলে নামিয়ে পরিবেশন করুন। ওপর থেকে কাঁচা লঙ্কা, বেরেস্ত ও ধনেপাতা ছড়িয়ে সাজান।

চিতলের কালিয়া
দুষ্টু বিশ্বাস

কী কী লাগবে
চিতল মাছের পেটি ৩ টুকরো, পিঁয়াজ বাটা ১টি মাঝারি, আদা ১/২ ইঞ্চি, কাঁচা লঙ্কা ৪টি, টমেটো ১টি, টকদই ২ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, তেজপাতা ১টি, গোটা জিরে ১/৪ চা চামচ, দারচিনি ১/২ ইঞ্চি, লবঙ্গ ২টি, এলাচ ২টি, Shalimar's সর্ষে তেল ৪ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো পরিমাণমতো, নুন স্বাদ অনুযায়ী, চিনি ১/৪ চা চামচ (ঐচ্ছিক)
কীভাবে বানাবেন
মাছ নুন ও হলুদ মাখিয়ে হালকা ভেজে নিন। একই তেলে গোটা জিরে, তেজপাতা ও গোটা গরম মসলা ফোড়ন দিয়ে পিয়াজ বাটা ভাজুন। এরপর আদা, কাঁচা লঙ্কা ও টমেটোর পেস্ট দিয়ে সব গুঁড়ো মসলা দিয়ে ভালোভাবে কোষে নিন। ফেটানো টকদই দিয়ে নেড়ে মসলা থেকে তেল ছাড়লে অল্প গরম জল দিন। ফুটে উঠলে মাছ দিয়ে ঢাকা দিয়ে ৫–৬ মিনিট রান্না করুন। শেষে সামান্য চিনি দিয়ে নামিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে পরিবেশন করুন।

দই ভেটকি
সুচরিতা মুখার্জি

কী কী লাগবে
ভেটকি মাছ ৪ টুকরো, টকদই ৩ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ বাটা ১টি মাঝারি, আদা বাটা ১ চা চামচ, রসুন বাটা ১ চা চামচ, কাঁচালঙ্কা ৩টি, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো পরিমাণমতো, Shalimar's Chef Spices গরম মসলা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, তেজপাতা ১টি, গোটা জিরে ১/৪ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, নুন স্বাদ অনুযায়ী, চিনি এক চিমটি
কীভাবে বানাবেন
মাছ নুন ও হলুদ মাখিয়ে হালকা ভেজে নিন। কড়াইয়ে তেল গরম করে তেজপাতা ও গোটা জিরে ফোড়ন দিন। পিয়াজ বাটা দিয়ে ভেজে আদা ও রসুন বাটা দিন। এরপর জিরে, ধনে, লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে মসলা কষে নিন। ফেটানো টকদই দিয়ে ভালোভাবে নেড়ে নিন যাতে না কাটে। মসলা থেকে তেল ছাড়লে অল্প গরম জল দিন। ফুটে উঠলে মাছ দিয়ে ঢেকে ৫ মিনিট রান্না করুন। শেষে গরম মসলা গুঁড়ো ও সামান্য চিনি দিয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করুন।

দই পটল
রিঙ্কু মিত্র

কী কী লাগবে
পটল ৬-৮টি, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো পরিমাণমতো, কাঁচা লঙ্কা ৪-৫টি, আদা ১ চা চামচ, গোটা জিরে ১ চা চামচ, পোস্ত ১ টেবিল চামচ, কাজু বাদাম ২ টেবিল চামচ, টকদই ৩ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মসলা গুঁড়ো ১/৪ চা চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, নুন ও চিনি স্বাদমতো
কীভাবে বানাবেন
পটলের খোসা ছাড়িয়ে নুন-হলুদ মাখিয়ে রাখুন। কাঁচা লঙ্কা, আদা ও গোটা জিরে আলাদা করে বেটে নিন। পোস্ত ও কাজু বাদাম সামান্য জল দিয়ে বেটে নিন। কড়াইয়ে তেল দিয়ে পটল ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে কালোজিরে ও কাঁচা লঙ্কার ফোড়ন দিন। এরপর আদা-কাঁচালঙ্কা বাটা, হলুদ, লঙ্কা গুঁড়ো, ধনে ও গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে কষান। পটল দিয়ে মসলা কষিয়ে উপরে টকদই দিন। ভালো করে মিশিয়ে ঢেকে রাখুন। শেষে কাঁচা লঙ্কা, গরম মসলা গুঁড়ো ও ঘি ছড়িয়ে নুন-মিষ্টি চেখে পরিবেশন করুন।
রক্তিমা কুণ্ডু
মিষ্টি দই দিয়ে বোয়াল মাছ

কী কী লাগবে
বড় ২ টুকরো বোয়াল মাছ, ১/২ কাপ মিষ্টি দই, ১/২ কাপ টকদই, ১ চা চামচ বেসন, ১ টি পেঁয়াজ, ১ ইঞ্চি আদা, ৪ টি চেরা কাঁচালঙ্কা, ১ চা চামচ চিনি, স্বাদমত নুন, ৫ টেবিল চামচ Shalimar's সরষের তেল, ১ টি ছোট এলাচ, ১ টা ছোট তেজপাতা, ১ ইঞ্চি দারচিনি, ১ চা চামচ ঘি, ১/২ টেবিল চামচ Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো, ১ টেবিল চামচ লেবুর রস, ১ চা চামচ Shalimar's Chef Spices গরম মশলার গুঁড়ো, ১ টেবিল চামচ কুচনো ধনেপাতা।
কীভাবে বানাবেন
প্রথমে মাছগুলোকে নুন, কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো, সর্ষের তেল ও লেবুর রস দিয়ে ম্যারিনেড করে রাখতে হবে ১০ মিনিট। টকদই, চিনি, বেসন ও অল্প নুন দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিতে হবে। পেঁয়াজ ও আদা একসাথে মিক্সিতে পেস্ট করে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে তার রস টা আলাদা করে নিতে হবে। এবারে ফেটানো দইয়ের মিশ্রনে ২ টেবিল চামচ পেঁয়াজ-আদার রস মিশিয়ে নিলেই গ্রেভির মিশ্রণ তৈরী। কড়াইতে তেল গরম করে মাছগুলোকে দুপাশে হাল্কা ভেজে তুলে নিতে হবে। ঐ তেলেই ঘি দিয়ে একে একে তেজপাতা, দারচিনি, এলাচ ফোড়ন দিয়ে ফোড়নের গন্ধ বের হওয়া অবধি নাড়িয়ে গ্যাসের আঁচ একদম কম করে দই এর মিশ্রণ ঢেলে অনবরত নাড়তে থাকতে হবে। ঢাকা না দিয়ে রান্নাটা ৫ মিনিট হতে দিয়ে চেরা কাঁচা লঙ্কা, মিষ্টি দই ও ভাজা মাছ দিয়ে দিতে হবে।মাছগুলো একবার গ্রেভিতে কোট করে প্রতি দিক ৪-৫ মিনিট করে ফুটতে দিতে হবে। এবার গরম মশলার গুঁড়ো, ধনেপাতা ছড়িয়ে হাল্কা হাতে নাড়াচাড়া করে গ্যাস অফ করে ৩-৪ মিনিট ঢেকে রেখে পরিবেশন করতে হবে।

দই লেবু মরিচ পমফ্রেট
কী কী লাগবে
২ কাপ নারকেল কোরা, ২ টেবিল চামচ জল ঝরানো টকদই, ২ টি পমফ্রেট মাছ, ৩ টি গন্ধরাজ লেবুর পাতা, ১ টি গন্ধরাজ লেবু, ৬ টি কাঁচালঙ্কা, ৬ টি গোটা গোলমরিচ, ৩ টেবিল চামচ Shalimar's সর্ষের তেল, ১ টেবিল চামচ আদার রস, ১ চা চামচ লঙ্কাবাটা, ১ টেবিল চামচ পেঁয়াজ বাটা, ১ চা চামচ চিনি, স্বাদমত নুন, প্রয়োজনমত জল।
কীভাবে বানাবেন
নারকেল কোরা অল্প জল দিয়ে বেটে ছেঁকে দুধ বার করে তাতে আদার থস আর নুন মিশিয়ে রাখুন। মাছ গুলোতে দই, নুন, গন্ধরাজ লেবুর রস, সরষের তেল মেখে কিছুক্ষণ রেখে প্যানে তেল গরম করে ভেজে তুলে নিন। ঐ তেলে গোটা গোলমরিচ ও ২ টি চেরা কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে একে একে পেঁয়াজবাটা ও লংকাবাটা, টকদই দিয়ে কষুন। এবার নারকেলের দুধ, ভাজা মাছ দিয়ে উল্টে পাল্টে রান্না করে গন্ধরাজ লেবুপাতা, কাঁচালঙ্কা, চিনি, গন্ধরাজ লেবুর রস দিয়ে ঢেকে পরিবেশন এর আগে পর্যন্ত ঢেকে রাখুন। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

দার্জিলিং-এর ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁ ও খাবারের গল্প
সুদেষ্ণা ঘোষ
পাহাড়, কুয়াশা, চা বাগান আর শান্তির প্রতীক বাঙালির নেক্সট টু ডেস্টিনেশন মানেই দার্জিলিং। কিন্তু শুধুই প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, দার্জিলিংয়ের শহরও একটি ভিন্ন রঙের গল্প বলে, যা আবহমান মানুষের স্মৃতি, খাবারের স্বাদ, এবং প্রথার মেলবন্ধন নিয়ে গঠিত। এই শহরের ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁগুলো কেবল খাদ্যের ঠিকানা নয়; বরং এরা ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং শহরের জীবনের ছোট ছোট গল্পের ধারক। প্রতিটি রেস্তোরাঁ নিজস্ব স্বাদ, নির্দিষ্ট পরিবেশ এবং নির্দিষ্ট মানুষের সাথে গাঁথা।
দার্জিলিংয়ের খাবারের জগৎ একটি অনন্য অভিজ্ঞতা, যেখানে পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি রান্না, তিব্বতি এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভাবের ছাপ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতি। দার্জিলিং ছিল ব্রিটিশদের গ্রীষ্মকালীন অবকাশ। ১৮৪১ সালে দার্জিলিংকে পাহাড়ি স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। শহরের উঁচু পাহাড়, শীতল বাতাস এবং চা বাগান সবকিছুই ব্রিটিশদের আকৃষ্ট করেছিল। তারা এখানে ক্লাব, কফি হাউস, বেকারি ও ছোট রেস্তোরাঁ গড়ে তুলতে শুরু করে। ঔপনিবেশিক শাসন ও স্থানীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণেই জন্ম নেয় দার্জিলিংয়ের প্রথম রেস্তোরাঁ এবং খাবারের ঐতিহ্য। এই সময়ে ইউরোপীয় রেসিপি এবং স্থানীয় উপাদান যেমন মাংস, সবজি এবং চা সবই একসঙ্গে রান্না হতে শুরু করে। সেই যুগের অনেক রেস্তোরাঁ আজও ঐতিহ্য হিসেবে টিকে আছে, যেমন গ্লেনারিজ (Glenary’s), কেভেন্টার্স (Keventer’s), এবং পার্ক রেস্তোরাঁ (Park Restaurant)।

১৯৩০-এর দশকে গ্লেনারিজ প্রতিষ্ঠা পায়। এটির মূল আকর্ষণ হল কাঠের মেঝে, বড় জানালা এবং ইউরোপীয় বেকারির সুবাস। ঢুকলেই মনে হয় সময় যেন পিছিয়ে গেছে। গ্লেনারিজ কেবল রেস্তোরাঁ নয়, এটি দার্জিলিংয়ের ব্রিটিশ যুগের স্মৃতি সংরক্ষণের একটি প্রতিষ্ঠান। চেখে দেখতে পারেন এখানকার ফ্রুট কেক, ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক, ক্রিম রোল, ইংলিশ ব্রেকফাস্ট, সসেজ, বেকড ডিশ ইত্যাদি। প্রতিটি কেক, প্রতিটি কফির কাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। ব্রিটিশরা বিকেলের চা ও কেকের জন্য এই রেস্তোরাঁতে আসতেন। আজও পর্যটকরা এখানকার চা এবং কেকের স্বাদ নিয়ে সময়ের সঙ্গে একটি সংযোগ অনুভব করেন।
এরপর নাম আসে, কেভেন্টার্সের। কেভেন্টার্সের নাম শুনলেই মনে আসে দার্জিলিংয়ের সকালের নাস্তা। ১৯১১ সালে এডওয়ার্ড কেভেন্টার এই রেস্তোরাঁ শুরু করেন। পাহাড়ের শহরে সকালের হিমেল বাতাসে একটি গরম কফি এবং টোস্ট এটাই কেভেন্টার্সের বিশেষ অভিজ্ঞতা। এখানকার পর্ক সসেজ, হ্যাম, বেকন, ফ্রাইড এগ এবং টোস্ট বহু লোকজন ভিড় জমান। কেভেন্টার্স কেবল খাবারের জন্য নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায় এমন ব্যালকনি, সকালে শহরের কুয়াশা এবং গরম কফি এই অভিজ্ঞতা একে কিংবদন্তি করেছে।
দার্জিলিং এ এসে একেবারে ঐতিহ্যবাহী তিব্বতি স্বাদের আসরে গা ভাসাতে চাইলে আসতে হবে কুংগা তে। দার্জিলিংয়ের খাবারের বৈচিত্র্যের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তিব্বতি এবং নেপালি খাবার। কুংগা রেস্তোরাঁ বহু দশক ধরে এই স্বাদের ঠিকানা। ছোট একটি রাস্তার কোণে থাকা এই রেস্তোরাঁ শহরের সাধারণ মানুষের কাছে যেমন প্রিয়, তেমনি পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণ। এখানকার মোমো, থুকপা, শাপ্তা শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং পাহাড়ি জীবন এবং সাদামাটা রান্নার আত্মার ও প্রতিফলন। শীতের হাওয়ায় গরম ঝোলের সঙ্গে মোমো এটি দার্জিলিং ভ্রমণের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

এবার শুধুই চিরচেনা স্বাদ না নিয়ে একটু ফিউশনে মন মজাতে চাইলে যেতে হবে পার্ক রেস্তোরাঁয়। দার্জিলিং মলের কাছে অবস্থিত পার্ক রেস্তোরাঁ বহুদিন ধরে স্থানীয় মানুষ এবং পর্যটকদের প্রিয়। এখানে চাইনিজ এবং ইন্ডিয়ান ফিউশন খাবার পরিবেশন করা হয়। জনপ্রিয় খাবার বলতে,
চিলি চিকেন, নুডলস, ফ্রাইড রাইস, স্থানীয় সবজি এবং মাছের নানা পদ। পর্যটনের ভিড়ে দ্রুত, স্বাদে ভরসাযোগ্য এই বৈশিষ্ট্য পার্ক রেস্তোরাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
পাহাড়ের খাবার মানে শুধুই খাওয়া নয়; এই খাবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের এক নিবিড় সম্পর্ক। পাহাড়ি রান্নায় জল ও আগুনের ব্যবহার অত্যন্ত সংযত এবং সচেতন। এখানে তীব্র মশলার আধিক্য নেই, নেই স্বাদের উপর জোর খাটানোর প্রবণতা। বরং কাঁচামালের প্রকৃত স্বাদকে সম্মান জানানোই পাহাড়ি রান্নার মূল দর্শন। কম উপকরণে, ধীরে এবং ধৈর্যের সঙ্গে রান্না করাই এখানে অভ্যাস। দার্জিলিংয়ে তাজা সবজি ও মাংস সাধারণত ধীরে আঁচে রান্না করা হয়, যাতে তার স্বাদ ও পুষ্টি বজায় থাকে। ঝোল ও স্যুপে অতিরিক্ত মশলার বদলে ব্যবহৃত হয় হালকা ফোড়ন, তাজা উপাদান এবং দীর্ঘ সময়ের রান্না। ফলে খাবারে এক ধরনের স্বচ্ছ, পরিচ্ছন্ন স্বাদ তৈরি হয়। চা, কফি কিংবা বেকড খাবারেও প্রক্রিয়াজাত উপাদানের ব্যবহার তুলনামূলক কম; এখানকার বেকারি ও ক্যাফেগুলি আজও অনেক ক্ষেত্রে পুরনো রেসিপি ও প্রাকৃতিক উপকরণের উপর নির্ভরশীল। এই সংযম, ধৈর্য এবং প্রাকৃতিকতার প্রতি আস্থা এই তিনের সমন্বয়ই পাহাড়ি রান্নাকে আলাদা করে চেনায়। দার্জিলিংয়ের খাবারে তাই কোনো তাড়াহুড়ো নেই; প্রতিটি পদ যেন সময় নিয়ে নিজেকে প্রস্তুত করে।

এই শহরের বহু রেস্তোরাঁ, বেকারি ও কফি হাউস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের হাতে পরিচালিত হয়ে আসছে। রাঁধুনিদের হাতে জমে আছে বছরের পর বছরের অভিজ্ঞতা, আর সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গেই তৈরি হয়েছে এক একটি স্বতন্ত্র স্বাদ। অনেক রেস্তোরাঁয় আজও পুরনো রেসিপি হাতে লেখা খাতায় সংরক্ষিত যা শুধু রান্নার নির্দেশ নয়, বরং পারিবারিক ইতিহাসের দলিল। স্থানীয় কৃষক ও চা বাগান থেকে সংগ্রহ করা তাজা সবজি, দুধ, মাংস এবং চা পাতাই এই রেস্তোরাঁগুলির ভরসা। উপাদান সংগ্রহ থেকে রান্না পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে থাকে মানুষের পরিশ্রম ও আন্তরিকতা। এই মানুষগুলিই খাবারে সেই ‘মানুষিকতা’ এবং জীবন্ত অনুভূতি যোগ করে, যা কোনো মেনু কার্ডে লেখা যায় না। প্রতিটি প্লেট খাবারের সঙ্গে মিশে থাকে ভালোবাসা, শ্রম এবং পারিবারিক স্মৃতির দীর্ঘ গল্প।
এ যেন কেবলমাত্র স্বাদের অভিজ্ঞতা নয়, বরং শহরের সামগ্রিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। চা বাগানের শ্রমিকদের সকাল-সন্ধ্যার সাধারণ খাবার থেকে শুরু করে শহরের অভিজাত ক্যাফেগুলির বিকেলের চা, সবকিছুই দার্জিলিংয়ের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। খাবারের মধ্য দিয়েই এই শহরের সামাজিক ছন্দ প্রকাশ পায়। স্থানীয় উৎসবের সময় বিশেষ রান্না, তিব্বতি সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানে মোমো ও থুকপা, কিংবা ইংলিশ ধাঁচের হোমস্টে ও কফি হাউসে বিকেলের চা এই সব মিলিয়ে খাবার ও শহরের জীবনের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। পর্যটকদের জন্য যেমন ভিন্ন অভিজ্ঞতা, তেমনই স্থানীয় মানুষের কাছেও এই খাবার দৈনন্দিন জীবনের আবেগঘন অনুষঙ্গ।

তাই এইসব রেস্তোরাঁগুলো শুধুমাত্র খাওয়ার জায়গা নয়, এ এক সম্পূর্ণ অভিজ্ঞতা। প্রতিটি টেবিল, প্রতিটি কফির কাপ, প্রতিটি গরম প্লেটের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, মানুষের স্মৃতি এবং পাহাড়ের নীরব গল্প। এই শহরের খাবারের প্রকৃত মানে লুকিয়ে আছে মানুষ, সংস্কৃতি এবং প্রথার এক অপূর্ব সংমিশ্রণে। দার্জিলিংয়ে গেলে তাই শুধু পাহাড় দেখলেই হয় না। এই শহরকে সত্যিকারভাবে অনুভব করতে হলে তার ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁগুলোর স্বাদ নিতে হয়। কারণ এখানকার প্রতিটি খাবার শুধু পেট ভরায় না সে একটি গল্প বলে, যা স্মৃতির পাতায় দীর্ঘদিন থেকে যায়।
পাহাড়ে উষ্ণ পানীয়
সুস্মিতা মিত্র
পাহাড়ের সকাল মানে কুয়াশা-মাখা অরণ্য, সূর্যের আলোয় ঝকঝকে পাহাড়, প্রিয়জনের সঙ্গে চড়াই উৎরাই পথে হেঁটে চলা অসীম দিগন্তে। আধো আলোয় ঘুমভাঙা চোখে বারান্দায় দাড়িয়ে হাতে ধোঁয়া ওঠা কাপ, এর থেকে বেশী ভালো আর কি হতে পারে! সেই কাপে চা কফি যা ইচ্ছে থাকতে পারে। অথবা হতে পারে কোনো ভেষজগুণ সম্পন্ন পানীয়'ও। রোজকার পাহাড়ি জনজীবনে এরা অলস সময়ের সঙ্গী, অনাবিল পরিশ্রমের বিরতি, অতিথেয়তার ভাষা এবং নীরব আলাপের সহচর। ভোরবেলা সূর্য ওঠার আগে বা সন্ধ্যায় কাজের শেষে, ঠান্ডায় জমে যাওয়া শরীরকে এক মূহুর্তে চনমনে করে তুলতে এর জুড়ি নেই। বর্তমান সময়ে অবশ্য পাহাড় থেকে শহুরে জনজীবন, হাইরাইজ বিল্ডিং থেকে ধূ ধূ পাড়া-গাঁয়ের প্রতিটি বাড়িতে সাতসকালে কিছু হোক কি না হোক এক কাপ চা কফি কিছু একটা হবেই। এখানে একটা ছোট্ট বিষয় না বললেই নয়! বাঙালি বাড়িতে কফি মানে এট্টু ইস্পেশাল! এসব হয় বিশেষ অতিথি এলে আর শীতকালের সন্ধ্যায়। যদিও এর কোনো যথাযোগ্য কারণ জানা নেই। তবে হালফ্যাশনে চিনি ছাড়া ব্ল্যাক কফি খাওয়ার চল হয়েছে। মাথা ধরা থেকে শুরু করে জরুরি বৈঠক, এ জিনিস মাস্ট! এককালের অজানা দূর্মূল্য বস্তু থেকে আজকের নিতান্তই সাধারণ ঘরে চা কফির এই অবাধ বিচরণের যাত্রাপথ নিয়ে আজ কথা বলবো।

চায়ের ইতিহাস বহু প্রাচীন। এর উৎস মূলত চীনে। কিংবদন্তি অনুসারে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৭০০ অব্দে সম্রাট শেননং দুর্ঘটনাবশত চায়ের স্বাদ আবিষ্কার করেন। এই বিষয়ে দুখানি কাহিনী জানা যায়। একটি বর্ণনা অনুযায়ী, সম্রাট শেননং একবার তীর্থযাত্রায় ছিলেন। পথিমধ্যে তিনি অসাবধানতাবশত একটি বিষাক্ত উদ্ভিদের পাতা খেয়ে ফেলেন, যার ফলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঠিক সেই সময়ে হঠাৎ একটি পাতা উড়ে এসে সম্রাট শেননং-এর মুখে পড়ে এবং তিনি তা চিবিয়ে খান। অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। পরবর্তীতে জানা যায়, সেই পাতাটি ছিল চা-পাতা, যা ওই বিষের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করেছিল। অন্য একটি বর্ণনা অনুসারে, সফরকালে ক্লান্ত হয়ে সম্রাট শেননং একদিন একটি গাছের নীচে বিশ্রাম নিতে বসেন। তিনি তাঁর চাকরকে জল ফুটিয়ে আনতে নির্দেশ দেন। জল ফুটতে থাকা অবস্থায় হঠাৎ বাতাসে কয়েকটি পাতা উড়ে এসে ফুটন্ত জলের পাত্রে পড়ে যায়। এর ফলে জলের রং বদলে যায়। বিষয়টি লক্ষ্য করে সম্রাট বিস্মিত হন। সেই জল ফেলে না দিয়ে তিনি তা পান করার সিদ্ধান্ত নেন। জলটির স্বাদ ছিল কিছুটা তেঁতো, তবে তা তাঁকে প্রশান্তি ও এক ধরনের চাঙ্গাভাব এনে দেয়। এই দুই বর্ণনার কোনটি কতটা সত্য, তা আজ আর নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এই কিংবদন্তিগুলিই চা আবিষ্কারের ইতিহাসকে রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। এভাবেই ধীরে ধীরে চা ভেষজ পানীয় থেকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। ফলে চা শুধু পানীয় নয় চিকিৎসা, আচার ও সামাজিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের হাত ধরে পৌঁছে যায় জাপানে, এবং পরিচিত হয় আধ্যাত্মিক চর্চায়। নবম শতাব্দীতে জাপানি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সাইচো চা-কে জাপানে নিয়ে আসেন এবং সেখানে এর চাষ শুরু হয়। জাপানের ‘চা সেরিমনি’ আজও সংযম, সৌন্দর্য ও মনোসংযোগের প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। ১৬শ ও ১৭শ শতকে ইউরোপে চায়ের প্রবেশ ঘটে। প্রথমে পর্তুগিজ ও ডাচ ব্যবসায়ীরা চা নিয়ে আসে, পরে ব্রিটিশরা এটিকে বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়ে দেয়। ইংল্যান্ডে চা দ্রুত অভিজাত সমাজের পানীয় হয়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়।

কিন্তু এদেশে চা নিয়ে এহেন হইচই শুরু হলো কবে থেকে? এবার আসি সে প্রসঙ্গে। ভারতে চায়ের আগমনের ইতিহাস ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯শ শতকে ব্রিটিশরা চীনের উপর নির্ভরতা কমাতে ভারতের পাহাড়ি ও আর্দ্র অঞ্চলে চা চাষ শুরু করে। আসাম, দার্জিলিং এবং পরে নীলগিরি, এই তিন অঞ্চল ধীরে ধীরে ভারতের চা মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দার্জিলিং চা তার স্বতন্ত্র সুবাস ও স্বাদের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। পাহাড়ি মাটি, কুয়াশা, নিয়মিত বৃষ্টি ও ঠান্ডা আবহাওয়া এই সব মিলিয়ে দার্জিলিং চায়ের এক আলাদা ঘরানা তৈরি হয়েছে। তবে এখানে চা শুধু শিল্প নয়, মানুষের জীবনেরও অংশ ও বটে। প্রথমদিকে এদেশে চা ছিল মূলত সাহেবদের পানীয়। কিন্তু রেললাইন ও বিভিন্ন কারখানার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে চা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনে ঢুকে পড়ে। দুধ, চিনি ও মশলার সংযোজনে তৈরি হয় অত্যন্ত সুস্বাদু ভারতীয় দুধ-চা, যা আজ দেশের প্রায় প্রতিটি কোণে জনপ্রিয়। তবে শুধুই স্বাদ নয়। এর পুষ্টিগুণ ও প্রচুর। চা অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ। নিয়মিত চা পান শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। আদা, এলাচ বা দারুচিনি মেশানো চা সর্দি-কাশিতে আরাম দেয়। ঠান্ডার সময় শরীর গরম রাখতে চা অত্যন্ত কার্যকর। আবার গ্রিন টি বা ব্ল্যাক টি হজমে সহায়ক। এছাড়াও মানসিক চাপ কমাতে এবং মনোযোগ বাড়াতে চায়ের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতিরিক্ত চা পান ক্ষতিকর হতে পারে এ কথা মাথায় রাখা জরুরি।
চায়ের পাশাপাশি কফির ইতিহাসও কম আকর্ষণীয় নয়। এর উৎপত্তি আফ্রিকার ইথিওপিয়ায়। কিংবদন্তি অনুযায়ী, কালদি নামের এক রাখাল লক্ষ্য করেন যে, কফি ফল খাওয়ার পর তাঁর ছাগলগুলো অস্বাভাবিকভাবে চঞ্চল হয়ে উঠছে। এই ফলের গুণাগুণ থেকে ধীরে ধীরে কফির ব্যবহার শুরু হয়। আরব বিশ্বে কফি দ্রুত জনপ্রিয়তা পায়। ইয়েমেন ও আরব উপদ্বীপে কফি পান সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। জানা যায় ১৫ শতকে সুফি সাধকরা এটি পান করে রাতের ইবাদতের জন্য জেগে থাকতেন। ১৬ শতকের মধ্যে আরবীয় উপদ্বীপ থেকে কফি পারস্য, মিশর, সিরিয়া এবং তুরস্কে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে ইউরোপ ও সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে কফি হাউসগুলি হয়ে ওঠে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার কেন্দ্র। এদিকে ভারতে কফির আগমন ঘটে মোটামুটি ১৭শ শতক নাগাদ। কথিত আছে, সুফি সাধক বাবা বুদান ইয়েমেন থেকে সাতটি কফি বীজ গোপনে নিয়ে এসে কর্ণাটকের পাহাড়ে রোপণ করেন। এই ঘটনাই ভারতের কফি ইতিহাসের সূচনা। পরবর্তীতে কুর্গ, চিকমাগালুর ও নীলগিরি অঞ্চলে কফি চাষ বিস্তার লাভ করে। কফিতে থাকা ক্যাফেইন ক্লান্তি দূর করে ও স্নায়ুকে উদ্দীপিত করে। পরিমিত কফি পান কাজের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করে। কফিতে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য'ও উপকারী। তবে অতিরিক্ত কফি অনিদ্রা বা অস্বস্তির কারণ হতে পারে, তাই পরিমিতি জরুরি।

তবে শুধুই চা কফিতে বিষয়টা কিন্তু সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ি অঞ্চলে ভেষজ চায়ের ব্যবহার ও বহু পুরোনো ঐতিহ্য। আধুনিক গ্রিন টি বা হার্বাল টি জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই পাহাড়ে নানারকম লতাপাতা, শিকড় ও মসলা দিয়ে উষ্ণ পানীয় তৈরি করা হতো। এগুলি শুধু স্বাদের জন্য নয়, মূলত স্বাস্থ্যরক্ষার উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হতো। আদা পাহাড়ি ভেষজ চায়ের অন্যতম প্রধান উপাদান। ঠান্ডা, সর্দি বা গলা ব্যথায় আদা চা আজও সবচেয়ে ভরসাযোগ্য। তুলসী পাতা অনেক পাহাড়ি ঘরে চায়ের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়। তুলসী চা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শ্বাসনালীর সমস্যা কমাতে সাহায্য করে। দারুচিনি ও লবঙ্গ মেশানো ভেষজ চা পাহাড়ি শীতে বিশেষ জনপ্রিয়। এগুলি শরীর উষ্ণ রাখে এবং রক্তসঞ্চালনে সাহায্য করে। অনেক এলাকায় লেমনগ্রাস দিয়ে চা তৈরি হয়, যার সুবাস মনকে শান্ত করে। কিছু এলাকায় স্থানীয় ফুল ও পাতা শুকিয়ে ভেষজ চা বানানোর রীতি আছে। এই চা গুলি ক্যাফেইনমুক্ত হওয়ায় রাতের বেলাতেও পান করা যায়। আধুনিক জীবনে এইসব পানীয় আবার নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, কারণ মানুষ প্রাকৃতিক ও রাসায়নিকমুক্ত খাবারের দিকে ঝুঁকছে। এ আসলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রতিফলন। কোন পাতা কখন তুলতে হবে, কতটা শুকোতে হবে, কতক্ষণ ফুটবে এই জ্ঞান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে চলে এসেছে। এ এক জীবনদর্শন। ইতিহাসের পথ পেরিয়ে, সংস্কৃতির ছোঁয়ায়, আবহাওয়ার প্রয়োজনে চা ও কফির মতো পানীয় আজ পাহাড়ি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে এক কাপ চা যেমন দিন শুরুর আবেগ, তেমনই সন্ধ্যার কফি যেন মানসিক প্রশান্তি।

মাফলার
নির্মাল্য বিশ্বাস
জয়দীপ কাল বেড টি খাবে না, মর্নিং ওয়াকে যাবে না, এমনকি ব্যালকনির চেয়ারে বসে পাখির কিচির মিচির শুনতে শুনতে খবরের কাগজেও চোখ রাখবে না। জয়দীপকে যারা চেনে তারা জানে পৃথিবী রসাতলে গেলেও এই তিনটি নিয়মের ব্যতিক্রম হয় না ওর। গিন্নি সুরঙ্গমা থেকে নাতনি মৌবনী সকলেই অবাক। অবাক হওয়ার কারণ এভাবে সাতসকালে বেরানো। তবে এমন নয় কাউকে কিছু না জানিয়ে হুট করে বেরিয়ে পড়ছে। সবাইকে বলে কয়েই বেরোচ্ছে। এটাও বলেছে, মনে হলে একদিন থেকেও আসতে পারে।
প্রদীপ্ত অবাক। - বাবা তুমি তো কখনো এভাবে একা একা কোথাও যাও না !
- কোনদিন যাইনি বলেই ভবিষ্যতে যাব না, এমন কোন কথা আছে কী? তুমিও তো তিরিশ বছর অবধি বাজার হাট কিচ্ছু করোনি, এখন করছ।
অকাট্য যুক্তি। কিচ্ছুটি বলার নেই।
সুরঙ্গমা গমগমিয়ে উঠল - তা অতো সাতসকালে কোথায় নাচতে যাওয়া হবে শুনি?
- বাটানগর।
- সেখানে আবার ঢলানোর কী আছে?
- জানোই তো আমার জীবনের অনেকগুলো বছর ওখানে কেটেছে। তাহলে আবার জিজ্ঞেস করছ কেন?
- এতবছর তো একবারও সেখানে যাবার কথা মনে হয়নি। বুড়ো বয়সে এসে আবার পিরিত উথলে উঠল কেন?
জয়দীপ কিছু বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই রিয়া বলে উঠল - সে আপনি ঘুরে আসুন না বাবা অসুবিধে নেই কিন্তু আটটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট করেই না হয় যাবেন।
- না বউমা, দেরী হয়ে যাবে পৌঁছতে। শহরটাকে একটু ঘুরে দেখব তো!
- তাহলে আপনার ছেলে যাক না আপনার সঙ্গে। অতটা রাস্তা একা যাবেন, কখন কী শরীর খারাপ হয়!
- আমি যথেষ্ট সুস্থ বউমা!
খুব মন দিয়ে নতুন কেনা বার্বি ডলটার চুল আঁচড়াচ্ছিল মৌবনী। চোখ আর কান দু-জায়গায় রেখে কাজ করার কোন স্পেশাল ট্রেনিং নিয়েছে বুঝি পাঁচ বছরের মেয়েটা। পুতুল খেললেও কানটা যে সান্ধ্য আলোচনা চক্রে বন্ধক রেখেছে সেটা বলাই বাহুল্য। ঠাম্মির রসালো কথাগুলো ওর সব থেকে বেশি মনে ধরে কিন্তু এই ধরে রাখার পাত্রটা ওর বয়সের মতই অনেক ছোট। যখন তখন ভর্তি হয়ে যায়। তখন ফস করে কিছু বুলি বেরিয়ে পড়ে মুখ দিয়ে। তেমনই হঠাৎ করেই বেরিয়ে এল - মরণ বাড় বেড়েছে বুড়ো।
রিয়া চোখ পাকিয়ে তাকালেও সুরঙ্গমা ফিক করে হেসে উঠল। নাতনির কথাটা বেশ মনে ধরেছে ধর বাড়ির গিন্নির।

(২)
মহেশতলা এতোটা বদলে যাবে ভাবতে পারেনি জয়দীপ। সারি সারি দোকানপাট তো গজিয়ে উঠেছেই, সেই সঙ্গে ক্যাফেটারিয়া, হাই রাইজিং বিল্ডিং পর্যন্ত মাথা তুলেছে শহর জুড়ে। আগে ছিল ধু ধু মাঠ, ইতস্তত ছাতিম, পাম আর গুলমোহরের সারি। তার মাঝ বরাবর ছবির মত রাস্তা গিয়ে মিশতো দিগন্তরেখার ঠিকানায়। শীতের শুরুর এই সময়টা সেই রাস্তাগুলো ভরে থাকত হলুদ মেরুন পাতায়। সেই ঝরা পাতার ওপর খসখস শব্দ করে দু'জন তরুণ- তরুণী পাশাপাশি হাঁটত। হাঁটতে হাঁটতেই পৌঁছে যেত সবুজ মাঠের মাঝে লাল- সাদা কোয়ার্টারে।
ইচ্ছে হলে দু'জনে সাইকেল নিয়ে চলে যেত গঙ্গার ধারে। বিস্তীর্ণ সবুজ পাড়ে এক ভাঙাচোরা চাতালে পাশাপাশি বসত। ভুটভুটিতে মানুষের আসা যাওয়া দেখত। পাশের এক লরঝরে জেটিতে বাটা কোম্পানীর জাহাজ এসে ভিড়ত। সন্ধ্যা নামার মুখে বিদায়ী সূর্য গঙ্গার জলে রং ছড়িয়ে যেত। আশেপাশের গাছ-গাছালিতে তখন পাখিদের ঘরে ফেরার কলতান। স্নেহলতার কাঁধে মাথা রেখে জয়দীপ শুনত- 'সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক বেশ তো।' শনশন করে একটা উত্তুরে হাওয়া বইত। সেই হাওয়ায় এলোমেলো স্নেহলতার খোলা চুলগুলো আছড়ে পড়ত জয়দীপের নাকে, মুখে, চোখে। জয়দীপ প্রাণভরে টেনে নিত সেই লেবুফুলের অলীক সুবাস।
সন্ধ্যা নামলে উঠত দু'জনে। ওড়না দিয়ে নিজের কান, মাথা জড়িয়ে কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ থেকে মাফলার বার করত স্নেহলতা। জয়দীপের হাতে দিয়ে বলত- নাও পরে নাও।
জয়দীপ এঁড়ে ছেলের মত তর্ক জুড়ত। -মাফলার পড়ার মত ঠান্ডা পড়েনি এখনও।
স্নেহলতা চোখ পাকাত। -পরো বলছি, ঠান্ডা লেগে যাবে। একে তোমার সর্দির ধাত।
সেসব কী আজকের কথা! প্রায় চল্লিশ বছর আগে এক রূপকথার কাহিনী যেন। তেইশ বছর বয়সে এ শহর ছেড়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে গিয়েছিল জয়দীপ। কেন গিয়েছিল এভাবে নিজের শহর ছেড়ে? সেও কী স্নেহলতার জন্য? তাহলে দশ বছর পর কেন আবার অফিস পিকনিকে এসে আতিপাতি করে খোঁজ করল ওর? যদিও সেই স্নেহলতার সুলুকসন্ধান দিতে পারেনি কেউ। সেই চল্লিশ বছর আগেই স্নেহলতা নামের সম্ভাবনার লতাগাছটি ও কেটে মাটিতে ফেলে দিয়েছিল। তারপর যৌবন পেরিয়ে, অপেক্ষার এক দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে অতীতের ভাঙচুরগুলো সাজিয়ে দেবার মানুষটাকে দেখবার সুযোগ আচমকাই এসে উপস্থিত হল। খবরটা দিয়েছিল অনুপম। গত পরশুই বাড়ি এসে অনুপম জানিয়েছে স্নেহলতার ফিরে আসার খবর। কোথায় আছে তার সন্ধানও নাকি পেয়েছে। অনুপমের কথা যে খুব বিশ্বাসযোগ্য হয় তা নয়। ও কান শুনতে ধান শোনে। তার উদাহরণ স্কুলজীবনে অনেকবার পেয়েছে। তবু কেন জানি অনুপমের কথাগুলো ভীষণভাবে বিশ্বাস করতে মন চাইল এখন। মন বলছিল সে ফিরবে, ফিরতে তাকে হবেই।

(৩)
রাস্তার চায়ের দোকান থেকে এক ভাঁড় চা নিল জয়দীপ, সাথে দুটো বিস্কুট। গলা ভিজিয়ে বুক পকেট থেকে ঠিকানা লেখা কাগজটা দোকানদারকে দেখাল।
- এটা কতদূর বলতে পারবে ভাই?
- দূর আছে মেসোমশাই। রিক্সা নিয়ে নিন।
পুরোন দিনের স্মৃতিগুলো ভাবতে ভাবতে রিক্সা কখন গোল বাউন্ডারির পাঁচিলওয়ালা এক বাড়ির সামনে চলে এসেছে সে খেয়াল নেই। লোহার গেটের মাথায় টিনের সাইনবোর্ডে লেখা - 'স্নেহলতা'।
গেট পেরোলেই ফুলের বাগান। সেখানে এক অল্পবয়সী মেয়ে গাছে জল দিচ্ছিল। তার সামনে এসে জয়দীপ দাঁড়াল।
- খুকু, স্নেহলতা সেন কী এখানে থাকেন ?
- হ্যাঁ, এসো আমার সঙ্গে।
বাগানের শেষপ্রান্তে গোটা পাঁচেক ছোট ছোট ঘর। ইঁটের গাঁথনি, তবে টালির চাল। মেয়েটা বাইরে থেকে বলল - ও দিদি, একজন দেখা করতে এসেছে।
যাকে ডাকল সে 'কে রে?' বলে একটা চায়ের কাপ নিয়ে বেরিয়ে এসেই ভূত দেখার মত চমকে উঠল।
মেয়েটা দেখল, দিদির কাপ থেকে ছিটকে অনেকটা চা মাটিতে এসে পড়ল। মুখ দিয়ে কথা সরছে না কোন। এক অদ্ভুত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে মানুষটার দিকে। মেয়েটা এবার তাকাল জয়দীপের দিকে। ওর মুখেও কোন কথা নেই। গলার কণ্ঠনালীটা ওঠানামা করছে শুধু।
মেয়েটা দেখছে দু'জনার চোখ দুটো জলে ভিজে আসছে। কেউই যেন আর এই জগতে নেই। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে আঁচলে চোখ মুছল সেই সৌম্যকান্তি নারী।
ধরা গলায় বলল - এসো। এতদিন পর!
পায়ে পায়ে সামনে এগিয়ে এল জয়দীপ। হাত বাড়িয়ে মিষ্টির প্যাকেটটা দিল।
- আবার এসব ফর্মালিটি কেন?
- নতুন গুড়ের সন্দেশ। তুমি ভালবাসতে বলে নিলাম।
ভুরু জোড়া কুঁচকে একটু কাছাকাছি হল স্নেহলতার। - তোমার মনে আছে এখনো?
- মনে থাকবে না?
- ভেতরে এসো, ঘরগুলো দেখাই।
স্নেহলতা ঘুরে ঘুরে সব দেখাল। একটা ছোট অফিস ঘর আর তার পাশের তিনটে ঘরে ওর মেয়েরা থাকে আর একটা ঘরে ও নিজে। মেয়ে বলতে ওর নিজের কেউ নয়, আবার নিজের থেকেও অনেক বেশি আপন। অনাথ এই মেয়েদের সকলের কাছেই ও দিদি। খুব বেশি জন রাখার সামর্থ্য নেই। ছ-জন মেয়েই থাকে। এদের কাউকে স্বাবলম্বী করে বিয়ে দিতে পারলে আবার নতুন কাউকে আনার ভাবনা। এভাবেই চলে।
গল্প চলার ফাঁকেই জলখাবার এল। গরম গরম লুচি আর আলু ছেঁচকি, সাথে বোঁদে।
- নাও, হাত ধুয়ে খেয়ে নাও। বউ রোজ যত্ন করে খাওয়ায়। আজ গরীব বন্ধুর বাড়ি যা আছে তাই খাও।
- এভাবে গরীব বলে আমাকে লজ্জা দিও না। তোমার যা আছে, আমার তা নেই।
- নাও নাও আর কথা না বাড়িয়ে খেয়ে নাও। সেই কোন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছ।
খাওয়া দাওয়ার পর বাগানটা ঘুরে ঘুরে দেখল। খুব যত্ন করে কাটা সবুজ ঘাসের ওপর ফুটে আছে হলুদ গাঁদা, থোকা থোকা ডালিয়া আর রঙ বেরঙের চন্দ্রমল্লিকা। তারই মাঝে তাল, সুপারি আর খেজুর গাছের ডাল বেয়ে কাঠবেড়ালিদের ছোটাছুটি চলছে।
দুপুরে আসন পেতে সবাই খেতে বসল। স্নেহলতাই পরিবেশন করছে। ভাত, মুসুর ডাল, আলু পোস্ত, পোস্তর বড়া আর দেশী মুরগীর ঝোল।
পরম তৃপ্তিতে খেতে খেতে জয়দীপ বলল - তোমার এখনো মনে আছে আমি পোস্ত খেতে ভালবাসতাম?
স্নেহলতা উত্তর করে না। দু-চোখ টিপে হাসে। প্রশান্তিটুকু মুখে লেগে থাকে।
দুপুরের খাবার পর্ব মিটতে স্নেহলতা বলল, চলো তোমাকে একটা জায়গা দেখাই। খুব ভাল লাগবে।
পায়ে পায়ে দু'জনে চলল। বেশি দূরে নয়। এই কম্পাউন্ডের পিছনেই একটা শান বাঁধানো ঘাট। ঘাটের পাশেই একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছ বহুদূর পর্যন্ত তার শাখা বিস্তার করে রেখেছে। তকতক করছে ঘাটের সিঁড়ি। পাশাপাশি বসল দু'জনে। সামনে কুলকুল করে বয়ে চলেছে গঙ্গা। শান্ত- নির্জন, জনমানবশূন্য। শুধু একটা চোখ গেল পাখি কখন থেকে ডেকে যাচ্ছে।
জয়দীপের মনে হল এই সেই জায়গা যেখানে মানুষের বয়স বাড়ে না, সময়ের কাঁটা থমকে দাঁড়ায়, হারিয়ে যাওয়া অতীতের স্মৃতিগুলো জমা হয়।
এতক্ষণ পর নিরিবিলিতে দু-দন্ড কথা বলার অবসর মিলল। জয়দীপের তর সইছে না।
- তুমি কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলে স্নেহা?
ঠোঁট কামড়ে নিচু গলায় বলল স্নেহলতা- অজ্ঞাতবাসে ছিলাম বলতে পারো।
- কিন্তু কেন?

স্নেহলতার চোয়াল শক্ত হল একটু।
-আমি চাইনি আমার জন্য তোমার কোন সম্মান নষ্ট হোক। তারপর শেষ বয়সে ফিরেই তো এলাম সেই শেকড়ের টানেই।
জয়দেব তাকাল স্নেহলতার দিকে। চোখে অপরাধীর চাহনি।
-একটা কথা খুব জানতে ইচ্ছা করছে। ছোট হলেও এই অনাথ আশ্রম চালাচ্ছ। এতজনের খরচ, চলে কী করে?
- আমি পুরুলিয়া চলে গিয়েছিলাম। ওখানে স্কুল মাস্টারি করতাম। ওখানেও দু'জন থাকত আমার সঙ্গে। তারপর রিটায়ারমেন্টের পর এই জমিটা কিনে এখানেই আশ্রম বানাই।
জয়দীপ চোখ সরাচ্ছে না। বুঝতে পারছে ওর কষ্ট হচ্ছে খুব। তবু না জিজ্ঞেস করেও পারল না - বিয়ে করলে না?
স্নেহলতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকায় গঙ্গার দিকে। ভাঁটার টানে ভেসে যাচ্ছে একঝাঁক কচুরিপানা। ইটভাটার সরু চিমনিগুলো থেকে ঘুড়ির সুতোর মত ধোঁয়া উঠছে আকাশে। স্নেহলতার ঘন কালো চোখ দুটো স্থির হল জয়দীপের চোখে। ভেজা নরম গলায় বলল- করেছিলাম তো একবার। তারপর আর কাউকে মনে ধরেনি।
জয়দীপের মনে হল একবার দোলপূর্ণিমায় স্নেহলতার সিঁথিটা লাল আবীরে রাঙিয়ে দিয়েছিল। কী অপরূপ লাগছিল স্নেহলতার মুখটা।
- লাল রঙে আমার বড় ভয় জানো। আজো মনে হয় তোমার দেওয়া সেই লাল আবীর মাথায় লেগে আছে। এখানে ঘষেঘষে সেই রঙ তুলি। পরদিন কেউ এসে আবার রাঙিয়ে দিয়ে যায়।
পশ্চিমের সূর্য গঙ্গার বুকে মাথা রেখেছে তখন। জয়দীপের মনে হল পৃথিবী নামের কোন এক নারী গঙ্গার জলে ধুয়ে দিচ্ছে সূর্যের মাখানো আবীর।
- চলো জয়। সন্ধ্যা নামবে এবার। তোমায় অনেকটা পথ যেতে হবে এবার।
জয়দীপ হেসে বলল- তোমার এখানে থেকে যেতে বলবে না?
কী সুন্দর একটা লেবুফুলের গন্ধ ভেসে এল। উত্তরে স্নেহলতা হাসল। বলল- আমার যে অতিরিক্ত কোন ঘর নেই বন্ধু।
- তোমার ঘরেই না হয় থেকে যেতাম।
সমস্যার সহজ সমাধান করে দিয়েছে জয়দীপ। স্নেহলতার শ্বাস পড়ছে দ্রুত। হৃদপিণ্ডটা বড় তাড়াতাড়ি ওঠানামা করছে। অস্থির স্বরে বলল- সেটা হয় না জয়। সমাজ তখন কী বলবে?
সময়ের মোম কিভাবে যেন গলে গলে পড়ছে। পুড়ে যাচ্ছে জয়দীপের ভিতরটা। চল্লিশ বছর আগে জয়দীপ ঠিক এই কথাটাই বলেছিল স্নেহলতাকে।
সেই উত্তুরে হাওয়াটা আজ আবার দিচ্ছে। জয়দীপের বুকের ভিতর পাতাঝরা অরণ্য। স্নেহলতা সোজাসুজি দাঁড়াল জয়দীপের সামনে। পূর্নদৃষ্টিতে তাকাল। দু'জনের মুখেই অস্তমিত সূর্যের আলো। দু'ফোঁটা জল শিশিরবিন্দুর মত চিকচিক করছে স্নেহলতার চোখে। আর তো কয়েকটা মুহূর্ত। তারপরই জয়দীপ ফিরে যাবে নিজের ঘরে, যেভাবে গাছের পাখিরা এখন ঘরে ফিরে আসছে ঠিক সেভাবেই। স্নেহলতা শুধু গঙ্গার পাড়ে এই স্মৃতিটুকু নিয়েই কাটিয়ে দেবে বাকি জীবন।
কাঁধের ঝোলা ব্যাগ থেকে একটা মাফলার বার করল স্নেহলতা। পরম যত্নে জয়দীপের গলায় সেটা জড়িয়ে দিয়ে ধরা গলায় বলল - এখানে খুব ঠান্ডা। তুমি গলায় কিছু দিয়ে আসোনি। শরীরের প্রতি এখনো অবহেলা রয়ে গেছে তোমার।
- আবার কবে আমাদের দেখা হবে স্নেহা?
- জানি না। হয়তো হবে কোনদিন কিংবা আর কোনোদিনও দেখা হবে না আমাদের। তুমি এই মাফলারটা যত্ন করে রেখো। এটাই আমাকে তোমার সাথে বেঁধে রাখবে আজন্মকাল।
(৪)
জয়দীপ ফিরে চলেছে। স্নেহলতার গেট ছাড়িয়ে, পাতা ঝরা গাছ গাছালি পেরিয়ে, রাস্তার এক অজানা বাঁকে মিলিয়ে গেল।
নঙ্গী রেলস্টেশন থেকে হুহু করে ট্রেনটা ছুটে চলেছে শিয়ালদহের দিকে। জানলার ধারে একটা সিটে চুপচাপ বসে আছে জয়দীপ। অতীতের স্মৃতিগুলো জানলা দিয়ে আসা হাওয়ার মত ঝাপটা মারছে।
চল্লিশ বছর আগে এমনি এক শীতের সন্ধ্যায় গঙ্গার ধার থেকে ফিরছিল দু'জনে। পথ চলতে চলতে হঠাৎ এক শিশুর কান্নার শব্দ। অন্ধকার তখনো অতো গাঢ় হয়নি। আওয়াজ অনুসরণ করে এগোতেই ওরা দেখল একটা ঝোপের আড়ালে কাপড়ে মোড়া এক দেবশিশু। কে বা কারা ফেলে দিয়ে গেছে জানা নেই। জয়দীপ থানাতেই দিয়ে দিতে বলল বাচ্চাটাকে। স্নেহলতা শুনল না। ও থানার সাথে কথা বলে বাচ্চাটাকে দত্তক নেবে বলে মনস্থির করল। জয়দীপ অনেক বোঝাল।
- এভাবে অবিবাহিত অবস্থায় দত্তক নিতে নেই। সমাজ কী বলবে?
- সমাজ কী বলবে তাতে আমাদের কী যায় আসে জয়? আমরা তো আর কয়েক বছরের মধ্যে বিয়ে করেই নেব। তখন আর কেউ কিছু বলবে না।
সমস্যার সহজ সমাধান করে দিলেও যুক্তিটা ঠিক মনঃপুত হল না জয়দীপের।
- সে তো আরো সমস্যার। লোকে বলবে ওদের বিয়ের আগের বাচ্চা। কেউ শুনবে না যে বাচ্চাটাকে দত্তক নিয়েছ তুমি। কতজন কত কথা বলবে, তুমি ভাবতে পারছ!
স্নেহলতার কঠিন দৃষ্টি থমকাল জয়দীপের মুখের ওপর।
- বুঝেছি তোমার ঠিক কোথায় সমস্যা। তোমার যত সমস্যা সব আমায় নিয়ে। আমি এখানে থাকলেই লোকে বলবে এটা আমাদের বাচ্চা। তার থেকে ভালো আমিই বাচ্চাটাকে নিয়ে তোমার সামনে থেকে দূরে চলে যাচ্ছি। কেউ আর বদনাম করতে পারবে না তোমার।
তার পরের দিন থেকে স্নেহলতাকে খুঁজে পায়নি কেউ।
অতীতের কথা ভাবতে ভাবতেই চোখ দুটো বর্ষার মেঘের মত ভারী হয়ে উঠল জয়দীপের। সূর্যের আলো নিভে গেছে কখন। একঝাঁক তারা চিনির দানার মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আকাশে। স্নেহলতা বলেছে - 'যত্নে রেখো মাফলারটাকে।' মাফলারটার গায়ে কয়েক কুঁচি শিশিরবিন্দু স্পর্শ হয়ে লেগে আছে। মাফলারটা যত্নে থাকলে সেগুলোও যত্নে থাকবে।








Comments