top of page
Search

রোজকার অনন্যা লাইফ - এপ্রিল ২০২২

নববর্ষ ফ্যাশনিস্তা, পোশাক - আদি রেডিমেড সেন্টার, স্টেশন রোড, সোদপুর
















উপন্যাস

ঋক্ষবিলের রহস্য

রাজা ভট্টাচার্য


****

সামান্য অন্ধকার, ধুলোয় ভরা সিঁড়িটার বাঁক ঘুরতে ঘুরতে অরিত্র মৃদু গলায় বলল,“একটা কথা বলব। কাউকে বলবি না, প্রমিস?”

ঋতমের হাতে একটা ভারি বইয়ের প্যাকেট। বেশ ভারি। প্লাস্টিকটা আঙুলে ব্যথা দিচ্ছে। বলল,“বল।”

“আমি না...মানে...আজই প্রথম কফিহাউসে ঢুকব।”

ঋতম এমনভাবে আঁতকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল যে, আর একটু হলেই পিছন পিছন উঠে-আসা মেয়েটা ওর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছিল। সেটা বুঝতে পেরে ও তড়বড় করে বাকি সিঁড়িটা পার হয়ে বাঁদিকে সরে রাস্তা ছেড়ে দাঁড়াল। তারপর হাঁফ-ধরা গলাতেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠল,“হ্যাট! আবার ঢপ দিচ্ছিস?”

অরিত্রও তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উঠে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,“চিল্লাচ্ছিস কেন? কী জ্বালা মাইরি! নিয়ম আছে নাকি, কলকাতার ছেলে হলে কফিহাউসে আড্ডা মারতেই হবে, নইলে আধার কার্ড বাজেয়াপ্ত করা হবে? আশ্চর্য!”

ঋতম হি হি করে একটা অসভ্য-মার্কা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে মস্ত দরজাটার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে দু’হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলল,“আসুন হুজুর! প্রথমবার কফিহাউসে ঢোকার মুহূর্তটা এনজয় করুন। প্লিজ কাম!”

চারপাশের লোকজন অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছে দেখে অরিত্র আর দেরি না-করে ওর পাশ দিয়ে টুক করে ঢুকে পড়ল ভিতরে।

যথারীতি একটা টেবিলও ফাঁকা নেই।

কয়েক সেকেন্ড সত্যিই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল অরিত্র। ঋতমও একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এই ব্যাপারটা ওর মাথায় ছিল না৷

বিশাল হলঘরটাকে অবাক হয়ে দেখছিল অরিত্র। বাপ রে! ঘর জুড়ে পরপর টেবিল, সেগুলো ঘিরে চেয়ার। তার প্রত্যেকটা এখন ভর্তি। মৃদু একটা গুনগুন শব্দে ঘরটা ভরে আছে৷ কথা চলছে চাপা গলায়। নলচে-আড়াল দিয়ে সিগারেট টানছে অজস্র লোক।

হঠাৎ ঋতম বলল,“এখানেই দাঁড়া এক মিনিট।” বলে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল। বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল অরিত্র।

পরক্ষণেই ওর মোবাইলটা বেজে উঠল। বের করে ঋতমের নাম দেখে অবাক হল ও৷ এ আবার কী!

“উপরে চলে আয় রে৷ পেয়ে গেছি বসার জায়গা।”

ও! পাছে নেমে এসে ডাকতে ডাকতেই চেয়ার হাতছাড়া হয়ে যায়— তাই ফোন করেছে৷

উপরে এসে অরিত্র ঋতমকে খুঁজে বের করে বসল আরাম করে৷ অনেকক্ষণ ধরে ঘুরেছে ওরা আজ কলেজ স্ট্রিটে। থার্ড ইয়ারের কিছু বই কেনার দরকার ছিল। পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে হাঁটতে হাঁটতে। হাতের প্যাকেটটাও কম ভারি হয়নি।

ফাঁকা চেয়ারটাতে বইগুলো গুছিয়ে রেখে ও বলল,“আর্য কোথায় গেল রে? ‘তোরা ঢোক, আমি আসছি’ বলে কেটে পড়ল যে?”

হাত নেড়ে ওয়েটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিল ঋতম৷ বলল,“কেটে পড়েনি। বঙ্কিম চাটুয্যে স্ট্রীটে ঢুকল কেন যেন। বলল তো চলে আসবে এক্ষুনি। ও— ওই যে...দাঁড়া, ফোন করি। নিচে খুঁজছে।” বলে ফোন করতে লাগল। অরিত্র ঝুঁকে দেখল, নিচের ফাঁকা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওদের খুঁজছে আর্য। এবার ফোন ধরল। তাকাল উপর দিকে। ও তাড়াতাড়ি হাত নাড়ল। একবার মাথা ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে গেল আর্য।

টেবিলে একটা বিকট মোটা প্যাকেট ধপাস করে ফেলে দিয়ে বসে পড়ল আর্য৷ একগাল হেসে বলল,“উফফ্! অ্যাটলাস্ট!”

“কী আছে রে প্যাকেটে? কতগুলো বই কিনলি?” বলল ঋতম।

আর্য মুখটা গম্ভীর করে বলল,“কতগুলো নয়, বৎস! একটাই।”

অরিত্র চোখ বড় বড় করে বলল,“একটা বই অ্যাত্ত মোটা? ভাগ!”

এই সময় ওয়েটার এগিয়ে আসতেই আর্য আঙুল দেখিয়ে বলল,“তিনটে ব্ল্যাক।”

তারপর অরিত্রর দিকে ঘুরে বসে বলল,“বল তো, রামের দিদির নাম কী?”

অরিত্র হকচকিয়ে গেল,“চ্যাংড়ামো করিস না। জন্ম থেকে শুনে আসছি— রামেরা চার ভাই।”

আর্য মধুর হেসে বলল,“এবং জন্ম থেকেই তুই ভুল শুনে আসছিস৷ ঋতম? এনি আইডিয়া?”

ঋতম ঠোঁট চেটে বলল,“সিরিয়াসলি?”

“কী?”

“মানে...রামের সত্যিই ইয়ে ছিল? দিদি?”

“ইয়েস! ছিল। তার নাম শান্তা। ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার।”

সত্যিকারের অবাক হয়ে ঋতম একবার অরিত্রর দিকে তাকাল। অরিত্রও চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে আছে আর্যর দিকে৷ ওরও জানা ছিল না স্পষ্টতই৷

আর্যর মুখ দেখেই বোঝা গেল, দীর্ঘদিনের দুই বন্ধুকে ঘাবড়ে দিতে পেরে মনে মনে বেজায় খুশি হয়েছে ও৷ আঙুল দিয়ে টেবিলে টকাটক শব্দ করতে করতে ও বলল,“এবার বল দেখি, সীতার বাবার নাম কী? বাবা বলতে আমি অফকোর্স পালক-পিতাই মিন করছি।”

অরিত্র মুখ খোলার আগেই ঋতম তাড়াহুড়ো করে বলল,“জনক, জনক! এটা জানি। তুই কি আমায় মুখ্যু ঠাউরেছিস একেবারে?”

রহস্যময় মুখ চোখ করে আর্য বলল,“আবার ভুল করলি। মিথিলার রাজারা সকলেই জনক। মানে— যে-ই রাজা হবে, তারই নাম হয়ে যাবে জনক। বলতে পারিস— জনক কোন নাম নয়, একটা পোস্ট। কোশ্চেনটা এইভাবে করা যেতে পারে— সীতার বাবা যে জনক, তার আসল নাম কী? এবার বল।”

ওরা আবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। না, জানা নেই। সত্যি কথা বলতে কী— জনক যে নাম নয়, উপাধি— সেটাই ওদের জানা ছিল না।

“সীরধ্বজ।” একটু হেসে বলল আর্য, “আচ্ছা আরেকটা বলি…”

“দাঁড়া রে ভাই!” ওর কথার মাঝখানেই বলে উঠল ঋতম,“এসব কোত্থেকে পাচ্ছিস বল দেখি?”

“পাইনি এখনও। পাব।”

“পাসনি তো বলছিস কোত্থেকে?”

“তা নয়। এগুলো নিতান্ত ছোটখাট ব্যাপার, যে-কেউ একটু-আধটু নেট ঘাঁটলেই পেয়ে যাবে। ফেসবুকে গন্ডা গন্ডা গ্রুপ আছে, সেখানে জিজ্ঞেস করলেই পনের-কুড়ি জন মিলে উত্তর দিয়ে দেয়। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল, এভাবে ঠিক পোষাচ্ছে না। তাই আজ ভেবেচিন্তে বইটা কিনেই ফেললাম।”

চোখ বড় বড় করে অরিত্র বলল,“কী কিনে ফেললি? রামায়ণ?”

প্রকাণ্ড মোটা প্যাকেটটার উপরে দুটো স্নেহের টোকা দিয়ে আর্য বলল,“ইয়েস! বাল্মীকি-রামায়ণ, উইথ অরিজিনাল সংস্কৃত শ্লোক।” বলে প্যাকেট থেকে বের করল বিশাল বইখানা। লাল রঙের মলাটে হাতে-আঁকা পুরনো স্টাইলের একটা ছবি। রাবণ জটায়ুর ডানা কেটে দিচ্ছেন তরোয়াল দিয়ে, আর পাশে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন সীতা। উপরে বড় বড় করে লেখা ‘রামায়ণম্’, আর ছবিটার নিচে তার চাইতে একটু ছোট হরফে লেখা রয়েছে— ’শ্রীমন্মহর্ষি-বাল্মীকি-বিরচিতম্।’

খুব ভয়ে ভয়ে প্রথম পাতাটা খুলল ঋতম। সেখানে লেখা রয়েছে অনুবাদকের নাম— পঞ্চানন তর্করত্ন। তার পরের পাতা থেকেই যেন অন্য এক পৃথিবীর গন্ধ আসছে। বাংলা হরফে, কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় লেখা একগাদা কথা, তার নিচে ওটা যে ফের লেখকের নাম লেখা, এটুকুই শুধু বুঝতে পারল ও। এরপর মস্ত একটা সূচিপত্র। তারও পরের পাতাটা দু'ভাগে ভাগ করা; উপরের দিকে সার বেঁধে সংস্কৃত ভাষার শ্লোক, আর তার নিচে একটা লম্বা লাইন টেনে বোধহয় তারই বাংলা অনুবাদ হবে। ‘তপঃস্বাধ্যায়নিরতং তপস্বী বাগ্বিদাং বরম্।’


এই পর্যন্ত দেখেই সাহস ফুরিয়ে গেল ঋতমের। চট করে বইটা বন্ধ করে দিয়ে ও মুখ তুলে তাকাল আর্যর দিকে। তারপর শুকনো গলায় বলল,“এই বই তুই পুরোটা পড়বি?”

আর্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গলায় বলল,“পড়ব বলেই তো কিনলাম। আলবাত পড়েগা। পুরোটাই পড়েগা।”

ঋতম ভক্তিভরে হাতদুটো জোড় করে মাথায় ঠেকিয়ে বলল,“আমার প্রণাম গ্রহণ করুন, হে মহর্ষি আর্যদেব! এতদিনে আপনি সার্থকনামা মানুষ হতে চলেছেন। শুধু দয়া করে আমাকে আপনার শিষ্য হতে বলবেন না। চার মাস পরে ফার্স্ট সেম; নম্বর খারাপ এলে বাবা ঠেঙিয়ে চামড়া খুলে নেবে।”

আর্য প্রথমে হেসে ফেলল। তারপর গম্ভীর হয়ে বলল,“না রে। ভেবে দেখলাম— এরকম খুঁটিনাটি অল্প অল্প করে জেনে কোনও লাভ হচ্ছে না। ভেবে দ্যাখ— একটা ক্যারেক্টার, কিংবা ধর একজন মানুষই— এত হাজার বছর পরে একটা গোটা দেশের রাজনীতির ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠেছে কোন গুণে, সেটা ভালো করে জানতে হলে মূল বইটা একবার পড়ে ফেলা উচিত না? তার বদলে এর বাবা কে, ওর বউয়ের নাম কী! ধুস! এসব হল নিছক তথ্য। আমি ঘটনাটা ভালো করে জানতে চাইছি। ক্যারেক্টারগুলোকে বুঝতে চাইছি।”


ওরা দুজন আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল। আর্য এইরকমই। যে-কোনো ব্যাপার তলিয়ে দেখতে ও ভালোবাসে। যেখানে দুখানা কোশ্চেন-অ্যান্সার মুখস্থ করলে দিব্যি নম্বর উঠে যায়, সেখানেও সবসময় টেক্সট বইটা একবার পড়ে নেয়। গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধ— সব। কক্ষনও সাজেশন বানায় না।


তাই বলে রামায়ণ! হে ভগবান!!

***†***


****


“বালীকে বধ করে রাম তো সিংহাসনে বসালেন সুগ্রীবকে। এই দুজনের মধ্যে যখন অগ্নিসাক্ষী করে ফর্মাল বন্ধুত্ব হয়েছিল, তখনই এঁরা একটা চুক্তিতে এসেছিলেন। রাম বালীকে হত্যা করে সুগ্রীবকে রাজা করে দেবেন, বিনিময়ে সুগ্রীব রাজা হওয়ার পর রামকে সব রকমের সাহায্য করবেন সীতাকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে।”

“দাঁড়া ভাই! আগে একটা ব্যাপার ক্লিয়ার করে নিই। এটা আমার অনেকদিনের প্রশ্ন। রাম খামোখা বালীকে মারতে গেলেন কেন? তার চাইতে অনেক সহজ ছিল বালীর কাছেই গিয়ে সারেন্ডার করে তার সাহায্য চাওয়া! বালী তখন ক্ষমতায় ছিলেন, আর সুগ্রীব নির্বাসিত! রাম খামোখা রাজার কাছে না-গিয়ে তার নির্বাসিত ভাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেলেন কেন?”

প্রশ্নটা করল অরিত্র।‌ আর্যদের সল্টলেকের বাড়ির দোতলার বারান্দায় ওরা বসেছে। দুটো বেতের চেয়ার নিয়ে অরিত্র আর ঋতম বসেছে পাশাপাশি; বক্স-জালনাটার উপরে উঠে নিজের ফেভারিট জায়গাটায় বসে আছে আর্য। সবে শেষ হয়ে গিয়েছে ফার্স্ট সেম। নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো কয়েকটা দিন আপাতত হাতে আছে ওদের; নইলে এমনিতে সেন্ট জেভিয়ার্স-এ পড়ার যা চাপ থাকে, তাতে অন্য কোনওদিকে তাকানোর সময় হয় না।


আর্যটা সত্যিই আজব ছেলে! বাইশ বছরের কোনও ছেলে ইংরেজি অনার্সের মারাত্মক চাপ সামলে গোটা বাল্মিকী-রামায়ণ পড়ে ফেলেছে— এমনটা দেখাই যায় না। এ কথাও স্বীকার করতে হবে, গল্পটার মধ্যে কোনও একটা ম্যাজিক আছে। তা নাহলে অরিত্র আর ঋতম কেনই বা আর্যর এই ‘রামায়ণী বকবক’ শুনতে রাজি হয়ে যাবে দিনের পর দিন?

আর্যদের বাড়িটা বিশাল, আর তাতে হেল্পিং হ্যান্ড, ড্রাইভার— এঁদের বাদ দিলে ওরা মাত্র তিনটি প্রাণী বাস করে। ওর বাবা-মা দুজনেই অসম্ভব ব্যস্ত মানুষ; তিনজনের দেখাই হয় সকালে একবার, রাত্রে আর একবার। ফলে দোতলার এই অংশটা আর্যর মৌরসিপাট্টা বললেই হয়। স্তূপাকার বইপত্র, চা কিংবা কফি করে নেওয়ার আয়োজন, মেঝেতে করা একটা বিছানা— সব আছে এখানে। অরিত্র চা করার দায়িত্বটা নিজে পালন করতেই ভালোবাসে, মাঝে মাঝেই উঠে গিয়ে ও ইলেকট্রনিক কেটলিতে চা করে আনছে। তিন বন্ধুর দুপুরের আড্ডা আজও রামায়ণ নিয়েই জমে উঠেছে। আর্যর কোলের কাছে সেই ভয়ানক-দর্শন বইখানা আজও রাখা আছে। ওটা ইদানিং ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেহাত বিশাল বপুর জন্য ওটাকে নিয়ে ঘোরা সম্ভব নয়; নইলে ও বোধহয় বইটাকে নিয়ে কলেজেও চলে যেত।

আর্য চায়ের কাপে একটা আরামের চুমুক দিয়ে বলল,“এটা আমারও ভালোভাবে মাথায় ঢোকেনি এখনও, জানিস! আসলে রামকে সুগ্রীবের কথা প্রথম বলেছিলেন কবন্ধ।”

“কবন্ধ? মানে তার মাথা নেই? তাহলে বলল কী করে?” ঋতম জিজ্ঞাসা করল।

“মাথা নেই বটে, কিন্তু পেটের মধ্যে তার মুখ আছে, একখানা চোখও আছে। ইনি শাপভ্রষ্ট।” বলে চলল আর্য,“সীতার খোঁজে রাম আর লক্ষ্মণ যখন বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তখন তাদের পথ আটকেছিল কবন্ধ নামের এই রাক্ষস। বিশাল বড় বড় দুই হাতে দুই ভাইকে চেপে ধরে মেরে ফেলার উপক্রম করেছিল। রাম-লক্ষ্মণ তার দুই হাত কেটে ফেলে, তারই কথায় তাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেললেন। তখন সেই চিতা থেকে এক আশ্চর্য সুন্দর পুরুষ উঠে এলেন। তিনিই প্রথম সুগ্রীবের কথা বললেন।” বলে আর্য চটপট সূচিপত্র দেখে একটা পাতা বের করে ফেলল, তারপর দেখে দেখে বলে চলল,“শ্রূয়তাং রাম বক্ষ্যামি সুগ্রীবো নাম বানরঃ…”

এইবার অরিত্র এক লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,“দ্যাখ! ফের যদি তুই সংস্কৃত আউড়েছিস, আমি তোর গায়ে গরম চা ঢেলে দেব। বাংলায় বল বলছি!”

আর্য থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলল,“আহা... তুই সংস্কৃত শুনলেই অমন চটে যাস কেন বল দেখি? সোজা বাংলায় এর মানে হল,‘শোনো রাম, আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি— সুগ্রীব নামে এক বানর আছেন।’ বুঝলি এবার? এটাই সুগ্রীবের রামায়ণের গল্পে ইনট্রুডাকশান। পরের লাইনেই কিন্তু কবন্ধ বললেন, সেই সুগ্রীব এখন বালীর দ্বারা নির্বাসিত হয়ে ঋষ্যমূক পর্বতে চারজন মাত্র বন্ধুকে নিয়ে বাস করছেন।”

অরিত্র আবার চেয়ারে বসে বলল,“এই তো দিব্যি বোঝা গেল বাবা! কেন যে তুই মাঝেমাঝেই ওই কঠিন ভাষাটা আওড়াতে থাকিস! যাই হোক, তারপর?”

আর্য বেজার গলায় বলল,“এত সুন্দর ভাষাটা তোর পছন্দ হয় না! যাক গে, বাদ দে... এইবার, এখান থেকে রাম প্রথম সুগ্রীবের কথা জানতে পারলেন। কিন্তু খেয়াল কর— সঙ্গে সঙ্গে এটাও তো জানতে পারলেন যে সুগ্রীব এখন নির্বাসিত, আর বালী ক্ষমতায় আছেন?”

“একজ্যাক্টলি মাই পয়েন্ট।” বলল ঋতম,“সেক্ষেত্রে তাঁর তো বালীর কাছে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল! ক্ষমতায় থাকা রাজা তাঁকে অনেক সহজে সাহায্য করতে পারতেন সেনাবাহিনী দিয়ে, তাই না?”

মাথা নেড়ে আর্য বলল, “একদম তাই। আমার কী মনে হয় জানিস, বালী বোধহয় উত্তর ভারতের আর্যদের পছন্দ করতেন না। রাম কোনওভাবে সে কথা জানতেন হয়তো। যাই হোক, বালীবধের পর সুগ্রীব তো রাজা হলেন। কিন্তু ততদিনে বর্ষা এসে গিয়েছে। সেকালে বর্ষাকালে যুদ্ধ-টুদ্ধ হত না— যাতায়াতের অসুবিধার জন্যই বোধহয়। কাজেই চার-চারটি মাস রাম প্রস্রবণগিরির একটা গুহায় লক্ষ্মণকে নিয়ে ঠায় বসে রইলেন।”

ঋতম চোখ বুজে গলাটা গম্ভীর করে নিয়ে বলল,“এই সেই জনস্থান মধ্যবর্তী প্রস্রবণগিরি। ইহার শিখরদেশ…”

আর্য উপরে নিচে মাথা দুলিয়ে হাসল।

“কিন্তু কেন? খামোখা পাহাড়ের গুহায় পড়ে থাকলেন কেন?” এইবার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল অরিত্র,“সুগ্রীবের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল, এইবার তাঁর রাজধানী কিষ্কিন্ধায় গিয়ে আরামে থাকতে পারতেন তো!”

“পারতেন বইকি!” ভুরু নাচিয়ে হাসল আর্য,“কেন গেলেন না, কেন একটা গুহার মধ্যে অত্তগুলো দিন কাটালেন কষ্টেসৃষ্টে— আন্দাজ কর দেখি?”

তিন সেকেন্ড পরে একটা তুড়ি দিয়ে ঋতম বলল,“আমি বলি? বনবাসের প্রতিজ্ঞা।”

নিজের হাঁটুতে একটা থাপ্পড় মেরে আর্য বলে উঠল,“রাইট! সেকালের লোকেদের কাছে কথার দাম ছিল খুব। এইজন্যই এত প্রতিজ্ঞা আর প্রতিজ্ঞা-পালনের ছড়াছড়ি— বুঝলি?”

অরিত্র মাথা নেড়ে বলল,“এই লাইনে অর্জুন ফার্স্ট বয়, ভাই! উরেব্বাস! খালি প্রতিজ্ঞা আর প্রতিজ্ঞা! যে যুধিষ্ঠিরের রক্তপাত ঘটাবে, তাকে মেরে ফেলব! যে অভিমন্যুকে মেরেছে, কালই তাকে মারতে না-পারলে আমিই চিতায় উঠে যাব— বাপ রে বাপ!”

আর্য রামায়ণ শুরু করেছে শুনে অরিত্রও মহাভারত শুরু করেছিল; অবশ্য উপেন্দ্রকিশোর। তারপর পরীক্ষা ঘাড়ে আসায় ছেড়ে দিয়েছে। ওর বলার ভঙ্গিতে বাকি দুই বন্ধু হো হো করে হেসে উঠল।

ঋতম খুব ভক্তিভরে বলল,“কী যে বলিস! ভীষ্ম থাকতে…"— বলে উপরের দিকে তাকিয়ে ঘটা করে একটা পেন্নাম ঠুকল।

“তা এইভাবে বসে বসে চার মাস কাটিয়ে দিলেন রাম-লক্ষ্মণ।” আর্য আবার ওর গল্পের খেই তুলে নিল,“রাম তো বৃষ্টিবাদলার সময় পাহাড়-জঙ্গলের রূপ দেখে খুব বিলাপ-টিলাপ করলেন। তারপর একসময় বর্ষা কেটে গেল। রাম রোজই ভাবেন— এইবার বোধহয় সুগ্রীব যুদ্ধের জন্য রেডি হবেন। তা কোথায় কী? তিনি নতুন রাজত্ব পেয়ে তোফা আরামে দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন। রামের কথা তার যেন আর মনেই নেই!”

“আহা, এরকম বলিস না!” বলল ঋতম,“সুগ্রীবও তো এতদিন নির্বাসিত হয়ে জঙ্গলেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, বল? তার বুঝি কষ্ট হয়নি? একটু রেস্ট নেবেন না?”

অরিত্র হেসে উঠতে যাচ্ছিল। তার আগেই আর্য বলল,“ভালো বলেছিস। তারাও ঠিক এই কথাগুলোই বললেন, যখন লক্ষ্মণ তাঁকে শাসাতে গেলেন কিষ্কিন্ধায়।”

“তারাও মানে? তারা আবার কারা?” চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল ঋতম,“তুই খালি গল্পের মধ্যে ক্যারেক্টার ঢোকাচ্ছিস।”

আর্য বলল,“কারা নয়, কে! তারা হলেন বালীর স্ত্রী। বালীর মৃত্যুর পর সুগ্রীব তাঁকে বিবাহ করেন। ইনি এক আশ্চর্য পার্সোনালিটি! যাই হোক...রাম যখন দেখলেন, সুগ্রীবের মোটেই খোঁজখবর নেওয়ার আগ্রহ নেই— তখন তিনি লক্ষ্মণকে দিয়ে বলে পাঠালেন... কী বলব... যেটা বলে পাঠালেন— তাকে সোজা কথায় বলে ধমকি।”

“হ্যাট! রাম সুগ্রীবকে ধমকি দিয়েছিলেন? ইয়ার্কি মারার জায়গা পাস না?”

“না রে! ইয়ার্কি নয়, সিরিয়াসলি! রাম লক্ষ্মণকে বলেছিলেন— তুমি সুগ্রীবকে গিয়ে বলবে, বালী নিহত হয়ে যে পথে গিয়েছেন— সে পথ কিন্তু এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি!”

“ওরেব্বাস!” অরিত্র প্রচন্ড অবাক হয়ে বলল,“এ তো সত্যিই ধমকি রে ভাই!!”

“একদমই তাই!”মাথা নেড়ে আর্য বলল,“এর সোজাসুজি মানে হচ্ছে— আমি যদি সীতার সন্ধানের খাতিরে একবার গুপ্তহত্যা করতে পেরে থাকি, তাহলে আরেকবার করতে আমার বিন্দুমাত্র কষ্ট হবে না। সাবধান!”

“বোঝো কাণ্ড!” বলে চোখ বড় বড় করে ঋতমের দিকে তাকাল অরিত্র,“এইজন্যেই এ ব্যাটা মূল বইগুলো পড়ে ফেলে— বুঝলি ঋতম? এই ঘটনাটা তুই জানতিস?”

ঘন ঘন মাথা নেড়ে ঋতম বুঝিয়ে দিল, শুধু জানত না— তাই নয়; জেনে ও অসম্ভব অবাক হয়ে গিয়েছে।

একটু পরিতৃপ্তির হাসি হেসে আর্য বলল,“সুগ্রীব তো ধমক খেয়ে কাজে নেমে পড়লেন। চারিদিকে চর পাঠিয়ে তিনি সমস্ত বানরদের কিষ্কিন্ধায় আসতে বললেন। বানর মানে যে মধ্যভারতের অনার্য গোষ্ঠীর মানুষজন, সে তো বুঝতেই পারছিস। এইবার দেখ— আর্যদের মধ্যে যতই দলাদলি থাকুক না কেন, অনার্যরা কিন্তু দরকারের সময় খুব এককাট্টা ছিল। সুগ্রীবের পাঠানো খবর পেতেই চারিদিক থেকে দলে দলে বানর-জাতীয় রাজারা সব দলবল নিয়ে বিরাট সৈন্য-সামন্ত নিয়ে চলে এলেন কিষ্কিন্ধায়।‌”

“ঠিকই বলেছিস। দিস ইজ ইউনিটি। সুগ্রীব নাহয় রামের দয়ায় সিংহাসন পেয়েছেন। অন্যদের তো কারোর কোন স্বার্থ নেই!” মাথা নেড়ে বলল অরিত্র।

“এগজ্যাক্টলি। এঁরা কিন্তু জাস্ট সুগ্রীবের পাশে দাঁড়াবেন বলেই আসছেন। যাইহোক, সুগ্রীব এইসব বানর-নেতাদের চার ভাগে ভাগ করে পাঠিয়ে দিলেন উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম চারদিকে। প্রত্যেককে বলেও দিলেন— কোন কোন জায়গায় খুঁজে দেখতে হবে। এই জায়গাটায় একটা প্রকাণ্ড ভূগোলের বর্ণনা আছে, বুঝলি! দেখলে হাঁ হয়ে যাবি— সেই আমলেও লোকজন কতদূর পর্যন্ত জায়গার কতখানি নলেজ রাখত! কিন্তু তাঁর নিশ্চয়ই মনে হয়েছিল, সীতাকে পাওয়ার চান্স দক্ষিণদিকে সবচেয়ে বেশি।”

“এটা কেন মনে হল তোর?” ঋতম জিজ্ঞাসা করল।

“কাদের দক্ষিণ দিকে পাঠাচ্ছেন, সেটা লক্ষ কর! তোরও একই কথা মনে হবে।‌” আর্য বলল,“শুধু লিস্টটা খেয়াল কর! নীল, জাম্বুবান, গজ, গবাক্ষ, সুষেন, বালীর ছেলে— যুবরাজ অঙ্গদ! এবং মোস্ট সিগনিফিকেন্ট— স্বয়ং হনুমান!”

“সবচেয়ে ভরসার লোকগুলো।” অরিত্র জোরে বলে উঠল।

মুখ টিপে হাসলো আর্য। তারপর বলল,“এবার বুঝলি? আর একটা ব্যাপার আরও অদ্ভুত।”

“কী রকম?”

“এত বানর এত দিকে সীতাকে খুঁজতে যাচ্ছে। রাম কিন্তু ঠিক হনুমানের হাতেই তুলে দিলেন নিজের আংটিটা— যা দেখালে সীতা বুঝতে পারবেন, হনুমান রামেরই দূত! একে বিশ্বাস করা যায়।”

“আহা! এগেইন আ রাইট চয়েস, বেবি!”

“একদম! রাম সবাইকে দেখার পর ঠিকই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন— এদের মধ্যে সবচেয়ে ইন্টেলিজেন্ট, সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটার নাম হনুমান। সীতাকে খুঁজে বার করার চান্স তাঁরই সবচেয়ে বেশি। সেইজন্যেই নিজের আংটিটা তিনি হনুমানের হাতে দিয়েছিলেন, এমনকি খোদ যুবরাজ— মানে বালীর ছেলে অঙ্গদের হাতেও নয়। নিখুঁত অবজারভেশন, কী বলিস?”

তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে একটা মুদ্রা করে সায় জানাল অরিত্র।

অনেকক্ষণ হয়ে গেছে ওরা গল্প করছে। খেয়াল করেনি, বাইরে সল্টলেকের রাস্তাঘাট নির্জন হয়ে এসেছে। অরিত্র আর ঋতমকে ফিরতে হবে। ওরা উঠে পড়ল। আর্য বইটা একটু সরিয়ে রেখে নেমে পড়ল জালনা থেকে। তারপর দু’হাত ঘসতে ঘসতে বলল,“এখান থেকেই শুরু হচ্ছে একটা মারাত্মক অ্যাডভেঞ্চার, যার মুখ্য চরিত্র হলো হনুমান এন্ড কোং। এবং ঠিক এইখানেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল— যেটা খুব খুঁটিয়ে রামায়ণ না-পড়লে কেউ খেয়াল করবে না।”

বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছিল ঋতম। শেষ বাক্যটা শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করে অরিত্রকে বলল,“আরেকবার চা করবি নাকি? এটুকু শুনেই চলে যাব— সত্যি বলছি!”

চোখ বড় বড় করে অরিত্র বলল,“তোরও কিন্তু আর্যর মতো রামায়ণের নেশা হয়ে যাচ্ছে ঋতম! খুউব সাবধান!”

হা হা করে হেসে উঠল আর্য। তারপর বলল,“সত্যিই এর উপরে নেশা নেই রে! আমিই চা-টা করে ফেলি বরং। তোরা বোস।”

****†****


****

হারিথা রিসর্ট-টা যে এত সুন্দর জায়গায় হতে পারে, সেটা ওদের কারোরই ধারণা ছিল না। এখন রুম থেকে বেরিয়ে বাইরের পাঁচিলটার পাশে দাঁড়িয়ে ওরা তিনজনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।


অন্ধ্রপ্রদেশ টুরিজম-এর এই হোটেলটা আসলে একটা টিলার উপরে। সামনে খাড়া নেমে গেছে ঢালু জমি। সেখানে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে ডাইনে-বাঁয়ে। তারপর কয়েকটা বাড়িঘর; আর তারপরেই আশ্চর্য নীলচে-সবুজ রঙের সমুদ্র এখন সকালের রোদে ঝলসে উঠছে। ধনুকের মতো বাঁকা বেলাভূমিতে হেঁটে যাচ্ছেন হাতে-গোনা কয়েকজন মানুষ। এক ঝাঁক পাখি উড়ছে তাদের মাথার উপর দিয়ে। আরও দূরে চোখ মেললে দেখা যাচ্ছে— ধোঁয়াটে পাহাড়ের শ্রেণী চলে গেছে দূর থেকে দূরে। নভেম্বর মাস, কিন্তু ঠান্ডা নেই আদৌ। বরং সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে ভেসে-আসা সকালের হাওয়াটা বেশ ভালো লাগছে।

“অপূর্ব! জাস্ট ফ্যান্টাস্টিক!” বলল অরিত্র।

ওরা দু’জন নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। তিনজনেই এবার প্রথম ভাইজাগে এসেছে। জায়গাটা সম্পর্কে ওদের তেমন ধারণা ছিল না। ঝকঝকে পরিষ্কার শহর, বড় বড় হোটেল, আধুনিক দোকানপাট আর শপিংমল— এসব দেখে কলকাতার ছেলেদের মুগ্ধ হওয়ার কোনও কারণ নেই আজ আর। কিছুটা নিরুৎসুক চোখে এইসব দেখতে দেখতে শহর পেরিয়েছিল ওরা। কিন্তু শহর ছাড়িয়ে একটু বেরিয়ে এসে হঠাৎ ডাইনে বাঁক নিয়ে অটোটা যখন ওদের রিসেপশনের সামনে নামিয়ে দিল, তখনই ওরা হোটেলটার অপূর্ব অবস্থান প্রথম বুঝতে পারল। আর এখন, ঘরে জিনিসপত্র রেখে, ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে সত্যিই ওরা হতবাক হয়ে গিয়েছে।

“ইস! আরও দু'একদিন থাকলে হত রে!” দূরে তাকিয়ে পাহাড় আর সমুদ্রের গলাগলি দেখতে দেখতে আফসোসের সুরে বলল ঋতম।

“স্নান করবি না?” আর্য জিজ্ঞেস করল।

“খুব একটা কেউ স্নান করছে না কিন্তু।” ঋতম বলল খুঁটিয়ে সমুদ্রের পাড় দেখতে দেখতে।

“না করুক! কোই নেহি যায়েগা, তো হাম তিন যায়েগা!” অরিত্র সতেজে বলল।

“আলবাত যায়েগা!” বলল আর্য,“কিন্তু চল, আগে ব্রেকফাস্ট সেরে ফেলি। বেজায় খিদে পেয়ে গেছে।”

কন্যাকুমারী সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস ধরার বুদ্ধিটা ওদের দিয়েছিলেন অরিত্রর ছোটকাকা। তিনি রেলের উঁচু পোস্টে চাকরি করেন। ঝটপট টিকিটটা জোগাড় করে দিয়েছিলেন তিনিই। হঠাৎ করে বেরিয়ে যাবে ঠিক করলে সবার আগে যে ঝঞ্ঝাটটা সবাইকে ফেস করতে হয়, সেটা ওদের এই কারণেই করতে হয়নি।

মুশকিল হল, ভাইজাগে ওরা থাকবে না। আসলে ওরা যাচ্ছে আরাকু ভ্যালি নামের একটা জায়গায়। সেটা এই ভাইজাগ হয়ে যেতে হয়। সেই কারণেই ওদের এখানে আসা, এবং ঠিক একটা দিন থাকবে— এই ভাবেই আসা। আগে থেকে ভালো করে খোঁজ খবর না-নিলে যা হয়। ওরা জানতই না— ভাইজাগে দেখার মত এত কিছু রয়েছে। ডলফিন’স নোজ, কিংবা কৈলাসগিরি সম্পর্কে ওদের কোনো ধারণাই ছিল না।

ট্রেনে আসার পথে এক পরিবারের সঙ্গে ওদের আলাপ হয়েছিল। মধ্যবয়স্ক দম্পতি দুই সন্তানসহ চলেছেন ভাইজাগের উদ্দেশ্যে। বেড়াতে নয়, সেখানেই থাকেন তাঁরা। ভদ্রলোক জমাটি স্বভাবের; তিনটে অল্পবয়সী ছেলেকে দেখে তাঁর কোনও কারণে ভালো লেগে গেল। গল্প জুড়ে দিলেন দিব্যি।

এই ভদ্রলোকের কাছ থেকেই এসব ওরা জানতে পারল। সবচেয়ে বড় কথা, তিনিই ওদের বললেন— বাসে বা গাড়ি ভাড়া করে আরাকু যাওয়া মানে একটা দুর্ধর্ষ জার্নি হাতছাড়া করে দেওয়া। আরাকু যদি যেতেই হয়, তবে যাওয়া চাই ট্রেনে।

কিরন্ডুল এক্সপ্রেস। অসংখ্য টানেলের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই ট্রেন থেকে পাহাড় আর উপত্যকায় যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা নাকি চোখ ঝলসে দেয়। বাসরাস্তায় সেই দৃশ্য মিলবে না।

কাজেই আবার লাফালাফি, এবং ট্রেন থেকেই ফের সেই ছোটকাকুকে ফোন করে টিকিটের ব্যবস্থা করতে বলা। কাল সকালেই সেই ট্রেন ধরে ওরা চলে যাবে আরাকুর দিকে, কাজেই ভাইজাগে থাকার জন্য ওদের হাতে আছে একটাই দিন। সমুদ্রে স্নান করবে, না সাইট-সিয়িং করে বেড়াবে— তা নিয়ে ওদের মধ্যে রীতিমতো একপ্রস্থ ঝগড়াঝাঁটি হয়ে গেল।

“এইরকম জল, তাও তোরা নামবি না! গাধা নাকি?” বলল অরিত্র।

ঋতম তেরিয়া হয়ে বলল,“সবাই তোর মতো জলহস্তী নয় যে, জল দেখলেই খলবলিয়ে নেমে যাবে।” অরিত্রর ব্যায়াম-করা ক্যারাটে-শেখা চেহারার সঙ্গে যে জলহস্তীর তুলনাটা মোটেই মানাচ্ছে না, সেটা ভাবার সময় ছিল না তখন আর।

আর্য মাঝে পড়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য বলল,“শোন, আমি একটা কথা বলি। সমুদ্রে স্নান তো করাই যায়, যেখানেই সমুদ্র— সেখানেই স্নান। কিন্তু কৈলাসগিরির উপর থেকে সমুদ্র দেখার চান্স তো সব জায়গায় পাব না, বল? আমরা এই যাত্রায় এগুলোই সেরে নেই, বুঝলি! পরে নাহয় হাতে সময় নিয়ে আসা যাবে আবার। তখন খুব করে স্নান করা যাবে।”

কিঞ্চিৎ মতান্তরের পর অরিত্রও রাজি হয়ে গেল। কথাটা ফ্যালনা নয়৷ একটা ছোট গাড়ি ভাড়া করা হল। সারাদিন ধরে দুর্ধর্ষ সব জায়গায় ঘুরে বেড়াল ওরা। সবচেয়ে বড় কথা, অল্পবয়সি হাসিমুখ ড্রাইভার ছেলেটি যে রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে গেল, সেখানকার বিরিয়ানির আস্বাদ তিন ঘন্টার মধ্যে মুখ থেকে গেল না, আর সেই স্বাদ কলকাতার বিরিয়ানির থেকে একেবারেই আলাদা। আহা!

সন্ধ্যের পর বিচে গিয়ে বসল ওরা। টুরিস্ট খুব কেউ নেই, হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, প্রধানত স্থানীয় মানুষেরাই সন্ধ্যায় সমুদ্রের হাওয়া খেতে এসেছেন। রাস্তার পাশে একটা মারুতি ওমনি গাড়ি দাঁড় করিয়ে দুর্ধর্ষ চা বিক্রি করছিল দুটো অল্পবয়সি ছেলে। ফাটাফাটি স্বাদের আদা-চা খেয়ে ওদের তখন মেজাজ শরিফ হয়ে গেছে। সাগরপাড়ের একটা বাঁধানো বেঞ্চে বসে সবে অরিত্র কৈলাসগিরির কথা তুলতে গেছে, এই সময় এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক এসে বসলেন ওদের কাছেই, একই বেঞ্চে৷ ওরা একটু সরে গিয়ে জায়গা করে দিল।

আর্য সবে বলেছে,“শুধু টেস্ট নয়; চায়ের উপর ওই তুলসীপাতা ভেসে থাকাটা কিন্তু ফ্যান্টাস্টিক— বল?”

অমনি ভদ্রলোক তড়িঘড়ি মুখ ঘুরিয়ে বললেন “তোম...সরি...আপনারা বুঝি বাঙালি?”

ওরা তিনজনেই একটু অবাক হয়ে তাকাল। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের দু’এক বছর এদিক-ওদিকে হবে। মাঝারী গড়ন, চুলে পাক ধরেছে অল্প। ওরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে ভদ্রলোক বললেন,“আমিও। আমার নাম জয়দেব সামন্ত। কাছেই একটা হোটেলের চাকরি করি। বাড়ি চুঁচুড়া। আপনারা?”

কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচয় হয়ে গেল। ওরা পরদিন আরাকু যাবে শুনে জয়দেববাবু মুখ বেজার করে বললেন,“আর সে আরাকু নেই ভাই। আমি ভাইজাগে আছি বিশ বছর যাবৎ। একাই থাকি। ফ্যামিলি আনিনি, হোটেল লাইফে ফ্যামিলি নিয়ে থাকা খুব একটা সুবিধের নয়, বুঝলেন! তো এখানে আসার পরে পরেই প্রথমবার গিয়েছিলাম আরাকুতে। আহা! সে যে কী সুন্দর ছিল, তা এখন তোমরা...ইয়ে...আপনারা ভাবতে পারবেন না। ধু ধু উপত্যকা, ঢেউ-খেলানো সবুজ ঘাসের মাঠ, ছোট ছোট পাহাড়, তার উপর দেওদার গাছের সারি! তখন ক'জনই বা আরাকু যেত? ফাঁকা চওড়া রাস্তা ধরে পায়ে পায়ে হেঁটে বেড়াতাম একা একা। পাশে পাহাড়ের কোলে রেললাইন দিয়ে টুকটুক করে যেত মালগাড়ি— সে এক অপূর্ব দৃশ্য।”

ব্যাপারটা ওরা ঠিক বুঝতে পারল না। ভ্যালি, পাহাড়, গাছের সারি বা রেললাইন— কোনটাই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না! তাহলে ভদ্রলোক এতো আফসোস করছেন কেন?

আর্য আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসল,“এখন কি সব পাল্টে গিয়েছে?”

জিভ দিয়ে ‘ছিক ছিক’ করে দুবার শব্দ করে ভদ্রলোক বললেন,“দুর দুর! সেই ভ্যালি, সেই পাহাড়ের সারি তোমরা দেখবে কোথা থেকে? চারিদিকেই তো বাড়ি আর হোটেল আর রেস্টুরেন্ট! গাঁ গাঁ করে গাড়িঘোড়া দৌড়চ্ছে রাস্তা দিয়ে, চারিদিকে নোংরা আর বাঁশ-পোড়া মাংসের গন্ধ। সেই ভার্জিনিটি আজ উধাও। চোখের সামনে নষ্ট হয়ে গেল অমন অপূর্ব সুন্দর জায়গাটা।” বলে সত্যিকারের দুঃখের সঙ্গে মাথা নাড়তে লাগলেন।


সত্যি বলতে কী, ওদের মন দমে গেল রীতিমতো। কৈলাসগিরির উপর থেকে সমুদ্র দেখে ওদের দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বিস্ময়ে— সে কথা মিথ্যে নয়। কিন্তু ওই সাজানো-গোছানো পার্ক আর মস্ত শিবমূর্তি— এসব ওদের বিশেষ ভালো লাগে না। ট্রেনের সেই ভদ্রলোক দেখা যাচ্ছে ইদানিংকালের মধ্যে আর আরাকু যাননি।

কিন্তু এখন তো আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই। দুদিনের বুকিং করা আছে আরাকুতে, তারপর সেখান থেকে ওরা চলে যাবে জঙ্গলের মধ্যে ‘টাইডা’ নামের একটা জায়গায়, একটা ছোট্ট রিসর্টে। তার নাম ‘জাঙ্গল বেল।’ সেটা যে কেমন হবে— তাই বা কে জানে!

ঋতম আর দেরি না করে জিজ্ঞেস করল,“আপনি টাইডায় গিয়েছেন?”

“জাঙ্গল বেল?” জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক। ওরা মাথা নাড়তেই ভদ্রলোক হেসে বললেন,“চমৎকার জায়গা। জঙ্গলের মধ্যে ছোট ছোট কাঠের বাড়ি কোনোটা কুঁড়েঘরের মতো, কোনোটা এস্কিমোদের ইগলুর মতো। কাছেই একটা ছোট্ট রেলস্টেশন আছে, ওই টাইডা স্টেশনটাই আরকি...ভারি নিরিবিলি জায়গা। ঘুরে আসুন, আরাকুর চাইতে ঢের ভাল। চাদ্দিকে জঙ্গল, পাহাড়…”

যাক! ট্যুরটা একেবারে জলে যাচ্ছে না তাহলে। ওরা এবার একটু আশা নিয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।


এমন সময় ভদ্রলোক আবার বললেন,“কাছেপিঠে আরেকটা জায়গা থেকে আপনারা ঘুরে আসতে পারেন। ট্রেনে যাচ্ছেন, না বাসে?”

আর্য বলল,“ওই কিরন্ডুল এক্সপ্রেসের টিকিট কেটেছি আরাকু পর্যন্ত, সেখান থেকে বাস ধরে নেমে আসব টাইডাতে।”

“তাহলে এক কাজ করুন না কেন! ট্রেন ধরেই সোজা চলে যান জগদলপুর! দুখানা ঝর্ণা আছে কাছেই। চিত্রকোট ফলস-কে ভারতের নায়াগ্রা বলা হয়— জানেন তো? দেখার মত ব্যাপার! তারপর ধরুন বেশ কিছু দুর্দান্ত গুহা...সে মশায় এই বোরা কেভস-এর মতো সাজানো-গোছানো লাইট-জ্বালানো টুরিস্ট-স্পট নয়! রীতিমতো অ্যানশিয়েন্ট গুহা, একা ঢোকার মতো বুকের পাটা নেই আজও কারোর! ট্রেন ধরে সোজা সেইটে দেখে নিয়ে ফিরে আরাকুতে আসুন বরং।”

চিত্রকূট শব্দটা শুনেই আর্য যে সোজা হয়ে বসল, সেটা ওদের দুজনের কারোরই চোখ এড়ালো না।

ভদ্রলোক তখন বলে চলেছেন,“জায়গাটা বস্তার জেলার মধ্যে পড়ে কিন্তু। অন্ধ্রার বাইরে, ছত্তিসগড় রাজ্য। চারপাশে ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলটারও নাম শুনে থাকবেন হয়তো। দণ্ডকারণ্য।”

ঋতম আর অরিত্রর আর বুঝতে বাকি রইল না, কাল সকালে কিরন্ডুল এক্সপ্রেস ধরে ওরা আরাকুতে নামছে না। ওরা যাচ্ছে জগদলপুরেই।

******†******

****

একখানা করে মশলা-ধোসা আর এক কাপ করে অতি উপাদেয় ফিল্টার কফি দিয়ে ডিনার সেরে ওরা যখন খাটের উপর বসল রুমে ফিরে, তখন রাত দশটা বেজে গেছে। সমুদ্রের দিকে দেওয়ালটা পুরোটাই কাচের। সে দিকে তাকালে চোখে পড়ছে সারসার আলোয় ভেসে যাওয়া বাঁকা সমুদ্রসৈকত আর ছুটে যাওয়া গাড়ির হেডলাইট।

আর্য বলল,“এইবার মনে কর— সেদিন কী বলেছিলাম। সুগ্রীব যে-দলটাকে দক্ষিণ দিকে পাঠিয়েছিলেন, তারা দণ্ডকারণ্যের মধ্যে সীতাকে খুঁজতে খুঁজতে একসময় পথ হারিয়ে ফেলেছিল— মনে পড়ছে?”

ওরা দুজন মাথা নাড়ল। রামায়ণের গল্পটা সকলেই মোটের ওপর জানে; কিন্তু এই ঘটনাটা সম্পর্কে ওরা কখনো তেমন আলাদা করে কিছু শোনেনি। আর সেই কারণেই আর্যদের সল্টলেকের বাড়ির বারান্দায় বসে ওরা যেটা শুনেছিল, তা সত্যিই হতভম্ব করে দেওয়ার মতোই। এমন আশ্চর্য ঘটনা কেন যে তেমন করে আলোচনার মধ্যে আসেনি কখনও— তা ওদের মাথাতেই ঢোকেনি।

“তোদের তো বললাম, সুগ্রীব চারদিকেই লোক পাঠিয়েছিলেন সীতার খোঁজে। সময় দিয়েছিলেন এক মাস, অর্থাৎ এক মাসের মধ্যে ফিরে এসে সীতার সন্ধান সুগ্রীবকে দিতে হবে।” বলে চলল আর্য,“কার্যকালে কিন্তু দেখা গেল— উত্তর, পূর্ব এবং পশ্চিম থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলো সন্ধানী দলগুলো। না, সীতাকে খুঁজে পায়নি তারা। ফিরল না শুধু দক্ষিণগামী দলটা।”

“এরাই তো সীতাকে খুঁজে বার করবে, তাই না? রাবণ তো দক্ষিণ দিকেই গিয়েছিলেন?” অরিত্র জিজ্ঞেস করল।

মাথা নেড়ে আর্য বলল,“ব্যাপারটা ঠিক এতটা সহজ দাঁড়াল না। আসলে এই দলটাও সীতাকে খুঁজে পায়নি।”

“এই খেয়েছে!” বলে উঠলো ঋতম,“তাহলে রাম আদৌ সীতাকে খুঁজে পেলেন কী করে? তুই তো রামায়ণের গল্পটাকেই গন্ডগোল করে দিচ্ছিস!”

“মোটেই না!” বলল আর্য,“বহুদিন ধরে দক্ষিণ দিকের সমস্ত জঙ্গল-পাহাড় তছনছ করে এই দলটা খুঁজে চলল সীতাকে। ভুলিস না, এই দলে কিন্তু ছিলেন শ্রেষ্ঠ বানরবীরেরা।”

“তাহলে?”

“হ্যাঁ, খুঁজে চললেন বটে, কিন্তু সন্ধান পাওয়া গেল না কোথাও। পথশ্রমে, খিদেয় আর তেষ্টায় তাদের তখন উদ্ভ্রান্ত অবস্থা। সুগ্রীব তাদের বলে দিয়েছিলেন, এই দক্ষিণ দিক বড় সুবিধের জায়গা নয়! বিন্ধ্যপর্বতের হাজার-হাজার শিখর, সবটাই জঙ্গলে ঢাকা; নর্মদা, গোদাবরী— এইসব নদী আছে এই অঞ্চলে। সেসব দেখার পর মেকল, উৎকল, অবন্তী, বিদর্ভ, মৎস্য, কলিঙ্গ—এই সমস্ত দেশ দেখতে হবে। দেখতে হবে অন্ধ্র চোল পাণ্ড্য কেরল— সর্বত্র। মলয় পর্বতে বাস করেন অগস্ত্য মুনি; তাঁকে সন্তুষ্ট করে তাম্রপর্ণী নদী পেরোতে হবে। এমনকি— বললে বিশ্বাস করবি না— দক্ষিণ ভারতের চন্দনগাছের বনের কথা অবধি তিনি উল্লেখ করেছেন!”

“বোঝো কান্ড! তবে যে আমরা বলি, আর্যরা কেবল উত্তর-ভারতটুকুই জানত?”

“সেটাই তো কথা! সুগ্রীব কিন্তু তন্নতন্ন করে দক্ষিণ-ভারতের নদ-নদী-পাহাড়-জঙ্গল-রাজ্য— সবকিছুর বর্ণনা করছেন নাম-টাম শুদ্ধু!”

অবাক হয়ে আর্যর দিকে তাকিয়ে রইল অরিত্র আর ঋতম। এসব ব্যাপার সত্যিই ওদের জানা ছিল না।

“শেষে সুগ্রীব বললেন সেই মোক্ষম কথাটা। একেবারে দক্ষিণে আছে সমুদ্র। সেই সমুদ্রের অপরপারে এক দ্বীপ। ভালো করে সেটাকে খুঁজে দেখতে বললেন তিনি, কারণ সেইদিকেই রাক্ষসরাজ রাবণের বাস।”

“আরিব্বাস! তার মানে সুগ্রীব জানতেন রাবণ কোথায় থাকে?”

“তাই মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু আসলে তাঁকে এই সন্ধানটা দিয়েছিলেন তারা। মনে আছে তো— সেই বালীর স্ত্রী। আর তারা বলেছিলেন, এ-খবর তাকে দিয়েছেন স্বয়ং বালী।

“আরও দক্ষিণে কী কী আছে— তারও একটা বর্ণনা সুগ্রীব করেছিলেন বটে, কিন্তু সেসব দিয়ে আমাদের কাজ নেই। অদ্ভুতভাবে শুধু এই দণ্ডকারণ্যের কথা বলার সময় সুগ্রীব বারবার করে উল্লেখ করলেন— এখানে অনেক গুহা আছে। রহস্যময় প্রকাণ্ড সব গুহা। সেইগুলোতে তিনি খুব ভালো করে খুঁজে বলেছিলেন। বুঝতেই পারছিস, যেকোন মানুষকে লুকিয়ে রাখার পক্ষে জঙ্গলের মধ্যে গোপন গুহার মত আইডিয়াল জায়গা আর কিছু হতেই পারে না।”

”স্বাভাবিক!” মাথা নেড়ে বলল ঋতম,“একেই জঙ্গল-পাহাড়। এমনিতেই সেখানে খুঁজে বেড়ানো মুশকিল। তার উপর গোপন গুহায় কাউকে লুকিয়ে রাখা হলে তাকে খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। সুগ্ৰীবের আইডিয়া মোটেও অবাস্তব ছিল না।”

“একদম তাই! তো হনুমান এবং অন্যরা সেই অনুযায়ী এই দক্ষিণ দেশের জঙ্গলময় এলাকাটা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলেন, কিন্তু সীতার সন্ধান পেলেন না। শেষে একসময় অবসন্ন হয়ে তাঁরা হাল ছেড়েই দিলেন। ততদিনে একমাস প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। পাছে সঙ্গী বানরেরা সত্যিই হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, সেইজন্যে অঙ্গদ একটা ভয়ঙ্কর সত্যি কথা বললেন।”

“ভয়ঙ্কর সত্যি! সে আবার কী রে!”

“হ্যাঁ, ভয়ংকর এবং সত্য। এই কথাটা অঙ্গদ পরে আরও একবার বলবেন, যখন সমুদ্রের পাড়ে পৌঁছে তারা আর পথ খুঁজে না-পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেটা হল— সুগ্রীব শাসক হিসেবে ভয়ঙ্কর লোক। অঙ্গদ তাঁকে যমের মত ভয় পেতেন, অন্য বানরেরাও তাঁকে দস্তুরমতো সমঝে চলতেন। ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলে এই দলটার জন্য যে মারাত্মক শাস্তি অপেক্ষা করে রয়েছে, তা বিশেষ করে এই দলের লোকেরা হাড়ে হাড়ে জানতেন।”

“কেন? মানে আমি বলছি— বিশেষ করে এই দলের বানরেরাই এমন মরিয়া হয়ে উঠলেন কেন?”

“খেয়াল করে দ্যাখ, অন্যদলের বানরদের চাইতে এরা সবাই সুগ্রীবের অনেক কাছের লোক। সুগ্রীবকে এঁরা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি চেনেন, জানেন। বোধহয় সেই কারণেই এঁদের ভয়টাও বেশি ছিল।”

“হ্যাঁ, এটা অবশ্য ঠিকই বলেছিস। অঙ্গদ তো ভাইপো, জাম্বুবান প্রধানমন্ত্রী, হনুমান নিজেও একজন মন্ত্রী ছিলেন। সুষেন বোধহয় রাজবৈদ্য, তাই না?”

“সুষেনের আরও একটা পরিচয় আছে, ভুলে যাস না। সুষেন সুগ্রীবের শ্বশুর হন।”

“ও! ইনি রুমার বাবা?”

“না! ইনি তারার বাবা। অঙ্গদের মত ইনিও সুগ্রীবের সরাসরি আত্মীয়। কাজেই এঁদের মতো করে অন্যরা সুগ্রীবের ক্রোধ চেনেন না। এইজন্যেই বারবার হাল ছেড়ে দিয়েও এঁরা কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। যে করেই হোক সীতাকে খুঁজে বের করতেই হবে— এইভাবেই কাজ করছিলেন এঁরা।”

“এইবার ব্যাপারটা বোঝা গেল। তারপর?”

“এই সময় এই দলটা একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল। জঙ্গলের মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা গুহা, আর সেই গুহার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে জলচর পাখির দল—বক আর সারস। তার চেয়েও বড় কথা হল, তাদের ডানায় জল লেগে রয়েছে। ততক্ষণে— ওই যে বললাম— খিদে আর চেষ্টায় বানরদের প্রাণ যাওয়ার জোগাড় হয়েছে। গুহা থেকে ভেজা ডানায় পাখিদের উড়ে আসতে দেখে তাঁরা আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন। গুহার ভিতরে নির্ঘাত জল রয়েছে। প্রাণটা তাহলে এ যাত্রায় অন্তত জলের অভাবে গেল না।”

বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আর্য যোগ করল,“এই হল ‘ঋক্ষবিল।’”

“বিল? মানে জলাভূমি?”

“না রে। সংস্কৃত ভাষায় ‘বিল’ শব্দের অর্থ গুহা। কেভ। মনে আছে, সুগ্রীব গুহাগুলোতে ভালো করে খুঁজে দেখতে বলেছিলেন!”

“ও, আচ্ছা! আর ঋক্ষ মানে কী?”

“ঋক্ষ মানে ভালুক।”

“ভালুকের গুহা? অবশ্য ভালুক তো গুহাতে থাকেই!”

“হ্যাঁ। আর এই গুহায় লুকিয়ে ছিল এমন এক রহস্য, যা এমনকি হনুমান বা জাম্বুবানের মত আশ্চর্য বুদ্ধিমান বানরেরাও চিন্তা করতে পারেননি।”

***†***


****


পাহাড়ে জঙ্গলে কম ঘোরেনি এই তিন বন্ধু। সুন্দর দৃশ্যও নিতান্ত কম চোখে পড়েনি ওদের এই বয়সেই। তবু কিরন্ডুল এক্সপ্রেস যখন সত্যিই একটার পর একটা সুড়ঙ্গ পেরিয়ে চলতে আরম্ভ করল, তখন ওরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। এত সুন্দর! আটান্নখানা টানেলের ভিতর দিয়ে, চুরাশিখানা ব্রিজ পার হয়ে যে ট্রেন যাবে, তা যে পাহাড়ি পথে চলবে— সে তো বোঝাই যায়। তা পাহাড়ি পথ দিয়ে চলা ট্রেনে ওরা যে আগে জার্নি করেনি— এমন তো নয়! কিন্তু এ একেবারে অন্য ব্যাপার।

শহর ছাড়িয়ে কিছুদূর আসার পরেই হঠাৎ করে একেবারে পাল্টে গেল দৃশ্যপট। কাল যে পাহাড়গুলো ওরা দূর থেকে দেখেছিল, এখন সেগুলোই ওদের কাছে চলে এসেছে। অন্য পাশে ধু ধু করছে লালমাটির রুখা মাঠ; তার মধ্যে এলোমেলো গাছপালা পিকচার পোস্টকার্ড-এর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটু দূরে চোখ সরালে সেগুলো জড়াজড়ি করে পরিণত হচ্ছে হালকা জঙ্গলে; আর সেই জঙ্গল আরও দূরে গিয়ে মিশে গেছে অন্তহীন পাহাড়ের ঢেউয়ে।

আর খানিকক্ষণ পরেই কিন্তু একটা হ্যাঁচকা মেরে ট্রেন উঠতে আরম্ভ করল উপরের দিকে। বেশ বোঝা গেল সেটা। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাওয়া বেশ ঠান্ডা হয়ে এল। এইবার রোদ উঠছে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছোট-বড় ঘন সবুজ উপত্যকা, আর সেই উজ্জ্বল সবুজের উপর আঁকা রয়েছে টুকটুকে লাল-রঙের টালি-ঢাকা স্থানীয় আদিবাসীদের গ্রামগুলো।

একটার পর একটা টানেলে ঢুকছে ট্রেনটা। কিছুক্ষণের জন্য হঠাৎ করে কামরা একেবারে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে, আর অমনি হইহই করে উঠছে টুরিস্টের দল। ট্রেনে বেশ ভিড়; এবং দিব্যি বোঝা যাচ্ছে— কারা টুরিস্ট, কারাই বা স্থানীয় মানুষ। কারণ এইবার ট্রেনের ডানদিকের জালনাময় উৎসুক মানুষের ভীড়। তাঁদের অধিকাংশের হাতে হয় ক্যামেরা, নয় দামি মোবাইল। সুপার্ব, অপূর্ব— এইসব বিশেষণ ভেসে আসছে ক্রমাগত।

ওরা আর থাকতে না-পেরে দরজার কাছে উঠে এল। জালনা দিয়ে সবটা দেখা সম্ভব নয়। সত্যিই সাংঘাতিক সুন্দর এই দিকটা। চুঁচুড়ার জয়দেব সামন্ত মশাই একেবারে কাঁটায় কাঁটায় সত্যি কথা বলেছিলেন— দেখাই যাচ্ছে। রসিক মানুষ।


টাইডা স্টেশনে ট্রেন থামতে ওরা আরও একবার মুগ্ধ হয়ে গেল। সত্যি দারুণ জায়গা। এখানে থাকতে যে চমৎকার লাগবে, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। ঠিক হ্যায়! দু'দিন পরেই তো আসবে এখানে।

আরাকু পর্যন্ত ভিড়টা বজায় থাকল। অধিকাংশ মানুষ এখানে নেমে গেলেন। এরা খাঁটি টুরিস্ট; স্টেশনের নাম লেখা টিনের শেডটার দিকে অবধি ক্যামেরা তাক করছেন মুহুর্মুহু। খুব সম্ভবত এঁদের মস্তিষ্ক স্মৃতিকে রক্ষা করার মতো জটিল কর্ম থেকে একেবারেই ছুটি নিয়েছে৷ সব দায়িত্ব যন্ত্রের৷


আরাকু ছেড়ে যেতেই ট্রেনের বাতাবরণ একেবারে বদলে গেল। এবার অধিকাংশই স্থানীয় মানুষ। প্রধানত এখানকার মূলনিবাসীরা চলেছেন দূর-দূরান্তের স্টেশনগুলোর উদ্দেশ্যে। অনেকেই এখন ট্রেনে দুপুরের খাওয়া সেরে নিচ্ছেন। কেউ বা খাওয়া সেরে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ছেন ফাঁকা সিটগুলাতে। ওরা তিনজন এইবার নিজেদের সিটে ফিরে এসে আরাম করে বসল। এইবার জানলা দিয়ে দিব্যি সব দেখা যাচ্ছে। পূর্বঘাট পর্বতমালার অপূর্ব সৌন্দর্য এতক্ষণে পূর্ণরূপে ধরা দিল ওদের কাছে এসে। চুপ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে বসে রইল তিন বন্ধু।

হোটেল থেকে প্যাক করে আনা চাওমিনের প্যাকেটটা খুলতে খুলতে আর্য বলল,“জগদলপুর পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে যাবে। পৌঁছে আগে হোটেল ঠিক করে নিতে হবে। ওটা কিন্তু জেলা সদর, বড় জায়গা। দেরি করলে রাত কাটানোর জায়গা নিয়ে প্রবলেমে পড়ব— বুঝলি!”

অরিত্রও খাবারে মন দিয়েছিল। এইবার মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল,“ঋক্ষবিলের ভিতরে কী ঘটেছিল, সেটা তো বললি না?”

একবার মাথা ঝাঁকিয়ে উঁ উঁ করে শব্দ করল আর্য। মুখভর্তি খাবার। কথা বলা চলবে না এখন।

খাওয়া সেরে জলটল খেয়ে একবারে মুখ খুলল আর্য। জুতো খুলে পা তুলে দিল উল্টোদিকের সিটে।

“বুঝতেই পারছিস, বানরদের আসল আনন্দটা হয়েছিল জল পাওয়া গেছে ভেবে। ততক্ষণে খিদে আর তেষ্টায় তারা এমনই নাজেহাল যে, সীতাকে খুঁজে বের করার ব্যাপারটা সেকেন্ডারি হয়ে গেছে।”

খুব গম্ভীর হয়ে অরিত্র বলল,“একটু আগে তোকে দেখেও আমার সেটাই মনে হচ্ছিল। ঠিকঠাক খিদে পেলে মানুষের বল আর বানরের বল— কারোরই মাথা ঠিক থাকে না রে!”

চটে যাওয়ার বদলে হেসে ফেলল আর্য। তারপর বলল,“বলেছিলাম না, এরা আসলে বানর নয়! সিরিয়ালে যাই দেখাক, আসলে এরা যে মানুষ, বাল্মীকি তার হাজার-খানেক ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন। এক জায়গায় তো স্পষ্টই বলেছেন, সুগ্রীবের আহ্বানে সেনাদলে যোগ দিতে-আসা একজন বানর-প্রধান নিজের লেজটা ভালো করে কোমরে গুঁজে নিলেন। বুঝতেই পারছিস— এঁরা আসলে এমন এক জাতির মানুষ, যাঁরা বানরকে নিজেদের টোটেম হিসেবে মনে করেন, এবং অন্তত প্রধানেরা নকল লেজ ব্যবহার করেন টোটেমকে সম্মান জানাতে। তা যদি বলিস— এই প্রথা এখনও সারা পৃথিবীর অজস্র উপজাতির মধ্যে দেখা যায়।”

“সেটা ঠিক। আফ্রিকার কোনও কোনও উপজাতির সর্দারেরা সিংহের মত সেজে থাকে, বিভিন্ন জীবজন্তুর চলাফেরা হাবভাব নকল করে— এটা আমি ডিসকভারি চ্যানেলে অনেকবার দেখেছি।” সায় দিলো ঋতম।

“এখনও এসব আছে নাকি?” অরিত্র জিজ্ঞেস করল।

ঋতম থতমত খেয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে গাল চুলকাতে চুলকাতে বলল,“এই মরেছে! সেটা তো ঠিক জানা নেই!”

“খুব আছে! বিলক্ষণ আছে!” আর্য বলল,“মুখের উপর ছবি আঁকা বা রংচঙে ডিজাইন করা— ইংরেজিতে যাকে ’ফেস-পেন্ট’ বলে, সে এক মস্ত বড় বিদ্যা। দস্তুরমতো পড়াশোনা করতে হয় রে! তাতে কত রকমফের আছি, ভাবতে পারবি না! একেকটা রং একেকটা বিষয়ের সিম্বল। মনে কর, লাল রং রাগের প্রতীক, কালো শক্তির প্রতীক— এইরকম। আবার অনেক ছবিও আঁকা হয়। তারও নানারকম মানে আছে।”

ঋতম বলল,“সেই যে— ‘আফ্রিকা’ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন— ‘বিদ্রুপ করছিলে ভীষণকে বিরূপের ছদ্মবেশে!’”

অরিত্র অবাক হয়ে বলল,“ওহো! এই লাইনটা ওদের সাজটাকে উদ্দেশ্য করে বলা, তাই না? কখনও খেয়াল করিনি তো!”

আর্য বলল,“এগজ্যাক্টলি! তা যাই হোক, বানরেরা তো জলের আশায় সেই গুহার মুখ দিয়ে ভিতরে ঢুকলেন এবং একেবারে তাজ্জব হয়ে গেলেন। সে এক প্রকাণ্ড গুহা। তার ভিতরে ঘন অন্ধকার। প্রথমদিকে তাঁরা কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু খানিকক্ষণ এগোনোর পরেই তাঁরা রোদ-ঝলমলে একটা জায়গায় এসে পৌছলেন। সেখানে দস্তুরমতো জঙ্গল— তালগাছ শালগাছ তমালগাছ; এমনকি বকুল চাঁপা বা নাগকেশরের মত ফুলের গাছ পর্যন্ত সেখানে সূর্যের আলোয় ঝলমল করছে। বড় বড় সব জলাশয় আছে সেখানে; তাতে তাঁরা কচ্ছপ আর মাছ দেখতে পেলেন।”

“এইবার কিন্তু গাঁজাখুরি গল্প হয়ে যাচ্ছে আর্য! গুহার মধ্যে জঙ্গল, পুকুর? ইয়ার্কি পায়া হ্যায়?” চটে গিয়ে বলল অরিত্র।

আর্য একটু হাসল,“কাল আমরা কিন্তু এমন একটা গুহায় সত্যিই যাব, যার ভিতরে পুকুর আছে।”

“কাল তো আমরা ওয়াটারফলস দেখতে যাচ্ছি, নাকি? এর মধ্যে আবার গুহা এলো কোত্থেকে?”

ভুরু নাচিয়ে আর্য বলল,“আছে, আছে। কঙ্গর ঘাঁটি ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে একটা এইরকম গুহা সত্যিই আছে। তার নাম কোটমসর গুহা।”

“ধুর! এত বড় গুহা হয় নাকি! আমরা সেই পাতাল-ভুবনেশ্বরে ঢুকে ছিলাম— মনে নেই? সেটা তো কত বড়! কিন্তু পুরোটাই পাথর। জঙ্গল কিংবা পুকুর গুহার মধ্যে হতেই পারে না।”

“সে তুই কালই দেখতে পাবি। এবার শুনবি?”

এদিকটায় আর টানেল নেই। দূরে দেখা যাচ্ছে অনন্ত পাহাড় আর ঘন সবুজ জঙ্গল। ওদের মাঝেমাঝেই মন চলে যাচ্ছে সেইদিকে। কামরা মোটামুটি ফাঁকা; এখানে ওখানে ঘুমোচ্ছেন স্থানীয় মানুষেরা।

“না না, বল, শুনব না কেন?” বলল অরিত্র।

আর্য আবার শুরু করল,“তা এইসব দেখে তো বানরেরা খুবই অবাক হয়ে গেলেন। কিন্তু তাদের সত্যি সত্যি চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল একটা অন্য জিনিস দেখে। দেখ, গুহার মধ্যে জঙ্গল গজাতেই পারে; নিচু জায়গায় জল জমে থাকবে, তাতে মাছ বা পাখি থাকবে— এতেও খুব আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু এইবার তাঁরা যা দেখতে পেলেন— তা প্রাকৃতিক নয়।”

“মানে অলৌকিক?” অবাক হয়ে বলল ঋতম।

“না অলৌকিক নয়। বরং মানবিক। সোজা কথায়— মানুষের তৈরি! তাঁরা দেখতে পেলেন একটা প্রকাণ্ড প্রাসাদ, আর সে প্রাসাদ যেমন-তেমন নয়। যেমন তার গঠনশৈলী, তেমনি তার আড়ম্বর। যাকে বলে রাজকীয়!”

“বোঝো কান্ড! গুহার মধ্যে প্রাসাদ! এত জায়গা থাকে নাকি কখনো? কী যে সব বলছিস…!”

আর্য এইবার একটু রেগে গিয়ে বলল,“তুই জানিস, ভিয়েতনামের সন ডুং গুহা প্রায় ন' কিলোমিটার লম্বা? এখনও তার নতুন নতুন সব দিক আবিষ্কার হয়ে চলেছে! সবচেয়ে উঁচু জায়গাটায় হাইট ছ’শো ষাট মিটার! ভেবে দেখ— কি বিশাল! দস্তুরমতো হাই-রাইজ হয়ে যাবে রে ভেতরে!”

“হয়েছে রে বাবা! তুই যে গুহার ব্যাপারেও এনসাইক্লোপিডিয়া, তা আমি জানব কী করে?” থতমত খেয়ে ঋতম বলল।

আর্য বলে চলল,“হনুমান এবং অন্য বানরেরা তো সেই বাড়ি দেখে প্রচণ্ড অবাক হয়ে গেলেন! তার উপর যখন কাছে গিয়ে দেখলেন— সেখানে দস্তুরমতো খাট-বিছানা আসবাবপত্র, খাবার-দাবার সব রয়েছে— তখন তাঁরা একেবারে থ হয়ে গেলেন। তারপর সেই প্রকাণ্ড প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এলেন এক তপস্বিনী। তাঁর তপঃক্লিষ্ট চেহারার জ্যোতি দেখে বানররা সব অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।”

“তপস্বীদের এই গুহায় থাকার অভ্যাসটা দেখা যাচ্ছে অনেক পুরনো, কি বলিস?”

“সে তো বটেই! এখনও হিমালয় গেলে আকছার এই ব্যাপারটা চোখে পড়ে।”

“তা না হয় হল। তাই বলে আজকালকার দিনের তপস্বীরা তো আর গুহার মধ্যে প্রাসাদ বানিয়ে তাতে বাস করেন না, আর সেখানে বিছানা-টিছানাও থাকে না!”

“তা অবশ্য আমার জানা নেই। কিন্তু ব্যাপারটা যে বিস্ময়কর, সেটা বুঝতে বানরদের দেরী হলো না। সবাই তাঁকে প্রণাম করলেন। তারপর হনুমান সাহস করে জিজ্ঞেস করলেন তাঁর পরিচয়। আর তার উত্তরে তিনি যা বললেন, তাতেই বোঝা গেল এই প্রাসাদ কে বানিয়েছেন। এই তপস্বিনীর নাম তোরা বোধহয় শুনিসনি; কিন্তু এই প্রাসাদ যাঁর বানানো— তাঁকে তোরা অন্য একটা কারণে খুব চিনিস।”

“কে বল তো? অন্য কোথাও এঁর কথা পড়েছি?”

“পড়েছিস বৈকি! কিন্তু রামায়ণে নয়। মহাভারতে।”

অরিত্র হতাশ হয়ে বলল,“এক রামায়ণ সামলাতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি, আবার তুই মহাভারত টানছিস ভাই?”

ওর বলার ভঙ্গিতে অরিত্র হেসে ফেলল। আর্য কিন্তু হাসল না। বলল,“মনে করে দ্যাখ, অর্জুন আর শ্রীকৃষ্ণ যখন খাণ্ডবদাহন করেছিলেন, তখন এক বিখ্যাত দানব সেখানে লুকিয়ে ছিলেন। অর্জুন তাঁকে প্রাণ নিয়ে পালানোর অনুমতি দিয়েছিলেন।”

ঋতম এবার প্রায় চেঁচিয়ে উঠল ট্রেনের আওয়াজের উপর গলা তুলে,“সে তো ময়দানব! দানবদের বিশ্বকর্মা!”

“রাইট! ইনিই পরে পাণ্ডবদের আশ্চর্য সভাগৃহ আর বিশাল রাজধানী তৈরি করে দিয়েছিলেন। ইন্দ্রপ্রস্থ।”

“গুহার মধ্যে এই প্রাসাদ ময়ের তৈরি? আমার ধারণা ছিল ময়দানবের উল্লেখ শুধু মহাভারতেই আছে!”

“একদম নয়!” মাথা নেড়ে বলল আর্য,“রামায়ণে তার আগেই আছে। আর রাবণের সঙ্গে এই ময়ের একটা সম্পর্ক আছে। খুব কাছের সম্পর্ক। ময়ের দুই ছেলে, এক মেয়ে ছিল। দুই ছেলের নাম মায়াবী আর দুন্দুভি। এদের নাম তোরা বোধহয় অতটা শুনিসনি। কিন্তু ময়দানবের মেয়ের নাম আমরা সবাই অজস্রবার শুনেছি। ময়ের কন্যার নাম মন্দোদরী।”

“রাবণের স্ত্রী?” বলে ফ্যাল ফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল ঋতম আর অরিত্র।

“ইয়েস বস!” বলল আর্য,“এবং মন্দোদরীর...সরি...মন্দোদরীর মায়ের সঙ্গে এই তপস্বিনীর গভীর সম্পর্ক আছে।”

“বোঝো!” বলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ওরা দু'জন।

*** ***


****

প্রায় আধ ঘন্টা লেট করে, সন্ধ্যার ঝোঁকে ট্রেনটা ঢুকল জগদলপুরে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে এসে ওরা একটু হকচকিয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে ক্রমাগত পাহাড়-জঙ্গল দেখতে দেখতে এসেছে ওরা, গল্প করেছে গুহা নিয়ে। ফলে ঝাঁ-চকচকে, আলো জ্বলতে শুরু-করা একটা শহর দেখে ওরা একটু অবাকই হল। প্রচুর গাড়ি দৌড়চ্ছে ধাঁ ধাঁ করে। সাধারণভাবে কোনও বড় শহরের সঙ্গে জগদলপুরের তেমন কোনও পার্থক্য খুঁজে পেল না ওরা।

একটু খোঁজ করতেই অবশ্য কাজ-চালানো গোছের একটা হোটেলের সন্ধান পাওয়া গেল। এই ব্যাপারটা নিয়ে ওদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই; রাত কাটানোর মত আশ্রয়ে পেলেই ওরা খুশি। ফলে নিজেদের ছোটখাটো জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখেই ওরা বেরিয়ে পড়ল কালকের জার্নির ব্যবস্থা করতে।

দেখা গেল, বাইরের লোক জগদলপুরে আসে মূলত ওই জলপ্রপাত দেখতেই; কেউ কেউ কোটমসর কেভ দেখতেও যায়, তবে সংখ্যায় কম। ট্যাক্সি ড্রাইভার অভ্যস্ত ভঙ্গিতে দরাদরি করে রাজি হয়ে গেল। চটপট সারাদিনের জন্য একটা গাড়ি বুক করে নিল ওরা। কাছেপিঠে যা আছে কালই দেখে নেবে— এটাই ওদের ইচ্ছে। এই কারণে ওরা হোটেলের রুমটাও একদিনের জন্যই বুক করেছে। শুধু আর্যকে দেখে অরিত্র আর ঋতমের সন্দেহ হতে লাগল, ওর সম্ভবত অন্য কোনও মতলব রয়েছে।

জগদলপুর থেকে চিত্রকোট ওয়াটারফলস আটত্রিশ কিলোমিটার দূরে। যেতে মোটামুটি ঘন্টাখানেক লেগে যাবে বোঝা গেল। তবে রাস্তা চমৎকার। ওদের মধ্যে একমাত্র অরিত্র নিজের বাইক নিয়ে কলকাতায় ঘুরে বেড়ায় হরদম। এখন একটু নিঃশ্বাস ফেলে বলল,“ইস! এইসব রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালাতে দারুন মজা রে! দুখানা বাইক থাকলে তিনজনে দিব্যি আরাকু হয়ে, টাইডা হয়ে ভাইজাগ পর্যন্ত বাইক চালিয়ে চলে যেতাম। ফাটাফাটি একটা জার্নি হয়ে যেত কিন্তু। এইরকম পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যেতে যা আরাম না রে! ও জিনিস ভাই ফোর-হুইলারে পাবি না।”

ঋতম আঁতকে ওঠার ভান করে বলল,“তোর বাইকে? এই পাহাড়ী রাস্তায়? আমায় কি ক্ষ্যাপা কুকুরে কামড়ে দিয়েছে? শ্যামবাজার থেকে পার্কস্ট্রিট— এইটুকু রাস্তা আসতেই আমার রোজ আতঙ্কে নাভিশ্বাস উঠে যায়! তুই বাইক চালাতে জানিস?”

তীব্র ঘৃণার দৃষ্টিতে ঋতমের দিকে তাকিয়ে অরিত্র বলল,“যে ছেলে এই বয়সেও ঠিকমতো হেলমেট পরতে জানে না, তার সঙ্গে আমি এই ব্যাপারে কথা বলব না। আমি আর্যর কথা বলছিলাম। তোকে আমি এমনিতেও নেব না।”

ঋতম ততোধিক হতাশ গলায় বলল,“আমি তো বাইক চালাতেও জানি না। তুই আর্যকে নিয়ে চলে গেলে আমি কি পেছনে পেছনে দৌড়ে যাব?”

“তুই-ই জানিস!” বলে দুপদাপ করে পা চালিয়ে এগিয়ে গেল অরিত্র।

ওর পিছন পিছন দৌড়তে দৌড়তে ঋতম বলল,“ফিরে গিয়ে তুই আর আমায় কলেজে নিয়ে যাবি না, অরিত্র? তুই এমন নিঠুর হতে পারবি? তোর তো গার্লফ্রেন্ডও নেই রে…”


বাইক অবশ্য আর্য নিজেও চালাতে জানে না। ওরা রীতিমতো বড়লোক। সল্টলেকে ওদের বিশাল বাড়িটা দেখলে যে-কেউ আঁতকে উঠবে। ইনফ্যাক্ট, ওর অষ্টাদশ জন্মদিনে ওকে একটা হুন্ডাই ভেন্যু উপহার দিয়েছিলেন ওর বাবা। মাস তিনেকের মধ্যে ও লাইসেন্সও পেয়ে গিয়েছিল। চালায়ও চমৎকার, কিন্তু সল্টলেকের মধ্যে। প্রপার কলকাতায় চালানোর ব্যাপারে ওর এখনও একটু টেনশন আছে। আর অদ্ভুত ব্যাপার হল— আর্য কলেজে সবসময়ই আসে বাস আর মেট্রোতে। আজ পর্যন্ত কখনও কেউ ওকে গাড়ি নিয়ে আসতে দেখেনি। শুধু এই দুই বন্ধু ওর ফ্যামিলির আর্থিক অবস্থার কথা জানে। অবশ্য আর্য নিজেও খুব একটা মিশুকে নয়; শুধু অরিত্র আর ঋতমের কাছে সামনেই ওর মুখ খুলে যায়। অন্য কাউকে ও এইজন্যই কখনও বাড়িতেও নিয়ে যায় না। মনে হয়, যেন নিজের আর্থিক অবস্থা নিয়ে ওর মধ্যে একটা অকারণ সঙ্কোচ আছে।

অথচ অরিত্রও বেশ ধনী পরিবারের ছেলে, বাগবাজারের ওদের দেড়শো বছরের পুরনো বাড়িটা দেখলেই বোঝা যায়— ওরা বনেদি বড়োলোক। সেই কারণেই ওদের টাকা নিয়ে মাথাব্যথা কম। তিন পুরুষ ধরে ডাক্তারি করছে ওদের পরিবার; এবং অর্থের চেয়ে এই সম্মানটা তাদের কাছে ঢের বেশি জরুরি ছিল। অরিত্রর ইংরেজি পড়তে যাওয়াটা ঠিক এইখানেই আঘাত দিয়েছে।

আবার ঋতমের বাবা একজন সরকারি অফিসার, মধ্যবিত্ত পরিবারটি শ্যামবাজারের গলির ভিতর এজমালি ভাড়াবাড়িতে দিব্যি আছে বহুকাল ধরে! বছরে দু’বার বর্ধমানের ‘দেশ-পাড়াগাঁয়ে’ যাওয়া হয়। সেখানে মস্ত পুরনো বাড়ি আছে, ঠাকুরদালান-নাটমন্দির-পুজো-জমিজমা— সবই আছে।

আসলে বন্ধুত্বের রেলপথে এসব স্টেশন থাকে না। থাকে দুটো জংশন স্টেশন— পরিচয় হওয়া, আর মানসিকতার মিলটা চিনতে পেরে বন্ধুত্ব হওয়া। ব্যস!


ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই ওদের তিনজনের আলাপ হয়ে গিয়েছিল। তিনজনেই সেন্ট জেভিয়ার্স, তিনজনেই ইংরেজি অনার্স নিয়েছিল বাড়ির তুমুল অমতে। বাড়িতে কম অশান্তি ভোগ করতে হয়নি এর জন্য ওদের। ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার বাইরে যে পৃথিবীতে কোনও তরুণের অন্য কোনও অ্যামবিশান থাকতে পারে— এটাই যেন অভিভাবকদের মাথায় ঢুকতে চায় না ইদানিং। কিন্তু হয়তো বা সেই কারণেই, ওদের মধ্যে বন্ধুত্বটা গড়ে উঠেছিল দ্রুত, যেমনটা হয় শুধুমাত্র ওই বয়সেই।

সেই বছরই প্রথম একসঙ্গে তিনজনে মিলে বেড়াতে বেরিয়ে ছিল ওরা। গিয়েছিল দার্জিলিঙে, যে জায়গাটা দিয়ে অধিকাংশ বাঙালির পর্যটনের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু দ্রুত তিনজনেই বুঝতে পারল, এই ভিড়ভাট্টা ওদের ভালো লাগছে না। অবজার্ভেটরি হিল, ম্যাল, চা, গ্লেনেরিজ— মানে এক কথায় যাবতীয় উপকরণ নিয়েও চিরকেলে দার্জিলিং তিন তরুণের চোখে সেই সম্মোহন জাগাতে ব্যর্থ হল। ফলে তৃতীয় দিনেই স্থানীয় ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে খবরাখবর নিয়ে ওরা চলে গিয়েছিল লেপচা জগতে। সেই নির্জনতা, সেই পাইনগাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটা, সেই রাতের বেলায় হাড়-কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার লোভে ভিউপয়েন্ট-এ গিয়ে দাঁড়ানো, এবং স্বভাবতই মাইনাস ফোর সহ্য করতে না-পেরে পালিয়ে-আসা— সবমিলিয়ে ওদের বুঝতে দেরি হয়নি— ওদের রুচিবোধ, ওদের পছন্দ অনেকটাই একরকম। এরপরই তিন বন্ধু একসঙ্গে নিয়মিত বের হতে আরম্ভ করে।

সেই সূত্রেই ওরা গিয়ে পড়েছিল ডিকিসুং নামে সিকিমের সেই অদ্ভুত জায়গাটায়; এবং উপত্যকা পেরিয়ে হেঁটে যাওয়ার সেই বিচিত্র অ্যাডভেঞ্চার আর একা সেই লোকটা ওদের যেন এক রাতে অনেকখানি বড় করে দিয়েছিল।

আজও সেই রাতটার কথা মনে পড়লে ওদের তিনজনের ঠোঁটে ফুটে ওঠে স্মৃতিমেদুর হাসি। এই রুখাসুখা জীবনের দিকে আবার প্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকাতে ইচ্ছে করে ওদের। আজও আর্যর প্রচণ্ড সফল এবং উচ্চাকাঙ্খী বাবা-মা সারাদিন দৈত্যের মতো খেটে অপরিমেয় অর্থ উপার্জন করেন, এবং দিনের বাকি সময়টা তীব্র বিদ্বেষের সঙ্গে ঝগড়া করে চলেন। গত সেমেস্টারে অবিশ্বাস্য নম্বর পেয়ে ফার্স্ট হওয়া সত্ত্বেও আজও অরিত্রর বাবা ওর সঙ্গে কথা বলেন তীক্ষ্ণ তাচ্ছিল্য মিশিয়েই; কারণ তাঁর একমাত্র ছেলে পারিবারিক প্রথা ভঙ্গ করে চিকিৎসক না-হয়ে অধ্যাপক হতে চেয়েছে। কিন্তু আজ ওরা দুজন আর ততটা আহত হয় না, যতখানি হত। ওরা এখন জানে, এসবের বাইরেও জীবনের একটা ব্যাপ্ততর, মহত্তর অর্থ আছে৷ সিকিমের সেই শীতল রাত ওদের কিছু গভীর শিক্ষা দান করেছিল।


একটু আগে আগে হেঁটে যাওয়া দুই বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আপনমনেই হাসল আর্য। দুজন ভালো বন্ধুর চাইতে বড় উপহার আর কীই বা থাকতে পারে এই জীবনে?


এলোমেলো খানিকক্ষণ হেঁটে অপরিচিত শহরটার একটু আঘ্রাণ নেওয়ার চেষ্টা করল ওরা। আজকাল সব বড় শহরগুলো মোটের উপর একই রকম হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই একঘেয়ে হয়ে যায়। প্রায় একই রকম রাস্তাঘাট, দুপাশে বড় বড় বিজ্ঞাপনের বোর্ড, একই দোকানপাট, গাড়ি, পার্ক...। দেখলে বোঝাই মুশকিল— এর এত কাছে এমন ঘন জঙ্গল আছে। এক প্রাচীন মহারণ্যের এত কাছে থেকেও, এইসব নগরীর গায়ে আজকাল আর প্রকৃতির ঘ্রাণ লেগে থাকে না এতটুকু। কেবল ধোঁয়ার গন্ধ পাওয়া যায়।

জগদলপুরের ধুলো-ভরা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সেই কথাটাই বলতে গিয়েছিলো আর্য,“ভেবে দ্যাখ, যে অরণ্যের উল্লেখ এত বছর ধরে ভারতীয় সাহিত্যের লাইনে লাইনে রয়েছে, এত কাছে থেকেও এখানে তার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই! আমরা কিন্তু আমাদের মূল থেকে খুব দ্রুত উৎখাত হয়ে যাচ্ছি।”

অরিত্র মাথা নেড়ে বলল,“ডার্লিং! এই শহরের উপর দোষ দিয়ে কী হবে? এককালে প্রায় গোটা দক্ষিণবঙ্গ সুন্দরবনের মধ্যে ছিল। কলকাতাটাও! পার্কস্ট্রিটে দিনেদুপুরে বাঘ ডাকত— ভাবতে পারিস? আর তোর যেখানে বাড়ি, সেখানে ছিল আদিগন্ত জলাভূমি! সবচেয়ে বড় কথা, এখনও কলকাতা থেকে সুন্দরবন যেতে তিন ঘণ্টার বেশি সময় লাগে না। তা বাছা, কলকাতার মধ্যে সুন্দরবনের নামমাত্র চিহ্ন কোথাও খুঁজে পাও কি?”

মাথা ঝাঁকালো আর্য। কথাটা সত্যি, তাই এর কোন উত্তর নেই। গোটা দেশটা খুব দ্রুত দুই ভাগ হয়ে যাচ্ছে। একদিকে নগরবাসী মানুষজন, অন্যপাশে বাকিরা। মাঝখানে বোধহয় একটা অনতিক্রম্য বেড়া উঠে যাচ্ছে।

হাঁটতে হাঁটতে ওরা একবার এখানকার অ্যানথ্রোপলজিক্যাল মিউজিয়ামটার দিক থেকেও ঘুরে এল। এখানে নাকি দুর্ধর্ষ কালেকশন আছে ট্রাইবাল আর্টৈর। স্বভাবতই বন্ধ হয়ে গেছে দরজা।

***†***


পরদিন ওর অবশ্য বুঝতে পারল, জগদলপুর শহরটা বাস্তবে খুব বড় নয়। গাড়ি নিয়ে রওনা দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শহর ফুরিয়ে গেল। দুপাশে রুখা মাঠ, লাল জমি, চাষবাস। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গ্রাম। মানুষজনের মুখে স্পষ্ট আদিবাসী ছাপ। ভারতবর্ষ আজও এইসব ছোটখাটো দূরদরাজ গ্রামগুলোতেই যেটুকু যা বেঁচে-বর্তে আছে।

চিত্রকোট জলপ্রপাতে পৌঁছতে প্রায় ন’টা বেজে গেল। এ এক দৃশ্য বটে। সিকিমে ওরা বেশ কিছু দুর্দান্ত জলপ্রপাত দেখেছে; তার সঙ্গে এই দৃশ্যের কোন মিল নেই। পাথুরে জমি দিয়ে গড়িয়ে-আসা ইন্দ্রাবতী নদী আচমকা এক বিপুল লাভ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে প্রায় একশো ফুট নিচে। এই লাফ দেওয়ার জায়গাটা ধনুকের মতো বাঁকা, বা বলা যেতে পারে— ঘোড়ার খুরের মতো। এই বিশেষত্বের জন্যই একে যে ‘ভারতের নায়াগ্রা ফলস’ বলা হয়— সেটা বুঝতে দেরি হল না ওদের। বিপুল পরিমাণে জল আছে নদীতে, বর্ষার রেশ এখনও একেবারে মুছে যায়নি। তবু স্থানীয় মানুষেরা বললেন, বর্ষায় এই জলপ্রপাত যে মত্তমাতঙ্গের রূপ ধারণ করে, তা দেখতে হলে আরও দু’তিন মাস আগে আসা উচিত ছিল ওদের। তবু ওই বিপুল সমারোহ, ওই ছিটকে আসা জলের কণা আর ক্ষণে ক্ষণে ফুটে-ওঠা রামধনু দেখে ওরা তিনজনেই মুগ্ধ হয়ে গেল।

এখানে এসে অবশ্য অরিত্রকে আর সামলানো গেল না। ঝপাঝপ জামাকাপড় বদলে নিয়ে ও নেমে গেল জলে। আর্য আর ঋতম মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে হাসল। সমুদ্র হোক, নদী হোক— জল দেখলে অরিত্রকে ঠেকানো মুশকিল। ওরাও পায়ে পায়ে নেমে এল নদীর পাথুরে অববাহিকায়৷ এমনিতেও অবশ্য প্রায় স্নান হয়েই যাচ্ছে; কারণ জলপ্রপাতের গর্জন করে লাফিয়ে-ওঠা জলের বিন্দু ক্রমাগত ছিটকে আসছে, উড়ে আসছে হাওয়ায় হাওয়ায় এইদিকে। হু হু করে বইছে জোলো বাতাস। জামাকাপড় এমনিতেই ভিজে উঠছে। পাথরে বসে ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে চারিদিকের জমে-ওঠা ভিড়টা দেখতে লাগল ওরা। স্পষ্টতই এটা এই অঞ্চলের সবচেয়ে জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পট। অবশ্য সেটাই স্বাভাবিক।

আর্য বলল,“হ্যাঁরে উশ্রী ফলস দেখেছিস?”

ঋতম চোখ বড় বড় করে বলল,“বলিস কী! যে ছেলের মাসির বাড়ি গিরিডিতে, তাকে এমন প্রশ্ন করলে মহাপাপ হয়, জানিস?”

জিভ কেটে হেসে ফেলল আর্য। এই কথাটা ও জানত, ভুলে মেরে দিয়েছিল। তারপর বলল,“আমি একবার মাত্র গিয়েছি বাবা-মার সঙ্গে। তখন সেভেনে পড়তাম। এই জায়গাটার সঙ্গে বেশ মিল আছে। অবশ্য এটা অনেক অনেক বড়।”

“ঠিকই বলেছিস। বিশেষত উপরটায় মিল আছে খুব। ওই যে জঙ্গল থেকে বাঁক নিয়ে নদীটা খোলা পাথুরে জমিতে বেরিয়ে এসেছে— ওই জায়গাটা সত্যিই উশ্রীর মতোই। যাবি নাকি ওইদিকটায়, জঙ্গলের দিকে?”

হাসিমুখেই আর্য বলল,“যাব তো জঙ্গলেই। দেখব, কত জঙ্গল তুই দেখতে পারিস। সবুর কর, অরিত্রটা স্নান সেরে উঠে আসুক।”

বেশ খানিকক্ষণ পরে পুরোদস্তুর স্নান করে জল থেকে উঠে এল অরিত্র। সম্প্রতি একটা সূক্ষ্ম চাপদাড়ি রেখেছে ও; চুলটাও বড় করেছে। এখন সেই চুলদাড়ি বেয়ে জল পড়ছে টপটপ করে। একমুখ হাসি নিয়ে ওদের কাছে এসে বলল,“একটু দাঁড়া, আমি গা মুছে চেঞ্জ করে আসি।”

গাড়িতে উঠে ঋতম আর্যর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল,“তাহলে এবার কোথায় যাচ্ছি আমরা?”

আর্য একটা রহস্যময় হাসি দিয়ে বলল,“চল না। আটান্ন কিলোমিটার রাস্তা যেতে হবে এখনও। ঘন্টা দেড়েক তো লেগেই যাবে।” তারপর ড্রাইভার ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করল,“কেয়া স্যারজি, ডেড় ঘন্টা তো লাগ্ হি যায়েগা, নেহি?”

খাড়া খাড়া কাঁচাপাকা চুলে ভরা মাথাটি নাড়িয়ে ভদ্রলোক বললেন,“জি স্যার।” ড্রাইভার মাত্রেই কেন যেন ভয়ানক স্বল্পভাষী হন। ইনিও তার ব্যতিক্রম নন, দেখা গেল। ওরা আরও দু’একবার আলাপ করার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিল খানিক পরে৷

নিজেরাই গল্প করতে করতে চলল ওরা। ইন্দ্রাবতী নদীর পাশ দিয়েই আসলে গিয়েছে রাস্তাটা, পৌঁছবে অবশ্য কাঙ্গের নদীর কাছে। নদী কখনো সরে গিয়েছে বহুদূরে, কখনো এসেছে কাছে। চমৎকার রাস্তা; কিন্তু ওরাই ড্রাইভারকে বারণ করল খুব জোরে গাড়ি চালাতে। দেখতেই তো এসেছে; তাড়া নেই কোনও। খাবার-দাবার সকালেই প্যাক করে এনেছে ওরা চারজনের মতো করে, নইলে ড্রাইভার ভদ্রলোকই বা খাবেন কোথায়?


এক ঘন্টা কুড়ি মিনিট পরে যখন ওরা কোটমসর কেভের সামনে এসে পৌঁছল, তখন একটা বেজে গিয়েছে। এখানেও বেশ ভিড়। বহুকাল ধরেই এই জায়গাটা স্থানীয় মানুষদের কাছে তীর্থক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। উত্তর ভারতের পাতাল-ভুবনেশ্বরের মতই এখানেও পুজো-আচ্চার ব্যাপার আছে।


পাথরের সিঁড়ি বেয়ে গুহার মুখের কাছে পৌঁছে কিন্তু ওরা বেশ অবাক হয়ে গেল। ভাইজাগের হোটেলে বোরা কেভের ছবি দেখেছিল বেশ কিছু। ক্যান্টিনের চার দেওয়াল সাজানো ছিল আশেপাশের দ্রষ্টব্য জায়গাগুলোর ছবি দিয়ে, সব টুরিস্ট-স্পটে যেমন থাকে। তার সঙ্গে এটার খানিক মিল আছে বটে। ভিতরে কিছু দূর পর্যন্ত আলোর ব্যবস্থা আছে। বর্ষাকালে পুরো গুহাটাই জলে ডুবে যায়। সেই সময় এখানে ঢোকার অনুমতি নেই। নভেম্বর মাস থেকে দর্শনার্থীরা এখানে ঢুকতে পারেন। বাইরেই গাইড নিয়ে নিতে হয়, নইলে ভিতরে ঢুকে বিপদ হতে পারে৷ বিপদটা কোন্ জাতীয়— সেটা অবিশ্যি ওদের মাথায় ঢুকল না। এত লোকজন চারিদিকে, এর মধ্যে...

একটা ছোট্ট লোহার গেট পড়ল প্রথমেই। সেখান থেকে এঁকেবেঁকে সিমেন্টে বাঁধানো অসম্ভব সরু সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে। খুব কষ্ট করে দুজন মানুষ পাশাপাশি চলতে পারে বড়জোর। অনিবার্যভাবেই ওদের সবারই আবার মনে পড়ে গেল পাতাল-ভুবনেশ্বরের কথা। সেখানে অবশ্য নামাটা আরও শক্ত ছিল, দড়ি ধরে পাথরের ধাপে ধাপে শরীরটাকে বেঁকিয়ে চুরিয়ে কোনক্রমে নামতে হয়েছিল। এখানে সিমেন্টের সিঁড়ি আছে বটে, কিন্তু সেটা ঘনঘনই এমনভাবে বাঁক নিয়েছে যে, স্বচ্ছন্দে চলাফেরা অসম্ভব। লোহার রেলিং আছে— এটাই যা রক্ষে।

প্রায় সত্তর ফুট নেমে আসার পর ওরা পায়ের নিচে শক্ত এবং মোটামুটি সমতল পাথর পেল আবার। হাঁপ ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল ওরা। তারপর অবাক হয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।


এটা একটা প্রকাণ্ড হলঘর ধরনের জায়গা। হাজার হাজার টন পাথরের নিচে দাঁড়িয়ে থাকার একটা অদ্ভুত অনুভূতি আছে, মনে হয়— যেন মাথার উপরে কিছু একটা চেপে আসছে ক্রমশ। এখানে দাঁড়িয়ে সেই অনুভূতিটা ওরা টের পাচ্ছিল স্পষ্ট। দৈত্যের মতো বড় বড় স্ট্যালাগমাইটের স্তম্ভ উঠে গিয়েছে উপর দিকে, লাইমস্টোন কেভের সাধারণ দৃশ্য যাকে বলা যায়। উপর থেকে ঝাড়বাতির মতো নেমে এসেছে অসংখ্য স্ট্যালাকটাইটও। ওদের সঙ্গী— অল্পবয়সী গাইড ছেলেটি সার্চলাইট নিয়ে এসেছে হাতে করে। তার আলোয় চারিদিক মাঝে মাঝে ঝলমল করে উঠেছে।

রেলিং দেওয়া সিঁড়ি কিংবা অপরিসর রাস্তা কিন্তু ক্রমাগত চলে গিয়েছে সামনে, পাথরের সরু ফাঁক দিয়ে। কখনো উঠছে, কখনো হু হু করে নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে। কোনও কোনও দেওয়ালে লাগানো আছে লাইট; কিন্তু চড়া আলোয় যাতে গুহাময় ছড়িয়ে-থাকা লাইমস্টোনের প্রাকৃতিক কারুকার্য ক্ষয়ে না-যায়, তাই সেই আলোর তেজ কম রাখা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবেই। ফলে চারিদিকেই— পাথরের আনাচে-কানাচে, ছাদে আর দেওয়ালে— জমে আছে যুগ-যুগান্তের গাঢ় অন্ধকার।

পা ঘষটে ঘষটে নামছিল ওরা গাইড ছেলেটির পিছন পিছন; আগে ঋতম, তারপরে আর্য, সবার পিছনে অরিত্র। হঠাৎ সামনে থেকে মুখ ফিরিয়ে চাপা গলায় ঋতম বলল,“যাই বলিস, এইরকম জায়গাগুলোতে আমি বড্ড আনকম্ফোর্টেবল ফিল করি। কী করে যে সেকালের মানুষ গুহার মধ্যে বাস করত— মাথায় ঢোকে না আমার।”

চাপা হেসে অরিত্র বলল,“সেকালের মানুষ ক্লস্ট্রোফোবিয়া শব্দটা জানত না, তাই পারত।”

ঋতম তিতকুটে গলায় বলল,“ফাজলামো করিস না অরিত্র। ভালো লাগছে না।”

গাড়ির ছেলেটি এইবার অভ্যস্ত গলায় ভাঙা ইংরেজিতে বলল,“এখানে জল আছে। সাবধানে এগিয়ে আসুন।”

ওরা এগিয়ে এসে জলের পাশে দাঁড়াতে ছেলেটি জলের মধ্যে টর্চ মারল। ছোট ছোট মাছ ঝাঁক বেঁধে কিলবিল করে বেড়াচ্ছে সেই অগভীর স্বচ্ছ জলে। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে ছেলেটি হঠাৎ আঙ্গুল দেখাল একটা বিশিষ্ট জায়গায়। টর্চের আলোটাকে স্থির রেখে ছেলেটি বলল,“সাদা রঙের মাছ দেখতে পাচ্ছেন একটা?”

হ্যাঁ! দেখা যাচ্ছে বটে! ঠিক সাদা নয়, ফিকে গোলাপি বা সোনালী রঙের মাছটা জলের মধ্যে স্থির হয়ে ভেসে আছে, আশেপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে কালো রঙের আরও অনেকগুলো মাছ। সেগুলো একটু ছোট আকারের।

গাইড ছেলেটি বলল,“এই সাদা মাছগুলো কিন্তু অন্ধ। এগুলো সারা পৃথিবীতে এই একটিমাত্র জায়গাতেই দেখা যায়, এই গুহাতে। এগুলোকেই ব্লাইন্ড ফিশ বলা হয়।”

“মানে এরা চোখে দেখতে পায় না?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ঋতম।

“না, সত্যিই এরা চোখে দেখে না। এরা এই গুহার মধ্যে সেভাবেই বিবর্তিত হয়েছে। আশেপাশে সাঁতার কাটছে যে কালো মাছগুলো, ওরা কিন্তু সাধারণ মাছ। মানে দেখতে পায়।”

সত্যিই গুহাটার বাঁকে বাঁকে অজস্র বিস্ময় অপেক্ষা করেছিল ওদের জন্য। জলের আর হাওয়ার খেলায় গড়ে উঠেছে নানারকম পাথুরে আকৃতি; তার কোনোটা বাঘের মতো, কোনোটা বা মানুষের চোখের মতো। আর হাতির শুঁড়ের মতো অজস্র লাইমস্টোন তো চারিদিকেই দেখা যাচ্ছে। কোনও কোনও দেওয়ালে আলো পড়া-মাত্র সেখান থেকে ঝাঁক বেঁধে উড়ে যাচ্ছে বাদুরের ঝাঁক; রিফ্লেক্স অ্যাকশনে মাথা নিচু করছিল ওরা। গাইড ছেলেটি অবশ্য অবিচল।

এই দিকটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। সিঁড়ি নেই। অমসৃণ এবড়োখেবড়ো পাথরের উপর দিয়ে ওই সার্চলাইটের আলোর ভরসায় হাঁটছিল ওরা।

এমন সময়ে গাইড ছেলেটি নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠল,“এইবার দেখুন প্রাকৃতিক এক আশ্চর্য বিস্ময়!”

বিস্ময়! কোথায়? সামনে আরেকটা ছোট লাইমস্টোনের স্ট্যালাকটাইট, যেমন ওরা এর আগেও অসংখ্য দেখে এসেছে। পার্থক্য শুধু এই যে, এটাতে খুব সিঁদুর লেপা হয়েছে।

গাইড ছেলেটি পরম ভক্তিভরে বলল,“এই হল সেই শিবলিঙ্গ, যা দর্শন করতে আপনারা তিনশো তিরিশ মিটার বিপজ্জনক পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছেন। প্রণাম করুন। মহাদেব আপনাদের আশীর্বাদ করবেন।”

ওরা ফের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল, তারপর মাথায় হাত ঠেকাল। এই দেশে এমন কোনও জায়গায় পৌঁছনো সত্যিই মুশকিল, যেখানে ধর্মের কোন স্পর্শ নেই।

তা হোক। এই আশ্চর্য সফরটা তো ওদের মগজে আজীবন বেঁচে থাকবে! সেটাই তো আসল প্রাপ্তি!


যতই মুগ্ধ হয়ে দেখুক না কেন, গুহার বাইরের খোলা চত্বরে বেরিয়ে এসে কিন্তু ঋতম প্রকাণ্ড একটা নিশ্বাস ফেলে বলল,“বাপরে! এতক্ষণে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম! মানুষ হল খোলা হাওয়ার আর আলোর জীব। বাদুড় তো নই রে ভাই আমরা আফটার অল, তাই না?”

অরিত্র আবার আগের মত খিক খিক করে হেসে বলল,“খোকা ভয় পেয়েছে।”

ঋতম চটেমটে কী একটা বলতে যাচ্ছিল, এই সময় আর্য গাইডের টাকা মিটিয়ে ফিরে এল। একবার চারদিকে তাকিয়ে ও বলল,“বন্ধুগণ! এইবার আপনাদের নতুন গাইড আপনাদের প্রাচীন দণ্ডকারণ্যে স্বাগত জানাচ্ছে!” এই বলে গুহার উল্টো দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল ও।

সে দিকে তাকিয়ে ওরা হঠাৎ হাসি থামিয়ে চুপ করে গেল। এদিকটায় ঘন জঙ্গল। চেনা-অচেনা নানা রকমের গাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে রয়েছে জটলা করে। এই মাঝ-দুপুরেও সেখানে ঘন অন্ধকার।

অরিত্র শুকনো গলায় বলল,“এটাই তাহলে…?”

ঋতম বলল,“এটা কাঙ্গের ঘাঁটি ন্যাশনাল পার্ক না?”

“অবশ্যই!” বলল আর্য,“কিন্তু রামায়ণের যুগে এই পুরো অঞ্চলটার নামই ছিল দণ্ডকারণ্য। আজ সেই অবিচ্ছিন্ন অরণ্য আর নেই। মাঝখানে মাঝখানে কেটেকুটে তাকে আমরা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছি। বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা নাম রেখেছি। তাতে অবশ্য তার মহিমা কিছু ক্ষয় হয়নি। আর একটা কথা আছে।”

“আবার কী?”

“এই জঙ্গলের মধ্যে...মানে বলা যায়— জঙ্গলের এই দিকটায় এইরকম পাহাড়ি গুহা অসংখ্য। তার অনেকগুলোই এখনো অনাবিষ্কৃত। ভুলে যাস না, এই গুহাটাও ঠিকঠাক আবিষ্কৃত হয়েছে এই সবে ষাট-সত্তর বছর আগে। আমার একটা প্ল্যান আছে। যদি হাঙ্গামা না করিস, তাহলে বলি।”

“তোর সব প্ল্যান আদতে গন্ডগোলের প্ল্যান। সিকিমেও গন্ডগোলে ফেলেছিলি। বলে ফ্যাল, কী বলবি।”

অভ্যাসবশত হাত দুটো ঘসতে ঘসতে চাপা উত্তেজনার সুরে আর্য বলল,“সত্যিই এখান থেকে কিন্তু ঘন জঙ্গল শুরু। এর ভেতরে আর শহর নেই। দু’একটা ছোটখাটো আদিবাসী বস্তি আছে শুধু। কাল এইখান থেকে জঙ্গলে ঢুকবি পায়ে হেঁটে? গাড়ি নেব না! শুধু তিনজন।”

“আবার যদি হারিয়ে যাই?” জিজ্ঞেস করল অরিত্র।

আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস ফেলে ঋতম বলল,“কেউ অন্ধকার গুহায় ভয় পায়, কেউ খোলামেলা জঙ্গলে। এই ভয়টার নাম কী রে আর্য?”

ঋতমের কাঁধে একটা জোরালো চড় মেরে অরিত্র বলল,“ভয় পাচ্ছি না। কিন্তু প্ল্যানটা ঠিকঠাক হওয়া চাই, সেটা তো মানবি?”

আর্য বলল,“খুব বেশি দূরে যাব না আমরা। ঠিক ততটুকুই, যেখান থেকে এই পাহাড়টা নজরে পড়ে। এটাই আমাদের ল্যান্ডমার্ক থাকবে। আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, আরাকুর চারপাশে আর কোথাও এইরকম জঙ্গল পাব না। সত্যিকারের জঙ্গল যদি দেখতে হয়, তাহলে এখানেই। ওই দেখ, এখান থেকেও এদিকে-ওদিকে অগুনতি পাহাড়ের চূড়ো দেখা যাচ্ছে। কালকের দিনটা আমরা বরং খুঁজে দেখব, এখানে কাছেপিঠে আরও এমন কোনও গুহা আছে কিনা, যেখানে এখনো এক্সক্যাভেশন হয়নি।”

“হঠাৎ তুই গুহা নিয়ে পড়লি কেন, সেটা বলবি?" জিজ্ঞেস করল অরিত্র।

এইবার ওদের দিকে পিছন ফিরে, জঙ্গলের দিকে মুখ করে দাঁড়াল আর্য। তারপর আত্মগত গলায় বলল,“জানিস, আমার কেমন মনে হচ্ছে— এর কাছেপিঠেই...এই ঘন জঙ্গলের মধ্যেই কোনও অজানা পাহাড়ে এখনো লুকিয়ে আছে আরও একটা গুহা, আর তার ভিতরে এখনও জমে আছে এক রহস্যময় অন্ধকার। অনেক দিনের পুরনো রহস্য।”

তারপর ওদের দিকে আস্তে আস্তে ফিরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল,“সেই গুহার নাম ঋক্ষবিল!”

****†****


*****

“একটা ছোট্ট কথা বল আগে৷ সত্যি করে বলবি।”

“আমি কবে তোকে মিথ্যে কথা বলেছি?”

“বলিসনি। আজ মোটেই বলবি না।”

“বেশ!”

“তুই হঠাৎ আরাকু ভ্যালি যাওয়ার জন্য খেপে উঠেছিলি কেন? আর এলিই যদি জগদলপুর, তীরথগড় ওয়াটারফলস বাদ দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গুহা খোঁজার জন্য তেড়ে উঠলি কেন?”

এবার একটু থমকে গেল আর্য। ঢোক গিলল। জল খেল একবার।

সারাদিনের ঝোড়ো যাত্রা শেষ করে সন্ধ্যায় ওরা বসেছে হোটেলের রুমের লাগোয়া ছোট্ট ব্যালকনিটায়৷ নিচে দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যার ধোঁয়াটে শহর৷ অফিস সেরে বাড়ি ফেরার জন্য উন্মুখ মানুষের ভিড় ধেয়ে যাচ্ছে বাড়ির পথে৷ দোকানে চলছে বিকিকিনি। ‘অঘ্রাণের শীতসন্ধ্যা, শ্বাসরোধী ধূম্রগন্ধা, চাপিয়াছে শহরের বুকে…।’ এখান থেকে যৎসামান্য দূরত্বেই যে গহীন অরণ্যের প্রান্তে অন্ধকারে ডুবে আছে এক নির্জন প্রাচীন গুহা— তা কল্পনাও করা কঠিন। সেইজন্যই আর্যর প্ল্যানটা এখন ওদের আরও অসংগত লাগছে; কষ্টকল্পনা বলে মনে হচ্ছে৷ জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে যে-কথাটাকে খুব একটা অবিশ্বাস্য বলে মনে হয় না, এইরকম জমজমাট শহরের আলো-ঝলমলে আর ঘিঞ্জি পেটের মধ্যে বসে তা-ই রীতিমতো হাস্যকর ঠেকবে— তা স্বাভাবিক।


ঋতম আবার বলল,“দেখ আর্য, আমাদের এদিকটায় আসারই কথা নয়। যাই হোক— এসেছি, দুর্ধর্ষ একটা জলপ্রপাত দেখেছি, একটা সাংঘাতিক গুহা দেখে এলাম— এই অব্দি সব ঠিক আছে। কিন্তু তোর এই অদ্ভুত ধারণার কারণটা আমি জানতে চাইছি। হঠাৎ তোর মনে হল কেন, রামায়ণের একটা আষাঢ়ে গল্প এইখানে সত্যি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে? এখনও রামায়ণের ঘটনাটা আদৌ ঐতিহাসিক কিনা— তারই কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। খোদ অযোধ্যায় তেমন প্রাচীন কিছু এখনও মেলেনি, কিষ্কিন্ধা খুঁজেই পাওয়া যায়নি, রাবণের রাজধানী স্বর্ণলঙ্কা…”

“তুই সিগিরিয়ার নাম শুনেছিস?” ওকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলো আর্য।

“কী? সিগি…”— থতমত খেয়ে থেমে গেল ঋতম।

“সিগিরিয়া। শ্রীলঙ্কার মাটালে জেলায় আছে এটা। একটা প্রকাণ্ড প্রস্তরদুর্গ। অবিশ্বাস্য বড়। ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। বিশ্বাস করা হয়, এটাই রাবণের সেই দুর্গ— যেখানে সীতাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। অজস্র রহস্য লুকিয়ে আছে এখানে। এই পাহাড়ের নিচে যে গুহাগুলো আছে, তার মধ্যে একটা গুহায় অসংখ্য নারীর মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। মূর্তি নয়। ছবি। বিশ্বাস করা হয়, সেগুলো রাবণের অন্যান্য পত্নীদের ছবি। এই গুহাতেই নাকি রাবণ সীতাকে বন্দিনী করে রেখেছিলেন।”

স্পষ্টতই ওদের কারোরই এই খবরটা জানা ছিল না। খানিকক্ষণ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে অরিত্র বলল,“সিরিয়াসলি?”

“কেউ কেউ অবশ্য বলেন যে, ওটা একটা প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ। কিন্তু এমনকি পণ্ডিতেরাও রাবণের সঙ্গে এই প্রস্তরদুর্গের যোগাযোগ সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেন না। ট্রয় নগরী কিভাবে আবিষ্কৃত হয়েছিল, তা তো তোরা জানিসই। তার আগে পর্যন্ত তো সবাই বিশ্বাস করত— ইলিয়াড-এর গল্পটাও একটা কল্পিত কাব্য! কিংবদন্তি মাত্র! সেই ঘটনাটাও যে ঐতিহাসিক, তা কি কেউ মানত?”

“হাইনরিখ শ্লীম্যান!”

“ইয়েস! অফকোর্স শ্লীম্যান! আজ যা কিংবদন্তি, কাল তা অনায়াসে ইতিহাসে পরিণত হতে পারে। আমি কিন্তু একবারও বলছি না যে, রামায়ণ আসলে ইতিহাসই। কিন্তু এটা তো মানতেই হবে— একটা কিছু ওইরকম ঘটেছিল, যার গল্পটা নানা আকারে পল্লবিত হয়ে সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল? আর কোন মহাকাব্যের কাহিনী পৃথিবীর এতোখানি জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে আছে বল দেখি?”

“তাই বলে ঋক্ষবিল? অত বড় বড় সব শহরগুলো হাওয়ায় মিশে গেল, আর একটা গুহা— রামায়ণের অর্ধেক পাঠক যার নামটা পর্যন্ত জানে না— সেটা টিকে যাবে? অদ্ভুত আইডিয়া না, বল?” বলে ঋতম অরিত্রর দিকে তাকাল।

“একবারের জন্যও এমন কিছু বলছি না আমি।” ঘন ঘন মাথা নাড়তে নাড়তে বলল আর্য,“এতদুর পর্যন্ত ভাবছিই না!”

“তাহলে তুই হঠাৎ করে জগদলপুর আসার জন্য ক্ষেপে উঠলি কেন, আর কেনই বা আজ ওই ভয়ানক জঙ্গল ঢোকার জন্য এমন মরিয়া হয়ে উঠেছিস?” এবার মুখ খুললো অরিত্র।

হেসে ফেলে আর্য বলল,“মরিয়া হয়ে কিছু উঠিনি রে! আসলে একটা লাইন... মানে রামায়ণেই পড়া একটা শব্দ, জানিস... হঠাৎ মাথায় স্পার্ক করে গেল ওই গুহার মধ্যে নেমে। তার আগে পর্যন্ত আসলে আমি দণ্ডকারণ্য দেখতে পাব— জাস্ট এইটে ভেবেই লাফাচ্ছিলাম। নাথিং এলস।”

“এর মধ্যে আবার রামায়ণের লাইন এল কোত্থেকে? আমরা তো দেখছিলাম একটা অন্ধকার, বাদুড়ে-ভরা লাইমস্টোন কেভ— নাকি?”

“এক মিনিট!” বলে ঝড়ের বেগে হোটেলের রুমে ঢুকে গেল আর্য। ওরা একে-অপরের দিকে তাকিয়ে বসে রইল অবাক হয়ে।

একটু পরেই ফিরে এল ও। হাতে একটা মাঝারি সাইজের বই। অরিত্র হতাশ গলায় বলল,“ওরে ঋতম! মোটকা বইটাকে বইতে না-পেরে একটা রোগা রামায়ণ নিয়ে এনেছে রে!”

আর্য হো হো হেসে উঠল,“এটা হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের অনূদিত রামায়ণ। সংস্কৃত শ্লোকগুলো নেই বলে রোগা দেখাচ্ছে, কিন্তু আছে পুরোটাই। দাঁড়া, লাইটটা জ্বালি…”

নিজের চেয়ারে বসে ঝড়ের বেগে পাতা উল্টে নির্দিষ্ট জায়গাটা পেয়ে গেল আর্য। তারপর একটু চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলল,“শোন। ঋক্ষবিলে ঢোকার পর অবাক হয়ে সব দেখতে দেখতে চলেছেন হনুমান অঙ্গদ এবং অন্যরা। বাল্মীকি তার বর্ণনা করতে করতে এক জায়গায় লিখছেন…”

“খবরদার সংস্কৃত আওড়াবি না, আগেই বলে দিলাম!” অরিত্র বলে উঠল আগেভাগেই। তারপর মনে পড়তে বলল,“ও না... এটা তো বাংলা!”

“হ্যাঁ, বাংলাতেই পড়ছি। একটু খটমটে, সে আমি বুঝিয়ে দেবো ’খন। হ্যাঁ... এই যে শোন এবার— নানারকম গাছ দেখতে পাচ্ছেন বানরেরা… মানে গুহার ভেতরে দেখছেন... বুঝলি তো! তারপর লেখা আছে...হ্যাঁ, এই যে,‘ঐ সমস্ত বৃক্ষ তরুণ সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল, মূলে বৈদূর্যময় বেদি। তথায় কোথাও নীল বৈদুর্যবর্ণ ভ্রমরপূর্ণ পদ্মলতা, কোথাও স্বচ্ছসলিল সরোবর, তন্মধ্যে স্বর্ণের মৎস্য ও উৎকৃষ্ট পদ্ম রহিয়াছে।”

“মোটের উপর বুঝে গেছি। গাছগুলো রোদ্দুরে ঝলমল করছে, তাদের পায়ের কাছে নীল রংয়ের বেদি আছে। নীল রঙের পদ্মফুল ফুটেছে— তাই তো? বেশ...তারপর আছে... পুকুরগুলোতে পদ্ম ফুটেছে, তাতে ভ্রমর উড়ছে। পুকুরের জল খুব পরিষ্কার, তার মধ্যে সোনালি মাছ আর খুব ভালো স্ট্যান্ডার্ডের পদ্ম ফুটেছে।” মনে করে করে বলে গেল অরিত্র।

প্রায় এক মিনিটের নীরবতার পর আর্য ফিসফিস করে বলল,“কিছু খেয়াল করলি?”

ওর দিকে বজ্রাহত চোখে তাকিয়ে, ওর চাইতেও ফিসফিস করে ঋতম বলল,“সোনালী রঙের মাছ... গুহার মধ্যে... আজকেই দেখলাম যে! মাই গড!”

প্রায় একই রকম উত্তেজনা-সংহত কাঁপা গলায় অরিত্র বলল,“ব্লাইন্ড ফিশ শুধু এই একটা গুহাতেই দেখা যায়। গাইড বলেছিল। রাইট! তাহলে কি ওটাই…?”

খুব আস্তে আস্তে মাথা নাড়তে নাড়তে আর্য বলল,“এটা নয়। মানে…আমার ধারণা— এটাই নয়। যদিও এই গুহার নতুন নতুন শাখাপ্রশাখা এখনও খুঁজে বের করা হচ্ছে, কিন্তু আমার মনে হয়— এই অঞ্চলে অন্য কোনও গুহা আছে, যার কথা বাল্মীকি লিখে গেছেন। সেই গুহাতে ওই একই প্রজাতির মাছ ডেভেলপ করেছে। ব্লাইন্ড ফিশ! স্থানীয় বৈশিষ্ট্য। কাছেপিঠেই হওয়া উচিত কোথাও।”

আর্যর অদ্ভুত কথায় ওরা যেন সম্মোহিত হয়ে পড়েছিল; এত প্রাচীন কোনও বইয়ের মধ্যে যার উল্লেখ আছে, তা হঠাৎ করে চোখের সামনে দেখলে যে-ধরনের সম্মোহন প্রত্যেককেই পেড়ে ফেলবে মুহূর্তে। এইবার কোনক্রমে সেই সম্মোহনের গ্রাস থেকে সবলে নিজেকে বের করে এনে ঋতম বলে উঠল,“খুব দুর্বল যুক্তি, আর্য! একটা গুহার মধ্যে কতকটা সোনালী রঙের মাছ কিলবিল করে বেড়াচ্ছে মানেই সেটা রামায়ণে উল্লিখিত সেই মাছ— এই হাইপোথিসিস একজনও মানবে না। পৃথিবীটা বাংলা থ্রিলার গল্প নয়।”

আর্য ওর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল,“আমি তো কাউকে মানতে বলিনি ঋতম! আমার বক্তব্য এইটুকু মাত্র— এমন যদি হয়ে থাকে যে, এই মাছ এইদিককার গুহাগুলোর নিজস্ব ইকোসিস্টেমের...ইভলিউশনের ফল, তাহলে আশেপাশে এইরকম বড় আর কোনও গুহা আছে কিনা— সেটুকু তো আমরা খুঁজে দেখতে পারি নিছক অ্যাডভেঞ্চারের জন্য?”

অরিত্র গম্ভীর গলায় বলল,“এই জঙ্গলে নাকি বাঘ আছে।”

“লেপার্ডও আছে। কিন্তু এখন আমরা জানি, বন্য জন্তুদের বিরক্ত না-করে কী করে জঙ্গলে পথ চলতে হয়। গুহার ভেতরে কোনও প্রাণী নেই— এটা সম্পর্কে নিশ্চিত না-হয়ে আমরা কোনও কারণেই কোনও গুহায় ঢুকব না। আর অবশ্যই, কাল বেরোনোর আগে কিনে নেব তিনখানা পাঁচ ব্যাটারির টর্চ; কিংবা সার্চলাইট— যেমন লাইট নিয়ে আজকের গাইড ছেলেটি আমাদের সঙ্গে গুহায় ঢুকেছিল। সবচাইতে বড় কথা— আমরা কোনও ঝুঁকি নেব না। এই জঙ্গলটায় বেশ কিছু বন-বস্তি আছে। আদিবাসী মানুষেরা থাকেন সেইসব গ্রামগুলোতে। আমরা এইরকম সমস্ত গ্রাম এড়িয়ে চলব। যেসব গুহায় অভিযাত্রীরা যাতায়াত করেন, সেগুলোতে যাওয়ার এমনিতেই কোনো মানে নেই— কারণ সেগুলোতে এক্সক্যাভেশন অলরেডি হয়ে গেছে। জঙ্গলের সেই বড় রাস্তাগুলো আমরা এড়িয়ে চলব।”

“জঙ্গলে যাওয়ার জন্য কিন্তু গাইড পাওয়া যায়, শুনলি তো কেভের সামনে।”

“ঠিক। গাইড পাওয়া যায় মানে, একটা নির্দিষ্ট রুট থাকবে— যে-পথে তারা ট্যুরিস্টদের ঘুরিয়ে দেখায়। আমরা সেই রুটটা এড়িয়ে চলব। কিন্তু যে মুহূর্তে ল্যান্ডমার্ক পাহাড়টা চোখের আড়াল হয়ে যাবে, তক্ষুনি ভালো ছেলের মত ফিরে চলে আসব। ঝুঁকি নেব না— মোদ্দা কথা।”

খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আর্য আবার বলল “ধরে নেওয়া যাক, আমরা আর একটা এমন গুহার খোঁজে যাচ্ছি— যেখানে স্বচ্ছ সরোবরে সোনালি মাছ খেলা করে। ব্যস।”

“খোলসা করে বল দেখি, তুই এগজ্যাক্টলি কী দেখার আশা করছিস?” অরিত্র শেষবারের মতো জিজ্ঞেস করল।

এইবার বইটা হাতে নিয়ে টান হয়ে উঠে দাঁড়াল আর্য। অকারণেই পাঞ্জাবিটাকে একবার টেনে ঠিক করল। তারপর গালের উপর হাত বুলিয়ে আনমনা গলায় বলল,“জানি না। হয়তো গুহার মধ্যে একটা জঙ্গল… সেই জঙ্গলের মধ্যে একটা পুকুর, তার জলে খেলা করছে সোনালী মাছ... আর … আর একটা প্রকাণ্ড ভাঙাচোরা ইমারত…!”

***†***



কোটামসার কেভের সামনে পৌঁছে গাড়িটা আজ ছেড়ে দিল ওরা। কখন ফিরবে— বলা মুশকিল। তবে এদিকে প্রচুর ট্যুরিষ্ট আসা-যাওয়া করে। ফেরার পথে তাদের কারও সঙ্গে শেয়ারে চলে যাওয়া যাবে— এটা আশা করাই যায়।

ইতস্তত ঘুরে-বেড়ানো আর দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে ব্যস্ত লোকজনকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য ওরা এবার খানিকটা হেঁটে এল উল্টো পথে। এদিকে রাস্তাটা নির্জন। দু'পাশেই ঘন জঙ্গল। দিনেমানে অন্ধকার ঘনিয়ে আছে।

অরিত্র হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,“একটা কথা বল দেখি আর্য। তোর হঠাৎ মনে হল কেন যে, এরকম একটা গুহা সত্যিই এক্সিস্ট করে? মানে গোটাটাই যে বাল্মীকির কল্পনা নয়— এমন মনে হওয়ার কারণটা জিজ্ঞেস করছি আর কি।”

“এর অবশ্য একটা কারণ আছে, জানিস। একটা ঘটনায় আমার প্রথম মনে হয়েছিল— বাল্মীকি একেবারে বানিয়ে কিছু লেখেননি। বাড়িয়ে লিখেছেন হয়ত, যেটাকে তুই মহাকাব্যের নিয়ম বলতে পারিস। কিন্তু পুরোপুরি বানিয়ে...মানে বাস্তবের সঙ্গে একেবারে সম্পর্ক না-রেখে প্রায় কিছুই লেখা হয়নি।”

“কোন ঘটনার কথা বলতে চাইছিস তুই?”

“আচ্ছা, একটা কথা বল। রাম তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে লঙ্কায় গিয়েছিলেন কীভাবে— মনে আছে?”

“নিশ্চয়ই! সমুদ্রের উপর দিয়ে সেতু বানিয়ে!”

“আর সেই সেতুটা কিভাবে বানানো হয়েছিল?”

“কেন— সেই যে বানরেরা বড় বড় পাথর বয়ে আনতে লাগল সমুদ্রের পাড়ে, তাতে ‘রাম’ লিখে জলে ফেলে দেওয়া হতেই সেগুলো ভাসতে লাগল! ওইরকম ভেসে-থাকা পাথরের উপর দিয়েই হেঁটে চলে গেল রামের বানরসেনা।”

“এই ডেসক্রিপশনটা কোথায় পড়েছিস, মনে আছে?”

এইবার অরিত্র খেই হারিয়ে ফেলল। হাঁটতে হাঁটতে এদিক-ওদিক তাকাল বারকয়েক। তারপর মাথা চুলকে বলল,“পড়েছিলাম কি? নাকি... টিভিতে দেখলাম!”

“ঠিক তাই। টিভিতে দেখেছিস। বাল্মীকি কিন্তু এরকম কিছু লেখেননি অ্যাট-অল।”

ব্যাকপ্যাক থেকে জলের বোতল বের করতে করতে ঋতম বলল,“ তাহলে নির্ঘাত কৃত্তিবাস লিখে গেছেন। আমরা যে রামায়ণটা জানি, তার বেশিরভাগটাই নাকি কৃত্তিবাসের লেখা। আর সেটা বাল্মীকি-রামায়ণের চেয়ে বেশ আলাদা।”

“এই কথাটা অবশ্য মোটেই মিথ্যে নয় কিন্তু মুশকিল হল— এটা এমনকি কৃত্তিবাসও লিখে যাননি।”

“তাহলে কি তুলসীদাস? দুর ছাই! খালি আন্দাজে ঢিল মেরে যাচ্ছি!”

“তিনি লিখলে অবশ্য ক্ষতি ছিল না, কারণ আমরা ভাবছি বাল্মীকিকে নিয়ে। কিন্তু তিনিও এরকম কিছু লেখেননি। মানে ওই রাম-নাম লিখে পাথর ছুঁড়ে মারার ব্যাপারটা অন্তত এরা তিনজনের কেউ লেখেননি।”

“অ। তার মানে আমি পড়িনি, টিভিতেই দেখেছিলাম।”

“ঠিক।”

“তাহলে বাল্মীকি মুনি কি লিখেছেন?”

“তিনি একেবারে সোজাসুজি বলেছেন— সমুদ্রের মধ্যে কাঠ দিয়ে স্ট্রাকচার তৈরি করে, তার উপরে পাথর ফেলে ব্রিজ বানানো হয়েছিল।”

“যাচ্চলে! সমুদ্রের ডেপথের কি অপমান মাইরি!”

“না রে! ব্যাপারটা অত সহজ নয়! এই যে ব্রিজটা— এটা এখনও ওখানেই আছে। ইনফ্যাক্ট রাবণের প্রাসাদের চেয়ে এটা অনেক জলজ্যান্ত একটা প্রমাণ।”

“কী উল্টোপাল্টা বলছিস! সমুদ্রের মধ্যে…হ্যাট! রামসেতু এখনও আছে?”

“ঠিক তা নয়। কিন্তু এই অঞ্চলটায় একটা কিছু গোলমাল আছে, বুঝলি! শ্রীলংকা আর ভারতের উপকূল যেখানে সবচেয়ে কাছাকাছি, মানে ভারতের উপকূলে রামেশ্বরম আর শ্রীলঙ্কার উপকূলে মান্নার— সেখানে বোধহয় একটা জলে ডোবা চুনাপাথরের গিরিশিরা বা ওইজাতীয় কিছু একটা আছে। এখানে সমুদ্র একই অগভীর যে, ভাটার সময় এখানে যে-কেউ আরাম-সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। আমি টিভিতে এই নিয়ে একটা প্রোগ্রাম দেখেছি। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য— বুঝলি! দেখলে মনে হবে, অকুল সমুদ্রের মাঝখানে একটা লোক দিব্যি দাঁড়িয়ে রয়েছে, এদিকে তার পা ভিজছে না।”

“বোঝো কান্ড! তুই বলতে চাইছিস, বাল্মীকি এই ব্যাপারটা জানতেন?”

“নির্ঘাত! তা নইলে এইরকম সাদামাটা পরিকল্পনা করতেনই না! সমুদ্র পার হওয়ার জন্য এই জায়গাটা সত্যিই একদম আইডিয়াল! জল প্রচণ্ড অগভীর। ভাটার সময় সেই অদ্ভুত জায়গাটার উপর দিয়ে গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি স্ট্রাকচারের ভেতরে পাথর ফেলে অনায়াসে একটা সেতু বানিয়ে ফেলা যায়— যেভাবে গ্রামের লোকজন বিল পারাপার করে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস, এটা আমি দেখেছি!” চেঁচিয়ে উঠল ঋতম। চার পুরুষ ধরে শ্যামবাজারে থাকলেও ওরা আদতে বর্ধমানের মানুষ, গাঁয়ে যাওয়া-আসা বন্ধ হয়নি মোটেই। কাজেই অগভীর জলা-জায়গা পার হয়ে যাওয়ার এই কায়দাটা ওর দিব্যি জানা আছে। “প্রথমে বাঁশ দিয়ে একটা কাঠামো তৈরি করা হয়, তারপর ইট-কাদামাটি-পাথর দিয়ে সেইটে ভরাট করে বিল-জলা-টলা পার হয় গাঁয়ের মানুষজন।”

“ঠিক সেইভাবেই সমুদ্র পার হওয়ার কায়দাটা ও দেখিয়েছেন বাল্মীকি; এবং তার জন্য বেছে নিয়েছেন অব্যর্থ একটা জায়গাও। এইখানেই শ্রীলঙ্কা আর ভারতের দূরত্ব সবচেয়ে কম, আর ঠিক এখানেই সমুদ্রের জল একেবারে অগভীর। মানে দুটো তথ্যই বাল্মীকি মুনির জানা ছিল, বোঝাই যাচ্ছে।”

“তা নাহয় হল। কিন্তু এর সঙ্গে…”

“বলছি, বলছি। ব্যাপারটা হল, এই প্রচণ্ড ন্যাচারাল বর্ণনাটা পড়ার পর থেকেই আমার কেমন মনে হচ্ছিল, হনুমানদের যাবার পথে এই যে অকারণে একটা গুহার বর্ণনা জুড়ে দেওয়া হল— যার সঙ্গে গল্পের কোনো সম্পর্কই নেই— সেটা নিশ্চয়ই বাস্তবে একজিস্ট করে। তা না-হলে খামোখা বাল্মীকি ওটাকে জুড়তে যাবেন কেন? কাল ওই মাছটা দেখার পরে মনে হল, যদি এমন হয়ে থাকে যে— এই এরিয়ার গুহাগুলোতে একটা নির্দিষ্ট টাইপের ব্লাইন্ড ফিশ ইভলভ্ করেছে, তাহলে আশেপাশে একটু খোঁজাখুঁজি করে দেখলে হয়! কে জানে, হয়তো রামসেতুর মতো এই ঋক্ষবিলের পেছনেও কোনও জিওগ্রাফিক্যাল সত্য রয়ে গেছে! অবশ্য বুঝতেই পারছিস— যদি সেই আমলে থেকেও থাকে, সেটা এখনও থেকে যাওয়ার প্রায় কোন চান্স নেই। ধরে নে, আমরা অকারণেই জঙ্গলের মধ্যে এক্সক্যাভেশনে যাচ্ছি— যেমন অন্যান্য জায়গায় আমরা গিয়ে থাকি। ব্যস, চুকে গেল। আর ভাবিস না।”

“কোটমসর কেভের পাশ দিয়ে আরেকটা রাস্তা জঙ্গলের ভিতর ঢুকে গেছে, দেখেছিস? ওটা ধরলেও হত কিন্তু…”

“ওটাও আরেকটা গুহায় গেছে। সেটার নাম দণ্ডকগুহা। ওখানেও একটা শিবলিঙ্গ আছে। আমি আসলে ওই রাস্তাগুলো অ্যাভয়েড করতে চাইছি— যেখানে সাধারণত টুরিস্টরা যাওয়া-আসা করে। বুঝতেই পারছিস— কেন।”

মাথা নাড়ল ঋতম আর অরিত্র। জানে ওরা। এমন দিকেই যাওয়ার চেষ্টা করবে ওরা, যে-পথে মানুষের আনাগোনা কম, নইলে একেবারেই নেই। আজকালকার দিনে এমন জায়গা আছে নাকি আর? ধুস! ঘোর জঙ্গলেও হামেশা ঘুরে বেড়াচ্ছে ফটো-পাগল ক্যামেরাধারীরা, নইলে জিওলজিস্ট বা অন্য ক্ষেত্রের গবেষকেরা। লুকিয়ে ঘুরছে চোরাশিকারী, আবার অরণ্যরক্ষীরা উন্মাদের মতো লড়ে যাচ্ছেন শেষ কয়েকটি বন্যপ্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। নির্জনতা কোথায় এই দুনিয়ায়?


কিন্তু এই একটি ক্ষেত্রে আর্য ঠিকঠাক আন্দাজ করতে পেরেছিল। গুহার বেশ খানিকটা আগে যেখানে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেয়, সেই জায়গাটা বেশ জমজমাট; গাড়ি-ভ্রমণার্থী-ট্যুরিস্ট গাইড — সব মিলিয়ে রীতিমতো লোকারণ্য। কিন্তু একটু তফাত আসতেই সবকিছু যেন বদলে যায়। সবুজ অরণ্যের বুক চিরে চলে গেছে কুচকুচে কালো, সামান্য ঢেউ-খেলানো রাস্তাটা। ওরা কথা বলতে বলতে বেশ খানিকটা চলে এসেছিল। এইবার আর্য বলল,“চল, দুর্গা দুর্গা বলে ঢুকে পড়া যাক এবার। খেয়াল রাখিস, আমরা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যাব, যাকে ভালো ভাষায় বলে ‘নৈঋত কোণ।’ ওইদিকেই সেইসব ছোটখাটো পাহাড়গুলো বেশি সংখ্যায় আছে, যেগুলোতে এইরকম গুহা থাকার সম্ভাবনা বেশি।”

স্পষ্টতই আর্য রীতিমতো পড়াশুনো করে রেডি হয়ে এসেছে আজ।

একবার এদিক ওদিক তাকাল তিনজনেই। না, যতদূর দেখা যায় ধু ধু রাস্তা; গাড়ি বা লোকজনের চিহ্নমাত্র নেই কোনও দিকে। আর দ্বিধা না-করে ওরা ছোট্ট নয়ানজুলিটা পার হয়ে ঢুকে পড়ল জঙ্গলে, আর…

আর নিমেষের মধ্যে যেন অন্য এক পৃথিবীতে চলে এল ওরা।


এই ফিলিংটা ঋতমের আগেও হয়েছে। আগেও যতবার জঙ্গলে ঢুকেছে ও, ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে। আজ আর থাকতে না পেরে মৃদু গলায় বলল,“তোরা খেয়াল করেছিস— জঙ্গলের রাস্তার ধারের গাছগুলো কেমন মন-খারাপ মতো দেখতে হয়? দুটো-তিনটে গাছের সারি পেরিয়ে এলেই একটা অন্যরকম জেল্লা দেখা যায়।”

আর্য মাথা নেড়ে বলল,“তা তো হবেই! রাস্তা দিয়ে কনস্ট্যান্ট গাড়ি যাচ্ছে যে! ধুলা উড়ে আসছে সারাক্ষণ! পাতার উপর ধুলো জমে থাকায় পাতার রং বোঝাই যায় না! এখানে দ্যাখ— কেমন চকচক করছে।”

পিছন থেকে অরিত্র বলল,“ভাইলোগ! উটের মতো আকাশে মুখ তুলে গাছের পাতার রং দেখতে দেখতে হাঁটিও না। নিচের দিকে তাকাইও। তোমরা কিন্তু রাস্তায় নেই আর।”

কথাটা নিতান্ত মিথ্যে বলেনি অরিত্র। সদ্য বর্ষা শেষ হয়েছে। জঙ্গলে এই সময়টায় নিবিড় আন্ডারগ্রোথ জন্মায়। বড় বড় গাছের নিচে ছোট গাছপালা, ঝোপঝাড় আর বুনো আগাছায় হাঁটা বেশ মুশকিল হয়ে পড়ে। তবে জঙ্গলের এই দিকটা মূলত পাথুরে, ঝোপঝাড় কম। হাঁটতে হাঁটতে ওরা বারবার মাথা তুলে দেখে নিচ্ছে কোটমসর কেভের দিকটা। ওই পাহাড়টাকেই কেন্দ্র করে ওদের হাঁটাহাঁটি করতে হবে, কারণ ফেরার সময় ওটাই ওদের নিশানা হয়ে দাঁড়াবে।

একটু পরেই গাড়ির শব্দ সম্পূর্ণ থেমে গেল। এখান থেকে বস্তুত জঙ্গলের নিজস্ব শব্দ ছাড়া আর কিছুই কানে আসছে না। পাখির ডাক, কিছু পোকামাকড়ের বিচিত্র শব্দ আর একটানা ঝিঁঝির আওয়াজ— দিনের বেলায় জঙ্গলের স্বাভাবিক শব্দ এইগুলোই। তবে গত তিন বছরে বেশকিছু জঙ্গল ঘুরে নিয়েছে এই তিন বন্ধু; প্রথমদিকে গাইডের সঙ্গে, পরে নিজেরাই পায়ে হেঁটে। ফলে প্রাথমিক অভিজ্ঞতা এখন একেবারেই যে নেই, তা বলা চলে না। জঙ্গলে চোখের চাইতে অনেক বেশি কাজ করে কান— এই জরুরী তথ্যটা এখন ওদের জানা আছে।

আর ঠিক এই কারণেই মিনিট দশেক পরে যখন আর্য হঠাৎ থমকে দাড়িয়ে ডানহাতটা তুলল, তখন তার কারণ বুঝতে অসুবিধা হল না বাকি দুজনের।

খুব আবছা একটা পথরেখা ধরে হাঁটছিল ওরা। এই জায়গায় সেটা সামান্য চওড়া হয়েছে। বোধহয় অনেককাল আগে এটা গাড়ি চলার পথ ছিল। এখন পরিত্যক্ত। দু'পাশে খুব বড় বড় শালের জঙ্গল। আর এমনি কোনও শালগাছের একেবারে মগডাল থেকে ভেসে আসছে একটা অদ্ভুত শব্দ— ‘হুক! হুক! হুক!’

থমকে দাঁড়িয়ে গেল ওরা। এই ডাকের মানে ওরা জানে। গাছের মাথায় বসে-থাকা নজরদারির দায়িত্বে থাকা সতর্ক বানরের চোখে পড়ে গেছে একটা কালো হলুদ ডোরাকাটা বিদ্যুতের নড়াচড়া।


বাঘ!


এই ব্যাপারে আর্য ওদের মধ্যে সবচেয়ে অভিজ্ঞ। এখন ও মাথা উঁচু করে বানরটাকে দেখার চেষ্টা করছে। ওটাকে খুঁজে বার করা গেলে আন্দাজ করতে পারবে— বাঘটা কোথায় আছে, কত দূরে আছে। কিন্তু এইসময় শালের জঙ্গলে অসম্ভব ঘন পত্রসমৃদ্ধি থাকে। ঘন পাতার আড়ালে কোথায় যে বানরটা লুকিয়ে বসে আছে, আর্য খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে ও একটু দিশেহারা হয়ে গেছে। টেন্সড দেখাচ্ছে ওকে।

অসম্ভব আতঙ্কিত কয়েকটা মুহূর্ত কেটে যাওয়ার পর একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখে ওরা হাঁ হয়ে গেল।


একটা প্রকাণ্ড বুড়ো বাঁদর—নিশ্চিতভাবেই পালের গোদা— ডান দিকের চড়াইটা থেকে নেমে এসে খোলা জায়গাটায় অদ্ভুত ভঙ্গিতে উবু হয়ে বসল‌। আরও বিচিত্র ব্যাপার হল, বানরটা দুদিকে দুটো হাত ছড়িয়ে দিয়েছে ট্রাফিক পুলিশের ভঙ্গিতে; যেন ওদের বারণ করছে আর এগোতে।

ওরা অবশ্য এগোচ্ছিল না এমনিতেও। তার ওপর সতর্কতার এই অদ্ভুত প্রতিমূর্তি দেখে ওরা আরও আটকে গেল যেন।

প্রায় তিরিশ সেকেন্ড পরে ডান দিকের উঁচু জমিটায়, শালগাছের জঙ্গলের মধ্যে একটা অদ্ভুত আলোড়ন শোনা গেল। তারপর একে একে ঢালু জমিতে নেমে এল অন্তত ত্রিশখানা বানর; তাদের কারও কারও পিঠে বা বুকে আঁকড়ে রয়েছে শিশু। রাস্তায় দাঁড়িয়ে-থাকা বড় বানরটার পিছন দিয়ে একে একে তারা এই ফাঁকা জমিটা পার হয়ে বাঁদিকের ঢাল বেয়ে নেমে চলে গেল। সবার শেষে একটা প্রকাণ্ড লাফ দিয়ে ডান দিকের শালগাছ থেকে নেমে এল আরেকটা বড় বানর। সেও একই ভঙ্গিতে ফাঁকা জায়গাটা পেরিয়ে যাবার পর বড় বানরটা বিদ্যুৎবেগে মিলিয়ে গেল তার পিছন পিছন। পুরো ব্যাপারটা ঘটতে বোধহয় দু’মিনিটও লাগল না।

থ হয়ে দাঁড়িয়ে এই অদ্ভুত প্যারেড দেখতে লাগল ওরা। দেখতে দেখতে বনভূমি আবার আগের মতোই নীরব, শান্ত হয়ে গেল। একটা শব্দ নেই। একটা পাখিও ডাকছে না।

কয়েক মুহূর্তের অভ্রভেদী নীরবতার পর হঠাৎ আর্যর কাঁধের ওপরে হাত রাখল অরিত্র। সেই হাত ঠকঠক করে কাঁপছে।


ওদের থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরে,একটা শালগাছের নিচের ঝোপের মধ্যে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সোজা হয়ে-ওঠা একটা লেজ। তাতে হলুদ আর কালো ডোরাকাটা দাগ।

এই মুহূর্তে, আস্তে আস্তে সেটা নেমে যাচ্ছে মাটির দিকে।

কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল তিন বন্ধু।

আরও মিনিট দুয়েক পরে লেজটা অদৃশ্য হয়ে গেল ঝোপের মধ্যে। তখনও ওরা দাঁড়িয়ে আছে একইভাবে। প্রায় পাঁচ মিনিট কেটে গেল অসহ্য নীরবতা আর আতঙ্কের মধ্যে।

তারপর ডানদিকের উপরের জঙ্গলটা থেকে, যেন বা অনন্তকাল পরে, পরপর দুবার ভেসে এল একটা কোটরা হরিণের ডাক। আর তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বানরগুলো যেদিকে চলে গিয়েছিল সেই বাঁদিকের জঙ্গল থেকে ভেসে এলো সম্পূর্ণ ভিন্ন রকমের একটা শব্দ। দ্রুত ছন্দে ‘কুঁক্ কুঁক্’ করে ডেকে চলেছে মগডালের পাহারাদার।

“অল ক্লিয়ার সাইরেন।” ফিসফিস করে বলল আর্য।

“মানে?” জিজ্ঞেস করল অরিত্র। তখনও ওর ডান হাত আর্যর কাঁধটাকে আঁকড়ে রয়েছে; তখনও সেই হাত কাঁপছে অল্প অল্প।

আর্য বলল,“ হরিণের ডাকটা নয়। অল ক্লিয়ার-এর সিগন্যালটা দিল বানরটা। শুনলি না? মানে... অন্যদের বলল, এবার তারা গাছ থেকে নেমে এসে আবার খাওয়া-দাওয়া শুরু করতে পারে। বাঘ চলে গেছে। আর ওই যে কোটরা হরিণটা ডাকল উপর থেকে— শুনতে পেয়েছিস তো— ওটা বাঘটাকে দেখেছে। বাঘটা এর মধ্যেই অনেকটা চলে গেছে।”

“বেঁচে গেলাম তাহলে এ যাত্রায়”, ধরা গলায় বলল ঋতম।

“কী মুশকিল! মরতে যাবি কোন দুঃখে? বাঘ মানেই কি ম্যান-ইটার নাকি? আমাদের দেখেই তো ও বানরগুলোকে চেজটা করল না। খোলা জমিটা পেরতে হত না? জঙ্গলের কোনও প্রাণীই চট করে মানুষের সামনে পড়তে চায় না। বাঘও না।”

অরিত্র কাঁপা গলায় বলল,“মাঝখান থেকে একটা লেজেন্ডারি ব্যাপার দেখে নিলাম আমরা।”

এত টেনশনের মধ্য ওর কথা শুনে অবাক হয়ে ফিরে তাকাল আর্য,“এরমধ্যে আবার লেজেন্ডারি ব্যাপার এলো কোত্থেকে?”

সেই ঝোপটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে অরিত্র উত্তর দিল,“বাঘ না দেখি, তার লেজের এন্ডটুকু তো নিজের চোখেই দেখলাম ভাই! এইটুকু তো অন্তত ফিরে গিয়ে বাড়িতে বলতে পারব— লেজেন্ড দেখে এসেছি বাঘের!”

সশব্দে হাসা এখন সম্ভব নয়। তবু এই ভয়ানক অবস্থাতেও চাপা হাসিতে ফুলে ফুলে উঠতে লাগল ঋতম আর আর্যর দেহ।

“এই অবস্থায় তোর এটা মাথায় এল কী করে রে? তুই তো নিজেই লেজেন্ডারি হয়ে গেলি!” খুব চাপা গলায় বলল ঋতম।

আর আর্য হাতজোড় করে ওর সামনে মাথা নিচু করে বলল,“প্রণাম, গুরুদেব, প্রণাম!”



bottom of page