Search

রোজকার অনন্যা লাইফ - এপ্রিল ২০২২

নববর্ষ ফ্যাশনিস্তা, পোশাক - আদি রেডিমেড সেন্টার, স্টেশন রোড, সোদপুর
















উপন্যাস

ঋক্ষবিলের রহস্য

রাজা ভট্টাচার্য


****

সামান্য অন্ধকার, ধুলোয় ভরা সিঁড়িটার বাঁক ঘুরতে ঘুরতে অরিত্র মৃদু গলায় বলল,“একটা কথা বলব। কাউকে বলবি না, প্রমিস?”

ঋতমের হাতে একটা ভারি বইয়ের প্যাকেট। বেশ ভারি। প্লাস্টিকটা আঙুলে ব্যথা দিচ্ছে। বলল,“বল।”

“আমি না...মানে...আজই প্রথম কফিহাউসে ঢুকব।”

ঋতম এমনভাবে আঁতকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল যে, আর একটু হলেই পিছন পিছন উঠে-আসা মেয়েটা ওর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে যাচ্ছিল। সেটা বুঝতে পেরে ও তড়বড় করে বাকি সিঁড়িটা পার হয়ে বাঁদিকে সরে রাস্তা ছেড়ে দাঁড়াল। তারপর হাঁফ-ধরা গলাতেই প্রায় চেঁচিয়ে উঠল,“হ্যাট! আবার ঢপ দিচ্ছিস?”

অরিত্রও তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে উঠে ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,“চিল্লাচ্ছিস কেন? কী জ্বালা মাইরি! নিয়ম আছে নাকি, কলকাতার ছেলে হলে কফিহাউসে আড্ডা মারতেই হবে, নইলে আধার কার্ড বাজেয়াপ্ত করা হবে? আশ্চর্য!”

ঋতম হি হি করে একটা অসভ্য-মার্কা হাসি ছুঁড়ে দিয়ে মস্ত দরজাটার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে দু’হাত ছড়িয়ে দিয়ে বলল,“আসুন হুজুর! প্রথমবার কফিহাউসে ঢোকার মুহূর্তটা এনজয় করুন। প্লিজ কাম!”

চারপাশের লোকজন অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছে দেখে অরিত্র আর দেরি না-করে ওর পাশ দিয়ে টুক করে ঢুকে পড়ল ভিতরে।

যথারীতি একটা টেবিলও ফাঁকা নেই।

কয়েক সেকেন্ড সত্যিই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল অরিত্র। ঋতমও একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এই ব্যাপারটা ওর মাথায় ছিল না৷

বিশাল হলঘরটাকে অবাক হয়ে দেখছিল অরিত্র। বাপ রে! ঘর জুড়ে পরপর টেবিল, সেগুলো ঘিরে চেয়ার। তার প্রত্যেকটা এখন ভর্তি। মৃদু একটা গুনগুন শব্দে ঘরটা ভরে আছে৷ কথা চলছে চাপা গলায়। নলচে-আড়াল দিয়ে সিগারেট টানছে অজস্র লোক।

হঠাৎ ঋতম বলল,“এখানেই দাঁড়া এক মিনিট।” বলে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে গেল। বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল অরিত্র।

পরক্ষণেই ওর মোবাইলটা বেজে উঠল। বের করে ঋতমের নাম দেখে অবাক হল ও৷ এ আবার কী!

“উপরে চলে আয় রে৷ পেয়ে গেছি বসার জায়গা।”

ও! পাছে নেমে এসে ডাকতে ডাকতেই চেয়ার হাতছাড়া হয়ে যায়— তাই ফোন করেছে৷

উপরে এসে অরিত্র ঋতমকে খুঁজে বের করে বসল আরাম করে৷ অনেকক্ষণ ধরে ঘুরেছে ওরা আজ কলেজ স্ট্রিটে। থার্ড ইয়ারের কিছু বই কেনার দরকার ছিল। পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে হাঁটতে হাঁটতে। হাতের প্যাকেটটাও কম ভারি হয়নি।

ফাঁকা চেয়ারটাতে বইগুলো গুছিয়ে রেখে ও বলল,“আর্য কোথায় গেল রে? ‘তোরা ঢোক, আমি আসছি’ বলে কেটে পড়ল যে?”

হাত নেড়ে ওয়েটারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করছিল ঋতম৷ বলল,“কেটে পড়েনি। বঙ্কিম চাটুয্যে স্ট্রীটে ঢুকল কেন যেন। বলল তো চলে আসবে এক্ষুনি। ও— ওই যে...দাঁড়া, ফোন করি। নিচে খুঁজছে।” বলে ফোন করতে লাগল। অরিত্র ঝুঁকে দেখল, নিচের ফাঁকা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ওদের খুঁজছে আর্য। এবার ফোন ধরল। তাকাল উপর দিকে। ও তাড়াতাড়ি হাত নাড়ল। একবার মাথা ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে গেল আর্য।

টেবিলে একটা বিকট মোটা প্যাকেট ধপাস করে ফেলে দিয়ে বসে পড়ল আর্য৷ একগাল হেসে বলল,“উফফ্! অ্যাটলাস্ট!”

“কী আছে রে প্যাকেটে? কতগুলো বই কিনলি?” বলল ঋতম।

আর্য মুখটা গম্ভীর করে বলল,“কতগুলো নয়, বৎস! একটাই।”

অরিত্র চোখ বড় বড় করে বলল,“একটা বই অ্যাত্ত মোটা? ভাগ!”

এই সময় ওয়েটার এগিয়ে আসতেই আর্য আঙুল দেখিয়ে বলল,“তিনটে ব্ল্যাক।”

তারপর অরিত্রর দিকে ঘুরে বসে বলল,“বল তো, রামের দিদির নাম কী?”

অরিত্র হকচকিয়ে গেল,“চ্যাংড়ামো করিস না। জন্ম থেকে শুনে আসছি— রামেরা চার ভাই।”

আর্য মধুর হেসে বলল,“এবং জন্ম থেকেই তুই ভুল শুনে আসছিস৷ ঋতম? এনি আইডিয়া?”

ঋতম ঠোঁট চেটে বলল,“সিরিয়াসলি?”

“কী?”

“মানে...রামের সত্যিই ইয়ে ছিল? দিদি?”

“ইয়েস! ছিল। তার নাম শান্তা। ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার।”

সত্যিকারের অবাক হয়ে ঋতম একবার অরিত্রর দিকে তাকাল। অরিত্রও চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে আছে আর্যর দিকে৷ ওরও জানা ছিল না স্পষ্টতই৷

আর্যর মুখ দেখেই বোঝা গেল, দীর্ঘদিনের দুই বন্ধুকে ঘাবড়ে দিতে পেরে মনে মনে বেজায় খুশি হয়েছে ও৷ আঙুল দিয়ে টেবিলে টকাটক শব্দ করতে করতে ও বলল,“এবার বল দেখি, সীতার বাবার নাম কী? বাবা বলতে আমি অফকোর্স পালক-পিতাই মিন করছি।”

অরিত্র মুখ খোলার আগেই ঋতম তাড়াহুড়ো করে বলল,“জনক, জনক! এটা জানি। তুই কি আমায় মুখ্যু ঠাউরেছিস একেবারে?”

রহস্যময় মুখ চোখ করে আর্য বলল,“আবার ভুল করলি। মিথিলার রাজারা সকলেই জনক। মানে— যে-ই রাজা হবে, তারই নাম হয়ে যাবে জনক। বলতে পারিস— জনক কোন নাম নয়, একটা পোস্ট। কোশ্চেনটা এইভাবে করা যেতে পারে— সীতার বাবা যে জনক, তার আসল নাম কী? এবার বল।”

ওরা আবার মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। না, জানা নেই। সত্যি কথা বলতে কী— জনক যে নাম নয়, উপাধি— সেটাই ওদের জানা ছিল না।

“সীরধ্বজ।” একটু হেসে বলল আর্য, “আচ্ছা আরেকটা বলি…”

“দাঁড়া রে ভাই!” ওর কথার মাঝখানেই বলে উঠল ঋতম,“এসব কোত্থেকে পাচ্ছিস বল দেখি?”

“পাইনি এখনও। পাব।”

“পাসনি তো বলছিস কোত্থেকে?”

“তা নয়। এগুলো নিতান্ত ছোটখাট ব্যাপার, যে-কেউ একটু-আধটু নেট ঘাঁটলেই পেয়ে যাবে। ফেসবুকে গন্ডা গন্ডা গ্রুপ আছে, সেখানে জিজ্ঞেস করলেই পনের-কুড়ি জন মিলে উত্তর দিয়ে দেয়। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই মনে হচ্ছিল, এভাবে ঠিক পোষাচ্ছে না। তাই আজ ভেবেচিন্তে বইটা কিনেই ফেললাম।”

চোখ বড় বড় করে অরিত্র বলল,“কী কিনে ফেললি? রামায়ণ?”

প্রকাণ্ড মোটা প্যাকেটটার উপরে দুটো স্নেহের টোকা দিয়ে আর্য বলল,“ইয়েস! বাল্মীকি-রামায়ণ, উইথ অরিজিনাল সংস্কৃত শ্লোক।” বলে প্যাকেট থেকে বের করল বিশাল বইখানা। লাল রঙের মলাটে হাতে-আঁকা পুরনো স্টাইলের একটা ছবি। রাবণ জটায়ুর ডানা কেটে দিচ্ছেন তরোয়াল দিয়ে, আর পাশে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন সীতা। উপরে বড় বড় করে লেখা ‘রামায়ণম্’, আর ছবিটার নিচে তার চাইতে একটু ছোট হরফে লেখা রয়েছে— ’শ্রীমন্মহর্ষি-বাল্মীকি-বিরচিতম্।’

খুব ভয়ে ভয়ে প্রথম পাতাটা খুলল ঋতম। সেখানে লেখা রয়েছে অনুবাদকের নাম— পঞ্চানন তর্করত্ন। তার পরের পাতা থেকেই যেন অন্য এক পৃথিবীর গন্ধ আসছে। বাংলা হরফে, কিন্তু সংস্কৃত ভাষায় লেখা একগাদা কথা, তার নিচে ওটা যে ফের লেখকের নাম লেখা, এটুকুই শুধু বুঝতে পারল ও। এরপর মস্ত একটা সূচিপত্র। তারও পরের পাতাটা দু'ভাগে ভাগ করা; উপরের দিকে সার বেঁধে সংস্কৃত ভাষার শ্লোক, আর তার নিচে একটা লম্বা লাইন টেনে বোধহয় তারই বাংলা অনুবাদ হবে। ‘তপঃস্বাধ্যায়নিরতং তপস্বী বাগ্বিদাং বরম্।’

এই পর্যন্ত দেখেই সাহস ফুরিয়ে গেল ঋতমের। চট করে বইটা বন্ধ করে দিয়ে ও মুখ তুলে তাকাল আর্যর দিকে। তারপর শুকনো গলায় বলল,“এই বই তুই পুরোটা পড়বি?”

আর্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গলায় বলল,“পড়ব বলেই তো কিনলাম। আলবাত পড়েগা। পুরোটাই পড়েগা।”

ঋতম ভক্তিভরে হাতদুটো জোড় করে মাথায় ঠেকিয়ে বলল,“আমার প্রণাম গ্রহণ করুন, হে মহর্ষি আর্যদেব! এতদিনে আপনি সার্থকনামা মানুষ হতে চলেছেন। শুধু দয়া করে আমাকে আপনার শিষ্য হতে বলবেন না। চার মাস পরে ফার্স্ট সেম; নম্বর খারাপ এলে বাবা ঠেঙিয়ে চামড়া খুলে নেবে।”

আর্য প্রথমে হেসে ফেলল। তারপর গম্ভীর হয়ে বলল,“না রে। ভেবে দেখলাম— এরকম খুঁটিনাটি অল্প অল্প করে জেনে কোনও লাভ হচ্ছে না। ভেবে দ্যাখ— একটা ক্যারেক্টার, কিংবা ধর একজন মানুষই— এত হাজার বছর পরে একটা গোটা দেশের রাজনীতির ভাগ্যবিধাতা হয়ে উঠেছে কোন গুণে, সেটা ভালো করে জানতে হলে মূল বইটা একবার পড়ে ফেলা উচিত না? তার বদলে এর বাবা কে, ওর বউয়ের নাম কী! ধুস! এসব হল নিছক তথ্য। আমি ঘটনাটা ভালো করে জানতে চাইছি। ক্যারেক্টারগুলোকে বুঝতে চাইছি।”

ওরা দুজন আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল। আর্য এইরকমই। যে-কোনো ব্যাপার তলিয়ে দেখতে ও ভালোবাসে। যেখানে দুখানা কোশ্চেন-অ্যান্সার মুখস্থ করলে দিব্যি নম্বর উঠে যায়, সেখানেও সবসময় টেক্সট বইটা একবার পড়ে নেয়। গদ্য, পদ্য, প্রবন্ধ— সব। কক্ষনও সাজেশন বানায় না।

তাই বলে রামায়ণ! হে ভগবান!!

***†***

****

“বালীকে বধ করে রাম তো সিংহাসনে বসালেন সুগ্রীবকে। এই দুজনের মধ্যে যখন অগ্নিসাক্ষী করে ফর্মাল বন্ধুত্ব হয়েছিল, তখনই এঁরা একটা চুক্তিতে এসেছিলেন। রাম বালীকে হত্যা করে সুগ্রীবকে রাজা করে দেবেন, বিনিময়ে সুগ্রীব রাজা হওয়ার পর রামকে সব রকমের সাহায্য করবেন সীতাকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে।”

“দাঁড়া ভাই! আগে একটা ব্যাপার ক্লিয়ার করে নিই। এটা আমার অনেকদিনের প্রশ্ন। রাম খামোখা বালীকে মারতে গেলেন কেন? তার চাইতে অনেক সহজ ছিল বালীর কাছেই গিয়ে সারেন্ডার করে তার সাহায্য চাওয়া! বালী তখন ক্ষমতায় ছিলেন, আর সুগ্রীব নির্বাসিত! রাম খামোখা রাজার কাছে না-গিয়ে তার নির্বাসিত ভাইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেলেন কেন?”

প্রশ্নটা করল অরিত্র।‌ আর্যদের সল্টলেকের বাড়ির দোতলার বারান্দায় ওরা বসেছে। দুটো বেতের চেয়ার নিয়ে অরিত্র আর ঋতম বসেছে পাশাপাশি; বক্স-জালনাটার উপরে উঠে নিজের ফেভারিট জায়গাটায় বসে আছে আর্য। সবে শেষ হয়ে গিয়েছে ফার্স্ট সেম। নিঃশ্বাস নেওয়ার মতো কয়েকটা দিন আপাতত হাতে আছে ওদের; নইলে এমনিতে সেন্ট জেভিয়ার্স-এ পড়ার যা চাপ থাকে, তাতে অন্য কোনওদিকে তাকানোর সময় হয় না।

আর্যটা সত্যিই আজব ছেলে! বাইশ বছরের কোনও ছেলে ইংরেজি অনার্সের মারাত্মক চাপ সামলে গোটা বাল্মিকী-রামায়ণ পড়ে ফেলেছে— এমনটা দেখাই যায় না। এ কথাও স্বীকার করতে হবে, গল্পটার মধ্যে কোনও একটা ম্যাজিক আছে। তা নাহলে অরিত্র আর ঋতম কেনই বা আর্যর এই ‘রামায়ণী বকবক’ শুনতে রাজি হয়ে যাবে দিনের পর দিন?

আর্যদের বাড়িটা বিশাল, আর তাতে হেল্পিং হ্যান্ড, ড্রাইভার— এঁদের বাদ দিলে ওরা মাত্র তিনটি প্রাণী বাস করে। ওর বাবা-মা দুজনেই অসম্ভব ব্যস্ত মানুষ; তিনজনের দেখাই হয় সকালে একবার, রাত্রে আর একবার। ফলে দোতলার এই অংশটা আর্যর মৌরসিপাট্টা বললেই হয়। স্তূপাকার বইপত্র, চা কিংবা কফি করে নেওয়ার আয়োজন, মেঝেতে করা একটা বিছানা— সব আছে এখানে। অরিত্র চা করার দায়িত্বটা নিজে পালন করতেই ভালোবাসে, মাঝে মাঝেই উঠে গিয়ে ও ইলেকট্রনিক কেটলিতে চা করে আনছে। তিন বন্ধুর দুপুরের আড্ডা আজও রামায়ণ নিয়েই জমে উঠেছে। আর্যর কোলের কাছে সেই ভয়ানক-দর্শন বইখানা আজও রাখা আছে। ওটা ইদানিং ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেহাত বিশাল বপুর জন্য ওটাকে নিয়ে ঘোরা সম্ভব নয়; নইলে ও বোধহয় বইটাকে নিয়ে কলেজেও চলে যেত।

আর্য চায়ের কাপে একটা আরামের চুমুক দিয়ে বলল,“এটা আমারও ভালোভাবে মাথায় ঢোকেনি এখনও, জানিস! আসলে রামকে সুগ্রীবের কথা প্রথম বলেছিলেন কবন্ধ।”

“কবন্ধ? মানে তার মাথা নেই? তাহলে বলল কী করে?” ঋতম জিজ্ঞাসা করল।

“মাথা নেই বটে, কিন্তু পেটের মধ্যে তার মুখ আছে, একখানা চোখও আছে। ইনি শাপভ্রষ্ট।” বলে চলল আর্য,“সীতার খোঁজে রাম আর লক্ষ্মণ যখন বনে বনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তখন তাদের পথ আটকেছিল কবন্ধ নামের এই রাক্ষস। বিশাল বড় বড় দুই হাতে দুই ভাইকে চেপে ধরে মেরে ফেলার উপক্রম করেছিল। রাম-লক্ষ্মণ তার দুই হাত কেটে ফেলে, তারই কথায় তাকে আগুনে পুড়িয়ে ফেললেন। তখন সেই চিতা থেকে এক আশ্চর্য সুন্দর পুরুষ উঠে এলেন। তিনিই প্রথম সুগ্রীবের কথা বললেন।” বলে আর্য চটপট সূচিপত্র দেখে একটা পাতা বের করে ফেলল, তারপর দেখে দেখে বলে চলল,“শ্রূয়তাং রাম বক্ষ্যামি সুগ্রীবো নাম বানরঃ…”

এইবার অরিত্র এক লাফ দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,“দ্যাখ! ফের যদি তুই সংস্কৃত আউড়েছিস, আমি তোর গায়ে গরম চা ঢেলে দেব। বাংলায় বল বলছি!”

আর্য থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলল,“আহা... তুই সংস্কৃত শুনলেই অমন চটে যাস কেন বল দেখি? সোজা বাংলায় এর মানে হল,‘শোনো রাম, আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি— সুগ্রীব নামে এক বানর আছেন।’ বুঝলি এবার? এটাই সুগ্রীবের রামায়ণের গল্পে ইনট্রুডাকশান। পরের লাইনেই কিন্তু কবন্ধ বললেন, সেই সুগ্রীব এখন বালীর দ্বারা নির্বাসিত হয়ে ঋষ্যমূক পর্বতে চারজন মাত্র বন্ধুকে নিয়ে বাস করছেন।”

অরিত্র আবার চেয়ারে বসে বলল,“এই তো দিব্যি বোঝা গেল বাবা! কেন যে তুই মাঝেমাঝেই ওই কঠিন ভাষাটা আওড়াতে থাকিস! যাই হোক, তারপর?”

আর্য বেজার গলায় বলল,“এত সুন্দর ভাষাটা তোর পছন্দ হয় না! যাক গে, বাদ দে... এইবার, এখান থেকে রাম প্রথম সুগ্রীবের কথা জানতে পারলেন। কিন্তু খেয়াল কর— সঙ্গে সঙ্গে এটাও তো জানতে পারলেন যে সুগ্রীব এখন নির্বাসিত, আর বালী ক্ষমতায় আছেন?”

“একজ্যাক্টলি মাই পয়েন্ট।” বলল ঋতম,“সেক্ষেত্রে তাঁর তো বালীর কাছে যাওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল! ক্ষমতায় থাকা রাজা তাঁকে অনেক সহজে সাহায্য করতে পারতেন সেনাবাহিনী দিয়ে, তাই না?”

মাথা নেড়ে আর্য বলল, “একদম তাই। আমার কী মনে হয় জানিস, বালী বোধহয় উত্তর ভারতের আর্যদের পছন্দ করতেন না। রাম কোনওভাবে সে কথা জানতেন হয়তো। যাই হোক, বালীবধের পর সুগ্রীব তো রাজা হলেন। কিন্তু ততদিনে বর্ষা এসে গিয়েছে। সেকালে বর্ষাকালে যুদ্ধ-টুদ্ধ হত না— যাতায়াতের অসুবিধার জন্যই বোধহয়। কাজেই চার-চারটি মাস রাম প্রস্রবণগিরির একটা গুহায় লক্ষ্মণকে নিয়ে ঠায় বসে রইলেন।”

ঋতম চোখ বুজে গলাটা গম্ভীর করে নিয়ে বলল,“এই সেই জনস্থান মধ্যবর্তী প্রস্রবণগিরি। ইহার শিখরদেশ…”

আর্য উপরে নিচে মাথা দুলিয়ে হাসল।

“কিন্তু কেন? খামোখা পাহাড়ের গুহায় পড়ে থাকলেন কেন?” এইবার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল অরিত্র,“সুগ্রীবের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল, এইবার তাঁর রাজধানী কিষ্কিন্ধায় গিয়ে আরামে থাকতে পারতেন তো!”

“পারতেন বইকি!” ভুরু নাচিয়ে হাসল আর্য,“কেন গেলেন না, কেন একটা গুহার মধ্যে অত্তগুলো দিন কাটালেন কষ্টেসৃষ্টে— আন্দাজ কর দেখি?”

তিন সেকেন্ড পরে একটা তুড়ি দিয়ে ঋতম বলল,“আমি বলি? বনবাসের প্রতিজ্ঞা।”

নিজের হাঁটুতে একটা থাপ্পড় মেরে আর্য বলে উঠল,“রাইট! সেকালের লোকেদের কাছে কথার দাম ছিল খুব। এইজন্যই এত প্রতিজ্ঞা আর প্রতিজ্ঞা-পালনের ছড়াছড়ি— বুঝলি?”

অরিত্র মাথা নেড়ে বলল,“এই লাইনে অর্জুন ফার্স্ট বয়, ভাই! উরেব্বাস! খালি প্রতিজ্ঞা আর প্রতিজ্ঞা! যে যুধিষ্ঠিরের রক্তপাত ঘটাবে, তাকে মেরে ফেলব! যে অভিমন্যুকে মেরেছে, কালই তাকে মারতে না-পারলে আমিই চিতায় উঠে যাব— বাপ রে বাপ!”

আর্য রামায়ণ শুরু করেছে শুনে অরিত্রও মহাভারত শুরু করেছিল; অবশ্য উপেন্দ্রকিশোর। তারপর পরীক্ষা ঘাড়ে আসায় ছেড়ে দিয়েছে। ওর বলার ভঙ্গিতে বাকি দুই বন্ধু হো হো করে হেসে উঠল।

ঋতম খুব ভক্তিভরে বলল,“কী যে বলিস! ভীষ্ম থাকতে…"— বলে উপরের দিকে তাকিয়ে ঘটা করে একটা পেন্নাম ঠুকল।

“তা এইভাবে বসে বসে চার মাস কাটিয়ে দিলেন রাম-লক্ষ্মণ।” আর্য আবার ওর গল্পের খেই তুলে নিল,“রাম তো বৃষ্টিবাদলার সময় পাহাড়-জঙ্গলের রূপ দেখে খুব বিলাপ-টিলাপ করলেন। তারপর একসময় বর্ষা কেটে গেল। রাম রোজই ভাবেন— এইবার বোধহয় সুগ্রীব যুদ্ধের জন্য রেডি হবেন। তা কোথায় কী? তিনি নতুন রাজত্ব পেয়ে তোফা আরামে দিন কাটিয়ে দিচ্ছেন। রামের কথা তার যেন আর মনেই নেই!”

“আহা, এরকম বলিস না!” বলল ঋতম,“সুগ্রীবও তো এতদিন নির্বাসিত হয়ে জঙ্গলেই ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন, বল? তার বুঝি কষ্ট হয়নি? একটু রেস্ট নেবেন না?”

অরিত্র হেসে উঠতে যাচ্ছিল। তার আগেই আর্য বলল,“ভালো বলেছিস। তারাও ঠিক এই কথাগুলোই বললেন, যখন লক্ষ্মণ তাঁকে শাসাতে গেলেন কিষ্কিন্ধায়।”

“তারাও মানে? তারা আবার কারা?” চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল ঋতম,“তুই খালি গল্পের মধ্যে ক্যারেক্টার ঢোকাচ্ছিস।”

আর্য বলল,“কারা নয়, কে! তারা হলেন বালীর স্ত্রী। বালীর মৃত্যুর পর সুগ্রীব তাঁকে বিবাহ করেন। ইনি এক আশ্চর্য পার্সোনালিটি! যাই হোক...রাম যখন দেখলেন, সুগ্রীবের মোটেই খোঁজখবর নেওয়ার আগ্রহ নেই— তখন তিনি লক্ষ্মণকে দিয়ে বলে পাঠালেন... কী বলব... যেটা বলে পাঠালেন— তাকে সোজা কথায় বলে ধমকি।”

“হ্যাট! রাম সুগ্রীবকে ধমকি দিয়েছিলেন? ইয়ার্কি মারার জায়গা পাস না?”

“না রে! ইয়ার্কি নয়, সিরিয়াসলি! রাম লক্ষ্মণকে বলেছিলেন— তুমি সুগ্রীবকে গিয়ে বলবে, বালী নিহত হয়ে যে পথে গিয়েছেন— সে পথ কিন্তু এখনও বন্ধ হয়ে যায়নি!”

“ওরেব্বাস!” অরিত্র প্রচন্ড অবাক হয়ে বলল,“এ তো সত্যিই ধমকি রে ভাই!!”

“একদমই তাই!”মাথা নেড়ে আর্য বলল,“এর সোজাসুজি মানে হচ্ছে— আমি যদি সীতার সন্ধানের খাতিরে একবার গুপ্তহত্যা করতে পেরে থাকি, তাহলে আরেকবার করতে আমার বিন্দুমাত্র কষ্ট হবে না। সাবধান!”

“বোঝো কাণ্ড!” বলে চোখ বড় বড় করে ঋতমের দিকে তাকাল অরিত্র,“এইজন্যেই এ ব্যাটা মূল বইগুলো পড়ে ফেলে— বুঝলি ঋতম? এই ঘটনাটা তুই জানতিস?”

ঘন ঘন মাথা নেড়ে ঋতম বুঝিয়ে দিল, শুধু জানত না— তাই নয়; জেনে ও অসম্ভব অবাক হয়ে গিয়েছে।

একটু পরিতৃপ্তির হাসি হেসে আর্য বলল,“সুগ্রীব তো ধমক খেয়ে কাজে নেমে পড়লেন। চারিদিকে চর পাঠিয়ে তিনি সমস্ত বানরদের কিষ্কিন্ধায় আসতে বললেন। বানর মানে যে মধ্যভারতের অনার্য গোষ্ঠীর মানুষজন, সে তো বুঝতেই পারছিস। এইবার দেখ— আর্যদের মধ্যে যতই দলাদলি থাকুক না কেন, অনার্যরা কিন্তু দরকারের সময় খুব এককাট্টা ছিল। সুগ্রীবের পাঠানো খবর পেতেই চারিদিক থেকে দলে দলে বানর-জাতীয় রাজারা সব দলবল নিয়ে বিরাট সৈন্য-সামন্ত নিয়ে চলে এলেন কিষ্কিন্ধায়।‌”

“ঠিকই বলেছিস। দিস ইজ ইউনিটি। সুগ্রীব নাহয় রামের দয়ায় সিংহাসন পেয়েছেন। অন্যদের তো কারোর কোন স্বার্থ নেই!” মাথা নেড়ে বলল অরিত্র।

“এগজ্যাক্টলি। এঁরা কিন্তু জাস্ট সুগ্রীবের পাশে দাঁড়াবেন বলেই আসছেন। যাইহোক, সুগ্রীব এইসব বানর-নেতাদের চার ভাগে ভাগ করে পাঠিয়ে দিলেন উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম চারদিকে। প্রত্যেককে বলেও দিলেন— কোন কোন জায়গায় খুঁজে দেখতে হবে। এই জায়গাটায় একটা প্রকাণ্ড ভূগোলের বর্ণনা আছে, বুঝলি! দেখলে হাঁ হয়ে যাবি— সেই আমলেও লোকজন কতদূর পর্যন্ত জায়গার কতখানি নলেজ রাখত! কিন্তু তাঁর নিশ্চয়ই মনে হয়েছিল, সীতাকে পাওয়ার চান্স দক্ষিণদিকে সবচেয়ে বেশি।”

“এটা কেন মনে হল তোর?” ঋতম জিজ্ঞাসা করল।

“কাদের দক্ষিণ দিকে পাঠাচ্ছেন, সেটা লক্ষ কর! তোরও একই কথা মনে হবে।‌” আর্য বলল,“শুধু লিস্টটা খেয়াল কর! নীল, জাম্বুবান, গজ, গবাক্ষ, সুষেন, বালীর ছেলে— যুবরাজ অঙ্গদ! এবং মোস্ট সিগনিফিকেন্ট— স্বয়ং হনুমান!”

“সবচেয়ে ভরসার লোকগুলো।” অরিত্র জোরে বলে উঠল।

মুখ টিপে হাসলো আর্য। তারপর বলল,“এবার বুঝলি? আর একটা ব্যাপার আরও অদ্ভুত।”

“কী রকম?”

“এত বানর এত দিকে সীতাকে খুঁজতে যাচ্ছে। রাম কিন্তু ঠিক হনুমানের হাতেই তুলে দিলেন নিজের আংটিটা— যা দেখালে সীতা বুঝতে পারবেন, হনুমান রামেরই দূত! একে বিশ্বাস করা যায়।”

“আহা! এগেইন আ রাইট চয়েস, বেবি!”

“একদম! রাম সবাইকে দেখার পর ঠিকই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন— এদের মধ্যে সবচেয়ে ইন্টেলিজেন্ট, সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষটার নাম হনুমান। সীতাকে খুঁজে বার করার চান্স তাঁরই সবচেয়ে বেশি। সেইজন্যেই নিজের আংটিটা তিনি হনুমানের হাতে দিয়েছিলেন, এমনকি খোদ যুবরাজ— মানে বালীর ছেলে অঙ্গদের হাতেও নয়। নিখুঁত অবজারভেশন, কী বলিস?”

তর্জনী আর বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে একটা মুদ্রা করে সায় জানাল অরিত্র।

অনেকক্ষণ হয়ে গেছে ওরা গল্প করছে। খেয়াল করেনি, বাইরে সল্টলেকের রাস্তাঘাট নির্জন হয়ে এসেছে। অরিত্র আর ঋতমকে ফিরতে হবে। ওরা উঠে পড়ল। আর্য বইটা একটু সরিয়ে রেখে নেমে পড়ল জালনা থেকে। তারপর দু’হাত ঘসতে ঘসতে বলল,“এখান থেকেই শুরু হচ্ছে একটা মারাত্মক অ্যাডভেঞ্চার, যার মুখ্য চরিত্র হলো হনুমান এন্ড কোং। এবং ঠিক এইখানেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল— যেটা খুব খুঁটিয়ে রামায়ণ না-পড়লে কেউ খেয়াল করবে না।”

বেরিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছিল ঋতম। শেষ বাক্যটা শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করে অরিত্রকে বলল,“আরেকবার চা করবি নাকি? এটুকু শুনেই চলে যাব— সত্যি বলছি!”

চোখ বড় বড় করে অরিত্র বলল,“তোরও কিন্তু আর্যর মতো রামায়ণের নেশা হয়ে যাচ্ছে ঋতম! খুউব সাবধান!”

হা হা করে হেসে উঠল আর্য। তারপর বলল,“সত্যিই এর উপরে নেশা নেই রে! আমিই চা-টা করে ফেলি বরং। তোরা বোস।”

****†****

****

হারিথা রিসর্ট-টা যে এত সুন্দর জায়গায় হতে পারে, সেটা ওদের কারোরই ধারণা ছিল না। এখন রুম থেকে বেরিয়ে বাইরের পাঁচিলটার পাশে দাঁড়িয়ে ওরা তিনজনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।

অন্ধ্রপ্রদেশ টুরিজম-এর এই হোটেলটা আসলে একটা টিলার উপরে। সামনে খাড়া নেমে গেছে ঢালু জমি। সেখানে একটা রাস্তা চলে গিয়েছে ডাইনে-বাঁয়ে। তারপর কয়েকটা বাড়িঘর; আর তারপরেই আশ্চর্য নীলচে-সবুজ রঙের সমুদ্র এখন সকালের রোদে ঝলসে উঠছে। ধনুকের মতো বাঁকা বেলাভূমিতে হেঁটে যাচ্ছেন হাতে-গোনা কয়েকজন মানুষ। এক ঝাঁক পাখি উড়ছে তাদের মাথার উপর দিয়ে। আরও দূরে চোখ মেললে দেখা যাচ্ছে— ধোঁয়াটে পাহাড়ের শ্রেণী চলে গেছে দূর থেকে দূরে। নভেম্বর মাস, কিন্তু ঠান্ডা নেই আদৌ। বরং সমুদ্রের ঢেউ ছুঁয়ে ভেসে-আসা সকালের হাওয়াটা বেশ ভালো লাগছে।

“অপূর্ব! জাস্ট ফ্যান্টাস্টিক!” বলল অরিত্র।

ওরা দু’জন নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। তিনজনেই এবার প্রথম ভাইজাগে এসেছে। জায়গাটা সম্পর্কে ওদের তেমন ধারণা ছিল না। ঝকঝকে পরিষ্কার শহর, বড় বড় হোটেল, আধুনিক দোকানপাট আর শপিংমল— এসব দেখে কলকাতার ছেলেদের মুগ্ধ হওয়ার কোনও কারণ নেই আজ আর। কিছুটা নিরুৎসুক চোখে এইসব দেখতে দেখতে শহর পেরিয়েছিল ওরা। কিন্তু শহর ছাড়িয়ে একটু বেরিয়ে এসে হঠাৎ ডাইনে বাঁক নিয়ে অটোটা যখন ওদের রিসেপশনের সামনে নামিয়ে দিল, তখনই ওরা হোটেলটার অপূর্ব অবস্থান প্রথম বুঝতে পারল। আর এখন, ঘরে জিনিসপত্র রেখে, ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে সত্যিই ওরা হতবাক হয়ে গিয়েছে।

“ইস! আরও দু'একদিন থাকলে হত রে!” দূরে তাকিয়ে পাহাড় আর সমুদ্রের গলাগলি দেখতে দেখতে আফসোসের সুরে বলল ঋতম।

“স্নান করবি না?” আর্য জিজ্ঞেস করল।

“খুব একটা কেউ স্নান করছে না কিন্তু।” ঋতম বলল খুঁটিয়ে সমুদ্রের পাড় দেখতে দেখতে।

“না করুক! কোই নেহি যায়েগা, তো হাম তিন যায়েগা!” অরিত্র সতেজে বলল।

“আলবাত যায়েগা!” বলল আর্য,“কিন্তু চল, আগে ব্রেকফাস্ট সেরে ফেলি। বেজায় খিদে পেয়ে গেছে।”

কন্যাকুমারী সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস ধরার বুদ্ধিটা ওদের দিয়েছিলেন অরিত্রর ছোটকাকা। তিনি রেলের উঁচু পোস্টে চাকরি করেন। ঝটপট টিকিটটা জোগাড় করে দিয়েছিলেন তিনিই। হঠাৎ করে বেরিয়ে যাবে ঠিক করলে সবার আগে যে ঝঞ্ঝাটটা সবাইকে ফেস করতে হয়, সেটা ওদের এই কারণেই করতে হয়নি।

মুশকিল হল, ভাইজাগে ওরা থাকবে না। আসলে ওরা যাচ্ছে আরাকু ভ্যালি নামের একটা জায়গায়। সেটা এই ভাইজাগ হয়ে যেতে হয়। সেই কারণেই ওদের এখানে আসা, এবং ঠিক একটা দিন থাকবে— এই ভাবেই আসা। আগে থেকে ভালো করে খোঁজ খবর না-নিলে যা হয়। ওরা জানতই না— ভাইজাগে দেখার মত এত কিছু রয়েছে। ডলফিন’স নোজ, কিংবা কৈলাসগিরি সম্পর্কে ওদের কোনো ধারণাই ছিল না।

ট্রেনে আসার পথে এক পরিবারের সঙ্গে ওদের আলাপ হয়েছিল। মধ্যবয়স্ক দম্পতি দুই সন্তানসহ চলেছেন ভাইজাগের উদ্দেশ্যে। বেড়াতে নয়, সেখানেই থাকেন তাঁরা। ভদ্রলোক জমাটি স্বভাবের; তিনটে অল্পবয়সী ছেলেকে দেখে তাঁর কোনও কারণে ভালো লেগে গেল। গল্প জুড়ে দিলেন দিব্যি।

এই ভদ্রলোকের কাছ থেকেই এসব ওরা জানতে পারল। সবচেয়ে বড় কথা, তিনিই ওদের বললেন— বাসে বা গাড়ি ভাড়া করে আরাকু যাওয়া মানে একটা দুর্ধর্ষ জার্নি হাতছাড়া করে দেওয়া। আরাকু যদি যেতেই হয়, তবে যাওয়া চাই ট্রেনে।

কিরন্ডুল এক্সপ্রেস। অসংখ্য টানেলের মধ্য দিয়ে যাওয়া এই ট্রেন থেকে পাহাড় আর উপত্যকায় যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা নাকি চোখ ঝলসে দেয়। বাসরাস্তায় সেই দৃশ্য মিলবে না।

কাজেই আবার লাফালাফি, এবং ট্রেন থেকেই ফের সেই ছোটকাকুকে ফোন করে টিকিটের ব্যবস্থা করতে বলা। কাল সকালেই সেই ট্রেন ধরে ওরা চলে যাবে আরাকুর দিকে, কাজেই ভাইজাগে থাকার জন্য ওদের হাতে আছে একটাই দিন। সমুদ্রে স্নান করবে, না সাইট-সিয়িং করে বেড়াবে— তা নিয়ে ওদের মধ্যে রীতিমতো একপ্রস্থ ঝগড়াঝাঁটি হয়ে গেল।

“এইরকম জল, তাও তোরা নামবি না! গাধা নাকি?” বলল অরিত্র।

ঋতম তেরিয়া হয়ে বলল,“সবাই তোর মতো জলহস্তী নয় যে, জল দেখলেই খলবলিয়ে নেমে যাবে।” অরিত্রর ব্যায়াম-করা ক্যারাটে-শেখা চেহারার সঙ্গে যে জলহস্তীর তুলনাটা মোটেই মানাচ্ছে না, সেটা ভাবার সময় ছিল না তখন আর।

আর্য মাঝে পড়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে দেওয়ার জন্য বলল,“শোন, আমি একটা কথা বলি। সমুদ্রে স্নান তো করাই যায়, যেখানেই সমুদ্র— সেখানেই স্নান। কিন্তু কৈলাসগিরির উপর থেকে সমুদ্র দেখার চান্স তো সব জায়গায় পাব না, বল? আমরা এই যাত্রায় এগুলোই সেরে নেই, বুঝলি! পরে নাহয় হাতে সময় নিয়ে আসা যাবে আবার। তখন খুব করে স্নান করা যাবে।”

কিঞ্চিৎ মতান্তরের পর অরিত্রও রাজি হয়ে গেল। কথাটা ফ্যালনা নয়৷ একটা ছোট গাড়ি ভাড়া করা হল। সারাদিন ধরে দুর্ধর্ষ সব জায়গায় ঘুরে বেড়াল ওরা। সবচেয়ে বড় কথা, অল্পবয়সি হাসিমুখ ড্রাইভার ছেলেটি যে রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে গেল, সেখানকার বিরিয়ানির আস্বাদ তিন ঘন্টার মধ্যে মুখ থেকে গেল না, আর সেই স্বাদ কলকাতার বিরিয়ানির থেকে একেবারেই আলাদা। আহা!

সন্ধ্যের পর বিচে গিয়ে বসল ওরা। টুরিস্ট খুব কেউ নেই, হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, প্রধানত স্থানীয় মানুষেরাই সন্ধ্যায় সমুদ্রের হাওয়া খেতে এসেছেন। রাস্তার পাশে একটা মারুতি ওমনি গাড়ি দাঁড় করিয়ে দুর্ধর্ষ চা বিক্রি করছিল দুটো অল্পবয়সি ছেলে। ফাটাফাটি স্বাদের আদা-চা খেয়ে ওদের তখন মেজাজ শরিফ হয়ে গেছে। সাগরপাড়ের একটা বাঁধানো বেঞ্চে বসে সবে অরিত্র কৈলাসগিরির কথা তুলতে গেছে, এই সময় এক মাঝবয়সী ভদ্রলোক এসে বসলেন ওদের কাছেই, একই বেঞ্চে৷ ওরা একটু সরে গিয়ে জায়গা করে দিল।

আর্য সবে বলেছে,“শুধু টেস্ট নয়; চায়ের উপর ওই তুলসীপাতা ভেসে থাকাটা কিন্তু ফ্যান্টাস্টিক— বল?”

অমনি ভদ্রলোক তড়িঘড়ি মুখ ঘুরিয়ে বললেন “তোম...সরি...আপনারা বুঝি বাঙালি?”

ওরা তিনজনেই একটু অবাক হয়ে তাকাল। ভদ্রলোকের বয়স পঞ্চাশের দু’এক বছর এদিক-ওদিকে হবে। মাঝারী গড়ন, চুলে পাক ধরেছে অল্প। ওরা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতে ভদ্রলোক বললেন,“আমিও। আমার নাম জয়দেব সামন্ত। কাছেই একটা হোটেলের চাকরি করি। বাড়ি চুঁচুড়া। আপনারা?”

কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিচয় হয়ে গেল। ওরা পরদিন আরাকু যাবে শুনে জয়দেববাবু মুখ বেজার করে বললেন,“আর সে আরাকু নেই ভাই। আমি ভাইজাগে আছি বিশ বছর যাবৎ। একাই থাকি। ফ্যামিলি আনিনি, হোটেল লাইফে ফ্যামিলি নিয়ে থাকা খুব একটা সুবিধের নয়, বুঝলেন! তো এখানে আসার পরে পরেই প্রথমবার গিয়েছিলাম আরাকুতে। আহা! সে যে কী সুন্দর ছিল, তা এখন তোমরা...ইয়ে...আপনারা ভাবতে পারবেন না। ধু ধু উপত্যকা, ঢেউ-খেলানো সবুজ ঘাসের মাঠ, ছোট ছোট পাহাড়, তার উপর দেওদার গাছের সারি! তখন ক'জনই বা আরাকু যেত? ফাঁকা চওড়া রাস্তা ধরে পায়ে পায়ে হেঁটে বেড়াতাম একা একা। পাশে পাহাড়ের কোলে রেললাইন দিয়ে টুকটুক করে যেত মালগাড়ি— সে এক অপূর্ব দৃশ্য।”

ব্যাপারটা ওরা ঠিক বুঝতে পারল না। ভ্যালি, পাহাড়, গাছের সারি বা রেললাইন— কোনটাই অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে না! তাহলে ভদ্রলোক এতো আফসোস করছেন কেন?

আর্য আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করে বসল,“এখন কি সব পাল্টে গিয়েছে?”

জিভ দিয়ে ‘ছিক ছিক’ করে দুবার শব্দ করে ভদ্রলোক বললেন,“দুর দুর! সেই ভ্যালি, সেই পাহাড়ের সারি তোমরা দেখবে কোথা থেকে? চারিদিকেই তো বাড়ি আর হোটেল আর রেস্টুরেন্ট! গাঁ গাঁ করে গাড়িঘোড়া দৌড়চ্ছে রাস্তা দিয়ে, চারিদিকে নোংরা আর বাঁশ-পোড়া মাংসের গন্ধ। সেই ভার্জিনিটি আজ উধাও। চোখের সামনে নষ্ট হয়ে গেল অমন অপূর্ব সুন্দর জায়গাটা।” বলে সত্যিকারের দুঃখের সঙ্গে মাথা নাড়তে লাগলেন।

সত্যি বলতে কী, ওদের মন দমে গেল রীতিমতো। কৈলাসগিরির উপর থেকে সমুদ্র দেখে ওদের দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বিস্ময়ে— সে কথা মিথ্যে নয়। কিন্তু ওই সাজানো-গোছানো পার্ক আর মস্ত শিবমূর্তি— এসব ওদের বিশেষ ভালো লাগে না। ট্রেনের সেই ভদ্রলোক দেখা যাচ্ছে ইদানিংকালের মধ্যে আর আরাকু যাননি।

কিন্তু এখন তো আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই। দুদিনের বুকিং করা আছে আরাকুতে, তারপর সেখান থেকে ওরা চলে যাবে জঙ্গলের মধ্যে ‘টাইডা’ নামের একটা জায়গায়, একটা ছোট্ট রিসর্টে। তার নাম ‘জাঙ্গল বেল।’ সেটা যে কেমন হবে— তাই বা কে জানে!

ঋতম আর দেরি না করে জিজ্ঞেস করল,“আপনি টাইডায় গিয়েছেন?”

“জাঙ্গল বেল?” জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক। ওরা মাথা নাড়তেই ভদ্রলোক হেসে বললেন,“চমৎকার জায়গা। জঙ্গলের মধ্যে ছোট ছোট কাঠের বাড়ি কোনোটা কুঁড়েঘরের মতো, কোনোটা এস্কিমোদের ইগলুর মতো। কাছেই একটা ছোট্ট রেলস্টেশন আছে, ওই টাইডা স্টেশনটাই আরকি...ভারি নিরিবিলি জায়গা। ঘুরে আসুন, আরাকুর চাইতে ঢের ভাল। চাদ্দিকে জঙ্গল, পাহাড়…”

যাক! ট্যুরটা একেবারে জলে যাচ্ছে না তাহলে। ওরা এবার একটু আশা নিয়ে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

এমন সময় ভদ্রলোক আবার বললেন,“কাছেপিঠে আরেকটা জায়গা থেকে আপনারা ঘুরে আসতে পারেন। ট্রেনে যাচ্ছেন, না বাসে?”

আর্য বলল,“ওই কিরন্ডুল এক্সপ্রেসের টিকিট কেটেছি আরাকু পর্যন্ত, সেখান থেকে বাস ধরে নেমে আসব টাইডাতে।”

“তাহলে এক কাজ করুন না কেন! ট্রেন ধরেই সোজা চলে যান জগদলপুর! দুখানা ঝর্ণা আছে কাছেই। চিত্রকোট ফলস-কে ভারতের নায়াগ্রা বলা হয়— জানেন তো? দেখার মত ব্যাপার! তারপর ধরুন বেশ কিছু দুর্দান্ত গুহা...সে মশায় এই বোরা কেভস-এর মতো সাজানো-গোছানো লাইট-জ্বালানো টুরিস্ট-স্পট নয়! রীতিমতো অ্যানশিয়েন্ট গুহা, একা ঢোকার মতো বুকের পাটা নেই আজও কারোর! ট্রেন ধরে সোজা সেইটে দেখে নিয়ে ফিরে আরাকুতে আসুন বরং।”

চিত্রকূট শব্দটা শুনেই আর্য যে সোজা হয়ে বসল, সেটা ওদের দুজনের কারোরই চোখ এড়ালো না।

ভদ্রলোক তখন বলে চলেছেন,“জায়গাটা বস্তার জেলার মধ্যে পড়ে কিন্তু। অন্ধ্রার বাইরে, ছত্তিসগড় রাজ্য। চারপাশে ঘন জঙ্গল। সেই জঙ্গলটারও নাম শুনে থাকবেন হয়তো। দণ্ডকারণ্য।”

ঋতম আর অরিত্রর আর বুঝতে বাকি রইল না, কাল সকালে কিরন্ডুল এক্সপ্রেস ধরে ওরা আরাকুতে নামছে না। ওরা যাচ্ছে জগদলপুরেই।

******†******

****

একখানা করে মশলা-ধোসা আর এক কাপ করে অতি উপাদেয় ফিল্টার কফি দিয়ে ডিনার সেরে ওরা যখন খাটের উপর বসল রুমে ফিরে, তখন রাত দশটা বেজে গেছে। সমুদ্রের দিকে দেওয়ালটা পুরোটাই কাচের। সে দিকে তাকালে চোখে পড়ছে সারসার আলোয় ভেসে যাওয়া বাঁকা সমুদ্রসৈকত আর ছুটে যাওয়া গাড়ির হেডলাইট।

আর্য বলল,“এইবার মনে কর— সেদিন কী বলেছিলাম। সুগ্রীব যে-দলটাকে দক্ষিণ দিকে পাঠিয়েছিলেন, তারা দণ্ডকারণ্যের মধ্যে সীতাকে খুঁজতে খুঁজতে একসময় পথ হারিয়ে ফেলেছিল— মনে পড়ছে?”

ওরা দুজন মাথা নাড়ল। রামায়ণের গল্পটা সকলেই মোটের ওপর জানে; কিন্তু এই ঘটনাটা সম্পর্কে ওরা কখনো তেমন আলাদা করে কিছু শোনেনি। আর সেই কারণেই আর্যদের সল্টলেকের বাড়ির বারান্দায় বসে ওরা যেটা শুনেছিল, তা সত্যিই হতভম্ব করে দেওয়ার মতোই। এমন আশ্চর্য ঘটনা কেন যে তেমন করে আলোচনার মধ্যে আসেনি কখনও— তা ওদের মাথাতেই ঢোকেনি।

“তোদের তো বললাম, সুগ্রীব চারদিকেই লোক পাঠিয়েছিলেন সীতার খোঁজে। সময় দিয়েছিলেন এক মাস, অর্থাৎ এক মাসের মধ্যে ফিরে এসে সীতার সন্ধান সুগ্রীবকে দিতে হবে।” বলে চলল আর্য,“কার্যকালে কিন্তু দেখা গেল— উত্তর, পূর্ব এবং পশ্চিম থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলো সন্ধানী দলগুলো। না, সীতাকে খুঁজে পায়নি তারা। ফিরল না শুধু দক্ষিণগামী দলটা।”

“এরাই তো সীতাকে খুঁজে বার করবে, তাই না? রাবণ তো দক্ষিণ দিকেই গিয়েছিলেন?” অরিত্র জিজ্ঞেস করল।

মাথা নেড়ে আর্য বলল,“ব্যাপারটা ঠিক এতটা সহজ দাঁড়াল না। আসলে এই দলটাও সীতাকে খুঁজে পায়নি।”

“এই খেয়েছে!” বলে উঠলো ঋতম,“তাহলে রাম আদৌ সীতাকে খুঁজে পেলেন কী করে? তুই তো রামায়ণের গল্পটাকেই গন্ডগোল করে দিচ্ছিস!”

“মোটেই না!” বলল আর্য,“বহুদিন ধরে দক্ষিণ দিকের সমস্ত জঙ্গল-পাহাড় তছনছ করে এই দলটা খুঁজে চলল সীতাকে। ভুলিস না, এই দলে কিন্তু ছিলেন শ্রেষ্ঠ বানরবীরেরা।”

“তাহলে?”

“হ্যাঁ, খুঁজে চললেন বটে, কিন্তু সন্ধান পাওয়া গেল না কোথাও। পথশ্রমে, খিদেয় আর তেষ্টায় তাদের তখন উদ্ভ্রান্ত অবস্থা। সুগ্রীব তাদের বলে দিয়েছিলেন, এই দক্ষিণ দিক বড় সুবিধের জায়গা নয়! বিন্ধ্যপর্বতের হাজার-হাজার শিখর, সবটাই জঙ্গলে ঢাকা; নর্মদা, গোদাবরী— এইসব নদী আছে এই অঞ্চলে। সেসব দেখার পর মেকল, উৎকল, অবন্তী, বিদর্ভ, মৎস্য, কলিঙ্গ—এই সমস্ত দেশ দেখতে হবে। দেখতে হবে অন্ধ্র চোল পাণ্ড্য কেরল— সর্বত্র। মলয় পর্বতে বাস করেন অগস্ত্য মুনি; তাঁকে সন্তুষ্ট করে তাম্রপর্ণী নদী পেরোতে হবে। এমনকি— বললে বিশ্বাস করবি না— দক্ষিণ ভারতের চন্দনগাছের বনের কথা অবধি তিনি উল্লেখ করেছেন!”

“বোঝো কান্ড! তবে যে আমরা বলি, আর্যরা কেবল উত্তর-ভারতটুকুই জানত?”

“সেটাই তো কথা! সুগ্রীব কিন্তু তন্নতন্ন করে দক্ষিণ-ভারতের নদ-নদী-পাহাড়-জঙ্গল-রাজ্য— সবকিছুর বর্ণনা করছেন নাম-টাম শুদ্ধু!”

অবাক হয়ে আর্যর দিকে তাকিয়ে রইল অরিত্র আর ঋতম। এসব ব্যাপার সত্যিই ওদের জানা ছিল না।

“শেষে সুগ্রীব বললেন সেই মোক্ষম কথাটা। একেবারে দক্ষিণে আছে সমুদ্র। সেই সমুদ্রের অপরপারে এক দ্বীপ। ভালো করে সেটাকে খুঁজে দেখতে বললেন তিনি, কারণ সেইদিকেই রাক্ষসরাজ রাবণের বাস।”

“আরিব্বাস! তার মানে সুগ্রীব জানতেন রাবণ কোথায় থাকে?”

“তাই মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু আসলে তাঁকে এই সন্ধানটা দিয়েছিলেন তারা। মনে আছে তো— সেই বালীর স্ত্রী। আর তারা বলেছিলেন, এ-খবর তাকে দিয়েছেন স্বয়ং বালী।

“আরও দক্ষিণে কী কী আছে— তারও একটা বর্ণনা সুগ্রীব করেছিলেন বটে, কিন্তু সেসব দিয়ে আমাদের কাজ নেই। অদ্ভুতভাবে শুধু এই দণ্ডকারণ্যের কথা বলার সময় সুগ্রীব বারবার করে উল্লেখ করলেন— এখানে অনেক গুহা আছে। রহস্যময় প্রকাণ্ড সব গুহা। সেইগুলোতে তিনি খুব ভালো করে খুঁজে বলেছিলেন। বুঝতেই পারছিস, যেকোন মানুষকে লুকিয়ে রাখার পক্ষে জঙ্গলের মধ্যে গোপন গুহার মত আইডিয়াল জায়গা আর কিছু হতেই পারে না।”

”স্বাভাবিক!” মাথা নেড়ে বলল ঋতম,“একেই জঙ্গল-পাহাড়। এমনিতেই সেখানে খুঁজে বেড়ানো মুশকিল। তার উপর গোপন গুহায় কাউকে লুকিয়ে রাখা হলে তাকে খুঁজে বের করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। সুগ্ৰীবের আইডিয়া মোটেও অবাস্তব ছিল না।”

“একদম তাই! তো হনুমান এবং অন্যরা সেই অনুযায়ী এই দক্ষিণ দেশের জঙ্গলময় এলাকাটা তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখলেন, কিন্তু সীতার সন্ধান পেলেন না। শেষে একসময় অবসন্ন হয়ে তাঁরা হাল ছেড়েই দিলেন। ততদিনে একমাস প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। পাছে সঙ্গী বানরেরা সত্যিই হাল ছেড়ে দিয়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করেন, সেইজন্যে অঙ্গদ একটা ভয়ঙ্কর সত্যি কথা বললেন।”

“ভয়ঙ্কর সত্যি! সে আবার কী রে!”

“হ্যাঁ, ভয়ংকর এবং সত্য। এই কথাটা অঙ্গদ পরে আরও একবার বলবেন, যখন সমুদ্রের পাড়ে পৌঁছে তারা আর পথ খুঁজে না-পেয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন। সেটা হল— সুগ্রীব শাসক হিসেবে ভয়ঙ্কর লোক। অঙ্গদ তাঁকে যমের মত ভয় পেতেন, অন্য বানরেরাও তাঁকে দস্তুরমতো সমঝে চলতেন। ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলে এই দলটার জন্য যে মারাত্মক শাস্তি অপেক্ষা করে রয়েছে, তা বিশেষ করে এই দলের লোকেরা হাড়ে হাড়ে জানতেন।”

“কেন? মানে আমি বলছি— বিশেষ করে এই দলের বানরেরাই এমন মরিয়া হয়ে উঠলেন কেন?”

“খেয়াল করে দ্যাখ, অন্যদলের বানরদের চাইতে এরা সবাই সুগ্রীবের অনেক কাছের লোক। সুগ্রীবকে এঁরা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি চেনেন, জানেন। বোধহয় সেই কারণেই এঁদের ভয়টাও বেশি ছিল।”

“হ্যাঁ, এটা অবশ্য ঠিকই বলেছিস। অঙ্গদ তো ভাইপো, জাম্বুবান প্রধানমন্ত্রী, হনুমান নিজেও একজন মন্ত্রী ছিলেন। সুষেন বোধহয় রাজবৈদ্য, তাই না?”

“সুষেনের আরও একটা পরিচয় আছে, ভুলে যাস না। সুষেন সুগ্রীবের শ্বশুর হন।”

“ও! ইনি রুমার বাবা?”

“না! ইনি তারার বাবা। অঙ্গদের মত ইনিও সুগ্রীবের সরাসরি আত্মীয়। কাজেই এঁদের মতো করে অন্যরা সুগ্রীবের ক্রোধ চেনেন না। এইজন্যেই বারবার হাল ছেড়ে দিয়েও এঁরা কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি। যে করেই হোক সীতাকে খুঁজে বের করতেই হবে— এইভাবেই কাজ করছিলেন এঁরা।”

“এইবার ব্যাপারটা বোঝা গেল। তারপর?”

“এই সময় এই দলটা একটা অদ্ভুত জিনিস দেখতে পেল। জঙ্গলের মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা গুহা, আর সেই গুহার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে জলচর পাখির দল—বক আর সারস। তার চেয়েও বড় কথা হল, তাদের ডানায় জল লেগে রয়েছে। ততক্ষণে— ওই যে বললাম— খিদে আর চেষ্টায় বানরদের প্রাণ যাওয়ার জোগাড় হয়েছে। গুহা থেকে ভেজা ডানায় পাখিদের উড়ে আসতে দেখে তাঁরা আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন। গুহার ভিতরে নির্ঘাত জল রয়েছে। প্রাণটা তাহলে এ যাত্রায় অন্তত জলের অভাবে গেল না।”

বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আর্য যোগ করল,“এই হল ‘ঋক্ষবিল।’”

“বিল? মানে জলাভূমি?”

“না রে। সংস্কৃত ভাষায় ‘বিল’ শব্দের অর্থ গুহা। কেভ। মনে আছে, সুগ্রীব গুহাগুলোতে ভালো করে খুঁজে দেখতে বলেছিলেন!”

“ও, আচ্ছা! আর ঋক্ষ মানে কী?”

“ঋক্ষ মানে ভালুক।”

“ভালুকের গুহা? অবশ্য ভালুক তো গুহাতে থাকেই!”

“হ্যাঁ। আর এই গুহায় লুকিয়ে ছিল এমন এক রহস্য, যা এমনকি হনুমান বা জাম্বুবানের মত আশ্চর্য বুদ্ধিমান বানরেরাও চিন্তা করতে পারেননি।”