top of page
Search

বাইকে লাদাখ ভ্রমণ, হারিয়ে যাওয়া বাঙালি রান্না..

বাইকে একাকী লাদাখ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন সরোজ মজুমদার, পেশায় পদার্থবিদ্যার শিক্ষক।



প্রথম দিন, (কলকাতা, বারানসী, উত্তরপ্রদেশ)

বাইকে ভ্রমণ করতে হলে আগাম প্রস্তুতি যা যা নিতে হয় যেমন, বাইক সার্ভিস করানো, লাগেজ , হেলমেট ও অ্যাকশন ক্যামেরা রেডি করা ইত্যাদি, সব আগেই সেরে রেখেছিলাম। রাতে উত্তেজনায় ভালো ঘুম আসার কথা নয়, আসেও নি ভালো। রাত ২:১৫ তে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে নিজেকে ও বাইককে রেডি করে ভোর ঠিক ৩:২২ মিনিটে বেলঘরিয়ার বাড়ি থেকে একাকি বেরিয়ে পড়লাম লাদাখ এর উদ্দেশ্যে। বালি ব্রিজ, ডানকুনি, গুরাপ, শক্তিগড় হয়ে বর্ধমান পেরোবার পর ভোরের আলো ফুটলো। ন্যাশনাল হাইওয়ে-১৯ ধরে এরপর দুর্গাপুর, রানীগঞ্জ, আসানসোল হয়ে মাইথনে এসে বরাকর নদী পার হতেই পশ্চিমবঙ্গের সীমানা অতিক্রম করে ঝাড়খন্ড রাজ্যে প্রবেশ করলাম। ঝাড়খণ্ডে আসার পর, সকাল সাড়ে আটটায় দুটো রুটি সঙ্গে টক-দই আর এক কাপ ব্ল্যাক-টি সহযোগে প্রাতরাশ সেরে নিলাম। ঝাড়খণ্ডে ন্যাশনাল হাইওয়ে-১৯ এর দুপাশে অনেক তরোয়াল ও লাঠির দোকান দোকান আছে। তোপচাঁচি, জামতাড়া, বর্হি, চৌপারন হয়ে ফল্গু নদীর সেতু পেরিয়ে এপাশে চলে আসতেই ঝাড়খন্ড ছেড়ে বিহার রাজ্যে প্রবেশ করলাম। ন্যাশনাল হাইওয়ে-১৯ এর দুপাশ জুড়ে সারা রাস্তায় প্রচুর কাশ ফুল ফুটেছে দেখলাম। ঔরঙ্গাবাদ, সোন নদী, দেহরী, সাসারাম, শিভসাগর হয়ে করমানসার নদীর উপর ব্রিজ পেরোতেই বিহার ছেড়ে উত্তরপ্রদেশে চলে এলাম। দুপুরে উত্তরপ্রদেশে লাঞ্চ সারলাম ভেজ-ফ্রাইড রাইস ও টকদই এর সাথে। বারানসীতে গঙ্গা নদীর উপর ব্রিজ পেরিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে ১৯ ধরে এগিয়ে চললাম। অবশেষে ৭৩০ কিমি দূরত্ব অতিক্রম করে উত্তরপ্রদেশের বারানসী শহরকে পিছনে ফেলে রেখে বিকেল ৫:৩০ এ পৌঁছেগেলাম গোপীগঞ্জে, যেখানে আমার আজকের রাত্রিবাস ।

দ্বিতীয় দিন (বারানসি থেকে আগ্রা, উত্তর প্রদেশ)

ভোর ৩ টে তে মোবাইলে অ্যালার্ম এর আওয়াজ শুনে ঘুম ভাঙলো। তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে স্নান সেরে নিয়ে বাইকে লাগেজ চাপিয়ে ভোর সাড়ে চারটের সময় উত্তরপ্রদেশের গোপীগঞ্জ থেকে বেরিয়ে পড়লাম আগ্রার উদ্দ্যেশ্যে, ন্যাশনাল হাইওয়ে-১৯ ধরে। সকল ৬ টার সময় তৃতীয় বারের জন্য আবার গঙ্গা নদীর দেখা পেলাম, উত্তর প্রদেশের ধীমিতে। গতকাল ভোরে যখন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম তখন দক্ষিনেশ্বরে বালি ব্রিজে গঙ্গা নদীর দেখা পেয়েছিলাম এবং ওইদিনই বিকেলে বারানসীতে। সকাল সাড়ে আটটায় প্রাতরাশ সেরে নিলাম।

এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে, আমার এই লাদাখ রাইডে প্রতিদিনের খাবার মেনু ছিল এইরকম সকালে দুটো রুটি ও টকদই সাথে ব্ল্যাক টি। দুপুরে ভেজ- ফ্রাইড রাইস ও টকদই আর রাতে দুটো রুটি ও টকদই। সামান্য কিছু ব্যাতিক্রম ছাড়া। এছাড়া যাত্রাপথে সকালের দিকে ও বিকেলের দিকে দুটো টি-ব্রেক নিতাম। গোপীগঞ্জ থেকে বেরিয়ে; প্রয়াগরাজ, কানপুর, ইটাওয়া শহর পেরিয়ে আগ্রা - লখনউ এক্সপ্রেসওয়ে তে পৌঁছে গেলাম দুপুর ১ টা নাগাদ। ৮৫ টাকা টোল ফি দিয়ে ঢুকে পড়লাম আগ্রা লখনউ এক্সপ্রেসওয়েতে। বলে রাখা দরকার যে এই আগ্রা লখনউ এক্সপ্রেসওয়েতে বাইক রাইডারদেরও টোল ফি দিতে হয়। দারুন রাস্তা। দ্রুত বাইক চালিয়ে আগ্রা লখনউ এক্সপ্রেসওয়ে হয়ে, আগ্রা ইনার রিং রোড ধরে দুপুর আড়াইটে নাগাদ পৌঁছে গেলাম আগ্রার হোটেলে। এইদিনের মোট যাত্রা পথ ছিলো ৫২৭ কিমি।

তাড়াতাড়ি লাঞ্চ সেরে ও একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেল ৪ টে নাগাদ বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম তাজ মহলের উদ্দ্যেশে। তাজমহল ওয়েস্ট-গেট পার্কিং এ বাইক রেখে, টিকিট কাউন্টার থেকে ৫০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম তাজমহল ক্যাম্পাসের মধ্যে। তাজমহল ক্যাম্পাসের ভিতৰ তখন কাঠ চাপা ফুলের গন্ধে ভরপুর। পড়ন্ত বিকেলের রৌদ্রে তাজ মহল তখন দারুন সুন্দর লাগছিলো। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে যমুনা নদী। ২১০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে মূল তাজমহল এর মধ্যে প্রবেশ করলাম। মূল তাজমহল এর মধ্যে মাঝখানে রয়েছে মমতাজ এর সমাধি ও তার পাশে সম্রাট শাজাহানের।

তৃতীয় দিন (আগ্রা, উত্তর প্রদেশ থেকে জলন্ধর, পাঞ্জাব)

ভোর ৪:৪০ এ এদিনের যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমে কিছুটা ভুল রাস্তায় যাওয়ার পর, আগ্রা ইনার রিং রোড ধরে পৌঁছে গেলাম ভারতের দ্রুততম এক্সপ্রেসওয়ের এন্ট্রি টোল গেটে। যমুনা এক্সপ্রেসওয়ে। এখানেও বাইকারদের টোল ফি দিতে হয়। ২০৫ টাকার টোল ফি দিয়ে যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে ভোরের অন্ধকারে যাত্রা শুরু করলাম। স্থানীয় লোকজনেরা তখন রাস্তায় শরীর চর্চায় ব্যস্ত। দারুণ সুন্দর রাস্তা। ভোরের আবহাওয়া এমন রাস্তায় রাইড করার আনন্দই আলাদা। যমুনা এক্সপ্রেসওয়েতে তিনটি পেট্রোল পাম্প আছে যা মেইন রাস্তা থেকে কিছুটা নেমে গিয়ে পরে। এরকমই একটি পেট্রল পাম্প থেকে বাইকে এ পেট্রল ভরে নিয়ে পৌঁছে গেলাম গ্রেটার নয়ডা। সেখান থেকে উঠলাম ইস্টার্ন পেরিফেরাল এক্সপ্রেসওয়েতে। উত্তরপ্রদেশ ছেড়ে এবার ঢুকে পড়লাম হরিয়ানা রাজ্যের সোনিপতে, প্রাতরাশ সেরে আবার চলা শুরু করলাম। পানিপথ, কার্নাল, কুরুক্ষেত্র, আম্বালা, লুধিয়ানা, ফাগওয়ারা হয়ে, সর্বমোট ৬২৪ কিমি রাস্তা অতিক্রম করে, বিকেল সাড়ে পাঁচটায় এসে পৌঁছালাম পাঞ্জাব রাজ্যের জলন্ধর শহরে যেখানে আমার আজকের রাত্রিবাস। পাঞ্জাবে রাস্তার পাশে অসংখ্য মুসম্বি লেবুর জুসের দোকান ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।

চতুর্থ দিন (জলন্ধর, পাঞ্জাব থেকে সোনমার্গ, জম্মু ও কাশ্মীর)

পাঞ্জাবের জলন্ধর থেকে ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমার চতুর্থ দিনের একাকী বাইক যাত্রা শুরু করলাম। পাঠানকোট হয়ে চলে এলাম পাঞ্জাব ও জম্মু -কাশ্মীর রাজ্যের বর্ডার লক্ষনপুরে রবি নদীর পাড়ে। এখানে আসতেই আমার প্রিপেইড মোবাইল সিম তার কাজ করা বন্ধ করে দিলো, আমি লাদাখ রাইড এর জন্য নেয়া নতুন পোস্টপেইড সিম টি মোবাইলে চালু করে নিলাম। রাস্তায় সাধারণ গাড়ি ও আর্মি গাড়ির ভিড় থাকায়; সাম্বা, মনসার মোড়ে এসে জম্মু শহর কে বাইপাস করে উধমপুর হয়ে শ্রীনগর যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। রাস্তার অবস্থা মোটামুটি হলেও রাস্তার দুপাশের সৌন্দর্য অসাধারণ। উধমপুরে প্রাতরাশ সেরে জম্মু-শ্রীনগর হাইওয়েতে এসে পৌছালাম। ৯ কিমি দীর্ঘ ড: শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী টানেল পেরিয়ে রামবানে এসে একটু টি ব্রেক নিলাম। এরপর ৮ কিমি দীর্ঘ বানিহাল-কাজিগুন্দ টানেল পেরিয়ে শ্রীনগরে পৌছে লাঞ্চ সেরে নিলাম। এরপর রূপসী সিন্ধু নদীর বয়ে চলা আর দুধারের পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখতে দেখতে, ৫১৫ কিমি পথ চলে বিকেল সাড়ে ছটায় সোনমার্গ এ পৌছলাম । এখানে সন্ধ্যা একটু দেরি করে হয়।

পঞ্চম দিন (সোনমার্গ, জম্মু কাশ্মীর থেকে লে, লাদাখ)

রাতে সোনমার্গে দারুন ঠান্ডা ছিল। সকাল ছ'টায় ঠান্ডার মধ্যেই রাইড শুরু করলাম। সাতটার আগেই জোজিলা পাস এ চলে এলাম। জোজিলা পাস অতিক্রম করতেই আর্মি চেক পোস্ট চলে এলো, সেখানে আমার নাম, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর, বাইকের নম্বর সবকিছু রেজিস্টার করতে হলো। এখানেই জম্মু -কাশ্মীর ও লাদাখ রাজ্যের বর্ডার। ভারতের কেন্দ্র শাসিত রাজ্য লাদাখ এ আমার এন্ট্রি হলো। মূল লাদাখ ভ্রমনের সূচনা হলো এখান থেকেই।

সকাল নটায় পৃথিবীর দ্বিতীয় শীতলতম গ্রাম দ্রাস এ পৌছে প্রাতরাশ করে, বাইকে পেট্রল ভরে নিয়ে আবার চলা শুরু করলাম। চারিদিকের পাহাড়ি আলো-আঁধারী অপরূপ দৃশ্য দেখতে দেখতে সকাল সাড়ে নটায় কাৰ্গিল ওয়ার মেমোরিয়ালে এসে পৌছালাম। কার পার্কিং এ বাইক রেখে কাৰ্গিল ওয়ার মেমোরিয়ালের ভিতর প্রবেশ করলাম। এখানে ঢোকার জন্য কোন প্রবেশ মূল্য নেই, তাবে আপনি আপনার ইচ্ছেমতো দান করতে পারেন। এখান থেকে বেরোবার সময় প্রবেশ পথের মূল গেটের উপর লেখাটি খুব ভালো লাগলো তাই আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম এখানে … WHEN YOU GO HOME TELL THEM OF US AND SAY ‘FOR YOUR TOMORROW, WE GAVE OUR TODAY’.

আবার পথ চলা শুরু করলাম। দুপুর ১ টার সময় ১২,১৯৮ ফুট উচ্চতার নামিকলা (নামিকা লা) পাস এ পৌছালাম। লাদাখে চারিদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য এককথায় অসাধারণ। এখানকার পাহাড় গাছবিহীন। একেকটি পাহাড়ের রং একেকরকম এবং তার আকার আকৃতিও আলাদা আলাদা। দুপুর ২টো তে ফটুলা টপে যখন এলাম আকাশ মেঘলা করে ছিলো ও তার সাথে বেশ জোরে বাতাস বইছিল। বিকেল পাঁচটায় সিন্ধু ও জান্সকার নদীর সঙ্গমস্থল নিম্মুতে এসে মনটা ভরে গেল। লাদাখে আকাশের রং ঘন নীল। নিম্মু থেকে আরেকটু পথ এগোতেই ম্যাগনেটিক হিল এর দেখা পেলাম। অবশেষে ৩৪২ কিমি পথ পেরিয়ে বিকেল সাড়ে ছটায় লাদাখের রাজধানী লে শহরে এসে পৌছলাম। লে তে আমার দুদিনের রাত্রিবাস ছিল।

ষষ্ঠ দিন (লে, লাদাখ)

সকালে লে র হোটেলে ঘুম থেকে উঠে দেখি ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে, যা দেখে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করার পর, সকাল সাড়ে নটায় বাইক নিয়ে পুরো লে শহরটি ঘুরে দেখার জন্য বেড়িয়ে পড়লাম। প্রথমেই গেলাম লে শহর থেকে ১৯ কিমি দূরে থিকসে মনাস্ট্রিতে। সুবিশাল মনাস্ট্রি, রাস্তায় যেতে যেতে অনেক দূর থেকেই নজরে পড়বে। কার পার্কিং এ বাইক রেখে ৫০ টাকার প্রবেশ মূল্য দিয়ে টিকিট কেটে মনাস্ট্রিতে প্রবেশ করলাম। খুব সুন্দর মনাস্ট্রি, পুরোটা ঘুরে দেখতে বেশ কিছুটা সময় লাগলো। মনাস্ট্রির ছাদ থেকে চারিদিকের অপরূপ দৃশ্য ভোলার নয়। মনাস্ট্রির ভিতরে থাকা গৌতম বুদ্ধের বিশাল মূর্তি মনে প্রশান্তি এনে দেবে। থিকসে মনাস্ট্রি থেকে চলে এলাম ৬ কিমি আগের সে-প্যালেস এ। কিছুটা উপরে উঠতে হয়, বাইক নিয়ে উপরে প্যালেসের সামনে চলে গেলাম। এরপর কিছুটা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে প্যালেস ঘুরে দেখা। এখানেও প্যালেসের উপর থেকে চারিদিকের দৃশ্য খুব সুন্দর। এরপর চললাম ৪ কিমি আগের সিন্ধু নদীর তীরে, সিন্ধু ঘাটে। কল্লোলিত পাহাড়ি নদী সিন্ধুর কলরব মনোমুগ্ধকর। সিন্ধু ঘাট থেকে এবার চললাম ১৩ কিমি দূরে পাহাড়ের উপর শান্তি স্তুপা দেখতে। বাইক রেখে ৩০ টাকা প্রবেশ মূল্যের টিকিট কেটে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে চললাম শান্তি স্তুপার দিকে। ঘন নীল - সাদা আকাশের নিচে শান্তি স্তুপা ও তার চারপাশের প্রকৃতি নৈসর্গিক। শান্তি স্তুপা দেখে বাইক নিয়ে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচে নামা শুরু করলাম এবং বিকেল তিনটের সময় ‘হল অফ ফেম’ মিউজিয়ামে এসে পৌছালাম। এটি ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্বারা নির্মিত এবং রক্ষিত। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে প্রাণ হারানো সেনাদের স্মরণে এই মিউজিয়ামটি তৈরি করা হয়েছে। এখানে প্রবেশ মূল্য ২৫০ টাকা এবং মোবাইল এর জন্য ২০ টাকা এবং এই পুরো পেমেন্টটা করতে হবে ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডে , ক্যাশ চলবে না।

সপ্তম দিন (লে থেকে হুন্ডার, লাদাখ )

আজকেও সকালে লে র হোটেলে ঘুম থেকে উঠে দেখি ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু আজকে আর বৃষ্টির জন্য দেরি করা যাবে না, কারণ আজকে অনেকটা পথ যেতে হবে। অগত্যা সকাল ছটায় বেরিয়ে পড়লাম। রাস্তা বেশ ভেজা ছিল। যত এগোচ্ছিলাম পাহাড়ি রাস্তার চড়াই তত বাড়ছিলো, আর তার সাথে ঠান্ডা। সকাল সাতটায় যখন ‘সাউথ পুলু’ এসে পৌঁছালাম চারিদিকের পাহাড় সব বরফে সাদা হয়ে গেছে। সাউথ পুলুর চেক পোস্টে আমাকে আটকে দেয়া হলো, কারণ খারাপ আবহাওয়ার কারণে খারদুংলার দিকে যেতে দেয়া যাবে না। খারদুংলার দিকে তখন স্নো ফল হচ্ছিল। ঠিক এইসময় সাউথ পুলুর চেক পোস্টে আমরা তিনজন বাইক রাইডার ছাড়া আর কেউ ছিলনা, আমি ও মধ্যপ্রদেশ থেকে আসা দুজন । ঠান্ডার মধ্যে এক কাপ গরম চা ও গরম ম্যাগি খেয়ে নিলাম। আড়াই ঘন্টা অপেক্ষা করার পর সকাল সাড়ে নটায় অবশেষে আমাদের খারদুংলার দিকে যাওয়ার অনুমতি মিললো। পাহাড়ী আঁকাবাঁকা ভেজা রাস্তা ধরে ক্রমশ উপরের দিকে উঠতে লাগলাম। রাস্তার দুপাশ তাজা বরফে ঢেকে গেছে। পাহাড়ী চড়াই যে বাড়ছিলো সেটা বাইকের ইঞ্জিনের আওয়াজে টের পাচ্ছিলাম। উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাইকের গতি ক্রমশ কমে আসছিল ও তার সাথে চললো স্নো ফল। সম্ভাবত অধিক উচ্চতা আর অত্যন্ত ঠান্ডার কারণে আমার হেলমেটে লাগানো অ্যাকশন ক্যামেরা কাজ করা বন্ধ করে দিলো। ঠান্ডায় আমার দু হাত ও অবশ হয়ে আসছিলো। অবশেষে সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে সকাল দশটায় ১৭,৯৮২ ফুট উঁচু বরফে ঢাকা, বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মোটরগাড়ি চলার যোগ্য রাস্তা ‘খারদুংলা পাসে’ পৌঁছে গেলাম। কিছু সময় খারদুংলা টপে কাটিয়ে এবার নিচে নামতে শুরু করলাম। নর্থ পুলু হয়ে খালসারে পৌছাতে ঠান্ডার প্রকোপ অনেকটা কমে গেলো। রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সায়ক নদী। নুব্রা ভ্যালির ডিস্কিট হয়ে হুন্ডারে পৌছাতেই বালিয়াড়ির দেখা মিললো। পাহাড়ের নিচে সুদূর বিস্তৃত সাদা বালির অপূর্ব সুন্দর পাহাড়ি মরুভুমি। দুপুর দুটোর সময় হুন্ডারের হোটেলে পৌঁছে স্নান ও লাঞ্চ সেরে নিলাম। হুন্ডারে অনেক হোটেলেরই নিজস্ব বাগান ও চাষের জমি আছে। আমি হুন্ডারে যে হোটেলটিতে ছিলাম সেটিতে অনেকগুলি লাল ও সবুজ আপেল গাছ এবং বেশ কিছুটা জায়গা জুড়ে বিভিন্নরকম সবজির চাষ ছিল। হোটেলে আমার রুমের জানালার পাশেই একটি বরো লাল আপেল ভর্তি গাছ ছিল, যে গাছটি থেকে দুটি আপেল আমি খেয়েছিলাম। বিকেলে বাইক নিয়ে হুন্ডারের স্যান্ড ডিউনস ও দ্বি-কুজ যুক্ত উট দেখতে চলে গেলাম। ২৫০ টাকায় এখানে ক্যামেল রাইড করা যায়। পড়ন্ত বিকেলের সূর্যের আলোয় স্যান্ড ডিউনসের সৌন্দর্য অপরূপ। হুন্ডারে আমি দুদিন রাত্রিবাস করেছিলাম। এদিনের মোট রাইড ছিলো ১৩৮ কিমি।

অষ্টম দিন (হুন্ডার, তুরতুক, ত্যাগশী, থ্যাং; লাদাখ )

সকাল ছটার একটু আগে হুন্ডারের হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়লাম তুরতুক, ত্যাগশী হয়ে থ্যাং যাওয়ার জন্য। হুন্ডার থেকে দূরত্ব ৯৩ কিমি। ডিস্কিট -তুরতুক হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চললাম, রাস্তা খুবই ভালো। পুরো রাস্তায় সঙ্গী হলো সায়ক নদী, কখনো ডানদিকে কখনো বামদিকে। রাস্তায় একটি আর্মি চেক পোস্টে আমকে আমার ব্যক্তিগত বিবরণ সব লিপিবদ্ধ করতে হলো এবং এর ঠিক পাশেই আর্মির একটি ক্যান্টিন ছিল, যেখানে আজকার প্রাতরাশ সেরে নিলাম । থোয়সে, বোগঢ্যাং হয়ে তুরতুকের ৫ কিমি আগে রাস্তার বামদিকে একটি খুব সুন্দর পাহাড়ি ঝর্ণা পেলাম। ঝর্ণার জল পাহাড় থেকে নেমে সায়ক নদীতে মিশেছে। সকাল সাড়ে নটায় তুরতুক পৌঁছে গেলাম। তুরতুকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য অসাধারণ। ১৯৭১ সালের আগে পর্যন্ত তুরতুক পাক অধিকৃত কাশ্মীরের অংশ ছিলো। ত্যাগশীতে এসে আর্মি চেক পোস্টে আমকে আবার আমার ব্যক্তিগত বিবরণ সব লিপিবদ্ধ করতে হলো এবং যেকোনো একটি পরিচয়পত্র হিসাবে আধার কার্ড জমা করতে হলো। এরপর আমার থ্যাং ভিলেজে যাবার অনুমতি মিললো। থ্যাং ভিলেজ হলো ভারত ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে মধ্যে বর্ডারের শেষ গ্রাম। মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে, পাকিস্তানের দিক থেকে শেষ গ্রাম এবং তাদের সেনাবাহিনীর বাঙ্কার দেখতে পাওয়া যায়। স্থানীয় মানুষেরা স্থানীয় আখরোট, শুকনো এপ্রিকট এবং এপ্রিকটের শাঁস বিক্রির জন্য স্টলও স্থাপন করেছেন। থ্যাং ভিলেজের প্রাকৃতিক দৃশ্য অসাধারণ।

এবার ফেরার পালা, ফেরার পথে আর্মি চেক পোস্ট থেকে আমার জমা রাখা আধার কার্ড নিয়ে হুন্ডারে ফেরার পথ ধরলাম। দুপুর আড়াইটে নাগাদ হুন্ডারের হোটেলে পৌঁছে লাঞ্চ সেরে একটু বিশ্রাম করেনিলাম। বিকেল সাড়ে চারটের সময় আবার বেড়িয়ে পড়লাম ডিস্কিট মনাস্ট্রির উদ্দেশ্যে। ৩০ টাকার টিকিট কেটে বাইক নিয়ে পাহাড়ের উপর অবস্থিত ডিস্কিট মনাস্ট্রির কাছে পৌঁছলাম। এবার কিছুটা পায়ে হেটে মূল মনাস্ট্রিতে চলে এলাম। মূল আকর্ষণ গৌতম বুদ্ধের বিশাল মূর্তি। মনাস্ট্রির উপর থেকে চারিদিকের দৃশ্য ভোলার নয়। এরপর সোজা চলে এলাম ডিস্কিট পেট্রল পাম্পে, বাইকে ফুল ট্যাংক পেট্রল ভরে নিলাম এবং সাথে কিছু অতিরিক্ত পেট্রল নিয়ে নিলাম। কারণ আগামীকাল থেকে আমি লাদাখের যে যে জায়গাগুলোতে যাবো সেখানে কোনো পেট্রল পাম্প নেই। এদিনের মোট যাত্রাপথ ছিলো ২২৩ কিমি।

নবম দিন (হুন্ডার থেকে প্যাংগং লেক, লাদাখ )

ভোর ৫:৪৫ এ হুন্ডার থেকে প্যাংগং লেকের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ডিস্কিট হয়ে খালসারে পৌছে আগম - সায়ক রিভার রোড ধরে সায়ক নদীকে বামদিকে নিয়ে চলতে থাকলাম। সকাল আটটায় আগমে এসে প্রাতরাশ সেরে নিলাম। আগম পর্যন্ত রাস্তা মোটামুটি ভালোই ছিলো। কিন্তু এর পরেই শুরু হলো সেই চূড়ান্ত খারাপ রাস্তা বা অফরোডিং। চলার গতি অত্যন্ত মন্থর হয়ে গেলো। বাইককে নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হতে লাগলো। অনেকগুলো ওয়াটার ক্রসিং কে পার হতে হলো এই রাস্তায়। তাই আগে থেকেই পায়ে গামবুট পরে নিয়েছিলাম। সায়ক ভিলেজ, দুর্বুক হয়ে ট্যাংস্টেতে পৌছালাম।

ট্যাংস্টে থেকে বামদিকের প্যাংগং লেক রোড ধরলাম। ফার্স্ট ভিউ অফ প্যাংগং লেক বলে একটি জায়গায় এসে প্রথম একচিলতে নীলাম্বরী প্যাংগং লেকের দেখা মিললো। দুপুর ১২ টার সময় লুকুং এ এসে পুরো প্যাংগং লেকের দর্শন পেলাম। উপরে সাদা মেঘের সাথে নীল আকাশ, চারিধারে বরফ আচ্ছাদিত পাহাড় আর তার মাঝে ঘন নীলবসনা প্যাংগং লেক। প্রকৃতির উজাড় করা রূপের ছ টায় অফরোডিং এর কষ্ট মুহূর্তে ভুলিয়ে দিলো। এমন রূপ দেখার জন্য হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে বাইক চালিয়ে আসা যায়। লুকুং থেকে প্যাংগং রোড ধরে স্প্যাগমিক, মান ভিলেজ হয়ে প্যাংগং লেককে বামদিকে সঙ্গে নিয়ে মিরাক ভিলেজে যখন পৌছালাম তখন দুপর দুটো বাজে। লুকুং থেকে প্যাংগংয়ে আসতে এতটা সময় লাগলো তার কারণ নীলবসনা রূপসী রাস্তায় আমাকে বার বার দাঁড়াতে বাধ্য করছিল। মিরাক ভিলেজে, প্যাংগং লেকের ধারে একটি হোমস্টেতে আজকের রাত্রিবাসের জন্য আস্তানা গাড়লাম। দুপুরের খাওয়া সেরে আজকে আর বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করলো না। সোজা চলে গেলাম প্যাংগং লেকের পাড়ে। প্যাংগং লেকর পার দিয়ে পায়ে হেটে পুরো বিকেলটা কাটিয়ে দিলাম। প্যাংগং লেকের হোমস্টে গুলিতে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে। তাই তাড়াতাড়ি আমার মোবাইল ও ক্যামেরা গুলিকে চার্জে বসিয়ে দিলাম। সন্ধ্যা হতেই আকাশে চাঁদ উঠল। প্যাংগং লেকের রূপ তখন অন্যরকম। আজকের যাত্রাপথ ছিলো ১৯৮ কিমি দীর্ঘ ও চূড়ান্ত অফরোডিংএ ভরা ।

দশম দিন (প্যাংগং লেক থেকে হানলে, লাদাখ )

সকালে হোমস্টেতে ব্রেকফাস্ট করে, সাড়ে ছটার সময় হানলের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লাম। নতুন টারম্যাক রোড তৈরি হচ্ছে সেই রাস্তা ধরে প্যাংগং লেক কে বামদিকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চললাম। সকালে প্যাংগং লেকের জলের রং ততোটা নীল নয়। সকাল আটটার সময় চুশূলে পৌছালাম। প্যাংগং লেক তার গতিপথ ঘুরিয়ে চীনের মধ্যে চলে গেলো । এখান থেকে চীনের বর্ডার খুব কাছে। চুশূল থেকে হানলে যাবার দুটি রাস্তা আছে। একটি রেজাঙলা হয়ে যেটি পুরোটাই অফরোডিং এবং ওয়াটার ক্রসিং আছে। আরেকটি কাকসাংলা হয়ে যেটা পুরোটাই পাহাড়ি চড়াই উৎরাই আর অসংখ্য জিগ জ্যাগ কার্ভ এ

ভরা ও আগেরটি থেকে ৪৫ কিমি অধিক রাস্তা। আমি কাকসাংলা হয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। পাহাড়ি চড়াই রাস্তা বেয়ে অসংখ্য হেয়ার পিন ব্যান্ড কার্ভ পেরিয়ে পাহাড়ের বুকে একটি সুন্দর লেকের দেখা পেলাম যার নাম মীরপাল লেক। সকাল ১০টার সময় ১৭,৮৫১ ফুট উঁচু কাকসাংলা টপে হাজির হলাম।



চারিদিকে পাহাড়ের মাথাগুলো সাদা বরফে ঢাকা। এখানে ভীষণ জোরে বাতাস বইছিল আর তার সাথে ঠাণ্ডাও বেশ লাগছিল তাই আর বেশিক্ষন দাড়ালাম না। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। মাহেতে পৌছে এক প্লেট ম্যাগি আর এক কাপ গরম চা খেয়ে নিলাম। মাহে থেকে লেফট টার্ন নিয়ে নিয়মার দিকে এগিয়ে চললাম। এখানে কোনো পেট্রল পাম্প না থাকায় নিয়মাতে এসে একটি স্থানীয় দোকান থেকে পেট্রল কিনে বাইকে ফুল ট্যাংঙ্ক করে নিলাম ও সাথে কিছুটা অতিরিক্ত পেট্রলও নিয়ে নিলাম। নিয়মা থেকে লোমাতে এসে পৌঁছালাম। এই রাস্তার দুপাশের প্রাকৃতিক শোভা ভীষণ সুন্দর, রাস্তার ডানপাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সিন্ধু নদী। লোমা চেক পোস্টে আমার সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য নথিবদ্ধ করতে হলো আর তার সাথে লে তে, লাদাখ ঘোরার জন্য যে অনলাইন পার্মিট করেছিলাম সেটাও দেখতে হলো। মাহে থেকে লোমা পর্যন্ত রাস্তা ভীষণ ভালো। লোমা থেকে আমার ডানদিকে হানলে নদীকে সঙ্গে নিয়ে অপূর্ব সুন্দর পথশোভা দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। দুপুর আড়াইটে নাগাদ হানলেতে এসে পৌছালাম ও রাত্রিবাসের জন্য একটি হোমস্টেতে আশ্রয় নিলাম। লাঞ্চ সেরে একটু বিশ্রাম নেবার পর হানলের কিছু জায়গা ঘুরে দেখবো বলে হোমস্টে থেকে বাইরে এসে দেখি আবহাওয়া ভীষণ খারাপ, প্রবল জোরে বাতাস বইছে, চারিদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে এবং তার সাথে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। সিদ্ধান্ত পাল্টে হোমস্টেতে থেকে গেলাম। সন্ধ্যাবেলায় আমার হোমস্টেতে মহারাষ্ট্র থেকে আসা দুটি ছেলের সাথে পরিচয় হলো যারা আগামী কাল উমলিঙ্গলা যাবে। রাতের দিকে আকাশ একটু পরিস্কার হওয়াতে হানলের রাতের আকাশে সেই বিখ্যাত মিল্কি ওয়ের দেখা পেলাম।

একাদশ তম দিন (হানলে, উমলিঙ্গলা; লাদাখ )

ভোর পাঁচটায় উঠে দেখি আকাশ মেঘ ও কুয়াশায় ছেয়ে আছে। অপেক্ষা করতে থাকলাম। সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ সূর্যের আলোর দেখা পেতেই উমলিঙ্গলার পথে বেরিয়ে পড়লাম। উমলিঙ্গলা যাওয়ার যে শর্টকাট রাস্তাটি আছে সেটি নিলাম। এপথে যেমন অফরোডিং তেমন চড়াই। রাস্তার অবস্থা বেহাল। চড়াই উৎরাই পেরিয়ে নুরবুলা টপ এর কাছাকাছি এসে ভালো টারম্যাক রোডের দেখা মিললো। এখানে এসে কিছুটা তুষারপাত পেলাম। নেরবোলে হয়ে চিসুমলে থেকে ডানদিকে চিসুমলে ব্রিজ পেরিয়ে কিছুটা যাওয়ার পর থেকে স্নো ফল শুরু হলো। রাস্তা ভেজা, রাস্তার দুপাশ তুষারের চাদরে ঢাকা। চারিদিকের পাহাড়গুলি বরফে ঢেকে পুরো সাদা হয়ে আছে। আকাশ মেঘলা হয়েছিল, সূর্যের আলোর দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না।

অনবরত তুষারপাত হতে থাকায় হেলমেটর ভাইসর ঝাপসা হয়ে আসছিলো, দেখতে অসুবিধা হওয়ায় অগত্যা প্রবল ঠান্ডার মধ্যে বাধ্য হয়ে হেলমেটের ভাইসর খুলে নিয়েই বাইক চালাতে থাকলাম। তুষার আমার চোখে মুখে থেকে শুরু করে সারা গায়ে পড়ছিলো। তুষার হেলমেটের ভাইসরের উপর ক্রমাগত পড়তে থাকায় একটা বিরামহীন টুং টাং শব্দ হতে থাকলো। প্যাঁচালো রাস্তার প্রতিটি প্যাঁচ বেয়ে উপরের দিকে ওঠা আর তার দরুন উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বাইক ক্রমশ তার শক্তি হারিয়ে ধীর গতির হতে থাকলো। রাস্তায় যেতে বাম দিকে একটি বোর্ডের লেখা চোখে পড়লো, “ YOU ARE AT EVEREST BASE CAMP HEIGHT” অর্থাৎ আমি এখন এভারেস্ট পাহাড়ের বেস ক্যাম্পের উচ্চতায় আছি। মনের ভিতর একটা অন্যরকম অনুভুতি খেলে গেলো।

চলতে চলতে অবশেষে সকাল সাড়ে দশটার সময় বিশ্বের সর্বোচ্চ মোটরেবল পাস; ১৯,০২৪ ফুট উচ্চতার উমলিঙ্গলাতে পৌঁছে গেলাম। অনবরত তুষারপাত হয়ে চলায় চারিদিকে শুধু বরফ আর বরফ। বিশ্বের সর্বোচ্চ মোটরেবল পাসে একাকী আসতে পারার আনন্দে মন ভরে রইলো। এবার ফেরার পালা। অনেকটা নিচে নেমে আসার পর তুষারপাত বন্ধ হলো। দুপুর ১২ টা নাগাদ যখন ১৭,৩২৮ ফুট উচ্চতার নূরবুলা টপে পৌছালাম তখন আবার তুষারপাত পেলাম।

বেশ কিছুটা ভালো টারম্যাক রোড পাওয়ার পারে আবার অফরোডিং শুরু হলো। দুপুর দেরটাতে হানলের হোমস্টেতে ফিরলাম। উমলিঙ্গলা যাওয়া এবং ফিরে আসা দিয়ে মোট ১৫৩ কিমি রাইড হলো। দুপুরের খাওয়া দাওয়া সেরে ও একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেল তিনটের সময় হানলের অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরি দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। পাহাড়ের গা বেয়ে আস্তে আস্তে উপরে উঠতে লাগলাম। পাহাড়ের মাথায় অবস্থিত অবজারভেটরির সামনে যখন এসে দাড়ালাম পড়ন্ত বিকেলের রৌদ্রে উপর থেকে পুরো হানলে গ্রামটিকে দেখা যাচ্ছিলো। অবজারভেটরি দর্শন সেড়ে এগিয়ে চললাম হানলে মনাস্ট্রির উদ্দ্যেশে। এটিও একটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত। পাহাড়ের উপরে হানলে মনাস্ট্রিতে এসে দেখলাম এখান থেকেও পুরো হানলে গ্রামটিকে দেখা যাচ্ছে। এবার হোমস্টেতে ফেরার পালা। এইদিনও হানলের রাতের আকাশে মিল্কি ওয়ের দেখা মিললো; অপূর্ব সুন্দর শোভা তার।

দ্বাদশ তম দিন (হানলে থেকে সোমোরিরি লেক; কারজোক, লাদাখ) :

সকাল সাড়ে পাঁচটার সময় হোমস্টের বাইরে এসে দেখি, বাইকের সিট, টপ বক্সের উপর বরফের লেয়ার জমে আছে। বাইকের সিটের উপর আঙ্গুল দিয়ে একটু লেখা লেখি করলাম। হোমস্টে থেকে খানিকটা গরম জল এনে বাইকের বরফের লেয়ার পরিস্কার করে নিয়ে সকাল ৬:২৫ এ আজকের রাইড শুরু করলাম। সিন্দু নদী পেরিয়ে লোমা চেক পোস্টে এসে ওখানে জানাতে হলো যে আমি হানলে থেকে চলে যাচ্ছি, চেক পোস্টে সেটা নোট করে নিলো। লোমা থেকে নিয়মার দিকে যখন এগোচ্ছি আকাশে একটি বরো এরোপ্লেন দেখতে পেলাম। প্রথমে যাত্রীবাহী এরোপ্লেন ভেবেছিলাম, কিন্তু কিছুক্ষন পরে দেখি ওই এরোপ্লেন থেকে প্যারাট্রুপিং হচ্ছে। আর্মির জওয়ানেরা এরোপ্লেন থেকে প্যারাশুট নিয়ে পাহাড়ের মাথায় নেমে আসছে। সকাল পৌনে নটার সময় মাহে তে এসে ম্যাগি ও এক কাপ চা খেয়ে নিলাম। মাহেতে বিহার রেজিমেন্টের একজন আর্মি অফিসারের সাথে পরিচয় হলো। অনেকক্ষন ওনার সাথে কথা হলো। উনি আমার রাইড সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চাইলেন। উনি খুশি হয়ে আমাকে এক বোতল ফ্রুট জুস উপহার দিয়েছিলেন। মাহের পর থেকে রাস্তার অবস্থা খারাপ হতে শুরু করলো। কিছুটা যাওয়ার পর বামদিকে টার্ন নিয়ে সিন্ধু নদীর উপর নির্মিত মাহে ব্রিজ পেরিয়ে ভীষণ বাজে অফরোড শুরু হলো। একটা বড় ওয়াটার ক্রসিং পেরোতে গিয়ে মাঝখানে জলের মধ্যে বাইক আটকে গেল। দুপা নামিয়ে জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়লাম, পায়ে গামবুট থাকায় পা ও প্যান্ট ভেজে নি । পাশেই ওয়াটার ক্রসিঙের উপর নির্মীয়মান কালভার্ট এ কর্মরত ‘বি-আর-ও’ এর একজন কর্মীর সাহায্য চাইলাম। সে এসে আমার বাইকে ধাক্কা দিয়ে ওয়াটার ক্রসিং পার হতে সাহায্য করলো। রাস্তার অবস্থা ভীষণ খারাপ হওয়ায় বাইকের গতি ভীষণ মন্থর হয়ে পড়লো। সুমডোতে এসে বামদিকের রাস্তা নিলাম।

ক্যাগার লা, পাস পেরিয়ে সকাল ১১:১৫ তে ক্যাগার লেক এ হাজির হলাম। দারুন সুন্দর একটি লেক। দিগন্ত বিস্তৃত নির্জনতা, স্বেতশুভ্র পাহাড়, বিস্তীর্ণ বালুরাশি আর তার মাঝে নিলাভো লেকের রূপ মোহিত করে দিলো। আবিষ্ট হয়ে বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে রইলাম। আবেশের রেশ কিছুক্ষন চলার পর বাইকের একটা অদ্ভুত শব্দে ভাঙলো। বাইক থেকে নেমে দেখি বাইকের সাইড টুল বক্সের একটি নাট-বোল্ট ভেঙে, বক্স ঝুলে আছে, আর তার থেকেই শব্দ হচ্ছে। টুল বক্সের নাট-বোল্ট যেভাবে ভেঙেছে সেটা এই মুহূর্তে ঠিক করা সম্ভব নয় বুঝে, দড়ি দিয়ে বেঁধে নিলাম। বাইকের দিকে আরেকটু খেয়াল করতেই, চোখে পড়লো টপ বক্সের ক্লামসহ একটি নাট-বোল্ট খুলে পড়ে গেছে। চূড়ান্ত অফরোডিংয়ের জন্য বাইকে যে ভাইব্রেশন হচ্ছিলো তার জন্যই এসব ঘটনা ঘটেছে।

আমার হাতেও ভীষণ ব্যাথা করছিলো। আরো কিছুটা পথ চলার পর কার্যকে এসে গেলাম। এখান থেকে দূরে সোমোরিরি লেক দেখা যাচ্ছিলো। এখানে বামদিকে ৭০ কিমি দীর্ঘ কার্যক থেকে চুমুর যাওয়ার একটি রাস্তা আছে দেখলাম। গুগল ম্যাপ অনুযায়ী এই রাস্তা দিয়ে কার্যক থেকে হানলে যাওয়া যায়। চলতে চলতে দুপুর ১২:৪০ এ সোমোরিরি লেকের একদম কাছে চলে এলাম। সুবিশাল নীল জলরাশির লেক সোমোরিরি। একবার দেখলে ভালো না বেসে থাকার উপায় নেই। রাত্রিবাসের জন্য সোমোরিরি লেকের একদম পাশে একটি হোমস্টেতে আশ্রয় নিলাম। হোমস্টেতে দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরে ও একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বাইক নিয়ে সোমোরিরি লেকের চারিপাশ ঘুরে দেখার জন্য বেরিয়ে পড়লাম। আজকের যাত্রাপথ ছিলো ১৫৫ কিমি দীর্ঘ ও চূড়ান্ত অফরোডিং এর।

এয়োদশ তম দিন (সোমোরিরি লেক, কারজোক থেকে সারচু, লাদাখ) :

প্রতিদিনের ন্যায় ভোরে উঠে প্রস্তুত হয়েও আজকের দিনের রাইড, বৃষ্টির জন্য শুরু করতে পারলাম না। বৃষ্টি ও খারাপ রাস্তার কথা ভেবে যাত্রা শুরু করতে দেরি হলো। প্রাতরাশ সেরে নিলাম হোমস্টেতেই। বৃষ্টি কমতেই সকাল ৭:১৮ তে যাত্রা শুরু করলাম। ভীষণ ধীরে ধীরে বাইক চালাতে হচ্ছিল। এতো সকালে সোমোরিরি লেকের জল আর ততটা নীল নেই। সোমোরিরি লেককে পিছনে রেখে এগিয়ে চললাম। সুমডোতে এসে বামদিকের রাস্তা নিলাম পূগার দিকে। প্রথমে কিছুটা ভালো রাস্তা পেলেও তারপরেই আবার শুরু হলো অফরোডিং। রাস্তার বিভিন্ন অংশে রাস্তা মেরামতের কাজ হতে দেখলাম। রাস্তায় বিপরীত দিক থেকে কোনো গাড়ি আসতে দেখলেই, তার ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করছিলাম ভালো রাস্তা কখন পাওয়া যাবে। পোলোগংকালা পাস পেরিয়ে বামদিকে একটি ছোট্ট নীল জলের লেক স্টার্টসাপুক দেখতে পেলাম। এখান থেকে কিছুটা এগোতেই দেখা মিললো সকার লেকের। ভীষণ সুন্দর একটি লেক পাহাড়ি নির্জনতার মাঝে স্বমহিমায় বিরাজমান। সকার লেকের অনতিদূরে ‘থুকযেতে’ রাত্রিবাসের জন্য কিছু হোমস্টে ও টেন্ট মিলবে। এখানে আমি একটু চাপানের বিরতি নিলাম। কেরালা থেকে আসা চারজন রাইডারের সাথে এখানে পরিচয় হলো, ওনারাও মানালির দিকে যাবেন। আলাপচারিতা সেরে আবার চলতে শুরু করলাম এবং চলতে চলতে ডেবরিং এ এসে লে মানালী হাইওয়েতে উঠে পড়লাম। বামদিকে বাইক ঘুরিয়ে লে মানালী হাইওয়েতে মানালীর দিকে চলতে শুরু করলাম। মোরে প্লেইন্স পর্যন্ত দারুন সুন্দর রাস্তা। পাং থেকে রাস্তা খারাপ হতে শুরু করলো। পাং এর খাবারের দোকান গুলিতে অনেক রাইডারদের ভিড় দেখতে পেলাম। পাং থেকে বেশ কিছুটা রাস্তা যাওয়ার পর রাস্তায় গাড়ির জ্যাম শুরু হলো। বার বার জ্যামে আটকে পড়ছিলাম।

লাচুং লা থেকে হুইস্কি নালা হয়ে নাকিলা পাসে পৌছালাম। রাস্তায় গাড়ির জ্যাম যেন পিছু ছাড়ার নাম নিচ্ছিল না। গাটা লুপস এর অসংখ্য হেয়ার পিন বেন্ড রাস্তা ধরে নিচে নামতেই, ডানপাশে সারাপ নদী আমার পথের সাথী হলো। বিকেল সাড়ে চারটের সময় সারচুতে এসে একটি রেস্টুরেন্টের সামনে দাড়ালাম। রাস্তায় গাড়ির জ্যামের জন্য আজকে আর লাঞ্চ করা হয় নি। বিকেল পাঁচটার সময় লাঞ্চ সেড়ে আজ আর না এগিয়ে সারচুতে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আজকের রাইড ছিলো ২১৫ কিমির। সারচুর প্রাকৃতিক শোভা খুবই সুন্দর। আমার প্রিপেইড মোবাইল সিম যেটি পাঠানকোট পেরোবার পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো সেটি সারচুতে আবার চালু হয়ে গেল। সারচুতে সোলার ব্যাটারির নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থা যা সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চালু থাকে। সারচু লাদাখ ও হিমাচল প্রদেশের বর্ডার এবং লাদাখের শেষ গ্রাম। সারচুতে রাতে বেশ ঠান্ডা ছিল।

চতুর্দশ তম দিন (সারচু, লাদাখ থেকে বিলাসপুর, হিমাচল প্রদেশে)

সকাল পাঁচটার সময় রুমের বাইরে এসে দেখি, হানলের মতো বাইকের সিট, টপ বক্সের উপর বরফের লেয়ার জমে আছে। বাইকের সিটের উপর আঙ্গুল দিয়ে একটু লেখা লেখি করলাম। ব্রেকফাস্ট সেরে সকাল ৬:৩০ এ রাইড স্টার্ট করলাম। একটু এগোতেই চেকপোস্ট পড়লো যেখানে আমাকে সবকিছু এন্ট্রি করতে হলো। চেকপোস্ট হয়ে সারচু ব্রিজ পার হতেই আমি লাদাখে ছেড়ে হিমাচল প্রদেশে চলে এলাম। আমার বাইকে একাকী লাদাখ ভ্রমণের পরিসমাপ্তি হলো। এবার মানালি হয়ে বাড়ি ফেরার পালা। সারচু থেকে মানালির দিকে লেঃ-মানালী হাইওয়েতে অনেকগুলো বাজে ওয়াটার ক্রসিং আছে।

ভরতপুর টেন্ট কলোনী হয়ে; ১৫,৯১০ ফুট উচ্চতার ‘বারালাচ লা’ পাস্ পেরিয়ে সুরাজ তাল লেকের পাশে এসে দাঁড়ালাম। সকালবেলার সূর্যের আলোয় লেকটি দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। জিং জিং বার পেরিয়ে রাস্তার ডানপাশে একটি ছোট লেক ‘দীপক তাল’ দেখতে পেলাম। এখান থেকে একটু এগোতেই পাহাড়ের গায়ে একটি ঝর্ণা দেখতে পেলাম যেটি ঠান্ডায় পুরো জমে গেছে। দারচা থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে সিঙ্কুলা পাস হয়ে জান্সকার ভ্যালির দিকে। লেঃ-মানালী হাইওয়ে ধরে জিসপা, গেমুর, কেলং হয়ে টান্ডিতে এসে হাজির হলাম। টান্ডি পেট্রল পাম্প থেকে বাইকের ফুল ট্যাংক পেট্রল ভরে নিলাম। ভাগা নদীর উপর টান্ডি ব্রিজ পেরিয়ে ডানপাশে ভাগা ও চেনাব নদীর সঙ্গমস্থল দেখতে পাওয়া যায়। লেঃ-মানালী হাইওয়ের ডানপাশে চেনাব নদীকে সাথে নিয়ে সিসু হয়ে টেলিং এ এসে ডানদিকের রাস্তায় এগোতেই অটল টানেলের নর্থ পোর্টালের মুখো মুখি হলাম, ঘড়িতে তখন সকাল ১১ টা। ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ অটল টানেল ১০,০০০ ফুট উপরে অবস্থিত বিশ্বের দীর্ঘতম সুড়ঙ্গ যা লেঃ-মানালী হাইওয়েতে যাতায়াত ব্যবস্থাকে অনেকটাই সুগম করেছে। তাই এখন আর রোহটাং পাস হয়ে মানালির দিকে যাওয়ার দরকার নেই। এক অনন্য সুন্দর অভিজ্ঞাতা নিয়ে অটল টানেলের মধ্যে দিয়ে বাইক চালিয়ে অটল টানেলর সাউথ পোর্টাল দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ধুন্ডি ব্রিজ পার হতেই আমার বামপাশে পেলাম রূপসী, চঞ্চল বিপাশা নদীকে। পথ চলার ক্লান্তি কিছুটা কমিয়ে দিল বিপাশা। সোলাং ভ্যালিতে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে প্যারাগ্লাইডিং দেখলাম । দুপুর সাড়ে বারোটায় মানালি তে এসে পৌছালাম। মানালি থেকে কুলু আসার পথে রাস্তার পাশে অনেক আপেল বিক্রির ষ্টল এবং প্যারাগ্লাইডিং, রাফটিং সহ অন্যান্য অ্যাক্টিভিটির টিকেট বুকিং অফিস দেখা গেলো । কুলুতে গায়ের শাল তৈরির অনেক কারখানা ও বিক্রির দোকান আছে। কুলুতে এসে গায়ের শীতের সব পোশাক খুলে নিলাম কারণ ঠান্ডা আর একদমই ছিল না। কুলুর একটি রেস্তোরায় লাঞ্চ সেরে নিলাম। চলতে চলতে হিমাচল প্রদেশের মান্ডিতে এসে গেলাম। এবার বিপাশা কে বিদায় জানানোর পালা, এই পুরো রাস্তায় বিপাশা আমার সঙ্গে ছিল। সুন্দর নগর, বারটি হয়ে বিকেল ছটার সময় হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুরে এসে পাহাড়ের কোলে, শতদ্রু নদীর পাশে রাত্রিবাসের জন্য একটি হোটেল নিলাম । আজকের যাত্রাপথ ছিলো ৩৪৭ কিমি দীর্ঘ ।

ভরতপুর টেন্ট কলোনী হয়ে; ১৫,৯১০ ফুট উচ্চতার ‘বারালাচ লা’ পাস্ পেরিয়ে সুরাজ তাল লেকের পাশে এসে দাঁড়ালাম । সকালবেলার সূর্যের আলোয় লেকটি দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। জিং জিং বার পেরিয়ে রাস্তার ডানপাশে একটি ছোট লেক ‘দীপক তাল’ দেখতে পেলাম। এখান থেকে একটু এগোতেই পাহাড়ের গায়ে একটি ঝর্ণা দেখতে পেলাম যেটি ঠান্ডায় পুরো জমে গেছে। দারচা থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে সিঙ্কুলা পাস হয়ে জান্সকার ভ্যালির দিকে। লেঃ-মানালী হাইওয়ে ধরে জিসপা, গেমুর, কেলং হয়ে টান্ডিতে এসে হাজির হলাম। টান্ডি পেট্রল পাম্প থেকে বাইকের ফুল ট্যাংক পেট্রল ভরে নিলাম । ভাগা নদীর উপর টান্ডি ব্রিজ পেরিয়ে ডানপাশে ভাগা ও চেনাব নদীর সঙ্গমস্থল দেখতে পাওয়া যায়। লেঃ-মানালী হাইওয়ের ডানপাশে চেনাব নদীকে সাথে নিয়ে সিসু হয়ে টেলিং এ এসে ডানদিকের রাস্তায় এগোতেই অটল টানেলের নর্থ পোর্টালের মুখো মুখি হলাম, ঘড়িতে তখন সকাল ১১ টা। ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ অটল টানেল ১০,০০০ ফুট উপরে অবস্থিত বিশ্বের দীর্ঘতম সুড়ঙ্গ যা লেঃ-মানালী হাইওয়েতে যাতায়াত ব্যবস্থাকে অনেকটাই সুগম করেছে। তাই এখন আর রোহটাং পাস হয়ে মানালির দিকে যাওয়ার দরকার নেই। এক অনন্য সুন্দর অভিজ্ঞাতা নিয়ে অটল টানেলের মধ্যে দিয়ে বাইক চালিয়ে অটল টানেলর সাউথ পোর্টাল দিয়ে বেরিয়ে এলাম। ধুন্ডি ব্রিজ পার হতেই আমার বামপাশে পেলাম রূপসী, চঞ্চল বিপাশা নদীকে। পথ চলার ক্লান্তি কিছুটা কমিয়ে দিল বিপাশা। সোলাং ভ্যালিতে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে প্যারাগ্লাইডিং দেখলাম। দুপুর সাড়ে বারোটায় মানালি তে এসে পৌছালাম। মানালি থেকে কুলু আসার পথে রাস্তার পাশে অনেক আপেল বিক্রির ষ্টল এবং প্যারাগ্লাইডিং, রাফটিং সহ অন্যান্য অ্যাক্টিভিটির টিকেট বুকিং অফিস দেখা গেলো। কুলুতে গায়ের শাল তৈরির অনেক কারখানা ও বিক্রির দোকান আছে। কুলুতে এসে গায়ের শীতের সব পোশাক খুলে নিলাম কারণ ঠান্ডা আর একদমি ছিল না। কুলুর একটি রেস্তোরায় লাঞ্চ সেরে নিলাম। চলতে চলতে হিমাচল প্রদেশের মান্ডিতে এসে গেলাম। এবার বিপাশা কে বিদায় জানানোর পালা, এই পুরো রাস্তায় বিপাশা আমার সঙ্গে ছিল। সুন্দর নগর, বারটি হয়ে বিকেল ছটার সময় হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুরে এসে পাহাড়ের কোলে, শতদ্রু নদীর পাশে রাত্রিবাসের জন্য একটি হোটেল নিলাম। আজকের যাত্রাপথ ছিলো ৩৪৭ কিমি দীর্ঘ ।

পঞ্চদশ তম দিন (আগ্রা থেকে বেনারস, উত্তর প্রদেশ)

এই দিনটা ছিলো আমার বৃষ্টিতে ভেজার দিন। সকাল ৫:২৫ এ রাইড শুরু করলাম। এতো সকালেও দেখলাম আগ্রার বিখ্যাত পেঠা মিষ্টির দোকান গুলো সব খোলা আছে। ২০০ থেকে ৪০০ টাকা কেজি দরে পেঠা মিষ্টি বিক্রি হচ্ছিল দোকানে, বাড়ির জন্য কিছুটা কিনে নিলাম। ‘আগ্রা ইনার রিং রোড’ হয়ে ৮৫ টাকার টোল ফিস দিয়ে ‘আগ্রা লখনউ এক্সপ্রেসওয়ে’ ধরলাম। বেশ ভালোই যাচ্ছিলাম। বাধ সাধলো বৃষ্টি। ‘আগ্রা লখনউ এক্সপ্রেসওয়েতে’ বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য দাড়াবার মতো কোনো জায়গা নেই। অনেকটাই ভিজে গেলাম। অগত্যা রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়েই রেইন কোট পরে নিতে হলো। বেশ কিছুটা চলার পর বৃষ্টি বন্ধ হলে, বাইক থামিয়ে রেইন কোট খুলে নিলাম। ‘আগ্রা লখনউ এক্সপ্রেসওয়ে’ থেকে বেরিয়ে, ন্যাশনাল হাইওয়ে-১৯ ধরে ইটাওয়া হয়ে অরাইয়া তে এসে ব্রেকফাস্ট করলাম। আকাশ মেঘলা ছিল তাই রোদের তাপের কষ্টটা ছিলো না। কানপুর, ফতেহপুর, পার করে এলাহাবাদে প্রচন্ড বৃষ্টির মধ্যে পড়ে গেলাম। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য একটি পেট্রল পাম্পে আশ্রয় নিলাম। এক ঘন্টার কিছু বেশি সময় ঠায় বসে থাকতে হলো। ঘড়ির কাঁটা ২ টো পেরিয়ে গেছে কিন্তু আজকের লাঞ্চ তখন করা হয় নি। বৃষ্টি বন্ধ হতেই আবার চলতে শুরু করলাম। উত্তর প্রদেশে ন্যাশনাল হাইওয়ে-১৯ এর দুপাশ জুড়ে সারা রাস্তায় প্রচুর কাশ ফুল ফুটেছে দেখলাম। সামনেই দূর্গা পূজা ছিল, এটি তারই আগমনী বার্তা। বিকেল চারটের সময় আজকের লাঞ্চ হল। ৫৯০ কিমির রাইড সেরে, বৃষ্টিতে ভিজে বিকেল ৫:৪০ এ বারানসির হোটেলে পৌছালাম। হোটেলের রুমে ঢুকে ফ্যান চালিয়ে আমার ভেজা জামা কাপড় গুলো সব শুকোতে দিলাম। সন্ধ্যায় বাইক নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে বেনারস শহরের দিকে গেলাম। পান খেয়ে আর প্যারা বাড়ির জন্য কিনে নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।

সপ্তদশ তম দিন (বেনারস, উত্তর প্রদেশ থেকে কলকাতা)

মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলো। উঠে দেখি প্রচন্ড জোরে বৃষ্টি হচ্ছে। জানলা খোলা থাকায় বৃষ্টির ছাঁট আমার গায়ে এসে লাগায় ঘুমটা ভেঙে গেছে। জানলা বন্ধ করে দিয়ে আবার শুয়ে পরলাম। ভোর তিনটের সময় ঘুম থেকে উঠে, রেডি হয়ে ৪:১৭ তে রাইড শুরু করলাম। আজকে বাড়ি ফেরার পালা। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে গঙ্গা নদীর উপর ব্রিজ পেরিয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে-১৯ ধরে এগিয়ে চললাম। রাতের অন্ধকারে বাইকের হেড লাইটের আলোয় রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় জল জমে আছে দেখতে পাচ্ছিলাম, তাই বাইক ধীরে ধীরে চালাতে হচ্ছিলো। দীর্ঘ সময় চলার পর ভোরের আলো ফুটল। গঙ্গার উপনদী করমানসার উপর ব্রিজ পেরোতেই উত্তর প্রদেশ ছেড়ে বিহারে প্রবেশ করলাম। শিভসাগর, সাসারাম, দেহরী, সোন নদী, ঔরঙ্গাবাদ পেরিয়ে এসে একটি ধাবাতে প্রাতরাশ সেরে নিলাম। ফল্গু নদীতে প্রচুর কাশ ফুল ফুটে আছে দেখলাম। ফল্গু নদীর সেতুর উপর থেকে যা দেখতে অসাধারণ লাগছিল। সেতু পেরিয়ে এপাশে চলে আসতেই বিহার ছেড়ে ঝাড়খন্ড রাজ্যে প্রবেশ করলাম। চৌপারন, বর্হি, জামতাড়া, তোপচাঁচি, রাজগঞ্জ হয়ে ধানবাদ এর কাছে আসতেই আবার প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পড়লাম। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য একটি বাইকের শোরুমে আশ্রয় নিলাম। ৪০ মিনিট অপেক্ষারপর বৃষ্টি থামার শেষে আবার রওনা দিলাম। মাইথনে এসে বরাকর নদী পেরোতেই নিজের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করলাম। বৃষ্টির জন্য আজকেও লাঞ্চ সারতে দেরি হয়ে গেলো। আসানসোল, দুর্গাপুর পেরিয়ে এসে বিকেল তিনটের সময় ন্যাশনাল হাইওয়ের পাশে একটি রেস্তোরায় লাঞ্চ করে নিলাম। রেস্তোরার পিছন দিকটাই প্রচুর কাশ ফুল ফুটেছে দেখলাম। সেদিন ২১শে সেপ্টেম্বর, মহালয়া ২৫ শে সেপ্টেম্বর। সামনেই দূর্গাপুজো। মনে একটা আলাদা আনন্দের আমেজ রয়েছে। ঝাড়খন্ড রাজ্যের মধ্যে দিয়ে যখন আসছিলাম ন্যাশনাল হাইওয়ের পাশে অনেকগুলো দূর্গাপুজার প্যান্ডেল দেখতে পেয়েছিলাম। বর্ধমান পেরিয়ে শক্তিগড় আসতেই দাঁড়াতে হলো। ঘড়িতে তখন বিকেল ৪:৪০ বাজে। শক্তিগড়ের ল্যাংচা না নিয়ে তো বাড়ি যাওয়া যাবে না। এখানকার ল্যাংচার স্বাদ অতুলনীয়। একটি দোকান থেকে ল্যাংচা কিনে বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম। রসুলপুর থেকে ডান দিকে ঘুরে গুড়াপ হয়ে সিঙ্গুরে আসতেই সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনালো। এরপর ডানকুনি টোল প্লাজা, রাজচন্দ্রপুর, বালি হয়ে বিবেকানন্দ সেতুতে (বালি ব্রিজ) আসতেই, আজ বারানসিতে ভোর সাড়ে চারটের পর ফের একবার গঙ্গা নদীর সাথে দেখা হয়ে গেলো, মাঝে থাকলো ৬৭৫ কিমির দুরত্বের ব্যবধান। দক্ষিনেশ্বর, ডানলপ হয়ে সন্ধ্যা সাতটায় বেলঘরিয়ায় বাড়িতে ফিরলাম। সঙ্গে নিয়ে এলাম একরাশ স্মৃতি, আনন্দ আর ভালোলাগা। আমার বাইকে একাকি লাদাখ ভ্রমণের পরিসমাপ্তি হলো।


১০ টি হারিয়ে যাওয়া বাঙালি রান্না...

মৌমিতা মুখার্জি

থোড় চিংড়ির চপ


কী কী লাগবে

দেড় কাপ থোর সেদ্ধ জল ঝরিয়ে রাখা, ১ টি বড় আলু, ১ কাপ কুচো চিংড়ি, ১০ টি বড় সাইজের চিংড়ি লেজ সহ, ১ টেবিল চামচ ভাজা মশলা, ১ টেবিল চামচ আদা রসুন বাটা, ১ চা চামচ লঙ্কা গুঁড়ো, আধ চা চামচ জিরা গুঁড়ো, নুন ও মিষ্টি স্বাদ অনুযায়ী, আধ কাপ বেসন, ১ কাপ বিস্কুটের গুঁড়ো, পরিমাণ মতো সাদা তেল


কীভাবে বানাবেন

সেদ্ধ করা থোর ভালো করে চটকে নিন। দুই রকমের চিংড়ি আলাদাভাবে নুন হলুদ মাখিয়ে রাখুন। বড় চিংড়ি সামান্য চিরে নিন। তেলে হালকা সাঁতলে তুলে নিন। কুচো চিংড়ি ও হালকা সাঁতলে নিয়ে আধ থেতো করে নিন। আলু চটকে রাখুন।



কড়াইয়ে ২ টেবিল চামচ তেল গরম করে তাতে আদা রসুন বাটা দিয়ে ভালো করে কষে থোর সেদ্ধ দিন। মাঝারি আঁচে ভাজতে থাকুন যতক্ষণ না জল শুকিয়ে যায়। এবার এতে এক এক করে সব মশলার গুঁড়ো আর নুন মিষ্টি দিন। ভালো করে কষে চটকানো আলু আর থেতো করা চিংড়ি দিন। খুন্তি দিয়ে উল্টে পাল্টে নাড়তে থাকুন যাতে সবকিছু একসাথে মিশে যায়। নামিয়ে ঠান্ডা হলে এক একটি বড় চিংড়ির চারিদিকে মিশ্রণটিকে গোল বলের মতন করে নিন। চিংড়ির লেজটা যেন চপের বাইরে থাকে। অন্যদিকে একটি পাত্রে বেসনে জল দিয়ে ঘন মিশ্রণ তৈরি করে রাখুন। একটি থালায় বিস্কুটের গুঁড়ো নিয়ে নিন। এক একটি চপ প্রথমে বেসনে ডুবিয়ে বিস্কুটের গুঁড়ো মাখিয়ে গড়ে নিন। ছাঁকা তেলে সোনালী করে ভেজে গরম গরম পরিবেশন করুন।

কচুর লতি আর মাছের ডিমের বড়ার টক


কী কী লাগবে

১ কাপ কচুর লতি টুকরো করা, ২০০ গ্রাম মাছের ডিম, ১/৪ চামচ খাবার সোডা, ১ টেবিল চামচ চালের গুঁড়ো,

২ টেবিল চামচ বেসন, ২ টেবিল চামচ সাদা সরষে বাটা, ১ চা চামচ কাঁচালঙ্কা বাটা, ২ টেবিল চামচ তেঁতুলের ক্বাথ,

২ টি শুকনো লঙ্কা, ১/২ টেবিল চামচ পাঁচফোড়ন, ১ টেবিল চামচ সরষের তেল + ডিমের বড়া ভাজার জন্য তেল, নুন স্বাদমতো


কীভাবে বানাবেন

কচুর লতি সামান্য নুন জলে হালকা ভাপিয়ে নিন। মাছের ডিম, নুন, খাবার সোডা, বেসন ও চালের গুঁড়োর সাথে মেখে নিন। তেল গরম করে মাঝারি সাইজের বড়া সোনালী করে ভেজে তুলে নিন।

অন্যদিকে কড়াইয়ে তেল গরম করে পাঁচফোড়ন, শুকনো লঙ্কা দিয়ে ভাপিয়ে রাখা কচুর লতি কিছুক্ষন সাঁতলে, সরষে বাটা, কাঁচা লঙ্কা বাটা দিন। হালকা নেড়েচেড়ে মাছের ডিমের বড়া, জল এবং স্বাদমতো নুন দিয়ে ফোটাতে থাকুন। জল কিছুটা কমে বড়া নরম হয়ে এলে তেঁতুলের ক্বাথ দিয়ে দিন। ঘন হলে সামান্য সরষের তেল ছড়িয়ে নামিয়ে দিন।

কলমি শাকের ডগা দিয়ে ইলিশ মাছ


কী কী লাগবে

দেড় কাপ লম্বা করে কাটা কলমি শাকের ডগা, ৬ পিস ইলিশ মাছের টুকরো, ১২ ফালি আলু, আধ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো, আধ চা চামচ লঙ্কা গুঁড়ো, আধ চা চামচ জিরে বাটা, আধ চা চামচ কাঁচালঙ্কা বাটা, ৪ টি চেরা কাঁচা লঙ্কা, আধ চা চামচ কালোজিরা, ১/৪ কাপ সরষের তেল, নুন স্বাদমতো


কীভাবে বানাবেন

মাছে অর্ধেক হলুদ এবং স্বাদমতো নুন মাখিয়ে কিছুক্ষণ রাখুন ।কড়াইয়ে তেল গরম করে মাছ গুলো সাঁতলে তুলে নিন। ঐ তেলে কালো জিরে, কাঁচা লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে আলু গুলো ছেড়ে দিন। সামান্য নুনের ছিটে দিয়ে নরম আঁচে আলু গুলো ভাজা হয়ে গেলে এতে কলমি শাক দিন। একটি পাত্রে বাকি হলুদ গুঁড়ো সাথে লঙ্কা গুঁড়ো, জিরে বাটা, কাঁচালঙ্কা বাটা, একটু জল দিয়ে মিশিয়ে নিন। এই মিশ্রণটি কড়াইয়ে ঢেলে দিয়ে কষতে থাকুন। তেল ছেড়ে দিলে দের কাপ ঈষদুষ্ণ জল কড়াইয়ে ঢেলে দিন। ফুটতে শুরু করলে এতে মাছগুলো ছেড়ে দিন। ঝোল ফুটে সামান্য ঘন হয়ে গেলে উপরে কাঁচা সরষের তেল দিয়ে নামিয়ে নিন।

অড়হর ডালের পাক


কী কী লাগবে

১০০ গ্রাম অড়হর ডাল, ১০০ গ্রাম টক দই, ২ টেবিল চামচ আদার রস, ৩ টি শুকনো লঙ্কা টুকরো করা, ২ ইঞ্চি দারচিনি, ৪ টি ছোট এলাচ, ১ চিমটে জাফরান, ২ চিমটে হিং, নুন স্বাদমতো, ২ টেবিল চামচ ঘি


কীভাবে বানাবেন

ডাল নুন দিয়ে সেদ্ধ করে কিছুটা ঠান্ডা হলে ওতে টক দই, জাফরান ও আদার রস ভালো করে মিশিয়ে নিন। কড়াইয়ে ঘি গরম করে, তাতে একে একে শুকনো লঙ্কার টুকরো হিং দারচিনি ছোট এলাচ ফোড়ন দিন। এতে ডালের মিশ্রণ ঢেলে নরম আঁচে রান্না হতে দিন কিছু সময়। আঁচ থেকে নামানোর আগে সামান্য ঘি ওপরে ছড়িয়ে দিন।

কাঁচা মাছের ফ্রেঞ্চ কোরমা


কী কী লাগবে

৫০০ কাতলা মাছ টুকরো করা, ৫০ গ্রাম দই, ১৫০ মিলি নারকেল দুধ, আধ চামচ জিরা বাটা, আধ চামচ লঙ্কা বাটা, আধ চামচ হলুদ গুঁড়ো, ১.৫ টেবিল চামচ আদার রস, আধ কাপ পেঁয়াজের রস,

২ টি তেজপাতা, ৩ টি ছোট এলাচ, ১ টুকরো দারুচিনি, সামান্য তেল, ২ টেবিল চামচ ঘি, আধ চামচ জিরে ফোড়নের জন্য, চিনি স্বাদমতো, নুন স্বাদমতো


কীভাবে বানাবেন

মাছ নুন মাখিয়ে রাখুন। কিছুক্ষণ পরে কাঁচা মাছ, হলুদ গুঁড়ো, লঙ্কা বাটা, জিরে বাটা, আদার রস, পেঁয়াজের রস, নুন, চিনি, দই দিয়ে মেখে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখুন। কড়াইয়ে তেল ও ঘি একসাথে গরম করে জিরে, তেজপাতা, আধ থেতো করা গোটা গরম মশলা ফোড়ন দিন। এতে মশলা মাখানো মাছ ঢেলে দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে নারকেলের দুধ ঢেলে দিন। প্রয়োজন হলে সামান্য জল দেবেন। নরম আঁচে সেদ্ধ হতে দিন। মাছ সেদ্ধ হয়ে গেলে ওপরে সামান্য ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে নেবেন।

সঞ্চিতা দাস

মৌরি ছানার রসা


কী কী লাগবে


২০০ গ্রাম পনীর, ১/৪ কাপ মটরশুঁটি, ২ চা চামচ মৌরি, ১ কাপ দুধ, ১ টেবিল চামচ মৌরি গুঁড়ো, ২ চা চামচ আদা বাটা, ১-২ টো তেজপাতা, ৩-৪ টে চেরা কাঁচালঙ্কা, ১ টেবিল চামচ সরষের তেল, ১/৪ চা চামচ চিনি, নুন স্বাদ মতো


কীভাবে বানাবেন

তেল গরম করে নুন মাখানো পনীর হালকা ভেজে তুলে নিন। জলে মৌরি গুঁড়ো ভিজিয়ে রাখুন। তেলে তেজপাতা আর গোটা মৌরি ফোড়ন দিয়ে একে একে আদা বাটা, চেরা কাঁচালঙ্কা, মৌরির পেস্ট, নুন দিয়ে কষুন। মটরশুঁটি, ভাজা পনীর দিয়ে নেড়েচেড়ে গরম দুধ দিন। চিনি মিশিয়ে নামিয়ে নিন।

গন্ধরাজ ঘোল পোলাও


কী কী লাগবে

বাসমতি চাল ২৫০ গ্রাম, নুন স্বাদমত, টকদই ৩ টেবিল চামচ, গন্ধরাজ লেবুর রস ২ চা চামচ, গন্ধরাজ লেবুর জেস্ট ১ চা চামচ, চেরা কাঁচালঙ্কা ২টি, চিনি ২ চা চামচ, ঘি ২ টেবিল চামচ, কাজুবাদাম কিশমিশ, গন্ধরাজ লেবুর পাতা ৪ টি


কীভাবে বানাবেন

চাল ভিজিয়ে রেখে জল ঝরিয়ে রাখুন। ঘি গরম করে কাজু কিশমিশ ভেজে তুলে নিন। টকদই, গন্ধরাজ লেবুর রস আর পরিমান মতো জল মিশিয়ে ঘোল বানিয়ে রাখুন। এবার প্যানে চাল, নুন, চেরা কাচালঙ্কা দিয়ে অল্প নেড়ে ঘোল ঢেলে ঢেকে রান্না করুন। চাল সেদ্ধ হয়ে ঝরঝরে হলে চিনি, ভাজা কাজুবাদাম কিশমিশ, গন্ধরাজ লেবুর জেস্ট আর পাতা দিয়ে আধঘন্টা ঢেকে রেখে পরিবেশন করুন এই একদম ভিন্ন স্বাদের পোলাও।

মুগ ফুলকপির ঘন্ট


কী কী লাগবে

১ টা মাঝারি মাপের ফুলকপি, ১/২ কাপ মুগডাল, ১ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো, দেড় চা চামচ আদা বাটা, ৬-৭ টা চেরা কাঁচালঙ্কা, ৩ টেবিল চামচ তেল, ১ টেবিল চামচ ঘি, ১/২ চা চামচ চিনি, স্বাদ মতো নুন


কীভাবে বানাবেন

মুগডাল শুকনো খোলায় ভেজে ধুয়ে সেদ্ধ করে নিন। নুন হলুদ গুঁড়ো দিয়ে ফুলকপি ভাপিয়ে নিন। এবার তেল গরম করে বাদামী করে ভেজে তুলে নিন। ঐ তেলে আদা বাটা, চেরা কাঁচালঙ্কা, নুন, হলুদ গুঁড়ো, চিনি, ভাজা ফুলকপি অল্প জল দিয়ে কষুন। সেদ্ধ মুগডাল দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। ঘি মিশিয়ে নামিয়ে নিন।

মোচার নিরামিষ পাতুরি


কী কী লাগবে

কুচোনো সেদ্ধ মোচা ২০০ গ্রাম, পোস্ত + সর্ষে বাটা ২ টেবিল চামচ, নারকেল কোরা ২ টেবিল চামচ, সর্ষের তেল পরিমাণমতো, কাঁচালঙ্কা বাটা ১ চা চামচ, নুন চিনি স্বাদ মতো, কলাপাতা, টুথপিক


কীভাবে বানাবেন

সেদ্ধ মোচা শিলনোড়া বা মিক্সিতে বেটে নিন। এর সঙ্গে নুন, চিনি, সর্ষে পোস্ত বাটা ও নারকেল কোরা মিশিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ ঢেকে রাখুন। লঙ্কা বাটা ও সর্ষের তেল মাখিয়ে নিন। কলাপাতার মধ্যে ২ চামচ মোচা বাটা নিয়ে পাতুরির মতো মুড়ে টুথপিক গেঁথে নিন। তাওয়ায় তেল লাগিয়ে কলাপাতা মোড়া মোচা বাটা এপিঠ ওপিঠ করে সেঁকে নিন ভালো করে। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

নারকেল মাখা লাউ


কী কী লাগবে

১ টা লাউ ছোট টুকরো করা, ১/২ কাপ নারকেল কোরা, ৩-৪ টে চেরা কাঁচালঙ্কা, ১০ টি থেঁতো করা গোলমরিচ, ১ চা চামচ চিনি, ২ টেবিল চামচ তেল, স্বাদমতো নুন


কীভাবে বানাবেন

একটি পাত্রে লাউ, নারকেল কোরা, গোলমরিচ, কাঁচা লঙ্কা, নুন, চিনি, সরষের তেল মিশিয়ে নিন। প্যানে এই মিশ্রণ দিয়ে ঢেকে অল্প আঁচে রান্না করুন। মজলে ওপরে আরো কিছুটা নারকেল কোরা আর সর্ষের তেল ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

bottom of page