top of page

পুরষোত্তম মাস ও পরমা একাদশী | সিঙ্গাপুরের সঙ্গলাভে | প্রথম পাতে তেঁতো! | সুগন্ধি ধোঁয়ায় চুলের যত্ন | রবিবারের গল্প: ভালোবাসার অন্তহীন পথ


পুরুষোত্তম মাস ও পরমা একাদশী


হিন্দু ধর্মে সময়কে কেবল দিন, মাস বা বছরের হিসাব হিসেবে দেখা হয় না; বরং সময়কে ধরা হয় ঈশ্বরপ্রদত্ত এক পবিত্র শক্তি হিসেবে, যার প্রতিটি মুহূর্ত মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সুযোগ এনে দেয়। সেই কারণেই হিন্দু পঞ্জিকায় কিছু বিশেষ তিথি, মাস এবং ব্রতের গুরুত্ব অপরিসীম। এমনই এক বিরল ও মহাপুণ্যময় সময় হল ‘পুরুষোত্তম মাস’ বা ‘অধিক মাস’, আর এই মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথি হল ‘পরমা একাদশী’। শাস্ত্র মতে, এই দুইয়ের মিলন মানুষের জীবনে ভগবানের বিশেষ কৃপা লাভের এক অনন্য সুযোগ এনে দেয়। এই বছর ১৭ মে থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত পালিত হবে পুরুষোত্তম মাস। প্রায় প্রতি তিন বছর অন্তর একবার এই বিশেষ মাসের আবির্ভাব ঘটে। ফলে এর ধর্মীয় গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনই জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পঞ্জিকাগত দিক থেকেও এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।



অধিক মাসের ধারণা মূলত হিন্দু চান্দ্র ও সৌর পঞ্জিকার মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখার জন্য সৃষ্টি হয়েছে। সৌর বছর প্রায় ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা দীর্ঘ, অন্যদিকে চান্দ্র বছর মাত্র ৩৫৪ দিনের। ফলে প্রতি বছর প্রায় ১১ দিনের ব্যবধান তৈরি হয়। এই ব্যবধান ক্রমশ জমতে জমতে প্রায় ৩২ থেকে ৩৩ মাসে এক পূর্ণ মাসের সমান হয়ে যায়। তখন এই অতিরিক্ত সময়ের ভারসাম্য রক্ষার জন্য পঞ্জিকায় একটি অতিরিক্ত মাস যুক্ত করা হয়, যাকে বলা হয় ‘অধিক মাস’। সংস্কৃত ভাষায় ‘অধিক’ শব্দের অর্থ অতিরিক্ত এবং ‘মাস’ অর্থ মাস। জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুযায়ী, যখন একটি সম্পূর্ণ চান্দ্রমাসের মধ্যে সূর্য কোনো নতুন রাশিতে প্রবেশ করে না, অর্থাৎ কোনো সংক্রান্তি ঘটে না, তখন সেই মাস অধিক মাস হিসেবে গণ্য হয়। এই পদ্ধতির মাধ্যমে ঋতুচক্র, কৃষিকাজ এবং ধর্মীয় উৎসবগুলিকে সঠিক সময়ে ধরে রাখা সম্ভব হয়।



তবে ধর্মীয় সাহিত্যে অধিক মাসের পরিচয় কেবল একটি অতিরিক্ত মাস হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক হৃদয়স্পর্শী পৌরাণিক কাহিনি। পদ্মপুরাণে বর্ণিত হয়েছে, অধিক মাসের কোনো অধিপতি দেবতা ছিল না। ফলে মানুষ এই মাসকে অশুভ মনে করত এবং বিবাহ, গৃহপ্রবেশ কিংবা অন্যান্য শুভকর্ম এড়িয়ে চলত। এই অবহেলা ও অপমান সহ্য করতে না পেরে মলমাস বৈকুণ্ঠে ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হয়। ভগবান বিষ্ণু তার দুঃখের কথা শুনে অত্যন্ত করুণাবশত তাকে নিজের প্রিয় নাম ‘পুরুষোত্তম’ প্রদান করেন এবং ঘোষণা করেন যে এই মাস হবে তাঁরই মাস। সেই থেকে মলমাসের কলঙ্ক মোচন হয় এবং এটি ‘পুরুষোত্তম মাস’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ‘পুরুষোত্তম’ শব্দটির অর্থ হল সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষ, অর্থাৎ ভগবান বিষ্ণু বা শ্রীকৃষ্ণ। যেহেতু স্বয়ং ভগবান তাঁর নাম এই মাসকে দান করেছেন, তাই এই সময়কে বিষ্ণুভক্তি, জপ, তপস্যা ও আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ কাল হিসেবে গণ্য করা হয়। বহু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, কার্তিক মাস যেমন ভগবানের প্রিয়, তেমনি পুরুষোত্তম মাসে করা সাধনা ও ভক্তির ফল আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।



এই মাসে ধর্মীয় আচরণের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল ভগবান বিষ্ণুর নামস্মরণ ও মন্ত্রজপ। ‘ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়’ মন্ত্রটি এই সময়ে বিশেষভাবে জপ করা হয়। এছাড়া মহামন্ত্র ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে, হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে’ জপ করলে মানসিক শান্তি, আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং ভগবৎকৃপা লাভ হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। তুলসীর মালা হাতে নিয়ে প্রতিদিন অন্তত ১০৮ বার এই মন্ত্র জপ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। শুধু জপ বা পূজা নয়, দানও এই মাসের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কর্তব্য। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, পুরুষোত্তম মাসে করা দান কখনও বৃথা যায় না। দরিদ্রদের অন্নদান, বস্ত্রদান, গোরক্ষণ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সহায়তা কিংবা প্রদীপদান সবকিছুরই অক্ষয় পুণ্যফল লাভ হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই সময়ে করা সৎকর্ম বহু জন্মের পাপক্ষয় ঘটাতে সক্ষম।


আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে ধর্মগ্রন্থ পাঠেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবত, রামায়ণ এবং বিষ্ণুপুরাণের মতো গ্রন্থ পাঠ ও শ্রবণ মানুষের মনকে ঈশ্বরমুখী করে তোলে। সংসারধর্ম পালন করতে গিয়েও কীভাবে ভগবানের স্মরণে থাকা যায়, তার শিক্ষা এই গ্রন্থগুলির মাধ্যমে লাভ করা যায়। তবে পুরুষোত্তম মাসে কিছু কাজ থেকে বিরত থাকারও নির্দেশ রয়েছে। বিশেষত বিবাহ, উপনয়ন, গৃহপ্রবেশ, নতুন ব্যবসা শুরু কিংবা নতুন বাড়ি ও গাড়ি কেনার মতো শুভ ও জাগতিক কার্যকলাপ সাধারণত এই সময়ে করা হয় না। কারণ এই মাসকে মূলত ভোগ নয়, ত্যাগ ও আত্মসংযমের মাস হিসেবে দেখা হয়। মানুষ যাতে কিছু সময়ের জন্য সংসারী আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে সরিয়ে ঈশ্বরচিন্তায় মনোনিবেশ করতে পারে, সেই উদ্দেশ্যেই এই বিধান।



পুরুষোত্তম মাসের মধ্যে যে একাদশী তিথি পড়ে, তার গুরুত্ব আরও বেশি। কৃষ্ণপক্ষের একাদশীকে বলা হয় ‘পরমা একাদশী’। এটি ‘কমলা একাদশী’ নামেও পরিচিত। যেহেতু এই একাদশী প্রতি তিন বছরে একবার আসে, তাই এর মাহাত্ম্য অন্যান্য একাদশীর তুলনায় বিশেষ বলে বিবেচিত হয়। ২০২৬ সালে পরমা একাদশী পালিত হবে ১১ জুন। বৈদিক পঞ্জিকা অনুযায়ী, একাদশী তিথি শুরু হবে ১০ জুন রাত ১২টা ৫৮ মিনিটে এবং শেষ হবে ১১ জুন রাত ১০টা ৩৭ মিনিটে। একাদশী ব্রত পালন করা হবে ১১ জুন এবং ব্রতভঙ্গ বা পারণ করা হবে ১২ জুন ভোর ৫টা ২৩ মিনিট থেকে সকাল ৮টা ১০ মিনিটের মধ্যে। হিন্দু ধর্মে একাদশীকে ভগবান বিষ্ণুর বিশেষ তিথি হিসেবে মানা হয়। বছরে সাধারণত ২৪টি একাদশী পালিত হয়। কিন্তু অধিক মাসের কারণে অতিরিক্ত দুটি একাদশী যুক্ত হয় এবং সেই অতিরিক্ত একাদশীগুলির মধ্যে অন্যতম হল পরমা একাদশী। পুরাণে উল্লেখ আছে, এই একাদশীর ব্রত পালন করলে শত যজ্ঞ সম্পাদনের সমতুল্য পুণ্য লাভ হয়। পরমা একাদশীর মূল উদ্দেশ্য হল উপবাস, আত্মসংযম এবং ভগবানের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ। ভোরে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র ধারণ, বিষ্ণুমূর্তি বা শালগ্রাম শিলার পূজা, তুলসী পাতা নিবেদন, বিষ্ণু সহস্রনাম পাঠ এবং সারাদিন ভগবানের নামস্মরণ এসবই এই ব্রতের প্রধান অঙ্গ। অনেক ভক্ত সম্পূর্ণ নির্জলা উপবাস পালন করেন, আবার কেউ কেউ ফলাহার গ্রহণ করে ব্রত পালন করেন।



শাস্ত্র অনুসারে, পরমা একাদশীর ব্রত পালন করলে দারিদ্র্য দূর হয়, পাপক্ষয় ঘটে এবং জীবনে সুখ, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্য বৃদ্ধি পায়। বিশ্বাস করা হয়, ভগবান বিষ্ণুর আশীর্বাদে সংসারের নানা বাধা-বিপত্তি দূর হয় এবং মৃত্যুর পর বৈকুণ্ঠধাম লাভের পথ সুগম হয়। জ্যোতিষশাস্ত্রেও ২০২৬ সালের পরমা একাদশীকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে মেষ, কর্কট, ধনু এবং মীন রাশির জাতক-জাতিকাদের জন্য এই সময়কে শুভ বলে মনে করা হচ্ছে। মেষ রাশির ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে উন্নতি, ব্যবসায়িক সাফল্য এবং আর্থিক লাভের সম্ভাবনা রয়েছে। কর্কট রাশির জাতক-জাতিকারা নতুন বিনিয়োগ থেকে লাভবান হতে পারেন এবং পারিবারিক সম্পর্কে সুখ বৃদ্ধি পেতে পারে। ধনু রাশির ব্যক্তিদের জন্য এই সময় আধ্যাত্মিক উন্নতি এবং নতুন সুযোগের দ্বার খুলে দিতে পারে। দীর্ঘদিনের আর্থিক সমস্যা সমাধানের সম্ভাবনাও দেখা যায়। অন্যদিকে মীন রাশির জাতকদের জন্য পারিবারিক আনন্দ, ব্যবসায়িক সাফল্য এবং অর্থলাভের সম্ভাবনা উজ্জ্বল বলে বিবেচিত হচ্ছে। তবে জ্যোতিষীয় ভবিষ্যদ্বাণী যাই হোক না কেন, হিন্দু ধর্মের মূল শিক্ষা হল কর্ম ও ভক্তির সমন্বয়। তাই রাশিফলের চেয়ে ভগবানের প্রতি আন্তরিক ভক্তি, সৎকর্ম এবং আত্মশুদ্ধির প্রচেষ্টাকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ব্যস্ত ও ভোগবাদী জীবনে পুরুষোত্তম মাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল অর্থ, সম্পদ বা সামাজিক প্রতিষ্ঠা নয়। আত্মার উন্নতি, নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা এবং ঈশ্বরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই মাস মানুষকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম এবং ঈশ্বরচিন্তার এক বিরল সুযোগ এনে দেয়। একইভাবে পরমা একাদশী আমাদের শেখায় যে উপবাস কেবল খাদ্যত্যাগ নয়; এটি ইন্দ্রিয়সংযম, মনসংযম এবং আত্মশুদ্ধির একটি প্রক্রিয়া। ভক্তি, প্রার্থনা ও সৎকর্মের মাধ্যমে মানুষ নিজের অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তিগুলিকে জয় করার চেষ্টা করে। সুতরাং, পুরুষোত্তম মাস ও পরমা একাদশী কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিষয় নয়; এগুলি মানুষের আধ্যাত্মিক বিকাশ, নৈতিক শুদ্ধি এবং ঈশ্বরস্মরণের এক মহাসুযোগ। ভগবান বিষ্ণুর কৃপা লাভের আশায় লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই সময়ে জপ, তপ, ব্রত, দান ও ধর্মগ্রন্থ পাঠে নিজেদের নিয়োজিত করেন। শাস্ত্রের ভাষায়, এই মাসে করা প্রতিটি সৎকর্ম অক্ষয় পুণ্যে পরিণত হয় এবং মানুষের জীবনে আনে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মুক্তির পথের আলোকবর্তিকা। তাই পুরুষোত্তম মাস এবং পরমা একাদশী ভারতীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ, যা যুগে যুগে ভক্তদের ঈশ্বরের আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে।



সিঙ্গাপুরের সঙ্গলাভে!


সুনৃতা মাইতি


দীপাবলির রাতকে টা টা বাইবাই জানিয়ে সপরিবারে চলেছি দেশান্তরে ঘুরতে। সারারাত জেগে থাকা কলকাতার মাত্রাহীন আনন্দে বিরাম নেই কোনও। বাজির ধোঁয়ায় চারিদিক ভরে গেছে। সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরে ঢুকে ঠিকভাবে নিশ্বাস নিতে পারলাম। চলেছি সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বুকে একটুকরো প্রথম বিশ্বের ঝলক দেখতে। সত্যি বলতে কি, পরবর্তীকালে সবসময়ই মনে হয়েছে সমর্থ ভারতীয়দের উচিত জীবনে একবার অন্তত সিঙ্গাপুরটা দেখে আসা। শৃঙ্খলা আর নিয়মানুবর্তিতা একটি দেশকে কোন উচ্চতায় যে নিয়ে যেতে পারে, তা দেখতে হলে সিঙ্গাপুর আসতেই হবে।



সিঙ্গাপুরের নাম নাকি ছিল সিঙ্গাপুরা, অর্থাৎ সিংহের শহর। একটি সিংহ দেখতে পেয়ে শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের রাজপুত্র স্যাঙ নিলা উতামা প্রাচীন তেমাসেক দ্বীপটির নাম রেখেছিলেন সিঙ্গাপুরা। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সিঙ্গাপুরে সিংহ একেবারেই নেই। রাজপুত্র সম্ভবত মালয়েশিয়ান বাঘ দেখে সিংহ ভেবে ভুল করেছিলেন। তবে সিঙ্গাপুরের রক্ষক দেবতা হলেন মার্লায়ন, যিনি গঠনবৈশিষ্ট্যে অর্ধেক সিংহ আর অর্ধেক মৎস্য। তাঁকে নিয়ে অনেক প্রবাদ আছে। ১৮১৯ সালে এই দ্বীপপুঞ্জকে ব্রিটিশরা নিজেদের বাণিজ্য বন্দর হিসেবে রূপান্তরিত করবার আগে অবশ্য সিঙ্গাপুর মালয় সুলতানি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হস্তগত হলেও কয়েক বছর পরেই মালয় ফেডারেশনের সঙ্গে যুক্ত হয় সিঙ্গাপুর এবং লাভ করে খানিক স্বশাসনের অধিকার। শেষপর্যন্ত ১৯৬৫ সালের ৯ই আগস্ট সিঙ্গাপুর আনুষ্ঠানিকভাবে মালয়েশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বাধীন দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর পরের কয়েকটি বছর সিঙ্গাপুরের জন্য মোটেই সুখকর ছিল না। একদিকে ইন্দোনেশিয়ার মিলিটারি আক্রমণ, অন্যদিকে মালয়েশিয়ার বৈদেশিক চাপ—সব মিলিয়ে এক বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। দেশের অভ্যন্তরীণ অবস্থা আরও ভয়াবহ! বাসস্থান সংকট, অপর্যাপ্ত পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থা, বেকারত্ব, খাদ্যসংকট, জাতিবিদ্বেষ... এই সবকিছু নিয়ে সমস্যাজর্জরিত একটি গরিব দেশ কীভাবে যে ঘুরে দাঁড়াল এবং কালক্রমে এশিয়ান চার বাঘের (দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, হংকং ও সিঙ্গাপুর) অন্যতম হয়ে উঠল, তা অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়। এই চার এশিয়ান বাঘের রাজকীয় ভঙ্গিমা থেকে এখন চোখ ফেরানো দায়।



আসলে কিনা ১৯৫৯ থেকে ১৯৯০-এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ-এর শাসনকালে মজবুত হলো সিঙ্গাপুর। লি কঠোর হস্তে দুর্নীতি দমন করলেন, জীবনযাত্রার মান উন্নত করবার দিকে সুগভীর মনোযোগ দিলেন এবং সামগ্রিকভাবে সিঙ্গাপুরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি চাঙ্গা করবার সমস্ত উদ্যোগ নিলেন।


কলকাতা থেকে রওনা হয়ে রাতের দিকে চার ঘণ্টারও বেশি বিমানযাত্রা সেরে পৌঁছে গেলাম চাঙ্গি বিমানবন্দরে। এই ঝাঁ-চকচকে বিমানবন্দরটি আমার দেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিমানবন্দর। এমনিতে তৃতীয় বিশ্বের আমস্য আম-আওরাত, তাই এই জাঁকজমক দেখে ঢোক গিলাই ভুলে যেতে বসেছি। বাইরে বেরিয়ে দেখি রাস্তাঘাট অতি পরিচ্ছন্ন, যেখানে-সেখানে আবর্জনা ফেলায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা। মানুষজন আইন মেনে চলেন প্রতি পদে। ট্রাফিক মেনটেন করা হয় প্রচণ্ড দক্ষতার সঙ্গে। সিকিউরিটি নাকি সাংঘাতিক! ট্যাক্সিচালক থেকে শুরু করে হকার—সবাই প্রায় তুখোড় ইংরেজি বলিয়ে। দেশের মুখ্য ভাষা ইংরেজি, তবে মান্দারিনের চল আছে মোটামুটি। এছাড়া তামিলও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি ভাষা। এক মহিলা ট্যাক্সিচালিকার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। সে নাকি জীবনবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। কথাপ্রসঙ্গে জানালেন, মহিলাদের জন্য এর মতো নিরাপদ স্থান এশিয়ায় আর একটিও নেই। অল্প থেকে অত্যল্প জামাকাপড় পরে সারারাত টইটই করে সিঙ্গাপুর চড়ে বেড়ান, কোনও আশঙ্কা নেই। এদিকে রাস্তাঘাটে পুলিশ-টুলিশ তো কিছু নেই! শুনলাম প্রতিটি রাস্তার কোণে কোণে নাকি সিসিটিভি লাগানো। বেআইনি কিছু বেচাল দেখলেই পুলিশপ্রবরেরা মাটি ফুঁড়ে কোথা থেকে যে হাজির হবে, বুঝতেই পারবেন না। ট্যাক্সিচালিকা বলেছিলেন যে তাঁর বাহনে একা যাতায়াতকারী সবচেয়ে ক্ষুদ্র প্রাণী ছিল এক পাঁচ বছরের কন্যা। আমাদের দেশে ভাবা যায়! শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারে আর কী বলি! সিঙ্গাপুরের মেধা তো এখন ভুবনবিখ্যাত।



চারিদিকে সুরম্য ও বিশালাকার সব অট্টালিকা, ঘোরানো-প্যাঁচানো ব্রিজের উপরিভাগ দিয়ে আমাদের গাড়ি চলছে গন্তব্যের দিকে। উপরে নীল উন্মুক্ত আকাশ। সব মিলিয়ে খানিক চমকে চুর আর কী! হোটেলে ঢুকতেই আমার ভারতীয় ছাপ মারা চেহারা দেখেই বুঝি হ্যাপি দীপাবলি উইশ করতে শুরু করলেন সবাই। একটি ট্রিপ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বুকিং করা ছিল হোটেল।


সিঙ্গাপুরে খাওয়াদাওয়ার অঢেল আয়োজন। চাইনিজ, মালয় খাবার তো বটেই, কে এফ সি বা ম্যাকডোনাল্ডের মতো খাবারের দোকানের ছড়াছড়ি চারিদিকে। আমরা যেহেতু ভারতীয় অধ্যুষিত লিটল ইন্ডিয়ায় ছিলাম, ভারতীয় রেস্তোরাঁর কোনও অভাব দেখতে পাইনি। কিন্তু মুশকিল হলো যে আমি বাদে আমার বাকি পরিবারের সদস্যরা "হোয়াইল ইন রোম..." মতবাদে বিশ্বাসী। সুযোগ পেলেই ফুটপাত-সংলগ্ন একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁয় সাঁটাতে বসে যেত তারা। সেখানে পর্ক, বিফ কিংবা চাইনিজ শুঁটকি জাতীয় কিছুর ঝাঁঝালো গন্ধে "আমি ভারতীয়"-র তো ওষ্ঠাগত অবস্থা হতো। করুণ মুখে এক গ্লাস কমলালেবুর জুস হাতে নিয়ে ইষ্টদেবকে স্মরণ করে সে অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি চাইতাম। পরের দিকে তো রেস্তোরাঁ-মালিকের সঙ্গে এমন সুসম্পর্ক হয়ে গেল যে ঢুকেই বিশুদ্ধ বাংলায় জিজ্ঞাসা করতাম, "দাদা, ভালো তো?"


এদিকে এত নির্ঘণ্ট লিখতে লিখতে ভুলেই গেছি যে সিঙ্গাপুরে প্রচুর দর্শনীয় স্থান আছে। ঘোরবার জন্য অন্তত সাতটি দিন হাতে রাখতেই হবে। আমাদের হাতে সময় ছিল কম, তাই ট্যুর ছিল হেকটিক।


প্রথম দিনের সকালটা নষ্ট, কারণ বিশ্রাম না নিলে মুশকিল হবে। বিশ্রাম-টিশ্রাম নিয়ে দুপুরের দিকে লিটল ইন্ডিয়ার আনাচে-কানাচে ঘোরা হলো, খুঁজে ফেলা হলো লোকাল ট্যুর অপারেটর। তারা পরামর্শ দিলেন সিঙ্গাপুর চিড়িয়াখানার রাতের সাফারিটা সেদিনই সেরে ফেলতে। সেইমতো রওনা দিলাম জু। আমরা যখনই কোনও স্থানে যাই, সেখানকার স্থানীয় ট্যুর অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে ট্যুর প্ল্যান করি।



সিঙ্গাপুর জুতে আপনি প্রায় ৩০০ প্রজাতির প্রাণী দেখতে পাবেন। বেশ নাটকীয় আলো ফেলে ফেলে তাদের দৃশ্যমান করা হচ্ছিল। এদিকে অন্ধকার বনাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে চলছিল আমাদের গাড়ি। এগুলো দেখলেই আমার মন খারাপ হয়ে যায়। মনে হয়, আমাদের দেশে কত রিসোর্স, অথচ সর্বস্তরে কী হেলাফেলা! আর এখানে সামান্য বস্তুগুলোকেই অসামান্য করে পেশ করা হচ্ছে দক্ষতার সঙ্গে।


পরদিন চললাম সেন্টোসা আইল্যান্ড। ট্যুর অপারেটর গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তবে লোকাল বাসে চড়েও দিব্যি যাওয়া সম্ভব। ছেলেপুলে অত্যন্ত উত্তেজিত, কারণ তারা ইউনিভার্সাল স্টুডিও দেখতে পাবে। এছাড়াও সেন্টোসায় আছে নানান রকম শোয়ের গ্যালারি, ওয়াটার পার্ক, মাদাম তুসোর কীর্তিকলাপ, ক্লাব হাউস, ইনডোর স্কাই ডাইভিং-সহ আরও অনেক রকমের আকর্ষণ। বজরংবলীর নাম নিয়ে একখান বিপজ্জনক রাইডে চড়েছিলুম। বিশ্বাস করবেন না, পা থেকে মাথা পর্যন্ত সব তুমুল নাড়িয়ে-চাড়িয়ে তারপর ছাড়ান দিল। পাওয়া গেল এক ত্রিমাত্রিক স্টুডিও, যেখানে রূপকথার সঙ্গে আপনি একাত্ম হয়ে যেতে পারেন, হয়ে উঠতে পারেন রূপকথার একটি চরিত্র। একটি অ্যাপ ডাউনলোড করলেই সব ধরা থাকবে আপনার ফোনে। সেন্টোসায় মনোরেল আছে, তাই যাতায়াতের বিশেষ অসুবিধা হয় না। ফুড স্টলেরও ছড়াছড়ি চারিদিকে। সারাদিন এই রাইড থেকে ওই রাইড, এই শো থেকে ওই শো, ডিজনিল্যান্ডের ফান্ডা থেকে ইজিপ্টের মমি দেখতে দেখতে পা টনটন, মাথা ভনভন অবস্থা। শুধু ছেলেপুলেদের উৎসাহে কোনও ঘাটতি নেই।


হাড়ে-মজ্জায় ব্যথাবেদনা অগ্রাহ্য করে পরদিন গেলাম জুরং বার্ড পার্কে। এখানে আপনি পাঁচ হাজারেরও বেশি পাখির প্রজাতি দেখতে পাবেন। সবথেকে সুন্দর হলো অ্যাভিয়ারি জলপ্রপাত। সারাদিন ধরে ট্রেনিংপ্রাপ্ত পাখিদের নানারকম শো চলতেই থাকে। দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়।


পরদিন ঠিক করলাম নিজেরাই ইচ্ছেমতো ঘোরাঘুরি করব। সেইমতো রেস্ট নিয়ে চললাম সিঙ্গাপুর ফ্লায়ারের উদ্দেশ্যে। বিশাল একটি চাকার মতো ঘূর্ণমান ফ্লায়ারে উঠে পৌঁছে যাওয়া যায় একেবারে টঙে, যেখান থেকে পাবেন সম্পূর্ণ সিঙ্গাপুরের একটি এরিয়াল ও মনোমুগ্ধকর ভিউ। এরপর সারাদিন ধরে বুগিস স্ট্রিট, চায়না টাউন এবং তেলোক আয়ারে ঘুরে ফিরে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। বুগিস স্ট্রিট সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত শপিং সেন্টারগুলোর মধ্যে অন্যতম। আর খাঁটি সিঙ্গাপুরি খাবারের স্বাদ পেতে হলে অবশ্যই ম্যাক্সওয়েল ফুড সেন্টারে যেতে হবে। তেলোক আয়ারে গেলে অবশ্যই ইন্দোনেশিয়ান খাবার চিকেন সাতে টেস্ট করবেন। তবে হোটেলে ফিরেই আমাদের মনে হলো, সিঙ্গাপুরের রাতের রূপটিই বা ছাড়ি কেন? পয়সা উসুলই হলো ভারতীয় মধ্যবিত্তের মূল মন্ত্র। সেইমতো রওনা হলাম মেরিনা বের দিকে। সেখানে আছে মার্লায়নের বিশালাকায় মূর্তি। সিংহ আর মৎস্যের মিশেল এই দেবতা নাকি সিঙ্গাপুরের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। ঝাঁ-চকচকে আলোঝলমলে রাস্তায় হরেক কিসিমের রেস্তোরাঁর আগ্রহী আহ্বান, এধারে-ওধারে নাচন-কোঁদন আর হল্লাগুল্লার খুল্লমখুল্লা ব্যবস্থা আর কী! রঙিন সব রাতচরা মানুষজন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছে। দেখে তো ছেলেপুলেসহ আমার বেশ ভ্যাবলাচরণ অবস্থা! তারপর চল্লুম সমুদ্রের ধারে লেজার শো দেখতে। সিঙ্গাপুরের শাস্ত্র-পূরাণ ইত্যাদির গল্পগাছা ওইসব লেজার শোয়ের মুখ্য বিষয়। এরপর হোটেলে ফিরে এলেই হতো, কিন্তু সিঙ্গাপুরের নাইট লাইফের আদ্যশ্রাদ্ধ না করে আমরা দেশে ফিরব না, যেন এই প্রতিজ্ঞা! বাচ্চা-দুখানিও যেন চৌবাচ্চার মতো সর্ব-এন্টারটেইনমেন্ট-গ্রাসী। অতএব আমরা গেলাম ক্লার্ক কুয়েতে; যেখানে এক ইউরোপিয়ান রোলের দোকানে চিকেন রোল খেয়ে পেটের বৌনি করা হলো। এরপর বোটে চেপে সিঙ্গাপুর নদী ভ্রমণের পালা। রাতের সিঙ্গাপুর যে কী মোহময়ী, তা ভাষায় বোঝানো অসম্ভব! মাঝরাতে এ রাস্তা ও রাস্তা ঘুরে ফিরে জব্বর খিদে পেয়ে গেল। ফুটপাতের এক দুর্দান্ত দেখতে স্টলে খাওয়া হলো ফিশ অ্যান্ড চিপস।


পরের দিন সবারই মন খারাপ। ফেরার পালা। রাতের দিকে ফ্লাইট, তাই ঠিক হলো বোটানিক্যাল গার্ডেন দেখে ফিরে এসে সবাই ঝটপট তৈরি হয়ে নেব। সকাল থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি সেদিন। আকাশের মুখ ভার। তাপমাত্রার পারদও মিইয়ে গেছে।


সিঙ্গাপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন প্রায় ১৫০ বছরের ইতিহাসের সাক্ষী। হাজার হাজার অর্কিডের খোঁজ পাবেন এখানে। শান্ত এক স্থান। এক একটি গাছপালা-সমাবৃত স্থান অতি মনোহর! অপূর্ব সব পুষ্পরাজির সমাহার চতুর্দিকে।


দ্বিতীয়ার্ধে দেখতে গেলাম গার্ডেনস বাই দ্য বে। এটি এক হাই-ফান্ডার বাগান। মানুষের তৈরি আধুনিকতম উদ্যান। ক্লাউড ফরেস্ট, ফ্লাওয়ার ডোম কিংবা ফ্লোরাল ফ্যান্টাসি... দেখলে হাঁ হয়ে থাকা ছাড়া কোনও উপায় নেই। এশিয়ার বৃহত্তম কাচ-বাগানের শিরোপা পাওয়া এই উদ্যানে বহু রকমের ফুলগাছের দেখা পেয়ে যাবেন। যা দেখে মাথা খারাপ হয়ে যায়।


রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর একটা কবিতা ছিল ‘সং অব সিটিজ’। সেখানে তিনি সিঙ্গাপুর সম্পর্কে লিখেছিলেন—


"Hail, Mother! East and West must seek my aid ..."


কিপলিং লিখেছিলেন বহু আগে, কিন্তু কথাগুলো আজ একদম খাপে খাপ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুর এখন বিদ্যাচর্চা হোক বা বাণিজ্য—সবেতেই বিশ্বের সেরা।


প্রথম পাতে তেঁতো!


বাঙালি ভোজনরীতিতে প্রথম পাতে তেঁতো খাওয়ার একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। শুধু স্বাদের বৈচিত্র্যের জন্য নয়, এর পিছনে রয়েছে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানেরও যুক্তি। উচ্ছে, করলা, নিমপাতা বা বিভিন্ন তেঁতো শাক ক্ষুধা বাড়াতে সাহায্য করে এবং হজমশক্তিকে সক্রিয় করে বলে মনে করা হয়। গরমের দিনে শরীরকে সতেজ রাখা, রুচি ফিরিয়ে আনা এবং পেটকে আরাম দেওয়ার জন্যও তেঁতো পদ বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাই আজও বহু বাঙালি পরিবারের মধ্যাহ্নভোজের শুরু হয় এক চামচ তেঁতো দিয়ে, যা ঐতিহ্য, স্বাস্থ্যসচেতনতা এবং রসনার এক অনন্য মেলবন্ধন।

ঐন্দ্রিলা ভট্টাচার্য


রুই মাছের মাথা দিয়ে ভাঙাচোরা শুক্তো


ঐন্দ্রিলা ভট্টাচার্য



কী কী লাগবে

রুই মাছের মাথা ১টি (গোটা), আলু ২টি মাঝারি (ছোট টুকরো করা), বেগুন ১টি মাঝারি (ছোট টুকরো করা), ঝিঙে ২টি (ছোট টুকরো করা), আদাবাটা ১ টেবিল চামচ, রাঁধুনি ১ চা চামচ, রাঁধুনি বাটা ২ টেবিল চামচ, তেজপাতা ২টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, Shalimar's সর্ষের তেল ৪ টেবিল চামচ।



কীভাবে বানাবেন

মাছের মাথায় নুন-হলুদ মেখে ভেজে তুলে রাখুন। তেলে তেজপাতা ও রাঁধুনি ফোড়ন দিয়ে আদাবাটা কষিয়ে আলু দিন। আলু নরম হলে বেগুন ও পরে ঝিঙে দিয়ে ঢেকে সিদ্ধ করুন। সবজি সেদ্ধ হলে মাছের মাথা, রাঁধুনি বাটা ও নুন মিশিয়ে ১০–১২ মিনিট ভালোভাবে কষিয়ে গা-মাখা হলে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।



লাউ শুক্তো


ঐন্দ্রিলা ভট্টাচার্য



কী কী লাগবে

লাউ ১টি মাঝারি (কুচি করা), বিউলির ডালের বড়ি ৮-১০টি, Shalimar's Sunflower তেল ২ টেবিল চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ, তেজপাতা ৩টি, মেথি ১ চা চামচ, সরষে ১ চা চামচ, আদা-রাঁধুনি বাটা ১ টেবিল চামচ, সরষে বাটা ১ টেবিল চামচ, দুধ ১/৪ কাপ, ময়দা ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১ চা চামচ।



কীভাবে বানাবেন

বড়ি লাল করে ভেজে তুলে রাখুন। তেল-ঘি গরম করে তেজপাতা, মেথি ও সরষে ফোড়ন দিন। মেথি ভাজা হলে কুচি লাউ দিয়ে ঢেকে নরম করুন। আদা-রাঁধুনি বাটা দিয়ে কষিয়ে সরষে বাটা, নুন ও চিনি মেশান। ভাঙা বড়ি ছড়িয়ে দিন, দুধে গুলে রাখা ময়দা মিশিয়ে কয়েক মিনিট ফুটিয়ে নিন। শেষে ঘি ছড়িয়ে ঢেকে রেখে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।


জল শুক্তো


ঐন্দ্রিলা ভট্টাচার্য



কী কী লাগবে

ঝিঙে ২টি মাঝারি (বড় টুকরো করা), ঢেঁড়স ২০০ গ্রাম (বড় টুকরো করা), আলু ২টি মাঝারি (বড় টুকরো করা), বিউলির ডালের বড়ি ৮-১০টি, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, তেজপাতা ২টি, রাঁধুনি আধ চা চামচ, সরষে আধ চা চামচ, আদাবাটা ১ টেবিল চামচ, সরষে বাটা দেড় টেবিল চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৩-৪টি, নুন স্বাদমতো, চিনি ১ চা চামচ, জল ২ কাপ, ঘি ১ চা চামচ, ভাজা মশলা ১ চা চামচ (রাঁধুনি, মেথি ও মৌরি ভেজে গুঁড়ো করা)।



কীভাবে বানাবেন

ঝিঙে, ঢেঁড়স ও আলু হালকা ভেজে তুলে রাখুন, বড়িও লাল করে ভেজে নিন। কড়াইতে সরষের তেল গরম করে তেজপাতা, রাঁধুনি ও সরষে ফোড়ন দিয়ে আদাবাটা কষিয়ে নিন। ভাজা সবজি দিয়ে ৪-৫ মিনিট নেড়ে সরষে বাটা মেশান। এরপর জল, নুন, চিনি ও কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ঢেকে ফুটতে দিন। ফুটে উঠলে বড়ি দিয়ে সবজি সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। শেষে ঘি ও ভাজা মশলা ছড়িয়ে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।


রুই মাছের শুক্তো


ঐন্দ্রিলা ভট্টাচার্য



কী কী লাগবে

রুই মাছ ৬ টুকরো (প্রায় ৫০০ গ্রাম), আলু ২টি মাঝারি (টুকরো করা), পটল ৬টি, ঝিঙে ২টি মাঝারি, আদাবাটা ১ টেবিল চামচ, রাঁধুনি আধ চা চামচ, শুকনো লঙ্কা ২টি, পাঁচফোড়ন ১ চা চামচ, সরষে ১ চা চামচ, চালের গুঁড়ো আধ চা চামচ, দুধ ১/৪ কাপ, ঘি ১ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৪ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, জল প্রয়োজনমতো।



কীভাবে বানাবেন

পাঁচফোড়ন ও সরষে শুকনো কড়াইতে ভেজে গুঁড়ো করে রাখুন। মাছে নুন মেখে ভেজে নিন। আলু, পটল ও ঝিঙে হালকা ভেজে তুলে রাখুন। কড়াইতে তেল গরম করে রাঁধুনি ও শুকনো লঙ্কার ফোড়ন দিয়ে আদাবাটা কষিয়ে নিন। ভাজা সবজি দিয়ে নেড়ে জল ও নুন মিশিয়ে সিদ্ধ করুন। সবজি সেদ্ধ হলে জলে গুলে রাখা চালের গুঁড়ো, দুধ ও ভাজা মাছ দিন। একবার ফুটে উঠলে তৈরি করা পাঁচফোড়ন-সরষের গুঁড়ো ও ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।



বাঙাল বাড়ির শুক্তো


সুস্মিতা চক্রবর্তী



কী কী লাগবে

২ টি উচ্ছে, ২ টি সজনে ডাঁটা, ১ টি মিষ্টি আলু, ১ টি কাঁচা কলা, ১ টি বেগুন, ১/৪ কাঁচা পেঁপে, ১ কাপ অথবা এক মুঠো বড়ি (বিউলির ডালের), ১ টেবিল চামচ গোটা সর্ষে, ১ চা চামচ পোস্ত, আধ চা চামচ রাঁধুনি, ১ টি গোটা লাল লঙ্কা, ১/২ চা চামচ Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো, স্বাদ অনুযায়ী নুন ও চিনি, ২ টেবিল চামচ Shalimar's সর্ষের তেল, দেড় কাপ জল



কীভাবে বানাবেন

সব সবজি গুলো ডুমো করে কেটে নিতে হবে। সর্ষে পোস্ত বেটে আলাদা করে রেখে দিতে হবে। পাত্রে তেল গরম করে তাতে বড়ি ভেজে নিয়ে আলাদা করে রেখে দিতে হবে। এবার পাত্রে তেল দিয়ে উচ্ছে ও বেগুন ভেজে নিয়ে আলাদা করে রাখতে হবে। শুকনো লঙ্কার সাথে রাঁধুনি ও সামান্য গোটা সরষে দিয়ে দিতে হবে। শুধু উচ্ছে ছাড়া সব সবজি গুলো দিয়ে ভেজে নিতে হবে। হলুদ গুঁড়ো নুন দিয়ে ভালো করে ভেজে নিতে হবে। জল দিয়ে ঢেকে দিয়ে ঢিমে আঁচে রাখতে হবে। এই সময় উচ্ছে এবং ভাজা বড়ি দিয়ে দিতে হবে। সবজি গুলো সেদ্ধ হয়ে এলে তাতে সরষে পোস্ত বাটা ও একটু চিনি দিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে মিশিয়ে নিতে হবে। এবার আগুন থেকে নামিয়ে গরম গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।


সর্ষে ফুলের বড়া


সুস্মিতা চক্রবর্তী 



কী কী লাগবে

১ কাপ সর্ষে ফুল ছাড়িয়ে নেওয়া, ১/৪ আঁটি ধনেপাতা কুচি, ১/৪ কাপ নারকেল কোরা, ১ টি কাঁচালঙ্কা কুচি, ২ টেবিল চামচ চাল বাটা, ১ চা চামচ বেসন, স্বাদমতো নুন ও চিনি, পরিমাণ মত Shalimar's Sunflower তেল ভাজার জন্য।


কীভাবে বানাবেন

একটি পাত্রে সর্ষে ফুল নিয়ে তার মধ্যে নুন, চিনি, কাঁচালঙ্কা কুচি, নারকেল কোরা, ধনে পাতা কুচি, দিয়ে ভালো করে চটকে মেখে নিতে হবে। এবারে চাল বাটা ও বেসন দিয়ে মিশিয়ে নিতে হবে। জল দেওয়ার দরকার নেই, তবে বেশি শুকনো মনে হলে খুব সামান্য জল দিয়ে মাখা যাবে। এবার ঐ মিশ্রণ থেকে ছোট ছোট বল বানিয়ে নিতে হবে।তেল গরম করে তাতে বড়া গুলো ভেজে তুলে নিন এবং পরিবেশন করুন গরম ভাতের সঙ্গে। আমি খুব অল্প তেলে সেঁকে নিয়েছি,স্বাদে কোন হেরফের হয়নি।


সুগন্ধি ধোঁয়ায় চুলের যত্ন


নিজস্ব প্রতিনিধি


চুল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, ব্যক্তিত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই চুলের যত্ন নিয়ে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। আজকের দিনে বাজারে নানা ধরনের শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, সিরাম ও হেয়ার মাস্ক পাওয়া গেলেও বহু মানুষ আবার ফিরে তাকাচ্ছেন প্রাচীন ভারতীয় সৌন্দর্যচর্চার দিকে। সেই প্রাচীন রীতিগুলির মধ্যে অন্যতম হল সুগন্ধি ধোঁয়ায় চুলের যত্ন বা ‘হেয়ার ফিউমিগেশন’। আয়ুর্বেদে একে ‘ধূপন’ বলা হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে নারীরা চুল পরিষ্কার ও সুগন্ধি রাখতে নানা ভেষজ উপাদানের ধোঁয়া ব্যবহার করতেন। বর্তমানে এই পদ্ধতি আবার নতুন করে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।



সুগন্ধি ধোঁয়ায় চুলের যত্নের ধারণা নতুন নয়। প্রাচীনকালে যখন রাসায়নিক সুগন্ধি বা আধুনিক হেয়ার কেয়ার পণ্য ছিল না, তখন বিভিন্ন ভেষজ, ফুল, কাঠ ও রজন জাতীয় পদার্থ জ্বালিয়ে তার ধোঁয়ার মাধ্যমে চুলে সুগন্ধ আনা হত। শুধু সুগন্ধই নয়, এই ধোঁয়া চুল ও মাথার ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার প্রতিকারেও সহায়ক বলে মনে করা হত। ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের রীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে। আয়ুর্বেদের মতে, কিছু বিশেষ ভেষজ উপাদান আগুনে জ্বালালে যে ধোঁয়া সৃষ্টি হয়, তা মাথার ত্বককে পরিষ্কার রাখতে, অতিরিক্ত আর্দ্রতা দূর করতে এবং চুলে প্রাকৃতিক সুগন্ধ যোগ করতে সাহায্য করে। বিশেষত চুল ধোয়ার পর ভেজাভাব দূর করতে এবং দীর্ঘ সময় চুলে সুগন্ধ ধরে রাখতে এই পদ্ধতির ব্যবহার ছিল ব্যাপক। প্রাচীন রাজপরিবারের নারীরাও সুগন্ধি ধোঁয়ার সাহায্যে চুল পরিচর্যা করতেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। সুগন্ধি ধোঁয়া তৈরিতে সাধারণত ব্যবহার করা হয় গুগ্গুল, লোবান, চন্দন কাঠ, আগর, জটামানসি, শুকনো গোলাপের পাপড়ি, ল্যাভেন্ডার, রোজমেরি, কর্পূর, নিমপাতা এবং নানা ধরনের ভেষজ উপাদান। এই উপাদানগুলি অল্প আঁচে জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করা হয়। এরপর চুলকে সরাসরি আগুনের কাছে না নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে রেখে সেই ধোঁয়ার সংস্পর্শে আনা হয়। ধোঁয়া চুলের গোড়া থেকে ডগা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে এবং চুলে এক ধরনের প্রাকৃতিক সুগন্ধ রেখে যায়।



সুগন্ধি ধোঁয়ার অন্যতম বড় সুবিধা হল এটি চুলের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে। দূষণ, ঘাম, রান্নাঘরের ধোঁয়া কিংবা দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকার ফলে চুলে অনেক সময় অপ্রীতিকর গন্ধ তৈরি হয়। সুগন্ধি ধোঁয়া সেই গন্ধকে আড়াল না করে অনেক ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ করতে সাহায্য করে। ফলে চুল দীর্ঘ সময় সতেজ ও মনোরম সুবাসযুক্ত থাকে। মাথার ত্বকের পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতির কিছু সম্ভাব্য উপকারিতা রয়েছে। নিমপাতা, গুগ্গুল বা লোবানের ধোঁয়ায় জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকরা মনে করেন। যদিও আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা এ বিষয়ে এখনও সীমিত, তবুও দীর্ঘদিনের ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে যে এই ধরনের ভেষজ ধোঁয়া মাথার ত্বকের কিছু সাধারণ সমস্যা কমাতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষাকালে বা আর্দ্র আবহাওয়ায় মাথার ত্বকে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, তা কমাতে অনেকেই এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন। চুলে প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা আনার ক্ষেত্রেও সুগন্ধি ধোঁয়ার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। অনেকের মতে, ধোঁয়ার উষ্ণতা চুলের উপরিভাগে জমে থাকা অতিরিক্ত আর্দ্রতা দূর করে এবং চুলকে মসৃণ অনুভূতি দেয়। ফলে চুল কিছুটা বেশি উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত দেখাতে পারে। যদিও এটি কোনও অলৌকিক সমাধান নয়, তবুও নিয়মিত পরিচর্যার অংশ হিসেবে এর ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করেন অনেক ব্যবহারকারী।



সুগন্ধি ধোঁয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল মানসিক প্রশান্তি। চন্দন, ল্যাভেন্ডার বা গোলাপের মতো সুগন্ধযুক্ত উপাদান থেকে নির্গত সুবাস মনকে শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। অ্যারোমাথেরাপিতেও এই ধরনের প্রাকৃতিক সুগন্ধ ব্যবহৃত হয়। তাই চুলে সুগন্ধি ধোঁয়া দেওয়ার অভিজ্ঞতা অনেকের কাছে শুধু সৌন্দর্যচর্চা নয়, বরং এক ধরনের মানসিক আরামেরও মাধ্যম। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ‘বাখুর’ নামে পরিচিত এক ধরনের সুগন্ধি কাঠ বা রজনের ধোঁয়া চুল ও পোশাকে সুবাস ছড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। বিশেষ অনুষ্ঠান, বিয়ে বা উৎসবের আগে অনেক নারী বাখুরের ধোঁয়া চুলে নেন। একইভাবে আফ্রিকার কিছু অঞ্চলেও ভেষজ ধোঁয়ার মাধ্যমে চুলের পরিচর্যার প্রথা দেখা যায়। এইসব ঐতিহ্য প্রমাণ করে যে সুগন্ধি ধোঁয়া ব্যবহারের রীতি শুধুমাত্র ভারতীয় সংস্কৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তবে সুগন্ধি ধোঁয়ার ব্যবহার নিয়ে কিছু সতর্কতাও জরুরি। যে কোনও ধোঁয়া অতিরিক্ত মাত্রায় শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের হাঁপানি, অ্যালার্জি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। ধোঁয়া নেওয়ার সময় ঘর ভালোভাবে বায়ুচলাচলযুক্ত হওয়া উচিত এবং কখনওই চুলকে আগুনের খুব কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়।



এছাড়া সব ধরনের উপাদান সবার জন্য সমানভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। কোনও ভেষজ বা সুগন্ধি উপাদানে অ্যালার্জি থাকলে তা ব্যবহার না করাই ভালো। নতুন কোনও উপাদান ব্যবহার করার আগে তার প্রতি শরীরের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া দরকার। গর্ভবতী নারী বা বিশেষ শারীরিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। আধুনিক সৌন্দর্য শিল্পও এই ঐতিহ্যবাহী ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন হেয়ার স্পা ও ওয়েলনেস সেন্টারে হারবাল স্মোক থেরাপি বা হেয়ার ফিউমিগেশন পরিষেবা দেওয়া হয়। সেখানে বিশেষভাবে প্রস্তুত ভেষজ মিশ্রণের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়। অনেকেই একে বিলাসবহুল হেয়ার কেয়ার ট্রিটমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করছেন। তবে মনে রাখতে হবে, সুগন্ধি ধোঁয়া কোনও চিকিৎসা পদ্ধতি নয় এবং এটি চুল পড়া, খুশকি বা মাথার ত্বকের গুরুতর সমস্যার নির্ভরযোগ্য চিকিৎসার বিকল্পও নয়। এসব সমস্যার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সুগন্ধি ধোঁয়া মূলত একটি ঐতিহ্যবাহী পরিচর্যা পদ্ধতি, যা চুলে সুগন্ধ যোগ করা, সাময়িক সতেজতা আনা এবং পরিচর্যার অভিজ্ঞতাকে আরও আনন্দদায়ক করে তুলতে পারে।



বর্তমান সময়ে যখন মানুষ ক্রমশ প্রাকৃতিক ও রাসায়নিকমুক্ত বিকল্পের দিকে ঝুঁকছেন, তখন সুগন্ধি ধোঁয়ায় চুলের যত্নের মতো প্রাচীন রীতিগুলিও নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই পদ্ধতি শুধু চুলের পরিচর্যার একটি কৌশল নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিরও একটি অংশ। আধুনিক বিজ্ঞান এখনও এর সব উপকারিতা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি, তবুও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণে এটি মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। চুলের যত্নে সুগন্ধি ধোঁয়ার ব্যবহার তাই একদিকে যেমন সৌন্দর্যচর্চার একটি অভিনব উপায়, অন্যদিকে তেমনি অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক সুন্দর সংযোগ। সচেতনতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে ব্যবহার করলে এই প্রাচীন রীতি আজও চুলের পরিচর্যায় এক বিশেষ মাত্রা যোগ করতে পারে।


ভালোবাসার অন্তহীন পথ


জয়নারায়ণ সরকার


"জানো সুপ্রিয়, তোমার সঙ্গে হাঁটতে আমার খুব ভাল লাগে।"

হঠাৎ করে বলে শ্রেয়া। বিকেলের মসৃণ আলোয় ওর মুখটা জ্বলজ্বল করে উঠেছিল।

সুপ্রিয় খানিকক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে, "আমারও ভাল লাগে। জানো, কখনও কখনও মনে হয় দুজনে হাত ধরাধরি করে কোথাও চলে যাই।"

খিলখিল করে হেসে ওঠে শ্রেয়া। ওর হাসিতে প্রাণখোলা আনন্দ মিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। হাসি থেমে যেতে বলে, "দূর, কোথায় আর যাব। তোমার যা ব্যস্ততা। এই বুড়িমার পুকুরের ধারে এসে দাঁড়িয়েছি, এটাই তো অনেক।"

সুপ্রিয় খানিকটা উত্তেজিত হয়ে বলে, "আমার ব্যস্ততা মানে? কবে এমন হয়েছে, তুমি বলেছ আর আমি যাইনি?"

শ্রেয়া শান্ত স্বরে বলে, "তোমার তো আবার জনসেবা করতে ভাল লাগে। তাই বলছিলাম..."

এক টুকরো ঢিল পুকুরের জলে ছোড়ে সুপ্রিয়। ঢিলটা জলে পড়তেই ঢেউয়ের পর ঢেউ কিছু সময় ধরে খেলা করতে থাকে।

মোবাইলটা বেজে উঠতেই সুপ্রিয় ধরে। শ্রেয়া তখনও নিমগ্ন হয়ে ঢেউ খেলে যাওয়া জলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে।

ফোনটা কেটে পকেটে রাখতে রাখতে সুপ্রিয় বলে, "আজ চলো, কাল আবার আসব।"

অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শ্রেয়া বলে, "হঠাৎ কী হল, এখনই যেতে হবে? আরও একটু গল্প করি।"

ব্যস্ততার সঙ্গে সুপ্রিয় বলে, "না, আজ থাক। আবার কাল এই সময় দেখা হবে এইখানে।"

বলেই হনহন করে হাঁটতে শুরু করে সুপ্রিয়। শ্রেয়া কিছু না বুঝেই ওর পিছন পিছন হাঁটতে থাকে।


রাস্তাটা সোজা চলে গেছে শহরের দিকে। চারমাথার মোড় আসবার আগেই সুপ্রিয় বাঁদিকের গলিতে ঢুকে পড়ে। শ্রেয়া বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।

সন্ধের অন্ধকার ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় রাস্তার দু'পাশের দোকানগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। হঠাৎ করেই দোকানগুলোকে চিনতে অসুবিধা হচ্ছে শ্রেয়ার। এই রাস্তা দিয়ে ছোট থেকে কতবার যে হেঁটেছে, তা আর মনে করতে পারে না। কিন্তু আজ এমন কেন হল! কয়েক দিনের পরিচয়েই মন দিয়ে ফেলেছিল সুপ্রিয়কে। প্রথম কথা বলার সময় বুকের ভেতরে কে যেন হাতুড়ির ঘা মারছিল। তবে সুপ্রিয়র কথা আরও কাছে টেনে নিয়েছিল ওকে।

সুপ্রিয়র হাঁটাচলা, কথাবার্তা ওকে মোহিত করে তুলেছিল। এ কথা কাউকে বলতে পারেনি। মনের অন্দরের গোপন কুঠুরিতে বন্দি করে রেখেছিল। অবসর সময় ওই কুঠুরির তালা ভেঙে নানা স্বপ্নের জাল বোনা শুরু হয়ে যেত।

মোবাইল বেজে উঠতেই চমকে উঠে তাকায় স্ক্রিনের দিকে। "সু" লেখাটা জ্বলজ্বল করছে।

"হ্যালো!" বলে শ্রেয়া।

অন্যপ্রান্তে সুপ্রিয়র গলা শুনতে পায়। ফোনটা আরও শক্ত হাতে ধরে কানে চেপে ধরে।

সুপ্রিয় একনাগাড়ে বলে, "কিছু মনে কোরো না। কালকে তুমি যতক্ষণ বলবে আমি ততক্ষণ থাকব তোমার সঙ্গে। মনখারাপ করবে না, প্লিজ।"

একটাও কথা বলেনি শ্রেয়া। ফোনটা কেটে যায়।


সুপ্রিয়ের সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে পালটে যেতে থাকে শ্রেয়া। মনের ভেতরে সবসময়ই আলাদা একটা ফুর্তি অনুভব করে সে। প্রথম যেদিন দেখেছিল সুপ্রিয়কে, সেদিনটার কথা ভুলতে পারে না সে।

মামনদির ডাকে নাচ করতে গিয়েছিল ওদের পাড়ায়। রবি ঠাকুরের "চিত্রাঙ্গদা" নৃত্যনাট্য হয়েছিল। মামনদির সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ছবিদির নাচের স্কুলে। শ্রেয়া বরাবর নাচ ভাল করে। তাই মামনদি ওকে বলেছিল। রিহার্সালের শুরুর দিন থেকে বুঝতে পেরেছিল সুপ্রিয় কিছু একটা বলতে চায়। প্রথম প্রথম এড়িয়ে গিয়েছিল। রিহার্সাল শেষ হলেই সুপ্রিয় মুখিয়ে থাকত ওকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দেওয়ার জন্য। মামনদিও বলত, রাত একটু বেশি হয়ে গেছে, সুপ্রিয় তোকে বাড়ি পৌঁছে দেবে। আরও কয়েকজন ছেলে থাকতে কেন যে ওর কথা বলত, শ্রেয়া বুঝতে পারত না। শ্রেয়া রাজি না হলেও প্রথমদিন সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে পৌঁছে দিয়েছিল সুপ্রিয়। সাইকেল চালাতে চালাতে অনেক কথা বলেছিল। শ্রেয়ার খারাপ লাগেনি। তারপর থেকে মামনদি না বললেও রিহার্সাল শেষ হলেই সুপ্রিয় এসে সামনে দাঁড়িয়ে পড়ত। শ্রেয়া শুধু বলেছিল, "সাইকেলে আর যাব না। হেঁটে চলুন।"

সুপ্রিয় মৃদু হেসে বলেছিল, "ঠিক আছে, সাইকেলে যেতে হবে না। তবে আপনি বলছ কেন?"

অন্ধকারে জিভ কেটে শ্রেয়া বলেছিল, "আসলে কয়েক দিন মাত্র আলাপ হয়েছে। তাই আর কী!"

সুপ্রিয় হো হো করে হেসে উঠে বলেছিল, "আচ্ছা, একটু পুরনো হলে তবেই তুমি বলবে?"

শ্রেয়া মৃদু হেসে উঠেছিল। সেই রাতটা ছিল জ্যোৎস্নার আলোয় আলোকিত! শ্রেয়ার মৃদু হাসিতে মুখটা বেশ দেখতে লাগছিল।

অনুষ্ঠানের দিন যত এগিয়ে আসে সুপ্রিয়র ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। ক্লাবের ওই ছিল সেক্রেটারি। দল বেঁধে চাঁদা তোলা, ডেকোরেটার্স, লাইটের লোকদের সঙ্গে কথা বলা—এত ব্যস্ততার মধ্যেও নৃত্যনাট্যের রিহার্সালে থাকত সুপ্রিয়।

শ্রেয়ার বুঝতে এতটুকুও অসুবিধা হয়নি।


মোবাইলটা বেজে ওঠে। সুপ্রিয় "হ্যালো" বলতেই ওপারে শ্রেয়ার গলা শুনতে পায়।

শ্রেয়া বলে, "আজ বিকেলে গোডাউন মাঠের পাশে দেখা করবে?"

সুপ্রিয় চটজলদি বলে, "বিকেল মানে, ক'টার সময়?"

শ্রেয়া বলে, "পাঁচটার সময়।"

সুপ্রিয় "হ্যাঁ" বলতেই ফোনটা কেটে যায়।


সুপ্রিয় একটু আগেই পৌঁছে গেছে গোডাউন মাঠে। অপেক্ষা করতে থাকে শ্রেয়ার জন্য। কত কী মনে মনে ভাবে। কিছুক্ষণ পরে শ্রেয়া আসে। দুজনে মাঠের একপাশে গিয়ে বসে। তখন সবে সন্ধে নামছে। ওই মাঠে আরও কয়েক জোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা বসে।

সুপ্রিয় বলে, "হঠাৎ এভাবে দেখা করতে বললে?"

শ্রেয়া দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, "বাড়িতে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। কোনও কিছু করতে ভাল লাগছিল না। এমনকী নাচের স্কুলেও যাওয়া হয়নি বেশ কয়েক দিন।"

সুপ্রিয় বলে, "কেন?"

শ্রেয়া কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর বলে, "আসলে তোমাকে দেখতে পাচ্ছিলাম না!"

সুপ্রিয় তার ডান হাত বাড়িয়ে ওর হাতটা ধরে। শ্রেয়া মাথা নিচু করে বসে থাকে।

সুপ্রিয় বলে, "দূর, পাগলি মেয়ে কোথাকার! এভাবে থাকলে তো কিছুই করতে পারবে না। আমি সবসময় আছি তোমার সঙ্গে।"

শ্রেয়া দুটো হাত দিয়ে ওর হাতটা চেপে ধরে। দক্ষিণের হাওয়া উথালপাথাল করে তুলছিল দুজনকে। নিবিষ্ট হয়ে কতক্ষণ বসেছিল তা আর মনে নেই।


সুপ্রিয় একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি পেয়েছে। ফোনে সেই খবরটা দিয়েছিল শ্রেয়াকে। আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল। তবে শুধুমাত্র ছুটির দিনগুলোতে দেখা হবে ভেবে মনটা বিষণ্ণও হয়ে উঠেছিল।

প্রতিদিন ফোনে কথা হয়। আর মুখিয়ে থাকে ছুটির দিনগুলোর জন্য। সপ্তাহগুলো বড্ড লম্বা মনে হয় শ্রেয়ার।


ছুটির দিন বিকেল থাকতে থাকতে ওরা দুজনে রওনা দিয়েছিল দক্ষিণপাড়া কালী বাড়ির উদ্দেশে। লোকমুখে শুনেছে অধিষ্ঠাত্রী কালী মা নাকি জাগ্রত! শ্রেয়ার জোরাজুরিতে রাজি হয়েছিল সুপ্রিয়। বিশাল একটা মাঠ পেরিয়ে যেতে হয় মন্দিরে। মন্দিরের পাশে পুকুর ও গাছ দেখতে পায়। একটা বটগাছ মন্দিরের পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে। সেই গাছে জড়িয়ে আছে নানা মনোস্কামনা পূর্ণ করার সুতো। মন্দিরে ঢোকার মুখে একটা ছোট্ট দোকান দেখতে পায়। সেখান থেকে পুজোর ডালা কিনেছিল শ্রেয়া। ওড়না দিয়ে ঘোমটা দিয়ে মন্দিরে ঢুকেছিল শ্রেয়া। সুপ্রিয় অবাক চোখে দেখছিল ওকে! সেরকম লোকজনের ভিড় নেই। তবে পৌষ মাসে নাকি এই মন্দিরে ভিড় লেগে থাকে। শ্রেয়া দ্রুত হেঁটে এগিয়ে যায়, সুপ্রিয় খানিকটা পিছিয়ে পড়ে। পুজো শেষ করে বটগাছের সামনে দাঁড়ায় শ্রেয়া। পুজোর ডালাটা সুপ্রিয়কে দিয়ে লাল সুতো বেঁধে দেয় বটগাছে। চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে।

অন্য এক শ্রেয়াকে দেখতে পায় সুপ্রিয়। ওড়নার ঘোমটার আড়ালে কপালে কালী মায়ের আশীর্বাদী লম্বা লাল টিপ ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

কপালে নেমে আসা ওড়নাটা আলতো করে সরিয়ে দেয় সুপ্রিয়। অবাক চোখে দেখতে থাকে শ্রেয়াকে। সুপ্রিয়র খুব ইচ্ছে করছিল ওকে বুকের মাঝে টেনে নিতে। দু'একজন এদিক-ওদিক থাকায় নিজেকে সামলে নিয়েছে। অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে, মঠের ভেতরে ছড়িয়ে থাকা কৃত্রিম আলোর মাঝে দুজনে হাত ধরে ফিরে আসছে। লাল টিপ পরা শ্রেয়ার মুখটা বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে সুপ্রিয়র। ভালবাসার অন্তহীন টানে দুজনে হাঁটতে শুরু করেছে আগামীর পথে।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page