ইলিশ কাহন.. রান্না পুজো, অরন্ধণ এবং বিশ্বকর্মা..কমিকস্, ভালো না মন্দ..
- রোজকার অনন্যা

- Sep 15, 2024
- 19 min read
বাঙালদের কাছে জোড়া ইলিশ মানেই বড় শুভ, বড় সুলক্ষুণে। পুজো পার্বণ থেকে বিয়ে সবার সঙ্গেই এর রসায়ন প্রগাঢ়। বাঙালি বাড়িতে মেয়ের বিয়ের পাকা কথা হলেও জোড়া ইলিশ আনার রীতি রয়েছে অনেক বাড়িতে। জোড়া ইলিশ কলাপাতা ছড়ানো পেতলের কুলোয় রেখে, মুখে দেওয়া হয় গঙ্গাজল আর পানের খিলি, কপালে ছোঁয়ানো হয় তেল সিঁদুর। পড়ানো হয় পাট ভাঙ্গা লাল হলুদ ছোপানো শাড়ি আর নাকে নোলক। সবশেষে সেই কুলো ছোয়ানো হয় আইবুড়ো মেয়ের মাথায়। এককালে কলকাতার অনেক বনেদী বাড়িতেও নিয়ম ছিল মরশুমের প্রথম ইলিশ ঘরে এলে নোড়ার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তেল সিঁদুর ছুইয়ে উৎসর্গ করা হতো কূলদেবীকে।

ফুটবলের ময়দানেও এর জনপ্রিয়তা কম নয়। একসময় ইস্টবেঙ্গল জিতলে বাজারে চড়া দামে হু হু করে বিকত ইলিশ ঐদিন বাঙাল হেঁশেলে ইলিশ আসা যেন বাধ্যতামূলক! সেই রামও নেই আর সে রাজত্বও নেই এখন বাজারে ভালো ইলিশ আসে কদাচিৎ আর চড়া দাম তা তো সারা বছরই! তাই বলে কি ইলিশ খাবো না? দাম যাই হোক জলের রূপোলি শস্য বাজারে আসতে দেরি আছে, বিকোতে দেরি নেই। আর কি থলে হাতে বেরিয়ে পড়ুন, রেসিপি তো রইলোই।

অর্পিতা চক্রবর্তী
ইলিশ দো-পেঁয়াজা
কী কী লাগবে
ইলিশ মাছ ৪ টুকরো, পেঁয়াজ কুচি দেড় কাপ, আদা-রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, Shalimar's জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, চেরা কাঁচালঙ্কা ৪-৫ টি, Shalimar's সর্ষের তেল ১/২ কাপ, নুন ১/২ চা চামচ, টকদই ২ টেবিল চামচ
কীভাবে বানাবেন
মাছের টুকরোগুলো ধুয়ে নুন হলুদ মাখিয়ে নিন। কড়াইতে Shalimar's সর্ষের তেল গরম করে হালকা ভেজে তুলে রাখুন। এবার তেলে পেঁয়াজ কুচি ছেড়ে ভাজুন। পেঁয়াজে বাদামি রং ধরলে খানিকটা তুলে রেখে এতে Shalimar's জিরে গুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, নুন, Shalimar's হলুদ দিয়ে সাতলান। এরপর আদা-রসুন বাটা দিয়ে আরও কিছুক্ষণ সাতলান। মশলার কাঁচা গন্ধ চলে গেলে ফেটানো দই দিয়ে আর একটু নাড়াচাড়া করে ভেজে রাখা মাছের টুকরোগুলো দিয়ে দিন। একটু নেড়ে অল্প গরম জল, তুলে রাখা ভাজা পেঁয়াজ আর চেরা কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। ৫ মিনিট পর ঢাকনা খুলে গোটা কাঁচা লঙ্কা ও ধনেপাতা ছড়িয়ে দিলেই ইলিশ দো-পেঁয়াজা পরিবেশনের জন্য তৈরি।
ইলিশের মাথা দিয়ে কচু শাক
কী কী লাগবে
ইলিশ মাছের মাথা ২টি, কচুর শাক ১ আঁটি, Shalimar's সর্ষের তেল ১/২ কাপ, কালোজিরে ১/২ চা চামচ, শুকনো লঙ্কা ২-৩ টে, চেরা কাঁচালঙ্কা ৭-৮ টা, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, Shalimar's জিরে গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, Shalimar's ধনে গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১/৪ কাপ, আদা-রসুনবাটা ১ চা চামচ, লেবুর রস ১ টি, স্বাদমতো নুন ও চিনি, ভেজানো ছোলা প্রয়োজন মতো, নারকোল কোড়া প্রয়োজন মতো

কীভাবে বানাবেন
প্রথমে কচু শাকের ডগা ও কেটে রাখা কচুশাক অল্প নুন ও লেবুর রস দিয়ে সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে চটকে রাখুন।
এবার কড়াইতে তেল গরম করে ইলিশ মাছের মাথাতে নুন, Shalimar's হলুদ মাখিয়ে ভাল করে ভেজে তুলে নিন। ওই তেলে কালোজিরে, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। সুগন্ধ বেরোলে পেঁয়াজ কুচি ভাজুন। সোনালী রং ধরলে একে একে ভেজানো ছোলা, আদা রসুন বাটা, জিরে, ধনে, Shalimar's লঙ্কা গুঁড়ো সামান্য চিনি দিয়ে ভাল করে সাঁতলাতে হবে। মশলার কাঁচা গন্ধ চলে গেলে সেদ্ধ করা কচুশাক ছেড়ে আবার বেশ কিছুক্ষণ সাঁতলান। জল শুকিয়ে আসলে ভেজে রাখা মাছের মাথা, নারকোল কোরা ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে আরো খানিকক্ষণ নাড়াচাড়া করুন। তেল ছেড়ে আসলেই তৈরি ইলিশের মাথা দিয়ে কচুর শাক।
ইলিশ মাছের ল্যাজা ভর্তা
কী কী লাগবে
ইলিশ মাছের ল্যাজা ২টি,
নুন ১/২ চা চামচ, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, কুচোনো পেঁয়াজ ১/২ কাপ, Shalimar's সর্ষের তেল ১/২ কাপ, ধনেপাতা কুচি, শুকনো লঙ্কা ৪ টে, ২ টো কাঁচালঙ্কা কুচোনো
কীভাবে বানাবেন
ইলিশ মাছের ল্যাজা ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নুন, Shalimar's হলুদ মেখে কড়াইতে Shalimar's সর্ষের তেল গরম করে ভালো ভাবে ভেজে নিন। এবার এই ভাজা ল্যাজা ঠান্ডা করে কাঁটা গুলো বেছে নিন। মাছ ভাজার তেলে শুকনো লঙ্কা ভেজে স্বাদ অনুযায়ী নুন দিয়ে একটা বাটিতে ভাল করে গুঁড়িয়ে নিন। এরপর এতে একে একে কাঁটা বাছা ল্যাজা, মাছ ভাজার তেল, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচালঙ্কা কুচি, ধনেপাতা কুচি হাত দিয়ে ভালো ভাবে চটকিয়ে মেখে নিন। এবার Shalimar's সর্ষের তেল আর লেবুর রস মিশিয়ে নিলেই তৈরি ইলিশের ল্যাজা ভর্তা। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে চালকুমড়োর ঘন্ট
কী কী লাগবে
কচি চালকুমড়ো ১টি, ইলিশ মাছের মাথা ১টি, ১/৪ চা-চামচ কালোজিরে, ১ টা শুকনো লঙ্কা, ১/২ চা-চামচ Shalimar's হলুদ গুঁড়ো, ১/২ চা চামচ Shalimar's জিরে গুঁড়ো, ১/২ চা চামচ Shalimar's ধনে গুঁড়ো, ১/২ চা-চামচ কাশ্মীরি লঙ্কাগুঁড়ো, ১ চামচ আদাবাটা, ৩ টেবিল চামচ Shalimar's সর্ষের তেল, ২ টো কাঁচালঙ্কা, নারকোল কোরা ২ টেবিল চামচ, ভেজানো ছোলা এক মুঠো, স্বাদ মতো নুন, চিনি
কীভাবে বানাবেন
প্রথমে চালকুমড়ো ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে কুচিয়ে রাখুন। নুন-হলুদ দিয়ে ইলিশ মাছের মাথা মাখিয়ে নিন। কড়াইতে Shalimar's সর্ষের তেল গরম করে ইলিশ মাছের মাথা ছেড়ে ভেজে তুলে রাখুন। এবার ওই তেলে কালোজিরে ও শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে তাতে ভেজানো ছোলা, আদাবাটা, Shalimar's জিরে, Shalimar's ধনে, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে সাঁতলাতে হবে। সুগন্ধ বেরলে কুচোনো চালকুমড়ো দিন। পরিমাণ মত নুন দিয়ে নাড়াচাড়া করে ঢাকা দিয়ে চড়া আঁচে রান্না করুন। চালকুমড়োর জলেই সেদ্ধ হয়ে যাবে। জল টেনে এলে Shalimar's হলুদ, সামান্য চিনি ও ভেজে রাখা মাছের মাথা ছেড়ে ভালো করে কষুন। তেল বেরিয়ে এলে নারকোল কোরা, ২ টো কাঁচালঙ্কা দিয়ে আর একটু নাড়াচাড়া করে নামিয়ে পরিবেশন করুন।
বেরেস্তা ইলিশ পোলাও
কী কী লাগবে
গোবিন্দভোগ চাল ২ কাপ,
দারুচিনি ২ টুকরা, ইলিশ মাছ ৪ টুকরো, গোলমরিচ ৮-১০ টি, আদা বাটা ১ চা চামচ, পেঁয়াজ বাটা ১/২ কাপ, আদা-রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ স্লাইস ১ কাপ, টকদই ১/৪ কাপ, জল ৩ কাপ, Shalimar's হলুদ ১/৪ চা চামচ, দুধ ১ কাপ, Shalimar's জিরে গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪-৫ টি, Shalimar's ধনে গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, চিনি ১ চা চামচ, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো-১ চা চামচ, Shalimar's সাদা তেল আধা কাপ, এলাচ ৪ টি, ঘি ২ টেবিল চামচ, বড় এলাচ ১টি, অর্ধেকটা লেবুর রস, নুন, চিনি, লবঙ্গ ৪ টে

কীভাবে বানাবেন
মাছের টুকরাগুলো ধুয়ে নুন, Shalimar's হলুদ মাখিয়ে নিন। কড়াইতে Shalimar's সাদা তেল গরম করে মাছের টুকরোগুলো ছেড়ে হালকা ভেজে তুলে রাখুন। এবার ওই তেলে পেঁয়াজ কুচি ভাজুন। পেঁয়াজে বাদামি রং ধরলে তুলে রাখুন, বেরেস্তা তৈরী। এবার একটি বাটিতে পেঁয়াজ বাটা, আদা-রসুন বাটা, নুন, Shalimar's জিরে, Shalimar's ধনে, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, ফেটানো দই, সামান্য Shalimar's সাদা তেল ও লেবুর রস দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। ঐ মশলা ১৫ মিনিট ইলিশের টুকরো গুলোতে মাখিয়ে রাখুন। তারপর তেলে মাছ থেকে মশলা আলাদা করে ৫ মিনিট সাঁতলে নিন। মাছের টুকরোগুলো ছেড়ে আরো কিছুক্ষণ সাতলে নিন। তেল ভেসে উঠলে নামিয়ে নিন।
অন্য একটি কড়াইতে সাদা তেল ও ঘি গরম করে থেতো করা ছোট এলাচ, বড় এলাচ, লবঙ্গ, দারচিনি, গোলমরিচ ফোড়ন দিন। তাতে ধুয়ে জল ঝরানো গোবিন্দভোগ চাল ছেড়ে মিনিট ২ নাড়াচাড়া করুন। চাল ভাজা ভাজা হলে আদা বাটা, নুন ও ২ টেবিল চামচ চিনি দিয়ে আরো কিছুক্ষন নাড়াচাড়া করে মাপমত দুধ, জল, ৪-৫ টা কাঁচালঙ্কা, খানিকটা বেরেস্তা ও মাছ ছেঁকে মশলাটা তুলে, ছড়িয়ে দিয়ে ভাল করে মিশিয়ে ঢাকা দিয়ে আঁচ কমিয়ে রান্না করুন। জল শুকিয়ে ঝরঝরে হলে ইলিশ মাছগুলো পোলাওয়ের উপর বিছিয়ে আরো কয়েকটি কাঁচালঙ্কা, খানিকটা বেরেস্তা ও ঘি ছড়িয়ে ঢাকা দিয়ে ঢিমে আঁচে মিনিট ৫ দমে বসান। হয়ে গেলে গরম গরম পরিবেশন করুন বেরেস্তা ইলিশ পোলাও।
রক্তিমা কুন্ডু
ইলিশ ভাঁপা
কী কী লাগবে
৩ টুকরো ইলিশ মাছ, ৬ টি চেরা কাঁচালঙ্কা, ২ টেবিল চামচ সাদা সর্ষে, ১ টেবিল চামচ কালো সর্ষে, ১ টেবিল চামচ জলঝরানো টকদই, ১ চা চামচ মিষ্টি দই, ৩ টেবিল চামচ Shalimar's সর্ষের তেল, স্বাদমত নুন, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো, কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো, জল

কীভাবে বানাবেন
মাছগুলো তেল, নুন, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো আর কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। সর্ষে আর ২ টো কাঁচালঙ্কা বেটে তাতে নুন, হলুদ, দু রকম দই আর জল দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে তাতে ম্যারিনেটেড মাছগুলো মেখে নিন। এবার একটি স্টিলের টিফিন বক্সে আগে সর্ষের মিশ্রণ ঢেলে ওপর থেকে মাছগুলো বসিয়ে চেরা কাঁচালংকা আর Shalimar's সর্ষের তেল ছড়িয়ে ঢাকনা বন্ধ করে ভাঁপিয়ে নিলেই তৈরী।
প্রিয়াঙ্কা মন্ডল
ইলিশ পাতুরি
কী কী লাগবে
ইলিশ মাছ ৬ টুকরো, পোস্ত ১ টেবিল চামচ, সাদা কালো সর্ষে ১ টেবিল চামচ, নারকেল কোরা আধ কাপ, কাঁচালঙ্কা ৫-৬ টা, নুন স্বাদ মতো, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, চিনি ১/২ চা চামচ, Shalimar's সরষের তেল ৪ টেবিল চামচ, কালোজিরা ১/২ চা চামচ, কলাপাতা।
কিভাবে বানাবেন
পোস্ত, সরষে, নারকেল কোরা একসাথে মিহি করে বেটে নুন, চিনি, কালোজিরা, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো, Shalimar's সরষের তেল একসঙ্গে মিশিয়ে একটি মিশ্রণ বানিয়ে রাখুন। কলাপাতায় তেল মাখিয়ে অল্প করে এই মিশ্রন, তার উপরে মাছ আবারও একটু মশলার মিশ্রন রেখে ওপরে একটা করে গোটা কাঁচালঙ্কা আর একটু তেল দিয়ে কলাপাতা মুড়ে সুতো দিয়ে বেঁধে নিন। ননস্টিক প্যানে তেল গরম করে উল্টে পাল্টে ভেজে তুলে নিলেই তৈরী।
সাধনা সাহা
সরষে ইলিশ
কী কী লাগবে
ইলিশ মাছ ৬ টুকরো, ২ টেবিল চামচ সাদা কালো সরষে ও ৫-৬ টা কাঁচালঙ্কা একসাথে বাটা, নুন স্বাদ মতো, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, চেরা কাঁচালঙ্কা ২টো, কালোজিরা ১/২ চা চামচ, Shalimar's সরষের তেল ৪ টেবিল চামচ।
কীভাবে বানাবেন
একটি পাত্রে একে একে সব উপকরণ একসঙ্গে মেখে নিন। স্টিলের টিফিন বক্সে ঢেলে ঢাকনা বন্ধ করে ভাপিয়ে নিলেই তৈরী সরষে ইলিশ ভাঁপা।
সারমিন সেলিম তুলি
ইলিশ মাছের কোরমা
কী কী লাগবে
ইলিশ মাছ ৪ টুকরো, ঘি ১ টেবিল চামচ, Shalimar's তেল ১/৪ কাপ, পেঁয়াজ কুচি ১/২ কাপ, নুন স্বাদ মতো, পেঁয়াজ বাটা ১/৪ কাপ, কাজুবাদাম বাটা দেড় টেবিল চামচ, Shalimar'sলঙ্কা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, Shalimar's জিরা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, টকদই ১/৪ কাপ, কাঁচালঙ্কা ৪-৫ টা, দুধ ১/২ কাপ, চিনি ১ চা চামচ, বেরেস্তা ১/৪ কাপ
কীভাবে বানাবেন
প্যানে তেল ও ঘি একসাথে গরম করে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে নাড়ুন। নরম হলে পেঁয়াজ বাটা দিয়ে কিছুক্ষণ নেড়ে বাদাম বাটা, Shalimar's জিরে গুঁড়ো, Shalimar's লঙ্কা গুঁড়ো, নুন ও সামান্য জল দিয়ে কষুন। তেল ভাসলে জল ঝরানো টকদই দিয়ে কষুন। এবার চেরা কাঁচালঙ্কা আর জল দিয়ে ফুটে উঠলে মাছগুলো দিয়ে ঢেকে ৪-৫ মিনিট রান্না করুন। উল্টে দিয়ে আরো ৪-৫ মিনিট রান্না করুন। দুধ আর চিনি মিশিয়ে ফুটতে দিন। বেশ গা মাখা হয়ে তেল ভেসে উঠলে বেরেস্তা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।
সমিতা হালদার
দই ইলিশ
কী কী লাগবে
ইলিশ মাছ, টকদই, কাজুবাদাম, পোস্ত, নুন, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো, চেরা কাঁচা লঙ্কা, Shalimar's সরষের তেল
কীভাবে বানাবেন
টকদই, কাজুবাদাম, পোস্ত একসাথে বেটে নিন। একটি পাত্রে ইলিশ মাছ, এই মিশ্রন, নুন, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো, চেরা কাঁচা লঙ্কা আর Shalimar's সরষের তেল মাখিয়ে নিন। ননস্টিক প্যানে মশলাসহ মাছ দিয়ে অল্প আঁচে ঢেকে ১০ মিনিট রান্না করলেই তৈরী হয়ে যাবে ইলিশের এই বিশেষ পদ।
সানন্দা ভট্টাচার্য
সুগন্ধি ইলিশ
কী কী লাগবে
ইলিশ মাছ- ২ টুকরো, গন্ধরাজ লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, রোস্টেড গন্ধরাজ লেবুরপাতা-১ টি , সাদা সরষে বাটা ১ টেবিল চামচ, কালো সরষে বাটা ২ টেবিল চামচ, চিনি ও নুন আন্দাজমতো, Shalimar's সরষের তেল- ৬ টেবিল চামচ, Shalimar's হলুদ গুঁড়ো- ১ টেবিল চামচ, কাঁচা লঙ্কা -২ টি
কীভাবে বানাবেন
মাছ ধুয়ে নুন ,হলুদ ও গন্ধরাজ লেবুর রস মাখিয়ে রাখতে হবে ১০ মিনিট। একটি বাটিতে দু'রকম সরষে বাটা, Shalimar's হলুদ, নুন ও চিনি ভাল করে মিশিয়ে নিতে হবে। প্যানে Shalimar's তেল গরম করে কাঁচা লঙ্কা দিয়ে এর মধ্যে মিশ্রণটি দিতে হবে। ভাল করে নাড়িয়ে সামান্য জল দিয়ে এর মধ্যে ইলিশ মাছ দিতে হবে। মাখা মাখা হলে গ্যাস বন্ধ করে নামানোর আগে গন্ধরাজ লেবুর শুকনো পাতা টুকরো করে ছড়িয়ে গরম ভাতের সাথে পরিবেশন করুন গন্ধরাজ ইলিশ।
রান্না পুজো, অরন্ধন এবং বিশ্বকর্মা
ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
বাংলা ক্যালেণ্ডারে একে একে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র পেরুতে থাকে লাফিয়ে লাফিয়ে। আর ঋতু বৈচিত্রের ঘনঘটায় বাংলায় পালপার্বণেরও হিড়িক যেন দফায় দফায়। বর্ষা শেষ হয়ে শরৎকাল সমাগত। তখন আকাশের নীল ক্যানভাসে পেঁজা তুলোর মত মেঘ ভেসে বেড়ায় ইতিউতি। ভাদ্রের থইথই পান্না পুকুরে শাপলা, শালুক উদ্ধত গ্রীবা তুলে জানান দিয়ে বলে, "শরৎ এসে গেছে"।
সেইসঙ্গে ছড়িয়েছিটিয়ে শিউলি, কাশও। রাঢ়বাংলার ঘরে সারাটা ভাদ্রমাস জুড়ে ভাদুগানের মহড়ারও ইতি টানার ক্ষণ এগিয়ে আসে দিন কয়েকের মধ্যেই। ভাদুলক্ষ্মী বা ভাদুমণির বিসর্জন দেবে তারা। চাষীদের ঘরে ঘরে ভাদ্রের আউস ধান ওঠার খুশিতে ভাদ্রের সংক্রান্তিতে আবার লক্ষ্মী পুজোর ধুম।প্রতিবছর ইংরেজী ক্যালেণ্ডারের ১৭ই সেপ্টেম্বর মানেই যন্ত্রের পুজো, স্বর্গীয় প্রযুক্তিবিদ, যন্ত্রের কারিগর বিশ্বকর্মার পুজো। সেদিনই ভাদ্রের সংক্রান্তি। সেদিনই আবার মনসাপুজোর অরন্ধন বা রান্নাপুজো।
জ্যোতিষশাস্ত্রের ১২টি রাশির প্রতি রাশিতে এক মাস করে অবস্থান করে সূর্যদেব। তাই বিভিন্ন রাশিতে সূর্যের গোচরের দিন মোটামুটি স্থির। এর নাম precession of the equinox। প্রায় প্রতি বছরই ১৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বকর্মার পুজোর দিন পড়ে। সেদিন ভাদ্র মাসের শেষ তারিখেই নির্ধারিত। বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা বিশ্বকর্মার জন্মদিন বলে সেদিনই বিশ্বকর্মা জয়ন্তী। সেটি কোনো তিথি নয়, ভাদ্র মাসের শেষ দিন। তবে কোনোকোনো বারে ১৮ তারিখেও হয়। ঠিক যেমন এবছর পড়েছে। ভাদ্র সংক্রান্তির আগে বাংলা পঞ্জিকায় পাঁচটি মাসের দিন সংখ্যা ১৫৬। তা প্রায় বাঁধাধরাই। সেই হিসেবে বিশ্বকর্মা পুজোর ইংরেজি ক্যালেন্ডারের ১৭ সেপ্টেম্বরেই পড়া উচিৎ। কোনও কোনও বছরে এই পাঁচটি বাংলা মাসের মধ্যে একটি মাসে যদি ২৯ বা ৩২ দিন হয় তখনই বিশ্বকর্মা পুজোর দিন পিছিয়ে বা এগিয়ে যায়। এবছরের বাংলা ক্যালেন্ডারে জ্যৈষ্ঠ মাস ছিল ৩২ দিনের।
হিন্দু ধর্মে সব দেব দেবীর পুজোর তারিখ প্রতি বছর পালটে গেলেও একমাত্র দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা পুজো প্রতিবছর একই তারিখে পড়ে। আসলে পঞ্জিকানুসারে দেবদেবীর পুজোর তিথি স্থির হয় সূর্য এবং চাঁদের গতি প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। কিন্তু বিশ্বকর্মার পুজোর তিথি স্থির হয় কেবলই সূর্যের গতি প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে। যখন সূর্য সিংহ রাশি থেকে কন্যা রাশিতে গমন করে, তখনই সময় উত্তরায়ণের। দেবতারা নিদ্রিত থেকে জাগ্রত হন। বাংলার বাইরে কোনো কোনো প্রদেশে তাই বলা হয় কন্যা সংক্রান্তি। আসলে সূর্যের সঙ্গে বিশ্বকর্মার নিবিড় আত্মীয়তার বন্ধন। নিজকন্যা সংজ্ঞার বিবাহ দিয়েছিলেন তিনি সূর্যের সঙ্গে। আবার তখনো ইউরোপে দূরবীন আবিষ্কার হয়নি।
মার্কণ্ডেয় পুরাণে রয়েছে
“তেজসঃ শাহনং চক্রে বিশ্বকর্মা শনৈঃশনৈঃ।
তেনাস্মিন শ্যামিকা জাতা শতনোর্চিষ স্তথা।
অর্থাৎ “বিশ্বকর্ম্মা, অল্প অল্প করিয়া সূর্য্যের তেজ কীর্ত্তন করিয়া লইলেন, যে যে অংশ কর্তিত হইল সেই অংশটি শ্যামিকা অর্থাৎ কলঙ্ক হইল।” মানে যাকে আমরা দূরবীন দিয়ে দেখে সোলার স্পট নামে অভিহিত করেছি।
তা এই ভাদ্রের সংক্রান্তিতেই বিশ্বকর্মার পুজোর আয়োজন। যেহেতু একটানা বর্ষার প্রকোপে আকাশে এতদিন কালো মেঘের দাপটে বৃষ্টির ছিল অবারিত দ্বার তাই বুঝি মেঘমুক্ত নীল আকাশ রঙিন হয়ে ওঠে রঙবেরংয়ের ঘুড়ির সম্ভারে। আসন্ন উত্সবের সূচনার বার্তা নিয়ে আসছে তারা। কিছুটা কৃষিকাজের সাফল্যে, কিছুটা আসন্ন উৎসবের আগমন বার্তায়। শাস্ত্রে বলে সুপর্বা আসছে। মানে দেবলোক জাগ্রত হচ্ছেন। সেই খুশিতে। দুর্গার আগমনী আর শুভ উৎসবের ক্ষণ তাই সু-পরবের সূচনা যেন জনজীবনে।
বিশেষতঃ দক্ষিণবঙ্গে রান্নাপুজোর চল সেইদিনেই। কথায় বলে ভাদ্রে রান্না, আশ্বিনে পান্না অর্থাৎ ভাদ্রের সংক্রান্তিতে রান্না করে আশ্বিনের পয়লায় পান্তা খাওয়া। সেদিন তাদের ঘরে ঘরে মনসা পুজো। আসলে সারাটা শ্রাবণমাস জুড়ে সারাবাংলায় নদীনালা, খালবিলে সাপের বংশবৃদ্ধির কারণে মানুষ কিছুটা তঠস্থ থাকে। তাদের জীবনযাপনে অহোরাত্র এই সরীসৃপের সঙ্গে ওঠাবসা। তাই সর্পদংশন থেকে মুক্তিলাভের একমাত্র পথ দেখান যেন মনসা। অথচ দেবলোকের মূলস্রোতে ব্রাত্য শিবের অন্ত্যজ এই কন্যা মনসা। একদিকে ঘরে ঘরে এই অরন্ধন যেমন ঋতু পরিবর্তনের কারণে "পান্তা" বা ঠাণ্ডা খাওয়ার মূলে এক শারীরিক রক্ষাকবচ তেমনি কৃষিপ্রধান বাংলার অন্যতম কৃষি উৎসবও বটে। মনসা পুজোর মাধ্যমে থ্যাংক্স গিভিং যেন। তাই ষোড়শপচারে এলাহি রান্নার আয়োজন এই অরন্ধনে। ভাদ্রে উঠেছে আউস ধান, ইলিশ মাছ সহ নানাপ্রকার মরশুমি আনাজপাতি। তাই রান্নাপুজো যেন আরেক নবান্ন। আর সেখানে বিশ্বকর্মার ভূমিকাও কম নয়।
পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গী তে ‘ইন্দ্র’ ও ‘বিশ্বকর্মা’র মধ্যে সাদৃশ্য রয়েছে। যদিও বিশ্বকর্মার পুত্র বিশ্বরূপ কে বধ করেছিলেন ইন্দ্র তবুও বলি এই দুই দেব নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বমহিমায় বলীয়ান। দেবরাজ ইন্দ্রও যেমন বর্ষণের দেবতা। আবার বিশ্বকর্মাও নাকি সূর্যের মধ্যে সোলার স্পট সৃষ্টি করে মেঘ এনে বৃষ্টি নামানোর মূলে। জ্যোতির্বিদ বরাহমিহিরের বৃহৎসংহিতায় সূর্য্য-বিম্বের, অর্থাৎ সৌরকলঙ্কের কথা আরো স্পষ্টাক্ষরে রয়েছে। কেবল তাই নয়, অষ্টাদশ শতাব্দীতে হার্শেল সূর্য-বিম্বের সঙ্গে দুর্ভিক্ষের যে সম্বন্ধ দেখান বরাহমিহির বহুদিন পুর্ব্বেই তা বলেছেন...
“যস্মিন যস্মিন্দেশে দর্শনমায়াস্তি সূর্য্য বিস্বস্যাঃ।
এতসব তথ্য জেনে মনে হল ভাদ্রের সংক্রান্তিতে সূর্যের কন্যারাশিতে গমন, কৃষিকাজে সূর্যের অপরিহার্যতা আর বজ্রগর্ভ মেঘ ও তা থেকে বর্ষাকালীন বৃষ্টি সবের মূলে ইন্দ্রের পাশাপাশি, বিশ্বকর্মারও কিছু কেরামতি থাকলেও থাকতে পারে। সেইকারণেই কী তবে দেবলোকের এই স্থপতি তথা কারিগর বিশ্বকর্মার পুজোয় এত ধুম?
বৃহৎসংহিতা অনুসারে কৃষিজাত পণ্যের প্রতিভূ তিনি। কারণ তিনিই তো নিদাঘ গ্রীষ্মের শেষে সূর্যর মধ্যে কলঙ্ক সৃষ্টি করে সূর্যের দাপট কিঞ্চিৎ ম্লান করে দিয়ে বজ্রগর্ভ মেঘ সৃষ্টি করেন এবং অকৃপণ বর্ষণের মাধ্যমে কৃষিকাজের সুবিধে করে দেন। আগলে রাখেন চাষাবাদ। আর তখনি মনসা পুজোর অরন্ধন, বিশ্বকর্মা পুজোয় ধন্যবাদ জ্ঞাপন...সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। সেইসঙ্গে অরন্ধনের রান্না খাওয়া হয় পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন সবাই মিলে... সেও এক মিলনোৎসব বৈকি। কলকারখানায় বিশ্বকর্মাপুজোর মহা ধুম । চাষাবাদের যন্ত্রপাতি সেসবেরও ছুটি সেদিন। সবেতেই যেন বিশ্বকর্মার স্পর্শ। সেগুলির বছরে একটা মাত্র দিন নিরলস কর্ম বিরতিও চাই বটে।
তা এই যন্ত্রপাতির পুজো কেন? কারণ আজ যে সারা বিশ্ব জুড়ে এত প্রযুক্তির রমরমা, এত বিলাসিতার হাতছানি, এত যন্ত্রনির্ভরতা আমাদের জীবন তার মূলেও কিন্তু এই বিশ্বকর্মা। এত সব প্রাসাদোপম অট্টালিকা, বহুতল নির্মাণ... এসবের কৌশল, এমন কি বাস্তুতন্ত্র, সবকিছু সিভিল কন্সট্রাকশন, ইঞ্জিনিয়ারিং কারিগরি... বিশ্বকর্মাই এইসব যাবতীয় বিদ্যাকে প্রথম গ্রন্থিত এবং বাস্তবায়িত করে তুলেছিলেন। তাই বুঝি তাঁর পুজোয় তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানানো। পুরাকালের এই সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বিশ্বকর্মা সেই ঋগবেদের আমল থেকেই সুপরিচিত এক শিল্পী, একজন ঐশ্বরিক কারিগর।
"কর্তা শিল্প সহস্রাণাম্" অর্থাৎ এই দেবশিল্পী সহস্র শিল্পের অধিকর্তা।
আর বিশ্বকর্মা পুজো মানেই আগমনীর ঘন্টা বেজে ওঠা। তার আগেভাগে অরন্ধনের পান্তা, ঠাণ্ডা খেয়ে ও খাইয়ে যেন গাঁয়ে ঘরে আবালবৃদ্ধবনিতার বাৎসরিক এক টীকাকরণ কর্মসূচী। জলবায়ু গত কারণে গ্রীষ্মপ্রধান রাজ্যাগুলিতে আষাঢ় মাসে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে যে বর্ষাকাল আসে ভরা বর্ষায় সাপেদের প্রাদুর্ভাবে গ্রামে গঞ্জে এখনো প্রচুর মানুষের প্রানাহানি হয়। তাই বুঝি মনসা পুজো সর্পকুল কে তুষ্ট রাখারও এক প্রয়াস।
মনসাপুজো অতি জনপ্রিয় লৌকিক উৎসব। দক্ষিণবঙ্গে মানুষের জলে জঙ্গলে কাল কাটানো, সাপখোপেদের সঙ্গে তাদের অহোরাত্র ওঠাবসা। তাদের বিশ্বাস তাদের প্রত্যেকের ঘরের নীচে যে বাস্তুসাপ আছে, যে সারাবছর তাদের বালবাচ্ছাদের বাঁচিয়ে রেখেছে, যার নজরদারিতে তারা সম্বচ্ছর বেঁচেবর্তে রয়েছে তাকে বছরের একটা দিন মনে করে পুজো করা। মা মনসা তুষ্ট হলে তবেই সাপেরা উৎপাত করবেনা। গোবরছড়া দিয়ে রান্নাঘর, উঠোন নিকিয়ে, শুকনো করে, ধোয়ামোছা করে, ঘর রং করে ষোড়শ উপচারে সংক্রান্তির দিন রাতে তারা নতুন উনুনে রান্না করে।
ভাত, ডাল চচ্চড়ি, ছোলা দিয়ে কচুশাক, নারকোল দিয়ে কুমড়োর ঘন্ট, ইলিশমাছ, পোনা মাছ, চিংড়িমাছ, ডালবড়া, মাছভাজা, উচ্ছে-চিংড়ি, গাঁটিকচুর দম,শোলাকচু, নারকোল কোরা, সর্ষে-বাটা আর সর্ষের তেল দিয়ে মাখা ঘেঁটুফুল ও কচুপাতা বাটা, সর্ষে দিয়ে কচুর লতি আর শাপলা ডাঁটার ডাল, চালতার টক, পাঁচ বা সাত রকম ভাজা, পিঠেপুলি, পায়েস রেঁধে বেড়ে মনসাদেবীকে উত্সর্গ করে তারপর দিন সব ঠান্ডা খাবে তারা। যদি রান্নাবান্নায় কোনো অসঙ্গতি থাকে কিম্বা পরিচ্ছন্নতায় দোষত্রুটি থাকে তবে ঐ দিন মনসাদেবী সাপকে পাঠিয়ে সব খাবার বিষাক্ত করে দেন তাই এই পুজোর নিষ্ঠা চোখে দেখবার মত। মনসাপুজোয় ধূপধুনো নিষেধ। তবে মনসাগাছের ডাল, জল ঢালা পান্তার সঙ্গে পঞ্চব্যাঞ্জন এবং নৈবেদ্য তাঁর চাইই।
তারা কাঁটা মনসার ঝোঁপেঝাড়ে এখনো রেখে আসে দুধের বাটি আর কলা। ঘরের উঠোনের সামনের মাটিতে একটি মনসা গাছের ডাল পুঁতে রাখার রীতি। সেখানেও নিবেদন করা হয় কিছু রান্নাপুজোর ভোগদ্রব্য। পচা গরমে কখনো রোদ, কখনো বৃষ্টি। তাই রান্না শুরু হয় মাঝরাত থেকে আর বাসিভাতে ঠান্ডা জল ঢেলে রাখার রেওয়াজ। অগাধ বিশ্বাস নিয়ে তারা সেই পঞ্চ ব্যঞ্জন নিবেদন করে মনসা ঠাকুরাণী আর তাঁর চ্যালা নাগনাগিনীদের। ঠিক রাঢ়বঙ্গের শ্রাবণ সংক্রান্তির অনুরূপ।
ঘরের সামনে মাটির উনুন তৈরী করে প্রথমে তার সামনে খড়কুটো জ্বেলে শাঁখ, ঘন্টা, উলুধ্বনি দিয়ে মনসা কে আবাহন জানানোর রীতি। তারপর সেই উনুনে শুকনো তালপাতার আগুণে, নতুন মাটির হাঁড়িতে বসবে আতপচালের ভাত। বাকী সব রান্না হতে পারে কাঠকুটো আর কয়লার আঁচে। রান্না শেষ হলে উনুন ঠাণ্ডা হলে শাপলার মালা জড়িয়ে পরের দিনটিতে সারাদিনের মত বাড়ির রান্নাবান্নায় ইতি টানা হয়। মনসার ডালেও পরানো হয় শাপলার মালা। পিতৃতান্ত্রিক সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাতৃতন্ত্রের ভেরী বাজিয়ে ওঠেন মনসার উপাসকরা। সেখানেই সার্থক মনসা পুজো। যিনি নিজের অধিকার একদিন মর্ত্যলোকে তথা স্বর্গে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শিবের কন্যা হয়েও অন্ত্যজ দেবী বলে পুজো চেয়েও বারেবারে বিফল হন।
অন্ত্যজ, অবৈধ মেয়ের মেইনস্ট্রিম দেবলোকে জায়গা নেই। কিন্তু জেদের বশে দেবলোকে এন্ট্রি পেয়েই যেনতেনপ্রকারেণ বদলা নিয়েছিলেন এই মনসা। কেন পুজো পাবনা আমি? আর পুজো পাওয়া মানেই সমাজে এক্সেপটেন্স । একদিন সবাই মেনে নিল শিবের বিবাহ বহির্ভূত এই লড়াকু কন্যাকে। তাই আবারো মনসার জয়। মাতৃতন্ত্রের জয়। তাই দোখনে কাজের পরিচারিকার কলার টিউনে যখন বেজে ওঠে
"জয় জয় মা মনসা, জয় বিষহরি গো, বন্দনা করি মাগো মা মনসার চরণে, তারপরে বন্দনা করি মহাদেবের চরণে..”
আমি তখন রবীন্দ্ররচনাবলীর পাতা উলটে চলি। আবারো আবিষ্কার করি পুতুল পুজোর বিপথে হাঁটা এক আদ্যন্ত দার্শনিককে।
আজীবন স্রষ্টা রবিঠাকুর তাঁর মুক্তধারা নাটকে বলেছিলেনই তো...
"নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র।
তুমি চক্রমুখরমন্দ্রিত, তুমি বজ্রবহ্নিবন্দিত,
তব বস্তুবিশ্ববক্ষোদংশ, ধ্বংসবিকট দন্ত।
তব দীপ্ত অগ্নি শত শতঘ্নী, বিঘ্নবিজয় পন্থ।
তব লৌহগলন শৈলদলন, অচলচলন মন্ত্র।
কভু কাষ্ঠলোষ্ট্রইষ্টকদৃঢ়, ঘনপিনদ্ধ কায়া,
কভু ভুতলজল-অন্তরীক্ষ- লঙ্ঘন লঘুমায়া,
তব খনিখনিত্রনখবিদীর্ণ, ক্ষিতি বিকীর্ণ-অন্ত্র,
তব পঞ্চভূতবন্ধনকর, ইন্দ্রজালতন্ত্র।"
রবীন্দ্রনাথ ১৯৩০ সালে রাশিয়ার কর্মোদ্যোগী ছাত্রসমাজকে লক্ষ্য করে ‘রাশিয়ার চিঠি’র সাত সংখ্যক পত্রে লিখেছিলেন,
“এঁরা ‘বিশ্বকর্মা’; অতএব, এঁদের বিশ্বমনা হওয়া চাই। অতএব এঁদের জন্যই যথার্থ বিশ্ববিদ্যালয়।” এখানে কবিগুরু ‘বিশ্বকর্মা’ শব্দটিকে একটি ব্যাপক অর্থে প্রয়োগ করেছিলেন, পৌরাণিক ‘বিশ্বকর্মা’কে তিনি আধুনিক মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেছিলেন। তাই দেখা যায় যে, কবির চোখে আধুনিক বিজ্ঞানও যেন বিশ্বকর্মা, যে কিনা মানবকল্যাণের সৃষ্টিযজ্ঞে আত্মমগ্ন।
এই কারণে ‘জাভাযাত্রীর পত্রে’ (পত্র - ১) তিনি বলেছিলেন, “মানুষের অমরাবতী নির্মাণের বিশ্বকর্মা এই বিজ্ঞান।” পুরাণের বিশ্বকর্মাকে রবীন্দ্রনাথ কত বড় ও কত ব্যাপক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আমাদের রবিঠাকুর! ‘শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের’ বিশ্বকর্মা “সদাজনানং হৃদয়ে সন্নিবিষ্টঃ” (৪/১৭); তাঁর কর্মক্ষেত্র শুধুই প্রাসাদ নির্মাণ, রাজধানী নির্মাণ বা দেবতাদের অস্ত্র নির্মাণেই সীমাবদ্ধ নয়, তাঁর কর্মক্ষেত্র বাহ্যলোক থেকে মানুষের অন্তরলোকেও প্রসারিত, তিনি মানুষের হৃদয়েরও অধিপতি। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, “বিশ্বকর্মা যে তোমার চৈতন্যাকাশকে এই মুহূর্তে একেবারে অরুণরাগে প্লাবিত করে দিলেন। চেয়ে দেখো তোমারই অন্তরে তরুণ সূর্য সোনার পদ্মের কুঁড়ির মত মাথা তুলে উঠছে, একটু একটু করে জ্যোতির পাপড়ি চারিদিকে ছড়িয়ে দেবার উপক্রম করছে - তোমারই অন্তরে। এই তো বিশ্বকর্মার আনন্দ।”
তথ্যঋণঃ
"বিশ্বকর্মা পূজার নির্ঘণ্ট ও সময়সূচি" আনন্দবাজার পত্রিকা
রবীন্দ্র রচনাবলী
পৌরাণিক অভিধান, সুধীরচন্দ্র সরকার
রবীন্দ্রনাথ এবং বিশ্বকর্মা বিষয়ক প্রবন্ধ - রাণা চক্রবর্তী
রান্নাপুজোর তথ্য – লেখকের প্রত্যক্ষ করা বিভিন্ন সূত্র
কমিক্স, ভালো না মন্দ
পবিত্র সরকার
১. আমাদের মুদ্রিত শিশু সাহিত্যের একটা প্রান্তিক, কিন্তু মোটামুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল 'কমিক্স' বা ছবিতে বলা গল্প। তার নানা ধরন আছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় ধরন হল কার্টুন ধাঁচের ছবিতে আঁকা গল্প, যা খবরের কাগজের সপ্তাহান্তিক পাতায় বা অতিপত্র ('সাপ্লিমেন্টে') নিয়মিত ছাপা হয়। সেগুলি মোটামুটি হাস্যরসাত্মক, চরিত্রগুলির ছবি যেমন একটু মজা করে ভেঙেচুরে আঁকা, তাদের কথাবার্তা কাজকর্মও তেমনই মজার। তাদের নিজেদের জন্য সব সময় মজার না হলেও। অন্যদিকে অকার্টুনিত মোটামুটি বাস্তব চরিত্রের নানা চিত্রকাহিনি, যার মধ্যে বাঙালি পাঠকের কাছে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় আনন্দবাজার পত্রিকা-র অরণ্যদেব।
একটি বিদেশি কমিকস সিরিজের অনুবাদ, যার মূল নাম Phantom. এগুলির লক্ষ্য কিছুটা কিশোর-বয়সি আর বয়স্কতর পাঠকেরা। আবার গল্প-উপন্যাসের কমিক্সও প্রচুর প্রকাশিত হয়ে চলেছে। কয়েক বছর আগে একটি ছোটদের পূজা-সংখার উদবোধন অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। দুঃখিত, আজকাল তো আর পূজা-সংখ্যা বলা হয় না, অনেক ক্ষেত্রেই শারদ সংখ্যা বা উৎসব সংখ্যা বলা হয়। আগের স্ত্রীলিঙ্গ দেওয়া 'শারদীয়া' সংখ্যাও আর তত দেখি না। সে এক হিসেবে ভালোই, এ সব সংখ্যা ধর্মনিরপেক্ষতাকে সম্মান করছে।
তবে বাংলাদেশে এখনও ঈদ সংখ্যা প্রকাশিত হয় সেটা লক্ষ করেছি। 'শারদ' সংখ্যার কোনও সমস্যা নেই, তা ঋতুকে বোঝায় মাত্র, যে ঋতু সম্বন্ধে কারও আপত্তি করার কিছু নেই; আপত্তি করলেই বা শুনছে কে, শরৎ তার নিজের নিয়মেই ঘুরে ঘুরে আসবে। আর এও ঠিক যে, এটি বাঙালির একটি প্রিয় ঋতুই বলা চলে। যদিও বর্ষার ১১৫টি আর বসন্তের ৯৬টির বদলে শরতের জন্যে রবীন্দ্রনাথ মাত্র ২২টি গান লিখেছেন, তবু গানগুলি চমৎকার, কলকাতা রেডিও-টেলিভিশনের শিল্পীরা অনেকদিন আগে থেকেই তা গাইতে শুরু করে দেন। এমনকি তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে তারও মধ্যে আমরা আজি শরত-তপনে প্রভাত স্বপনে কী জানি পরান কী যে চায়' শুনেছি। কিছু করার নেই, পঞ্জিকার ঋতুর হিসেব প্রকৃতি মানবে এমন কোনও কথা আছে নাকি? প্রকৃতি মাঝে মাঝেই দেখিয়ে দেয় 'Who is the master'.

বুড়োদের যা সুবিধে-সেই অবান্তর কথার ঘুড়ি-ওড়ানো রেখে এবার আসল কথায় ফিরে এসে বলি, সেই অনুষ্ঠানে একটি 'সেমিনার'- এর ব্যবস্থা ছিল-- 'কমিক্স' কি ছোটদের পড়ার অভ্যেস কমিয়ে আনছে? এই নিয়ে তো কিছুদিন ধরেই আলোচনা আর লেখলিখি আমি লক্ষ করছিলাম। বুড়োদের আর- একটা সুবিধের সুযোগ নিয়ে আমি সেই আলোচনাচক্রে পুরো থাকতে পারিনি। কিন্তু যেটুকু ছিলাম, তাতেই দু'- একজন বক্তার কথায় মনে হল কমিক্স বিষয়ে তাঁদের অনুমোদন নেই, কমিক্সকে তাঁরা সভ্যতা ও সংস্কৃতির শত্রু বলে মনে না করলেও ছোটদের পড়ার অভ্যাসের পক্ষে ক্ষতিকর বলে মনে করেন। তারা নাকি ছবির ভক্ত হয়ে ওঠে, পড়ার নয়। ছেলেবেলায় আমাদের ইশকুলের রচনায় 'উপকারিতা' আর 'অপকারিতা'র একটা প্যারাগ্রাফ লিখতে হত, তা এঁরা অপকারিতার কথাটা খুব জমিয়ে বললেন।
জানি না, পশ্চিমে পত্রপত্রিকায় বা প্রকাশনায় যে 'গ্রাফিক নভেল'-এর জনপ্রিয়তা তৈরি হচ্ছে, বড়রাও তা পড়ছেন, সে সম্বন্ধেও এই বক্তারা একই • কথা বলবেন কি না- যে বুড়োদের এবার ছবির ভক্ত করে দেওয়া হচ্ছে, পড়া থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে। এই কথা শুনে আমি বেশ একটু ঘাবড়ে গেলাম, আমার থুতনি ঝুলে পড়ল। আমার নিজেকে দু'-দিক থেকে অপরাধী বলে মনে হতে লাগল। এক, আমি নিজে এখনও কমিকস পড়ি বা ' দেখি', তা ভালোই লাগে আমার। অনেক ইংরেজি খবরের কাগজে বা তাদের অতিপত্রে কমিক্সের যে- পাতাটি থাকে, আমি তা বেশ মন দিয়ে দেখি, আর দুই, আমি পিতা হিসেবে আমার সন্তানদের কমিক্সের হাতে অনেক বই তুলে দিয়েছি, তাতে কোনও টের পাইনি। বিবেকের দংশন লেখাপড়াতে তারা আহামরি কিছু না করলেও খুব খারাপ করেনি। এখন যদি বলা হয় কমিক্স না পড়ার জন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট হতে পারল না, আমি আরও ঘাবড়ে যাব।
আর আমার নাতিরাও এখন কমিক্স সানন্দে পড়ে, তাদের হাত থেকে তা কেড়ে নেওয়ার কথা ভাবতেই পারি না। কার্টুন কমিক্স আর বাস্তববাদী কমিক্সের তফাত মনে রেখেই বলছি, এ কথা ঠিক যে, আমাদের ছেলেবেলায় এত কমিক্স ছিল না। কিন্তু 'আনন্দবাজার পত্রিকা'র 'আনন্দমেলা'র পাতায় ধীরেন বলের ছবির গল্প ছিল, 'যুগান্তর'-এ 'ছোটদের পাততাড়ি'তেও তা ছিল। ছিল পিসিএল বা প্রফুল্লচন্দ্র লাহিড়ী বা কাফি খাঁ-র ছবির সঙ্গে হরেন ঘটকের চমৎকার ছড়া। ছবির বই ছিল। যেসব ডিটেকটিভ বই পড়তাম তাতে 'পাতায় পাতায়' ছবি না থাকলেও কিছু পাতাজোড়া আর্ট পেপারে ছাপা ছবি থাকত, প্রতুল বন্দ্যোপাধ্যায়, পূর্ণ চক্রবর্তী বা বলাইবন্ধু রায়ের। সে আমাদের ভালোই লাগত।
যাকে বুক ইলাস্ট্রেশন বলে ইংরেজিতে, তার তো অভাব বড়দের পাঠ্যবইয়ে খুব একটা ইলাস্ট্রেশন না থাকলেও শারদ সংখ্যায় বা সাপ্তাহিক- পাক্ষিক পত্রপত্রিকায় যেসব গল্প উপন্যাস নাটক ছাপা হত, তাতে বড় বড় শিল্পীদের- সমীর সরকার, সুধীর মৈত্র, সুবোধ দাশগুপ্ত, পূর্ণেন্দু পত্রী, কৃষ্ণেন্দু চাকি প্রমুখের ছবি থাকতই। সুকুমার রায়ের বইগুলোকে কি তাঁর আর সত্যজিৎ রায়ের ছবি ছাড়া ভাবা যায়? আমাদের বন্ধুরা বলবেন, ওগুলি তো কমিকস নয়, প্রতিচিত্রণ বা ইলাস্ট্রেশন মাত্র। বেশিরভাগ টেক্সট বা পাঠ তো বর্ণমালা সাজিয়ে, ছবি তার একটা অতি ক্ষুদ্র অংশ। অবশ্যই কমিকসের চরিত্র আলাদা। তাতে ছবিটাই গল্প বলে, নেহাত সংলাপ আর অতি অল্প বর্ণনা তাতে গোল সাদা জায়গায় ভরে দেওয়া থাকে। চিত্রপাঠই মূল, শব্দপাঠ যৎসামান্য।
তাতে 'সাহিত্য' তৈরি হয় না, কারণ সাহিত্য মূলত ভাষানির্ভর, আর মূল আকর্ষণ সেখানে ভাষানির্মাণ নয়, চিত্র নিহিত কর্মধারা বা 'অ্যাকশন'। তাতে কৃত্রিম নাটকীয়তাও বেশি হয়, শিল্পের থেকে তা কিছুটা দূর দিয়ে হাঁটে। ফলে, কমিকসের সঙ্গে প্রতিচিত্রিত সাহিত্যের মৌলিক তফাত আছে। প্রথম তফাত ভাষার অনুপাতে। আর তারই ফলে, এটা সকলেই লক্ষ করেছে যে কমিক্স প্রচুর জনপ্রিয় হলেও তা কখনওই ধ্রুপদি পর্যায়ে ওঠে না। বরং সাহিত্যের, বিশেষত নাটক ও কথাসাহিত্যের ধ্রুপদি সৃষ্টিগুলিকেই কমিক্স অনুকরণ করার ভালোমন্দ চেষ্টা করে।পরে, ষাটের বছরগুলো থেকেই বোধ হয় রামায়ণ-মহাভারতের গল্প বলা হতে লাগল পূর্ণ চক্রবর্তীর ছবির সঙ্গে, শিশু সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে, সেগুলো ছোটরা আনন্দ নিয়েই পড়ত।
ওই একই প্রকাশকের উদ্যোগে ধীরেন বলের 'তুতু-ভূতু' এল, এল মৌমাছির 'চ্যাঙা- ব্যাঙা'। ওই সময় বাজার ছেয়ে ফেলল 'ইন্দ্রজাল' কমিকস, তার কাটতিও বেশ ছিল। আর সেই সঙ্গে অধুনালুপ্ত সোভিয়েত আর চিনের অজস্র ছবির বই চলে এল, 'দাদুর দস্তানা' যেমন, কিংবা 'বোকা শেয়ালের গল্প' বা ওই ধরনের কোনও বই। আমাদের বাড়িতে তো 'দস্তানা যে ফাটো ফাটো' কথাটা আমাদের পরিবারের একটা লজ হয়ে গিয়েছিল, উপলক্ষ পেলেই আমরা সেটা ঝেড়ে দিতাম। তার পর স্বনামধন্য এবং প্রাতঃস্মরণীয় নারায়ণ দেবনাথ এলেন, তাঁর হাঁদা-ভোঁদা আর অন্যান্য কার্টুন কমিক্স বাঙালি শিশুদের কাছে এক আশীর্বাদ হয়ে এল বলে আমি মনে করি। করি এই জন্য যে, সে বইগুলো বাংলা পড়ার আকর্ষণ বাড়িয়েছে ছোটদের।
আমার বড় নাতি বাংলা বই পড়ার দিকে এগিয়েছে হাঁদা-ভোঁদা আর বাটুলের কমিকস পড়ে। এখন উনিশ বছর বয়সে সে নাতি বাংলা-ইংরেজি ছবিলেশহীন প্রচুর বই পড়ে, আবার বাঁটুল, ত্যাঁ- ত্যাঁ (Tintin) আর Asterix-ও পড়ে। বিদেশি লেডিবার্ড জাতীয় অজস্র পাতাজোড়া রঙিন ছবির বইও সে পড়ে। প্রথম বইয়ে কোনও ছবি থাকবে না- এই রকম একটা ফতোয়া ছিল লেনার্ড ব্লুমফিল্ড বলে এক ভাষাবিজ্ঞানীর। আমরা এই ফতোয়াতে বিশ্বাস করি না। আমরা ছেলেবেলায় 'বাল্যশিক্ষা' বলে একটা বইয়ে বর্ণপাঠ শিখেছিলাম, তাতে ছবি ছিল না এটা মনে আছে, বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়েও যেমন আগে ছবি ছিল না। সেটা খুব ভালো ব্যাপার ছিল বলে আমরা মনে করি না। তখন বর্ণপরিচয় ছিল একটা 'বাধ্যতামূলক' ব্যাপার, তাতে রসকষের কোনও অবকাশ অভিভাবকেরা রাখতেন না। বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ে প্রথম দিকে ছবি ছিল না, পরে কিছু ছবি, যেগুলি এখন পাই, তা তাঁর পুত্র যোগ করেন। যোগীন্দ্রনাথ সরকার যে সেই ১৮৯৭ সালে ছবি দিয়ে পদ্যে বর্ণ পরিচয় করালেন, তাতে বর্ণশিক্ষার সঙ্গে আনন্দের যোগ হল।
রবীন্দ্রনাথ 'সহজ পাঠ'-এ সেই আনন্দের মাত্রা আরও অনেক বাড়িয়ে দিলেন, তার সঙ্গে কল্পনার সৌন্দর্য আর কবিত্বের যোগ হল। নন্দলালের কাঠখোদাইজাতীয় ছবিগুলির কথা তো ভোলা যায় না। আমি সেমিনারের পুরোটা থাকিনি, তাই কমিক্সের পক্ষে কারা ছিলেন, কে কী বলেছেন তা জানি না। যাঁরা বিপক্ষে, তাঁরা কতটা বিপক্ষে ছিলেন, আরও বাঘা-বাঘা যুক্তি বিপক্ষে কেউ দিয়েছেন কিনা, আবার কোথাও একটা আপসরফা হয়েছে কিনা তাও জানি না। আমি শুধু আমার বয়সি একজনের বক্তৃতা শুনেই গম্ভীরভাবে মাথা চুলকে চলে এসেছি। আমি শুধু বলি, যা অবধারিত (ধরা যাক কম্পিউটার, মোবাইল বা গুঁড়োমশলার মতো), যাকে সভ্যতা থেকে আর উৎখাত করা কোনওক্রমেই সম্ভব হবে না, তার খারাপ দিকের চেয়ে ভালো দিকগুলো দেখার আর ব্যবহার করার চেষ্টাই করা উচিত।
একটা যুক্তিও শুনেছিলাম যে, কমিক্স শিশুর কল্পনাকে একটা ছবির মধ্যে আটকে দেয়, তার নিজের মতো কল্পনাতে বাধা দেয়। এটা আমার মোটেই জুতসই যুক্তি মনে হয়নি। শিশু, বা বয়স্করা, নিশ্চয়ইকোনও টেক্সট পড়বার সময় নিজের মনে মানুষগুলোর বা দৃশ্যপটের ছবি একটা কল্পনা করে নেয়। কিন্তু কমিক্সের শিল্পীর ছবি তাকে সংকীর্ণ করে তার মাথাতে একটা ছক চাপিয়ে দেয়, এ সম্বন্ধে মনোবিজ্ঞানীরা একই কথা বলবেন বলে মনে হয় না। তা হলে গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ বা চলচ্চিত্রায়ণ সম্বন্ধেও আপত্তির কারণ ছিল, বলা যেত তাও আমাদের কল্পনাকে ব্যাহত করে। তা কি সত্যই ঘটে।
একই গল্পের- উপন্যাসের একাধিক চলচ্চিত্র রূপ তো আমরা উপভোগ করি, এমনকি একই নাটকও বিভিন্ন পরিচালক কত বিভিন্নভাবে উপস্থিত করেন। তার সঙ্গে তাল মেলাতে আমাদের কোনও অসুবিধে হয় কি? এখানে ওই সব অত্যাধুনিক পাঠক- প্রতিক্রিয়া তত্ত্ব-ফত্ব আনার কোনও মানে আছে বলে আমার মনে হয় না। এর সঙ্গে কেউ কেউ ছোটদের সাহিত্যের 'কন্টেন্ট' বা বিষয়ের কথাও জুড়ে দেন।
অর্থাৎ ভূত রাক্ষস খোক্কস ইত্যাদির কথা শিশুদের পাঠ্য সাহিত্যে থাকবে কি না। এটা অন্যত্র আলোচনার বিষয়, ঠিক এখানকার নয়। আমাদের মতে শিশুর কল্পনার জগৎ, যা মানুষ দীর্ঘদিন ধরে তৈরি করেছে, একই সঙ্গে ইচ্ছাপূরক নানা বর্ণাঢ্য উপাদান আর ভয় আর আতঙ্কের উপাদান মিশিয়ে, তাকে কেটে ছোট করে দেওয়ার কোনও মানে হয় না। যুক্তিবাদী হিসেবে আমি শুধু এইটুকু দাবি করব যে, ভূত-প্রেত ইত্যাদি যে মানুষের কল্পনামাত্র, বাস্তব সত্য নয়, তার পাঠও যেন তার জন্য কোথাও প্রস্তুত থাকে, তার জ্ঞানের কোঠায় কোথাও সঞ্চিত রাখার জন্য। তার আবেগ ও কল্পনা তাকে মাঝে মাঝে অস্বীকার করে রোমাঞ্চিত হতেই পারে।

২. আমাদের মতে, বাচ্চাদের হাত থেকে ছবির বই বা কমিক্স কেড়ে নেওয়া এক নিষ্ঠুরের কাজ হবে। তার একটা বড় কারণ, অভিভাবক হিসেবে আমি, যেমন অন্যরাও লক্ষ করেছেন যে, ছবি বাচ্চাদের সহজে আকর্ষণ করে, এবং ছবির সেই আকর্ষণ যদি থাকে, তাহলে সেই আকর্ষণ ভাষাপাঠেও সঞ্চারিত হয়। এবং বর্ণপরিচয় যেমন ছবির মাধ্যমে অনেক সহজ, তেমনই বর্ণপরিচয়ের পরে কমিকসের বই বাচ্চাদের হাতে তুলে দিলে তারা ভাষার পাঠে আগ্রহী হয়ে ওঠে। আমার নাতির বাংলা পড়ার আগ্রহ বেড়েছে নারায়ণ দেবনাথের 'হাঁদাভোঁদা' আর অন্যান্য কমিক্স পড়ে, এ আমার পারিবারিক অভিজ্ঞতা। এবং এও দেখেছি যে, আমাদের মতোই বাচ্চারা একদিন ছবির আকর্ষণ ছেড়ে ছবিহীন বইয়ের পড়ায় সহজেই পৌঁছে যায়, কেউ কোনও আপত্তি করে না।
তার কারণ এই, আমাদের অনেক মধ্যবিত্ত ঘরে তাদের ভাষায় আশ্রিত সাহিত্যের দীক্ষা হয় প্রথমে শুনে, যখন ছবি-টবি কিছুই তাদের নাগালে থাকে না। তারা ছবিটা কল্পনা করে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'ছেলেভুলানো ছড়া'য় এই কথাটা আমাদের বুঝিয়েছেন। তারা মায়ের মুখে ছড়া শোনে, গান শোনে, ঠাকুমা-দিদিমার মুখে বা মায়ের মুখে ঘুমিয়ে পড়ার আগে গল্প শোনে। শোনে যখন তাদের বর্ণপরিচয়ই হয়নি।
ফলে, ছবি ছাড়াও যে সাহিত্য হয়, সাহিত্য কী তা না জানলেও সে তাদের মনে নিহিত হয়ে যায়। পরে লেখাপড়ার জগতে ঢুকলে তাদের উঁচু ক্লাসের পাঠ্যবইয়ে তত ছবি থাকে না। বাযে ছবি থাকে তার ছবিত্ব খুবই কম। ইতিহাসে রাজারাজড়ার ছবির ব্যাপারটা মনে করে দেখুন। পরে, বছর পঞ্চাশ ধরে অবশ্য পাঠ্য বইয়ের মধ্যে ছবি বেড়েছে, রংও যুক্ত হয়েছে। তারপর বাচ্চারা যখন ক্রমশ আরও ওপরে ওঠে শিক্ষার ধাপে ধাপে, তখন তাদের বইয়ে অত ছবি কোথায়?
তারা সুকুমার রায় পড়বে, রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, হেমেন্দ্রকুমার রায় পড়বে, পড়ার বই পড়বে, গ্রন্থাবলি পড়বে- ছবি যে তাদের সব পড়ার সঙ্গী হবে না তা তারা জানে। কাজেই কমিক্স বাচ্চাদের পক্ষে অপকারী, জানি না এই মত এখন কতজন পোষণ করেন- এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে অবশ্যই ভালো কমিক্স খারাপ কমিক্স আছে। ভালো মানে ছবির মান অনেক নীচু, প্রচুর বানান ভুল (যেসব শিল্পীরা ছবিগুলি আঁকেন এবং নিজেদের হাতের লেখায় কথাগুলি বসান তাঁদের বানানে প্রচুর দুর্বলতা থাকে) এবং প্রকাশক সেগুলি সংশোধনের ব্যাপারে সযত্ন হন না, এমন প্রায়ই দেখা যায়। প্রকাশকেরা এটা নিয়ে একটু ভাবুন, এই আমার প্রার্থনা। তবু বাচ্চারা কমিক্স পড়ুক, পড়তে পড়তে এগিয়ে যাক, এইটেই আমাদের স্বপ্ন। ভারতে যে এখনও প্রায় তিরিশ কোটি নিরক্ষর আছে- পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি নিরক্ষর এ দেশেই সেই অভিশাপ থেকে এ দেশ মুক্ত হোক।



































Comments