top of page

দূর পাহাড়ের দেশে কয়েকটা নীরব দিন | চেনা উপকরণের অচেনা রান্না | ডিজিটাল যুগে মানসিক স্বাস্থ্য | রবিবারের গল্প: নীলপদ্মের ঘ্রাণ ও এক চিলতে রোদ


দূর পাহাড়ের দেশে কয়েকটা নীরব দিন..


তন্বী রায়



কয়েক বছর আগের কথা। ডিসেম্বর মাস। শীত তখন বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। সেদিন সকালে চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসেছিলাম। রোদটা তখনও পুরোপুরি চড়েনি, চারপাশে একটা অলস শীতের আবহ। ঠিক সেই সময়েই মাথায় এল চিন্তাটা—কোথাও বেরিয়ে পড়লে কেমন হয়?


এমন না যে আগে একা কোথাও যাইনি। সলো ট্রাভেল তখন আমার কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেদিনের ভাবনাটা একটু আলাদা ছিল। মনে হচ্ছিল এমন একটা জায়গায় যেতে হবে, যেটা এখনও খুব বেশি মানুষের নজরে পড়েনি। এমন একটা জায়গা, যেখানে পৌঁছানোর গল্পটাই গন্তব্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।


কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক ভাবার পর মাথায় এল একটা নাম—অনিনি।



অরুণাচল প্রদেশের দিবাং ভ্যালির ছোট্ট একটা জনপদ।


অনিনি সম্পর্কে তখন খুব বেশি কিছু জানতাম না। কয়েকটা ছবি দেখেছিলাম, দু-একটা ট্রাভেল ব্লগ পড়েছিলাম। শুধু জানতাম, জায়গাটা অনেক দূরে, পৌঁছানো সহজ নয়, আর সেই কারণেই বোধহয় ওটা আমাকে এতটা টানছিল।


ল্যাপটপ খুলে বসে গেলাম। রুট দেখতে শুরু করলাম। কলকাতা থেকে ডিব্রুগড়, তারপর রোইং, তারপর অনিনি।


আমার কাছে ট্রিপের সবচেয়ে মজার অংশগুলোর একটা হলো এই পরিকল্পনার সময়টা। মানচিত্রের ওপর আঙুল চালাতে চালাতে মনে হয়, যাত্রা যেন শুরু হয়ে গেছে।


কিছুক্ষণ পর হঠাৎই মনে হলো, এত ভাবছি কেন? যেতে ইচ্ছে করছে যখন, তখন যাই।



পরের কয়েক মিনিটের মধ্যেই ডিব্রুগড় পর্যন্ত একটা ফ্লাইট বুক করে ফেললাম।


টিকিট কনফার্ম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা পরিচিত অনুভূতি হলো। যতক্ষণ পর্যন্ত ভ্রমণটা শুধু মাথার মধ্যে থাকে, ততক্ষণ সবকিছু খুব সহজ লাগে। কিন্তু টিকিট কেটে ফেললেই ব্যাপারটা বাস্তব হয়ে যায়।


মনে হয়—আচ্ছা, এবার সত্যিই যাওয়া হচ্ছে।


যাওয়ার দিনটা বেশ স্বাভাবিকভাবেই কেটে গেল। বিমানবন্দরের ভিড়, বোর্ডিং, অপেক্ষা—সব মিলিয়ে একটা দীর্ঘ দিন।


ডিব্রুগড়ে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গিয়েছিল।



প্লেন থেকে নামতেই প্রথম যে জিনিসটা টের পেলাম, সেটা হলো বাতাসের গন্ধ। নতুন জায়গায় গেলে মাঝে মাঝে এমন হয়। মনে হয় বাতাসের মধ্যেও একটা আলাদা চরিত্র আছে।


ডিব্রুগড়ের বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ ছিল। সঙ্গে একটা শান্ত ভাব।


এয়ারপোর্ট থেকে সোজা একটা হোটেলে গিয়ে উঠলাম। কারণ জানতাম, পরের দিনটা খুব ভোরে শুরু করতে হবে। চেক-ইন করার পর হোটেলের ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললাম। তাঁকে বললাম, আমার ভোররাতেই রোইং যেতে হবে। ডিব্রুগড় থেকে রোইং পৌঁছতে প্রায় তিন ঘণ্টা লাগে, আর অনিনির দিকে যাওয়া শেয়ারড সুমোগুলো খুব সকালেই ছেড়ে দেয়।


উনি বললেন, “কোনো সমস্যা নেই, আমি ক্যাবের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”


সব ঠিকঠাক করে রাতে ঘুমোতে গেলাম। কিন্তু সত্যি বলতে, খুব একটা ঘুম হলো না। পরের দিনের জার্নির কথা মাথায় ঘুরছিল।



ঘড়িতে তখন রাত তিনটে।


অ্যালার্ম বাজতেই উঠে পড়লাম। বাইরে তখনও গভীর অন্ধকার। শহর ঘুমিয়ে আছে। রাস্তা ফাঁকা।


হোটেলের সামনে বেরিয়ে দেখি ক্যাবটা দাঁড়িয়ে আছে।


ব্যাগ গাড়িতে তুলে দিয়ে যাত্রা শুরু হলো।


ডিব্রুগড় তখনও পুরো জেগে ওঠেনি। রাস্তার দুপাশে কুয়াশা। মাঝে মাঝে ট্রাক যাচ্ছে। আর আমরা এগিয়ে চলেছি

রোইংয়ের দিকে।


এই ধরনের ভোররাতের যাত্রার একটা আলাদা অনুভূতি আছে। মনে হয় পৃথিবীর বাকি সবাই ঘুমিয়ে আছে, আর তুমি একাই কোথাও বেরিয়ে পড়েছ।


প্রায় তিন ঘণ্টা পর রোইং পৌঁছলাম।


তখন ধীরে ধীরে সকাল হচ্ছে।


রোইং ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেখি ইতিমধ্যেই বেশ ব্যস্ততা। কয়েকটা টাটা সুমো দাঁড়িয়ে আছে। যাত্রীদের ব্যাগ ছাদে তোলা হচ্ছে। ড্রাইভাররা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।


আমি একটা সুমোতে সিট বুক করে নিলাম।



পরে জানতে পারলাম, অনিনির দিকে যাওয়া প্রায় সব শেয়ারড গাড়িই খুব ভোরে বেরিয়ে পড়ে। কারণ রাস্তা দীর্ঘ, কঠিন এবং অনেকটাই দুর্গম। দিনের আলো থাকতে থাকতে পাহাড়ি রাস্তার বড় অংশটা পার করে ফেলাই সবার লক্ষ্য।


কিছুক্ষণ পর গাড়ি ছাড়ল।


আর শুরু হলো সেই যাত্রা, যেটা আজও আমার মনে সবচেয়ে স্পষ্ট।


প্রথম দিকে রাস্তা বেশ ভালোই ছিল। ছোট ছোট গ্রাম, নদীর ধারে বাড়ি, সবুজ মাঠ।


কিন্তু ধীরে ধীরে দৃশ্য বদলাতে শুরু করল।


পাহাড় কাছে আসতে লাগল।


রাস্তা সরু হতে লাগল। আর তারপর শুরু হলো সেই বিখ্যাত অনিনি রোড।


কোথাও রাস্তা ভাঙা। কোথাও শুধু পাথর। কোথাও কাদা। আবার কোথাও মনে হচ্ছিল, রাস্তা আছে বলেই বিশ্বাস করতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল।


গাড়ি এমনভাবে লাফাচ্ছিল যে মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল আমরা রাস্তার ওপর না, পাহাড়ের গা বেয়ে চলেছি।


তবুও বিরক্ত লাগছিল না।


বরং যত এগোচ্ছিলাম, ততই মনে হচ্ছিল আমি সত্যিই একটা অন্য জগতের দিকে যাচ্ছি।



একদিকে গভীর খাদ। নিচে কোথাও নদী। কোথাও শুধু সাদা মেঘ। অন্যদিকে আকাশ ছোঁয়া পাহাড়। প্রতিটা বাঁকের পর নতুন দৃশ্য। নতুন বিস্ময়। নতুন রোমাঞ্চ। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল রাস্তা এখানেই শেষ। কিন্তু প্রতিবারই সামনে আরেকটা বাঁক খুলে যাচ্ছিল।


প্রায় দশ ঘণ্টার সেই দীর্ঘ যাত্রার পর বিকেলের দিকে অবশেষে অনিনি পৌঁছলাম।


গাড়ি থেকে নেমেই প্রথম যে জিনিসটা অনুভব করলাম, সেটা হলো নীরবতা।


কিন্তু এটা শহরের নীরবতা নয়।


এটা এমন একটা নীরবতা, যেটাকে অনুভব করতে হয়।


চারপাশে পাহাড়। দূরে বন। কোথাও জলের শব্দ। কোথাও হাওয়ার শব্দ। তবুও পুরো জায়গাটার মধ্যে একটা অদ্ভুত শান্তি ছিল।


মনে হচ্ছিল পৃথিবী এখানে একটু ধীরে চলে।


আমি যে হোমস্টেতে ছিলাম, সেটার মালিক খুবই আন্তরিক মানুষ ছিলেন। আমি একা এসেছি শুনে উনি অবাক হলেন না। বরং খুব স্বাভাবিকভাবে গল্প করতে লাগলেন।



কিছুক্ষণ পর উনিই বললেন, “আপনি চাইলে আমি লোকাল সাইটসিইংয়ের জন্য একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে দিতে পারি।”


আমারও সেটাই দরকার ছিল।


পরদিনের জন্য গাড়ি ঠিক হয়ে গেল।


পরের দিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম মায়ো ওয়াটারফলের দিকে। অনিনি থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে। পাহাড়ি রাস্তা ধরে যেতে যেতে চারপাশের দৃশ্য বারবার মন টেনে নিচ্ছিল।


কিছুক্ষণ পর রাস্তা শেষ হলো।


এবার শুরু ট্রেক।



জঙ্গলে ঢুকতেই পরিবেশ পুরো বদলে গেল। বিশাল বিশাল গাছ। তাদের গায়ে মোটা শ্যাওলা। ভেজা মাটি। আর এমন ঘন জঙ্গল যে সূর্যের আলোও ঠিকমতো নিচে পৌঁছাতে পারছিল না।


মনে হচ্ছিল কোনো সিনেমার সেটে হাঁটছি।


ছোটবেলায় "জঙ্গল বুক" দেখে যেমন জঙ্গল কল্পনা করতাম, অনেকটা তেমন।


পথ খুব স্পষ্ট ছিল না। মাঝেমধ্যে ছোট ছোট কাঠের সেতু পার হতে হচ্ছিল। কোথাও পা সাবধানে ফেলতে হচ্ছিল।


আমার সঙ্গে থাকা ড্রাইভার হঠাৎ বললেন, “এখানে নাকি মাঝে মাঝে টাইগারও দেখা যায়।”


আমি হেসে বললাম, “এই খবরটা ট্রেক শুরুর আগে দিলে ভালো হতো না?”


উনিও হেসে ফেললেন। আমিও হাসলাম। তবে এরপর থেকে চারপাশ একটু বেশি খেয়াল করছিলাম।আর তারপর হঠাৎ করেই জঙ্গল শেষ হয়ে গেল।


সামনে খুলে গেল মায়ো ওয়াটারফল।


উঁচু পাহাড় থেকে ধাপে ধাপে জল নেমে আসছে। চারপাশে শুধু জলের গর্জন। কিন্তু আশ্চর্যভাবে সেই শব্দও শান্ত লাগছিল।


আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। কোনো তাড়া ছিল না। কোনো পরিকল্পনা ছিল না।


শুধু দেখছিলাম।


শুধু অনুভব করছিলাম।


সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা রওনা দিলাম চিগু ভ্যালির দিকে।



চিগু ভ্যালি যেন মায়ো ওয়াটারফলের একেবারে বিপরীত মেজাজের একটা জায়গা। ওখানে যেখানে জঙ্গলের বুনো সৌন্দর্য আর জলপ্রপাতের গর্জন ছিল, এখানে সবকিছু অনেক বেশি শান্ত।


পাহাড়ে ঘেরা একটা সুন্দর উপত্যকা। মাঝখানে স্বচ্ছ জলের লেক। চারপাশে এমন দৃশ্য, যেন কেউ খুব যত্ন করে এঁকে রেখেছে।


লেকের জল এতটাই পরিষ্কার ছিল যে আকাশ আর জলের সীমারেখা আলাদা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল।


সেখানে একটা ছোট্ট ক্যাফে ছিল।


আমি এক কাপ গরম ব্ল্যাক কফি আর একটা ম্যাগি অর্ডার করলাম।


ঠান্ডা হাওয়া বইছে। হাতে গরম কফির কাপ। সামনে শান্ত লেক। আর কোথাও যাওয়ার কোনো তাড়া নেই।


আমি একটা বই খুলেছিলাম ঠিকই, কিন্তু খুব বেশি পড়া হয়নি। বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল লেকের দিকে।


মনে হচ্ছিল পৃথিবীটা এখানে থেমে গেছে।


চিগু ভ্যালি থেকে ফেরার সময় হোমস্টেতে সরাসরি ফিরে যাইনি। একটা অভ্যাস আছে আমার—নতুন কোনো জায়গায় গেলে সুযোগ পেলেই লোকাল মার্কেট ঘুরে দেখি।


আসলে বাজারে ঘুরলে একটা জায়গাকে অন্যভাবে চেনা যায়। মানুষ কী খায়, কী চাষ করে, কী বিক্রি করে—এসব দেখতে আমার ভীষণ ভালো লাগে। তাই অনিনির ছোট্ট বাজারটাতেও একটু সময় কাটানোর লোভ সামলাতে পারলাম না।



বাজারে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ চোখে পড়ল এক দোকানে সাজানো টাটকা কিউই। দেখে মনে হচ্ছিল সবে বাগান থেকে তুলে আনা হয়েছে। ফল আর টাটকা সবজির প্রতি আমার দুর্বলতা বরাবরের, তাই স্বাভাবিকভাবেই দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।


আমার আগ্রহ দেখে দোকানদার হাসতে হাসতে বললেন, “আগে একটা খেয়ে দেখুন, তারপর কিনবেন।”


আমি আর না করলাম না।


একটা কিউই কেটে হাতে দিলেন। প্রথম কামড় দেওয়ার পরই বুঝলাম, এটা অন্যরকম।


সত্যি বলতে, জীবনে খাওয়া সবচেয়ে জুসি আর সুস্বাদু কিউইগুলোর মধ্যে এটা ছিল একটা। এত টাটকা আর মিষ্টি ছিল যে একটা খেয়ে আর থামতে ইচ্ছে করছিল না।


শেষ পর্যন্ত বেশ কয়েকটা কিউই কিনেই হোমস্টের দিকে ফিরলাম সন্ধের আগে।


শরীর ক্লান্ত ছিল, কিন্তু মন অদ্ভুতভাবে হালকা লাগছিল।


পরের দিনের গন্তব্য ছিল মিপি ভ্যালি।


অনিনি থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে। অনেকেই অবশ্য জায়গাটাকে মাথুন ভ্যালি নামেও চেনে।


সকালের আলোয় পাহাড়ি রাস্তা ধরে যেতে যেতে বারবার মনে হচ্ছিল, এই অঞ্চলের সৌন্দর্যকে ছবি দিয়ে পুরোপুরি বোঝানো সম্ভব নয়।


মিপি ভ্যালির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো মাথুন নদী আর মিপি নদীর মিলনস্থল।


দুটো নদী এসে এখানে একসঙ্গে মিশেছে। আর তাদের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য সবুজ পাহাড়।


দূর থেকে পুরো দৃশ্যটা দেখতে অনেকটা একটা বিশাল প্রাকৃতিক অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো লাগে।


পাহাড়, নদী আর উপত্যকা মিলে এমন একটা দৃশ্য তৈরি করেছে, যেটা চোখের সামনে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।


আমি অনেকক্ষণ নদীর ধারে বসে ছিলাম। হাওয়া বইছিল। নদী নিজের ছন্দে বয়ে যাচ্ছিল। চারপাশে শুধু সবুজ আর সবুজ।



সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব তাড়াহুড়ো যেন বহু দূরে কোথাও রয়ে গেছে।


পরের কয়েকটা দিন অনিনিতে খুব ধীরে কেটেছিল। কখনও উদ্দেশ্য ছাড়াই হাঁটতাম। কখনও পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতাম। কখনও হোমস্টের বারান্দায় চা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিতাম।


মজার ব্যাপার হলো, কিছু না করেও দিনগুলো খুব সুন্দরভাবে কেটে যাচ্ছিল।


আমরা সাধারণত ভাবি, ভ্রমণ মানেই অনেক কিছু দেখতে হবে। অনেক কিছু করতে হবে। কিন্তু অনিনি আমাকে অন্য একটা ব্যাপার শিখিয়েছিল।


কখনও কখনও শুধু থাকাটাও যথেষ্ট।


সন্ধ্যাগুলো ছিল বিশেষ সুন্দর।


সূর্য ধীরে ধীরে পাহাড়ের পেছনে হারিয়ে যেত।


আকাশের রং বদলাত।


তারপর পুরো উপত্যকা একটা নরম অন্ধকারে ঢেকে যেত।


আমি প্রায়ই জানালার পাশে বসে থাকতাম।


বাইরে খুব বেশি কিছু ঘটত না।


কিন্তু ভেতরে অনেক কিছু চলত।


আসলে একলা ভ্রমণের সবচেয়ে বড় উপহার সম্ভবত এটাই—নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ।


ফেরার দিনটা এসে গেল।


সকালবেলা ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।


সবকিছু আগের মতোই ছিল। পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে ছিল। নদী বয়ে যাচ্ছিল। হাওয়া বইছিল।


শুধু আমি ফিরে যাচ্ছিলাম।


ফিরে আসার পরও অনেকদিন পর্যন্ত সেই রাস্তা, সেই জঙ্গল, মায়ো ওয়াটারফল, চিগু ভ্যালির লেক আর মিপি ভ্যালির সবুজ পাহাড় বারবার মনে পড়ত।



আর ধীরে ধীরে একটা জিনিস বুঝতে পেরেছিলাম।


এই ট্রিপটা আসলে কোনো গন্তব্যের গল্প ছিল না।


এটা ছিল পথের গল্প।


নীরবতার গল্প।


আর সবচেয়ে বেশি, নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর গল্প।


আজও অনিনির কথা ভাবলে প্রথমে কোনো নির্দিষ্ট জায়গার ছবি মনে পড়ে না। মনে পড়ে একটা অনুভূতি। একটা শান্ত অনুভূতি।


যেটা এখনও মনে করিয়ে দেয়—সব সময় দৌড়ে চলার দরকার নেই। কখনও কখনও একটু থেমেও থাকা যায়। একটু থেমেও জীবনকে উপভোগ করা যায়।


আর জীবনের কিছু সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত হয়তো সেখানেই লুকিয়ে থাকে।

চেনা উপকরণের অচেনা রান্না

রূপা বন্দ্যোপাধ্যায়


রান্নাঘরের তাক খুললেই চোখে পড়ে কত চেনা উপকরণ। বছরের পর বছর ধরে এদের দিয়ে তৈরি হয়ে আসছে পরিচিত সব পদ। কিন্তু এই সাধারণ উপকরণগুলির মধ্যেই লুকিয়ে আছে অসাধারণ সম্ভাবনা। একটু কল্পনা, সামান্য নতুন ভাবনা আর রান্নার প্রতি ভালোবাসা মিশলেই চেনা উপাদান হয়ে উঠতে পারে সম্পূর্ণ অন্য স্বাদের বিস্ময়।


এই সংকলনে রইল চেনা উপকরণ দিয়ে তৈরি এমন কিছু অভিনব ও সুস্বাদু পদ, যা একদিকে যেমন স্বাদে চমক দেবে, তেমনি অন্যদিকে দৈনন্দিন রান্নায় আনবে নতুনত্বের ছোঁয়া। ঘরের সাধারণ উপাদানকে একটু ভিন্নভাবে ব্যবহার করে কীভাবে তৈরি করা যায় অসাধারণ সব খাবার, তারই কিছু নির্বাচিত রেসিপি তুলে ধরা হলো এই আয়োজনে।




লিচু-চিংড়ি মালাই টোস্ট



কী কী লাগবে

পাউরুটি – ৪ টুকরো

ছোট চিংড়ি – ২০০ গ্রাম

লিচু – ৬–৮টি (ছোট কুচি)

নারকেলের দুধ – আধ কাপ

পেঁয়াজ কুচি – ১ টেবিল চামচ

আদা-রসুন বাটা – ১ চা চামচ

Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো – আধ চা চামচ

মাখন – ২ টেবিল চামচ

নুন – স্বাদমতো



কীভাবে বানাবেন

কড়াইতে মাখন গরম করে পেঁয়াজ কুচি ভেজে আদা-রসুন বাটা কষিয়ে নিন। চিংড়ি ও নুন দিয়ে ২–৩ মিনিট রান্না করুন। নারকেলের দুধ ঢেলে ঘন মালাই মিশ্রণ তৈরি করুন। নামানোর আগে লিচু কুচি ও গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে নিন। পাউরুটি মাখন দিয়ে টোস্ট করে তার ওপর চিংড়ি-লিচুর মালাই মিশ্রণ ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।


লিচু পাঁপড় চাট



কী কী লাগবে

পাঁপড় – ৪–৫টি

লিচু – ৮–১০টি (ছোট কুচি)

সেদ্ধ আলু – ১টি

পেঁয়াজ কুচি – ২ টেবিল চামচ

কাঁচালঙ্কা কুচি – ১ চা চামচ

টক দই – আধ কাপ

তেঁতুল চাটনি – ২ টেবিল চামচ

ভুজিয়া/চানাচুর – আধ কাপ

বিট নুন – আধ চা চামচ

ভাজা জিরে গুঁড়ো – আধ চা চামচ

ধনেপাতা কুচি – ১ টেবিল চামচ

Shalimar's সর্ষের তেল – কয়েক ফোঁটা



কীভাবে বানাবেন

পাঁপড় সেঁকে বা ভেজে মুচমুচে করে নিন। সেদ্ধ আলুর সঙ্গে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, বিট নুন, ভাজা জিরে গুঁড়ো ও কয়েক ফোঁটা সর্ষের তেল মিশিয়ে নিন। পাঁপড়ের ওপর আলুর মিশ্রণ ছড়িয়ে দিন। টক দই, লিচু কুচি ও তেঁতুল চাটনি দিন। ওপরে ভুজিয়া/চানাচুর ও ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশন করুন।


লিচু পাতুরি



কী কী লাগবে

লিচু – ১০–১২টি (কুচি করা)

নারকেল কোরা – ১ কাপ

ক্ষীর/খোয়া – আধ কাপ

গুড় – ৩–৪ টেবিল চামচ

Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো – ১ চিমটি

এলাচ গুঁড়ো – ১/৪ চা চামচ

কলাপাতা – ৪–৬ টুকরো

ঘি – ১ চা চামচ



কীভাবে বানাবেন

কড়াইতে নারকেল কোরা, খোয়া, গুড়, এলাচ ও গোলমরিচ মিশিয়ে অল্প আঁচে নেড়ে মাখা-মাখা করুন। লিচু কুচি মিশিয়ে নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। কলাপাতায় ঘি মেখে মিশ্রণ ভরে প্যাকেটের মতো মুড়ে সুতো দিয়ে বেঁধে নিন। স্টিমারে ১০–১২ মিনিট ভাপিয়ে নিন। গরম বা ঠান্ডা—দু’ভাবেই পরিবেশন করুন।


স্মোকি কচু পুডিং



কী কী লাগবে


পুডিংয়ের জন্য:

সেদ্ধ মুখিকচু বা মানকচু – ২৫০ গ্রাম

ডিম – ২টি

নারকেলের দুধ – আধ কাপ

পোস্ত বাটা – ১ টেবিল চামচ

ভাজা রসুন বাটা – আধ চা চামচ

Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো – আধ চা চামচ

ঘি – ১ চা চামচ

নুন – স্বাদমতো



সসের জন্য:

দুধ – ১ কাপ

মালাই – ২ টেবিল চামচ

চিজ – ২ টেবিল চামচ

Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো – এক চিমটি


জেলির জন্য:

কাঁচা আমের রস – আধ কাপ

পুদিনা বাটা – ১ টেবিল চামচ

আগার আগার – ১ চা চামচ


সাজানোর জন্য:

ক্রিসপি পোস্ত টোস্ট

ছোট আলু ভাজা

ধনেপাতা



কীভাবে বানাবেন

সেদ্ধ কচু, ডিম, নারকেলের দুধ, পোস্ত বাটা, রসুন বাটা, গোলমরিচ ও নুন একসঙ্গে ব্লেন্ড করে মোল্ডে ঢেলে ২০ মিনিট ভাপে রান্না করুন। দুধ, মালাই, চিজ ও গোলমরিচ মিশিয়ে ঘন ক্রিমি সস তৈরি করুন। কাঁচা আমের রস, পুদিনা বাটা ও আগার আগার ফুটিয়ে জেলি বানিয়ে ঠান্ডা করে কিউব করে নিন। প্লেটে সস ছড়িয়ে তার ওপর কচুর পুডিং বসান। আলু ভাজা, ক্রিসপি পোস্ত টোস্ট ও ধনেপাতা দিয়ে সাজিয়ে চারপাশে জেলি রেখে পরিবেশন|


বেলসুধা মাছের ডিমের পুডিং চকো কাপ



কী কী লাগবে

চকো কাপের জন্য:

ডার্ক চকোলেট – ২০০ গ্রাম

পুডিংয়ের জন্য:

মাছের ডিম – ১৫০ গ্রাম

দুধ – ২ কাপ

নারকেলের দুধ – আধ কাপ

কনডেন্সড মিল্ক – আধ কাপ

নলেন গুড় – ৪ টেবিল চামচ

ডিম – ২টি

কেশর দুধ – ১ টেবিল চামচ

পোস্ত গুঁড়ো – ১ চা চামচ

ঘি – ১ চা চামচ

বেলফুল – ৮–১০টি


সাজানোর জন্য:

মালাই – ২ টেবিল চামচ

বেলফুলের পাপড়ি – সামান্য



কীভাবে বানাবেন

হালকা গরম দুধে বেলফুল ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রেখে ছেঁকে নিন। ডার্ক চকোলেট গলিয়ে মোল্ডে দু’বার কোট করে ফ্রিজে সেট করে চকো কাপ তৈরি করুন। মাছের ডিম নারকেলের দুধে ১০ মিনিট ভিজিয়ে ঘি দিয়ে হালকা নেড়ে মসৃণ পেস্ট বানান। বেলফুল-ভেজানো দুধে নলেন গুড় ও কনডেন্সড মিল্ক মিশিয়ে নিন। এরপর ডিম, মাছের ডিমের পেস্ট, কেশর দুধ ও পোস্ত গুঁড়ো দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। মিশ্রণটি মোল্ডে ঢেলে ২০–২৫ মিনিট ভাপে রান্না করুন। ঠান্ডা হলে পুডিং বের করে চকো কাপে ভরে নিন। ওপরে মালাই ও বেলফুলের পাপড়ি দিয়ে সাজিয়ে ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।

ডিজিটাল যুগে মানসিক স্বাস্থ্য: অগ্রগতির আড়ালে এক নীরব সংকট


দীপান্বিতা দে


একবিংশ শতাব্দীকে ডিজিটাল যুগ বলা হয়। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রযুক্তির কল্যাণে পৃথিবী আজ হাতের মুঠোয় চলে এসেছে এবং আজকের দ্রুতগতির ও অত্যন্ত সংযুক্ত বিশ্বের মানুষের জীবন যেন পর্দাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্মার্টফোন, অনলাইন কাজকর্ম এবং ই-মেইল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রযুক্তি যেমন যোগাযোগকে সহজ করেছে এবং তথ্যপ্রাপ্তিকে করেছে দ্রুত ও সহজলভ্য, তেমনি এর সঙ্গে নীরবে বেড়ে চলেছে এক নতুন সংকট—মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি।

ডিজিটাল যুগে উদ্বেগ, একাকিত্ব, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং মানসিক চাপের মতো সমস্যাগুলি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবনের সাজানো-গোছানো ছবি দেখে অনেকেই নিজেদের জীবনকে কম সফল বা কম আকর্ষণীয় বলে মনে করেন। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে, মনোযোগ কমে যায় এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে মানুষের মানসিক সুস্থতা নানা ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও নানা প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তাই ডিজিটাল যুগে মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে



ডিজিটাল প্রযুক্তির ইতিবাচক প্রভাব


ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর অবদান অনস্বীকার্য। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সচেতনতা বৃদ্ধি, অনলাইন কাউন্সেলিং এবং বিভিন্ন সহায়ক অ্যাপ মানুষের মানসিক সুস্থতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অনেক মানুষ আজ ঘরে বসেই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে পারছেন।


নেতিবাচক প্রভাব


অন্যদিকে প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে অনেকের মধ্যে উদ্বেগ, একাকিত্ব ও হতাশা দেখা দেয়। অন্যের সাফল্য ও জীবনযাত্রার সঙ্গে নিজের তুলনা করতে গিয়ে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। এছাড়া অনলাইন হয়রানি বা সাইবার বুলিংও মানসিক সমস্যার অন্যতম কারণ।


শিশু-কিশোরদের বিকাশমান মস্তিষ্কের উপর অনলাইন কনটেন্টের প্রভাব


বর্তমান সময়ে শিশু ও কিশোররা অল্প বয়স থেকেই ডিজিটাল জগতের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। অনলাইন কনটেন্ট তাদের জ্ঞান ও সৃজনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করলেও অতিরিক্ত বা অনুপযুক্ত ব্যবহার তাদের বিকাশমান মস্তিষ্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।



এর ফলে দেখা দিতে পারে—


১. মনোযোগ ও একাগ্রতা কমে যাওয়া, যার প্রভাব পড়ে পড়াশোনার ফলাফলে।

২.সামাজিক মেলামেশায় অনীহা এবং একাকিত্বের প্রবণতা বৃদ্ধি।

৩.নিজের শরীর ও চেহারা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়া।

৪.আত্মবিশ্বাস হ্রাস পাওয়া।

৫.খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা এবং ঘন ঘন মানসিক পরিবর্তন।


এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভিভাবকদের সচেতন ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করা, খেলাধুলা ও বাইরের কার্যকলাপে উৎসাহিত করা এবং তাদের ডিজিটাল অভিজ্ঞতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন।


অতিরিক্ত স্ক্রিন-টাইম কি শারীরিক স্বাস্থ্যেরও ক্ষতি করে?


নিঃসন্দেহে। মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘ সময় ধরে মোবাইল, কম্পিউটার বা ট্যাবলেট ব্যবহারের ফলে নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যেমন—

১.চোখে চাপ পড়া বা ডিজিটাল আই স্ট্রেন।

২.ঘাড় ও মেরুদণ্ডের ব্যথা, যা অনেক সময় টেক নেক নামে পরিচিত।

৪.শরীরের ভঙ্গি বা অঙ্গবিন্যাসের সমস্যা।

৪.মাথাব্যথা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি।


এসব সমস্যা এড়ানোর জন্য নিয়মিত বিরতি নেওয়া, হালকা ব্যায়াম ও স্ট্রেচিং করা, সঠিকভাবে বসে কাজ করা এবং দীর্ঘক্ষণ একটানা স্ক্রিনের দিকে না তাকানো অত্যন্ত জরুরি। প্রযুক্তির ব্যবহার যতই বাড়ুক না কেন, সুস্থ শরীর ও সুস্থ মন বজায় রাখার জন্য সচেতনতা ও সংযমের কোনো বিকল্প নেই।



ডিজিটাল যুগে ভালো মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার উপায়


প্রযুক্তি আমাদের জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হলেও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে এর সঠিক ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে ডিজিটাল যুগেও সুস্থ ও ইতিবাচক মানসিক জীবনযাপন সম্ভব।


১. স্ক্রিন ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করুন


প্রতিদিন কতক্ষণ মোবাইল, কম্পিউটার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছেন তা নিয়ন্ত্রণ করুন। প্রয়োজনে স্ক্রিন-টাইম পর্যবেক্ষণকারী অ্যাপ ব্যবহার করে সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারেন।


২. বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিন


বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটান। মুখোমুখি কথোপকথন ও সামাজিক মেলামেশা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।


৩. সচেতনভাবে কনটেন্ট নির্বাচন করুন


নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তুর পরিবর্তে শিক্ষামূলক, ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণামূলক কনটেন্ট অনুসরণ করুন। এটি মানসিক প্রশান্তি ও ইতিবাচক চিন্তাভাবনা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।


৪. নিয়মিত শরীরচর্চা করুন


ব্যায়াম শরীরে এন্ডোরফিন নামক ‘সুখের হরমোন’ নিঃসরণ বাড়ায়, যা মানসিক চাপ কমাতে এবং মন ভালো রাখতে সাহায্য করে।


৫. ধ্যান ও মননচর্চা করুন


ধ্যান, যোগব্যায়াম বা মননশীলতার চর্চা (Mindfulness) মনকে শান্ত রাখে, উদ্বেগ কমায় এবং মনোযোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।


৬. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন


সুস্থ মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য। ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল বা অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ রাখা ভালো।


৭. প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন


যদি ডিজিটাল অভ্যাসের কারণে অতিরিক্ত উদ্বেগ, হতাশা, ঘুমের সমস্যা বা মানসিক অস্বস্তি দেখা দেয়, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত।


ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবনের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এর সুফল ভোগ করতে হলে সচেতনতা, সংযম এবং স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবহার করতে পারলেই মানসিক সুস্থতা বজায় রেখে একটি সুন্দর ও সুষম জীবন গড়ে তোলা সম্ভব।

রবিবারের গল্প


নীলপদ্মের ঘ্রাণ ও এক চিলতে রোদ


পিয়ালী চক্রবর্তী


কলকাতার পুরনো অলিগলিতে আজও এমন কিছু রহস্য লুকিয়ে থাকে যা ধুলোবালি মাখা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। অরিজিৎ আর মৈত্রেয়ীর গল্পটা ঠিক তেমনই। তবে এটি কোনো কিশোরী প্রেমের ছটফটানি নয়, বরং মাঝবয়সের এক গুমোট দুপুরের পর হঠাৎ নামা কালবৈশাখীর মতো স্নিগ্ধ এবং তীব্র। বড়দের প্রেম মানে তো কেবল আবেগ নয়, সেখানে মিশে থাকে যাপনের ক্লান্তি, অভিজ্ঞতার প্রজ্ঞা আর এক অদ্ভুত স্থিতি।

অরিজিৎ পেশায় স্থপতি। বয়স পঁয়তাল্লিশ ছুঁইছুঁই। নিঃসঙ্গতা তার সঙ্গী নয়, বরং তার অভ্যেস। ডিভোর্সের পর গত সাত বছর সে একাই আছে বালিগঞ্জের এক পুরনো অ্যাপার্টমেন্টে। তার জীবনে কোনো ‘রঙ’ ছিল না বললেই চলে। সে ড্রয়িং বোর্ডে রেখা টানত, কংক্রিটের হিসেবে জীবন মাপত। বাড়ির বারান্দায় রাখা ক্যাকটাসগুলোর মতোই সে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল। যতক্ষণ না মৈত্রেয়ী তার জীবনে এল—একটি হেরিটেজ কনসালটেন্সি প্রজেক্টের খাতিরে।

মৈত্রেয়ীর বয়স বিয়াল্লিশ । সে একজন নামকরা কিউরেটর। তার চোখে এক অদ্ভুত গভীরতা আছে, যা হাজার বছরের পুরনো কোনো পাণ্ডুলিপির মতো রহস্যময়। সে যখন কথা বলে, মনে হয় শব্দগুলো কোনো এক প্রাচীন সুরের মতো ভেসে আসছে। তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল উত্তর কলকাতার এক ধুলোমাখা আর্ট গ্যালারিতে, যা সংস্কার করার দায়িত্ব পড়েছিল অরিজিতের ওপর।

“আপনি কি মনে করেন, পুরনো সবকিছুই সংরক্ষণ করা প্রয়োজন? ভেঙে নতুন কিছু গড়া কি অপরাধ?”—অরিজিতের গলায় সেদিন ছিল পেশাদারী কাঠিন্য। সে চাইছিল গ্যালারির মাঝের অংশটা ভেঙে আধুনিক কাঁচের কাজ করতে।

মৈত্রেয়ী হাসল। তার হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, কিন্তু রেশ ছিল অনেকক্ষণ। সে ম্লান আলোয় একটা ভাঙা টেরাকোটার মূর্তির দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “ভাঙাটা সহজ অরিজিৎ বাবু। কিন্তু সেই ভগ্নস্তূপের ভেতর থেকে ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখাটা কঠিন। প্রেমও তো অনেকটা তাই, তাই না? মানুষ ভেঙে গেলে আমরা নতুন মানুষ খুঁজি, নতুন সম্পর্ক গড়ি। কিন্তু পুরনো স্মৃতির কারুকার্যগুলো কি সত্যিই মন থেকে মুছে যায়? নাকি সেগুলো ভেতরে থেকেই আমাদের বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করে?”

অরিজিৎ স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এই নারী কেবল কাজ বোঝে না, সে মানুষের মনের মানচিত্রটাও পড়তে জানে। সেদিন বিকেলের সেই সংক্ষিপ্ত আলাপ অরিজিতের অবচেতন মনে একটা ঢেউ তুলে দিয়ে গিয়েছিল। কংক্রিটের দেয়ালগুলোর বাইরেও যে এক কোমল পৃথিবী আছে, তা সে বহু বছর পর অনুভব করল।


পরের কয়েক মাস তাদের দেখা হতে থাকল নিয়মিত। বড়দের প্রেম ডানা মেলে ধীরগতিতে, সেখানে তাড়াহুড়ো নেই। কফি হাউসের ধোঁয়াটে আড্ডা কিংবা গঙ্গার ঘাটে সূর্যাস্ত দেখা—তাদের সম্পর্কটা গড়ে উঠছিল বুদ্ধিবৃত্তিক আদান-প্রদান আর নীরবতার মধ্য দিয়ে। একদিন বৃষ্টির বিকেলে মৈত্রেয়ীর ফ্ল্যাটে বসে ছিল অরিজিৎ। ঘরের কোণে রাখা পুরনো গ্রামোফোনে বাজছিল মল্লার রাগের আলাপ। মৈত্রেয়ী যখন চা নিয়ে এল, অরিজিৎ দেখল তার পড়ার টেবিলের ওপর রাখা অরিজিতের লেখা একটা পুরনো আর্কিটেকচারাল জার্নাল, যা প্রায় দশ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল।

“তুমি এটা আজও রেখেছ?” অরিজিৎ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

মৈত্রেয়ী জানালার বাইরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “আমি আপনাকে চিনি আপনার কাজের মাধ্যমে, অনেক আগে থেকেই। আপনার যখন ক্যারিয়ারের শুরু, যখন আপনি কংক্রিটের মাঝেও প্রাণের ছোঁয়া খুঁজতেন, আমি তখন থেকেই আপনার কাজের ভক্ত। আপনার তৈরি প্রতিটি নকশায় একটা অদ্ভুত হাহাকার থাকত—যেন কেউ একলা দাঁড়িয়ে কারো প্রতীক্ষা করছে। আমি সেই একাকীত্বটাকেই ভালোবেসেছিলাম।”

অরিজিতের মনে হলো, সাত বছরের জমে থাকা বরফটা গলতে শুরু করেছে। সে মৈত্রেয়ীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল। মাঝবয়সী হাতের চামড়ার কুঁচকানো রেখায় রেখায় মিশে গেল এক অন্যরকম প্রতিশ্রুতি। এটা কোনো কিশোর সুলভ উত্তেজনার ছোঁয়া নয়, এটা বহু পথ হেঁটে আসা এক পথিকের ঘরে ফেরার আশ্বাস।


পূর্ণবয়স্ক প্রেমের নিজস্ব এক ভাষা থাকে। সেখানে ‘ভালোবাসি’ বলার চেয়ে ‘আছ তো?’ শোনার গুরুত্ব অনেক বেশি। তাদের শারীরিক সান্নিধ্যও ছিল এক শিল্পের মতো, যা কেবল ত্বকের স্পর্শে সীমাবদ্ধ নয়। একদিন রাতে, যখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছিল সারা কলকাতায়, মৈত্রেয়ীর ড্রয়িং রুমে মৃদু হলুদ আলোয় তারা খুব কাছাকাছি এল।

অরিজিৎ মৈত্রেয়ীর চুলে আঙুল চালাতে চালাতে ফিসফিস করে বলল, “আমাদের জীবনে অনেক দেরি হয়ে গেল না মৈত্রেয়ী? যদি বিশ বছর আগে দেখা হতো?”

মৈত্রেয়ী তার বুকের ওপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে বলল, “দেরি কিসের অরিজিৎ? ফল যখন রোদে পেকে রসালো হয়, তখনই তো তার আসল স্বাদ। কুড়িতে যে আবেগ থাকে, তাকে বলে উন্মাদনা, যা সহজেই পথ হারায়। আর এই বয়সে যা হয়, তাকে বলে স্থিতি। এখানে একে অপরকে জয় করার জেদ নেই, আছে কেবল নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার শান্তি। আমি এই শান্তিটাই চেয়েছিলাম।”

সেদিন রাতে তারা একে অপরকে নতুন করে আবিষ্কার করল। কোনো কৃত্রিমতা নেই, কেবল দীর্ঘদিনের একাকীত্বের এক ধীর লয়ের মুক্তি। মৈত্রেয়ীর শরীরে নীলপদ্মের মতো এক মৃদু সুগন্ধ ছিল, যা অরিজিতকে সারারাত এক সম্মোহনে আচ্ছন্ন করে রাখল। তাদের চারপাশটা যেন এক মায়াবী জগত হয়ে উঠেছিল যেখানে ঘড়ির কাঁটা থেমে গেছে।


তবে জীবন কখনও সরলরেখায় চলে না। প্রেমের মাঝপথে মেঘ এল মৈত্রেয়ীর অতীতের রূপে। তার প্রাক্তন স্বামী, যার সাথে বিচ্ছেদ হয়েছিল তিক্ততার মধ্য দিয়ে, সে হঠাৎই অসুস্থ অবস্থায় ফিরে এল। সে একা, তার দেখাশোনা করার কেউ নেই। মৈত্রেয়ী এক কঠিন দোটানায় পড়ল। একদিকে তার নতুন করে খুঁজে পাওয়া ভালোবাসা, অন্যদিকে মানবিক দায়বদ্ধতা।

সমাজ যাকে ‘দায়িত্ব’ বলে, মৈত্রেয়ী তার ঊর্ধ্বে যেতে পারছিল না। সে অরিজিতকে সবটা খুলে বলল। কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। অরিজিৎ শান্ত থাকল। সে মৈত্রেয়ীর মাথায় হাত রেখে বলল, “আমি তোমাকে শিকল দিয়ে বাঁধতে আসিনি মৈত্রেয়ী। আমি তোমার ডানা হতে চেয়েছি। তুমি যদি মনে করো তাকে এই বিপদে সাহায্য করা তোমার মানবিক শান্তি, তবে তাই করো। আমি তোমাকে আটকাব না। ভালোবাসা মানে তো দখল করা নয়, ভালোবাসা মানে মুক্তি। আমি গঙ্গার এপারেই থাকব, যেমনটা এই শহর থাকে।”

এই পরিপক্কতা কেবল বড়দের প্রেমেই সম্ভব। কোনো চিৎকার নয়, কোনো নোংরা অধিকারবোধের লড়াই নয়। কেবল একে অপরের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা করা। মৈত্রেয়ী বিদায় নিল কয়েক মাসের জন্য। বালিগঞ্জের সেই ফ্ল্যাটে অরিজিৎ আবার একা হয়ে গেল, কিন্তু এবারের একাকীত্বটা ছিল অপেক্ষায় ভরা।


কয়েক সপ্তাহ পর এক ভোরে, যখন কলকাতার আকাশে ফিকে আলো ফুটছে, অরিজিৎ তার বারান্দায় বসে স্কেচ করছিল। হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠল। দরজা খুলতেই সে দেখল মৈত্রেয়ী দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কালি পড়েছে, চেহারায় ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু ঠোঁটে সেই ম্লান হাসি।

“আমি ফিরলাম,” মৈত্রেয়ী খুব নিচু স্বরে বলল।

অরিজিৎ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। সে জানত মৈত্রেয়ী ফিরবেই। সে কেবল এক মগ গরম কফি মৈত্রেয়ীর দিকে এগিয়ে দিল। তারা দীর্ঘক্ষণ বারান্দায় বসে শহরের জেগে ওঠা দেখল। কোনো কথা হলো না, অথচ হাজারটা অব্যক্ত কথা সেই নিঃশব্দ সকালে বিনিময় হয়ে গেল।


তাদের প্রেম কোনো প্রচলিত রূপকথার মতো শেষ হয়নি। আজও তারা আলাদা বাড়িতে থাকে, আজও তারা নিজেদের পেশাদারী জীবনে ব্যস্ত। কিন্তু প্রতি শনিবার বিকেলে তারা গঙ্গার ধারের সেই পুরনো আর্ট গ্যালারিতে দেখা করে। এখন তারা আর কেউ কারোর কাছে কিছু লুকায় না। তাদের সম্পর্কটা এখন কাঁচের মতো স্বচ্ছ।

অরিজিৎ এখন বোঝে, স্থাপত্য মানে কেবল ইট-কাঠের গাঁথুনি নয়, স্থাপত্য মানে হলো ভেঙে যাওয়া অংশগুলোকে পরম মমতায় জোড়া লাগানো। সে এখন তার নকশায় একাকীত্বের বদলে আশ্রয়ের ছবি আঁকে। আর মৈত্রেয়ী? সে এখন অরিজিতের হৃদয়ের সেই কিউরেটর, যে অরিজিতের ধূসর যাপনে নীলপদ্মের ঘ্রাণ মিশিয়ে দিয়েছে।

গল্পের শেষ পাতা বলে কিছু হয় না। বড়দের প্রেমের কোনো শেষ নেই, কেবল রূপান্তর আছে। প্রেম মানে কেবল যৌবনের জোয়ার নয়, প্রেম হলো ভাটার টানেও বালুচরে আটকে থাকা দুটি নৌকার নিভৃত আলাপ। যেখানে অন্ধকার থাকলেও ভয় নেই, কারণ পাশে অন্য হাতটি পরম বিশ্বস্ততায় ধরা আছে। কলকাতার এই ইট-পাথরের ভিড়ে অরিজিৎ আর মৈত্রেয়ীর প্রেমটা আজও এক চিলতে রোদ্দুরের মতো বেঁচে আছে, যা কেবল অনুভব করা যায়, ধরা যায় না।

তাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে এখন নীলপদ্মের সেই মাদকতা, যা হারানো সুরকে আবার ফিরিয়ে এনেছে। এভাবেই তারা প্রতিদিন নতুন করে প্রেমে পড়ে—একটু ভিন্ন স্বাদে, একটু বেশি গভীরতায়। বড়দের এই প্রেমে হারানোর ভয় নেই, কারণ তারা জানে, যা সত্যি তা চিরকালই সঙ্গেই থাকে।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page