top of page

অন্নকূটের আয়োজনে, পুষ্টিবিদের মতামত ছাড়া নিজে নিজে ডায়েট করছেন? ঘরের কোণে গড়ে উঠুক নিজের ছোট্ট জগত! রবিবারের গল্প: বালিকার বড়ো হয়ে ওঠা..

Updated: 2 days ago


"অন্ন'ই পরম ব্রক্ষ্ম, অন্ন'ই ঈশ্বর"

অন্নকূটের আয়োজনে..

সুস্মিতা মিত্র

'অন্নের পাহাড়', 'অন্ন কূট'; বিগ্রহের সামনে নিবেদিত ভোগ বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে হাজার হাজার ভক্তদের মধ্যে। হিন্দু ধর্মে, অতিথি মানেই নারায়ণ। কত ভাগ্য করলে বাড়িতে অতিথি আসে। আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতি এই যে বাড়িতে কেউ এলে আমরা তাকে খালি হাতে ফেরাই না। ভিক্ষা প্রার্থী সেও দরিদ্র রূপে স্বয়ং নারায়ণ। সাধ্যমত তার সেবা, এটাই আসলে ঈশ্বরের সেবা। নর নারায়ণ সেবা। 'ভক্তের ভগবান' নাকি 'ভগবানের ভক্ত' এই ভাবনাকে নিয়েই অন্নকূট। শ্রীকৃষ্ণ ব্রজবাসীকে রক্ষা করতে হাতে তুলে নিয়েছিলেন গিরি গোবর্ধন আর ব্রজবাসীরা তাদের প্রিয় নন্দলালা অভুক্ত থাকবেন এই চিন্তায় এত খাবার জড়ো করেছিলেন যে তার আকার হয়েছিল পাহাড়সম। এমনই এক অপূর্ব গাঁথাকে মনে রাখতে প্রতি বছর আয়োজন করা হয় অন্নকূট মহোৎসবের। দুবেলা দুমুঠো জোটে না এমন কত মানুষ পেটপুরে খেতে পান, এখানেই স্বার্থকতা। ভক্তের খুশিতেই ভগবান তুষ্ট। অন্নকূট মহোৎসবের মূলমন্ত্র তো এটাই।


‘সর্ব ধর্মান পরিত্যাজ মা মে কং স্মরণং ভজ।’


-এ'কথার আলোকে শরতের ঠিক মাঝামাঝি কার্তিক মাসে ব্রজবাসীরা এক বিশেষ অনুষ্ঠানের অয়োজন করেন, যা গিরি গোবর্ধন পূজা ও অন্নকূট মহোৎসব নামে খ্যাত। হিসেবমতো কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথিতে অর্থাৎ দীপাবলির পরের দিন এই উৎসব পালিত হয়।



অন্নকূট কী ?

'অন্ন কূট' অর্থাৎ অন্নের পাহাড়। একাধিক অন্ন অথবা শস্যের মিশ্রণই হল অন্নকূট। চালের বিভিন্ন রকম পদ, ডাল, সবজি, মিষ্টান্ন একসঙ্গে সাজিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়, দেখে মনে হবে যেন বিশাল এক পাহাড়। নিয়ম অনুযায়ী, অন্নকূটের প্রসাদ পৃথক পৃথক বিতরণ করা হয় না। বরং সমস্ত প্রসাদ একসঙ্গে মিশিয়ে সকলকে বিতরণ করতে হয়।


কেন পালন করা হয় অন্নকূট উৎসব ?

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, ব্রজবাসীরা দেবরাজ ইন্দ্রের পুজো করতেন। সে প্রসঙ্গে নন্দ মহারাজ বলেন, "বৈশ্য গোপ জাতি। কৃষি এবং গো-পালন আমাদের জীবিকা। গো-পালনের জন্য আমাদের ঘাসের প্রয়োজন। চাষের জন্য বৃষ্টি চাই। আর ইন্দ্র হলেন বৃষ্টির দেবতা। তাই আমরা দেবরাজ ইন্দ্রের পূজা করি।”

তখন শ্রীকৃষ্ণ বলেন, “সমুদ্রের মাঝেও বৃষ্টি হয়। সেখানে কেউ ইন্দ্র পূজা করেন না। আমাদের জীবিকা গো-পালন। গাভী বর্ধনের জন্য আমরা গিরি গোবর্ধনের কাছে ঋণী। ইন্দ্রের কাছে নয়। চলো আমরা গিরি গোবর্ধনের পূজা করি।”

এতে ক্ষুব্ধ হন দেবরাজ ইন্দ্র। শুরু হয় প্রবল বর্ষণ। তখন শ্রীকৃষ্ণ গিরি গোর্বধনকে নিজের কড়ে আঙুলে তুলে ধরেন, তার নীচে আশ্রয় পান ব্রজবাসী। এবং ইন্দ্রের ভয়ঙ্কর বজ্রের আঘাত নিজ অঙ্গে ধারণ করেন গোর্বধন। মোট সাতদিন এইভাবে গিরি গোবর্ধনকে নিজের বামহাতের কড়ে আঙুলে তুলে রেখেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ। তাই তিনি গিরিধারী। এই সাতদিন ধরে নন্দরাজ গিরি গোবর্ধনের পূজা করতে থাকেন এবং প্রতিদিন অষ্টভোগের (প্রতি প্রহরে একটি করে ভোগ। সেই অনুযায়ী অষ্টপ্রহর অর্থাৎ একদিনে অষ্টভোগ) হিসাবে ৭×৮= মোট ৫৬ রকম ভোগ নিবেদন করেন তাঁকে। যাতে অন্নসহ ছিল নানাবিধ পদ। যদিও পাহাড় দেবতায় রূপান্তরিত কখনওই হননি। বিভিন্ন শাস্ত্রে বর্ণিত, স্বয়ং গিরিধারী কৃষ্ণই গোবর্ধনের রূপ ধারণ করে এই ভোগ গ্রহণ করেছিলেন।

এই বিশ্বাস থেকেই প্রতিবছর কার্তিক মাসের শুক্লা প্রতিপদ তিথিতে শ্রীকৃষ্ণ পূজিত হন গোবর্ধনরূপে। তাঁকে ৫৬ রকম ভোগ নিবেদন করে ‘অন্নকূট’ মহোৎসব পালন করা হয়। নীলাচলের জগন্নাথদেবকে বলা হয়, অচল ব্রহ্ম। তিনি অবশ্য রোজই এই ৫৬ প্রকার ভোগ পেয়ে থাকেন।


ঈশ্বর পরমব্রক্ষ্ম। ঈশ্বরের প্রকাশ সর্ব জীবে, সর্বত্র। এই ভাবনাকে মাথায় রেখে দেশের অন্যান্য মন্দিরেও অন্নকূট মহোৎসবের আয়োজন করা হয়।


ব্যারাকপুর অন্নপূর্ণা মন্দির :

রানি রাসমণির কন্যা জগদম্বা ১৮৭৫ এ ব্যারাকপুর তালপুকুরের অন্নপূর্ণা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ওই মন্দিরে অন্নকূট উৎসব হয় অন্নপূর্ণা পুজোর দিনে। ওই দিন সকালে মূল পুজো, কুমারীপুজো ও হোমের পরে হয় অন্নকূট। একুশ কিলোগ্রাম চালের ভাত-সহ ৫১ রকম পদ দেওয়া হয় ভোগ হিসেবে।


শ্যামপুকুর বলরাম ঘোষ স্ট্রিটের ভট্টাচার্য বাড়ি :

শ্যামপুকুরের বলরাম ঘোষ স্ট্রিটের বাড়িতে অন্নপূর্ণা মূর্তি ও শ্রীধর (শালগ্রাম শিলা) স্থাপন করেন ভূপতি ভট্টাচার্য। এবাড়িতে অন্নকূট উৎসবে ১১৫ রকম রান্না করা পদ ও ১২০ রকম মিষ্টান্ন ভোগ দেওয়া হয়।এবাড়ির অন্নকূটের বিশেষত্ব হলো, এখানে কোনোরকম জাতিভেদ মানা হয় না। যে কোনও বর্ণের মানুষ এসে ভোগ রান্না করতে পারেন।

বাগবাজার নববৃন্দাবন মন্দির

বাগবাজার নববৃন্দাবন মন্দিরেও পালিত হয় অন্নকূট মহোৎসব। কড়ুই পরিবার প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরের অন্নকূটের এবছর ৮৪ তম বর্ষ। মোটামুটি ৩০০ রকমের ভোগ নিবেদন করা হয় এখানে। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং এখানে অবস্থান করেন ভাতের চূড়ার উপরে।

রানিগঞ্জ বাজার বারোয়ারি পুজো উৎসব ও সেবা সমিতি

মোটামুটিভাবে ৪১ বছর ধরে এখানে অন্নকূট উৎসব পালন হয়ে আসছে। বাহান্ন রকম ভোগ দেওয়া হয় এই পুজোয়। ২৫-৩০ প্রকারের ভাজা, পোলাও, ভাত, চাটনি, পায়েস এবং অনেক প্রকারের মিষ্টি থাকে ভোগে।



মদনমোহনতলার মদনমোহন ঠাকুরবাড়ি :

১৭৬১তে গোকুলচন্দ্র মিত্র তাঁর এক বিঘার'ও বেশি জায়গা নিয়ে তৈরি বাড়ির দোতলায় কুলদেবতা ‘মদনমোহন’-এর জন্য ‘দরবার কক্ষ’ তৈরি করেন। একতলায় তৈরি করেন ঠাকুরদালান ও নাটমন্দির। কার্তিক মাসের শুক্লা-প্রতিপদ তিথিতে নাটমন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় অন্নকূট উৎসব। প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম চালের ভাত-সহ ১৫৭ রকম পদ তৈরি হয়। পুজো শেষে ভক্তদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হয় ওই অন্নভোগ।


সোনারপুর কালী শিবগুরু মঠ:

সোনারপুর খড়িগাছি অঞ্চলের কালী শিবগুরু মঠে অনুষ্ঠিত হয় অন্নকূট উৎসব। উৎসবের দিন পিতলের পরাতে প্রায় আড়াই মণ চালের ভাত দেওয়া হয় ভোগ হিসেবে। চুড়ো করে সাজানো ভাতের গায়ে সব্জি দিয়ে কালীর মুখ আঁকা হয়। সঙ্গে থাকে ১৫৫ রকমের নিরামিষ পদ।




পুষ্টিবিদের মতামত ছাড়া নিজে নিজে ডায়েট করছেন? অজান্তেই ডেকে আনছেন বিপদ! কেন প্রয়োজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, আলোচনায় পুষ্টিবিদ কোয়েল পাল চৌধুরী।


ওজন কমানোর জোয়ারে গা ভাসিয়ে আজকাল পুষ্টিবিদ সবাই! এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন এমন, অথবা কোনোরূপ পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়া নিজে নিজে যারা ডায়েট চার্ট বানিয়ে প্রয়োজনের কম খেতে শুরু করেন, তারা সন্মুখীন হতে পারেন বিভিন্ন গম্ভীর সমস্যার। বলা হয়, যা খাও তাই তুমি। তার মানে আপনি যা খান তা আপনার ত্বক এবং শরীরে প্রতিফলিত হয় সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে শরীর এবং সমস্যা অনুযায়ী সবার প্রয়োজন ও আলাদা। তাই শুধু মাত্র সঠিক খাবার খেয়ে সুস্থ থাকতে চাইলে চাই সঠিক পরামর্শ। রইলো বিশেষজ্ঞের সুচিন্তিত মতামত।


ডায়েট কথাটা বড্ড ভারীক্কি বা আধুনিক যুগে ফ্রেন্ডলি কিন্তু তার তাৎপর্য? চিকিৎসা শাস্ত্রে সৃষ্টিবিজ্ঞানের উজ্জ্বল উপস্থিতি, বা তা দৈনন্দিন জীবনে সম্পাদন করার উপায়? নৈব নৈব চ! মানুষ মেতে উঠেছে গুগল গন্ডগোল জোয়ারে গা ভাসিয়ে নানারকম বিদেশি খাবারের বা কায়দায় উন্মুক্ত করেছে তাদের পাক প্রণালী। তার জন্য হাসপাতালে বাড়ছে ভিড় কেননা কত মানুষ জিম বা ওয়েলনেস সেন্টার থেকে ভুলভাল বা মাত্রাতিরিক্ত সাপ্লিমেন্ট বা ইনজেকশন নিয়ে ডাক্তারি করছে দিকে দিকে অনেক বার্তা প্রচার করা সত্ত্বেও। হাতুড়ে ডাক্তারের জেরে শিক্ষিত সমাজ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। হচ্ছে অপুষ্টির শিকার কঠিন পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর সাথে সাথে পুষ্টিবিজ্ঞানের বাস্তবিক রূপায়ণটাও বোঝানো দরকার। কেন এটি বিজ্ঞান? সেই অপকট সত্যটা উদ্ভাবন করার সময় এসেছে কারণ ভারত ছাড়া বিশ্বের মধ্যে নামাঙ্কিত অপুষ্টির দেশ হিসাবে। এটি সার্বজনীন সত্য যে মাতৃগর্ভ থেকে নতুন প্রাণের সৃষ্টি হয় তবুও যদি মায়ের পুষ্টি স্থিতি না হতো অর্থাৎ মায়ের শরীরে পুষ্টিগত পদার্থ না গচ্ছিত থাকতো তবে বাচ্চার জন্ম দেওয়া সম্ভব হতো না একটি দুই থেকে তিন কেজি ঠিক হওয়া শিশুর প্রথম খাবার ই হলো মাতৃদুগ্ধ। যা মহৌষধি বললেও কম বলা হবে।



৬ মাসে অন্নপ্রাশন তারপরে শিশুর পূর্ণ বিকাশ সবকিছুই খাবারের মাধ্যমে মা সন্তান অর্থাৎ পৃথিবীর সমস্ত জীবকেই জীবন দিচ্ছে এই পুষ্টি, যা জনজীবনের প্রথম থেকে শেষ দিন উক্তি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু খাবারের বাদ বিচার তো মোটেই আমরা করি না কারণ হয়তো সহজলভ্য জিনিসের মূল্য এই জগতে কম। আবার অনেকে এটাও ভেবে ফেলে সহজেও সস্তায় পাওয়া খাদ্য উপাদানের পুষ্টিগত গুরুত্ব কম অনেকেই এই ধারণা পোষণ করেন ডায়েট অতি খরচ সাপেক্ষ বিষয়। আগেকার দিনের মানুষজন অনেক বেশি সতেজ রোগমুক্ত থাকতো তার কারণ পরিমিত শস্য শাকসবজি ফল জল সহজলভ্য ছিল। সঠিক দাম ও মান বজায় থাকতো। শৃঙ্খলা ছিল অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। যদি বিজ্ঞানের ভাষায় বলি ফুড এন্ড নিউট্রিশন সিকিউরিটি অনেক বেশি স্বচ্ছ এবং সমৃদ্ধ। পরিবেশ ও খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং জীবন-যাপন ছিল সরল ও মার্জিত তথ্য সাপেক্ষে বলা ভালো আগে মহামারী হত ঠিকই তবে তা বাইরে থেকে আসা জীবাণু বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে লাইফ স্টাইল ডিজিজ মত বা ফ্যাশন বা ফ্রিকশন তৈরি হয়েছে অনেক পরে যা মানবজাতির অবক্ষয়ের ফলে তৈরি হয়েছে এখন বৈচিত্র্যময় খাবার মুঠোফোনের একটা ক্লিকেই চলে আসে। মানুষ ঘরের খাবার ছেড়ে ইন্টারনেটে দেখা জটিল খাবার সরলিকরণ করতে গিয়ে গলাদ্ধকরণ করে ফেলেছে। বাঙালি ছিল মাছে ভাতে আজ তার মাছে গন্ধ লাগে আর ভাতে ভাবে নাকি সুগার আছে। অনেক খাস গল্পের পরে হাসপাতালের প্রেক্ষাপট সামনে রেখেই বলা ভালো বেশিরভাগ রোগী মালনিউট্রিশন এর শিকার। নয় পর্যাপ্ত খাবারের অভাব না হলে খাবারের প্রাচুর যে শরীর নাজেহাল ডায়াবেটিস কার্ডিও লিভার ডিপার্টমেন্টে লম্বা লাইন। রোগীর সাথে প্রাথমিক কথোপকথন ই উঠে আসে দিনের পর দিন খাবারকে অবহেলা করা ঠিক সময় না খাওয়ার বদভ্যাস কিংবা অতিরিক্ত তেল মসলা খাবার খাওয়ার সদিচ্ছা। ক্যান্সার রিসার্চ বলছে সতেজ স্বাস্থ্যকর খাদ্য উপাদানের অভাবে ম্যালিগন্যান্ট সেল বাসা বাঁধছে শরীরে। অতিরিক্ত প্যাকেট খাদ্য ২ মিনিটে তৈরি হওয়া চটজলদি খাবারের ফলে স্থগিত হয়ে যাচ্ছে শিশুর বিকাশ। বড় সার্জারির পরে রোগ সেরে উঠতে সময় লাগছে শুধুমাত্র পুষ্টির অভাবে। বলা বাহুল্য যাদের জন্ম থেকে পুষ্টি সঠিকভাবে সঞ্চারিত হয় স্বাস্থ্যের সু বিকাশ হয় তারা অনেক করোনা নামক মৃত্যু রূপী ভাইরাস এরো মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছে বুঝতে হবে সমস্ত ওষুধ তথ্য মানবদেহে কার্যকরী তখনই হয় যখন পুষ্টি উপাদানগুলি সঠিক সমন্বয় থাকবে যাকে বিজ্ঞান খচিত নামে বলা হয় ফুড এন্ড ড্রাগ ইন্টারেকশন। দেখবেন প্রতিটি রোগের আলাদা আলাদা ডাক্তার থাকে যাদের সেই বিষয়ে স্পেশালিস্ট বলা হয়। তেমনই খাবার নিয়ে পড়াশোনা হয় বিএসসি এমএসসি পি এইচ ডি অর্থাৎ স্নাতক স্নাতক উত্তর গবেষণামূলক কাজ করে একজন ডায়েটিশিয়ান একজন রোগীকে দেখতে আসে কাজে ডিগ্রিমহীন বা ৬ মাসের সার্টিফিকেট কোর্স করা বা ওষুধের প্রেসক্রিপশনে এটা খাবেন আর ওটা খাবেন না লেখাকে প্রাধান্য দিলে আপনার স্বাস্থ্যেরই প্রাধান্য কমবে। ডায়েট করা মানে না খেয়ে বা বিদেশি খাবার খেয়ে বা ১৮ ঘণ্টা উপোস করে থাকা নয়। সুষম খাদ্য বা ব্যালেন্স ড ডায়েট কে আত্মস্থ না করতে পারলে নানা রকম রোগ আপনাকে আত্মসাৎ করে ফেলবে। যে কোন মানুষের বয়স ওজন পেশা জীবনযাত্রা জিনগত রোগাবলীর বিচারের বৃত্তীয় ক্রিয়া মানসিক স্বাস্থ্য এমনকি অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে ডায়েট প্রেসক্রিপশন করা হয়।



কাজটি যেমন সময় সাপেক্ষ তেমনই অনেক কিছু ক্যালকুলেশন লাগে সবার ক্ষেত্রে একই ফর্মুলা ধার্য নয় একই খাবারের মেনু যথাযথ নয়‌। বায়োকেমিক্যাল এবং ক্লিনিকাল অবস্থা পরীক্ষা না করে আন্দাজে খাদ্য তালিকা করা অসম্ভব শুধু নয় অনৈতিক ও কারণ এটি মানব যন্ত্র যার মধ্যে ভুরিভুরি বিজ্ঞান লুকিয়ে আছে অথচ বাঙালির ভুঁড়ি বেড়ে যাওয়ার জন্য বাঙালি ডায়েট করছে। ঘুড়ি অর্থাৎ সেন্ট্রাল ওবিসিটি অর্থাৎ মধ্যপ্রদেশ স্ফিত হওয়ার মূল কারণ খাদ্যের অনিয়ম। সঠিক পথে আনতে আজ dietian দের প্রয়োজন। বিদেশে অল্টারনেটিভ মেডিসিন এর হই হই। প্রাকৃতিক খাবারকে পন্থা করেই চলে চিকিৎসা অথচ আমাদের দেশ সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা তবুও এর সদ্ব্যবহার হচ্ছে না প্রকৃতিকে সঙ্গী করে প্রকৃতি থেকে সহজে মেলা খাবারই চাঙ্গা করবে আমাদের শরীর ও মন। মেডিটেরিয়ান ডায়েট বাঙালির জন্য নয়, আকর্ষণীয় হলেও সহজপাচ্য হবে না বিষয়টা। কিটো ডায়েট করে ওজন ঝরাতে গেলে হবে আর এক বিপদ আপনার পুরনো স্বাভাবিক জৈবিক ক্রিয়া বা মেটাবলিজম ফেরানো দুষ্কর হবে। আপনি বুঝবেন না ইউটিউব দেখে কিটো ডায়েটে কত শতাংশ ফ্যাট দিতে হবে। ওষুধের যেমন ডোজ আছে তেমনি ডায়েটেরও মাপ আছে, মান্যতা আছে ক্যালরি কাউন্ট আছে মাত্রাতিরিক্ত হলে টক্সিসিটি কেউ আছে খাবারই প্রতিটি কলা কে শক্তি দিচ্ছে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ চালিত করছি উৎসেচক কে উজ্জীবিত করছে। মস্তিষ্ক সঞ্চালন করছে মানব শরীরকে পরিকাঠামো দিচ্ছে। কাজেই খাবারকে অবৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে গ্রাহ্য করা যায় না বা নিজের মত করে প্রেসক্রিপশন করা যায় না রোগ হলে তা বিয়োগ করার জন্য ডায়েট যোগ করা প্রয়োজন। সামাজিক মাধ্যমে নানান উপদেশ বড়দের বকুল আদেশ সহজলোক্য খাবারের অনাসৃষ্টি বাহ্যিক সৌন্দর্যের তাড়নায় রোগভোগ বাড়ছে আয়ু কমছে। হাইপার টেনশন ডায়বেটিস থাইরয়েড লিভারের সমস্যা, নানাবিধ রোগ শুধুমাত্র সঠিক খাদ্যাশেই সেরে যেতে পারে তার জন্য সারা জীবন ওষুধের সাহচর্য লাগে না আবার শরীরের উপর জোর করে নানান রকম ইন্টারমিডিয়েট ফাস্টিং চাপিয়ে দিয়ে দশটা মাল্টিভিটামিন ট্যাবলেট খেয়ে নিজেকে ফিট দেখাতে গিয়ে হিটের বিপরীত হয়ে যাচ্ছে জিমে গিয়ে অতিরিক্ত প্রোটিন বা কিডনি ফেলিওর এর কারণ হচ্ছে। আমরা যারা হাসপাতালে নিত্যদিন থাকি এইসব ঘটনা দিবারাত্র ক্রিটিকাল কেয়ারেও দেখতেই পাই। পুষ্টি কতটা জরুরি সেই নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে মানুষের মধ্যে এক বাক্য লাভ হওয়া দরকার রোগা মোটা নিয়ে হেলথ স্ট্যাটাস নির্ণয় করা যায় না সুপুষ্টি মানুষকে শারীরিক মানসিক ও সামাজিকভাবে সু বৃদ্ধি সমাপন করে আর তার কান্ডারী হল একজন ডিগ্রিধারী ডায়াটিশিয়ান।


তাই নিজে নিজে নয়, যেকোনো সমস্যায় একজন সঠিক পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন। ওষুধ নয়, খাবার খেয়ে সুস্থ থাকুন, ভালো থাকুন।

ঘরের কোণে গড়ে উঠুক নিজের ছোট্ট জগত !

এলিজা


আমাদের অনেককেই এখন আর সকাল আটটার বাস বা ট্রেন ধরার কথা ভাবতে হয় না। সময়ের সঙ্গে বদলেছে কাজের ধরন ও পরিসর। আর এই পরিবর্তনের কেন্দ্রে রয়েছে হোম অফিস বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম কনসেপ্ট।


কিন্তু হোম অফিস মানে কি শুধুই একটা ডেস্ক আর একটা চেয়ার? নাকি এমন একটি জায়গা, যেখানে চিন্তা, নৈঃশব্দ্য ও সৃষ্টিশীলতা একসাথে বেড়ে ওঠে?


হোম অফিস হতে পারে আপনার নিজস্ব এক আশ্রয়, যেখানে আপনি কাজ করতে পারেন, স্বপ্ন দেখতে পারেন, আবার মাঝেমধ্যে একটুখানি চুপচাপ বসেও থাকতে পারেন।



স্থান : এমন একটা কোণ খুঁজুন, যেটা কথা বলে।একটি ভালো হোম অফিস তৈরির প্রথম ধাপ সঠিক জায়গা নির্বাচন।

খেয়াল রাখুন : বাইরের আওয়াজ যেন কম আসে, বাড়ির অন্যান্য কাজকর্ম বা চলাচল যেন কম থাকে ,জানালা থাকলে খুব ভালো, আলো ও হাওয়া দুটোই দরকার, এমন জায়গা বেছে নিন, যার অন্তত একপাশের দেয়াল আপনি নিজের মতো করে সাজাতে পারেন।

আমার মতে, হোম অফিস একধরনের ব্যক্তিগত ‘রিফিউজ’। এমন একটা আশ্রয়, যেখানে আপনি ফোকাস করতে পারেন, নিজের মতো কাজ করতে পারেন, আর মাঝে মাঝে নিজের কাছেও ফিরে যেতে পারেন।

আসবাব : আরাম, রুচি ও কার্যকারিতার মিলন

হোম অফিসে আসবাব বাছার সহজ নিয়ম, ফাংশন মিটস ফর্ম। মানে, যা দেখতে ভালো লাগে, আবার ব্যবহারযোগ্যও হয়।

ডেস্ক : মাঝারি আকারের, মজবুত কাঠের একটি ডেস্ক নেওয়া যেতে পারে, যাতে ল্যাপটপ, নোটপ্যাড, মোমবাতি, কফি মগ, জলের বোতল এবং একটি ছোট গাছ রাখা যায়। ইন-উড বা প্লাইউডের আধুনিক ডেস্কও হতে পারে ভাল বিকল্প।


চেয়ার : ব্যাক সাপোর্ট-সহ একটি আরগোনমিক চেয়ার নেওয়া ভালো, তবে তার মধ্যে যেন সফটনেস ও নান্দনিকতাও থাকে। কুশন-প্যাডেড বাঁশের হাই ব্যাক চেয়ারও একটা আকর্ষণীয় বিকল্প।


শেলফ বা ওয়াল ইউনিট : কাজের বই, কিছু প্রিন্ট, স্টেশনারি ও অনুপ্রেরণামূলক সামগ্রী রাখার জন্য ছোট তাক রাখা যেতে পারে। পুরনো কোনো তাককে নতুন করে ব্যবহার করাও চলতে পারে।


জায়গা কম হলে : একটি ফোল্ডিং ডেস্ক, বেডসাইড টেবিল, হালকা ওয়াল শেলফ বা হ্যাংগিং অর্গানাইজার ব্যবহার করে জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার করা সম্ভব।



রঙ ও টেক্সচার : স্পেস-এর সঙ্গে স্পিরিটের মেলবন্ধন

হোম অফিসের পরিবেশ বদলে দিতে পারে রঙ।

হালকা সবুজ, ধূসর বা মাটির রঙ, মন শান্ত রাখে। হালকা হলুদ বা অফ হোয়াইট, মন ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। তবে অফিসের রঙ যেন ঘরের বাকি রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

সাজানোর উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন :

নিজের আঁকা একটি ছোট ক্যানভাস

একপাশে আলপনা প্রিন্টের ওয়াল

জানালায় জামদানি মোটিফের পাতলা পর্দা

ডেস্কে হ্যান্ড পেইন্টেড মাটির টব ও তাতে একটি সবুজ গাছ

এই সবকিছু যেন আপনার ব্যক্তিগত গল্পের অংশ হয়ে ওঠে।


আলো ও প্রযুক্তি : আধুনিক আর শৈল্পিক ভারসাম্য

হোম অফিসে প্রযুক্তি থাকবে ঠিকই, তবে সেটি যেন চোখে পড়ে না। জায়গাটি যেন একসাথে শান্ত ও সক্রিয় থাকে।

ডেস্ক ল্যাম্প : নিজের কাজের ধরন ও ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী ল্যাম্প বেছে নিন। নানা ধরণের ল্যাম্প ও ল্যাম্পশেড এখন বাজারে সহজলভ্য।

ইন্টারনেট রাউটার : কাঠের বক্সে ঢেকে রাখা যায়, অথবা ডেস্কের নিচে সেমি-কভার্ড জায়গায় রাখা যেতে পারে।

কেবল অর্গানাইজার : টেবিলের নিচে বা ওপরে স্টাইলিশ কেবল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করুন। ইউএসবি পোর্টসহ ওয়াল সকেট থাকলে সুবিধা হয়।

আলো : দিনের বেলায় জানালা দিয়ে সূর্যের আলো আর সন্ধ্যায় ডেস্ক ল্যাম্পের আলো, এই আলোর ছন্দে তৈরি হয় কাজের মুড। সঙ্গে একটি সুগন্ধি ক্যান্ডেল জার রাখলে পরিবেশ আরও প্রশান্তিময় হয়।


স্পর্শ ও সুগন্ধ : হোম অফিস হোক জীবন্ত

গন্ধ : একটি ইনসেন্স স্টিক, এসেনশিয়াল অয়েল ডিফিউজার বা সুগন্ধি ক্যান্ডেল রাখতে পারেন, যেমন ল্যাভেন্ডার, লেমন গ্রাস বা ইউক্যালিপটাস।


নরম ছোঁয়া : নরম কুশন, মাদুর কাঠি বা জুটের ডেস্ক ম্যাট, মসৃণ সিরামিকের ছোট পেন হোল্ডার, সব কিছু যেন ছুঁয়ে দেখার মতো টানে।


স্মৃতি : প্রিয় মানুষের লেখা চিঠি, ছোট্ট মাটির ঘণ্টা, পুরনো ক্যামেরার শেল, পরিবারের কারও হাতে আঁকা ছবি বা ওয়াল হ্যাঙ্গিং, এসব রাখুন আপনার আশেপাশে।

এটা আপনার স্পেস, তাই আপনার গল্প বলুক


হোম অফিসকে সাজান এমনভাবে, যেখানে ঘড়ির কাঁটা শুধু সময় নয়, সৃজনের ছন্দ বলে। যেখানে ডেস্কের উপর রাখা গাছটার মতোই আপনি নিজেও একটু একটু করে বড় হন।যেখানে প্রতিটি বস্তু আপনাকে মনে করিয়ে দেয়, আপনি কে, আপনি কী করতে চান।


থিম অনুযায়ী সাজানোর কিছু ভাবনা :


বোহেমিয়ান : কুশনে হাতের কাজ, গালিচায় আফগানি প্রিন্ট, ম্যাকারেম, শুকনো ফুলের ডাল আর জুটের ছোঁয়া


মিনিমাল : সিম্পল, ইউজফুল, স্লিক আসবাব; ন্যূনতম রঙ ও সাজ


রিজিওনাল বাঙালি : কাঁসার জিনিস, কাঠের ফ্রেমে আলপনা, মাদুর কাঠি, পোড়ামাটির সামগ্রী


আধুনিক মেট্রো : ধাতব ফিনিশ, ব্রাস হ্যান্ডেল, কালার ব্লকিং


ইন্ডাস্ট্রিয়াল/রাস্টিক : এক্সপোজড ব্রিকস, রাফ কাঠ, ব্ল্যাক ফ্রেম


হোম অফিস মানে শুধু কাজের জায়গা নয়।

এটা আপনার একটি স্যাংচুয়ারি, যেখানে আপনি নিজের সঙ্গে সময় কাটাতে পারেন, নিজের মন ও স্বপ্নকে স্পর্শ করতে পারেন।


হোম অফিস হোক আপনার মতো করে, আপনার বাজেট, আপনার ভাবনা আর আপনার স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে সুর মিলিয়ে।


বালিকার বড়ো হয়ে ওঠা

তপন বন্দ্যোপাধ্যায়


জীবনের কিছু ঘটনা অলক্ষ্যে কোথাও তৈরি হতে থাকে যার মধ্যে মানুষের কোনও হাত থাকে না। যা কোনও দিন ঘটার কথা ছিল না সেরকমই এক অভিনব ঘটনার মুখোমুখি হঠাৎ এক আন্তরিক সকালে। কাছাকছি একটা বড়ো মাঠে আমার প্রতিদিনের মর্নিং ওয়াক। কিছুণ হাঁটাহাঁটির পর ঘরে ফেরা। ফেরার পথে একটা পার্ক আছে-ভিতরে সবুজের রমরমা। কত রকমের গাছ। কত রঙের ফুল। পার্কেও প্রতিদিন ভোরে হাঁটতে থাকেন কিছু সুবেশ নারীপুরুষ, তাঁরা বড়ো মাঠে হাঁটতে না-গিয়ে পছন্দ করেন ছোটো পার্কের স্বল্পপরিসরে হাঁটা।


মর্নিং ওয়াক সেরে ফেরার পথে- পার্কের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কখনও চোখ রাখি ভিতরের দৃশ্যে। কেউ একা হনফন করে হাঁটছেন, কেউ-কেউ জোড় বেঁধে গল্পে মত্ত হয়ে। কারও বা হাঁটার কোটা শেষ, পার্কের বেঞ্চিতে বসে গল্পগাছায় ব্যস্ত। কখনও দু'দণ্ড দাঁড়িয়ে দেখি পার্কের বাগানের নিত্যনতুন সেজে ওঠা।


এরকমই এক অলৌকিক সকালে মাঠ থেকে অন্যমনস্কভাবে ফিরছি পার্কের পাশ দিয়ে, হঠাৎ পথ অবরোধ করে দাঁড়ায় এক ছ-সাত বছরের বালিকা, কুণ্ঠা-কুণ্ঠা গলায় কিন্তু স্পষ্ট উচ্চারণে বলল, তুমি কি লেখক?


আমি বিপর্যস্ত এই অভাবিত আত্র (মণে। কখনও পথ-চলতি মানুষ এরকমই কাছে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেন, 'আপনি কি অমুক?' কিন্তু এই বালিকা তো নিতান্তই দুগ্ধপোষ্য! দাঁড়াতেই হয় অতএব, বলি, তুই কী করে জানলি?


-তা হলে ঠিকই ধরেছি। বইতে তোমার ছবি দেখেছি। আমার এম্মা লাইব্রেরি থেকে মাঝেমাঝে তোমার বই নিয়ে আসে। বইয়ের পিছনদিকে লেখকের ছবি থাকে। তোমাকে এখান দিয়ে রোজ যেতে দেখি, আমার মনে হচ্ছিল ছবিটা তোমারই।


বইয়ের মধ্যে আমার ছবি থাকে সে-তথ্য ঠিক, কিন্তু সেই ছবি দেখে আমাকে চিনে রেখেছে এতটুকু মেয়ে! তা হলে তো তার সঙ্গে একটু আলাপ জমাতেই হয়, জিজ্ঞাসা করি, কী নাম তোর? -বাড়িতে সবাই আমাকে সোনু বলে ডকে। আমার একটা ভালো নাম আছে, অভিদত্তা। - বেশ অন্যরকম নাম তো! অভিদত্তা।


-আসলে কী জানো, আমার বাবার নাম অভীক, মায়ের নাম সোমদত্তা। দুটো নমের অর্ধেক অর্ধেক নিয়ে অভিদত্তা।


-চমৎকার। আমি তার পিঠে হাত রেখে বলি, বেশ, তুই আজ থেকে আমার একটা ছোট্ট বন্ধু। সোনুর সঙ্গে ভাব পাতিয়ে, তার সঙ্গে করমর্দন করে ফিরে আসি ঘরে। মনের আয়নায় বারবার ভেসে ওঠে হাসি-হাসি ছোট্ট মুখখানা। তার কথাগুলো বাজতে থাকে টুংটাং শব্দের মতো।


তার পরদিন আবার ফিরছি, পার্কের পাশ দিয়ে আসার সময় দেখি, কালকের মতোই সোনু হাসি- হাসি মুখে দাঁড়িয়ে, গুড মর্নিং।



-ইয়েস, গুড মর্নিং, বলে জিজ্ঞাসা করি, তুই কি রোজই আসিস?


-আসিই তো রোজ। এম্মার সঙ্গে আসি তো।


সোনুর এম্মা কে তা জানা নেই, নিশ্চয় সোনুর অভিভাবক, তিনি না হয় শরীর সুস্থ রাখতে রোজ পার্কে হাঁটতে আসেন, কিন্তু এই ছোট্ট বালিকা রোজ মর্নিং ওয়াক করতে আসে-এ বড়ো বিস্ময়ের কথা। হাসি-হাসি মুখে বলল, এম্মাকে তোমার কথা বলেছি। এম্মা বলছিল তোর সঙ্গে তা হলে লেখকবাবুর বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল!


অতএব এক অদ্ভুত কাকতালের মধ্যে কয়েকদিনের মধ্যে গাঢ় হয়ে ওঠে বন্ধুত্বটা। প্রতিদিন সকালে ঘরে ফেরার পথে দেখি পার্কের গেটে একই রকম হাসকুটি মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে সোনু, আমাকে দেখেই একটা লাফ দিয়ে উঠে ছুটে আসে, দুই হাতে আমার হাতদুটো ধরে একনাগাড়ে বলে যাবে গতকাল সারাদিনে তার কী কী অভিজ্ঞতা হয়েছে, কে কী বলেছে, কোথাও গিয়ে থাকলে তার ধারাবিবরণী।


কোনও দিন পার্কের সামনে গিয়ে দেখি সোনু অপোয় নেই, পার্কে তার নানা বয়সি বন্ধু আছে, তাদের কারও না কারও হাত ধরে পার্কের চারপাশে ঘুরছে বড়ো বড়ো পা ফেলে। হঠাৎ দূর থেকে আমাকে দেখে সেই বন্ধুর হাত ছেড়ে একছুট্টে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে হাজির, বলে, তুমি আজ পাঁচ মিনিট আগে এসে পড়েছ।



কব্জিতে চোখ বুলিয়ে দেখি, সত্যিই তাই, বলি, কী করে বুঝলি?


-এখানে এক চল্লিশ মিনিট দাদু আছেন। তিনি পার্ক ছেড়ে চলে গেলে বুঝি তোমার আসার সময়


হয়ে গেছে।


-চল্লিশ মিনিট দাদু?


-হ্যাঁ, উনি ঠিক ঘড়ি ধরে চল্লিশ মিনিট হাটেন। আজ তিনি এখনও বেরোননি। কী আশ্চর্য সোনুর সময়জ্ঞান। আমি ঠিক কখন আসব তা মুখস্থ হয়ে গেছে ওর।


তা যেদিনই একটু আগে আসি, সোনু কারও না কারও হাতে ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে পার্কের ভিতরের বাঁধানো রাস্তা ধরে। হাঁটে, কিন্তু খেয়াল রাখে আমি পার্কের মুখে এসে গেছি কি না! আমাকে দেখতে


পেলেই অমনি লাফ দিয়ে ছুটে এসে আমার হাত ধরে তার আগডুম বাগডুম গল্প। তার গল্পের বৈচিত্র্যও অনেক। নানা ধরনের বই পড়ার অভ্যাস সোনুর। কখনও ভূতের গল্প, কখনও ফেয়ারি টেল, কখনও কমিক্সের গল্প। সেই আজগুবি, অলৌকিক অথচ মজার পৃথিবীতে তার



অনায়াস আনাগোনা। গল্প বলার ফুরসতে তার অভিব্যত্তি(তে ছায়া পড় সেই অলীক পৃথিবীর। আমিও তার রহস্যময় পৃথিবীতে পা রাখে শামিল হই তার ভাবনার সঙ্গে। সোনুর এম্মার সঙ্গে আলাপও হয়ে গেল একদিন। তিনি সোনুর ঠাকমা। টিভি সিরিয়ালের মায়া


কাটিয়ে যিনি এখনও গল্পের বইয়ের পাতায় মগ্ন থাকেন নিয়ত। তাঁর হাঁটা শেষ হলে পার্কের একটি


নির্দিষ্ট বেঞ্চিতে বসে থাকেন কিছু (ণ। তাঁকে দেখলেই আমি বুঝতে পারি সোনুও এসেছে।


সোনুর সঙ্গে প্রতিদিন এত গল্পগাছা দেখে একদিন সোনুর এম্মা বললেন, আপনারা দু'জনে যখন নিবিষ্ট হয়ে কথা বলেন, আমার মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালার গল্পটা। কাবুলিওয়ালা ঠিক এরকমভাবেই মিনির সঙ্গে গল্প করত রোজ।তাই নাকি! বিষয়টা আমার মাথায় আসেনি এতদিন। সোনুর সঙ্গে গল্প করাটা এমনই অভ্যাসে দাঁড়িয়েছে যে, একদিন সোনু কোনও কারণে পার্কে না এলে কীরকম শূন্য-শূন্য লাগে দিনটা। সোনুর এম্মা বললেন, আজ কিছুতেই ঘুম থেকে উঠতে চাইল না। বলল, 'ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।' কাল রাতে


ঘুমোতে অনেকটা রাত হয়ে গিয়েছিল তো।


সোনু ঠিকই তো বলেছে। অতটুকু মেয়ে রোজ ঘুম ভেঙে এত পথ যে আসে সেটাই অবাক কাণ্ড! তার বয়সি ছেলেমেয়েরা কেউ আসতে চাইবে এরকম রোজ রোজ!


পরদিন পার্কে দেখা হতে কাঁচুমাচু মুখে সোনু বলে, কাল আসতে পারিনি। এত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম


না!



তার অপরাধী-অপরাধী মুখে দেখে হেসে পিঠ চাপড়ে সান্ত্বনা দিই, বলি, ঘুম তো আর টিভির নব নয় যে, ইচ্ছেমতো খুলব বা বন্ধ করব। ঘুম কারও নিয়ন্ত্রণে থাকে না।


সোনুও হেসে উঠে বলল, ঠিক বলেছ।


তারপর যথারীতি তার সারাদিনের রোজনামচা।


ক'দিন পরে পার্কের সামনে এসে দেখি সোনু নেই। নিশ্চয়ই আজও ঘুমিয়ে পড়েছে। বিমর্ষ মুখে ফিরে আসছি, হঠাৎ কে যেন পিছন থেকে লাফিয়ে এসে আমার হাত ধরে ঝুলে পড়ে। দেখি সোনুর মুখে দুষ্টুমির হাসি। বলি, কী রে তুই কোথায় ছিলি?


সোনু হেসে গড়িয়ে পড়ে, বলল, তোমার ঠিক পিছনেই লুকিয়ে ছিলাম। দেখছিলাম তুমি আমাকে খুঁজে পাও কি না!


হেসে উঠে বলি, বাহ, বেশ দুষ্টু তো তুই!


এই লুকোচুরি খেলায় সোনু এতটাই মজা পেল যে, মাঝেমধ্যেই পার্কের এখানে ওখানে লুকিয়ে থাকে, আর আমাকে পার্কে ঢুকে এ-ঝোপে ও-ঝোপে ঘুরে ঘুরে খুঁজে বার করতে হয় তাকে। আমিও বেশ মজা পাই তার এই দুষ্টুমির খেলায়। কোনওদিন কামিনীগাছের ঝোপের আড়ালে, কোনওদিন পামগাছের আড়ালে, কোনওদিন-


তার মধ্যে হঠাৎ একদিন দেখি সোনুর এম্মা আসেননি। বেঞ্চিটা ফাঁকা। কিছুক্ষণ চোখ চালিয়ে


সোনুকে না-দেখে ফিরে আসি বাড়িতে। কিছু(ণ পরেই মোবাইলে ফোন। সুইচ অন করতেই ওদিকে নারীকণ্ঠ, আমি সোনুর এম্মা বলছি। আপনি আজ মর্নিং ওয়াকে যাননি?



-হ্যাঁ। গিয়েছিলাম তো।


-এই রে। আসার সময় আপনি সোনুর সঙ্গে দেখা না-করেই চলে এসেছেন! অবাক হয়ে বলি, সোনু কি আজ পার্কে ছিল? আমি তো চোখ চালিয়ে খুঁজলাম ওকে। কোথাও


দেখতে পাইনি তো! আপনাকেও দেখতি পাইনি। ভাবলাম আজ আপনারা আসেননি!


- কিন্তু কী মুশকিল হয়েছে জানেন? আমি একটু সময়ের জন্য পাশের আশ্রমে গিয়েছিলাম। সোনু আমার সঙ্গে যায়নি। দূরের একেটা বেঞ্চে একা বসেছিল পাছে আপনি ওকে না- পেয়ে চলে যান।


-সে কী! আমি তো আপনাদের দুজনের কাউকে দেখতে না-পেয়ে ভাবলাম আজ আসেননি। -সোনু আপনার জন্যই বসেছিল। আপনাকে ও দেখতে পেয়েছে দূর থেকে। ছুটে এসেওছিল গেট পর্যন্ত। আপনাকে অনেকবার ডেকেছে, কিন্তু আপনি শুনতে পাননি। আমি এসে দেখি বেঞ্চিতেবসে হাপুশ নয়ন কাঁদছে একা-একা।


-সে কী! আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি, নিশ্চয় গাড়ির আওয়াজে ওর কণ্ঠস্বর কানে পৌঁছোয়নি আমার!


-খুব অভিমান হয়েছে ওর। বাড়িতে এসেও কেঁদে ভাসাচ্ছে, কিছুতেই শান্ত করতে পারছি মা! বলছে আর কোনও দিন আপনার সঙ্গে কথা বলবে না!


আমার উত্তরোত্তর বিস্ময়, ব্যস্ত হয়ে বলি, ফোনটা ওকে দিন। আমি দেখি ওর রাগ ভাঙাতে পারি কিনা!


তার পরের দশ মিনিট চলল এক খুদে অভিমানিনীর সঙ্গে কথোপকথন। তখনও হাউমাউ করে কেঁদে চলেছে আর বলছে, 'তুমি আমাকে একটুও ভালোবাসো না। তোমার সঙ্গে আমার আড়ি আড়ি


আড়ি।' অমি তাকে ক্রমাগত বোঝাতে চাইছি কীভাবে ঘটল এই ভুল-বোঝাবুঝি। কিন্তু একজন তরুণী বা যুবতীকে যত সহজে বোঝানো যায়, একটি বালিকাকে বোঝানো তার চেয়ে ঢের ঢের দুরূহ।


অনেক (ণণ পরে ফোনের মধ্যে মুখে হাসি ফোটাতে স(ম হলে বলল, কাল রবিবার। একটু বেশি সময় নিয়ে আসবে। দুদিনের গল্প একদিনে শুনতে হবে।


বললাম, নিশ্চয়ই। তুই আমাকে ফাইন করে দে।




পরের দিন একটি চকোলেট পকেটে নিয়ে গিয়ে তাকে খুশি করার চেষ্টা করি। কিন্তু ভবি কি অত সহজে ভোলে! বহু (ণ রাগ দেখানোর পর বলল, এম্মা আমাকে আশ্রমে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু


তুমি আমাকে না দেখতে পেলে দুঃখ পাবে বলে আমি একা বসেছিলাম তোমার জন্য। আর তুমি আমাকে-


আবার অভিমান ভরে এল তার গলায়।


-ঠিক আছে, এর পর থেকে তোকে না দেখতে পেলে আমি সারা পার্ক তন্নতন্ন করে খুঁজব। দরকার হরলে পাম গাছটা বেয়ে উপরে উঠে পাতার ঝোপের মধ্যে খুঁজব।


শেষ কথাটা শুনে ফিক করে হেসে ফেলল সোনু-বিষয়টির মধ্যে যে অসম্ভব মজা লুকিয়ে আছে তাই বুঝতে পেরে। ব্যস, অমনি আমাকে (মা করে দিল। তার পরদিন থেকে আর ভুল হয় না। হঠাৎ একদিন আমার পায়ে ঢিপ করে প্রণাম করে বলল, আজ আমার জন্মদিন।


তাই! সোনু আজ বেশ সুন্দর করে সেজে এসেছে। পরিপাটি করে চুল আঁচড়ে, জংলা ছাপা নতুন একটা লং স্কার্ট পরে। হাতে একটা ছোটো ব্যাগ।


হাতের ব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বার করে আমার হাতে দিয়ে বলল, রিটার্ন গিফট। -তা হলে তো আজ একটা সুন্দর দিন। বাড়িতে খুব খাওয়াদাওয়া হবে নিশ্চয়! কিন্তু গিফট-ই দিলাম না। তার আগেই রিটার্ন গিফট!


-জানো, কাল রাতে আমি আর মা মিলে অনেকগুলো প্যাকেট বানিয়েছি। পার্কে আমার তো অনেক বন্ধু।


সোনুর জন্য কী গিফট দেওয়া যায় ভাবতে ভাবতে বাড়ি আসি। বই পড়তে ভালোবাসে, বই দেওয়াটাই শ্রেষ্ঠ উপহার। পরের দিন বইয়ের সঙ্গে নিলাম একটা ডায়েরি আর পেন। বললাম, এই ডায়েরিটায় রোজ কিছু না কিছু লেখার চেষ্টা করবি।


সোনু খুব সিরিয়াস হয়ে বলল, আমি কি তোমার মতো লিখতে পারি?

-তুই লিখবি তোর মতো। যা মনে আসে। এই তো সেদিন বাবা-মায়ের সঙ্গে ডুয়ার্স ঘুরে এলি। সেই ভ্রমণটা লিখে ফেল। লিখে আমাকে দেখাবি।


কঠিন সমস্যায় পড়ল সোনু। দিন তিনেক পরে ডায়েরিটা নিয়ে পার্কে এল, বলল, লিখেছি।


-বাহ। গুড গার্ল। কই দেখি কী লিখেছিস।


সোনু কাঁচুমাচু মুখে বলল, আমি কিন্তু ইংরেজিতে লিখেছি। ইংরেজিতে লিখতেই আমার বেশি ভালো লাগে।


-ঠিক আছে, যা লিখতে ভালো লাগে, সেটা লেখাই ভালো। দেখি কী লিখেছিস?


ডায়েরি খুলে পড়ে দেখি, বেশ গুছিয়ে লিখেছে ডুয়ার্সের নানা অভিনব অভিজ্ঞতা। ময়ূরের সঙ্গে ভাব হওয়া, হাতির দলের উদ্দেশে টা টা করা, রাতে একটা ভয়ংকর আওয়াজ শোনা, সেটা বাঘের কি


না কে জানে। তার মা একটা বড়ো মাপের স্কুলে ইংরেজির শি(কা। অতএব সোনুও যে ইংরেজিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ হবে তাতে অবাক হওয়ার কী আছে! বললাম, যখনই সময় পাবি, কিছু না কিছু লিখবি। কিছুদিনের মধ্যেই সোনুর ডায়েরি ভরে ওঠে নানা ধরনের লেখায়। একবার বাবা-মায়ের সঙ্গে


ঘুরে এল পুরী থেকে। আসার সময় আমার জন্য একটা উপহার। স্থানীয় কারিগরদের তৈরি হস্তশিল্প। বেশ খুশি-খুশি লাগল। ছোট্ট মেয়েটা বাইরে বেড়াতে গিয়ে আমার কথা মনে রেখেছে, মা-বাবাকে


বলে কিনে এনেছে সুন্দর কারুকাজ।


বাড়িতে এনে টেবিলের উপর সাজিয়ে রাখলাম সোনুর দেওয়া উপহার।



সে বছর আমরাও ঘুরতে গেলাম কেরালায়। প্রচুর সমুদ্র, অজস্র ব্যাক-ওয়াটার, আর মশলাপাতির বাগান আর দোকান দেখে ফেরার পথে ভাবলাম সোনুর জন্য কিছু উপহার কিনতে হবে। কোভালাম- এর সাজানো শোরুমগুলি খুঁজে কী-কিনব কী-কিনব ভাবতে ভাবতে কিনে ফেললাম একটা সালঙ্কারা হাতি। র‍্যাকে রাখার মতো। তবু মনে খুঁতখুঁত, কী জানি পছন্দ হবে কি না সোনুর!


হাতিটি কিনে মোবাইলে জানিয়েও দিলাম, তোর জন্য একটা হাতি কিনেছি।


সোনু উচ্ছ্বসিত, তাই! কী মজা!


পরদিন তার এম্মার কাছ থেকে একটা প্রতিত্রি (য়াও পেলাম, 'জানেন, আপনি হাতি আনছেন শুনে সোনু কাল সারা রাত ঘুমোয়নি।' বিস্মিত হয়ে বলি, 'সে কী, কেন?' এম্মার পরবর্তী উত্তর পেয়ে আমি স্তম্ভিত। বললেন, সোনুর এখন অনেক চিন্তা। প্রথমত, হাতিটাকে নিয়ে আপনি কীসে আসবেন! ট্রেনে, না প্লেনে! প্লেনে নিশ্চয় হাতিটাকে নেবে না, তাতে প্লেন ভেঙে পড়তে পারে। তা হলে নিশ্চয় ট্রেনে করে আনবেন। কিন্তু হাওড়া স্টেশন থেকে বেহালা পর্যন্ত কীভাবে নিয়ে আসবেন! কোনও বাসে তো ধরবেই না। তা হলে হেঁটে আসতে হবে। তারপর এ-বাড়িতে কোন ঘর হাতিটার জন্য বরাদ্দ করা হবে। সবচেয়ে বড়ো ঘরটা ছাড়তেই হবে হাতিটাকে। তার পরের প্রশ্ন, হাতি কী খায়! হাতি আস্ত আস্ত কলাগাছ খায় শুনে সোনুর আরও চিন্তা। বাজারে কি কলাগাছ কিনতে পাওয়া যায়! না পাওয়া গেলে কোথা থেকে রোজ কলাগাছ কিনে আনা হবে। ওর মা বলেছে, তা হলে বাড়ির পিছনে যে কিছুটা ফাঁকা জমি আছে সেখানে কয়েক ঝাড় কলাগাছ পুতে দেবে, তা হলে আর হাতির খাবার নিয়ে কোনও ভাবনা থাকবে না। বুঝলেন, সোনু যত প্রশ্ন করছে, ওর মা দুষ্টুমি করে আরও উসকে দিচ্ছে ওকে। ভোরে উঠে কী উত্তেজনা ওর। ওর মা বলছে, এখন ওর ভুল ভাঙিয়ে কাজ নেই।

আমি বেশ হতচকিত।


কলকাত ফিরে পরদিন পার্কের সামনে পৌঁছোতে ছুটে এল সোনু। আমার আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে হাতিটা কোথায়! আমি পার্কের একটা বেঞ্চিতে বসে যখন হাতের ব্যাগ থেকে হাতিটা বার করলাম-সোনুর মুখভঙ্গি দেখার মতো। একবার হাতিটার দিকে তাকায়, একবার আমার মুখের দিকে। তার স্বপ্নভঙ্গ হওয়ার পর্যায়গুলি একেবারে সেলুলয়েডের পর্দায় তুলে রাখার মতো।


আস্তে আস্তে বাস্তবে পা রাখার মুহূর্তে সে হঠাৎ হাতিটাকে কোলে তুলে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল ফিক করে। আমিও তখন হাসছি। সোনু হাসি-হাসি মুখ করে বলল, কী সুন্দর দেখতে হাতিটকে। আমার পড়ার টেবিলে রেখে দেব ওকে।


ততক্ষণে সোনু বুঝতে পেরেছে তার মায়ের দুষ্টুমির কথাও। বলল, বুঝলে, মা ক'দিন ধরে আমার সঙ্গে এত মজা করেছে, আমি সত্যিটা বুঝতেই পারিনি!


হাতির এপিসোডটা সোনুকে এক লাফে অনেকটাই বড়ো করে দিল। এ (মে বুঝতে শিখল তার ভাবনার অবাস্তবতা। তবে তার গল্পের ঝুলি রোজই উপুড় করে ঢেলে দেয় আমার কাছে।


তার মধ্যে একদিন মন-খারাপ মুখে বলল, জানো, লেখকবাবু, নতুন ক্লাসে উঠে আমার স্কুলের রুটিন বদলে গেছে। এখন আটটার মধ্যে স্কুলে ঢুকতে হবে।


-তাই নাকি!


--হ্যাঁ। আর রোজ আসতে পারব না। শুধু রবিবার-রবিবার। বলি, তা হলে আর কী করা! সপ্তাহে একদিন দেখা হবে।


--হ্যাঁ। সেদিন কিন্তু হাতে বেশি সময় রাখবে। এক সপ্তাহে অনেক গল্প জমে উঠবে। সব গল্প তোমাকে না শোনালে স্বস্তি হয় না আমার। --ঠিক আছে। তাই হবে।


সোনুর সঙ্গে অতএব সপ্তাহে একদিন। সারা সপ্তাহ ধরে কী কী করেছে, কোথায় গিয়েছে তার পাই-টু-পাই বিবরণ আমাকে শুনিয়ে তবে সে নিশ্চিন্ত।



দিন গড়াতে থাকে। একটা করে নতুন ক্লাসে ওঠে, সোনুর পড়াশুনার চাপ বেড়ে যায়, খুব ব্যস্ততা তার। অনেক সময় এমন হচ্ছে, সপ্তাহের একটা দিন- সেই রবিবারেও আসতে পারে তা নয়। স্কুলের পড়াশুনোর পাশাপাশি চলছে তার ছবি আঁকার ক্লাস, নাচের ক্লাস, গানের ক্লাস, আরও কত কী! পার্কে না-আসতে পারলেও টেলিফোনে খবর নেয়, কেমন আছো তুমি? জানো মা-বাবার সঙ্গে ঘুরে এলাম ব্যাঙ্কক হয়ে পাটোয়া। কী যে সুন্দর জায়গা।


-তা হলে ডায়েরিতে লিখে রাখ সব। দেরি হলে ভুলে যাবি। পরে পড়ব।


ত্র (মে আরও উঁচু ক্লাসে উঠতে থাকে সোনু, ব্যস্ততা বেড়ে যায় আরও। কত রবিবার পার হয়ে


যায়, সোনু আসে না। হঠাৎ একদিন মনে হয় অনেকদিন হয়ে গেল সোনুর সঙ্গে দেখা হয় না, তার টেলিফোনও আসে না আর। একদিন পার্কের পাশ দিয়ে যেতে যেতে ভাবি কী জানি সোনু কতটা বড়ো


হল! হয়তো অনেকদিন পরে সোনুর সঙ্গে হঠাৎ রাস্তায় দেখা হলে ভাবব, এই কি সেই সোনু! সোনুও আমাকে দেখে, কাবুলিয়ালা গল্পের সেই মিনির মতো লজ্জা পেয়ে যাবে হঠাৎ। ঘুরে দাঁড়িয়ে দৌড় দেবে।




Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page