রবিবারের অনন্যা ১৮ই জানুয়ারি,২০২৬ সংখ্যা ১৫২ বরাক ভ্যালির দেশে, অন্দরসজ্জায় রং, মোটিফ এবং বাস্তু, ফ্যাশনে আসান, রবিবারের গল্প: হলুদ পদ্ম
- রোজকার অনন্যা

- 3 days ago
- 15 min read

বরাক ভ্যালির দেশে
গরমের ছুটি পড়তে আর খুব বেশি দেরি নেই। ঠিক এমন সময় মন যদি পাহাড়-পাহাড় করে, তবে চোখবুজে চলে যেতে পারেন বরাক উপত্যকায়। জানালেন তৃষা নন্দী
নর্থ-ইস্ট শুনে নাক কুঁচকোবেন অনেকেই, তবে আস্থা রেখে একবার গেলে কিন্তু বারবার টানবে আপনাকে ব্রহ্মপুত্রে ঘেরা নীল পাহাড়ের দেশ, অসম। ট্রাইবাল সংস্কৃতি, বিহুর বোল, আ-দিগন্ত চা বাগান--- সব মিলিয়ে ভ্রমণপ্রেমীদের যথার্থই নিশ্চিন্তিপুর অসম। কেন্দ্রস্থলে জ্বলজ্বল করছে উত্তর-পূর্ব ভারতের একমাত্র কসমোপলিটল সিটি, গুয়াহাটি, দ্য লাইট অফ দ্য ইস্ট। কাছাকাছির মধ্যে রয়েছে অজস্র টুরিস্ট ডেসটিনেশন। তবে শুধু চোখের শান্তিই নয়, জিভের শান্তির জন্যও অসমের রয়েছে অঢেল ভাঁড়ার। ভেতো বাঙালিরা জেনে খুশি হবেন অসমও কিন্তু মাছ-ভাতের দেশ। চেখে দেখতে পারেন আদি ও অকৃত্রিম বেশ কিছু ডিশ, তা সে সর্ষে দিয়ে হালকা মাছের ঝোল 'টেঙ্গা'ই হোক, কলাপাতা দিয়ে রাঁধা চিকেনই হোক, বা টক ঝালের মিশেলে পর্ক।

কী কী দেখবেন:
কামাখ্যা মন্দির- গুয়াহটির পশ্চিম প্রান্তে ৫১ সতীপীঠের এক পীঠ হল এই কামাখ্যা। পুরাণ অনুসারে, সতীর যোনি পড়েছিল এখানে। তবে শুধু ধর্মচর্চাই নয়, ইতিহাস ও স্থাপত্যের মেলবন্ধনের সাক্ষীও এই কামাখ্যা।
উমানাদা মন্দির- ব্রহ্মপুত্র নদে ঘেরা পিকক আইল্যান্ডে শিবের উপাসনার জন্য নির্মিত এই মন্দিরটি। চারপাশে জলে ঘেরা এই পিকক আইল্যান্ডের সৌন্দর্যের টানে যেতেই পারেন।
হাজো- হিন্দু, মুসলিম ও বৌদ্ধ ধর্মের একাধারে সংমিশ্রণ ঘটেছে এখানে। রয়েছে অজস্র মন্দির-মসজিদ।
হাফলং- যেন বিশাল এক ক্যানভাসে আঁকা শৈলশহর! পাহাড়ের উপর থেকে নীচের দিকে তাকালে রামধনু দেখা যায়। হাফলং থেকে মাত্র ন'কিমি দূরে পরিযায়ী পাখিদের অস্বাভাবিক মৃত্যুস্থল জাটিঙ্গা।
আসাম স্টেট মিউজিয়াম- গুয়াহাটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অসমিয়া সংস্কৃতি ও ইতিহাস চর্চার ধারক এই মিউজিয়ামটি।
সুয়ালকুচি- গুয়াহাটি শহর থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে অসমিয়া হস্তশিল্পের খনি সুয়ালকুচি। ছোট্ট এই জনপদের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে বাঁশের তৈরি তাঁত। অসমিয়া মেখলা, সিল্কের শাড়ি, চাদর এসব তো পাবেনই, সঙ্গে বাড়তি পাওয়া নীল পাহাড়ের সৌন্দর্য।
মাজুলি দ্বীপ- ব্রহ্মপুত্র নদের ঠিক মাঝে অবস্থিত মাজুলি পৃথিবীর বৃহত্তম নদী-দ্বীপ। অজস্র তীর্থক্ষেত্র এবং বন্যজন্তু দেখতে পাবেন।
তেজপুর- শোণিতপুর জেলায় অবস্থিত তেজপুর
অসমের অন্যতম আর্কিওলজিক্যাল সাইট। তবে তেজপুরকে অনেকে চেনেন ভালোবাসার শহর নামেও। ভগবান কৃষ্ণের পৌত্র অনিরুদ্ধের সঙ্গে রাজকুমারী উষার প্রণয়গাথা আজও চর্চিত হয় তেজপুরের আকাশে-বাতাস। অরুণাচলী পাহাড়ে ঘেরা, ব্রহ্মপুত্রের ঢেউ, পাহাড়ের ঢালের চা-বাগান সব মিলিয়ে তেজপুর আসামের অন্যতম সেরা হানিমুন স্পট। দোকায় নিভৃতে সময় কাটাতে অনেকেই ফিরে ফিরে যান এই রোম্যান্সের শহরে।
জোড়হাট- চায়ের চুমুকে দার্জিলিং না আসাম
বলে দিতে পারেন যাঁরা, তাঁদের তীর্থক্ষেত্র এই জোড়হাট। শুধু চা চাষই নয়, দেশের সবচেয়ে বড় চা গবেষণাগারটিও কিন্তু এখানেই। তবে শুধু কাপ বা গ্লাসেই নয়, সবুজে ছাওয়া চা- বাগানের সৌন্দর্য চোখ আর মনের তৃষ্ণাও কিন্তু মিটিয়ে দেবে।
শিবসাগর- ছ'শতকেরও বেশি সময় ধরে রাজত্ব করা অসমের অহম সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু এই শিবসাগর। ইতিহাসপ্রেমীদের বরাবরের পছন্দের জায়গা।
ডিব্ৰুগড়- ভারতের চা-রাজধানী ডিব্রুগড়। তবে পর্যটনপ্রেমীরা বলেন, ব্রহ্মপুত্রের আসল রূপ দেখতে হলে আসতেই হবে ডিব্রুগড়ে। বেড়াতে গিয়ে অ্যাডভেঞ্চার নিয়ে মজে যান যাঁরা, ডিব্রুগড় তাঁদের পছন্দের জায়গা। ট্রেকিং, মাউন্টেনিয়ারিং, ক্যাম্পিং-- কী নেই অ্যাডভেঞ্চারের তালিকায়!

উত্তর কাছাড়- শহরের কোলাহল, টুরিস্ট প্লেসের ব্যস্ততা থেকে অনেক দূরে শান্তিতে খানিকটা নিভৃত সময় কাটানোর জায়গা। ঘন সবুজ পাহাড়, ইতিউতি পাহাড়ি নদীর ছটফটানি, পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা, প্রাচীন জনজাতিদের আদিম জীবনযাপন আপনার হলিডে চিরকালীন করে রাখবে।
বরাক উপত্যকা- নিঃসন্দেহে বরাক ভ্যালিই অসমের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। অসমকে তো বলাই হয় বরাক ভ্যালির দেশ। বরাক আর কুশিয়ারা নদী দিয়ে ঘেরা বরাকের আকর্ষণ অমোঘ। ভুবন মন্দির, করিমগঞ্জ, বদরপুর ফোর্ট, হাইলাকান্দি, সিদ্ধেশ্বর মন্দির, আদি কালীমন্দির আরও বেশ কিছু কাছাকাছি স্পট ঘুরে আসতে পারেন। কাজিরাঙা ন্যাশনাল পার্ক- বিভিন্ন জন্তুর সমাহার হলেও মূলত একশৃঙ্গ গন্ডারের জন্যই এখানে যাওয়া যেতে পারে।
কীভাবে যাবেন: কলকাতা থেকে ওয়াহাটি বিমানযোগ রয়েছে। হাওড়া থেকে গুয়াহাটি পর্যন্ত অজস্র ট্রেন রয়েছে। সময় লাগে প্রায় ১৮-২০ ঘণ্টা। শিয়ালদহ থেকে রয়েছে সকাল ৬.৩৫ মিনিটে কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস। কলকাতা স্টেশন থেকে রয়েছে রাত ৯.৪০ মিনিটে কলকাতা গুয়াহাটি গরিবরথ এক্সপ্রেস।
যোগাযোগ: অসম টুরিজম অসম হাউস ৮ রাসেল স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০৭১ ফোন- ০৩৩ ২২২৯৫০৯৪ ওয়েবসাইট- tourism.assam.gov.in

অন্দরসজ্জায় রং, মোটিফ এবং বাস্তু
বাড়ি কিংবা ফ্ল্যাট তো হল, এবার রং কী হবে? চিন্তিত! বাস্তু মেনে রং করার পরামর্শ দিলেন এলিজা
যে-কোনও সাজসজ্জার মতোই অন্দরসজ্জার একটা আবেদন আছে আমাদের চোখে। অন্দরসজ্জা অনেকখানি নির্ভর করে রংয়ের উপর। কারণ, রঙের মাধ্যমে আমরা আমাদের আবেগ প্রকাশ করতে পারি। যা মানুষ দেখতে পায়, অনুভব করতে পারে। তবে অন্দরসজ্জা কেবলমাত্র দেখতে ভালোলাগার জন্যই যে করা হয়, তেমনটা কিন্তু নয়। ঘর সাজানোর সময় তার ব্যবহারের কথা এবং আমাদের রুচি, আমাদের পছন্দের কথা মাথায় রাখতে হবে। ঘরের মানুষের রুচি, পছন্দ, ব্যক্তিত্ব, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে আমাদের একটা সম্যক ধারণা হয় সেই বাড়ির অন্দরসজ্জা থেকে।
রং বলতে মূলত এখানে আমরা দেওয়ালের রং নিয়ে আলোচনা করলেও মনে রাখতে হবে রং কিন্তু ঘরের আসবাবপত্র, আপহোলস্ট্রি থেকে শুরু সমস্ত ব্যবহারের জিনিসেও থাকে। সেক্ষেত্রে কোন রঙের ব্যবহার কোথায় করা উচিত বা অনুচিত সেটা দেওয়ালের রঙের ওপর নির্ভর করে ঠিক করতে হবে।
আজকাল বাড়ির দেওয়াল রং করার সময় তার ওপর বিভিন্ন ধরনের সেপ বা মোটিফ তৈরি করা হয়। কিন্তু একটা ছোট ফ্ল্যাটের ছোট ঘরে যদি অহেতুক অনেক বড় মোটিফ কিংবা অনেক বেশি উজ্জ্বল রং ব্যবহার করা হয়, সেই ফ্ল্যাট বা বাড়িটি খুব একটা ব্যবহারযোগ্য হবে না। তাই মোটিফের ক্ষেত্রেও তার ব্যবহারের কথা মনে রাখতে হবে। এই কারণে আজকাল অনেক মানুষের পুরো ফ্ল্যাট একটাই মাত্র রঙের ব্যবহার করেন। যেমন, অফ হোয়াইট, লাইট গ্রে, আইভরি রং বা ক্রিম কালার দিয়ে অনেকেই সম্পূর্ণ বাড়ি বা ফ্ল্যাট রং করে থাকেন। তার সঙ্গে ব্যবহার করেন হাইলাইটার। তবে বড় বাড়ি বা ফ্ল্যাট হলে ঘরের মেঝে, ছাদ এবং বিভিন্ন দেওয়ালে বিভিন্ন রঙের ব্যবহার করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে কালার কম্বিনেশন এর কথা। ছোট বা বড় ফ্ল্যাট কিংবা বাড়িতে আজকাল মোটিফের ব্যবহার চোখে পড়ে সে মোটিফ যেমনই হোক, ফ্লোরাল, অ্যাবস্ট্রাক্ট, লিফ কিংবা জিওমেট্রিক, মাথায় রাখা দরকার যে ছোট ঘরের জন্য ছোট মোটিফ এবং বড় ঘরের জন্য বড় মোটিফ মানানসই হবে। ছোট ঘরের ক্ষেত্রে মোটিফকে শুধু হাইলাইটার হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। দেওয়ালের ওপর মোটিফ বানানোর সহজ উপায় হল স্টিকার ব্যবহার করা। আজকাল অনেকেই দেওয়াল সাজানোর জন্য স্টিকার ব্যবহার করে থাকেন। যেটা খুব সহজে অনলাইনে কিনতে পাওয়া যায়। স্টেনসিলও ব্যবহার করছেন অনেকে। এছাড়াও বড় বাড়ির ক্ষেত্রে পেন্টিং কিংবা ম্যুরালের ব্যবহারও চোখে পড়ছে ইদানীং। অনেকে আবার দেওয়ালের ওপর ক্রিয়েট করছেন টেক্সচার কেউ কেউ অবশ্য ওয়ালপেপারও ব্যবহার করেন।

আমরা যেহেতু রং আর মোটিফ নিয়েই আজ আলোচনা করছি, তাই কোন ঘরে কোন রং ব্যবহার করা যায় কিংবা যায় না তার একটা উদাহরণ রাখলাম।
যদিও নিয়মের বাইরে অনেকেই অনেক রং ব্যবহার করে থাকেন তাদের রুচি পছন্দ কিংবা স্টাইলিংয়ের আইডিয়ার ওপর। তবুও সব জিনিসের যেমন একটা ব্যাকরণ হয় তেমনি অন্দরসজ্জার ব্যাকরণ মেনে এখানে কিছু ঘরের উপযোগী রঙের সম্বন্ধে আলোচনা করা হল।
লিভিং রুম বা বসার ঘর--- ঘর যদি খুব ছোট না হয়, তাহলে একাধিক রঙের ব্যবহার করা যেতে পারে। সাধারণত দেখা যায় ছোট ফ্ল্যাটেও লিভিং কাম ডাইনিং রুমটি সবচাইতে বড় হয়। সেক্ষেত্রে ডাইনিংয়ের দেয়ালে লাল, হলুদ, কমলা জাতীয় রংয়ের ব্যবহার করা যেতে পারে। ফ্ল্যাট বা বাড়ি ছোট হলে অন্যান্য দেওয়ালগুলোতে হালকা রং করা যায়। বড় বাড়ির ক্ষেত্রে অবশ্য একাধিক গাঢ় রঙের ব্যবহারও সম্ভব। বসার ঘর ছোট হলে গাঢ় রং যেমন কালো, গাঢ় নীল এড়িয়ে চলাই ভালো।
শোয়ার ঘর--- শোয়ার ঘরের জন্য সবচাইতে ভালো রংগুলি হল নীল, সবুজ, বেজ ,অফ হোয়াইট, হালকা গোলাপি অথবা ধূসর। যেই রংগুলি শোয়ার ঘরের জন্য অনুপযোগী সেগুলি হল লাল, কালো, গাঢ় খয়েরি, গাঢ় বেগুনি, কমলা এবং উজ্জ্বল হলুদ।
রান্না ঘর--- এর জন্য উপযোগী হল ওয়ার্ম কালার, যেমন হলুদ, সেজ গ্রিন, বেজ এবং ক্রিম কালার। রান্নাঘরের দেওয়াল রং করার ক্ষেত্রে গাঢ় রং এবং কুল কালার ব্যবহার না-করাই ভালো। এক্ষেত্রে কালো, স্লেট কালার, নীল এই রংগুলো রান্নাঘর রং করার জন্য উপযোগী নয়। রান্না ঘরে সাদা রং এড়িয়ে চলুন কারণ এক্ষেত্রে রান্না করার সময় যেমন অসুবিধে হতে পারে তেমনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার ক্ষেত্রেও অসুবিধে হতে পারে।
বাথরুম--- স্নানের ঘরের দেওয়াল রং করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী রং হল হালকা ধূসর, হালকা নীল, স্টোন কালার, সি ব্লু বা টার্কিশ ব্লু, সবুজ ইত্যাদি। অনুপযোগী রংগুলির মধ্যে রয়েছে পিচ, সাদা, কালো, হলুদ, গাঢ় লাল, গোলাপি এবং সোনালি রং এই রংগুলো আপনার ত্বকের রং পরিবর্তন করে দেখাবে আয়নায়।
ছোটদের ঘর--- কিডস রুম রং করার ক্ষেত্রে ছোটদের পছন্দের কথা অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে এক্ষেত্রে ছোট ঘর হলে তুলনামূলকভাবে হালকা রং এবং বড় ঘর হলে গাঢ় রঙের ব্যবহার করা যেতে পারে।
কিছু রং কোথায় ব্যবহার করা উপযোগী সে প্রসঙ্গে একটা ধারণা রইল- লাল, গাঢ় লাল রং শোয়ার ঘরের পক্ষে অনুপযোগী হলেও খাওয়ার ঘরের জন্য উপযোগী। অন্তত খাওয়ার ঘরের একটা দেওয়াল লাল রঙের করাই যেতে পারে। লক্ষ করে দেখবেন অনেক রেস্তরাঁর দেওয়াল লাল রংয়ের হয়। কারণ, লাল রং খিদে বাড়াতে সাহায্য করে কথোপকথনের ইচ্ছে বাড়ায়। কিন্তু খুব বেশি লাল রঙের ব্যবহার অবশ্যই এড়িয়ে চলা ভালো। কারণ, মানুষের উত্তেজনা বা ব্লাড প্রেসার বাড়িয়ে দেওয়ার কারণ হতে পারে এই রং।
গোলাপি-- এই রং হোম অফিসের জন্য খুব ভালো। কারণ, গোলাপি রং যথেষ্ট চিয়ারফুল অথচ কাম ফিলিং দেয়। শোয়ার ঘরেও হালকা গোলাপি রং ব্যবহার করা যেতে পারে।
কমলা-- এই রঙকে আমরা আনন্দের রং বলে থাকি। কমলা রঙের ব্যবহার ক্রিয়েটিভিটি বাড়ায়। কাজের ঘরের জন্য বা হোম অফিসের জন্য কমলা রঙের ব্যবহার করা যেতে পারে ছোটদের ঘর রং করার ক্ষেত্রেও কমলা রঙের ব্যবহার চলতে পারে।

হলুদ-- খুবই পজিটিভ এবং ব্রাইট একটা কালার রান্নাঘর বা খাওয়ার ঘরের জন্য এই রঙটি ভালো। পড়ার ঘরেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
বেগুনি-- এই রংটি আধ্যাত্মিক, ক্রিয়েটিভিটি, লাক্সারি, ঐশ্বর্যের অনুভূতি দেয়। এই রংটি সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার না করে অন্যান্য রঙের সঙ্গে হাইলাইট হিসেবে ( যেমন হালকা গোলাপির সঙ্গে শোয়ার ঘরে, অথবা হালকা ল্যাভেন্ডারের সঙ্গেও মেডিটেশনের ঘরে, অফ হোয়াইট বা নীলের সঙ্গে বসার ঘরে) ব্যবহার করা যায়। শোয়ার ঘর, বসার ঘর, কাজের ঘরের জন্য এমনকী পুজোর ঘর কিংবা মেডিটেশনের ঘরেও এই রংটি ব্যবহার করা যায়। হালকা বেগুনি রং শোয়ার ঘরে ব্যবহার করলে নিজেকে রাজা বা রানির মতো মনে হবে।
নীল-- নীল রং প্রচণ্ড কামিং একটা রং। এই রংটি শোয়ার ঘর কিংবা স্নানের ঘরে ব্যবহার করুন সাধারণত স্পা কিংবা পার্লারে নীল বা সবুজ রঙের ব্যবহার হয়ে থাকে মেডিটেশনের ঘরের জন্য নীল রং ব্যবহার করা যেতে পারে। নীল রং যেহেতু কামিং এফেক্ট দেয় তাই রান্নাঘরে বা খাওয়ার ঘরে এই রঙের ব্যবহার না করাই শ্রেয়। যেহেতু নীল রং ভরসার অনুভূতি দেয় তাই অফিসের জন্য নীল রং খুবই ভালো। স্টাডি রুম বা পড়ার ঘরেও এই রংটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
সবুজ-- খুব রিলাক্সিং অথচ চিয়ারফুল রং হল সবুজ। কারণ, সবুজ রংটি নীল এবং হলুদ রঙের মিশ্রণে তৈরি। ফলত, নীল রঙের কামিং ফিলিং এবং হলুদ রঙের চিয়ারফুল অনুভূতি দুটোই উপস্থিত এই সবুজ রংয়ের মধ্যে রংটি যত উজ্জ্বল হবে তত চিয়ারফুল ফিলিং বাড়বে। আর যত নীল ঘেঁষা হবে তত কামিং ফিলিং বাড়িয়ে দেবে। শোয়ার ঘর, বসার ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম বা বারান্দার জন্য সবুজ রং উপযুক্ত।
খয়েরি রং-- এটি একটি ওয়ার্ম কালার, আজকাল অনেকেই বসার ঘরে এই রঙের ব্যবহার করে থাকেন যদি হালকা সেডের খয়রি হয় ,তাহলে শোয়ার ঘরেও এই রঙটি ব্যবহার করা যেতে পারে, ওয়ার্ম কালার হওয়ার জন্য রান্নাঘরে কিংবা খাওয়ার ঘরেও খয়েরি রং বা টেরাকোটা রংয়ের ব্যবহার আজকাল দেখা যায়। তবে এই রং ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে খুব ছোট ঘরের জন্য কিন্তু গাঢ় খয়েরি রংটি একেবারেই অনুপযোগী সে ক্ষেত্রে অবশ্য বেজ রং ব্যবহার করা যায়।
সাদা-- প্রকৃতপক্ষে সাদা কোনও রং-ই নয় । ঘর বড় দেখাতে সাদার জুড়ি মেলা ভার। তবে সম্পূর্ণ সাদা বা ট্রু হোয়াইট কালারের ব্যবহার না-করে অফ হোয়াইট বা আইভরি ব্যবহার করা ভালো। (এ পর্যন্ত দেখা হয়েছে)
কালো-- এই রংকে রঙের মধ্যে ধরায় হয় না। কারণ, প্রাইমারি, সেকেন্ডারি বা টার্শিয়ারি কালারের মধ্যে এটা পড়ে না। কিন্তু ঘরের দেওয়ালে কালো রং করলে ঘর খুবই রাজকীয় দেখাতে পারে। মনে রাখতে হবে, কালো রং করলে যে-কোনও ঘরকে ছোট দেখায়। আবার ডিপ্রেশনের বাড়ায় এই রং। তাই শুধুমাত্র হাইলাইটার হিসেবেই এই রং ব্যবহার করা শ্রেয়। অনেকে কালো রঙের বদলে চারকোল কালার বা স্লেট কালার ব্যবহার করে থাকেন অর্থাৎ যেই রং ট্রু ব্ল্যাক নয় কিন্তু ব্ল্যাক এর কাছাকাছি।

এবার আসি বাস্তুশাস্ত্রের কথায়, বাস্তু অনুযায়ী প্রতিটা দিকের একটা নির্দিষ্ট এলিমেন্ট রয়েছে এবং সেই এলিমেন্ট অনুযায়ী প্রতিটি দিকের নির্দিষ্ট কিছু রংও আছে। যাঁরা বাস্তু মানেন তাঁরা এই রংগুলির ব্যবহার করে থাকেন।
পাঁচটি এলিমেন্ট দিয়েই পৃথিবী তৈরি। মূলত, পাঁচটি দিকে পাঁচটি এলিমেন্টের প্রাধান্য রয়েছে।
যেমন, নর্থ বা উত্তর দিকের এলিমেন্ট হল জল। এই দিকের উপযোগী রং হল বিভিন্ন সেডের নীল এবং কালো।
পূর্ব বা ইস্টের এলিমেন্ট উড বা অরণ্য। এই দিকের উপযোগী রং হল বিভিন্ন শেডের সবুজ এবং খয়েরি।
সাউথইস্ট বা দক্ষিণ-পূর্ব দিকের এলিমেন্ট ফায়ার। কমলা, লাল, গোলাপি, হলুদ বা বেগুনি হল এই দিকের উপযোগী রং।
সাউথ ওয়েস্ট বা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকের এলিমেন্ট আর্থ। এদিকের উপযোগী রংগুলি হল বেজ, টেরাকোটা, স্যান্ড কালার এবং খয়েরি।
পশ্চিম দিক বা ওয়েস্টের এলিমেন্ট হল মেটাল। ধূসর, সাদা, হালকা নীল, সিলভার এগুলি হল এই দিককার উপযোগী রং।
বাস্তু মেনে বাড়ি সাজানোর ক্ষেত্রে এই রংগুলি যে সরাসরি ব্যবহার করতে হবে তেমন নয় বরং সেক্ষেত্রে পর্দায়, বিছানার চাদরে, সোফার কাভারে, কুশনে বা নানাধরনের সাজানোর জিনিসে কিংবা ফুলদানি বা ফুলে এই রঙের ব্যবহার করে, ঘরে বাস্তু ব্যালেন্স করা যেতে পারে।

ফ্যাশনে আসান
অফিস টুরে যাবেন? ভাবছেন কী নেবেন, কী নেবেন না! মুশকিল আসান করলেন এলিজা
অফিস টুর : বেড়াতে যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছানো বাঙালির নখদর্পণে। কিন্তু অফিস টুরে যাওয়ার জন্য কি পোশাক নেবেন আর কতগুলোই বা নেবেন এ ব্যাপারে বহু পুরুষ এবং মহিলারা দ্বিধাদ্বন্দে ভোগেন। তারপর অফিস টুরে গিয়ে যদি কলিগদের সঙ্গে লাঞ্চে বা ডিনারে যাওয়ার থাকে কিংবা টুকটাক বেড়ানো, শপিং করার পরিকল্পনা থাকে তাহলে তো চিন্তা আরও দ্বিগুণ হয়ে যায়।
তাহলে অফিস টুরে যাওয়ার জন্য কি কি পোশাক নেওয়া যেতে পারে বা কীভাবে মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ করে পোশাক পরা যায়, সেটা সর্বাগ্রে ভেবে নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রথমেই যে-ব্যাপারটি মগজে রাখতে হবে তা হল কমসংখ্যক পোশাক দিয়ে কীভাবে বেশি অপশন বানানো সম্ভব। তাহলে ভারও কমবে। মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ কথাটার সঙ্গে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত। সহজভাবে বলতে গেলে একটি পোশাকের সঙ্গে নির্দিষ্ট আরেকটি পোশাক না পরে মিলিয়ে মিশিয়ে পোশাক পরা। ধরুন, আপনার কাছে চারটে টপ ওয়্যার রয়েছে আর রয়েছে দুটি বটম ওয়্যার। এখন যদি টপগুলোকে ১,২,৩,৪ নম্বর দেওয়া যায় আর বটম্ ওয়্যারগুলোকে এ এবং বি হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে টপ এবং বটম ওয়ারগুলোকে এমনভাবে অ্যারেঞ্জ করতে হবে যে এ বটম্ ওয়্যারের সঙ্গে ওয়ান টু থ্রি ফোর চারটে টপই পরা সম্ভব। আবার বি বটম ওয়্যারের সঙ্গে ওয়ান টু থ্রি ফোর চারটে টপই পরা সম্ভব। এভাবে মাত্র ছটি পোশাক দিয়ে আমরা তৈরি করতে পারব আটটি অপশন। মিক্স অ্যান্ড ম্যাচ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হল কিছু নিউট্রাল কালারের পোশাককে প্রাধান্য দেওয়া। আর তার সঙ্গে কালারফুল অ্যাক্সেসরি ব্যবহার করলে লাগেজ কম নিয়ে বেশি সংখ্যক পোশাকের অপশন তৈরি করা সহজ।

পুরুষদের ক্ষেত্রে একটা জিনস একটা শর্টস তো অবশ্যই নেওয়া উচিত। অফিসের বাইরে কলিগদের সঙ্গে ডিনারে বা লাঞ্চে জিনস টি শার্ট বা জিনসের সঙ্গে শার্ট পেয়ার করতে পারেন । আবার টুকটাক বেড়াতে বের হলে বা শপিংয়ের জন্য শর্টস ব্যবহার করা যেতে পারে, অফিস এর জন্য নেবেন নিউট্রাল ডার্ক আর লাইট দুটো প্যান্ট দু-তিনটি সেমি ফরমাল শার্ট দুটো টি শার্ট। সেমি ফরমাল জ্যাকেট আর সঙ্গে নেবেন দুই জোড়া জুতো। এই ক'টা পোশাক নিয়ে দেখবেন প্রায় ১২-১৩ রকমের অপশন আপনি পেয়ে যাবেন।
যেসব মহিলারা ওয়েস্টিন পরেন, তারা দুতিনটে টপ দুটো ফরমাল শার্ট, দুটো টি শার্ট, দু-একটা ফরমাল স্কার্ট অথবা প্যান্ট নিতে পারেন। সঙ্গে অবশ্যই একটা জিনস, একটা শর্টস নেবেন। এর সঙ্গে হালকা কয়েকটা শ্রাগ, স্কার্ফও সঙ্গে রাখতে পারেন মহিলাদের ক্ষেত্রে যেহেতু টপগুলো অনেক কম জায়গা নেয় এবং ওজনেও কম হয়, সেক্ষেত্রে আরও বেশি অপশন ক্রিয়েট করা সহজ হবে সঙ্গে রাখবেন দুজোড়া জুতো, এক্ষেত্রে দুটি ফরমাল শুয়ের ব্যবহার না-করে অন্তত একটা সেমি ফরমাল বা ক্যাজুয়াল জুতো নিতে পারেন। সঙ্গে অবশ্যই নেবেন কিছু মিনিমাল জুয়েলারি অফিস এর জন্য। আর দুএকটা এক্সট্রাভাগান্ট ইয়ার রিঙের নেকলেস বেড়াতে বেরোনোর জন্য।
যেসব মহিলারা ইন্দো-ওয়েস্টার্ন পোশাক পরে থাকেন তারা দুতিনটি নিউট্রাল কালারের কুর্তি অবশ্যই নেবেন। সঙ্গে নিন দুটো সিগারেট প্যান্ট, দুটো পালাজো, একটা জিনস, দুএকটা স্কার্ট। আর নেবেন দুটো শ্রাগ। তবে একটা জিনিস যেটা অবশ্যই রাখবেন সেটা হলো ফ্রন্ট ওপেন লং ড্রেস। এই ফ্রন্ট ওপেন ড্রেসগুলি মাল্টিপারপাস ইউজ করা যায়। আপনি যেমন এটাকে ড্রেস হিসেবে পরতে পারবেন তেমনই কুর্তা বা টিউনিক হিসেবেও পরতে পারবেন আবার শ্রাগ হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। এমনকী স্কার্টের উপরেও সুন্দর করে স্টাইলিং করে পরা যেতে পারে। সঙ্গে নিতে পারেন একজোড়া স্যান্ডেল আর একজোড়া জুতি আর নেবেন কয়েকটা স্কার্ফ এবং কিছু সুন্দর একসেসরি।
মনে রাখবেন নুড নেলপলিশ আর ন্যুড মেক-আপ। কিন্তু সমস্ত ধরনের জামা-কাপড়ের সঙ্গে খুব সুন্দর। যায় ফলে, অল্প মেকআপ বা ছোট মেকআপ কিট নিয়ে আপনি অফিস টুরে যেতে পারবেন।
চুল বাঁধা বা খোলা রাখা নির্ভর করে আপনার চুলের লেন্থের উপর। তবে চেষ্টা করবেন কমপ্লিকটেড স্টাইলিং না-করতে। বরং ছোট এক্সেসরিজ ব্যবহার করতে পারেন। অফিসের জন্য চুল নিট করে পনিটেল কিংবা বান করে নিতে পারেন। আর বাইরে বেরোনোর জন্য মানে টুকটাক শপিং কিংবা ডাইন আউটের জন্য সুন্দর সুন্দর বিনুনি বা খোলা চুলে নানারকম স্টাইল করতে পারেন। এতে চেহারায় ভিন্নতা আসবে আর আপনিও উপভোগও করতে পারবেন।
ব্যাগ এমন নেবেন যেটা ফরমাল এবং ক্যাজুয়াল সবকিছুর সঙ্গেই যায়। এক্ষেত্রে চামড়ার ব্যাগের কোনও জুড়ি নেই।

হলুদ পদ্ম
অদিতি বসু রায়
হলুদ রঙের পদ্মফুলের কথা আমি প্রথম জানতে পারি, প্রণবকাকার কাছ থেকে। আমাদের আধা-শহুরে টাউনে হাতেগোনা লোক বেড়াতে যেত তখন।। আমাদের মতো নিম্ন মধবিত্তদের দৌড় ছিল তারাপীঠ, দিঘা খুব বেশি হলে পুরী। প্রণবকাকা যেত লাদাখ, ধর্মশালা, উটি, কিন্নর, আরও কত দূরের জায়গায়। বস্তুত প্রণবকাকার নেশা ছিল ঘুরে বেড়ানো। বিড়ি, চা, সিগারেট, মদ কিছুই ছুঁতো না। ইস্কুলের মাস্টারমশাই ছিল। একা থাকতো। নিজেই রান্না করে খেত। বিয়ে করেনি। মা বলতো, প্রণবকাকা নাকি তার মাসতুতো বোনকে ভালবেসেছিল কলেজে পড়ার সময়। জানতে পেরে, মাসি বাড়ি বয়ে এসে খুব গালিগালাজ করে যাওয়ায় গ্লানিতে প্রণবকাকার মা আত্মহত্যা করে। তারপর থেকেই প্রণবকাকার বাইরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ইস্কুলে পড়াতো বলে ছুটি-ছাটাও পেত। বিশেষ করে গরমের ছুটি এবং পুজোর ছুটিতে। প্রতিবার প্রণবকাকা বাইরে থেকে ফিরে এলে, আমাদের বাড়িতে গল্পের আসর বসতো। অধিকাংশ সময়ে সেটা হত, ইস্কুল খোলার আগের দিন। প্রণবকাকা এসেই হইচই শুরু করে দিত 'বউঠান, আজ রান্নাবান্না রাখুন। সুবীরকে বলে দিন, আজ মোগলাই পরোঠা রাতে। আমি অর্ডার দিয়ে এসেছি বুবু কেবিনে।' আমাদের মফঃস্বলে কোন সেলেব্রেশনই সম্পূর্ণ হতো না মোগলাই পরোঠা ছাড়া। তখন এতো বিরিয়ানির চল ছিল না। রাতের খাবারের বন্দোবস্ত হয়ে যাওয়ায় মা নিশ্চিন্ত হত। আমাদের বাড়িতে অসময়ে আসা অতিথিকে খাওয়ার পাতে কী দিয়ে বসাবেন এই ছিল আমার মায়ের অন্যতম আমার ডাক পড়তো অ্যাই, টুকি, এখানে এসে বস। বইপত্তর বন্ধ করে দে। মানালিতে এবার যা হল উফফ ভাবলে এখনও গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে'। আমিও ওমনি লাফিয়ে বই বাক্সে তুলে দিয়ে এসে বসতাম বাইরের ঘরের চৌকিতে।

মা চা বসাতো। বাবাও এসে দ্রুত পোশাক পাল্টে সামনের ঘরে চা নিয়ে এসে বসত। মা সর্ষের তেল, পেঁয়াজকুচি, চানাচুর দিয়ে মুড়ি মেখে নিয়ে ঢুকলে, প্রণবকাকা বলে উঠত- বউঠান, কাঁচালঙ্কা দাও একটা।' জমিয়ে গল্প শুনতাম আমরা। মানালিতে কীভাবে দুই কুলির মারামারির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল কিংবা রাজস্থানে ডাকু মাধো সিংয়ের খপ্পর থেকে কেমন করে রেহাই পেল এইসব আমরা তিন ছাপোষা প্রাণী অবাক হয়ে শুনতাম। কোথায় বালির ওপর উট চলা রাজস্থান কোথায়-বা হিমাচলের চুড়োর মানালি!

আমার 'পথের পাঁচালি'র কথা মনে পড়ে যেত বারবার। সেই যেখানে আছে, সান্যাল মশাই তীর্থ করে ফিরে এসে প্রসন্ন গুরুমশায়ের পাঠশালায় গল্প করতে আসছেন - সেই জায়গাটা আমার প্রতিবারই চোখের সামনে ভেসে উঠতো। আর খুব ইচ্ছে হত - এই বাড়ি, চেনা পাড়া, পরিচিত জনপদ ছাড়িয়ে অনেক অনেক দূরে যেতে। আর দূর বলতেই যার কথা মনে আসতো সে হল, পাহাড়। আহা সেই কোন শিশুকাল থেকে পাহাড় আমাকে চুম্বকের মতো টান দিত- একটু বড় হতে, এই পাহাড় যেন হয়ে উঠল এক রহস্যময় পুরুষ, যার প্রতিটি বাঁকে নানা অজানা রং। অবশ্য এই ঘোর থাকেনি খুব বেশিদিন। আমি তখন কলেজের ফার্স্ট ইয়ার। ভূগোলে অনার্স। প্রণবকাকা খুব উৎসাহ দিয়েছিল ভূগোল পড়ার জন্যে। আমার তখন উত্তরমেরু থেকে দক্ষিণমেরুর স্বপ্ন বাবা, মাও খুব আগ্রহ নিয়ে আমার স্বপ্নের সঙ্গে নিজেদের যোগ করেছিল। দিব্যি চলছিল আমাদের ছোট্ট ইউনিট। তবে
সুখেরও এক্সপায়ারি ডেট থাকে। বাবা এক হেমন্তের রাতে বাড়ি ফিরছিল বাজার করে। দুই হাতে দুটো বড় বড় থলি। তাতে সদ্য ওঠা ফুলকপি, গাজর, কড়াইশুঁটি, নতুন আলু এবং দেশি মুরগি। বাবার তাড়া ছিল- অতো ভারী জিনিস নিয়ে হাঁটা- এর মধ্যেই কখন যে শীতঘুমের অভিসারী সাপের গায়ে পা দিয়ে ফেলেছে, বুঝতেও পারেনি। সাপও জমে থাকা বিষ উজাড় করে ঘুমাতে ছুটেছে। তারও সময় ছিল না। ফলে বাবা থলি ছুড়ে ফেলে বাড়িতে ঢুকে চিৎকার করে মাকে যখন ডেকেছে, 'শান্তি, কোথায় গেলে? শিগগিরি এসো। আমাকে বোধহয় সাপে কামড় দিয়েছে।' মা ডিম সেদ্ধ বসিয়েছিল সবে। রাতে ডিমের ঝোল আর রুটি করবে। ঠান্ডা পড়লে আমরা সবাই রাতে রুটি খেতে পছন্দ করতাম। বাবার আর্তনাদ শুনে মা কী মনে করে ডিমের পাত্রটা নামিয়ে রেখে ছুটে গেল। আমি টেলিভিশনের ন্যাশানাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল খুলে বসেছিলাম। ছুটলাম আমিও। গিয়ে দেখি, বাবার মুখ থেকে গ্যাঁজলা বেরচ্ছে। মা, বাবার মাথাটা কোলে নিয়ে অবিকল সিনেমার মতো বলে চলেছে, 'এ আমার কী সর্বনাশ হল? 'টুকি লোক ডাক।' মায়ের আঁচল মাটিতে লোটাচ্ছে।

বাবার শেষ কাজের আগের দিন, বাবার আপিস থেকে সহকর্মীরা এসে মাকে বাবার
প্রভিডেন্ড ফান্ড ইত্যাদি সব বুঝিয়ে দিয়ে যায়। এছাড়াও মোটা টাকার জীবনবিমা ছিল বাবার। অর্থের অসুবিধা আমাদের সেভাবে হয়নি। বাবা মারা যাওয়ার পরের গরমের ছুটিতে, আমি প্রথম হ্রদ পদ্মের কথা শুনি। প্রণবকাকা সেবার কালিম্পং ছাড়িয়ে আরও উঁচুতে ইচ্ছেগাঁও বলে একটা পাহাড়ি নিরালা গ্রামে গিয়েছিল। সেখানে গিয়ে বনের মধ্যে, একদিন ট্রেক করতে করতে পথ হারিয়ে, প্রায় বারো ঘণ্টা পায়ে হেঁটে একটা আশ্চর্য সুন্দর হ্রদের কাছে পৌঁছয়। সেখানেই দেখে, হ্রদের জলে হলুদ রঙের পদ্মফুল ফুটে আছে। অনেক কষ্টে লোকালয়ে ফিরে এসে, যখন স্থানীয় বাসিন্দাদের ওই ফুলের কথা জানায়, তারা নাকি প্রণবকাকাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করে, বাইরে ওই ফুলের কথা, প্রকাশ না-করতে। কারণ, ওই ফুলই নাকি এই পাহাড়ের দেবী। বাইরের লোকের সামনে ওরা দেবীকে আনতে চায় না। তাছাড়া যারাই ওই ফুলকে স্পর্শ করে, তাদের জীবন পালটে যায় বলে, ওদের বিশ্বাস। প্রণবকাকার ক্যামেরায় আমি সেই হলুদ রঙের পদ্মের ছবি দেখতে গিয়ে দেখি, আসলে তা একটা কুঁড়ি। রঙও ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। অনেকদূর থেকে তোলা বলে হয়তো ছবিটি খুব পরিষ্কার হয়নি। সময় দ্রুত ছুটতে লাগল। আমার কলেজ শেষ হল। যাদবপুরে পোস্ট গ্রাজুয়েশন করতে করতে একটা প্রেম হল। ভেঙেও গেল। মা অসুস্থ হয়ে পড়াতে, আমার এক দূর-সম্পর্কের বিধবা পিসি এসে মায়ের সঙ্গে থাকতে লাগল। মায়ের খুব দুরারোগ্য কিছু নয়, ডায়াবেটিস দেখা দিয়েছিল।

সেই সঙ্গে হাই ব্লাড প্রেসার। প্রণবকাকাও খুব দেখাশোনা করতো আমাদের। আগের মতো বছরে দু'বার আর বেড়াতেও যেত না, নিয়ম করে। পর্যটকের বয়স ও সক্ষমতা কমে গেলে, সে কিন্তু মনে মনে গ্লোব-ট্রটারই রয়ে যায়। তাই প্রণবকাকা যেখানে যত ভ্রমণ কাহিনি প্রকাশিত হয়, কিনে পড়তে শুরু করে। তিনটি ট্রাভেল ম্যাগাজিনের সাবস্ক্রাইবার হয় এবং আমাকে সেইসব ম্যাগাজিন থেকে ভাল লাগা লেখাগুলো হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে থাকে। মা'ও দেখি ধীরে ধীরে ওই সব বইয়ের ভক্ত বনে যাচ্ছে। রিসার্চ শুরু করার পর, আমি আর মায়ের পাঠানো টাকা নিতাম না। বরং মায়ের ওষুধ আরো নানা টুকিটাকি কেনার জন্যে খানিক টাকা পাঠাতে শুরু করলাম মাসে মাসে। এই সময়ই, মা একদিন ফোন করল।
-টুকি, কেমন আছিস? - ভাল মা। শুধু কাজের বড্ড চাপ। বাড়ি যাব সামনের মাসে। তোমার শরীর কেমন?
শোন, পুজোর ছুটিতে আমাকে কালিম্পং নিয়ে যাবি এবার?
আমি বেশ অবাক হলাম। বেড়াতে যাওয়ার গল্প পড়লেও, মা এমনিতে ঘরকুনো। তার ওপর এখন এবার বাংলা টিভি সিরিয়ালের নেশায় পেয়েছে। ফলে বাড়ি ছেড়ে বিশেষ নড়তে চায় না। -হঠাৎ কালিম্পং?

-যাবি কিনা বল! -যেতে পারি। তাহলে একটা ডেট জানাও। টিকিট কাটতে হবে তো।
-লক্ষ্মীপুজোর পরের পরের দিন কর। আর শোন, প্রণবদাও আমাদের সঙ্গে যাবেন। আমি বিস্মিত।
-আচ্ছা, তাই হবে। পিসি যাবে না?
না। ঠাকুরঝি, ভাইফোঁটা পর্যন্ত মেয়ের বাড়ি গিয়ে থাকবে।
প্রণবকাকা, মাকে নিয়ে যেদিন এনজেপি স্টেশনে
নামলাম, তখনও আমরা কেউই আন্দাজ করতে পারিনি কি ঘটতে যাচ্ছে। এনজেপি থেকে কালিম্পং যেতে সময় লাগে ঘণ্টা তিনেক। ধাবাতে রুটি, ডিমের ভুজিয়া আর কফি খেতে আরও মিনিট কুড়ি বেশি লেগে গেল আমাদের। একটা হোমস্টে-তে থাকার ব্যবস্থা।
এনজেপি থেকেই মাকে খুব অন্যমনস্ক লাগছিল।

চারটে কথার একটা উত্তর দিচ্ছে- বেশিরভাগটাই হুঁ-হাঁ করে সেরে ফেলছে। মা ঠিক এরকমটা নয় বলেই অবাক লাগছিল। এতদিন পরে বেড়াতে এসে, আমার নিজের এতো ভাল লাগছিল যে মাকে নিয়ে বেশি ভাবতে পারছিলাম না সেদিন। দু'দিন কালিম্পং-এ ঘুরে ফিরে- গাড়ি ঠিক করে ইচ্ছেগাঁও যাত্রা। ওখানে এখন দুটো-তিনটে হোমস্টে হয়েছে। আমিই ইন্টারনেট থেকে বুকিং করে রেখেছিলাম। এই সময়টায় পুজোর ছুটির জন্য টুরিস্টের চাপ থাকে। মুশকিল হল- প্রণবকাকা তো পথ হারিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে হলুদ পদ্মের হ্রদের কাছে পৌঁছতে পেরেছিল। এবার এসে দেখা গেল- বছর চার-পাঁচের মধ্যে এই গ্রামের ভূগোল খানিক পালটে গেছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, প্রণবকাকা বনের দিকে গিয়েও কিছুতেই সেই পথ আর খুঁজে পেল না। মধ্যে থেকে পাহাড়ে বৃষ্টিতে ভিজে মায়ের জ্বর। সর্দি। প্রণবকাকার গলা ব্যথা। আমার কাশি- সবমিলিয়ে একেবারে ঘরবন্দি দশা! এর মধ্যে একদিন মা, বিকেলে আমাকে বলল, যা তোর প্রণবকাকাকে ডেকে আন। কথা আছে।

দু'বছর হল, আমাদের নতুন বাড়ি এই ইচ্ছেগাঁও- এর প্রান্তে। আমরা একটা হোমস্টে চালাচ্ছি। সবজির খামার করেছে প্রণবকাকা। দিব্যি চলে যাচ্ছে দিন। আমার আর থিসিসটা কমপ্লিট করা হয়নি। তাতে কিছু এসেও যায়নি। এখানে এই উদার আকাশ, নিরালা বনভূমি, সরল প্রতিবেশিদের নিয়ে আমাদের সংসার ভালই চলছে। মা হোমিওপ্যাথি ওষুধ দেয় অসুস্থ মানুষদের। এইসবের ভেতর, সবচেয়ে ভাল আছে
প্রণবকাকা। সারাজীবনে ঘরগেরস্থালির স্বাদ না-পাওয়া মানুষটা, সারাক্ষণ ঘর গোছাচ্ছে- শিলিগুড়ি থেকে সুন্দর নকশাকাটা চাদর কিনে আনছে- ফুলগাছ লাগাচ্ছে- চমৎকার সব ক্রকারিতে আমরা খাওয়াদাওয়া করি- প্রণবকাকা বই দেখে দেখে নানা দেশি-বিদেশি রান্না করে- সবচেয়ে অন্যরকম হয়ে গেছে আমার মা। পা পর্যন্ত ঝুলের গাউন এবং সাদা কার্ডিগান পরা মা যখন মাথায় বাহারি স্কার্ফ বেঁধে, টুরিস্টদের দেখাশোনা করতে ছোটাছুটি করে- আমার বুকের মধ্যেটা উছলে ওঠে। আলোর মতো। আর মাঝে মাঝে খুব খুব মনখারাপ হয়ে যায় সেই অকালে চলে যাওয়া মানুষটির কথা ভেবে- যাকে আমি এখানে আসার আগে পর্যন্ত আমার জন্মদাতা বলে জানতাম। মা সেই বিকেলে, প্রণবকাকার সামনে আমাকে বলে দিয়েছিল সব। কীভাবে এক ঝড়ের রাতে প্রণবকাকা ও মায়ের অতর্কিত ভালবাসায় আমি এসে গিয়েছিলাম এবং মায়ের আজীবনের

অনুতাপ, বাবাকে ঠকানোর জন্য, এমন জায়গায়
পৌঁছেছে যে মা আর ফিরে যেতে চায়নি বাড়িতে। সব শুনে আমিই প্রস্তাব দি থেকে যাওয়ার। প্রণবকাকা আর মায়ের অপরাধী মুখদু'টিতে হাসি ফুটিয়ে, বাঁচাতে চেয়েছিলাম, কারণ- মুহূর্তের ভুলের জন্যে এরা দু'জনেই সারাজীবন কষ্ট পেয়ে, প্রায়শ্চিত্ত করে ফেলেছে। বাকি জীবনটা অন্তত আনন্দে কাটাক হলুদ পদ্ম নাকি জীবন পালটে দেয়! তাই আমিও রয়ে গেলাম। ভারী ভালো লাগে দুই বয়স্ক মানুষের খুনসুটি দেখতে! কাজের ফাঁকে, বনে বনে ঘুরে ট্রেক করি- যদি
কখনও সেই অলৌকিক ফুলের দেখা পাই- আমার জীবনটারও একটা বদল দরকার। পরিবর্তনহীন বেঁচে- থাকা আসলে ঠান্ডা হয়ে আসা চায়ের কাপ- প্রণবকাকা আর মায়ের মতো একটা বদল কতজন আর পায়! এও তো এক ধরনের সৌভাগ্য! দেখা যাক। তবে একটা কথা ঠিক, হলুদ পদ্ম কি করতে পারে জানি না। এখনো সত্যি কিন্তু অনেক কিছু বদলে দিতে পারে।








Comments