পিকনিকের হুল্লোড় বাছাই ২০টি পিকনিক স্পট, বো-ব্যারাকস ও বাকিরা, ফিরে দেখা ২০২৫: কী পেলাম, কী হারালাম, রবিবারের গল্প: দশম অধ্যায়
- রোজকার অনন্যা

- Dec 18, 2025
- 34 min read

পিকনিকের হুল্লোড়
কমলেন্দু সরকার
পুজোর মরশুম বাদ দিলে মধ্যবিত্ত বাঙালির বছরের সেরা আনন্দ পিকনিক। ক্যালেন্ডারে নভেম্বর দেখা গেলেই হালকা হালকা ঠান্ডা। মাসের মাঝ বরাবর আলমারি বন্দি ন্যাপথলিনের গন্ধমাখা সোয়েটার চাদর বেরিয়ে পড়ে। শুরু হয় পিকনিকের প্রহর গোনা। কত আলোচনা, কত হিসাব কষা, মতামত পাল্টা মতামত-- এসব নিয়েই সরগরম পিকনিকের আগের রাত পর্যন্ত। ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পিকনিক স্থান পরিবর্তন ঘটে। জায়গা ঠিক হল তো মেনু নিয়ে মতান্তর মনান্তর। তারপর পিকনিকের মিটিং ছেড়ে চলে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। রাত্রিবেলা ফোন চালাচালি। কিছুক্ষণ মানভঞ্জনের পালা চলে। তারপর একটি আশ্বাসবাণী উড়ে আছে, 'ঠিক আছে যাব। ওই পথেই তো যাবি, আমাকে তুলে নিস।' হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন পিকনিকের নেতাটি। পিকনিক মানেই উজাড় করা স্মৃতি ভিড় করে মনে। থাক সেসব কথা। মনে কষ্ট বাড়ে কারওর কারওর, সেবার পিকনিকেই তো প্রেমটা কেটে গেল। আরও কতশত কথা। যাকগে সেসব কথা। শীতের ঠান্ডা ঠান্ডা মনোরম পরিবেশে পিকনিকে হাজারো মজা! দেখা যাক পিকনিক স্পটের হালহদিশ কি বলছে।
১। পারমাদান: ইছামতী নামের মতোই সুন্দর, তেমনই রূপ-সৌন্দর্য নদীর! মনের আরাম ইছামতী নদী! এই নদী-লাগোয়া পারমদান অভয়ারণ্য। পোশাকি নাম বিভূতিভূষণ অভয়ারণ্য। নামকরণ সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর নামে। ইছামতীর বুকে নৌকাভ্রমণ স্মৃতিতে অটুট হয়ে থাকে চিরকাল! রূপসী ইছামতীর রূপ-মাধুর্য অবর্ণনীয়! বিশেষ করে, সূর্যাস্তের সময় ইছামতী যেন অধরা মাধুরী। অভয়ারণ্যটিও চমৎকার। ডাকলেই চলে আসে হরিণের দল। কখনওসখনও নিজেরাই মানুষের কাছে চলে আসে ভাব জমাতে! নির্দিষ্ট জায়গায় পিকনিকের জন্য অনুমতি দেওয়া হয়। এন্ট্রি এবং গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য কিছু অর্থ দিতে হবে। আগে খোঁজ নিয়ে নিন ডিএফও, চাঁপাডালি, বারাসত।
২। অছিপুর : বজবজের কাছে গঙ্গার ধারে চমৎকার এক জায়গা। শুধু প্রাকৃতিক রূপসৌন্দর্য উপভোগ নয়, জায়গাটির আছে এক অন্য ঐতিহাসিক মূল্যও। এখানেই এসেছিলেন প্রথম চিনা অছু। ইনিই ছিলেন চিন থেকে কলকাতায় আগত প্রথম চিনা। তিনি এখানে বানিয়েছিলেন চিনি এবং কাগজ কল। তাই এই অছু সাহেবের নামেই অছিপুর নামকরণ।
চড়ুইভাতির আসর বসিয়ে নিন বিস্তীর্ণ গঙ্গার পাড়ে যে-কোনও একটি জায়গা বাছাই করে। শীতের নরম রোদ্দুর গায়ে সঙ্গে গঙ্গা-ছোঁয়া হিমেল বাতাসে অপূর্ব লাগবে অছিপুর! অবসরে গঙ্গার বুকে ভেসে যেতেও পারেন নৌকায়। গঙ্গার বুকে সূর্যাস্ত বেশ লাগে! মন ভরিয়ে দেবে। একরাশ টাটকা অক্সিজেন নিয়ে বাড়ি ফিরুন বনভোজন শেষে।
শিয়ালদা থেকে দক্ষিণ লাইনের ট্রেন ধরে বজবজ। স্টেশন বাইরে থেকে অটোতে অছিপুর। এসপ্ল্যানেড থেকে ৭৭ নম্বর বাসে চেপে যেতে পারেন। গাড়ি থাকলে কোনও চিন্তাই নেই।
৩। গাদিয়াড়া : নদী ধার মানেই পিকনিকের জন্য আদর্শ। তাই আর একটি চমৎকার বনভোজনের জায়গা। তবে এটি হাওড়ায়। গাদিয়াড়া আর গেঁওখালি দুই ভাই। এপারে হাওড়ার গাদিয়াড়া, আর ওপারে পূর্ব মেদিনীপুরের গেঁওখালি। গাদিয়াড়ায় আর এক ত্রিবেণী সঙ্গম– গঙ্গা, রূপনারায়ণ আর দামোদর তিন নদী এক হয়ে পড়েছে সাগরে।
নদীতীরে পিকনিক আর বেড়ানো চমৎকার একটি জায়গা গাদিয়াড়া! ওপারে গেঁওখালিও তাই। নৌকা নিয়ে ভেসে পড়া যায় নদীর বুকে। প্রচুর নৌকা বাঁধা আছে তীরে। মাঝিভাইকে বললেই তাঁর নাওটি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে নদীর বুকে! মাঝি তিন নদীর এলাকা আর জল দেখিয়ে দেবে। মাঝিকে বললে তিনিই চিনিয়ে দেবেন কোথায় নুরপুর, কোন দিকে-বা গেঁওখালি। গড়চুমুকই-বা কীভাবে যেতে হবে। সেইসঙ্গে মাঝিভাই সতর্কও করে দেন বেশি হইহল্লা না-করতে। নইলে যে-কোনও মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
গাদিয়াড়ায় দেখে নেওয়া যায় ক্লাইভের প্রাচীন দুর্গ, লাইটহাউস আর জগদীশচন্দ্র বসুর বাড়ি। যেখানে বসে তিনি আবিষ্কার করেন গাছেরও প্রাণ আছে। দেখবেন, আপনার বা আপনাদের গায়েও নদীর হাওয়া লেগে প্রাণ চাঙ্গা হয়ে উঠেছে! নদীর পাড় ধরে হাঁটতেও বেশ লাগে! যাওয়া যায় গাদিয়াড়া থেকে লঞ্চে নুরপুর হয়ে সেখান থেকে গেঁওখালি। নদীর তীরে এক মনোরম ভ্রমণ। কাছেপিঠে বেড়ানোর পক্ষেও চমৎকার! পিকনিকের পক্ষে তো বটেই। পিকনিকের জন্য খুবই জনপ্রিয় গাদিয়াড়া।
গাদিয়াড়া যাবেন হাওড়া থেকে ট্রেনে বাগনান। সেখান থেকে বাসে গাদিয়াড়া। হাওড়া থেকে গাদিয়াড়া আসার সরাসরি বাসও আছে। নিজেদের গাড়ি থাকলে তো সবচেয়ে ভাল। বাগনান থেকে অটোও আছে। গাদিয়াড়া থাকার জন্য বিবাদি বাগের পশ্চিমবঙ্গ টুরিজম অফিসে খোঁজ করুন।

৪। কল্যাণী জুবিলি পার্ক : নদিয়া জেলার কল্যাণীতে এই জুবিলি পার্ক। বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে চমৎকার এই পার্কটি। চারিপাশে কেবলই সবুজ। সবুজের মাঝে রকমারি মরশুমি ফুলের রং ছড়িয়ে আছে। মনে হয়, রঙের মজলিস বসেছে জুবিলি পার্কে। সবমিলিয়ে গাছগাছালির আলোছায়াময় পরিবেশে ভাললাগার কেমন যেন এক জাদু খেলা করে!
সবকিছুর ফাঁকে উঁকি দেয় এক জলাশয়। এই লেকটিতে ৫০ টাকার বিনিময়ে বোটিং করতে পারবেন পিকনিকের মাঝে। বনভোজনের অবসরে শীতের মিঠে রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে বোটিংয়ের মজা সীমাহীন! পার্কে প্রচুর পাখি। ঝিলে আসে পরিযায়ী পাখির দল। সবকিছু ভরপুর মজা আর আনন্দ! পিকনিকের জন্য আছে টেন্ট।
পিকনিকের জন্য ভাড়া পড়বে ১০০০ থেকে শুরু হয়ে ৩৫০০ টাকা। পার্কে প্রবেশের জন্য লাগবে ৫০ টাকা, পিকনিকের জন্য। শুধু পার্কে ঘুরতে গেলে ১০০ টাকা। যোগাযোগ: 083369 59677. ট্রেনে গেলে শিয়ালদা থেকে কাচরাপাড়া অথবা কল্যাণী স্টেশনে নেমে তারপর অটোতে জুবিলি পার্ক। গাড়িতে দমদম এয়ারপোর্ট হয়ে বিরাটির মোড় থেকে কল্যাণী-ব্যারাকপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সোজা জনপুর মোড় থেকে ডানদিকে কমবেশি ১২ কিমি। কলকাতা থেকে ৩৪ নাম্বার জাতীয় সড়ক ধরে জাগলির পরের স্টপ কল্যাণী মোড় থেকে ছ'কিমি চেকপোস্ট। বাঁদিকে গেলেই পার্ক। ঈশ্বর গুপ্ত সেতু পেরিয়ে কল্যাণী।
৫। প্রান্তিক রিট্রিট : হাওড়া-খড়গপুর দক্ষিণ শাখায় ঘোড়াঘাটা-দেউলটি। এই দুই স্টেশনের মাঝে প্রান্তিক রিট্রিট। পিকনিক স্পট এবং রিসর্ট। বিশাল এলাকা নিয়ে প্রান্তিক। চারিপাশে গাছগাছালির সবুজ আর মরশুমি ফুলের বাগান। দেখে মনে হয়, সবুজের মাঝে বসেছে ফুলের জলসা। আছে বাচ্চাদের মনোরঞ্জনের জন্য চিল্ড্রেনস পার্ক। বাচ্চাদের ভাল লাগাবার জন্য সব উপকরণই মজুত আছে প্রান্তিকে। এখানে রাত্রিবাসের জন্য লাগবে ১৮৫০ থেকে ৩২০০ টাকা। আবাসিকদের জন্য সুইমিং পুল ফ্রি।
যাঁরা পিকনিক করতে যাবেন তাঁদের জন্য কোনও টাকাপয়সা লাগে না। তবে বাইরে থেকে কোনও খাবার নিয়ে আসা যাবে না, এমনকী রান্না করাও। প্রান্তিক রিট্রিট থেকেই খাবার নিতে হবে। পিকনিকের জন্য খাবারের দাম মাথাপিছু ৫৬০ থেকে ৯০০ টাকা প্যাকেজ। পিকনিকের দলে ২৫ জনের বেশি হলেই একটি, ৫০ জনের বেশি হলে দুটি ঘর কমপ্লিমেন্টারি দেওয়া হয়। যোগাযোগ: অনীক ঘোষ, মোবাইল: 085880 29760.
ট্রেনে গেলে দেউলটি স্টেশনে নেমে মিনিট দুই হেঁটে অটোস্ট্যান্ড। প্রান্তিকে পৌঁছতে অটোতে লাগবে ১০ টাকা ভাড়া। গাড়িতে ছ'নম্বর জাতীয় সড়ক (বম্বে রোড) ধরে যেতে হবে।
৬। মুক্তবীথি : বর্ধমান মানেই সবুজ। খেত ভরা ফসল। ধানের গোলা। খোলামেলা প্রকৃতি। টাটকা তাজা নির্মল বাতাস। টইটম্বুর পুকুর। তাই এবার পিকনিক হোক গঙ্গাধরপুরের ‘মুক্তবীথি’। এখানে রাত্রি যাপনের জন্য তৈরি আছে তাঁবু। পিকনিকের জন্যও পাওয়া যাবে তাঁবু। এখানে জৈব পদ্ধতিতে চাষ হয়। পাওয়া যাবে খেতের তাজা সবজি। পুকুরের জ্যান্ত সুস্বাদু মাছ দিয়ে হতে পারে পিকনিকের পদ। আছে পেয়ারা, সুপুরি, ঝাউ বাগান। ছোটদের জন্য পার্ক। গঙ্গানন্দপুরের কাছ চৈতন্যদেবের বাল্যশিক্ষার কেন্দ্র। পিকনিকের ফাঁকে সেখানেও ঘুরে আসতে পারেন। ভাল লাগবে।
আচে বাঁশদহ আর চাঁদের বিল। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত জলরাশিতে ঘুরে বেড়ায় পরিযায়ী পাখির দল পরিযায়ী পাখি দেখবার জন্য আছে নৌকা। নৌকায় ঘোরা যায় সারা বিল। দেখে নিতে পারেন কাছেই ১০৮ শিব মন্দির, কৃষ্ণসায়র পার্ক। শান্ত গ্রাম্য পরিবেশ বেশখানিক মনের আরাম দেবে মুক্তবীথি। লাল মাটির পথ, সরষে খেত আর পুকুরে বাঁশের ঘাট-- সবমিলিয়ে অপূর্ব! মুক্তবীথি রাজ্যের ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প দফতর দ্বারা পরিচালিত, পিকনিকে যাওয়ার আগে যোগাযোগ করে যাওয়াটাই শ্রেয়।
৭। গঙ্গানীড় : শীতের উজ্জ্বল উজ্জ্বল রোদ্দুর পিঠে লাগিয়ে দিন কাটানো বিনা খরচায় সবচেয়ে বড় বিলাসিতা। আর সেটা যদি হয় গঙ্গার ধারে তাহলে তো ডাবল ধামাকা! তেমনই একটি পিকনিকের জায়গা হল 'গঙ্গানীড়'। সামনে চোখ মেললেই বিস্তৃত জলরাশি। গঙ্গা বয়ে চলেছে। অপূর্ব জায়গা! কী করে যে সময় কেটে যাবে বুঝতেই কেটে যাবে বুঝতেই পারবেন না!
গঙ্গার ধারে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে গঙ্গানীড়। এটি অনেকটা বাংলোবাড়ি কিংবা ভিলা টাইপের বলা যায়। ফলতার রাজারামপুরে গঙ্গার ধারেই। রাত্রিযাপনের জন্য ঘর আছে। একটি চার এবং অন্যটি দু'শয্যার। ভাড়া ২৫০০ টাকা। পিকনিকের জন্য মাথাপিছু ১০০০ এবং ১২০০ টাকা। ওয়াশরুমের ব্যবস্থা আছে। ফুলের বাগান, পুকুর, সুইমিং পুল, গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা আছে। পুকুরটিতে পিকনিকের অবসরে পুকুরে মাছ ধরে সময় কাটাতে পারেন। শীতের রোদ্দুর গায়ে মেখে চমৎকার লাগবে! বাচ্চাদের সময় কাটানোর ব্যবস্থাও করা আছে। বয়স্কদের জন্য হুইলচেয়ারের সুবিধা নজরে পড়বে। সবমিলিয়ে দারুণ লাগবে, 'গঙ্গানীড়'!
'গঙ্গানীড়'-এর মূল আকর্ষণ অন্দরমহল অর্থাৎ ঘরগুলো সাজানো হয়েছে সব Vintage Ratten ফার্নিচারে! একটা সাবেকিয়ানার ছোঁয়া আছে ।
যোগাযোগ: মোবাইল- 98300 11715.
কীভাবে আসবেন:
তারাতলা কমবেশি ৩৫-৩৬ কিমি। বেহালার ঠাকুরপুকুর বাজার থেকে বাকরা হাট রোড ধরে ডোঙাড়িয়া বুরুল হয়ে খুব সহজেই এখানে চলে আসা যায়। ট্রেনে শিয়ালদহ দক্ষিণ থেকে ডায়মন্ড হারবার লোকাল ধরে ডায়মন্ড হারবার স্টেশন নামতে হবে। কাছেই ফলতার অটোস্ট্যান্ড। অটোতে মিনিট ৪০-৪৫ মতো সময় লাগবে।

৮। হরিখালি : দিঘা যাওয়ার পথেই পড়ে হরিখালি শীতে বেড়ানোর দুর্দান্ত জায়গা! বেশ জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছে! আর শীতের রোদ্দুর পিঠে নিয়েই তো পিকনিক! পিকনিকের জন্য সেরা পছন্দ নদীর তীর। সে যে নদীই হোক। নদী মানেই প্রাকৃতিক রূপ-মাধুর্যের বাড়তি আকর্ষণ! নদীর তীরে তেমনই এক নতুন পিকনিক স্পট হল হরিখালি।
মহিষাদল ব্লকে হলদি নদীর ধারে হরিখালি। শীতের দিনে নদীর ধারে ফাঁকা জায়গায় পিকনিকে মেতে ওঠেন বহু মানুষ। হলদি নদী তীরে হরিখালি পিকনিকের এক নতুন ঠিকানা। এখানকার পুরনো কৃষ্ণমন্দির, এবং দুর্গামণ্ডপ জানান দেয় হরিখালি তার পুরনো ঐতিহ্যে মহীয়ান এবং হলদি নদীর ধারে পুরনো আমলের ঘরবাড়ি, মন্দির সব মিলিয়ে অপার সৌন্দর্যের অধিকারী। সব মিলিয়ে হরিখালি একটি দুর্দান্ত পিকনিক স্পট। নন্দকুমার-দিঘা ১১৬বি জাতীয় সড়কের নরঘাট ব্রিজের আগে ডানদিকে দু'কিমির মতো হরিখালি। এবার তাই হরি বলি, হরিখালি চলি।
৯। পুষ্পবন : 'পুষ্পবন' নামটি মনে পড়লে ধরে নেওয়া যেতেই পারে, ফুলে ফুলে রাঙানো এক রঙিন বাগিচা! সেখানে গেলেই মনের কল্পনা বাস্তবে রূপায়িত হয়। সত্যিই মরশুমি ফুলে ভরা চমৎকার এই পিকনিক স্পট। বহুরকম গাছগাছালির সমাহার এই পুষ্পবনে। বাঙালির পিকনিকের জনপ্রিয় এক জায়গা হল ডায়মন্ড হারবার। এখানে পিকনিক করতে যাননি এমন বনভোজনপ্রেমী খুঁজে মেলা ভার! ডায়মন্ড হারবারে গঙ্গার ধারে এই পুষ্পবন। শীতের হিম-বাতাস বয়ে যায় গঙ্গায়। নদীর জল কাঁপে তিরতির করে। দূর থেকে মনে হয়, কেউ যেন বিলি কেটে দিচ্ছে গঙ্গার জল-শরীরে!
পুষ্পবনের কিছুটা দূরে দু'টি কেল্লার ভগ্নস্তূপ। একটি ছিল পর্তুগিজ, অন্যটি ইংরেজ আমলের। পিকনিক করতে এসে না-হয় ইতিহাসের সাক্ষী হলে ক্ষতি কী! তবে পুষ্পবনে বুকিং করে পিকনিক করতে আসাই ভাল। নইলে মুশকিলে পড়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট। এখানে রয়েছে দু'টি স্পট। একটির ভাড়া ৬০০০ টাকা, অন্যটির ৫০০০ টাকা। ৬০০০ টাকা ভাড়ায় বেডরুম-সহ দু'টি ওয়াশরুম-সহ ঘর দেওয়া হয়। ৫০০০ টাকায় একটি। খাওয়াদাওয়ার ঝামেলা না-চাইলে কোনও অসুবিধা নেই। মেনু বলে দিলে পুষ্পবনের কর্মকর্তারাই সব করে দেবেন। সেজন্য আলাদা অর্থ দিতে হবে। যোগাযোগ: মোবাইল- 98310 39032. ডায়মন্ড হারবার মহুয়া হোটেলের বিপরীতে পুষ্পবন।
১০। মন নিয়ে : চমৎকার রোম্যান্টিক নাম। একই নামে একটি হিট এবং জনপ্রিয় ছবি ছিল উত্তম-সুপ্রিয়ার। ভিতরে ঢুকলে রোম্যান্স আরও জাগে যখন সুইমিং পুলটি চোখে পড়ে! পিকনিকে গিয়ে আস্ত একটা সুইমিং পুল হাতে পাওয়া, জাস্ট ভাবা যায় না! সঙ্গে ঝরনা, পাহাড়ও আছে। পুরো বাগানটাই লন। অতিথিদের স্বাগত জানানোর জন্য ফুটে থাকে কতশত রংবেরঙের ফুল! গাছগাছালির ছায়ায় ছায়ায় লুটোপুটি খায় শীতের রোদ্দুর। রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে বসলেই অনন্ত আরাম। দিঘির পাড়ে বসে আড্ডা দিতেও বেশ লাগে। পিকনিক দলের জন্য বরাদ্দ করা হয় দোতলা বাড়ির একতলাটি। ওয়াশরুম আছে। সবকিছুই পাওয়া যায় এখানে। ব্যবস্থা আছে কেটারিংয়েরও। প্রতিদিন একই ভাড়া ৪২৫০০ টাকা। কোনও হেরফের নেই। বারাসত ডাকবাংলোর মোড় থেকে কৃষ্ণনগর রোড ধরে কমবেশি ১১ কিমি মন নিয়ে। যোগাযোগ: মোবাইল- 98317 89014.

১১। নন্দী বাগানবাড়ি : ব্যারাকপুরের কাছেই দেবপুকুর। নামটা শুনে দেব-দেবীর স্পর্শ আছে মনে হয়, তাই তো? ঠিকই ধরেছেন, এখানে ৪০০ বছরেরও বেশি পুরনো রাধাকৃষ্ণ-এর নন্দদুলাল আর সিদ্ধেশ্বরী কালীমায়ের মন্দির আছে। নন্দদুলাল মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল মুঘল আমলে। এখানেই গড়ে উঠেছে চমৎকার এক পিকনিক স্পট।
বিশাল এলাকা জুড়ে নন্দী বাগানবাড়ি। চারিদিক উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। মরশুমি ফুলে ভরে ওঠে শীতের বাগান। ফুলে ফুলে প্রজাপতি ওড়ে! সবমিলিয়ে চমৎকার লাগে নন্দী বাগানবাড়ি পিকনিক স্পটটি। আছে একটি দিঘিও। এবছর আরও নতুন করে সেজেছে নন্দী বাগানবাড়ি। বাচ্চাদের জন্য নতুন আকর্ষণ দেখা যাবে এই বাগানবাড়িতে। শীতের পিকনিকের ব্যস্ত এবং অলস দুপুর কেটে যাবে দিঘির পাড়ে বসে! কখনওসখনও দল থেকে নিজেকে আলাদা করে নিতে ইচ্ছে করে। তখন চলে যান দিঘির ধারে। দেখবেন, নিজেকে খুঁজে পাবেন। কিংবা পিকনিকের অবসরে চলে যান কাছেই মঙ্গল পান্ডে উদ্যান,গান্ধী ঘাটে আর মন্দির দু'টির কথা আগেই বলেছি। ছোটদের জন্য রয়েছে ভিন্ন ব্যবস্থা।
নন্দী বাগানবাড়ির ভাড়া- শনি, রবি ও ছুটির দিন ১২০০০ এবং অন্যান্য দিন ১০০০০ টাকা। ট্রেনে শিয়ালদা থেকে ব্যারাকপুর স্টেশনে নেমে দেবপুকুর কমবেশি ৩.৫ কিমি। গাড়িতে বারাসত-ব্যারাকপুর রোড ধরে ৯ কিমি। আশপাশে ঘুরতে ইচ্ছে করলে বাগানবাড়ির লোকজনদের বললে ওরা টোটোর ব্যবস্থা করে দেবেন। তবে টোটো ভাড়া নিজেদের। যোগাযোগ: মোবাইল- 098833 94992/062913 94968.
১২। কমলা গার্ডেন : শিবালয় বনবীথির বিপরীতে কমলা গার্ডেন। শিবালয় বনবীথিই-বা কোথায়! বারাসত ডাকবাংলো মোড় থেকে ন'কিমি দূরে। কমলা গার্ডেনের অন্দরে ঢুকলেই অবাক হতে হয়। চারিদিকে গাছপালা, দিঘি, বাঁধানো বসার জায়গা, ছোটদের আনন্দদানের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা। দিঘির শানবাঁধানো ঘাটে বসে সময় কাটবে চমৎকার। শীতের দুপুরটি ভীষণই মনোরম।
আড়াইশো জনের বেশি একসঙ্গে পিকনিক করা যায় এখানে। পিকনিকের দলকে ওয়াশরুম-সহ ঘর দেওয়া হয়। কেটারিংয়েরও ব্যবস্থা আছে। ট্রেনে শিয়ালদা থেকে দত্তপুকুর স্টেশনে নামতে হবে। তারপর ভ্যানরিকশায় লাগবে কমবেশি মিনিট বিশেক। ভাড়া- ১২৫০০ টাকা। যোগাযোগ: মোবাইল- 98317 89014.
১৩। মানকুর : গঙ্গার মতোই রূপ-মাধুর্যের ছটা রূপনারায়ণ নদীতেও! পাশাপাশি গঙ্গার মতোই রূপনারায়ণের ইলিশও বিখ্যাত। রূপনারায়ণ নদী বয়ে চলেছে আপন খেয়ালে। শীতের রোদ্দুর নদীর জলে পড়ে চকচক করছে। আর শীতের দিনে রূপনারায়ণ নদীর পাড়ে বসে পিকনিক করার মজাই আলাদা! খোলা নীল আকাশের নীচে পিকনিকের আনন্দ দ্বিগুণ করে দেয়। ইচ্ছে হলে নৌকায় চেপে রূপনারায়ণের বুকে ভেসেও যাওয়া যায় এপাশ-ওপাশ। সে খুব মজা। তবে, খেয়াল রাখবেন নৌকায় কোনওরকম হইহল্লা করবেন না। যে-কোনও সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। আর পিকনিকে এসে দুর্ঘটনা কখনওই কাম্য নয়। তবে এখন প্রশাসন থেকেও বারণ আছে নৌকায় বসে হইহল্লা করার।
তাই নৌকায় চুপচাপ বসে গল্পগুজব করতে করতে শীতের রোদ্দুরের আমেজ নিন। প্রাকৃতিক রূপ-সৌন্দর্যে গা-এলিয়ে উপভোগ করুন রূপ-মাধুর্যের! সূর্যাস্তের সময় আকাশ আর রূপনারায়ণ হোলি খেলে। চমৎকার সে-দৃশ্য!
অযথা বাজার না-বয়ে স্থানীয় বাজার থেকে নেওয়া যেতে পারে পিকনিকের সবকিছু। হাওড়া স্টেশন থেকে দক্ষিণ শাখার ট্রেনে বাগনান নেমে বাসে মানকুর। শ্যামবাজার-বাগনান বাসসার্ভিস আছে নিয়মিত। কলকাতা সরাসরি গাড়িতেও যাওয়া যায় মানকুর।
১৪। রামমন্দির গার্ডেন : কেউ যদি বলেন, পিকনিক করতে গিয়ে গাছে বসে আড্ডা দিতে কেমন লাগবে? উত্তর হবে, কেমন আবার! ভালই লাগবে। কিন্তু আমরা কী কপি যে গাছে গাছে লাফালাফি করব!
নিশ্চয়ই এতক্ষণ অভিধান খুলে দেখে নিয়েছেন 'কপি' বলতে কি বলেছি। না, না, একেবারে সেসব কিছু নয়। রামমন্দির গার্ডেনে আমগাছের ওপরে রয়েছে একটি গাছ-মাচা। সেই মাচায় বসে আড্ডা দিতে বেশ লাগে। এছাড়াও লনে আছে খড়ের চালা ঘর। এটিও আড্ডা ঘর। এছাড়াও আছে খেলার মাঠ।
শীতের রোদ্দুর খেলা করে লনে, গাছগাছালির ফাঁকফোকরে। কতরকম গাছ এই গার্ডেনে! কাজুবাদাম, দারুচিনি, কমলালেবু, আম, পাম ইত্যাদি। হ্যাঁ, মরশুমি ফুলেও ভর্তি। রংবেরঙের মরশুমি ফুল ফুটে এই বাগানের রূপসৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি করেছে। পিকনিকপ্রেমীদের কাছে খুবই প্রিয় জগৎবল্লভপুরের রামমন্দির গার্ডেন।
ভাড়া: শনি, রবি এবং ছুটির দিন ১০০০০টাকা। অন্যান্য দিন ৭০০০টাকা। তবে ৫০-৬০জনের ওপর অতিরিক্ত ভাড়া লাগে৷ রান্নার জন্য আছে আলাদা জায়গা। কাছেই বাজার তাই জিনিসপত্র টেনে আনার প্রয়োজন নেই। যোগাযোগ: 98303 46682/87774 76217.
কোনা এক্সপ্রেস দিয়ে ডোমজুড় হয়ে যেতে হবে। ঠিকানা: রামমন্দির গার্ডেন, বড়গাছিয়া, জগৎবল্লভপুর রোড, হাওড়া।
Website: www.rammandirgarden.com

১৫। সামতাবেড় : এই জায়গাটির নাম শোনেননি বা জানা নেই, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এখানে বাঙালির সবচয়ে প্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত জায়গা। পিকনিকের অবসরের একফাঁকে টুক করে ঘুরে আসুন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি। রূপনারায়ণ নদীর তীরে পিকনিকের জায়গাটি চমৎকার! শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িটিও।
পিকনিক ছাড়াও বহু প্রকৃতিপ্রেমী আসেন রূপনারায়ণ নদীর ধারে। প্রকৃতিকে যেমন উপভোগ করেন, তেমনই বাংলা এবং বাঙালির একান্ত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনেকেই সপরিবারে আসেন সামতাবেড়। তবে নদীর ধারে শীতের রোদের সঙ্গে মিতালি পাতাতে অনেকেই আসেন বনভোজনে।
নদীর পাড় ঘেঁষে পিকনিকের জায়গা। গরম গরম পকোড়া আর কালো কফি খেয়ে ভাড়া করা নৌকায় ভেসে যান রূপনারায়ণের জলে। ভীষণই ভাল লাগবে। তবে কখনওই নৌকা চেপে কোনও হইচই নয়, চুপচাপ প্রকৃতির রূপ-মাধুর্য উপভোগ করবেন। নয়তো হাঁটাপথে গ্রামের অন্দরে যান। বাংলার গ্রামের রূপ দেখে মুগ্ধ হবেনই, এ-কথা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়!
সড়কপথে যেতে পারেন। নইলে হাওড়া স্টেশন থেকে দক্ষিণ শাখার ট্রেনে দেউলটি নেমে ভ্যানরিকশা, টোটোতে সামতাবেড়।
১৬। নীলদীপ গার্ডেন : কলকাতা থেকে দূরত্ব মাত্র ৩০ কিমি, নীলদীপ পিকনিক গার্ডেন-এর। রং-বেরঙের মরশুমি ফুলের মাঝে সবুজের সমারোহ এককথায় অপূর্ব! গাছের ফাঁকে শীত-দুপুরের রোদ্দুর যখন চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে তখন মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে চারিপাশ! তারই মাঝে পাখিদের কলগুঞ্জন আরও মোহময় করে তোলে নীলদীপের পরিবেশ। প্রকৃতির আঁচলে অপরূপ সৌন্দর্য ভরা এই নীলদীপ পিকনিক গার্ডেন। বনভোজনে এসে সকলের সঙ্গে সময় কাটানোর আদর্শ জায়গা। নীলদীপের নিজস্ব রেস্তরাঁ আছে। আগে থেকে বলে রাখলে পাওয়া যায় ব্রেকফাস্ট থেকে লাঞ্চ, বিকেলের স্ন্যাকও। বাচ্চারা নিজেদের মতো সময় কাটাতে পারে। তাদের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা।
শিয়ালদা দক্ষিণ শাখার ট্রেনে বারুইপুর স্টেশন। তারপর অটোতে জোগাইলপুকুর মোড়, কাছেই নীলদীপ গার্ডেন। গাড়িতে বাইপাস ধরে বারুইপুরের শেষে ডানদিকে আমতলার রাস্তা, সেখান থেকে জোগাইলপুকুর মোড়। ল্যান্ডমার্ক হল আই হসপিটাল। ভাড়া- শনি, রবি এবং ছুটির দিন ১৬০০০, অন্যান্য দিন ১১০০০ টাকা। যোগাযোগ: মোবাইল- 96744 77044. Website: www.neeldeepgarden.com
১৭। বাবর হাট : বাবর হাট নাকি বাবুর হাট। নাম যাইহোক, তাতে কী আসে যায়! কলকাতা থেকে মাত্র কমবেশি ৫০-৫১ কিমি গেলেই বাবুর হাট বা বাবর হাট। গ্রাম বাংলার ছবি দেখবেন৷ অতি মনোরম গ্রাম। শান্ত নিরিবিলি গ্রাম। সারা গ্রাম ঘিরে রয়েছে লেক। যার পরিচিতি ভেরি হিসেবেই। নানারকম বাংলার মাছ চাষ হয় সেখানে। পাশাপাশি আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ খেত। বিশাল বিশাল লেক আর সুবিস্তীর্ণ সবুজ খেত অপূর্ব এক চিত্রকল্প তৈরি করেছে বাবর হাট গ্রাম জুড়ে!
চোখে পড়ে স্থানীয় গ্রামবাসীদের ঘরবাড়ি। সেসবে পুরোপুরি বিদ্যমান বাংলার গ্রামের ছবি আর যাপনচিত্র। কোনও একটা ফাঁকা খেত বা আমবাগানে জায়গা খুঁজে বসে পড়ুন বনভোজনে। ভীষণ ভাল লাগবে! গ্রামের মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে প্রচুর পাখি নজরে পড়বে। যাঁরা পাখি খুঁজে বেড়ান গ্রাম বাংলার পথেঘাটে, তাঁদের কাছে আদর্শ বাবর হাট বা বাবুর হাট।
মাত্র ১৫ কিমি দূরে মালঞ্চ। এখানেও অনেকেই আসেন পিকনিকে। মাছের জন্য বিখ্যাত মালঞ্চ। এখান দিয়ে বয়ে চলেছে ইছামতী আর বিদ্যাধরী। বিদ্যাধরী নদীর বুকে সূর্যাস্ত দেখা সারাজীবনের এক পরম পাওয়া, অভিজ্ঞতাও বটে!
কলকাতার কাছেই বাবর হাট কিংবা বাবুর হাটের পরিচিতি ক্রমশ বাড়ছে। শহরের ধুলো দূষণ থেকে বাঁচতে গ্রামীণ পরিবেশে সময় কাটানোর বা পিকনিকের আদর্শ জায়গা এই বাবুর হাট বা বাবর হাট। কলকাতা থেকে উত্তর ২৪ পরগনার বাবুর হাটের দূরত্ব প্রায় ৪৮ থেকে ৫০ কিমি। ঘণ্টা দুই-আড়াই লাগবে পৌঁছতে। সবুজ খেত, পুকুর, গাছগাছালির মাঝে মন খুশিতে ভরে উঠবে আপনা থেকেই।
কীভাবে যাবেন: সড়কপথে কলকাতা থেকে বাসন্তী হাইওয়ে ধরে যেতে হবে বাবুর হাট। কলকাতা-মালঞ্চ বাসে গিয়ে বাবুর হাট বা বাবর হাট নামতে হবে। তবে বাসন্তী হাইওয়ে খুব সতর্ক হয়ে গাড়ি চালাতে হবে।

১৮। ফুলেশ্বর : একসময় বেড়ানোর ক্ষেত্রে বাঙালির নামই ছিল দিপুদা। অর্থাৎ বাঙালির বেড়ানোর জায়গা বলতে দিঘা পুরী দার্জিলিং, ঠিক তেমনই একসময় পিকনিকের জায়গা বলতে ছিল ডায়মন্ড হারবার, দেউলটি, ফুলেশ্বর। যাঁরা নিয়মিত পিকনিক করেন বা যান, তাঁদের কাছে অতিপরিচিত একটি জায়গা ফুলেশ্বর। বর্তমানে তো নতুন নতুন বহু পিকনিকের জায়গার নাম শোনা যায়, ভিড়ভাট্টাও হয়।
বাংলায় বহুল পরিচিত একটি প্রবাদ আছে, পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। ফুলেশ্বর পিকনিক স্পটটিও তেমনই নতুন নতুন পিকনিকের জায়গা যতই হোক ফুলেশ্বরের চাহিদা মোটামুটি একইরকম রয়ে গেছে। গঙ্গার ধারে গাছগাছালি ঘেরা অতি উত্তম জায়গা। মনোমতো একটি জায়গা বেছে নিয়ে জাস্ট বসে পড়ো।
এখানে রয়েছে সেচ দফতরের একটি বাংলো। ব্যবস্থা করতে পারলে রর চেয়ে উত্তম কিছু আর হয় না। বারান্দায় বসে বসে কেবলই নদীর রূপ-মাধুর্য উপভোগ করা! দেখা যাবে, দূরে নৌকাগুলো গঙ্গার ছোট ছোট ঢেউয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে। সেইসঙ্গে শীতের হিমেল বাতাসে পরিবেশ হয়ে উঠবে রোম্যান্টিক! গাছগাছালির ফাঁকে পাখির ডাক তো বাড়তি পাওনা!
কীভাবে যাবেন: সড়কপথে ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে যেতে হবে। গুগল ম্যাপ দেখে যাবেন। হাওড়া স্টেশন থেকে দক্ষিণ শাখার মেচেদা, খড়গপুর বা মেদিনীপুরগামী ট্রেনে ফুলেশ্বর নামতে হবে। তারপর স্টেশনের বাইরে এসে যেতে হবে পিকনিক স্পট।
১৯। প্রত্যুষা পার্ক : পশ্চিম মেদিনীপুরে কেশিয়ারিতে এই প্রত্যুষা পার্ক। ৫০ একর জমির ওপর এই পার্কটি গড়ে উঠেছে। বাচ্চাদের মনোরঞ্জনের জন্য বিশেষভাবে নজর দিয়েছেন পার্ক কতৃপক্ষ। স্লিপ, দোলনা থেকে সবকিছুই আছে। পার্কের ভিতর এক বিশাল জলাশয়। সেখানে ঘাটে বাঁধা রয়েছে বোট। চমৎকার দেখতে বোটগুলো। রাজহাঁসের মতো আকার। সেই বোটে চেপে ভেসে পড়ুন জলাশয়ে। পিকনিক করতে গিয়ে অন্যরকম অভিজ্ঞতা হবে। মজাও হবে।
শীত মানেই তো বেড়ানোর আমেজ, পিকনিকের মজা। তা এবারের পিকনিক হতেই পারে মনকাড়া পরিবেশে পশ্চিম মেদিনীপুরের কেশিয়াড়ির প্রত্যুষা পার্ক। কেশিয়াড়ি জীব বৈচিত্র্য ও শিশু বিনোদন উদ্যান ‘প্রত্যুষা’। এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আচ্ছন্ন করে। বাচ্চারা নিজের মতো সময় কাটাতে পারে। আছে বাচ্চাদের খেলার যাবতীয় সরঞ্জাম। পার্কের ভেতর কৃত্রিম হাতি, হরিণ। খুব সুন্দর পার্কের বড় রঙিন ফোয়ারাটি। মানুষের পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ায় রাজহাঁস, টার্কি, পায়রা। জলাশয়ে ফুটে থাকে পদ্ম।। বিশাল এলাকা তাই ঘুরতে সময় লাগে। শীতের রোদ্দুর গায়ে মেখে ঘুরতে ভালই লাগব। পিকনিকের জন্য চমৎকার জায়গা। এবারের শীতে অতিথিদের জন্য সেজে উঠেছে প্রত্যুষা পার্ক। সামান্য অর্থের বিনিময়ে বিনোদন পাবেন। অর্থাৎ কিছু অর্থের বিনিময়ে পার্কে প্রবেশ করা যাবে। যাকে বলে ষোলো আনা আনন্দ। কয়েকশো টাকার বিনিময়ে পিকনিক করতে পারেন। রান্নার আলাদা ব্যবস্থা আছে।
যাতায়াতে কোনও অসুবিধা নেই। খড়্গপুর থেকে ঘণ্টাখানেক।
২০। কঙ্কণা বিনোদন উদ্যান : উত্তর ২৪ পরগনা জেলার গোবরডাঙারর কঙ্কণা বিনোদন উদ্যান পিকনিকের জন্য এক আদর্শ স্পট। কঙ্কণা বাঁওড় হিসেবে পরিচিত। এই বাঁওড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপূর্ব। গোবরডাঙার পরিচিতি নাটকের শহর হিসেবে।

বো-ব্যারাকস ও বাকিরা..
অরিত্র ঘোষ
বুঝলেন মশাই এই পত্রিকার লোকজন ভারি দুষ্টু। শীতের এক মনোরম রবিবারে কাগজি লেবু চিপে ডুমো ডুমো আলু দেওয়া কচি পাঁঠার ঝোল দিয়ে একথালা গরম ভাত ঝেড়ে একটা দার্জিলিং কমলালেবু (আসলে নাগপুর, কিন্তু দার্জিলিং না বললে মান থাকে না) নিয়ে যেই না রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে বসেছি, এমন সময় পত্রিকার জন্য লেখার ফরমাশ হয়ে গেলো। বিশ্বাস করুন, অফিসে মাইক্রোসফট এক্সেল চালানোর থেকে বেশী কঠিন লেখার টপিক খুঁজে বের করা। কি লিখবো ভাবছি, এমন সময় পাড়ায় আয়োজিত আবৃত্তি প্রতিযোগিতা থেকে মাইকে এক পুঁচকের গলা ভেসে এলো-
স্টেটবাসের জানালায় মুখ রেখে
একবার আকাশ দেখি, একবার তোমাকে। ভিখারি-মায়ের শিশু, কলকাতার যিশু, সমস্ত ট্রাফিক তুমি মন্ত্রবলে থামিয়ে দিয়েছ।
এ যেন আমার জন্য দৈববাণী হলো। ঠিক করে ফেললাম যীশুদেবই ভরসা। যেমন ভাবা, তেমন কাজ কিন্তু হলো না। কি যে ছাই লিখবো, ভেবে কুল পেলাম না। এসব ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা একটু ভারীই হয়ে এসেছিলো বোধহয়, কিন্তু হঠাৎ একটা ফাচি আওয়াজ শুনে চটকা ভেঙে তাকিয়ে দেখি- এ কি! এ তো সুকুমার রায়ের "হযবরল" এর সেই বেড়াল।
বেড়ালটা খানিকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল, 'কলকাতার যীশু চাই তো বো-ব্যারাকস গেলেই পার।
আমি বললাম, 'বলা ভারি সহজ, কিন্তু বললেই তো আর যাওয়া যায় না?"
বেড়াল বলল, "কেন, সে আর মুশকিল কি?'
আমি বললাম, 'কি করে যেতে হয় তুমি জানো?"
বেড়াল একগাল হেসে বলল, "তা আর জানি নে? বেথলেহেম, ব্যান্ডেল চার্চ, পার্ক স্ট্রিট, বো-ব্যারাকস ব্যাস্। সিধে রাস্তা, সওয়া ঘণ্টার পথ, গেলেই হল।"
এমন সময় পাড়ার মাইকে কোন এক চৌবাচ্চা তারস্বরে 'বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর' ইত্যাদি ইত্যাদি বলে জীবনানন্দ আউড়ে উঠলে ঘুমটা ভেঙে গেলো। উঠে দেখি কোথায় বেড়াল, কোথায় কি। পুরোটাই স্রেফ স্বপ্ন। তবে হ্যাঁ, লাভ হয়েছে বৈ কি! লেখার টপিক তো পেয়েছি নাকি..
ইয়ে মাইরি বলছি, কেস দেবেন না প্লিজ। একটু গৌরচন্দ্রিকা না করলে হয় বলুন তো? এবার আসল লেখায় আসছি।
কলকাতায় সেন্ট্রাল থেকে এগিয়ে চাঁদনি, এসপ্ল্যানেড হয়ে পার্কস্ট্রিট অবধি জায়গার জনজাতি নিয়ে একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে এই জায়গাটুকু যেন ওপরওয়ালার ডাইভার্সিটির এক্সপেরিমেন্ট ল্যাবরেটরির গিনিপিগস্বরূপ। তার মধ্যেও এক্সট্রিম প্রোজেক্ট হলো টেরিটি বাজার আর বো-ব্যারাকস সংলগ্ন এলাকা। ক্রস-কালচারের এরকম জীবন্ত-জ্বলন্ত উদাহরণ বড় কমই আছে। এই মহামানবের সাগরতীরকে উপমামন্ডিত করতে হলে কেবল একটা কথাই মনে আসে নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান, বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান"। এই উপরোক্ত অঞ্চলে কোন জাত-ধর্মেরই অভাব নেই। হিন্দুদের পাড়া, মুসলিমদের মহল্লা, চাইনিজদের ঠেক, অ্যাংলোদের কলোনি, পার্সিদের ধর্মশালা সব মিলিয়ে বৈচিত্র্যের এক চরম সুস্বাদু জগা-খিচুড়ি, আর তাতে জবজবে করে গাওয়া ঘি ঢালাই এই লেখার মুখ্য উদ্দেশ্য।
বো-ব্যারাকস আর তৎসংলগ্ন এলাকা সম্বন্ধে নিজের মনে একটা ধারণার ছবি ফুটিয়ে তুলতে গেলে ইতিহাসের রযে সওয়ার হয়ে আপনাকে বর্তমান টাইমলাইন থেকে একটু পেছন দিকে যেতেই হবে। এই ইতিহাস দীর্ঘ, ঘটনাবহুল ও রোমাঞ্চকর এই স্বল্প পরিসরে সবটুকু লেখার চেষ্টা ধৃষ্টতা, তবে জ্ঞানরসলোভী পাঠক নিজের মস্তিষ্কপুষ্টির জন্য যদি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটু এই অঞ্চলের ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তবে নিরাশ যে হবেন না তা নিশ্চিতরূপে বলা যায়।

এই লেখার মূল উপাজীব্য "বো-ব্যারাকস' হলেও টেরিটি বাজার, ডালহৌসি, নিউ মার্কেট এসব জায়গার কথা কান টানলে মাথার মতো চলে আসবে। আসুন, টেরিটি বাজার দিয়েই শ্রীগণেশ করা যাক। পোদ্দার কোর্টের কাছে টেরিটি বাজার বা ওল্ড চায়না টাউন চেনেন না এমন মানুষ, বিশেষতঃ খাদ্যরসিক মানুষ বোধহয় বিরল। কিন্তু এই বাজারের ইতিহাস কি? আসুন, এক ঝলক দেখে নেওয়া যাক।
অনেক মেয়েবন্ধু বা গার্লফ্রেন্ড থাকা বন্ধু-বান্ধবকে আমরা প্রায়ই লাভগুরু ক্যাসানোভা, রোমিও এসব বলে প্যাঁক দিই। 'রোমিও' শেক্সপিয়ারের নাটকের চরিত্র হলেও "ক্যাসানোভা' কিন্তু ছিলেন রক্ত-মাংসের মানুষ। বহু- নারীসংসর্গে জীবন কাটান্যে এহেন ক্যাসানোভার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর নাম 'এদুয়ার্দো টিরেট্রো বা 'কাউন্ট টিরেট্রা দে ট্রেভিসা'। ক্যাসানোভার রেকমেন্ডেশন লেটারে আমস্টার্ডামের ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় বাটাভিয়া (অধুনা জাকার্তা) তে কেরানির চাকরি পান টিরেট্রা। কিন্তু স্বভাববশতঃ স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়ে ১৭৭০ এর গোড়ার দিকে বাধ্য হন কলকাতা পালিয়ে আসতে।
ক্যাসানোভার সংস্পর্শে থেকে বেশ কিছু বদ-গুণ টিরেট্রার মধ্যেও চলে এসেছিলো। দামী শৌখিন পোশাক, পাখির শখ, নারীসঙ্গ এসব উল্লেখযোগ্য। এই টিরেট্রাই দখল করে বসেন কলকাতার উপকণ্ঠের এক বাজার। শুরুতে মানচিত্র আঁকিয়ে টিরেট্রা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়ায় নিজের কর্মদক্ষতা ও বুদ্ধিবলে বেশ উচ্চপদে আসীন হয়ে মোটা অঙ্কের বেতন পেতেন। তার সেই বাজারেরই নামকরণ হয় 'টিরেট্টা বাজার', লোকমুখে যার আজকের নাম 'টেরিটি বাজার'। সেই যুগেই তার বাজারের দর ছিলো প্রায় দুই লক্ষ টাকা।
জেমস অগাস্টাস হিকির হিকি'স বেঙ্গল গেজেট (কলকাতা থেকে প্রকাশিত তৎকালীন ভারতের প্রথম ও প্রধান ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা) থেকে জানা যায় কলকাতার ভয়ঙ্কর গরমে ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় জর্জের জন্মদিন উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক বলডান্সের আসরে টিরেটা ভেলভেটের স্যুট পরে এসেছিলেন। এই থেকেই টিরেট্রোর শখ আর খরচের একটা ধারণা পাওয়া যায়। পরের দিকে তিনি প্রায় দেউলিয়া হয়ে যাওয়ায় দেনার দায়ে তাঁর বাজার ওঠে লটারিতে। ১৭৯১ নাগাদ চার্লস ওয়েস্টন নামের এক অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান লটারিতে জিতে টিরেটা বাজারের মালিক হলেও বাজারের আর নাম পরিবর্তন করেননি।

১৭৯২ তে রাজনৈতিক কারণে ফ্রান্স থেকে পালিয়ে শ্রীরামপুরে চলে আসা ক্যারিয়ন-এর কাউন্টের মেয়ে চোদ্দ বছর বয়েসী অ্যাঞ্জেলিকাকে বিয়ে করেন টিরেটা। ১৭৯৬ নাগাদ বাচ্চা জন্ম দেওয়ার সময় অ্যাঞ্জেলিকা মারা যান। এর পরবর্তী সময়ে টিরেটীর জীবন নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। কেউ বলেন তিনি মারা গেছিলেন আবার কেউ বলেন তিনি সন্তানকে নিয়ে মনোকষ্টে দেশ ছেড়েছিলেন। মোট কথ্য, ১৭৯৭ এর পর ইতিহাসের পাতায় টিরেট্রার অধ্যায় শেষ হয় কিন্তু রয়ে যায় তার বাজার, অনেক অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে।টেরিটি বাজার নিয়ে কথা বলতে গেলে চীনাদের কথা আসবেই। আঠারো শতকের দ্বিতীয় দশক নাগাদ টং আচিউ নামের এক চীনা ব্যবসায়ী ওয়ারেন হেস্টিংস-এর সাথে বন্দোবস্ত করে বজবজের কাছে গড়ে তোলেন এক চিনির কল, সাথে আখ চাষের ব্যবস্থা। তাঁর নাম থেকেই এই জায়গার নাম লোকমুখে আচিপুর থেকে অছিপুরে দাঁড়িয়েছে। কলে কাজ করার জন্য আমদানি হয় প্রচুর চীনা শ্রমিকদের। সময়ের সাথে সাথে জীবন-জীবিকার সন্ধানে চীন থেকে আসতে থাকেন বিভিন্ন পেশার মানুষ।
হাক্কা আর ক্যান্টনিজ প্রদেশের লোকজনই মুখ্য এর মধ্যে। আঠারো শতকের মাঝামাঝি ইন্দো-চায়না ট্রেড রুটের অনেক নাবিক-খালাসি পাকাপাকি ভাবে বসবাস শুরু করেন। আস্তে আস্তে ট্যানারি ও সূক্ষা চামড়ার কাজ, পোর্সেলিনের কাজ, ভিন্ন রন্ধনশিল্পে এদের নাম ছড়াতে থাকে। ১৯৬২ তে ইন্দো-চায়না যুদ্ধ (Sino-Indian War) এর সময়ও সাউথ চায়নার অনেক রিফিউজি এখানে এসে ওঠেন। এনাদের বেশীরভাগই টেরিটি বাজার ও ট্যাংরা অঞ্চলে সেটল করেন। বহু পরিবার চীনে ফিরে গেছেন, কিন্তু রয়ে গেছে বহু চীনে পরিবার। তারা বাঙালীদের মধ্যে থেকেও নিজস্ব আচার-আচরণ-ধর্ম পালন করে চলেছেন প্রতিনিয়ত। লুনার নিউ ইয়ার পালন থেকে শুরু করে সব উৎসবও পালন করেন নিজস্ব স্বকীয়তায়। ভাগ্যদেবতা যে কিভাবে এই বঙ্গদেশের সাথে সুদূর চীনের কিয়দংশের ভাগ্য এক সুতোয় বেঁধে দিলেন, তা ভাবলেই রোমাঞ্চ হয় বৈ কি!
যারা খাদ্যরসিক তাদের কাছে টেরিটি বাজারের কথা শোনানো মানে মায়ের কাছে মাসির গল্প বলার মতো। টেরিটি বাজারে ভোরবেলা বসা ব্রেকফাস্ট মার্কেটে (উইকএন্ডে বেশী জমজমাট হয়) মোমো, বাও, তাই-পেই, সসেজ, ফিশ/মিট বল স্যুপ ও বিভিন্ন চাইনিজ আইটেম ট্রাই করেননি এরকম ভোজনবিলাসী কমই আছেন। হাইজিনের দিকে একটু চোখ টিপে দিলে এ এক দিব্যি খানা-খাজানা। তবে আসল জিনিস হলো টেরিটির ছোট বাহুল্য ও বিজ্ঞাপনবর্তিত রেস্তোরাঁগুলো (বলা ভালো ইটিং হাউস) আর তাদের বানানো বিভিন্ন পদ, মূলতঃ পর্কের আইটেম। এদের মধ্যে Tung Nam, Pou Hing, D'ley, Sei Vui এদের খাবারের কথা সুধীজনবিদিত ও বহুলচর্চিত। এছাড়াও Pou Chong এর বিভিন্ন সস্, এশিয়ান প্রোডাক্টসের কথা আপনারা অনেকেই জানেন।
তবে একটা সময় এই চীনা পাড়া হয়ে উঠেছিলো অঞ্চলের হ্রাস। লালবাজারের নাকের ডগায় লেগেই থাকতো খুন-জখম আর সাথে ছিলো আফিম-চন্ডুর ঠেক। এই ঠেকের রেগুলার খদ্দের যেমন নিম্নবিত্ত চীনারা ছিলো, তেমনই ছিলো ভিস্তিওয়ালা, পালকিবাহক আর সরকার বাহাদুরের খোচররা। তবে মাঝে মাঝে সম্ভ্রান্তবংশীয় বাবু আর অ্যাংলো-ইন্ডিয়ানদের যাতায়াতও কিন্তু লেগেই থাকতো।

কথায় কথায় 'অ্যাংলো ইন্ডিয়ান' শব্দটা বেশ কয়েকবার চলে এলো। কলকাতায় 'অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পাড়া কোথায় জিজ্ঞেস করলে প্রথমেই যেটা আপনার মাথায় আসবে, সেটা হলো "বো-ব্যারাকস'। চাঁদনি মেট্রো স্টেশন নেমে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ এর দিকে বৌ-বাজার থানা (থানায় কিন্তু এখনও 'বহুবাজার থানা' লেখা আছে বড় বড় হরফে)আর হেয়ার স্ট্রিট থানা ছাড়িয়ে দু-একটা গলি পেরিয়েই ঠিক যেখানটায় আপনার চোখ একবার হলেও আটকে যাবে, সেটাই বো-ব্যারাকস। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, অঞ্জন দত্ত পরিচালিত ভিক্টর ব্যানার্জী, সব্যসাচী চক্রবর্তী, মুনমুন সেন অভিনীত বিতর্কিত সিনেমা 'বো ব্যারাকস ফরএভার' এর সেই 'বো-ব্যারাকস'।
BOW BARRACK কোন প্রামাণ্য নথি নেই, তবে মুখে মুখে চলে আসছে এই কাহিনী। পার্সি ধর্মশালার উল্টোদিকে তাকালেই দেখবেন কতগুলো লাল-লাল ইটের বাড়ি এক বুক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সব বাড়ির সামনে ছোট ছোট বারান্দাওয়ালা ব্যালকনি আর সবুজ সবুজ ঝিরি-পাল্লাওয়ালা জানলা। বলা হয় হাওড়া স্টেশনের আর্কিটেক্ট ও রূপকার হ্যালসি রিকার্ডো সাহেব নিজের হাতে এই বো-ব্যারাকসের বাড়িগুলোর নকশা বানান প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আমেরিকান সৈন্যদের বসবাসের জন্য। যদিও পরে কোন কারণে সৈন্যরা ব্যারাকস ছেড়ে ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে চলে যায়। মজার কথা হলো এর পরবর্তীকালে Calcutta Improvement Trust (CIT, তবে বর্তমান KIT) এর মধ্যস্থতায় এই ব্যারাকসগুলিতে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অ্যাংলোরা বো-ব্যারাকে একত্রিত হয়ে বসবাস শুরু করে। ১৯৮০ নাগাদ বো-ব্যারাকসের বাড়িগুলির বিপজ্জনক অবস্থা দেখে পুনঃনির্মাণ উপলক্ষ্যে বাসিন্দাদের ব্যারাকস ছাড়তে বলা হলে তাঁরা রাজি হন না, ফলস্বরূপ অথরিটির সাথে বেশ লম্বা মনোমালিন্য হওয়ায় দীর্ঘদিন মেরামতির কাজ হয় নি এই অঞ্চলে। সম্প্রতি ২০২১ এ KMDA এর তত্ত্বাবধানে দুটি ফেসে নতুন রঙসহ ইন্টিরিয়ার-এক্সটিরিয়ার মেরামতির কাজ হয়। নথি অনুযায়ী, বো-ব্যারাকে রয়েছে ১৩২ টি ফ্ল্যাট যাদের মধ্যে বেশীরভাগই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান ফ্যামিলি। স্বাধীনতার সময়ে অনেকেই ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বিভিন্ন দেশে ফিরে গেলেও রয়ে গেছে বেশ কিছু পরিবার, বাঙালী পরিবেশে থেকেও নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে চলেছেন যুগের পর যুগ। কর্মদক্ষতা, মেধার উৎকর্ষতা, খেলাধূলায় পারদর্শীতার সূত্রে আজ এদের মধ্যে অনেকেই সমাজের বিভিন্ন পেশার সাথে সসম্মানে যুক্ত। বো ব্যারাকস তবে কারা এই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান? এমন নামই বা কেন? জানতে হলে ইতিহাসের হাত ধরে আবার গুটি গুটি পিছিয়ে যেতে হবে। গোদা বাংলায় বলতে গেলে আধা-ভারতীয় আর আধা ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়ান সংকর জাতি হলো এই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান।
১৪৯৮ সালে ভাস্কো-গা-দামা কালিকটে বন্দরে আসার পর ইউরোপীয়ানদের কাছে খুলে যায় এক নতুন দরজা। শুরু হয় ব্যবসা- বাণিজ্য, আদান-প্রদান। অবশেষে ১৫১০ সালে বণিকের মানদন্ড দেখা দেয় রাজদন্ড রূপে। পর্তুগিজ জেনারেল আফনসো দে আলবুকার্ক স্থানীয় এক নির্বাসিত হিন্দু তিমোজা বা তিমোয়া নায়েকের সহায়তায় আদিল শাহিদের পরাজিত করে গোয়ার মসনদে বসে পড়েন। সংখ্যায় কম পর্তুগিজরা নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ভারতের বুকে নিজেদের সংখ্যা বাড়াতে ভারতীয় মহিলাদের বিবাহ করতে থাকেন। এছাড়াও ইনকুইজিশনের সময়ে অনেক ভারতীয় ধর্মত্যাগ করে ক্যাথোলিক ধর্মগ্রহণ করেন। ফলস্বরূপ যে পর্তুগিজ-ভারতীয় সংকর প্রজাতি সৃষ্টি হয়, তাদের বলা হতো 'লুসো-ইন্ডিয়ান'। কনসেপ্টটা কিন্তু বহু পুরনো, সেই চিরচেনা প্রহসনের প্লট। এর সূচনা বহুযুগ আগে, যখন মোগল বা যবন সম্রাটরা নিজেদের স্বার্থে আশেপাশের এলাকার রাজকন্যা বিবাহ করে বিনা-যুদ্ধে যৌতুক হিসেবে রাজ্যজয় করে নিতেন। বিশেষতঃ শক্তিশালী প্রতিপক্ষ বা রাজপুত কন্যা বিবাহ নিয়ে মোগল অধ্যায় লিখলে বসলে গোটা বই হয়ে যাবে। ইংরেজরাও বুদ্ধিমান, তারাও পর্তুগিজ ও ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পদানুসরণ করা শুরু করে। ইংরেজ ফৌজের সিপাহীরা নির্বিচারে ভারতীয় মহিলাদের বিবাহ করতেশুরু করেন। শুধু সাধারণ ভারতীয় মহিলা নয়, এই ক্ষমতায় নোংরা খেলার শিকার হন লক্ষেক্ষ্মী এর অনেক সুন্দরী বাঈজি, এমনকি দেশের বিভিন্ন নিষিদ্ধপল্লীর দেহোপজীবিনীরাও। তবে উল্টো দিকে অনেক ইউরোপীয়ান গণিকা ও নিম্নবিত্ত ব্রিটিশ মহিলারাও এদেশে সংসার করে পাকাপাকি ভাবে বসবাস করতে থাকেন। এই ইউরোপীয়ান- ভারতীয় সংমিশ্রণে যে সন্তানেরা আসতে থাকে, ১৯১১ সাল অবধি তাদের অভিহিত করা হতো ইন্দো-ব্রিটন বা ইউরেশিয়ান নামে।

ইংরেজদের দ্রুত নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠার পেছনে অ্যাংলোদের অবদান অপরিসীম। তবে চেহারায়, ভাষায় ভারতীয় ছাপ থাকার কারণে এরা সম্মানে কিন্তু খাঁটি ব্রিটিশ রক্তের সমকক্ষ কখনোও হয়ে উঠতে পারেনি। অনেক ব্রিটিশ রাজপুরুষ অ্যাংলো সন্তানকে স্বীকৃতি দিতেও অস্বীকার করেছেন। একটা সময় পর সরকারি উচ্চপদে পর্যন্ত অ্যাংলোদের নিয়োগ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যায়। কালো চুল, শ্যামলা বা তামাটে গাত্রবর্ণের অ্যাংলোদের 'ব্ল্যাকি", এমনকি 'নিগার'ও শুনতে হতো বলে জানা যায়। ১৯১১ সালের আদমশুমারির সময় প্রথম 'অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়। পরে ভারত সরকারের অ্যাক্ট ১৯৩৫ মতে, অ্যাংলোদের আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৪৭ এ স্বাধীনতার সময়ে একটা বড় অংশ ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গেলে ১৯৫০ নাগাদ এদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলে ঘোষণা করা হয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ অবধি সময়টায় বহু অ্যাংলো পরিবার দেশ ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি দেন। বর্তমানে দেশজুড়ে এদের সংখ্যাটা হ্রাস পেয়ে পেয়ে প্রায় ১,২৫,০০০ থেকে ১,৫০,০০০০ এর কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে, যার বৃহদংশই চেন্নাই আর কলকাতায় বসবাস করেন।
ফিরে আসা যাক পুরনো ট্র্যাকে, সেই 'বো-ব্যারাকে'। কালচক্রের গহ্বরে কালচারাল এক্সচেঞ্জ এর নিয়ম মেনে বো-ব্যারাকসের অ্যাংলোরাও বংশানুক্রমে মিশে গেছেন সমাজের মূল ধারায়, তবে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই। বো- ব্যারাকে শুধু খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী অ্যাংলোরাই নন, থাকেন বিভিন্ন ধর্মের মানুষ। বো-ব্যারাকে গেলে যেমন হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট S.M.Hannan এর নামের ফলক দেখতে পাবেন, ঠিক তেমনি উল্টোদিকের বাড়ির ফলকে বো স্ট্রিটের বাড়ির সিভিল ও ড্রেইনেজ সিস্টেমের জন্য ফান্ডের ব্যবস্থা করা Sri Michael Shane Calvert এর নামও দেখতে পাবেন। রাস্তার একদিকে যেমন পার্সি ধর্মশালা দেখতে পাবেন, অন্যদিকে তেমন বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা দেখতে পাবেন, আবার গলির ভেতরে প্রভু যীশুর ছবি সমেত ছোট উপাসনাস্থল দেখতে পাবেন যেখানে লেখা থাকবে 'This grotto was built on 11.02.1999 by Stephen Seedin"I এতগুলো কালচার যেখানে মিশেছে, সেখানে মানুষের মেজাজ তো রঙিন হবেই। ডিসেম্বর পড়তে না পড়তেই ব্যে-ব্যারাকসের হাওয়ায় যেন উৎসবের একটা অঘোষিত আমেজ চলে আসে। আমরা যেমন দূর্গাপুজোয় ছুটি-ছাটা নিয়ে বাড়ি আসার প্ল্যান করি, ওনারা ক্রিসমাসে একত্রিত হয়ে মজা করার পরিকল্পনা করেন। এমনকি বিদেশথেকেও শিকড়ের টানে ছুটে আসেন অনেক প্রবাসী অ্যাংলো। বাড়িতে বাড়িতে ড্রাই ফ্রুটস ভিজতে থাকে রাম আর অরেঞ্জ জাসে। ডিনারে শেফার্ড'স পাই চিকেন ক্যাসেরোল, প্রণ টেম্পেরাডো, প্যান্থারাস, পুডিং এর মতো স্পেশাল ডিশ তৈরী হতে থাকে। আগে এই সময়ে চাহিদা বাড়তো ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের (অধুনা মির্জা গালিব স্ট্রিট) বিখ্যাত দোকান 'কালম্যান" এর কোল্ড কাটসের, যে দোকানটি দুঃখজনক ভাবে প্রায় সাত দশক রসনাতৃপ্তির পর কিছুদিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। এটাই সেই সময় যখন আপনি বো-ব্যারাকে কোন বাড়িতে অতিথি হয়ে ঢুকতে পারলে আপনার ভাগ্যে হোমমেড জিঞ্জার ওয়াইন, রেইজিন ওয়াইন বা পিচ ওয়াইন জুটলেও জুটতে পারে।
বো-ব্যারাকসের সামনেই রবার্ট স্ট্রিটে JN.Barua তে ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। কলকাতার নাহুমস, ইম্পেরিয়াল, সালডানহা সব বেকারির সাথে পাল্লা দিয়ে বড়য়াতে কেকবিলাসী মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে ছানার কেক, চিকেন-মাটন বা কোকোনাট প্যাটিস, ওয়াইন কেক, রাম কেক, ফরুট কেক বা ওয়ালনাট কেক কেনার। ডিসেম্বরের প্রথম কটা দিন সকাল থেকে রাত অবধি দোকান খোলা থাকলেও ক্রিসমাসের আগে আগে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা রাখতে হয় সাপ্লাই আর ডিমান্ড চেইন বজায় রাখতে। বো-ব্যারাকস গেলে এই কলকাতা-ক্লাসিকস থেকে না খেলে কিন্তু মিস করবেন। একটু ফাঁকা থাকলে দোকানের প্রতিষ্ঠাতার সুপুত্র বর্তমান কর্ণধার রতন বড়ুয়ার সাথে দাঁড়িয়ে দুদন্ড কথা বললে আপনার ভালো লাগতে বাধ্য। দেশভাগের আগে তাঁর বাবার এদেশে BARU এসে দোকান দিয়ে অ্যাংলোদের জন্য কেক বানানোর গল্প থেকে শুরু করে উৎসবে-অনুষ্ঠানে স্পেশাল কেকের অর্ডার দিয়ে বো- ব্যারাকসের বাসিন্দাদের আত্মীয়-সজনের মধ্যে কেক উপহার দেওয়া অথবা এখনও বিদেশ থেকে কেকের অর্ডার আসার গল্প শুনতে আপনার মন্দ লাগবে না বলেই আমার বিশ্বাস।
শীতের মৌতাতে ক্রিসমাসের প্রাক্কালে বো-ব্যারাকস সেজে উঠতে থাকে নতুন সাজে। আলোর মালা, ক্রিসমাস ট্রির আভরণে লাল-লাল ইঁটের বাড়িগুলো তখন স্বপ্নের মতো লাগে। ২৪ শে ডিসেম্বর থেকে পয়লা জানুয়ারি অবধি বো-ব্যারাকে তখন খুশির বন্যা, ছোটখাটো অনুষ্ঠান লেগেই থাকে ক্রিসমাস-ইভ থেকে। ক্রিসমাসের সময় সমবেত প্রার্থনা, হাতে-টানা রিক্সা করে সান্টা ক্লসের আসা সবকিছু নিয়ে একটা আলাদা ভাইবস তখন। সন্ধ্যা হতে না হতেই জ্বলে ওঠে আলো, শুরু হয়ে যায় গান-বাজনা, হই হুল্লোড়। হারমোনিকা, স্যাক্সোফোন এর আওয়াজ সমেত এই পরিবেশ আপনাকে অন্য একটা জগতে নিয়ে চলে যেতে বাধ্য। কিন্তু খালি পেটে বা শুধু মুখে তো আর সেলিব্রেশন হয় না। তার জন্য চিন্তা কি? রাস্তার ধারে লাইন করে বসা ক্রিসমাস স্পেশাল খাবারের দোকানগুলো আছে না। এগুলো বেশীর ভাগই স্হানীয় বাসিন্দ্যরা চালান এই কটা দিনের জন্য। ফুচকা, কেক, কাবাব, মোমো, ডিমসাম, হারগাও থেকে শুরু করে সসেজ, প্যান্থারাস, বিভিন্ন ফ্রায়েড আইটেমস সবকিছুর ঢালাও বিকিকিনি হয়। প্রতিবছর তো পার্ক স্ট্রিটে গিয়ে ঘুরে আসেন, পারলে একবছর বো-ব্যারাকসও ঘুরে আসতেই পারেন। একটু রাতের দিকে গেলে স্থানীয়দের সাথে বলডান্সের আসরে তালে তাল মিলিয়ে প্রেয়সীর কোমড় জড়িয়ে ধরে শীতের রাতে অ্যাংলো-কায়দায় উষ্ণ চুম্বন খারাপ লাগবে না।অনেক লিখে ফেললাম, তবে বো-ব্যারাকস এরিয়ায় যেটার সন্ধান না দিলে পাপ হবে সেই জায়গাটায় নাম পার্সি ধর্মশালা। ধর্মশালার বাইরের ফলকে লেখা দেখবেন "MANACKJEE RUSTOMJEE DHARAMSALA FOR PARSI TRAVELLERS"। আমাদের তিলোত্তমা কলকাতা অ্যাংলোদের মতো পার্সিদেরও এক রঙিন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে, সেও এক সুদীর্ঘ কাহিনী, পরে আবার লেখার সুযোগ হলে অবশ্যই অন্য কোন পর্বে লিখবো। যেটা বলার সেটা হলো পার্সি ধর্মশালার খাবার। কলকাতায় বেশ কিছু পার্সি পরিবার থাকলেও সর্বসাধারণের জন্য সেইসব খাবার চেখে দেখার সুযোগ কম। সম্প্রতি সাউথ সিটি মলে "SodaBottle OpenerWala' খুললেও তার দাম যথেষ্ট বেশী। তাই সাধারণ মানুষের পকেটের রেস্ত অনুযায়ী একটু ভালো পার্সি খাবারের অপশন বলতে "পার্সি ধর্মশালা' আর নিউ মার্কেটের দিকে সুপ্রিয়া মানচেরজির "Mancherji's"!

আগে মিঃ দারা হানসোর্টিয়া ও মিসেস মেহের হানসোর্টিয়ার হাতযশে কলকাতার একটা বড় অংশ পার্সি ধর্মশালার খাবারের একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে উঠেছিলো। ওনারা চলে গেলে মাঝে কিছুদিন খাবার-দাবার পর্ব বন্ধ থাকলেও এখন মিঃ পেসি বালসারা আর তার কন্যা এনাক্ষী বালসারা রসনাতৃপ্তির বাগডোর সামলাচ্ছেন। তবে এটা কোন চিরাচরিত রেস্তোরাঁ নয়, আগে থেকে কথা বলে অর্ডার দিয়ে যাওয়াই রীতি। পাতরানি মচ্ছি, চিকেন ফারচা, পার্সি স্পেশাল কাটলেট ইত্যাদি দিয়ে স্টার্টার পর্ব সেরে পেট ভরে প্রণ পাতিও, সাল্লি মুর্গ, ব্রাউন রাইস সহ মাটন ধনশাগ সাঁটিয়েও একটুখানি জায়গা কিন্তু বাঁচিয়ে রাখতেই হবে এখানকার বিখ্যাত ডেজার্ট 'লগন-নু-কাস্টার্ড" এর জন্য। এই কাস্টার্ড সেট হতে বা জমতে একটু সময় লাগে, তাই ভালো যেতে হলে হাতে সময় রেখে অর্ডার করাই দস্তুর।
যাক আর লেখা বাড়াবো না, কলম একবার চলতে শুরু করলে থামতে চায় না। তবে এ লেখা আমার গবেষণালব্ধ লেখা নয়, অন্তর্জাল ও বই-পত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলে আর আমার মতো কলকাতা-প্রেমী মানুষ হলে পুরনো কলকাতার গলি-খুঁজিতে চোখ খুলে আর কান পেতে হাঁটলে এই ইতিহাস চোখে ধরা দেবেই। সেসবকে এক জায়গায় করে কয়েক পাতার মধ্যে তুলে ধরার চেষ্টা করলাম মাত্র।
এই মুহূর্তে টেরিটি বাজারের অতি-পুরনো বাড়িগুলোর অনেক জায়গাতে ফাটল ধরেছে, বো-ব্যারাকসের অনেক বাড়ির দেওয়াল বেয়ে গড়িয়ে আছে অশ্বত্থের চারা। শীতের কুয়াশামাখা ভোরে অথবা হেমন্ত গোধূলির সন্ধ্যায় যে ইতিহাসঘেরা বাড়িগুলোকে দেখে আমরা বড় হয়েছি, কল্লোলিনী কলকাতাকে চিনেছি, প্রার্থনা করুন যেন তাদের সব ভালো হয়, সর্বাঙ্গীন সুন্দর হয়। রসে-বসে মিলেমিশে থাকুক অষ্টমীর খিচুড়ি, ঈদের সিমাই আর বড়দিনের কেক। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। শীত তো এসেই পড়েছে; নলেন গুড়ের মিষ্টি, জয়নগরের মোয়া, বড়দিনের প্লাম কেক, কড়াইশুঁটির কচুরি-নতুন আলুর দম, গরম কফির সাথে ফুলকপি-ধনেপাতার পকোড়া, পিকনিক, বার্বিকিউ, বিয়েবাড়ি সব চলতে থাকুক। বড়দিন আর নতুন বছর উপলক্ষ্যে আপনাদের জন্য রইলো অনেক অনেক কলকাতা-বাসা।
শুভমন্ত্র, অলমিতি

ফিরে দেখা ২০২৫: কী পেলাম, কী হারালাম!
২০২৫ সাল কেবল ঘটনাবহুল একটি বছর নয় এ বছর আমাদের স্মৃতির ভাঁজে চিরস্থায়ী হয়ে রইল অসংখ্য প্রিয় মুখের বিদায়ে। এমন মানুষদের আমরা হারিয়েছি, যাঁরা তাঁদের প্রতিভা, শ্রম, চিন্তা ও নেতৃত্ব দিয়ে সমাজের নানা স্তরকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। কেউ ছিলেন পর্দার উজ্জ্বল নক্ষত্র, কেউ শব্দের কারিগর, কেউ মাঠের লড়াকু যোদ্ধা, কেউ রাষ্ট্রচিন্তার চালিকাশক্তি, কেউ বা শিল্প ও ব্যবসার নীরব স্থপতি। ২০২৫ সাল আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে, আবার নিঃশব্দে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছেও। এই প্রতিবেদনে একনজরে ফিরে দেখা যাঁদের প্রয়াণে শূন্য হয়ে গেছে সাহিত্য, বিনোদন, ক্রীড়া, রাজনীতি ও ব্যবসা জগতের : ভারতীয় বিনোদন জগৎ ২০২৫ সালে একের পর এক দুঃসংবাদে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। যাঁরা পর্দায় আমাদের হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, ভাবিয়েছেন—তাঁদের অনেকেই চিরবিদায় নিয়েছেন এই বছর।
ধর্মেন্দ্র (Dharmendra) : বলিউডের ইতিহাসে যাঁর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধায়—ধর্মেন্দ্র। ‘শোলে’, ‘চুপকে চুপকে’, ‘সত্যমেব জয়তে’, ‘ফুল অউর পাথর’—এমন অসংখ্য ছবিতে তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল পর্দা জুড়ে প্রাণের সঞ্চার। রোম্যান্টিক নায়ক থেকে অ্যাকশন হিরো, আবার সংবেদনশীল চরিত্র—সব রূপেই তিনি অনবদ্য।
২৪ নভেম্বর ২০২৫-এ তাঁর প্রয়াণে হিন্দি সিনেমার এক সম্পূর্ণ যুগের অবসান ঘটে। ধর্মেন্দ্র ছিলেন কেবল একজন অভিনেতা নন, তিনি ছিলেন আবেগ, সৌন্দর্য ও শক্তির এক অনন্য মিশ্রণ।
সতীশ শাহ (Satish Shah) : হাস্যরসের সূক্ষ্ম শিল্পী সতীশ শাহ টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র—দুই মাধ্যমেই দর্শকের মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে ‘সারাভাই ভার্সেস সারাভাই’ ধারাবাহিকে তাঁর চরিত্র আজও কাল্ট ক্লাসিক। ২৫ অক্টোবর ২০২৫-এ তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় কমেডি এক অভিভাবককে হারাল। তাঁর সংলাপ, টাইমিং ও বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয় দীর্ঘদিন দর্শকদের হাসির স্মৃতি হয়ে থাকবে।
অসরানি (Asrani) : ‘শোলে’-র সেই জেলারের চরিত্র—“হম ইংলিশ জানতা হ্যায়!”—আজও বাঙালি-অবাঙালি সকল দর্শকের মুখে মুখে ফেরে। অসরানি ছিলেন এমন এক অভিনেতা, যিনি পার্শ্বচরিত্রেও গল্পের কেন্দ্রে চলে আসতেন। ২০ অক্টোবর ২০২৫-এ তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র তার এক অনন্য রসিক প্রতিভাকে হারায়।
সুলক্ষণা পণ্ডিত (Sulakshana Pandit) : গায়িকা ও অভিনেত্রী—দুই পরিচয়েই সুলক্ষণা পণ্ডিত ছিলেন সমানভাবে স্মরণীয়। তাঁর কণ্ঠে বহু গান আজও শ্রোতাদের আবেগে ভাসায়। ৬ নভেম্বর ২০২৫-এ তাঁর প্রয়াণে সংগীত ও অভিনয়ের জগতে তৈরি হয় এক নীরব শূন্যতা।
পঙ্কজ ধীর (Pankaj Dheer) : টেলিভিশনের ‘মহাভারত’-এ কর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে যিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন—পঙ্কজ ধীর। তাঁর কণ্ঠস্বর, সংলাপ ও ব্যক্তিত্ব কর্ণকে নতুন মাত্রা দিয়েছিল। ১৫ অক্টোবর ২০২৫-এ তাঁর মৃত্যু টেলিভিশন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ইতি টানে।
জুবিন গৰ্গ (Zubeen Garg) : অসমের গর্ব, সংগীতজগতের জনপ্রিয় নাম জুবিন গৰ্গ। আঞ্চলিক সীমানা পেরিয়ে জাতীয় স্তরে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল অসাধারণ। ‘ইয়া আলি’ গান তাঁকে সর্বভারতীয় পরিচিতি এনে দেয়। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ সিঙ্গাপুরে সাঁতার কাটার সময় দুর্ঘটনায় তাঁর অকালপ্রয়াণ সংগীত প্রেমীদের গভীর শোকের মধ্যে ডুবিয়ে দেয়।

সাহিত্য ও বিজ্ঞাপন জগতে প্রস্থান
পিয়ুষ পাণ্ডে (Piyush Pandey) : ভারতীয় বিজ্ঞাপন জগতের সৃজনশীলতার প্রতীক ছিলেন পিয়ুষ পাণ্ডে। শব্দ, আবেগ ও সাধারণ মানুষের অনুভূতিকে বিজ্ঞাপনের ভাষায় রূপ দিতে তিনি ছিলেন অনন্য। ২৪ অক্টোবর ২০২৫-এ তাঁর প্রয়াণে বিজ্ঞাপন শিল্প হারায় তার সবচেয়ে মানবিক কণ্ঠস্বরগুলির একটিকে।
প্রীতিশ নন্দী (Pritish Nandy) : কবি, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও রাজনীতিক বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী প্রীতিশ নন্দী ছিলেন সমাজচিন্তার এক তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। ৮ জানুয়ারি ২০২৫-এ তাঁর মৃত্যুতে সাহিত্য ও চিন্তাজগত হারায় এক সাহসী প্রশ্নকারী কণ্ঠকে। তাঁর কবিতা ও লেখালেখি বহু প্রজন্মকে ভাবতে শিখিয়েছে।
ক্রীড়াক্ষেত্রে বিদায়
ম্যানুয়েল ফ্রেডরিক (Manuel Frederick) : ভারতের প্রাক্তন হকি গোলকিপার, ১৯৭২ মিউনিখ অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ পদকজয়ী দলের সদস্য ম্যানুয়েল ফ্রেডরিক ছিলেন কেরালার প্রথম অলিম্পিক পদকজয়ী। ৩১ অক্টোবর ২০২৫-এ তাঁর প্রয়াণে ভারতীয় হকি হারাল এক নিঃশব্দ বীরকে।
চার্লস কস্ট (Charles Coste) : ফ্রান্সের কিংবদন্তি সাইক্লিস্ট, ১৯৪৮ অলিম্পিকে স্বর্ণপদকজয়ী চার্লস কস্ট ৩০ অক্টোবর ২০২৫-এ ১০১ বছর বয়সে প্রয়াত হন। দীর্ঘ জীবনে তিনি ক্রীড়াজগতের ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হয়ে ছিলেন।
রাজনীতির মঞ্চে প্রস্থান
বিজয় রূপানি (Vijay Rupani) : গুজরাটের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানি ১২ জুন ২০২৫-এ এয়ার ইন্ডিয়া দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তাঁর মৃত্যুতে গুজরাট রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা তৈরি হয়।
কিম ইয়ং নাম (Kim Yong Nam) : উত্তর কোরিয়ার প্রাক্তন রাষ্ট্রপ্রধান কিম ইয়ং নাম দীর্ঘদিন কিম পরিবারকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ৩ নভেম্বর ২০২৫-এ ৯৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
ব্যবসা ও শিল্প জগতে ক্ষতি :
গোপীচাঁদ হিন্দুজা (Gopichand Hinduja) : হিন্দুজা গ্রুপের চেয়ারম্যান গোপীচাঁদ হিন্দুজা ছিলেন ভারত ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্কের অন্যতম স্তম্ভ। ৪ নভেম্বর ২০২৫-এ লন্ডনে তাঁর প্রয়াণে আন্তর্জাতিক শিল্পজগৎ হারায় এক প্রভাবশালী দূরদর্শী নেতৃত্বকে।
২০২৫ সাল আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে কিছু মানুষ কেবল ব্যক্তি নন, তাঁরা এক একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁদের প্রয়াণ মানে শুধু একজন মানুষের চলে যাওয়া নয়, একটি যুগ, একটি চিন্তা, একটি পথের অবসান।
এই গুণীজনেরা তাঁদের কর্মে, সৃষ্টিতে, নেতৃত্বে ও প্রতিভায় সমাজকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরা নেই, কিন্তু তাঁদের কাজ, তাঁদের আদর্শ, তাঁদের রেখে যাওয়া আলো আগামী প্রজন্মের পথ দেখাবে। ২০২৫ আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে তবু তাঁদের স্মৃতির মধ্যেই আমরা খুঁজে পাই শক্তি, প্রেরণা আর এগিয়ে যাওয়ার সাহস। কারণ মানুষ চলে যায়, কিন্তু সৃষ্টি থেকে যায়।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ক্রীড়া, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বিশ্ব ও ভারতের প্রাপ্তি :
২০২৫ সাল ছিল এমন এক বছর, যা মানবসভ্যতার অগ্রগতির নানা স্তম্ভকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরীক্ষাগার থেকে শুরু করে ক্রীড়ামাঠ, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি সব ক্ষেত্রেই এই বছর রেখে গেছে উল্লেখযোগ্য ছাপ। কিছু ঘটনা আমাদের বিস্মিত করেছে, কিছু আশাবাদী করেছে, আবার কিছু ভবিষ্যতের পথনির্দেশ দিয়েছে। চলুন ফিরে দেখা যাক ২০২৫ সালে বিশ্ব ও ভারত কী কী পেল।
আন্তর্জাতিক কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বর্ষ (IYQ) ২০২৫ :
জাতিসংঘ ঘোষিত International Year of Quantum Science and Technology (IYQ 2025) ছিল এই বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রাপ্তি। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের শতবর্ষ পূর্তিকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে গবেষণা, সম্মেলন ও জনসচেতনতা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি এবং কোয়ান্টাম সেন্সিং—এই তিনটি ক্ষেত্রেই যুগান্তকারী অগ্রগতির দিকেই এগিয়েছে বিশ্ব। ভারতও এই বর্ষে কোয়ান্টাম মিশনের মাধ্যমে নিজেকে ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির দৌড়ে এগিয়ে রাখার বার্তা দিয়েছে।
ইউরেনাসের নতুন চাঁদ আবিষ্কার :
মহাকাশবিজ্ঞানে ২০২৫ সালের বড় চমক—জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ ব্যবহার করে ইউরেনাসের একটি নতুন চাঁদ আবিষ্কার। চাঁদটির অস্থায়ী নাম S/2025 U 1। এই আবিষ্কার সৌরজগতের বহির্ভাগ সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে আরও বিস্তৃত করেছে এবং প্রমাণ করেছে—মহাকাশ এখনও আমাদের কাছে অগণিত রহস্য লুকিয়ে রেখেছে।
মস্তিষ্ক গঠন নিয়ে নতুন গবেষণা :
২০২৫ সালে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, শিশুর জন্মের আগেই জীবাণু কীভাবে মস্তিষ্কের গঠনে প্রভাব ফেলে। নিউরোসায়েন্সের এই গবেষণা ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য, অটিজম এবং স্নায়বিক রোগ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ :
২০২৫ সালের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপে চেলসি চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রমাণ করেছে ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের আধিপত্য। এই জয় বিশ্ব ফুটবলের শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।
লিওনেল মেসি ও ফুটবল উন্মাদনা :
২০২৫ সালে লিওনেল মেসির ভারত সফর ছিল ক্রীড়াজগতের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। ভারতীয় দর্শকদের ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে তিনি ভারতের ফুটবল ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে মন্তব্য করেন। মেসির উপস্থিতি শুধু মাঠেই নয়, ভারতের ক্রীড়া সংস্কৃতিতেও নতুন অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সাফল্য :
২০২৫ সালে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভারত একাধিক পদক ও সম্মান অর্জন করেছে। অলিম্পিক প্রস্তুতি, এশিয়ান গেমস-পরবর্তী উন্নতি এবং যুব ক্রীড়াবিদদের সাফল্য ভারতের ক্রীড়া ভবিষ্যৎকে আরও দৃঢ় করেছে।
বিমা সংশোধনী বিল ও FDI বৃদ্ধি :
২০২৫ সালে ভারতের বিমা সংশোধনী বিল পাশ হওয়ার মাধ্যমে বিমা খাতে FDI ১০০ শতাংশ করা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বাড়ে, বাজার চাঙ্গা হয় এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই সিদ্ধান্ত ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
G7 শীর্ষ সম্মেলন :
২০২৫ সালের জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তি নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়। উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে ভারতের ভূমিকা আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ভারতের ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস :
২০২৫ সালে ভারত তার ৭৯তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে। এই উপলক্ষে উন্নয়ন, আত্মনির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ ভারত গঠনের বার্তা উঠে আসে।

পুরস্কার ও স্বীকৃতি : মেধার আন্তর্জাতিক স্বাক্ষর
নোবেল পুরস্কার : ২০২৫ সালে নোবেল পুরস্কারে বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তি—এই তিন ক্ষেত্রেই যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসা গবেষণা, জলবায়ু সচেতনতা ও মানবিক সাহিত্যের কাজ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়।
গ্র্যামি ও অস্কার : গ্র্যামি ও অস্কারে বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি ও নতুন ধারার শিল্প বিশেষভাবে স্বীকৃতি পায়। ভারতীয় শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক মঞ্চে আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
বিশ্বকাপ ও আন্তর্জাতিক শিরোপা : ফুটবল, ক্রিকেট ও অন্যান্য খেলায় বিশ্বকাপ পর্যায়ের প্রতিযোগিতাগুলি ২০২৫ সালকে ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয় করে তোলে। ভারতের পারফরম্যান্স আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে!
২০২৫ সালে গুগল সার্চে সবচেয়ে বেশি খোঁজা বিষয়গুলির মধ্যে ছিল :
IPL ও আন্তর্জাতিক খেলাধুলা
বিনোদন ও তারকা সংক্রান্ত খবর
AI ও নতুন প্রযুক্তি
এটি প্রমাণ করে, প্রযুক্তি ও বিনোদন আজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
২০২৫ সাল আমাদের দেখিয়েছে জ্ঞান বাড়ছে, প্রযুক্তি এগোচ্ছে, ক্রীড়া অনুপ্রাণিত করছে, রাজনীতি ও অর্থনীতি নতুন পথে হাঁটছে। একই সঙ্গে এই বছর আমাদের শিখিয়েছে এই অগ্রগতিকে মানবিক ও দায়িত্বশীল পথে পরিচালিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ। ২০২৫ আমাদের দিয়েছে সম্ভাবনা, প্রেরণা ও দায়িত্ব—যা আগামী দিনের বিশ্ব গঠনে দিশা দেখাবে।

দশম অধ্যায়
দীপঙ্কর ঘোষ
ট্রেন এসে মাধবপুর স্টেশনে থেমেছে। গত কুড়ি বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে স্টেশনের। শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদ গায়ে লাগছে। স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে একটু যেতেই অটো ড্রাইভারদের ডাকাডাকি শুনতে পেলাম। রেল আসার শব্দে তাদের মধ্যে যাত্রী টানার জন্য একটা হুড়োহুড়ি লেগেছে। আমাকে দেখে কম বয়সের এক অটো ড্রাইভার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, "কাকু, যাবেন কোথায়?"
"আখড়ায়।"
"নীলাম্বর ঠাকুরে আখড়া?"
"হ্যাঁ। যাবে?"
"দুশো টাকা দেবেন।"
"দুশো! তুমি কি আমাকে নতুন প্যাসেঞ্জার পেয়েছো। এই আখড়ায় আমি আগে বহুবার এসেছি।"
ছেলেটি এবার স্টেশনের দিকে একবার দেখল। ওদিক থেকে আসার মতো আর কোনো যাত্রী নেই। তাই বাধ্য হয়েই বলল, "ঠিক আছে, চলুন, কিন্তু রাস্তায় যদি কাউকে পাই তাহলে তুলে নেব।"
আমার এ প্রস্তাবে আপত্তি থাকার কোনো কারণ নেই। আমি তো আর পেছনের সিটে শুয়ে যাচ্ছি না, কেউ বসলেই কী যায় আসে।
ছেলেটা অটোতে স্টার্ট দিয়েই কানে হেডফোন গুঁজে দিল। পিচ রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে অটোটা ডান দিকের মাটির রাস্তা ধরে নেমে গেল। দূর থেকে এক ভদ্রলোক অটোকে থামার জন্য হাত দেখাচ্ছেন। বয়স্ক লোক বলেই মনে হচ্ছে। গলার মাফলারটা দিয়ে কান মুখ ভাল করে ঢাকা। অটোওয়ালা কানের হেডফোনটা খুলে জিজ্ঞেস করল,

"কোথায় যাবেন কাকু?"
"আখড়া থেকে একটু এগিয়ে।"
"পঞ্চাশ টাকা লাগবে।"
ভদ্রলোক কোনো কথা না বলে আমার পাশে এসে বসলেন। আড়চোখে আমার দিকে দেখে বললেন, "মশায়ের গন্তব্য কোথায়?"
"নীলাম্বর ঠাকুরের আখড়া।"
ভদ্রলোক একটু কৌতুহল নিয়ে আমার দিকে তাকালেন, "আপনি কি নীলাম্বর ঠাকুরের দীক্ষিত?"
"আজ্ঞে না, আমার বাবা ছিলেন। উনি গুরুদেবের কাছ থেকে সরাসরি দীক্ষা নিয়েছিলেন।"
ভদ্রলোক এবার আস্তে আস্তে গল্পের ডানা মেললেন, "আমার নাম ডাঃ সমীরণ দত্ত। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার ছিলাম। দশ বছর হলো রিটায়ার করেছি।"
ডাক্তার শুনে ভদ্রলোকের প্রতি আমার একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্মালো। ঘুরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "অত্যন্ত নোবল প্রফেশন।"
"ছাই নোবল। আমি এই পেশাকে এখন ঘেন্না করি।"
বলেই কী লোকটা! নিশ্চয়ই কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে তার জীবনে।
"তবে রিটায়ারের পর এখন প্রায় দশ বছর থেকে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর লেখালেখি করছি।"

তার মানে ভদ্রলোক একটু খেয়ালি প্রকৃতির লোক।
"আপনার লেখাগুলো কি মেডিক্যাল প্রফেশনের ওপর?"
আমার প্রশ্নে মনে হয় ভদ্রলোক খুব রাগ করলেন। তার কপালের রগগুলো কেঁপে ওঠল। আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
"বললাম না, ওসব আমার আর আগ্রহের বিষয় নয় এখন। আমার বইগুলো সব নিজের জীবন বৃত্তান্ত।"
"হুম। তারমানে একটা বর্ণময় জীবন ছিল আপনার।"
হো হো করে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক, "বর্ণময় নয়। কর্ম দুষ্কর্ম মিলিয়ে ঘটনাবহুল বলতে পারেন।"
ভদ্রলোক মাধবপুর গ্রামের আদি অন্ত বর্ণনা করে যাচ্ছেন। সূর্য আস্তে আস্তে পশ্চিমে হেলে যাচ্ছে। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজেরই সুষমা। ফসলিমাঠ, আম জাম নারকেল গাছে ঘেরা গৃহস্থের শান্তির নীড়। কোথাও অকর্ষিত ভূমি, কোথাও জলাশয়। নিপুন হাতে আঁকা ছবির মতো সুন্দর ছায়া শীতল অবনী।
অটোটা আরেকটু এগিয়ে নীলাম্বর ঠাকুরের আখড়ার গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। আমি নেমে টাকাটা দিতেই সমীরণবাবু বললেন,
"এখানে থাকবেন কতদিন?"
"আপাতত দুদিন থাকার ইচ্ছে।"

"হুম। এখান থেকে আধমাইল পথ এগিয়ে গেলেই একটা পাঠশালা আছে। তার ডান পাশে ইট রঙা বাড়িটা আমার। গেটে নাম লিখা আছে, ডাঃ সমীরণ দত্ত। কাল একবার আসতে পারেন।"
অবশ্যই আসব, বলে আমি আখড়ার দিকে এগিয়ে গেলাম। সন্ধ্যা আরতির আয়োজন চলছে এখানে। আখড়ার পূর্ণকর্মীরা শ্বেতশুভ্র বসনে চরম ব্যস্ততায় চারদিকে ঘোরাঘুরি করছে। সেগুন কাঠের কারুকাজ মন্ডিত আসনে স্বর্ণালংকার সজ্জিত ভুবন আলোকিত যুগলরূপ। প্রণাম করে ব্যাগ হাতে নিয়ে প্রথমে মন্দিরের কার্যালয়ে গিয়ে একটা থাকার ব্যবস্থা করে ব্যাগটা রেখে আবার যখন মন্দিরে ফিরে এলাম তখন প্রার্থনা শুরু হয়ে গেছে। রাধাকৃষ্ণের মন্দিরের পাশের কোঠায় নীলাম্বর ঠাকুরের পাথরের মূর্তি রাখা। সেখানেও প্রদীপ জ্বলছে। দেখতে দেখতেই নীলাম্বর ঠাকুর পাথরের মূর্তি হয়ে গেলেন! আজও অবাক লাগে ভাবতে। প্রথম যেদিন বাবার সাথে এখানে এসেছিলাম তখন আমি সবে মাধ্যমিক দিয়েছি। বাবা শুধু গুরুদেবের শিষ্যই ছিলেন না, পরম আপনজনও ছিলেন। ঠাকুর বলতেন, "তুই আমার জনম জনমের সখা।" প্রতি সন্ধ্যায় কীর্তনের পর ঠাকুর অমৃত বচন শুনাতেন। ভক্তবৃন্দ পরিবৃত সৌম্যদর্শন ঠাকুর তখন সবার পরম আশ্রয়।
বাবা একবার এলে নেই করেও সপ্তাহ দশদিন থেকে যেতেন। আমি যখন ডিগ্রি ফাইনাল দিচ্ছি তখন হঠাৎ একদিন বাড়িতে খবর গেল নীলাম্বর ঠাকুর নাকি দেহত্যাগ করেছেন। খবর পেয়ে বাবা পাগলপ্রায় হয়ে আমাকে নিয়ে ছুটে এলেন এখানে। কিন্তু ঠাকুরের অন্তিম দর্শন আর করতে পারলেন না। শেষ রাতেই নাকি তাঁর নশ্বর দেহ সমাধিস্থ করা হয়ে গেছে। কী রোগে, কী ভাবে সবে পঞ্চাশ উত্তীর্ণ একজন সুস্থ সবল মানুষ দেহত্যাগ করলেন — এ প্রশ্ন নিয়ে বাবা পুরো আশ্রম চষে বেড়ালেন। সবারই এক কথা, ঠাকুর নাকি ধ্যানস্থ অবস্থাতেই ঈশ্বরে বিলীন হয়েছেন!
ভাঙামন নিয়ে বাবা বাড়ি ফিরে এলেন। এরপর থেকে কিছুদিন পর পরই ঠাকুরের আখড়ায় যেতেন। ফিরতে দেরি হলে আমি গিয়ে মাঝেমধ্যে বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসতাম। নীলাম্বর ঠাকুরের দেহত্যাগের পর তাঁর ঘনিষ্ঠ শিষ্য মদনগোপাল বৈষ্ণব আখড়ার সেবাইত হলেন। এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল কয়েকটা বছর। আমি চলে গেলাম চাকরি সূত্রে শিবসাগরে। হঠাৎ একদিন বাড়ি থেকে ফোন এলো — বাবার শরীরটা নাকি খুব খারাপ। রাতের বাসেই বাড়ি ফিরে শুনি বাবা আখড়ার দীঘিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন। বাড়িতে এক শোকাবহ পরিবেশ। এমন আকস্মিক দুসংবাদে সবাই ভেঙে পড়েছে। নীলাম্বর ঠাকুরের আখড়ায় যাওয়ার জন্য আত্মীয় স্বজন সবাই আমার অপেক্ষা করছে।
আখড়ায় গিয়ে বুঝলাম শুনলাম বাবা ঘাটে পা পিছলে দীঘির জলে ডুবে গিয়েছিলেন। আখড়ার সেবাইত মদনগোপাল বৈষ্ণব ততদিনে মদনঠাকুর। আখড়ার তিনিই হর্তা-কার্তা। এই কয়েক বছরে তার চেহারায় ফোটে উঠেছে এক অপূর্ব দিব্যদ্যুতি। তিনি অবশ্য আমাকে স্নেহে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দিয়েছিলেন।
---

রাত এখন অনেক। পুরো আখড়া ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর কিছু নাম না জানা পাখির অস্ফূট কথা শোনা যাচ্ছে। আমি এপাশ ওপাশ করে যাচ্ছি। কিছুতেই ঘুম আসছে না। দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বিশাল বাগান সামনে। ফুলের কলিগুলো একটু একটু করে প্রস্ফুটিত হচ্ছে। অচেনা এক সুগন্ধে চারদিক ম-ম করছে। এ কোন ফুলের গন্ধ? দূরে এক বিশাল বটগাছের ঝুরি নেমেছে। তার তলায় বাঁধানো বেদিতে শ্বেত বসনে গৌরকান্তি এক বৃদ্ধ বিজনে বসে আছেন। একপা একপা করে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। তাঁর দেহ থেকেই আসছে এই সুগন্ধ। এক অপার্থিব পরিবেশের আবেশে আমি এখন হারিয়ে যাচ্ছি। বৃদ্ধের মুখ দেখা যাচ্ছে না। তিনি হাতের ইশারায় আমাকে ডাকছেন। ঘোরের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে আমি তাঁর পায়ের কাছে বসলাম।
বৃদ্ধা প্রশ্ন করলেন, "আজই এসেছিস?"
"হ্যাঁ বাবা।"
"দীক্ষা নিয়েছিস?"
"না।"
"দীক্ষা ছাড়া দেহ অশুদ্ধ থাকে। আজই নিয়ে নে।"
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "আজই? এই রাতে?"
"হ্যাঁ, আজ রাতেই। শুভ কর্মের রাতদিন হয় না রে। আকাশের দিকে চেয়ে দেখ, কালো মেঘ জমেছে। একটু পরেই ঝড় উঠবে।"
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম দক্ষিণের আকাশ চিরে রূপোলি বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে।
বৃদ্ধ বললেন, "যা দেরি করিস নে। দিঘিতে চান করে আয়।"
আমি চাবি দেয়া পুতুলের মতো দিঘির বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে নামতে লাগলাম। প্রচুর শাপলা ফুল ইতিউতি ফুটে আছে। কাজল কালো দিঘিকে বাতাস চঞ্চলা করেছে। দিঘিতে চান করে উঠতে উঠতেই দেখলাম বাতাসে বাগানের বড় বড় গাছগুলো দুলছে।
ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দে কিছু পাখি ওড়াউড়ি করছে।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাইলাম। কিন্তু উঠতে পারছি না কেন! কে আমাকে পেছন থেকে টানছে? ঘুরে দেখি সেই শ্বেত-শুভ্র বসনের বৃদ্ধ কোমর পর্যন্ত জলে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে টানছেন। দানবের মতো শক্তি তার। বিদ্যুতের ঝলকে তার মুখটা দেখার চেষ্টা করলাম। ঠিকড়ে বেরিয়ে আসা দুটো চোখ ছাড়া আর কিছুই একঝলকে দেখতে পারলাম না। ভয়ে ঠান্ডায় সারা শরীর এখন কাঁপছে আমার। শরীরের সব শক্তি দিয়ে বৃদ্ধ আমাকে টানছেন। কিছুতেই আমি তার হাত ছাড়াতে পারছি না। হঠাৎ প্রকাণ্ড একটা গাছের ডাল ভেঙে আমাদের দুজনের হাতের মধ্যে পড়ল। অসহ্য ব্যথায় মনে হল আমার হাতটা ভেঙে গেছে। বৃদ্ধ ডাল হাতে পড়ায় হাতটা ছাড়িয়ে নিলেন। আমি প্রাণপণে চিৎকার করতে করতে সামনের দিকে ছুটতে লাগলাম।
দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আমি এখন ছুটছি। শো শো শব্দে বাতাসের সাথে ধুলো আর শুকনো পাতা উড়ে আসছে। গাছগুলো ঝড়ের দাপটে ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। কড়কড় করে মাঝেমধ্যেই আকাশ কাঁপিয়ে পড়ছে বজ।
সামনের দিকে ছুটতে ছুটতে মনে হল আমি এখন যাব কোথায়? হঠাৎ খেয়াল হল ডাঃ সমীরণ দত্তের কথা। তিনি নিজেই তো আমাকে তাঁর বাড়িতে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু এত রাতে? রাত দেখে লাভ নেই। প্রাণ বাঁচাতে হলে তাঁর ঘরেই যেতে হবে।
ঝড়ের গতি বাড়ছে। সাথে বড় বড় দু-এক ফোটা বৃষ্টিও পড়তে শুরু করেছে। আমি উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে লাগলাম। কতক্ষণ দৌড়েছি তা খেয়াল নেই।
ওই তো পাঠশালাটা। তার ডানদিকে পুরনো আমলের একটা ঘর দেখা যাচ্ছে। ইট রঙেরই হবে মনে হয়। গেটের পিলারে কিছু একটা নাম লিখা আছে। অন্ধকারে পড়া সম্ভব নয়। দরজার সামনে এসে দুবার সজোরে কড়া নেড়ে আস্তে আস্তে অবশ শরীরে বারান্দায় বসে পড়লাম।
দরজা খুলে ডাঃ সমীরণ দত্ত বেরিয়ে এলেন। এত রাতে আমাকে দেখে প্রশ্ন করলেন, "আপনি! এত রাতে?"
কাঁপা কাঁপা স্বরে বললাম, "আমাকে দয়া করে একটু ভেতরে আসতে দিন। সব বলছি।"
সমীরণবাবু সব শুনলেন। কিন্তু আশ্চর্য হলেন না। ভয়ও পেলেন না।
"বসুন," বলে চুপচাপ পাশের ঘরে গিয়ে দু কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এলেন। ভদ্রলোক মনে হয় একাই এই বাড়িতে থাকেন। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, "এই ঝড়ের রাতে একটু চা না হলে গল্পটা জমবে না। আপনার কথায় আমি একেবারেই অবাক হইনি। আগে আমি ভূত প্রেতে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু এখন করি। না করে তো উপায় নেই। বাস্তবকে তো আর অস্বীকার করা যায় না।"
ভদ্রলোক এত স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন কেন? সব! তিনিও কি ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন?
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত প্রায় একটা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সমীরণবাবু আমাকে বসিয়ে রেখে আবার পাশের ঘরে চলে গেলেন। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখলাম। ঘরটা পরিপাটি করে গোছানো। টেবিলের ওপর দু-তিনটে ডায়রি পড়ে আছে। আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে ডায়রিগুলো দেখতে লাগলাম। সম্ভবত বই প্রকাশের জন্য ডায়রিতে লিখে সব গুছিয়ে রেখেছেন। একটায় লেখা, "নীলাম্বর ঠাকুরের আশ্রম বৃত্তান্ত।" আগ্রহের সাথে আমি পাতা উল্টে যেতে লাগলাম। এক-দুই করে দশ অধ্যায়। দশম অধ্যায় হচ্ছে মৃত্যু রহস্য। এটাই আমার জানা দরকার। মাত্র আটটি পাতা। কিন্তু পড়তে পড়তে আমার সারা শরীর থর থর করে কাঁপতে শুরু করেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন বনের বাঘের হাতে এসে পড়েছি।
সমীরণবাবু ডায়রিতে অকপটে লিখেছেন তার সব অপকর্মের কথা। আখড়ার বর্তমান সেবাইত মদনঠাকুরের সাথে মিলে এই এস্টেটের সব সম্পত্তি নিজেরা ভাগ করার লোভে প্রতিদিন তিনি নীলাম্বর ঠাকুরকে সিডেটিভ দিতেন। নীলাম্বর ঠাকুরের ঝিমুনিকে তারা পরমাত্মার সাথে মিলনের জন্য ধ্যানস্থ হওয়া বলতেন। উলুধ্বনি শঙ্খনাদ আর ভক্তদের কীর্তনের আওয়াজে রোজ রাতেই চাপা পড়তো নীলাম্বর ঠাকুরের বাঁচার আকুতি। মদনঠাকুরের নির্দেশে একটু একটু করে বাড়াতেন নেশার ডোজ। এভাবেই একদিন অত্যধিক সিডেটিভে যখন নীলাম্বর ঠাকুর সংজ্ঞাহীন, তখন প্রাণ থাকতেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করলেন ডাঃ সমীরণ দত্ত। তড়িঘড়ি সামান্য কিছু আখড়ার আবাসিকের উপস্থিতিতে সমাধিস্থ করা হলো তাঁকে।
কিন্তু তারপর? আর কিছু লিখেননি সমীরণবাবু। দুটো খালি পাতা ছেড়ে শেষ পাতায় লিখেছেন, "সমাপ্ত।" আরও কি কিছু লেখার বাকি?
"হ্যাঁ বাকি।" আমার পেছন থেকে ভারী গলায় কে যেন বলল কথাটা। আঁতকে উঠলাম আওয়াজটা পেয়ে। আতঙ্কে বিস্ময়ে চোখ ঘুরিয়ে দেখি সমীরণবাবু আমার পেছনে দাঁড়িয়ে! সেই ঠিকড়ে বেরিয়ে আসা চোখ। থলথলে মুখ। সারা শরীর যেন বিষে নীল।
কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, "আ-আ, আপনি কি একটু আগে আমাকে জলে ডুবিয়ে..."
"হ্যাঁ, আমিই রে।"
"ক্কী ক্কী... কিন্তু কেন!"
"তুই তোর বাপের মৃত্যু রহস্য খোঁজতে এসেছিস, তাই না?"
"না, মানে আমি..."
"তাহলে শোন, 'আমি তোর বাপকেও মেরেছি। কারণ তোর বাপ নীলাম্বর ঠাকুরের মৃত্যু রহস্য জেনে গিয়েছিল। কিন্তু তোর বাপকে মারার সময় আমি জীবিত ছিলাম, এখন আমি মৃত। মদনঠাকুর আমাকে ঠকিয়েছে। সব কাজ আমাকে দিয়ে করিয়ে আমাকেই গলা টিপে মেরে ফেলেছে। মুখে বালিশ চাপা দিয়ে এখানেই, এই বিছানায়, যেখানে তুই বসে আছিস। দেখ, বালিশটা এখনো কুঁচকে আছে।"
অবাক বিস্ময় দেখলাম বিছানাটা এলোমেলো! বালিশটা ছেঁড়া। ভেতরের তুলো সব বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
সমীরণবাবু বললেন, "তোর বাপের মরার কথাটা লিখে বইটা শেষ করবো ভেবেছিলাম। কিন্তু তার আগেই ওই ক্রিমিনাল মদনটা আমাকে মেরে ফেলেছে। তাই আর লিখতে পারিনি। রোজ চেষ্টা করছি। পারছি না। তবে আমি লিখবই। পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মরা মানুষের লেখা বই ছাপবে।"
বলে সমীরণবাবু পাগলের মতো ছুটে গিয়ে একটা কলম নিয়ে এলেন। একটানে ডায়রিটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কিছু লেখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। সমীরণবাবুর দিকে এখন আর তাকানো যাচ্ছে না। ধীরে ধীরে এক বীভৎস রূপ নিচ্ছেন তিনি। হাতে তার এক চিমটি মাংসও এখন অবশিষ্ট নেই। সমস্ত হাড় বেরিয়ে এসেছে। ফ্যালাঞ্জ থেকে কলম ফস্কে যাচ্ছে। বিকট শব্দে চিৎকার করছেন সমীরণবাবু। তার চিৎকারে ঘরটা প্রায় ফেটে যাচ্ছে।
সমীরণবাবুর এই অন্যমনস্কতার সুযোগে আমি এক দৌড়ে উঠোনে চলে এলাম। তারপর শুধু প্রাণের ভয়ে দৌড়েই গেলাম। চিতা আর হরিণের দৌড়। কতক্ষণ, কতদূর দৌড়েছি মনে নেই। ছুটতে ছুটতে কখন জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম তাও মনে নেই।
সকালে যখন চোখ মেললাম তখন আমি রেলস্টেশনে, স্টেশন মাস্টারের রুমে। আমাকে চোখ মেলতে দেখে ভদ্রলোক শুধু বললেন, "গ্রামের দুজন লোক স্টেশনের পাশে আপনাকে পড়ে থাকতে দেখে এখানে এনে রেখে গেছে। একটু পরেই কামরূপ ডাউন আসছে। চোখে-মুখে জল দিয়ে একটু গরম চা খেয়ে নিন।








Comments