রবিবারের অনন্যা ১১ই জানুয়ারি, ২০২৬ সংখ্যা ১৫১ সূর্যের উত্তরায়ণ এবং দেশজুড়ে উৎসব, একডজন পিঠেপুলি, শীতকালীন ট্রেন্ডে ডিটক্স ড্রিঙ্ক, রবিবারের গল্প: ভালোবাসা ও পাউরুটি
- রোজকার অনন্যা

- Jan 10
- 20 min read

সূর্যের উত্তরায়ণ এবং দেশজুড়ে উৎসব
১৪ জানুয়ারি শনিবার সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশ করবে। এই দিন থেকেই সূর্যের উত্তরায়ন শুরু হয়। সূর্যের উত্তরমুখী যাত্রাকে বলা হয় উত্তরায়ন এবং দক্ষিণমুখী যাত্রাকে বলা হয় দক্ষিণায়ন। বছরে ছয় মাস সূর্য উত্তরায়নে থাকে এবং পরবর্তী ছয় মাস দক্ষিণায়নে অবস্থান করে। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মর্ত্যের এক বছর স্বর্গে এক দিনের সমান। সেই হিসেবে দক্ষিণায়ন হলো দেবতাদের রাত এই সময় দেবতারা নিদ্রাবিভূত থাকেন। আর উত্তরায়ন হলো দেবতাদের দিন, যখন তাঁরা জাগ্রত অবস্থায় থাকেন। এই কারণেই হিন্দুধর্মে উত্তরায়নকে অত্যন্ত শুভ সময় হিসেবে গণ্য করা হয়। মহাভারতেও উত্তরায়নের তাৎপর্যের উল্লেখ রয়েছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে শরশয্যায় শায়িত অবস্থায় ভীষ্ম পিতামহ উত্তরায়নের প্রতীক্ষা করেছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, উত্তরায়নে মৃত্যু হলে আত্মা জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি লাভ করে। তাই স্বেচ্ছামৃত্যুর বরপ্রাপ্ত ভীষ্ম পিতামহ সূর্য মকর রাশিতে প্রবেশ করার পর, অর্থাৎ মকর সংক্রান্তির দিনেই প্রাণত্যাগ করেন। সূর্যের মকর রাশি থেকে মিথুন রাশি পর্যন্ত অবস্থানকালকে উত্তরায়ন এবং কর্কট রাশি থেকে ধনু রাশি পর্যন্ত অবস্থানকালকে দক্ষিণায়ন বলা হয়।
‘অয়ন’ শব্দের অর্থ গমন। সূর্য যখন পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের দিকে হেলে পড়ে, তখন উত্তরায়ন ঘটে এবং দক্ষিণ গোলার্ধের দিকে হেলে পড়লে দক্ষিণায়ন হয়। সূর্যের এই অবস্থান পরিবর্তনের উপরই পৃথিবীর ঋতু পরিবর্তন নির্ভরশীল। জ্যোতিষ অনুসারে সূর্য এক একটি রাশিতে এক মাস করে অবস্থান করে এবং বছরে বারোটি রাশি পরিক্রমা করে। এই বারো মাসের মধ্যে ছয় মাস উত্তরায়ন ও ছয় মাস দক্ষিণায়ন হয়। সূর্য উত্তরায়ণে থাকাকালীন শীত, বসন্ত ও গ্রীষ্ম এই তিনটি ঋতু আসে; আর দক্ষিণায়নে বর্ষা, শরৎ ও হেমন্ত ঋতু উপস্থিত হয়। বৈদিক যুগে উত্তরায়নকে বলা হতো ‘দেবায়ন’ এবং দক্ষিণায়নকে বলা হতো ‘পিত্রায়ন’। মকর সংক্রান্তির পর থেকে মাঘ মাসকে সব শুভ কাজের জন্য বিশেষ উপযোগী সময় হিসেবে ধরা হয়। যদিও সূর্য প্রতি মাসেই রাশি পরিবর্তন করে, তবুও জ্যোতিষশাস্ত্রে সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই দিন সূর্য নিজের পুত্র শনির রাশিতে গোচর করেন। মকর রাশির অধিপতি শনি। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে স্নান সেরে সূর্যোপাসনা করলে সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি লাভ করা যায়।
পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি বা উত্তরায়ণ হলো ভারতীয় উপমহাদেশে উদযাপিত একটি মধ্য-শীতকালীন ফসল উৎসব। এটি বাংলা পৌষ মাসের শেষ দিন এবং গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী সাধারণত ১৪ জানুয়ারি (অধিবর্ষে ১৫ জানুয়ারি) পালিত হয়। এই দিন সূর্যের রাশিচক্রে ধনু থেকে মকর রাশিতে প্রবেশকে চিহ্নিত করা হয়। যেহেতু এই পরিবর্তন সূর্যের দক্ষিণ থেকে উত্তরমুখী যাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এই উৎসব সূর্যদেবকে উৎসর্গীকৃত এবং নতুন শুরুর প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মকর সংক্রান্তি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় ‘সংক্রান্তি’ বা ‘পেড্ডা পণ্ডুগা’, অসমে ‘মাঘ বিহু’, তামিলনাড়ুতে ‘পোঙ্গল’, পাঞ্জাবে ‘মাঘি’, গুজরাট ও উত্তর প্রদেশে ‘উত্তরায়ণ’, বিহারে ‘দই চিড়া’, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গে ‘মকর সংক্রান্তি’ বা বাংলায় ‘পৌষ সংক্রান্তি’ নামে এটি উদযাপিত হয়। নেপালে একে বলা হয় ‘মাঘে সংক্রান্তি’, আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতেও বিভিন্ন নামে এই উৎসব পালিত হয়।
বাংলায় এই দিন পিঠে-পুলি খাওয়া, ঘুড়ি ওড়ানো, ফানুস ও পটকা ফাটানোর মাধ্যমে উৎসব উদযাপন করা হয়। সারা ভারতজুড়ে সূর্যদেব, বিষ্ণু ও লক্ষ্মী দেবীর পূজা করা হয়। সামাজিক উৎসব হিসেবে মেলা, নৃত্য, গান, আলোর উৎসব ও ভোজের আয়োজন হয়। অনেক স্থানে শিশুরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান গেয়ে মিষ্টি বা উপহার সংগ্রহ করে।
মকর সংক্রান্তির সঙ্গে কুম্ভ মেলার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। প্রতি বারো বছর অন্তর এই উপলক্ষে কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যা বিশ্বের বৃহত্তম তীর্থযাত্রাগুলির একটি। লক্ষ লক্ষ ভক্ত গঙ্গা, যমুনা ও সরস্বতীর সঙ্গমস্থল প্রয়াগরাজে পবিত্র স্নান করেন। এই স্নান পাপক্ষয় ও পুণ্যার্জনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

এই উৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। কৃষি চক্রের একটি পর্যায় শেষ হওয়ায় মানুষ প্রকৃতির কাছে কৃতজ্ঞতা জানায়। তিল ও গুড় দিয়ে তৈরি মিষ্টান্ন শান্তি ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে খাওয়া হয়। গুজরাটে ঘুড়ি ওড়ানো এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। মকর সংক্রান্তি সৌরচক্র অনুযায়ী নির্ধারিত হয় এবং সূর্যের মকর রাশিতে প্রবেশের নির্দিষ্ট জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এটি সাধারণত ১৪ জানুয়ারি পড়ে, তবে অধিবর্ষে ১৫ জানুয়ারি হয়। ভবিষ্যতে অধিবর্ষের হিসাব অনুযায়ী তারিখ আরও পরিবর্তিত হবে। উদাহরণস্বরূপ, ২১০২ সালে প্রথমবার মকর সংক্রান্তি ১৬ জানুয়ারি পড়বে, কারণ ২১০০ সাল অধিবর্ষ নয়।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের দিক থেকে মকর সংক্রান্তি ও উত্তরায়ণ এক নয়। উত্তরায়ণ শুরু হয় ২১ ডিসেম্বর শীতকালীন অয়নের দিন, আর মকর সংক্রান্তি ঘটে সূর্যের নাক্ষত্রিক মকর রাশিতে প্রবেশের সময়। প্রায় ১৭০০ বছর আগে, ২৯১ খ্রিস্টাব্দে এই দুই ঘটনা একই দিনে ঘটেছিল। বর্তমানে পৃথিবীর অক্ষের পূর্বগমনের কারণে এই দুটি ঘটনা ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে গেছে।
মকর সংক্রান্তি মূলতঃ সর্বভারতীয় সৌর উৎসব, যা অঞ্চলভেদে নানা রীতি, নাম ও সংস্কৃতিতে উদযাপিত হয়। এই দিন সূর্যদেবের উপাসনা বিশেষ গুরুত্ব পায়। বহু মানুষ গঙ্গাসাগরের মতো পবিত্র তীর্থে গিয়ে স্নান করেন এবং সূর্যদেবের কাছে কৃতজ্ঞতা নিবেদন করেন। ভারতের দক্ষিণাঞ্চলে এই উৎসব আনন্দ-উৎসবের রূপ নেয় অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা ও কর্ণাটকে এটি ‘সংক্রান্তি’, তামিলনাড়ুতে ‘পোঙ্গল’ এবং পাঞ্জাবে ‘লোহরি’ নামে পরিচিত।
মেলা ও তীর্থকেন্দ্রের নানা উৎসব :
মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় মেলার আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো কুম্ভমেলা, যা প্রতি বারো বছরে চারটি পবিত্র স্থানে, হরিদ্বার, প্রয়াগরাজ, উজ্জয়িনী ও নাসিকে অনুষ্ঠিত হয়। প্রয়াগরাজে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত মাঘ মেলা বা ছোট কুম্ভ মেলাও এই সময়ে বিশেষ গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গাসাগর মেলা, যেখানে গঙ্গা নদী বঙ্গোপসাগরে মিশেছে, লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগমে এক মহোৎসবে পরিণত হয়। ওডিশায় পালিত হয় মকর মেলা এবং ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত হয় তুসু মেলা বা তুসু পরব। পাঞ্জাবের মুক্তসার সাহিবে প্রতিবছর মাঘি মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যা চল্লিশ শিখ শহীদের স্মরণে পালিত হয়।
অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় চার দিনের সংক্রান্তি :
অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় সংক্রান্তি চার দিন ধরে উদযাপিত হয়। তেলুগু নারীরা বাড়ির প্রবেশপথে রঙিন চালের গুঁড়ো দিয়ে মুগ্গু নামে জ্যামিতিক নকশা আঁকেন।
দিন ১ : বোগি - পুরোনো ও অপ্রয়োজনীয় সামগ্রী আগুনে পুড়িয়ে নতুনের সূচনা করা হয়। সন্ধ্যায় ‘ভোগি পল্লু’ অনুষ্ঠানে ফল, ফুল ও কয়েন শিশুদের উপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
দিন ২ : পেদ্দা - পান্ডুগা বা সংক্রান্তি- সূর্যদেবের উদ্দেশে প্রধান উৎসব। ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি আরিসেলু নিবেদন করা হয়।
দিন ৩ : কানুমা - গবাদি পশু ও গৃহপালিত প্রাণীদের পূজা করা হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে শুরু হয় কড়ি পাণ্ডেম নামের ঐতিহ্যবাহী খেলা।
দিন ৪ : মুক্কানুমা - পারিবারিক পুনর্মিলন ও সামাজিক আনন্দের দিন।

অসমে মাঘ বিহু :
অসমে মকর সংক্রান্তি পালিত হয় মাঘ বিহু বা ভোগালী বিহু নামে। এটি ফসল তোলার সমাপ্তির উৎসব। ‘উরুকা’ রাতে মানুষ অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে জড়ো হয়ে ভোজ ও আনন্দে মেতে ওঠে। পরদিন ভোরে ‘মেজি’ জ্বালিয়ে অগ্নিদেবের কাছে আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়। শুঙা পিঠা, তিল পিঠা, নারকেল লাড্ডু, এই উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও লোকাচার এই উৎসবকে আরও রঙিন করে তোলে।
কেরালায় মকর সংক্রান্তি :
কেরালায় এই উৎসব সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি নামে পরিচিত। সাবরিমালায় মকরবিলাক্কু প্রজ্বলনের মাধ্যমে দেবতার মহিমা প্রকাশ করা হয়, যা ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র।
উত্তরাখণ্ডে উত্তরায়ণী :
উত্তরাখণ্ডে মকর সংক্রান্তি ‘উত্তরায়ণী’ নামে বিশেষভাবে পরিচিত। কুমাউঁ অঞ্চলের বাগেশ্বরে জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত উত্তরায়ণী মেলা রাজ্যের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় মেলা। পুণ্যার্থীরা সরযূ ও গোমতী নদীর সঙ্গমে স্নান করে বাগনাথ মন্দিরে শিবের উদ্দেশে জল নিবেদন করেন। এই দিনে খিচুড়ি দান, পাখিদের পিঠে খাওয়ানো এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি।
পশ্চিমবঙ্গে পৌষ সংক্রান্তি :
পশ্চিমবঙ্গে মকর সংক্রান্তি পরিচিত ‘পৌষ সংক্রান্তি’ নামে। বাংলা মাস পৌষের শেষ দিনে এই উৎসব পালিত হয়। নতুন ধান ও খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি পায়েস, পাটিসাপটা, দুধপুলি, পুলি পিঠে এই দিনের প্রধান আকর্ষণ। তিন দিনব্যাপী এই উৎসবে সমাজের সব স্তরের মানুষ অংশ নেন। সংক্রান্তির দিনে সাধারণত দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। দার্জিলিং পাহাড়ে এটি ‘মাঘে সংক্রান্তি’ নামে পরিচিত এবং শিবপূজার সঙ্গে যুক্ত। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগরদ্বীপে কপিল মুনির আশ্রমকে কেন্দ্র করে গঙ্গাসাগর মেলা এই উৎসবের অন্যতম বৃহৎ তীর্থসমাগম।
আউনি বাউনি :
পশ্চিমবঙ্গে পৌষ সংক্রান্তির সঙ্গে যুক্ত একটি প্রাচীন কৃষিজ আচার হলো ‘আউনি বাউনি’। নতুন ধানের শিষ দিয়ে তৈরি এই প্রতীক ধানের গোলা ও ঘরের বিভিন্ন স্থানে স্থাপন করা হয়। প্রথম ফসলকে পবিত্র ও সৌভাগ্যদায়ক মনে করে সারা বছরের জন্য সংরক্ষণ করা হয় এতেই প্রতিফলিত হয় কৃষিজীবনের সঙ্গে উৎসবের গভীর যোগ।
সব মিলিয়ে, মকর সংক্রান্তি ভারতের ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের মধ্যেও এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন। সূর্য, ফসল, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনের আনন্দ এই চার উপাদানের মিলনেই এই উৎসব যুগে যুগে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

একডজন পিঠে-পুলি
মকর সংক্রান্তি মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে পিঠে-পুলির উৎসব। নতুন চাল, খেজুর গুড় আর নারকেলের মিষ্টি ঘ্রাণে এই সময়টা যেন আলাদা করে চেনা যায়। শীতের সকালে উনুনের পাশে বসে হাতে হাতে পিঠে বানানোর আনন্দ, পরিবারের সবাইকে ঘিরে থাকা সেই উষ্ণ মুহূর্ত এ সবই মকর সংক্রান্তির আবহকে সম্পূর্ণ করে। গ্রাম থেকে শহর, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এই পিঠে-সংস্কৃতি শুধু খাবার নয়, বাঙালির স্মৃতি, আবেগ আর উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই রান্না সংকলনে আমরা তুলে ধরছি মকর সংক্রান্তির জন্য বাছাই করা এক ডজন ঐতিহ্যবাহী ও জনপ্রিয় পিঠে-পুলির রেসিপি। গুড়ের মালপোয়া থেকে শুরু করে নারকেল-গুড় ভরা পুলি, ভাপা পিঠে, চিতই, পাটিসাপটা, প্রতিটি রেসিপির মধ্যেই লুকিয়ে আছে শীতের মিঠে স্বাদ আর ঘরোয়া উষ্ণতা। সহজ উপকরণে, ঘরোয়া কায়দায় কীভাবে এই পিঠেগুলো বানানো যায়, তারই বিস্তারিত নির্দেশ থাকছে এই সংকলনে।
নতুন প্রজন্মের জন্য যেমন এই পিঠে-পুলি হবে ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়ের এক পথ, তেমনই অভিজ্ঞ রাঁধুনিদের কাছে এটি হবে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসার সুযোগ। মকর সংক্রান্তির দিনে প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য, কিংবা শুধুই বাঙালির শীতের স্বাদ উপভোগ করতে, এই এক ডজন পিঠে-পুলির সংকলন রইল আপনাদের জন্য।
নকশি পিঠা :
নাজিয়া ফারহানা

কী কী লাগবে
চালের গুঁড়ো ৪ কাপ, জল ৩ কাপ, নুন সামান্য,
ঘি ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Sunflower তেল ভাজার জন্য।
সিরার জন্য:
গুড় ১ কাপ, চিনি ১ কাপ, জল ২ কাপ
কীভাবে বানাবেন
সব উপকরণ একসঙ্গে জ্বাল দিয়ে সিরা তৈরি করে নিন। জলের সঙ্গে লবণ ও ঘি মিশিয়ে আঁচে বসান। ফুটে উঠলে তাতে চালের গুঁড়ো মিশিয়ে সেদ্ধ করুন। পিঠার ডো নামিয়ে ঠান্ডা করে ভালোভাবে মথে নিন। এবার আধা ইঞ্চি পুরু করে রুটি বানিয়ে পছন্দমতো আকার দিয়ে কেটে নিন। খেজুর কাঁটা দিয়ে রুটিতে পছন্দমতো নকশা করুন। এরপর ডুবো তেলে ভেজে নিন। কিছুক্ষণ পর আবার তেলে ভেজে সিরায় দিয়ে ১ মিনিট রেখে তুলে নিন। এই পিঠা কয়েকদিন সংরক্ষণ করেও খাওয়া যায়।

পানপাতা পিঠা
নাজিয়া ফারহানা

কী কী লাগবে
নারকেল, চিনি, আটা/ময়দা, Shalimar's Sunflower তেল, পিঠা তৈরীর ছাঁচ।
কীভাবে বানাবেন
প্রথমে কোরানো নারিকেল চিনির সাথে মিক্স করে কড়াইয়ে ভেজে নিন। ময়দা আর তেল একসাথে দিয়ে আগে শুকনো মেখে নিন তারপর জল দিয়ে ময়ান তৈরী করুন। রুটি বেলে ভিতর নারকেল পুর দিয়ে পান পাতার মতো আকার করে পিঠা তৈরী করুন। ডুবো তেলে ছেড়ে দিন পিঠা, সোনালী করে ভেজে নিলেই তৈরী পানপাতা পিঠা।

মুগ ডালের নকশি পিঠা
নাজিয়া ফারহানা

কী কী লাগবে
চালের গুঁড়ো ১ কাপ, মুগ ডাল আধ কাপ, দুধ ১ কাপ, জল ১ কাপ, ঘি অথবা Shalimar's Soyabean তেল ২ টেবিল চামচ
সিরার জন্য:
চিনি ১.৫ কাপ, জল ১.৫ কাপ, ছোট এলাচ ২টি
কীভাবে বানাবেন
সিরার উপকরণ একসঙ্গে জ্বাল দিয়ে রাখুন। কড়াইতে ১ চামচ ঘি দিয়ে মুগডাল ভেজে দুধ ও জল মিশিয়ে সেদ্ধ করে বেটে নিন। এবার এই মিশ্রণটি কড়াইতে ঢেলে ওর মধ্যে নুন, ঘি, চালের গুঁড়ো দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে ডো মতো হলে নামিয়ে ঠাণ্ডা করুন। ঘি দিয়ে মেখে নিন। লেচি কেটে একটু মোটা করে বেলে পছন্দ মতো ডিজাইন করে সোনালী করে ভেজে সিরাতে ভিজিয়ে তুলে নিলেই তৈরী।
ফুল পিঠা
নাজিয়া ফারহানা

কী কী লাগবে
চালের গুঁড়ো ২ কাপ, লবণ ১ চা চামচ, Shalimar's Sunflower তেল ৬ কাপ, মুগ বা মাসকলাই ডাল ১ কাপ, ময়দা ২ কাপ, গরম জল ৩ কাপ, জর্দার রং ১/২ চা চামচ, চিনি ১/২ কাপ
কীভাবে বানাবেন
মাসকলাই বা মুগডাল সারা রাত জলে ভিজিয়ে রেখে নরম হলে পাটাতে পিষে নিতে হবে। এবার উনুনে হাড়িতে জল গরম করতে হবে। ফুটে উঠলে তাতে একে একে ময়দা, চালের গুঁড়ো ও ডাল বাটা দিয়ে সিদ্ধ করে নিন। ঠান্ডা হলে জর্দার রং দিয়ে ভালো করে মেখে নিন। এবার মেখে নেওয়া ময়দার ডো মোটা করে রুটি বেলে একটি গোল ছাঁচের সাহায্যে কেটে নিন। এবার কাটা চামচ ও টুথপিকের সাহায্যে মনের মতো নকশা করুন। তেল গরম করে একটি একটি করে পিঠা ভেজে তুলুন। গরম অবস্থায় উপরে চিনি ছিটিয়ে পরিবেশন করুন।

তালের ঝিনুক পিঠা
নাজিয়া ফারহানা

কী কী লাগবে
চালের গুঁড়ো ১ কাপ, তালের গোলা ১ কাপ, জল আধ কাপ, Shalimar's Soyabean তেল ভাজার জন্য আধ কাপ, চিনি ১ কাপ, জল ১ কাপ
কীভাবে বানাবেন
তালের গোলা জল মিশিয়ে জ্বাল দিতে হবে। ফুটে উঠলে চালের গোলা দিতে হবে। কাই করে নিয়ে পরিমাণমতো গোলা নিয়ে হাতের তালুতে ডলে লম্বা করে প্লাস্টিকের ঝুড়িতে চেপে দাগ বসিয়ে নিয়ে মচমচে করে তেলে ভাজতে হবে। চিনি ও জল জ্বাল দিয়ে সিরা করে পিঠাগুলো তেল থেকে তুলে সিরায় দিলেই তৈরী।
গাজরের পাটিসাপটা
সুস্মিতা মিত্র

কী কী লাগবে
গাজর গ্রেট করা ১ কাপ, নারকোল কোরা ১/২ কাপ, খোয়া ২০০ গ্রাম, ১/২ কাপ চিনি, কাজুবাদাম, কিশমিশ, ময়দা ৫০০ গ্রাম, দুধ ১/২ কেজি, Shalimar's Sunflower তেল পরিমাণমত
কীভাবে বানাবেন
কড়ায় ১ চামচ তেল দিয়ে হাল্কা আঁচে গাজর কোরা, নারকোল কোরা, চিনি ও খোয়া দিয়ে নাড়াচাড়া করুন। এর মধ্যে কাজুবাদাম ও কিশমিশ দিয়ে আরও একটু ভালো করে নাড়াচাড়া করুন, কড়া থেকে পুর ছেড়ে এলে নামিয়ে নিন। ময়দাতে ১ চামচ তেল ময়ান দিয়ে খানিকটা দুধ ঢেলে গোলা তৈরী করুন, যেন না খুব ঘন না খুব পাতলা হয়। নন-স্টিক তাওয়ায় অল্প তেল ছড়িয়ে ১ হাতা গোলা দিয়ে তাওয়া ঘুরিয়ে গোলাকার করে দিন।
এর একধারে খানিকটা পুর ছড়িয়ে মুড়ে নিন। উল্টেপাল্টে ভেজে নিলেই পাটিসাপটা তৈরী।

রাঙ্গালুর দুধপুলি
সুস্মিতা মিত্র

কী কী লাগবে
মিষ্টি আলু ১/২ কিলোগ্রাম,
নারকেল ১ টি, চিনি ৫০০ গ্রাম, আতপ চালের গুঁড়ো ১/২ কাপ, ছোট এলাচ ৫-৬ টি, দুধ ২ লিটার, খোয়া ২০০ গ্রাম
কীভাবে বানাবেন
মিষ্টি আলুর খোসা ছাড়িয়ে সেদ্ধ করে ভালভাবে চটকে নিন। এতে আতপ চালের গুঁড়ো মেশান। বুঝে মেশাবেন। খুব বেশী দিলে রস ঢুকবে না। ভালভাবে মেখে নিন। নারকেল কুরিয়ে তাতে ২০০ গ্রাম চিনি মিশিয়ে কড়াইয়ে পাক দিন। খুব কড়া পাকের প্ৰয়োজন নেই। এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে নামান। মাখানো আলু থেকে ছোট ছোট লেচি কাটুন। হাতের সাহায্যে চ্যাপ্টা করে মাঝে পুর রাখুন। আঙুলের সাহায্যে চেপে মুখ বন্ধ করুন। পুলির আকার দিন। সবগুলো একরকম ভাবে তৈরি করুন। দুধ ফুটিয়ে ঘন করে খোয়া, চিনি আর পুলি গুলো সাবধানে ছেড়ে অল্প আঁচে কিছু সময় রেখে নামান।

চকো হৃদয়হরণ পিঠে
সুস্মিতা মিত্র

উপকরণ
ময়দা ২ কাপ, নুন স্বাদমতো,
চিনি ১ কাপ, চকলেট সস, Shalimar's Sunflower তেল পরিমাণমত
কীভাবে বানাবেন
প্রথমে প্যানে চিনি, সামান্য নুন, অল্প চকলেট সস ও জল জ্বাল দিয়ে ঘন সিরা তৈরি করে নিন। এবার ময়দায় ময়ান আর পরিমাণমতো জল দিয়ে একটি মণ্ড তৈরি করে নিন। এই মণ্ড থেকে লেচি কেটে বেলে নিন। ভাজ করে পান পাতার আকৃতিতে পিঠে গুলো বানিয়ে নিন। এবার ডুবো তেলে ভেজে চিনির সিরায় কিছুক্ষণ ডুবিয়ে রাখুন। সিরা থেকে তুলে ওপর থেকে চকলেট সস ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

নতুনগুড়ের রসবড়া
সুস্মিতা মিত্র

কী কী লাগবে
১ কাপ বিউলির ডাল, নতুন গুড় ২০০ গ্রাম, বেকিং সোডা সামান্য, গোটা মৌরি সামান্য, নুন ১/৪ চামচ,
৩ টি এলাচ থেঁতো করা, ভাজার জন্য Shalimar's Sunflower তেল
কীভাবে বানাবেন
বিউলির ডাল সারারাত ভিজিয়ে সকালে খুব ভালো ভাবে বেটে নিতে হবে। যতোটা পারা যায় কম জল দিয়ে ডাল বাটতে হবে।
এরপর ওই বাটা ডালের মধ্যে থেঁতো করা এলাচ, গোটা মৌরি, বেকিং সোডা আর সামান্য নুন দিয়ে খুব ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। যতো ভালোভাবে ডাল বাটা ফেটানো হবে, বড়া তত নরম হবে। রস বানানোর জন্য নতুন গুড়, ২ কাপ জল আর এলাচ দিয়ে ফুটতে দিন। এবার ডাল বাটার মিশ্রণ থেকে অল্প অল্প নিয়ে ডুবো তেলে ছোট ছোট বড়া লালচে করে ভেজে তুলে নিন। রসে ভিজিয়ে ১ ঘন্টা মত রেখে পরিবেশন করুন।
আপেলের মালপোয়া
সুস্মিতা মিত্র

কী কী লাগবে
১ কাপ খোয়া ক্ষীর, ১ কাপ গ্রেট করা আপেল, ২ কাপ ময়দা, ১/৪ চা চামচ বেকিং সোডা, ২ চা চামচ মৌরি, ১/৪ চা চামচ ছোট এলাচ গুঁড়ো, নুন আন্দাজ মতো, ৩ কাপ দুধ, ভাজার জন্য Shalimar's Sunflower তেল
কীভাবে বানাবেন
একটা বড়ো বাটিতে খোয়া আর ময়দার সঙ্গে কোরানো আপেল, মৌরি, নুন, এলাচগুঁড়ো মিশিয়ে নিন।
তার পর অল্প অল্প করে দুধ মিশিয়ে মসৃণ ব্যাটার তৈরি করে নিন। কড়ায় তেল গরম করে এক হাতা গোলা নিয়ে তেলে দিন। মিনিটখানেক ভাজা হওয়ার পর ধারের দিকটা শক্ত হয়ে আসবে, তখন এক চামচ তেল মাঝের রান্না না হওয়া অংশের উপর ছড়িয়ে দিন।
এবার উলটে দিয়ে অন্য পিঠটাও সোনালি করে ভেজে তুলে নিন।

ড্রাইফ্রুটস এর চন্দ্রপুলি
সুস্মিতা মিত্র

কী কী লাগবে
নারকেল কোরা ১ কাপ
কাজুবাদাম, কিশমিশ, আমন্ড, পেস্তা কুচি ১ কাপ, চিনি ১৫০ গ্রাম, ময়দা ৫০০ গ্রাম, দুধ ৫০০ গ্রাম, Shalimar's Sunflower তেল পরিমান মত
কীভাবে বানাবেন
কোরানো নারকেলের সঙ্গে দুধ আর চিনি জ্বাল দিয়ে হালুয়ার মত করে পুর বানিয়ে নিন। এর সাথে কুচোনো ড্রাইফ্রুটস মিশিয়ে রাখুন। ময়দা ময়ান দিয়ে মেখে লেচি কেটে পাতলা করে বেলে পুর ভরে চন্দ্রপুলি গুলো গড়ে অল্প আঁচে ডুবো তেলে ভেজে তুলুন।

সরু চাকলি
সুস্মিতা মিত্র

কী কী লাগবে
গোবিন্দ ভোগ চাল ২ কাপ, বিউলির ডাল ১ কাপ, মৌরি বাটা ১ চা চামচ, নুন স্বাদ মতো, ভাজার জন্য পরিমাণ মতো ঘি বা Shalimar's Soyabean তেল।
কীভাবে বানাবেন
চাল ও ডাল ভিজিয়ে রেখে মিহি করে বেটে নিন। মৌরিবাটা ও নুন মিশিয়ে একসাথে ফেটিয়ে পরিমাণ মতো জল দিয়ে মিশ্রন বানিয়ে নিন। ননস্টিক প্যানে ঘি অথবা সাদা তেল ব্রাশ করে একহাতা করে মিশ্রন ছড়িয়ে অল্প আঁচে ভাজুন। বেশী ভাজবেন না। নলেন গুড়ের সাথে পরিবেশন করুন।

শীতকালীন ট্রেন্ডে ডিটক্স ড্রিংক
শীতকাল মানেই উৎসব, পার্বণ, ভারী খাবার আর একটু বেশি আরামপ্রিয় জীবনযাপন। পিঠে পুলি, নলেন গুড়, ঘি-ভাজা নানা পদ, সঙ্গে কম শারীরিক পরিশ্রম এই সব মিলিয়ে শীতকালে শরীরে টক্সিন জমার প্রবণতা বেড়ে যায়। তার ওপর ঠান্ডার কারণে জলপানের পরিমাণও অনেক সময় কমে যায়। ফলস্বরূপ হজমের গোলমাল, ত্বকের শুষ্কতা, ওজন বৃদ্ধি, ক্লান্তি কিংবা ইমিউনিটি কমে যাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা দেয়। ঠিক এই কারণেই সাম্প্রতিক কয়েক বছরে শীতকালীন লাইফস্টাইল ট্রেন্ডে জোরালোভাবে উঠে এসেছে ডিটক্স ড্রিংক। এক সময় ডিটক্স মানেই ছিল শুধুই গ্রীষ্মকাল লেবু জল, শসা, পুদিনা বা ঠান্ডা স্মুদি। কিন্তু এখন ধারণা বদলেছে। পুষ্টিবিদ ও আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতকালের জন্য আলাদা ডিটক্স পদ্ধতি প্রয়োজন, যেখানে উষ্ণ পানীয়, মশলা ও ঋতুভিত্তিক উপকরণই সবচেয়ে কার্যকর।
ডিটক্স কী এবং কেন জরুরি?
ডিটক্স মানে শরীর থেকে ক্ষতিকারক বর্জ্য বা টক্সিন বের করে দেওয়া। আমাদের লিভার, কিডনি, ত্বক ও অন্ত্র স্বাভাবিকভাবেই এই কাজ করে। তবে অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত জল না খাওয়া, অতিরিক্ত চিনি ও চর্বি গ্রহণ, মানসিক চাপ এবং ঘুমের অভাব শরীরের এই স্বাভাবিক ডিটক্স প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। ডিটক্স ড্রিংক আসলে শরীরকে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। এগুলি,
হজমশক্তি বাড়ায়, লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা উন্নত করে,
অন্ত্র পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে, ত্বক ও চুলের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, শীতকালে যখন বিপাক ক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীর হয়ে যায়, তখন সঠিক ডিটক্স পানীয় শরীরকে ভেতর থেকে সক্রিয় রাখতে পারে।
শীতকালীন ডিটক্স ড্রিংকের বিশেষত্ব :
শীতের ডিটক্স ড্রিংক গ্রীষ্মের মতো ঠান্ডা নয়। বরং এগুলি সাধারণত হালকা গরম বা উষ্ণ, যাতে শরীর ঠান্ডা না হয় এবং রক্তসঞ্চালন ভালো থাকে। আদা, দারচিনি, হলুদ, জিরে, গোলমরিচ, তুলসি এই সব উপাদান শীতকালীন ডিটক্সের মূল ভরকেন্দ্র। এই পানীয়গুলির আরেকটি বড় সুবিধা হলো এগুলি সহজলভ্য, ঘরে তৈরি করা যায় এবং কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই দীর্ঘদিন গ্রহণ করা সম্ভব।

শীতে জনপ্রিয় কিছু ডিটক্স ড্রিংক :
১.আদা-লেবু-গরম জল
শীতকালীন ডিটক্সের সবচেয়ে পরিচিত ও কার্যকর পানীয়। আদা হজমশক্তি বাড়ায়, লেবু লিভার পরিষ্কার করতে সাহায্য করে এবং গরম জল অন্ত্রকে সক্রিয় রাখে। সকালে খালি পেটে এই পানীয় শরীরকে সারাদিনের জন্য প্রস্তুত করে।
২.হলুদ দুধ (গোল্ডেন মিল্ক)
শুধু ডিটক্স নয়, শীতকালের সুপার ড্রিংক বলা যায় হলুদ দুধকে। হলুদের কারকিউমিন উপাদান প্রদাহ কমায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীরের ভেতরের টক্সিন দূর করতে সাহায্য করে।
৩.জিরে জল
রাতে ভিজিয়ে রাখা জিরে ফুটিয়ে সকালে পান করলে হজম ভালো হয়, গ্যাস ও ফোলাভাব কমে। যারা শীতে ওজন বাড়ার সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের জন্য এটি অত্যন্ত উপকারী।
৪.দারচিনি-তেজপাতা চা
এই ড্রিংক রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং শরীরের অতিরিক্ত জলধারণ কমাতে সাহায্য করে। ঠান্ডাজনিত অলসতা কাটাতেও এটি কার্যকর।
৫.তুলসি-আদা হার্বাল চা
তুলসি শীতকালীন সর্দি-কাশির বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আদার সঙ্গে মিশে এটি একটি শক্তিশালী ডিটক্স ও ইমিউনিটি বুস্টার হিসেবে কাজ করে।

আয়ুর্বেদ ও শীতকালীন ডিটক্স :
আয়ুর্বেদ মতে শীতকাল বা হেমন্ত-শিশির ঋতুতে শরীরে কফ দোষ বৃদ্ধি পায়। তাই এই সময়ে এমন পানীয় গ্রহণ করা উচিত যা কফ কমায় এবং অগ্নি বা হজমশক্তি বাড়ায়। উষ্ণ জল, মশলাযুক্ত পানীয় এবং তিক্ত বা কষা স্বাদের উপাদান এই সময়ে বেশি উপযোগী। আয়ুর্বেদিক ডিটক্স ড্রিংক কেবল শরীর নয়, মনকেও হালকা রাখে। কারণ আয়ুর্বেদে ডিটক্স মানে শুধুই শারীরিক পরিশুদ্ধি নয়, মানসিক ভারসাম্যও। ডিটক্স ড্রিংক ও ত্বকের যত্ন, শীতকালে ত্বকের শুষ্কতা একটি বড় সমস্যা। শুধু বাহ্যিক ময়েশ্চারাইজার নয়, ভেতর থেকে ত্বক আর্দ্র রাখার জন্য ডিটক্স ড্রিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পর্যাপ্ত জল, সঙ্গে ভিটামিন সি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ পানীয় ত্বককে উজ্জ্বল ও স্বাস্থ্যবান রাখে। লেবু, আমলকি, আদা, মধু এই উপাদানগুলি ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে এবং ব্রণ বা নিস্তেজ ভাব কমায়।
শীতকালীন ডিটক্সে কিছু সতর্কতা :
ডিটক্স ড্রিংক উপকারী হলেও কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। খুব বেশি উপবাস বা চরম ডিটক্স করা উচিত নয়, গর্ভবতী মহিলা বা দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন, ডিটক্সের নামে শুধুই তরল খাদ্যে সীমাবদ্ধ থাকা শরীরের ক্ষতি করতে পারে, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের সঙ্গে, ডিটক্স পানীয় গ্রহণ করাই, সবচেয়ে নিরাপদ।

আধুনিক জীবনধারা ও ডিটক্সের প্রয়োজনীয়তা :
আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়শই নিজের শরীরের সংকেত উপেক্ষা করি। শীতকালে অলসতা, ক্লান্তি বা মনখারাপকে আমরা আবহাওয়ার দোষ দিয়ে এড়িয়ে যাই। অথচ সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ডিটক্স রুটিন এই সমস্যাগুলি অনেকটাই কমাতে পারে। ডিটক্স ড্রিংক কোনও জাদুকাঠি নয়, তবে এটি সুস্থ জীবনযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে বিশেষ করে শীতকালে।
শীতকাল মানেই শুধু আরাম আর ভারী খাবার নয়, এটি শরীরকে নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ারও আদর্শ সময়। শীতকালীন ডিটক্স ড্রিংক সেই প্রক্রিয়ায় এক নীরব কিন্তু কার্যকর সঙ্গী। সহজ উপকরণ, ঘরে তৈরি রেসিপি এবং নিয়মিত অভ্যাস এই তিনের সমন্বয়েই ডিটক্স ড্রিংক হয়ে উঠতে পারে সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি। ফ্যাশনের মতোই আজ ডিটক্সও একটি ট্রেন্ড। তবে এই ট্রেন্ড যদি সচেতনতা ও জ্ঞানের সঙ্গে অনুসরণ করা যায়, তাহলে তা কেবল শরীর নয়, মনকেও দেবে স্বচ্ছতা ও প্রশান্তি। শীতের সকালে এক কাপ উষ্ণ ডিটক্স ড্রিংক দিয়ে দিন শুরু করাই হতে পারে নিজের প্রতি যত্ন নেওয়ার সবচেয়ে সহজ ও সুন্দর উপায়।

ভালোবাসা ও পাউরুটি
জন অগস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ
ভাষান্তর: সুজাতা পান্থী সরকার
গুস্তফ ফক ও লুসি পরস্পরকে গভীরভাবে ভালবাসে...।
সহকারী কাউন্সিলর গুস্তফ ফক লুসির বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিতেই লুসির বাবার প্রথম প্রশ্ন: 'তোমার মাসিক উপার্জন কত?'
'মাসিক এক শিলিং দেড় পেন্স। কিন্তু লুসি...'
'লুসির কথা ছেড়ে দাও। তোমার আয় তো তেমন নয়...।'
কিন্তু লুসি ও আমি দু'জনেই দু'জনকে খুব ভালোবাসি। আর আমরা দু'জনেই এটা জানি...।
'তেমনই তো হওয়া উচিত। তাহলে তোমাদের বার্ষিক আয় বারোশো। আচ্ছা, কিভাবে তোমাদের আলাপ হল?'
'লিডিঙ্গাতে পরিচয় হয়।'
'সরকারি চাকরির মাইনে ছাড়া অন্য কোনও রোজগার আছে তোমার?'
'কোন অসুবিধে নেই। ওই টাকাতেই আমাদের স্বচ্ছন্দে চলে যাবে। আমরা দু'জনেই দু'জনকে খুব ভালোবাসি।'
'ঠিক কথা। তবুও তোমার রোজগারের ব্যাপারটা তো আমার জানা দরকার।'
'আমি অন্য ধরনের কাজও করেও সংসার চালাতে পারি।'
'কি ধরনের কাজ? তাতে কত টাকা পাবে বলে মনে কর?'
'আমি ফরাসি ভাষা ভালো জানি। ফরাসি ভাষা শেখাতে পারি। ফরাসি থেকে অনুবাদ করতে পারি। সঙ্গে কিছু

প্রুফ দেখার কাজ...
'অনুবাদ...! তাতে কত রোজগার হবে?'
'এটা সঠিক বলতে পারছি না। তবে এখন আমি একটা ফরাসি বই অনুবাদ করছি। তাতে প্রতি পাতার জন্য দশ থেকে এগারো শিলিং পাচ্ছি।'
'কত পাতা আছে বইটাতে?'
'কয়েক ডজন।'
'ভালো কথা। তবে আড়াইশো তিনশো চাইবে। এরকম অনুবাদের কাজ ভবিষ্যতে আর পাবে?'
'জানি না। কিছুটা অনিশ্চিত।'
'নিশ্চিত না হয়ে এক্ষুনি বিয়ে করতে চাইছ কেন? তোমাদের মতো তরুণদের বিয়ের ধারণাটা বড় অদ্ভুত। আরে, বুঝতে পারছ না কেন, ভবিষ্যতে তোমাদের ছেলেমেয়ে হবে...। তাদের খাওয়াতে পরাতে হবে...। তখন কি করে সংসার চলবে?'
মাথা নেড়ে প্রবল আপত্তি জানালো ফক:
'আমাদের অত তাড়াতাড়ি সন্তান নাও আসতে পারে। আমরা পরস্পরকে খুব ভালোবাসি।'
'ছেলেমেয়ে যে হবে সেটা তো জানা কথা...। একটা জিনিস বুঝতে পারছি, তোমরা দু'জনই দু'জনকে খুব ভালোবাস এবং বিয়ে করবে বলে একেবারে ঠিক করে ফেলেছ। অতএব আমি আর কী করি! মত তো দিতেই হবে। তবে আমার পরামর্শ আগে রোজগার বাড়ানোর চেষ্টা করো... তার পরে বিয়ে।'
এ কথা শুনে উল্লসিত হয়ে লুসির বাবার হাতে একটা চুমু দিল গুস্তভ। দু'জনের আনন্দ আর ধরে না। লুসির বাবা যখন মত দিয়েছেন তাহলে আর ভাবনা কি...। এই প্রথম তারা হাত ধরে একসঙ্গে বেড়াতে বের হল। তাদের উজ্জ্বল, আনন্দিত মুখদুটো পথচারীদের অনেকেরই চোখে পড়ল।
সন্ধেবেলা গুস্তভ লুসিদের বাড়িতে যখন এল, সঙ্গে করে নিয়ে এল সেই সময় যে-প্রুফটি সে দেখছিল সেই কাগজটি। লুসির বাবা সেটা দেখলেন। দেখে খুশি হলেন।
একদিন সন্ধ্যায় গাড়ি ভাড়া করে তারা থিয়েটার দেখতে গেল। সেই বাবদ খরচ হল দশ শিলিং। পরের কয়েকটি সন্ধ্যায় লুসিদের বাড়িতে আসবার জন্য সে বাড়তি কোনও কাজ করতে পারল না...।

ইতিমধ্যে বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেছে...।
তারা তাদের ফ্ল্যাট সাজানোর জন্য একসঙ্গে কেনাকাটা করতে বের হল। তারা কিনল দুটো ভালো খাট। তোশক, নরম লেপ। এছাড়াও একটা ঢাকনা দেওয়া ল্যাম্প। ভেনিসের একটা ছোট মূর্তি। কাঁটা-চামচ, খাবার টেবিল ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশ্য রান্নাঘরের বাসনপত্রগুলো লুসি মায়ের সঙ্গে পরামর্শ করেই কিনল।
এদিকে ঘর ভাড়া করা, লোক দিয়ে ঘর পরিষ্কার করানো, আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো ইত্যাদি কারণে ব্যস্ত থাকায় এই কয়েকটা দিনে তার কোনও বাড়তি রোজগার হয়নি...।
ভাবল একবার বিয়েটা হয়ে গেলে ওরা নিজেরা মানিয়ে-গুছিয়ে নেবে। আর তারা তো ঠিকই করেছে বিয়ের পর বেশি খরচ করবে না।
প্রথমে অবশ্য ঠিক ছিল একটা বাড়ির সবচেয়ে উপরের তলায় তিনটে ঘর নেবে। কিন্তু সেটা আর সম্ভব হয়ে উঠল না। তাই একটা বাড়ির একতলাতেই ফ্ল্যাট নিল। সেখানে আছে দুটো ঘর, রান্নাঘর আর সবজি, মাংস রাখার জন্য একটা ঠান্ডা আলমারি।
শেষে ঘরগুলো সব সাজানো হয়ে গেল...।
শোয়ার ঘরে পাশাপাশি দুটো খাট। তাতে পরিপাটি করে বিছানা পাতা। ধবধবে সাদা চাদর, তার ওপর নীল লেপ।। সুচের কাজ করা সুন্দর বালিশের ঢাকনা। দেখে মনে হচ্ছে, জীবনের পথে চলার জন্য দুটো রথ যেন তৈরি হয়ে আছে।
দু'জনেই ঠিক করেছে পাশের ঘরটা ব্যবহার করা হবে বসার ঘর, খাওয়ার ঘর ও পড়ার ঘর হিসেবে। সেখানে রাখা আছে লুসির জন্য একটা সুন্দর লেসের ঢাকনা দেওয়া দামি পিয়ানো। খাওয়ার টেবিলের পাশেই পড়ার টেবিল। একটা বইয়ের আলমারিও আছে ঘরে। আর রাখা একটি সোফা ও বড় আয়না।
বিয়েটা হল শনিবার রাতে...।
পরেরদিন অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমলো দু'জনে। গুস্তফেরই ঘুম ভাঙলো আগে। বাইরে তখন ঝকঝকে দিনের আলো। কিন্তু জানলা না খুলে লাল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিল গুস্তভ। সেই আলো থেকে গোলাপি আভা ছড়িয়ে পড়ল ভেনাসের মূর্তিটার উপর। একটা অপরূপ দৃশ্যের অবতরণা হল ঘরের মধ্যে।
লুসি তখনও ঘুমোচ্ছে বিছানায়। ঘুমটা ভালোই হয়েছে। রবিবার তাই রাস্তায় গাড়ি বেশি নেই। বাজারের দিকে যাওয়া ওয়াগনগুলোর ঘড়ঘড় আওয়াজ অন্যদিনের তুলনায় অনেক কম। চার্চের ঘণ্টা বাজছে।
এবার লুসি ঘুম থেকে উঠছে।
লুসিকে চমকে দিতে হবে। গুস্তফ রান্নাঘরে এল লাঞ্চের ব্যাবস্থা করতে। সদ্য কেনা বাসনপত্রগুলো ঝকঝক করছে। এসব দেখে খুব ভালো লাগছে গুস্তফের...। এখানে যা কিছু আছে, সব তার। স-ব...।
আজ আর বাড়ির রান্না নয়। বাইরের দোকানে লাঞ্চ বলা আছে। তাদের রাঁধুনিকে পাঠালো সেগুলো নিয়ে আসবার জন্য।
গুস্তফ এবার গিয়ে তাদের শোয়ার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বলল:
'আসতে পারি?'
'একটু দাঁড়াও, সোনা।'
ততক্ষণে গুস্তফ নিজেই টেবিল সাজাতে লাগল। টেবিলের ওপর লিনেলের কাপড় পেতে, তার ওপর রাখল প্লেট, কাঁটা, চামচ, ছুরি...।

এসব করতে করতেই লাঞ্চ এসে গেল। লুসিকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। গুস্তফ তাই তাকে বসিয়ে দিল একটা আর্মচেয়ারে।
বিয়ের আগে এরকম লাঞ্চ গুস্তফ কয়েকবার খেয়েছে। কিন্তু এমন তৃপ্তি সে আগে কখনও পায়নি। তার মনে হল, সত্যিই অবিবাহিত যুবকগুলো যে কেন তাড়াতাড়ি বিয়ে করে না, কে জানে! এদিকে লুসিও এরকমই ভাবছে। বিয়ে করে কেউ যদি সংসার চালাতে পারে,তাহলে সে কেন বিয়ে করবে না?
অবশ্য খরচপত্রের কথা ভেবে গুস্তফ বুকের মধ্যে একটা চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল ঠিকই। কিন্তু নিজেকে সান্ত্বনা দিল এই ভেবে, রোজ রোজ তো এমন খরচ হবে না। তাছাড়া বাড়তি কাজ তো সে পেয়েই যাবে...।
এত ভালো ভালো খাবার, বিলাসবহুল আসবাবপত্র, দামি মদ... এসব দেখে লুসি কিন্তু একটু ভয় পেয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল: 'আচ্ছা, আমাদের পরের দিনগুলো এরকম ভাবেই আমরা কাটাতে পারব?'
তাকে আশ্বস্ত করার জন্য তার গ্লাসে মদ ঢেলে দিয়ে গুস্তফ বলল:
'চিন্তা কোরো না সোনামণি। বিয়ের পর প্রথম প্রথম এমন খরচ হয়। তবে সাধ্যমতো জীবনকে উপভোগ করতেও তো হয়। রোজ তো আর এমন হবে না।'
সেদিন সন্ধেবেলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল দুটো ঘোড়াওলা একটা সাজানো জুড়ি গাড়ি। গাড়িটা ধীরে ধীরে পার্কের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে। সিটের ওপরে মাথা এলিয়ে আরাম করে বসে রইল লুসি।
পথ চলতি চেনা জানা মানুষেরা বিস্ময়ে তাদের দেখছে। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, গুস্তভ খুব ভাগ্যবান। একজন ধনীর মেয়েকে বিয়ে করেছে।
প্রথম মাসটা কেটে গেল... পার্টি, থিয়েটার, দামি হোটেলে ডিনার, বল ডান্স... হইহুল্লোড়ের মধ্যে দিয়ে। তবে যতক্ষণ তারা ফ্ল্যাটে থাকত সেই সময়টাই ছিল সবথেকে বেশি আনন্দের। সুখী দম্পতির এটাই তো লক্ষণ। লুসিকে নিয়ে বেড়িয়ে এসে রাতে খাওয়ার পর অনেকক্ষণ ধরে গল্প করত দু'জনে।
গুস্তফ খুব চেষ্টা করত কম খরচ করতে কিন্তু মাঝেমাঝে লুসিকে খুশি করার জন্য কিছু দামি জিনিস তো কিনতেই হত।
কিছুদিন যেতে না যেতেই খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল লুসি। ডাক্তার ডাকতে হল। ওষুধ, পথ্য, চিকিৎসা- সবকিছু নিয়ে বেশ মুশকিলে পড়ল গুস্তফ। তবে বেশ তাড়াতাড়ি মাসখানেকের মধ্যেই সেরে উঠল লুসি।
এই সময়ই লুসির গর্ভে এলো তাদের সন্তান...।

বিয়ের পর থেকে একটা পয়সাও বাড়তি রোজগার হয়নি...। শুধু চাকরির মাইনেটুকুই সম্বল। কিন্তু লুসির জন্য এখন অনেক খরচ। অনেক টাকার দরকার। কী যে করবে গুস্তফ ভেবে পায় না!
গুস্তভ একদিন তার ব্যারিস্টার বন্ধুর কাছে গেল যদি কিছু ধার পাওয়া যায়। কিন্তু বন্ধুটি কড়া ভাষাতেই বলল: 'তুই বিয়ে করে বাজে খরচ করবি...। ফুর্তিতে টাকা ওড়াবি...। আর আমি তোকে টাকা দেব...। হবে না। '
খালি হাতে ফিরে এলো সে। লজ্জায়, কুণ্ঠায় আর কাউকে টাকা ধার দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে পারল না।
এদিকে লুসির চিন্তা বাড়ছে। সে উৎকণ্ঠায় জিঞ্জেস করে: 'আচ্ছা, এবার আমাদের কিভাবে চলবে?'
গুস্তফ তাকে বলে, 'কিচ্ছু ভেবো না। আমি বাড়তি কিছু রোজগারের ব্যবস্থা ক'দিনের মধ্যেই করে ফেলব।'
'কিন্তু আমাদের এখনকার ধারদেনা... সেগুলোর কি হবে...?
'চিন্তা কোরো না সোনা। একটা বড় ঋণ নিয়ে স-ব শোধ করে দেবো...।'
লুসি তো অথৈ জলে। কি যে হবে। আবার নতুন করে ঋণ নেওয়ার ব্যাপারে তার একেবারে সায় নেই।
কিন্তু গুস্তফের কোনও হেলদোল নেই। মেজাজ ভালো করার জন্য সে বাড়ির পরিচারিকাকে বাইরে দোকানে পাঠালো এক বোতল শেরি আনতে...।
সেদিন বিকেলে দিবানিদ্রা থেকে উঠে লুসি তার স্বামীকে বলল :
'রাগ করো না, লক্ষ্মীটি। তোমার মনে আছে তো মুদিখানায় আমাদের ধার রয়েছে। মাংসের দোকানের কসাই রাগ করছে। টাকার জন্য ভয় দেখাচ্ছে। গাড়ির কোচোয়ানরা ভাড়ার টাকা চাইছে...।'
গুস্তফ বলল: 'ঠিক আছে। কাল সকালে সবার পাইপয়সা ধার মিটিয়ে দেব।
এখন চলো তো, পার্কে বেড়িয়ে আসি। কিসে করে যাবে? গাড়ি ডাকব না ট্রামে করে যাবে ?'
তারা পার্কে বেড়িয়ে এল। সেইসঙ্গে রাতের খাওয়াটাও সেরে এল আলহামব্রা হোটেলে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, তারা প্রেমিক-প্রেমিকা যুগল। ভবিষ্যতের স্বপ্নে বিভোর। বিবাহিত দম্পতি নয়। বিল দেখে লুসির মুখ ভার... তার কেবলই মনে হচ্ছিল এর থেকে অনেক কম টাকায় বাড়িতে রান্না করে খেলে হত...। এর চেয়ে যথেষ্ট ভালো খাবার খাওয়া যেত।
এভাবেই কেটে গেল মাসের পর মাস...।
লুসির প্রসবের সময় এসে গেল। খরচ আরও বেশি ... দোলনা চাই... শিশুর পোশাকআসাক চাই। সর্দি বা জ্বর হলে ডাক্তার,ওষুধ আরও কত কী!
এদিকে গুস্তাফের হাতে কোনও টাকা নেই। একটা বাড়তি কাজও করতে পারেনি ইদানীং...।
পাওনাদাররা আর তাদের টাকা ফেলে রাখতে চায় না। মুদির দোকান ধার দেয় না। ভাড়াগাড়ির লোক নিয়মিত তাগাদা দেয়। তাদেরও তো ঘরসংসার আছে...।
কেউ টাকা ধার দেয় না...।
অবশেষে সেই দিনটা এসে গেল। তাদের কন্যা সন্তান পৃথিবীর আলো দেখল।
এদিকে গুস্তফের চোখে সর্ষেফুল। এক্ষুনি বাচ্চাকে দেখার জন্য নার্স চাই। নতুন দায়িত্ব পাথরের মতো চেপে বসেছে তার বুকে।
সেই বা কী করে! সারাক্ষণ ঘরের কাজে ব্যস্ত থাকলে কাজ খুঁজবে কখন? কিছু অনুবাদের কাজ অবশ্য পেল। কিন্তু কখন করবে?
এমন অবস্থায় একমাত্র ভরসা তখন শ্বশুর। অনেক দ্বিধা করে শেষপর্যন্ত তাঁরই দারস্থ হল গুস্তফ।
তিনি তো তাকে দেখে রেগে অগ্নিশর্মা। বললেন:
'দেখো বাপু, শুধু এইবারের মতো সাহায্য করছি। আর কখনওই নয়। তাছাড়া লুসি তো আমার একমাত্র সন্তান নয়।'
যাইহোক, এই ধাক্কাটা তো সামলানো গেল। লুসির জন্য এখন রোজ মুরগির স্যুপ আর ভালো মদ চাই।
ধীরে ধীরে লুসি সেরে উঠতে লাগল। তার ছিপছিপে চেহারায় আবার ফিরে এল লাবণ্য।
লুসির বাবা কিন্ত রীতিমতো ধমক দিয়ে জামাইকে বললেন :
খবরদার, আর যেন এখন বাচ্চা-কাচ্চা না হয়। তাহলে কিন্তু সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে। কথাটা মনে রেখো...।'
একদিকে নিবিষ্ট প্রেম অন্যদিকে ঋণের পর ঋণ... এর ওপর ভিত্তি করেই গুস্তফ ফক পরিবারের দিনগুলো কেটে যেতে লাগল। কিন্তু এইভাবে বেশদিন চলল না। দেউলিয়া হয়ে গেল তারা। অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক হয়ে যাবার উপক্রম।
সব শুনে লুসির বাবা এসে মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে গেলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে তাদের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল গুস্তফ ফক। তার মনে হল, লুসির বাবা যেন এক বছরের জন্য মেয়েকে ধার দিয়েছিলেন। সেটা শেষ হতেই তাকে নিয়ে চলে গেলেন।
লুসিই বা কী করে! লুসির আর দোষ কী! সে তো এই ভয়ংকর অবস্থার মধ্যে একটা বছর কাটিয়েছে। ঘরে খাবার নেই। পাওনাদাররা সবসময় এসে তাগাদা দিচ্ছে। বাচ্চার দুধ নেই...।
গুস্তফ রয়ে গেল একা...।
লুসিরা চলে যেতেই পিছন ফিরে সে দেখল, দাঁড়িয়ে আছে কোর্টের পেয়াদারা। তাদের হাতে ছড়ি। তারা বাড়ির সব আসবাবপত্র, খাওয়ার টেবিল, খাট-বিছানা, বাসনপত্র যা কিছু ছিল সব নিয়ে গেল।
এবার শুরু হল গুস্তফের টিকে থাকার সংগ্রাম। কোনওরকমে প্রুফরিডারের কাজটা বজায় রইল। সকালবেলায় সে একটা দৈনিক সংবাদপত্রের অফিসে কাজ করত। রাতেও কয়েক ঘণ্টা ধরে অফিসের কাজ করতে হত। সরকারিভাবে তাকে যেহেতু দেউলিয়া ঘোষণা করা হয়নি, তাই কোনওক্রমে সরকারি দফতরের সহকারী কাউন্সিলরের পদটা তার রয়ে গেল ।
লুসির বাবা রবিবার কিছুক্ষণের জন্য তার স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে অনুমতি দিলেন। কিন্তু তাদের কাছে তাকে একা কখনও থাকতে দেওয়া হত না। যখন দেখা করে সে বাড়ি চলে আসত তখন দরজা পর্যন্ত তাকে পৌঁছে দেওয়া হত।
দুঃসহ অপমানের বোঝা নিয়ে প্রতিদিন সে ফিরে আসত নিজের ডেরায়। হিসাব করে সে দেখেছে, তার সব ঋণ শোধ করতে কুড়ি বছর সময় লাগবে। কিন্তু তারপর! তখনও কি সে তার পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে পারবে?
ইতিমধ্যে লুসির বাবা যদি মারা যান, তবে লুসি আর বাপের বাড়িতে থাকতে পারবে না। মেয়েকে নিয়ে চলে আসতে হবে তার কাছেই।
এইজন্যই শ্বশুর নামের মানুষটি যতই খারাপ, নির্মম ব্যবহার করুক তার সঙ্গে সে কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে।
আজকাল গুস্তফ বুঝতে পারছে, শুধু লুসির বাবা নয়... মানুষের জীবনটাই বড়ো কঠিন... নিষ্ঠুর...।
লেখক পরিচিতি:
জন অগস্ট স্ট্রিন্ডবার্গ
(২২ জানুয়ারি-১৪মে ১৯১২)
স্টকহোম নিবাসী এই সুইডিশ লেখক তাঁর চার দশকব্যাপী লেখকজীবনে রচনা করেছেন বহু ছোট গল্প, কবিতা, ষাটটির বেশি নাটক, তিরিশের বেশি কল্পকাহিনি, জীবনী, ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণমূলক প্রবন্ধ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা। তাঁকে বলা হয়, আধুনিক সুইডিশ সাহিত্যের জনক। ১৯৭৯ সালে তাঁর রচিত 'দ্য বেডরুম ' উপন্যাসটিকে প্রথম আধুনিক সুইডিশ উপন্যাস বলে অভিহিত করা হয়।








Comments