আপনার শিশুকে গরমে আরামে রাখুন, রাজকীয় নিরামিষ, গরমে শিশুর ত্বকের যত্ন জরুরি, রবিবারের গল্প: না বলা কথা
- রোজকার অনন্যা

- 13 minutes ago
- 21 min read

আপনার শিশুকে গরমে আরামে রাখুন
'দারুণ অগ্নি বাণে রে'-- অসহ্য গরমে এল নিনো, বিশ্ব উষ্ণায়ন, দূষণ অনেক শব্দই উঠে আসছে। কিন্তু তাতে তো আর সূর্যের প্রখর তাপকে বশে আনা যাবে না। অস্বস্তিকর গরম আর তাপপ্রবাহর কবলে নাকাল শিশু থেকে সিনিয়র সিটিজেন সকলেই। গরমে অতিষ্ঠ হলেও স্কুল, টিউশন, ড্রইং ক্লাস বা ক্যারাটে কিছুই তো বাদ দেওয়া যায় না। ভয়ানক গরমে শিশুদের সুস্থ রাখতে কী করবেন কী করবেন না বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে লিখলেন সুমা বন্দ্যোপাধ্যায়।
ভোটের গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সূর্যের চোখ রাঙানি বাড়ছে। গাছপালা থেকে প্রাণীজগৎ সকলেই নাজেহাল। সাধারণ মানুষ তো বটেই, আবহাওয়া দফতরও বৃষ্টির পূর্বাভাষের জন্য উন্মুখ। কিন্তু রুষ্ট প্রকৃতি নারাজ। গুমোট গরমে প্যাচপ্যাচে ঘাম অস্বস্তি বাড়াচ্ছে। কারওর খাবার হজম হতে অসুবিধে হচ্ছে, কেউ ঘামাচিতে নাজেহাল, অনেকে আবার মাথা ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। গরমে আবার সর্দি-কাশি, জ্বর-পেটব্যথার সমস্যাও বাড়ছে।

প্রবল গরমে বাচ্চাদের বাইরে নিয়ে যাবেন না
গরমে কমবেশি সকলেরই কিছু না কিছু কষ্ট হয়। তবে সবথেকে বেশি সমস্যা হতে পারে পাঁচ বছরের কম বয়সি বাচ্চাদের। এই বয়সের শিশুদের দুপুরে বাইরে নিয়ে যেতে মানা করলেন ইনস্টিটিউট অফ চাইন্ড হেলথের অধিকর্তা শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার অপূর্ব ঘোষ।
বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য মাসে গরম হবেই এ আর নতুন কথা কী! কিন্তু অতিরিক্ত রোদ্দুর আর শুকনো গরমে বাচ্চাদের নানারকম শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে ভর দুপুরে ঠা ঠা রোদ্দুরে শিশুদের বাইরে নিয়ে গেলে ভয়ানক অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভবনা বেড়ে যায়। এই সময়ে বেশিরভাগ স্কুলে গরমের ছুটি পড়ে যাওয়ার কথা। তবুও নানান কারণে বাচ্চাদের বাইরে নিয়ে যেতে হয়। মর্নিং স্কুল সাতসকালে শুরু হলেও বাড়ি ফেরার সময় তীব্র রোদ থাকে। আমার মতে এই সময় বাচ্চাদের স্কুলে না-পাঠানোই ভাল। প্রচণ্ড গরমে বাচ্চাদের একদিকে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়ায় শরীরে জলের অভাব হতে পারে। সবমিলিয়ে শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়ে। এছাড়া গরমের সময় পেটের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বাইরের জল ও খাবার একেবারেই দেওয়া উচিত নয়। টাটকা ফল বা বাড়িতে বানানো টাটকা ফলের রস দিলেই ভাল। বাড়িতে রান্না করা হালকা ও টাটকা খাবার দেওয়াই ভাল। ছয় মাসের কম বয়সি শিশুদের এই গরমে বিশেষ যত্নের প্রয়োজন। জরুরি কারণ ছাড়া এদের বাড়ি থেকে বের করা অনুচিত। তবে টিকা দেওয়ার ব্যাপারে কোনওরকম গড়মসি করা ঠিক নয়। রোদ কমলে বিকেলে বা সন্ধের দিকে দুগ্ধপোষ্য শিশুদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে পারেন। ছ'মাসের কম বয়সি বাচ্চাদের মায়ের দুধ ছাড়া অন্য খাবার এমনকী জল দেওয়ারও দরকার হয় না। বাচ্চাকে চাপাচুপি দিয়ে রাখবেন না। খোলা জায়গায় পাখার নীচে রাখতে হবে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে রাখতে পারেন। তবে তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রির কম যেন না থাকে সেই দিকে খেয়াল রাখতে হবে। ৩/৪ বছরের বাচ্চারা সারাদিনই দৌড়দৌড়ি করে খেলতে চায়। খেয়াল রাখতে হবে ছাদে, বারান্দায় বা খোলা জায়গায় রোদ্দুরের মধ্যে যেন ছোটাছুটি না করে। সরাসরি রোদ্দুরে গিয়ে সঙ্গেসঙ্গে ঠান্ডা ঘরে ঢোকা কিংবা ঠান্ডা ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা রোদ্দুরে যাওয়ার ব্যাপারে নিয়ম মেনে চলা উচিত। এক্ষেত্রে চট করে শরীর খারাপ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। যেসব বাচ্চা টিউশন পড়তে যায়, গান, নাচ বা আঁকার স্কুল, ক্যারাটে ক্লাশ করতে যায় তাদের বাবা-মায়ের কাছে অনুরোধ রোদ কমলে এক্সট্রা ক্যারিক্যুলার অ্যাক্টিভিটির ক্লাসে যেন নিয়ে যান। ক্যারাটে, না বা অন্যান্য খেলাধুলো প্রচণ্ড গরমে স্থগিত রাখলে ভাল হয়। বাচ্চার শারীরিক অবস্থা বিচার করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গরমে দৌড়দৌড়ি করে খেলতে গিয়ে বাচ্চারা যদি প্রচণ্ড ঘেমে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে সেক্ষেত্রে ঘামে ভেজা পোশাক খুলিয়ে হাওয়ায় বসান। নুন-চিনির শরবত বা ওআরএস-এর জল খাওয়াতে হবে।

সকাল ১১টার পর সরাসরি রোদ্দুরে যাওয়া ঠিক নয়। ছাতা ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত জল ও শরবত পান করে বাইরে গেলে ভাল হয়। এই সময় কিছু জীবাণু সক্রিয় হয়ে ওঠে। পেটের সমস্যা, টাইফয়েড, ভাইরাল ফিভার, ঠান্ডা লেগে জ্বর-সর্দি গলাব্যথা হতে পারে। বৃষ্টিতে ভিজে গিয়ে যেমন ঠান্ডা লাগে তেমনই ঘাম বসেও ঠাণ্ডা লাগতে পারে। তাই এই ব্যাপারটাও খেয়াল রাখতে হবে। গরমে ভয়ানক বিপদে পড়তে হয় পার্কিং করা গাড়ির মধ্যে বসে থাকলে। এর থেকে মারাত্মক বিপদের ঝুঁকি থাকে। রোদ্দুরে গাড়ি পার্ক করে রাখলে ১০ মিনিটের মধ্যেই গাড়ির মধ্যেই গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা বেড়ে যায় প্রায় ২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট। বাচ্চাদের পার্কিং করা গাড়িতে রেখে কেনাকাটি করতে যাবেন না।
এর ফলে, প্রবল গরমে বাচ্চাটি বেহুঁশ হয়ে যেতে পারে। সুতরাং এই ব্যাপারটা একেবারেই ভুলবেন না। এছাড়াও আরও একটা ব্যাপার মনে রাখবেন যে রোদে না থাকলেও ঘরে দরজা জানলা বন্ধ করে রাখলে বদ্ধ ঘরের বাতাস গরম হয়ে গিয়েও বাচ্চারা অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। ঘরের মধ্যে যেন বাতাস চলাচল করতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখা উচিত। গরমকে বশে রেখে বাচ্চাদের ভাল রাখুন।

গরমে বাচ্চাদের দিনে দু'বার স্নান করান
গরমের ছুটি এগিয়ে আসায় কিছুটা স্বস্তি পেলেও দাবদাহ থেকে রেহাই নেই। গরমে হজমের গোলমাল, ডায়রিয়া থেকে শুরু করে জ্বর, ঘামাচি-সহ নানান শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। আপনার শিশুকে ভাল রাখতে কী কী ব্যবস্থা নেবেন পরামর্শ দিলেন উডল্যান্ডস হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শান্তনু রায়।
এই বছর গরমের সবথেকে বড় অসুবিধে হিট ওয়েভ বা তাপপ্রবাহ। আগুন গরম শুকনো বাতাসের ঝাপটা লেগে একদিকে শরীরে জলের অভাব হচ্ছে, অন্যদিকে গরমের সঙ্গে সমঝোতা করতে গিয়ে শরীরে স্ট্রেস হরমোনের পরিমাণ বাড়ছে। এর ফলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কিছুটা কমজোরি হয়ে পড়ছে। ফলে, বিভিন্ন জীবাণুরা বাচ্চাদের সহজেই আক্রমণ করছে। ভাইরাল জ্বর, সর্দি-কাশি, হজমের অসুবিধে, ডায়রিয়ার মতো জীবাণুঘটিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। গরমকে মোকাবিলা করার সবথেকে ভাল উপায় শরীর ঠান্ডা রাখা। অন্যান্য শারীরিক অসুবিধে না-থাকলে গরমকালে দু' থেকে তিন বার স্নান করলে গরমের কষ্ট অনেক কম হয়। গরমে শরীর অস্থির অস্থির লাগলে চোখেমুখে ঠান্ডা জলের ঝাপটা দিতে হবে। সম্ভব হলে স্নান করে নিতে পারলে ভাল হয়। দুপুরের রোদ্দুরে না-বেরনোর চেষ্টা করবেন। জেনে রাখুন, দুপুর দুটো পর্যন্ত তাপমাত্রা সব থেকে বেশি থাকে।

এই সময় বাইরে গেলে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। খুব কষ্ট হয়। তাই চেষ্টা করবেন দুপুর বারোটা থেকে দুপুর তিনটের মধ্যে বাচ্চা যেন ঠান্ডা ঘরে থাকে। এই সময়ে বাচ্চাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে জল ও জলীয় খাবার খেতে দিন। যেসব বাচ্চার ক্রনিক কিডনির অসুখ বা জন্মগত হার্টের সমস্যা আছে, তাদের জল খেতে হয় মাপ অনুযায়ী। গরমে বেশি জল পান করা যায় কিনা তা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জেনে নিন। কষ্ট হলে অবশ্যই চিকিৎসককে অসুবিধের কথা জানান। এই সময়ে বাচ্চার জ্বর, সর্দি, কাশি বা পেটের অসুখ হলেই যে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়াতে হবে তা কিন্তু নয়। বাড়িতে টাটকা রান্না করা হালকা খাবার, প্রচুর জল, ওআরএস, শরবত খাওয়াতে হবে। জ্বর বাড়লে শিশুর বয়স ও ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল দেওয়া যায়। ইনফ্লুয়েঞ্জায় সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে কোনও কাজ হয় না। পেটের সমস্যা হোক বা জ্বর দুই ক্ষেত্রেই ডি হাইড্রেশনের আশঙ্কা থাকে। তাই বাচ্চার শরীরে যাতে জলের অভাব না হয় সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। অনেক শিশু আছে যারা বোতল বন্দি কোলা বা এই জাতীয় ঠান্ডা পানীয় খুব পছন্দ করে, খাবার জন্যে বায়না ধরে। জেনে রাখুন, বোতল বন্দি ঠান্ডা পানীয় একদিকে এম্পটি ক্যালোরি, অর্থাৎ এর পুষ্টি মূল্য শূন্য। অন্যদিকে নরম পানীয় সাময়িকভাবে তেষ্টা মেটালেও আদতে এটি শরীরে জলের ঘাটতি তৈরি করে। টিউশন, ক্যারাটে ক্লাস বা অন্য কারণে বাইরে যেতে হলে সঙ্গে অবশ্যই জলের বোতল নিয়ে যেতে হবে। নরম পানীয় একেবারেই মানা। এর পরিবর্তে ডাবের জল, নুন লেবুর শরবত, ওআরএস, লস্যি (রাস্তার দোকানের নয়) , ছাঁচ বা টাটকা ফলের রস খাওয়াতে পারেন। গরমে জ্বর, গলাব্যথা, ডায়রিয়া ছাড়াও হিট ক্র্যাম্প হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাচ্চারা ছোটাছুটি করে খেলাধুলো করলে পায়ের পেশিতে টান ধরে। ঘামের সঙ্গে মিনারেল ও নুন বেরিয়ে যাওয়ায় মাসল ক্রাম্পের ঝুঁকি বাড়ে।এরকম হলে বাচ্চাকে এক জায়গায় স্থির হয়ে বসিয়ে ক্র্যাম্প হওয়া জায়গায় হালকা হাতে ম্যাসাজ করে দিন। একইসঙ্গে ওআরএস খাওয়ান।

গরমের আর এক সমস্যা ত্বকের বিভিন্ন র্যাশ, বিশেষ করে ঘামাচি। হিট র্যাশ অর্থাৎ ঘামাচির নানান রকমফের আছে। অল্পস্বল্প ঘামাচির নাম মিলিয়ারি ক্রিস্টালাইন, আর বড় বড় প্রায় ফোড়ার আকারের ব্যথা যুক্ত ঘামাচি হয়েছে এর নাম মিলিয়ারি প্রোফাউন্ডা। তবে এর জন্যে ভয় পাওয়ার দরকার নেই। গরমে আর রোদ্দুরের জন্যে এগুলো হয়। মোটেও কঠিন অসুখ নয়। কপাল, হাত, গলা আর ঘাড় র্যাশে ভরে যায়। বাচ্চা সারাক্ষণই অস্বস্তিতে ভোগে। মাঝে মাঝে খুব জ্বালা করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘামাচি কমাতে মায়েরা একগাদা পাউডার লাগিয়ে দেন। পাউডার কখনও ঘামাচি সারাতে পারে না। বরং ত্বকের লোমকুপের মুখ বন্ধ হয়ে গিয়ে সমস্যা আরও বেড়ে যায়। অনেক শিশুর ত্বক খুব সংবেদনশীল হয়। যাদের থার্মো রেগুলেটরি মেকানিজম অর্থাৎ ত্বকের গরমের সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা একটু কমজোরি তাদের ঘামাচির প্রবণতা বেশি। হিট র্যাশ হলে পাখার নীচে বা এয়ার কন্ডিশনার ঘরে থাকতে হবে। বেশি গরম আর ঘাম সমস্যা বাড়িয়ে দেয়। মারাত্মক ঘামাচির ব্যথা আর জ্বালা কমাতে বরফ পাতলা কাপড়ে জড়িয়ে র্যাশের ওপর লাগালে আরাম হয়। গরম বাড়ছে, হয়তো ভবিষ্যতে আরও বাড়বে, গরমের সঙ্গে মোকাবিলা করতে গাছ লাগান।
হিট স্ট্রোক হতে চলছে কী করে বুঝবেন
কেউ বলেন সান স্ট্রোক, কেউ বলেন হিট স্ট্রোক আবার পুরনো দিনের মানুষরা বলেন সর্দিগর্মি। ভয়ানক গরমে শরীরে জলের অভাব ও নানান কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে সকলেই আতঙ্কিত হয় পড়েন। হিটস্ট্রোক আচমকা আসে না, জানান দেয় আগে থেকে, সবিস্তারে জানালেন ডিসান হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক ইন্টেন্সিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বিচিত্রভানু সরকার।
বাচ্চাদের ঠান্ডা-গরম বোধের থেকে খেলার তাগিদ বেশি। বিশেষ করে আট-দশ বছর বয়স পর্যন্ত বেশিরভাগ শিশুর জীবনের লক্ষ্য দিনভর খেলা করা। স্কুল ছুটি থাকলেও বাচ্চারা ঘরের মধ্যে দৌড়দৌড়ি করে খেলা করে। অতিরিক্ত গরমে যদি লক্ষ করেন খেলতে খেলতে বাচ্চার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে, তবে হাঁটতে-চলতে, দম নিতে কষ্ট হচ্ছে, পায়ে ব্যথা করছে, বাচ্চার ঠোঁট, জিভ শুকিয়ে যাচ্ছে, শিশুটি বসে বা শুয়ে পড়ছে ক্লান্তিতে তখনই বুঝতে হবে যে বাচ্চার শরীরের তাপমাত্রার হেরফের হচ্ছে। এই অবস্থায় বাচ্চাকে ওআরএস এর জল খাইয়ে ঠান্ডা জলে স্নান করানো উচিত। একটু বড় বাচ্চারা ফাঁক পেলেই বাইরে রোদ্দুরে দৌড়দৌড়ি করতে চায়। এই ব্যাপারটার দিকে নজর দেওয়া উচিত। আসলে গরমে রোদ্দুরে দৌড়দৌড়ি করলে খুব ঘাম হয়। ঘামের সঙ্গে অনেকটা জল, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম-সহ অনেক দরকারি মিনারেলস বেরিয়ে যায়। এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অংশে ঠিকমতো রক্ত সরবরাহ হতে পারে না। আর এই কারণেই মাসল ক্র্যাম্প, মাথায় ব্যথা-সহ নানান কষ্ট হয়। গরমে আমাদের ঘাম হওয়ার কারণ হল শরীরকে খুব গরম হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে। ঘাম যখন শুকোয় তখন শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমে। আমাদের ব্রেনের একটা অংশ আছে যেখানে গরমের সময় সিগন্যাল যায় যে এবারে ঘাম হওয়া দরকার। তখনই আমরা ঘামি। এবারে অরিতিক্ত গরমে শরীর থেকে মিনারেলস বেরিয়ে যাওয়ায় রক্তচলাচল কমে যায়। ফলে, ব্রেন আর সিগন্যাল পাঠাতে পারে না। ঘাম তো হয়ই না, শরীর গরম হয়ে যায়। তখন আমাদের শরীরের পুরো সিস্টেমটাই ওলটপালট হয়ে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। এর ডাক্তারি নাম হিট স্ট্রোক। ঘাম হয়ে বা অন্য কারণে ডিহাইড্রেশন হলে পা-সহ শরীরের বিভিন্ন পেশিতে ক্র্যাম্প হয়। অল্প অল্প করে বারে বারে সরবত খেলে সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। বাবা মায়েদের উচিত বাচ্চাদের দিকে নজর রাখার পাশাপাশি নিজেদেরও খেয়াল রাখা। বেশি শারীরিক পরিশ্রম করলে অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রবল গরমে বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের অভ্যন্তরের তাপমাত্রাও বেড়ে যায়। ফলত বেসাল মেটাবলিক রেট অর্থাৎ BMR বেড়ে গিয়ে নানারকম শারীরিক গোলোযোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। হরমোন এবং এনজাইমগুলির ম্বাভাবিক কাজ ব্যহত হয়। সরাসরি রোদ্দুর লাগলে চোখ এবং ত্বক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বাচ্চাদের ছাতা, সানগ্লাস ব্যবহারের পাশাপাশি সানস্ক্রিন লাগান উচিত।

এবারের গরমে আপেক্ষিক আর্দ্রতা কম থাকায় হিট স্ট্রোকের সম্ভাবনা অনেক বেড়ে গেছে। তাই সাবধান থাকতে হবে, রোদ্দুর এড়িয়ে চলার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জলপান, ইলেক্ট্রোলাইট ব্যালান্স বজায় রাখতে ওআরএস, ফলের রস-সহ জলীয় খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। শরীরে অস্বস্তি হলে, মাথা ঝিমঝিম করলে ঠান্ডা জায়গায় গিয়ে নুন-চিনির জল পান এবং প্রয়োজনে ঠান্ডা জলে স্নান করে নিতে হবে। এইবারের গরমে আপেক্ষিক আর্দ্রতা কম বলে অনেকে ভাবছেন ঘাম হয় না। কিন্তু ঘাম হয়েই শুকিয়ে যায় বলে অস্বস্তি কম হয়। শরীরের অভ্যন্তরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে ঘাম হয়। অন্য সময় প্রতি কেজি দেহের ওজন পিছু পাঁচ থেকে দশ মিলি ঘাম নির্গত হয়। কিন্তু প্রখর দাবদাহের সময় এই পরমাণ বেড়ে দাঁড়ায় কেজি প্রতি ২০ থেকে ৩০ মিলিতে। সুতরাং প্রচুর জল ও মিনারেল শরীর থেকে বেরিয়ে যায় বলে ছোট থেকে বড় সকলেই দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ফলে, কিডনি-সহ শরীরের অভ্যন্তরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কাজ কমতে শুরু করে। ঘামের সঙ্গে সোডিয়াম পটাশিয়াম বেরিয়ে গেলে মাথা ঝিমঝিম করা ছাড়াও বাচ্চাদের মেজাজ খারাপ হতে পারে। গরমে জ্বর ও পেটের সংক্রমণের সম্ভবাবনা থাকে। জ্বর হলে ঠান্ডা জলে স্নান মাস্ট। জ্বরেও ডিহাইড্রেশনের চান্স বাড়ে। তাই লিক্যুইড ডায়েটের পরিমাণ বাড়াতে হবে। পেটের সমস্যা এড়াতে বাইরে খাওয়া এবং ভাজা ও মশলাদার খাবার একাবারেই বন্ধ। এই প্রসঙ্গে জেনে রাখুন যাঁদের টপ ফ্লোরে থাকতে হয়, অর্থাৎ সরাসরি ঘরের ছাদের ওপর রোদ্দুর পড়ে তাঁদের ঘরের দরজা জানলা বন্ধ করে রাখলে বদ্ধ ঘরের তাপমাত্রা ভয়ানক বেড়ে গিয়ে ঘরের মধ্যেও হিট স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গরমে বাচ্চারা নির্জীব হয়ে পড়লে, ভয়ানক ক্লান্ত দেখালে কোনও ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত ওআরএস যুক্ত জল পান করান সঙ্গে ঠান্ডা জলে স্নান করিয়ে দিন। এরপরও সমস্যা থাকলে কাছাকাছি হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো উচিত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইচডিইউ-তে রেখে বাচ্চাকে স্থিতিশীল করা হয়। হিট স্ট্রোক হতে চলেছে বুঝলে কোনও গড়িমসি না করে বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসার পর নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত।

ফল ও শরবত খাইয়ে বাচ্চাদের সুস্থ রাখুন
গরমকালে বাইরের খাবার খেলে অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। বাড়িতে তৈরি টাটকা খাবার, প্রচুর ফল ও শরবত খাওয়ার পরামর্শ দিলেন উডল্যান্ডস মাল্টি স্পেশালিটি হাসপাতালের ডায়েটিশিয়ান সুবর্ণা রায়চৌধুরী।
গরমের দিনে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে খাবার ও জলে। ভাল থাকতে গেলে বেশি করে ফল, জল, দইয়ের ঘোল, লেবুর শরবত খেলে গরমের কষ্ট কমবে। বাড়িতেও হালকা খাবার খেতে হবে। মাছের ঝোল, ডাল, চিকেন সবই খাওয়া যায় তবে তেল মশলা কম দিতে হবে। এই সময়ে কেন হালকা খাবার খেতে হয় জেনে নিন। গরমকালে শরীরকে ঠান্ডা রাখার জন্যে আমাদের শরীরের রক্ত চলাচল বাড়ে ত্বকের নীচের অংশে। অন্যান্য অংশে তুলনামুলকভাবে কম রক্ত চলাচল করে। পাকস্থলী, মস্তিষ্ক-সহ সব জায়গাতেই এটা হয়। তাই লক্ষ করে দেখবেন গরমে মাথা ব্যথার প্রবণতা বাড়ে। সেরকমই হজম ক্ষমতাও কিছুটা কমে। হালকা খাবার খেলে কোনও অসুবিধে হয় না। কিন্তু বেশি তেল-মশলা দেওয়া খাবার খেলে হজম করতে অসুবিধে হয়। সেইজন্যেই হালকা খাবার খেতে বলা হয়। কী কী খাবার আপনার শিশুকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে এক নজরে জেনে নিন।
বাড়িতে পাতা দইয়ের ঘোল, নুন-লেবুর শরবত, ডাবের জল, যে-কোনও টাটকা ফলের রস (ক্যান বন্দি চিনি দেওয়া ফ্রুট জুস নয়) খেলে বাচ্চারা চট করে ক্লান্ত হবে না।
শসা, জামরুল, তরমুজ, আঙুর-সহ যে-কোনও টাটকা ফল খেলে ভাল হয়।
এই সময়টায় বেশি মশলাদার খাবার ও বেশি মাংস খেলে হজমের সময় শরীরে বাড়তি তাপ উৎপন্ন হয়। তাই হালকা খাবার খেতে হবে। রোজকার ডায়েটে রাখুন বাড়িতে পাতা টকদই, হজম শক্তি বাড়বে।
শসা, জামরুল, পাকা পেঁপে জাতীয় ফল খেয়ে জলের ঘাটতি মেটানোর চেষ্টা করুন।
বাচ্চাদের অনেকেই বোতল বন্দি ঠান্ডা পানীয় খেতে খুব পছন্দ করে। কিন্তু এগুলি একেবারেই দেওয়া উচিত নয়। কোল্ড ড্রিংকস খেলে শরীরে জলের অভাব দেখা দিতে পারে। তার থেকে নুন-লেবুর শরবত বা লস্যি খাওয়া অনেক ভাল।
পুদিনা আর শসা দিয়ে লেবুর শরবত বাচ্চারা আনন্দ করে খাবে। চিকেন সিদ্ধ করে টকদই, মধু ও শসা দিয়ে কোল্ড স্যলাড বানিয়ে দিলেও বাচ্চারা আনন্দ করে খাবে।
গরমে ভয়ানক ঘাম হলে, চোখে অন্ধকার দেখলে অথবা নিঃশ্বাসের কষ্ট হলে দেরি না করে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।

রাজকীয় নিরামিষ
ভারতীয় রন্ধনঐতিহ্যে নিরামিষ খাবারের স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু যুগ ধরেই রাজপ্রাসাদ থেকে মন্দিরের ভোগ সব ক্ষেত্রেই নিরামিষ আহারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক সমৃদ্ধ খাদ্যসংস্কৃতি। বিশেষত রাজবাড়ির রান্নাঘরে তৈরি নিরামিষ পদগুলির মধ্যে ছিল আভিজাত্যের ছোঁয়া, রন্ধনশিল্পীর দক্ষতা এবং ঋতু ও অঞ্চলের উপকরণের অপূর্ব সমন্বয়। তাই নিরামিষ মানেই শুধু সাধারণ বা সাদামাটা নয় বরং সঠিক উপকরণ, নিখুঁত মশলার ব্যবহার এবং পরিবেশনের সৌন্দর্যে তা হয়ে উঠতে পারে একেবারে রাজকীয় ভোজ।

রাজকীয় নিরামিষ রান্নায় প্রায়ই দেখা যায় দুধ, ঘি, কাজু, কিশমিশ, সুগন্ধি মশলা এবং নানা সবজির অভিনব ব্যবহার। কখনও তা মুঘল দরবারের ঐশ্বর্য বহন করে, কখনও আবার রাজস্থানি বা অবধি রান্নার সূক্ষ্ম স্বাদ নিয়ে হাজির হয়। আবার বাংলার জমিদারবাড়ির রান্নাঘরেও নিরামিষ পদকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হত উৎসব, পূজা কিংবা অতিথি আপ্যায়নে নিরামিষ আহারের বিশাল আয়োজন ছিল এক ঐতিহ্য। এই সংকলনে আমরা তুলে ধরেছি এমনই কিছু রাজকীয় নিরামিষ পদ, যেগুলোর স্বাদে আছে ঐতিহ্য, রূপে আছে আভিজাত্য, আর রান্নায় আছে সহজ অথচ নিখুঁত কৌশল। ঘরের সাধারণ রান্নাঘরেও সামান্য যত্নে তৈরি করা যায় এই পদগুলি, যা আপনার খাবারের আসরকে মুহূর্তেই করে তুলবে রাজকীয় ও স্মরণীয়।

নিরামিষ শাহী পনির
সুতপা বৈদ্য
কী কী লাগবে
পনির ২০০ গ্রাম, জলপাই আলু ২টি, পোস্ত ১ টেবিল চামচ, কাজু ১২-১৫টি, টকদই আধ কাপ, কিসমিস ১ টেবিলচামচ, কাঁচালঙ্কা ২টি, ছোট এলাচ ২টি, জিরে আধ চা-চামচ, গোটা গরম মশলা ২টি লবঙ্গ + ১ টুকরো দারচিনি + ১টি তেজপাতা, ফ্রেশ ক্রিম ২ টেবিলচামচ, Shalimar's Chef Spices কাসুরি মেথি আধ চা-চামচ, Shalimar's Sunflower তেল ৩ টেবিলচামচ, লবণ স্বাদমতো।

কীভাবে বানাবেন
শুকনো কড়াইয়ে পোস্ত, কাজু ও ছোট এলাচ হালকা ভেজে ঠান্ডা করে গুঁড়ো করুন, এতে দই, কিসমিস ও কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মসৃণ পেস্ট বানান। কড়াইয়ে তেল গরম করে আলু হালকা ভেজে তুলুন, একইভাবে পনিরও সোনালি করে ভেজে নিন। একই কড়াইয়ে জিরে ও গোটা গরম মশলা ফোড়ন দিয়ে বাটা মসলা দিয়ে কষান। ভাজা আলু দিয়ে নেড়ে লবণ ও পরিমাণমতো জল দিন, ঢেকে কম আঁচে আলু সিদ্ধ করুন। শেষে ভাজা পনির, ফ্রেশ ক্রিম ও কাসুরি মেথি দিয়ে ১–২ মিনিট রান্না করে নামিয়ে পরিবেশন করুন।

ফুলকপির লাচ্ছা পরোটা
সুতপা বৈদ্য
কী কী লাগবে
ময়দা/আটা ২ কাপ, গ্রেট করা ফুলকপি ১ কাপ, ছোলার ছাতু ২ টেবিল চামচ, সেজুয়ান সস ১ টেবিল চামচ, কালোজিরা ১/২ চা-চামচ, কুচি ধনেপাতা ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, Shalimar's Sunflower তেল বা ঘি ২-৩ টেবিল চামচ, জল প্রয়োজনমতো।

কীভাবে বানাবেন
গ্রেট করা ফুলকপিতে লবণ মেখে কিছুক্ষণ রেখে জল চিপে বের করে নিন, তাতে সেজুয়ান সস ও ছোলার ছাতু মিশিয়ে রাখুন। আটা লবণ ও জল দিয়ে মেখে ছোট লেচি কেটে রুটি বেলে নিন। একটি রুটির ওপর ফুলকপির মিশ্রণ ছড়িয়ে অন্য রুটি দিয়ে ঢেকে দিন, উপর থেকে কালোজিরা ও ধনেপাতা ছড়িয়ে আবার বেলে নিন। রুটি টিকে ফাঁকা ফাঁকা করে কেটে রোল করে জুড়ে নিয়ে তালু দিয়ে চেপে দিন। হালকা বেলে তাওয়ায় তেল বা ঘি দিয়ে দুই পিঠ সেঁকে মুচমুচে করে ভেজে নিন। গরম গরম ধনে-পুদিনা চাটনির সঙ্গে পরিবেশন করুন।

পনির কোপ্তা কারী
সুতপা বৈদ্য
কী কী লাগবে
কুরানো পনির ২০০ গ্রাম, বেসন বা ময়দা ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি আধ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো আধ চা-চামচ, Shalimar's Sunflower তেল ভাজার জন্য পরিমাণমতো, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, টমেটো বাটা ১টি মাঝারি, তেজপাতা ১টি, গোটা জিরে আধ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices হিং ১ চিমটে, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো আধ চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, Shalimar's সর্ষের তেল ২ টেবিল চামচ, জল প্রয়োজনমতো।

কীভাবে বানাবেন
কুরানো পনির, বেসন বা ময়দা, লবণ, চিনি ও গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে ছোট কোপ্তা গড়ে তেলে হালকা বাদামি করে ভেজে তুলে রাখুন। কড়াইয়ে তেল গরম করে তেজপাতা, গোটা জিরে ও হিং ফোড়ন দিয়ে আদা বাটা ও টমেটো বাটা দিয়ে ভালো করে কষান। হলুদ, লঙ্কা গুঁড়ো ও লবণ দিয়ে মশলা কষিয়ে পরিমাণমতো জল দিন। গ্রেভি ফুটে এলে ভাজা কোপ্তা দিয়ে ২ মিনিট রান্না করে নামিয়ে পরিবেশন করুন।

সাবুর খিচুড়ি
সুতপা বৈদ্য
কী কী লাগবে
সাবু ১ কাপ, জল ২ কাপ, সেদ্ধ আলু ২টি (মাঝারি, কিউব করে কাটা), চিনাবাদাম ২ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা কুচি ২টি, জিরে আধ চা-চামচ, আদা কুচি ১ চা-চামচ, ঘি/ Shalimar's Sunflower তেল ১ টেবিলচামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি আধ চা-চামচ (ঐচ্ছিক), লেবুর রস ১ চা-চামচ, ধনেপাতা কুচি ২ টেবিলচামচ।
কীভাবে বানাবেন
সাবু ধুয়ে ১৫–২০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে জল ঝরিয়ে নিন। কড়াইয়ে ঘি গরম করে জিরে ফোড়ন দিন, চিনাবাদাম দিয়ে হালকা ভেজে নিন। এরপর আদা কুচি ও কাঁচা লঙ্কা দিয়ে নেড়ে সেদ্ধ আলু দিন। লবণ ও সামান্য চিনি দিয়ে মিশিয়ে ভেজানো সাবু দিন। মাঝারি আঁচে নেড়ে নেড়ে রান্না করুন যতক্ষণ সাবু স্বচ্ছ হয়ে আসে। শেষে লেবুর রস ও ধনেপাতা কুচি দিয়ে মিশিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।

গন্ধরাজ পনির ভাপা
তনুজা আচার্য্য
কী কী লাগবে
পনির ২০০ গ্রাম (চৌকো করে কাটা), টক দই আধ কাপ, পোস্ত ১ টেবিল চামচ, সাদা সর্ষে ১ টেবিল চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৩–৪টি, গন্ধরাজ লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চিমটে, কলাপাতা বা স্টিলের পাত্র।

কীভাবে বানাবেন
পোস্ত, সাদা সর্ষে ও কাঁচা লঙ্কা অল্প জল দিয়ে মিক্সিতে মিহি পেস্ট করুন।
একটি পাত্রে দই, সর্ষে-পোস্ত বাটা, লবণ, হলুদ, গন্ধরাজ লেবুর রস ও সর্ষের তেল মিশিয়ে নিন। এর মধ্যে পনির টুকরো দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে ১০–১৫ মিনিট রেখে দিন। মিশ্রণটি কলাপাতায় মুড়ে বা ভাপার পাত্রে ঢেলে ঢেকে দিন। কড়াই বা স্টিমারে ১০–১২ মিনিট ভাপে রান্না করুন।
গরম গরম গন্ধরাজ পনির ভাপা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

মেথি মালাই পনির
তনুজা আচার্য্য
কী কী লাগবে
পনির ২০০ গ্রাম, পেঁয়াজ বাটা আধ কাপ, আদা-রসুন বাটা ১ চা-চামচ, কড়াইশুঁটি আধ কাপ, ফ্রেশ ক্রিম আধ কাপ, মেথি শাক কুচি আধ কাপ, Shalimar's Chef Spices কাসুরি মেথি ১ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো আধ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো আধ চা-চামচ, Shalimar's Soyabean তেল বা মাখন ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি আধ চা-চামচ, জল প্রয়োজনমতো।

কীভাবে বানাবেন
কড়াইয়ে তেল বা মাখন গরম করে জিরে ফোড়ন দিন, পেঁয়াজ বাটা দিয়ে হালকা বাদামি হওয়া পর্যন্ত কষান। এরপর আদা-রসুন বাটা ও টমেটো বাটা দিয়ে ভালো করে কষান। মেথি শাক কুচি, হলুদ, লবণ ও সামান্য চিনি দিয়ে মশলা কষিয়ে নিন। পরিমাণমতো জল দিয়ে গ্রেভি ফুটে উঠলে মটর আর পনির দিন। কাসুরি মেথি ও ফ্রেশ ক্রিম মিশিয়ে ২–৩ মিনিট রান্না করুন। শেষে গরম মশলা ছড়িয়ে নামিয়ে গরম গরম রুটি, নান বা পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

পাট পাতার বড়া
তনুজা আচার্য্য
কী কী লাগবে
গোটা পাট শাকের পাতা, আতপ চালের গুঁড়ো ১ কাপ, সাদা তিল ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো, Shalimar's Sunflower তেল ভাজার জন্য পরিমাণমতো।
কীভাবে বানাবেন
পাট শাক ভালো করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিন। একটি পাত্রে পাট শাক, চালের গুঁড়ো, সাদা তিল, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা লঙ্কা, রসুন, হলুদ ও লবণ মিশিয়ে নিন। প্রয়োজনে অল্প জল দিয়ে ঘন মিশ্রণ তৈরি করুন। কড়াইয়ে তেল গরম করে মিশ্রণ থেকে ছোট বড়ার আকারে দিয়ে মাঝারি আঁচে মুচমুচে করে ভেজে নিন। গরম গরম পাট শাকের বড়া ভাত বা চায়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

তেঁতোর ডাল
তনুজা আচার্য্য
কী কী লাগবে
সোনা মুগ ডাল ১ কাপ, লাউ ১/৪টি, উচ্ছে ৩–৪টি, কাঁচালঙ্কা ৩–৪টি, আদা ১/২ ইঞ্চি, রাঁধুনী ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, সরষে ১/২ চা চামচ, Shalimar's সরষের তেল ২ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি স্বাদমতো।

কীভাবে বানাবেন
লাউ ও উচ্ছে কেটে নিন, আদা-রাঁধুনী-কাঁচালঙ্কা একসঙ্গে বেটে রাখুন। মুগ ডাল উচ্ছে, লাউ ও নুন দিয়ে সিদ্ধ করুন। কড়াইয়ে সরষের তেলে সরষে ফোড়ন দিয়ে আদা-রাঁধুনী বাটা ও হলুদ কষিয়ে সিদ্ধ ডাল মেশান। শেষে স্বাদমতো চিনি দিয়ে ফুটিয়ে ঘন হলে নামিয়ে পরিবেশন করুন।
গরমে শিশুর ত্বকের যত্ন জরুরি
অতিরিক্ত গরম আর রোদ্দুরের অতিবেগুনি রশ্মি শিশুদের কোমল ত্বকের ওপর নানান বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ঘামাচি, অন্যান্য র্যাশ ছাড়াও রোদের তাপে হাতে মুখে ট্যান পড়ে যায়। ত্বক ভাল রাখতে কয়েকটি ঘরোয়া টোটকার কথা জানালেন সুশ্রী বিউটিপার্লারের বিউটি থেরাপিস্ট সুচিস্মিতা পাত্র।
শিশুর কোমল ত্বক গরমের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বাইরে গেলে তো বটেই খোলা বারান্দা বা ছাদে খেলা করলেও বাচ্চাদেরও উপযোগী সানস্ক্রিন লাগানো উচিত। রোদ্দুরে সান বার্ন আর হিট র্যাশ হলে ত্বকের ওপর কালচে ছোপ পড়ে যায়। এছাড়া ঘাম বসে পিট্রিয়াসিস ভার্সিকালার নামে একধরনের ছত্রাক ঘটিত সমস্যা দেখা যেতে পারে। আসলে গরমে খুব ঘাম হয় তো, ত্বকের ওপরে ঘাম জমে থাকে। তার ওপর জীবাণুরা আক্রমণ করলেই সমস্যার শুরু। প্যাচপ্যাচে গরমে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস জাতীয় পরজীবীরা অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই চট করে সংক্রমণ হবার ঝুঁকি থাকে। তাই বড়দের সঙ্গে সঙ্গে বাচ্চাদেরও ত্বকের যত্ন নেওয়া আবশ্যক। একে একে জেনে নেওয়া যাক কীভাবে আপনার শিশুর ত্বকের যত্ন নেবেন।

গরমে দিনে অন্তত দু'বার স্নান করানো উচিত। তবে ঠান্ডার লাগার ধাত থাকলে বুঝে স্নান করাবেন। স্নানের সময় মাইল্ড সাবান মাখিয়ে দিতে হবে।
স্নানের পর শুকনো করে গা মুছিয়ে নিয়ে হালকা ময়েশ্চারাইজার বা নারিকেল তেল মাখিয়ে দিতে হবে।
ঘাম জমলে ভিজে গামছা বা নরম তোয়ালে দিয়ে গা মুছিয়ে শুকিয়ে নিন।
ঘামাচি হলে ঠান্ডা ঘরে রাখার চেষ্টা করুন। বড় ঘামাচি হলে বরফ দিলে ভাল হয়। পাউডার লাগাবেন না।
ঘামাচি-সহ অন্যান্য সমস্যায় কাপড়ের মধ্যে বরফ নিয়ে আক্রান্ত জায়গায় আলতো করে লাগাবেন। সমস্যা কমবে।
স্কুল বা টিউশন যাওয়ার কারণে বা রোদে খেলাধুলো করলে বাচ্চার ত্বকে ট্যান পড়ার ঝুঁকি থাকে। এক্ষেত্রে তুলো দুধে ভিজিয়ে ট্যান হওয়া অংশে লাগিয়ে দিন। পাঁচ–সাত মিনিট রেখে জল দিয়ে ধুয়ে দিলে ট্যান কমবে।
বেসন, হলুদ ও পাতিলেবু একসঙ্গে মিশিয়ে জল দিয়ে লেই করে নিন। বাচ্চার ট্যান হওয়া অংশে মাখিয়ে রাখুন পাঁচ-সাত মিনিট। স্নানের আগে মাখালে ভাল। স্নানের সময় ঘষে ধুয়ে দিলে ট্যান কাটবে।
মাথায় ঘাম বসে স্ক্যাল্প ও চুলে বাজে গন্ধ হয়, চুল পড়ে যেতে পারে। তাই সপ্তাহে তিনদিন অন্তত মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে দিন।
ত্বক চুল-সহ সামগ্রিকভাবে শিশুকে ভাল রাখতে লেবুর শরবত, ডাব, জল খাওয়ার অভ্যাস করান।

না বলা কথা
সুপ্তা আঢ্য
বিকেল ৪.১৫ নাগাদ হাওড়া স্টেশনে রাজধানী এক্সপ্রেসের ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেণ্টের নিজের কূপে গুছিয়ে বসলেন বিখ্যাত আইনজীবী সুরঞ্জন সেন। এসি কম্পার্টমেণ্টে ট্রেনের আওয়াজ বিরক্তির সঞ্চার করে না বলেই বোধহয় ট্রেনের দুলুনিতে একটা ঘুম ঘুম আমেজ আসে। জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে আনমনা হতেই স্মৃতিগুলো পরপর জুড়ে মেঘমালার মতো সেজে উঠছিল।
কলকাতার ছেলে সুরঞ্জন গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে আইন পড়তে দিল্লীর ল কলেজে ভর্তি হয়েছিল; সে প্রায় বছর কুড়ি আগেকার কথা। আজকের স্বভাবগম্ভীর সুরঞ্জন সেদিন ছিল যৌবনের রঙে রঙিন উচ্ছ্বল এক যুবক। এলোমেলো একমাথা ঝাঁকড়া চুল,গালে হাল্কা দাড়ি আর টানা চোখের ফর্সা,প্রায় পাঁচ ফুট এগারোর ছেলেটা কলেজ, পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধব, আড্ডায় মেতে হেসে খেলে কাটাবে ভাবলেও থার্ড ইয়ারে অন্য কিছু অপেক্ষা করছিল।
ফার্স্ট ইয়ারের নতুন ক্লাস শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্টরা ফ্রেশার্সের প্রিপারেশন শুরু করে দিল। একদিন ফার্স্ট ইয়ারের ডিপার্টমেন্টে ওদের সাথে ইনট্রো শুরু করতে সিনিয়রদের আন্তরিকতায় খুব সহজেই মিশে গিয়েছিল ওরা। হঠাৎ সুরঞ্জনের চোখে পড়ল লাস্ট বেঞ্চের মেয়েটা চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে আছে। একটু অবাক হয়ে ওর কাছে গিয়ে 'হাই' বলতেই মুখ ঘুরিয়ে মিষ্টি করে হাসতেই ওই চোখের গভীরে হারিয়ে গিয়েছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য; হঠাৎ পলাশের ডাকে যে অপ্রস্তুতের হাসি হেসেছিল,তা দেখে বন্ধুরা জোরে হেসে উঠতেই কপট রাগে বাইরে চলে এসেছিল। পলাশের প্রশ্নে প্রথমে এড়িয়ে গেলেও পলাশের জোরাজুরিতে স্বীকার করে নিল ওর সত্যিই ভালো লেগেছে; কিন্তু কী লাভ! হোয়্যার অ্যাবাউটস তো কিছুই জানেনা। পলাশ আশ্বস্ত করলেও মন কিছুতেই মানছিল না। হাজারো প্রশ্ন মাথায় ভিড় করে আসছিল।

প্রোগ্রামের প্রায় শেষে বন্ধুদের জোরাজুরিতে মাউথ অর্গ্যানটা নিয়ে স্টেজে উঠে ইতিউতি তাকাতেই খুঁজে পেয়ে গেল; ওর দিকেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সে। এই চাহনির সামনে বোবা হয়ে যাচ্ছিল সুরঞ্জন। মাউথ অর্গ্যানে মান্না দে'র একটা গানের সুর তুলেছিল ও।গান শেষে ওর দিকে তাকাতেই মনে হল ও চোখের না বলা ভাষা হাতছানি দিচ্ছে সুরঞ্জনকে। সুরঞ্জনের চোখেও একটা ঘোর! স্টেজ থেকে নামতে ফার্স্ট ইয়ারের অনেকে ঘিরে ধরলেও ওর চোখ যাকে চায় সে ভিড়ে গা না ভাসিয়ে চুপচাপ চলে যাচ্ছিল। সুরঞ্জনের ইচ্ছে করলেও মুখে সাড়া জোগাচ্ছিল না।
বেশ কিছুদিন পর পলাশ ওকে যার সামনে নিয়ে গেল তাকে দেখে সুরঞ্জন জাস্ট বোবা! পলাশ ওদের নিজেদের মতো করে থাকার সুযোগ করে দিয়ে কখন যে চলে গেছে ওদের হুঁশই হয়নি। হঠাৎ অপর দিকের মানুষটা বলে উঠল,আপ বহৎ আচ্ছে মাউথ অর্গ্যান বাজাতে হো। মুঝে অর একদিন শুননা হ্যায়… অকেলে।
জরুর শুনায়েঙ্গি।এক বাত কহুঁ?
ম্যায় তো কবসে ইন্তেজার কর রাহি হুঁ কুছ শুননে কে লিয়ে।
মানে?
আপ বাঙ্গালী হো?
হাঁ,কিঁউ! মুঝসে বাত নেহি করেঙ্গে?
আভি সে তো অওর জাদা বাত করেঙ্গে।
মেরি মা বাঙ্গালী হ্যায়।আমরা বেঙ্গলীতে কোথা বলতে পারি না?
তোমাকে কী নামে ডাকব?
হামার নাম সুনয়না আছে। অওর তুমি সু-র-ঞ্জ-ন দাদা।
অনেকক্ষণ থেকেই সুনয়নার নরম হাতটা ওর হাতের মধ্যেই ছিল।'দাদা' শুনে হাতটা এক ঝটকায় ছেড়ে বলল,কোই দাদা নেহি,ওনলি সুরঞ্জন।
লজ্জায় মুখ নামাতেই ও বলল,তুমি জানো,প্রথম দিনেই তোমার চোখে হারিয়ে গেছিলাম।
ইতনা টাফ বেঙ্গলী!
সুরঞ্জন হেসে বলল,ম্যায় খো গ্যয়া থা তুমহারে আঁখো মে।
ম্যায় ভি।
মতলব!
মুঝে ভি খোনা হ্যায় তুমহারে আঁখোমে।
স্থান, কাল ভুলে সুরঞ্জন জড়িয়ে ধরল ওকে।
সেদিন বলতে পারেনি,কিন্তু আজ বোঝেন,সুনয়না আজও ওনার ভালোবাসা। গরম জলে টি ব্যাগটা ডুবিয়ে আয়েস করে চায়ে চুমুক দিতেই পলাশের গলাটা বহুদূর থেকে শুনতে পেল।
সাম হো গ্যয়ি,ঘর নহি জায়োগি।
সুরঞ্জন ওর কপালে ভালোবাসার চিহ্ন আঁকতেই ওর বুকে মুখ লুকোলো সুনয়না।
কিছুক্ষণ পর সুনয়না চলে যেতেই একটা অদ্ভুত আবেশ সুরঞ্জনকে ঘিরে রইল।কাউকে ভালোবাসার আবেশ যে এতটা সুন্দর, সেটা জানা ছিল না ওর। এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হস্টেলে ফিরে চোখে হাত চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ল ও।
সুরঞ্জন বাঙালি হওয়ায় সুনয়নার মা একটু অন্য চোখেই দেখতেন ওকে। সু'র বাবা-মা ওদের সম্পর্কটা বেশ ভালোভাবে মেনে নিলেও সুরঞ্জন বাড়ীতে কাউকে কিছু জানায়নি।রাশভারী প্রকৃতির মানুষ সুরঞ্জনের বাবা ছিলেন কলকাতার বড় উকিল।বাড়ী হোক বা কোর্ট,কোথাও কারোর সাহস হত না ওনার মুখের ওপর কথা বলার।
হঠাৎ ট্রেনটা থামতে বাস্তবের মাটিতে ফিরে এলেন সুরঞ্জন সেন। কোনো একটা স্টেশনে ট্রেনটা থেমেছে।ঘড়ির কাঁটা এখন রাত দশটায়। ফয়েলে প্যাকড খাবারটা খেতে ইচ্ছে করছিল না একেবারেই। বদলে উইদাউট সুগার এককাপ ব্ল্যাক কফি পেলে বেশ হতো। প্যাণ্ট্রি কারের ছেলেটাকে ডেকে রিকোয়েস্ট করতে ও আনতে যেতেই সুরঞ্জনও বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে বাইরের অন্ধকার প্রকৃতিকে দেখতে লাগলেন। মাঝেমধ্যেই সিগারেটের স্ফুলিঙ্গ অন্ধকারে ছোট ছোট সোনার কুচির মতো জ্বলেই নিভে যাচ্ছিল। বেশ লাগছিল সুরঞ্জনের। খোলা হাওয়ায় এলোমেলো চুলগুলোর মতো ভাবনাগুলোও ছিল বড্ড এলোমেলো।
সিগারেটের ধোঁয়ার রিংটা ওপরে ছেড়ে বাকিটুকু ফেলে ব্ল্যাক কফিটা বানিয়ে একটা চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করতেই যোজন দূর থেকে সুনয়নার গলা…
কাল তুম চলা যায়েগা না? তুমহারে বিনা ক্যায়সে গুজারু ম্যায়!
মাথা নীচু করে বসেছিল সুরঞ্জন। সু'কে ছেড়ে যেতে বুকের ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছিল ওর। নিজের কষ্ট লুকোতে সুনয়নাকে বুকের মাঝখানে জড়িয়ে ধরেছিল।সুনয়নাও শেষবারের মতো ওর কবোষ্ণ বুকের ওমে নিজেকে ভরিয়ে নিচ্ছিল।
রঞ্জন,মুঝে ভুল তো নেহি যাওগি?
নিজের বুকের মাঝে একেবারে মিশিয়ে নিয়ে বলল,তুম মেরি শ্বাস হো সু। ম্যায় এভরি উইকমে চিটঠি ভেজুঙ্গা। আই উইল ওয়েট ফর ইউ।
জলদি জলদি পঢ়াই খতম করকে মেরে পাশ আনা রঞ্জন।
সুনয়নাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁটটা মিশিয়ে দিল সুরঞ্জন। সেদিন প্রিয়ার চোখের জল অধরসুধার সাথে মিশে এক অন্য আস্বাদনের অনুভূতি এনে দিয়েছিল যা আজও চোখ বন্ধ করলেই অনুভব করতে পারে।
কফিটা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেলেও কষা ভাবটা জিভে এখনও লেগে আছে। হাতঘড়িতে দেখল মধ্যরাত পার হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগেই।কী অদ্ভুত ভাবে রাতের নীরবতা ভেদ করে আপন গতিতে ডেস্টিনেশনে এগিয়ে চলেছে ট্রেনটা। ঘষা জানালার কাঁচের ভেতর থেকে বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারে আলেয়ার আলোর বিন্দু ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।
আজকের রাতটা বহু বছর পর এসেছে সুরঞ্জনের জীবনে। প্রতিটা রাত একা থাকলেও সারাদিনের পরিশ্রমের পর দুচোখ জুড়ে ক্লান্তির ঘুম নেমে আসে। আজ ক্লান্তি থাকলেও চোখ ঘুমহীন। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই মায়ের মুখটা ভেসে উঠল।
কয়েকটাদিন পর কতদূর চলে যাবি। ইচ্ছেমতো আসতেও পারবি না।এর থেকে হস্টেলই ভালো।
তুমি এরকম করলে যাব কিকরে? তাহলে কী এখানেই বাবার জুনিয়র হিসেবে কাজ শুরু করব?
তোর বাবার স্বপ্ন তোকে ব্যারিস্টার হতে দেখা।
তোমার স্বপ্ন!
ভালো মানুষ হওয়া যে অন্যের ফিলিংসকে সম্মান দেবে।
কয়েকদিন পর থেকেই বাড়িতে মন টিকছিল না ওর। বাড়ীর ফোনে কলার আইডি থাকায় বুথ থেকেই ফোন করে সু'র গলাটা শুনতে হতো। হাতখরচটুকু ফোনেই চলে যেত, সিগারেটের পয়সাটুকুও থাকত না। এস টি ডি কলের চার্জ কখনোই ওদের প্রেমের সময়টা বুঝত না।
দিল্লীতে থাকতেই সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন ওর বাবা। সুরঞ্জনও এন্ট্রান্সে স্কলারশিপটা পেয়ে যেতে একমাসের মধ্যেই ওকে তল্পি গোটাতে হল লন্ডনের পথে।যাওয়ার আগের দিন মায়ের কাছে এক্সট্রা টাকা নিয়ে সুনয়নার সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেছিল। ঠিক করেছিল, চিঠি লিখবে একে অপরকে। চিঠির পাতায় হাত বুলিয়ে উষ্ণ স্পর্শসুখ অনুভব করতে পারবে! যা দুজনের কেউই কল্পনা করেনি,ওটাই ওদের শেষ কথা।
লন্ডনে পৌঁছেই একটা লম্বা চিঠি লিখেছিল প্রিয় সু'কে।কয়েকদিনের মধ্যে উত্তরও পেয়েছিল। প্রায় বছর দেড়েক সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও হঠাৎ করেই চিঠির উত্তর আসা বন্ধ হয়ে গেছিল। শুধুমাত্র একটুকরো আশায় নিয়মিত চিঠি পাঠিয়ে সুরঞ্জন ছটফট করত সু'র কাছে যাওয়ার জন্য।
ব্যারিস্টারি পাশ করে ফিরে প্র্যাকটিস শুরুর আগে বাবার অনুমতি নিয়ে দৌড়ে গিয়েছিল সুনয়নার কাছে। কলিং বেল বাজাতে এক অপরাচিতা মহিলা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, বোলিয়ে,কেয়া চাহিয়ে আপকো?
বেশ অবাক হয়ে সুরঞ্জন সু'র কথা ওর বাবার কথা জিজ্ঞেস করতে কোনো সদুত্তর দিতে পারলেন না।
শুধু জানালেন, কাউকেই উনি চেনেন না।
দিশেহারা সুরঞ্জন মাথা নীচু করে চলে আসার উপক্রম করতেই ভদ্রমহিলা হঠাৎ বলে উঠলেন,আপকা শুভনাম সুরঞ্জন হ্যায় ক্যয়া?
চোখ ভরা আশা নিয়ে তাকাতেই ভদ্রমহিলা ভিতর থেকে একগোছা চিঠি ওকে দিয়ে বললেন,ইয়ে সারি খত্ আপনেহি ভেজা না?
আরও যে দুঃখ পাওয়ার আছে তা কল্পনাতেও আসেনি ওর। চিঠির গোছাটা নিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখল,গত কয়েক বছরে ওর পাঠানো চিঠিগুলো না খোলা অবস্থাতেই রয়েছে। চিঠির প্রাপক কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। নিজের লেখা চিঠির ভার যে এতখানি,তা কল্পনাতেও আসেনি ওর। কোনোরকমে চিঠিগুলো নিয়ে পরাজিত সৈনিকের মতো ফিরে এসেছিল সুরঞ্জন।
পলাশকে ফোন করে সবটা বলতে ও অনেক কথা বললেও সুরঞ্জনের কানে কিছুই যাচ্ছিল না। এই প্রশ্নের উত্তরগুলো ও নিজেও খুঁজছে। যে এই উত্তরগুলো দিতে পারত,সে কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। যে নিজে হারিয়ে যায় তাকে খুঁজে পাওয়া বড্ড কঠিন।
দিল্লী থেকে ফিরে এসে বহুদিন কাজে মন বসাতে পারেনি। এক লহমায় ওর জীবনটা থমকে গেছিল। তবে আস্তে আস্তে সময়ের স্রোতে পলি পড়ার মতো ওর মনেও পলি পড়ছিল। সময়ের সাথে সাথে সুনয়নার স্মৃতি থিতিয়ে এলেও সময়ের স্রোত তাকে মন থেকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে নি। যদিও শেষ পর্যন্ত মায়ের জেদের কাছে হার স্বীকার করে মাধুরীর সাথে জীবনটাকে জড়িয়েছে।তবে সম্পর্কে সেই উষ্ণতা ছিল না। তবে স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যে কোনো অবহেলা ছিল না।
খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেও সম্মানের খিদে মেটেনি ওর।যতদিন এগোচ্ছে আরও বেশী বেশী করে কাজের নেশা পেয়ে বসছে ওকে।বেশ ছিল নিজের জগতে,কিন্তু গত সপ্তাহের পলাশের ফোন আর কলেজ রিইউনিয়নের ইনভিটেশন সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। এতবছর পর পলাশের ফোন পেয়ে একটুও অবাক হয় নি ও।
রিইউনিয়ন মে তুম যায়োগে তো?
সব কাম ছোড় কর্ তু যায়েগা ?
কিঁউ নেহি?
ম্যায় নেহি যাউঙ্গা;ম্যায় উঁহা যানা নেহি চাহাতা।
পর তুমহে যানা চাহিয়ে। উঁহা সুনয়না আ সকতি হ্যায়।
উসসে ক্যয়া হোগা। জিস্ দিন্ মেরা লিকখা হুয়া সারে খত্ লেকর লট আয়া,উসহি দিন সে যো পল্ ম্যায় গুজারা,উসকা ক্যয়া হোগা!ম্যায় নেহি আউঙ্গা।
কুছ নাহি জাননা চাহোগি?
শেষ অব্দি পলাশের যুক্তির কাছে হার মেনে কলেজের রিইউনিয়নে যেতে রাজী হল সুরঞ্জন।
জানালার পর্দাগুলো টানা থাকায় কখন যে সকাল হয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি ও। পর্দাটা সরাতেই ঘষা কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরের আলোয় ভরে উঠল ভেতরটা।গতরাতের ফ্লাস্কের জল দিয়ে সকালের প্রথম কফিটা বানিয়ে মি টাইমটা বেশ উপভোগ করছিল ও।
দিল্লী পৌঁছে একটা ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলের রুমে পৌঁছে যাকে দেখল, সেদিনের সেই লম্বা,রোগা ছেলেটার সাথে আজকের এই মাঝবয়সী মোটাসোটা স্বল্প চুলের ভদ্রলোকটিকে মেলাতেই পারত না যদি না হাসিটা দেখত।
তু ইতনা মোটা ক্যায়সে হো গ্যয়া?কিতনা দুবলা থা তু,ইয়াদ হ্যায় তুঝে!
আরে,পহলে অন্দর তো আ।
ঘরে ঢুকে দেখল পলাশ একটা স্যুইট বুক করেছে। ব্রেকফাস্ট আর চায়ের সাথে
দুজনে পুরোনো কথা শুরু করলেও সে আলোচনা শাখা বিছিয়ে দুপুরে; একসাথে লাঞ্চ সেরে পলাশ বিছানা দখল করল।আর সুরঞ্জন ব্যাগ খুলে একটা পার্সেল বের করে ছোট ব্যাগে রেখে সোফায় বসে মেল চেক করতে লাগলেও ওর মন যে কোন সুদূরে তার খোঁজ একমাত্র ওই জানে। সময় এগোনোর সাথে সাথে বেশ অস্থির হয়ে উঠছিল ও।
হোটেল থেকেই একটা ক্যাব বুক করে কলেজের সামনে পৌঁছে দেখল বন্ধু বান্ধবরা ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্পে মেতে উঠেছে। নিউ জেনারেশনের কাছ থেকে পাওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা বেশ ভালোই লাগছিল। বন্ধুরা এগিয়ে যেতেই পাশের পায়ে চলা পথ দিয়ে কিছুটা এগিয়ে একসময়ের সুখ দুঃখের সঙ্গী গাছের বেদীটায় বসল সুরঞ্জন। স্টেডিয়ামের দিক থেকে অনুষ্ঠানের আওয়াজ ভেসে এলেও এই জায়গাটা অপেক্ষাকৃত শান্ত। এখানের আলো আঁধারি পরিবেশে একা বেশ ভালো লাগছিল ওর। হঠাৎ পাশে কারোর উপস্থিতি বুঝতে পেরে চমকে তাকিয়ে যাকে দেখল অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখে বেশ অবাকই হল সুরঞ্জন। সেদিনের ছিপছিপে চেহারার মেয়েটা আজ একটু পৃথুলা যা বয়স আর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই। কোমর ঘেরা চুলের বদলে আধুনিক ফ্যাশানের হেয়ার কাটিং কাঁধ ছুঁয়েছে। ক্যায়সে হো রঞ্জন? মুঝে মাফ কর পায়োগি?
তুমহে যো আচ্ছি লগি ওহিঁ তো কিয়া।ফির মাফি কিঁউ?
মুঝে মওকা নহি দোগি কুছ বোলনে কি?
ক্যয়া বোলোগি তুম! আজ ইতনে দিনো কি বাদ ক্যয়া করুঙ্গা মে উও সব শুনকর! ম্যায় উস্ পলকো জি লিয়া সুনয়না;অব কুছ শুননে সে উও পল্ মিট্ নহি যায়েগা।
একবার মেরে বাত শুনলো !ম্যায়নে ভি দর্দ সহা সুরঞ্জন!মেরি মজবুরি কিসকো বাতাউঁ ম্যায়?
কিসিকো নেহি…কুছ বাত,কুছ পল্,কুছ দর্দ সির্ফ আপনা হোতা হ্যায়।উসকো আপনে পাশ রাখো।
তুম মুঝে আপনে নামসে নেহি বুলাওঙ্গে? একবার বোলো না রঞ্জন, ম্যায় তরস খা গয়ি উস নাম শুননে কে লিয়ে।
সুনয়নার কথায় এমন কিছু ছিল যা শুনে এত বছর পরেও ভেতর থেকে শিহরিত হচ্ছিল ও।যতটা সম্ভব নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,তুমহারে কুছ চিজ্ মেরে পাশ হ্যায়।ইয়ে লো।
ক্যয়া হ্যায় ইস পার্সেল মে?
খুলকর দেখো।
কিছু না বলে পার্সেলটা খুলতেই একগোছা চিঠি উঁকি দিল ভেতর থেকে।কাঁপা হাতে চিঠিগুলো বের করে তারিখ দেখে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সুরঞ্জনের দিকে। আধো অন্ধকারে সুনয়নার জল ভরা চোখ দেখে গলার কাছে কষ্টটা দলা পাকিয়ে আসছিল সুরঞ্জনের। কাঁপা গলায় বলল,ক্যয়া হুয়া সু?
তুম লট কর ইঁহা আয়েথে?
হাঁ,ইয়ে সব থা উঁহা,সির্ফ তুম নেহি থি সু।
ম্যায় কুছ বোলনা চাহতি হুঁ।প্লিজ শুনো না রঞ্জন।
কওন সা বাত! কিঁউ চলি গ্যয়ি থি মুঝে ছোড় কর…তুমহারি মজবুরি …ইয়ে সব না? উস পল্ ইয়ে সব কিঁউ নহি সোচা?কিঁউ নেহি বাতায়া মুঝে?চিটঠি পে তো বোল সকতি থি?আজ শুনকর্ ক্যয়া করু ম্যায়?অব হম দোনোকা দুনিয়া অলগ;ম্যায় চহা করভি কুছ নহি কর পাউঙ্গা।ভালো থেকো সু।
তুমভি ভালো থেকো।
ম্যায় খুদকো লেকর জিলুঙ্গি আনেওয়ালা পল্।টেক কেয়ার।
সুনয়নার হাত থেকে নিজের হাতটা টেনে নিয়ে ওর চোখে একবার তাকিয়ে চলে এল সুরঞ্জন। পিছনে তখন সুনয়না চিঠিগুলো হাতে নিয়ে ওর যাওয়ার পথের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে।






Comments