ধনত্রয়োদশীতে ধনলক্ষ্মীর আহ্বান | আলোর উৎসবে সাজুক অন্দরমহল | ফিউশন মিষ্টি | রবিবারের গল্প: যে ঘরে কেউ খুন হয়নি
Updated: 2 days ago

ধনত্রয়োদশীতে ধনলক্ষ্মীর আহ্বান
শরতের নীল আকাশে যখন হেমন্তের আগমনী বার্তা, বাতাসে হালকা শীতের পরশ, আর চারপাশে উৎসবের শেষ না হওয়া রেশ, তখনই বাঙালির দোরগোড়ায় এসে উপস্থিত হয় আলোর উৎসব। দুর্গাপুজোর আনন্দ, লক্ষ্মীপুজোর আরাধনা পেরিয়ে দীপাবলির আগে যে বিশেষ তিথিটি নিয়ে মানুষের মধ্যে তৈরি হয় কেনাকাটার উৎসাহ, তার নাম ধনতেরাস বা ধনত্রয়োদশী। নতুন বাসন, সোনা, রুপো, গয়না কিংবা সংসারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার জন্য এই দিনটিকে শুভ বলে মনে করেন বহু মানুষ। দোকানে দোকানে সাজানো থাকে নতুন সংগ্রহ, স্বর্ণালংকারের বিপণিতে বাড়ে ক্রেতাদের ভিড়, আর গৃহস্থের অন্দরমহলে শুরু হয় নতুন কিছু কেনার প্রস্তুতি। তবে ধনতেরাস কি কেবলই কেনাকাটার উৎসব? এর অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে সুপ্রাচীন পৌরাণিক আখ্যান, দেবদেবীর আরাধনা, সুস্বাস্থ্যের কামনা এবং মানুষের চিরন্তন সমৃদ্ধিলাভের আকাঙ্ক্ষা।

ধনতেরাস শব্দটির মধ্যেই রয়েছে উৎসবের মূল পরিচয়। ধন অর্থাৎ সম্পদ এবং ত্রয়োদশী অর্থাৎ চান্দ্রপঞ্জিকার ত্রয়োদশী তিথি। কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশী তিথিতে পালিত হয় এই উৎসব। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এর উদ্যাপনের রীতি আলাদা হলেও মূল ভাবনা এক—জীবনে আসুক শুভ, সংসারে বাড়ুক সমৃদ্ধি, দূর হোক অভাব ও অমঙ্গল। উত্তর ভারত, গুজরাত, মহারাষ্ট্র এবং রাজস্থানে ধনতেরাস অত্যন্ত জনপ্রিয়। বর্তমানে বাংলাতেও এই উৎসবের পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা ক্রমশ বেড়েছে। বিশেষ করে শহুরে মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পরিবারে ধনতেরাস উপলক্ষে সোনা, রুপো কিংবা নতুন বাসন কেনার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো।
সমুদ্র মন্থন ও দেববৈদ্য ধন্বন্তরির আবির্ভাব:
ধনতেরাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে হিন্দু পুরাণের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাহিনি—সমুদ্র মন্থন। পুরাণ অনুযায়ী, একসময় দেবতা ও অসুররা অমৃত লাভের আশায় ক্ষীরসাগর মন্থন করার সিদ্ধান্ত নেন। মন্দার পর্বতকে মন্থনদণ্ড এবং বাসুকি নাগকে রজ্জু করে শুরু হয় সেই মহাজাগতিক মন্থন। সমুদ্রের গভীর থেকে একে একে উঠে আসতে থাকে নানা ঐশ্বরিক সম্পদ, রত্ন এবং অলৌকিক উপাদান। সেই মন্থনেরই এক পর্যায়ে আবির্ভূত হন দেববৈদ্য ধন্বন্তরি। তাঁর হাতে ছিল অমৃতপূর্ণ কলস। তাঁকে আয়ুর্বেদশাস্ত্রের অধিষ্ঠাতা এবং দেবতাদের চিকিৎসক হিসেবে মান্য করা হয়।
ধন্বন্তরির আবির্ভাবের সঙ্গে ধনতেরাসের সম্পর্ক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই দিনটি তাই কেবল অর্থসম্পদ লাভের জন্য নয়, সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর কামনার জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় ঐতিহ্যে স্বাস্থ্যকে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। অর্থ, অলংকার, বাড়ি কিংবা জমিজমা—সবই মূল্যহীন হয়ে পড়ে যদি শরীর সুস্থ না থাকে। ধন্বন্তরির আরাধনা আমাদের সেই প্রাচীন উপলব্ধির কথাই মনে করিয়ে দেয়।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ধনতেরাসের দিন ধন্বন্তরি জয়ন্তী হিসেবেও পালিত হয়। চিকিৎসক, আয়ুর্বেদ অনুরাগী এবং স্বাস্থ্যসচেতন মানুষ এই দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। অনেক জায়গায় আয়ুর্বেদ, ভেষজ চিকিৎসা ও সুস্থ জীবনযাপন নিয়ে আলোচনা এবং নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দেববৈদ্য ধন্বন্তরির কাছে প্রার্থনা করা হয় রোগমুক্তি, দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবনের জন্য। অর্থাৎ ধনতেরাসের প্রকৃত দর্শনে ধন এবং স্বাস্থ্য পরস্পরের পরিপূরক।

যমদীপের আলোয় অকালমৃত্যুর ভয় জয়:
ধনতেরাসের আর একটি বিশেষ ঐতিহ্য হল যমদীপদান। এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজা হিমের পুত্রের একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনি। কথিত আছে, রাজা হিমের পুত্রের জন্মকুণ্ডলীতে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল যে বিবাহের চতুর্থ দিনে সাপের কামড়ে তাঁর মৃত্যু হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে নববধূ অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়েন। স্বামীর প্রাণরক্ষার জন্য তিনি এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। বিবাহের নির্দিষ্ট রাতে তিনি ঘরের প্রবেশপথে সোনা, রুপো ও মূল্যবান অলংকারের স্তূপ সাজিয়ে রাখেন। চারদিকে জ্বালিয়ে দেন অসংখ্য প্রদীপ। এরপর স্বামীকে জাগিয়ে রাখতে সারারাত গল্প, গান ও কথাবার্তায় কাটিয়ে দেন।
মৃত্যুর দেবতা যম সাপের রূপ ধারণ করে রাজপুত্রের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রদীপের তীব্র আলো এবং অলংকারের ঝলকানিতে তিনি পথ হারিয়ে ফেলেন। সারারাত কেটে যায়। পরদিন সকালে রাজপুত্রের প্রাণরক্ষা হয়। এই কাহিনির স্মরণে ধনতেরাসের সন্ধ্যায় বাড়ির বাইরে প্রদীপ জ্বালানোর রীতি প্রচলিত হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
যমদীপের এই ঐতিহ্য শুধু মৃত্যুভয় দূর করার প্রতীক নয়, এটি মানুষের আশাবাদ ও ভালোবাসারও এক অনন্য উপাখ্যান। অন্ধকারের সামনে আলোর জয়, ভয়কে অতিক্রম করে জীবনের প্রতি আস্থা—এই ভাবনাই যেন যমদীপের মধ্যে প্রকাশিত হয়। অনেক পরিবারে বাড়ির প্রবেশদ্বারে দক্ষিণমুখী করে প্রদীপ জ্বালানো হয়। কোথাও মাটির প্রদীপে তেল ও সলতে দিয়ে আরাধনা করা হয়, কোথাও আবার বিশেষ মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে যমদেবের উদ্দেশে প্রার্থনা জানানো হয়।
কেন ধনতেরাসে সোনা, রুপো ও বাসন কেনার রীতি?
ধনতেরাসের সবচেয়ে পরিচিত অনুষঙ্গ নিঃসন্দেহে কেনাকাটা। বিশেষ করে সোনা ও রুপো কেনার ক্ষেত্রে এই দিনটিকে অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। বহু পরিবারে বিশ্বাস, ধনতেরাসে নতুন ধাতু বা মূল্যবান সামগ্রী ঘরে আনলে সংসারে শুভলাভ ও সমৃদ্ধি আসে। তাই এই দিনে স্বর্ণালংকার, রুপোর কয়েন, পিতলের প্রদীপ, তামার পাত্র কিংবা নতুন রান্নার বাসন কেনার রীতি রয়েছে।

প্রাচীন ভারতীয় গৃহস্থ সংস্কৃতিতে ধাতুর বাসন ছিল দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পিতল, কাঁসা ও তামার পাত্রে রান্না করা, খাবার পরিবেশন কিংবা জল রাখার প্রচলন ছিল বহু পুরনো। উৎসবের আগে নতুন বাসন কেনা ছিল সংসারের নতুন সূচনা এবং গৃহস্থালির সমৃদ্ধির প্রতীক। সেই ঐতিহ্যই সময়ের সঙ্গে ধনতেরাসের কেনাকাটার প্রথায় জায়গা করে নিয়েছে।
সোনার প্রতি ভারতীয়দের আকর্ষণও বহু প্রাচীন। সোনা কেবল অলংকার নয়, এটি সঞ্চয়, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক ভরসার প্রতীক। বিশেষত ভারতীয় পরিবারে মেয়ের বিয়ে, সন্তানের ভবিষ্যৎ কিংবা বিপদের দিনের সঞ্চয় হিসেবে সোনার গয়নার গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। ধনতেরাসের মতো শুভ তিথিতে তাই অনেক পরিবার সামর্থ্য অনুযায়ী সোনা কেনার পরিকল্পনা করে।
তবে সোনা কেনা সম্ভব না হলেও উৎসবের আনন্দে কোনও ঘাটতি থাকে না। একটি ছোট রুপোর কয়েন, পিতলের প্রদীপ, তামার পাত্র কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের নতুন বাসনও হতে পারে শুভ কেনাকাটা। এমনকি সংসারের প্রয়োজনীয় কোনও সামগ্রী কেনাকেও অনেকে এই দিনের শুভ সূচনা বলে মনে করেন। আসল কথা হল, কেনাকাটা যেন আনন্দের হয়, আর্থিক চাপের কারণ না হয়ে ওঠে।

ধনলক্ষ্মীর আরাধনা ও কুবের পূজা:
ধনতেরাসের সঙ্গে দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার সম্পর্ক গভীর। হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে দেবী লক্ষ্মী হলেন ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য, শ্রী, সম্পদ ও সমৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী। তাঁর কৃপায় সংসারে আসে সুখ, শান্তি ও সচ্ছলতা। অন্যদিকে কুবেরকে ধনসম্পদের অধিপতি হিসেবে মান্য করা হয়। তাই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধনতেরাসের সন্ধ্যায় লক্ষ্মী ও কুবেরের পূজা করার রীতি রয়েছে।
পুজোর আগে বাড়ি পরিষ্কার করা হয়। বিশেষ করে প্রবেশদ্বার, ঠাকুরঘর এবং অর্থসম্পদ রাখার জায়গাটি পরিচ্ছন্ন করে সাজানো হয়। অনেক পরিবারে চালের গুঁড়ো দিয়ে আঁকা হয় আলপনা। কোথাও পদ্মফুলের নকশা, কোথাও লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, আবার কোথাও প্রদীপের সারি দিয়ে সাজানো হয় বাড়ির প্রবেশপথ। বিশ্বাস করা হয়, পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর পরিবেশে দেবী লক্ষ্মীর আগমন ঘটে।
সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালিয়ে ফুল, ধূপ, দীপ, ফল, মিষ্টি ও নৈবেদ্য দিয়ে পূজা করা হয়। নতুন কেনা সোনা বা রুপোর সামগ্রী দেবীর সামনে রেখে আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন অনেকে। ব্যবসায়ীরা তাঁদের হিসাবের খাতা, নগদ অর্থ কিংবা ব্যবসায়িক সামগ্রীও পূজার স্থানে রাখেন। নতুন আর্থিক বছরের শুভ সূচনার প্রতীক হিসেবে কোথাও কোথাও এই দিনটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
তবে পুজোর নিয়ম অঞ্চল ও পরিবারভেদে আলাদা হতে পারে। কোথাও লক্ষ্মী-গণেশের পূজা হয়, কোথাও কুবেরের আরাধনা, আবার কোথাও ধন্বন্তরির পূজার মাধ্যমে দিনটির সূচনা করা হয়। এই বৈচিত্র্যই ভারতীয় উৎসব সংস্কৃতির সৌন্দর্য।

বাঙালির লক্ষ্মীভাবনায় ধনতেরাসের নতুন পরিচয় :
বাংলার ঘরে লক্ষ্মী মানেই অন্ন, শস্য, গোলাভরা ধান, সংসারের সচ্ছলতা এবং পরিবারের মঙ্গল। কোজাগরী পূর্ণিমার লক্ষ্মীপুজো থেকে শুরু করে প্রতি বৃহস্পতিবারের লক্ষ্মী আরাধনা—বাঙালি গৃহস্থের জীবনে দেবী লক্ষ্মী যেন ঘরেরই একজন। আলপনায় আঁকা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, ধানের শিষ, কড়ি, শঙ্খ, পদ্মফুল এবং লক্ষ্মীর ঝাঁপি বাঙালির গৃহস্থ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
প্রথাগত বাঙালি লক্ষ্মীপুজোয় ধান, চাল, ফলমূল, নারকেল, মিষ্টি এবং নানা ধরনের নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। কৃষিনির্ভর সমাজে শস্যই ছিল সম্পদের প্রধান পরিচয়। গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু এবং সংসারে অন্নের অভাব না থাকা—এই ছিল সমৃদ্ধির মাপকাঠি। তাই বাঙালির লক্ষ্মীভাবনায় সোনাদানা বা অলংকারের চেয়েও অন্নপূর্ণতার গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি।
বর্তমানে ধনতেরাসের জনপ্রিয়তা বাড়লেও বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যকে ভুলে যাওয়ার কোনও কারণ নেই। বরং উত্তর ও পশ্চিম ভারতের এই উৎসবের সঙ্গে বাঙালির গৃহস্থ সংস্কৃতির সুন্দর মেলবন্ধন ঘটতে পারে। ধনলক্ষ্মীর আরাধনার পাশাপাশি অন্নের মর্যাদা, কৃষকের শ্রম এবং সংসারের প্রকৃত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়াই হতে পারে এই উৎসবের বিশেষ বার্তা।
বাজারজুড়ে উৎসবের রং ও কেনাকাটার উন্মাদনা:
ধনতেরাসের কয়েকদিন আগে থেকেই বাজারে শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। স্বর্ণালংকারের দোকানে সাজানো হয় নতুন ডিজাইনের হার, বালা, কানের দুল, আংটি ও মঙ্গলসূত্র। রুপোর দোকানে পাওয়া যায় লক্ষ্মী-গণেশের মূর্তি, কয়েন, প্রদীপ, থালা এবং নানা ধরনের উপহারসামগ্রী। বাসনের দোকানে পিতল, তামা, কাঁসা ও স্টিলের নতুন সংগ্রহ সাজিয়ে রাখা হয়।
বড় বিপণি থেকে শুরু করে পাড়ার ছোট দোকান—সব জায়গাতেই থাকে উৎসবের আবহ। অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রেও ধনতেরাস উপলক্ষে বিশেষ অফার ও ছাড় দেওয়া হয়। অনেক পরিবার আগে থেকেই বাজেট তৈরি করে রাখে। কেউ গয়না কেনেন, কেউ সংসারের জন্য নতুন বাসন, আবার কেউ ভবিষ্যতের সঞ্চয় হিসেবে রুপোর কয়েন সংগ্রহ করেন।
এই কেনাকাটার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও। উৎসবকে কেন্দ্র করে স্বর্ণকার, রুপোর কারিগর, বাসন ব্যবসায়ী, পরিবহণকর্মী এবং ছোট ব্যবসায়ীদের কাজ বাড়ে। বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সারা বছরের একটি বড় বিক্রির প্রত্যাশা করেন এই সময়টিকে ঘিরে। ফলে ধনতেরাস শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, দেশের বাজার অর্থনীতির ক্ষেত্রেও একটি উল্লেখযোগ্য সময়।

তবে কেনাকাটার আনন্দে সচেতনতা জরুরি। সোনা কেনার সময় হলমার্ক, ক্যারেট, বিশুদ্ধতা, মজুরি এবং জিএসটির বিষয়টি ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। রুপোর ক্ষেত্রেও বিশুদ্ধতার পরিচয় দেখে নেওয়া প্রয়োজন। কেবল শুভ তিথির আবেগে অপ্রয়োজনীয় ঋণ বা অতিরিক্ত খরচের পথে না গিয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কেনাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সম্পদের সংজ্ঞা বদলাক সময়ের সঙ্গে:
আজকের পৃথিবীতে সম্পদের অর্থ অনেক বিস্তৃত। একসময় জমি, সোনা, গবাদি পশু কিংবা শস্যভাণ্ডার ছিল সমৃদ্ধির প্রধান পরিচয়। বর্তমানে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা, প্রযুক্তি, আর্থিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিমা, সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। একটি পরিবারের প্রকৃত সমৃদ্ধি নির্ভর করে তার সদস্যদের সুস্থতা, নিরাপত্তা এবং সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার সুযোগের উপর।
ধনতেরাস তাই নিজের আর্থিক জীবনকে নতুন করে পর্যালোচনা করারও একটি উপলক্ষ হতে পারে। অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে নিয়মিত সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করা, পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরীক্ষা করানো কিংবা সন্তানের শিক্ষার জন্য অর্থ জমিয়ে রাখা—এসবও সমৃদ্ধিরই অংশ। শুধু সম্পদ সংগ্রহ নয়, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং সংরক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এর পাশাপাশি মানসিক শান্তি ও পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না। যে সংসারে ভালোবাসা নেই, সেখানে সোনার অলংকারও আনন্দ দিতে পারে না। যে বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা অবহেলিত, শিশুদের শৈশব অনিরাপদ, কিংবা পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার অভাব, সেই বাড়ির ঐশ্বর্য কখনও পূর্ণতা পায় না।
উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ুক অন্যের জীবনেও:
ধনতেরাসের আলো শুধু নিজের বাড়ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুক কেন? উৎসবের প্রকৃত আনন্দ তখনই পূর্ণ হয়, যখন নিজের আনন্দের কিছুটা অংশ অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। বাড়ির পরিচারিকা, নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা দীর্ঘদিন পাশে থাকা মানুষদের জন্য ছোট্ট উপহার রাখা যেতে পারে। অসহায় কোনও পরিবারের শিশুর হাতে নতুন পোশাক তুলে দেওয়া যায়। বৃদ্ধাশ্রমে ফল ও মিষ্টি পৌঁছে দেওয়া যায়। স্থানীয় কারিগরদের তৈরি প্রদীপ, মাটির বাসন কিংবা হাতে তৈরি সাজসজ্জার সামগ্রী কিনে তাঁদের জীবিকায় সহায়তা করা যায়।

উৎসবের বাজারে বড় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি স্থানীয় শিল্পীদেরও জায়গা দেওয়া প্রয়োজন। মৃৎশিল্পীরা সারা বছর ধরে প্রদীপ, লক্ষ্মীর মূর্তি, ধূপদান এবং নানা ধরনের সামগ্রী তৈরি করেন। তাঁদের তৈরি জিনিস কিনলে যেমন ঘরে আসে ঐতিহ্যের ছোঁয়া, তেমনই বেঁচে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা শিল্পকর্ম।
এমনকী বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর সময় বিদ্যুৎ সাশ্রয়, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ বেছে নেওয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। উৎসবের আলো যেন পরিবেশের অন্ধকার না বাড়ায়, সেটিও আমাদের দায়িত্ব।
ধনলক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা হোক পূর্ণতার:
ধনতেরাসের সন্ধ্যায় যখন বাড়ির প্রবেশদ্বারে জ্বলে ওঠে প্রথম প্রদীপ, নতুন বাসনের গায়ে প্রতিফলিত হয় আলো, ঠাকুরঘরে ধূপের গন্ধে ভরে ওঠে পরিবেশ, তখন মনে হয় এ যেন কেবল একটি উৎসবের সূচনা নয়, নতুন করে ভালো থাকারও এক প্রতিশ্রুতি। জীবনের নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানুষ স্বপ্ন দেখে, সংসারকে সুন্দর করে সাজাতে চায়, প্রিয়জনদের মুখে হাসি দেখতে চায়। সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষারই নাম সমৃদ্ধি।
ধনতেরাস আমাদের শেখায়, সম্পদ মানে শুধু অর্থ বা অলংকার নয়। সুস্থ শরীর, শান্ত মন, ভালোবাসায় ভরা পরিবার, সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ এবং অন্যের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও অমূল্য সম্পদ। দেববৈদ্য ধন্বন্তরির আবির্ভাব আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাস্থ্যের গুরুত্ব, যমদীপের কাহিনি শেখায় জীবনের প্রতি ভালোবাসা, আর ধনলক্ষ্মীর আরাধনা জানায় শুভ ও সচ্ছল ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
তাই এই ধনত্রয়োদশীতে প্রার্থনা হোক, প্রতিটি ঘরে আসুক অন্ন ও আনন্দ, প্রতিটি পরিবারে থাকুক সুস্বাস্থ্য ও শান্তি, কর্মে আসুক সাফল্য, সঞ্চয়ে আসুক নিরাপত্তা। যে সম্পদ মানুষকে ভালো থাকতে শেখায়, যে সমৃদ্ধি অন্যের মুখেও হাসি ফোটায়, সেই সম্পদেই পূর্ণ হোক জীবন।
প্রদীপের আলোয় দূর হোক অন্ধকার, ধনলক্ষ্মীর আশীর্বাদে সমৃদ্ধ হোক অন্দরমহল। ধনতেরাস হয়ে উঠুক শুধু কেনাকাটার দিন নয়, বরং সুস্থতা, সম্প্রীতি, মানবিকতা এবং শুভ সূচনার এক সুন্দর উৎসব।

আলোর উৎসবে সাজুক অন্দরমহল
নিজস্ব প্রতিনিধি
উৎসবের আনন্দের একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে ঘর সাজানোর প্রস্তুতি। দুর্গাপুজোর পর যখন দীপাবলি দরজায় কড়া নাড়ে, তখন বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন নতুন করে সেজে ওঠার অপেক্ষায় থাকে। কোথাও ঝাড়বাতির আলো, কোথাও রঙিন কুশন, কোথাও ফুলের মালা, আবার কোথাও ছোট ছোট প্রদীপের সারি। দীপাবলি মানেই শুধু বাইরে আলোর রোশনাই নয়, নিজের অন্দরমহলকে নতুন করে আবিষ্কার করারও এক সুন্দর উপলক্ষ।
বাড়ি আমাদের কাছে কেবল চার দেওয়ালের আশ্রয় নয়। প্রতিটি ঘরে জমে থাকে স্মৃতি, ভালোবাসা, অভ্যাস এবং ব্যক্তিগত রুচির ছাপ। উৎসবের সাজে তাই প্রয়োজন এমন এক পরিকল্পনা, যা ঘরকে সুন্দর করে তুলবে, অথচ তার স্বাভাবিক আরাম ও ব্যবহারিক সুবিধাকে নষ্ট করবে না। অল্প কিছু রঙ, আলো, ফুল এবং সৃজনশীলতার সাহায্যেই তৈরি করা যায় আকর্ষণীয় উৎসবের আবহ।
সাজসজ্জা শুরু করার আগে প্রয়োজন ঘর পরিষ্কার ও অপ্রয়োজনীয় জিনিস সরিয়ে ফেলা। অনেক সময় বাড়িতে এমন বহু সামগ্রী জমে থাকে, যেগুলি দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয় না। পুরনো কাগজ, ভাঙা শোপিস, অপ্রয়োজনীয় বাক্স কিংবা অব্যবহৃত কাপড় সরিয়ে দিলে ঘর অনেক বেশি খোলামেলা দেখায়।
আলমারি, বইয়ের তাক, জানলার পাল্লা, দরজার কোণ এবং আসবাবের উপরিভাগ ভালো করে পরিষ্কার করা উচিত। পর্দা, কুশন কভার এবং বিছানার চাদর ধুয়ে নতুন করে ব্যবহার করলে ঘরের চেহারায় দ্রুত পরিবর্তন আসে। পরিচ্ছন্নতাই সুন্দর অন্দরসজ্জার প্রথম শর্ত।

তবে সব পুরনো জিনিস ফেলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ঠাকুমার আমলের পিতলের প্রদীপ, পুরনো কাঠের বাক্স, মাটির পুতুল কিংবা পারিবারিক স্মৃতিবিজড়িত কোনও সামগ্রী নতুন সাজে ব্যবহার করা যায়। পুরনো ও নতুনের মেলবন্ধনেই তৈরি হতে পারে এক অনন্য ঘরোয়া নান্দনিকতা।
বাড়ির প্রবেশদ্বার হল অতিথির কাছে অন্দরমহলের প্রথম পরিচয়। তাই দীপাবলির সাজ শুরু হোক দরজা থেকেই। দরজার দুপাশে ফুলের মালা, ছোট টেরাকোটার টব, পিতলের প্রদীপ কিংবা রঙিন লণ্ঠন রাখা যেতে পারে।
প্রবেশপথের মেঝেতে আলপনা আঁকা বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্য। চালের গুঁড়ো দিয়ে আঁকা পদ্ম, শঙ্খ, প্রদীপ, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ কিংবা জ্যামিতিক নকশা বাড়ির পরিবেশে নিয়ে আসে উৎসবের আমেজ। যাঁরা দীর্ঘক্ষণ আলপনা আঁকার সময় পান না, তাঁরা রেডিমেড আলপনা স্টিকারও ব্যবহার করতে পারেন। তবে হাতে আঁকা আলপনার নিজস্ব সৌন্দর্য কখনও ম্লান হয় না।
দরজায় ফুলের বন্দনবার ব্যবহার করা যায়। গাঁদা, রজনীগন্ধা, গোলাপ অথবা কৃত্রিম ফুলের মালা দিয়ে তৈরি করা যায় সুন্দর তোরণ। ছোট একটি নামফলক বা উৎসবের শুভেচ্ছাবার্তাও সাজে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
দীপাবলির সাজে আলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে আলো মানেই অতিরিক্ত ঝলমলে সাজ নয়। বরং আলোর স্তরবিন্যাসের মাধ্যমে ঘরের সৌন্দর্য অনেক বেশি ফুটিয়ে তোলা যায়।
ড্রয়িংরুমের কোণে একটি সুন্দর ফ্লোর ল্যাম্প, জানলার ধারে ফেয়ারি লাইট, দেওয়ালের পাশে উষ্ণ আলো ছড়ানো ওয়াল ল্যাম্প এবং টেবিলে ছোট একটি লণ্ঠন—এই কয়েকটি উপাদানেই তৈরি হতে পারে মনোরম পরিবেশ। হলুদাভ বা উষ্ণ সাদা আলো ঘরে আরামদায়ক আবহ তৈরি করে। অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো চোখে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, তাই আলো নির্বাচনে ভারসাম্য রাখা জরুরি।

মাটির প্রদীপের আবেদন চিরকালীন। ছোট মাটির প্রদীপে তেল বা ঘি দিয়ে সলতে জ্বালানো যায়। পিতল, কাঁসা কিংবা টেরাকোটার প্রদীপও ঘরের সাজে ঐতিহ্যের ছোঁয়া এনে দেয়। প্রদীপ রাখার সময় পর্দা, কাগজ, শুকনো ফুল বা দাহ্য সামগ্রী থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। শিশু ও পোষ্য থাকলে প্রদীপ এমন জায়গায় রাখা উচিত, যেখানে অসাবধানতাবশত হাত লাগার আশঙ্কা নেই।
ব্যালকনি ও জানলায় আলো সাজানোর ক্ষেত্রে ভালো মানের বৈদ্যুতিক লাইট ব্যবহার করা যেতে পারে। খোলা তার, অতিরিক্ত সংযোগ এবং নিম্নমানের আলো এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
ঘরের রঙের পরিবর্তন না করেও উৎসবের সাজে নতুনত্ব আনা সম্ভব। কুশন কভার, টেবিল রানার, পর্দা, সোফার থ্রো এবং বিছানার চাদরের রঙ বদলে ফেললেই ঘরের চেহারা অনেকটা পাল্টে যায়।
দীপাবলির সাজে সোনালি, মেরুন, গাঢ় লাল, কমলা, সবুজ এবং রাজকীয় নীল বিশেষ আকর্ষণীয়। যাঁরা আধুনিক মিনিমাল সাজ পছন্দ করেন, তাঁরা অফ-হোয়াইট, বেইজ, সোনালি এবং হালকা বাদামির সংমিশ্রণ বেছে নিতে পারেন। অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী সাজে মেরুন ও সোনালি রঙের ব্যবহার ঘরে উৎসবের গভীরতা এনে দেয়।
সোফার উপর কয়েকটি রঙিন কুশন, তার সঙ্গে মানানসই একটি শাল বা থ্রো, কেন্দ্রীয় টেবিলে ফুলের সাজ—এতটুকুই যথেষ্ট। অতিরিক্ত জিনিস দিয়ে ঘর ভরিয়ে ফেললে বরং সৌন্দর্য কমে যেতে পারে।
ফুল ছাড়া উৎসবের সাজ যেন অসম্পূর্ণ। গাঁদা, গোলাপ, রজনীগন্ধা, জুঁই এবং পদ্মের ব্যবহার ঘরের পরিবেশে এনে দেয় সতেজতা। প্রবেশদ্বারে গাঁদার মালা, ডাইনিং টেবিলে ছোট ফুলদানি, ঠাকুরঘরে পদ্ম বা জবা এবং বসার ঘরে রজনীগন্ধার সাজ হতে পারে চমৎকার।
ফুল সাজানোর ক্ষেত্রে পিতল, কাঁসা, মাটির পাত্র কিংবা কাচের ফুলদানি ব্যবহার করা যায়। বড় ফুলদানিতে বেশি ফুল না রেখে কয়েকটি লম্বা ডাঁটার ফুল সাজালে আধুনিক ও মার্জিত দেখায়। আবার চওড়া থালায় জল, ফুলের পাপড়ি এবং কয়েকটি ভাসমান ফুল দিয়ে তৈরি করা যায় সুন্দর ফ্লোটিং ফ্লাওয়ার ডেকর।
তাজা ফুল ব্যবহার করলে প্রতিদিন জল বদলানো জরুরি। শুকনো ফুল বা পটপৌরি দিয়েও সাজানো যায় ঘরের বিশেষ কোণ। তবে তীব্র সুগন্ধযুক্ত ফুল বা সুগন্ধি ব্যবহারে পরিবারের কারও অ্যালার্জি থাকলে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

দীপাবলির সাজে ঠাকুরঘর বিশেষ গুরুত্ব পায়। লক্ষ্মী-গণেশের আসন পরিষ্কার করে নতুন কাপড় দিয়ে সাজানো যেতে পারে। পিতলের প্রদীপ, ধূপদান, ঘণ্টা, ফুলের মালা এবং ছোট আলপনা দিয়ে তৈরি করা যায় সুন্দর পূজার পরিবেশ।
লাল, হলুদ বা গেরুয়া রঙের কাপড় ঠাকুরঘরে ঐতিহ্যবাহী আবহ তৈরি করে। দেবদেবীর মূর্তি বা ছবির সামনে অতিরিক্ত সাজসজ্জা না করে পরিচ্ছন্নতা ও সুষমা বজায় রাখা ভালো। পুজোর সামগ্রী এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে আরাধনার সময় কোনও অসুবিধা না হয়।
উৎসবের সময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন। তাই ডাইনিং টেবিলের সাজও হতে পারে বিশেষ আকর্ষণ। একটি সুন্দর টেবিল রানার, কয়েকটি কাপড়ের ন্যাপকিন, পিতল বা কাচের বাটি এবং মাঝখানে ছোট ফুলের সাজ টেবিলকে করে তুলতে পারে উৎসবমুখর।
সোনালি বর্ডার দেওয়া প্লেট, মাটির বাটি বা ঐতিহ্যবাহী কাঁসার বাসন ব্যবহার করলে সাজে আসে আভিজাত্য। তবে খাবার পরিবেশনের সুবিধা যেন ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। টেবিলের মাঝখানে বড় সাজসজ্জার সামগ্রী রাখলে খাবার পরিবেশন ও কথাবার্তায় অসুবিধা হতে পারে।
শহুরে জীবনে অনেকেরই বাড়ির সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ব্যালকনি। দীপাবলিতে এই ছোট্ট জায়গাটিকে সাজিয়ে তোলা যায় অসাধারণভাবে। কয়েকটি টেরাকোটার টব, ঝুলন্ত গাছ, বাঁশের লণ্ঠন, মাটির প্রদীপ এবং ছোট আলো দিয়ে তৈরি হতে পারে সুন্দর উৎসবের কোণ।
যাঁদের জায়গা কম, তাঁরা দেয়ালে ঝোলানো প্ল্যান্টার ব্যবহার করতে পারেন। মানিপ্ল্যান্ট, তুলসী, মানি ট্রি বা ছোট ফুলের গাছ ব্যালকনিকে সবুজ করে তুলবে। সন্ধ্যায় চা হাতে বসে থাকার জন্য একটি ছোট চেয়ার ও টেবিলও রাখা যেতে পারে।
প্রতিবছর নতুন সাজসজ্জার জিনিস কেনার প্রয়োজন নেই। পুরনো কাচের বোতল রং করে ফুলদানি তৈরি করা যায়। অব্যবহৃত কাচের বয়ামে ফেয়ারি লাইট রেখে সুন্দর লণ্ঠন বানানো যায়। পুরনো শাড়ির কাপড় দিয়ে টেবিল রানার, কুশন কভার কিংবা ছোট ঝালর তৈরি করা সম্ভব।
মাটির প্রদীপ আগের বছরের হলে পরিষ্কার করে নতুন রঙে সাজিয়ে নেওয়া যায়। পুরনো পিতলের বাসন পালিশ করে আবার ব্যবহার করা যায়। কাগজের লণ্ঠন, হাতে তৈরি কাগজের ফুল এবং কাপড়ের বন্দনবারও পরিবেশবান্ধব সাজের অংশ হতে পারে।
দীপাবলি আনন্দের উৎসব হলেও পরিবেশ ও নিরাপত্তার কথা ভুলে গেলে চলবে না। অতিরিক্ত শব্দ ও ধোঁয়া বায়ুদূষণ বাড়ায় এবং শিশু, প্রবীণ মানুষ, অসুস্থ ব্যক্তি ও পশুপাখির কষ্টের কারণ হতে পারে। তাই শব্দবাজি এড়িয়ে প্রদীপ, আলো এবং সৃজনশীল সাজের মাধ্যমে উৎসব উদ্যাপন করা উচিত।

বৈদ্যুতিক আলোর ক্ষেত্রে মানসম্মত তার ও সংযোগ ব্যবহার করতে হবে। একাধিক যন্ত্র একই সকেটে লাগিয়ে বিদ্যুতের উপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়। প্রদীপ জ্বালিয়ে কখনও ঘর ফাঁকা রাখা যাবে না। শিশুদের নাগালের বাইরে আগুন ও বৈদ্যুতিক সংযোগ রাখতে হবে।
দীপাবলির ঘর সাজানোর সবচেয়ে সুন্দর দিক হল, এই কাজে পরিবারের প্রত্যেকে অংশ নিতে পারেন। কেউ আলপনা আঁকবেন, কেউ ফুল সাজাবেন, কেউ প্রদীপ পরিষ্কার করবেন, কেউ আবার রান্নাঘরে তৈরি করবেন উৎসবের মিষ্টি। এই সম্মিলিত প্রস্তুতিই উৎসবের আসল আনন্দ।
ঘরের সৌন্দর্য কেবল দামি আসবাব বা বিলাসবহুল আলোয় তৈরি হয় না। পরিচ্ছন্নতা, আন্তরিকতা, সৃজনশীলতা এবং পরিবারের মানুষের উপস্থিতিই একটি বাড়িকে সত্যিকারের সুন্দর করে তোলে। তাই এই দীপাবলিতে অন্দরমহল সাজুক নিজের রুচিতে, নিজের ভালোবাসায়। আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি জানলায়, প্রতিটি সম্পর্কের মধ্যে
।
মিষ্টিমুখে ফিউশন
উৎসব মানেই মিষ্টিমুখ। তবে সেই মিষ্টিমুখ যদি হয় একটু অন্য রকম, তাহলে আনন্দও বেড়ে যায় কয়েক গুণ। বাঙালির চিরচেনা সন্দেশ, রসগোল্লা, পায়েস কিংবা ক্ষীরের সঙ্গে যখন মিশে যায় চকোলেট, কফি, স্ট্রবেরি, ক্যারামেল বা বিদেশি ডেজার্টের স্বাদ, তখন তৈরি হয় অভিনব ফিউশন মিষ্টি। ধনতেরাস, দীপাবলি কিংবা ভাইফোঁটার অতিথি আপ্যায়নে পরিবেশন করতে পারো এই বারোটি সহজ ও আকর্ষণীয় মিষ্টি।
১. চকোলেট সন্দেশ

কী কী লাগবে: ছানা ২৫০ গ্রাম, গুঁড়ো চিনি ৪ টেবিল চামচ, কোকো পাউডার ২ টেবিল চামচ, গলানো ডার্ক চকোলেট ৫০ গ্রাম, এলাচ গুঁড়ো সামান্য, পেস্তা কুচি।

কীভাবে বানাবেন: প্রথমে ছানা ভালো করে মেখে মসৃণ করে নাও। কড়াইয়ে ছানা ও গুঁড়ো চিনি দিয়ে অল্প আঁচে নাড়তে থাকো। মিশ্রণটি সামান্য শুকিয়ে এলে কোকো পাউডার ও গলানো চকোলেট মিশিয়ে দাও। এলাচ গুঁড়ো দিয়ে আরও কিছুক্ষণ নাড়ো। মিশ্রণটি কড়াই ছেড়ে এলে নামিয়ে ঠান্ডা করো। হাতে সামান্য ঘি মেখে ছোট ছোট সন্দেশের আকার দাও। উপরে পেস্তা কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করো।
২. রসগোল্লা তিরামিসু

কী কী লাগবে: ছোট রসগোল্লা ৬টি, হুইপড ক্রিম ১ কাপ, মাসকারপোন চিজ বা ক্রিম চিজ আধ কাপ, গুঁড়ো চিনি ২ টেবিল চামচ, ইনস্ট্যান্ট কফি ১ চা চামচ, গরম জল ২ টেবিল চামচ, কোকো পাউডার সামান্য।
কীভাবে বানাবেন: প্রথমে রসগোল্লাগুলি হালকা হাতে চেপে অতিরিক্ত রস বের করে নাও। কফি গরম জলে গুলে ঠান্ডা করে রাখো। অন্য পাত্রে ক্রিম চিজ ও গুঁড়ো চিনি মিশিয়ে নাও। এবার হুইপড ক্রিম আলতো করে মিশিয়ে মসৃণ ক্রিম তৈরি করো। ছোট কাচের বাটিতে রসগোল্লার টুকরো সাজিয়ে তার উপর অল্প কফি ছড়িয়ে দাও। তার উপর ক্রিমের স্তর দাও। এভাবে আরও একটি স্তর তৈরি করে উপরে কোকো পাউডার ছড়িয়ে দাও। ফ্রিজে অন্তত ২ ঘণ্টা রেখে ঠান্ডা পরিবেশন করো।
৩. গুড়-নারকেলের মোদক

কী কী লাগবে: চালের গুঁড়ো ১ কাপ, জল ১ কাপ, ঘি ১ চা চামচ, নুন এক চিমটি, নারকেল কোরা ১ কাপ, খেজুর গুড় আধ কাপ, এলাচ গুঁড়ো সামান্য।

কীভাবে বানাবেন: কড়াইয়ে নারকেল কোরা ও খেজুর গুড় দিয়ে নাড়তে থাকো। গুড় গলে নারকেলের সঙ্গে মিশে গেলে এলাচ গুঁড়ো দিয়ে পুর তৈরি করে নামিয়ে রাখো। এবার অন্য পাত্রে জল, ঘি ও নুন ফুটিয়ে চালের গুঁড়ো দিয়ে দ্রুত নাড়তে থাকো। আঁচ বন্ধ করে ঢেকে রাখো ৫ মিনিট। মিশ্রণটি সামান্য ঠান্ডা হলে ভালো করে মেখে নরম মণ্ড তৈরি করো। ছোট লেচি কেটে হাতে চ্যাপটা করে মাঝখানে নারকেলের পুর দাও। চারপাশে ভাঁজ করে মোদকের আকার তৈরি করো। স্টিমারে ১০–১২ মিনিট ভাপিয়ে নিলেই তৈরি গুড়-নারকেলের মোদক।
৪. কেশর-পেস্তা রাবড়ি কাপ

কী কী লাগবে: ফুল ফ্যাট দুধ ১ লিটার, চিনি ৪ টেবিল চামচ, কেশর কয়েকটি, এলাচ গুঁড়ো সামান্য, পেস্তা ও আমন্ড কুচি ২ টেবিল চামচ, ছোট মাটির ভাঁড় বা ডেজার্ট কাপ।
কীভাবে বানাবেন: ভারী তলার পাত্রে দুধ ফুটিয়ে অল্প আঁচে জ্বাল দিতে থাকো। দুধের সর জমলে পাত্রের গায়ে সর তুলে রাখবে। দুধ ঘন হয়ে অর্ধেকের কাছাকাছি এলে চিনি, কেশর ও এলাচ গুঁড়ো মেশাও। তুলে রাখা সরগুলো আলতো করে মিশিয়ে দাও। আরও কিছুক্ষণ জ্বাল দিয়ে নামিয়ে ঠান্ডা করো। ছোট ভাঁড় বা কাপে রাবড়ি ঢেলে পেস্তা ও আমন্ড কুচি ছড়িয়ে ফ্রিজে রাখো। ঠান্ডা পরিবেশন করো।
৫. স্ট্রবেরি সন্দেশ টার্ট

কী কী লাগবে: ময়দা ১ কাপ, ঠান্ডা মাখন ৫০ গ্রাম, গুঁড়ো চিনি ২ টেবিল চামচ, দুধ ২–৩ টেবিল চামচ, ছানা ২০০ গ্রাম, গুঁড়ো চিনি ৩ টেবিল চামচ, স্ট্রবেরি পিউরি ৩ টেবিল চামচ, তাজা স্ট্রবেরি কয়েকটি।

কীভাবে বানাবেন: ময়দা, ঠান্ডা মাখন ও গুঁড়ো চিনি একসঙ্গে মিশিয়ে ঝুরঝুরে করে নাও। অল্প অল্প দুধ দিয়ে মেখে নরম ডো তৈরি করো। ছোট টার্ট মোল্ডে ডো বিছিয়ে কাঁটাচামচ দিয়ে কয়েকটি ছিদ্র করে নাও। ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে প্রিহিট করা ওভেনে ১৫–১৮ মিনিট বেক করো। ঠান্ডা হলে মোল্ড থেকে বের করো। এবার ছানা ও গুঁড়ো চিনি মেখে স্ট্রবেরি পিউরি মিশিয়ে নাও। টার্টের মধ্যে এই সন্দেশের পুর ভরে উপরে কাটা স্ট্রবেরি সাজিয়ে পরিবেশন করো।
৬. ক্যারামেল ক্ষীরকদম

কী কী লাগবে: ছোট রসগোল্লা ৬টি, খোয়া ক্ষীর ২০০ গ্রাম, গুঁড়ো চিনি ৩ টেবিল চামচ, এলাচ গুঁড়ো সামান্য, চিনি আধ কাপ, জল ২ টেবিল চামচ, মাখন ১ চা চামচ।
কীভাবে বানাবেন: প্রথমে রসগোল্লাগুলি হালকা চেপে অতিরিক্ত রস বের করে নাও। খোয়া ক্ষীরের সঙ্গে গুঁড়ো চিনি ও এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে মসৃণ মণ্ড তৈরি করো। ছোট লেচি নিয়ে চ্যাপটা করে তার মধ্যে একটি রসগোল্লা ঢুকিয়ে গোল করে নাও। এবার প্যানে চিনি ও জল দিয়ে গরম করো। চিনি গলে সোনালি ক্যারামেল তৈরি হলে মাখন মিশিয়ে আঁচ বন্ধ করো। প্রতিটি ক্ষীরকদমের গায়ে অল্প ক্যারামেল ব্রাশ করে ঠান্ডা হতে দাও। ক্যারামেল শক্ত হয়ে গেলে পরিবেশন করো।
৭. কফি-ক্ষীরের পায়েস

কী কী লাগবে: গোবিন্দভোগ চাল আধ কাপ, দুধ ১ লিটার, চিনি আধ কাপ, ইনস্ট্যান্ট কফি ১ চা চামচ, কনডেন্সড মিল্ক ২ টেবিল চামচ, আমন্ড কুচি, কাজুবাদাম ও কিশমিশ।
কীভাবে বানাবেন: চাল ধুয়ে ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখো। দুধ ফুটিয়ে চাল দিয়ে অল্প আঁচে রান্না করো। চাল সেদ্ধ হয়ে দুধ ঘন হলে চিনি ও কনডেন্সড মিল্ক মিশিয়ে দাও। কফি সামান্য গরম জলে গুলে পায়েসে মেশাও। আরও ২–৩ মিনিট নাড়িয়ে নামিয়ে নাও। উপরে আমন্ড, কাজু ও কিশমিশ ছড়িয়ে ঠান্ডা করে পরিবেশন করো।
৮. কাজু-পেস্তা চকোলেট বরফি

কী কী লাগবে: কাজুবাদাম গুঁড়ো ১ কাপ, গুঁড়ো চিনি আধ কাপ, ঘি ১ টেবিল চামচ, দুধ ২ টেবিল চামচ, ডার্ক চকোলেট ৫০ গ্রাম, পেস্তা কুচি ২ টেবিল চামচ।

কীভাবে বানাবেন: কড়াইয়ে কাজুবাদাম গুঁড়ো, চিনি, ঘি ও দুধ মিশিয়ে অল্প আঁচে নাড়তে থাকো। মিশ্রণটি একসঙ্গে জমাট বাঁধতে শুরু করলে নামিয়ে নাও। একটি থালায় ঘি মাখিয়ে মিশ্রণটি সমান করে ছড়িয়ে দাও। অন্যদিকে ডার্ক চকোলেট গলিয়ে বরফির উপর সমানভাবে ঢেলে দাও। পেস্তা কুচি ছড়িয়ে ঘরের তাপমাত্রায় ঠান্ডা করো। তারপর ফ্রিজে রেখে জমে গেলে পছন্দমতো আকারে কেটে পরিবেশন করো।
৯. মালাই কুলফি রাবড়ি ফালুদা

কী কী লাগবে: মালাই কুলফি ২টি, ফালুদা সেমাই আধ কাপ, দুধ ১ কাপ, রাবড়ি আধ কাপ, গোলাপের সিরাপ ২ টেবিল চামচ, ভেজানো সাবজা বীজ ২ টেবিল চামচ, পেস্তা কুচি।
কীভাবে বানাবেন: প্রথমে ফালুদা সেমাই ফুটন্ত জলে সেদ্ধ করে ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে নাও। সাবজা বীজ আলাদা করে জলে ভিজিয়ে রাখো। লম্বা গ্লাসে প্রথমে গোলাপের সিরাপ দাও। তার উপর সাবজা, ফালুদা সেমাই ও ঠান্ডা দুধ ঢালো। এবার রাবড়ির একটি স্তর তৈরি করো। সবশেষে মালাই কুলফি বসিয়ে পেস্তা কুচি ছড়িয়ে দাও। পরিবেশনের ঠিক আগে তৈরি করলেই স্বাদ সবচেয়ে ভালো থাকবে।
১০. আমন্ড-এলাচ বেকড রসগোল্লা

কী কী লাগবে: রসগোল্লা ৬টি, কনডেন্সড মিল্ক আধ কাপ, দুধ আধ কাপ, ক্রিম ২ টেবিল চামচ, এলাচ গুঁড়ো সামান্য, জাফরান কয়েকটি, আমন্ড কুচি ২ টেবিল চামচ।
কীভাবে বানাবেন: রসগোল্লাগুলি হালকা চেপে অতিরিক্ত রস বের করে একটি বেকিং ডিশে সাজিয়ে রাখো। অন্য পাত্রে কনডেন্সড মিল্ক, দুধ, ক্রিম, এলাচ গুঁড়ো ও জাফরান মিশিয়ে নাও। এই মিশ্রণ রসগোল্লার উপর ঢেলে আমন্ড কুচি ছড়িয়ে দাও। ১৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে প্রিহিট করা ওভেনে ১২–১৫ মিনিট বেক করো। উপরের অংশ হালকা সোনালি হলে বের করে ঠান্ডা করে পরিবেশন করো।
১১. নারকেল-চকোলেট লাড্ডু

কী কী লাগবে: নারকেল কোরা ২ কাপ, কনডেন্সড মিল্ক আধ কাপ, কোকো পাউডার ২ টেবিল চামচ, ডার্ক চকোলেট ৩০ গ্রাম, ঘি ১ চা চামচ, নারকেল গুঁড়ো সামান্য।

কীভাবে বানাবেন: কড়াইয়ে ঘি গরম করে নারকেল কোরা ও কনডেন্সড মিল্ক মিশিয়ে নাও। অল্প আঁচে নাড়তে থাকো। মিশ্রণটি ঘন হলে কোকো পাউডার ও গলানো ডার্ক চকোলেট মিশিয়ে দাও। কড়াই ছেড়ে এলে নামিয়ে ঠান্ডা করো। হাতে সামান্য ঘি মেখে ছোট ছোট লাড্ডু তৈরি করো। নারকেল গুঁড়োয় গড়িয়ে নিলেই তৈরি চকোলেট-নারকেল লাড্ডু।
১২. গুড়ের প্যানকেক রস-মালাই

কী কী লাগবে: ময়দা ১ কাপ, গুড় ৩ টেবিল চামচ, দুধ ৩/৪ কাপ, বেকিং পাউডার আধ চা চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ, রাবড়ি ১ কাপ, এলাচ গুঁড়ো সামান্য, পেস্তা কুচি।
কীভাবে বানাবেন: একটি পাত্রে ময়দা, গুড়, দুধ ও বেকিং পাউডার মিশিয়ে মসৃণ ব্যাটার তৈরি করো। ননস্টিক প্যানে সামান্য ঘি মাখিয়ে ছোট ছোট প্যানকেক তৈরি করো। দু'পিঠ হালকা সোনালি করে ভেজে নাও। এবার একটি পাত্রে প্যানকেক সাজিয়ে তার উপর ঘন রাবড়ি ঢেলে দাও। এলাচ গুঁড়ো ও পেস্তা কুচি ছড়িয়ে ফ্রিজে অন্তত ৩০ মিনিট রাখো। ঠান্ডা পরিবেশন করো।
টিপস: রসগোল্লা বা ছানার মিষ্টি দিয়ে তৈরি ফিউশন ডেজার্ট সবসময় ফ্রিজে রাখবে। ক্রিম, দুধ ও রাবড়ি দিয়ে তৈরি পদ পরিবেশনের ঠিক আগে সাজালে স্বাদ ও সৌন্দর্য দুটোই বজায় থাকবে। চকোলেট, কফি বা ফলের স্বাদ যোগ করার সময় মূল মিষ্টির স্বাদ যেন হারিয়ে না যায়, সেদিকেও নজর রেখো। এবারের উৎসবে চেনা মিষ্টির সঙ্গে নতুন স্বাদের বন্ধুত্ব হোক।
রবিবারের গল্প: যে ঘরে কেউ খুন হয়নি
সুস্মিতা মিত্র
উত্তর কলকাতার পুরনো বাড়িগুলোর একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, পালিশ উঠে যাওয়া কাঠের দরজা, ধুলো জমা জানলা আর বহু বছর ধরে সেখানে বসবাস করা মানুষের নিঃশ্বাস, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত গন্ধ। নীলকুঠি বাড়িটারও সেই গন্ধ ছিল। চিৎপুরের একটা সরু গলির একেবারে শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটাকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হত, সময় যেন এখানে এসে থেমে গেছে। লোহার গেটে মরচে, পাঁচিলের গায়ে শ্যাওলা, দোতলার বারান্দায় ভাঙা রেলিং আর ছাদের কার্নিশ বেয়ে নেমে আসা বুনো লতা। অথচ এই বাড়িতেই গত তিরিশ বছর ধরে বাস করছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অরিন্দম সেন।
সত্তর পেরিয়েও মানুষটি ছিলেন অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী। সকাল ছটায় ঘুম থেকে ওঠা, নির্দিষ্ট সময়ে প্রাতরাশ, বিকেলে এক ঘণ্টা বই পড়া, রাত দশটার মধ্যে খাওয়া এবং সাড়ে দশটার মধ্যে লাইব্রেরিতে বসা, তাঁর জীবনে কোনও কিছুরই যেন হেরফের হত না। কিন্তু সেই নিয়মের রাতেই সবকিছু বদলে গেল। রাত দুটো সতেরো মিনিটে অরিন্দম সেনকে তাঁর লাইব্রেরিতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেল। তারও সাত মিনিট আগে, রাত দুটো দশ মিনিটে, তাঁর মোবাইল ফোন থেকে থানার নম্বরে একটি বার্তা পাঠানো হয়েছিল। বার্তায় লেখা ছিল, “খুনটা আমি করিনি। কিন্তু এই খুনের একমাত্র সাক্ষী আমি।” এর পরে আর কোনও কথা নেই। সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ খবরটা থানায় পৌঁছতেই তদন্তের দায়িত্ব পেলেন গোয়েন্দা ঋদ্ধিমান মুখার্জি। নীলকুঠিতে পৌঁছে তিনি দেখলেন, বাড়ির সামনে ইতিমধ্যেই ভিড় জমে গেছে। পুলিশ, প্রতিবেশী, সাংবাদিক সকলের মধ্যেই উত্তেজনা। কিন্তু ঋদ্ধিমান এসবের দিকে না তাকিয়ে সোজা দোতলার লাইব্রেরিতে উঠে গেলেন।

অরিন্দম সেনের দেহ পড়ে ছিল তাঁর চেয়ারের পাশে। মাথার পেছনে আঘাতের চিহ্ন। ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। জানলাগুলোও ভিতর থেকে আটকানো। কোনও ভাঙচুর নেই, আসবাবপত্র এলোমেলো নয়, এমনকী টেবিলের ওপর রাখা চায়ের কাপটিও অক্ষত। যেন কেউ অত্যন্ত শান্তভাবে ঘরে ঢুকে খুন করে আবার বেরিয়ে গেছে অথচ বেরোনোর কোনও পথ নেই। ঋদ্ধিমান দেওয়ালের ঘড়িটার দিকে তাকালেন। ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে রাত দুটো সতেরো মিনিটে।
“ঘড়িটা কখন থেমেছে?” তিনি জানতে চাইলেন।
সঙ্গে থাকা সাব-ইন্সপেক্টর বলল, “সম্ভবত মৃত্যুর সময়।”
“সম্ভবত?”
অফিসারটি একটু ইতস্তত করে বলল, “ঘড়িটা বেশ পুরনো। ঠিক বলা যাচ্ছে না।”
ঋদ্ধিমান আর কিছু বললেন না। তাঁর চোখ এবার গিয়ে থামল টেবিলের ওপর রাখা একটা বইয়ে। বইটা তুলে নিতেই মাঝখান থেকে একটা কাগজ মেঝেতে পড়ে গেল। কাগজে মাত্র চারটি শব্দ লেখা “মেঘলা মারা যায়নি।”
ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। ঘরে তখন অরিন্দম সেনের স্ত্রী সুনন্দা, ভাইপো সৌম্য, বহু বছরের পরিচারিকা মালতী এবং পরিবারের ঘনিষ্ঠ চিকিৎসক ডা. রোহিত মুখোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“মেঘলা কে?” ঋদ্ধিমান প্রশ্ন করলেন।
কেউ উত্তর দিল না। শুধু মালতী হঠাৎ মুখটা ঘুরিয়ে জানলার দিকে তাকাল। ঋদ্ধিমানের চোখ এড়াল না। সেদিনই শুরু হল জিজ্ঞাসাবাদ। প্রত্যেকের বক্তব্য প্রায় একই। রাত দুটো সতেরো মিনিটে তাঁরা নিজেদের ঘরেই ছিলেন। কেউ কোনও শব্দ শোনেননি। কেউ লাইব্রেরির দিকে কাউকে যেতে দেখেননি। কিন্তু বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজ তাঁদের কথার সঙ্গে মিলল না।
রাত দুটো বারো মিনিটে একজন মানুষ করিডর দিয়ে হেঁটে লাইব্রেরির দিকে গিয়েছিল। মুখ দেখা যাচ্ছিল না। আর দুটো সতেরো মিনিটের কয়েক সেকেন্ড পরেই ক্যামেরার ফুটেজ বন্ধ হয়ে যায়। প্রযুক্তিবিদ জানাল, “কেউ সিস্টেমে ঢুকে ফুটেজ মুছে দিয়েছে।”
“বাড়ির ভেতর থেকেই?”
“সম্ভাবনা বেশি।”
ঋদ্ধিমান জানলার বাইরে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, “তাহলে খুনি এখনও এই বাড়ির মধ্যেই আছে।”
কিন্তু তাঁর আসল সন্দেহ শুরু হল অন্য জায়গায়। পুরনো নথি ঘাঁটতে গিয়ে তিনি পঁচিশ বছর আগের একটি মামলার সন্ধান পেলেন। একটি সতেরো বছরের মেয়ে নিখোঁজ হয়েছিল। নাম—মেঘলা দত্ত। শেষবার তাকে দেখা গিয়েছিল নীলকুঠির আশেপাশে। মামলাটির বিচারক ছিলেন অরিন্দম সেন। মেঘলার কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ তদন্তের পর মামলা বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি নথিতে লেখা ছিল, মেয়েটি সম্ভবত বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু অরিন্দমের লাইব্রেরিতে পাওয়া সেই কাগজ বলছে অন্য কথা। ঋদ্ধিমান আবার নীলকুঠিতে ফিরে এলেন। পুরনো বুকশেলফ ঘাঁটতে গিয়ে তিনি একটি ছোট রুপোর লকেট পেলেন। লকেটটির ওপর খোদাই করা একটি অদ্ভুত ফুল। পুরনো মামলার ছবিতে মেঘলার গলায়ও ঠিক একই লকেট দেখা গিয়েছিল।
“এটা কার?” ঋদ্ধিমান সুনন্দাকে জিজ্ঞেস করলেন।
“জানি না।”
“মেঘলা দত্তকে চিনতেন?”
বৃদ্ধার মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তারপর খুব আস্তে বললেন, “না।”
ঋদ্ধিমান লকেটটা টেবিলের ওপর রাখলেন। “আপনি মিথ্যে বলছেন।”
সুনন্দা কোনও উত্তর দিলেন না। সেই রাতেই নীলকুঠিতে ঘটল দ্বিতীয় অস্বাভাবিক ঘটনা। বহু বছর ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকা পুরনো গ্রামোফোন হঠাৎ মাঝরাতে নিজে থেকেই বাজতে শুরু করল। বাড়ির সবাই ছুটে এসে দেখল, গ্রামোফোনের সূঁচ ঘুরছে। কিন্তু কোনও গান নেই। তার বদলে ভেসে আসছে একটি মেয়ের কণ্ঠ।
“আমি দেখেছিলাম।”
তারপর কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
“ওরা পাঁচজন ছিল।”
শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল।
সৌম্য কাঁপা গলায় বলল, “এটা কী করে সম্ভব?”
ঋদ্ধিমান তার দিকে তাকালেন। “কী অসম্ভব?”
“মেঘলা যে রাতে নিখোঁজ হয়েছিল, সেই রাতে বাড়িতে চারজন মানুষ ছিল।”
ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে বললেন, “তাহলে পঞ্চমজন কে?”
সৌম্য মুখ নামিয়ে ফেলল। পরদিন সকালে বাড়ির পুরনো দেওয়াল মেরামত করতে গিয়ে শ্রমিকরা একটা টিনের বাক্স খুঁজে পেল। তার ভিতরে ছিল কয়েকটি পুরনো ছবি, একটা স্কুলের ব্যাজ, একটি লাল চুলের ক্লিপ এবং একটি ডায়েরি। ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা “মেঘলা দত্ত।”
শেষের দিকে একটি পাতায় লেখা ছিল, “যদি আমি কখনও হারিয়ে যাই, তাহলে জানবে, আমি পালাইনি।”
তার পরের পাতাগুলো ছেঁড়া। ঋদ্ধিমান ছবিগুলো দেখতে দেখতে একটি ছবিতে থেমে গেলেন। একটি ঘরের সামনে ছয়জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। অরিন্দম সেন, সুনন্দা, ডা. রোহিত, বাড়ির পুরনো কর্মচারী হরিপদ, এক অচেনা পুরুষ এবং মেঘলা। ছবির পিছনে লেখা “এই ছবির একজন মানুষকে আমরা পঁচিশ বছর ধরে মৃত বলে জানি।”
ঋদ্ধিমান ছবিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। অচেনা পুরুষটির পরিচয় খুঁজে বের করতে বেশি সময় লাগল না। তিনি মেঘলার বাবা, অমিত দত্ত। সরকারি নথি অনুযায়ী পঁচিশ বছর আগে তিনি কলকাতা ছেড়ে বিদেশে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছবির মানুষটি বিদেশে যাওয়ার কোনও চিহ্ন রাখেনি। আরও খোঁজ নিয়ে ঋদ্ধিমান জানতে পারলেন, মেঘলার নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে নীলকুঠির পুরনো কর্মচারী হরিপদ একটি খুনের ঘটনা সম্পর্কে পুলিশকে কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু সে আর সাক্ষ্য দিতে পারেনি। পরদিন থেকেই সে নিখোঁজ।
ডা. রোহিত দাবি করলেন, “মেঘলা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। ওর কথায় বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই।”
ঋদ্ধিমান শান্তভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি ওকে চিকিৎসা করেছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“তার চিকিৎসার নথি কোথায়?”
“অনেক পুরনো ব্যাপার। এখন আর নেই।”
“নষ্ট হয়ে গেছে?”
“সম্ভবত।”
ঋদ্ধিমান আর প্রশ্ন করলেন না। শুধু মনে মনে একটা হিসাব কষলেন। এতগুলো মানুষের বক্তব্যে একই ধরনের ফাঁক কেন? সেই রাতে তিনি আবার অরিন্দম সেনের লাইব্রেরিতে গেলেন। টেবিলের ড্রয়ার ঘাঁটতে গিয়ে একটি খাম পেলেন। খামের ওপর তাঁর নিজের নাম লেখা। ভেতরে ছিল একটি মেমরি কার্ড। ভিডিয়ো চালু করতেই অরিন্দম সেনের মুখ ভেসে উঠল।
“যদি এই রেকর্ডিং কেউ দেখে, তাহলে বুঝবে আমি আর বেঁচে নেই।”
কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি বললেন, “পঁচিশ বছর আগে আমি একটা ভুল করেছিলাম। মেঘলা হরিপদের মৃত্যুর ঘটনা দেখেছিল। আমি জানতাম। কিন্তু আমি তার সাক্ষ্য আদালতে পৌঁছতে দিইনি।”
ঋদ্ধিমানের চোখ স্থির হয়ে গেল।
অরিন্দম আবার বললেন, “আমি ভয় পেয়েছিলাম। যার বিরুদ্ধে মেঘলা সাক্ষ্য দিতে চেয়েছিল, তার ক্ষমতা অনেক ছিল। আমি ভেবেছিলাম, একটা মেয়ের জীবন নষ্ট করে দিলে হয়তো বাকিদের বাঁচাতে পারব।”
তিনি কিছুক্ষণ থামলেন।
“আমি ভুল ছিলাম।”
তারপর তাঁর কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।
“মেঘলা মারা যায়নি। আমি তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেছিলাম। আর সে এই বাড়ির মধ্যেই এত বছর ধরে অন্য পরিচয়ে বেঁচে আছে।”
ভিডিয়ো সেখানেই শেষ হয়ে গেল। ঋদ্ধিমান আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। তাঁর মনে তখন একটাই নাম, মালতী। বাড়ির বহু বছরের পরিচারিকা। পঁচিশ বছর ধরে এই বাড়িতেই রয়েছে। পরদিন সকালে মালতীকে একা পেয়ে ঋদ্ধিমান বললেন, “আপনি মেঘলা দত্ত।”
বৃদ্ধা প্রথমে চুপ করে রইলেন। তারপর চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল।
“আমি পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলাম,” তিনি বললেন।
“অরিন্দম সেনকে আপনি খুন করেছেন?”
“না।”
“তাহলে কে?”
মালতী মাথা নাড়লেন।
“ও নিজেই নিজের মৃত্যুর রাস্তা খুলে দিয়েছিল।”
“মানে?”
“অরিন্দমবাবু জানতেন, সত্যিটা আর বেশি দিন চাপা রাখা যাবে না। তিনি সব প্রমাণ রেখে গিয়েছিলেন। কিন্তু কেউ সেটা জেনে ফেলেছিল।”
“কে?”
মালতী জানলার বাইরে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “যে মানুষটাকে সবাই পঁচিশ বছর ধরে মৃত বলে জানে।”
ঋদ্ধিমানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“অমিত দত্ত?”
মালতী কোনও উত্তর দিলেন না। ঠিক তখনই বাড়ির বাইরে একটা গাড়ির শব্দ হল। দুজনেই চমকে উঠলেন। ঋদ্ধিমান দৌড়ে বারান্দায় এসে দেখলেন, একজন বৃদ্ধ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে। মেঘলার পুরনো ছবির সেই মুখ। অমিত দত্ত। কিন্তু তিনি একা নন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছে ডা. রোহিত মুখোপাধ্যায়। ঋদ্ধিমান বুঝলেন, পঁচিশ বছরের পুরনো গল্পের শেষ অধ্যায় এখনও বাকি। অমিত ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। তাঁর মুখে অদ্ভুত শান্ত হাসি।
“অনেক খুঁজেছেন আমাকে, তাই না?”
ঋদ্ধিমান বললেন, “আপনি হরিপদকে খুন করেছিলেন?”
অমিতের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“হরিপদ অনেক কিছু জানত।”
“মেঘলাকে কেন মেরে ফেলেননি?”
অমিত এবার মালতীর দিকে তাকালেন।
“কারণ ওকে মেরে ফেললে সবাই সত্যিটা জানতে পারত। ওকে মৃত বানিয়ে দেওয়াই সহজ ছিল।”
ঋদ্ধিমান বুঝলেন, অরিন্দম একা অপরাধী ছিলেন না। সেই রাতের ষড়যন্ত্রে আরও অনেকেই জড়িত ছিল।
“তাহলে অরিন্দম সেন?”
অমিত বললেন, “সে শেষ পর্যন্ত কথা বলতে চেয়েছিল। তাই তাকে থামাতে হয়েছিল।”
“আপনি তাঁকে খুন করেছেন?”
অমিত চুপ করে রইলেন। তারপর হঠাৎ মালতী বললেন, “না। অরিন্দমবাবুকে ও খুন করেনি।” ঋদ্ধিমান অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকালেন। মালতী ধীরে ধীরে বললেন, “অরিন্দমবাবু জানতেন, অমিত ফিরে এসেছে। তিনি বুঝেছিলেন, এবার আর কাউকে বাঁচানো যাবে না। তাই মৃত্যুর আগের রাতে তিনি আমাকে ডেকে সব বলেছিলেন।”
“তাহলে?”
“তিনি নিজের হাতে বিষ খেয়েছিলেন।”
ঋদ্ধিমান স্তব্ধ হয়ে গেলেন।
“কেন?”
মালতীর চোখে জল।
“কারণ তিনি জানতেন, আদালতে সত্যিটা বলার সাহস পঁচিশ বছর আগে তাঁর ছিল না। কিন্তু মৃত্যুর আগে অন্তত সত্যিটা রেখে যেতে চেয়েছিলেন।”
ঘরের মধ্যে তখন অদ্ভুত নীরবতা। ঋদ্ধিমান ধীরে ধীরে অমিতের দিকে তাকালেন।
“কিন্তু আপনি? আপনি এত বছর কোথায় ছিলেন?”
অমিত উত্তর দেওয়ার আগেই বাইরে পুলিশের সাইরেন শোনা গেল। ঋদ্ধিমান আগেই খবর পাঠিয়েছিলেন। অমিত জানলার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন, “আপনি ভাবছেন, সব শেষ?”
ঋদ্ধিমান বললেন, “না। এখনই শুরু।”
অমিতকে নিয়ে যাওয়ার সময় মালতী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর চোখে জল, মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। ঋদ্ধিমান কাছে এসে বললেন, “আপনি এত বছর এই বাড়িতে কাজ করলেন কেন?”
মালতী মৃদু হেসে বললেন, “যে বাড়ি আমার জীবন কেড়ে নিয়েছিল, সেই বাড়ির ভেতরেই সত্যিটাকে বাঁচিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম।” ঋদ্ধিমান আর কিছু বললেন না। বেরিয়ে আসার সময় তাঁর চোখ পড়ল লাইব্রেরির দেওয়ালে থেমে থাকা ঘড়িটার দিকে। দুটো সতেরো মিনিট। ঘড়িটা এখনও থেমে আছে। কিন্তু এবার তিনি জানতেন, সেই সময়টা কোনও মৃত্যুর সময় নয়। সেটা ছিল একটি সত্যির জন্মের সময়। নীলকুঠির সেই ঘরে আসলে কেউ খুন হয়নি। খুন হয়েছিল অনেক আগেই, একটি মেয়ের পরিচয়, একটি পরিবারের বিশ্বাস, আর সত্যি বলার সাহস। পঁচিশ বছর পর সেই মৃত সত্যিই ফিরে এসেছিল। আর দরজায় কড়া নেড়েছিল।
একবার।
তারপর আরও একবার।








Comments