top of page

শারদ পূর্ণিমা | বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজো | কোজাগরীর রান্নাঘর | আলপনায় অক্ষয় ঐতিহ্য | রবিবারের গল্প: ভুপেদা জিন্দাবাদ


শারদ পূর্ণিমা


শরতের আকাশে তখন মেঘের আনাগোনা অনেকটাই কমে এসেছে। নীল আকাশের বুকে সাদা তুলোর মতো মেঘ ভেসে বেড়ায়, বাতাসে শিউলি ফুলের মিষ্টি গন্ধ, দূরে কোথাও কাশবনের মাথায় দোলা দেয় হালকা হাওয়া। দুর্গাপুজোর ঢাকের শব্দ ক্রমশ মিলিয়ে এসেছে দৈনন্দিন জীবনের ব্যস্ততায়। কিন্তু বাঙালির উৎসবের ক্যালেন্ডারে আনন্দের প্রদীপ তখনও নিভে যায়নি। বরং এক অন্য মায়ায়, এক অন্য আবেশে প্রকৃতি ও মানুষের মনকে ভরিয়ে দিতে হাজির হয় পূর্ণিমার চাঁদ। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের পূর্ণিমা—শারদ পূর্ণিমা, বাংলার ঘরে ঘরে যা কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আবেগে বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে।


শারদ পূর্ণিমা শুধু একটি তিথির নাম নয়। এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের উৎসব, কৃষিজীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, ভক্তি ও বিশ্বাসের এক প্রাচীন অনুষঙ্গ। কোথাও এই রাত লক্ষ্মী আরাধনার, কোথাও কৃষ্ণের রাসলীলা স্মরণের, কোথাও আবার চাঁদের আলোয় ক্ষীর নিবেদন ও পারিবারিক মিলনের। ভারতীয় সংস্কৃতির নানা প্রান্তে এই পূর্ণিমা নানা নামে, নানা আচারে পালিত হলেও তার কেন্দ্রে রয়েছে একটিই অনুভব—শরতের নির্মল আলোয় জীবনকে নতুন করে অনুভব করা।


ভারতীয় ঋতুচক্রে শরৎ এমন এক সময়, যখন প্রকৃতি বর্ষার ক্লান্তি কাটিয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে সাজিয়ে তোলে। আকাশ হয় স্বচ্ছ, বাতাসে আসে স্নিগ্ধতা, দিনের আলোয় থাকে কোমল উজ্জ্বলতা আর রাতের আকাশে চাঁদ যেন আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। শারদ পূর্ণিমার চাঁদকে ঘিরে মানুষের মুগ্ধতা বহু শতাব্দী ধরে কবিতা, সংগীত, লোককথা ও ধর্মীয় সাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছে।



এই পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত বিশ্বাস, বছরের অন্য অনেক পূর্ণিমার তুলনায় এই রাতের চাঁদের আলো বিশেষ উজ্জ্বল ও মনোরম। লোকবিশ্বাসে এই জ্যোৎস্নার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অমৃতের ধারণা, সুস্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি ও মানসিক প্রশান্তির আকাঙ্ক্ষা। রাতের খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা, উঠোনে বসে গল্প করা কিংবা ছাদে চাঁদের আলোয় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—এসবের মধ্যেও যেন রয়েছে এক পুরনো ভারতীয় জীবনবোধ, যেখানে প্রকৃতি কেবল দৃশ্যপট নয়, মানুষের আনন্দ ও বিশ্বাসের অংশ।


আধুনিক নগরজীবনে এই অনুভূতির প্রকাশ কিছুটা বদলে গিয়েছে। বহুতলের বারান্দা, ব্যস্ত রাস্তা আর কৃত্রিম আলোর ভিড়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকার অবকাশ কমেছে। তবু কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে বাংলার বহু বাড়িতে প্রদীপ জ্বলে, আলপনা আঁকা হয়, পূজার আয়োজন চলে, আর রান্নাঘরে তৈরি হয় ক্ষীর, নারকেল নাড়ু, মোয়া কিংবা অন্যান্য মিষ্টান্ন। উৎসবের এই পরিচিত দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, সময় বদলালেও কিছু অনুভূতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একইভাবে বেঁচে থাকে।


শারদ পূর্ণিমার সঙ্গে বাংলার সম্পর্ক সবচেয়ে নিবিড় হয়ে ওঠে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর মধ্য দিয়ে। ‘কোজাগরী’ শব্দটির উৎস সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’—অর্থাৎ, ‘কে জেগে আছ?’ লোকবিশ্বাস অনুসারে, এই পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করেন। তিনি জানতে চান, কে জেগে রয়েছে, কে নিষ্ঠা ও ভক্তির সঙ্গে তাঁর আরাধনা করছে। যে গৃহে মানুষ জেগে থেকে দেবীর পূজা করেন, সেই গৃহে তিনি সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের আশীর্বাদ বর্ষণ করেন বলে বিশ্বাস। এই বিশ্বাসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে কোজাগরী ব্রতের নানা কাহিনি। কোথাও এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প শোনা যায়, কোথাও আবার অভাবগ্রস্ত রাজা ও তাঁর রানির নিষ্ঠার কাহিনি প্রচলিত। গল্পগুলির বিবরণ অঞ্চলভেদে আলাদা হলেও মূল বক্তব্য একই—অভাবের অন্ধকার পেরিয়ে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা এখানে কেবল ধনসম্পদের প্রার্থনা নয়; সংসারে শান্তি, খাদ্যের প্রাচুর্য, সুস্থতা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের কামনাও। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে যুক্ত এই লোকবিশ্বাসের উল্লেখ ব্রতকথা ও ধর্মীয় আচারসংক্রান্ত গ্রন্থেও পাওয়া যায়। তবে সব কাহিনির উৎস এক নয়। কিছু কাহিনি পুরাণ ও ব্রতসংকলনের সঙ্গে সম্পর্কিত, আবার কিছু কাহিনি লোকমুখে প্রচলিত। এই বৈচিত্র্যই উৎসবটিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেছে।



দুর্গাপুজোর পাঁচ দিন পরের পূর্ণিমা বাংলার বহু পরিবারের কাছে বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্মীপুজোর দিন। দুর্গাপুজোর আনন্দ, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা হওয়া, নতুন পোশাক আর উৎসবের ব্যস্ততা পেরিয়ে এই রাতে বাড়ির পরিবেশ হয়ে ওঠে শান্ত, স্নিগ্ধ ও ভক্তিময়। সকাল থেকেই শুরু হয় প্রস্তুতি। বাড়ির উঠোন, ঠাকুরঘর কিংবা বারান্দা পরিষ্কার করা হয়। সন্ধ্যার আগে চালের গুঁড়ো দিয়ে আঁকা হয় আলপনা। কোথাও পদ্মফুলের নকশা, কোথাও ধানের ছড়া, কোথাও বা দেবীর ছোট ছোট পায়ের ছাপ। বিশ্বাস, লক্ষ্মীর চরণ যেন সেই পথ ধরেই ঘরে প্রবেশ করেন। দরজার সামনে থেকে ঠাকুরঘর পর্যন্ত আঁকা সাদা আলপনা বাঙালির লোকশিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। অনেক বাড়িতে লক্ষ্মীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়, আবার কোথাও লক্ষ্মীর সরায় দেবীর প্রতীকী রূপে পুজো হয়। মাটির প্রতিমা, পটচিত্র, সরার ছবি কিংবা ধান-শস্যের প্রতীক—সবেতেই রয়েছে নিজস্ব পারিবারিক ঐতিহ্য। কোনও বাড়িতে বংশপরম্পরায় চলে আসা পুরনো লক্ষ্মীর সরা রয়েছে, যা প্রতি বছর যত্ন করে বের করা হয়। সেই সরার সামনে প্রদীপ জ্বালানোর মুহূর্তে যেন একসঙ্গে উপস্থিত হন পরিবারের অতীত ও বর্তমানের মানুষজন।


পুজোর উপকরণেও থাকে ঐতিহ্যের ছোঁয়া। ধান, দূর্বা, ফুল, ফল, পান, সুপারি, মিষ্টি, বাতাসা এবং নানা নৈবেদ্য দিয়ে দেবীর আরাধনা করা হয়। পরিবারভেদে উপকরণ ও পুজোর নিয়মে পার্থক্য থাকতে পারে। কোথাও পুরোহিতের সাহায্যে পুজো হয়, কোথাও বাড়ির প্রবীণ সদস্য নিজেই মন্ত্রপাঠ করেন। আবার বহু বাড়িতে মহিলারাই সমস্ত আয়োজন সামলান। তাঁদের হাতের আলপনা, সাজানো নৈবেদ্য আর প্রদীপের আলোয় ঘর ভরে ওঠে উৎসবের মাধুর্যে। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর একটি বিশেষ দিক হল, এই উৎসবের আনন্দ মূলত গৃহকেন্দ্রিক। বড় মণ্ডপ বা জাঁকজমকপূর্ণ শোভাযাত্রার পরিবর্তে বাড়ির নিজস্ব আচার, পারিবারিক স্মৃতি ও একসঙ্গে বসে পুজো করার আনন্দই এখানে প্রধান। সেই কারণেই বাংলার অসংখ্য পরিবারের কাছে কোজাগরী পূর্ণিমা ব্যক্তিগত আবেগের এক বিশেষ দিন।



কোজাগরী পূর্ণিমার কথা বলতে গেলে আলপনার প্রসঙ্গ অনিবার্য। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে আলপনা শুধু মেঝে সাজানোর শিল্প নয়; এটি শুভকামনা, বিশ্বাস ও নারীর সৃজনশীলতার প্রকাশ। চালের গুঁড়ো জলে গুলে আঙুলের সাহায্যে যে নকশা আঁকা হয়, তার মধ্যে লুকিয়ে থাকে বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতা। লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় পদ্ম, ধানের শিষ, শঙ্খ, প্রদীপ, লতাপাতা এবং দেবীর পায়ের ছাপ বিশেষভাবে দেখা যায়। পদ্ম পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক, ধান খাদ্য ও প্রাচুর্যের প্রতীক, আর ঘরের দিকে মুখ করা পায়ের ছাপ দেবীর আগমনকে নির্দেশ করে বলে প্রচলিত বিশ্বাস। আগেকার দিনে পরিবারের মেয়েরা ও গৃহবধূরা পুজোর আগের দিন থেকেই আলপনার নকশা নিয়ে আলোচনা করতেন। কারও কাছে থাকত মায়ের শেখানো নকশা, কারও কাছে ঠাকুমার হাতের বিশেষ পদ্ম। অনেক সময় একই পরিবারের আলপনার ধরন অন্য বাড়ির থেকে আলাদা হত। এইভাবে মুখে মুখে, হাতে হাতে বেঁচে থাকত এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে যাওয়া শিল্প। আজকের দিনে রঙিন আলপনা, প্রস্তুত নকশা কিংবা আধুনিক সাজসজ্জার উপকরণও ব্যবহৃত হচ্ছে। তবু সাদা চালের গুঁড়ো দিয়ে নিজের হাতে আঁকা লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের আবেদন আলাদা। কারণ, সেখানে নিখুঁত নকশার চেয়ে বেশি মূল্য পায় মানুষের আন্তরিকতা। আলপনা আঁকার সময় বাড়ির ছোটদেরও কাছে ডেকে নেওয়া হয়। তারা হয়তো প্রথমে সোজা রেখা আঁকতে পারে না, পদ্মের পাপড়ি বেঁকে যায়, পায়ের ছাপের আকারও সমান হয় না। কিন্তু সেই অসম্পূর্ণ নকশার মধ্যেই তৈরি হয় উৎসবের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি। একদিন সেই শিশুরাই বড় হয়ে নিজের বাড়িতে আলপনা আঁকবে। এভাবেই ঐতিহ্য শুধু সংরক্ষিত হয় না, নতুন করে জন্ম নেয়।



যে কোনও বাঙালি উৎসবের মতো শারদ পূর্ণিমারও একটি নিজস্ব স্বাদ রয়েছে। সেই স্বাদের কেন্দ্রে থাকে ক্ষীর বা পায়েস, নারকেল নাড়ু, বাতাসা, মোয়া, ফলমূল এবং বাড়ির তৈরি নানা মিষ্টান্ন। পুজোর নৈবেদ্য সাজানোর সময় রান্নাঘরের ব্যস্ততা যেন আলাদা এক উৎসবে পরিণত হয়। দুধ, চাল ও চিনি বা গুড় দিয়ে তৈরি ক্ষীর বহু ভারতীয় অঞ্চলে শারদ পূর্ণিমার বিশেষ খাদ্য হিসেবে পরিচিত। কোথাও ক্ষীর তৈরি করে চাঁদের আলোয় রাখা হয়, কোথাও দুধের সঙ্গে চাল, চিনি, এলাচ ও শুকনো ফল মিশিয়ে তৈরি হয় বিশেষ পদ। মহারাষ্ট্রসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই রাতে দুধের পানীয় তৈরির চল রয়েছে। বাংলায় অবশ্য লক্ষ্মীপুজোর ভোগে পরিবারের নিজস্ব রীতি অনুযায়ী নানা ধরনের মিষ্টি ও নিরামিষ পদ স্থান পায়। ক্ষীরের সঙ্গে চাঁদের আলোর সম্পর্কও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। প্রচলিত বিশ্বাস, শারদ পূর্ণিমার জ্যোৎস্নায় ক্ষীর রেখে দিলে তা অমৃতের মতো গুণসম্পন্ন হয়ে ওঠে। সেই বিশ্বাস থেকেই অনেক পরিবারে দুধ বা ক্ষীর রাতভর খোলা আকাশের নিচে রাখার রীতি রয়েছে। পরদিন তা প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই ধারণা ধর্মীয় ও লোকবিশ্বাসের অংশ; চাঁদের আলোয় রাখা খাবারের বিশেষ ঔষধি গুণ রয়েছে, এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। খাবার খোলা আকাশে রাখলে ধুলো, পোকামাকড় ও জীবাণুর সংস্পর্শে আসার আশঙ্কাও থাকে। তাই ঐতিহ্য পালন করতে চাইলে খাবার পরিষ্কার, ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখা উচিত।


বাংলার কোজাগরী রান্নাঘরে ক্ষীরের পাশাপাশি নারকেল নাড়ুর গুরুত্বও কম নয়। নারকেল কোরা, গুড় কিংবা চিনি আর সামান্য এলাচ দিয়ে তৈরি নাড়ু বহু বাড়িতে পুজোর অপরিহার্য অংশ। কোথাও মুড়ির মোয়া, কোথাও খই, কোথাও বাতাসা ও মুড়কি দিয়ে সাজানো হয় নৈবেদ্য। বাড়ির বয়স্ক মহিলারা যখন নাড়ু পাকান, তখন তাঁদের হাতের কৌশল দেখে শেখে পরবর্তী প্রজন্ম। কোনও নাড়ু একটু শক্ত, কোনওটি নরম; কোনওটিতে গুড়ের গন্ধ বেশি, কোনওটিতে নারকেলের স্বাদ। এই ছোট ছোট পার্থক্যই পারিবারিক রান্নার নিজস্ব পরিচয় তৈরি করে। পুজোর ভোগে নিরামিষ রান্নারও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। পরিবারের রীতি অনুযায়ী খিচুড়ি, লাবড়া, বিভিন্ন ভাজা, চাটনি ও মিষ্টি পরিবেশন করা হতে পারে। তবে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর খাদ্যতালিকা সর্বত্র এক নয়। অঞ্চল, পরিবার ও প্রচলিত আচার অনুযায়ী তার পরিবর্তন ঘটে। রান্নাঘরের এই আয়োজন আসলে বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতিরই অংশ। একটি বিশেষ দিনে পরিচিত খাবারও যেন অন্য অর্থ লাভ করে। পায়েসের বাটিতে থাকে মায়ের হাতের স্বাদ, নাড়ুর মধ্যে থাকে ঠাকুমার শেখানো কৌশল, আর ভোগের থালায় থাকে গোটা পরিবারের অংশগ্রহণ। শারদ পূর্ণিমার তাৎপর্য বুঝতে হলে বাংলার কৃষিজীবনের দিকে তাকানো প্রয়োজন। বহু শতাব্দী ধরে মানুষের জীবন প্রকৃতির ঋতুচক্রের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বর্ষার জল, জমির উর্বরতা, ধানের বৃদ্ধি, ফসলের নিরাপত্তা—এসবের ওপর নির্ভর করত গ্রামীণ সমাজের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা।



শরৎকাল বর্ষা থেকে শীতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়। এই সময়ে কৃষকের মনে থাকে ফসলের আশা, আবার অতিবৃষ্টি, রোগবালাই কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কাও। লক্ষ্মীকে ধনসম্পদ ও শস্যের দেবী হিসেবে কল্পনা করার মধ্যে এই কৃষিনির্ভর সমাজের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয়েছে। বাংলার লক্ষ্মীপুজোয় ধান, চাল, শস্য এবং খাদ্যদ্রব্যের উপস্থিতি তাই তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে সম্পদের ধারণা শুধু অর্থ বা অলংকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ঘরে চাল আছে কি না, পরিবারের সবাই পেট ভরে খেতে পাচ্ছে কি না, গৃহপালিত প্রাণী ভালো আছে কি না, পরবর্তী মরশুমে চাষের ব্যবস্থা হবে কি না—এসবও সমৃদ্ধির অংশ।


কৃষিজীবনের এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লক্ষ্মীপুজোকে দেখলে উৎসবটির সামাজিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়। দেবীর কাছে প্রার্থনা মানে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য চাওয়া নয়; প্রকৃতির অনুকূলতা, খাদ্যের নিরাপত্তা এবং পরিবারের মঙ্গল কামনাও। আজকের নগরজীবনে কৃষিকাজ থেকে দূরে থাকা মানুষও যখন লক্ষ্মীপুজো করেন, তখন হয়তো সেই কৃষিসমাজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তাঁদের নেই। কিন্তু চাল, ডাল, শস্য ও খাদ্যের মূল্য আজও অটুট। তাই লক্ষ্মীর আরাধনা আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে—সমৃদ্ধির প্রথম শর্ত হল অন্ন, আর অন্নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষক, মাটি, জল ও প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা।


ভারতের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে শারদ পূর্ণিমার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় রয়েছে। উত্তর ভারতের ব্রজভূমি, বৃন্দাবন ও মথুরার বৈষ্ণব পরম্পরায় এই পূর্ণিমা রাধাকৃষ্ণের রাসলীলার সঙ্গে যুক্ত। তাই বিভিন্ন অঞ্চলে এই তিথি রাস পূর্ণিমা বা রাসোৎসবের আবহেও স্মরণ করা হয়। ভাগবত পুরাণের দশম স্কন্ধে শরৎকালের এক পূর্ণিমা রাতে কৃষ্ণের বাঁশির আহ্বানে গোপীদের সমবেত হওয়া এবং রাসলীলার বর্ণনা রয়েছে। বৈষ্ণব ভক্তির ধারায় এই লীলা ঈশ্বরের সঙ্গে আত্মার মিলন, প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং ভক্তির এক প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। কৃষ্ণের বাঁশি যেন মানুষের অন্তরের গভীরে পৌঁছে যাওয়া এক আহ্বান, যা জাগতিক ব্যস্ততার মধ্যে থেকেও মানুষকে তার চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার কথা মনে করিয়ে দেয়। ব্রজভূমিতে রাসলীলার নাট্যরূপ, কীর্তন, মন্দিরের বিশেষ সাজসজ্জা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটে। গুজরাতের কিছু অঞ্চলেও শারদ পূর্ণিমা উপলক্ষে রাস ও গরবার আয়োজন করা হয়। অঞ্চলভেদে উৎসবের ধরন আলাদা হলেও পূর্ণিমার চাঁদ, সংগীত, নৃত্য ও ভক্তির মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক যোগসূত্র দেখা যায়।



বাংলায় কোজাগরী পূর্ণিমার প্রধান পরিচয় লক্ষ্মীপুজো হলেও বৈষ্ণব সাহিত্য ও কীর্তনের ঐতিহ্যে রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এইভাবে একটি পূর্ণিমা একই সঙ্গে নানা ধর্মীয় অনুভবের আশ্রয় হয়ে উঠেছে। কোথাও তা গৃহলক্ষ্মীর আরাধনা, কোথাও কৃষ্ণপ্রেমের উদ্‌যাপন, আবার কোথাও প্রকৃতি ও চন্দ্রালোকের সৌন্দর্য উপভোগের উপলক্ষ।


শারদ পূর্ণিমা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন নামে ও রীতিতে পালিত হয়। বাংলার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ছাড়াও মহারাষ্ট্রে কোজাগিরি পূর্ণিমা, গুজরাতে শারদ পূনম এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে শারদ পূর্ণিমা বা কৌমুদী পূর্ণিমা নামে এর পরিচিতি রয়েছে। কোথাও লক্ষ্মীর আরাধনা প্রধান, কোথাও চাঁদের আলোয় দুধ পান করার প্রথা, আবার কোথাও কৃষ্ণের রাসলীলা উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু। মহারাষ্ট্রের কোজাগিরি উৎসবে রাত জেগে দুধের বিশেষ পানীয় পান করার রীতি বেশ পরিচিত। গুজরাতে রাস ও গরবার আয়োজন পূর্ণিমার রাতকে সংগীতময় করে তোলে। ব্রজভূমিতে রাসলীলার ভক্তিমূলক পরিবেশ উৎসবকে দেয় অন্য মাত্রা। পূর্ব ভারতের বাংলায় আবার আলপনা, লক্ষ্মীর সরা, নৈবেদ্য এবং পারিবারিক পুজোর মধ্যে এই রাতের আবেগ প্রকাশ পায়। এই আচারগুলির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও তাদের মূল সুরে মিল রয়েছে। পূর্ণিমার চাঁদকে কেন্দ্র করে মানুষ একত্রিত হয়, প্রার্থনা করে, বিশেষ খাবার তৈরি করে এবং রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করে। প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক ঘটনাকে ঘিরে মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন কীভাবে সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে, শারদ পূর্ণিমা তারই একটি সুন্দর উদাহরণ।


শারদ পূর্ণিমার চাঁদের আলোকে ঘিরে বহু বিশ্বাস প্রচলিত। বলা হয়, এই রাতের জ্যোৎস্নায় বিশেষ আরোগ্যক্ষমতা রয়েছে, চাঁদের আলোয় রাখা ক্ষীর অমৃতের গুণ পায়, এমনকি শরীর ও মনও বিশেষভাবে উপকৃত হয়। এই বিশ্বাসগুলি দীর্ঘকাল ধরে লোকাচার ও পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে পূর্ণিমার চাঁদ পৃথিবী থেকে আলোকিত অবস্থায় বেশি দৃশ্যমান হয়, কারণ চাঁদের সূর্যালোকপ্রাপ্ত অংশের প্রায় সম্পূর্ণটাই তখন পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকে। তবে শারদ পূর্ণিমার চাঁদ প্রতি বছর পৃথিবীর সবচেয়ে কাছে থাকে, এমন ধারণা সঠিক নয়। চাঁদের কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হওয়ায় পৃথিবী থেকে তার দূরত্ব পরিবর্তিত হয়, কিন্তু সেই পরিবর্তন নির্দিষ্টভাবে শারদ পূর্ণিমার সঙ্গেই যুক্ত নয়। একইভাবে, চাঁদের আলোয় রাখা দুধ বা ক্ষীরের বিশেষ চিকিৎসাগত গুণ রয়েছে—এমন দাবিও প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য নয়। তবু উৎসবের সাংস্কৃতিক মূল্যকে কেবল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা উচিত নয়। মানুষের বিশ্বাস, পারিবারিক স্মৃতি, প্রকৃতির প্রতি আকর্ষণ এবং একসঙ্গে উৎসব পালনের আনন্দের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে। বরং এই পূর্ণিমা আমাদের প্রকৃতিকে নতুন করে দেখার সুযোগ দিতে পারে। শহরের আলো থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকানো, চাঁদের পরিবর্তন বোঝা, শিশুদের মহাকাশ সম্পর্কে জানানো কিংবা রাতের প্রকৃতির নীরবতা অনুভব করা—এসবের মধ্যে ঐতিহ্য ও বিজ্ঞান পাশাপাশি চলতে পারে।



সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা। একসময় যেখানে পুজোর প্রস্তুতি শুরু হত কয়েক দিন আগে, আজ সেখানে অনেক আয়োজনই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয়। যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার হয়েছে, বহু মানুষ কর্মসূত্রে শহরের বাইরে থাকেন, আবার কেউ কেউ বিদেশে বসেও ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিবারের পুজোয় অংশ নেন। তবু কোজাগরী পূর্ণিমার আবেগ হারিয়ে যায়নি। বরং পরিবর্তিত জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে উৎসব নতুন রূপে বেঁচে রয়েছে। কেউ বাড়ির ঠাকুরঘরে ছোট করে পুজো করেন, কেউ পুরনো সরার ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ভাগ করে নেন, কেউ আবার বহু দূরে থাকা মা-বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলে পূর্ণিমার রাতের খবর নেন। আজকের প্রজন্মের কাছে এই উৎসবকে অর্থবহ করে তোলার জন্য তার সাংস্কৃতিক ইতিহাস জানানো জরুরি। কেন আলপনায় লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকা হয়, কেন ধান ও শস্য নৈবেদ্যে রাখা হয়, কেন এই পূর্ণিমাকে কোজাগরী বলা হয়—এসব প্রশ্নের উত্তর জানলে উৎসবের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হয়। একই সঙ্গে উৎসবকে পরিবেশবান্ধব করে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিকের সাজসজ্জা এড়িয়ে মাটির প্রদীপ, প্রাকৃতিক উপকরণ ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ব্যবহার করা যেতে পারে। অতিরিক্ত খাবার নষ্ট না করে প্রয়োজনে অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায়। কারণ, দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার অন্তর্নিহিত ভাব যদি সমৃদ্ধি ও মঙ্গল হয়, তবে সেই মঙ্গলের পরিসর বাড়ির চার দেওয়ালের বাইরেও বিস্তৃত হওয়া উচিত।



সময়ের সঙ্গে অনেক রীতিই বদলে যাবে, নতুন প্রজন্ম নতুনভাবে উৎসব পালন করবে। তবু শরতের নির্মল আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠলে মানুষের মনে যে মুগ্ধতা জাগে, তার আবেদন চিরন্তন। সেই আলোয় আমরা যেমন দেবীর কাছে মঙ্গল কামনা করি, তেমনই ফিরে দেখি নিজেদের জীবন, সম্পর্ক ও দায়িত্বকে। কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে তাই শুধু দেবীর আগমনের অপেক্ষায় জেগে থাকা নয়, জেগে থাকা নিজের বিবেকের কাছেও। মনে রাখা—সমৃদ্ধি তখনই সুন্দর, যখন তার ভাগ সবার কাছে পৌঁছয়; উৎসব তখনই পূর্ণ, যখন তার আনন্দে অন্যের মুখেও হাসি ফোটে। শারদ পূর্ণিমার চাঁদ উঠুক প্রতিটি ঘরের আকাশে। প্রদীপের আলোয় মুছে যাক অভাবের অন্ধকার, আলপনার পথে ফিরে আসুক ভালোবাসা, আর বাংলার চিরন্তন উৎসবের সুরে মিশে থাকুক শান্তি, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার প্রার্থনা।

বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজো


বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজো মানেই ঐতিহ্য, আভিজাত্য আর পারিবারিক স্মৃতির আলোয় কোজাগরীর এক চিরন্তন উপাখ্যান। শারদীয় দুর্গোৎসবের ঢাক যখন ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে আসে, বিসর্জনের বিষণ্ণ সুরে যখন মনখারাপের মেঘ জমে, ঠিক তখনই বাংলার আকাশে উদিত হন পূর্ণিমার চাঁদ। শরতের নির্মল আকাশ, শিউলির গন্ধমাখা বাতাস, উঠোনে সাদা আলপনা আর প্রদীপের সোনালি আলোয় ফিরে আসে এক অন্য উৎসব—কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। এই পুজোয় নেই দুর্গাপুজোর মতো বিপুল জনসমাগম, নেই ঢাকের প্রতিযোগিতা কিংবা আলোর ঝলকানি। আছে এক নিবিড় পারিবারিক আবহ, সমৃদ্ধির প্রার্থনা, শস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার।


বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজো তাই কেবল দেবী আরাধনার অনুষ্ঠান নয়। এটি এক একটি পরিবারের ইতিহাস, আভিজাত্য, রুচি, বিশ্বাস এবং স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জীবন্ত সংস্কৃতি। উত্তর কলকাতার পুরনো রাজবাড়ি থেকে নদিয়ার জমিদারবাড়ি, বর্ধমানের প্রাচীন গৃহস্থবাড়ি থেকে হুগলি ও মুর্শিদাবাদের ঐতিহ্যবাহী অন্দরমহল—বাঙালির ঘরে ঘরে লক্ষ্মী যেন নানা রূপে, নানা আয়োজনে, নানা কাহিনিতে বিরাজ করে।



‘কোজাগরী’ শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একটি বহুল প্রচলিত বিশ্বাস। সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’ কথাটির অর্থ—কে জেগে আছ? লোকবিশ্বাস অনুসারে, আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে দেখেন, কে তাঁর আরাধনায় জেগে রয়েছে। যে গৃহে পরিচ্ছন্নতা, নিষ্ঠা, আতিথেয়তা এবং ভক্তির সঙ্গে তাঁকে আহ্বান করা হয়, সেই গৃহে দেবীর কৃপা বর্ষিত হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজে লক্ষ্মী কেবল ধনসম্পদের দেবী নন, তিনি অন্নের দেবী, শস্যের দেবী, গৃহস্থের সুখ-শান্তি ও মঙ্গলকামনার প্রতীক। গোলাভরা ধান, গোয়ালভরা গরু, ভরা ভাঁড়ার এবং পরিবারের সুস্থতা—একটি সমৃদ্ধ সংসারের যে চিরাচরিত ছবি বাঙালির কল্পনায় রয়েছে, তার কেন্দ্রেই লক্ষ্মীর অবস্থান। বনেদি বাড়ির পুজোয় এই বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে যায় পারিবারিক ঐতিহ্য। কোথাও বহু প্রজন্ম ধরে একই প্রতিমায় পুজো হয়, কোথাও লক্ষ্মীর সরায় আঁকা দেবীমূর্তিই আরাধনার কেন্দ্র, আবার কোথাও ধানের শিষ, ঘট, পদ্মফুল এবং শস্যদানা দিয়ে সাজানো হয় পুজোর আসন। প্রতিটি বাড়ির নিজস্ব নিয়ম, নিজস্ব উপাচার, নিজস্ব স্মৃতি। সেই নিয়মের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পরিবারের সাংস্কৃতিক পরিচয়।


বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজোর প্রধান আকর্ষণ তার আড়ম্বরের চেয়ে ঐতিহ্য। প্রাচীন বাড়ির উঁচু ছাদ, খিলান দেওয়া দরজা, লম্বা বারান্দা, ঠাকুরদালান কিংবা অন্দরমহলের প্রশস্ত উঠোন—সব কিছু যেন এই পুজোর জন্যই অপেক্ষা করে থাকে। কোজাগরীর আগের দিন থেকেই শুরু হয় ঘরদোর পরিষ্কারের পালা। ঠাকুরঘর ধুয়ে-মুছে সাজানো হয়। পিতলের প্রদীপ, কাঁসার থালা, রুপোর পাত্র, পুরনো ঘট এবং পুজোর বাসনপত্র যত্ন করে বের করা হয়। অনেক বাড়িতে এই বাসনগুলি পরিবারের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেগুলির গায়ে সময়ের ছাপ থাকলেও, পরিবারের কাছে তাদের মূল্য অপরিসীম। বাড়ির প্রবীণ মহিলারা তদারক করেন পুজোর প্রস্তুতি। কোন পাত্রে নৈবেদ্য সাজবে, কোন ফুল লাগবে, কতগুলি পদ্মফুল আনতে হবে, ধানের শিষ কোথায় রাখা হবে—সবই তাঁদের নখদর্পণে। নতুন প্রজন্মের মেয়েরা তাঁদের কাছ থেকেই শেখে আলপনা দেওয়ার কৌশল, নৈবেদ্য সাজানোর নিয়ম এবং পুজোর মন্ত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পারিবারিক বিশ্বাস। পুরনো বনেদি বাড়ির অনেকগুলিতে পুজোর আয়োজনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশেষ পারিবারিক বিধি। কোথাও নির্দিষ্ট পুরোহিত বংশপরম্পরায় পুজো করে আসছেন, কোথাও নির্দিষ্ট পরিবারের সদস্যরাই পুজোর দায়িত্ব পালন করেন। কোনও কোনও বাড়িতে পুজোর দিন নিরামিষ আহারের বিশেষ নিয়ম থাকে, আবার কোথাও দেবীর ভোগের উপকরণ নির্বাচনেও চলে দীর্ঘদিনের প্রথা। এইসব নিয়মের মধ্যেই বনেদিয়ানার আসল সৌন্দর্য। আভিজাত্য এখানে কেবল মূল্যবান সামগ্রীতে নয়, বরং যত্নে, শৃঙ্খলায় এবং উত্তরাধিকারকে বাঁচিয়ে রাখার আন্তরিকতায়।



লক্ষ্মীপুজোর কথা উঠলে প্রথমেই মনে পড়ে সাদা আলপনায় সাজানো উঠোন। বাংলার লোকশিল্পের অন্যতম প্রাচীন নিদর্শন এই আলপনা, যা লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত। চালের গুঁড়ো গুলে তৈরি সাদা লেই দিয়ে আঁকা হয় পদ্ম, ধানের ছড়া, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, গোলাকার নকশা এবং নানা মঙ্গলচিহ্ন। বনেদি বাড়ির আলপনায় অনেক সময় দেখা যায় শিল্পিত সূক্ষ্মতা। বাড়ির ঠাকুরদালান থেকে পুজোর আসন পর্যন্ত আঁকা হয় দেবীর পদচিহ্ন। প্রচলিত বিশ্বাসে, এই ছোট ছোট পায়ের ছাপ ধরে দেবী লক্ষ্মী ঘরে প্রবেশ করেন। কোথাও আলপনার কেন্দ্রে থাকে বড় পদ্মফুল, তার চারদিকে ধানের শিষ, শঙ্খ কিংবা কলসের নকশা। আগেকার দিনে পরিবারের মহিলারাই এই আলপনা আঁকতেন। তাঁদের হাতের টানে তৈরি হতো এমন সব নকশা, যা কোনও ছাঁচে বাঁধা নয়, অথচ প্রজন্মের পর প্রজন্মে এক বিশেষ রীতিতে প্রবাহিত। মা যেমন শিখেছেন তাঁর মায়ের কাছে, মেয়েও তেমন শিখেছে মায়ের কাছ থেকে। আজ অবশ্য অনেক বাড়িতেই আলপনা আঁকার কাজে নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কোথাও ঐতিহ্যবাহী নকশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন শিল্পভাবনা, কোথাও আবার পুরনো নকশা অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা চলছে। তবু লক্ষ্মীপুজোর সকালে সাদা আলপনায় ভরে ওঠা উঠোনের যে মায়াবী সৌন্দর্য, তা আজও বাঙালির উৎসবস্মৃতির অন্যতম উজ্জ্বল অংশ।


বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় দেবীর রূপেও রয়েছে বৈচিত্র্য। সর্বত্র যে একই ধরনের প্রতিমা ব্যবহৃত হয়, তা নয়। কোনও বাড়িতে পূজিতা হন মাটির তৈরি লক্ষ্মীপ্রতিমা, কোথাও আবার লক্ষ্মী-নারায়ণের যুগল মূর্তি। বহু পরিবারে লক্ষ্মীর সরা বা পটের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বাংলার গ্রামীণ লোকশিল্পের ঐতিহ্যে লক্ষ্মীর সরা একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে আছে। গোলাকার মাটির পাত্রের ওপর আঁকা হয় দেবী লক্ষ্মীর মুখ, তাঁর বাহন পেঁচা, পদ্মফুল এবং অন্যান্য মঙ্গলচিহ্ন। সরা আঁকার রীতিতে অঞ্চলভেদে পার্থক্য রয়েছে। কোথাও রঙের ব্যবহার সংযত, কোথাও উজ্জ্বল লাল, হলুদ, সাদা ও সবুজের মেলবন্ধনে ফুটে ওঠে দেবীমূর্তি। বনেদি বাড়ির পুজোয় অনেক সময় পুরনো সরা বা পট যত্ন করে সংরক্ষণ করা হয়। তার বয়স কয়েক দশক, কখনও তারও বেশি হতে পারে। নতুন প্রতিমা তৈরি হলেও পরিবারের ঐতিহ্যবাহী কোনও চিহ্ন বা উপকরণ অপরিবর্তিত থাকে। কারণ, সেই বস্তুটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পূর্বপুরুষের স্মৃতি এবং পরিবারের বিশ্বাস।



কোনও বাড়িতে লক্ষ্মীকে কেবল ধনসম্পদের দেবী হিসেবে নয়, পরিবারের কন্যা কিংবা গৃহলক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবেও ভাবা হয়। দেবীকে ঘিরে থাকে স্নেহ, শ্রদ্ধা ও এক ধরনের আত্মীয়তার অনুভূতি। সেই কারণেই লক্ষ্মীপুজোর পরিবেশে দুর্গাপুজোর তুলনায় অন্য রকম অন্তরঙ্গতা অনুভূত হয়।


বাঙালির যে কোনও পুজোর সঙ্গে খাদ্যসংস্কৃতির সম্পর্ক গভীর। লক্ষ্মীপুজোও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং কোজাগরীর পুজোয় ভোগের আয়োজনের মধ্যে ধরা পড়ে বাংলার কৃষিজীবন, ঋতুচক্র এবং ঘরোয়া রন্ধনশৈলীর পরিচয়। লক্ষ্মীর ভোগে সাধারণত ফলমূল, নারকেল, নাড়ু, মুড়কি, বাতাসা, খই, চিঁড়ে, দুধ, দই এবং নানা ধরনের মিষ্টি ব্যবহৃত হয়। অঞ্চল ও পারিবারিক রীতি অনুসারে উপকরণের পরিবর্তন ঘটে। কোথাও নারকেলের নাড়ু তৈরি হয় গুড় দিয়ে, কোথাও চিনির নাড়ু। কোনও বাড়িতে থাকে তিলের নাড়ু, মোয়া, মুড়কির সঙ্গে নানা রকম ফল। আবার কোথাও পরিবারের নিজস্ব রেসিপি অনুসারে তৈরি হয় বিশেষ মিষ্টান্ন।


কোজাগরীর সঙ্গে নারকেল, খই, মুড়কি এবং চিঁড়ের সম্পর্ক কেবল স্বাদের নয়, প্রতীকীও। বাংলার কৃষিজীবনে নতুন শস্য, ধান এবং শস্যজাত খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। লক্ষ্মীকে শস্যের দেবী হিসেবে কল্পনা করার ফলে অন্ন ও কৃষিজ উপকরণ তাঁর আরাধনায় বিশেষ স্থান পেয়েছে। অনেক বনেদি বাড়িতে ভোগ রান্নার দায়িত্ব পরিবারের নির্দিষ্ট সদস্যদের ওপর থাকে। বাড়ির প্রবীণ মহিলারা মাপজোক বলে দেন, ছোটরা সাহায্য করে নারকেল কোরা, নাড়ু পাকানো কিংবা ফল সাজানোর কাজে। রান্নাঘরে তখন তৈরি হয় এক অন্য উৎসবের পরিবেশ। বড় বড় পাত্রে ভোগ প্রস্তুত হয়, থালায় থালায় সাজানো হয় নৈবেদ্য, আর তার সঙ্গে মিশে থাকে ঘিয়ের সুগন্ধ, নারকেলের মিষ্টি গন্ধ এবং নতুন শস্যের পরিচিত আবেশ।


তবে প্রতিটি বনেদি বাড়ির ভোগের তালিকা এক নয়। কোথাও নির্দিষ্ট কয়েকটি পদ বহু বছর ধরে অপরিবর্তিত, কোথাও আবার পারিবারিক রুচি ও আঞ্চলিক প্রথা অনুযায়ী ভোগের আয়োজন বদলেছে। এই বৈচিত্র্যই বাংলার খাদ্যঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। কোজাগরীর রাতে আত্মীয়স্বজন ও অতিথিদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়েও প্রকাশ পায় বাঙালির আতিথেয়তা। দেবীর ভোগ সকলের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে রয়েছে প্রাচুর্যকে ভাগ করে নেওয়ার এক সুন্দর সামাজিক বার্তা।



বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজো বলতে শুধু কলকাতার পুরনো জমিদারবাড়িকে বোঝায় না। বাংলার নানা জেলা ও অঞ্চলে রয়েছে স্বতন্ত্র পুজোর রীতি, যা স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। কলকাতার পুরনো বনেদি পরিবারগুলির পুজোয় যেমন দেখা যায় সাবেকি প্রতিমা, ঐতিহ্যবাহী পুজোর বাসন এবং অন্দরমহলের আয়োজন, তেমনই নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি, মুর্শিদাবাদ কিংবা মেদিনীপুরের বিভিন্ন পরিবারের পুজোয় প্রতিফলিত হয় নিজস্ব আঞ্চলিক রীতি। কোথাও লক্ষ্মীর সরা প্রধান, কোথাও প্রতিমা, আবার কোথাও বাড়ির ঠাকুরঘরে স্থাপিত লক্ষ্মী-নারায়ণের বিগ্রহই পুজোর কেন্দ্র। ঐতিহাসিকভাবে বাংলার জমিদার ও সচ্ছল গৃহস্থ পরিবারগুলিতে গৃহদেবতার পুজো ছিল পারিবারিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই ধারায় লক্ষ্মীপুজোও বহু বাড়িতে বিশেষ মর্যাদা পেয়েছে। তবে সব বনেদি পরিবারের ইতিহাস এক নয়, তাঁদের পুজোর সূচনাকাল বা আয়োজন সম্পর্কেও একটিমাত্র সাধারণ বিবরণ দেওয়া যায় না। অনেক পরিবারের প্রথা নথিভুক্ত ইতিহাসের চেয়ে বেশি নির্ভরশীল মৌখিক স্মৃতি ও পারিবারিক বর্ণনার ওপর।


বাড়ির প্রবীণদের মুখে শোনা যায়, একসময় পুজোর দিন দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয়রা আসতেন। যাঁরা সারা বছর কর্মসূত্রে অন্যত্র থাকতেন, তাঁরাও চেষ্টা করতেন কোজাগরীর সময় বাড়িতে ফিরতে। এক উঠোনে জড়ো হতেন পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্ম। পুজোর পর চলত গল্প, স্মৃতিচারণ, আত্মীয়তার খোঁজখবর এবং প্রসাদ বিতরণ। আজ সময় বদলেছে। বহু পুরনো বাড়ির যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট হয়েছে, কেউ কেউ কর্মসূত্রে শহর বা দেশের বাইরে চলে গিয়েছেন। তবু বাড়ির লক্ষ্মীপুজোকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবারে ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা রয়ে গিয়েছে। পুজো তাই শুধু দেবীর আরাধনা নয়, পরিবারের মানুষদের একত্রিত করার উপলক্ষও।


কোজাগরী পূর্ণিমার আরেকটি পরিচিত অনুষঙ্গ হল রাত জাগা। লোকাচার অনুসারে, এই রাতে অনেকেই জেগে থাকেন, দেবীর আরাধনা করেন এবং বাড়িতে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখেন। কিছু পরিবারে প্রচলিত রয়েছে পাশা বা অন্যান্য ঘরোয়া খেলার রীতি। তবে সব বাড়িতে এই প্রথা সমানভাবে পালিত হয় না। আগেকার দিনের বনেদি বাড়িতে রাতের পুজোর পর পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসতেন। কোথাও চলত গল্পগুজব, কোথাও ধর্মীয় পাঠ, কোথাও আবার আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া। জানলার বাইরে পূর্ণিমার আলো, উঠোনে প্রদীপের সারি, আর ঘরের মধ্যে মৃদু কথোপকথন—এই পরিবেশে উৎসব যেন পেত এক অনন্য আবেশ।



শরতের আকাশে কোজাগরীর চাঁদকে ঘিরে বাঙালির কল্পনায় বহুদিন ধরেই জড়িয়ে রয়েছে নির্মলতা ও প্রাচুর্যের প্রতীক। চাঁদের আলোয় স্নাত বাড়ির ছাদ, সাদা আলপনায় ভরা উঠোন কিংবা ঠাকুরদালানে জ্বলতে থাকা প্রদীপের দৃশ্য আজও বহু মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। আধুনিক জীবনে রাত জাগার রীতিতে পরিবর্তন এলেও কোজাগরীর পূর্ণিমা বাঙালির কাছে এখনও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কেউ পুজো সেরে আত্মীয়দের সঙ্গে সময় কাটান, কেউ বাড়ির ছাদে বসে চাঁদ দেখেন, কেউ আবার পরের দিনের কাজের প্রস্তুতির মধ্যেও উৎসবের আবহটুকু ধরে রাখেন।


সময়ের সঙ্গে বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজোতেও এসেছে পরিবর্তন। পুরনো বাড়ির অনেকগুলি আজ আর আগের মতো বাসযোগ্য নয়। কোথাও পরিবারের সদস্যসংখ্যা কমেছে, কোথাও পুজোর খরচ বহন করা কঠিন হয়ে উঠেছে। আবার কিছু পরিবার পেশাগত ব্যস্ততা ও দূরত্বের কারণে আগের মতো বড় আয়োজন করতে পারেন না। তবু ঐতিহ্য রক্ষার ইচ্ছা আজও প্রবল। কোথাও পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হয়ে পুজোর আয়োজন করেন, কোথাও ছোট পরিসরে পুরনো রীতি বজায় রাখা হয়। পুজোর প্রতিটি উপকরণ সংগ্রহ করা, পুরনো আলপনার নকশা সংরক্ষণ করা, পূর্বপুরুষদের ব্যবহৃত বাসন যত্নে রাখা কিংবা পরিবারের নিজস্ব ভোগের রেসিপি লিখে রাখা—এই ছোট ছোট উদ্যোগই ঐতিহ্যকে ভবিষ্যতের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যম। নতুন প্রজন্মের কাছে এই পুজোর তাৎপর্য বোঝানোও জরুরি। শুধু আচার পালন নয়, কেন লক্ষ্মীকে শস্যের দেবী বলা হয়, কেন আলপনায় ধানের ছড়া আঁকা হয়, কেন ভোগে খই-মুড়কি-নারকেলের গুরুত্ব—এই প্রশ্নগুলির উত্তর জানার মধ্য দিয়েই ঐতিহ্য নতুন করে অর্থ পায়।


একই সঙ্গে লক্ষ্মীপুজোর সামাজিক তাৎপর্যও মনে রাখা প্রয়োজন। সমৃদ্ধির কামনা যেন কেবল ব্যক্তিগত সম্পদবৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। পরিবারের সুস্থতা, পরস্পরের প্রতি সম্মান, শ্রমের মর্যাদা, অন্নের অপচয় রোধ এবং অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এই মূল্যবোধগুলিও লক্ষ্মী আরাধনার ভাবনার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কারণ, যে ঘরে অন্নের মর্যাদা আছে, মানুষের প্রতি মমতা আছে, পরিশ্রমের সম্মান আছে, সেই ঘরের সমৃদ্ধিই প্রকৃত অর্থে স্থায়ী।


বাংলার লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে নারীর শ্রম, সৃজনশীলতা এবং গৃহসংস্কৃতির সম্পর্ক গভীর। পুজোর প্রস্তুতিতে আলপনা আঁকা, নৈবেদ্য সাজানো, নাড়ু তৈরি, ফুল বাছাই, পুজোর উপকরণ গুছিয়ে রাখা—এই কাজগুলির বড় অংশ বহুদিন ধরে পরিবারের মহিলারাই সামলে এসেছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের হাতেই রক্ষিত হয়েছে পরিবারের পুজোর নিয়ম, বিশেষ রান্নার পদ্ধতি এবং পুরনো দিনের গল্প। কোন বছরে কীভাবে পুজো হয়েছিল, কোন আত্মীয় কোন উপহার দিয়েছিলেন, কোন নাড়ুর স্বাদ ছিল সবার প্রিয়—এমন অসংখ্য স্মৃতি তাঁদের মুখে মুখে বেঁচে থাকে।


কিন্তু এই ঐতিহ্যকে কেবল নারীর অবৈতনিক শ্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা উচিত নয়। পুজোর দায়িত্ব পরিবারের সব প্রজন্ম ও সদস্যের মধ্যে ভাগ করে নেওয়া গেলে উৎসব আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। আজ বহু বাড়িতে পুরুষেরাও ভোগ রান্না, বাজার করা, আলপনা আঁকা এবং পুজোর আয়োজনের বিভিন্ন কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। এই পরিবর্তন ঐতিহ্যকে ভাঙে না, বরং তাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলে। লক্ষ্মীকে গৃহের মঙ্গল ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে দেখার অর্থ তাই শুধু দেবীর আরাধনা নয়, ঘরের প্রতিটি মানুষের শ্রম ও অবদানকে সম্মান জানানোও।



বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজোর সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ধারাবাহিকতা। বাড়ির রং বদলেছে, মানুষ বদলেছে, সময়ের সঙ্গে বদলেছে পুজোর আয়োজনও। তবু কোজাগরীর রাতে দেবীর সামনে প্রদীপ জ্বালানোর মুহূর্তটি বহু পরিবারের কাছে আজও একই রকম আবেগময়। যে বাড়িতে একসময় ঠাকুরদালানে জড়ো হতেন চার প্রজন্ম, আজ সেখানে হয়তো হাতে গোনা কয়েকজন। যে উঠোনে একসময় পরিবারের প্রবীণ মহিলা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আলপনা আঁকতেন, আজ সেখানে তাঁর নাতনি নতুন করে সেই নকশা শেখার চেষ্টা করছে। যে রুপোর থালায় পূর্বপুরুষেরা ভোগ সাজাতেন, আজও সেই থালাতেই সাজানো হচ্ছে নারকেলের নাড়ু, খই আর ফলমূল। এই ধারাবাহিকতাই বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজোকে অনন্য করে তুলেছে। ঐতিহ্য মানে কেবল অতীতকে অবিকল ধরে রাখা নয়; বরং অতীতের মূল্যবোধকে বর্তমানের জীবনে অর্থবহ করে তোলা। কোজাগরীর পূর্ণিমা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সমৃদ্ধি শুধু ধনসম্পদে মাপা যায় না। পরিবারের মানুষের ভালো থাকা, ঘরে অন্নের নিশ্চয়তা, সম্পর্কের উষ্ণতা, সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে মূল্যবান স্মৃতি তুলে দেওয়ার মধ্যেও রয়েছে প্রকৃত ঐশ্বর্য।


বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজো সেই ঐশ্বর্যেরই এক মায়াময় প্রতিচ্ছবি। পূর্ণিমার আলোয় যখন সাদা আলপনায় আঁকা দেবীর পদচিহ্ন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, প্রদীপের শিখা দুলতে থাকে বাতাসে, আর ভোগের থালায় সাজানো থাকে অন্ন ও মিষ্টান্ন, তখন মনে হয়—এই পুজো শুধু দেবীকে ঘরে আহ্বান করার নয়, নিজের শিকড়ের কাছেও ফিরে আসার উৎসব। বহু শতাব্দীর লোকবিশ্বাস, কৃষিজীবনের স্মৃতি, পারিবারিক সংস্কার এবং বাঙালির আবেগ মিলেমিশে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়। সময়ের পরিবর্তন সত্ত্বেও সেই পরিচয় বেঁচে থাকবে, যতদিন কোনও বনেদি বাড়ির উঠোনে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে আঁকা হবে আলপনা, যতদিন কোনও মা তাঁর মেয়েকে শেখাবেন নাড়ু পাকানোর পুরনো কৌশল, যতদিন পূর্ণিমার রাতে পরিবারের মানুষ একসঙ্গে বসে দেবীর কাছে প্রার্থনা করবেন সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির। তখনই বোঝা যাবে, বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজো আসলে কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়—এ আমাদের পারিবারিক উত্তরাধিকার, লোকসংস্কৃতির গর্ব এবং বাঙালির চিরন্তন ঘরকন্নার ইতিহাস। কোজাগরীর চাঁদের মতোই তার আলো ম্লান হয় না; প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, স্মৃতি থেকে স্মৃতিতে, সেই আলো নীরবে ছড়িয়ে পড়ে বাংলার প্রতিটি ঘরে।

কোজাগরীর রান্নাঘর


শরতের আকাশে ঝলমল করছে পূর্ণিমার চাঁদ। উঠোনে সাদা চালের গুঁড়ির আলপনা, দরজার সামনে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, ঠাকুরঘরে জ্বলছে প্রদীপ। দুর্গাপুজোর উচ্ছ্বাস পেরিয়ে বাঙালির ঘরে ঘরে এসে উপস্থিত হয়েছে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো। এই রাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অগণিত বিশ্বাস, পারিবারিক রীতি আর শৈশবের মায়ামাখা স্মৃতি। আর এই সমস্ত কিছুর কেন্দ্রে যে জায়গাটি নিঃশব্দে উৎসবের প্রাণ হয়ে ওঠে, সেটি হল রান্নাঘর।


কড়াইয়ে নারকেল কোরা আর গুড়ের মিষ্টি গন্ধ, উনুনে দুধ জ্বাল দেওয়ার দৃশ্য, চাল-ডাল বেছে রাখার ব্যস্ততা, ফলমূল সাজিয়ে রাখার প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে কোজাগরীর রান্নাঘর যেন এক অন্য জগৎ। এখানে রান্না মানে কেবল খাবার তৈরি করা নয়, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে আসা ঐতিহ্যকে যত্ন করে বাঁচিয়ে রাখা। ঠাকুমার হাতের নারকেলের নাড়ু, মায়ের তৈরি সুজির হালুয়া কিংবা পুজোর পর ছোট্ট বাটিতে পরিবেশন করা পায়েস—এই সব স্বাদেই মিশে থাকে বাঙালির উৎসবের আবেগ।



‘কোজাগরী’ শব্দটি নিয়ে প্রচলিত বিশ্বাস, শারদ পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী প্রশ্ন করেন, ‘কে জেগে আছ?’ এই বিশ্বাস থেকেই বহু পরিবারে রাত জেগে দেবীর আরাধনা করার রীতি রয়েছে। দেবী লক্ষ্মীকে অন্ন, শস্য, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে কল্পনা করা হয়। তাই তাঁর পুজোয় চাল, ধান, দুধ, নারকেল, গুড়, চিঁড়ে, খই, মুড়ি ও ফলমূলের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তবে বাংলার প্রতিটি পরিবারের পুজোর রীতি এক নয়। কোথাও লুচি ও সুজি, কোথাও নিরামিষ খিচুড়ি ও তরকারি, আবার কোথাও ঘরোয়া মিষ্টি আর ফলমূল দিয়েই সাজানো হয় দেবীর নৈবেদ্য।


কোজাগরীর রান্নাঘরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার সরলতা। অল্প কিছু উপকরণ, সামান্য সময় আর অনেকখানি আন্তরিকতা দিয়েই তৈরি হয়ে যায় উৎসবের নানা পদ। সেই পরিচিত স্বাদের কয়েকটি রেসিপি আজও বাংলার ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজোর আনন্দকে পূর্ণতা দেয়।



ভোগের নিরামিষ খিচুড়ি


বাঙালির পুজোর ভোগে খিচুড়ির স্থান বরাবরই বিশেষ। গোবিন্দভোগ চালের মিষ্টি সুবাস, ভাজা মুগ ডালের ঘ্রাণ আর ঘিয়ের পরশে তৈরি খিচুড়ি যেন উৎসবের নিজস্ব স্বাদ। যদিও সব বাড়িতে কোজাগরীর ভোগে খিচুড়ি হয় না, বহু পরিবারে এটি বিশেষ যত্নে রান্না করা হয়।


কী কী লাগবে

গোবিন্দভোগ চাল ১ কাপ, মুগ ডাল আধ কাপ, আদাবাটা ১ চা-চামচ, গোটা জিরে আধ চা-চামচ, তেজপাতা ২টি, শুকনো লঙ্কা ১টি, হলুদ গুঁড়ো আধ চা-চামচ, জিরে গুঁড়ো আধ চা-চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি সামান্য, ঘি ১–২ টেবিল-চামচ, গরম জল প্রয়োজনমতো।


কীভাবে বানাবেন

প্রথমে মুগ ডাল শুকনো কড়াইয়ে হালকা সোনালি করে ভেজে ধুয়ে নাও। চালও ভালো করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখো। কড়াইয়ে সামান্য ঘি গরম করে তেজপাতা, গোটা জিরে ও শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দাও। এবার আদাবাটা দিয়ে কিছুক্ষণ নেড়ে ভাজা ডাল ও চাল মিশিয়ে নাও। হলুদ ও জিরে গুঁড়ো দিয়ে ভালোভাবে নাড়াচাড়া করে গরম জল ঢেলে দাও। চাল ও ডাল সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত মাঝারি আঁচে রান্না করো। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও গরম জল দিতে পারো। শেষে নুন, সামান্য চিনি ও ঘি মিশিয়ে নামিয়ে নাও। ভোগের খিচুড়ি খুব শুকনো না রেখে মাখামাখা করলে খেতে ভালো লাগে।



নিরামিষ লাবড়া


খিচুড়ির সঙ্গে লাবড়া থাকলে ভোগের থালা যেন পূর্ণতা পায়। কুমড়ো, আলু, মিষ্টি আলু, বাঁধাকপি, বেগুন কিংবা অন্যান্য মৌসুমি সবজি দিয়ে তৈরি এই পদ বাঙালির নিরামিষ রান্নার এক পরিচিত ঐতিহ্য। একাধিক সবজির স্বাদ একসঙ্গে মিশে তৈরি করে অপূর্ব এক ঘরোয়া স্বাদ।


কী কী লাগবে

কুমড়ো ২০০ গ্রাম, আলু ১টি, মিষ্টি আলু ১টি, বেগুন ১টি, বাঁধাকপি ১ কাপ, মূলা ১টি, কাঁচালঙ্কা ২টি, আদাবাটা ১ চা-চামচ, পাঁচফোড়ন আধ চা-চামচ, শুকনো লঙ্কা ১টি, হলুদ গুঁড়ো আধ চা-চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি সামান্য, সর্ষের তেল ২ টেবিল-চামচ।



কীভাবে বানাবেন

সব সবজি মাঝারি আকারে কেটে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নাও। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে পাঁচফোড়ন ও শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দাও। আদাবাটা দিয়ে সামান্য নেড়ে প্রথমে শক্ত সবজিগুলি দিয়ে ভাজতে থাকো। এরপর কুমড়ো, বেগুন ও বাঁধাকপি দিয়ে হলুদ, নুন ও কাঁচালঙ্কা মিশিয়ে নাও। অল্প জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে কম আঁচে রান্না করো। সবজি নরম হয়ে এলে চামচ দিয়ে সামান্য চটকে মাখামাখা করে নাও। শেষে স্বাদমতো সামান্য চিনি দিয়ে নামিয়ে ফেলো। পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া এই রান্নাটি বহু বাড়িতে পুজোর নিরামিষ ভোগের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।



ফুলকো লুচি


কোজাগরীর সন্ধ্যায় গরম লুচির গন্ধে বাড়ির পরিবেশই বদলে যায়। কোথাও লুচির সঙ্গে সুজি, কোথাও আবার আলুর তরকারি বা অন্যান্য নিরামিষ পদ পরিবেশন করা হয়। পুজোর ভোগে লুচি থাকলে তার সাদা, ফুলকো রূপটি যেন উৎসবের থালায় আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে।


কী কী লাগবে

ময়দা ২ কাপ, সাদা তেল বা ঘি ১ টেবিল-চামচ, নুন এক চিমটি, কুসুম গরম জল প্রয়োজনমতো, ভাজার জন্য সাদা তেল।


কীভাবে বানাবেন

ময়দার সঙ্গে নুন ও তেল বা ঘি ভালো করে মিশিয়ে নাও। অল্প অল্প জল দিয়ে শক্ত অথচ মসৃণ মণ্ড তৈরি করো। ঢাকা দিয়ে ১৫–২০ মিনিট রেখে ছোট ছোট লেচি কেটে গোল করে বেলে নাও। কড়াইয়ে তেল গরম হলে একটি করে লুচি ছেড়ে আলতো করে চাপ দাও, যাতে লুচি ফুলে ওঠে। দুই পিঠ হালকা সোনালি হলে তুলে নাও। গরম লুচি সুজি কিংবা পছন্দের নিরামিষ তরকারির সঙ্গে পরিবেশন করো।



সুজির হালুয়া


লুচির সঙ্গে সুজি বাঙালির বহু পরিবারের কোজাগরীর পরিচিত আয়োজন। ঘি, এলাচ, কাজুবাদাম ও কিশমিশের মিষ্টি সুবাসে তৈরি সুজির হালুয়া খুব সাধারণ উপকরণেই উৎসবের স্বাদ এনে দেয়।



কী কী লাগবে

সুজি ১ কাপ, ঘি ৩ টেবিল-চামচ, চিনি আধ কাপ, জল ২ কাপ, ছোট এলাচ ২টি, কাজুবাদাম ৮–১০টি, কিশমিশ ১ টেবিল-চামচ।


কীভাবে বানাবেন

একটি পাত্রে জল ও চিনি গরম করে চিনির রস তৈরি করে রাখো। অন্য কড়াইয়ে ঘি গরম করে কাজুবাদাম ও কিশমিশ হালকা ভেজে তুলে নাও। একই ঘিয়ের মধ্যে সুজি দিয়ে কম আঁচে ধীরে ধীরে ভাজতে থাকো। সুজি থেকে মিষ্টি সুবাস বেরোলে গরম চিনির জল সাবধানে ঢেলে দাও। এক হাতে জল ঢালবে, অন্য হাতে ক্রমাগত নাড়বে, যাতে দলা না বাঁধে। সুজি জল শুষে নরম হয়ে এলে এলাচ গুঁড়ো, ভাজা কাজু ও কিশমিশ মিশিয়ে ঢাকা দিয়ে দু-এক মিনিট রেখে নামিয়ে নাও।



নারকেল নাড়ু


কোজাগরীর রান্নাঘরের কথা উঠলে নারকেলের নাড়ুর কথা বলতেই হয়। নারকেল কোরা, গুড়ের পাক আর এলাচের সুবাস—এই তিনের মেলবন্ধনেই তৈরি হয় বাঙালির ঘরোয়া মিষ্টির অন্যতম প্রিয় পদ। একসময় পুজোর আগে বাড়ির মেয়েরা একসঙ্গে বসে নাড়ু তৈরি করতেন। কেউ নারকেল কুরিয়ে দিতেন, কেউ কড়াইয়ে পাক নাড়তেন, আবার কেউ ঠান্ডা হওয়ার আগেই গোল গোল নাড়ু গড়ে রাখতেন। সেই দৃশ্যের মধ্যে ছিল পারিবারিক আনন্দের এক সহজ, অনাড়ম্বর সৌন্দর্য।


কী কী লাগবে

নারকেল কোরা ২ কাপ, খেজুর গুড় ১ কাপ, ছোট এলাচ গুঁড়ো আধ চা-চামচ, প্রয়োজনে দুধ ২–৩ টেবিল-চামচ।


কীভাবে বানাবেন

কড়াইয়ে নারকেল কোরা ও গুড় একসঙ্গে দিয়ে কম আঁচে নাড়তে থাকো। গুড় গলে নারকেলের সঙ্গে মিশে গেলে ক্রমাগত নাড়বে, যাতে তলায় লেগে না যায়। মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে এবং কড়াইয়ের গা ছাড়তে শুরু করলে এলাচ গুঁড়ো দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নামিয়ে নাও। সামান্য ঠান্ডা হলে হাতে অল্প ঘি মেখে গোল গোল নাড়ু তৈরি করো। নাড়ু গড়ার সময় মিশ্রণ একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেলে শক্ত হয়ে যেতে পারে, তাই হালকা গরম থাকতেই কাজটি করা ভালো। সম্পূর্ণ ঠান্ডা হলে শুকনো পাত্রে রেখে দাও।


চিনি দিয়েও নারকেলের নাড়ু তৈরি করা যায়। তবে খেজুর গুড়ের নাড়ুতে যে গভীর মিষ্টি সুবাস থাকে, তা কোজাগরীর ঘরোয়া আবহের সঙ্গে বিশেষভাবে মানিয়ে যায়।



তিলের নাড়ু


তিল ও গুড়ের নাড়ু বাংলার ঋতুভিত্তিক মিষ্টির ঐতিহ্যের অংশ। কোজাগরীর নৈবেদ্যে এটি সর্বত্র প্রচলিত না হলেও অনেক পরিবারে ঘরোয়া মিষ্টির তালিকায় তিলের নাড়ু জায়গা করে নেয়। অল্প উপকরণে তৈরি এই মিষ্টি স্বাদে যেমন চমৎকার, তেমনই দেখতে সুন্দর।


কী কী লাগবে

সাদা তিল ১ কাপ, খেজুর গুড় আধ কাপ, নারকেল কোরা ২ টেবিল-চামচ, এলাচ গুঁড়ো এক চিমটি।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে শুকনো কড়াইয়ে তিল হালকা ভেজে নাও। তিল থেকে সুবাস বেরোলে নামিয়ে ঠান্ডা করে রাখো। অন্য কড়াইয়ে গুড় দিয়ে কম আঁচে গলিয়ে ঘন পাক তৈরি করো। এক ফোঁটা গুড় ঠান্ডা জলে ফেললে যদি তা সামান্য জমাট বাঁধে, বুঝবে পাক তৈরি হয়েছে। এবার তিল, নারকেল কোরা ও এলাচ গুঁড়ো দিয়ে দ্রুত মিশিয়ে নাও। মিশ্রণটি সামান্য ঠান্ডা হলে হাতে অল্প ঘি মেখে গোল নাড়ু তৈরি করো। গুড় ঠান্ডা হয়ে গেলে মিশ্রণ শক্ত হয়ে যায়, তাই এই সময়ে দ্রুত কাজ করা জরুরি।



মোয়া


মুড়ির মোয়া বাংলার ঘরোয়া মিষ্টির এমন একটি পদ, যার সঙ্গে গ্রামবাংলার কৃষিজীবন ও শস্যের সম্পর্ক গভীর। মুড়ি আর গুড়ের মতো সাধারণ উপকরণ দিয়ে তৈরি এই মিষ্টি বহু বাড়িতে উৎসবের সময় প্রস্তুত করা হয়। কোজাগরীর নৈবেদ্যে মোয়া থাকলে ভোগের থালায় যোগ হয় বাংলার মাটির কাছাকাছি এক পরিচিত স্বাদ।


কী কী লাগবে

মুড়ি ৪ কাপ, খেজুর গুড় ১ কাপ, ঘি ১ চা-চামচ, ছোট এলাচ গুঁড়ো এক চিমটি।


কীভাবে বানাবেন

মুড়ি ঝেড়ে পরিষ্কার করে একটি বড় পাত্রে রাখো। কড়াইয়ে গুড় দিয়ে কম আঁচে গলাতে থাকো। গুড় ঘন হয়ে এলে সামান্য পাক পরীক্ষা করে ঘি ও এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে নাও। এবার দ্রুত মুড়ি ঢেলে কাঠের চামচ দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে ফেলো। মুড়ির প্রতিটি দানায় গুড় মাখা হয়ে গেলে মিশ্রণটি সামান্য ঠান্ডা হতে দাও। হাতে অল্প ঘি মেখে গোল গোল মোয়া তৈরি করো। গুড়ের পাক ঠিক থাকলে মোয়া সুন্দরভাবে জমে যাবে।



খইয়ের মুড়কি


মুড়কি তৈরি করতে উপকরণ লাগে সামান্য, কিন্তু গুড়ের পাক ঠিক হওয়া জরুরি। হালকা মিষ্টি, মুচমুচে এই পদটি ঘরোয়া নৈবেদ্যের পাশাপাশি পুজোর পর প্রসাদ হিসেবে পরিবেশন করার জন্যও উপযোগী।


কী কী লাগবে

খই ৩ কাপ, খেজুর গুড় আধ কাপ, জল ১–২ টেবিল-চামচ, ঘি আধ চা-চামচ।


কীভাবে বানাবেন

কড়াইয়ে গুড় ও অল্প জল দিয়ে গলিয়ে নাও। গুড় ফুটে ঘন হয়ে এলে কম আঁচে নাড়তে থাকো। এবার খই দিয়ে দ্রুত মিশিয়ে ফেলো, যাতে প্রতিটি দানা গুড়ের আস্তরণে ঢেকে যায়। একটি থালায় সামান্য ঘি মেখে মিশ্রণটি ছড়িয়ে দাও। ঠান্ডা হয়ে গেলে হাতে ভেঙে ছোট ছোট মুড়কি তৈরি করো। সম্পূর্ণ ঠান্ডা হলে বায়ুরোধী পাত্রে রাখলে মুড়কির মুচমুচে ভাব বজায় থাকে।



পায়েস


বাংলার শুভ অনুষ্ঠানে পায়েসের উপস্থিতি যেন এক চিরন্তন রীতি। জন্মদিন, অন্নপ্রাশন কিংবা পারিবারিক পুজো—দুধ ও চালের এই মিষ্টি পদটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে শুভ সূচনা ও আনন্দের স্মৃতি। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোতেও অনেক বাড়িতে পায়েস নিবেদন করা হয়। গোবিন্দভোগ চালের সুগন্ধ, ঘন দুধের মিষ্টত্ব আর এলাচের সুবাসে তৈরি পায়েস ভোগের থালায় বিশেষ স্থান অধিকার করে।


কী কী লাগবে

গোবিন্দভোগ চাল আধ কাপ, ঘন দুধ ১ লিটার, চিনি আধ কাপ বা স্বাদমতো, তেজপাতা ১টি, ছোট এলাচ ২টি, কাজুবাদাম ৮–১০টি, কিশমিশ ১ টেবিল-চামচ।


কীভাবে বানাবেন

চাল ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখো। একটি ভারী তলাযুক্ত পাত্রে দুধ ফুটিয়ে আঁচ কমিয়ে দাও। এবার দুধে চাল ও তেজপাতা দিয়ে মাঝেমধ্যে নাড়তে থাকো, যাতে চাল তলায় লেগে না যায়। চাল নরম হয়ে এলে এবং দুধ ঘন হয়ে উঠলে চিনি মিশিয়ে দাও। আরও কিছুক্ষণ কম আঁচে রান্না করে এলাচ গুঁড়ো, কাজুবাদাম ও কিশমিশ দিয়ে নামিয়ে নাও। পায়েস ঠান্ডা হলে আরও ঘন হয়ে আসে, তাই রান্নার সময় খুব বেশি শুকিয়ে ফেলার প্রয়োজন নেই।



চিঁড়ের নৈবেদ্য


কোজাগরীর নৈবেদ্যে ফলমূল, চিঁড়ে, দুধ, কলা, খই ও মুড়ির মতো উপকরণও বহু বাড়িতে ব্যবহৃত হয়। কোথাও এগুলি আলাদা করে নিবেদন করা হয়, কোথাও আবার চিঁড়ে ও দুধ মিশিয়ে তৈরি করা হয় একটি সহজ মিষ্টি পদ। এই আয়োজনের মধ্যে রয়েছে অন্নের প্রতি শ্রদ্ধা এবং প্রকৃতির দানের জন্য কৃতজ্ঞতার অনুভূতি।


কী কী লাগবে

পাতলা চিঁড়ে ১ কাপ, দুধ ১ কাপ, পাকা কলা ১টি, চিনি বা গুড় স্বাদমতো, কিশমিশ সামান্য, নারকেল কোরা সামান্য।


কীভাবে বানাবেন

চিঁড়ে পরিষ্কার করে অল্প জল দিয়ে দ্রুত ধুয়ে জল ঝরিয়ে নাও। বেশি সময় ভিজিয়ে রাখবে না, তাতে চিঁড়ে গলে যেতে পারে। এবার দুধের সঙ্গে চিঁড়ে মিশিয়ে কাটা কলা, চিনি বা গুড় এবং কিশমিশ দিয়ে নেড়ে নাও। উপর থেকে সামান্য নারকেল কোরা ছড়িয়ে পরিবেশন করো। পুজোর নৈবেদ্যে নিবেদন করার আগে বাড়ির প্রচলিত রীতি অনুযায়ী উপকরণ সাজিয়ে রাখবে।



কোজাগরীর রান্নাঘরের সঙ্গে পুজোর ঘরের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। একদিকে কড়াইয়ে যখন নাড়ু তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে উঠোনে বা ঠাকুরঘরের সামনে আঁকা হচ্ছে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। সাদা চালের গুঁড়ি দিয়ে পদ্ম, শঙ্খ, ধানের শিষ কিংবা নানা নকশায় সাজিয়ে তোলা হয় মেঝে। ঘটের পাশে রাখা হয় আমপাতা, নারকেল, ধান, দুর্বা ও ফুল। পুজোর থালায় ভোগের পদগুলি সাজানোর সময়ও থাকে বিশেষ যত্ন। ছোট বাটিতে পায়েস, থালায় ফলমূল, পাশে নাড়ু-মোয়া-মুড়কি—সব মিলিয়ে নৈবেদ্য যেন হয়ে ওঠে এক সুন্দর ঘরোয়া শিল্পকর্ম।


বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কোজাগরীর ভোগের আয়োজন ভিন্ন। কোথাও নিরামিষ খিচুড়ি ও তরকারি, কোথাও লুচি-সুজি, কোথাও আবার ফলমূল ও ঘরোয়া মিষ্টিই প্রধান। কোনও একটি পদকে বাংলার সব বাড়ির জন্য অপরিহার্য বলা যায় না। বরং এই বৈচিত্র্যের মধ্যেই বাংলার লক্ষ্মীপুজোর সৌন্দর্য লুকিয়ে রয়েছে।


অনেক বাড়িতে আমিষ ভোগ করা হয় না। রান্নার পাত্র আলাদা রাখা হয়, ভোগ নিবেদনের আগে খাবার চেখে দেখা হয় না, অন্নভোগ হয় আলুনি, আবার কোথাও উপবাসের নির্দিষ্ট নিয়মও মানা হয়। পারিবারিক রীতি অনুযায়ী এই আচারগুলির মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। রান্নার উপকরণ ও প্রণালীর পাশাপাশি এই বিশ্বাসগুলিও উৎসবের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখে। লক্ষ্মীপুজোর সঙ্গে সম্পদ ও সৌভাগ্যের ধারণা জড়িত থাকলেও বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজে দেবী লক্ষ্মী অন্ন, শস্য ও গৃহস্থের সমৃদ্ধিরও প্রতীক। ধান, চাল, দুধ, ফলমূল ও গুড়ের মতো উপকরণ তাই ভোগের থালায় বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। শস্যের প্রতিটি দানা যে কত পরিশ্রমে ঘরে আসে, সেই উপলব্ধিও এই উৎসবের অন্তর্নিহিত বার্তা।


একটি নাড়ু তৈরির জন্য নারকেল কোরা থেকে গুড়ের পাক দেওয়া পর্যন্ত যে শ্রম লাগে, একটি পায়েসের জন্য দুধ জ্বাল দিতে যে ধৈর্যের প্রয়োজন হয়, কিংবা একটি খিচুড়ির জন্য চাল-ডাল বেছে নিয়ে সবজি কাটার যে প্রস্তুতি—এসব কাজের মধ্যেই রয়েছে অন্নের প্রতি সম্মান। ভোগের পদগুলি তাই কেবল দেবীর সামনে নিবেদিত খাবার নয়; এগুলি গৃহস্থের শ্রম, প্রকৃতির দান এবং পরিবারের সম্মিলিত ভালোবাসার প্রতীক। বর্তমান সময়ে কর্মব্যস্ত জীবনে প্রতিটি পদ বাড়িতে তৈরি করা সম্ভব হয় না। তবু কয়েকটি পদ নিজের হাতে তৈরি করলে কোজাগরীর আনন্দ যেন অন্য মাত্রা পায়। একটি ছোট বাটিতে পায়েস, কয়েকটি নারকেলের নাড়ু, কিছু ফল, খই আর মুড়কি দিয়েও সুন্দর নৈবেদ্য সাজানো যায়। পুজোর পর সেই প্রসাদ পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার আনন্দও কম নয়। খাবার ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসব ব্যক্তিগত পরিসর ছাড়িয়ে সামাজিক বন্ধনের রূপ পায়।


কোজাগরীর রান্নাঘর আসলে কোনও নির্দিষ্ট রেসিপির সংকলন নয়। এটি বাংলার গৃহস্থালি সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল, যেখানে রন্ধনপ্রণালীর সঙ্গে মিশে থাকে আচার, স্মৃতি, পারিবারিক গল্প এবং ঋতুর পরিবর্তন। এখানে রান্নার উপকরণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সেই রান্নাকে ঘিরে মানুষের সম্পর্ক। শারদ পূর্ণিমার রাতে জানলার বাইরে যখন গোল চাঁদ উঠে আসে, প্রদীপের আলোয় ঝলমল করে ঠাকুরঘর, তখন রান্নাঘরের এক কোণে সাজানো থাকে নারকেলের নাড়ু, পায়েস, খই-মুড়কি আর ভোগের থালা। কোথাও সদ্য নামানো খিচুড়ির ধোঁয়া উঠছে, কোথাও গরম লুচি ঢাকা দিয়ে রাখা হয়েছে, কোথাও আবার ছোট্ট বাটিতে দুধ-চিঁড়ে অপেক্ষা করছে দেবীর নিবেদনের জন্য। এই পরিচিত দৃশ্যের মধ্যেই বেঁচে থাকে বাঙালির কোজাগরী।


দেবী লক্ষ্মীর কাছে প্রার্থনা শুধু ধনসম্পদের নয়, ঘরে যেন অন্নের অভাব না হয়, সংসারে যেন শান্তি থাকে, পরিবারের মানুষগুলি যেন সুস্থ ও সুখী থাকে। তাই কোজাগরীর ভোগের আসল মাধুর্য তার বাহুল্যে নয়, তার আন্তরিকতায়। মুঠোভর্তি খই, গুড়ের একটি নাড়ু কিংবা এক চামচ পায়েসের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে গভীর কৃতজ্ঞতা। কোজাগরীর রান্নাঘর তাই শেষ পর্যন্ত এক ভালোবাসার নাম—যেখানে উনুনের আঁচে শুধু খাবার তৈরি হয় না, তৈরি হয় স্মৃতি; গুড়ের মিষ্টিতে শুধু স্বাদ মেশে না, মেশে শৈশব; আর ভোগের থালায় শুধু উপকরণ সাজানো হয় না, সাজানো হয় একটি বাঙালি পরিবারের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির স্বপ্ন।

আলপনায় অক্ষয় ঐতিহ্য


শরতের নীল আকাশে যখন পূর্ণিমার চাঁদ তার স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে দেয় বাংলার আঙিনায়, তখন ঘরে ঘরে শুরু হয় এক বিশেষ প্রস্তুতি। উনুনে নৈবেদ্যের আয়োজন, ঠাকুরঘরে লক্ষ্মীর আসন সাজানো, ধানের শিষ, কড়ি, শঙ্খ, প্রদীপ আর নতুন ফসলের সম্ভারে সেজে ওঠে পুজোর ঘর। আর সেই সমস্ত আয়োজনের মধ্যে যে শিল্পটি নিঃশব্দে বাঙালির উৎসবচেতনাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে নিয়ে চলেছে, তার নাম আলপনা। কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আলপনা কেবল মেঝের ওপর আঁকা কিছু সাদা রেখা নয়, বরং তা বাঙালির কৃষিজীবন, সমৃদ্ধির আকাঙ্ক্ষা, নারীর সৃজনশীলতা এবং দেবী লক্ষ্মীকে ঘরে আহ্বান করার এক প্রাচীন সাংস্কৃতিক ভাষা।


কোজাগরী শব্দটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, শারদ পূর্ণিমার রাতে দেবী লক্ষ্মী পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করেন এবং দেখেন, কে জেগে থেকে তাঁর আরাধনা করছে। ‘কো জাগর্তি’ অর্থাৎ ‘কে জেগে আছে’—এই বিশ্বাস থেকেই কোজাগরী নামের উৎপত্তি বলে মনে করা হয়। সেই জাগরণের রাতে ঘরের প্রতিটি কোণ পরিচ্ছন্ন করে, প্রদীপ জ্বেলে, দেবীর পূজার আয়োজন করা হয়। আর আলপনা হয়ে ওঠে সেই পবিত্র আহ্বানের দৃশ্যমান প্রকাশ। মাটির ঘরের দাওয়া থেকে কলকাতার বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান, গ্রামের উঠোন থেকে আধুনিক ফ্ল্যাটের পুজোর আসন—সর্বত্র আলপনার মধ্য দিয়ে বাঙালি যেন দেবীকে জানায়, তাঁর আগমনের অপেক্ষায় ঘর প্রস্তুত।


বাংলার আলপনা মূলত লোকশিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। গ্রামবাংলার মাটির বাড়িতে উৎসব, ব্রত, বিবাহ কিংবা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আগে মেঝে পরিষ্কার করে তার ওপর আলপনা আঁকার রীতি বহুদিনের। একসময় চাল বেটে তৈরি করা হতো সাদা তরল, যা পরিচিত ছিল পিটুলি বা চালের গুঁড়ির গোলা হিসেবে। আঙুলের ডগা, তুলোর পুঁটলি কিংবা কাপড়ের সাহায্যে সেই গোলা দিয়ে আঁকা হতো নানা নকশা। এই শিল্পে বিশেষ কোনও দামি উপকরণের প্রয়োজন পড়ত না। ঘরের চাল, জল আর শিল্পীর কল্পনাই হয়ে উঠত আলপনার প্রধান উপাদান।


কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আলপনার বিশেষত্ব হলো, এর নকশায় ধর্মীয় প্রতীক ও লোকবিশ্বাসের নিবিড় মেলবন্ধন ঘটে। অন্যান্য উৎসবের আলপনায় যেখানে নানা জ্যামিতিক নকশা, ফুল, লতা কিংবা বিমূর্ত রেখার প্রাধান্য দেখা যায়, সেখানে লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় দেবীর আগমন, ধনধান্যের প্রাচুর্য এবং শুভলক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পদ্ম, ধানের শিষ, শঙ্খ, প্রদীপ, কড়ি, কলস এবং লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ—প্রতিটি নকশার পিছনেই রয়েছে কোনও না কোনও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য।


কোজাগরী আলপনার সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। ঠাকুরঘরের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে মূল পুজোর আসন পর্যন্ত ছোট ছোট পায়ের চিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়। অনেক বাড়িতে এই পায়ের ছাপ বাইরের দিক থেকে ঘরের ভিতরে এগিয়ে আসে, যেন দেবী নিজেই পদার্পণ করছেন গৃহস্থের অন্দরে। কোথাও আবার লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ আঁকা হয় ধানের গোলা, চালের হাঁড়ি কিংবা অর্থসম্পদের প্রতীকী স্থানের সামনে।


এই পায়ের ছাপের নকশা সাধারণত ছোট, সরল এবং যুগল আকারে তৈরি হয়। পায়ের আঙুলের চিহ্নগুলি স্পষ্ট করে আঁকা হয়, যাতে তার মধ্যে পদচারণার অনুভূতি ফুটে ওঠে। তবে সব অঞ্চলে নকশার ধরন এক নয়। কোথাও পায়ের ছাপ বড়, কোথাও ছোট; কোথাও একটির পর একটি সারিবদ্ধ, আবার কোথাও পদ্মফুলের নকশার সঙ্গে মিলিয়ে আঁকা হয়। এই প্রতীকী পদচিহ্নের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বাঙালির এক আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা—দেবী যেন শুধু পুজোর আসনেই সীমাবদ্ধ না থাকেন, তিনি যেন পরিবারের দৈনন্দিন জীবনেরও অংশ হয়ে ওঠেন। তাঁর আগমনের অর্থ শুধু অর্থসম্পদ নয়; সংসারে অন্নের অভাব না থাকা, পরিবারের মঙ্গল, শান্তি এবং পরিশ্রমের যথার্থ মূল্য পাওয়ার স্বপ্নও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।


লক্ষ্মীর আলপনায় পদ্মফুলের উপস্থিতি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পদ্ম দেবীর অন্যতম পরিচিত প্রতীক। কাদাজলে জন্মেও পদ্ম যেমন তার সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রাখে, তেমনই সংসারের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও শুভ ও সুন্দরকে ধারণ করার প্রত্যাশা এই ফুলের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। আলপনায় পদ্মের পাপড়ি কখনও একের পর এক বৃত্তাকারে সাজানো হয়, কখনও ফুলের চারদিকে লতাপাতা কিংবা ছোট ছোট বিন্দু দিয়ে নকশা সম্পূর্ণ করা হয়। পুজোর আসনের কেন্দ্রে বড় পদ্ম এঁকে তার ওপর দেবীর আসন স্থাপন করার রীতিও বহু বাড়িতে দেখা যায়।


অন্যদিকে ধানের শিষ ও শস্যের নকশা বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজজীবনের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলার লক্ষ্মী মূলত অন্ন, শস্য ও সমৃদ্ধির দেবী হিসেবেও পূজিত। কৃষিনির্ভর জীবনে নতুন ধান, গোলাভরা শস্য এবং পরিবারের সারা বছরের খাদ্যনিরাপত্তা ছিল পরম কাম্য। তাই আলপনায় ধানের শিষ আঁকা কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের উপায় নয়; তা ছিল শস্যপূর্ণ জীবনের প্রার্থনা। কোথাও ধানের শিষের পাশে আঁকা হয় গোলাকার শস্যভাণ্ডারের প্রতীক, কোথাও ধানের শিষকে ঘিরে থাকে লতাপাতা। আবার কোথাও শঙ্খ, কড়ি ও পদ্মের সঙ্গে ধানের নকশা মিলিয়ে তৈরি হয় একটি সম্পূর্ণ অলংকরণ। এই নকশাগুলির মধ্যে দিয়ে বোঝা যায়, বাংলার লোকশিল্প কখনও মানুষের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। তার প্রতিটি রেখায় ধরা পড়েছে মাটি, ফসল, সংসার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আশা।


কোজাগরী আলপনায় কড়ি একটি পরিচিত প্রতীক। একসময় বাংলায় কড়ি বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীকালে কড়ি শুভলক্ষণ, সম্পদ ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে লোকাচারে স্থান পায়। তাই লক্ষ্মীপুজোর আলপনায় কড়ির নকশা অর্থনৈতিক প্রাচুর্যের আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। শঙ্খের নকশা শুভতা ও পবিত্রতার ভাব বহন করে। পূজার আচার-অনুষ্ঠানে শঙ্খধ্বনির যে বিশেষ স্থান, আলপনায় তার প্রতীকী উপস্থিতিও তেমনই তাৎপর্যপূর্ণ। কলস বা ঘট আবার পূর্ণতা, মঙ্গল এবং জীবনধারণের উপাদানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। কলসের গায়ে লতা, ফুল কিংবা পাতা এঁকে আলপনাকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা হয়।


প্রদীপের নকশা কোজাগরী রাতের সঙ্গে বিশেষভাবে মানানসই। শারদ পূর্ণিমার চাঁদের আলো আর প্রদীপের উষ্ণ শিখা—এই দুই আলোর মিলন যেন উৎসবের আবহকে আরও মায়াময় করে তোলে। আলপনায় প্রদীপ আঁকার মধ্যে রয়েছে অন্ধকার দূর করে শুভের প্রতিষ্ঠা করার ভাবনা। সব মিলিয়ে প্রতিটি প্রতীক আলাদা হলেও তাদের সম্মিলিত অর্থ একটাই—ঘরে আসুক মঙ্গল, জীবনে থাকুক প্রাচুর্য, আর সংসার ভরে উঠুক শান্তি ও আনন্দে।


প্রথাগত কোজাগরী আলপনার প্রধান রং সাদা। চালের গুঁড়ি ও জল মিশিয়ে তৈরি সাদা গোলা দিয়ে মাটির লালচে বা মেঝের গাঢ় পটভূমির ওপর নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। সাদা রঙের সরলতা এবং উজ্জ্বলতা আলপনাকে এক ধরনের পবিত্র ও শান্ত সৌন্দর্য দেয়। কোনও কোনও বাড়িতে আলপনার চারপাশে সিঁদুর, হলুদ কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক রঙের ব্যবহার দেখা যায়। আধুনিক সময়ে রং, তুলি ও নানা উপকরণের সাহায্যে বহুরঙা আলপনাও তৈরি হচ্ছে। তবে ঐতিহ্যবাহী আলপনার আসল সৌন্দর্য তার নিখুঁত যান্ত্রিক পরিমাপে নয়, বরং হাতের স্বতঃস্ফূর্ত রেখায়। একই পদ্মফুল দুই শিল্পীর হাতে দু’ভাবে ফুটে উঠতে পারে। একই লক্ষ্মীর পায়ের ছাপের নকশায় থাকতে পারে ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিগত ছোঁয়া। এই বৈচিত্র্যই আলপনাকে জীবন্ত লোকশিল্পে পরিণত করেছে।


অনেক বাড়িতে আলপনার নকশা মুখে মুখে শেখানো হয়। মা মেয়েকে, ঠাকুমা নাতনিকে কিংবা পরিবারের প্রবীণ কোনও মহিলা ছোটদের হাতে ধরে শিখিয়ে দেন পদ্ম আঁকার কৌশল, পায়ের ছাপের মাপ এবং লতার বাঁক। ফলে আলপনা শুধু একটি শিল্পচর্চা নয়, পারিবারিক স্মৃতি ও প্রজন্মান্তরের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারেরও বাহক। এই শেখার মধ্যে কোনও আনুষ্ঠানিকতার প্রয়োজন হয় না। পুজোর আগের বিকেলে মেঝে পরিষ্কার করা, চালের গুঁড়ি গুলে নেওয়া, নকশার পরিকল্পনা করা এবং একসঙ্গে আলপনা আঁকার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় এক আন্তরিক পারিবারিক পরিবেশ।


বাংলার বনেদি বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় আলপনার একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। প্রশস্ত ঠাকুরদালান, পুরনো মেঝে, পিতলের প্রদীপ, ধানের শিষ, শঙ্খ ও ঐতিহ্যবাহী পুজোর উপকরণের সঙ্গে সাদা আলপনার নকশা এক অনন্য আবহ তৈরি করে। কোথাও পুজোর আসনের চারদিকে বৃত্তাকার নকশা, কোথাও দরজার সামনে লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, আবার কোথাও উঠোনজুড়ে পদ্ম ও লতাপাতার বিস্তার দেখা যায়। গ্রামবাংলায় আলপনার নকশা প্রায়শই স্থানীয় লোকসংস্কৃতি ও পারিবারিক রীতির সঙ্গে যুক্ত। কোনও বাড়িতে বিশেষ একটি নকশা বহু প্রজন্ম ধরে ব্যবহৃত হয়, যা সেই পরিবারের নিজস্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। আবার শহরের আধুনিক বাড়িতেও ছোট্ট পুজোর আসনের সামনে আঁকা আলপনা উৎসবের পরিবেশকে পূর্ণতা দেয়।


সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কোজাগরী আলপনার ধরন বদলেছে। সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবে নতুন নকশা ছড়িয়ে পড়ছে, শহরে পেশাদার শিল্পীরা আলপনা আঁকছেন, আবার অনেকে নিজের বাড়ির পুজোকে বিশেষ করে তুলতে আধুনিক নকশার সাহায্য নিচ্ছেন। মেঝেতে সরাসরি আঁকার পাশাপাশি এখন কাঠ, কাপড় কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ওপরও আলপনার নকশা তৈরি করা হয়। এই পরিবর্তন স্বাভাবিক। তবে তার মধ্যেও প্রথাগত আলপনার মূল ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। কারণ আলপনা শুধু উৎসবের সাজসজ্জা নয়; তা বাংলার ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও পারিবারিক সংস্কৃতির এক মূল্যবান দলিল।


আলপনার ইতিহাসের সঙ্গে বাংলার নারীদের সৃজনশীল শ্রম গভীরভাবে জড়িত। সংসারের কাজের ফাঁকে, পুজোর আগের ব্যস্ততার মধ্যে, অনেক মহিলা নিজেদের কল্পনা ও দক্ষতায় মেঝেকে রূপ দিয়েছেন শিল্পের ক্যানভাসে। তাঁদের অনেকের নাম ইতিহাসে লেখা নেই, তাঁদের নকশার কোনও লিখিত দলিলও নেই। তবু তাঁদের হাতের কাজের মধ্য দিয়ে একটি সমৃদ্ধ লোকশিল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে রয়েছে। চালের গোলায় আঙুল ডুবিয়ে একটি রেখা টানা থেকে শুরু করে জটিল পদ্মের নকশা সম্পূর্ণ করা—সবই ছিল অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সম্মিলন। আজও অনেক বাড়িতে আলপনা আঁকার সময় পরিবারের সকলে মিলে কাজ করেন। কেউ নকশা ঠিক করেন, কেউ চালের গোলা তৈরি করেন, কেউ প্রদীপ সাজান। এই সম্মিলিত প্রস্তুতিই উৎসবকে সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনের উৎসবে পরিণত করে।


শারদ পূর্ণিমার রাতে যখন উঠোনে বা ঠাকুরঘরের সামনে সাদা আলপনা ফুটে ওঠে, তখন মনে হয় যেন মাটির বুকেই লেখা হচ্ছে এক প্রাচীন প্রার্থনা। সেই প্রার্থনায় রয়েছে অন্নের নিশ্চয়তা, সংসারের মঙ্গল, প্রিয়জনের সুস্থতা এবং আগামী দিনের আশাবাদ। লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ যেন প্রতিটি ঘরে মনে করিয়ে দেয়—সমৃদ্ধি শুধু ধনসম্পদের নাম নয়, পরিশ্রমের সম্মান, ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ এবং ভালোবাসায় বাঁধা সংসারও তারই অংশ।


কোজাগরী আলপনার বিশেষত্ব তাই তার নকশার নিপুণতায় যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি তার অন্তর্নিহিত বিশ্বাসে। সাদা রেখার প্রতিটি বাঁকে, পদ্মের প্রতিটি পাপড়িতে, ধানের শিষের প্রতিটি দোলায় এবং ছোট্ট পায়ের ছাপের প্রতিটি চিহ্নে লুকিয়ে থাকে বাংলার জীবনদর্শন। আধুনিকতার আলোয় বদলে যাওয়া পৃথিবীতেও এই আলপনা আমাদের শিকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, উৎসবের প্রকৃত সৌন্দর্য দামি আয়োজনে নয়, বরং নিজের হাতে সাজিয়ে তোলা ঘরে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা স্মৃতিতে এবং মাটির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের মধ্যে।


কোজাগরীর পূর্ণিমার চাঁদ যখন আকাশের বুকে স্থির হয়ে থাকে, তখন ঘরের মেঝেতে আঁকা সাদা আলপনা যেন তারই প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে। সেই আলোয় দেবী লক্ষ্মীকে আহ্বান করার পাশাপাশি বাঙালি আসলে নিজের ঐতিহ্যকেও নতুন করে বরণ করে নেয়। আর তাই, যত দিন বাংলার ঘরে ঘরে লক্ষ্মীপুজো হবে, যত দিন চালের গোলা মিশিয়ে আঙুলের ডগায় ফুটে উঠবে পদ্ম আর পায়ের ছাপ, তত দিন কোজাগরী আলপনা হয়ে থাকবে বাংলার সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল, স্নিগ্ধ এবং চিরন্তন পরিচয়।

রবিবারের গল্প: ভুপেদা জিন্দাবাদ


ভগীরথ মিশ্র


১.


মানুষটির পোশাকি নাম বুঝি ভূপতি কিংবা ভূপেন। কিন্তু দুনিয়াশুদ্ধু মানুষ তাকে ভুপে নামেই চেনে। কারোর তিনি ভুপেদা, কারোর বা ভুপেকাকা, ভুপেমামা, কারোর কাছে তিনি শুধুই ভুপে। আমাদের মতো কচিকাঁচাদের কাছে তিনি ভুপেদা।


আমাদের চেয়ে বয়সে বেশ বড়ই ভুপেদা। কিন্তু আমরা সেটা ভুলেই গিয়েছি। ওর সঙ্গে ঘুরে বেড়াবার সময় মনে হয়, তিনি বুঝি আমাদের সহপাঠী, বুঝি একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়েন। ভূপতি মানে নাকি রাজা-গজা। আর, রাজা-গজা মানেই গম্ভীর, লালচোখো, রুক্ষ জাতের একটি লোক। কথাটা যে কতখানি ভুল, তা আমাদের ভুপেদাকে দেখলেই মালুম হয়। তিনি যে কতখানি মাই-ডিয়ার আর মজাদার, ওঁকে দেখতে দেখতে আমাদের একটু একটু করে বিশ্বাস হয়েছে, স্রেফ মজা করে ভুপেদা যা খুশি করতে পারে। বাস্তবিক, ভুপেদা আমাদের দেখা সেরা মজাদার মানুষ একজন।


সারাক্ষণ দুনিয়ার সবকিছু নিয়ে মজা করাটা সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু ভুপেদা তা অবলীলায় পারে! হাসির কথা বলতে গিয়ে, কিংবা হাসির ঘটনা ঘটাবার সময় অনেকে নিজেরাই হেসে কুটিপাটি হয়। কিন্তু ভুপেদা ঠিক তার উলটো। ওর মুখে মজার কথা শুনে, কিংবা ওকে অন্যের সঙ্গে মজা করতে দেখে আমরা যখন হেসে কুটিপাটি, ভুপেদার মুখে কিন্তু হাসির লেশমাত্র থাকে না। এমন গম্ভীর মুখে মজা করতে আমি আর কাউকে দেখিনি।


সেবার, আমরা তখন ক্লাস নাইনের ছাত্র, মহকুমা স্তরে একটা ফুটবল টুর্নামেন্ট হচ্ছিল। আমাদের স্কুলও নাম দিয়েছিল তাতে। ভুপেদা কবে জানি আমাদের স্কুলে পড়ত, কিন্তু আজ অবধি স্কুলের সঙ্গে তার সম্পর্ক আগের মতোই রয়েছে। ফুটবলটা নাকি এককালে ভালোই খেলত ভুপেদা। সেই সুবাদে ছাত্রজীবনে সে ছিল আমাদের স্কুলের ফুটবল-টিমের কোচ-কাম-ক্যাপ্টেন-কাম-ম্যানেজার। আজও আমাদের স্কুলের ফুটবল-টিমটির ক্ষেত্রে ভুপেদা ওই পদেই রয়েছে। নিজে অবশ্য মাঠে নামে না এখন, তবে বাকি পদগুলো এখনও অবধি তাঁর জন্যই বাঁধা। ফলে, কোথাও আমাদের স্কুলের ম্যাচ থাকলে ভুপেদাই আমাদের দলের নেতা। মূলত তাঁরই অভিভাবকত্বে দূরে-দূরান্তে অবধি খেলতে যাই আমরা।


মহকুমা ফুটবল টুর্নামেন্টের খেলাগুলো ফি-বছর নবীগঞ্জ হাইস্কুলের মাঠেই হয় ফি-বছর। আমাদের বসন্তপুর থেকে গোটা পাঁচেক স্টেশন পরেই নবীগঞ্জ। আমরা ট্রেনে চড়েই খেলতে যাই। ট্রেনে চড়েই ফিরি। রওনা দেবার আগে হেডস্যার আমাদের যাতায়াতের ট্রেনভাড়া ও যৎসামান্য টিফিন বাবদ কিছু টাকা গুঁজে দেন ভুপেদার হাতে। ওই টাকা এবং গুটি পনেরোর একটি দল নিয়ে রওনা হয় ভুপেদা। এ বছরের টুর্নামেন্টেও প্রায় প্রতিটি রাউন্ডে জিতছি আমরা। কিন্তু তাও ফি-বারেই শুকনো মুখে বাড়ি ফিরি। কারণ, খেলা শেষ হলে পর যদিও টুর্নামেন্ট কমিটি পাউরুটি আর ঘুগনির একটা ছোট্ট জলখাবার দেয়, কিন্তু সেই কখন বাড়ি থেকে বেরোই আমরা, দেড় ঘণ্টা মাঠে দৌড়োদৌড়ি করি, কাজেই, ওইটুকু জলখাবারে আমাদের পেটের এক কোণও ভরে না। ভুপেদা হেডস্যারের দেওয়া টিফিনের পয়সা দিয়ে আমাদের যা খাওয়ায়, তাও দু-গ্রাসেই শেষ করে ফেলি আমরা। কাজেই, বাড়ি যখন ফিরি, খিদের চোটে আমরা কাহিল।


কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে আমরা তাই ভুপেদার সামনে জোরালো দাবি পেশ করলুম, হেডস্যারকে বলে টিফিনের বরাদ্দ বাড়াও ভুপেদা। ফেরার পথে মাথা ঘুরতে থাকে আমাদের। ভুপেদা যথারীতি দাবিটা পেশ করল হেডস্যারের কাছে। কিন্তু হেডস্যার ছিলেন রাম চিপ্পু। একটি পয়সাও বাড়ালেন না। বাধ্য হয়ে বরাদ্দ গুটিকয়েক টাকা নিয়েই রওনা দিল ভুপেদা।


সেদিন বেশ গম্ভীর লাগছিল ওকে। বুঝলুম, এতগুলো ছেলেকে শেষবেলায় খালিপেটে ফিরিয়ে আনতে ওর বিবেকে খুবই লাগছে। অথচ হেডস্যারের কথার ওপর তো কথা চলে না।


বসন্তপুর স্টেশনে পৌঁছে টিকিটের লাইনে দাঁড়াল ভুপেদা। আমরা আশেপাশে ঘোরাঘুরি করতে লাগলুম। যথাসময়ে ভুপেদা কাউন্টারের মুখটাতে পৌঁছল। খুব স্পষ্ট গলায় উচ্চারণ করল, নবীগঞ্জ, একটা।


শুনেই আমাদের সবার ভুরু একসঙ্গে কুঁচকে উঠল। দলে পনেরো জন রয়েছি, ভুপেদা কোন আক্কেলে মাত্র একখানা টিকিট কাটল?


টিকিটের লাইন থেকে বেরিয়ে আসতেই আমরা সবাই ভুপেদাকে ঘিরে ধরলুম, মাত্র একখানা টিকিট কাটলে যে? আমরা কি তবে বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ব?


—চেকার যদি ধরে?


—ইদানীং খুব চেকিং হচ্ছে ভুপেদা।


—গতকালই জনা দশেককে জেলে পুরেছে।


—ওদের মধ্যে আমাদের স্কুলের পিয়ন পরেশও ছিল।


ভুপেদা খুব গম্ভীর মুখে শুনছিল আমাদের কথাগুলো। একসময় কটমট করে তাকায় আমাদের দিকে। খরখরে গলায় বলে, এই টিমের কোচ কে? আমি না তোরা?


—তুমিই তো।


—এই টিমের ম্যানেজার কে? আমি, নাকি তোরা?


—আ—হা, এসব কে অস্বীকার করছে? কিন্তু তাই বলে বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়লে চেকার যদি ধরে...?


ভুপেদা রাগী রাগী মুখে বলে, আদার ব্যাপারী তোরা, জাহাজের খোঁজ নিচ্ছিস কেন? চেকার ধরলে কী হবে, সে ভাবনা তো আমার। তোরা শুধু নিজেদের খেলাটা খ্যাল দেখি। নবীগঞ্জকে অন্তত পাঁচ গোল দেওয়া চাই। বাকিটা আমার ওপর ছেড়ে দে।


প্ল্যাটফর্মে এসে একসময় ট্রেনে চড়লুম আমরা। ট্রেনের মধ্যে সারাক্ষণ বুক ধুকপুক করছিল আমাদের। মনে হচ্ছিল, যদি চেকার একটিবার চলে আসে আমাদের কামরায়, তো আমরা গেছি। সঙ্গে সঙ্গে লক-আপে ঢুকিয়ে দেবে। ফলে, নবীগঞ্জ আজকের খেলায় ওয়াকওভার পেয়ে যাবে। আর, খবরটা পাওয়ামাত্র হেডস্যার আমাদের পিঠে দু-ডজন বেত ভাঙবেন।


কিন্তু আমাদের কপাল ভালো, সারাটা পথ চেকার আমাদের কামরায় এল না। একসময় ট্রেন থামল নবীগঞ্জ স্টেশনে।


সেদিনও গেটের মুখে খুব চেকিং চলছে। দূর থেকে দেখতে পেলুম আমরা। আচমকা বুকটা কেমন ঢিপঢিপ করতে লাগল। আজ একটা কেলেঙ্কারি না হয়ে যায় না।


গেটের মুখটাতে এসে ভুপেদা টিকিট-চেকারের পাশটিতে দাঁড়িয়ে পড়ল। গম্ভীর গলায় বলল, সবাই এক-এক করে লাইন দিয়ে বেরোও। হুড়োহুড়ি করো না। বলতে বলতে তিনি মুখে মুখে গুনতি শুরু করে দিলেন। অ্যা—ক, দু—ই, তি—ন, আ—ট, ন—য়, বা—রো, তে—রো, চোদ্দ...।


আমরা সবাই গেটের বাইরে যাবার পর চেকারের দিকে তাকিয়ে একগাল হাসল ভুপেদা। বলল, গেটের মুখে ভিড় বেড়ে গেলে আপনারা যে কী মুশকিলে পড়ে যান!


একগাল হেসে চেকার পুরোপুরি সমর্থন করলেন ভুপেদার কথাটা।


ভুপেদা ততক্ষণে পকেট থেকে একখানা টিকিট বের করে এগিয়ে দিয়েছে চেকারের দিকে। মিষ্টি হেসে বলল, তাহলে এবার আমি যা—ই?


ভুপেদার দিকে কটমট করে তাকালেন চেকার, এ কী! একটিমাত্র যে?


আবারও মিষ্টি হেসে ভুপেদা বলল, আমি তো একাই।


—আর ওরা? ওই যাদের গুনে গুনে বের করলেন গেট দিয়ে?


—ওরা আমার লোক হতে যাবে কেন? ওদের তো আমি চিনিই না। ভুপেদা মিষ্টি হাসিতে ভরিয়ে ফেলল মুখ, ছেলেগুলো তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে আসছে দেখে আমার মনে হল, আপনাকে একটুখানি হেল্প করা দরকার। একসঙ্গে এত প্যাসেঞ্জারের ভিড় সামলাতে গিয়ে আপনার হিমশিম অবস্থা হবে, তা—ই—।


ততক্ষণে আমরা সবাই স্টেশনের বাইরে। ভুপেদার কথা শুনে চেকার এমন দৃষ্টিতে তাকালেন ওর দিকে, সত্যযুগ হলে ভুপেদা নির্ঘাত ভস্ম হয়ে যেত। কিন্তু ততক্ষণে আমরা তো চেকারের নাগালের বাইরে।


হাসিমুখে গেটের বাইরে বেরিয়ে এল ভুপেদা। চেকারের দিকে মুখ ফিরিয়ে নমস্কার করল। বলল, চলি, অ্যাঁ। বাবা সেই ছেলেবেলাতেই শিখিয়েছিলেন, কেউ অসুবিধেয় পড়েছে দেখলে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিস, খোকা। সেটা আর ইহজীবনে ভুলতে পারলুম না।


বলতে বলতে একসময় আমাদের কাছে চলে এল ভুপেদা।


বলল, চল, চল, ম্যাচের সময় হয়ে এল।


নবীগঞ্জের সঙ্গে ম্যাচটাতে আমরা তিন গোলে জিতলুম। টুর্নামেন্ট-কমিটির দেওয়া যৎসামান্য টিফিন খেয়ে আমরা রওনা দিলুম স্টেশনের দিকে।


স্টেশনের কাছেই আদ্যাশক্তি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। থরে থরে সাজানো রয়েছে হরেক জাতের মিঠাই। কিন্তু আমরা তো জানি, টিফিন বাবদ হেডস্যারের দেওয়া যৎসামান্য পয়সায় আমাদের কপালে একটি দানাদারের বেশি জুটবে না। কিন্তু প্লেটে প্লেটে যখন খাবার এল, আমরা সবাই চোখ ছানাবড়া করে দেখলুম, দুটো করে ফুলকপির সিঙ্গাড়া, একটা করে রসমালাই আর একটা করে চমচম। বুঝলুম, আমাদের চোদ্দজনের রেলের টিকিট ফাঁকি দিয়ে ওই টাকায় এই বাড়তি ব্যবস্থা। আমরা সবাই একযোগে চেঁচিয়ে উঠলুম, ভুপেদা জিন্দাবাদ।


ঘোতনটা আবার রাম পাকা। খেতে খেতে বলে উঠল, কিন্তু বিনা টিকিটে রেলে চড়ে রেল-কোম্পানিকে ফাঁকি দেওয়াটা কি ভালো, ভুপেদা?


সিঙ্গাড়ায় কামড় দিতে গিয়ে থেমে গেল ভুপেদা। ঘোতনের দিকে কটমট করে তাকাল। বলল, তাহলে তো বলতে হয়, দেশের স্বাধীনতার জন্য সাহেবকে মারতে গিয়ে ঘোরতর অন্যায় করেছিল শহিদ ক্ষুদিরাম। একটু থেমে বলল, ওরে, একটা বড় কাজের জন্য দু-একটা খুচরো অন্যায় করলে তাতে দোষ হয় না। এতগুলো কচি পেটে আগুন জ্বলছে, সেই আগুন নেভাবার জন্য...। কথাটা আর শেষ করল না ভুপেদা। একলপটে সিঙ্গাড়ার আধখানাই পুরে ফেলল মুখে।


২.


আমাদের জয়ের খবরে স্কুলশুদ্ধু সবার আনন্দের সীমা নেই। হেডস্যার একদিন টিফিন-পিরিয়ডে স্কুলের সামনের মাঠে সবাইকে জড়ো করে একটা রিসেপশন দিয়ে দিলেন। স্যারেরা সবাই একে একে স্কুলের ফুটবল-টিমের খেলুড়েদের শতমুখে প্রশংসা করলেন।


পরের সপ্তাহেই আমাদের সেমিফাইনাল ম্যাচ হবিবপুরের সঙ্গে। ভুপেদাই আমাদের কোচ-কাম-ম্যানেজার। নবীগঞ্জের মাঠেই খেলা।


এবার দলে আমরা ষোলোজন, কিন্তু সেদিনও স্টেশনে এসে মাত্র একটা টিকিট কাটল ভুপেদা।


আমরা বলে উঠি, রোজ রোজ এক বুদ্ধি খাটবে না ভুপেদা। মাত্র গেল সপ্তাহেই চেকারকে বোকা বানিয়েছ তুমি। সে ভুলে গিয়েছে ভেবেছ? তোমাকে দেখেই চিনে ফেলবে।


কটমট করে আমাদের দিকে তাকাল ভুপেদা। বলল, তোদের কতবার বলেছি না, খেলার আগে শুধু খেলা নিয়েই ভাববি। একেবারে অর্জুনের পাখির চোখ দেখার কায়দায়। আমার ভাবনা আমাকে ভাবতে দে না।


ঠিক সময়ে নবীগঞ্জে নামলুম আমরা।


ওই পড়ন্ত দুপুরে ট্রেন থেকে বড় একটা কেউ নামেনি। আমাদের টিমের জনা ষোল ছাড়া আর মাত্র দু-চারজনই ছিল।


আমাদের একটুখানি পেছনে থাকতে বলে ভুপেদা একাই হনহন করে এগিয়ে গেল গেটের দিকে। আমরা দূর থেকে দেখলুম, সেই আগের দিনের গোঁফওয়ালা চেকার পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে গেটের মুখে। এবং চেকারের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝলুম, ভুপেদাকে বিলক্ষণ চিনতে পেরেছে সে। আর কারোর দিকে না তাকিয়ে সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে ভুপেদার দিকেই, যেমন করে ইঁদুরের দিকে তাকায় শিকারি বেড়াল।


ভুপেদা কোনও দিকে না তাকিয়ে আচমকা সুরুৎ করে পেরিয়ে গেল গেটটা। তারপর হনহনিয়ে হাঁটতে লাগল।


পেছন থেকে হাঁ-হাঁ করে উঠল চেকার। বলল, এই যে মশাই, টিকিট না দিয়ে চলে যাচ্ছেন যে?


ভুপেদা কোনও জবাব না দিয়ে হাঁটতেই লাগল।


—তবে রে! টিকিট না দিয়ে কেটে পড়া? দাঁড়াও, দাঁড়াও বলছি। বলতে বলতে চেকারও হাঁটতে লাগল ভুপেদার পিছুপিছু। তাই দেখে ভুপেদা হাঁটার গতিটা বাড়িয়ে দিল। ওকে ধরবার জন্য চেকারও ততক্ষণে ছুটতে শুরু করেছে। তাই দেখে ভুপেদাও ছুটতে শুরু করল। আমরা দূর থেকে দেখতে পাচ্ছিলুম দৃশ্যটা। ভয়ে আমাদের দুরুদুরু করছিল বুক। আজ একটা কেলেঙ্কারি না ঘটে যায় না।


ওদিক থেকে একটা রেলের সেপাই হেলতে দুলতে আসছিল। চেকার ওর দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, অ্যাই, ধরো ধরো। টিকিট না দিয়েই পালাচ্ছে।


সেপাইটা দৌড়ে গিয়ে ভুপেদাকে দু-হাতে জাপটে ধরল।


পর মুহূর্তে চেকারও হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে হাজির হল ওর পাশটিতে।


চোখ পাকিয়ে ভুপেদা শুধোল, এর মানে কী? এভাবে পাবলিককে হ্যারাস করছেন কেন?


—হ্যারাস করছি কেন? টিকিট না কেটে ট্রেনে চড়া? চালবাজি করবার জায়গা পাওনি?


—মুখ সামলে কথা বলবেন। বাঘের মতো গর্জে উঠল ভুপেদা। পরমুহূর্তে পকেট থেকে টিকিটখানা বের করে এগিয়ে দিল চেকারের দিকে, এটা তবে কী?


টিকিটটাকে এক ঝলক পরীক্ষা করে ভুপেদার দিকে বোকার মতো তাকিয়ে রইল চেকার। তোতলাতে তোতলাতে বলল, তবে কেন টিকিট না দেখিয়ে চলে যাচ্ছিলেন?


—কী আশ্চর্য! গাঁটের পয়সা খরচ করে টিকিট কেটেছি, না দেখাবার কী হয়েছে? তবে দেখলুম, আপনার টিকিট নেবার কোনও গরজই নেই। আমারও খুব জরুরি কাজ রয়েছে। সময়মতো কাজের জায়গায় পৌঁছতে হবে...।


—টিকিটই যখন রয়েছে, তবে অমন মুক্তকচ্ছ হয়ে ছুটছিলেন কেন?


—আমি ছুটলে আপনার কী, মশাই? সহসা ভুপেদা খেপচুরিয়াস হয়ে ওঠে, এ দেশে ছোটা কি বেআইনি? অলিম্পিকে যারা ছুটতে যায়, তারা কি বেআইনি কাজ করতে যায়?


—কিন্তু আমাকে দেখেই তো ছুটতে শুরু করলেন।


—যাব্বাবা, পকেটে টিকিট থাকা সত্ত্বেও খামোখা আপনাকে দেখে ছুটতে যাব কেন? বললুম না, আমার খুব জরুরি কাজ রয়েছে।


চেকারের তখন সসেমিরা অবস্থা। সেপাইটিও চেকারের দিকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে।


ভুপেদার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে চেকার বললেন, ঠিক আছে। যান।


—যান মানে? ভুপেদা আচমকা আগ্রাসী হয়ে ওঠে, আপনি অকারণে আমাকে অপমান করলেন, আর এখন বলছেন, যান! আমি যদি রেল কোম্পানির কাছে আপনার আর সেপাইজির নামে কমপ্লেন করি?


—আমার নামে কমপ্লেন কেন করবেন, মশাই? সেপাইটি ততক্ষণে ভয় পেয়েছে।


—বাহ্‌, এত-এত মানুষের সামনে আমায় চোর ধরবার কায়দায় জাপটে ধরলেন, আমার অপমান হল না? ভুপেদা ফুঁসে ওঠে, আমি তো মানহানির মামলা করব আপনাদের নামে। করবই।


চেকার ততক্ষণে পুরোপুরি তোতলাতে লেগেছে। বলল, এটা একটা ভুল বোঝাবুঝি। কিছু মনে করবেন না, স্যার।


দু-চোখ দিয়ে চেকারের ওপর খানিকটা আগুন উগরে দিয়ে ভুপেদা একসময় হাঁটতে আরম্ভ করল।


বলাই বাহুল্য, গেট অরক্ষিত পেয়ে ততক্ষণে আমরা টিমের সবাই অনেক আগেই চলে এসেছি গেটের বাইরে।


ততক্ষণে আনন্দে নেচে উঠেছে আমাদের বুক। আজ ম্যাচের পরে আবার আদ্যাশক্তি মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে ফুলকপির জোড়া-সিঙ্গাড়া, চমচম, রসমালাই...।


স্টেশনের বাইরে দাঁড়িয়েই আমরা একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠি, ভুপেদা জিন্দাবাদ!!


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page