পুজোর গন্ধে পুরনো কলকাতা | শাড়ির সঙ্গে মানানসই সাজ | নারকেল তেলে রূপচর্চা | রবিবারের গল্প: একটি মৃতদেহের বিজ্ঞাপন ও শ্রীলেখা

পুজোর গন্ধে পুরনো কলকাতা
কলকাতার পুজোকে কি শুধু চোখে দেখা যায়? আলো ঝলমলে মণ্ডপ, নতুন জামাকাপড়, ঠাকুরের মুখ, আলপনা, ধুনুচি নাচ—সবই তো চোখের সামনে ধরা দেয়। কিন্তু কলকাতার দুর্গাপুজোর আসল স্মৃতি যেন চোখের চেয়ে বেশি ধরা থাকে নাকে। কোথাও ধুনোর ধোঁয়ায়, কোথাও শিউলির গন্ধে, কোথাও ভিজে মাটির সোঁদা সুবাসে, আবার কোথাও ভোগের খিচুড়ি আর ঘিয়ের গন্ধে। আর সেই গন্ধ যদি অনুসরণ করতে করতে হাঁটা যায় উত্তর কলকাতার পুরনো গলির ভিতর, তবে হঠাৎ মনে হয়, শহরটা বুঝি একটু ধীর হয়ে গিয়েছে। আধুনিক কলকাতার কোলাহলের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে অন্য এক কলকাতা—জানালায় সবুজ খড়খড়ি, লোহার বারান্দা, উঁচু ছাদ, পাথরের উঠোন আর শতাব্দীপ্রাচীন পুজোর স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো কলকাতা।

শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভাসতে শুরু করলেই এই শহরের গায়ে বদলে যায় ঋতুর গন্ধ। ভোরবেলায় গলির মোড়ে শিউলি ঝরে থাকে। কোনও পুরনো বাড়ির ঠাকুরদালানের সামনে ধুয়ে দেওয়া হয় উঠোন। কোথাও কলাপাতা, কোথাও বেলপাতা, কোথাও কাশফুলের সাদা দোলা। বাড়ির ভিতর থেকে ভেসে আসে ধূপ-ধুনোর গন্ধ। দূরে কোথাও ঢাকের প্রথম আওয়াজ। সেই আওয়াজের সঙ্গে মিশে থাকে পুজোর রান্নার প্রস্তুতি। এই সমস্ত ছোট ছোট গন্ধ আর শব্দ মিলে তৈরি হয় কলকাতার শারদোৎসবের নিজস্ব এক আবহ।
পুরনো কলকাতার পুজো আসলে শুধু দেবী আরাধনা নয়, একটি পরিবারের ইতিহাস। এক একটি বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালান যেন সেই পরিবারের স্মৃতির খাতা। কত প্রজন্ম এসেছে, কত মানুষ চলে গিয়েছে, কত সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে—কিন্তু শরৎ এলেই সেই বাড়ির দরজা খুলে যায়, প্রদীপ জ্বলে, ধূপ জ্বলে, ঢাক বাজে। দেবী ফিরে আসেন সেই পুরনো ঠিকানায়।
উত্তর কলকাতার সরু গলিতে হাঁটতে হাঁটতে এমন অনেক বাড়ির দেখা মেলে, যাদের পুজোর ইতিহাস শহরের ইতিহাসের সঙ্গেই মিশে আছে। শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো তার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ। অন্দরমহল, বিশাল উঠোন, ঠাকুরদালান—সবকিছুতেই যেন অতীতের পদচিহ্ন। এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার সামাজিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ অধ্যায়। একসময় পুজো মানেই ছিল বনেদি পরিবারের সামাজিক প্রতিপত্তির প্রকাশ। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন। সাহেবদের আমন্ত্রণ জানানো হত। রাজবাড়ির পুজো ঘিরে বসত আড্ডা, গান, নাটক, খাওয়াদাওয়া। সেই জাঁকজমকের অনেকটাই আজ ইতিহাস, কিন্তু পুজোর গন্ধটি এখনও রয়ে গিয়েছে।

শোভাবাজার থেকে আরও একটু এগোলেই পুরনো বাড়িগুলির সারি। কোথাও বড় বড় দরজা, কোথাও ভাঙা কার্নিশ, কোথাও রঙচটা দেওয়ালে এখনও দেখা যায় পুরনো অলংকরণ। পুজোর সময় এই বাড়িগুলির কিছু কিছু যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। বছরের অন্য সময় যে উঠোন নিস্তব্ধ, ষষ্ঠীর সকালেই সেখানে ব্যস্ততা। ফুল আসে, পুরোহিত আসেন, ঢাকি আসে, বাড়ির সদস্যরা একে একে জড়ো হন। রান্নাঘরে শুরু হয় প্রস্তুতি। দেবীর জন্য ভোগ রান্না হবে।
এই ভোগের গন্ধও পুরনো কলকাতার পুজোর অন্যতম পরিচয়। আজকের শহুরে পুজোয় যেখানে খাবারের তালিকায় নানা রকম নতুন পদ, সেখানে বনেদি বাড়ির পুজোর রান্নায় এখনও অনেক সময় ফিরে আসে পুরনো স্বাদ। কোথাও নিরামিষ ভোগ, কোথাও ডাল, তরকারি, ভাজা, খিচুড়ি, পায়েস। কোথাও আবার পারিবারিক রীতিতে বিশেষ কোনও পদ রান্না হয়। সেই রান্নার গন্ধ উঠোন পেরিয়ে গলিতে এসে মিশে যায় ধুনোর গন্ধের সঙ্গে।
পুরনো কলকাতার পুজোয় রান্নাঘর কখনওই কেবল রান্নাঘর নয়। সেটিও পুজোর এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। বড় বড় কড়াই, কাঠের উনুন, একসঙ্গে অনেক মানুষের রান্নার ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে যেন আলাদা এক জগৎ। বাড়ির বয়স্ক মহিলারা ছোটদের শেখান কোন পদ কীভাবে রান্না করতে হয়। কোনও কোনও পরিবারের নির্দিষ্ট রান্না প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। মাপের হিসাব হয়তো কোথাও লেখা নেই, তবু হাতের আন্দাজে সেই একই স্বাদ ফিরে আসে প্রতি বছর।
আর সেই স্বাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্মৃতি।

পুরনো কলকাতার দুর্গাপুজোর আর একটি বিশেষ পরিচয় তার স্থাপত্য। আজকের শহরে বড় বড় মণ্ডপ তৈরি হয়, আলোয় সাজানো হয় রাস্তা। কিন্তু বনেদি বাড়ির পুজোয় মণ্ডপটি তৈরি নয়, মণ্ডপটি বাড়িরই অংশ। ঠাকুরদালানের স্তম্ভ, খিলান, ছাদ, পুরনো মেঝে—সবকিছুর মধ্যেই দেবীর আরাধনা। সময়ের সঙ্গে বাড়ির অনেক কিছু বদলেছে, কিন্তু ঠাকুরদালানের কাঠামো অনেক ক্ষেত্রেই ধরে রেখেছে তার পুরনো রূপ।
এই ঠাকুরদালানগুলির সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, কলকাতা আসলে কত গল্প জমিয়ে রেখেছে। এই শহরের ইতিহাস শুধু রাজপথে লেখা নেই; লেখা আছে পুরনো বাড়ির দেওয়ালে, সিঁড়ির ধাপে, কাঠের দরজায়, ঠাকুরদালানের পাথরের মেঝেতে।
পুজোর সময় সেই ইতিহাস যেন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর সঙ্গে তাই ‘গন্ধ’-এর সম্পর্ক এত গভীর। ভোরের শিউলি, ধূপ, ধুনো, চন্দন, পদ্ম, বেলপাতা, ভোগের ঘি, নারকেল, পায়েস—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অদ্ভুত ঘ্রাণ। এই গন্ধ কোনও সুগন্ধির বোতলে ভরে রাখা যায় না। এটি তৈরি হয় সময়ের সঙ্গে, স্মৃতির সঙ্গে, মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে।
ষষ্ঠীর সকাল যেন সেই গন্ধের প্রথম পূর্ণ প্রকাশ। বোধনের প্রস্তুতি শুরু হয়। বাড়ির উঠোন পরিষ্কার হয়। ফুল সাজানো হয়। দেবীর সামনে নানা উপাচার। কোথাও কলাবউয়ের জন্য প্রস্তুতি, কোথাও বেলগাছের নীচে পুজোর আয়োজন। ধূপের ধোঁয়া ধীরে ধীরে উঠে যায় পুরনো বাড়ির উঁচু ছাদের দিকে। জানলার ফাঁক দিয়ে সেই ধোঁয়া বাইরে বেরিয়ে আসে। পাশের গলি দিয়ে যাওয়া মানুষও বুঝতে পারেন—এই বাড়িতে পুজো শুরু হয়েছে।
সপ্তমীর সকাল আসে অন্য এক আবহ নিয়ে। ভোররাতে নদী বা পুকুরের ঘাটের দিকে যাওয়ার দৃশ্য আজও কলকাতার বহু পাড়ায় পুজোর স্মৃতির অংশ। নবপত্রিকা স্নান, ঢাকের আওয়াজ, শঙ্খধ্বনি—সব মিলিয়ে শহরের সকাল অন্যরকম হয়ে ওঠে। আধুনিক গাড়ির হর্নের মধ্যেও কোথাও কোথাও শোনা যায় ঢাকের তাল।

আর অষ্টমী?
অষ্টমীর সকাল যেন পুরনো কলকাতার পুজোর হৃদয়। অঞ্জলি দিতে আসা মানুষের ভিড়, শাড়ির খসখস শব্দ, ধূপের গন্ধ, পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খধ্বনি—সবকিছু মিলিয়ে এক গভীর আবেগ তৈরি হয়। কেউ দূর থেকে শুধু অঞ্জলি দিতে এসেছেন, কেউ পরিবারের সঙ্গে এসেছেন, কেউ আবার বহু বছর পর শহরে ফিরে এসে পুরনো বাড়ির পুজোয় দাঁড়িয়েছেন।
অষ্টমীর অঞ্জলি শুধু ধর্মীয় আচার নয়, অনেকের কাছে শৈশবে ফিরে যাওয়ার মুহূর্ত।
যে মেয়েটি ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে অঞ্জলি দিতে আসত, আজ সে নিজের সন্তানকে নিয়ে এসেছে। যে ছেলেটি একসময় ধুনুচি হাতে ঠাকুরদালানের সামনে দাঁড়াত, আজ সে বিদেশ থেকে ছুটে এসে সেই একই উঠোনে দাঁড়িয়ে। বাড়ির দেওয়াল বদলায়নি, শুধু মানুষের প্রজন্ম বদলেছে।
সন্ধি পুজোর সময় পুরনো কলকাতা যেন আরও গম্ভীর হয়ে ওঠে। ঢাকের গতি বাড়ে। প্রদীপ জ্বলে। ধুনোর ধোঁয়ায় ঠাকুরদালান ভরে যায়। শতাধিক প্রদীপের আলোয় দেবীর মুখ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই মুহূর্তে আধুনিক শহরটি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য পিছিয়ে যায়। সময় থমকে দাঁড়ায়।
তারপর আসে নবমী। পুজোর আনন্দ তখন চূড়ান্ত। কিন্তু বনেদি বাড়ির পুজোয় নবমীর ভোজেরও আলাদা গুরুত্ব। বড় বাড়ির রান্নাঘরে তখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। একসঙ্গে অনেক মানুষের জন্য রান্না হচ্ছে। ভোগের গন্ধে চারদিক ভরে উঠছে। বাড়ির সদস্য, আত্মীয়স্বজন, অতিথি—সবাইকে খাওয়ানোর আয়োজন। খাবারের সঙ্গে এখানে মিশে থাকে আতিথেয়তা।
এই আতিথেয়তার মধ্যেই পুরনো কলকাতার আর একটি চরিত্র ধরা পড়ে। পুজো মানেই শুধু নিজের পরিবারের উৎসব নয়। পাড়ার মানুষ, পরিচিতজন, পুরনো কর্মচারী, প্রতিবেশী—অনেকেই এই উৎসবের অংশ হয়ে ওঠেন। একটি বাড়ির পুজো ধীরে ধীরে একটি পাড়ার স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।

পুরনো কলকাতার আর একটি অপরিহার্য দৃশ্য হল পুজোর বাজার। বড়বাজার, হাতিবাগান, শ্যামবাজার, কলেজ স্ট্রিট, বউবাজার—শরৎ এলেই এসব এলাকার চেহারা বদলে যায়। কাপড়ের দোকান, ফুলের দোকান, মিষ্টির দোকান, পুজোর উপকরণের দোকান—সবখানেই ব্যস্ততা। পুরনো গলির দোকানগুলিতেও তখন উৎসবের রং।
মিষ্টির দোকান থেকে বেরিয়ে আসে গরম গরম গন্ধ। কোথাও সন্দেশ, কোথাও রসগোল্লা, কোথাও লুচি-তরকারির প্রস্তুতি। রাস্তার পাশ দিয়ে ঢাকি যাচ্ছে। কোনও বাড়ির সামনে বাঁশ নামছে। কোথাও মৃৎশিল্পীর হাতে দেবীর মুখে শেষ রঙের কাজ চলছে। পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই শহর যেন নিজেকে নতুন করে সাজাতে শুরু করে।
কুমোরটুলির কথা না বললে পুরনো কলকাতার পুজোর গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মাটির গন্ধ, খড়ের গন্ধ, রঙের গন্ধ—সবকিছুর সঙ্গে মিশে থাকে শিল্পীর ঘাম। দেবীর প্রতিমা তৈরি হয় ধাপে ধাপে। খড়ের কাঠামো, মাটির প্রলেপ, শুকিয়ে যাওয়া, রঙ, অলংকরণ—প্রতিটি ধাপের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শিল্পীর দক্ষতা। শরৎ এলেই কুমোরটুলি যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
সেখানে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, কলকাতার পুজো আসলে কত মানুষের সম্মিলিত শ্রমের ফল। দেবী যখন বনেদি বাড়ির ঠাকুরদালানে এসে বসেন, তাঁর পিছনে থাকে বহু মানুষের হাত।
আর আছে ঢাক।
ঢাকের শব্দকে কি কোনওদিন ব্যাখ্যা করা যায়? প্রথমে দূর থেকে ভেসে আসে—ধুম্, ধুম্। তারপর ধীরে ধীরে কাছে আসে। পুজোর দিনগুলিতে এই শব্দ কলকাতার নিজস্ব সঙ্গীত হয়ে ওঠে। পুরনো বাড়ির উঁচু দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ঢাকের আওয়াজ আরও গভীর হয়ে ফিরে আসে। সন্ধ্যার আলো, ধুনোর ধোঁয়া আর ঢাকের তালে মনে হয়, এই শহর তার বহু পুরনো কোনও স্মৃতি আবার শুনছে।
পুজোর দিনগুলিতে পুরনো কলকাতার অলিগলিও যেন চরিত্র হয়ে ওঠে। দিনের ব্যস্ততা পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলে বাড়িগুলির জানলায় আলো জ্বলে। কোথাও লাল-সাদা আলোর মালা, কোথাও প্রদীপ। গলির একপ্রান্তে পুজোর ঢাক, অন্যপ্রান্তে চায়ের দোকানে আড্ডা। রাস্তায় নতুন পোশাক পরা মানুষের ভিড়। বাচ্চাদের হাতে খেলনা। বয়স্করা দাঁড়িয়ে পুরনো দিনের গল্প করছেন।

কেউ বলছেন, “আগে পুজো এমন ছিল না।” কেউ বলছেন, “আমাদের সময়ে অষ্টমীর অঞ্জলিতে এই গলিটা ভরে যেত।” কেউ আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কোন বাড়িতে কী ভোগ হত, কোন বাড়ির প্রতিমা কেমন ছিল, কোন পুজোর বিসর্জনের শোভাযাত্রা সবচেয়ে বড় ছিল।
এই কথাগুলিই আসলে শহরের মৌখিক ইতিহাস।
পুরনো কলকাতার পুজো তাই শুধুমাত্র একটি উৎসবের ইতিহাস নয়। এটি মানুষের ইতিহাস। পরিবার ভাঙার ইতিহাস, নতুন প্রজন্মের শহর ছেড়ে দূরে চলে যাওয়ার ইতিহাস, আবার পুজোর সময় সেই মানুষগুলির ফিরে আসার ইতিহাস। এটি বাড়ির ইতিহাস, রান্নার ইতিহাস, শিল্পের ইতিহাস, সংগীতের ইতিহাস এবং অবশ্যই কলকাতার সামাজিক ইতিহাস।
দশমীর সকাল এলে সেই আনন্দের মধ্যে হঠাৎ বিষণ্ণতা এসে বসে। দেবীর বিদায়ের প্রস্তুতি শুরু হয়। সিঁদুর খেলা, মিষ্টিমুখ, প্রণাম, আলিঙ্গন—সবকিছুর মধ্যেই থাকে বিচ্ছেদের সুর। পুরনো বাড়ির ঠাকুরদালানে তখনও ধূপের গন্ধ। দেবীর সামনে শেষবারের মতো প্রদীপ জ্বলে।
তারপর প্রতিমা বেরিয়ে যায়।
যে বাড়ির উঠোন কয়েক দিন ধরে মানুষের কোলাহলে ভরে ছিল, সেখানে আবার নেমে আসে নীরবতা। ধূপের ধোঁয়া মিলিয়ে যায়। ঢাক থেমে যায়। ফুল শুকিয়ে যায়। আলো খুলে ফেলা হয়। কিন্তু গন্ধটা থেকে যায়।
শিউলির গন্ধ, ধুনোর গন্ধ, ভোগের গন্ধ, ভিজে মাটির গন্ধ—আর তার সঙ্গে মিশে থাকে স্মৃতি।
হয়তো এ কারণেই পুজো শেষ হয়ে গেলেও কলকাতার মানুষ পুজোকে ভুলতে পারেন না। নতুন জামাকাপড় পুরনো হয়ে যায়, আলোর মালা খুলে রাখা হয়, মণ্ডপ ভেঙে যায়, কিন্তু কোনও এক শরতের সকাল হঠাৎ শিউলির গন্ধ পেলেই মনে পড়ে যায় সেই পুরনো বাড়ি। কোনও এক সন্ধ্যায় ঢাকের আওয়াজ শুনলেই মনে হয়, ঠাকুরদালানে বুঝি আবার প্রদীপ জ্বলেছে।
পুরনো কলকাতার পুজো আসলে এমনই—একটি শহরের ঘ্রাণস্মৃতি।

আজকের কলকাতা অনেক বদলে গিয়েছে। উঁচু বাড়ি উঠেছে, পুরনো বাড়ি ভেঙেছে, নতুন রাস্তা হয়েছে, বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। তবু শহরের কিছু কিছু কোণে সময় এখনও ধীর। সেখানে শরৎ এলে পুরনো জানলা খুলে যায়, ঠাকুরদালানে আলো জ্বলে, ঢাক বাজে, ধূপের ধোঁয়া ওঠে। কোনও বৃদ্ধা হয়তো এখনও নিজের নাতনিকে বলে দেন, “এই পুজোর ভোগটা আমাদের বাড়িতে এমনভাবেই হয়।” কোনও পুরনো বাড়ির রান্নাঘরে এখনও কড়াই চাপানো হয়। কোনও গলির মোড়ে এখনও ঢাকিরা বসে বিশ্রাম নেন।
সেখানেই বেঁচে থাকে কলকাতা।
পুজোর কলকাতাকে তাই শুধু আলো দিয়ে চিনলে ভুল হবে। তাকে চিনতে হবে গন্ধ দিয়ে। ভোরের শিউলি থেকে সন্ধ্যার ধুনো, কুমোরটুলির মাটি থেকে ভোগের কড়াই, পুরনো কাঠের দরজার গন্ধ থেকে বৃষ্টিভেজা গলির সোঁদা সুবাস—সব মিলিয়ে যে ঘ্রাণ তৈরি হয়, তার নাম কলকাতার পুজো।
আর সেই গন্ধে আজও মিশে আছে এক পুরনো শহর।
একটি শহর, যে প্রতি বছর দেবীকে বরণ করে, কয়েক দিন উৎসব করে, তারপর চোখের জলে বিদায় জানায়। কিন্তু দেবী চলে গেলেও তাঁর আসার স্মৃতি রেখে যায়। রেখে যায় ধূপের ছাই, শুকনো ফুল, ঢাকের প্রতিধ্বনি আর এক অদ্ভুত মায়া। সেই মায়ার নামই—পুরনো কলকাতা। যে কলকাতা পুজোর গন্ধে আজও ফিরে আসে।
দুর্গাপুজোয় শাড়ির সঙ্গে মানানসই সাজ
ষষ্ঠী থেকে দশমী, শাড়ির সঙ্গে সাজের সঠিক সমন্বয়েই ফুটে উঠুক পুজোর সৌন্দর্য
দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির কাছে নতুন জামাকাপড়, সাজগোজ, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, ঠাকুর দেখা আর অগণিত ছবি। পুজোর চার-পাঁচটি দিন যেন নিজের মতো করে সেজে ওঠার এক বিশেষ সুযোগ। সারা বছর ব্যস্ততার কারণে যে সাজটি করা হয়ে ওঠে না, পুজোর দিনগুলিতে সেই সাজেই নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করতে ভালোবাসেন অনেকেই। আর বাঙালির পুজোর সাজের কথা উঠলে শাড়ির কথা আলাদা করে বলতেই হয়। শাড়ি যেন শুধু পোশাক নয়, বাঙালি নারীর সৌন্দর্য, ঐতিহ্য এবং ব্যক্তিত্বের এক অনন্য প্রকাশ।

তবে সুন্দর শাড়ি পরলেই সাজ সম্পূর্ণ হয় না। শাড়ির রং, কাপড়, নকশা এবং পরার ধরন অনুযায়ী যদি ব্লাউজ, গয়না, চুলের সাজ, মেকআপ এবং জুতো বেছে নেওয়া যায়, তবেই গোটা সাজে আসে পরিপূর্ণতা। একই শাড়ির সঙ্গেও গয়না বা মেকআপ বদলে সম্পূর্ণ আলাদা দুটি সাজ তৈরি করা সম্ভব। তাই পুজোর প্রতিটি দিনের জন্য শাড়ির সঙ্গে সাজের পরিকল্পনাটাও হওয়া চাই একটু ভেবেচিন্তে।
ষষ্ঠীর সকাল থেকেই শুরু হতে পারে পুজোর সাজ। ষষ্ঠীর সাজে খুব বেশি ভারী হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং দিনের আলোয় হালকা, পরিপাটি এবং স্বচ্ছন্দ সাজ বেশ মানানসই। এই দিনের জন্য বেছে নিতে পারেন সাদা বা হালকা রঙের খাঁটি সুতির শাড়ি। লাল পাড়ের সাদা শাড়ি যেমন চিরকালীন, তেমনই হালকা হলুদ, প্যাস্টেল গোলাপি, আকাশি কিংবা অফ-হোয়াইট সুতির শাড়িও ষষ্ঠীর সকালের জন্য বেশ সুন্দর। শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজটি হতে পারে বিপরীত রঙের, অথবা শাড়ির পাড়ের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে।
সুতির শাড়ির সঙ্গে খুব ভারী গয়না না পরাই ভালো। ছোট সোনার দুল, মুক্তোর দুল, রুপোর ঝুমকো কিংবা টেরাকোটার গয়না এই ধরনের সাজে দারুণ মানায়। হাতে কয়েকটি চুড়ি বা একটি ঘড়ি থাকলেই যথেষ্ট। চুল খোলা রাখা যেতে পারে, আবার নিচু করে বাঁধা খোঁপায় কয়েকটি সাদা ফুলও সাজে অন্য মাত্রা যোগ করবে।
মেকআপেও থাকবে স্বাভাবিকতার ছোঁয়া। হালকা বেস, সামান্য ব্লাশ, চোখে কাজল, পাতলা আইলাইনার এবং ঠোঁটে গোলাপি বা ন্যুড শেডের লিপস্টিক—এইটুকুতেই তৈরি হয়ে যেতে পারে ষষ্ঠীর সকালের সাজ। দিনের আলোয় অতিরিক্ত মেকআপ অনেক সময় মুখের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে ঢেকে দেয়। তাই এই সময়ে ‘কম মেকআপে বেশি সুন্দর’ নীতিই হতে পারে সেরা পছন্দ।
ষষ্ঠীর সন্ধ্যার সাজ অবশ্য একটু জমকালো হতে পারে। দিনের সুতির শাড়ির পরিবর্তে বেছে নিতে পারেন ক্রাশড টিস্যু, সিল্ক বা হালকা কাজের শাড়ি। শাড়ি যদি ঝলমলে হয়, তবে গয়না তুলনামূলকভাবে হালকা রাখুন। আর শাড়ি যদি একরঙা হয়, সেক্ষেত্রে একটু বড় কানের দুল বা একটি স্টেটমেন্ট নেকপিস সাজকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

সপ্তমীর সকাল মানেই পুজোর ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়া। অঞ্জলি, ঠাকুর দেখা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—সব মিলিয়ে এই দিনের সাজে যেমন ঐতিহ্য থাকবে, তেমনই থাকতে হবে আরাম। লিনেন শাড়ি এই দিনের জন্য চমৎকার একটি বিকল্প। লিনেনের স্বাভাবিক টেক্সচার এবং হালকা ভাব সকালের পুজোর পরিবেশের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে যায়। প্যাস্টেল, মাটির রং, মেরুন, সবুজ কিংবা নীলের মতো রং বেছে নিতে পারেন।
লিনেন শাড়ির সঙ্গে অক্সিডাইজড রুপোর গয়না বেশ মানায়। বড় ঝুমকো, লম্বা দুল, কয়েকটি রুপোর চুড়ি এবং ছোট টিপ—এই সামান্য কয়েকটি উপকরণেই তৈরি হতে পারে একেবারে বাঙালি অথচ আধুনিক সাজ। চুলে এলোমেলো বিনুনি বা নিচু খোঁপা করা যেতে পারে। খোঁপায় জুঁই বা বেলি ফুল দিলে সাজে উৎসবের গন্ধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সপ্তমীর রাতের সাজে অবশ্য একটু বেশি আভিজাত্য আনা যায়। ঢাকাই জামদানি হতে পারে এই রাতের অন্যতম সেরা পছন্দ। জামদানির সূক্ষ্ম বুনন এবং নকশা নিজেই এত সুন্দর যে এর সঙ্গে অতিরিক্ত সাজের প্রয়োজন হয় না। শাড়ির নকশা যদি ঘন হয়, তবে গয়না কম রাখুন। বড় ঝুমকো, একটি চওড়া চুড়ি এবং ছোট টিপ যথেষ্ট।
জামদানির সঙ্গে চুলের সাজে পুরনো দিনের বাঙালিয়ানা ফিরিয়ে আনা যায়। মাঝখানে সিঁথি করে নিচু খোঁপা, কপালে বড় গোল টিপ এবং খোঁপায় গোঁজা ফুল—এই সাজটি কখনও পুরনো হয় না। চোখে কালো কাজল ও উইংড আইলাইনার এবং ঠোঁটে গাঢ় লাল বা মেরুন লিপস্টিক যোগ করলে রাতের সাজ হয়ে উঠবে আরও আকর্ষণীয়।
অষ্টমী বাঙালির পুজোর অন্যতম আবেগঘন দিন। অঞ্জলি, উপোস, পুষ্পাঞ্জলি এবং সন্ধিপুজোর আবহে এই দিনের সাজেও থাকে আলাদা গুরুত্ব। অষ্টমীর সকালের জন্য ধনেখালি বা খাঁটি সুতির শাড়ি দারুণ মানায়। লাল-সাদা, গেরুয়া-হলুদ, সাদা-নীল কিংবা সবুজ পাড়ের শাড়ি বেছে নিতে পারেন। যাঁরা একটু অন্যরকম কিছু পরতে চান, তাঁরা মাটির রঙের সঙ্গে লাল পাড়ের সমন্বয়ও করতে পারেন।
অষ্টমীর শাড়ির সঙ্গে গয়নায় বাঙালিয়ানা আরও স্পষ্ট করা যায়। সোনার হার, সীতাহার, ছোট নাকছাবি, ঝুমকো, চুড়ি—যাঁদের ভালো লাগে তাঁরা ঐতিহ্যবাহী গয়না বেছে নিতে পারেন। তবে সব গয়না একসঙ্গে পরার প্রয়োজন নেই। একটি বড় হার বা সুন্দর কানের দুলকে কেন্দ্র করে বাকি গয়না হালকা রাখলে সাজে ভারসাম্য থাকে।

অষ্টমীর মেকআপে চোখকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে। কালো কাজল, আইলাইনার এবং সামান্য ব্রাউন বা গোল্ডেন আইশ্যাডো চোখকে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে। কপালে বড় লাল টিপ এবং ঠোঁটে লাল লিপস্টিক বাঙালি সাজের পরিচিত সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনবে। তবে লিপস্টিক গাঢ় হলে চোখের মেকআপ খুব ভারী না করাই ভালো।
অষ্টমীর রাতের সাজে শাড়ি হতে পারে কারুকাজ করা জামদানি, কাতান, সিল্ক কিংবা মসৃণ টিস্যু। সন্ধ্যার আলোয় ধাতব আভাযুক্ত শাড়ি বেশ সুন্দর লাগে। এই ধরনের শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজে সামান্য কাজ রাখা যায়। ডিপ নেক বা স্টেটমেন্ট স্লিভের বদলে শাড়ির সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নকশা করা ব্লাউজ বেছে নিলে সাজে পরিমিত আভিজাত্য থাকে।
নবমীর সাজে একটু বেশি উৎসবের রং যোগ করা যায়। দিনের জন্য ডিজিটাল প্রিন্ট কটন সিল্ক, সিল্ক বা হালকা মুদ্রিত শাড়ি বেছে নিতে পারেন। ফুলের নকশা, পাতা, পাখি কিংবা জ্যামিতিক ছাপের শাড়ি নবমীর দিনের জন্য বেশ মানানসই। যাঁরা একটু উজ্জ্বল রং পছন্দ করেন, তাঁরা কমলা, ফুচিয়া, নীল, সবুজ বা হলুদ বেছে নিতে পারেন।
প্রিন্টেড শাড়ির সঙ্গে গয়না নির্বাচনের সময় একটু সতর্ক থাকা দরকার। শাড়িতেই যদি অনেক রং ও নকশা থাকে, তবে খুব ভারী গয়না সাজকে ব্যস্ত করে দিতে পারে। তার পরিবর্তে একজোড়া বড় দুল, কয়েকটি চুড়ি এবং একটি আংটি যথেষ্ট। শাড়ির কোনও একটি রং ধরে গয়নার রং বেছে নিলে গোটা সাজে সামঞ্জস্য বজায় থাকবে।
নবমীর রাতেই হতে পারে পুজোর সবচেয়ে জমকালো সাজগুলির একটি। এই সময়ে বেছে নিতে পারেন মর্দাল সিল্ক, বেনারসি কিংবা ভারী সিল্কের শাড়ি। লাল, মেরুন, গাঢ় নীল, বেগুনি, কালো কিংবা বোতল সবুজের মতো গভীর রং রাতের আলোয় বেশ উজ্জ্বল দেখায়। বেনারসির সঙ্গে সোনার গয়না চিরকালীন, তবে চাইলে আধুনিক কুন্দন, পোলকি বা মন্দিরের গয়নাও পরা যায়।

বেনারসি শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজের নকশায় খুব বেশি পরীক্ষা না করাই ভালো। শাড়ির পাড় বা জরির রং ধরে ব্লাউজ তৈরি করলে সাজে ঐতিহ্য বজায় থাকে। চুলে খোঁপা, খোঁপায় গজরা, কপালে বড় টিপ এবং হাতে চুড়ি—এই সাজে বাঙালি নারীর চিরন্তন সৌন্দর্য ফুটে উঠবে।
আর তারপর আসে দশমী। বিসর্জনের দিনটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আনন্দের পাশাপাশি একরাশ মনখারাপ। তাই দশমীর সাজে ফিরে আসতে পারে বাঙালির চিরপরিচিত সাদা-লাল। সাদা কটন সিল্ক, গরদ, তাঁত কিংবা সাদা-লাল পুজোর শাড়ি এই দিনের জন্য একেবারে আদর্শ। শাড়ির সঙ্গে লাল ব্লাউজ এবং লাল টিপের সমন্বয় সহজ অথচ অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
দশমীর সাজে সিঁদুরের গুরুত্ব আলাদা। সিঁদুরখেলার ঐতিহ্য থাকলে সাজে লাল রঙের উপস্থিতি এমনিতেই বেড়ে যায়। তাই মেকআপ তুলনামূলক হালকা রাখা যায়। গালে সামান্য ব্লাশ, চোখে কাজল, ঠোঁটে লাল বা গোলাপি লিপস্টিক এবং কপালে লাল টিপ—এইটুকুতেই সাজ সম্পূর্ণ। চুলে খোঁপা বা বেণি করলে দশমীর বাঙালিয়ানা আরও ফুটে উঠবে।
তবে শাড়ির সাজ মানেই শুধু শাড়ি, গয়না আর মেকআপ নয়। জুতোর নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ। পুজোর সময় অনেকটা হাঁটতে হয়। তাই শুধুমাত্র সৌন্দর্যের কথা না ভেবে আরামের কথাও মাথায় রাখতে হবে। শাড়ির সঙ্গে জুতি, কোলাপুরি, ছোট হিল কিংবা আরামদায়ক স্যান্ডেল বেছে নিতে পারেন। নতুন জুতো হলে পুজোর আগেই কয়েক দিন পরে দেখে নেওয়া ভালো। নাহলে পুজোর দিন পায়ে ফোস্কা হয়ে গোটা আনন্দটাই মাটি হতে পারে।

ব্যাগের ক্ষেত্রেও একই কথা। বড় ব্যাগের পরিবর্তে ছোট স্লিং ব্যাগ, ক্লাচ বা শাড়ির সঙ্গে মানানসই ছোট ব্যাগ বেছে নেওয়া যেতে পারে। ফোন, টাকা, লিপস্টিক, চিরুনি এবং প্রয়োজনীয় ছোটখাটো জিনিস রাখার মতো জায়গা থাকলেই যথেষ্ট।
শাড়ির সঙ্গে সাজের ক্ষেত্রে একটি বিষয় সবসময় মনে রাখা দরকার—সবকিছু একসঙ্গে নজরকাড়া করার চেষ্টা না করাই ভালো। শাড়ি যদি খুব জমকালো হয়, গয়না হালকা হতে পারে। গয়না যদি ভারী হয়, মেকআপ তুলনামূলকভাবে সংযত রাখা যায়। চোখকে যদি সাজের কেন্দ্রবিন্দু করা হয়, ঠোঁটে হালকা রং রাখা যায়। আবার গাঢ় লাল লিপস্টিক ব্যবহার করলে চোখের সাজ খুব বেশি ভারী না করাই ভালো। এই ভারসাম্যই সাজকে রুচিশীল করে তোলে।
শাড়ির রঙের সঙ্গেও মেকআপের সমন্বয় করা যায়। প্যাস্টেল বা হালকা রঙের শাড়ির সঙ্গে গোলাপি, পিচ কিংবা ন্যুড মেকআপ সুন্দর লাগে। লাল, মেরুন বা গাঢ় রঙের শাড়ির সঙ্গে উষ্ণ টোনের মেকআপ মানায়। সবুজ বা নীল শাড়ির সঙ্গে ব্রোঞ্জ কিংবা গোল্ডেন আই মেকআপ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে ত্বকের স্বাভাবিক রং এবং ব্যক্তিগত পছন্দই শেষ কথা।
আরেকটি বিষয় ভুললে চলবে না—পুজোর সময় গরম, ঘাম এবং আর্দ্রতার কারণে মেকআপ দ্রুত নষ্ট হতে পারে। তাই খুব ভারী বেসের পরিবর্তে হালকা এবং দীর্ঘস্থায়ী মেকআপ বেছে নেওয়া ভালো। মুখ পরিষ্কার করে ময়েশ্চারাইজার, সানস্ক্রিন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা বেস ব্যবহার করলে ত্বকও স্বস্তিতে থাকবে। সঙ্গে একটি ছোট টিস্যু বা ব্লটিং পেপার রাখলে প্রয়োজনে মুখের অতিরিক্ত তেল ও ঘাম সামলে নেওয়া যায়।

চুলের ক্ষেত্রেও পুজোর আগে খুব বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করাই ভালো। শাড়ির সঙ্গে খোঁপা, বেণি, অর্ধেক খোলা চুল কিংবা সম্পূর্ণ খোলা চুল—সবই সুন্দর লাগতে পারে। তবে কোনটি ভালো লাগবে তা নির্ভর করবে শাড়ির ধরন, মুখের গড়ন এবং ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের উপর। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে খোলা চুলের পরিবর্তে বিনুনি বা খোঁপা বেশি আরামদায়ক হতে পারে।
সবশেষে, পুজোর সাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কোনও প্রসাধনী বা দামি শাড়ি নয়, আত্মবিশ্বাস। নিজের শরীরের গড়ন, ত্বকের রং কিংবা বয়স নিয়ে অযথা ভাবার কোনও কারণ নেই। যে শাড়িতে নিজেকে স্বচ্ছন্দ লাগে, সেটিই আসলে সবচেয়ে সুন্দর শাড়ি। কারও সাজ দেখে হুবহু অনুকরণ করার পরিবর্তে নিজের পছন্দ এবং ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে সাজ তৈরি করাই ভালো।
দুর্গাপুজো আসলে নিজেকে উদ্যাপন করার সময়। তাই ষষ্ঠীর সাদামাটা সুতির শাড়ি থেকে নবমীর ঝলমলে বেনারসি, অষ্টমীর লাল-সাদা ঐতিহ্য থেকে দশমীর সিঁদুররাঙা সাজ—প্রতিটি দিনেই থাকুক নিজের মতো করে সুন্দর হয়ে ওঠার আনন্দ। শাড়ির আঁচলে জড়িয়ে থাকুক বাঙালিয়ানা, গয়নায় ফুটে উঠুক ঐতিহ্য, মেকআপে থাকুক ব্যক্তিত্ব আর চোখে থাকুক পুজোর সেই চিরচেনা উচ্ছ্বাস। কারণ শেষ পর্যন্ত পুজোর সাজের আসল সৌন্দর্য পোশাকে নয়, সেই পোশাক পরে নিজেকে কতটা আপন করে নিতে পারলেন, তার মধ্যেই।

নারকেল তেলে রূপচর্চা
রূপচর্চার জগতে নতুন নতুন উপাদানের আনাগোনা লেগেই থাকে। কখনও দামি সিরাম, কখনও বিদেশি ফেস অয়েল, আবার কখনও বিশেষ কোনও বোটানিক্যাল এক্সট্র্যাক্ট—ত্বক ও চুলের যত্নে বাজারে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নাম। কিন্তু এইসব আধুনিক উপকরণের ভিড়েও এমন কিছু উপাদান আছে, যাদের কদর কখনও কমে না। নারকেল তেল তেমনই একটি চিরপরিচিত নাম। বাঙালি বাড়িতে ঠাকুমা-দিদিমার আমল থেকেই চুলের যত্নে নারকেল তেলের ব্যবহার হয়ে আসছে। মাথায় তেল দেওয়ার সেই চেনা রীতি আজও বহু পরিবারের সৌন্দর্যচর্চার অংশ।
তবে নারকেল তেলের ব্যবহার শুধু চুলে তেল দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শুষ্ক ত্বকের যত্ন, শরীরের রুক্ষতা কমানো, ঠোঁটের পরিচর্যা, হাত-পায়ের শুষ্ক অংশে ময়েশ্চারাইজার হিসেবে ব্যবহার—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই নারকেল তেল কাজে লাগতে পারে। অবশ্য প্রত্যেকের ত্বক ও চুলের ধরন এক নয়। তাই নারকেল তেলকে ‘সব সমস্যার সমাধান’ হিসেবে না দেখে নিজের প্রয়োজন ও ত্বকের প্রকৃতি বুঝে ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

চুলের যত্নে নারকেল তেল
নারকেল তেলের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহার অবশ্যই চুলের যত্নে। শ্যাম্পু করার আগে মাথার ত্বক ও চুলে হালকা হাতে নারকেল তেল মালিশ করার অভ্যাস বহু পুরনো। চুলের গঠন এবং তেলের প্রকৃতির কারণে নারকেল তেল চুলের শুষ্কতা ও রুক্ষতা কমাতে সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের চুল শুষ্ক, রুক্ষ বা অতিরিক্ত জট পড়ে, তাঁদের ক্ষেত্রে শ্যাম্পুর আগে অল্প পরিমাণ নারকেল তেল ব্যবহার উপকারী হতে পারে।
তেল ব্যবহারের সময় খুব বেশি পরিমাণ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। হাতের তালুতে সামান্য তেল নিয়ে প্রথমে চুলের ডগা ও দৈর্ঘ্যে লাগানো যায়। প্রয়োজন হলে মাথার ত্বকেও হালকা হাতে মালিশ করা যেতে পারে। তবে খুব জোরে ঘষাঘষি করা উচিত নয়। এতে চুলের গোড়ায় অস্বস্তি হতে পারে এবং চুল ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
অনেকেই মনে করেন, যত বেশি সময় তেল মাথায় রাখা হবে, তত বেশি উপকার পাওয়া যাবে। আসলে এমন কোনও নিয়ম নেই। কারও ক্ষেত্রে অল্প সময় রেখে শ্যাম্পু করাই যথেষ্ট। আবার কারও চুলে কয়েক ঘণ্টা তেল রাখা আরামদায়ক হতে পারে। সারারাত তেল রেখে দেওয়াই যে সবার জন্য ভালো, তা নয়।

চুলের রুক্ষতা কমাতে
চুলের ডগা ফেটে যাওয়া, অতিরিক্ত রুক্ষতা কিংবা চুলে জেল্লা না থাকার সমস্যা থাকলে শ্যাম্পুর আগে অল্প নারকেল তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। বিশেষ করে শীতকালে অথবা অতিরিক্ত শুষ্ক আবহাওয়ায় চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখতে তেল কিছুটা সাহায্য করতে পারে।
তবে চুলের ডগা ইতিমধ্যেই খুব ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু তেল ব্যবহার করে তা স্থায়ীভাবে ঠিক করা সম্ভব নয়। চুলের ফাটা ডগা একবার তৈরি হয়ে গেলে তা সম্পূর্ণ জোড়া লাগানো যায় না; প্রয়োজন হলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে ফেলা এবং নিয়মিত চুলের যত্ন নেওয়াই বেশি কার্যকর।
ত্বকের শুষ্কতায় নারকেল তেল
চুলের পাশাপাশি শরীরের শুষ্ক ত্বকের যত্নেও নারকেল তেল ব্যবহার করা যায়। স্নানের পর ত্বক সামান্য ভেজা থাকা অবস্থায় অল্প নারকেল তেল লাগালে ত্বকের উপর একটি আবরণ তৈরি হয়, যা ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে। শীতকালে কনুই, হাঁটু, গোড়ালি বা পায়ের পাতার মতো অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অংশে এটি ব্যবহার করা যায়।
তবে মুখের ত্বকে নারকেল তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটু সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। যাঁদের ত্বক খুব শুষ্ক এবং ব্রণপ্রবণ নয়, তাঁরা অল্প পরিমাণ ব্যবহার করে দেখতে পারেন। কিন্তু যাঁদের ত্বক তৈলাক্ত, ব্রণপ্রবণ বা সহজেই রোমকূপ বন্ধ হয়ে যায়, তাঁদের মুখে নারকেল তেল ব্যবহার না করাই ভালো হতে পারে। নতুন কোনও উপাদান মুখে লাগানোর আগে ছোট জায়গায় পরীক্ষা করে নেওয়াও নিরাপদ অভ্যাস।

ঠোঁটের যত্নে
শীতকালে ঠোঁট শুকিয়ে গিয়ে ফেটে যাওয়ার সমস্যা অনেকেরই হয়। ঠোঁটের উপর অল্প নারকেল তেল ব্যবহার করলে সাময়িকভাবে শুষ্কতা কমাতে এবং ঠোঁটকে নরম রাখতে সাহায্য করতে পারে। রাতে ঘুমোনোর আগে পরিষ্কার ঠোঁটে সামান্য নারকেল তেল লাগানো যায়।
তবে ঠোঁট বারবার শুকিয়ে যাওয়া, রক্তপাত, ঘা বা দীর্ঘদিনের সমস্যা থাকলে শুধু তেল ব্যবহার না করে কারণটি খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
হাত-পায়ের রুক্ষতায়
সারাদিন কাজের ফলে হাতের তালু, আঙুলের চারপাশ কিংবা পায়ের গোড়ালি রুক্ষ হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে শীতকালে গোড়ালি ফেটে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়ে। রাতে ঘুমোনোর আগে পরিষ্কার পা ও গোড়ালিতে সামান্য নারকেল তেল মালিশ করা যেতে পারে। আরও ভালো ফলের জন্য তেল লাগানোর পর পরিষ্কার সুতির মোজা পরা যায়।
তবে গোড়ালির ফাটল যদি গভীর হয়, ব্যথা করে, রক্তপাত হয় বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দেয়, তখন ঘরোয়া পরিচর্যার উপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মেকআপ তোলার ক্ষেত্রে
নারকেল তেল তেল-দ্রবণীয় মেকআপের কিছু অংশ আলগা করতে সাহায্য করতে পারে। ফলে কেউ কেউ মেকআপ রিমুভ করার সময় সামান্য নারকেল তেল ব্যবহার করেন। চোখের চারপাশে ব্যবহারের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। চোখের ভিতরে তেল ঢুকে গেলে অস্বস্তি হতে পারে।
মেকআপ আলগা করার পর ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করা জরুরি। শুধু নারকেল তেল লাগিয়ে রেখে দিলে ত্বকে তেল ও মেকআপের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে।

বডি অয়েল হিসেবে
স্নানের পর শরীরে ময়েশ্চারাইজারের বিকল্প হিসেবে নারকেল তেল ব্যবহার করার চল বহুদিনের। বিশেষ করে হাত-পা, কনুই, হাঁটু এবং শরীরের শুষ্ক অংশে অল্প তেল ব্যবহার করা যায়। স্নানের পর সামান্য ভেজা ত্বকে তেল লাগালে ত্বক তুলনামূলক নরম অনুভূত হতে পারে।
তবে গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করলে শরীরে অস্বস্তি বা ঘামাচির মতো সমস্যা হতে পারে। তাই আবহাওয়া এবং নিজের ত্বকের ধরন অনুযায়ী পরিমাণ ঠিক করা দরকার।
নারকেল তেল দিয়ে স্ক্রাব?
নারকেল তেলের সঙ্গে চিনি বা অন্য কোনও দানাদার উপাদান মিশিয়ে ঘরোয়া স্ক্রাব তৈরির চল রয়েছে। এতে ত্বকের উপরিভাগের মৃত কোষ কিছুটা উঠে যেতে পারে। কিন্তু মুখের ত্বকে এ ধরনের দানাদার স্ক্রাব ব্যবহারে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বেশি ঘষলে ত্বকে ক্ষুদ্র ক্ষত তৈরি হয়ে জ্বালা বা প্রদাহ বাড়তে পারে।
বিশেষ করে ব্রণ, সংবেদনশীল ত্বক বা সক্রিয় র্যাশ থাকলে মুখে ঘষে ঘষে স্ক্রাব করা এড়ানোই ভালো। শরীরের তুলনামূলক পুরু ত্বকে খুব হালকা হাতে ব্যবহার করা গেলেও নিয়মিত বা অতিরিক্ত এক্সফোলিয়েশন প্রয়োজন নেই।
নারকেল তেল ও ঘরোয়া ফেসপ্যাক
অনেকে নারকেল তেলের সঙ্গে মধু, অ্যালোভেরা বা অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে ফেসপ্যাক তৈরি করেন। শুষ্ক ত্বকের ক্ষেত্রে কিছু উপাদান সাময়িকভাবে ত্বককে নরম অনুভব করাতে পারে। কিন্তু ঘরোয়া ফেসপ্যাক মানেই যে সব ত্বকের জন্য নিরাপদ, তা নয়।
লেবুর রস, বেকিং সোডা বা অতিরিক্ত সুগন্ধি উপাদান মিশিয়ে মুখে লাগানোর প্রবণতা এড়ানো উচিত। এগুলি ত্বকে জ্বালা, শুষ্কতা বা সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে। বিশেষ করে কোনও অনুষ্ঠান বা পুজোর আগে নতুন ঘরোয়া উপাদান মুখে পরীক্ষা করা ঠিক নয়।

ব্রণপ্রবণ ত্বকে কেন সাবধান?
নারকেল তেল অনেকের ত্বকে ভালো মানালেও মুখের ব্রণপ্রবণ ত্বকে এটি সবসময় উপযুক্ত নয়। তেলের ঘন প্রকৃতির কারণে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে রোমকূপ বন্ধ হয়ে ব্রণ বা ছোট ছোট দানা বাড়তে পারে। তাই তৈলাক্ত বা ব্রণপ্রবণ ত্বক হলে মুখে নারকেল তেল ব্যবহারের আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
কেউ ব্যবহার করতে চাইলে প্রথমে ছোট একটি অংশে অল্প পরিমাণ লাগিয়ে ত্বকের প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। কয়েক দিন ব্যবহারের পর যদি ব্রণ, চুলকানি, লালচে ভাব বা জ্বালা বাড়ে, তা হলে ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।
মাথার ত্বকে তেল দেওয়ার সময় কী মনে রাখবেন?
মাথার ত্বকে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করলেই চুল বেশি ভালো থাকবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। মাথার ত্বকে যদি খুশকি, চুলকানি, অতিরিক্ত তৈলাক্তভাব বা প্রদাহের সমস্যা থাকে, তাহলে তেল দিয়ে সমস্যা চাপা না দিয়ে কারণটি বোঝা দরকার।
বিশেষ করে খুশকির ক্ষেত্রে অনেকে বেশি করে তেল দিয়ে রাখেন। কিন্তু খুশকির কারণ যদি ছত্রাকজাতীয় হয়, তাহলে শুধু তেল ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। বরং কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়তেও পারে। তাই দীর্ঘদিনের খুশকি বা মাথার ত্বকের সমস্যায় প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নারকেল তেল কি চুল গজায়?
নারকেল তেল নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত দাবিগুলির একটি হল—এটি চুল গজাতে সাহায্য করে। বাস্তবে নারকেল তেল চুলের যত্নে উপকারী হতে পারে, চুলের শুষ্কতা ও ভঙ্গুরতা কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু নতুন চুল গজানোর নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে নারকেল তেলকে ধরা যায় না।
চুল পড়ার কারণ একাধিক হতে পারে—পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন, মানসিক চাপ, অসুস্থতা, বংশগত কারণ কিংবা মাথার ত্বকের সমস্যা। তাই অস্বাভাবিক হারে চুল পড়লে শুধু তেল বদল না করে কারণটি খুঁজে বের করা জরুরি।
কোন নারকেল তেল ব্যবহার করবেন?
রূপচর্চায় ব্যবহারের জন্য পরিষ্কার, ভালো মানের নারকেল তেল বেছে নেওয়া উচিত। বোতল খোলার পর গন্ধ, রং বা গঠনে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে ব্যবহার না করাই ভালো। তেল সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও পরিষ্কার ও শুকনো পাত্র ব্যবহার করা দরকার।
নারকেল তেল ঠান্ডা জায়গায় রাখলে অনেক সময় জমে যেতে পারে। আবার গরমে তরল হয়ে যায়। তাপমাত্রার এই পরিবর্তন স্বাভাবিক। তেল জমে গেলে পাত্রটি হাতে কিছুক্ষণ রাখলেই তা গলে যেতে পারে। বারবার খুব বেশি গরম করা বা দীর্ঘক্ষণ সরাসরি রোদে রাখা উচিত নয়।

রূপচর্চায় নারকেল তেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা—সরলতা
আজকের ব্যস্ত জীবনে রূপচর্চা অনেক সময় হয়ে উঠেছে বহু ধাপের একটি প্রক্রিয়া। ক্লিনজার, টোনার, সিরাম, ময়েশ্চারাইজার, হেয়ার মাস্ক—তালিকা দীর্ঘ। সেই জায়গায় নারকেল তেলের ব্যবহার অনেকটাই সহজ। একটি পরিচিত উপাদান, সহজলভ্য এবং বহু প্রজন্মের ঘরোয়া পরিচর্যার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা।
তবে প্রাকৃতিক বলেই কোনও উপাদান সবার জন্য নিরাপদ—এমন ধারণা ঠিক নয়। নারকেল তেলও তার ব্যতিক্রম নয়। কারও ত্বকে এটি খুব ভালো মানাতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে ব্রণ বা অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। তাই রূপচর্চার মূলমন্ত্র হওয়া উচিত নিজের ত্বক ও চুলকে বোঝা।
রূপচর্চার ক্ষেত্রে দামি প্রসাধনীই শেষ কথা নয়, আবার ঘরোয়া উপাদানই সব সমস্যার সমাধান—এটিও সত্যি নয়। বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক উপাদান বেছে নেওয়া, পরিমিত ব্যবহার করা এবং ত্বক বা চুলের কোনও অস্বাভাবিক সমস্যা হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নারকেল তেলের সৌন্দর্য এখানেই—এটি কোনও জাদুকাঠি নয়, বরং দৈনন্দিন যত্নের একটি সহজ উপাদান। চুলের শুষ্কতা থেকে শরীরের রুক্ষ ত্বক, ঠোঁটের পরিচর্যা থেকে গোড়ালির যত্ন—সঠিকভাবে ব্যবহার করলে ছোট ছোট সৌন্দর্যচর্চার মুহূর্তকে আরও সহজ করে তুলতে পারে। ঠাকুমার কাঠের বাক্সে রাখা সেই চেনা নারকেল তেলের শিশি তাই আজও আধুনিক রূপচর্চার দুনিয়ায় নিজের জায়গা ধরে রেখেছে।
রবিবারের গল্প: একটি মৃতদেহের বিজ্ঞাপন ও শ্রীলেখা
শোভনলাল আধারকার
সেদিনের খবরের কাগজটা পড়া শেষ করে ভাঁজ করে টেবিলের নিচে ছুঁড়ে দিতে গিয়েই হঠাৎ চোখ পড়ে গেল দুই নম্বর পাতার কালো ‘বর্ডারের’ বিজ্ঞাপনটা। একটা অস্বচ্ছ ছবির নিচে লেখা ছিল, “বয়স অনুমান ৩০-৩২, উচ্চতা ৫ ফুট ৫ ইঞ্চি, গায়ের রঙ ফরসা, বলিষ্ঠ গড়ন, পরনে কালো রঙের প্যান্ট আর সাদা শার্ট, চোখে চশমা নেই, সন্ধান জানাবার ঠিকানা, টেলিফোন নম্বর ইত্যাদি...”
শ্রীলেখা সাধারণত এইসব খবর শুধু নয়, এই পাতাটাই পড়ে না। কারণ অবজ্ঞা করা নয়। ওই পাতাটার খবরগুলো ওর মনে অযথা বিষাদের অনুভূতি এনে দেয় আর সারাদিন ওই সব চিন্তা করে মনে মনে কষ্ট পায়। কিন্তু কেন জানে না, আজ ওই পাতাটার উপর নজর পড়তেই ওর চোখের দৃষ্টি যেন চুম্বকের মতো আকর্ষিত হল। বিনা কারণেই পর পর কয়েকবার পড়ল বিজ্ঞাপনটা আর অস্পষ্ট ছবিটার দিকে তাকিয়ে দেখল। একে তো খবরের কাগজের ছবি, তায় সরকারি বিজ্ঞাপন—লেখা আর ছবিটা মোটেই স্পষ্ট নয়, কিন্তু তবু অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল শ্রীলেখা। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই অনেক দিন আগের স্মৃতিতে ফিরে গেল:
অনিরুদ্ধ বিশ্বাস এসেছিল ওর জীবনে খুব অল্প সময়ের জন্যই; দেখা আর আলাপ হয়েছিল সাত-আট বছর আগে কোন এক বইমেলায়। এম.এ. পরীক্ষা হয়ে গেছে, কিন্তু ফলাফল বেরুতে দেরি ছিল, সেই বেপরোয়া, বেকার দিনগুলিতে শ্রীলেখা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যহীন ভাবে সারা শহর ঘুরে বেড়াত—কখনো বাসে, কখনও বা সম্পূর্ণ কপর্দকহীন ভাবে হেঁটে। এমন সুখের সময় আর হয় না—পাশ বা ফেল কিছুই হয়নি, পরীক্ষাও শেষ, অতএব ‘মুক্ত-বিহঙ্গ’।
অনিরুদ্ধই যেচে আলাপ করেছিল, “ক’টা বাজলো বলুন তো? আমার ঘড়িটা অনেক দিন আগেই বেচে দিতে হল আর মোবাইলটা সদ্য হারিয়েছি।”
শ্রীলেখা খানিকটা অবাক আর একটু বেশি বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে দেখেছিল ওর দিকে। ওকে দেখে মনে হয়নি রাস্তার লোফার বা গায়ে পড়ে ভাব জমাবার জন্য সময় জানতে চাইছে বা ওর ঘড়ি না থাকার ব্যাখ্যা সবিস্তারে জানাবার ‘টাইপ’। বিরক্তি অনুভব করলেও মনে মনে একটু কৌতূহল বোধ হচ্ছিল শ্রীলেখার। তবুও নিজের ছোট হাতঘড়িটার দিকে এক নজর তাকিয়েই বলল, “বারোটা।”
অনিরুদ্ধ হেসে বলেছিল, “এগারোটা পঞ্চান্ন বলুন।”
শ্রীলেখা পিঠ সোজা করে দাঁড়িয়ে আরও বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিল।
শিশুর মতো সরল একমুখ হেসে অনিরুদ্ধ বলেছিল, “বারোটা মানে, সব শেষ; তাই এগারোটা পঞ্চান্ন, মানে সব শেষ হয়নি, এখনও আশা আছে।”
আবার একগাল শিশুসুলভ হাসি হেসে বলেছিল, “দেখুন না, বাটা-কোম্পানির জুতোর দাম সব সময়ই একশো নিরানব্বই হয়, দু’শো হয় না। এই এক টাকার ব্যবধানে ক্রেতার মনে আশ্বাস জাগায়, যে দামটা ন্যায্য, আর দু’শো টাকাও খরচ হল না।”
ওর বলার ধরণে শ্রীলেখাও না হেসে থাকতে পারল না।
তারপর কথায় কথায় বিরক্তির ভাবটা ধীরে ধীরে দূর হয়ে গিয়েছিল।
অনিরুদ্ধই প্রস্তাব করেছিল, “একটু চা খাবেন, ওই যে মাটির ভাঁড়ের চা।”
রাজি হয়ে ঘাড় নেড়েছিল শ্রীলেখা; আসলে অনেকক্ষণ হাঁটার পর মনে মনে একটু চা খাবার ইচ্ছেও জেগেছিল। মনে মনে হিসেব করে নিল দু’কাপ চায়ের মতো পয়সা ব্যাগে আছে বোধ হয়।
তারপর একটা সস্তা রেস্টুরেন্টে বসে চা খেল দু’জনে। বিল হয়েছিল বারো টাকা। অনিরুদ্ধ পকেট থেকে পার্স বের করে গুনে গুনে এগারো টাকা নব্বই পয়সা এগিয়ে দিয়েছিল। দোকানদার অবাক হয়ে চেয়ে ছিল।
অনিরুদ্ধ হেসে বলেছিল, “দশ পয়সা কনসেশন কাকু।”
দোকানদার পয়সা গুনে নিয়ে হেসে বলেছিল, “আবার এসো ভাই-পো, আরও বেশি কনসেশন পাবে।”
ওর রকম-সকম দেখে শ্রীলেখা নীরবে তিরস্কার করেছিল।
সেই শুরু।
এরপর ওরা অনেক জায়গায়, অনেকবার বসে গল্প করেছে, চা খেয়েছে—মোটামুটি মন জানাজানিও হয়েছে।
তারপর একদিন হঠাৎ যেমন করে এসেছিল, তেমনি করে আচমকা কিছু না বলে, না জানিয়ে উধাও হয়ে গেল অনিরুদ্ধ। শ্রীলেখা অনেক ঘোরাঘুরি করে ওই সব রেস্টুরেন্টে খোঁজ নিয়েও ওর কোনও খবর পেল না।
এরপর গঙ্গা-যমুনায় অনেক জল বয়ে গেল। শ্রীলেখার স্মৃতিতেও অনিরুদ্ধ ফিকে হতে হতে অস্বচ্ছ ছবি হয়ে রয়ে গেছে। ওর জীবনে এসেছে সুশোভন দত্ত—প্রফেসর দত্ত। আর স্বাভাবিক নিয়মেই ওদের জীবনে এলো ‘আশীর্বাদ’—ওদের প্রথম সন্তান।
হঠাৎ মনের পটে ফিরে আসা অনিরুদ্ধের ফিকে স্মৃতিকে সরিয়ে রেখে বিজ্ঞাপনের লেখাটা আর একবার পড়তে আর ছবিটাকে ভালো করে দেখতে লাগল: মুখটা ভীষণ অস্বচ্ছ, কিন্তু বাঁ-হাতের কবজিতে কী যেন একটা কালো দাগ দেখা যায়। অনবরত ঘড়ি পরার ছাপ অথবা একটা উল্কির অস্পষ্ট ছাপ বলে মনে হল।
বিনা কারণেই শ্রীলেখা ভাবতে লাগল, অনিরুদ্ধের গায়ে কোনও উল্কির ছাপ কোনওদিন দেখেনি। আসলে, ও উল্কি পছন্দই করত না। ও বলত, “উল্কি-ওয়ালা শরীর কেমন যেন ‘ভয়ানক আর ভালগার ভালগার’ মনে হয়।” অনিরুদ্ধের হাতে ঘড়ি কোনওদিনই দেখে নি শ্রীলেখা। একবার বলেছিল বটে, পকেটে পয়সা না থাকায় হোটেলের মালিককে খাবারের দাম হিসাবে দিতে হয়েছিল।
শ্রীলেখা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিল: ‘সে নয়।’
কিন্তু বিজ্ঞাপনের ছবিটা মাথা থেকে সরাতে পারল না, কবজির দাগটা আরও ভালো করে পরীক্ষা করতে লাগল শ্রীলেখা। পাশের ঘর থেকে আশীর্বাদের খেলনা ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা নিয়ে এসে ছবিটা দেখতে লাগল: সুশোভনের পড়ার ঘরে টেবিল লাইটটার নিচে ছবিটা রেখে দূরবীন চোখে লাগিয়ে ভালো করে দেখতে লাগল শ্রীলেখা। হ্যাঁ, একটা উল্কিই মনে হচ্ছে, বাঁ হাতের কবজিতে ঠিক যেন একটা হাতঘড়ি। মনে মনে ভাবল শ্রীলেখা, “হ্যাঁ, তাই তো একটা হাতঘড়ির ছাপ।” আরও ভালো করে লক্ষ্য করল শ্রীলেখা: হাতঘড়িতে আঁকা রয়েছে, এগারোটা পঞ্চান্ন, দুটো কাঁটাই প্রায় একসঙ্গে—মাঝে সামান্য ফাঁক।
হঠাৎ কেউ যেন একটা ভারী হাতুড়ির ঘা মারল ওর মাথায় আর বুকে, হৃদপিণ্ডের স্পন্দন থেমে গেল শ্রীলেখার।
অজান্তেই, শ্রীলেখার দৃষ্টি ঠিকরে পড়ল টেবিলের উপরে রাখা টেলিফোনটার উপর।
ভাবল, ‘পুলিশকে ফোন করা দরকার।’








Comments