top of page

পাহাড়ি পথ থেকে শহুরে স্ট্রিটফুডে মোমো, গরমে অফিসের পোশাক, সুস্থ থাকতে মাছ, রবিবারের গল্প: পেয়ার! পেয়ার!


পাহাড়ি পথ থেকে শহুরে স্ট্রিটফুডে মোমো


টিম অনন্যা


আট থেকে আশি, মোমোর জনপ্রিয়তা বর্তমানে তুঙ্গে! এটি আজ শুধু একটি খাবার নয়, এক সুস্বাদু অনুভব, যা আজ শহরের অলিতে-গলিতে, অফিস পাড়া থেকে কলেজ ক্যান্টিনে, সর্বত্র এক জনপ্রিয় স্ট্রিট ফুডে পরিণত হয়েছে। কিন্তু মোমোর যাত্রা শুরু হয়েছিল পাহাড়ি পথ বেয়ে, তিব্বত ও নেপালের নির্জন গাঁথা থেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ ও রসনার ভিন্নতা বদলে দিয়েছে তাকে, তবু তার অন্তরালের সেই গরম ভাপ আর মশলাদার পূরণের জাদু আজও অমলিন।


এদেশে কোথা থেকে এলো মোমো?

মোমোর জন্মভূমি তিব্বত। কথিত আছে, তিব্বতী ভাষায় mog mog শব্দের অর্থ ‘স্টিমড রুটি’।তিব্বতের প্রাচীন বৌদ্ধ গৃহস্থালিতে মোমো ছিল পারিবারিক খাবার, সাধারণত মাংস বা সবজির পুর দিয়ে বানানো হত। পরবর্তীতে এই খাবার নেপাল, ভুটান, সিকিম, লাদাখ হয়ে ভারতের দার্জিলিং, কালিম্পং ও শিলিগুড়ির দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সেখান থেকেই শহর কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই, সব শহরের রাস্তায় সে স্ট্রিটফুড রূপে রাজত্ব করতে শুরু করে। সময় বদলেছে, বদলেছে উপকরণ ও পরিবেশনের ধরণও। এখন শুধু ভেজ বা চিকেন নয়, মোমো যেন হয়ে উঠেছে ফিউশন খাদ্যসংস্কৃতির প্রতীক।




ভিন্ন স্বাদে মোমো:

ভেজ মোমো: বাঁধাকপি, গাজর, পেঁয়াজ, পনির, কর্ন এর পুর ভরা সঙ্গে সামান্য তেল মশলার সিজনিং।

চিকেন মোমো: মাংসের মিহি কিমা ও মশলার পুরভরা। সাধারণত সবথেকে বেশি জনপ্রিয়।

ফিশ মোমো: সামুদ্রিক মাছের পুর ভরা, সাধারণত স্টিমড বা ফ্রায়েড।

চিজ মোমো: গলানো চিজ ও কর্নের সংমিশ্রণ। অনেক সময় মাংসের কিমা ও অন্যান্য সবজি থাকে।

চকলেট মোমো: ডেজার্ট মোমোর রূপ। ভেতরে থাকে মেল্টেড চকলেট।

মশলা মোমো/তন্দুরি মোমো: গ্রিল করা মোমোতে মশলা মাখিয়ে গ্রিল করছ চাট মশলা আর ধনেপাতার চাটনি সহ পরিবেশন করা হয়।

স্টিমড মোমো: ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি এবং স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

ফ্রাইড মোমো: ডিপ ফ্রাই করে সোনালি রঙের খাস্তা স্বাদ।

প্যান ফ্রাইড/ কুরকুরে মোমো: নিচে হালকা করে ভাজা, ওপরটা নরম থাকে।

সিজলিং মোমো: হট প্লেট-এ পরিবেশন করা হয়, সঙ্গে থাকে ঝাল সস।

স্যুপ মোমো: ঝোল সহ পরিবেশিত, সাধারণত নেপালী বা তিব্বতি খাবারে প্রচলিত।



কলকাতা ও শিলিগুড়িতে মোমো এখন একটি অনিবার্য রাস্তার খাবার। কলেজ ক্যাম্পাস, পার্ক, অফিসপাড়া, সব জায়গায় দেখা মেলে মোমো স্টলের। সজল সস আর গরম ভাপ ওঠা মোমোর থালা যেন স্ট্রেস দূর করার ছোট্ট ছুটি। স্ট্রিট স্টাইলে তন্দুরি মোমো বা মায়োনিজ-মোমো, এমনকি তেবিলে পরিবেশিত কন্টিনেন্টাল সস-সহ চিজ বেকড মোমো, সবই শহুরে রসনার সঙ্গে মিলেমিশে গেছে।


তিব্বতি ও নেপালি পরিবারে মোমো শুধুমাত্র খাবার নয়, এটি উৎসবেরও অংশ। পরিবারের সকলে মিলে মোমো তৈরি করে, একসঙ্গে খাওয়া হয়। এই ‘মোমো মেকিং’ আসলে এক সামাজিক আচার। এখন শহরাঞ্চলেও বন্ধুদের আড্ডা, টিউশন ফাঁকি, পার্টির নৈশভোজ, সব কিছুর কেন্দ্রে মোমো নিজের স্থান করে নিয়েছে।



মোমো তার সরলতা, নরম আবরন, সুস্বাদু পুর আর ঝাঁঝালো সসের মাধ্যমে তৈরি করে এক চিরন্তন টান। পাহাড়ি উপত্যকা থেকে শহরের কোলাহল, মোমোর এই যাত্রা শুধু ভৌগোলিক নয়, তা সাংস্কৃতিকও। নানা রূপে, নানা স্বাদে মোমো যেন এখন এক আধুনিক ভারতীয় রূপকথা—যা কখনও তিব্বতের উপকথার মতো শান্ত, কখনও আবার মসলাদার শহুরে চমক।

গরমে অফিসের পোষাক


গরম আবার পড়ে গেলো, আর এখানে তো গরম মানেই হিউমিডিটি আর প্যাচপ্যাচে ঘাম। ওয়ার্ক ফ্রম হোম আইডিয়াটা বেশ ভালই ছিল কিন্তু এখন অনেক অফিসই ওয়ার্ক ফ্রম হোম তুলে দিয়ে আবার এমপ্লয়ীদের অফিসে ডেকে নিচ্ছে সুতরাং গরমের মধ্যেও অফিসে যেতে হচ্ছে প্রায় অনেক মানুষকে। আর গরমে অফিস যাওয়ার কথা ভাবলেই মনে হয় ঘেমে নিয়ে বিধ্বস্ত হয়ে অফিসে পৌঁছনো , যেটার অর্থই হলো কাজ শুরু হওয়ার আগেই টায়ার্ড হয়ে যাওয়া, কিংবা হয়তো থাকা যেতে পারে একেবারেই কুল এন্ড কনফিডেন্ট। তাও কি সম্ভব যদি সম্ভব হয় তাহলে কিভাবে? তারই কিছু আইডিয়া শেয়ার করলাম এবার


অফিস যাত্রা যেন গরমে আস্তে আস্তে গ্রিল হয়ে যাওয়ার মতো অভিজ্ঞতা।

এই পরিস্থিতিতে পুরোপুরি ঠান্ডা থাকা সম্ভব নয়, কিন্তু বুদ্ধি করে পোশাক নির্বাচন করলে গরমের কষ্ট অনেকটাই কমানো যায় — আর প্রফেশনাল লুকটাও সুন্দরভাবে ধরে রাখা যায়।

গরমকালে অফিসের জন্য স্টাইলের তিনটে মূল মন্ত্র:

ফ্যাব্রিক, ফিট আর ফিনেস।


১. ফ্যাব্রিক নির্বাচন: পোশাককেই শ্বাস নিতে দিন

ভারতের গরমে প্রথম কাজ হলো এমন কাপড় বেছে নেওয়া যা বাতাস চলাচল করতে দেয়:

লিনেন: হালকা, আরামদায়ক আর ক্যাজুয়াল ক্রিজ সহ লুক। লিনেন-সুতির মিশ্রণ বা আইরিশ লিনেন নিলে আরও ভালো।

স্মার্ট কটন: পাতলা ও হালকা বোনা কটন — যেমন চামব্রে, সিয়ারসাকার বা ম্যাডরাস কটন।

অন্যান্য বিকল্প: হপস্যাক (খোলা বুননের ব্লেজার ফ্যাব্রিক), ভিসকোস, হ্যাম্প বা সিয়ারসাকার।

স্মার্ট টিপ:

ডেনিমের জিন্স বাদ দিয়ে লিনেন বা পাতলা কটনের প্যান্ট বেছে নিন। পলিয়েস্টার ড্রেসের বদলে সুতির ফ্রক বা টপ পরুন।



২. ফিটের ব্যাপার: ঢিলেঢালা কিন্তু গোছানো

গরমে খুব টাইট জামা-কাপড় এড়িয়ে চলাই ভালো।

আরামদায়ক হলেও ফিট যেন স্মার্ট থাকে — ঢিলেঢালা, কিন্তু অগোছালো না।

শার্ট: হালকা বক্সি ফিট, ঢিলেঢালা হাতা। কিউবান কলার বা ব্যান্ড কলার ট্রাই করতে পারেন।

ট্রাউজার: সিগারেট প্যান্ট বাদ দিন, প্লিটেড বা ঢিলেঢালা কাটের ট্রাউজার নিন। অ্যাঙ্কেল-লেংথ হলে বেশি আরাম পাবেন।


ব্লেজার: হালকা অনস্ট্রাকচার্ড ব্লেজার (যেমন হপস্যাক বা ট্রপিক্যাল উলে তৈরি) নিন যাতে অতিরিক্ত গরম না লাগে সম্ভব হলে গ্রীষ্ম কালে ব্লেজার পরা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন।

৩. রঙ নির্বাচন: হালকা রঙে ভরসা রাখুন

গরমে হালকা ও প্যাস্টেল রঙের জামা-কাপড় পরুন:

প্যাস্টেল শেড: ল্যাভেন্ডার, মিন্ট, পাউডার পিঙ্ক, বেবি ব্লু।

কনট্রাস্ট প্লে করুন: হালকা ট্রাউজারের সাথে একটু মিড-টোন শার্ট পরুন — যেমন খাকি শার্টের সাথে অফ-হোয়াইট চিনো।


টিপস:

কালো রঙ এড়িয়ে চলুন যদি না আপনি পুরো সময় এয়ারকন্ডিশন্ড রুমে থাকেন।

৪. স্টাইলিং ম্যানেজমেন্ট: কম টুকরোতে বেশি স্টাইল

গরমে লেয়ারিং কম করুন। তার বদলে টেক্সচার বা প্যাটার্ন দিয়ে স্টাইল বাড়ান:

টেক্সচার: লিনেন, সিয়ারসাকার, হপস্যাকের মত হালকা কাপড় ব্যবহার করুন।

প্যাটার্ন: মাইক্রো-চেক, সফট ফ্লোরাল বা হালকা পিনস্ট্রাইপ যুক্ত জামা পরুন।

৫. স্মার্ট অ্যাক্সেসরিজ: কম হলেও স্টাইলিশ

কম অ্যাক্সেসরিজ ব্যবহার করুন কিন্তু স্টাইল ঠিক রাখুন:

বেল্ট: টেক্সচারড লেদার বেল্ট (যেমন DIESEL B-LINE বেল্ট)।

ব্যাগ: স্লিম ব্রিফকেস (যেমন Tom Ford গ্রেইন্ড লেদার ব্রিফকেস)।

ঘড়ি: মিনিমাল ডিজাইনের ঘড়ি।

৬. সঠিক জুতো নির্বাচন: আরাম আর স্টাইল একসাথে

গরমে পায়ের আরাম ভীষণ জরুরি। সঠিক জুতো নির্বাচন আপনাকে অনেক কষ্ট থেকে বাঁচাবে:



লোফার (সুয়েড বা ক্যানভাস):

Ralph Lauren Purple Label সুয়েড লোফার

Dior Granville লোফার

Christian Louboutin ক্যানভাস লোফার

ডার্বি সুজ:

Nappa Dori সুয়েড ডার্বি

Tom Ford ডেজার্ট বুটস

মিউলস/কোলাপুরি (কম ফরমাল অফিসের জন্য):

Tod's Gommino মিউলস

Bottega Veneta Sunday মিউলস


ছেলে-মেয়েদের জন্য আলাদা টিপস

ছেলেদের জন্য:

হালকা রঙের সুতি বা লিনেনের ফুল হাতা বা হাফ হাতার শার্ট

পাতলা ট্রাউজার বা চিনো প্যান্ট

ক্লোজড-টো জুতো (লোফার/ডার্বি)


মেয়েদের জন্য:

হালকা রঙের সুতির শাড়ি, সালওয়ার কামিজ, কুর্তি-পালাজো

হালকা ব্লাউজের সাথে স্কার্ট বা ট্রাউজার

ফ্ল্যাট বা লো হিলের জুতো (কম ফরমাল হলে খোলা স্যান্ডেলও চলবে)



গরম যতই ভয়ঙ্কর হোক, স্মার্ট কাপড় নির্বাচন, সঠিক ফিট আর স্টাইল সেন্স থাকলে আপনি গরমেও থাকবেন কুল, কম্পোজড আর কনফিডেন্ট। অফিসে প্রথম নজর কেড়ে নেবেন, আর গরমের কষ্টটাও অনেক কম লাগবে!


সুস্থ থাকতে মাছ


পুষ্টিবিদ জয়িতা ব্রক্ষ্ম


মাছে ভাতে বাঙালির পাতে রোজ মাছ থাকা চাই, না হলে যে খাওয়াটাই অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। এমনটাই আপামর বাঙালির একমাত্র চাহিদা। রকমারি মাছের রকমারি পদের সাথে গরম ভাত যে ভীষণ রকম প্রিয়। কিন্তু মাঝে মাঝে বাধ সাধে কিছু অসুখ, আর ডাক্তারি পরোয়ানা। কি মাছ খাবো, কতটা খাবো ,কিভাবে রান্না করে খাবো এই সব প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে মাথার ভিতর। তাই আজকের আলোচনার মধ্যমনি বাঙালির সেরা মাছের গুনাগুন।


প্রথমেই বলি মাছ হলো প্রোটিন এর একটি উৎকৃষ্ট উৎস, সম্পূর্ণ প্রাণীজ প্রোটিন এর ১৭ শতাংশ প্রোটিন থাকে মাছে। এছাড়াও ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, পলি আনস্যাটুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড,বিভিন্ন ভিটামিন এবং মিনারেল এ সম্মৃদ্ধ যেমন ভিটামিন এ, বি এবং বিশেষত ভিটামিন ডি এ ভরপুর যা সাম্প্রতিককালে অত্যন্ত আবশ্যিক একটি ভিটামিন যার ঘাটতির সমস্যায় ভোগেন প্রায় ৪০ শতাংশ ভারতীয়। তাই প্রতিদিন মাছ ও মাছের তেল যদি ডায়েট এ থাকে তবে আমাদের তা আমাদের শরীরে নানাবিধ উপকারে লাগে। যেমন মাছে রয়েছে DHA ও EPA এর মতো লং চেন ফ্যাটি অ্যাসিড যা আমাদের হার্ট কে সুস্থ রাখে, আমাদের মস্তিস্ক ও নাৰ্ভাস সিস্টেম কে ভালো রাখে,মাছে উপস্থিত জিংক,সেলেনিয়াম,আয়োডিন,ক্যালসিয়াম,ফসফরাস ইত্যাদি মিনারেল এবং ভিটামিন ডি, বি ১২, বি ৬ প্রভৃতি বিভিন্ন হরমোনের কার্যকারিতা বজায় রাখে এবং আমাদের ত্বক ও ভালো রাখে।১০০ গ্রাম টাটকা কাঁচা মাছে মোটামুটি ৮০ ক্যালোরি এনার্জি বর্তমান থাকে।এছাড়াও মাছে রয়েছে কিছু অপরিহার্য সালফার যুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড (লাইসিন, মিথিওনাইন, সিস্টিন। এছাড়াও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে COPD, IBS, অ্যাজমা, আলঝেইমার ডিজিস ইত্যাদি জটিল অসুখে এই ফার্স্ট ক্লাস প্রোটিন যুক্ত মাছ খেলে উপকার মেলে।


এবার আসি কোন মাছ শরীরের জন্য ভালো , বড় মাছ না ছোট মাছ ? সবার আগে পুষ্টিবিদের কাছে বেশির ভাগ রুগীর এই প্রশ্নটাই থাকে। American Heart Association এর গাইডলাইন অনুযায়ী সপ্তাহে অন্তত ২ দিন ,৩.৫ আউন্স অর্থাৎ ৩/৪ কাপ ফ্যাটি ফিশ বা তৈলাক্ত সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অবশ্যই ছোট ছাড়া মাছ শরীরের জন্য ভালো তবে বড় মাছ যদি খেতেই হয় তাহলে দেড় কেজির কম ওজনের মাছ খান, কারণ অতিরিক্ত বড় সাইজ এর পাকা মাছে চর্বি বেশি থাকে|মিষ্টি জলের মাছে যেমন ভালো পরিমানে প্রোটিন থাকে ঠিক তেমন সামুদ্রিক মাছে লবণের মাত্রা কিছুটা বেশি হলেও ফসফরাস ও ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে ভালো পরিমানে, তাই দু ধরণের মাছই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খান। বাঙালির পাতে থাকুক রুই, বাটা, চারাপোনা , মৌরলা , পুটি , ইলিশ ,পমফ্রেট, স্যামন ইত্যাদি মাছের সম্ভার। সারাদিনে ৭৫ - ১০০ গ্রাম মাছ খেতেই পারেন যদি না আপনার কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস এর মতো কোনো শারীরিক অসুস্স্থতা থেকে থাকে।



সমীক্ষায় দেখা গেছে জাপান এবং গ্রিনল্যান্ড এর মানুষ অনেকদিন বেশি বেঁচে থাকেন মাছ খেয়ে,এবং সেটা অবশ্যই বাঙালিদের মতো করা মাছ ভাজা বা রসিয়ে সর্ষে দিয়ে ঝাল করে নয়। প্রতিটা খাদ্যের নির্দিষ্ট একটি বয়েলিং পয়েন্ট থাকে, তাই খুব বেশি তেল ব্যবহার করে অনেক্ষন ভেজে খেলে তার উপকারিতা ও পুষ্টিগত গুণমান অনেকাংশেই কমে যায়। তাই সুস্থ থাকতে গ্রীলড ফিশ, স্মোকড ফিশ , রোস্ট ফিশ এর মতো রেসিপি যোগ করুন ডায়েট এ।


তাহলে আপনি বলতেই পারেন মাছে তো এখন ফরমালিন দিয়ে সংরক্ষণ করা হয় যা শরীরের পক্ষে ভীষণই ক্ষতিকারক, আবার অনেক মাছে মার্কারির পরিমান থাকে বেশি মাত্রায়। তাহলে কি ট্রেন্ডি ভেগান ডায়েট ই কি ভালো? ভারতবর্ষে প্রতি বছর প্রায় ২৬.৬ শতাংশ মৃত্যু হয় হৃদরোগে যা খুব সহজেই আমরা আটকাতে পারি যদি সঠিক মাছ সঠিক পরিমানে ও সঠিক পদ্ধতিতে রান্না করে খাই। অবশ্যই ভালো বিশ্বস্ত জায়গা থেকে মাছ দেখে কিনুন যাতে ফরমালিনে চুবিয়ে রাখা বেশিদিনের বাসি মাছ না হয় এবং ক্যানড বিগ আই টুনা, সার্ক, কিং ম্যাকারেল, স্বৰ্ড ফিশ ইত্যাদি মাছে মার্কারি এর মাত্রা বেশি থাকে যা মস্তিস্ত ও নার্ভ এর ক্ষতি করে।

তাই পুষ্টিবিদের কাছে সঠিক তথ্য জেনে নিন এবং যেটাই খান ভালোবেসে তৃপ্তি করে খান। তাতেই শরীর ও মন দুই থাকবে বশে।


ভারতীয় মাছ পুষ্টিগুণের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসেবে পরিচিত। এতে প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের ভালো উৎস রয়েছে। নিচে ভারতীয় মাছের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:


১. প্রোটিনের উৎস

মাছ উচ্চমানের প্রোটিনের চমৎকার উৎস, যা শরীরের কোষ গঠন ও মেরামত করতে সাহায্য করে। চিংড়ি, রুই, কাতলা, পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া জাতীয় মাছ প্রচুর প্রোটিন সরবরাহ করে।



২. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড

বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ (যেমন ইলিশ, টুনা, সার্ডিন) ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ, যা হৃদরোগ প্রতিরোধ, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করা এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।


৩. ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ

ভিটামিন ডি: মাছ সূর্যালোকের পাশাপাশি অন্যতম ভিটামিন ডি-এর উৎস, যা হাড় ও দাঁতের গঠনে সহায়ক।

ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স: মাছের মধ্যে ভিটামিন বি১২, বি৬ ও নিয়াসিন থাকে, যা স্নায়ুতন্ত্র ও বিপাক প্রক্রিয়ার জন্য জরুরি।

আয়রন ও জিঙ্ক: রক্ত তৈরিতে আয়রন গুরুত্বপূর্ণ, আর জিঙ্ক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।


৪. হৃদরোগ প্রতিরোধ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ

মাছের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও উচ্চ প্রোটিন হৃদরোগ প্রতিরোধে কার্যকর। এটি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করে।


৫. ওজন নিয়ন্ত্রণ ও হজমে সহায়ক

মাছ কম ক্যালোরিযুক্ত এবং সহজপাচ্য প্রোটিনের ভালো উৎস, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ভারতীয় মাছ উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। নিয়মিত মাছ খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে, হাড় মজবুত হয় এবং শরীরের সামগ্রিক কার্যকারিতা উন্নত হয়।



পেয়ার! পেয়ার!


শুভমানস ঘোষ


আমার বয়েস আট। তা বলে ভেবো না আমি কিছু বুঝি না ত্রিমার বাবা বলে আমার ভারী বুদ্ধি। বুদ্ধি কি না জানি না, আমি মজার মজার কথা বলতে পারি খুব। আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে একজন সাধু আসে। সন্ন্যাসী। আমরা তাকে লালদাদা বলে ডাকি। আমার মা-বাবা যে গুরুর শিষ্য লালদাদা তারই শিষ্য। তাই আমার মা-বাবাও লালদাদাকে দাদা বলেই ডাকে। মাথায় পেল্লাই পাগড়ি, লাল আলখাল্লা, একগাল গোঁফদাড়ি, টকটক করছে গায়ের রং। সিনেমার হিরোদের মতো ফার্স্টক্লাস দেখতে। বেসিনের কল খুললে যেমন জল বেরোয় লালদাদা তেমনি ইংরেজিতে কথা বলতে পারে।


সকালে লালদাদা ব্রেকফাস্টের সঙ্গে একগেলাস গরম দুধ খায়। আমার দিদি কিচেন থেকে দুধ গরম করে নিয়ে যায় তার কাছে। খাওয়ার পরেই আসল মজাটা হয়। লালদাদার গোঁফেদাড়িতে দুধের সর লেগে যায়। আমি তখন লালদাদাকে বলি, "লালদা, ও লালদা, তোমার দাড়ি দুধ খেয়েছে।"


আমার বাবা আগে বিরাট বড় চাকরি করত। তখন আমি লিটিল স্টার ইংরেজি স্কুলে পড়তাম। আমার জন্য রোজ সকালে দুধসাদা রঙের বাস আসত। আমার মা রুগি মানুষ। সারাদিন বিছানাতেই পড়ে থাকে। আমার দিদি বলে, আমার জন্মের পর থেকেই নাকি মা এমন।



তো মায়ের বদলে এখন আমার মা হয়েছে আমার দিদি, দিদি আমার থেকে অনেকটাই বড়। দিদির পরে মনে হয় আমাকে কেউ চায়নি, হঠাৎ করেই এসে পড়েছি। আমার খালি মনে হয়, তার জন্যই মায়ের এই অবস্থা।


তো দিদিই আমাকে কোলে করে নিয়ে গিয়ে বসিয়ে দিত বাসে। আবার স্কুলের পরে যখন বাস এসে আমাকে নামিয়ে দিত তখন দিদিই ছুটে এসে আমাকে বাস থেকে নামিয়ে টপাস করে একচুমু। এই রকম রোজ রোজ। তাই আমি একদিন করলাম কী, দিদির গলা জড়িয়ে উলটে দিদিকেই দিলাম চুমু, বললাম, "তুই বুঝি একাই রোজ রোজ আমাকে পেয়ার করবি!"


"পেয়ার।" দিদি তো অবাক, "এটা আবার কোথেকে শিখলি?"


"আমাদের স্কুলের নেহার কাছে। টিভিতে পেয়ারের বই হয়, দেখিসনি?" আমি বললাম।


"যাহ্।" দিদি লজ্জা পেল।


তার পর কোত্থেকে কী হয়ে গেল, একদিন শুনলাম, বাবার আর চাকরি নেই। আমাদের বাড়িতে কাজের লোক ছিল দু'জন, তাদের ছাড়িয়ে দেওয়া হল। ইংরেজি স্কুল থেকে আমাকে ভর্তি করে দেওয়া হল বাড়ির কাছের একটা বাংলা স্কুলে। দিদিও কলেজ ছেড়ে দিল।


আমি এখন দিদির সঙ্গে হেঁটে হেঁটেই স্কুলে যাই। স্কুল ছুটির পরে নিজেই বন্ধুদের সঙ্গে ফিরে আসি। আগে আমরা ভাল ভাল খাবার খেতাম, এখন শুধু তরকারি দিয়ে ভাত হয়। ডালও হয় না রোজ। কেন যে চাকরি চলে যায় বাবাদের।



বাবার চাকরি চলে যেতে এখন লালদাদাই আমাদের ভরসা, হাঁ করে বসে থাকি কবে লালদাদা আসবে। লালদাদা এলে আমাদের ভারী ফুর্তি। লালদাদার লালরঙের লম্বা জামার পকেটে সব সময় টাকা থাকে। তা দিয়ে আমাদের খুব খাওয়াদাওয়া হয়, এটাসেটা ভালমন্দ কেনা হয়, মায়ের ওষুধ আসে, আমার খেলনা, দিদির জন্য শাড়ি। এমনিতেই দিদির মুখ সব সময় ভার ভার, কিন্তু লালদাদা এলেই দেখেছি, দিদি অন্য রকম হয়ে যায়। খালি খালি ছুটে যায় লালদাদার ঘরে, বসে বসে গল্প করে, তখন কথায় কথায় কী হাসির ধূম দিদির। লালদাদা আমাকেও ভীষণ ভালবাসে। আমাকে মিস্টার রুরুবাবু বলে ডাকে। কত কত জায়গায় লালদাদা ঘুরেছে, তার মজার মজার গল্প শোনায়।


তবে লালদাদা যখন ধ্যানে বসে তখন একদম অন্য লালদাদা, একঘন্টা দু'ঘন্টা তখন কিচ্ছু না। ধ্যান করতে করতে এমন হুংকার দয় ভয় হবে তোমাদের। থেকে থেকে এমন করে কাঁপবে তুমি ভাববে কী না কী হয়ে গেল লালদাদার। একদিন ধ্যান করার সময় দেখি কী, লালদাদা বাচ্চার মতন কাঁদছে! দেখে তো আমি অবাক, একছুট্টে দিদির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "হ্যাঁ রে দিদি লালদা কাঁদছে কেন বল তো?"


দিদি সব জানে। বলল, "ভগবানের জন্য।"


"ভগবান? যে ভগবানের কথা বলে লালদা সে?"


"हूँ।"


"দিদি, ভগবান কি লালদার বউ?"


দিদি হেসে ফেলল, "দুর বোকা, ভগবান কারও বউ হয় না।"


"তবে?"



"লালদা একদিন বলেছিল, সবচেয়ে সুন্দর আর সবচেয়ে ভাল হল ভগবান।"


"ভ্যাট, তুই মিথ্যে বলছিস। আসলে লালদা লালবউদির জন্য কাঁদছে। বাড়িতে লালবউদি একা একা আছে না?"


দিদি গম্ভীর হয়ে গেল। 'বড্ড পাকা হয়েছিস তুই' বলে আমাকে চোখ পাকিয়ে নিজেই হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, "দাদারা সন্ন্যাসী না? সন্ন্যাসীরা বিয়ে করে না, বুঝলি?"


"বিয়ে পেয়ার কিচ্ছু করে না?" আমি আরও অবাক।


দিদি আবার গম্ভীর হয়ে গেল, "ওদের ওসব করতে নেই। তুই বাচ্চা ছেলে বাচ্চার মতো থাক।"


তা তো আমি থাকতেই চাই, কিন্তু মনটা খারাপ হয়ে গেলে আমি কী করব? কাউকে বলো না, টিভিতে কার্টুন দেখতে দেখতে যেই দেখি কেউ নেই, আমি রিমোট ঘুরিয়ে পেয়ারের সিনেমায় চলে যাই। কেউ যখন কারও সঙ্গে পেয়ার করে তখন দেখেছি তারজ্জুব আনন্দ হয়। যাকে পেয়ার করে তারও কী আনন্দ। কিন্তু বেচারা লালদাদার সেই আনন্দ করবার উপায় নেই। তার জন্যই তো ধ্যান করতে বসে লালদাদা লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে। ভগবান, না হাতি।



লালদাদা আমাদের বাড়িতে এসেছে খবর পেলে কত লোকজন আসে আমাদের বাড়িতে। সন্ধেবেলা ধ্যান সেরে উঠে লালদাদা তাদের নিয়ে ক্লাস করতে বসে। ভগবানের উপর ক্লাস। সেই যে দিদি বলেছে, সবচেয়ে ভাল আর সবচেয়ে সুন্দর সেই ভগবানের। কিন্তু বাবা বললে কী হবে আমার খুব বুদ্ধি, আমি লালদাদার কথার কিছুই বুঝতে পারি না। তাই আমি সোজা চলে যাই মায়ের কাছে।


আজও সেই রকম মায়ের কাছে এসে বসে আছি। মায়ের আজ ব্যথা বেড়েছে, বালিশটা বুকে চেপে হাঁফাচ্ছিল। আমার সাড়া পেয়ে


বলল, "আয় বোস।"


"খুব কষ্ট হচ্ছে মা?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।


মা কষ্ট করে একটু হেসে বলল, "আর কষ্ট। ভগবান এখন নিলেই বাঁচি।"


আবার সেই ভগবান। আমি বললাম, "কেন মা আমরা কি ভাল নই, সুন্দর নই? আমাদের ছেড়ে কেন তুমি ভগবানের কাছে যাবে?"


মিষ্টি হাসিতে ভরে গেল মায়ের মুখখানা, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, "ঠিক আছে বাবা, যাব না। হল?"


আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আচ্ছা মা, ভগবান কি কারও বউ হয়?"



মা হাসল, "তা আবার কখনও হয়?"


"হয় না? তা হলে ভগবান কীসের ভাল?"


মা শিউরে উঠল, "ও কথা বলে না বাবা।"


"কেন?"


"ভগবান পাপ দেবে।"


আমি চুপ করে গেলাম। এত সহজে ভগবান পাপ দিয়ে দেয়? ক্লাসটা হোক, লালদাদাকে গিয়ে ধরব। বলব, "কীসের ভাল, কীসের


সুন্দর তোমার ভগবান?"


মায়ের কাছে একটু বসে উঠতে যাব বাবা এল ঘরে। চাকরি চলে গেলে কী হবে, রোজ বাবা নতুন চাকরি খুঁজতে একবার করে বাইরে বেরোয়, এই ফিরছে, মায়ের সঙ্গে এখন গল্প করবে, আমি আর দাঁড়ালাম না, চলে গেলাম নিজের ঘরে, মন দিয়ে স্কুলের টাস্ক করে লালদাদার ঘরের দিকে হাঁটা দিলাম, ততক্ষণে লালদাদার কাছে যারা এসেছিল তারা চলে গিয়েছে। বাবা তো মায়ের ঘরে, দিদিও মনে হয় কিচেনে, লালদাদাকে চেপে ধরার এই সুযোগ।


কিন্তু লালদাদার ঘরের পরদা সরিয়ে চমকে উঠলাম আমি। ভেবেছিলাম দিদি কিচেনে, কই না তো, এই তো লালদাদার ঘরে। কিন্তু এ


কী দেখছি। আমি অস্ফুট চিৎকার করে চলে গেলাম মায়ের কাছে।


"কী হয়েছে রুরু?" বাবা শুধোল, "হাঁফাচ্ছিস কেন?"


মা গায়ে চাদর টেনে শুয়ে পড়েছিল, উঠে বসল, আমি শুধু "দিদি" বলে চুপ করে গেলাম। বুক উঠছে পড়ছে আমার।


"কী হয়েছে দিদির?"


"আমি জানি না। লালদা-"


আর কথা খুঁজে পেলাম না আমি। তার পর কোথায় গেল মায়ের গায়ের চাদর, কোথায় গেল শরীরের ব্যথা? সব ফেলে-ছড়িয়ে গলা তুলল, "কী হয়েছে দিদির? সত্যি করে বল।"


"বল রুরু।" বাবাও বলল।


আমার লজ্জা লজ্জা করছিল, মুখটা অন্যদিকে ফিরিয়ে বলে দিলাম, "দিদি আর লালদা লালদার ঘরে বসে পেয়ার করছে।"


"কী!" মায়ের চোখ জ্বলে উঠল।


"সর্বনাশ!" বলে বাবাও আর কথা খুঁজে পেল না।


"তুমি এর জন্য দায়ী।" মা বাবার দিকে ফিরে বেঝঝে উঠল, "তুমি তুমি।"


বাবার চোখ গোল হয়ে গেল, "আমি?"


"তো কে? কথায় কথায় তুমিই নিতুকে ঠেলে ঠেলে দাদার ঘরে পাঠাতে। একজন সন্ন্যাসী মানুষ ঘরদোর ছেড়ে এসেছে-ছিছিছি।"


বাবা রেগে উঠল, "এখন সব দোষ আমার? তুমি বুঝি ধোয়া তুলসীপাতা? তুমিই তো যখন তখন 'যা না, যা না দাদার ঘরে, কী দরকার


দ্যাখ' বলে মেয়েটাকে এগিয়ে দিতে। দাদা এলেই তার পকেটের দিকে নজর দিয়ে বসে থাকতে। তোমরা কম লোভী?"


"তুমি আর মুখ নেড়ো না। ঘরের লোককে দু'বেলা দু'মুঠো খেতে দিতে পারো না, কথা বলছ? তোমার জন্যই মেয়েটার এই দশা।" বাবা মা ঝগড়া করে চলল। আমি চেয়ে রইলাম। নাহ, পেয়ার জিনিসটাকে যত ভাল মনে করেছিলাম দেখছি তা নয়, রীতিমতো গোলমেলে।


সেদিন অনেক রাতে কীসের একটা আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেল আমার। পাশে গুটিয়েমুটিয়ে শুয়ে আছে দিদি। কাল অনেক রাত পর্যন্ত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল দিদি। কাঁদতে কাঁদতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছে। রাতে মায়ের ঘর থেকে চলে আসার পর বাবা নিজে গিয়ে লালদাদার ঘর থেকে দিদিকে ডেকে এনে প্রচণ্ড বকুনি দিয়েছিল। মা চড় মেরেছিল দিদিকে। বলেছিল, "তোরই দোষ। মরবি, একবারে মরবি, কেউ তোকে বাঁচাতে পারবে না রে হতভাগি!" আমিও দিদির উপর রেগে গিয়েছিলাম। লালদাদারা বিয়ে-পেয়ার কিছু করে না। আমাকে ছোট পেয়ে দিদি কী রকম মিথ্যেটাই না বলেছিল আমাকে!


বিছানায় উঠে বসে দিদির দিকে চাইলাম। খোলা জানলা দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়েছে দিদির মুখে, চিকচিক করছে মুখটা। চাঁদের আলো না দিদি ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাঁদছে? মনটা ভারী হয়ে এল আমার। দিদির উপর যতই রাগ করি না কেন, দিদি কিন্তু আমার খুব ভাল। আমাকে ভীষণ ভালবাসে। বাবার যখন চাকরি ছিল, তখন দিদি রোজ সাজত গুজত, ভাল ভাল খাবার আনিয়ে খেত, দিদির কত বন্ধু ছিল তখন। কিন্তু বাবার চাকরি চলে যেতে তারা এখন আর আসেই না বলতে গেলে। মায়ের নয় রোগভোগ, বাবাও দেখি উঠতে বসতে আজকাল দিদিকে বকাবকি করে। তাই দিদির মুখখানা সব সময় ভার ভার। শুধু লালদাদা এলেই মুখে একটু হাসি ফোটে তার, সেটাও গেল মনে হচ্ছে আজ থেকে।


কান পেতে বুঝলাম আওয়াজটা বাইরে থেকেই আসছে। একটা গুম গুম শব্দ, সঙ্গে গুন গুন করে উঠছে একটা গলা, মানুষেরই গলা। কার? আমার বুক ধুকপুক করে উঠল, তাড়াতাড়ি দিদিকে জাগিয়ে দিলাম, দিদি ঘুম ভেঙে উঠে চুপ করে কিছুক্ষণ শব্দটা শুনে নেমে পড়ল বিছানা থেকে।


"কোথায় যাচ্ছিস? অ্যাই দিদি, কোথায় যাচ্ছিস?" আমি দিদির জামা টেনে ধরলাম।


"দাঁড়া আমি আসছি। চুপ করে শুয়ে থাক একটু।"


দিদি ঘরের আলো জ্বালল না, দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে একটু দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করল লালদাদার ঘরের দিকে। ওরে বাবা, আমি একা এই অন্ধকারে বসে থাকব? দিদির পিছু পিছু আমিও গেলাম।


লালদাদার ঘরে আলো জ্বলছিল। আমার সামনে দিদি। পরদা সরিয়ে উকি দিচ্ছিল, দিদিকে বুঝতে না দিয়ে আমিও চুপচাপ গলাটা বাড়িয়ে দিলাম, ভিতরে যা দেখলাম একেবারে চমকে উঠলাম।


লালদাদা তার গুরুর বাঁধানো ফোটোগ্রাফের সামনে উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছে আর খাটের কাঠে মাথা ঠুকছে। লালদাদার মাথার পাগড়ি ছড়িয়ে আছে মেঝেয়, গায়ের লাল জামাটা ফালা ফালা হয়ে পড়ে আছে খাটের এককোণে। গায়ে প্লেন গেঞ্জি আর লাল লুঙ্গি লালদাদার।


"কী করছেন আপনি?" দিদি ছুটে গেল।


দিদির গলা পেয়ে লালদাদা মুখ তুলল। মাথা ঠুকে ঠুকে রক্ত বের করে ফেলেছে, চুল খুলে মুখময় হয়ে আছে। দিদিকে দেখেই পাগলের মতো ছুটে এসে দিদির পায়ে পড়ে গেল। দিদির পা চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, "নিতু তুমি আমায় ক্ষমা করো, আমি পাপ করেছি। মহাপাপ মহাপাপ! কালই আমি বাড়ি ফিরে যাব। আমার সন্ন্যাসী থাকার আর অধিকার নেই।"


দিদি চেঁচিয়ে উঠল, "এ কাঁ, এ কী! পা ছাড়ুন।"


"না ছাড়ব না। তুমি আমাকে ক্ষমা না করলে আমার নরকেও গতি হবে না। গুরুর অভিশাপে আমি জ্বলেপুড়ে যাব। এ আমি কী করলাম।"


লালদাদা দিদির পায়ে মাথা ঠুকতে আরম্ভ করল। চিৎকার করে বলছিল, "আমার সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে। তুমি আমায় বাঁচাও নিতু।" দিদি স্থির হয়ে গেল, অবাক হয়ে দেখলাম দিদির মুখখানা অন্য রকম হয়ে গিয়েছে, আস্তে আস্তে থেমে থেমে লালদাদাকে বলল, "আর


আমি? আমাকে কে বাঁচাবে? আপনি বলে দিন, আমাকে কে বাঁচাবে?"


লালদাদা দিদির পা ছেড়ে কেমন সিঁটিয়ে গেল। কথা বেরোচ্ছে না মুখ দিয়ে।


"আপনার ভগবান? আপনার গুরু?" দিদির গলা ভেঙে এল, "কিন্তু আপনার মতো আমার যে শরীর জ্বলে যায় না, একটুও


অনুশোচনা হয় না, আরও বড় পাপ করবার ইচ্ছে হয়। তার কী হবে?"


লালদাদার গলা কেঁপে গেল, "আমি জানি না।"


দিদির গলা চড়ল, "তা জানবেন কেন? আমার বাঁচামরায় আপনাদের কিছুই আসে যায় না। বাড়িতেও দেখেছি। সকলে আমায় শুধু


ব্যবহার করে, কেউ ভালবাসে না।"


বলতে বলতে দিদি কেঁদে ফেলল ঝরঝর করে। কান্নাজড়ানো গলায় বলল, "আমার ক্ষমার দরকার নেই। তার চেয়ে আপনি আমাকে ঘেন্না করুন। মনের সুখে অভিশাপ দিন। অনুশোচনায় জ্বলেপুড়ে মরুন। একদিন না একদিন আপনার গুরু ঠিক আপনাকে মাফ করবেন।"


কথা শেষ করে দিদি আর দাঁড়াল না, কাঁদতে কাঁদতে ছুটে বেরিয়ে ঘরে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল বিছানায়, ফুলে ফুলে উঠে কাঁদতে থাকল,


কাঁদতে থাকল, আমি এগিয়ে গিয়ে দিদির মাথায় হাত রাখলাম।


দিদি পরথর করে কেঁপে উঠল, উঠে বসে আমাকে বলল, "রুরু তুই আমাকে একটু ভালবাসবি? একটু পেয়ার দিবি তোর?"


আমার বুকটা মুচড়ে উঠল। মনে হল বলি, "তুই আমার দুঃখী দিদি, তোকেদেব না তো কাকে দেব আমার পেয়ার?"


"কী রে তুইও দিবি না?" দিদি কাঁদতে লাগল।


আমার চোখে জল এল। লালদাদা বলেছে ভগবান, কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে ভাল, সবচেয়ে সুন্দর তুই, যে যা খুশি বলুক, আমিই তোকে পেয়ার করি দিদি। আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম দিদির কোলে, "দেব দেব।"


মাথার উপর পাখাটা ফুলস্পিডে ঘুরছিল। চাঁদের আলোয় আমরা দু'জন দু'জনকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকলাম।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page