top of page

মহাশিবরাত্রির মাহাত্ম্য এবং পুরাণ,সোনার সন্ধানী পিঁপড়ের খোঁজে, বিদেশে বেড়াতে যাবেন? কোন সতর্কতা জরুরি? রবিবারের গল্প: কথাকলি


মহাশিবরাত্রি মাহাত্ম্য এবং পুরাণ


মহাশিবরাত্রি হল সনাতন ধর্মালম্বীদের আরাধ্য দেবাদিদেব মহাদেব ‘শিবের মহান রাত্রি’। শিব পুরাণ অনুসারে, এই রাত্রেই শিব সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের মহা তাণ্ডব নৃত্য করেছিলেন। আবার এই রাত্রেই শিব ও মাতা পার্বতীর বিয়ে হয়েছিল। মহা শিবরাত্রি হিন্দু ধর্মের অন্যতম গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় ব্রত ও সাধনাক্ষণ। এটি শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়, বরং আত্মশুদ্ধি, সংযম ও চেতনা জাগরণের বিশেষ উপলক্ষ। ফাল্গুন মাসের কৃষ্ণ পক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত এই রাত্রি ভগবান শিবের আরাধনায় নিবেদিত। অন্যান্য হিন্দু উৎসব যেখানে আনন্দ, রং ও বাহ্যিক উদযাপনের মাধ্যমে পালিত হয়, সেখানে মহা শিবরাত্রি তার বিপরীত নীরবতা, উপবাস, জাগরণ ও অন্তর্মুখী সাধনার প্রতীক। এই রাত্রি শিবভক্তদের কাছে আত্মিক উন্নতির এক বিশেষ সুযোগ।


‘শিব’ শব্দের অর্থ কল্যাণময় এবং ‘রাত্রি’ শব্দের অর্থ অন্ধকার বা নিবৃত্তি। সেই অর্থে শিবরাত্রি হলো অজ্ঞানতার অন্ধকার কাটিয়ে কল্যাণের পথে উত্তরণের রাত্রি। শাস্ত্রমতে, এই রাত্রিতে শিবতত্ত্ব সবচেয়ে সক্রিয় থাকে এবং নিষ্ঠা ও ভক্তিসহকারে আরাধনা করলে জীবনের দুঃখ, ক্লেশ ও পাপক্ষয় হয়। শিব পুরাণ, লিঙ্গ পুরাণ ও স্কন্দ পুরাণে এই রাত্রির মাহাত্ম্য বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। মহা শিবরাত্রি পালনের পেছনে একাধিক পৌরাণিক ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই তিথিতেই ভগবান শিব ও দেবী পার্বতীর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। বৈরাগী ও ত্যাগী শিব সংসার ধর্মে প্রবেশ করেন শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে। ফলে এই দিনটি দাম্পত্য সুখ, পারিবারিক স্থিতি ও ভারসাম্যের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। বিশেষত গৃহস্থ জীবনে শান্তি ও কল্যাণ কামনায় এই ব্রতের প্রচলন হয়েছে।




আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক কাহিনি যুক্ত রয়েছে সমুদ্র মন্থনের সঙ্গে। দেবতা ও অসুরদের সমুদ্র মন্থনের ফলে যে ভয়ংকর হলাহল বিষ উৎপন্ন হয়েছিল, তা সমগ্র বিশ্ব ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। তখন সকলের অনুরোধে ভগবান শিব সেই বিষ নিজ কণ্ঠে ধারণ করেন। বিষ তাঁর কণ্ঠে স্থিত হওয়ায় তিনি নীলকণ্ঠ নামে পরিচিত হন। এই ত্যাগ ও করুণার স্মৃতিতেই শিবরাত্রিতে উপবাস ও জাগরণের প্রথা চালু হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। শাস্ত্র মতে, মহা শিবরাত্রির আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো শিবলিঙ্গের আবির্ভাব। এই দিনেই নিরাকার ব্রহ্ম প্রথম লিঙ্গরূপে প্রকাশিত হন। শিবলিঙ্গ কোনও মানবাকৃতি মূর্তি নয়, বরং সৃষ্টি ও চেতনার প্রতীক। এটি আদি ও অন্তহীন ব্রহ্মতত্ত্বের প্রকাশ। তাই শিবরাত্রিতে শিবলিঙ্গ পূজা সর্বাধিক গুরুত্ব পায়। মহা শিবরাত্রির সঙ্গে একটি বহুল প্রচলিত ব্রতকথা জড়িয়ে আছে। শিবপুরাণে বর্ণিত কাহিনি অনুযায়ী, এক দরিদ্র ব্যাধ অজান্তেই শিবরাত্রির দিন উপবাস ও জাগরণ পালন করেন। সারারাত বেলগাছের উপর বসে শিকারের অপেক্ষায় থাকাকালীন তাঁর হাত থেকে বেলপাতা ও জল শিবলিঙ্গের উপর পড়তে থাকে। এই অনিচ্ছাকৃত পূজার ফলেই তাঁর সমস্ত পাপ ক্ষয় হয় এবং মৃত্যুর পর তিনি শিবলোকে গমন করেন। এই কাহিনি শিবভক্তির মূল দর্শনকে তুলে ধরে, শিব বাহ্যিক আচার নয়, অন্তরের নিষ্কলুষ ভক্তিতেই প্রসন্ন হন।


এই বিশেষ দিনের একটি প্রধান অঙ্গ হলো ব্রত ও উপবাস। ভক্তরা এই দিন নির্জলা উপবাস, জলাহার বা ফলাহার পালন করেন। ব্রতের উদ্দেশ্য শরীরকে কষ্ট দেওয়া নয়, বরং ইন্দ্রিয় সংযমের মাধ্যমে মনকে শুদ্ধ করা। এই দিনে আমিষ, পেঁয়াজ, রসুন ও মাদক দ্রব্য পরিহার করা হয়। পাশাপাশি মিথ্যা কথা, ক্রোধ, হিংসা ও নিন্দা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে। ব্রত মানে শুধুমাত্র খাদ্য নিয়ন্ত্রণ নয়, চিন্তা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণও। মহা শিবরাত্রির পূজা সাধারণত ভোরে স্নান করে শুদ্ধ বস্ত্র পরিধানের মাধ্যমে শুরু হয়। শিবলিঙ্গ পরিষ্কার করে তাতে জল নিবেদন করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে দুধ, দই, ঘি, মধু ও চিনি দিয়ে অভিষেক করা হয়, যা পঞ্চামৃত নামে পরিচিত। প্রতিটি উপাদানের আলাদা আলাদা তাৎপর্য রয়েছে জল মনশুদ্ধির প্রতীক, দুধ পবিত্রতার, দই স্থিতির, ঘি শক্তির এবং মধু মাধুর্যের প্রতীক। শাস্ত্রমতে, মহা শিবরাত্রির পূজা চার প্রহরে সম্পন্ন করা শ্রেয়। প্রথম প্রহরে জল ও দুধ দিয়ে অভিষেক, দ্বিতীয় প্রহরে দই ও ঘি, তৃতীয় প্রহরে মধু এবং চতুর্থ প্রহরে শুদ্ধ জল ও বেলপাতা নিবেদন করা হয়। প্রতিটি প্রহরে “ওঁ নমঃ শিবায়” মন্ত্র জপ করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে মনে করা হয়। এই চার প্রহরের পূজা মানুষের চারটি স্তর শরীর, মন, বুদ্ধি ও আত্মাকে শুদ্ধ করার প্রতীক। মহা শিবরাত্রিতে সারারাত জাগরণ করার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। শিব নিজে যোগী, যিনি চিরজাগ্রত চেতনার প্রতীক। তাই এই রাত্রিতে ঘুম ত্যাগ করে ভজন, কীর্তন, শিবপুরাণ পাঠ ও ধ্যানের মাধ্যমে সময় কাটানো হয়। জাগরণ মানে কেবল চোখ খোলা রাখা নয়, বরং অজ্ঞানতা ও আলস্য থেকে মুক্ত থাকা। এই সাধনাই শিবরাত্রির মূল আত্মা।



শিব পূজায় নির্দিষ্ট কিছু ফুল ও পাতা বিশেষভাবে প্রিয়। বেলপাতা শিবের সর্বাধিক প্রিয় অর্পণ। ত্রিদল বেলপাতা সত্ত্ব, রজ ও তম এই তিন গুণের প্রতীক। ধুতুরা ফুল ও ফল শিবের বৈরাগ্য ও ত্যাগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আকন্দ ফুল এবং সাদা পদ্মও শিব পূজায় প্রচলিত। শাস্ত্র মতে, কেতকী ফুল শিব পূজায় নিষিদ্ধ। প্রসাদ হিসেবে শিবকে সাধারণত সাত্ত্বিক দ্রব্য নিবেদন করা হয়। ফল, দুধ, দুধজাত খাদ্য, খই, মধু ও চিনি শিবের প্রিয় ভোগ। ভোগ নিবেদনের পর তা প্রসাদ হিসেবে গ্রহণ করলে মানসিক ও শারীরিক শুদ্ধি লাভ হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। শিব তামসিক নন, তাই পূজায় সম্পূর্ণ সাত্ত্বিকতা বজায় রাখা জরুরি। মহা শিবরাত্রিতে কিছু বিশেষ নিয়ম ও নিষেধ মানা হয়। শিবলিঙ্গে তুলসী পাতা দেওয়া হয় না। এই দিনে তামসিক চিন্তা, অশুদ্ধ আচরণ ও অসংযম বর্জনীয়। রাত্রে অকারণে ঘুমানো এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। শুদ্ধতা, মৌনতা ও ধ্যানের মাধ্যমে এই রাত্রিকে সাধনার রূপ দেওয়াই শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করা হয়। নারী সমাজে মহা শিবরাত্রির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অবিবাহিত নারীরা যোগ্য বর লাভের আশায় এবং বিবাহিত নারীরা দাম্পত্য সুখ ও স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনায় এই ব্রত পালন করেন। দেবী পার্বতীর কঠোর তপস্যার আদর্শ অনুসরণ করেই এই প্রথার প্রচলন হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়।



দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে মহা শিবরাত্রি অহংকার ও অজ্ঞানের বিনাশের প্রতীক। শিব ধ্বংসের দেবতা হলেও তাঁর ধ্বংস আসলে অকল্যাণের ধ্বংস। শিবলিঙ্গ নিরাকার ব্রহ্মের প্রতীক যেখানে রূপ নেই, সীমা নেই, শুরু ও শেষ নেই। এই দিনে ধ্যান ও আত্মসমীক্ষার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরের শিবত্ব উপলব্ধি করার সুযোগ পায়। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে মহা শিবরাত্রি আমাদের স্থিরতা ও সংযমের পাঠ শেখায়। এক রাতের উপবাস ও জাগরণ হয়তো বাহ্যিকভাবে ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত শিক্ষা গভীর। নিজের ভেতরের অস্থিরতা, লোভ ও অহংকারকে দমন করাই এই ব্রতের মূল উদ্দেশ্য। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি আত্মিক উত্তরণের এক গভীর উপলক্ষ। ভক্তি, ত্যাগ, সংযম ও চেতনার মিলনে এই রাত্রি মানুষকে নিজের ভেতরের অন্ধকার অতিক্রম করে আলোর পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে। শিবের আরাধনা মানে ভয় নয়, ধ্বংস নয় বরং কল্যাণ ও চিরশান্তির উপলব্ধি। এই কারণেই মহা শিবরাত্রি যুগ যুগ ধরে ভারতীয় আধ্যাত্মিক জীবনে এক অনন্য স্থান অধিকার করে আছে।

সোনার সন্ধানী পিঁপড়ের খোঁজে


সর্বাণী মুখোপাধ্যায়


অতি প্রাচীন কাল থেকেই আমাদের দেশ ভারতবর্ষ সারা বিশ্বে সোনার দেশ নামে বিখ্যাত ছিল৷ এ দেশের সম্পদের লোভে কত না বিদেশি আক্রমণকারী এ দেশে হানা দিয়েছে৷ কিন্তু সেই সোনাদানার সঙ্গে যখন জড়িয়ে যায় পিঁপড়ের নাম তখন তো একটু আশ্চর্য হতে হয় বইকি৷ কোথায় সোনাদানা আর কোথায় পিঁপড়ে৷ তাহলে একটু ব্যাখ্যা করেই বলতে হয়৷


প্রথমেই বলেছিলাম ভারতবর্ষের সম্পদের আকর্ষণে বারবার বিদেশি শক্তি আঘাত হেনেছে এই দেশে৷ শুরুটা করা যাক প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন দিয়ে৷ ভারতীয় অর্থনীতিবিদ উষা পট্টনায়ক তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে ১৭৬৫–১৯৩২ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৩ হাজার ৭৮ লক্ষ কোটি টাকা ভারত থেকে ব্রিটেনে ইংরেজরা নিয়ে গিয়েছিল সুচতুর বাণিজ্য পদ্ধতির মাধ্যমে৷ অর্থাৎ ভারত থেকে রাজস্ব আদায় করে সেই রাজস্বের অর্থই ব্যবহার করা হয়েছিল ভারতীয়দের থেকে পণ্য কেনবার জন্য৷


এত হলো পরোক্ষ লুঠ আর প্রত্যক্ষভাবে যে কত মূল্যবান মনিমুক্তো রত্ন সরাসরি লুঠ করে ব্রিটেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তার একটা সামান্য পরিসংখ্যান সম্প্রতি উঠে এসেছে রাজা তৃতীয় চার্লসের রাজ্যাভিষেকের সময়৷ এই সময় “কস্ট অফ ক্রাউন’’ নামে একটি সিরিজ প্রকাশ করে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা “গার্ডিয়ান’’৷ সেই প্রতিবেদনে ভারতের মহাফেজখানায় ৪১ পাতার একটি ফাইলের তথ্য প্রকাশ্যে আনা হয়, সেখানে রানি মেরি থেকে দ্বিতীয় এলিজাবেথ পর্যন্ত ভারত থেকে সম্পদের লুঠের বিবরণ রয়েছে, যার শীর্ষে রয়েছে বিখ্যাত কোহিনুর হিরে৷ এছাড়া পান্না বসানো একটি বেল্ট, ছোট বড় ২২৪টি রত্ন বসানো বহু মূল্যবান কণ্ঠহার, যা রাজার মুকুটে বসানো৷ তার সঙ্গে রয়েছে চারটে চুনির কাজ করা হার, যার মধ্যে একটি চুনি ৩২৫ ক্যারাটের, যার পোষাকি নাম “তৈমুর চুনি’’৷ এগুলো তো কিছু নমুনা মাত্র, আরও কত যে এমনই মূল্যবান ধন বিলেতে সে সময় পাড়ি দিয়েছিল তার খবর কে রাখে৷ সময়ের কাঁটা ঘুরিয়ে বরং পিছিয়ে যাওয়া যাক আরও অতীতের দিকে৷ ইতিহাসের পাতা উল্টোলেই যখন দেখা মেলে একের পর এক বিদেশি আক্রমণে বিধ্বস্ত ভারতের চিত্র৷




১০০৯ সালে সুলতান মাহমুদ যখন ভারতে অনুপ্রবেশ করে কাংড়া পাহাড়ের নগরকোট দুর্গ আক্রমণ করে অধিকার করেন, তখন সেখানকার মন্দিরের ভূগর্ভস্থ সিন্দুকঘরে রক্ষিত ধনরত্ন মাহমুদের হস্তগত হয়৷ ঐতিহাসিক ফিরিস্তার মতে সাত লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা, সাতশো মণ সোনা–রুপোর তৈজসপত্র, দু-শো মণ খাঁটি সোনা, দু হাজার মণ অপরিশোধিত রূপো ও কুড়ি মণ বিভিন্ন ধরনের মনিমুক্তা মাহমুদ দখল করেন৷ ভারতের অপরিমেয় সম্পদের লোভ গ্রাস করেছিল সমরখন্দের শাসক তৈমুর লঙ্গকেও৷ তুজুক-ই তৈমুরি থেকে জানা যায় যে ভারত আক্রমণের প্রাক্কালে গুপ্তচররা তৈমুরকে জানায় যে ভারত সোনা–রুপোয় পরিপূর্ণ৷ ভারতে ১৭টি সোনা–রুপোর খনি আছে৷ এছাড়া মূল্যবান পাথর আর লোহার খনিও আছে৷ এর ফলে তৈমুর আশা করেন যে ভারত থেকে অন্তত ৬০০ কোটি টাকার সম্পদ হস্তগত করতে পারবেন৷ পরবর্তীকালে ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধ জয় করে বাবর ভারতে প্রতিষ্ঠা করলেন মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি৷ কিন্তু তিনি ভারতবর্ষকে মোটেই পছন্দ করতে পারেননি৷ তাঁর লেখা আত্মজীবনী বাবরনামা তে তিনি নানা অভিযোগে বিদ্ধ করেছেন এই দেশকে, কিন্তু তাকেও স্বীকার করতে হয়েছিল — “এটি একটি বিশাল দেশ, এখানে প্রচুর পরিমাণে সোনা ও রুপো রয়েছে৷’’


এতক্ষণ তো ভারতের সম্পদের প্রাচুর্যের কথা বলছিলাম৷ আশ্চর্যজনকভাবে এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বর্ণসন্ধানী পিঁপড়েদের কথা৷ এই পিঁপড়েদের চমৎকার এক ইতিহাস রয়েছে৷ এর উৎস কি ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারত? কেননা যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে উপহার হিসাবে বিপুল পরিমাণ পিপীলিকাস্বর্ণের উল্লেখ আমরা পাচ্ছি৷ মহাভারতে সভা পর্বে দেখা যাচ্ছে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের পর বিমর্ষ কুরু যুবরাজ দুর্যোধন তার পিতা রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে বলছেন, তিনি পান্ডবদের ধ্বংস চান, কারণ পান্ডবদের অপরিমিত সম্পদ দেখে তিনি আশ্চর্য হয়ে গেছেন৷ যজ্ঞে যে রাজারা নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন, তারা যে উপহার এনে ছিলেন, তা যুধিষ্ঠিরের প্রতিনিধি হয়ে তিনিই গ্রহণ করেছিলেন এবং সেই উপহারের পরিমাণ এত বিপুল যে তা গ্রহণ করতে করতে তাঁর হাত ব্যথা হয়ে গেছে৷ রাজাদের প্রদত্ত উপহার প্রসঙ্গে দুর্যোধন বলেন যে, মেরু ও মন্দার পর্বতের মধ্যবর্তী শৈলদা নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী খস, প্রদারা, কুনিন্দ, পাশুপত উপজাতির অন্তর্গত দলপতিরা, যারা বাঁশ ও বেত গাছের ছায়া উপভোগ করেন, তারা পিপীলিকা নামে বিপুল পরিমাণ সোনা উপহার এনেছিল, এই সোনা পিঁপড়েদের দিয়ে খনন করা সোনা৷


বিশ্ববিখ্যাত গ্রিকবীর আলেকজান্ডার পারস্য সাম্রাজ্য জয় করে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে বিভিন্ন উপজাতীয় শাসকদের এলাকা দখল করেন৷ কিন্তু ঝিলাম আর চেনাব নদীর মধ্যবর্তী এলাকার রাজা পুরুকে ঝিলামের যুদ্ধে পরাস্ত করেও ভারতের ভিতরে আর প্রবেশ না করে দেশে ফেরার পথ ধরেছিলেন৷ অবশ্য দেশে ফেরা আর তাঁর হয়নি৷ পথেই তাঁর মৃত্যু হয়৷ তাঁর জয় করা সব এলাকা গ্রিক সেনাপতিরা নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়৷ বিখ্যাত মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তখন মগধের সম্রাট৷ তিনি আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলুকাসকে যুদ্ধে হারিয়ে দিয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারত দখল করে নেন৷ এই সেলুকাসের দূত হয়ে চন্দ্রগুপ্তের রাজধানী পাটলিপুত্রে এসেছিলেন মেগাস্থিনিস৷ তিনি এদেশে অনেকদিন বাস করে ইন্ডিকা নামে একটি বই লিখেছিলেন৷ তাঁর মূল বইটি না পাওয়া গেলেও পরবর্তী কালের অনেক লেখক তাঁদের বইতে মেগাস্থিনিসের লেখা থেকে অনেক অংশ তুলে দিয়েছেন৷ তেমনই একজন হলেন অ্যারিয়ান৷ তিনি বলেছেন মেগাস্থিনিস নাকি বলেছেন যে, ভারতবর্ষে এমন পিঁপড়ে রয়েছে যারা মাটি খুঁড়ে সোনা বের করে৷ অবশ্য এরা যে সোনা খোঁজার জন্যই মাটি খুঁড়ে তা কিন্তু নয়, আসলে মাটির তলায় লুকিয়ে থাকার জন্যই ওরা মাটি খুঁড়ে৷ কিন্তু এই পিঁপড়েগুলোর আকার শেয়ালের চেয়েও বড়৷ তাই তারা গর্তগুলোও খুব বড় করে খুঁড়ে৷ আর তখন সেই মাটির সঙ্গে তলায় থাকা সোনা উঠে আসে, আর স্থানীয় লোকজন সেই সোনা মেশানো মাটি থেকে সোনা সংগ্রহ করে৷



এমন কিন্তু নয় যে, মেগাস্থিনিসই প্রথম এমন ধরনের পিঁপড়েদের কথা বলেছিলেন৷ তারও অনেক আগে “ইতিহাসের জনক’’ নামে পরিচিত গ্রীসের হেরোডোটাস খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সময়কালে তাঁর লেখা দ্য হিস্টোরিজ বইতে এমন বিশাল আকৃতির পিঁপড়েদের কথা বলেছিলেন, আর তাঁদের চেহারার বর্ণনাও দিয়েছিলেন৷ কী বলেছিলেন হেরোডোটাস? তাঁর কথায়, এই শেয়ালের আকারের পিঁপড়েগুলো পারসিক সাম্রাজ্যের অন্তর্গত সুদূর পূর্বে ভারতীয় রাজ্যে বাস করে৷ এই এলাকা বালিতে ভরা, মরুভূমি অঞ্চল৷ এই অঞ্চলকে তিনি দর্দে বলেছেন, যাকে সংস্কৃত ভাষায় দর্দদেশ বলা হয় অর্থাৎ দরদদের দেশ৷ অনেকেই এই অঞ্চলকে বর্তমান আফগানিস্তানের পাকতিয়া এলাকার সঙ্গে সনাক্ত করার পক্ষপাতী৷ যাই হোক এই বালির মধ্যে সোনার গুঁড়ো মিশে থাকে৷ হেরোডোটাসও বলেছেন এই বিশাল আকারের পিঁপড়েরা সুড়ঙ্গ বা ঢিবি তৈরির জন্য যখন খুঁড়তে থাকে তখন স্থানীয় লোকেরা সেখানে হাজির হয়ে সেই মূল্যবান বালি মেশানো গুঁড়ো নিতে থাকে৷


কিভাবে এই সোনা সংগ্রহ করা হয় বিভিন্ন তথ্যসূত্রে তার বিবরণও পাওয়া যায়৷ ভারতীয়রা যখন এই বালি সংগ্রহের জন্য মরুভূমিতে যায়, তখন প্রত্যেকের সঙ্গে তিনটি করে উট দেওয়া হয়৷ দু’পাশে থাকে দুটি পুরুষ উট এবং যেটিতে সে চড়ে সেটি হয় মহিলা উট৷ এবং সেই মহিলা উটটিও এমন নেওয়া হয় যে সদ্য সন্তানের জন্ম দিয়েছে৷ এইভাবে সজ্জিত হয়ে সবাই রওনা দেয় এমন একটা সময়ে যখন প্রচণ্ড গরম থাকে, কারণ এই তাপের জন্য পিঁপড়েরা বাইরে থাকে না৷ ভারতীয়রা তাঁদের বাসার সামনে আসে, এবং দ্রুত ব্যাগের মধ্যে সোনা মেশানো বালি ভরতে থাকে এবং খুব তাড়াতাড়ি সেই স্থান ত্যাগ করার চেষ্টা করে কারণ কোনোভাবে পিঁপড়েরা তাঁদের গায়ের গন্ধ পেয়ে গেলে তাঁদের দ্রুত গতিতে তাড়া করে৷ তখন তাঁদের প্রাণ নিয়ে বেঁচে ফেরা কঠিন হয়ে যায়৷ এখানেই মহিলা উটের প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়৷ কারণ পুরুষ উটগুলি একটু ধীরে দৌড়ায়, কিন্তু মহিলা উটগুলি তাঁদের ফেলে আসা সন্তানের কথা ভেবে খুব দ্রুত গতিতে ছুটে চলে, এবং সোনা হরণকারীর প্রাণও বেঁচে যায়৷


হেরোডোটাসের এই গল্প প্রাচীন পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে আর পরে প্লিনির মতো বিখ্যাত লেখক তাঁর ন্যাচারাল হিস্ট্রি বইয়ের গোল্ড মাইনিং অংশে এই ব্যাপারটির উল্লেখ করার পর আরও তা জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়৷ পরবর্তীকালে বিভিন্ন তথ্য থেকে এটা পরিষ্কার যে, এই সোনা খননকারী পিঁপড়েদের চেহারা ছিল বিশাল, কিন্তু কুকুরের চেয়ে বড় নয়৷ পশমে ঢাকা, সম্ভবত শিং ছিল, অত্যন্ত হিংস্র এবং এরা বাসা তৈরির জন্যই মাটি খুঁড়ত, আর তখনই মাটিতে মিশে থাকা সোনাধুলোও মিলে যেত৷ খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে নিয়ারকাস আবার বলেছেন যে, তিনি সোনা খননকারী পিঁপড়েদের চামড়া দেখেছেন, যা চিতাবাঘের মতই বড়৷ অনেকেই মনে করেন হেরোডোটাস পিঁপড়েদের কাহিনীকে অতিরঞ্জিত করেছেন৷ অনেকে তাই তাঁকে মিথ্যাবাদী এক অভিনব গল্পকার বলতেও ছাড়েননি৷ তাহলে কি সত্যিই হেরোডোটাসের বলা পিঁপড়েদের কাহিনী সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন?


এ. এইচ. ফ্রাঙ্ক তাঁর এ হিস্ট্রি অফ ওয়েস্টার্ন টিবেট — ওয়ান অফ দ্য আননোন এম্পায়ার গ্রন্থে এই কিংবদন্তি সম্পর্কে আলোচনা করে বলেছেন যে তিনি পশ্চিম তিব্বতে এসে এই সোনা খননকারী পিঁপড়েদের সম্পর্কে শুনেছিলেন৷ এই অঞ্চল একসময় দর্দদের দ্বারা অধ্যুষিত ছিল৷ তিনি এখানে পিঁপড়ে দেখলেও সেগুলির আকার সাধারণ পিঁপড়ের মতই ছিল৷ সেগুলি মোটেই হেরোডোটাসের বর্ণনা করা দৈত্যাকার পিঁপড়ে ছিল না৷ তবে এখানে স্থানীয় লোকজন তাঁকে এমন পিঁপড়েও দেখিয়েছিল, যা সেখানকার লোকদের বিশ্বাস অনুযায়ী সোনা খননকারী পিঁপড়ে৷ যদিও সেগুলির আকার ছিল খুবই ছোট৷ ফ্রাঙ্ক অনুমান করেছেন খুব সম্ভবত এই পিঁপড়েরা এখানকার কোনো স্বর্ণধাতু সমৃদ্ধ এলাকায় বাসা তৈরি করতে গিয়ে মাটির সঙ্গে সোনাও খুঁড়ে তুলে ফেলত এবং স্থানীয় মানুষরা তা জানত বলে সেই মাটি মেশানো গুঁড়ো সংগ্রহ করত৷ আর ভারতবর্ষ থেকে এই পিঁপড়েদের গল্প ক্রমশ ছড়াতে ছড়াতে পশ্চিমি দুনিয়ায় গিয়ে পিঁপড়েদের আকারকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল৷



প্রখ্যাত ফরাসি জাতিতত্ত্ববিদ মিশেল পেইসেল বলেছেন যে সম্ভবত বর্তমান পাকিস্তানের গিলগিট–বালুচিস্তানে হেরোডোটাসের বর্ণনা করা পিঁপড়ে বাস করত৷ এই অঞ্চল সোনার জন্য বিখ্যাত ছিল৷ পেইসেল এখানকার মিনারো, মারুত ও সোনিভাল উপজাতির সঙ্গে কথা বলেছেন৷ আর তারা জানিয়েছে যে, যখন মারমটরা বাসা তৈরির জন্য মাটি খুঁড়তে থাকে তখন তারা পুরুষানুক্রমে এখান থেকে সোনার গুঁড়ো সংগ্রহ করে৷


এত ভারি অদ্ভুত হলো৷ হচ্ছিল তো পিঁপড়ের কথা, এখানে আবার মারমট এল কোথা থেকে? পেইসেল তাঁর দ্য অ্যান্টস, গোল্ড : দ্য ডিসকভারি অফ দ্য গ্রিক এলডোরাডো ইন দ্য হিমালয়া বইতে বলেছেন যে এক ধরনের পাহাড়ি ইঁদুর বা কাঠবেড়ালি জাতীয় প্রাণী হলো এই মারমট৷ এরা লং-টেইলড গোল্ডেন মারমট এবং হিমালয়ান মারমট নামে বিখ্যাত৷ মধ্য এশিয়া, পামির, তিয়েন-শান, হিন্দুকুশ এবং হিমালয় অঞ্চলে এদের দেখা পাওয়া যায়৷


পেইসেল মনে করেন হেরোডোটাস প্রাচীন পারসিক শব্দ সম্পর্কে মোটেই সড়গড় ছিলেন না৷ তাই তিনি পিঁপড়ে আর কাঠবেড়ালির পারসিক উচ্চারণগত মিল থাকায় দুটি শব্দের মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিলেন৷ তাছাড়া হিমালয় অঞ্চলের এই মারমট জাতীয় প্রাণীরা অস্বাভাবিক বড়, পশমের আধিক্য রয়েছে চেহারায়, তাঁদের শেয়ালের মত লেজ থাকে, ধারালো দাঁত আর নখও আছে৷ তারা যদি মনে করে কেউ তাঁদের সন্তানকে চুরি বা বাসা ভাঙার চেষ্টা করছে, তখন তারা ভয়ানক হিংস্র হয়ে ওঠে৷ যখন হেরোডোটাস পারস্যে ভ্রমণ করেছিলেন, তখন তাঁকে স্থানীয় অনুবাদকদের উপরই নির্ভর করতে হয়েছিল, কারণ তিনি নিজে পারসিক ভাষা জানতেন না৷ তাছাড়া তিনি এমনও দাবি করেননি যে তিনি নিজে এমন সোনা খোঁড়া পিঁপড়ে দেখেছেন৷ তিনি বলেছিলেন যে অন্যান্য ভ্রমণকারী যা বলেছেন, তিনি সেটাই বর্ণনা করেছেন মাত্র৷


পেইসেল বলেছেন এই মারমট জাতীয় প্রাণীরা নিরীহ বলেই পরিচিত, খুব সম্ভবত তাঁদের হিংস্রতার গল্পটি কৌশলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাতে অন্য কেউ এখানে এসে সোনা সংগ্রহ করে তাঁদের অধিকারে ভাগ না বসায়৷ পেইসেল এবং ফ্রাঙ্কের কথা যথেষ্ট যুক্তিগ্রাহ্য বটে, তবে আবার অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীরা বলেছেন, যে অঞ্চলের কথা গ্রিক ইতিহাসবিদ বলেছেন, সেখানে আসলে উইপোকারা মাটি খুঁড়ে বিশাল বিশাল ঢিবি তৈরি করে, আর তার মধ্যেই মাটি থেকে সোনা উঠে আসে৷ অর্থাৎ সত্যিটা যে কী সেটা কেউই পরিষ্কার করে বলতে পারছেন না সোনা খুঁড়তে থাকা পিঁপড়েদের কাহিনী শুধুই গল্পকথা, না তাতে সত্য কিছু আছে? যদিও অনেকেই ফ্রাঙ্ক ও পেইসেলের কথার গুরুত্ব আছে বলে মনে করেন৷


এই কথা নিয়ে মাথা ঘামানোর সঙ্গে সঙ্গেই ভারি মজার একটা ঘটনার কথা বলি৷ কিছুদিন আগের ঘটনা৷ বিহার রাজ্যের জামুই জেলার করমটিয়া এলাকায় সন্ধান পাওয়া গেছে ভারতের এক বড় সোনার ভান্ডারের৷ সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, গাছগাছালি আর লাল মাটির নিচে যে এত বড় সোনার ভান্ডার লুকিয়ে আছে তা কেউ ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি৷ নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে মনে করা হচ্ছে এখানে ২২৩ টন সোনা রয়েছে মাটির তলায়৷


না, কোনো বিজ্ঞানী বা অন্য কোনো যন্ত্রের সাহায্যে এই বিপুল সোনার সন্ধান পাওয়া যায়নি৷ এই সোনার খোঁজ দিয়েছে পিঁপড়েরা৷ অবিশ্বাস্য হলেও এমনই দাবি করেছে ঐ এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা৷ তারা বলেছেন, ঐ এলাকায় চার দশক ধরে একটা বিরাট বটগাছ আছে৷ রোদের তেজ আর গরমের হাত থেকে বাঁচতে পিঁপড়েরা ঐ বটগাছের নিচে বাসা বানাতে শুরু করেছিল৷ তুলে আনছিল অনেক মাটি৷ তখনই সেই মাটির মধ্যে চকচকে হলুদ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা মিশে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন৷ তারপরই হু হু করে খবর ছড়িয়ে যায় যে, এখানে সোনা পাওয়া গেছে৷


সুতরাং বিশাল সোনার ভান্ডারের সন্ধান দেবার জন্য পিঁপড়েদের তো অবশ্যই ধন্যবাদ প্রাপ্য, তাই না? সুতরাং হেরোডোটাস বা মেগাস্থিনিস যা বলেছিলেন মানে পিঁপড়েদের নিয়ে যে দাবি করেছিলেন তা কতটা সত্যি এখনও তার প্রমান সেভাবে করা না গেলেও আজকের দিনে পিঁপড়েরা যে পরোক্ষ ভাবে হলেও বেশ ভালো কাজ করে ফেলেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই৷ অবশ্য এই বিষয় নিয়ে এখনও নানা তর্ক বিতর্ক চলছে৷ শেষ কথা বলার সময় এখনও আসেনি৷

বিদেশে বেড়াতে যাবেন? কোন সতর্কতা জরুরি?


বিদেশ ভ্রমণ আজ আর বিলাসিতা নয়, অনেকের কাছেই তা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি, অচেনা খাবার ও পরিবেশ সব মিলিয়ে ভ্রমণ মানেই এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। কিন্তু সেই আনন্দ যেন কোনো অনভিপ্রেত সমস্যায় ম্লান না হয়ে যায়, তার জন্য প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি ও সচেতনতা। বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার আগে এবং ভ্রমণের সময় কিছু জরুরি সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সঠিক পরিকল্পনা। পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ছয় মাসের বেশি আছে কি না, তা আগে যাচাই করে নিতে হবে। ভিসা সংক্রান্ত নিয়ম প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে আলাদা কোথাও অন-অ্যারাইভাল ভিসা, কোথাও ই-ভিসা, আবার কোথাও আগাম আবেদন জরুরি। বিমানের টিকিট, হোটেল বুকিং, ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স—সব কিছুর হার্ড কপি ও ডিজিটাল কপি আলাদা করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। অনেকেই ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্সকে অপ্রয়োজনীয় খরচ মনে করেন। কিন্তু বিদেশে হঠাৎ অসুস্থতা, দুর্ঘটনা, লাগেজ হারানো বা ফ্লাইট বাতিলের মতো পরিস্থিতিতে এই ইন্স্যুরেন্সই বড় রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। উন্নত দেশগুলিতে চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি হওয়ায় ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স ছাড়া ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ।


ভ্রমণের আগে গন্তব্য দেশের আবহাওয়া ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নির্দেশিকা জেনে নেওয়া জরুরি। কিছু দেশে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট টিকাকরণ বাধ্যতামূলক। নিয়মিত খাওয়ার ওষুধ থাকলে তা পর্যাপ্ত পরিমাণে সঙ্গে রাখতে হবে এবং ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন সঙ্গে রাখা ভালো। অপরিচিত খাবার খাওয়ার সময় সতর্ক থাকা, বোতলজাত জল ব্যবহার করা এবং রাস্তার খাবার এড়িয়ে চলাই নিরাপদ। বিদেশে যাওয়ার আগে স্থানীয় মুদ্রা সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। সব টাকা এক জায়গায় না রেখে কিছু ক্যাশ, কিছু কার্ড এইভাবে ভাগ করে রাখা নিরাপদ। ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড ব্যবহারের আগে ব্যাঙ্ককে জানিয়ে রাখা উচিত, যাতে কার্ড ব্লক হওয়ার সমস্যা না হয়। জনসমাগমপূর্ণ জায়গায় পকেটমারের ঝুঁকি বেশি থাকে, তাই মানিব্যাগ ও মোবাইল ব্যবহারে সতর্ক থাকা জরুরি।


প্রতিটি দেশের আইন ও সামাজিক রীতি আলাদা। যে আচরণ আমাদের দেশে স্বাভাবিক, তা অন্য দেশে অপরাধ হিসেবেও গণ্য হতে পারে। কোথাও প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ, কোথাও নির্দিষ্ট পোশাকবিধি মানতে হয়। তাই ভ্রমণের আগে সেই দেশের আইন, সংস্কৃতি ও সামাজিক নিয়ম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। অচেনা দেশে একা ঘোরার সময় অতিরিক্ত সতর্ক থাকা দরকার। রাতের বেলায় নির্জন এলাকায় যাওয়া এড়িয়ে চলা, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা না করা এবং নিজের অবস্থান সম্পর্কে পরিবারকে নিয়মিত জানানো উচিত। হোটেলের ঠিকানা, স্থানীয় জরুরি নম্বর ও ভারতীয় দূতাবাসের যোগাযোগ নম্বর ফোনে সংরক্ষণ করে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। আজকের দিনে স্মার্টফোন ভ্রমণের অন্যতম সহায়ক। গুগল ম্যাপ, অনুবাদ অ্যাপ, অনলাইন টিকিট সবই কাজে লাগে। তবে পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহার করার সময় ব্যক্তিগত তথ্য বা ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত লেনদেন না করাই নিরাপদ। ফোনে পাসওয়ার্ড ও লোকেশন ট্র্যাকিং চালু রাখা প্রয়োজন।


লাগেজে কী নেওয়া যাবে আর কী যাবে না?

এয়ারলাইনের নিয়ম আগে জেনে নেওয়া জরুরি। গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যেমন পাসপোর্ট, টাকা, ওষুধ সবসময় হ্যান্ড ব্যাগে রাখা উচিত। লাগেজে নাম ও যোগাযোগ নম্বর লেখা থাকলে হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া সহজ হয়! বিদেশ ভ্রমণ মানেই শুধু ঘোরা নয়, নিজেকে নতুনভাবে জানা, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া। তবে সেই অভিজ্ঞতা যেন নিরাপদ ও সুখকর হয়, তার জন্য সচেতনতা অপরিহার্য। সঠিক প্রস্তুতি, সতর্ক আচরণ ও দায়িত্বশীল মনোভাব থাকলে বিদেশ ভ্রমণ হয়ে উঠতে পারে জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।

কথাকলি

সুপ্তা আঢ্য


দীর্ঘ স্কুলজীবনের আজ ইতি কথাকলি ভট্টাচার্যের। সেই কবে বছর ছাব্বিশের এক তরুণী, কোনো এক সকালে তপোবনের মতো এই স্কুল চত্বরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার হাতে দুরুদুরু বুকে এসে দাঁড়ালে, সেদিন বড়দি প্রতিভা বসুর স্নেহে সব দ্বিধা কেটে গেছিল নিমেষেই। বড়দি হয়ে গেছিলেন অতি আপন জন।

বছর পনেরো আগে এরকমই একটা দিনে বড়দি নির্দ্বিধায় ওর হাতে ব্যাটনটা ধরিয়ে বলেছিলেন, বটবৃক্ষ না অশ্বত্থগাছ হয়ে ওঠো, শেষ বেলায় শিকড় উপড়ালে কোনো ঝুরি শিকড় তৈরী করতে না পারে।

শুরুর দিনের মতোই আজ কথাকলি নীরবে যেতে চাইলেও স্কুল হতে দিল না। সহকর্মীরা, স্কুল কমিটি বেশ ঘটা করেই বিদায় সম্বর্ধনার আয়োজন করেছেন। সকলের স্মৃতিচারণে পুরোনো পাতাগুলো ঝোড়ো হাওয়ায় বড়ো ওলটপালট হচ্ছে। চশমার আড়ালের চোখদুটো বারেবারেই ঝাপসা হয়ে আসছে।

শেষ দুপুরের নরম রোদের আভা পাতার ফাঁক দিয়ে পায়ে জড়িয়ে আজ পিছন পায়ে টানছে কথাকলিকে। শেষবেলার সময় ঘড়ির কাঁটা ধীরে সুস্থে পেরোচ্ছিল; কোথাও কোনও তাড়া নেই। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় স্কুল বাড়িটাকে একবার দেখে পায়ে পায়ে গেট পেরিয়ে এসে পিছনে তাকিয়ে হাত নেড়ে গাড়িতে উঠলেন মণিমালা উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য প্রাক্তন হেড মিস্ট্রেস কথাকলি ভট্টাচার্য। সামনের সিটে নতুন টিচার রহমান। বারণ করলেও শোনেনি ছেলেটা। এই কয়মাসে হাসিখুশি স্বভাব মিশুক ছেলেটার সকলের স্নেহ আদায় করতে বেশী সময় লাগেনি।

- কী ব্যাপার রহমান, এতো চুপচাপ?

- আপনাকে ভীষণ মিস করব দিদি।

- আমিও মিস করব। তোমরা কাজে থাকবে, আর আমি কর্মহীন; তোমাদের মনে করাই কাজ এখন থেকে।

- কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার স্কুলে আসুন না দিদি।

চেয়ারের সম্মানটাই শেষ কথা কর্মক্ষেত্রে। মিষ্টি হেসে বললেন, অনেকদিন চাকরী করলাম; এবার একটু নিজের মতো করে কাটাই বরং।



বড়দির কথার অন্যথা হবে না বুঝে সামনে তাকিয়ে রইল রহমান, আর কথাকলি সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। অপরাহ্নবেলার এই দিনটা আয়না ধরতেই উনিও ভাবনায় হারাতে সময় নিলেন না।

- এরপর কোন দিকে যেতে হবে দিদি? হঠাৎই রহমানের প্রশ্নে একটু ধাতস্থ হয়ে ঠিকানা বলে চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, বিদায় উপহারে ভরে গেছে গাড়ি। কোনদিনই কিছু নেওয়ার ইচ্ছে হয়নি কথাকলির, কিন্তু শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান মিলেমিশে এগুলো সেতুবিহীন এক সেতু।

বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াতেই রহমান দরজা খুলে নামতে সাহায্য করল। এখন বাড়িতে কেউ নেই। দাদা বৌদি ছেলের কাছে মুম্বইতে। গেটের তালা খুলে রহমানকে ডাকার জন্য তাকিয়ে দেখলেন, ও উপহারগুলো নামাতে ব্যস্ত। সব উপহার বসার ঘরে রেখে ওনাকে প্রণাম করে চলে যেতে উদ্যত হলে চায়ের কথা বলতেই ও হেসে বলল, আজ থাক দিদি। আপনি বিশ্রাম নিন।

রহমান বেরিয়ে যেতেই দরজায় দাঁড়িয়ে কথাকলি দেখলেন প্রায় ছ'ফুট হাইটের ছেলেটা লম্বা পা ফেলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটায় উঠে হাত নাড়তে নাড়তে চলে গেল।

এই মুহূর্তে বাড়িতে কথাকলি একা। বৌদি থাকলে বলার আগেই দু'কাপ চা নিয়ে গল্প জমাতো। এদিকে চায়ের তেষ্টাও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। সব আলসেমি ছেড়ে এক কাপ কড়া চা বানিয়ে সোফায় বসতেই ফোন জানান দিল।

ফোনটা রিসিভ করে বলল, এরকম ভাবে তাকিয়ে আছ কেন?

- তুই ঠিক আছিস তো?

- কথা, মনখারাপ করবে না। দেখবে সব সয়ে যাবে।

- হ্যাঁ পিপি, এতদিন তো স্কুল নিয়েই কাটালে। এবার নিজের মতো করে থাকবে। এটা নতুন জার্নি পিপি, এনজয় দ্য জার্নি।



- তোমার জন্য অনেক বই কিনেছি। বাই ট্রেন না প্লেন, কোনটা পছন্দ বলো সেটাই হবে।

- কিছু বল, চুপ করে আছিস কেন?

দাদার প্রশ্নে হাসতে হাসতে বলল, তোমাদের শেষ না হলে আমি শুরু করি কী করে! আমি ঠিক আছি দাদা। প্রথম প্রথম একটু তো মনখারাপ হবেই; এতদিনের অভ্যেস, তবে এটাও অভ্যেস হয়ে যাবে। তোমাদের কথামতো নতুন জার্নি। তবে এবার তিন বুড়োবুড়ি মিলে এনজয় করব। ট্রেনেই যাব রে। সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে যাব।

- ঠিক আছে পিপি, তাই হবে। কী গিফট পেলে? গিফটগুলো দেখেছ!

- একা একা গিফট দেখতে ইচ্ছে করে !

- নাও,আগে চা খাও; তারপর গিফট দেখি।

ওঃ বৌদি! তুমি পারোও বটে।

মোবাইলটা ফুলদানির গায়ে রেখে র‌্যাপ খুলতেই বেরোতে লাগল পেন, বই, ঘড়ি, শাল, শাড়ি।

ডোডো মৌ তো বলেই দিল, সত্যি পিপি,আমরাও বোধহয় এতটা ভালো বাসি না। অ্যাজ আ টিচার, এটাই গ্রেট অ্যাচিভমেণ্ট।

নারে, সবটুকু দায়িত্ববোধ, ডেডিকেশন দাদার কাছে শেখা। দাদাই আমার টিচার; সব কৃতিত্ব দাদারই।

বোনের কথায় হেসে কল্লোলবাবু বললেন, আমি শুধু পথ দেখিয়েছি, দীর্ঘ পথ হেঁটেছিস তুই একা।

দাদার কথায় চোখে জল এসে গেল কথাকলির। আরও কিছুক্ষণ কথার শেষে গিফটগুলো রেখে বই নিয়ে বসল ও।

রিটায়ারমেণ্টের কিছুদিন পর ব্যস্ত সময় পেরিয়ে এসে এক অখণ্ড অবকাশ। প্রথম প্রথম ব্যস্ততার সময়ে ঘড়ির কাঁটা পৌঁছলে মনটাও ছটফটিয়ে উঠত। এখন সেখানে পলি জমতে শুরু হয়েছে। মাঘের শেষের শীত বছরভোরের অপেক্ষা রেখে যাওয়ার আগে আরেকবার জাঁকিয়ে পড়েছে। সামনের দক্ষিণমুখো গোল বারান্দাটায় শেষবেলা অব্দি রোদ্দুরটা যাব যাব করেও থেকে যায়। শেষ দুপুরের সোহাগী রোদ্দুরে গায়ে শাল জড়িয়ে বারান্দার ইজিচেয়ারে শরীরটাকে হেলিয়ে বই হাতে বসেন কথাকলি। কুয়াশা মোড়া বিষণ্ণ বিকেলকে নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেন শরীর মনে।

প্রায় দিন দশেক পর মুম্বই যাওয়ার টিকিটটা ডোডো পাঠালেও অলসতা ভেঙে আর যেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু ওদের উৎসাহ দেখে এ কদিনে জাঁকিয়ে বসা আলসেমিকে সরিয়ে ব্যস্ত হতেই হল।



যদিও বেড়াতে যাওয়া খুব বেশী হয়ে ওঠেনি, তবুও রাতের জার্নিই পছন্দ করেন কথাকলি। অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে যাওয়া এক ঘুমন্ত পুরীতে অন্য অনুভূতি ; নিস্তব্ধ কামরায় নির্ঘুম চোখে ট্রেনের দুলুনিতে ঘুমের আবেশ। নামার তাড়া না থাকলে বেশ আয়েস করে আধোঘুমে অলসতায় অনেকখানি সময় আড়মোড়া ভেঙে নিজের মতো করে কাটানো যায়। আর এটাতো লম্বা জার্নি! কোনও ব্যস্ততা নেই, একটা অলস দিন শুয়ে বসে জানালা দিয়ে বাইরের কর্মব্যস্ত মানুষ, ছুটে চলা প্রকৃতি দেখতে দেখতে একটা বার্থে একদিনের খেলনাবাটির সংসারে বেশ ভালোই কাটে।

হাওড়া থেকে সন্ধ্যের ট্রেন, সেইমতো দুপুরের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে গাড়ির অপেক্ষা করতে লাগলেন। এখন আর নতুন করে দৌড়ঝাঁপ করতে ইচ্ছে করে না বলেই কাজের মাসী শোভা'র ভাই বরুণকে বলেছেন।

তাই ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টাখানেক আগেই স্টেশনে পৌঁছে গেছেন কথাকলি। শোভার ভাই বেশ যত্ন করেই নিয়ে এসেছে ; অল্প বয়স হলেও বেশ দায়িত্বশীল। স্টেশনে পৌঁছে ওকে ফিরে যাওয়ার কথা বলতেই বলল,ও নিয়ে আপনি ভাববেন না দিদি। আপনাকে ট্রেনে উঠিয়ে আমি ফিরব।

- তোমার দেরী হয়ে যাবে, আমি ঠিক উঠে পড়ব, তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না।

- আমাকে বাধা দেবেন না দিদি।

এরপর আর কিছুই বলার ছিল না। স্টেশনে ঢুকে একটা চেয়ারে কথাকলি বসলে ব্যাগপত্তরগুলো রেখে চা আনতে চলে গেল বছর ছাব্বিশের ছেলেটা। স্টেশনে বসে অপেক্ষা করতে বেশ লাগছিল। কত মানুষের কতরকমের ব্যস্ততা; কারো ট্রেন ধরার ব্যস্ততা,কেউ ব্যস্ত ট্রেন থেকে কাছের মানুষকে খুঁজে নিয়ে স্বস্তির হাসি হাসতে আবার কেউ গন্তব্যে পৌঁছতে ব্যস্ত। আর এখন পাখিদের নীড়ে ফেরার সময়; কয়েকদিন আগে পর্যন্ত স্কুল শেষে বাগান ঘেরা বাড়িটায় ফেরার ব্যস্ততায় ছটফট করত মনটা। দিন শেষে একান্ত নীড়ে ফিরতে চাওয়া মানুষগুলোকে দেখে অদ্ভুত তৃপ্তির স্বাদ পাচ্ছিলেন।


স্টেশনে বসে মানুষের আনাগোনা, কথাবার্তা শুনতে শুনতে সময়ের একঘেয়েমি বুঝতেই পারেননি কথাকলি। একুশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন অ্যানাউন্স হতে বরুণই লাগেজ নিয়ে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে বার্থ, সিট খুঁজে ট্রলিটা সিটের নীচে রেখে হাসিমুখে বলল, সাবধানে যাবেন দিদি। আমি এবার আসি।

কথাকলি জানেন কোনো কিছুর বিনিময়েই এই আন্তরিকতার ঋণ শোধ হওয়ার নয়। মিষ্টি হেসে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, সাবধানে যেও। ফিরে আসি, তারপর এসো একদিন।

বরুণ চলে গেলে নিজের সিটে বসে ট্রেন ছাড়ার আগে উদ্বিগ্ন মুখগুলোর দৌড়োদৌড়ি দেখতে দেখতে ভাবছিলেন, বরুণ না থাকলে বেশ মুশকিল হত।

সি অফ করতে আসা কাছের মানুষগুলোর উৎকন্ঠিত সাবধানবাণী বেশ লাগছিল কথাকলির। মায়ের সন্তানের জন্য, স্ত্রীর স্বামীর জন্য, বন্ধুর বন্ধুকে নিয়ে, প্রেমিকার প্রেমিককে নিয়ে চিন্তা… কতরকমের চিন্তা পরিজনদের। এদের শুভকামনাই ড্রাইভার সাহেবকে একরাশ আত্মবিশ্বাসে ভরিয়ে তোলে। নিজের বার্থে গুছিয়ে বসে এসব আকাশ পাতাল ভাবছিলেন কথাকলি। হঠাৎ শেষ মুহূর্তে একটি মেয়ে সামনের বার্থে নিজের সেটআপ ঠিক করে নিশ্চিন্তে বসতেই জানালার পাশের ভিড়ে একটা মুখ চমকে দিল কথাকলিকে। এক অজানা কৌতুহল ঘিরে ধরছিল। হঠাৎই দেখলেন, মেয়েটি জানালার সামনে হাত নাড়িয়ে বলল, ডোন্ট ওয়ারি, আমি পৌঁছে খবর দেব।

জানালার বাইরের উদ্বিগ্ন, মনখারাপের বাতাসকে সঙ্গী করা মানুষটা বললেন, সাবধানে যাবি। অচেনা এড়িয়ে চলবি।

গলাটা শুনে আরও একবার জানালার বাইরে তাকিয়ে চেহারাটা একঝলক দেখতেই ট্রেন গতি নিয়ে চলতে শুরু করল। মেয়েটা হাসিমুখে হাত নাড়ছিল শেষ ছায়াটুকু অব্দি। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই মেয়েটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসগুলো একপাশে সরিয়ে কানে ইয়ার বাডস্ নিয়ে আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এতক্ষণে মেয়েটাকে সোজাসুজি দেখার সুযোগ পেয়েছে কথাকলি। বড়জোর বছর পঁচিশ বয়স হবে, গায়ের রঙ চাপা হলেও মুখশ্রী ভারী মায়াবী। স্টেপ কাট চুল কাঁধ ছাড়িয়েছে। পরনে জিন্স টপ, পায়ে স্নিকার। মায়াবী মুখটার সাথে একটু আগে স্টেশনে দেখা মুখের অদ্ভুত মিল! ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেবেন না ভাবলেও ঝেড়ে ফেলতেও পারছিলেন না। মেয়েটার দিকে তাকালেই দীর্ঘসময় চাপা থাকা গল্পগুলো হেঁটে দৌড়ে চেতনে এসে জীবন পেতে চাইছে। একদিন যা ছিল জীবন, আজ সেটাই গল্প; কী অদ্ভুত জীবনবৃত্ত। মেয়েটা ততক্ষণে উঠে বসে ফোনে নিভৃতালাপ করছে বুঝতে পেরে আড়চোখে দেখে চোখ বন্ধ করতেই গল্পগুলো চোখের পাতায় ভিড় করে এল।


আজকের কথাকলি সেদিন ছিল অষ্টাদশী। সুন্দরী না হলেও শ্যামলা মেয়েটাকে সুশ্রী বলাই যেত। পুরো চেহারায় মন কেড়ে নিত ঝকঝকে সরল হাসিটা। ওর জগৎ বই ছিল বলেই কলেজে গিয়েও বন্ধুসঙ্গ তৈরি হয়নি, কিন্তু বসন্ত কখন কার হৃদয়ে সুর তোলে সেটা মদনদেবই জানেন। ছোট থেকেই হাই পাওয়ারের চশমা। ফার্স্ট বেঞ্চে রোজ বসলেও একদিন একটু দেরীতে কলেজ পৌঁছে দেখল শুধুমাত্র লাস্ট বেঞ্চের কোণের সিটটাই ফাঁকা। দূরের কিছু দেখতে ওর অসুবিধেই হয়, সেদিনও হচ্ছিল। বোর্ডে লেখাগুলো একটু ঝাপসা লাগছিল বলে বারবার চশমাটা ওড়না দিয়ে মুছছিল। পাশে বসা ছেলেটার দৃষ্টি এড়ায়নি ব্যাপারটা। ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোর কী বোর্ড ফলো করতে অসুবিধে হচ্ছে? সেক্ষেত্রে আমার খাতাটা দেখতে পারিস।

- থ্যাঙ্কস, ভীষণ উপকার করলেন আপনি। ওর মুখে আপনি শুনে একটু চমকেই গিয়েছিল ছেলেটা আর বাকিরা ঘাড় ঘুরিয়ে মুখ টিপে হাসছিল।

- আমরা একসাথে পড়ি ইয়ার, আপনি বলছিস কেন?

- সামনের বেঞ্চের মেয়েটা বলল, আপনি বুঝি মঙ্গল গ্রহ হইতে আসিয়াছেন!

বড্ড অস্বস্তি হচ্ছিল কথাকলির। পাশে বসা ছেলেটা ওদের থামিয়ে বলল, ঘুরে বস, স্যার দেখতে পাবেন।

- ওদের কথায় পাত্তা দিস না। তুই লেখ।

সেই বন্ধুত্বের শুরু চয়নের সাথে। এরপর সময়ের সাথে ওদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়েছে। চয়নের অনেক বন্ধু থাকলেও কথাকলির চয়ন ছাড়া কোনো বন্ধু ছিল না। চয়নের ওপর অনেকখানি নির্ভরতা কখনো বুঝতেই দেয়নি। চয়ন প্রায়ই কলেজ বাঙ্ক করে খেলতে চলে যেত আর কথাকলি ওকে ক্লাস নোটস দিয়ে ধন্য হত।

দিনগুলো প্রত্যেকটা দিনের মতোই কাটছিল; কোনো আলাদা রকমের সুবাস ছিল না তাতে। কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটির গিয়েও বন্ধুত্ব একরকম ভাবেই রয়ে গেছিল ওদের। চয়নের ওপর এক দুর্বোধ্য রকমের অধিকার জন্মালেও প্রকাশ করেনি কখনও। এত বছরের বন্ধুত্বের পরেও চয়ন কথাকলির মন বোঝেনি। কবে কোন মেয়েকে ভালো লেগেছে, কাকে ছাড়া জীবন অচল সব কথাকলিকে না বলা অব্দি শান্তি পেত না। ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ হত কথাকলির। চয়ন যে কখনোই ধরা দেবে না এটা বুঝতে পারলেও মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে পারত না মেয়েটা। আসলে চয়নের কাছে ও বন্ধু হলেও চয়নই যৌবনের প্রথম পুরুষ যার সংস্পর্শে ওর হৃদয় মুকুল পাপড়ি মেলেছে। এসব চয়নের অজানা হলেও এটাই দিনশেষের সত্য।

টেস্ট এক্সামের সপ্তাহখানেক আগে চয়ন বেশ কয়েকদিন ইউনিভার্সিটি না আসায় অবাকই হচ্ছিল কথাকলি, সাথে একটু চিন্তাও হচ্ছিল। চার পাঁচদিন পরেও যখন চয়ন এলো না, এক শনিবার ক্লাস শেষে সাহসে ভর করে চয়নের বাড়ি গেছিল ও। বেশ বড়ো বাড়ি চয়নদের; সামনে কেয়ারি করা ফুল বাগানের মাঝখান দিয়ে নুড়ি বিছানো পথ। দোতলা তিনতলার ছাদ বারান্দা সুন্দর করে সাজানো। নীচ থেকেই ফুলের সমারোহ বেশ বোঝা যাচ্ছিল। পায়ে পায়ে বাগান পেরিয়ে দরজার কাছে এসে দ্বিধাভরে বেলটা বাজাতে গিয়েও হাত সরিয়ে ফিরে আসছিল কথাকলি। বাগানের মাঝামাঝি আসতেই শুনতে পেল, কে তুমি? বাড়ীতে না এসেই ফিরে যাচ্ছ?

শান্ত, মুখচোরা কথাকলি দাঁড়িয়ে গেল স্থানুবৎ। পিছনে পায়ের আওয়াজে জড়োসড়ো হয়ে গেল অস্বস্তিতে।

- এই ভরদুপুর বেলায় ভেতরে না এসে ফিরে যাচ্ছ। কে তুমি?

স্নেহশীল কণ্ঠে অস্বস্তি খানিকটা কাটিয়ে বলল, আমি কথাকলি।

ও তাইতো! তুমি কথাকলি, চয়নের বন্ধু। ফিরে যাচ্ছিলে কেন?

- আসলে, চয়ন কিছুদিন ক্লাসে আসছে না তাই নোটস দিতে, মানে…

- ঠিক আছে, তুমি বন্ধুর বাড়ি এসেছ। এত কিছু বলার প্রয়োজনই নেই। ভেতরে এস।

বাড়ির ভেতরে আসতেই উনি বললেন, আমি কে বলতো!

চয়নের মা বলেই মনে হচ্ছিল কথাকলির। তবু ভয়ে ভয়েই বলল, আপনি কাকীমা…মানে…চয়নের মা!

- একেবারে ঠিক বলেছ। তুমি তো ইউনিভার্সিটি থেকে আসছ; রোদ্দুরে মুখটা শুকিয়ে গেছে। তিনতলায় চলে যাও, চয়ন ওখানেই আছে। আমি টিফিনের ব্যবস্থা করছি।

- কিছু খাব না কাকীমা, একটু জল খাব শুধু।

ওমা, তাইতো! দুপুর রোদে এসেছ, আমারই তো বলার কথা।

চয়নের মা জল আনতে গেলে একরাশ বিস্ময়ে বাড়িটা দেখতে লাগল ও।

কী অপূর্ব শৌখিনতায় সাজানো। জল খেতে খেতে শুনল চয়ন কদিন ধরেই জ্বরে ভুগছে। ওপরে গিয়ে দেখল, চয়ন আপাদমস্তক চাদর চাপা নিয়ে ঘুমোচ্ছে। একটু ইতস্তত বোধ করছিল ওকে জাগাতে; হয়ত চয়ন জেগেই ছিল বা আধোঘুমে, তাই ওর লঘু পায়ের আওয়াজে মুখ থেকে চাদর সরিয়ে চমকে জিজ্ঞেস করল, তুই! হঠাৎ!

- ক'দিন ধরে ইউনিভার্সিটি আসছিস না। কয়েকদিন পরেই তো টেস্ট, নোটসগুলো তো প্রয়োজন। তাই…

- ঠিক আছে রে বাবা, এত বলতে হবে না। বোস এখানে। মায়ের সাথে দেখা হয়েছে?

- হ্যাঁ,কাকীমা নীচেই ছিলেন।

চয়নকে নোটসগুলো বুঝিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ বসেই চলে এসেছিল কথাকলি। চয়ন যে এতটা বড়লোক ভাবতেই পারেনি ও। চয়ন যদিও ভীষণই মনখোলা তবু একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। তবে কাকীমা মানে চয়নের মাকে বেশ পছন্দ হয়েছিল; ভারী ভালো, যেমন রূপ তেমনই মিষ্টি ব্যবহার। চয়ন মায়ের মতোই দেখতে হয়েছে।

কথাকলির অস্বস্তি চয়নের সামনে ধোপে টেকেনি। চয়নের মা মাঝেমধ্যেই ডেকে পাঠাতেন আর চয়নও জোর করে নিয়ে যেত; কোনও ওজর আপত্তিই চলত না। তবে আস্তে আস্তে অনেকখানি সহজ হয়ে গিয়েছিল কথাকলি। ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিন চয়ন বলেছিল, মা তোকে আজ যেতে বলেছেন। যাবি তো?

- না রে,আজ না। কদিন পর যাব, কাকীমাকে বলিস।

- যো আপকি মর্জি! তো…না যাওয়ার কারণ কী বলব আপনার কাকীমাকে।

- রাগ করিস না, ভীষণ টায়ার্ড লাগছে।



চয়ন ঠোঁট উল্টে বলল, সে তুই ইচ্ছেমতো যাস। আমার কাজ খবরির, চলি রে। পরে দেখা হবে।

পরীক্ষার পর চয়নদের বাড়ি যাওয়ার কথা ভুলেই গেছিল ও। হঠাৎই একদিন দুপুরে পুরোনো পত্রিকায় উপন্যাসের নায়ক চয়ন মনে পড়িয়ে দিল, কাকীমা যেতে বললেও আর যাওয়া হয়ে উঠেনি আলসেমিতে। পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে, চয়নের সাথে দেখা হয় না বলে মনে পড়ানোরও কেউ নেই।

পরের দিন অবশ্যই যাব। গেলে চয়ন লেগপুলিং করবেই; ওসবে পাত্তা না দিয়ে কাল যাবোই।

পরের দিন দুপুর থাকতেই রোদ মাথায় বেরিয়ে পড়ল কথাকলি। চয়নদের বাড়ি যখন পৌঁছলো, তখনও শেষ দুপুরের গরম হাওয়ায় তেতে উঠছিল চোখ মুখ। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে বাগানে ঢুকতেই দেখল কেয়ারি করা গাছগুলোও রোদ্দুরের তেজে ঝিমিয়ে আছে। বাগান পেরিয়ে দরজা পর্যন্ত আসতেই হাঁফিয়ে উঠল কথাকলি। বেলটা না বাজিয়ে দরজায় কয়েকবার ধাক্কা দিয়ে পাশের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে হারানদা ওকে দেখেই বলল, ওমা দিদি! তুমি এই রোদ্দুরে! ভেতরে এস।

- ভালো আছ হারানদা?

- হ্যাঁ দিদি, ভালো আছি।

- একটু জল খাওয়াবে? কাকীমা কোথায়? কথাকলির গণ্ডির সীমানার কথা মাথায় রেখেই বলল, সবাই ওপরে আছে, তুমি যাও। আমি শরবত নিয়ে আসছি।

সিঁড়ি বেয়ে লঘু পায়ে তিনতলায় পৌঁছে বারান্দা পেরিয়ে চয়নের ঘরের কাছাকাছি পৌঁছতেই কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পেল ও। হাল্কা মনে আরও কিছুটা এগোতেই শুনতে পেল, তোর তো মাস্টার্স কমপ্লিট। চাকরী খোঁজার গরজ তো নেই

এবার বিয়ে করে আমায় শান্তি দে। কথাকলি জানে এটা চয়নদের পার্সোনাল ব্যাপার। ওর এসব শোনার অধিকার নেই,আর কথাকলি নিজেও কারোর ব্যাপারে থাকতে চায় না। তবে আজ পা দুটো এগোচ্ছিল না; এক অদম্য কৌতুহল চেপে ধরছিল।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল, বিয়ে করে বৌকে হাওয়া খাওয়াব?

- হাওয়া খাওয়াতে যাবি কেন? তুই তো অফিস জয়েন করবি? আর এসব কিছু তো তোরই। আমি তাহলে এগোই; কী বলো তোমরা?

- তুমি মেয়ে পছন্দ করে ফেলেছ মা!

- একরকম, সে মেয়েকে তোমাদেরও পছন্দ হবে।

- কে সে!

- কথাকলি, ভারী মিষ্টি মেয়ে। শান্ত, ভদ্র, ভালো বংশ আর কী চাই।

- জাস্ট অ্যা মিনিট! তুমি চয়নের বান্ধবীর কথা বলছ না তো!

- হ্যাঁ, ওর কথাই বলছি। তোমার পছন্দ না ওকে!

কাকীমার মুখে নিজের নাম শুনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা হচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। চয়নকে মনে মনে অনেকখানি ভালোবাসলেও মুখ ফুটে বলতে পারেনি কখনও। তাই চয়নের উত্তর শোনার অমোঘ আকর্ষণে স্থির দাঁড়িয়ে রইল ও।

- আমার কথা থাক। আগে চয়নের কথা শুনি। কী রে, তোর পছন্দ? কথা এগোব?

- না মা, কথাকে স্ত্রী হিসেবে আমার পছন্দ না।

- কেন চয়ন? অত ভালো একটা মেয়েকে কেন পছন্দ নয়? তাছাড়া, ও দেখতেও খারাপ নয়।

- বেশ তো, কথাকলির জন্য অন্য কোনো ভালো ছেলের সন্ধান করো। আমি হেল্প করব। কিন্তু,আমি নই।

- কারণ না বললে কথাকলির সাথেই বিয়ে হবে তোমার।

- তুমি কী একাই সিদ্ধান্ত নেবে? ছেলের অমতে কিছু করবে না তুমি।

ভীষণ অপমানিত লাগছিল নিজেকে। তবু শেষটা না শুনে যেতে পারছিল না কথাকলি।

মা, আমি জানি ওকে, কিন্তু আমার চাওয়ার সাথে মেলে না।

- তোমার কোন চাওয়ার সাথে মেলে না!

- থাক না মা, ও আমার খুব ভালো বন্ধু। ওর সম্বন্ধে এগুলো আমি বলতে চাই না।

- মা হয়ে বুঝতে পারছ না ছেলের কথা!

- না পারছি না। তুমি বুঝলে বলে দাও।

- মেয়েটার গায়ের রঙ দেখেছ! এমন দুধে আলতা ছেলের পাশে মানাবে? ওর গুণ আছে মানছি কিন্তু রূপটাও দরকার। নিজের দিকে তাকিয়ে তো বউ আনবে নাকি?

এই অপমানটাই যথেষ্ট ছিল ওর জন্য। তবু চয়নের উত্তরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল কথাকলি।

- কী রে, কিছু বলবি?

তুমি যখন শুনতেই চাইছ! কথাকলি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, ভীষণ ভালোবাসি আমি ওকে। কিন্তু ওকে বিয়ে করার কথা ভাবিনি কখনও। হয়তো কমপ্লেকশনটাই কারণ।



এরপর আর কিছু শোনার অবস্থায় ছিল না; পরাজিত সৈনিকের মতো ফিরে এসেছিল নিজের ঘরে। ফেরার সময় সিঁড়ির মুখে হারানদার হাতে শরবতে তেষ্টাটা আর বাড়েনি। শুকনো হেসে পাশ কাটিয়ে চলে এসেছিল। বাড়ি ফিরে আরও গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। নিজের রঙ রূপ নিয়ে যে ভাবেইনি কখনও, আজ হঠাৎই বড্ড কষ্ট হচ্ছিল সেই মেয়েটার। নিজেকে সামলাতে অনেক সময় লেগেছিল। ভেতরে ভেতরে পুড়ে এক অন্য মানবী হয়ে উঠেছিল ও। চয়ন আর আসেনি, হারানদার কাছে কথাকলির যাওয়া আর ফিরে আসার কথা জেনেই হয়তো বুঝেছিল সবটা।

- আণ্টি…

আলতো ছোঁয়া আর ডাকে চমকে তাকিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, কিছু বলবে?

- টি টি সাহেব এসেছেন।

ওর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বাঁ দিকে তাকাতেই কথাকলি টিকিট চেকারকে দেখে টিকিটটা ওনার হাতে দিয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে বসলেন। হঠাৎ করে ভাবনার জাল ছিঁড়ে যাওয়ায় অতীত বর্তমান এক হয়ে যাচ্ছিল।

টিকিট চেকার ভদ্রলোক হঠাৎই মুখ তুলে বললেন , দারুণ ব্যাপার…দু'জনেই কথাকলি! হ্যাভ অ্যা গ্রেট জার্নি টু বোথ অব ইউ।

উনি চলে যেতেই মেয়েটি বলল, আপনার নামও কথাকলি?

- হ্যাঁ, আমার সময় এই নাম চলত, কিন্তু এই জেনারেশনে তোমার এরকম নাম হবার কারণ!

- একটা গল্প

- ওওও!

কথাকলি চুপ করে গেলেও জানা অজানায় মেশা একটা কৌতুহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। জোর করে তা দমিয়ে বসে রইলেন কোনও এক মুহূর্তে আর এক কথাকলির গল্প শোনার আশায়।

- এরকম আদ্যিকালের নাম একেবারেই পছন্দ ছিল না আমার, কিন্তু যখন ঠাম্মির কাছে গল্প শুনলাম, সেদিন থেকে এই নামই আমার প্রিয়।

নামটা আমার বাবার দেওয়া। বাবার প্রিয় বান্ধবী কথাকলির নামে। শুনেছি,বাবা নিজের উন্নাসিকতায় তাঁকে হারিয়েছেন। এখনও অনুশোচনা করেন। তাঁকে মনে রাখতেই এই নাম। জানেন আণ্টি, যে কারণে বাবার উন্নাসিকতা, সেখানেই বাবার হার হয়েছে।

- বুঝলাম না।

- ঠাম্মি বলে, উনি নাকি শ্যামাঙ্গী ছিলেন। শুধুমাত্র শ্যামলা বলেই বাবা বন্ধুত্বের বেশী এগোতে রাজী হননি।

- এটা তো হতেই পারে, কিন্তু হার জিতের ব্যাপার কোথায়?

- আমার মা সুন্দরী, ভদ্র; যেমন সবার ইচ্ছে ছিল। এতদূর পর্যন্ত ঠিকঠাক চলছিল। বাবা হেরে গেলেন আমার জন্মের পর; আদ্যন্ত ফর্সা পরিবারে শ্যামলা মেয়ে পেয়ে। মা একটু কষ্ট পেলেও বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে মুহূর্ত না ভেবে ডেকে উঠেছিলেন কথাকলি বলে।

-:হুমমম বুঝলাম। তোমার বাবা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসেন, তাই না!

- হ্যাঁ,আমি ছাড়া বাবা চলতেই পারেন না। অফিসের কাজে যাচ্ছি,তাও ছাড়ছেন না একা। নেহাতই কিছু জরুরি কাজ আছে তাই! আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি।

- হ্যাঁ বলো।

- আপনিই কি বাবার সেই হারিয়ে যাওয়া বান্ধবী!

এমন একটা প্রশ্নে অপ্রস্তুত হলেও সেই ভাবটা আড়াল করেই বললেন, না গো,আমি সে নই।

- বড্ড চাইছিলাম আণ্টি, আপনাকেই সেই হারিয়ে যাওয়া কথাকলি ভাবতে।

ওর কথায় মুচকি হেসে বাইরে তাকালেন কথাকলি।

সেদিকে তাকিয়ে আর এক কথাকলি ভাবল, তুমি যতই গোপন করো, আমি সিওর তুমিই সে। বাবা ঠিকই বলেন, যে হারাতে চায় তাকে হারিয়েই থাকতে দিতে হয়। তুমিও হারিয়েই থাকো আণ্টি। কথাকলি ঠোঁটের কোলে অল্প হেসে কানে ইয়ার বাডস নিয়ে চোখ বন্ধ করতেই প্রবীণা কথাকলি ওকে চোখ ভরে ভালো করে দেখে ছবিটা মনে গেঁথে চোখ বন্ধ করলেন শীতল হেমন্তের বসন্ত বাতাস বুকে নিয়ে।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page