top of page

দেবী দুর্গার চোখ আঁকলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব, কলকাতার অলিতে-গলিতে কচুরি শিল্প, দেশীয় শাকসবজি ফলমূলের পুষ্টিগুণ, রবিবারের গল্প: কাঁকনের এভারেস্ট অভিযান


দেবী দুর্গার চোখ আঁকলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব

কমলেন্দু সরকার


না, গদাধর চট্টোপাধ্যায় তখনও ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব হননি। সেবার কামারপুকুরে লাহাবাড়ির দুর্গাপুজোয় প্রতিমার চোখ কিছুতেই আঁকা যাচ্ছে না। সবাই অবাক! কারণটি কী! পরে জানা যায়, প্রতিমা গড়ার সময় কারিগরকে গদাধর বলেছিলেন, 'এবার আমি ঠাকুরের চোখ আঁকব।' আসলে মা সেবার চাইছিলেন গদাধরের হাতেই আমার চক্ষুদান হোক। প্রতিমা গড়ার কারিগর কিছুতেই রাজি নন। প্রতিমা গড়ার কাজ শেষ৷ হলে হবে কী, চোখ আর আঁকতে পারছেন না কারিগর। মায়ের ইচ্ছা গদাধরের হাতেই চক্ষুদান হোক। মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে সামান্য এক মানুষ কী আর করতে পারেন!

না, পারেনওনি। শেষমেশ নিমরাজি কারিগর গদাধরের হাতে রং-তুলি তুলে দেন। তিনি চক্ষুদান করলেন দেবী দুর্গার।

শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের মা চন্দ্রমণি দেবী কামারপুকুর লাহা বাড়ির দুর্গাপুজোর ভোগ রান্না করতেন। বাবা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এই লাহাবাড়ির দুর্গাপুজোয় চণ্ডীপাঠ করতেন প্রতিপদ থেকে নবমী পর্যন্ত। আজও লাহাবড়ির দুর্গাপুজোয় চণ্ডীপাঠ হয়ে থাকে প্রতিপদ থেকে নবমী৷ সেইসময় এই বাড়িতে যাত্রাপালার আসর বসত মহালয়ার দিন থেকে টানা ন'দিন৷ বালক গদাধর ওই যাত্রাপালায় অংশ নিতেন। অর্থাৎ অভিনয় করতেন। একবার তো তিনি চলে গেছিলেন ভাবসমাধিতে।


আদতে রামকৃষ্ণ দেবের পিতা ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় এই গ্রামের লোক ছিলেন না। তিনি ছিলেন কামারপুকুর থেকে দু-মাইল পশ্চিমে ডেরেপুর গ্রামের বাসিন্দা। ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সত্যের প্রতি আনুগত্য এবং দৃঢ় ব্যক্তিত্বের জন্য সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। প্রথম স্ত্রীর অকাল মৃত্যুর পর বিয়ে করেন চন্দ্রমণি দেবীকে। একটি মামলায় জমিদারের পক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে অসম্মতি জ্ঞাপন করলে তিনি পড়েন স্থানীয় জমিদারের রোষানলে। প্রায় ৫০ একর মতো জমি এবং পৈতৃক ভিটে ছেড়ে ডেরেপুর থেকে কামারপুকুর চলে আসেন। সেইসময় ক্ষুদিরামের পুত্র রামকুমার এবং কন্যা কাত্যায়নী তাঁর সংসারে নতুন অতিথি। দারিদ্র্যের মুখোমুখি ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় আশ্রয় পেলেন স্থানীয় জমিদার সুখলাল গোস্বামীর সাহায্যে। ক্ষুদিরামকে তিনি দান করেন প্রায় এক একর কৃষিজমি। সাহায্য পেয়েছিলেন কামারপুকুর লাহাবাড়ি থেকেও।

কামারপুকুর লাহাবাড়ির দুর্গাপুজো বহু পুরনো। কয়েকশো বছর আগের। সেকালের পুরনো প্রথা মেনে আজও পুজো হয়। মায়ের কাঠামোপুজো হয় বিপত্তারিণীপুজোর দিন। মহালয়ার পরদিন ঘট উত্তোলন। প্রতিপদের দিন থেকে শুরু মহাচণ্ডীর পুজো।


এই বাড়ির দুর্গাপুজো ঘিরে রয়েছে এক কিংবদন্তি। সেটি হল, জমি সংক্রান্ত মামলায় লাহাবড়ির পূর্বপুরুষ ধর্মদাস লাহা যাচ্ছিলেন মেঠো পথ ধরে চুঁচুড়া আদালতের উদ্দেশে। কিছুটা পথ যাওয়ার পর ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তিনি গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার ফাঁকে তন্দ্রাঘোরে দেখতে পান তাঁকে মা দুর্গা বলছেন, 'মামলায় তুইই জিতবি। বাড়িতে এবার আমার পুজো করবি। তোর বাড়ির দিকে খানাকুল থেকে রওনা দিয়েছে দুই পটুয়া।' মামলার জিতে মায়ের স্বপ্নাদেশের কথা আর খেয়াল থাকে না ধর্মদাসের। কিন্তু বাড়ি ফিরেই চমকে যান তিনি। দেখেন তার বাড়ি ফেরার আগেই দুই প্রতিমা শিল্পী এসে সেখানে উপস্থিত। তাঁরা বলেন, 'একজন মেয়ে আমাদের বলল, এই বাড়িতে দুর্গাপ্রতিমা গড়তে হবে। তাই আমরা এসেছি প্রতিমা নির্মাণ করতে।'

সেই শুরু কামারপুকুর লাহাবাড়ির দুর্গাপুজো। সেকালের প্রথা ছিল পুজোয় পশুবলি দেওয়ার। কিন্তু ধর্মদাস ছিলেন ঘোর বৈষ্ণব। তিনি ছিলেন বৈষ্ণববাড়ির লোক। দ্বিধাগ্রস্ত ধর্মদাস চললেন সাতবেড়িয়ার মোমিনপুরে গুরুদেবের কাছে। পালকি করে চলেছেন ধর্মদাস। যাওয়ার পথে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হল এক বৃদ্ধার। তিনি ধর্মদাস লাহাকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'কোথায় যাবে বাবা তুমি?' তখন ধর্মদাস বৃদ্ধাকে সব কথা খুলে বললেন। বৃদ্ধা বলেন, 'মা কি সন্তানের রক্ত চাইতে পারে?' গুরুদেবের কাছে পৌঁছে বৃদ্ধার সব কথা জানালে, গুরুদেব বলেন, 'স্বয়ং মা তোমাকে বিধান দিয়ে গেছেন। তাঁর কথা মেনে চলো।' নবমীর দিন লাহাবাড়িতে হয় কাত্যায়নী রূপে কুমারী পুজো।

এই বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শ্রীরামকৃষ্ণ দেবের শৈশব অর্থাৎ গদাধরের লীলা।

শরৎ মানেই হিমের পরশ, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। সে ভেলা ভেসে যায় আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। বাতাসে কাশফুল দোলা খায়, শিউলির গন্ধে মা দুর্গা কৈলাস ছেড়ে মর্তে আসেন পুত্র-কন্যাসহ। পুজো মণ্ডপে মণ্ডপে যেমন সাজসাজ রব। তেমনই বাঙালি বনেদি বাড়িগুলোর দেউড়িতে, দুর্গাদালানে কলি ফেরে। আবার বহু বাড়িতে কাঠামোপুজো সেরে প্রতিমা গড়ার কাজ কোনও পুণ্যতিথিতে। কামারপুকুর লাহাবাড়িতেও তেমনই আয়োজন। যে-বাড়িতে ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেবের পদরেণু ছড়িয়ে ছড়িয়ে আছে সেই বাড়ির পুজো তো পুণ্যতীর্থ। কামারপুকুর লাহাবাড়িও তেমনই একটি পুণ্যতীর্থ।


আমাদের শহর কলকাতাতেও কয়েকটি বাড়ি রয়েছে যেখানে ঠাকুরের পদস্পর্শে ধন্য। উত্তর কলকাতার অধরলাল সেনের বাড়ি। যে-বাড়িতে একাধিকবার ঠাকুর এসেছেন। দুর্গাপুজোতেও এসেছেন। সেই বাড়িতে স্বামীজি এসেছেন। একবার পুজোর সময় শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের কণ্ঠে বেশকিছু গান শুনেছিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব। একবার জোর তর্ক হয়েছিল সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। সাহিত্য সম্রাট অবাক হয়েছিলেন ঠাকুরের পাণ্ডিত্যে! অথচ তাঁর ছিল কামারপুকুর লাহাবাড়ির পাঠশালার বিদ্যা। সেই পাঠশালা এখনও আছে, যার পরিচিতি গদাধরের পাঠশালা নামে।

একবার পুজোর সময় কাউকে না-জানিয়েই রানি রাসমণির বাড়ির দুর্গাপুজোয় আসেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ দেব। এসেছিলেন রমণীর বেশে। এসে দুর্গা মায়ের প্রতিমার সামনে চামর নাড়িয়ে পুজো করেন। ঠাকুরকে চিনেছিলেন একমাত্র রানি রাসমণির জামাই মথুরামোহন বিশ্বাস।


কলকাতার অলিতে-গলিতে কচুরি শিল্প


সুস্মিতা মিত্র


"শীতকালে ঘুম থেকে উঠে সাতসকালে কী খেতে ভালো লাগে?" -জিজ্ঞেস করলে হাতেগোনা গুটিকয়েক লোকজন ছাড়া প্রায় সবাই বলবে কচুরি। তা সে শীতকালীন প্রেম কড়াইশুঁটির মোহময়ী কচুরি হোক, কি সারাবছরের হিং এর কচুরি, ডালপুরি বা রাধাবল্লভী! বাঙালির নিখাঁদ ভালোবাসা বলতে এই! তবে বাড়িতে এসব তরিযুত করে বানানো বড়ই ঝক্কির! মশলা কোটো, ডাল ভেজাও, শিলে বাটো, পুর করো, বেলো, ভাজো; তারপর আবার কত কী খেয়াল রাখতে হয়! কচুরির পেট ফেঁটে পুর বেরিয়ে গেলো কিনা। ময়দায় ময়ান ঠিকমতো হলো কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি। আর হ্যাঁ, তেলের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করাটাও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে। খাস্তা কচুরি ভাজতে হবে ধিমে আঁচে। ভেতরে নরম রসালো পুর থাকবে আর ওপরে মুচমুচে খাস্তা। ভাজার পর শুকনো খটখটে হয়ে যাবে না। মিইয়ে যাবে না। আবার ডালপুরি বা কড়াইশুঁটির কচুরি ভাজতে হবে চড়া আঁচে। ডুবো তেলে সোনালী হয়ে উল্টে পাল্টে ভেজে উঠে আসবে তাঁরা একে একে। পাত আলো করে জ্বলজ্বল করবে‌। এক্কেবারে ধোঁয়া ওঠা অবস্থায় কলাপাতায় পড়বে ঝোল ঝোল আলুর তরকারি অথবা নারকেল দেওয়া বেশ শুকনো নরম ছোলার ডালের সঙ্গে। জুলজুল চোখে তাকিয়ে থাকলে বাড়ির বুড়ো থেকে খুঁদে পর্যন্ত সবাই। অনেকে আবার এই ছোলার ডালে রসগোল্লার রস চিপে খেতে ভালোবাসেন। গাওয়া ঘি তে ভাজা ধবধবে সাদা লুচি ভালোবাসলেও কচুরির যে অন্য এক মায়া আছে, তা মানবেন সবাই। আর বাঙালি যে কতদূর খাদ্যরসিক তা উল্লেখ ভর্তি ভর্তি পাবেন সাহিত্যে, ইতিহাসে, সিনেমার পর্দায়। অস্বীকার করার জায়গা নেই! তাই তো পাড়ায় পাড়ায় এতো কচুরির দোকান। কাঠের পাটায় বেলা চলছে, আর বড় তেল ভর্তি লোহার কড়াইতে ভাজা চলছে দিবারাত্রি। তাঁরা উদরপূর্তি করে চলেছে আপামর জনসাধারণের। সস্তায় পেটপুরে খাওয়া যাকে বলে তার জন্য সবথেকে ভালো অপশন এই কচুরি। সঙ্গত হিসেবে থাকে যে তরকারি, তাকেও বাদ দিলে চলবে না। কচুরির স্বাদ হাজার গুণ বাড়িয়ে তোলে এই জিনিস।


কলকাতার গলি, তেলেভাজা যেখানে শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে; কচুরির আঁতুরঘর বলতে পারেন মোটামুটি। সেই অলিগলি ঘুরে খুঁজে আনা অমৃত-তুল্য স্বাদের কচুরির গল্প নিয়ে আজ কথা বলবো।কলকাতার কাছাকাছি যারা থাকেন তাঁরা ছুটির দিনে সদলবলে একবার ঢুঁ মারতেই পারেন এখানে। রসনাতৃপ্তির সঙ্গে মনের স্বাদ মিটবে একথা হলফ করে বলতে পারি। চলুন তাহলে দেখে নিই, শীতের বেড়ানো তে একটা কচুরি স্পেশ্যাল ফুড-ওয়াক হয়েই যাক তাহলে!


পুঁটিরাম

কলকাতার কচুরিকথার শুরুতে পুঁটি রামের উল্লেখ করতেই হবে। কলেজ স্ট্রিট এলাকার কিংবদন্তি দোকান এটি। দিনের যেকোনো সময় রাধাবল্লভী অথবা কচুরির সঙ্গে ছোলার ডাল কিংবা আলুর দম আর বিভিন্ন রকম মিষ্টি খেতে ভীড় জমায় খাদ্যরসিক জনগণ।


গীতিকা

উত্তর কলকাতার মানিকতলার গীতিকায় পাবেন এই এলাকার সেরা কচুরি। ফুলকো লুচি আর হিং এর কচুরি, এই দুই-ই পাবেন এই দোকানে।

নীলাচল

শ্যামবাজার বা বাগবাজার অঞ্চলের বিখ্যাত দোকান এটি। আর এখানের বিখ্যাত পদ হলো ভেটকি মাছের কচুরি। ভোলা-ভেটকির সাথে চিংড়ি ও আরও অন্যান্য মশলার সাথে মিশিয়ে মাছের পুরটা বানান। আলুর দম আর স্যালাডের সঙ্গে দুখানা কচুরি খেয়ে নিলে পেট ভরতে বাধ্য।


লালি ছাঙ্গানি

১৮, বৈশাক স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০০০৭


এখানে প্রতি প্লেটে চারটি করে ক্লাব কচুরির সঙ্গে দেওয়া হয় আলুর ঝাল ঝাল তরকারি। তার উপরে থাকে ভুজিয়া ছড়ানো।


শর্মা টি

৫৩/৫এ হাজরা রোড, কলকাতা ৭০০০১৯


আলু এবং চানা মেশানো তরকারির সঙ্গে কচুরি খেতে হলে কিন্তু আসতে হবে এই দোকানে। সঙ্গে থাকে টক ঝাল আচার এবং লঙ্কাও।


শ্রী হরি মিষ্টান্ন ভান্ডার

৩৫এ/বি শ্যমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রোড, কলকাতা ৭০০০২৫

এখানে ডালের পুরভরা কচুরির সঙ্গে পাওয়া যায় ক্লাব কচুরিও। ছোট ছোট ছাতুর পুরভরা কচুরিকে এরা বলে গুটকে কচুরি। সঙ্গে থাকে হয় হালুয়া। বিশেষ করে শীতকালে এখানে পাওয়া যায় কাশ্মীরি আলুর দম।


মহারানি

শরৎ বোস রোডে অবস্থিত এই কচুরির দোকান। এই দোকানের হিঙের কচুরি আর আলুর দম গোটা কলকাতায় বিখ্যাত।


মোহন ভান্ডার

ধর্মতলার এস এন ব্যানার্জি রোডের এটি সেই বিখ্যাত জায়গা যেখানে পিকু সিনেমাতে স্বয়ং অমিতাভ বচ্চন পেটপুরে কচুরি খেয়েছিলেন। সকাল ৮টা থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকে। প্লেটে থাকে কচুরি, আলুর তরকারি, আচার আর কাঁচালঙ্কা।


আদি হরিদাস মোদক

এপিসি বোস রোডের শ্যামবাজার ফাইভ-পয়েন্ট ক্রসিং-এর এই দোকানটি ২০০ বছরেরও বেশি পুরনো এবং বহু বছর ধরে কচুরির জন্য পরিচিত। এই দোকানের অনন্য বিষয় হল তাঁরা কলাপাতায় কচুরি পরিবেশন করেন। সকাল ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত এখানে খোসাসহ আলুর তরকারি, ছোলার ডাল, লুচি, কচুরি ইত্যাদি পাওয়া যায়।


গনেশদার কচুরি

বাগবাজার এলাকার নন্দলাল বোস লেনের এই দোকানটি বিখ্যাত তাদের মাছের কচুরির জন্য। পুরের জন্য তাঁরা ব্যবহার করেন কাতলা মাছের। সঙ্গে দেওয়া হয় আলুর দম। দোকানটি খোলা থাকে বিকেল ৫:৩০ থেকে ৯টা পর্যন্ত।


কানহাইয়া কচৌরি

বড়বাজার এলাকায় রবীন্দ্র সরণীতে অবস্হিত এই দোকান খোলা থাকে সকাল ৭টা থেকে রাত ১১:৩০ পর্যন্ত। ক্লাব কচুরির সঙ্গে পরিবেশন করা হয় রসেওয়ালি আলু কি সবজি আর জিলিপি।


বদ্রি কি কচৌরি

খাস্তা কচুরি ভালোবাসলে বড়বাজারের শ্রী হরিরাম গোয়েঙ্কা স্ট্রিটের এই দোকানটিতে আপনাকে একবার যেতেই হবে। খাস্তা কচুরির সঙ্গে ভাঙ্গা আলুর তরকারি ওপরে ঝুরিভাজা ছড়িয়ে এখানে পরিবেশন করা হয়।


পটলার কচুরি

বাগবাজারে ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ব্রাঞ্চের একেবারে বিপরীতে অবস্থিত এই দোকানটি।

ভারী ছোলার ডালের পুর ভরা লাল করে ভাজা কচুরি ও টক মিষ্টি আলুর দম মেলে এখানে। সকালে আবার কচুরির সাথে আলুর দম বা আলুর তরকারী ও পাওয়া যায়।


গৌরাঙ্গ মিষ্টান্ন ভাণ্ডার

বাগবাজার বাটার কাছে এই দোকান প্রায় ৬০ বছরের পুরনো। গরম গরম হিঙের কচুরি মেলে সারাদিন। খোসাওয়ালা আলুর ঝাল মিষ্টি তরকারীর সাথে কচুরির স্বাদ একবার পেলে কখনো ভুলবেন না। দোকান খোলা থাকে সকাল ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।


দেশীয় শাকসবজি ফলমূলের পুষ্টিগুণ


সুদেষ্ণা ঘোষ


কথায় আছে, সমস্ত রকম সমস্যার সমাধান থাকে মরশুমি শাকসবজি ফলমূলে। সারাবছর সব কিছু আজকাল পাওয়া যায় ঠিকই, তবে মরশুমি সবকিছুর স্বাদ এবং গুণাগুণ সবসময় বেশি। এককথায় বলতে গেলে আমাদের আশেপাশে থাকা সহজলভ্য উপকরণ ই আমাদের সুস্থ থাকার চাবিকাঠি।

এখন তো বাজার ভর্তি টাটকা রঙিন শাকসবজি। যেমন তার রূপ মাধুর্য, তেমনি তার গুণের বাহার। শীতকালীন শাকসবজিতে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় ভিটামিন এবং মিনারেলস। চলুন জেনে নিই দেশীয় কোন শাক সবজির কী কী গুণাগুণ রয়েছে:

১.পালংশাক: আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন কে এবং ফোলেট সমৃদ্ধ।

২.ব্রকলি: ভিটামিন সি এবং কে সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে গ্লুকোসিনোলেটস যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম।

৩.বাঁধাকপি: ভিটামিন সি এবং কে এর ভাল উৎস। এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান রয়েছে।

৪.মটরশুটি: কম ক্যালোরি, ভিটামিন কে সমৃদ্ধ, ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ঠাসা।

৫.ফুলকপি: ফুলকপিতে রয়েছে ভিটমিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-সি, ক্যালসিয়াম, ফলিক অ্যাসিড ও জল। এ ছাড়াও পর্যাপ্ত পরিমাণে আয়রন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফার রয়েছে, যা কিডনির পাথর গলাতে সাহায্য করে এবং ক্যানসার নিরাময়ে সহায়তা করে।

৬.বাঁধাকপি: বাঁধাকপিতে রয়েছে ভিটামিন-সি ও প্রচুর পরিমাণে ফাইবার। শরীরের হাড় শক্ত ও মজবুত রাখতে এবং ওজন কমাতে বাঁধাকপির জুড়ি নেই। তাছাড়া বাঁধাকপি আলসার প্রতিরোধে সক্ষম।


৭.টমেটো: টমেটো তে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি, যা মানবদেহের হাড় ও দাঁত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। স্কার্ভি ও চর্মরোগ প্রতিরোধ করে। অন্য আরেক উপাদান হলো লাইকোপেন, যা ক্যানসার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে। এ জন্য টমেটোকে অনেকে অন্ত্রের অ্যান্টিসেপটিক বলে থাকেন। এছাড়াও থাকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা কিনা প্রকৃতির আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির বিরুদ্ধে কাজ করে।

৮.গাজর: এতে রয়েছে বিটা-ক্যারোটিন, থায়ামিন, নিয়াসিন, ভিটামিন বি-৬, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-কে, ফাইবার, ম্যাংগানিজ ও পটাশিয়াম। যা চোখ ও দাঁতের সুরক্ষায়, লিভার সুস্থ রাখতে ও ক্যান্সার প্রতিরোধে সহায়তা করে।

৯.ধনেপাতা: এতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-কে ও ফলিক অ্যাসিড রয়েছে, যা আমাদের ত্বকের জন্য যথেষ্ট প্রয়োজনীয়।

সমস্ত রকম ভিটামিনের সহজ এবং সস্তা উৎস হলো ফল। যার আরেকটি সুবিধা হলো, সহজলভ্য, সহজপাচ্য এবং রান্না করা হয় না বলে পুষ্টিগুণ অবিকৃত থাকে। বিভিন্ন ধরনের মিনারেলস যেমন- ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস দেহের বিপাকীয় কার্যাবলিকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। এছাড়াও ফল অন্যান্য পুষ্টি উপাদান যেমন- শর্করা, চর্বি, ভিটামিন, জল এসব দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ করে দেহকে সুস্থ রাখে। চলুন জেনে নিই এই মরশুমের কোন কোন ফলে কী পুষ্টিগুণ রয়েছে!


১.কমলালেবু: কমলায় রয়েছে ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি কমপ্লেক্স, ফাইবার ও মিনারেলস, যা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। কমলালেবুকে ক্যানসার প্রতিরোধক বলা হয়ে থাকে।

২.জলপাই: শীতকালীন ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ এই ফল উচ্চরক্তচাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য ও পাকস্থলীর কোলন ক্যানসার দূর করতে সাহায্য করে। অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে ভরপুর এই ফলে এছাড়াও রয়েছে ভিটামিন-এ এবং ভিটামিন-ই।


৩.আমলকি: এতে রয়েছে ভিটামিন-সি, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি১, ভিটামিন-বি১২, ভিটামিন-বি৬ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ত্বকের সুরক্ষা, মাড়ি মজবুত করতে এবং ক্যানসার প্রতিরোধক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আমলকি।

৪.বেদানা: এতে রয়েছে ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-সি। বেদানার রস কুষ্ঠরোগ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও হার্ট ভালো রাখতে বেশ উপকারী।

৫.কুল: ভিটামিন-এ, ভিটামিন-সি, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম এ সমৃদ্ধ । অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা টিউমারের উপর সাইটোটক্সিক প্রভাব বিস্তার করে। যার ফলে শরীরে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কমে। কোষ্ঠকাঠিন্যসহ অন্যান্য হজমজনিত সমস্যার জন্য ও উপকারী।

৬.শাঁকালু: যাঁদের আইবিএস বা পেটের অন্যান্য কোনও সমস্যা রয়েছে তার জন্যেও খুব উপকারী হল শাঁকালু। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ ফাইবার। যা অনেকক্ষণ পর্যন্ত পেট ভরিয়ে রাখে।

৭.সবেদা: সবেদার মধ্যে থাকে প্রচুর পরিমাণ ফ্রুকটোজ, ভিটামিন এ, ই, সি, ভিটামিন বি কমপ্লেক্স। যা চুল আর ত্বকের স্বাস্থ্যরক্ষাতে খুব ভাল কাজ করে।

৮.আঙুর: আঙুরে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন সি, ভিটামিন কে, ফাইবার, পটাশিয়াম থাকে। এতে রয়েছে সেলুলাস ও চিনি, যা শরীরের জন্য উপকারী।


ফলের প্রচুর গুণ তা বলাই বাহুল্য! তবে বাজারজাত কেটে রাখা ফল কখনোই খাবেন না। অবশ্যই বাড়িতে এনে ভালো করে ধুয়ে মুছে তবেই খাওয়া উচিত। রাস্তার পাশের জুসের দোকান থেকে কখনওই খাবেন না। কারণ তাতে ফাইবার ছেঁকে ফেলে দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে সময় নিয়ে চিবিয়ে সম্পূর্ণ পাল্প সহ ফল খেতে চেষ্টা করবেন। বাড়ির প্রতিটি সদস্যের রোজকার ডায়েটে মরশুমি শাকসবজি, ফলমূল দিতে ভুলবেন না।

কাঁকনের এভারেস্ট অভিযান

অর্জুন সরকার


হাতের সামনে রাখা কয়েকদিনের বাসি নিউজপেপার সামনে তুলে ধরল কাঁকন। তখনই চোখে পড়ল পেপারের ওপর জ্বলজ্বল করছে বিজ্ঞাপনটা। চলুন, ঘুরে আসুন মাউন্ট এভারেস্ট, স্বপ্ন সফল করুন, আর ইতিহাসের সাক্ষী হোন। আগে আসলে আগে সুযোগ। সিট লিমিটেড, প্রথম কুড়ি জনের জন্য রয়েছে আকর্ষণীয় ৪০% ডিসকাউন্ট।


ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালো, আজ ২৪শে ফেব্রুয়ারি, মে ১০ তারিখ যাত্রা শুরু। হাতে মাত্র দু’মাস সময়। অফারটা রিসিভ করবে কিনা ভাবছে।

ফোন লাগিয়েই ফেলল। ওপারে ভদ্রলোকটির বিনীত কণ্ঠ, নমস্কার ম্যাডাম।

শুনেই বোঝা যাচ্ছে পুরোপুরি প্রফেশনাল।


বললো, টোটাল প্যাকেজ ২০ লাখ টাকা মাত্র। দেখুন বিভিন্ন ট্রেকিং সংস্থার থেকে আমরা অনেক কম খরচে আপনাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবো।

— তা আপনাদের প্যাকেজে কী কী আছে? প্রশ্নটা ছুড়ে দেয় কাঁকন।

— মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো, এলব্রুস, এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, মাউন্ট কে-টু, কী নেই ম্যাডাম, কিন্তু এভারেস্ট প্যাকেজে আমরা ৪০% অফ রেখেছি।

— কেন?

— বুঝতেই পারছেন কম্পিটিশনের বাজার, সবাই শীর্ষ মাউন্টেন ছুঁতে চাই। তবে যদি আপনার বাজেট কিছু কম থাকে তবে মাকালু বা নন্দাদেবী চলে যান, তার চেয়ে অনেক কম খরচে করে দেব।


সামান্য কৌতূহল নিয়েই জিজ্ঞেস করল কাঁকন, আচ্ছা, লোকালের মধ্যে কী কী আছে? আপনাদের কোনো প্যাকেজে আছে?

— লোকালের মধ্যে? ভদ্রলোক যেন কিছুটা অবাক হলেন।

ফালুট, সান্দাকফু আছে, একদিনের টুর প্যাকেজ। তবে ওখানে গিয়ে লাভ হবে না ম্যাডাম, ওখানে তো আর সেকালের মতো রোনাল্ড রয়েজের গাড়িও নেই, পরিষ্কার ডবল লেনের রাস্তা হয়ে গেছে। আপনি চাইলেই ছ’ঘণ্টায় বাই কারে এনজেপি থেকে স্পটে পৌঁছে যাবেন। আর পিচের রাস্তার পাশ দিয়েই একটা ট্রেকারদের জন্য রাস্তা বানানো আছে, শখের ট্রেকাররা সে রাস্তা ধরেই হাঁটে। সিরিখোলা দিয়েও গাড়ির রুট খুলে গেছে।


ডিসিশন অবশেষে নিয়েই নিলো, সে এভারেস্টই যাবে।


যথারীতি নামচে বাজারে নেমে দেখে, ছবির মতো সুন্দর শহর। লাইন দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, এভারেস্ট বেস ক্যাম্প বেস ক্যাম্প বলে চেঁচাচ্ছে। দূর থেকে হিমালয়ের চূড়াগুলো দেখা যাচ্ছে।

— আপনি বাঙালি নাকি? আওয়াজ শুনে চমকে ওঠে কাঁকন। পাশে দাঁড়িয়ে এক বয়স্ক মানুষ, বয়স ৭০ ছুঁইছুঁই, চেহারা দেখে বয়স বোঝার উপায় নেই।

হেসে বললেন, আমিও আপনার মতো এভারেস্ট অভিযাত্রী। ওদের টিমে মোট পঞ্চাশ জন সদস্য, প্রায় প্রত্যেকেই শুধু বাঙালিই নয়, ভ্রমণপ্রিয় বাঙালি। খাদ্যরসিকও বলা যায়, কারণ ফ্লাইটে টিমের এক দম্পতিকে এই কদিনে কী ছাইপাশ খাবে সেই নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছি।


কাঁকন অবশ্য একাই এসেছে। ওর এরকম অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা আছে। এর আগেও কয়েকটা জায়গায় ট্রেকিং কাম অ্যাডভেঞ্চার টিমের সাথে গেছে।


দূর থেকে এক ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন।

— কাঁকন দেবী?

হালকা মাথাটা নাড়ালো কাঁকন।

— নমস্কার, দাস টুর এজেন্সি থেকে এসেছি ম্যাডাম। আমি আপনাদের গাইড কাম টুর ম্যানেজার। আগামী পনেরো দিন আমি আপনাদের সাথে থাকব। আমার নাম বিমল জোয়ারদার, রানাঘাটে আমার বাড়ি। দশ বছর আগে এখানে এসেছিলাম। তারপর থেকে এখানেই পড়ে আছি, টুর অপারেট করি। চলুন যাওয়া যাক।


ড্রাইভারকে লাগেজ তোলার নির্দেশ দিলেন। তারপর কাঁকনের দিকে তাকিয়ে বললেন, একদম টেনশন নেবেন না ম্যাডাম।

কাঁকন বলল, শেষে পারব তো? বলেন না, সত্যি খুব টেনশন হচ্ছে।

— বাড়িতে কোনোদিন মই চড়ে ছাদে উঠেছেন?

— হ্যাঁ, মামার বাড়ির ছাদে একবার মই দিয়ে উঠেছিলাম। মামার ছাদে সিঁড়ি ছিল না তাই।

ভদ্রলোক হেসে বললেন, তাহলে এভারেস্টেও উঠতে পারবেন। না পারলেও চিন্তা নেই, আমরা জোর করে উঠিয়ে দেব আপনাকে। আগে চলুন না ম্যাডাম, দেখবেন পুরো মনে হবে যেন রাজসূয় আয়োজন চলছে। এই চার মাস তো সিজন।


বেস ক্যাম্পে পৌঁছে কাঁকনের চোখ কপালে— এরা কারা? হাজার হাজার লোক, শয়ে শয়ে তাবু, এ কী অবস্থা করেছে এভারেস্টের? এত লোক এখানে কী করছে? যেন এভারেস্ট বেস ক্যাম্প নয়, এ যেন কুম্ভের মেলা। শয়ে শয়ে লোক চলেছে উপরের দিকে।

দূরে সাদা চিনির পাহাড়ের মধ্যে যেন দল বেঁধে চলেছে পিঁপড়ের সারি। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, কমলা— কত বাহারি রঙের।


বিমলবাবুকে জিজ্ঞেস করতে জানা গেল, ওরা সব খুম্বু আইসফল ক্রস করে ক্যাম্প ওয়ানে যাচ্ছে, গন্তব্য এভারেস্ট পিক ক্লাইম্ব।

বিমলবাবু বললেন, ওই যে একদম উপরের দিকে দেখছেন, ওরা পরশু রাতে রওনা হয়েছিল, সব ব্যবস্থার দায়িত্ব স্থানীয় শেরপাদের। ওই দিকে তাকিয়ে দেখুন, বলে ডান দিকে ইশারা করলেন, দেখছেন না এখানে শেরপাদের একটা ছোট জনবসতি গড়ে উঠেছে।


পাশের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে দেখে কাঁকন, ওটা কী দাদা?

— দেখে তো মনে হচ্ছে একটা ছোট পাহাড়, তবে এত রঙের বাহারি কী এসব চিকচিক করছে বুঝতে পারছি না। তবে ওটা কিছু নয়, ওটা হল এভারেস্টের ডাম্পিং গ্রাউন্ড। এভারেস্ট ক্লাইম্বারদের ফেলে দেওয়া ওয়েস্টেজ। কী নেই ওতে— প্লাস্টিক, পাউচ, র‍্যাপার, বিয়ারের ক্যান, এমনকি হিউম্যান বায়োলজিকাল ওয়েস্টও আছে।

ককিয়ে ওঠে কাঁকন, এ তো আমাদের ধাপাকেও হার মানিয়ে দেবে!


সেই সময় কাঁকনের কানে হেলিকপ্টারের আওয়াজ। তাকিয়ে দেখে, একটু দূরে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হেলিকপ্টার। প্রশ্নটা করেই ফেলল—

এত হেলিকপ্টার কেন?

— সামনেই হেলিপ্যাড, সেখান থেকে প্রতিদিন তিনটি হেলি সার্ভিস আছে ম্যাডাম। প্রথমটি ক্যাম্প ওয়ান অবধি, দ্বিতীয়টি ক্যাম্প টু অবধি, আর তৃতীয়টি ক্যাম্প থ্রি অবধি। পুরোটাই টুরিস্টদের জন্য। প্রতি আধা ঘণ্টা অন্তর সার্ভিস, চাইলে হেলিকপ্টারে করেও ঘুরে আসতে পারেন। আর আছে হেলি-গুডস সার্ভিসের ব্যবস্থা, উপরের ক্যাম্পগুলোতে রসদ পৌঁছানোর জন্য। আছে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স, মোবাইল মেডিক্যাল টিম, মোবাইল রেস্কিউ টিম। আর একটু উপরের ট্রানজিট ক্যাম্প কাম হাসপাতাল আছে।


নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না কাঁকন, একি শুনছে!!


বাদলবাবু বলেন, জানেন ম্যাডাম, মাউন্ট এভারেস্টে আগে চড়তে গেলে অনেক খরচ হত, এখন প্যাকেজ অনেক কম। কম্পিটিশনও অনেক বেশি, বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সিগুলো অনেক কমে আকর্ষণীয় প্যাকেজ দিচ্ছে। পাশে দেখুন লোতসে বা মাউন্ট কে-টু যেমন কা তেমনি আছে, আর খরচাও প্রচুর। তবে সেখানেও ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ডেভেলপমেন্টের কাজ চলছে। আর কয়েক বছরের মধ্যে এই রুটও খুলে যাবে সাধারণ পাবলিকের জন্য।


মনে মনে ভাবল কাঁকন— ইনফ্রাস্ট্রাকচার না ছাই, পাহাড় ধ্বংসের আয়োজন। এখানে আসার পর থেকে কাঁকনের মন ভালো নেই, একি অবস্থা করেছে এভারেস্টের।


বিমলবাবু বলেই যাচ্ছেন— এখানে সব ব্যবস্থা আছে। একটু শরীর খারাপ হলেই এয়ার অ্যাম্বুলেন্স থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার, মাস্ক। এছাড়া এসি টেন্ট থেকে হ্যাঙ্গিং টেন্ট সব আছে। উপরে উঠলে ক্যাম্প টু থেকে ক্যাম্প থ্রি পর্যন্ত যেখানে ৮০ ডিগ্রি ভার্টিকাল হয়ে গেছে, সেখানে দেখবেন শয়ে শয়ে হ্যাঙ্গিং টেন্ট লাগানো আছে। আর তার পাশে পাথরে খোদাই করে সিঁড়ি গাঁথা আছে, চার পাশে নেট দিয়ে ঘেরা, যাতে পড়ে গেলেও নেটে আটকে যায়। এমন ব্যবস্থা করা আছে যে আপনি পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিতে চাইলেও পারবেন না, ঠিক আটকে যাবেন। আর আছে প্রতি একশো মিটারে উচ্চতায় একটি করে হ্যাঙ্গিং টেন্ট— রেস্ট হাউস কাম ক্লাইম্বার হাট। চাইলে সেখানেই রেস্ট নিতে পারেন, সাথে অক্সিজেন সিলিন্ডার ফ্রি। এই তো সামনের মাসে এক দম্পতি দু’মাসে পিক ক্লাইম্ব করেছেন। ভদ্রমহিলাটি বেতো রুগী ছিলেন, তবুও তাকে ক্লাইম্ব করিয়েই ছেড়েছি আমরা। আপনি চাইলে বরফের উপর হাঁটার ব্যবস্থা আছে, আপনাকে কিছু করতে হবে না, শেরপারাই সব করে দেবে। প্রয়োজনে কাঁধে করে তুলে ওরা আপনাকে সামিটে পৌঁছে দেবে। শুধু আপনাকে একটু বেশি খরচা করতে হবে, এই যা। একদম হান্ড্রেড পারসেন্ট সাক্সেস। আর জিপিএস ব্যবস্থার মাধ্যমে ক্লাইমেট চেঞ্জের খবর আমরা পেয়ে যাই। বড় বৈশিষ্ট্য কী জানেন? কয়েক মুহূর্তেই ওয়েদার চেঞ্জ, কিন্তু তারও উপায় আছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা তার আগাম খবর পেয়ে যাই, খারাপ ওয়েদার আপনাদের কাছে পৌঁছানোর আগেই আমরা এসে হাজির। তখন হেলি-সার্ভিস রেডি, আপনাকে রেস্কিউ করে নিচে বেস ক্যাম্পে নিয়ে আসার জন্য। নিচে এসে আবার ওয়েদার ঠিক হলে যেখান থেকে শেষ করেছিলেন সেখানেই পৌঁছে দিই সেফলি, যাতে কেউ বলতে না পারে স্টেপ জাম্প করেছেন। দেখছেন না আকাশে কত হেলিকপ্টার উড়ছে।


আজ তৃতীয় দিন ওরা ভোরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। একটু উপরে উঠেই কাঁকন দেখল, ওটা কী?

— ও কিছু না ম্যাডাম, রাস্তায় বেশ কিছু খাদ আছে। কিন্তু এখন এখানে পার্মানেন্ট ল্যাডার লাগানো আর নিচে ফিফথ লেভেল অবধি নেট লাগানো আছে। নদীর উপর ব্রিজ যেমন হয় তেমনি ল্যাডার ধরে ইজিলি পার হয়ে যাবেন। পিছলে পরলেও ক্ষতি নেই, সোজা গিয়ে নেটে পড়বেন। আগের বছরই এক ইউরোপিয়ান টুরিস্ট ল্যাডার থেকে পা পিছলে সোজা নিচে খাদে, কিন্তু নিচে যে নেট লাগানো! তবে ভদ্রলোক ভীষণ ভারী ছিলেন, তাই প্রথম নেট ছিঁড়ে দ্বিতীয় নেটে গিয়ে পড়েন। দু’দিন পর রেস্কিউ টিম উদ্ধার করতে গিয়ে দেখে ভদ্রলোক নেটে শুয়ে আইপডে গান শুনছেন, আর থেকে থেকে পাশে রাখা অক্সিজেন মাস্ক থেকে অক্সিজেন নিচ্ছেন, পাশে থাকা ২০ লিটারের হট ফ্লাস্ক থেকে গরম জল খাচ্ছেন, সাথে চকলেট।

— প্রতিটা হ্যাঙ্গিং নেটের পাশে একটা ছোট্ট কুঠুরির মতো করে রাখা আছে। সেখানে ২০ লিটারের ফ্লাস্কে জল, অক্সিজেন সিলিন্ডার-মাস্ক আর এলইডি লাইটের ব্যবস্থা আছে। টুরিস্ট সেফটি সবার আগে। বেস ক্যাম্প থেকে সামিট অবধি পুরো ল্যাডার আর রোপের পার্মানেন্ট ব্যবস্থা, একজন টুরিস্টও যাতে ক্যাজুয়ালটি না হয়। আগে সেমি-পার্মানেন্ট মেটাল ল্যাডার ছিল ক্লাইম্বিং এইড হিসেবে, কিন্তু সেগুলো এখন অতীত। আর তার সাথে হাত-পায়ের পাঁচটি আঙুলে ফার্স্ট, সেকেন্ড, থার্ড ডিগ্রি ফ্রস্টবাইটও এখন পাস্ট। জার্নির শুরুতেই এমন গ্লাভস আমরা দেব, যা মাইনাস ১০০ ডিগ্রি টেম্পারেচারেও আপনার কিছু হবে না।


সাউথ কলে উঠে কাঁকন দেখল, মেলা লেগেছে। একটু পরে বিমলবাবু এসে খবর দিলেন, আজ রাতে হবে না ম্যাডাম, কাল রাতে জার্নি করতে হবে।

— কিন্তু কেন? কাঁকনের মনে প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে।

— আগে সাউথ সামিট থেকে হিলারি স্টেপ অবধি ট্রাফিক জ্যাম।

— সে কী! আশ্চর্য, এখানেও ট্রাফিক জ্যাম!


— এ কী বলছেন ম্যাডাম, আপনার ভাগ্য ভালো যে দু’দিনেই লাইন ক্লিয়ার পাচ্ছেন। আগের সপ্তাহে তো চার দিন পর্যন্ত ট্রাফিক জ্যামে সামিটের লাইন বন্ধ ছিল।


সামিটের প্রায় একশো মিটার নিচে হিলারি স্টেপে পৌঁছে কাঁকন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। এ কী বিশাল লাইন! সামিটের সামনে এত ভিড় কেন? ওটা সামিটে ওঠার লাইন। সামিটের একটু নিচে একটা অপ্রতুল সমতল জায়গায় দেখে মানুষের ভিড়, সেখানে একটা ছোট স্টল। ক্লাইম্বাররা অক্সিজেন মাস্ক খুলে মনের সুখে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে, আর সঙ্গে সামান্য চা-কফি-স্ন্যাকস।

সামনে এসে বিমলবাবু এককাপ গরম কফি ধরিয়ে দিলেন। — ম্যাডাম, হাতে ৫ মিনিট টাইম, এর চেয়ে বেশি অক্সিজেন মাস্ক খুলে রাখা যাবে না, এর মধ্যেই কফিটা খেয়ে নিন। সত্যি, সামিটের এত কাছে এসে এক কাপ গরম কফি— ভাবাই যায় না, মেজাজটা ফ্রেশ হয়ে গেল।


অবশেষে স্বপ্ন পূরণ— সামিটে পৌঁছানো। স্বপ্নপূরণের আনন্দে আত্মহারা কাঁকন। আনন্দে ছটফট করতে করতে চারপাশে ঠিকভাবে লক্ষ্যই করেনি। কিন্তু এ কী— এখানেও মানুষের ভিড়! কাঁধের রুকস্যাক থেকে কাঁকন লেটেস্ট মডেলের থ্রি-ডি মোবাইল ক্যামেরাটা বের করল।


— দিদি, একটু সাইড দিন না প্লিজ। বিরক্ত মুখে তাকাল কাঁকন। এক বাঙালি নববিবাহিত দম্পতি। মনে হচ্ছে হানিমুনে এসেছে। মেয়েটার মুখে হাসি রেখে সেলফি তুলছে, আর গলায় বিরক্তি।

— ধুর, এটুকু জায়গায় সেলফি তোলা যায় নাকি! যেদিকেই তুলছি শুধু মানুষের মুখ।

কাঁকনেরও মনে হল, সত্যিই প্রেস্টিজের ব্যাপার। সামিটে উঠে সব সেলফি তোলার ভিড়। ওকে দেখে হেসে বলল, আপনিও বাঙালি নাকি?

— হ্যাঁ।

— পৃথিবীর যে প্রান্তেই ঘুরতে যান না ম্যাডাম, বাঙালির দেখা পাবেন। তা বলে এভারেস্ট সামিটে উঠে এত বাঙালি পাব সেটা কাঁকনের ধারণা ছিল না। কাঁকন আর কথা বাড়ালো না।


সামিটের সামনে বিশাল লাইন, প্রতিটা টিমের জন্য বরাদ্দ দু’মিনিট।

পাশের গাইড কাম শেরপা অস্থায়ী ক্যাম্প থেকে ক্রমাগত ঘোষণা করে চলেছে— আর বেশি দেরি করবেন না, হাই অ্যালটিচিউড। অ্যালটিচিউড সিকনেস হতে পারে। রেস্ট নিতে হলে সামিট ক্যাম্পে গিয়ে রেস্ট নিন যত খুশি। আর যারা হেলিসার্ভিস নেবেন তারা সাউথ কলে গিয়ে লাইন দিন। সেখান থেকে সোজা হেলি সার্ভিস আছে নিচের বেস ক্যাম্প অবধি।


মনে মনে ভাবল, এভারেস্ট ক্লাইম্ব যখন হয়েই গেছে তখন হেঁটে নামছি না, উড়ে যাচ্ছি। কে দেখতে যাচ্ছে? অ্যাচিভমেন্টটাই বড় কথা। হেলিপ্যাডের দিকেই পা বাড়াল কাঁকন।


বেশ কিছুটা নামতেই হঠাৎ আকাশ কাঁপানো আওয়াজ। সঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসছে বরফ আর পাথরের টুকরো। একটা আস্ত হেলিকপ্টার ধাক্কা খেয়ে পাহাড়ের চূড়ায় আছড়ে পড়েছে। কালো ধোঁয়া, আগুনের স্ফুলিঙ্গ আর বিস্ফোরণের শব্দে চারিদিক অন্ধকার দেখছে কাঁকন। হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে—একি! এত তুষারঝড়! মনে হচ্ছে, পুরো পাহাড়টাই যেন নেমে আসছে। দৌড় শুরু করল কাঁকন। মাঝারি আকারের একটা বরফের চাঙরে ধাক্কা খেয়ে বরফের মধ্যে ছিটকে পড়ল। চোখ দুটো কেমন যেন আবছা হয়ে আসছে, শরীরও অবশ হয়ে আসছে।


কাঁকনের বাড়ির কথা খুব মনে পড়ছে—মা-বাবা আর ছোট বোনটার কথা। হিমেল ঝোড়ো হাওয়ার সাথে নেমে আসছে তুষারের ঝড়। চোখ আস্তে আস্তে ভারী হয়ে আসছে। সেই আবছা আলোয় সে যেন দেখছে—মানুষ ফিরে যাচ্ছে আধুনিক যুগ থেকে মানবসভ্যতার আদিম তুষারযুগে।


চারিদিকে ধেয়ে আসছে শুধু রাশি রাশি তুষার। ধ্বংসের মাঝে কাঁকন যেন প্রত্যক্ষ করছে তুষারযুগের পুনঃআবির্ভাব।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page