top of page
Search

এপ্রিল ফুল ও একটি গল্প

আজ দোসরা এপ্রিল। গতকাল গেছে পয়লা এপ্রিল। এই দিনটি আমাদের কাছে অন্য অর্থ বহন করে। কী? বলছেন

সমীর চট্টোপাধ্যায়

গতকাল কি আপনি বোকা হয়েছেন? বোকা হওয়ার দিন ছিল গতকাল। গতকালই ছিল ১ এপ্রিল। লোকে বলে পয়লা এপ্রিল মানে এপ্রিল ফুল। সারাবিশ্বে পালিত বহুল প্রচলিত কয়েকটি দিবসের মধ্যে একটি এই এপ্রিল ফুলইউক্রেনের ওডেস্সা শহরে এই দিনটি পূর্ণদিবস ছুটি থাকে। প্রতি বছর এপ্রিল মাসের প্রথম তারিখে পুরো বিশ্বে সড়াম্বরে পালিত হয় এই দিবস। বলা হয়ে থাকে, প্রতিবেশী বা বন্ধুকে বোকা বানানো কিংবা তাদের নিয়ে কৌতুক করার একটি দিন এটা। কেউ কেউ একে ‘অল ফুলস ডে’ বলেও অভিহিত করেন। আর এপ্রিল ফুল দিবসে বোকা হওয়া ব্যক্তিরা হন ‘এপ্রিল ফুল’। এটি ইউরোপীয় এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে খুবই জনপ্রিয় একটি দিন। দিনটিতে পশ্চিমা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমও ভুয়া ও ভূল সংবাদ সরবরাহের মাধ্যমে এপ্রিল ফুল পালন করে থাকেন। অবশ্য তারপরের দিনই, সেই ভূল সংবাদ সম্পর্কে পুনরায় জানিয়ে দেওয়া হয়।

এ দিনের উৎপত্তি আজও আমাদের কাছে রহস্যময়। ইতিহাসের হালখাতা উল্টিয়ে এপ্রিল ফুলের উৎপত্তি নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য আমরা পাইনা। তবে বিভিন্ন দেশের প্রাচীন সাহিত্যে আমরা এপ্রিল ফুল নির্দেশক নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পেয়ে থাকি। কোনও একটি দিনকে আমরা পালন করি, কিন্তু কেন আমরা পালন করি, তাঁর উৎস ও উজানের সন্ধানে মন ছুটে বেড়ায়। তাই মনে হল, আপনাদের যাঁদের আমার মতো অনুসন্ধিৎসু মন, তাঁদেরকে আমার জানা বোঝাটা একটু শেয়ার করি।

ইউরোপে এপ্রিল ফুলের প্রসার ফ্রেঞ্চ জাতির মধ্যে। ফ্রেঞ্চরা ১৫০৮ সাল, ডাচরা ১৫৩৯ সাল থেকে এপ্রিল মাসের প্রথম দিনকে কৌতুকের দিন হিসেবে পালন শুরু করে। ফ্রান্সই প্রথম দেশ হিসেবে সরকারিভাবে নবম চার্লস ১৫৬৪ সালে এক ফরমানের মাধ্যমে ১ জানুয়ারিকে নববর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন । অর্থাৎ তিনি এটি করেন ১৫৮২ সালে ইতালীয়ান পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরী প্রবর্তিত গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডার হিসেবে প্রচলন হওয়ারও আগে। পাশাপাশি ১ এপ্রিল বন্ধুদের উপহার আদানপ্রদানের প্রথা বদলে যায় ১ জানুয়ারি। কারণ তখন বিভিন্ন দেশে জুলিয়ীও ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নিউইয়ার পালিত হত ১ এপ্রিলে। অনেকেই এই পরিবর্তনকে মেনে নিতে না পেরে এদিনই তাদের পুরনো প্রথাসমূহ চালিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু ১ জানুয়ারির পক্ষের লোকজন এদেরকে ফাঁকি দিতে ১ এপ্রিলে ভুয়া উপহার পাঠানোর প্রথা চালু করে।

১৩৯২ সালে ইংরেজি সাহিত্যের কিংবদন্তি কবি জিওফ্রি চচারের ‘দি কেন্টারবেরী টেলস’ কাব্যে এপ্রিল মাসের ১ম তারিখ এবং বোকামির একটা যোগসূত্র পাওয়া যায়। ১৫০৮ সালে ফরাসী লেখক এলোয় এম্যাবেল তার লেখায়, এপ্রিলের ১ তারিখকে ছুটির দিন হিসেবে উল্লেখ করেন। আর দিনটিকে ‘ফিস অব এপ্রিল’ নামে অভিহিত করেন। আবার ১৬৮৬ সালে বৃটিশ কবি জন অব্রে এ দিনটিকে সরাসরি ‘ফুলস হলি ডে’ বা বোকাদের ছুটির দিন বলে অবিহিত করেন।

এপ্রিল ফুলের ইতিহাসে সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটে ১৬৯৮ সালে। এবছরের ১ এপ্রিল ইংল্যান্ডের টাওয়ার অব লন্ডনে ওয়াশিং দ্যা লায়ন্স অনুষ্ঠান দেখানোর নাম করে টিকিট বিক্রি করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে হাজারও দর্শক নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে ভিড় করে। দেখে সেখানে অনুষ্ঠান আয়োজনের নামমাত্র নেই। এভাবে সেদিন হাজারও মানুষকে বোকা বানানো হয়। ইংল্যান্ডের অনেক মানুষ, এ ঘটনা থেকেই এপ্রিল ফুলের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করেন।

এছাড়াও মধ্যযুগে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে মার্চের শেষের দিকে (মার্চের ২৫ তারিখ) নতুন বছর উদযাপন করা হতো। এছাড়া ফ্রান্সের বিভিন্ন জায়গায়ও মার্চে নিউ ইয়ার উদযাপনের পাশাপাশি এপ্রিলের ১ তারিখ পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী ছুটি থাকতো। এসময় জানুয়ারির ১ তারিখ নতুন বছর উদযাপনকারী ব্যক্তিরা মার্চে নতুন বছর উদযাপনকারীদের এপ্রিল ফুল নামে অভিহিত করতো।

তবে এ মতের বাইরে আরও একটি মত আছে। এপ্রিল ফুলের ইতিহাস নিয়ে। অনেকেই মনে করে থাকেন, ১৪৯২ সালে রাজা ফার্দিনান্দ স্পেনের মুসলিম অধ্যুষিত গ্রানাডার অভিমুখে হামলা করেন। এসময় ফার্দিনান্দ শহরের আশেপাশের শস্যক্ষেত জ্বালিয়ে দেওয়ার আদেশ দেন। ফলে শহরের মুসলিমরা খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হন। অচিরেই সেখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দুর্ভিক্ষ যখন মারাত্মক রূপ নেয়, তখন রাজা ফার্দিনান্দ ঘোষণা করেন যে, মুসলমানরা যদি শহরের প্রধান ফটক খুলে দিয়ে নিরস্ত্রভাবে মসজিদে আশ্রয় নেয়, তবে তাদের বিনা রক্তপাতে মুক্তি দেওয়া হবে। এসময় দুর্দশাগ্রস্ত অসংখ্য নারী ও পুরুষের কথা ভেবে খুলে দেওয়া হয় শহরের প্রধান ফটক। মুসলমানরা নিরস্ত্রভাবে শহরের মসজিদগুলোতে আশ্রয় নেয়। এসময় খ্রিস্টান সৈন্যবাহিনী শহরে প্রবেশ করে মসজিদগুলোতে তালা আটকে দেয় এবং শহরের প্রত্যেকটি মসজিদে আগুন লাগিয়ে দেয়। এঘটনায় লক্ষ লক্ষ মুসলিম নারী ও পুরুষ মর্মান্তিকভাবে মসজিদের ভিতরেই প্রাণ হারান। প্রকৃতভাবে মুসলমানদের সহজভাবে বোকা বানানো হয়। অনুমান করা হয়, এই ঘটনাকে এপ্রিলফুল হিসেবে পালন করার রীতি চালু করে খ্রিষ্টান দেশগুলোতে। ভিন্ন মতও পোষণ করেন অনেকেই। কেউ কেউ মনে করেন, ১৪৯২ সালের ওইদিন এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি। যে ঘটনাকে এপ্রিল ফুল-এর উৎপত্তির কারন মনে করা হয়, তা ঘটেছিল ওই বছরের ২ রা জানুয়ারি। ১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারী ইসাবেলা গ্রানাডা প্রবেশ করে এবং ২ জানুয়ারী তা মুসলমানদের কাছ থেকে দখল করে নেয়।

এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকায় এপ্রিল ফুল নিয়ে ভিন্ন একটি মত পাই। এনসাইক্লোপিডিয়া অনুসারে, এপ্রিল ফুলের উৎপত্তি মূলত রোমান উৎসব হিলারিয়া থেকে। যা পালিত হতো ২৫ মার্চ। এরপর ধীরে ধীরে ওই উৎসব আশেপাশের দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পরে। যার ধারবাহিকতায় আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে এপ্রিলফুল।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, এর ইতিহাসের নেপথ্যে অনেক কাহিনি আছে। এক এক দেশে এক এক রকম সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ রয়েছে এই কাহিনির।


কাহিনি ১ ।। ক্যালেন্ডার বদল

সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনি এটাই। ১৫৬৪ সালে ফ্রান্স, দেশের ক্যালেন্ডার বদল করে। এর আগে বছর শুরু হত মার্চের শেষ থেকে। কিন্তু ওই বছর সেটি বদল করে নতুন বছর শুরু করা হয় ১ জানুয়ারি থেকে। এই পরিবর্তন অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। তাঁরা ২৫ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত নতুন বছরের সূচনা পালন করতে থাকেন। যাঁরা পরিবর্তনটি মেনে নেন, তাঁদের বোকাও বানাতে থাকেন। তাঁদের পিঠে কাগজের তৈরি মাছ লাগিয়ে দেওয়া হয়। নতুন ক্যালেন্ডারের পক্ষ যাঁরা, তাঁদের ডাকা হত এপ্রিল ফিশ বলে। সেই থেকেই এপ্রিল ফুলের গল্প শুরু হয়। ‘এপ্রিল ফুল’-এর ইতিহাস নিয়েই এটিই এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রচলিত গল্প।


কাহিনি ২ ।। রোমান তত্ত্ব

রোমান দেবতা প্লুটো যখন তার স্ত্রী পারসিফনকে অপহরণ করে আনেন, তখন পারসিফনের মা সেরিস মেয়েকে খোঁজার অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু পান না। মেয়ে তখন মাটির নীচে। কিন্তু তাঁর মা ‘বোকার মতো’ মাটির উপরে খুঁজতে থাকেন। সেই ‘বোকামি’র কথা ভেবেই নাকি রোমানরা এই দিনটিতে বোকামি দিবস পালন করত।

কাহিনি ৩ ।। ব্রিটিশ কাহিনি

ব্রিটিশ লোককথা বলে, নটিংহ্যামশায়ারের ‘গথাম’ শহর নাকি ছিল বোকাদের শহর। ত্রয়োদশ শতকের নিয়ম ছিল, সে দেশের রাজা যেখানে যেখানে পা রাখবেন, তা হয়ে যাবে রাষ্ট্রের সম্পত্তি। যখন গথামবাসীরা শুনলেন, রাজা আসছেন, তাঁরা নাকি বললেন, ঢুকতে দেবেন না। রাজা সৈন্য পাঠালেন। সৈন্য এসে দেখল সারা শহরে ভয়াবহ কাণ্ড! সবাই বোকার মতো কাজ করছে। তারা ফিরে গিয়ে রিপোর্ট দিল। রাজা বললেন, এমন বোকাদের শাস্তি দেওয়া যায় না। তাই তিনি মাফ করে দিলেন। গথাম স্বাধীন থাকল। সেই থেকে দিনটি ‘বোকা দিবস’।


কাহিনি ৪ ।। জার্মান লোককথা

১৫৩০ সালের ১ এপ্রিল, জার্মানির অগসবারগ শহরে একটি আলোচনাসভা বসার কথা ছিল। আলোচনার ফলের কথা ভেবে অনেকে বিপুল টাকা বাজি ধরেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই সভা বসেই না। বহু মানুষের টাকা গচ্চা যায়। এই বোকামি থেকেই এপ্রিল ফুলের শুরু।


কাহিনি ৫ ।। নেদারল্যান্ডসের কাহিনি

১৫৭২ সালের ১ এপ্রিল। এদিন নেদারল্যান্ডসের ডেন ব্রিয়েল শহরটি স্প্যানিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়। এই দিন বিদ্রোহীরা স্পেনের শাসকদের বোকা বানিয়ে ছাড়ে। তারপর থেকেই নাকি এপ্রিল ফুল পালন করা হয়।


কাহিনি ৬ ।। মুসলিম বিরোধী কাহিনি

এটা কেবল মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত। ৭১১ সালের অক্টোবরে মুসলমানরা কর্ডোভা জয় করেন। মুসলমানরা স্পেন জয় করার পর প্রথমে সেভিলকে রাজধানী হিসাবে ঘোষণা করে। কিন্তু সুলাইমান ইবনু আব্দিল মালিকের যুগে স্পেনের গভর্ণর সামাহ বিন মালেক খাওলানী রাজধানী সেভিল থেকে কর্ডোভায় স্থানান্তরিত করেন। এরপর এই কর্ডোভা শতাব্দীর পর শতাব্দী স্পেনের রাজধানী হিসাবে থেকে যায়। এভাবে পযার্য়ক্রমে বৃহত্তর স্পেন মুসলমানদের নেতৃত্বে চলে আসে। ইসলামি শাসনের শাশ্বত সৌন্দর্য ও ন্যায় বিচারে মুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার মানুষ ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে। সাথে সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিল্প-সভ্যতার ক্ষেত্রে বিস্ময়কর উন্নতি হতে থাকে।

এদিকে ইউরোপীয় খ্রিস্টান রাজাদের চক্ষুশূলের কারণ হয় মুসলমানদের এই অগ্রগতি। ফলে ইউরোপীয় মাটি থেকে মুসলিম শাসনের উচ্ছেদ চিন্তায় তারা ব্যাকুল হয়ে উঠে। অতঃপর আরগুনের ফার্ডিন্যান্ড এবং কাস্তালিয়ার পর্তুগীজ রাণী ইসাবেলা এই দু’জনই চরম মুসলিম বিদ্বেষী খ্রিস্টান নেতা পরস্পর বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়। তারা সর্বাত্মক শক্তি প্রয়োগ করে মুসলমানদের উপর আঘাত হানবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা মুসলমানদের দুর্বলতার সুযোগ খুঁজতে থাকে। এমন এক মুহূর্তে ১৪৮৩ সালে আবুল হাসানের পুত্র আবু আব্দিল্লাহ বোয়াবদিল খ্রিস্টান শহর লুসানা আক্রমণ করে পরাজিত ও বন্দী হন।

এবার ফার্ডিন্যান্ড বন্দী বোয়াবদিলকে গ্রানাডা ধ্বংসের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। একদল সৈন্য দিয়ে বোয়াবদিলকে প্রেরণ করে তারই পিতৃব্য আল-জাগালের বিরুদ্ধে। বিশ্বাসঘাতক বোয়াবদিল ফার্ডিন্যান্ডের ধূর্তামি বুঝতে পারেননি এবং নিজেদের পতন নিজেদের দ্বারাই সংঘটিত হবে এ কথা তখন তার মনেও জাগেনি। খ্রিস্টানরাও উপযুক্ত সুযোগ পেয়ে তাদের লক্ষ্যবস্তুর ওপর দৃষ্টি ফেলে পরিকল্পনা কার্যকর করতে থাকে। বোয়াবদিল গ্রানাডা আক্রমণ করলে আজ-জাগাল উপায়ান্তর না দেখে মুসলিম শক্তিকে টিকিয়ে রাখার মানসেই বোয়াবদিলকে প্রস্তাব দিলেন যে, গ্রানাডা তারা যুক্তভাবে শাসন করবেন এবং সাধারণ শত্রুদের মোকাবেলার জন্য লড়াই করতে থাকবেন। কিন্তু আজ-জাগালের দেওয়া এ প্রস্তাব অযোগ্য ও হতভাগ্য বোয়াবদিল প্রত্যাখ্যান করেন। শুরু হয় উভয়ের মাঝে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ।

ফার্ডিন্যান্ড ও রাণী ইসাবেলা মুসলমানদের এই আত্মঘাতী গৃহযুদ্ধের সুযোগ গ্রহণ করে গ্রাম-গঞ্জের নিরীহ মুসলিম নারী-পুরুষকে হত্যা করে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে দিতে ছুটে আসে শহরের দিকে। অতঃপর রাজধানী গ্রানাডা অবরোধ করে। এতক্ষণে টনক নড়ে মুসলিম সেনাবাহিনীর। তারা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে। তাতে ভড়কে যায় সম্মিলিত কাপুরুষ খ্রিস্টান বাহিনী। সম্মুখ যুদ্ধে নির্ঘাত পরাজয় বুঝতে পেরে তারা ভিন্ন পথ অবলম্বন করে। তারা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় শহরের বাইরের সকল শস্য খামার এবং বিশেষ করে শহরের খাদ্য সরবরাহের প্রধান উৎস ‘ভেগা’ উপত্যকা। ফলে অচিরেই দুর্ভিক্ষ নেমে আসে শহরে। খাদ্যাভাবে সেখানে হাহাকার দেখা দেয়। এই সুযোগে প্রতারক খ্রিস্টান রাজা ফার্ডিন্যান্ড ঘোষণা করে, “মুসলমানেরা যদি শহরের প্রধান ফটক খুলে দেয় এবং নিরস্ত্র অবস্থায় মসজিদে আশ্রয় নেয়, তাহলে তাদেরকে বিনা রক্তপাতে মুক্তি দেওয়া হবে। আর যারা খ্রিস্টান জাহাজগুলোতে আশ্রয় নিবে, তাদেরকে অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। অন্যথা আমার হাতে তোমাদেরকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হবে।”

দুর্ভিক্ষতাড়িত অসহায় নারী-পুরুষ ও বাচ্চাদের কচি মুখের দিকে তাকিয়ে মুসলিম নেতৃবৃন্দ সেদিন খ্রিস্টান নেতাদের আশ্বাসে বিশ্বাস করে শহরের প্রধান ফটক খুলে দেন ও সবাইকে নিয়ে মসজিদে আশ্রয় নেন। কেউবা জাহাজগুলোতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু শহরে ঢুকে খ্রিস্টান বাহিনী নিরস্ত্র মুসলমানদেরকে মসজিদে আটকিয়ে বাহির থেকে প্রতিটি মসজিদে তালা লাগিয়ে দেয়। অতঃপর একযোগে সকল মসজিদে আগুন লাগিয়ে বর্বর উল্লাসে ফেটে পড়ে নরপশুরা। আর জাহাজগুলোকে মাঝ সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। কেউ উইপোকার মতো আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেল, কারওর হল সলিল সমাধি। প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখায় দগ্ধীভূত ৭ লক্ষাধিক অসহায় মুসলিম নারী-পুরুষ ও শিশুদের আর্তচিৎকারে গ্রানাডার আকাশ-বাতাস যখন ভারী ও শোকাতুর হয়ে উঠেছিল, তখন হিংস্রতার নগ্নমূর্তি ফার্ডিন্যান্ড আনন্দের আতিশয্যে স্ত্রী ইসাবেলাকে জড়িয়ে ধরে ক্রূর হাসি হেসে বলতে থাকে, “Oh! Muslim! How fool you are!”

যেদিন এই হৃদয় বিদারক, মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল, সে দিনটি ছিল ১৪৯২ সালের ১ এপ্রিল। সেদিন থেকেই খ্রিস্টান জগৎ প্রতি বছর ১ এপ্রিল সাড়ম্বরে পালন করে আসছে April Fools’ Day তথা ‘এপ্রিলের বোকা দিবস’ হিসেবে। মুসলমানদের বোকা বানানোর এই নিষ্ঠুর ধোঁকাবাজিকে স্মরণীয় করে রাখার উদ্দেশ্যে সমগ্র ইউরোপে প্রতিবছর পহেলা এপ্রিল ‘এপ্রিল ফুল’ দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৪৯২ সালের পয়লা এপ্রিলের এ ঘটনার কোনই উল্লেখ নেই ইতিহাসের পাতায়। A History of Medieval Spain বইতে আমরা পাচ্ছি, ‘১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি ইসাবেলা আর ফারদিনান্দ গ্রানাডায় প্রবেশ করেন। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সেদিন গ্রানাডার শাসক দ্বাদশ মহাম্মাদের কাছ থেকে গ্রানাডার চাবি নেন।’


১ এপ্রিল থেকে বদলে গেছে অনেক কিছু


আয়করে বদল

চলতি অর্থবর্ষ থেকে অর্থাৎ গত কাল থেকেই আয়কর বিধিতে বেশ কিছু পরিবর্তন এসেছে। এটা হওয়ারই ছিল। কিন্তু কার্যকর হয়েছে গতকাল, অর্থাৎ ১ এপ্রিল থেকে। আরেকবার মনে করিয়ে দিচ্ছি সে পরিবর্তন। আয়কর স্ল্যাব থেকে ট্যাক্স রিবেটের সীমা বাড়ছে। আর,

১) আয়করের এই নিয়মের অধীনে ৭ লক্ষ টাকা অবধি আয়ের উপরে করছাড় মিলবে। আগে এই করছাড়ের উর্ধ্বসীমা ছিল ৫ লক্ষ টাকা। ২) নতুন আয়কর নিয়ম অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের সাড়ে ১৫ লক্ষ টাকা বা তার বেশি উপার্জনের উপরে ৫২ হাজার ৫০০ টাকা অবধি ছাড় পাবেন।

৩) বেসরকারি কর্মীদের ক্ষেত্রে লিভ এনক্যাশমেন্টের ক্ষেত্রে সীমা ছিল ৩ লক্ষ টাকা। এবার সেই আর্থিক সীমা বাড়িয়ে ২৫ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

৪) এলআইসির বার্ষিক প্রিমিয়াম যদি ৫ লক্ষ টাকা হয়, তবে নতুন অর্থবর্ষ থেকে তা থেকে উপার্জন আয়করের অধীনে আসবে।

৫) সিনিয়র সিটিজেন স্কিমে সর্বোচ্চ ডিপোজিটের সীমা ১৫ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছে।

৬) ১ এপ্রিল থেকে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকে শর্ট টার্ম ক্যাপিটাল গেইনের অধীনে কর নেওয়া শুরু হয়েছে।

৭) ১ এপ্রিলের পরে মার্কেট লিঙ্কড ডিবেঞ্চারে (MLDs) বিনিয়োগ স্বল্পমেয়াদী মূলধন সম্পদ হিসাবে গণ্য হবে।

৮) ২০২৩ সালের বাজেট পেশ করার সময়, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছিলেন, যদি সাধারণ​ সোনাকে ই-গোল্ডে রূপান্তরিত করা হয়, সেক্ষেত্রে কোনও মূলধন লাভ হিসাবে তা গণ্য করা হবে না। ফলে করও দিতে হবে না।


পয়লা এপ্রিল থেকে UPI-তে ওয়ালেট বা কার্ড দিয়ে পেমেন্ট করলে বসবে চার্জ

UPI-এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা, ন্যাশনাল পেমেন্ট কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া অনলাইন মার্চেন্ট, বড় মার্চেন্ট এবং ছোট অফলাইন ব্যবসায়ীদের ২,০০টাকার উপরে লেনদেনের উপর ১.১% ইন্টারচেঞ্জ ফি ধার্য করেছে।

কলকাতায় পয়লা এপ্রিল থেকেই বেড়েছে পার্কিং ফি

গতকাল অর্থাৎ শনিবার থেকেই কলকাতায় পার্কিং ফি বেড়েছে। অন্তত তেমন কথা। এখন থেকে মোটরবাইকের জন্য ঘণ্টা পিছু ৫ টাকার বদলে ১০ টাকা দিতে হবে। চার চাকা গাড়ির ক্ষেত্রে ঘণ্টা প্রতি ১০ টাকা থেকে বেড়ে পার্কিং ফি হচ্ছে ২০ টাকা। বাস এবং লরির ক্ষেত্রে পার্কিং ফি ২০ টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ শুরু হচ্ছে।

যদিও পুরসভা তরফে খবর মিলেছে, প্রথম দুই ঘণ্টায় পার্কিং ফি অপরিবর্তিত থাকছে। মোটরবাইক ৩ ঘণ্টা থাকলে ৪০ টাকা দিতে হবে, ৪ ঘণ্টা ও ৫ ঘণ্টার জন্য যথাক্রমে ৬০ টাকা এবং ৮০ টাকা দিতে হবে। পাঁচ ঘণ্টা পেরোলেই ঘণ্টা প্রতি ৫০ টাকা গুনতে হবে। চারচাকা গাড়ির ক্ষেত্রে তিন ঘন্টার পর থেকে ধাপে ধাপে ফি হবে ৮০, ১২০, ১৬০ এবং পাঁচ ঘণ্টা পেরোলেই ঘণ্টা প্রতি ১০০ টাকা করে পার্কিং ফি দিতে হবে। চার ঘণ্টা বাস বা লরি রাখার ক্ষেত্রে ২৪০ টাকা করে নেওয়া হবে। পাঁচ ঘণ্টার ফি দিতে হবে ৩২০ টাকা। পাঁচ ঘণ্টার পর থেকে ঘণ্টা প্রতি ২০০ টাকা করে ফি বাবদ দিতে হবে।

১ এপ্রিল থেকে আরও বেড়েছে ওষুধের দাম

গরিব ও মধ্যবিত্তকে চাপে ফেলে ১ এপ্রিল মানে গতকাল থেকে ওষুধের দাম আরও বেড়েছে।

হার্টের অসুখের বিভিন্ন ওষুধ, যন্ত্রণানাশক, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টি–ইনফেক্টিভ (‌সংক্রমণ রোধী)‌–সহ সমস্ত ওষুধের দাম ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

ফি বছর পেনকিলার থেকে অ্যান্টিবায়োটিকের পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির হারের সূচক পরিবর্তন করে ন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল প্রাইসিং অথরিটি (‌এনপিপিএ)‌। গতবছর ওষুধের পাইকারি মূল্যবৃদ্ধির হার ১০.‌৭ শতাংশ বাড়িয়েছিল। এর ওপর বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা দাম নির্ধারণ করে। জ্বর, উচ্চ রক্তচাপ, ত্বকের রোগ, রক্তাল্পতা–সহ প্রায় ৮০০–র বেশি ওষুধের দামের হেরফের হয়। এবার এনপিপিএ–র পদক্ষেপ অনুযায়ী ওষুধের দাম ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। দাম বেড়েছে জীবনদায়ী, জটিল রোগের ওষুধপত্রেরও। কেমিস্টরা বলছেন, ওষুধ তৈরির কাঁচামালের দাম অনেক বেড়েছে। সে–সব জিনিস বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এর ওপর বিভিন্ন শুল্ক, প্যাকেজিং–এর খরচপত্র রয়েছে। সব মিলিয়ে ওষুধের দাম বেড়েই যায়।

জ্বালানি, রান্নার গ্যাস থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। এবার তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওষুধের দামও বেড়েছে।

প্যান, ব্যাংক, আধার, গ্যাস সহ 8 রকমের নিয়মে বদল

প্রত্যেক অর্থবর্ষ শেষ হয় প্রতি বছর ৩১শে মার্চ তারিখেই। এবারে প্যান কার্ড সহ অন্যান্য কার্ডের লিংক, ব্যাংক, গ্যাসের দাম, পেট্রোল, ডিজেল সহ বেশ অনেক কিছুতে এসেছে একাধিক বদল যা সাধারণ মানুষের পকেটে বিশেষ চাপ সৃষ্টি করতে চলেছে। এপ্রিল থেকে কোন কোন নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, একে একে জেনে নেওয়া যাক। গতকাল মানে পয়লা এপ্রিল থেকেই শুরু হচ্ছে নতুন আর্থিক বছর। বেশ কিছু পুরোনো নিয়ম বদলে গেছে এই নতুন অর্থবর্ষে আবার তেমনই কিছু নতুন নিয়ম লাগু করা হয়েছে। কী কী বদলে গেছে ১ এপ্রিল থেকে।

১। প্যান আধার লিঙ্ক কেন্দ্রীয় আয়কর দফতর ইতিমধ্যেই বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে ৩০ জুনের মধ্যে দেশবাসীকে তাদের আধারের সঙ্গে প্যান কার্ড লিঙ্ক করিয়ে নিতে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই দুটি সংযুক্ত করিয়ে নিন। নাহলে প্যান কার্ড নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হবে।

২। ছয় ডিজিটের হলমার্ক গয়না সিদ্ধান্ত হয়, পয়লা এপ্রিল থেকে গহনা বিক্রেতাদের ছয় অঙ্কের সংখ্যা যুক্ত সোনার গয়না বিক্রি করতে হবে। ৬ অঙ্কের HUID ছাড়া এপ্রিল থেকে আর সোনার গয়না বিক্রি করা যাবে না। গতকাল থেকেই লাগু হওয়ার কথা।

৩। ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে নমিনি পয়লা এপ্রিল থেকে ডিম্যাট অ্যাকাউন্টে নমিনি থাকা আবশ্যক করে দেওয়া হয়েছে। আপনি যদি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন বা ভবিষ্যতে করার পরিকল্পনা করে থাকেন, সেক্ষেত্রে আপনাকে এই বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে। অ্যাকাউন্টের নমিনি না থাকলে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে, এমনকি গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট বাতিলও করে দেওয়া হতে পারে। সেবি ইতিমধ্যেই এই নিয়ে সার্কুলার জারি করেছে।

৪। প্রিমিয়াম বৃদ্ধি কেন্দ্রীয় সরকার মার্চ মাসেই ঘোষণা করেছে, এবার থেকে গ্রাহকদের বীমা নিতে গেলে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে গ্রাহক যদি ৫ লক্ষ টাকার বেশি বার্ষিক প্রিমিয়াম পলিসি কিনতে চান, তাহলে তাঁদের আয়ের উপরে কর দিতে হবে সরকারকে। অর্থাৎ নতুন অর্থবর্ষে জনগণের খরচ যে বাড়ছে, তা সহজেই অনুমেয়।

সিগারেট থেকে স্মার্টফোন, দাম বদলেছে

কেন্দ্রীয় বাজেট ২০২৩-এর নীতি শীঘ্রই লাগু হয়েছে। ১ এপ্রিল থেকে নতুন অর্থবর্ষ শুরু হয়েছে। তার সঙ্গে সঙ্গে বদলে গেছে বেশ কিছু জিনিসপত্রের দাম। সেই তালিকায় রয়েছে সিগারেট থেকে শুরু করে স্মার্টফোন। মূল্যবান ধাতু যেমন সোনা এবং প্ল্যাটিনামের দাম বেড়ে যাওয়ায় ১ এপ্রিল থেকে গয়নার দাম আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

দাম বাড়ার কথা

১. রান্নাঘরের বৈদ্যুতিক চিমনির দাম।

২. সোনা, প্ল্যাটিনাম এবং রূপোর পাত্রের দাম।

৩. সিগারেটের দাম।

৪. আমদানিকৃত পণ্যের দাম।

৫. গয়নার দাম।

৬. ছোটদের খেলনা এবং সাইকেলের।

৭. LED টিভির দাম।

দাম কমার কথা

১. কম দামের স্মার্টফোনের সংখ্যা বাড়ার কথা।

২. ইলেকট্রিক যানবাহন আরও সাশ্রয়ী হওয়ার কথা।


bottom of page