top of page

উত্তর ভারতের হেঁশেল থেকে| হিট স্ট্রোকে কী করবেন?| পাখিদের স্নেহ| রবিবারের গল্প: বাদুড় পিশাচ ও সেই তান্ত্রিক


উত্তর ভারতের হেঁশেল থেকে

উত্তর ভারতীয় রান্না ভারতীয় খাদ্যসংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় অধ্যায়। পাঞ্জাব, কাশ্মীর, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, দিল্লি, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের নানা স্বাদ, মশলা ও রান্নার কৌশল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে এই খাদ্যধারা। এই অঞ্চলের রান্নায় ঘি, মাখন, দই, কাজুবাদাম, কিশমিশ ও সুগন্ধি মশলার ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নান, রুটি, পরোটা কিংবা কুলচার সঙ্গে ডাল মাখনি, বাটার চিকেন, রোগনজোশ, ছোলে ভাটুরে বা শাহী পনির— প্রতিটি পদেই রয়েছে ঐতিহ্য ও রাজকীয়তার ছোঁয়া। মুঘল যুগের প্রভাব উত্তর ভারতীয় রান্নাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে, যার ফলে কাবাব, বিরিয়ানি ও কোরমার মতো পদ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। স্বাদের পাশাপাশি পরিবেশনের আভিজাত্যও এই রান্নার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। চলুন চেখে দেখি এমন কিছু জিভে জল আনা পদ।



পাঞ্জাবি স্টাইল রাজমা চাউল

দীপশিখা নাগ



কী কী লাগবে:

২ কাপ রাজমা(সারা রাত জলে ভিজিয়ে রাখতে হবে), নুন, পরিমাণমতো জল

মশলার জন্য: ১ চামচ ঘি, ১ চামচ Shalimar's Sunflower তেল, ২টো মাঝারি মাপের পেঁয়াজ (১ টা কুচানো, ১ টা পেস্ট করা), শুকনো লঙ্কা ২ টো, ১ চামচ গোটা জিরে, ১ চামচ আদা ও রসুন পেস্ট, ১ চামচ Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো, ১ চামচ Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো, ১ চামচ Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো, ১ চামচ ঘি, ২ টো কাঁচালঙ্কা (১টা কুচানো আর ১ টা পেস্ট), ১ চামচ Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো, ১ চামচ Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো, ১ চামচ Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো, ২ টো মাঝারি মাপের টমেটো পেস্ট, সামান্য Shalimar's Chef Spices কসুরি মেথি, ধনে পাতা কুচানো



কীভাবে বানাবেন:

সারা রাত জলে ভিজিয়ে রাখা রাজমা সামান্য নুন দিয়ে প্রেসার কুকারে একটা সিটি দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। তারপরে কড়াইতে ঘি আর সাদা তেল দিয়ে, তাতে একে একে গোটা জিরে, শুকনো লঙ্কা, পেঁয়াজ কুচি দিয়ে হালকা ভেজে তাতে আদা-রসুন বাটা, পেঁয়াজ লঙ্কার পেস্ট, হলুদ, জিরে, ধনে, লঙ্কা, কাশ্মীরী লঙ্কার গুঁড়ো, গরম মশলা আর কুচানো লঙ্কা দিয়ে হালকা কষিয়ে, টমেটো পেস্ট আর নুন দিয়ে ভালো করে কষতে হবে। তারপর সেদ্ধ রাজমা দিয়ে ১৫-২০ মিনিট ফোটাতে হবে মাঝারি আঁচে। সেদ্ধ হয়ে এলে কুচানো ধনে পাতা আর কসুরি মেথি দিয়ে নামিয়ে নিতে হবে।


জিরা রাইসের জন্য : কড়াইতে ঘি, তেজপাতা, দারচিনি, লবঙ্গ, ছোট এলাচ, আস্ত গোলমরিচ, আস্ত জিরে দিয়ে হালকা ভেজে এক ঘন্টা ভিজিয়ে রাখা এক কাপ বাসমতী রাইস, দেড় কাপ জল, স্বাদমতো নুন দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে আধ ঘন্টা ফোঁটাতে হবে। শেষে ধনে পাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন রাজমার সাথে!


কারি পকোড়া

দীপশিখা নাগ



কী কী লাগবে


পাকোড়ার জন্য: পেঁয়াজ ১কাপ, বেসন ১/৪ কাপ, কাঁচা লঙ্কা ১ চামচ, ধনে পাতা ৪ চামচ, আদা-রসুন বাটা ১ চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদগুঁড়ো ১/২চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১/২ চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১/২, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১/২ চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো ১/২ চামচ, বেকিং সোডা ১ চিমটি, নুন, জল, সাদা তেল


কারির জন্য: বেসন ১/২ কাপ, দই ১ কাপ, আস্ত জিরে ১/২ চামচ, কালো সর্ষে ১চামচ, হিং ১/৪ চামচ, মেথি ১/২ চামচ, শুকনো লঙ্কা ২ টো, লঙ্কা কুচি ১ চামচ, রসুন কুচি ১ চামচ, কারি পাতা ৪-৫ টা নুন, Shalimar's Sunflower তেল ২ চামচ, ধনে পাতা ১/৪ কাপ


তড়কা দেওয়ার জন্য: ঘি ২ চামচ, শুকনো লঙ্কা ২ টো, আস্ত জিরে ১/২ চামচ, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো ১/২ চামচ



কীভাবে বানাবেন

পেঁয়াজ, ধনে পাতা, বেসন, হলুদ, জিরে, গরম মশলা, ধনে গুঁড়ো, নুন, বেকিং সোডা আর অল্প অল্প করে জল দিয়ে ভালো করে মেখে বড়া মতো ভেজে নিতে হবে। কারি বানাতে বেসন, দই আর জল দিয়ে ভালো করে মিশ্রণ বানাতে হবে। তেল গরম হলে তাতে হিং, মেথি, কালো সর্ষে, জিরে, কারি পাতা, রসুন কুচি, শুকনো লঙ্কা দিয়ে হালকা ভেজে, বাটিতে হলুদ জল গুলে দিতে হবে। আর একটু ভেজে মিশ্রণ ঢেলে দিতে হবে। তারপরে মাঝারি আঁচে আস্তে আস্তে জল মিশিয়ে নেড়ে যেতে হবে যতক্ষণ না পর্যন্ত ফুটতে থাকে। এবার পকোড়া, নুন, ধনে পাতা দিয়ে নামিয়ে নিতে হবে। শেষে ঘি তে শুকনো লঙ্কা, জিরে, কাশ্মীরি লঙ্কা, রসুন কুচি দিয়ে গরম করে তড়কা দিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।



ধনিয়া চিকেন

সৌমাশ্রী ভট্টাচার্য



কী কী লাগবে

২০০ গ্ৰাম চিকেন, ১/২ কাপ ধনেপাতা পেস্ট, ৩ চা চামচ রসুন বাটা, ৪ চা চামচ কাঁচালঙ্কা বাটা, ১ টেবিল চামচ Shalimar's সর্ষের তেল, স্বাদমত নুন, স্বাদমত চিনি, ১টি তেজপাতা, ১ চা চামচ গোটা গরম মশলা, ২ টেবিল চামচ পেঁয়াজ কুচি, ১ টেবিল চামচ পাতি লেবুর রস, ২ টেবিল চামচ Shalimar's Sunflower তেল



কীভাবে বানাবেন

একটি বাটিতে চিকেন, ধনেপাতা বাটা, রসুন বাটা, কাঁচালঙ্কা বাটা, পাতিলেবুর রস, সর্ষের তেল, নুন দিয়ে মেখে দুই ঘন্টা রাখতে হবে। কড়াইতে তেল দিয়ে, গরম হলে একটু চিনি দিতে হবে। তারপর একে একে তেজপাতা, গোটা গরম মশলা দিতে হবে। পেঁয়াজকুচি দিয়ে ভালো করে ভেজে একটু জল আর চিকেন দিয়ে ভালো করে কষাতে হবে। কম আঁচে ঢাকা দিয়ে কষিয়ে মাখা মাখা করে নামাতে হবে।



শাহী ফিরনি

সৌমাশ্রী ভট্টাচার্য



কী কী লাগবে

১/৪ কাপ বাসমতি চাল (ধুয়ে জল ঝরিয়ে গুঁড়ো করে রাখা), ৭৫০ মি.লি. দুধ, ৮ চা চামচ চিনি গুঁড়ো, ২ চা চামচ কাজু কুচি, ১/২ চা চামচ এলাচ গুঁড়ো, ১ চা চামচ গোলাপ জল



কীভাবে বানাবেন

ফিরনি বানানোর জন্য প্রথমে মিক্সারে ভাল করে ধুয়ে রাখা বাসমতি চাল নিয়ে গুঁড়ো করে নিতে হবে। এবার একটি প্যান গরম করে তাতে দুধ ঢেলে ফুটিয়ে নিতে হবে। গরম দুধের মধ্যে বেটে রাখা চাল ঢেলে সমানে নাড়াতে থাকুন, যাতে দলা বেঁধে না যায়। ততক্ষণ রান্না করতে হবে, যতক্ষণ না দুধ ৩ ভাগের ১ ভাগ হয়ে যায়।

এরপর এর মধ্যে চিনি গুঁড়ো মেশাতে হবে। চিনি দিয়ে ৩-৪ মিনিট নাড়ানোর পর কুচোনো কাজুবাদাম দিতে হবে। চাইলে এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এবার এক চামচ গোলাপ জল দিয়ে দিতে হবে। দুধ ঘন হলে একটু ঠান্ডা করে মাটির পাত্রে ঢেলে ফ্রিজে রেখে দিতে হবে। ঘণ্টা দুয়েক পর ঠান্ডা ঠান্ডা পরিবেশন করুন শাহী ফিরনি।



চিকেন চাঙ্গেজী

মনমিতা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

হাড় সহ মুরগির মাংস ৭৫০ গ্রাম, সাদা ঘন টক দই ১০০ গ্রাম, লেবুর রস ২ টেবিল চামচ, টমেটো ২টি বড়, শাহী গরম মশলা ২ টেবিল চামচ, আদা বাটা দেড় টেবিল চামচ (উচু করে মাপা), রসুন বাটা দেড় টেবিল চামচ (উঁচু করে মাপা), পেঁয়াজ ১ টা বেশ বড় বা দুটো মাঝারি, কাজু ১০-১২ টা, দুধ আধা কাপ, ঘন ক্রীম, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ (উঁচু করে মাপা), Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১/২ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices চাট মশলা ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices কসুরি মেথি, কাঁচালঙ্কা, Shalimar's Sunflower তেল, ঘি এবং নুন



কীভাবে বানাবেন

একটু বড় বড় টুকরো করে কাটা হাড় সহ মুরগির মাংস ভালো করে ধুয়ে পাতলা কাপড় বা টিস্যু পেপার দিয়ে জল টা শুকিয়ে নিন। মাংসে যেন অতিরিক্ত জল না থাকে। টমেটো কেটে মিক্সিতে পেস্ট করে পিউরি বানিয়ে নিন। ঝিরিঝিরি করে পেঁয়াজ কেটে নিন। এবার মাংস কে টকদই , আধ টেবিল চামচ আদা বাটা, আধ টেবিল চামচ রসুন বাটা, ১ টেবিল চামচ শাহী গরম মশলা, ২ টেবিল চামচ টমেটো পিউরি দিয়ে ভালো করে মেখে ম্যারিনেট করে রাখুন অন্তত আধঘন্টা। এক ছোট চামচ টকদই আলাদা রাখবেন যেটা পরে লাগবে। এবার একটি কড়াইতে সাদা তেল ও ঘি মিশিয়ে গরম করুন। তাতে ভালো করে পেঁয়াজ লাল লাল করে ভেজে নিন। ওর মধ্যে কাজু দিন, এবং ভাজা হলে একসাথে পেঁয়াজ ও কাজু একটু ঠান্ডা করে আধ কাপ দুধ এর সাথে বেটে নিন। এবার একটি মোটা বেড় এর কড়াই তে এক চামচ সাদা তেল বা ঘি গরম করে, ম্যারিনেটেড মাংস কে সব ম্যারিনেশন সহ একসাথে দিয়ে, বেশি আঁচে, ঢাকনা না দিয়ে রান্না করতে থাকুন মাংস নরম হওয়া অবধি।



অন্যদিকে আরেকটি কড়াইয়ে দুই টেবিল চামচ ঘি গরম করে তাতে একে একে বাকি থাকা আদা রসুন বাটা, লঙ্কা গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, কাজু ও পেঁয়াজ ভাজা বাটা, বাকি থাকা টমেটো পিউরি, লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে কষাতে থাকুন। এক ছোট চামচ টকদই দিয়ে কষে নিন এবং তারপর এতে দুই চামচ ক্রীম দিন। কষে নিয়ে গ্যাস একটু বন্ধ রাখুন। এবার যে পাত্রে মাংস টা ছিল, তার থেকে মাংস তুলে যে গ্রেভির মতো অংশ টুকু, সেটুকুকে পেঁয়াজ বাটা কষিয়ে বানানো গ্রেভিটার মধ্যে ঢেলে দিন ও দুটো গ্রেভি কে হালকা আঁচে মিশিয়ে দিন। অন্য দিকে যে মাংস গুলো তুলে রেখেছেন সেগুলোকে আবার এক চামচ তেল ও ঘি গরম করে তার মধ্যে দিয়ে একটু দুপিঠ হালকা লাল লাল করে রোস্ট করে নিন। এবার মাংস গুলোকে তেল সহ গ্রেভির মধ্যে দিয়ে দিন, কাঁচালঙ্কা ও বাকি গরম মশলা দিন, একটু নেড়ে চেড়ে ওর মধ্যে আধ কাপ গরম জল দিয়ে ফুটতে দিন। ফুটে ঠিকঠাক ঘনত্ব এলে, তারপর ওর মধ্যে চাট মশলা ও হাতে ক্রাশ করা কসুরি মেথি দিন। গ্যাস বন্ধ করে কিছুক্ষন ঢাকা দিয়ে রাখুন। পরিবেশনের সময় ধনেপাতা একদম কুচি করে ছড়িয়ে আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে, ক্রীম ছড়িয়ে, নান বা রুটির সাথে পরিবেশন করুন ।



মুর্গ আফগানী

মনমিতা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

মুরগির মাংস ৮০০গ্রাম, পেঁয়াজ ১ টা বড়, আদা বাটা ১ বড় চামচ, রসুন বাটা ১ বড় চামচ, ধনেপাতা ১ মুঠো, পুদিনা পাতা যতটা ধনেপাতা তার অর্ধেক, কাজু ১৫ টা, জল ঝরানো টক দই আধ কাপ, Shalimar's Chef Spices কসুরি মেথি পাউডার ১/২ চা চামচ, শাহী গরম মসলা পাউডার ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices চাট মশলা ১ চা চামচ, কাঁচালঙ্কা, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো, ঘি, মাখন, ফ্রেশ ক্রিম, চারকোল, লবঙ্গ ৩-৪ টে



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে মাংসকে নুন ও এক চামচ লেবুর রস, আদা রসুন বাটা, চাট মশলা মাখিয়ে পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট রেখে দিন। এবার টক দই, দু চামচ ফ্রেশ ক্রিম, কসুরি মেথি, গোলমরিচ গুঁড়ো, চাট মশলা, গরম মশলা একসাথে ফেটিয়ে নিন। এবার পেঁয়াজ, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, কাঁচা লঙ্কা, কাজু সব একসাথে বেটে নিন। এবারে মাংসে একে একে ফেটানো দই এর মিশ্রণ, পেঁয়াজ, ধনেপাতা বাটা মিশিয়ে ভালো করে মাখিয়ে নিন। এইভাবে ম্যারিনেট করে রাখুন অন্তত ঘন্টা খানেক। দুই তিন ঘন্টা ম্যারিনেট করতে পারলে আরো ভালো হয়। এবার ফ্ল্যাট কড়াইতে ঘি দিয়ে মাংস গুলোকে ম্যারিনেশন থেকে তুলে এক এক করে প্যান রোস্ট করে গ্রিল করে নিন। মাংসের ধার গুলো যেন একটু পোড়া লাগে। কারণ স্মোকি ফ্লেভার এই মুর্গ আফগানির জন্য খুব জরুরি। প্যান রোস্ট এর জন্য ফ্ল্যাট বটম কোনো পাত্র নেবেন। মাংস গ্রিল হয়ে গেলে কড়াইতে একটু মাখন আর সাদা তেল দিয়ে গরম করুন। এবার ওর মধ্যে মুরগির মাংস তোলার পর থাকা বাকি ম্যারিনেড টা দিয়ে দিন এবং কষাতে থাকুন। খানিকক্ষণ পর মাংসের পিস গুলো দিন এবং সামান্য জল দিয়ে ঢাকা দিয়ে দিন। ১২ মিনিট মতো হালকা থেকে মাঝারি আঁচে ঢাকা দিয়ে রাখুন। গ্রেভি ঘন হয়ে তেল ছাড়লে, গ্যাস অফ করে এক চামচ ফ্রেশ ক্রীম ওতে মিশিয়ে নিন। আর একটা ছোট বাটিতে কাঠ কয়লা আর লবঙ্গ ঘি দিয়ে জ্বালিয়ে মাংসের মাঝখানে বসিয়ে আবার ঢাকা দিয়ে দিন। পাঁচ মিনিট পর খুলে কাঠ কয়লার বাটি বের করে ঢাকা দিয়ে রাখুন। খানিক পরে পরিবেশন করুন রুটি বা নান এর সাথে।



পনিরের আচারি টিক্কা কাবাব

আবিদা সুলতানা



কী কী লাগবে

পনির, টকদই, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো, Shalimar's Chef Spices কসুরি মেথি, Shalimar's Chef কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো, জোয়ান গুঁড়ো, নুন, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো, আমের আচার, Shalimar's সর্ষের তেল, পাতিলেবুর রস, রোস্টেড বেসন, পেঁয়াজ ও ক্যাপসিকাম



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে পনির গুলো ছোট চৌকো করে কেটে নিতে হবে। একই মাপে পেঁয়াজ ক্যাপসিকাম ও কেটে নিতে হবে। এবার ফেটানো টকদই, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, হলুদ গুঁড়ো, গোল মরিচ গুঁড়ো, আমের আচারের তেল, নুন, পাতিলেবুর রস, জোয়ান গুঁড়ো, সর্ষের তেল ও কসুরি মেথি দিয়ে ভালভাবে সব উপকরণ মেখে নিতে হবে। এবার পেঁয়াজ, ক্যাপসিকাম ও পনিরে এই মসলার পেষ্ট মাখিয়ে ৩০ মিনিট রেখে দিতে হবে। এবার কাবাবের কাঠিতে প্রথমে ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজের মাঝে পনির এভাবে সাজিয়ে ফ্রাইং প্যানে তেল গরম করে তাতে সেঁকে নিলেই তৈরী।


চিকেন আওধি বিরিয়ানি

আবিদা সুলতানা



কী কী লাগবে

বাসমতী চাল, চিকেন, দুধ, ফেটিয়ে নেওয়া টকদই, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা গুড়ো, আদা-রসুন পেস্ট, কাঁচা লঙ্কা, গোটা গরম মশলা, লেবু, পেঁয়াজ, Shalimar's Sunflower তেল, নুন, জায়ফল, গোলাপ জল, কেওড়ার জল।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে চিকেন গুলো টকদই, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, আদা বাটা, রসুনের রস, গোটা গরম মশলা, জায়ফলের গুঁড়ো, গোলাপ জল ও কেওড়ার জল দিয়ে ম্যারিনেট হতে দিন। তারপর কড়াইতে তেল দিয়ে তাতে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে অল্প ভেজে মাংস গুলো দিয়ে দিতে হবে। নুন ও হলুদ দিয়ে ভালো ভাবে মিনিট পাঁচেক কষিয়ে নিয়ে দুধ দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। তেল ভাসলে নামিয়ে নিন। এবার মাংস গুলো গ্রেভি থেকে আলাদা করে তেল ও গ্রেভি আলাদা করে রাখুন। এবার চাল ভালো করে ধুয়ে আধঘন্টা ভিজিয়ে রাখুন। একটা পাত্রে জল বসিয়ে তাতে কাঁচা লঙ্কা, গোটা গরম মশলা, নুন ও লেবু দিয়ে ফুটিয়ে নিন। এবার চাল দিয়ে পঞ্চাশ শতাংশ রান্না করে নামিয়ে নিন। একটি হাড়িতে প্রথমে মাংস ও আগে থেকে আলাদা করে রাখা গ্রেভি দিয়ে তার উপর ভাত দিয়ে দিতে হবে। এবার ভাতের উপর দুধে ভেজানো কেশর, গোলাপ জল ও কেওড়ার জল দিন। এবার আলাদা করে রাখা তেল উপর থেকে ছড়িয়ে সব শেষে হাড়ি টি এয়ার টাইট করে অল্প আঁচে দমে বসিয়ে কিছুক্ষণ বাদে গরম গরম পরিবেশন করুন।

হিট স্ট্রোকে কী করবেন?


গ্রীষ্ম যতই বাড়ছে, তাপমাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হিট স্ট্রোকের আশঙ্কাও। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে কংক্রিটের তাপ, যানবাহনের ধোঁয়া, অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকার কারণে বহু মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অনেক সময় সাধারণ ক্লান্তি বা গরম লাগা ভেবে বিষয়টিকে অবহেলা করা হয়, অথচ হিট স্ট্রোক জীবনহানির কারণও হতে পারে। তাই এই বিষয়ে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।


হিট স্ট্রোক হলো শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি মারাত্মক অবস্থা। সাধারণত আমাদের শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্রতার কারণে যখন শরীর আর স্বাভাবিকভাবে তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, তখন শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। অনেক সময় তা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তারও বেশি হয়ে যায়। এই অবস্থায় মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, কিডনি এবং স্নায়ুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। হিট স্ট্রোক যে কারও হতে পারে, তবে কিছু মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। শিশু ও বৃদ্ধদের শরীর দ্রুত জলশূন্য হয়ে পড়ে। আবার যাঁরা দীর্ঘক্ষণ রোদে কাজ করেন, যেমন নির্মাণ শ্রমিক, ট্রাফিক পুলিশ, ডেলিভারি কর্মী, রিকশাচালক বা কৃষক, তাঁদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি অনেক বেশি। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত সতর্কতা প্রয়োজন।



হিট স্ট্রোকের কিছু সাধারণ লক্ষণ রয়েছে। প্রথমে মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা, অতিরিক্ত তেষ্টা পাওয়া, মাথাব্যথা বা বমিভাব দেখা দিতে পারে। পরে শরীর অত্যন্ত গরম হয়ে যায়, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হতে থাকে এবং হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। অনেক সময় রোগী বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন বা অসংলগ্ন কথা বলতে শুরু করেন। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে শরীরের ঘাম বন্ধ হয়ে যায়, যা বিপদের বড় লক্ষণ। কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমেই রোগীকে রোদ বা গরম জায়গা থেকে সরিয়ে ঠান্ডা বা ছায়াযুক্ত স্থানে নিয়ে যেতে হবে। জামাকাপড় ঢিলা করে দিতে হবে যাতে শরীর সহজে ঠান্ডা হতে পারে। ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দেওয়া, ফ্যান চালানো বা মাথা, ঘাড়, বগল এবং কুঁচকির কাছে বরফ বা ঠান্ডা কাপড় দেওয়া যেতে পারে। এতে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমাতে সুবিধা হয়।



রোগী সচেতন থাকলে অল্প অল্প করে জল, ওআরএস, ডাবের জল বা লেবুর শরবত খাওয়ানো যেতে পারে। তবে অজ্ঞান ব্যক্তির মুখে কখনও জল বা খাবার দেওয়া উচিত নয়। এতে শ্বাসরোধের আশঙ্কা থাকে। মনে রাখতে হবে, হিট স্ট্রোক একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা। তাই যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। গরমের সময় কিছু সাধারণ নিয়ম মেনে চললে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। নিয়মিত পর্যাপ্ত জল পান করা অত্যন্ত জরুরি। তেষ্টা না পেলেও বারবার জল খেতে হবে। দুপুর ১১টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত রোদ সবচেয়ে বেশি তীব্র থাকে, তাই খুব প্রয়োজন না হলে এই সময় বাইরে না যাওয়াই ভালো। বাইরে বেরোলে ছাতা, টুপি বা সানগ্লাস ব্যবহার করা উচিত।



পোশাকের ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া দরকার। গরমে সুতির, ঢিলেঢালা এবং হালকা রঙের পোশাক শরীরকে আরাম দেয়। অতিরিক্ত টাইট বা গাঢ় রঙের পোশাক শরীরে তাপ বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে খাবারের দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। গরমে অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবারের বদলে জলসমৃদ্ধ ফল ও হালকা খাবার খাওয়া ভালো। তরমুজ, শসা, ডাবের জল, ঘোল, দই, লেবুর শরবত ইত্যাদি শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।

শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা দরকার। শিশুদের দীর্ঘক্ষণ রোদে খেলতে দেওয়া উচিত নয়। বৃদ্ধদের নিয়মিত জল খাওয়াতে হবে এবং গরম ঘরে একা রাখা ঠিক নয়। অনেক সময় তাঁরা তেষ্টা পেলেও তা বুঝতে পারেন না, ফলে দ্রুত জলশূন্যতা দেখা দেয়।


বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ছে। শহরে গাছ কমে যাওয়া, কংক্রিটের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং দূষণের কারণে পরিবেশ আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে। ফলে হিট স্ট্রোক এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হয়েছে। শুধু ব্যক্তিগত সতর্কতা নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। হিট স্ট্রোককে কখনও হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা নিলে অনেক বড় বিপদ এড়ানো সম্ভব। তাই এই গরমে নিজের পাশাপাশি পরিবারের সকলের দিকেও নজর রাখুন। সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।


পাখিদের সন্তানস্নেহ


আবীর গুপ্ত


মানব সমাজে বাবা-মারা নিজেদের সন্তানদের জন্য কত কী না করে! বাবা মা সন্তানদের জন্য কতদূর যেতে পারে তার এমন কিছু নজির আছে যা শুনলে অবাক হয়ে যেতে হয়। পশুপাখিদের মধ্যেও কি এরকম সন্তান স্নেহ দেখা যায়? পাখিদের ছবি তুলতে গিয়ে বেশ কিছু এ ধরনের অদ্ভুত নজিরের কথা জানতে পেরে অবাক হয়ে গেছি। তাহলে শুরু করা যাক পাখিদের সন্তান স্নেহ নিয়ে এই গল্প।


২০২৪ সালের মে মাসের প্রথম দিকে এক রবিবার সকালে ক্যামেরা কাঁধে চলে গিয়েছিলাম পূর্বস্থলীতে। খবর এসেছিল ওখানে ইন্ডিয়ান প্যারাডাইস্ ফ্লাইক্যাচার-এর বাচ্চা হয়েছে। গিয়ে দেখি অধমের মতো আরো বহু পাগল সেখানে হাজির হয়েছে ছবি তোলার জন্য। সকাল থেকে প্রায় সাত ঘন্টা খুব কাছ থেকে বাবা মার সদ্যোজাত শাবকদের প্রতি আচরণ ও কর্তব্য পালন দেখেছিলাম, বহু ছবিও তোলা হয়েছিল।



ইন্ডিয়ান প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচারে দু'রকমের গায়ের রঙের পাখি দেখা যায়। একটা সাদা ভ্যারাইটি আর অন্যটি রুফাস ভ্যারাইটি। দু রকমের পাখিরই স্ত্রী পাখির লেজ ছোট হয়, কিন্তু গায়ের দেহের রং রূফাস হয়। শুধু পুরুষ পাখিদের মধ্যে রঙের পার্থক্য দেখা যায়। দু রকমের পাখিকেই ক্যামেরা বন্দী করতে পেরেছি যদিও সাদা ভ্যারাইটিকে তার বাসায় পেলেও, তখনও ডিম ফুটে শাবকের জন্ম হয় নি তাই শাবকদের দেখা পাইনি। কিন্তু শাবকদের দেখা পেয়েছি রুপাস ভ্যারাইটির ক্ষেত্রে। মা ও বাবা পাখি ঘুরে ঘুরে পোকামাকড় কিংবা অন্য খাবার সংগ্রহ করে নিয়ে আসছে বাসায় এসে শাবকদের মুখের মধ্যে ঠোঁট ঢুকিয়ে সেই খাবার চিপে তার রসটা ফেলে দিচ্ছে। কারণ শাবকগুলো এত ছোট, এতই শিশু যে ওই খাবার গিলে খাবার ক্ষমতা তাদের নেই। মা ও বাবা পাখি কীট পতঙ্গ চিপে তার নির্যাস বাচ্চার মুখে ফেলে বাকিটা ওই বাসাতেই রেখে দিচ্ছে, পরে আবার সেটা তুলে নিয়ে অন্য জায়গায় গিয়ে ফেলে দিচ্ছে, কখনও বা নিজেই খেয়ে নিচ্ছে। এভাবে ওই ছোট্ট বাসাটিকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখছে যাতে সদ্যোজাত শাবকদের কোন অসুবিধা না হয়। পাখিদের এরকম বহু সন্তান স্নেহের নজির ক্যামেরাবন্দী করা গেছে।



পাখিদের মধ্যেও ঘর বাঁধার আগে পুরুষ ও স্ত্রী পাখিদের মধ্যে পরস্পরকে পছন্দ করার ব্যাপার থাকে। কয়েক প্রজাতির পাখিদের ক্ষেত্রে বিষয়টা বেশ ইন্টারেস্টিং।


অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের বাওয়ার পাখির বিবাহ বাসর দেখলে যে কেউ লজ্জা পেয়ে যাবে, ওদের রুচিবোধের প্রশংসা না করে পারবে না। ছেলে বাওয়ার পাখিরা বিয়ের আগে প্রথমে বাসর ঘরের জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজে বার করে। তারপর সেখানে লেজ দিয়ে খানিকটা জায়গা এমনভাবে ঝাট দেয় যাতে এতটুকু ধুলো বা ময়লা সেখানে না থাকে। তারপর সমান্তরালভাবে দুসারি প্রায় তিনফুট লম্বা কাঠি এমনভাবে মাটিতে পোঁতে যাতে দুধারের সমান্তরাল কাঠিগুলো ভিতরের দিকে নুয়ে থাকে। এরপর নানান রকম রঙিন ফুল, পাতা, পাপড়ি এনে ওই নুয়ে পড়া কাঠিগুলোর উপর সাজিয়ে দেয়। মেঝেতেও ফুলের পাপড়ি, ফুল ছড়িয়ে দিয়ে ফুলশয্যার শয্যা তৈরি করে। এরপর ওই বাসর ঘর রং করার জন্য নানান রঙিন ফল সংগ্রহ করে ঠোঁট দিয়ে চিপে রস বার করে ওই ঘরের উপর ছড়িয়ে দিয়ে রঙিন করে তোলে। রং লাগানোর সময় ঠোঁটে করে পাতা নিয়ে গিয়ে পাতা দিয়ে রং লাগায়। এরপর পাত্রী বা কণে জোগাড় করার পালা। নানারকম কায়দা কানুন লাফালাফি করে মেয়ে বাওয়ারদের খুশি করার চেষ্টা করে। কোনো মেয়ে বাওয়ার খুশি হয়ে ওই ঘরে বা কুঞ্জে এলে তখন তাকে বউ হিসেবে গ্রহণ করে।



বায়া উয়েভার বার্ড (Baya Weaver Bird), বৈজ্ঞানিক নাম প্লোমিয়াস ফিলিপিনাস (Plomieus philippinus), বাংলা নাম বাবুই পাখি, যারা বাসা তৈরির জন্য বিখ্যাত। এরা দেখতে স্ত্রী চড়াই পাখির মতো, শুধু এদের ঠোঁট মোটা আর লেজ ছোটো। ক্ষেতের চারপাশে ঝাঁকবেঁধে থাকে। এদের বাসা তৈরির কৌশলটা এরকম, প্রথমে পুরুষ পাখিরা একটির পর একটি বাসা তৈরি করে যায় কিন্তু কোনোটিই শেষ করে না। স্ত্রী পাখিরা ফাইনাল টাচ দিয়ে শেষ করে। তারপর স্ত্রী পাখিরা ওই বাসাগুলির দখল নেয়। প্রতিটি বাবুই একাধিক বাসা যেমন বানায় তেমনই একাধিক সংসারও পাতে। ঝুলন্ত বাসাগুলি দেখতে বকযন্ত্রের মতো। বাসার ভিতরে আবার ডিম রাখার জন্য আলাদা চেম্বার থাকে। ওই চেম্বারে নরম কাদা লেপে দেয় যাতে ডিম ফুটে শাবক জন্মালে তাদের কোন অসুবিধা না হয়। ২-৪টি ডিম পাড়ে।


পাখিদের সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষ ও স্ত্রী পাখি যৌথভাবে ডিম বা শাবকদের দেখাশোনা করে। শাবকরা যখন উড়তে শিখে যায়, নিজের খাবার নিজেই জোগার করার ক্ষমতা অর্জন করে, তখন বাবা-মাকে ছেড়ে চলে যায়।



সাধারণত বাবা কিংবা মা পাখিরা ডিমে তা দেয় যাতে ডিম ফুটে শাবকের জন্ম হয়। কিন্তু এমন পাখিও আছে যারা মোটেই ডিমে তা দেয় না। ডিমে তা দেওয়ার প্রয়োজন তাপ সৃষ্টির জন্য, যাতে ডিম ফুটতে অসুবিধা না হয়। এই তাপ বেশি বা কম হলে কিন্তু ডিম নষ্ট হয়ে যাবে, শাবকের জন্ম হবে না। অস্ট্রেলিয়ার একধরনের ফেজন্ট পাখি আছে যার নাম মেগাপোডে। ডিম পাড়ার অনেক আগেই, ওরা পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁড়ে একটা গোলাকার গর্ত তৈরি করে। এই গর্তের মাপ মোটামুটি তিন থেকে চার ফুট ব্যাসের আর দু থেকে তিন ফুট গভীর। ওই গর্তে লতাপাতা, বালি, মাটি ইত্যাদি দিয়ে ভরাট করে। বাসাটা মাটির থেকে উঁচু হয়ে থাকে। অনেকটা শঙ্কুর মতো বা আগ্নেয়গিরির মতো দেখতে হয়ে যায়। একটা সরু সুড়ঙ দিয়ে ভিতরে মেয়ে পাখি ডিম পেড়ে বাইরে এসে ওই সুড়ঙের মুখও বন্ধ করে দেয়। ওই ঢিপির ভিতরে ডিমের জায়গায় উষ্ণতা যদি সঠিক না থাকে তবে ডিম নষ্ট হয়ে যাবে। তাই, বাবারা মাঝে মাঝেই ঢিপিতে গর্ত করে মুণ্ড ভিতরে ঢুকিয়ে ভিতরের অপমাত্রা দেখে নেয়। কমে গেলে ঢিপির উপর আরো লতাপাতা চাপায় আর বেড়ে গেলে কিছু লতাপাতা, বালি ঢিপির উপর থেকে সরিয়ে নেয়। কিন্তু ওরা কী করে কোন অঙ্গের সাহায্যে ভিতরে সঠিক তাপমাত্রা আছে কিনা তা বুঝতে পারে তা এখনও বিজ্ঞানীরা সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি।



মেয়ে ধনেশ পাখিদের ভাগ্য দারুণ ভালো। ডিম পাড়ার আগে থেকে শুরু করে ডিম ফুটে শাবকের জন্ম হওয়া অবধি বাবারা যা করে তা নজিরবিহীন। ডিম পাড়ার আগে মেয়ে ধনেশরা কোনোও একটা গাছের গুড়ির গর্ত খুঁজে বার করে তাতে ঢুকে পড়ে। তারপর কাদামাটি, নিজেদের বিষ্ঠা দিয়ে ওই মুখ বন্ধ করে দেয়। শুধু সরু একটা ছিদ্র রেখে দেয়। তারপর মেয়ে ধনেশ পাখি ভিতরে বহাল তবিয়তে খোসমেজাজে থাকে আর বাইরে ভাবী বাবাকে হুকুম করে খাবার-দাবার জোগান দিতে। বাইরে ভাবী বাবা সারাদিন না খেয়ে না দেয়ে ওই সরু ছিদ্র দিয়ে বউকে খাবার সাপ্লাই করে যায়। এমনকী শাবক জন্মানোর পরও বেশ কয়েকদিন এরকম করতে হয়। শাবক জন্মানোর পর স্বাভাবিক ভাবেই পরিশ্রম আরো বাড়ে কারণ তখন তো পেটের সংখ্যা একাধিক। তারপর তিনমাস বাদে যখন মা ও শাবকরা বাইরে আসে তখন মায়ের আয়তন দ্বিগুণ আর বাবা অর্ধেক! Conservation of mass!


পাখিরা গরম রক্তের প্রাণী আর ওদের পালক ওদের দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। শীতপ্রধান অঞ্চলের পাখিদের নিজের দেহকে গরম রাখার জন্য, ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রযোজন হয়। নিজেদের দেহকে গরম রাখার ব্যাপারে চ্যাম্পিয়ান হল এমপারার পেঙ্গুইন (বৈজ্ঞানিক নাম অ্যাপটেনোডাইটেস্ ফস্টেরি)। এরা নিজেদের দেহকে গরম রাখার ব্যাপারে চ্যাম্পিয়নই শুধু নয় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছে। এই পেঙ্গুইনরা অ্যান্টার্কটিকার বাসিন্দা। অ্যান্টার্কটিকা পৃথিবীর শীতলতম অঞ্চল। শীতকালে অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা -৫০° সেন্টিগ্রেড অবধি নেমে যায়। শুধু তাই নয়, ওই প্রচণ্ড ঠান্ডার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলে ঝোড়ো বাতাস যার গতিবেগ ঘণ্টায় প্রায় ৩০০ কিলোমিটার। এই পরিবেশে টিকে থাকার জন্য ওদেরকে নিজেদের দেহের এবং আচরণে বেশ কিছু পরিবর্তন ঘটাতে হয়েছে। এই প্রচণ্ড ঠান্ডায় কোনো পাখিই নতুন শাবকের জন্ম দিতে পারে না। এমনকি অন্যান্য প্রজাতির পেঙ্গুইনও এ ব্যাপারে অক্ষম। তাহলে ওদের শরীর গরম রাখার রহস্যটা কী?


প্রথমত নিজের কাজকর্মকে নিয়ন্ত্রিত করা যাতে ওই প্রচণ্ড ঠান্ডায় বেশি শক্তিক্ষয় না হয়। দ্বিতীয়ত দেহের সঙ্গে নিচে থাকা বরফের যত কম সংস্পর্শ হয় ততই ভালো। তাই, হাঁটাচলার সময় ওদের গোড়ালি শূন্যে থাকে আর আঙুলে ভর দিয়ে হাঁটে। ঠান্ডা বাড়লে কিংবা পরিবেশ আরো খারাপ হলে ওরা ওদের ডিম বা সদ্যোজাত শাবকদের পায়ের পাতার ওপর রাখে যাতে শক্তি সঞ্চয় করা যায়। এমনকী এরকমভাবে ওরা হাঁটতেও পারে। তৃতীয়ত ওরা এমন একটি পদ্ধতি বার করেছে যা ওদের ওই ঠান্ডায় নিজের দেহকে গরম রাখতে সাহায্য করে। সেটি হল জমায়েত বা হাডল (Huddle) পদ্ধতি। দশ বর্গমিটার জায়গায় যদি ছ-হাজার পাখি একত্রিত হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে তাহলে সেখানে গরম তো হবেই। বাচ্চাদের হাডলের মধ্যে রাখে। এতে দেখা গেছে প্রায় ২৫-৫০% তাপমাত্রা ক্ষয় আটকানো যায়। এই অবস্থায়, সমস্ত পেঙ্গুইনকে একসঙ্গে হেঁটে ১০০-২০০ মিটার অবধি যেতেও দেখা গেছে।


জাভা স্প্যারো পাখিটি সুন্দর দেখতে বলে বাড়িতে শোভা বাড়ানোর জন্য এদেরকে খাঁচায় পুরে বাড়ির অন্দরমহলে বা বসার ঘরে রাখা হয়। বন্দী অবস্থায় এদের প্রজনন ক্ষমতা অটুট থাকে, এটাও এদের একটি বড়ো গুণ। এরা নানারকম রংযুক্ত হয়। সবচেয়ে পরিচিত পাখিটির রঙের বাহার এরকম, দেহ নীলচে ধূসর, মাথা কালো, তলপেটের কাছটা গোলাপি আভাযুক্ত, লেজ কালো আর কানের কাছটা সাদা। এদের ঠোঁট গোলাপি আর সাদা রঙের। পাখিটি লম্বায় পাঁচ ইঞ্চির মতো, যেখানে আমাদের পরিচিত চড়াই পাখির দৈর্ঘ্য ছয় ইঞ্চি, মাত্র এক ইঞ্চি কম। এই পাখিটির আসল বাসস্থান হল জাভা এবং বালির দ্বীপসমূহ, তবে কলকাতার চিড়িয়াখানা থেকে শুরু করে অনেকের বাড়িতেই হয়তো পাখিটিকে দেখা যাবে। সরকার আইন করে দেশি পাখিকে খাঁচায় পোষা বন্ধ করলেও এখনও বিদেশি পাখিকে খাঁচায় পোষা রমরমিয়ে চলছে।


জাভা স্প্যারোর বৈজ্ঞানিক নাম পাড্ডা অরিজিভোরা। নামটি কতটা তাৎপর্যপূর্ণ তা এদের খাদ্যাভ্যাস শুনলেই বোঝা যাবে। এদের প্রধান খাদ্য ধান। বন্দী অবস্থাতেও এরা ধানই খেতে চায় তবে একান্তই না পেলে জীবনধারণের জন্য অন্য খাবার খেতে বাধ্য হয়। অন্য খাবার মানে সবুজ ফল/পাতা, বীজ থেকে ছোটোখাটো কীটপতঙ্গ ইত্যাদি। প্রজনন ঋতুতে স্ত্রী পাখিকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য পুরুষ পাখিরা ঠোঁট এদিক ওদিক দুলিয়ে লেজ নাড়িয়ে ঘাড় বেঁকিয়ে নিজের প্রেম নিবেদন করে। স্ত্রী পাখি খুশি হয়ে কাছে এলে তখন গান গাওয়া শুরু করে। যদি স্ত্রী পাখি পুরুষ পাখির প্রেম নিবেদনে খুশি না হয়ে তাকে প্রত্যাখান করতে চায় তখন স্ত্রী পাখি হয় পুরুষটির ঘাড়ে মাথা রাখে অথবা ঠোঁট দিয়ে তাকে আক্রমণ করে।


মিলন শেষে বাসা বাঁধার পালা। ঘাস, পাতা, ডাল ইত্যাদি দিয়ে বাসা তৈরি হয়। সাধারণতঃ পুরুষ পাখিরা বাসা তৈরির দায়িত্ব নেয়। স্ত্রী পাখি জিনিসপত্র যোগাড় করে এনে সাহায্য করে। সবশেষে পালক দিয়ে বাসার কিনারা মোড়া হয় যাতে বাসাটি শক্তসমর্থ শুধু নয়, বাসার ডালপালা থেকে শাবক যেন খোঁচা না খায়। পুরুষ আর স্ত্রী উভয়েই ডিমে তা দেয়। তিন সপ্তাহ বাদে শাবকের জন্ম হয়। এমনি চড়াই পাখিদের মতোই শাবকের গায়ে তখন কোনও লোম বা পালক কিছুই থাকে না। বাবা মা উভয়েই শাবককে খাওয়ানো থেকে সবরকম দেখভালের দায়িত্ব নেয়।

বাদুড় পিশাচ ও সেই তান্ত্রিক


ফটিকচাঁদ বন্দ্যোপাধ্যায়


কালিয়াগড় গ্রাম। সামনে গভীর জলের পদ্মদিঘি। তারই পাড়ে বুড়ো বট গাছ ,সঙ্গে বিরাট আকারের বেল, দুটো গাছ যেন মা তার কোলে সন্তান।সারা বছর কালী ,শীতলা, শিব, ষষ্ঠী নানান পুজোয় গ্রামের জেলে পাড়ার পরিবার গুলো মেতে থাকে। কিন্তু কাল রাতের বিধ্বংসী ঝড়ে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। গ্রামে টালি,টিনের ঘরবাড়ি ,গাছপালা অনেক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু বটতলায় এসে সকলের মন খারাপ। গাছের ডালপালা অল্প বিস্তর নষ্ট হয়েছে । কিন্তু বেলগাছ কোমড় থেকে ভেঙে ঝুলছে। লাউয়ের মত বেল যেমন মিষ্টি তেমনি মাখনের মতো। গ্রামের বিশ্বাস, এসব শিবের প্রসাদ মাহাত্ম।

সন্ধ্যে হতেই জেলেপাড়ার শখানেক মানুষ গুটি গুটি পায়ে বটতলায় হাজির হয়। অভয় জ্যাঠা , সতীশ কাকা , থানের কোনায় বসে। বাকি সবাই দাঁড়িয়ে।

- অশুদ্ধ একটা তো হয়ছে। নয়তো পোয়াতি বেল গাছটা ভাঙবে কেন? কতো গুটি এসেছিল।রমলা মাসীর কথায় গুপী বলে, পাপ পুন্নি যাই থাক, ঝড় বেকায়দায় হয়েছে।

- দেখো, এখন এসব ভেবে লাভ নেই, বরং আগামী চৈত্রে গাজনের আগে কি করা যায়, সেটাই ভাবো। দরকার হয় ভাঙা গাছ কেটে নতুন চারা লাগাও।সতীশ কাকার কথায় অভয় জ্যাঠা সম্মতি দেয়।

এরই মধ্যে পঞ্চায়েত মেম্বার গোকুল কীর্তনিয়া আসে। একবার চোখ বুলিয়ে বলে,, ঠাকুরের খোলা থান,ঝড়বৃষ্টি হবেই। কিন্তু সামনে গাজন, সেটা আগে ভাবো।

আলো কাকি থান শুদ্ধর উপায় বলে ,পূজা তো হইবো, আগে ওই ব্যালগাছ গঙ্গায় দিতে হইবো। তিন ঘড়া দুধ দিয়া থান শুদ্ধি করবা। নচেৎ মহাবিপদ।

আলোচনা চলতে থাকে। জেলে পাড়ার মেয়ে বউ সকলেই বেলগাছ কাটার বিরুদ্ধে। অথচ ভাঙা গাছের কি হবে?অবশেষে ব্যানার্জি দিদার উপদেশ সকলেই শোনে। ঠিক হয়, কোনও শুভ দিনে পুরোহিত ডেকে ভাঙা বেলকাঠে শিবের যজ্ঞ করে আসন শুদ্ধি করতে হবে। তারপর গাজনের আয়োজন ।

আলোচনা শেষ হলে সকলে বাড়ির পথ ধরে।চারিদিক অন্ধকার নেমে আসে। বিরাট বট গাছের ডালে তখন অসংখ্য বাদুড়ের ডানা ঝাপটানো, তাদের কর্কশ ডাক, সন্ধ্যে হলেই পদ্ম পুকুর পাড়ে পরিবেশ যেন ভয়ার্ত করে তোলে। গুপী, বিনোদ জগা ক্লাবে তাস খেলা শেষ করে বটের নিচ দিয়ে বাড়ি ফেরে। ভাঙা বেল গাছের দিকে তাকিয়ে জগা বলে, সত্যি খুব খারাপ লাগছে বেল গাছের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।

- দেখ,পাতাগুলো কেমন নেতিয়ে পড়েছে। গাছের কষ্ট কেউ বুঝবে না। গুপীর কথা শেষ না হতেই উপর থেকে ছেড় ছেড় করে জল পড়ে। বিনোদ সরে যায়। উপড়ে তাকায়। ওই দেখ, মাথার ওপর এক পাল হনুমান।

জমাট অন্ধকারে ওরা গ্রামে প্রবেশ করে।


পর্ব- ২

ভোর হতেই কালিয়াগড় গ্রাম সহ আশেপাশের অঞ্চলে রটে যায়, বটতলায় ঠাকুরের থানে এক তান্ত্রিক বাবা এসেছেন। শুধু বলছে,বাদুড় পিশাচের ভয়ংকর নজর এখন জেলে পাড়ায়। বেলগাছ ভেঙে ওই থানে পিশাচ ভড় করেছে। কি যে ক্ষতি হবে কে জানে।

দলে দলে গ্রামের মানুষ হঠাৎ তান্ত্রিক দেখে অবাক। তামাটে গায়ের রঙ।কালো কাপড়, মাথায় সোনালী জটা, তার উপরে সাদা কাপড়ে ফেটটি বাধা।গালে দড়ি পাকানো দাড়ি,দু হাতে তিনফেত্তি রুদ্রাক্ষ , গলায় রঙিন পুঁথির অজস্র মালা। কপাল জুড়ে কৈলাশপতির তিন দাগের খড়ি তিলক। প্রথম নজরে ভয় পেলেও মায়াময় চোখের দিকে তাকালে মনের গভীরে প্রশান্তি আসবেই।মাঝে মাঝেই চিৎকার করছে,,ওম হাম হাম সত্রস্তম্ভনায় হাম হাম ওম ফুট |

ইতিমধ্যে গ্রামে বাচ্চা বুড়ো সকলেই উপস্থিত। মানুষজন ঘিরে ধরেছে তান্ত্রিক বাবাজীকে

- ও সাধু ভাই, কোথা থেকে আইছ?এখানে কিসের লাইগ্যা আইলা?

রামলা মাসীর কথায় তান্ত্রিকের কোনও সাড়া নেই।

- বলি কি মতলবে আইছ? এই থান অসুচ লাগছে। পাপ হইছে। শুদ্ধি করণ লাগবো। তুমি বাপু কেটে পরো।নিষ্টারিণীর কাঠ কাঠ কথায় নির্বিকার তান্ত্রিক।

- জানিনে বাপু, এ যে কি ভাষা বোঝে । কিছুই তো কয়না।

হঠাৎ তান্ত্রিক বাবা গর্জে উঠলেন,,

ওম তৎপুরুষায় বিদমহে মহাদেবায় দীমাহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ।

মুহুর্তে তান্ত্রিকের হুঙ্কারে নির্জন পুজোর থানে যেনো বজ্র নিনাদ শোনা গেলো।চোখদুটো রক্ত জবার মতো লাল হয়ে ওঠে, সকলে পিছিয়ে যায়।

রমলা ফিসফিস করে বলে, কি ভাষারে আলো ? আসতে কইতে জানে না? গলা খেকাইয়া কয়,,,

এর মধ্যে গ্রাম সদস্য গোকুল, সতীশ কাকা, অভয় জ্যাঠা, গুপী, নিতাই, ঝটিমনা, পলু সকলেই হাজির। ব্যানার্জী দিদা, কাকন, অণু অনেক মেয়ে বউ ঝি এসেছে। ওদিক থেকে পরেশ গৌড়া বিন্দু অশোক মাছের আড়ত হয়ে সোজা বটের থানে।

কথা শুরু হয়।

তান্ত্রিকেরা নাম গণ্ডকী বাবা। নেপালের গণ্ডকী নদীতীর থেকে ঘুরতে ঘুরতে শিবের থানে। স্বপ্নে বাদুড় পিশাচের খবর পেয়েছে। তন্ত্র সাধনায় এই পিশাচ পাওয়া খুবই কঠিন। তাই হাজির।

- কিন্তু বাবা, এইযে বেল গাছে, এর কি গতি হবে? গাজনের পুজো কি হবে? পাপ হবে না? সতীশকাকার কথায় তান্ত্রিক বাবা হাতের ত্রিশুল ঝাঁকিয়ে বলে, বোম্ব ভোলে, বাবা আছেন, প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবেই।

একমাস এখানে অদৃশ্য পিশাচ তপস্যা করবো।সব শুদ্ধ হয়ে যাবে। তার জন্য চারদিক কালো কাপড়ে আড়াল করতে হবে। অস্তমিত সূর্য। শুধু সকালে এক কাপ চা আর সন্ধ্যাকালে এক গণ্ডুস দুধ, মালসায় এক ফুট আতপের সঙ্গে আলু সিদ্ধ আর তিলপোড়া। এটুকুই যথেষ্ট।

সকলেই মেনে নেয়। কিন্তু সকালের চা আর সন্ধ্যে বেলায় অন্ন দেবে কে?

গ্রামের মেয়ে বউরা কেউ তান্ত্রিক বাবার কাছে আসতে রাজি হয়না। হঠাৎ আলোকাকি বলে ওঠে, ওরে তোরা গৌরীকে বল, বেচারা বিধবা মেয়ে, শুধু পিসির কাছে ঝাঁটা লাথি খায়, তবু ঠাকুর সেবায় যদি সুখ শান্তি ফিরে পায়। ওকে খপর দে, ঠিক পারবে।


পর্ব- ৩

দীর্ঘ প্রায় একমাস চারিদিক টিন দিয়ে ঘেরা, তার বাইরে কালো কাপড়ের বেষ্টনী। শুধু সামনে এক ফালি মাথা গলানো উন্মুক্ত অংশ। সেখান থেকেই গৌরী চা, জল, সেদ্ধ আতপ মালসা, তিলপোড়া জল দেয়। থানের চারিদিক ঝোপঝাড়, সামনে বিরাট পদ্ম দিঘি, পাড়ে সারি সারি তাল নারকেল খেজুর কদবেল গাছ। সবুজ বনানীর মধ্যে ছোটো ছোটো ঘর,জেলেদের শান্ত সংসার, গরু হাঁস ছাগল প্রতিপালন,সঙ্গে জাল আর বিড়ি বাঁধা। সূর্য ডোবার পর গ্রামে কুপি জ্বলে ওঠে,, আর ভোর হলেই জাল হাঁড়ি নিয়ে জেলেদের হাঁকডাক।

সেদিন ভোর অন্ধকার থাকতে বিন্দু অশোক রাস্তায় যেতে গিয়ে হঠাৎ শিবের থানে চোখ যায়। একটা ছায়ামূর্তি বটের ডাল বেয়ে নামছে।

- এই বিন্দু, ওই দেখ, তান্ত্রিক গাছ থেকে নামছে না? রাতে কি গাছে থাকে?

- সেটাইতো দেখছি। কিন্তু হাতে ওটা কি? অন্ধকারে বোঝা যাচ্ছে না। ঐতো পুকুর ঘাটে নামে। কিছু ধুচ্ছে মনে হয়। অশোক উত্তর দেয়।

- নারকেল গাছের আড়ালে চল, দেখি বেটাকে।

বিন্দু অশোক একটু অপেক্ষা করার পর যা দেখে, ভয়তে আঁতকে ওঠে। তান্ত্রিক একটা বিশাল আকার বাদুড় ধরে ঘাটের ধারে আগুন জ্বালিয়ে কি সব করছে। আগুনের লেলিহান শিখায় তান্ত্রিকের মুখ জ্বলজ্বল করছে। ভয়ংকর চোখদুটো রক্তবর্ণ , অগ্নি শিখায় বাদুড় পুড়ছে। ডানা দুটো ঝটপট করছে।এবার তান্ত্রিক বাবা নাচা শুরু করে । পা দুটো যেনো মাটিতে নেই। ওদিকে বটের থানের গুপ্ত ঘর থেকে ধীর পায়ে এক নারী মূর্তি বেরিয়ে আসে।

- এই বিন্দু , ওই দেখ, কে ওটা?

- আরে, এতো আমাদের গৌরী মনে হয়। কি সাংঘাতিক কাণ্ড। ও এখানে কি করছে? বেটা সাধু মহা ধড়িবাজ।

- শব্দ করিস না, শুধু দেখে যা। বলেই দুজনায় মুখে আঙুল দেয়।

মুহুর্তে তান্ত্রিক ঝলসানো বাদুড়কে দু হাতে তুলে আকাশে উড়িয়ে সেই নারী মূর্তির সামনে দাঁড়ায়। নারী এলো চুলে বিকট নৃত্য শুরু করে। তান্ত্রিক ম্যালসায় জল নিয়ে আগুনে দেয়। নারী, বাদুড়ের মতো ডেকে ওঠে। আগুনের লেলিহান শিখা হিলহিল করে উপরে উঠতেই তান্ত্রিক আগুনের ভিতরে প্রবেশ করে। গৌরী ধপ করে বসে পরে।

- এই বিন্দু, কি সাংঘাতিক ব্যাপার। কি হচ্ছে ?

-আরে তন্ত্রমন্ত্রে কতো কি সাধনা আছে জানিস ? চুপচাপ দেখে যা।

মূহুর্তে তান্ত্রিক বাবা আগুন থেকে বেরিয়ে জলে ঝাঁপ দেয়। বিরাট একটা ঢেউ পদ্ম দীঘির জল উথালপাথাল করে।

- এই অশোক, আমার তো হাতপা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।

- আমারও পা অবস হয়ে গেছে। এতো ভয়ঙ্কর দৃশ্য। চল, পালিয়ে যাই। তান্ত্রিক বাবা এক্ষুণি উঠবে। আমাদের ক্ষতি করতে পারে।

ওরা পাশ ফিরতেই দেখে বাবা দূরে দাঁড়িয়ে ডাকছে।

অশোক বিন্দু নির্বাক হয়ে কাছে যায়। সামনে তাকায়। অবাক কাণ্ড। শান্ত নম্র কালো পোশাকের সেই তান্ত্রিক। একটু আগের ভয়ঙ্কর মূর্তি কোথায় !

- যা দেখেছ ভুলে যাও। গ্রামের কেউ যেনো জানতে না পারে,, বাদুড় পিশাচ থেকে মুক্তি লাভের উপায় পেয়ে গেছি। কঠিন সাধনা। তবেই মুক্তি।গ্রামের মুক্তি। গৌরীর মুক্তি। চুপচাপ চলে যা।

বিন্দু নিতাই কোনও কথা না বলে ঠক ঠক করে কাঁপছে। তারপর সাইকেল নিয়ে চলে যায়। একটু পরে ওরা পরেশদের বাড়ির সামনে দাঁড়ায়।

- এই বিন্দু, তান্ত্রিকের সামনে গৌরী ছিলনা? চলতো, বেনু পিসির বাড়ি। গৌরী আছে কি না দেখি।

- তাই চল ।

ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। শুধু পূবের আকাশে এক ফালি মেঘ হলুদ বর্ণ ধারণ করেছে। নির্জন পদ্মদীঘির পাড়ে সবুজ গাছপালার ভিতর থেকে দুএকটা পাখি ডাকছে। দীঘির ওপাশে নিস্তারিনীর বাঁশঝারে হুতুম পেঁচা ডাকছে। পশ্চিম আকাশে তখনও মোমফালি চাঁদ দেখা যাচ্ছে। নির্জন জেলেপাড়া। তার মধ্যে চৌমাথা থেকে চিৎকার, এই গণেশ, জাল গোছা। আবার হাঁক, এই নিতাই, বাদাম বিলে আয়,, ভোর রাতের হাঁক ডাকে জেলে পাড়ার ঘুম ভাঙে।

ওরা গুটি গুটি পায়ে বেনু পিসির বাড়িতে উঠোনে দাঁড়ায়।

- পিসি আছো নাকি? ও বেনু পিসি।

কোনও উত্তর নেই দেখে বিন্দু বলে, টিনের দরজায় টোকা দে।

অশোক ঠক ঠক করতেই ভিতর থেকে পিসির গলা,,কে রে ? অণু নাকি? আইতাছি, আজ কোন পুকুরে যামু? গুগলি পাইমু তো?

কিন্তু বাইরে এসে যেনো ঘুম ভাঙে। বিন্দু অশোক, তোরা এই ভোরকালে?

- পিসি, গৌরী আছে?

-আ মরণ, রাত থাকতে গৌরীর খোঁজ?

- না না পিসি, একটু ডেকে দেবে? আজ শনিবার,তান্ত্রিকের চাল আছে কিনা, তাই জিজ্ঞেস করতাম।

ও গৌরী, গৌরী, অশোক বিন্দু আইছে, কি জিগায় দেখ, আমি একটু বাহ্য করে আসি।

- কও দাদা, এই ভোরকালে?

- গৌরী, তুই রাতে ওই শিবের থানে গেছিলি?

- নাতো দাদা,ঘুমাইছিলাম, কেন দাদা?

- নারে, তোর মতো কারে যেন দেখলাম।অন্ধকারে ভুল হইতে পারে। ঠিক আছে। তুই দুয়ার দে।

গৌরী ঘরে যায়, মনটা খচ খচ করে। ভোরের স্বপ্ন ওরা জানলো কেমনে? সত্যি গৌরী গেছিলো।তান্ত্রিক বাবা স্বপ্নে আইছিল।আগুন, বাদুড়, পদ্ম দীঘির ঢেউ,,, আর তো মনে পরে না।স্বপ্নের কথা ওরা জানলো কেমনে?


পর্ব- ৪

সবে সন্ধ্যে হয়েছে। রোজকার মতো গণ্ডকী বাবা টিনের ঘর থেকে উঁকি দেয়। সামনে চাটাই পেতে জেলে পাড়ার বউ ঝি ছেলে পুলে নিয়ে হাজির। এই কয়েকদিনে সকলেই জেনে গেছে তান্ত্রিক বাবা শাস্ত্রপাঠ ভালোই জানে। তিনি মহাকাল শিবের ভক্ত। তাই এ জীবনে পাপ মুক্ত করতে সকলেই তান্ত্রিকের অমৃত বাণী শুনতে আসে।

আজ সোমবার, ভোলে বাবার পুজোর দিন। তিনু হেজাগ লাইট জ্বালিয়ে গেছে। শুদ্ধ মনে সকলে বসতেই আলো দিদা মাথায় গঙ্গাজল ছিটায়।সকলকে টিপ দেয়। এবার টিনের দরজায় সাগরী টোকা দিতেই বাবা বেরিয়ে আসে। বোম ভোলে,, বিকট চিৎকারে আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠে,,

বাবা সুপরী পাতার বাকলে বসে। রক্ত জবা চোখ, ঢুলু ঢুলু দৃষ্টি, কপাল জুড়ে চন্দন মাটি। রমলা মাসী ধূপ জ্বালায়। সবাই চুপ। বাবা দূরের ধূসর আকাশের দিকে তাকায়। বলতে শুরু করে,,

" শিবের পরম সত্যের সঙ্গে তাঁর শক্তির প্রকাশস্বরূপ এই বিশ্বের প্রতিটি সজীব নির্জীব বস্তুকণাকে সংযুক্ত করে তন্ত্র। তাই মহাতন্ত্রের উৎপত্তি স্থল কৈলাশ ,, বাবা মহেশ্বর থেকে। সেই তন্ত্র স্রোত ধারা পরম্পরায় চলে আসছে। এটি আগম, তবে ছন্দোবদ্ধ। মহা ভারতের সব তন্ত্রশাস্ত্র সার কথা সেই সত্যের সন্ধান দেয়।বলতে বলতে তান্ত্রিক বাবা সামনে কয়েক টুকরো বেল কাঠ নিয়ে হাতের তালুতে ঘষে। মূহুর্তে আগুন জ্বলে ওঠে। আরতির মতো তিনবার হাত ঘুরিয়ে নিচের বেল কাঠ ধরায়। মন্ত্র উচ্চারণ করে।

নমঃ শিবায় শান্তায় কারুণাত্রায়

হেতবে নিবেদিতামি চাত্মানং ত্বং গত্বিং পরমেশ্বরম,,তস্মৈ নমঃ পরমকারণ কারণায় দীপ্তোজ্জ্বলজ্জ্বলিত পিঙ্গললোচনায়!

নাগেন্দ্রহাররকৃত কুন্ডলভূষণা,,,,

দেখতে দেখতে তান্ত্রিক বাবা আগুনের উপরে হাত রেখে ধ্যানস্থ হলেন। চোখ বন্ধ, আগুনের শিখায় গৈরিক মুখমন্ডল যেনো স্বয়ং মহাদেবের আবির্ভাব। সকলেই জোড়হাত করে প্রণাম করে।উলু দেয়। বাবা গম্ভীর গলায় মন্ত্র উচ্চারণ করেন।

ঐঁ প্রমত্তং শক্তিসংযুক্তং বাণাখ্যঞ্চ মহাপ্রভাং।

কামবাণান্বিতং দেবং সংসারদহনক্ষমম্।।

শৃঙ্গারাদি-রসোল্লাসং বাণাখ্যং পরমেশ্বরম্।

এবং ধ্যাত্বা বাণলিঙ্গং যজেত্তং পরমং শিবম্।

সবাই নিস্তব্দ। শুধু বটের শাখায় বাদুড়ের ডানা ঝাপটানো আর চিঁচি শব্দ।

এর মধ্যে কালীবাড়ির পুরোহিত শ্রীদাম এসে বসে। খুব আগ্রহে বাবাকে দেখে। বাবার কথা শোনে।ও পাঠ নিতে চেষ্টা করে। তাই তান্ত্রিক চোখ খুলতেই পুরোহিত জিজ্ঞেস করে,বাবা

বাণেশ্বর শিবলিঙ্গে দশোপচার পূজার মন্ত্রটা যদি একটু বলেন। ভীষন কঠিন। আমি এখনো উদ্ধার করতে পারিনি।

গন্ডকী বাবা দুহাত আকাশের দিকে তুলে চিৎকার করে, জয় বানেশ্বর বাবার জয়। হে মানব শোন তবে ,,,

ঐঁ এতৎ পাদ্যং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ এষঃ অর্ঘ্যঃ বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদমাচমনীয়ং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং স্নানীয়ং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ এষ গন্ধঃ বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং সচন্দনপুষ্পং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং সচন্দনবিল্বপত্রং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ এষ ধূপঃ বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ এষ দীপঃ বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং সোপকরণনৈবেদ্যং বাণেশ্বরশিবায় নিবেদয়ামি।

ঐঁ ইদং পানার্থোদকং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং পুনরাচমনীয়ং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং তাম্বুলং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

ঐঁ ইদং মাল্যং বাণেশ্বরশিবায় নমঃ।

মন্ত্র শেষ হতেই হঠাৎ তান্ত্রিক বাবা এক মুঠো ছাই হাতে তুলে দাঁড়ায়। উপরের দিকে নিক্ষেপ করে চিৎকার করে। এবার বেরিয়ে আয়, আয় বলছি, নিচে নেমে আয়।শিবের থানে ভড় করেছিস? আজই তোর খেলা শেষ।

তান্ত্রিক বাবা কাপালীমন্ত্র বলতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে শঙ্খ উলুধ্বনি আকাশ বাতাস কেঁপে ওঠে । কি ভয়ঙ্কর সেই মন্ত্রের নিনাদ, তার তেজ।,,,

নমস্তে রুদ্রমণ্যব অতি–তা ইসাভে নমঃ |

বহুভ্যো মাতু–তে নমঃ ||

ওম হাম হাম সত্রস্তম্ভনায় হাম হাম ওম ফুট |

মন্ত্র শেষ হতেই দমকা বাতাস।গাছের ডালপালা যেনো ভেঙে পড়বে। তান্ত্রিক বাবা বলে, ভয় নেই, আজই পিশাচ পালাবে,, তারপর দুহাত তুলে বাবা উপরে তাকায় । একটা বিরাট আকারের বাদুড় ঘুরতে ঘুরতে তান্ত্রিকের হাতে। তান্ত্রিক বাবা মূহুর্তে দুহাতে ডানা ধরে নিমেষে বাদুড়ের গলা ছিঁড়ে ফেলে। বাদুড় ছট্ফট্ করছে।বাবা মুণ্ডু ধরে এক ঝটকায় সামনের আগুনে নিক্ষেপ করে। সকলে বিস্ময়ে হতবাক। ভয়তে চোখ বন্ধ করে।

তান্ত্রিক বাবা আগুন থেকে এক মুঠো ছাই নিয়ে আকাশে মিলিয়ে দেয়। হাত জোড় করে মহাকালের উদ্দেশ্যে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে। তীক্ষ্ণ গলায় উচ্চারন করে,,

ওঁ নমঃ শিবায় শান্তায় কারণত্রয়হেতবে।

নিবেদয়ামি চাত্মানং গতিস্তং পরমেশ্বরম্।


পর্ব- ৫

আজ সকাল থেকেই কালিয়াগড় গ্রামে আকাশে বাতাসে রটে যায়, ভয়ঙ্কর বাদুড় পিশাচ মুক্ত হয়েছে শিবের থানে। কিন্তু তান্ত্রিক বাবা কোথায় গেলেন? ভোর থেকেই কানাঘুষো খবর পেয়ে জড়ো হয়েছে বটের তলায়।দুয়েকজন টিনের দরজায় টোকা মেরেছে। কিন্তু ডাকতে সাহস পায়নি। খবর পেয়েই অভয় জ্যাঠা, সতীশ কাকা, গুপী, নিতাই,সকলেই হাজির। একটু পরেই হাজির হয় গ্রামের মাতব্বর মুক্তেশ্বর দাস।কথাবার্তা চলছে। ভিতরে বাবা আছে কি নেই,সেটাই বুঝতে পারছেনা।

হঠাৎ বাংশীর মা জানায় কাল অনেক রাত্রে একজনকে ওই ঘরে ঢুকতে দেখেছে। কিন্তু তান্ত্রিক বাবা নয়। চুল দাড়ি কাটা সাদা ধূতি পড়া কোনও পুরোহিত হবে ।

- এই মরেছে। কি কস তুই? এহানে নেশার আড্ডা হইতো নাকি? আলোকাকির কথায় রমলা মাসি বলে, হইতেই পারে। তান্ত্রিকদের আখড়ায় গাঁজার মদ চরস থাকবেই।ওদের কারন হলো মহা প্রসাদ।

- আরে তোমরা থামবে? আমরা তো বুঝতেই পারছিনা, তান্ত্রিক বাবা ভিতরে আছে নাকি উধাও হয়েছে? সতীশ কাকার কথায় গুপী বলে , কাকা, তাহলে,কালো তিরপোল, টিন খোলা হোক। বেটা মরে গেছে কিনা কে জানে?

ধীরে ধীরে গ্রাম ভেঙে লোক আসে বটের থানে। মানুষের মুখ আটকানো যাচ্ছে না । কেউ বলছে ভণ্ড, কেউ বলছে, সাত্ত্বিক, কেউ বলছে কালা জাদুর তান্ত্রিক,,,

অবশেষে অঞ্চল প্রধান তিনকড়ি দাস এলেন। পদ্মদীঘির পাড়ে তখন হাজার মানুষের ভিড়। বাড়ির কাজকর্ম ফেলে বউ ঝি রা সবাই কোলের বাচ্চা নিয়ে তান্ত্রিকের খোঁজে এসেছে। তাদের এই কদিনে ভালোলাগা, ভক্তি শ্রদ্ধা জন্মেছে।

তিনকড়ি বাবুর জন্য চেয়ার এলো। গ্রামের মাতব্বররা সকলেই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে।

- সতীশদা, অভয়দা,কি চাও তোমরা? পুলিশ ডেকে তাদের হাতে কেসটা ছেড়ে দেবে? নাকি বিষয়টা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে? কথাটা তিনকড়ি কানে কানে ভাসিয়ে দিলেন।

- গুপী প্রথমেই বলে , ব্যপারটা পুলিশে দেওয়া হোক ।

অভয় জ্যাঠা টিপপুনি কাটে ,গ্রামের ব্যাপার, পুলিশ ডাকলে সেটাকি ঠিক হবে?

নিতাই গলা বাড়িয়ে বলে, বাবা তান্ত্রিক মানুষ,ভিতরে মদ গাঁজা কি কি খেতো,কে জানে। বেটা শয়তানের গাছ।আবার লোকজন আসতো বলছে।

পাশ থেকে আলোকাকি হুঙ্কার দেয়, তুই খামোকা লোকটাকে মন্দ বলিস কেন? তোরা যখন রাত দুপুরে মদ গিলিস,বেহাল্লাপনা করিস, সেকালে দোষ নেই?

কথা শেষ না হতেই নিস্তারিণী ঘাড় বেঁকিয়ে সামনে মুখ এনে বলে, তোরা যে ঝগড়া করছিস, আগে দরজা সরিয়ে টিন খুলে দেখ, লোকটা মরলো না অসুখ করলো,,,,

তিনকড়ি নড়ে বসে, ঠিক বলেছো মাসী, এই গুপী, আগে দরজা খোল, টিনের বেড়া সরা,, সব দেখে তারপর সিধান্ত।

গুপী, নিতাই, শিবু,পলাশ সকলে দরজায় ডাকাডাকি,টানাটানি করে। কিন্তু ভিতর থেকে সারা নেই ।

- কাকা, ভিতর থেকে তালা বন্ধ , কি করবো?

পলাশ বলে, দুদিন বাদেই গাজন, থান পরিষ্কার করতে হবে, ভেঙে ফেলাই ভালো।

অবশেষে কুরুল, হাতুড়ি, বাটালি এনে দরজা ভাঙা হয়। কালো ত্রিপল সরিয়ে পাশ থেকে ঘেরাটিন খোলা হয়। কিন্তু সকলে ভিতর দেখে দুহাত কপালে তুলে প্রণাম করে।আলোকাকি জয়ধ্বনি দেয়, জয় বাবা মহেশ্বরের জয়, জয় কৈলাশপতির জয়।

সকলেই বিস্ময়ে হতবাক। হুমরি খেয়ে দেখতে যায়। একি!! ভাঙা বেল গাছের গুঁড়ি নেই, দাঁড়িয়ে আছে শিব শম্ভু দেবাদিদেব মহাদেব ।এক হাতে ত্রিশুল, অন্য হাতে ডমরু,, গলায় অজাগর,, কাঠ খোদাই অপূর্ব মূর্তি। সঙ্গে সঙ্গে শ্রীদাম কে ডাকা হয়। ব্যানার্জী দিদা চলে আসে।এক ঘড়া দুধ দিয়ে বাবাকে স্নান করানো, আসন শুদ্ধি, মেয়ে বউরা ভগবান শিবের মূর্তি দেখে আবেগে আপ্লুত।পুজোর প্রস্তুতি শুরু করে।

ওদিকে ছেলেরা টিন ট্রিপল নোংরা জঞ্জাল সরিয়ে পুকুরের জল দিয়ে মণ্ডপ সাফা করছে।

হঠাৎ বেনুপিসি বটের থানে এসে আছাড়বিছার খায়। ওলো সব্বনাশ হয়ে গেছে, ও মাগো আমার গৌরী কোথায় গেলো গো, ও ভগবান, মেয়েটাকে কেড়ে নিলো গো,,,

সবাই শিব ঠাকুর ফেলে বেনু পিসি কে ধরে। চোখে মুখে জল দেয়। শান্ত করে।

অভয় জ্যাঠা জিজ্ঞেস করে,, গৌরী কে পাওয়া যাচ্ছেনা ? হয়তো আশেপাশে কোথাও গেছে।

- নাগো দাদা,ভোরকাল থেকে অনেক খুঁজেছি,, কিন্তু কোত্থাও নেই। আমার কি হোলো গো, ও গৌরী কোথায় গেলিরে? বলে বেনু পিসি থানে মাথা ঠুকতে থাকে। সবাই জাপটে ধরে।

ভিতর থেকে গুপী চেঁচায়,দাদা, এই দেখো, একটা প্যাকেটে জটা চুল, দাড়ি, কালো কাপড়, কলকে, তান্ত্রিকের ফেলে গেছে ।

- তাহলে মনে হচ্ছে,দুটো মিসিং এর মধ্যে কোনও যোগসূত্র আছে। সতীশ কাকা বলে।

-এদিকে তান্ত্রিক বেপাত্তা। গৌরী ও নেই।পুলিশ ডাকতেই হবে । গুপীর কথায় সকলে যখন সম্মতি দেয়, তখনই বিন্দু জালের হাঁড়ি জাল নিয়ে ভ্যানে করে ঢোকে।

পলাশ, বলাই, উত্তম সকলে বিন্দুকে তিনকড়ি বাবুর সামনে আনে।

- কাকা, বিন্দু বলছে তান্ত্রিককে দেখেছে , শোনো ওর মুখে।

সবাই চুপ হয়।

বিন্দু বলে, ভোর রাতে যখন জাল নিয়ে আসানপুর যাচ্ছিলাম। তখন রেলগেট পড়ে। হঠাৎ দূরে দেখি সাদা ধূতি পড়া নেড়ামাথা একজন দু নম্বর প্লাটফর্মে উঠছে। ঠিক সেই সময় নবদ্বীপ লোকাল আনাউন্স করে।

সঙ্গে সঙ্গে বেনুপিসি হুড়মুড় করে মাটি থেকে উঠে বলে, এই বিন্দু, সঙ্গে গৌরী ছিলো?

বিন্দু একবারটি তাকিয়ে বলে, পিছনে এক মহিলা শাড়ি পড়া ছিল। কিন্তু অন্ধকারে ঠাওর করতে পারিনি।

শ্রীদাম পুরোহিত বলে ওঠে, ও কাকা, তান্ত্রিক গৌরী কে পেয়ে গৃহী হয়ে গেলো নাকি?


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page