top of page

সাবেকি স্বাদের বাঙালি রান্না | ওজন কমাতে ক্রাশ ডায়েট নয় | সম্পর্কে বিশ্বাস, কতটা প্রয়োজন |রবিবারের গল্প: পাঠক আমি ও পাপিয়া


সাবেকি স্বাদের বাঙালি রান্না


বাংলার রান্না শুধু পেট ভরানোর উপায় নয়, এ আমাদের সংস্কৃতি, স্মৃতি আর আবেগের এক অমূল্য ভাণ্ডার। ঘরের রান্নাঘরে মায়ের হাতের গন্ধ, ঠাকুমার মাটির উনুনে ধোঁয়া ওঠা হাঁড়ি, উৎসবের দিন কলাপাতায় সাজানো ভোজ, সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে বাঙালির খাদ্যঐতিহ্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাত্রা বদলেছে, রান্নার ধরনেও এসেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। তবু আজও কিছু স্বাদ থেকে যায় মনের গভীরে, যা আমাদের বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় শিকড়ের কাছে।

এই সংকলনে সেইসব সাবেকি বাঙালি রান্নারই সম্ভার তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলি একসময় প্রতিটি বাঙালি ঘরের নিত্যসঙ্গী ছিল। প্রতিটি রেসিপির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলার মাটি, ঋতু, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং আন্তরিকতা।



আজকের প্রজন্মের কাছে অনেক রান্নাই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত জীবনের ভিড়ে সময়সাপেক্ষ সেই রান্নাগুলি হয়তো আর রোজ তৈরি হয় না, কিন্তু তাদের স্বাদ ও ইতিহাস আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তাই এই প্রয়াস শুধুমাত্র রেসিপির সংগ্রহ নয়, বরং বাংলার হারিয়ে যেতে বসা খাদ্যসংস্কৃতিকে নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার এক আন্তরিক উদ্যোগ। আশা করি, এই সংকলনের প্রতিটি পদ পাঠকদের মনে নস্টালজিয়ার স্বাদ ফিরিয়ে আনবে এবং নতুন প্রজন্মকেও পরিচয় করাবে বাঙালির আসল ঘরোয়া রান্নার সঙ্গে। কারণ সাবেকি রান্নার প্রতিটি গন্ধে লুকিয়ে থাকে এক টুকরো বাংলা, এক টুকরো আপন ঘর।


তিল পটল

মনমিতা কুণ্ডু


কী কী লাগবে

পটল মাঝারি মাপের ৬-৭ টা ( গায়ে একটু খোসা রেখে বাকি খোসা ছাড়িয়ে দুদিকে চিরে নেবেন), সাদা তিল ১ কাপ, জলে ভেজানো খোসা ছাড়ানো চিনেবাদাম ৭-৮ টা, কাঁচালঙ্কা ৪ টে, নুন স্বাদ মত, চিনি ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৪ টেবিল চামচ, জল ১ কাপ।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে সাদা তিল, ২ টো কাঁচালঙ্কা, চিনাবাদাম ও একদম সামান্য জল দিয়ে মিক্সিতে পেস্ট বানিয়ে নিন। এবার প্যানে তেল গরম করে পটলগুলো দিয়ে নাড়তে থাকুন। হলুদ গুঁড়ো ও স্বাদমত নুন দিয়ে ভালো করে ভাজতে থাকুন। তিলের পেস্টটা দিয়ে পটলের সাথে ভালো করে মিশিয়ে নিন। বাকি ২ টো কাঁচালঙ্কা দিয়ে ২-৩ মিনিট নাড়াচাড়া করে জল দিন। ঢাকা দিয়ে অল্প আঁচে ৩-৪ মিনিট ফোটান। তেল ছাড়লে তিল পটল তৈরি। ওপরে সামান্য তিল ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।


নারকেল পোলাও

মনমিতা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

বাসমতি চাল ২৫০ গ্রাম (ভালো করে ধুয়ে আধ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখা), পেঁয়াজ কুচি ১ টা মাঝারি মাপের, নারকেলের দুধ ২ কাপ, কাজুবাদাম আধ কাপ, কিশমিশ আধ কাপ, চিনি ১ টেবিল চামচ, নারকেলের কুচি ১০-১৫ টুকরো, ঘি ২ টেবিল চামচ, Shalimar's Sunflower তেল ১ টেবিল চামচ, ছোট এলাচ ৫ টা, লবঙ্গ ৫ টা, দারচিনি ১ ইঞ্চির স্টিক, তেজপাতা ২ টো, জয়িত্রী ১ টুকরো, নুন স্বাদমত,

জল ২-৩ কাপ।



কীভাবে বানাবেন

ঘি গরম করে কাজুবাদাম, কিশমিশ ও নারকেল ভেজে তুলে নিন।

ওই ঘি তে সাদা তেল মিশিয়ে গরম করে গোটা গরমমশলা দিয়ে সামান্য নেড়ে নিন। সুগন্ধ বেরোলে পেঁয়াজ কুচি দিয়ে হালকা সোনালী হওয়া অবধি ভাজুন। ধুয়ে জল ঝরানো চাল দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে ২-৩ মিনিট নাড়তে থাকুন। নারকেলের দুধ ও জলটা দিয়ে মিশিয়ে নিন। ওতে ভাজা কাজুবাদাম, কিশমিশ, নারকেলের কুচি, নুন ও চিনি দিন। পাত্রের মুখ বন্ধ করে ১০-১২ মিনিট মিডিয়াম ফ্লেমে রাখুন। হয়ে গেলে আঁচ থেকে নামিয়ে ওইভাবে ঢেকে রেখে দিন আরো ১০ মিনিট অথবা পরিবেশনের আগে পর্যন্ত।


ছানার পাতুরি

মনমিতা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

মিহি ছানা বা হাতে চটকে নেওয়া পনির ২৫০ গ্রাম, কাঁচালঙ্কা দিয়ে সর্ষে বাটা ১ টেবিল চামচ, মিহি নারকেল কোরা ১/২ কাপ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, চেরা কাঁচালঙ্কা ৪-৫ টা, জল ঝরানো দই ১ টেবিল চামচ, পোস্ত বাটা ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, নুন স্বাদ মত, ছোট খাতার পাতার মত কচি কলাপাতার টুকরো ৫-৬ টা।



কীভাবে বানাবেন

একটা বড় পাত্রে ছানা/পনির, নারকেল কোরা, সর্ষের তেল, দই, পোস্ত বাটা, সর্ষে বাটা, হলুদ গুঁড়ো ও নুন দিয়ে ভালো করে মেখে নিন। এবার কলাপাতার ওপরে সামান্য তেল মাখিয়ে এই মিশ্রণ ৩ চামচ মতো নিয়ে আয়তাকার করে নিন। ওপরে একটা বা দুটো কাঁচালঙ্কা দিন। কলাপাতা চারদিক থেকে মুড়ে সুতো দিয়ে বেঁধে দিন। পাতুরিগুলো একটা প্লেটে সাজিয়ে প্রায় ৬-৭ মিনিট মাইক্রোওয়েভ ওভেনে রান্না করুন অথবা তাওয়াতে তেল ব্রাশ করে ১০-১৫ মিনিট উল্টে পাল্টে সেঁকে নিন। ব্যস তৈরি সুস্বাদু ছানার পাতুরি।



কচুপাতা ভাপা চিংড়ি

মনমিতা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

মাঝারি মাপের চিংড়ি ২৫০ গ্রাম, দুধ মানকচু পাতা ২০০ গ্রাম (ঝিরি ঝিরি করে কেটে নেওয়া), সর্ষে বাটা ৩-৪ টেবিল চামচ,

পোস্ত বাটা ২ টেবিল চামচ, আদা রসুন বাটা ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, কাঁচালঙ্কা বাটা ১ টেবিল চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৬ চামচ, নারকেল বাটা ২ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমত, লেবুর রস ২ টেবিল চামচ, জল ৪-৫ কাপ, চিনি ১/২ চা চামচ, গোটা কাঁচালঙ্কা ২ টো।



কীভাবে বানাবেন

একটি পাত্রে ৪ কাপ জল গরম করে, তারমধ্যে কচুপাতা, লেবুর রস ও সামান্য নুন দিয়ে প্রায় ৬-৭ মিনিট সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে রাখুন। অন্য একটি প্যানে ৪ টেবিল চামচ সর্ষের তেল নিয়ে গরম করে চিংড়ি মাছ দিয়ে সামান্য নেড়ে নিন। নুন, কাঁচালঙ্কা বাটা, আদা রসুন বাটা, হলুদ গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে ভালো করে নেড়ে নিন। মশলা প্যানে লাগলে সামান্য জল দিয়ে দিন। গ্যাস মিডিয়াম রেখে প্যানে একটা ঢাকনা দিয়ে ২-৩ মিনিট রান্না করুন। ঢাকনা খুলে সর্ষে বাটা, পোস্ত বাটা, নারকেল বাটা ও চিনি মিশিয়ে দিন এবং ভালো করে নেড়ে নিন একবার। কচুপাতা মিশিয়ে দিন ভালো করে। বাকি সর্ষের তেল ও কাঁচালঙ্কা দুটো ওতে দিয়ে ৩-৪ মিনিট রান্না করুন। ব্যস তৈরি কচুপাতা চিংড়ি।



টমেটো পাবদা

রক্তিমা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

৪ টি পাবদা, ১ টি মাঝারী টমেটো বাটা, ১ টি মাঝারী টমেটো কুচি, ২ কোয়া রসুনের কিমা কুচি, ১ টেবিল চামচ কালোজিরে, ৪ টি চেরা কাঁচালঙ্কা, ১ টেবিল চামচ Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো, Shalimar's সর্ষের তেল পরিমান মতো, ১ চা চামচ চিনি, স্বাদমত নুন, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো, গরম জল।



কীভাবে বানাবেন

মাছগুলো নুন, হলুদ, কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো ও তেল দিয়ে কিছুক্ষণ ম্যারিনেড করে রাখুন। সর্ষের তেল গরম করে তাতে মাছগুলো ভেজে তুলে নিন। ঐ তেলে কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা আর রসুন কুচি ফোড়ন দিয়ে টমেটো কুচি, টমেটো বাটা, নুন, হলুদ গুঁড়ো, কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো দিয়ে কষিয়ে ঢাকা দিন। টমেটো কুচি গলে গেলে ঝোলের জন্য গরম জল দিয়ে ভাজা মাছগুলো দিয়ে ফুটিয়ে, চিনি দিয়ে দিলেই তৈরী।


ইলিশ ভাপা

রক্তিমা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

৩ টুকরো ইলিশ মাছ, ৬ টি চেরা কাঁচালঙ্কা, ২ টেবিল চামচ সাদা সর্ষে, ১ টেবিল চামচ কালো সর্ষে, ১ টেবিল চামচ জল ঝরানো টকদই, ১ চা চামচ মিষ্টি দই, ৩ টেবিল চামচ Shalimar's সর্ষের তেল, স্বাদমত নুন, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো, জল।



কীভাবে বানাবেন

মাছগুলো তেল, নুন, হলুদ গুঁড়ো আর কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। সর্ষে আর ২ টো কাঁচালঙ্কা বেটে তাতে নুন, হলুদ, দু রকম দই আর জল দিয়ে ভালো করে ফেটিয়ে তাতে ম্যারিনেটেড মাছগুলো মেখে নিন। এবার একটি স্টিলের টিফিন বক্সে আগে সর্ষের মিশ্রণ ঢেলে ওপর থেকে মাছগুলো বসিয়ে চেরা কাঁচালঙ্কা আর সর্ষের তেল ছড়িয়ে ঢাকনা বন্ধ করে ভাপিয়ে নিলেই তৈরী।


ঠাকুরবাড়ির বিট বাটা

রক্তিমা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

১ টি বিট, ১ টেবিল চামচ পোস্ত, ১ চা চামচ কালো সর্ষে, ২ চা চামচ সাদা সর্ষে, ১ টেবিল চামচ কালোজিরে, ৩ টি কাঁচালঙ্কা, স্বাদমত নুন, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লংকার গুঁড়ো, চিনি, Shalimar's সর্ষের তেল



কীভাবে বানাবেন

বিটের খোসা ছাড়িয়ে টুকরো করে ভাপিয়ে নিন। পোস্ত, সর্ষে, ভাপানো বিট আর কাঁচালঙ্কা একসাথে বেটে নিন। কড়াইতে তেল গরম করে তাতে কালোজিরে, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো আর বিট বাটার মিশ্রন দিয়ে নাড়তে থাকুন। শুকনো হয়ে এলে নুন, চিনি মিশিয়ে ওপর থেকে সরষের তেল ছড়িয়ে গরম ভাতে পরিবেশন করুন।


দই রুই

রক্তিমা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

৫ টুকরো রুই মাছ, ১০০ গ্রাম টকদই, ১/২ চা চামচ বেসন, ১ টি পেঁয়াজ, ১ ইঞ্চি আদা, ৩ টে কাঁচালঙ্কা, ১ চা চামচ চিনি, স্বাদমত নুন, ৪ টেবিল চামচ Shalimar's সরষের তেল, ২ টি ছোট এলাচ, ১ টা ছোট তেজপাতা, ১ ইঞ্চি দারচিনি, ১ টা লবঙ্গ, ১ চা চামচ ঘি, ১ চা চামচ Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো, ১০-১২ টি ধনেপাতার পাতা।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে টকদইতে চিনি, বেসন ও অল্প নুন দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে নিন। এতে স্বাদ ব্যালান্স হওয়ার সাথে সাথে রান্নায় দেওয়া দই ফেটে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমবে। পেঁয়াজ ও আদা একসাথে মিক্সিতে পেস্ট করে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে তার রস টা আলাদা করে নিন। এই রস দিয়েই রান্নাটা হবে। এবার ফেটানো টকদইতে ২ টেবিল চামচ পেঁয়াজ-আদার রস মিশিয়ে নিলেই গ্রেভির মিশ্রণ তৈরী। মাছগুলোতে ভালো করে নুন মাখিয়ে কড়াইতে তেল গরম করে মাছগুলোকে দুপাশে হাল্কা ভেজে তুলে নিন। ঐ তেলেই একে একে তেজপাতা, দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ফোড়ন দিয়ে ফোড়নের গন্ধ বের হওয়া অবধি নেড়ে দই এর মিশ্রণ ঢেলে অনবরত নাড়তে থাকুন। এতে দই ফেটে যাওয়া পুরোপুরি আটকানো যাবে। ঢাকা না দিয়ে রান্নাটা ৫ মিনিট হতে দিয়ে চেরা কাঁচা লঙ্কা ও ভাজা মাছ দিয়ে দিন। মাছগুলো একবার গ্রেভিতে কোট করে প্রতি দিক ৪-৫ মিনিট করে ফুটতে দিন। ঢাকা না দিয়ে মাঝারি আঁচে রান্নাটা হবে। ঘি, গরমমশলা গুঁড়ো, ধনেপাতার পাতা ছড়িয়ে হাল্কা হাতে নাড়াচাড়া করে গ্যাস বন্ধ করে ৩-৪ মিনিট ঢেকে রেখে পরিবেশন করুন দই রুই।


কষা মুরগি

রক্তিমা কুণ্ডু



কী কী লাগবে

১ কেজি মুরগির মাংস, ৪ টি আলু, ২ টেবিল চামচ ফেটানো টকদই, ৩ টি মাঝারি মাপের পেঁয়াজ কুচি, ১ টি বড় টমেটো, ২ টেবিল চামচ আদা-রসুন বাটা, ১০ টি চেরা কাঁচালঙ্কা, ১ চা চামচ Shalimar's Chef Spices শুকনো লঙ্কা গুঁড়ো, ১ টি দারচিনি, ২ টি ছোট এলাচ, ১ টেবিল চামচ Shalimar's Chef Spices লঙ্কার গুঁড়ো, ১ চা চামচ চিনি, প্রয়োজন মতো নুন, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো, Shalimar's সর্ষের তেল, গরম জল।


কীভাবে বানাবেন

মাংস, নুন, হলুদ গুঁড়ো, টকদই, অল্প তেল, কাঁচালঙ্কা, অল্প পেঁয়াজ কুচি ও আদা-রসুনবাটা দিয়ে ম্যারিনেট করে ৩০ মিনিট ঢেকে রেখে দিন। কড়াইতে বাকী তেল গরম করে তাতে নুন, হলুদ গুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো মাখা আলুর টুকরোগুলো ভেজে তুলে নিন। ঐ তেলেই ফাটানো এলাচ, দারচিনি দিয়ে নাড়তে হবে ফোড়নের গন্ধ বের হওয়া পর্যন্ত। এবার চিনি দিয়ে লাল হওয়া অবধি নেড়ে পেঁয়াজগুলো লাল করে ভেজে ওতে আদা-রসুন বাটা, শুকনো লঙ্কা গুঁড়ো, কাশ্মীরী লঙ্কার গুঁড়ো, টমেটো, নুন দিয়ে একটু ভেজে নিন। টমেটো গলে গেলে ম্যারিনেটেড মাংস দিয়ে নাড়াচাড়া করে ঢাকা দিয়ে রাখুন। মাংস পুরো সেদ্ধ হয়ে গেলে এবারে ভালোভাবে জল শোকানো অবধি কষিয়ে নিন। ভাজা আলু দিয়ে গরম জল ঢেলে ফুটিয়ে নিলেই একদম মাখামাখা হলেই তৈরী।


ওজন কমাতে ক্র্যাশ ডায়েট নয়!

নিজস্ব প্রতিনিধি


বর্তমান সময়ে ওজন কমানো যেন এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই চোখে পড়ে— “৭ দিনে ৫ কেজি ওজন কমান”, “কার্বোহাইড্রেট একেবারে বাদ দিন”, “ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করলেই রোগা হবেন”— এমন অসংখ্য দাবি। দ্রুত ফল পাওয়ার আশায় অনেকেই সেই পথে হাঁটছেনও। কেউ দিনের পর দিন না খেয়ে থাকছেন, কেউ আবার ভাত-রুটি পুরোপুরি বাদ দিচ্ছেন। অথচ শরীরের প্রয়োজন, পুষ্টির ভারসাম্য কিংবা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ভাবার সময়টুকুও নিচ্ছেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হল শরীরকে শত্রু ভেবে চলা। অনেকে মনে করেন, যত কম খাবেন তত দ্রুত ওজন কমবে। কিন্তু বাস্তব বলছে উল্টো কথা। অনিয়ন্ত্রিত ক্র্যাশ ডায়েট, দীর্ঘক্ষণ উপোস কিংবা একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাস শরীরের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু ওজন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে মেটাবলিজ়ম, হরমোনের ভারসাম্য, এমনকি মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও পড়তে পারে নেতিবাচক প্রভাব। বিশিষ্ট ডায়েটিশিয়ানদের মতে, স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমানো মানে নিজেকে বঞ্চিত করা নয়। বরং শরীরের প্রয়োজন বুঝে সঠিক পরিমাণে সুষম খাবার খাওয়াই হল মূল চাবিকাঠি। তাই ডায়েট নিয়ে প্রচলিত নানা ভুল ধারণা ভেঙে সত্যিটা জানা জরুরি।



সব কার্বোহাইড্রেট খারাপ নয়

ওজন কমানোর প্রসঙ্গ উঠলেই প্রথম যে খাবারটিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়, তা হল কার্বোহাইড্রেট। অনেকেই মনে করেন, ভাত-রুটি খেলেই মোটা হয়ে যেতে হয়। তাই দ্রুত রোগা হওয়ার আশায় অনেকে কার্বোহাইড্রেট পুরোপুরি বাদ দিয়ে দেন। পরিবর্তে বেশি করে প্রোটিন ও ফ্যাট খেতে শুরু করেন। কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ সব কার্বোহাইড্রেট একরকম নয়। রিফাইন্ড সুগার, ময়দা, প্রসেসড খাবার— এগুলো অবশ্যই সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত। এগুলোকে বলা হয় সিম্পল কার্বোহাইড্রেট। কিন্তু হোলগ্রেন, ওটস, লাল চাল, ডাল, ফল, শাকসবজি— এগুলো হল কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেট, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই ধরনের কার্বোহাইড্রেট শরীরে ধীরে ধীরে শক্তি জোগায়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যায় না। দীর্ঘক্ষণ পেট ভরতি থাকে, বারবার খিদে পায় না। একই সঙ্গে এগুলিতে থাকা ফাইবার হজমে সাহায্য করে এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখে।



কার্বোহাইড্রেট একেবারে বাদ দিলে প্রথম দিকে হয়তো কিছুটা ওজন কমতে পারে। কিন্তু সেটা মূলত জল ও গ্লাইকোজেন কমার জন্য। দীর্ঘমেয়াদে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। মাথা ঘোরা, ক্লান্তি, বিরক্তি, মনোসংযোগের অভাব— এসব সমস্যা দেখা দিতে পারে। অনেক সময় শরীর হঠাৎ মিষ্টি বা জাঙ্ক ফুডের প্রতি তীব্র আকর্ষণ অনুভব করে। ফলে পরে অতিরিক্ত খেয়ে ফেলার প্রবণতা বাড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন কমানোর জন্য কার্বোহাইড্রেট নয়, বরং খারাপ খাদ্যাভ্যাস দায়ী। পরিমাণ বুঝে সঠিক কার্বোহাইড্রেট খেলে শরীর সুস্থ থাকে এবং ওজনও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।


ক্র্যাশ ডায়েটের ভয়াবহতা

আজকাল খুব কম সময়ের মধ্যে রোগা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিয়ে, পার্টি বা কোনও বিশেষ অনুষ্ঠানের আগে অনেকে হঠাৎ করে ‘ক্র্যাশ ডায়েট’ শুরু করেন। কেউ দিনে একবেলা খান, কেউ শুধু ফল খেয়ে থাকেন, কেউ আবার তরল খাবারের উপর নির্ভর করেন। এই ধরনের ডায়েট শরীরের উপর অত্যন্ত খারাপ প্রভাব ফেলে। কারণ শরীর যখন প্রয়োজনীয় ক্যালোরি পায় না, তখন সেটি ‘সারভাইভাল মোড’-এ চলে যায়। অর্থাৎ শরীর বুঝতে পারে খাবারের অভাব চলছে। ফলে সে শক্তি খরচ কমিয়ে ফ্যাট জমিয়ে রাখতে শুরু করে। এতে মেটাবলিজ়ম ধীর হয়ে যায়। ফলাফল কী হয়? প্রথমে ওজন কিছুটা কমলেও পরে তা দ্রুত ফিরে আসে। এমনকি আগের চেয়েও বেশি ওজন বেড়ে যেতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় ‘ইয়ো-ইয়ো এফেক্ট’।

শুধু তাই নয়, ক্র্যাশ ডায়েটের ফলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয়। আয়রন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি১২, প্রোটিনের অভাবে চুল পড়া, ত্বক খারাপ হওয়া, দুর্বলতা, মাসিকের অনিয়ম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া— এমন নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘদিন এই ধরনের ডায়েট চললে হার্ট, কিডনি, লিভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই দ্রুত ওজন কমানোর লোভে শরীরকে না খাইয়ে রাখা কোনওভাবেই স্বাস্থ্যকর পথ নয়।



উপোস আর অনাহার এক নয়

অনেকেই ভাবেন, কম খেলেই ওজন কমবে। তাই দিনের পর দিন ব্রেকফাস্ট বাদ দেন, দুপুরের খাবার এড়িয়ে যান বা দীর্ঘক্ষণ না খেয়ে থাকেন। বিশেষ করে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং জনপ্রিয় হওয়ার পর এই প্রবণতা আরও বেড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, পরিকল্পিত উপোস আর শরীরকে অনাহারে রাখা— এই দু’টি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। ধর্মীয় বা স্বাস্থ্যগত কারণে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে উপোস করলে অনেক সময় উপকার পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু না বুঝে মিল স্কিপ করা শরীরের ক্ষতি ডেকে আনে। সবচেয়ে বড় ভুল হল ব্রেকফাস্ট বাদ দেওয়া। সারারাত ঘুমের মধ্যে শরীর খাবার পায় না। অথচ সেই সময়ও শরীরের কাজ থেমে থাকে না। হৃদস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস, কোষের কাজ— সব কিছু চলতেই থাকে। ফলে সকালে শরীরের শক্তির প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি।


সকালের খাবার না খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায়। এতে ক্লান্তি, মাথা ঝিমঝিম, খিটখিটে মেজাজ দেখা দেয়। পাশাপাশি শরীর মেটাবলিজ়মের গতি কমিয়ে ফেলে। ফলে ক্যালোরি পোড়ানোর হারও কমে যায়। যাঁরা সকালে শরীরচর্চা করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। খালি পেটে অতিরিক্ত শরীরচর্চা করলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পেশির ক্ষয় হতে পারে। তাই ব্রেকফাস্ট কখনও বাদ দেওয়া উচিত নয়। খুব ভারী খাবার না হলেও চলবে। তবে এমন খাবার খেতে হবে যাতে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন এবং ফাইবারের সঠিক ভারসাম্য থাকে। যেমন— ওটস, ডিম, ফল, দই, হোলগ্রেন ব্রেড, চিঁড়ে বা উপমা।



‘ফ্যাট খেলেই মোটা’— এই ধারণাও ভুল

একসময় ফ্যাটকে স্বাস্থ্যর সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করা হত। এখনও অনেকে তেল-ঘি একেবারে বন্ধ করে দেন। কিন্তু সব ফ্যাট ক্ষতিকর নয়। বরং শরীরের জন্য কিছু স্বাস্থ্যকর ফ্যাট অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বাদাম, বীজ, মাছ, অলিভ অয়েল, সর্ষের তেল, অ্যাভোকাডো— এই ধরনের খাবারে থাকা আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট হার্ট ভাল রাখে এবং শরীরের নানা কাজে সাহায্য করে। ফ্যাট শরীরে হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে, কোষকে সুস্থ রাখে এবং ভিটামিন শোষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। একেবারে ফ্যাটহীন ডায়েট করলে শরীরে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। সমস্যা হয় তখনই, যখন অতিরিক্ত প্রসেসড ফুড, ভাজাভুজি বা ট্রান্স ফ্যাট খাওয়া হয়। তাই ফ্যাটকে সম্পূর্ণ বাদ না দিয়ে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।


শুধু ওজন নয়, জরুরি সামগ্রিক স্বাস্থ্য

অনেকেই ওজন মাপার যন্ত্রে সংখ্যা কমলেই খুশি হন। কিন্তু শুধু ওজন কমলেই শরীর সুস্থ হয় না। অনেক সময় শরীরের পেশি কমে গেলেও ওজন কমে যায়। অথচ এতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমানোর অর্থ হল শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট কমানো, পেশি বজায় রাখা এবং শরীরকে কর্মক্ষম রাখা। তাই শুধু ক্যালোরি কমানো নয়, প্রয়োজন সঠিক পুষ্টি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সুষম খাদ্য— এই চারটি বিষয় একসঙ্গে মেনে চললেই দীর্ঘমেয়াদে ভাল ফল পাওয়া সম্ভব।


ডিটক্স ডায়েট কি সত্যিই প্রয়োজন?

অনেকেই মনে করেন, শরীরে জমে থাকা ‘টক্সিন’ বের করতে ডিটক্স ডায়েট জরুরি। তাই শুধু জুস খাওয়া, লেবু-জল খেয়ে থাকা বা বিশেষ পানীয়ের উপর নির্ভর করার প্রবণতা দেখা যায়। চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ মানুষের শরীরে আলাদা করে ডিটক্স করার প্রয়োজন নেই। কারণ শরীরের নিজস্ব ডিটক্স সিস্টেম রয়েছে। লিভার, কিডনি, ফুসফুস এবং ত্বক স্বাভাবিকভাবেই শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়। বরং দীর্ঘদিন শুধুমাত্র তরল খাবারের উপর নির্ভর করলে শরীরে প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টির অভাব দেখা দিতে পারে। তাই ডিটক্সের নামে না খেয়ে থাকার কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।



মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও পড়ে প্রভাব

অতিরিক্ত ডায়েটিং শুধু শরীর নয়, মনকেও প্রভাবিত করে। সবসময় খাবার নিয়ে চিন্তা করা, ক্যালোরি গোনা, পছন্দের খাবার খেতে ভয় পাওয়া— এগুলো ধীরে ধীরে মানসিক চাপ তৈরি করে। অনেকের ক্ষেত্রে তা ‘ইটিং ডিসঅর্ডার’-এর রূপ নিতে পারে। যেমন— অতিরিক্ত খেয়ে ফেলা, তারপর অপরাধবোধে না খেয়ে থাকা, কিংবা খাবার নিয়ে অস্বাস্থ্যকর ভয় তৈরি হওয়া। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডায়েটকে শাস্তি হিসেবে নয়, সুস্থ জীবনের অংশ হিসেবে দেখা উচিত।


কীভাবে হবে স্বাস্থ্যকর ওজন নিয়ন্ত্রণ?

স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চলাই যথেষ্ট। প্রথমত, প্রতিদিনের খাবারে ভারসাম্য রাখতে হবে। ভাত, রুটি, ডাল, মাছ, ডিম, শাকসবজি, ফল— সব কিছুই পরিমাণ বুঝে খেতে হবে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকা চলবে না। অল্প অল্প করে নির্দিষ্ট সময় অন্তর খাবার খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থির থাকে। তৃতীয়ত, পর্যাপ্ত জল খাওয়া জরুরি। অনেক সময় শরীরের জল কমে গেলে খিদের অনুভূতি বাড়ে। চতুর্থত, নিয়মিত শরীরচর্চা অত্যন্ত প্রয়োজন। জিমে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়। হাঁটা, যোগব্যায়াম, নাচ বা সাইক্লিং— যে কোনও শারীরিক কার্যকলাপই উপকারী। সবশেষে, পর্যাপ্ত ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কম ঘুম হলে শরীরে এমন কিছু হরমোনের পরিবর্তন হয়, যা অতিরিক্ত খিদে বাড়িয়ে দেয়।



সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন

ওজন কমানোর কোনও শর্টকাট নেই। শরীরকে না খাইয়ে, একঘেয়ে ডায়েট করে বা হঠাৎ করে খাবার বাদ দিয়ে হয়তো কিছুদিনের জন্য ওজন কমানো সম্ভব। কিন্তু তাতে শরীরের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা থেকেই যায়। সুস্থভাবে বাঁচতে গেলে প্রয়োজন সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং নিজের শরীরের প্রতি দায়িত্বশীল মনোভাব। মনে রাখতে হবে, ডায়েট মানে বঞ্চনা নয়— ডায়েট মানে শরীরকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি দিয়ে সুস্থ রাখা। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার ট্রেন্ড নয়, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলুন। কারণ রোগা হওয়ার চেয়ে সুস্থ থাকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সম্পর্কে বিশ্বাস, কতটা প্রয়োজন?


-নিজস্ব প্রতিনিধি


প্রেম টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সম্মান, বিশ্বাস ও বোঝাপড়া। আজকের দ্রুতগতির জীবনে সম্পর্ক তৈরি হয় খুব সহজে, আবার ভেঙেও যায় মুহূর্তে। সোশ্যাল মিডিয়া, চ্যাট, ফোনকল কিংবা কর্মক্ষেত্রে আলাপ সব মিলিয়ে মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লেও, সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ভাল লাগা, আকর্ষণ, ঘনিষ্ঠতা এসবই কি প্রেম? নাকি প্রেমের জন্য প্রয়োজন আরও কিছু? বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আবেগ নয়, একটি সুস্থ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সবচেয়ে জরুরি হল পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস এবং বোঝাপড়া। ভালবাসা আসলে এক জটিল অনুভূতি। এতে যেমন আবেগ রয়েছে, তেমনই রয়েছে দায়িত্ববোধও। একজন মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতে ভাল লাগা, তার উপস্থিতিতে আনন্দ পাওয়া বা শারীরিক আকর্ষণ অনুভব করা প্রেমের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সম্পর্কের ভিত তৈরি হয় পারস্পরিক বিশ্বাসের উপর। সেখানে একে অপরকে নিজের মতো করে গ্রহণ করার মানসিকতা থাকে। সাইকোলজিস্ট লিও বুসালিয়া ভালবাসাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ভালবাসা হল একে অপরকে গ্রহণ করা এবং বিশ্বাস করা— কোনও নিশ্চয়তার প্রতিশ্রুতি ছাড়াই। এই কারণেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে শুধু ‘আমি কী চাই’ ভাবলে চলে না। বরং ‘আমার পার্টনার কী অনুভব করছে’— সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।



অনেক সময় দেখা যায়, সম্পর্কে ভালবাসা থাকলেও সম্মানের অভাব তৈরি হয়। একজনের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া, পার্টনারের অনুভূতিকে হালকাভাবে নেওয়া কিংবা তাকে ‘টেকেন ফর গ্রান্টেড’ ভাবা— এসব ধীরে ধীরে সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলির মধ্যে একটি হল সম্মান। পার্টনারের ব্যক্তিত্ব, পছন্দ-অপছন্দ, চাহিদা এবং সীমারেখাকে সম্মান করতে জানতে হবে। কোনও মানুষই নিখুঁত নয়। তাই পার্টনার সবসময় নিজের মনের মতো আচরণ করবে— এমন প্রত্যাশা অবাস্তব। বরং সম্পর্কের মধ্যে ছোটখাটো অপূর্ণতাকে মেনে নেওয়ার ক্ষমতাই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে। অনেক সম্পর্ক ভেঙে যায় শুধুমাত্র ভুল বোঝাবুঝির কারণে। মনের কথা চেপে রাখা, অভিমান জমতে দেওয়া বা নিজের অনুভূতি প্রকাশ না করা সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভালবাসা অনুভব করলেই হবে না, সেটি প্রকাশ করাও জরুরি। আপনার পার্টনার যেন বুঝতে পারেন যে তিনি আপনার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ— এই অনুভূতিটাই সম্পর্ককে নিরাপদ করে তোলে। ছোট ছোট যত্ন, সময় দেওয়া, প্রশংসা করা বা কোনও সমস্যার সময় পাশে থাকা— এই বিষয়গুলো সম্পর্ককে আরও গভীর করে। অনেক সময় একটি আন্তরিক কথাই সম্পর্কের টানাপোড়েন কমিয়ে দিতে পারে।



দীর্ঘদিনের সম্পর্কে অনেক সময় একঘেয়েমি চলে আসে। কাজের চাপ, মানসিক ক্লান্তি বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনভাবে চেষ্টা করলে সম্পর্কের উষ্ণতা ধরে রাখা সম্ভব। একসঙ্গে সময় কাটানো, একে অপরের কথা মন দিয়ে শোনা, ছোট ছোট সারপ্রাইজ বা পুরনো স্মৃতি ফিরিয়ে আনা— এসব সম্পর্ককে প্রাণবন্ত রাখে। সবচেয়ে বড় কথা, সম্পর্কে বন্ধুত্ব বজায় রাখা জরুরি। কারণ প্রেমের ভিত যতটা আবেগের উপর দাঁড়িয়ে, ততটাই নির্ভর করে বন্ধুত্ব ও বোঝাপড়ার উপর।


বর্তমান সময়ে অনেকেই সম্পর্ককে খুব হালকাভাবে নেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তুলতে গেলে দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। শুধু নিজের চাহিদা পূরণ নয়, পার্টনারের মানসিক নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হবে। সম্পর্কে বিশ্বস্ততা, সততা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভালবাসা তখনই সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন দু’জন মানুষ একে অপরকে সমান গুরুত্ব দেন।


ভালবাসা কখনও শুধু বড় বড় প্রতিশ্রুতির উপর দাঁড়িয়ে থাকে না। বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ, সম্মান, যত্ন এবং বোঝাপড়াই সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। তাই প্রেমকে শুধু আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, তাকে যত্ন করতে শিখুন। পার্টনারকে গুরুত্ব দিন, তার অনুভূতির মূল্য দিন এবং নিজের ভালবাসা প্রকাশ করতে দ্বিধা করবেন না। কারণ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হল— পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্বাস।


পাঠক আমি ও পাপিয়া

গৌতম মুখোপাধ্যায়


অনেক দিন পাপিয়াদের বাড়ি যাইনি। সে আমার ছোটবেলার বান্ধবী। আজ একবার যাব ভাবছি। পাপিয়া আজ নিজেই এসেছে আমাকে নিয়ে যেতে, সঙ্গে ওর বয়ফ্রেন্ড ঋজু। একটু আগে পাপিয়ার মায়ের সঙ্গে আমার ফোনে কথা হয়েছে। আমি যাচ্ছি শুনে কাকিমা খুব খুশি।

পাপিয়ার ইচ্ছে তিন জন মিলে ব্যান্ডেল চার্চ বেড়াতে যাওয়ার। লিলুয়া থেকে ব্যান্ডেল চার্চ খুব বেশি দূরও নয়। আজ যেহেতু ওর সঙ্গে বয়ফ্রেন্ড আছে, ও এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চায় না। আমিও কোনও আপত্তি করলাম না, ওর ইচ্ছেই আমার ইচ্ছে।

ট্রেনে অসম্ভব ভিড়। আমরা বসার সিট পাইনি। হঠাৎই কে যেন আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আমি দাঁড়াচ্ছি, আপনি বসুন।

এক মাঝবয়সি ভদ্রলোককে সিট ছেড়ে উঠতে দেখে আমি আপত্তি করলাম, না না, ঠিক আছে। আমার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না।

ভদ্রলোক বসে পড়লেন।

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর কয়েকটা সিট খালি আমি ভদ্রলোকের সামনের সিটে বসলাম আর পাপিয়া বয়ফ্রেন্ড ঋজুকে নিয়ে বসল আমার পিছনের সামনের সিটের ভদ্রলোককে এর আগে কখনও দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, কোলের উপর একটা শান্তিনিকেতনী সাইড ব্যাগ। ভদ্রলোকের ব্যাগে যে বই ভর্তি, বুঝতে অসুবিধা হল না। একটা বই তো হাতেই নিয়ে বসে আছেন। বুঝলাম তিনি বই ভালোবাসেন।

আমি জানলার বাইরে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল ভদ্রলোক আমার সঙ্গে আলাপ জমাতে চাইলেন। দু-একটা কথা বলার পর তিনি আমার নাম জিজ্ঞেস করলেন। কিছুটা দ্বিধা নিয়েই বললাম, আমার নাম মধু।

মধু কী?

পদবিটা না-ই জানলেন, নামটাই তো যথেষ্ট। কিন্তু আমার নাম জানতে চাইলেন বলুন তো?

না না, তেমন কিছুই নয়, এমনিই। মুখোমুখি বসে আছি, কথাও বলছি, তাই নামটা জানার ইচ্ছা হল আর কী। এখনতো কেউ কারও সঙ্গে বেশি কথা বলে না, অচেনা কারও সঙ্গে তো নয়ই। সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। আমি আবার কথা না বলে থাকতে পারি না, সেই কারণেই আপনার সঙ্গে আলাপ জমালাম। তারপর মনে হল আপনার নামটা জিজ্ঞেস করি। নাম না জানলে কি বন্ধুত্ব জমে?

বন্ধুত্ব? আমার মনে হল ভদ্রলোক খুবই গায়েপড়া। কে জানে কী উদ্দেশ্য। আমি নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। এমনিতেই আমার মাথার ঠিক নেই, কী বলতে কী বলে বসব...।

এ-কথা ঠিক যে এখন সবাই নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। একজন আর-একজনের খোঁজ রাখে না। কেউ কারও দুঃখ কিংবা চোখের জলের খবর রাখে না, রাখলেও কারও মনে কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না।

আমার পিছনের সিটে বসে পাপিয়া গল্প করছে বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে। আমিও যে আছি, ওদের হয়তো খেয়াল নেই।

ট্রেনের খোলা জানলা দিয়ে হাওয়া ঢুকছে হু-হু করে সেই হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে মাথার চুল। আমি তাকিয়ে আছি বাইরে।

হঠাৎ কানে এল, কী করা হয়। হ্যালো মধু?

হুম, কিছু বলছেন?

বাব্বা, আপনি তো দেখছি ট্রেনে থেকেও নেই। তখন থেকে কী এত ভাবছেন?

না না, তেমন কিছু না। ওই আর কী, বাইরেটা ভালো করে দেখছিলাম। অনেকদিন পরে ট্রেনে উঠলাম তো, আসলে আমি কোথাও খুব একটা যাই না, ভালো লাগে না।

ভদ্রলোক আগের প্রশ্নে ফিরলেন, সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু আমি জানতে চাইছি আপনি কী করেন?

আমি মনে মনে বিরক্ত হলাম, আচ্ছা মানুষ তো। এ দেখছি একের পর এক প্রশ্ন করে আমার মাথাটা আরও খারাপ করে দেবে। আমি উত্তর না দিয়ে আবারও চুপ করে রইলাম।

ভদ্রলোক তবু নাছোড় আপনি কিন্তু কিছু একটা ভাবছেন। আচ্ছা একটা কথা বলতে পারি?

একটা কথা। এতক্ষণ ধরে বক বক করে আমার মাথা খারাপ করে দিচ্ছেন, এখন বলছেন একটা কথা। বিরক্তি গোপন করেই মুখে নকল হাসি রেখে বললাম, বলুন কী বলবেন?

বলছি যে আমি কি আপনাকে আপনি না বলে তুমি বলতে পারি? যদি কিছু মনে না করেন।

দেখুন, আপনি আমাকে আপনি বলবেন না তুমি বলবেন। সেটা আপনার ব্যাপার। আমি আপনার কথা শুনব কি শুনব না সেটাও আমার ব্যাপার।

এই রে, তুমি তো দেখছি তাড়াতাড়ি রেগে যাও। তার মানে তুমি খুব রাগী। ঠিক কি না?

না, এটা আপনার ভুল ধারণা।

হবে হয়তো। তা হলে আমার প্রশ্নের উত্তরটা এবার পাব?

কোন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইছেন?

ওই যে, কী করো?

কী আর করব, কিছুই না।

ভাবলাম ভদ্রলোক এই উত্তরে সন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু হলেন কই? আবারও প্রশ্ন করলেন, নিশ্চয়ই পড়াশোনা করো?

না, তা-ও করি না। অনেকদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছি। আমার কথা শুনে ভদ্রলোকের কণ্ঠে বিস্ময় ঝরে পড়ল, ওমা সে কী! পড়াশোনা ছাড়লে কেন?

এমনি। আমার ভালো লাগছিল না।

ভালো লাগছিল না। ও মাই গড।

এতে গডকে ডাকার কী আছে বুঝলাম না। এতে তো গডের কোনও ভূমিকাই নেই।

ঘরে বসে তবে কী করো?

এবার আমার চোখে-মুখে বিরক্তি ফুটে উঠল, বললাম তো কিছুই করি না। শুয়ে-বসেই সময় কাটাই।

ভদ্রলোকের কণ্ঠে একই রকম বিস্ময়, বলো কী? শুয়ে-বসেই সময় কাটাও?

আমি ভদ্রলোকের চোখে চোখ রাখলাম, কেন, আপনার তাতে কোনও অসুবিধা আছে?

না না, ঠিক তা নয়। আসলে...।

কী আসলে?

তোমার বাড়িতে আর কে কে আছেন?

নাঃ, ভদ্রলোকের প্রশ্ন দেখছি শেষ হবে না। ইচ্ছা না থাকলেও বললাম, আমি ছাড়াও বাবা-মা আর দাদা।

ও তবে চার জন। তা হলে তো ছোট পরিবার।

ছোট নয়, বড়।

আচ্ছা তাই হল। নিশ্চয়ই কোথাও গিয়েছিলে?

গিয়েছিলাম নয়, যাচ্ছি। আমি পাপিয়াকে দেখিয়ে বললাম, ওই যে আমার বান্ধবী, ওদের বাড়িই যাচ্ছি।

কী নাম তোমার বান্ধবীর?

বান্ধবীর নামও বলতে হবে? আচ্ছা মুশকিল তো দেখছি। তবু বললাম, ওর নাম পাপিয়া।

ও পড়াশোনা করে? নাকি তোমার মতো...।

না, ও পড়াশোনা করে। শুধু পড়াশোনা নয়, কাজও করে। আমিই শুধু বেকার।

তুমি কিন্তু আমাকে ভুল বুঝেছ। আমি সেই ভেবে বলিনি।

দেখুন, আপনার সঙ্গে আমার এই ট্রেনেই আলাপ, আপনাকে আমি চিনিও না। তা হলে ভুল বোঝার প্রশ্ন আসছে কোত্থেকে?

এই দেখো, আবার রেগে গেলে! জানো তো, আমারও একটা মেয়ে আছে। সে পড়াশোনা করে। আমি ছোটখাটো ব্যবসা করি।

এই রকমই কথাবার্তা চলছিল। ও দিকে পাপিয়া ওর বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে গল্পে মেতে আছে। এমন সময় আমার ফোন বেজে উঠল। কাকিমার নম্বর। পাপিয়া নিশ্চয় ওর ফোনের সুইচ অফ করে রেখেছে।

আমি পাপিয়াকে বললাম, কাকিমা ফোন করেছে। বলব? নাকি তুই কথা বলবি?

তুই বল। আমি স্টেশনে নেমে ফোন করব। এখন ফোন করলে প্রচুর বক বক করবে।

হ্যাঁ কাকিমা।

কাকিমা জিজ্ঞেস করল, কোথায় তোরা? এত দেরি হচ্ছে কেন?

আমরা একটা স্টেশনে আটকে আছি। কোথায় নাকি অবরোধ চলছে। ট্রেন থেকে নেমে পাপিয়াই তোমাকে ফোন করবে। ঠিক আছে?

আমার কথা শুনে ভদ্রলোক আমার দিকে সন্দেহের চোখে তাকালেন। আমি যে এ-রকম ডাহা মিথ্যে কথা বলতে পারি, উনি হয়তো ধারণাই করতে পারেননি। আমার সম্বন্ধে ভদ্রলোকের খারাপ ধারণা তৈরি হল।

পাপিয়া কিন্তু তারিফ করল, দারুণ বুদ্ধি তো তোর! কী সুন্দর বললি।

আমি ওর তারিফে খুশি হলাম না। বললাম, তোর জন্য কাকিমাকে মিথ্যে কথা বলতে হল।

পাপিয়া উত্তর দিল, ও-রকম একটু-আধটু মিথ্যে বললে মহাভারত অশুদ্ধ হয় না, বুঝলি?

আমি রাগ দেখিয়ে বললাম, না, বুঝলাম না।

ঠিক আছে, তোকে বুঝতে হবে না। তুই ওই বুড়োটার সঙ্গে গল্প কর।

পাপিয়া আস্তে, উনি শুনতে পাবেন। খারাপ ভাববেন।

হঠাৎ ভদ্রলোক বলে উঠলেন, না না, আমি খারাপ ভাবিনি।

লজ্জায় আমার মাথা নত হয়ে এল।

ভদ্রলোক আবারও বললেন, বিশ্বাস করো আমি খারাপ ভাবিনি, কিছু মনেও করিনি। আসলে আমি কথা বলতে ভালোবাসি, কাউকে পেলে তার সঙ্গেই বকবক করি। আমার বউও বিরক্ত হয়। শুধু বউ কেন, অনেকেই বিরক্ত হয়। কেউ কেউ ভুলও বোঝে।

আমি বললাম, স্বীকার করছি আমিও আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম। ভেবেছিলাম আপনার কোনও মতলব আছে। এখন বুঝেছি আপনি খুবই ভালো মানুষ।

ভদ্রলোক অন্যমনস্কভাবে বললেন, ভালো মানুষ কিনা জানি না, তবে তুমি আমার মেয়ের বয়সি, তাই তোমাকে মেয়ে ভেবেই আলাপ জমিয়েছিলাম।

এমন সময় আমাদের কামরায় এক জন বাদামওয়ালা ঢুকল। ভদ্রলোক চার প্যাকেট বাদাম কিনলেন। আমার হাতে তিন প্যাকেট দিয়ে বললেন, ওদের দুজনকে দুপ্যাকেট দিয়ে দাও।

অগত্যা তাই করলাম। পাপিয়া জিজ্ঞেস করল, তুই কিনলি?

আমি বললাম, না না, ওই ভদ্রলোক কিনেছেন, যাকে একটু আগে বিদ্রূপ করেছিলি।

আমার কথা শুনে পাপিয়া মুচকি হাসল, মুখে কিছুই বলল না।

এবার আমি ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলাম, আপনি তো আমার নাম জেনেছেন, আমি কিন্তু আমার নামটা এখনও জানতে পারিনি।

আমার নাম কাঞ্চন ভৌমিক।

আপনি বুঝি বই পড়তে খুব ভালোবাসেন? ব্যাগে যখন এত বই।

হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। যখনই সময় পাই, বই পড়ি। আমার মেয়ে পড়াশোনায় ব্যস্ত, ওর মা ব্যস্ত সংসারের কাজে। যেটুকু অবসর ওরা পায়, টিভি দেখে। ওদের সঙ্গে একটু গল্প করব, সে-উপায়ও নেই। তাই তা পড়ি।

এমন সময় আবারও আমার ফেন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। কথা বলে বুঝলাম যিনি ফোন করেছেন, ভুল নম্বরে করেছেন।

কাঞ্চনবাবু বলতে থাকলেন, আগে আমার মেয়ে আমার সঙ্গে তো বটেই, ওর মায়ের সঙ্গেও গল্প করত। এখন আর করে না। ও যেন নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিয়েছে।

নিশ্চয় কোনও কারণ আছে। হয়তো সে মানসিক অবসাদে ভুগছে।

কী জানি, আমি তো ঠিক বুঝতে পারি না। ফোন করলেও উত্তরই দেয় না।

আপনার মেয়ের নাম কী?

ওর নাম নন্দিতা। আমরা আদর করে মিঠাই বলে ডাকি।

আচ্ছা, উনি কি নন্দিতার সঙ্গে এই ব্যাপারে কোনও বলেছেন?

হয়তো বলেছে। আমি ঠিক জানি না।

দেখুন, মা-ই তার সন্তানের সমস্যা সবচেয়ে ভালো বোঝেন, তাই বউদির উচিত নন্দিতার সঙ্গে কথা বলা।

আচ্ছা আমি খোঁজ নেব।

হ্যাঁ, খোঁজ নেবেন। বউদি কী বুঝলেন সেটা আমাকে জানাবেন। এই বলে আমি আমার ফোন নম্বর কাঞ্চনবাবুকে দিলাম।

ইতিমধ্যে কাঞ্চনবাবুর সঙ্গে পাপিয়া আর ঋজুর পরিচয় হয়েছে। পাপিয়ার প্রথম দিকে জড়তা তো ছিলই, সন্দেহও ছিল হয়তো। তারপর যখন বুঝতে পারল ভদ্রলোক খারাপ নন, তাই এখন আমার মতো স্বাভাবিক।


সে-দিন ছিল সবার। আগের রাতেই আমি ভেবে রেখেছিলাম, জামাইবাবুর সঙ্গে দিদিকে দেখছে! সকালেই খেয়ে পড়ব হাসপাতালে। বেশ কিছুদিন হল আমার মাসতুতো দিদি হাসপাতালে ভর্তি। দিদির পেটের টিউমার অপারেশন হয়েছে।

আমাদের বাড়ির সকলেই দিদিকে দেখতে গিয়েছিল। কেবল আমারই যাওয়া হয়ে ওঠেনি। দিদি নাকি মাকে আমার পড়া নিয়ে বলেছিল।

মাসি, বোন এল না?

ওর কথা ছাড়, ও আর আগের মতো নেই। সারা দিন ঘরে বসে কী যে করে ও-ই জানে। কারও সঙ্গে তো কথাই বলে না ঠিকমতো। যাদের কাছে মানুষ হল তাদেরই ভুলে গেল।

হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে মা আমাকে পাঁচ কথা শুনিয়েও দিয়েছিল। আমি উত্তর দিইনি। আমার যে যাওয়াটা ভুল হয়েছে, সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। এ-কথা সত্যি যে মাসি আর মেসো আমাকে মানুষ করেছে। আমি মেয়ে হয়ে জন্মেছিলাম বলে বাড়িতে তুমুল অশান্তি হয়েছিল। মাসি-মেসোই আমাকে মানুষ করার দায়িত্ব নিয়েছিল। তা না হলে আমি হয়তো কোথায় ভেসে যেতাম।

দিদির ফোনে ফোন করেছিলাম, ফোনটা ধরেছিল জামাইবাবু।

আমি মধু বলছি, দিদিকে একটু দাও।

তোমার দিদির তো অপারেশন হয়েছে। ওর এখন কথাও বলা নিষেধ। একটু আগে ও ঘুমিয়েছে। আমি ওকে বলব তুমি ফোন করেছিলে।

আচ্ছা ঠিক আছে। আমি ফোন রাখতে গিয়েও জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি কালকেও হাসপাতালে যাবে?

হ্যাঁ, যত দিন ও হাসপাতালে থাকবে তত দিনই আমাকে আসা-যাওয়া করতে হবে।

তা হলে আমি কাল তোমার সঙ্গে যাব।

সত্যি বলছ, নাকি ঠাট্টা করছ? তুমি তো আজকাল বাড়ি থেকে বেরোও না, মেশোও না কারও সঙ্গে। এমনকী ফোন করলেও ধরো না।

আরে হ্যাঁ বাবা, আমি কাল তোমার সঙ্গে যাব। তবে দিদিকে সেটা আগে থেকে বলবে না। আমি ওকে চমকে দেব।

ঠিক আছে, তা-ই হবে। তা হলে রাখছি? ডাক্তারের সঙ্গে কিছু কথা আছে।

জামাইবাবু ফোন রেখে দিল।

মধু, তখন থেকে কী এত ভাবছ? তোমার ফোন তো বেজেই যাচ্ছে। তুমি ফোন ধরছ না বলেই তোমাকে গায়ে হাত দিয়ে ডাকলাম। কিছু মনে কোরো না।

না না, আমি কিছু মনে করিনি। তা ছাড়া আপনি তো আমার দাদার মতো।

কথা বলতে বলতে আমি ফোনটা কেটে দিলাম, কারণ নম্বরটা আমার চেনা নয়।

কাঞ্চনবাবু আমাকে ডাকলেন, মধু?

হ্যাঁ বলুন।

ওদের সম্পর্ক ঠিক কত দিনের?

আমি বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, কাদের?

ওই যে ওদের, তোমার বান্ধবী আর ওর বয়ফ্রেন্ডের।

তা ধরুন বছর তিনেকের তো হবেই। আমি ঋজুকে জিজ্ঞেস করলাম, কী, তোমাদের সম্পর্ক তিন বছরের তো?

একদম। মনে রেখেছ দেখছি।

আমি মজা করে বললাম, ভুলে গেলে ভালো হত বলছ?

না, তা নয়। আমাদের সম্পর্ক তো তোমার জন্যই সম্ভব হয়েছিল। তুমি মাঝখানে না থাকলে সম্পর্ক হওয়া তো দূরের কথা, কেউ কাউকে চিনতামই না।

হঠাৎ কাঞ্চনবাবু বলে উঠলেন, আমি বোধহয় প্রশ্নটা করে ঠিক করিনি।

এ কী বলছেন। এতে তো কোনও অন্যায় নেই।

না, আসলে...।

বাদ দিন। এবার বলুন বাড়ি ফিরে কী করবেন?

বাড়ি ফিরতে আজ অনেক রাত হবে। কিছু নেওয়ার আছে। কিন্তু ‘বাড়ি ফিরে কী করব’ কথাটার মানে বুঝলাম না।

আমি বলতে চাইছি আপনার যদি সময় থাকে, মেয়েকে একটু সময় দেবেন। কথা বলবেন ওর সঙ্গে। দেখুন ও কী বলতে চায়।

ঠিক আছে, বলব। কিন্তু কী বলব সেটাই তো ভেবে পাচ্ছি না। ও তো আমার কোনও কথারই উত্তর দেয় না। খুব বেশি হলে হ্যাঁ না বলে কাটিয়ে দেয়।

আমি কাঞ্চনবাবুর কথা শুনে হাসলাম।

তুমি হাসছে মধু? আসলে তুমি ঠিক বুঝবে না আমাদের সমস্যাটা কোথায়।

এটা ঠিক, বাইরে থেকে কারও সমস্যা বোঝা যায় না। তবু আমি যেটুকু বুঝেছি, আপনাকে বলছি। কাঞ্চনবাবু, জীবনের কিছু কিছু ভুল মানুষকে অনেক শিক্ষা দিয়ে যায়। আপনার মেয়ে হয়তো কোনও ভুল করেছে, তার ফলে আঘাতও পেয়েছে। কিন্তু সেটা কাউকে বলতেও পারছে না। আপনাকে সেই ভুলটা ধরতে হবে। ওকে বোঝাতে হবে মানুষ মাত্রেই ভুল করে, তার জন্য মন খারাপ করার কোনও মানে নেই। আপনার কাজ হবে ওকে সহজ স্বাভাবিক করে তোলা। এটা ভাববেন না আপনার মেয়ে বড় হয়েছে বলে সব কিছু নিজেই সামলে নিতে পারবে। অনেক সময় সেটা হয়ও না। তখন মানুষ নিজেকে গুটিয়ে নেয়। আমার ক্ষেত্রেও সেটা হয়েছে। একটা সময় আমিও মানুষের সঙ্গে মিশতাম, কথাও বলতাম স্বাভাবিকভাবে। তারপর সব যেন কেমন হয়ে গেল, পালটে গেল আমার জীবন। আপনার মেয়ের সমস্যাটা আমি বুঝি।

তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে পারি মধু?

হ্যাঁ করুন। আমার আপত্তি নেই।

না, আসলে তুমি একটু আগে কথায় কথায় বললে না যে, একটা সময় ছিল যখন তুমি সবার সঙ্গে মিশতে, কিন্তু এখন একা থাকতে চাও, এর কারণটা যদি বলো।

প্রথম কথা, আমি এখনও মানুষের সঙ্গে মিশি, যতটা না মিশলে নয় ততটাই। আমি বুঝেছি বেশি মেশামোলা ভালো নয়।

তোমার বয়স কত মধু?

দেখুন, আমি নিজের বয়স গোপন করি না। তবে একটু বাড়িয়ে বলি, যাতে অন্যে আমাকে বড় ভাবে। আসলে আমি বড় হতে চাই।

সে কী! কেন? সবাই তো চায় বয়স কমাতে, তুমি দেখছি উলটো। এর কারণ কী?

কারণ আর কী। আমি বিশ্বাস করি বয়স বাড়লে মানুষের অভিজ্ঞতা বাড়ে। আমি এই বয়সে অনেক দেখেছি, অনেক বুঝেছিও। আমি তাই বয়সের তুলনায় বড়। এবার জিজ্ঞেস করি, হঠাৎ আমার বয়স জানতে চাইলেন?

জানতে চাইলাম এই কারণেই, আমার মনে হয়েছিল তোমার যা বয়স, অভিজ্ঞতা তার চেয়ে অনেক বেশি। আমার মেয়েটা ঠিক উলটো, বয়সের তুলনায় অভিজ্ঞতা অল্প।


সে-দিন আমাকে দেখে দিদি খুবই খুশি হয়েছিল। কিন্তু আমার কষ্ট হচ্ছিল ওকে দেখে। কিছুদিন হল ওর অপারেশন হয়েছে। এখনও ওর শরীর দুর্বল। আমাদের মধ্যে কথা হল অনেকক্ষণ। আমি বুঝতে পারছিলাম কথা বলতে ওর কষ্ট হচ্ছিল, তবু আমাকে কাছে পেয়ে ওর যেন কথায় পেয়েছিল, কিছুতেই থামতে চাইছিল না।

আমার মনে হয়েছিল ওকে বেশিক্ষণ কথা বলানো উচিত নয়, তাই আবার আসব বলে বেরিয়ে এসেছিলাম। যদিও আমার ইচ্ছে করছিল আরও কিছুক্ষণ থাকি।

ফেরার পথে ছোট একটা বিপত্তি। প্ল্যাটফর্মে এক বৃদ্ধা হঠাৎই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল। আমি প্ল্যাটফর্ম থেকে নেমে সবে ঋজুর বাইকে উঠেছি এবং ঋজু বাইকে স্টার্টও দিয়েছে। তখনই ওকে বললাম, দাঁড়াও ঋজু, এক বৃদ্ধা প্ল্যাটফর্মে পড়ে গেছে। আমি ওর কাছে যাব।

ঋজু অবাক হয়ে বলল, তোমার কি মাথা খারাপ! দেখছ না কী ভিড় জমে গেছে। এখন এখানে দাঁড়ালে বহু মানুষের অসুবিধা হবে। সবাই চেঁচামেচি জুড়ে দেবে।

আমি ঋজুর আপত্তি উপেক্ষা করে বাইক থেকে নেমেই ছুটে গেলাম প্ল্যাটফর্মে। বৃদ্ধাকে তুলে বসালাম। আমাকে দেখে আরও কয়েক জন এগিয়ে এল। ঋজু বিরক্ত হয়ে বসে রইল বাইকে। বৃদ্ধার খুব বেশি আঘাত লাগেনি। প্রাথমিক শুশ্রূষায় সুস্থ হয়ে একটু পরেই সে ধীরে ধীরে নিজের গন্তব্যের দিকে চলে গেল।

সে-দিন ঋজুর অমানবিকতায় আঘাত পেয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল এ পাপিয়ারই উপযুক্ত বটে, কারণ পাপিয়াও ঠিক ঋজুর মতোই।

কিন্তু একা ঋজু নয়, সে-দিন দাদাও ঘটনাটা শুনে বিরক্ত, তোর মাথার দোষ আছে, উটকো ঝামেলায় জড়াস। তোর বাইরে বেরনোই উচিত নয়।

আরও অবাক করা ব্যাপার, জামাইবাবুও ফোন করে একই কথা বলল।

আমি ভেবেই পেলাম না সবাই আমাকে ভুল বুঝছে কেন। ওরা কী চায় আমিও ওদের মতো অমানবিক হই। কিন্তু আমি তো সেটা পারব না।


ট্রেন এগিয়ে চলেছে। আমি বাইরে তাকিয়ে বসে আছি চুপচাপ। হঠাৎ কানে এল, মধু, তোমার ফোন নম্বরটা?

আমি শুনেও না শোনার ভান করলাম। কী হবে ফোন নম্বর দিয়ে? মাত্র তো কয়েক মুহূর্তের পরিচয়। আবা আমরা হারিয়ে যাব, মিশে যাব মানুষের ভিড়ে। ট্রেনের সম্পর্ক ট্রেনেই শেষ হোক। এখন আর কারও সঙ্গেই সম্পর্ক তৈরি করতে ইচ্ছে করে না। সবাই দেখি নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত। আমি কেন পারি না?

আমার অনেক কথা বলার আছে, কিন্তু তেমন কাউকে পাই না যাকে সব কথা বলা যায়। তাই লিখি। যে-সব কথা বলতে পারি না সেই সবই লিখে যাই কবিতায়, গল্পে। যদিও কিছুদিন হল লিখতেও ইচ্ছে করছে না। মাঝে মাঝে মনে হয় লিখেই-বা কী হবে? কে পড়বে?

আমি পড়ি। নিজের লেখা তো পড়িই, অন্যের লেখা পড়ি, পড়ে যাই। কিন্তু সেটাও যখন একঘেয়ে হয়ে যায়, আবার খাতা-কলম নিয়ে বসি। বসে বসে ভাবি কী লিখব। যখন লেখা আসে না, খুবই কষ্ট পাই।

কারও কথায় এখন আর কষ্ট পাই না, কাঁদিও না গোপনে, সহ্য হয়ে গেছে। কষ্ট হয় লিখতে না পারলে।

আমি এখন নিজের মতো থাকি, সেটাই আমার পক্ষে ভালো। কারওরই যখন আমাকে নিয়ে মাথাব্যথা নেই, আ কেন জোর করে মিশতে যাব?

আজ আমার দেবব্রত স্যারের কথা খুবই মনে পড়ছে। যখন স্কুলে পড়তাম, দেবব্রত স্যার আমাকে যত্ন করে পড়াতেন। আমি তাঁকে স্যার না বলে দাদা বলে ডাকতাম। হয়তো সেই জন্যই আমার উপর তাঁর আলাদা টান ছিল হয়তো তাঁর নিজের কোনও বোন ছিল না বলেই একজন বোন খুঁজছিলেন।

আমি যখন তখন তাকে বিরক্ত করতাম। যা খুশি কার মাথা খারাপ করে দিতাম। তিনি হাসতেন।

অনেকেই সন্দেহ করত। তারা ভাবত স্যার বোধহয় আমাকে ভালোবাসেন। কেউ কেউ প্রশ্নও করেছে, কী ব্যাপার বল তো? স্যারের সঙ্গে প্রেম করেছিস নাকি?

আমি উত্তর দিতাম না। এ-রকম প্রশ্নের কীই-বা উত্তর দেব। ওরা তো জানতই না স্যারকে আমি কী চোখে দেখতাম আর স্যারই-বা আমাকে কী চোখে দেখতেন।

আরও একটা স্টেশন পার হলাম। কাঞ্চনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, মধু, তুমি গল্পের বই পড়ো?

কেন বলুন তো?

না, আসলে তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব হল, অথচ তোমাকে উপহার দেওয়ার মতো আমার কাছে তেমন কিছুই নেই, আছে কটা গল্পের বই আর কিছু পত্রিকা। সেই জন্য তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম। তুমি যদি পছন্দ না করো...।

আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি বলেই কি আপনার মনে হয়েছে আমার গল্পের বই পড়ার অভ্যেস নেই? আমি গল্পের। বই পছন্দ করি না?

এমা, ছি ছি। তা কেন? আসলে তোমার বয়স কম। এই বয়সের ছেলেমেয়েরা খুব একটা গল্পের বই পড়ে না।

আমি পড়ি। আপনি আমাকে দিতে পারেন। কিন্তু, আমারও তো উচিত আপনাকে কিছু দেওয়া।

আরে না না, আমি তো বয়সে বড়, তোমার দাদা, আমি তোমার কাছ থেকে কিছু নিতে পারব না।

কেন, বোন কি দাদাকে কিছু দিতে পারে না? আমি কাঞ্চনবাবুর হাতে তুলে নিলাম ছোট্ট একটা যিশু খ্রিস্টের মূর্তি।

মূর্তিটা হাতে নিয়ে কাঞ্চনবাবু বললেন, খুব সুন্দর তো! দেখো, এটা তুমি নিজের জন্য কিনেছ, এখন আমাকেই দিয়ে দিলে।

তাতে কী হয়েছে? কোনও কিছু ভালোবেসে নিজের কাছে রাখা আর ভালোবেসে কাউকে দেওয়া একই।

ট্রেনের গতি কমে এল। আমি কাঞ্চনবাবুকে বললাম, এবার আমাকে নামতে হবে। আবার হয়তো কখনও দেখা হবে।

কাঞ্চনবাবু হেসে বললেন, নিশ্চয়। ভালো থেকো। আমি ট্রেন থেকে নেমে পড়লাম। আমার পিছু পিছু নামল ঋজু আর পাপিয়াও।

একজন মানুষ আর একজন মানুষের জন্য অপেক্ষা করে তখনই যখন সেই দুজন মানুষের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। আমার কারও সঙ্গে তেমন সম্পর্ক নেই। একবারই একটা পানের দোকানে দেবব্রতদার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম, তাও কয়েক বছর আগে। জানি না কী কারণে আমার মনে হয়েছিল তিনি যদি আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারেন, আমি কেন পারব না।

কিন্তু সে-দিন কেন জানি না আমার ডাক শুনেও দেবব্রতদা না-শোনার ভান করে এড়িয়ে যেতে চাইলেন। আমি নিজেই তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।

দেবব্ৰতদা কিছুই বললেন না, যদিও আমি বুঝতে পারলাম তার চোখে-মুখে বিরক্তি ফুটে উঠছে। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। মনে মনে ঠিক করলাম রেজাল্ট খারাপ হওয়ার জন্য ক্ষমা চেয়ে নেব। কিন্তু দেবব্রতদা যে হঠাৎই এ-রকম একটা প্রশ্ন ছুড়ে দেবেন, আমি ধারণাই করতে পারিনি।

দেবরাজের সঙ্গে তোমার কীসের সম্পর্ক?

আমি তখনই কোনও উত্তর দিতে পারলাম না।

সে-দিনের কথা মনে পড়লে আজও দু-চোখ ভিজে ওঠে। দেবব্রতদা আমাকে ভুল বুঝেছিলেন। দেবরাজ আমাদের স্কুলেই উঁচু ক্লাসে পড়ত। মিথ্যে বলব না, সে আমাকে ভালোবাসত, যদিও মুখ ফুটে কোনও দিন আমাকে বলেনি। কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম। দেবরাজ আমার দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকত। সে একবারই অন্যের হাত দিয়ে আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিল। আমি সেই চিঠি পড়েও দেখিনি।

কেউ হয়তো দেবব্রতদাকে এই ব্যাপারটা বলেছিল, সেই থেকেই আমার উপর তাঁর রাগ। যদিও আমার ধারণা ছিল রেজাল্ট খারাপ হওয়ায় তিনি রেগে গেছেন। সেই ধারণাটা পরে পালটে গিয়েছিল। সত্যি বলতে পড়াশোনায় আমি খুব একটা খারাপ ছিলাম না, তবু কেন যে রেজাল্ট ভালো হয়নি, আমি নিজেও জানি না। দেবব্রতদা হয়তো ভেবেছিলেন আমি পড়াশোনায় ফাঁকি দিয়েছি। দেবরাজের সঙ্গে মেলামেশা করতে গিয়ে পড়াশোনায় ঠিকমতো মনোযোগ দিইনি।

এর কিছু দিন পরেই দেবব্রতদা অন্য স্কুলে চলে গেলেন। আমি তাঁর ভুল ভাঙানোর সুযোগ পাইনি। দেবব্ৰতদা চলে যাওয়ায় আমার পড়াশোনা থেকেই মন উঠে গেল।

তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। দেবব্রতদা কোথায় আছেন, কেমন আছেন আমি জানি না। হয়তো ভালো আছেন, হয়তো ভুলেই গেছেন আমাকে। শুধু আমিই তাঁকে ভুলতে পারলাম না আজও।

কাঞ্চনবাবু বইয়ের সঙ্গে একটা পত্রিকাও আমাকে দিয়েছিলেন। পত্রিকাটা দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম এই পত্রিকায় আমিও মাঝেমধ্যে লিখি। উনি যে পত্রিকাটা নিয়মিত পড়েন এবং সেই সূত্রে আমার নামও জানেন সেটা জানা ছিল না। আমার ভালো লাগল এই ভেবে যে, উনি ঠিকই ধরে ফেলেছেন আমি সেই মধু।

কাঞ্চনবাবু আমার ফোন নম্বর চেয়েছিলেন, সেটা আর দেওয়া হয়নি। আজ মনে হয় দিলে কী এমন মন্দ হত। খুব বেশি হলে দু-একবার ফোন করতেন। তখন হয়তো আমার মনে হয়েছিল কোনও কিছু অতিরিক্ত ভালো নয়। ট্রেনের আলাপ ট্রেনেই শেষ হওয়া ভালো।

তবে কাঞ্চনবাবু আমার লেখালেখির ইচ্ছেটাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম, কেউ না কেউ আমার লেখা পড়ে এবং আমার নামও মনে রাখে।

দেবব্রতদা স্কুল ছেড়ে চলে যাওয়ায় আমি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছি। কিন্তু লেখালেখিটা টিকে আছে। হয়তো সেটাও ছেড়ে দিতাম, যদি না সে-দিন কাঞ্চনবাবু হস্তদন্ত হয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে আমার হাতে বই আর পত্রিকা ধরিয়ে দিতেন।

এই দেখো, তোমাকে তো বই-ই দেওয়া হল না।

ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠতেই কাঞ্চনবাবু দৌড়ে ট্রেনে উঠলেন, দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়লেন আমার দিকে। আমি হাত নেড়ে তাঁকে বিদায় জানালাম।

ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে যেতেই আমি পত্রিকাটা খুললাম। আমার একটা গল্প আছে এই পত্রিকায়। তাকিয়ে দেখি ট্রেনটা তখন অনেক দূরে চলে গেছে। ওই ট্রেনেই আছেন আমার একজন পাঠক।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page