top of page

গরমের ঠান্ডা রান্না| অনলাইন কনটেন্ট এবং রোজগার| ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে সাহিত্যচর্চা| রবিবারের গল্প: তিরস্কার-পুরস্কার


গরমের ঠান্ডা রান্না

সঞ্চিতা দাস


গরমকাল মানেই তীব্র রোদ, গরম হাওয়া আর শরীরকে সতেজ রাখার লড়াইয়ের সময়। এই সময়ে রান্নাঘরেও আসে বিশেষ পরিবর্তন। ভারী, তেল-মশলাদার খাবারের বদলে জায়গা করে নেয় হালকা, সহজপাচ্য এবং শরীর ঠান্ডা রাখে এমন পদ। গরমের রান্না শুধু স্বাদের বিষয় নয়, এটি স্বাস্থ্য ও সুস্থতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। আম, দই, শসা, লাউ, পেঁপে কিংবা নানা ধরনের মৌসুমি শাকসবজি, এই সময়ের রান্নায় প্রকৃতির দেওয়া উপাদানগুলোই হয়ে ওঠে প্রধান ভরসা।



এই সংকলনে আমরা এমন কিছু রান্নার কথা তুলে ধরেছি, যা গ্রীষ্মের দিনেও শরীরকে আরাম দেয়, ক্লান্তি কমায় এবং একই সঙ্গে স্বাদের নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পদ থেকে শুরু করে আধুনিক হালকা রেসিপি সব মিলিয়ে এই আয়োজন গরমের রান্নার এক বৈচিত্র্যময় ছবি তুলে ধরার চেষ্টা। এই রান্নাগুলো পাঠকদের রান্নাঘরে নতুন অনুপ্রেরণা যোগ করবে এবং গরমের দিনগুলোকে আরও সুস্বাদু ও স্বস্তিদায়ক করে তুলবে কথা দিচ্ছি।



আম পোড়া চিকেন



কী কী লাগবে

চিকেন ৫০০ গ্রাম, কাঁচা আম ১ টি, পেঁয়াজ কুচি ২টি, আদা বাটা ১ চা চামচ, রসুন বাটা ১ চা চামচ, টক দই ৩ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লাললঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, ভাজা জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরমমশলা গুঁড়ো আধ চা চামচ, চিনি ১ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, ধনেপাতা কুচি সামান্য।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে কাঁচা আম আগুনে বা ওভেনে পুড়িয়ে খোসা ছাড়িয়ে শাঁস বের করে নিন। চিকেনের সঙ্গে দই, আদা-রসুন বাটা, হলুদ, লাললঙ্কা গুঁড়ো ও নুন মেখে কিছুক্ষণ মেরিনেট করে রাখুন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি ভেজে নিন। এরপর মেরিনেট করা চিকেন দিয়ে ভালো করে কষতে থাকুন। চিকেন অর্ধেক সেদ্ধ হলে পোড়া আমের শাঁস, কাঁচালঙ্কা ও চিনি মিশিয়ে দিন। সামান্য জল দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। শেষে ভাজা জিরে গুঁড়ো, গরমমশলা ও ধনেপাতা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাত বা পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।


গন্ধরাজ চিকেন বিরিয়ানি



কী কী লাগবে

বাসমতি চাল ৫০০ গ্রাম, চিকেন ৭৫০ গ্রাম, গন্ধরাজ লেবু ২টি, টক দই আধ কাপ, পেঁয়াজ পাতলা কুচি ৩টি, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা বাটা ১ চা চামচ, বিরিয়ানি মশলা ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ সামান্য, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো আধ চা চামচ, দুধ আধ কাপ, জাফরান সামান্য, ঘি ৪ টেবিল চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ২ টেবিল চামচ, তেজপাতা ২টি, দারচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৪টি, গোলাপজল ১ চা চামচ, কেওড়া জল ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি সামান্য।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে চিকেনের সঙ্গে দই, আদা-রসুন বাটা, কাঁচালঙ্কা বাটা, হলুদ, লাললঙ্কা গুঁড়ো, নুন, সর্ষের তেল ও গন্ধরাজ লেবুর রস মিশিয়ে অন্তত ১ ঘণ্টা মেরিনেট করে রাখুন। বাসমতি চাল ধুয়ে আধ ঘণ্টা ভিজিয়ে রেখে তেজপাতা, দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও নুন দিয়ে ৭০ শতাংশ সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে নিন। কড়াইয়ে ঘি গরম করে পেঁয়াজ কুচি ভেজে বেরেস্তা তৈরি করুন। একই কড়াইয়ে মেরিনেট করা চিকেন ভালো করে কষে নিন। চিকেন প্রায় সেদ্ধ হলে আঁচ বন্ধ করুন। একটি ভারী তলার পাত্রে প্রথমে চিকেনের স্তর দিন, তার উপর ভাত ছড়িয়ে দিন। ওপরে বেরেস্তা, জাফরান ভেজানো দুধ, ঘি, গোলাপজল, কেওড়া জল ও সামান্য গন্ধরাজ লেবুর খোসা কুঁচি ছড়িয়ে দিন।

ঢেকে কম আঁচে ২০–২৫ মিনিট দমে রাখুন। দম খোলার সঙ্গে সঙ্গে গন্ধরাজের মন মাতানো সুবাসে ভরে উঠবে পুরো ঘর।


তিল বাটা আলু পোস্ত



কী কী লাগবে

আলু ৪টি, পোস্ত ৪ টেবিল চামচ, সাদা তিল ২ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪টি, কালোজিরা আধ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো সামান্য, নুন স্বাদমতো।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে পোস্ত ও সাদা তিল একসঙ্গে ভিজিয়ে রেখে কাঁচালঙ্কা দিয়ে মিহি বেটে নিন। আলু খোসা ছাড়িয়ে লম্বা করে কেটে নিন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরা ফোড়ন দিন। এরপর আলু দিয়ে সামান্য হলুদ ও নুন মিশিয়ে ভেজে নিন। আলু আধসেদ্ধ হলে তিল-পোস্ত বাটা দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। সামান্য গরম জল দিয়ে ঢেকে কম আঁচে রান্না করুন। তেল ছেড়ে এলে ওপরে কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই তিল বাটা আলু পোস্ত দারুণ লাগে।


ছানার পাতুরি



কী কী লাগবে

তাজা ছানা ৩০০ গ্রাম, নারকেল কোরানো আধ কাপ, সর্ষে ২ টেবিল চামচ, পোস্ত ১ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৫টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো সামান্য, কলাপাতা ৪–৫ টুকরো, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি সামান্য।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে সর্ষে, পোস্ত ও কাঁচালঙ্কা সামান্য জল দিয়ে মিহি বেটে নিন। একটি পাত্রে ছানা চটকে তার সঙ্গে নারকেল কোরানো, সর্ষে-পোস্ত বাটা, হলুদ, নুন, চিনি ও সর্ষের তেল মিশিয়ে নিন। কলাপাতা হালকা আঁচে গরম করে নরম করে নিন। এবার প্রতিটি পাতায় ছানার মিশ্রণ রেখে সুন্দর করে মুড়ে সুতো দিয়ে বেঁধে নিন। স্টিমারে বা ঢাকা তাওয়ায় অল্প আঁচে ১৫–২০ মিনিট রান্না করুন। কলাপাতার গন্ধে মাখামাখি নরম ছানার পাতুরি গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।


নারকেল বাটা দিয়ে গলদা চিংড়ি



কী কী লাগবে

গলদা চিংড়ি ৬-৮টি, নারকেল কোরানো ১ কাপ, পেঁয়াজ বাটা ২ টেবিল চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, রসুন বাটা ১ চা চামচ, কাঁচালঙ্কা ৫টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরমমশলা গুঁড়ো সামান্য, তেজপাতা ১টি, Shalimar's সর্ষের তেল ৪ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি সামান্য।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে নারকেল কোরানো ও কাঁচালঙ্কা একসঙ্গে মিহি বেটে নিন। গলদা চিংড়িতে সামান্য হলুদ ও নুন মেখে রেখে দিন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে চিংড়িগুলি হালকা ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ বাটা কষুন। এরপর আদা-রসুন বাটা দিয়ে আরও কিছুক্ষণ কষিয়ে হলুদ, লাল লঙ্কা গুঁড়ো ও নুন মেশান। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে নারকেল বাটা দিয়ে অল্প আঁচে নাড়তে থাকুন। সামান্য গরম জল দিয়ে ফুটে উঠলে ভাজা গলদা চিংড়ি দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। শেষে চিনি ও গরমমশলা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই নারকেল বাটা দিয়ে গলদা চিংড়ির স্বাদ অনন্য।



কাঁচা আম দিয়ে ইচড়



কী কী লাগবে

ইচড় ৫০০ গ্রাম, কাঁচা আম ১টি, আলু ২টি, পেঁয়াজ কুচি ২টি, আদা বাটা ১ চা চামচ, রসুন বাটা ১ চা চামচ, টমেটো ১টি, কাঁচালঙ্কা ৪টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরমমশলা গুঁড়ো সামান্য, তেজপাতা ১টি, শুকনো লঙ্কা ২টি, জিরে আধ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৪ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি সামান্য।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে ইচড় টুকরো করে কেটে নুন-হলুদ মাখিয়ে সেদ্ধ করে নিন। কাঁচা আমের খোসা ছাড়িয়ে টুকরো করে রাখুন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে আলু ভেজে তুলে রাখুন। এরপর তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা ও জিরে ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ কুচি দিয়ে ভেজে আদা-রসুন বাটা মিশিয়ে কষুন। টমেটো, হলুদ, জিরে গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো ও নুন দিয়ে মশলা ভালো করে কষিয়ে নিন। এবার ইচড় ও আলু দিয়ে মশলার সঙ্গে মিশিয়ে নাড়ুন। এরপর কাঁচা আম ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে সামান্য গরম জল মিশিয়ে ঢেকে রান্না করুন। সবকিছু মাখামাখি হয়ে এলে ওপরে চিনি ও গরমমশলা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই টক-মশলাদার ইচড় দারুণ লাগে।

অনলাইন কনটেন্ট এবং রোজগার, ডিজিটাল যুগে নতুন পেশার দিগন্ত


একসময় রোজগারের ধারণা মানেই ছিল অফিস, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট বেতন এবং একটি স্থায়ী চাকরি। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি ও ইন্টারনেটের বিস্তারের ফলে সেই ধারণা বদলে গেছে অনেকটাই। এখন মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই মানুষ নিজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ঘরে বসেই উপার্জনের পথ তৈরি করতে পারছেন। বিশেষ করে অনলাইন কনটেন্ট বা ডিজিটাল বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র, যেখানে কাজের সুযোগ যেমন বেড়েছে, তেমনই বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রার ধরণও।



বর্তমানে ইউটিউব ভিডিও, ফেসবুক পোস্ট, ইনস্টাগ্রাম রিল, ব্লগ, পডকাস্ট, অনলাইন কোর্স, ওয়েবসাইটের লেখা কিংবা লাইভ স্ট্রিম সবই অনলাইন কনটেন্টের অন্তর্ভুক্ত। এই কনটেন্ট তৈরি করে বহু মানুষ আজ স্বাধীনভাবে রোজগার করছেন। কেউ পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে নিয়েছেন, কেউ আবার চাকরি বা পড়াশোনার পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের পথ হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে অনলাইন কনটেন্ট এখন শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। ভারতে ডিজিটাল বিপ্লবের পরে স্মার্টফোন ও সস্তা ইন্টারনেট পরিষেবা সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। এর ফলে গ্রামের মানুষ থেকে শহরের তরুণ সকলেই ডিজিটাল দুনিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেন। বিশেষ করে করোনা অতিমারির সময় মানুষ ঘরে বন্দি থাকাকালীন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন অনেকেই বুঝতে পারেন, শুধুমাত্র তথ্য গ্রহণ নয়, তথ্য বা কনটেন্ট তৈরি করেও আয় করা সম্ভব।



বর্তমানে ইউটিউব সবচেয়ে জনপ্রিয় কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মগুলির মধ্যে অন্যতম। রান্না, ভ্রমণ, প্রযুক্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ফ্যাশন, সংগীত, ধর্মীয় আলোচনা, গল্প বলা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা যেকোনো বিষয় নিয়েই ভিডিও তৈরি করা যায়। নির্দিষ্ট সংখ্যক দর্শক ও ওয়াচ টাইম অর্জনের পর ইউটিউব নির্মাতাদের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অর্থ প্রদান করে। এর পাশাপাশি ব্র্যান্ড প্রোমোশন, স্পনসরশিপ এবং অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং থেকেও আয় হয়। শুধু ভিডিও নয়, লেখালিখিও অনলাইন রোজগারের একটি বড় ক্ষেত্র। ব্লগিং বা ওয়েবসাইটে নিয়মিত লেখা প্রকাশ করে বহু মানুষ আয় করছেন। রান্নার রেসিপি, স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ, ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, সাহিত্যচর্চা, শিক্ষামূলক লেখা কিংবা সংবাদ বিশ্লেষণ নানা ধরনের বিষয় নিয়ে ব্লগ তৈরি হচ্ছে। ওয়েবসাইটে যত বেশি পাঠক আসেন, বিজ্ঞাপন ও স্পনসরশিপের মাধ্যমে তত বেশি আয় সম্ভব হয়। বাংলা ভাষাতেও বর্তমানে ব্লগিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিও এখন আয়ের বড় উৎস। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় কনটেন্ট নির্মাতারা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করেন। কোনো পণ্যের প্রচার, রিভিউ, লাইফস্টাইল ভিডিও বা বিশেষ ক্যাম্পেনের মাধ্যমে তাঁরা অর্থ উপার্জন করেন। অনেক সময় একটি ছোট ভিডিও বা একটি পোস্ট থেকেই কয়েক হাজার থেকে লক্ষ টাকা পর্যন্ত আয় হতে পারে, যদি সেই নির্মাতার অনুসরণকারীর সংখ্যা বেশি হয়।



বর্তমানে “ইনফ্লুয়েন্সার” শব্দটি খুব পরিচিত। যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করেন এবং নিজের মতামত বা জীবনযাত্রার মাধ্যমে দর্শকদের আকৃষ্ট করেন, তাঁদেরই বলা হয় ইনফ্লুয়েন্সার। ফ্যাশন, খাদ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, ভ্রমণ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এখন ইনফ্লুয়েন্সারদের চাহিদা রয়েছে। অনেক সংস্থা নিজেদের পণ্যের প্রচারের জন্য প্রচলিত বিজ্ঞাপনের বদলে ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিংয়ের উপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে শুধু জনপ্রিয়তা থাকলেই সফল হওয়া যায় না। অনলাইন কনটেন্টের জগতে টিকে থাকতে হলে নিয়মিত কাজ, ধৈর্য এবং নতুন ভাবনার প্রয়োজন হয়। দর্শক বা পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখতে হলে মানসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য কনটেন্ট তৈরি করা জরুরি। কারণ ইন্টারনেটে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত বেশি। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ভিডিও, পোস্ট ও লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। তাই নিজস্ব স্বকীয়তা না থাকলে আলাদা করে নজরে আসা কঠিন। অনলাইন রোজগারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হল দক্ষতা। ভিডিও এডিটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ফটোগ্রাফি, লেখালিখি, ভয়েসওভার, অ্যানিমেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং, ওয়েব ডিজাইন এই সমস্ত দক্ষতার চাহিদা বর্তমানে অনেক বেশি। অনেকেই ইউটিউব বা অনলাইন কোর্স দেখে নিজে নিজেই এই দক্ষতা অর্জন করছেন এবং পরে ফ্রিল্যান্স কাজের মাধ্যমে আয় করছেন।



ফ্রিল্যান্সিং বর্তমানে অনলাইন রোজগারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বিভিন্ন সংস্থা বা ব্যক্তি তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী অনলাইনে কাজ করিয়ে নেন। যেমন কনটেন্ট লেখা, ভিডিও সম্পাদনা, ওয়েবসাইট তৈরি, লোগো ডিজাইন বা সোশ্যাল মিডিয়া পরিচালনা। কাজের ভিত্তিতে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়। এর ফলে একজন ব্যক্তি একই সঙ্গে একাধিক ক্লায়েন্টের সঙ্গে কাজ করতে পারেন। বাংলার বহু তরুণ-তরুণী এখন অনলাইন কনটেন্ট তৈরিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করছেন। কেউ গ্রামের জীবন তুলে ধরছেন, কেউ ঐতিহ্যবাহী রান্না, কেউ আবার লোকসংস্কৃতি বা পর্যটনের ভিডিও তৈরি করছেন। এর ফলে শুধু ব্যক্তিগত রোজগারই নয়, বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যও বিশ্বদরবারে পৌঁছে যাচ্ছে। অনেক সময় একটি ভাইরাল ভিডিও স্থানীয় ব্যবসা বা পর্যটনকেও জনপ্রিয় করে তুলতে পারে। তবে এই ক্ষেত্রের কিছু সমস্যাও রয়েছে। অনলাইন দুনিয়ায় আয়ের নিশ্চয়তা সবসময় থাকে না। অনেক সময় দীর্ঘদিন কাজ করার পরেও সাফল্য আসে না। আবার দর্শকের পছন্দ দ্রুত বদলে যায়। ফলে নিয়মিত নতুন বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়। এছাড়া কপিরাইট সমস্যা, ভুয়ো খবর, ট্রোলিং, মানসিক চাপ এবং অতিরিক্ত প্রতিযোগিতাও এই জগতের বড় চ্যালেঞ্জ।



বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন কনটেন্ট তৈরি করতে গেলে দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি। শুধুমাত্র জনপ্রিয়তার জন্য বিভ্রান্তিকর বা ক্ষতিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। কারণ সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব এখন অত্যন্ত গভীর। একটি ভুল তথ্য মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই সত্যতা যাচাই করে দায়িত্বশীল কনটেন্ট তৈরি করা প্রয়োজন। বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রেও অনলাইন কনটেন্টের গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। বহু শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইউটিউব বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাঠদান করছেন। এতে ছাত্রছাত্রীরা ঘরে বসেই বিভিন্ন বিষয় শিখতে পারছেন। অনেক শিক্ষামূলক চ্যানেল আজ বিপুল জনপ্রিয় এবং সেখান থেকেও আয় হচ্ছে। ফলে শিক্ষা ও রোজগার— দুই ক্ষেত্রেই ডিজিটাল মাধ্যম নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।



নারীদের ক্ষেত্রেও অনলাইন কনটেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বহু গৃহবধূ রান্না, হস্তশিল্প, সাজসজ্জা, স্বাস্থ্যচর্চা বা দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভিডিও তৈরি করে স্বনির্ভর হচ্ছেন। অনেকেই ছোট ব্যবসাকে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বড় পরিসরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসও বাড়ছে। গ্রামের মানুষের কাছেও অনলাইন কনটেন্ট এখন সম্ভাবনার নতুন পথ। আগে যেখানে শহরকেন্দ্রিক কাজের সুযোগ বেশি ছিল, এখন গ্রামের মানুষও নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে তুলে ধরে জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন। লোকগান, কৃষিকাজ, গ্রামীণ জীবনযাত্রা কিংবা ঐতিহ্যবাহী খাবারের ভিডিও দেশ-বিদেশে সমানভাবে দেখা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় অর্থনীতিও লাভবান হচ্ছে। অনলাইন রোজগারের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল “অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং”। এখানে কোনো সংস্থার পণ্য বা পরিষেবা প্রচার করে বিক্রির উপর কমিশন পাওয়া যায়। অনেক ব্লগার ও ইউটিউবার এই পদ্ধতির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য আয় করছেন। একইভাবে অনলাইন কোর্স বিক্রি, ই-বুক প্রকাশ কিংবা সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক কনটেন্টও এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।



ডিজিটাল যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির প্রভাবও দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে ভিডিও সম্পাদনা, ছবি তৈরি, লেখালিখি কিংবা ভয়েস জেনারেশনের মতো কাজেও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে কাজের গতি বাড়লেও নতুন ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে টিকে থাকতে হলে সৃজনশীলতা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব আরও বাড়বে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আগামী দিনে অনলাইন কনটেন্ট অর্থনীতির পরিধি আরও বিস্তৃত হবে। ডিজিটাল বিজ্ঞাপন, ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা এবং বিনোদন শিল্পের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে। তবে সেই সঙ্গে প্রয়োজন ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার এবং সঠিক প্রশিক্ষণ। অনলাইন কনটেন্ট আজ শুধু বিনোদন বা সময় কাটানোর বিষয় নয়, বরং এটি আধুনিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য, দক্ষতা এবং দায়িত্ববোধ থাকলে এই ক্ষেত্র থেকে স্থায়ী ও সম্মানজনক রোজগার সম্ভব। প্রযুক্তির এই যুগে যাঁরা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের গড়ে তুলতে পারবেন, তাঁদের জন্য অনলাইন কনটেন্ট হতে পারে সাফল্যের নতুন দিগন্ত।

ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে সাহিত্যচর্চা


উনিশ ও বিশ শতকের বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি এক অনন্য নাম। এই পরিবার শুধু ধনাঢ্য বা প্রভাবশালী ছিল না, বরং বাংলা নবজাগরণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে যে সাহিত্যচর্চা, শিল্পচর্চা ও বৌদ্ধিক আলোচনার পরিবেশ গড়ে উঠেছিল, তা সমকালীন সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষত নারীদের অংশগ্রহণ এবং পারিবারিক সাংস্কৃতিক চর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছিল এই বাড়িতে।



ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক। জোড়াসাঁকোর বাড়িটি ছিল যেন একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে নিয়মিত সাহিত্যসভা, সংগীতচর্চা, নাট্যাভিনয় ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতো। এই পরিবেশে সাহিত্য ও শিল্পচর্চা পারিবারিক জীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে অন্দরমহলে নারীদের জন্য আলাদা একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হয়েছিল, যা সেই যুগে অত্যন্ত অগ্রণী উদ্যোগ ছিল। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে নারীদের সাহিত্যচর্চা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। সেই সময়ে সমাজে নারীদের শিক্ষার সুযোগ সীমিত থাকলেও ঠাকুরবাড়ির নারীরা লেখালেখি, কবিতা, প্রবন্ধ ও অনুবাদে সক্রিয় ছিলেন। স্বর্ণকুমারী দেবী বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিকের নারী ঔপন্যাসিকদের একজন হিসেবে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর রচনায় নারীর জীবন, সামাজিক বাস্তবতা এবং চিন্তাধারার নতুন দিক উঠে এসেছে। জ্ঞানদানন্দিনী দেবীও সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।



ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের সাহিত্যচর্চা শুধু ব্যক্তিগত লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এখানে নিয়মিত সাহিত্যসভা অনুষ্ঠিত হতো, যেখানে পরিবারের সদস্যরা নিজেদের লেখা পড়ে শোনাতেন এবং তা নিয়ে আলোচনা করতেন। এই আলোচনা সভাগুলি ছিল অত্যন্ত বৌদ্ধিক ও সৃজনশীল। নারীরা এখানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতেন, যা সেই সময়ে সমাজে বিরল ছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যিক বিকাশেও অন্দরমহলের গভীর প্রভাব ছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি পরিবারের সাহিত্যসভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে বড় হন। বড়দের লেখা শোনা, আলোচনা দেখা এবং সংগীতচর্চার পরিবেশ তাঁর মানসগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে অন্দরমহলের নারীদের সংবেদনশীলতা ও সাংস্কৃতিক চর্চা তাঁর সাহিত্যচিন্তাকে সমৃদ্ধ করে তোলে। ঠাকুরবাড়ির সাহিত্যচর্চায় ব্রাহ্ম সমাজের প্রভাবও উল্লেখযোগ্য। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে ব্রাহ্ম সমাজের মানবতাবাদী ও সংস্কারমুখী চিন্তাধারা অন্দরমহলের বৌদ্ধিক পরিবেশকে আরও উন্নত করে। নারীশিক্ষা, সামাজিক কুসংস্কারের বিরোধিতা এবং যুক্তিবাদী চিন্তার বিকাশ এখানে গুরুত্ব পেত। এই চিন্তাধারা ঠাকুরবাড়ির সাহিত্যচর্চাকে আধুনিকতার দিকে নিয়ে যায়।



অন্দরমহলের সাহিত্যচর্চার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল সাহিত্য ও সংগীতের সমন্বয়। রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতা অনেকাংশে এই পরিবেশেই বিকশিত হয়। নারীরাও সংগীতচর্চায় অংশ নিতেন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। ফলে সাহিত্য ও সংগীত এখানে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের সাহিত্যচর্চা শুধু একটি পারিবারিক অভ্যাস ছিল না, বরং তা সমকালীন সমাজে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। নারীদের শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার গুরুত্ব সমাজে ধীরে ধীরে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। অনেক শিক্ষিত পরিবার এই মডেল অনুসরণ করতে আগ্রহী হয়। বাংলা নবজাগরণের ক্ষেত্রে ঠাকুরবাড়ির এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


তবে বাস্তবতা হলো, এই সাহিত্যচর্চা মূলত একটি অভিজাত পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সাধারণ মানুষের মধ্যে তখনও শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চার সুযোগ সীমিত ছিল। তবুও ঠাকুরবাড়ির উদ্যোগ সমাজে পরিবর্তনের একটি পথ তৈরি করেছিল, যা পরবর্তীকালে আরও বিস্তৃত হয়। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে সাহিত্যচর্চা বাংলা সংস্কৃতির ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। এটি শুধু সাহিত্যচর্চার কেন্দ্র ছিল না, বরং একটি চিন্তাশীল, সংস্কারমুখী ও সৃজনশীল সমাজ গঠনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু প্রতিভার বিকাশ এই পরিবেশেই সম্ভব হয়েছিল। আজও এই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সাহিত্য কেবল লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মাধ্যম।


তিরস্কার-পুরস্কার


বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়


গতকালের কথা আগামীকাল অবধি টেনে নিয়ে যাওয়ার অভ্যেস ঘনশ্যাম ঘটকের কোনোদিনই নেই। ওঁকে জিজ্ঞেস করলে পরে বলেন, গতকালের মাছ ফ্রিজ থেকে বের করে খাচ্ছি, আবার গতকালের কথাও বয়ে বেড়াতে হবে? এই মানসিকতার জন্যই একগোল খেলে তিনগোল করে আসতে পেরেছেন বলে ঘনশ্যাম বিশ্বাস করেন; নইলে গতকাল সন্ধ্যার ঘটনা নিয়েই কত নাদান তিনদিন কান্নাকাটি করত। গতকাল কী হয়েছিল জানতে হলে আপনাকে অবশ্য পরশু পেরিয়ে তরশু পর্যন্ত যেতে হবে যেহেতু ওইদিন থেকেই ঘনশ্যামের গলার খুশখুশে কাশির সূত্রপাত। শীত আসছে, এই সময়টাই নতুন কাশি আর নতুন গুড়ের। তবে কিনা কাশিতে উঠে আসে বুকের রস। আর গুড়ে থাকে সুখের রস।

তবে দুঃখের সময়, রস নয়, সামান্য রামের প্রয়োজন হয় ঘনশ্যামের। গরম জলে মিশিয়ে নিলে প্রথম ডোজটি ওষুধের বাবা। দ্বিতীয় ডোজ থেকেই নেশার থাবা। তো, কাশি কমাবেন বলে গতকাল তরুণ প্রতিশ্রুতিমান লেখক অভিষিক্ত অধিকারীকে নিয়ে লোয়ার বারে গিয়ে বসেছিলেন ঘনশ্যাম। এই বারের আগের নাম ছিল ‘ফ্লাওয়ার’ বার। কিন্তু কালের কল্লোলে সাইনবোর্ড থেকে ‘এফ’টা খুলে যাওয়ায় নাম হয়ে গেছে ‘লোয়ার’। নিন্দুকেরা বলে এটাই যথার্থ কারণ ফ্লাওয়ারে এখন আর মেধার ফুল ফোটে না।


অভিষিক্ত, চার্টাড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। বললে পরে পার্কস্ট্রীটের বার কাম রেস্তোঁরায় নিয়ে যেতেই পারত ঘনশ্যামকে। কিন্তু ঘনশ্যাম মনে করেন যে সুরার দামই হল গিয়ে সুরার সুর। মূল্য যত উর্ধ্বমুখী হয়ে হিসহিস করতে থাকে গলা দিয়ে নামার সময় বিলিতিও তত বিষ-বিষ করতে থাকে। অসুখ-বিসুখের ব্যাপারে একটি অস্বীকৃত পিইচডি রয়েছে বলে ঘনশ্যাম জানেন ওই অনুভূতির নাম হল গিয়ে, গ্যাস্ট্রোকস্টাইটিস। অনুভূতির ঠেলা খেলেই কবিয়াল হয়ে ওঠেন সাহিত্য-সমালোচক ঘনশ্যাম। গতকালই যেমন ওঁর মনে হচ্ছিল, “ কেন হোস পথভ্রষ্ট? পয়সায় নেশা নষ্ট।” লেখা শেখার বাসনায় অভিষিক্ত থেকে চিরঋক্ত কতজন ঘনশ্যামকে পান- সুখ দিতে চায়। কিন্তু পয়সার দুঃখ ঘনশ্যাম কাউকে দিতে চান না। অতএব, লোয়ার বার।

মরবি তো মর, সেখানেই লীলাময় লাহা এসে ওঁর গলায় রজনীগন্ধার মালা পরিয়ে দিল। প্রথমটায় একটু চমকে গিয়েছিলেন ঘনশ্যাম। লীলাময়ের লেখার উনি কড়া সমালোচনাই করে থাকেন পত্র-পত্রিকায়। তারপরও এই মাল্যদান কেন? তখনই মনে পড়ল লীলাময়ের শেষ উপন্যাসের তত নির্মম সমালোচনাও করেননি উনি। এক বিখ্যাত গায়কের ফাংশন থেকে ফিরে জনৈক সঙ্গীত সমালোচক লিখেছিলেন হারমোনিয়ামটা ভদ্রলোক ভালোই বাজিয়েছেন; সেই কায়দাতেই লিখেছিলেন যে প্লট খাজা হলেও, সংলাপগুলো বেশ ভাল। ঘনশ্যামকে যাঁরা চেনেন তাঁরা জানেন যে ওঁর কলমে এ একরকম প্রশংসাই। হয়তো তার প্রতিদানেই এই অপ্রত্যাশিত মাল্যদান!

ঘনশ্যাম তাই স্মিতমুখে বলেছিলেন, শ্রদ্ধা করো জানি কিন্তু মালা কেন? আজ তো আমার জন্মদিন নয়।

লীলাময় পালটা হেসে বলেছিলেন, জন্মদিন নয় যে তা জানি। কিন্তু আপনার হয়তো মনে নেই, আজ আপনার অন্যের পয়সায় মদ খাওয়ার পঁচিশ বছর পূর্ণ হল।



লীলাময়ের ওই বিলো দ্য বেল্ট, গ্লাসের বরফ মেল্ট করার আগেই দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়বে তা বুঝতে এতটুকুও ভুল হয়নি ঘনশ্যামের। হয়নি বলেই কাল দু’পেগের পর এক মিনিটও আর বারে বসেননি ঘনশ্যাম। কিন্তু তাই বলে আজ ‘সাহিত্য মহারথী’ সম্মানের বিচার কমিটির সভায় যাবেন না তা তো হয় না।

রাস্তায় প্রবল জ্যাম থাকার কারণে কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণে পৌঁছতে খানিক দেরিই হয়ে গেল ঘনশ্যামের। জায়গাটা বাইপাসের ধারে। এখানে দেড় বিঘে জমির উপর ‘প্রাণবন্ত’ নামে এক পলিক্লিনিক ছিল বছর তিরিশ আগে। অধুনা সেটাই এক ফাইভ-স্টার হোটেল আর তার নাম রাখা হয়েছে, ‘জিভান্তা’। সেই জিভান্তার সাততলার কনফারেন্স-রুমে দরজা ঠেলে ঢোকার সময় একটি বাক্য কানে ভেসে এল ঘনশ্যামের।

-সকলের পিছনে কাঠি করলে, সামনে থেকে বুলেট খেতে হয় একদিন।

গলাটা শ্রীমন্ত সরখেলের। ঘরে আর যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রমীলা সান্নিগ্রাহী এবং যমুনেশ মাহাতোর সঙ্গে ওঁর বহুদিনের পরিচয়। আর কিঙ্কর রাহা তো বলতে গেলে ঘনশ্যামের একরকম চেলাই। কিন্তু ছোট্ট একটা অঙ্কুশ যেমন হাতির গতিপথ পালটে দেয়, শ্রীমন্ত সরখেলের ওই একটি কথাই স্ট্র্যাটেজি বদলাতে বলল ঘনশ্যামকে।

- আজ আর পেছনে লেগে নয়। সামনে থেকে জড়িয়ে ধরেই কাজ হাসিল করতে হবে। মনে মনে আওড়ে নিলেন ঘনশ্যাম।


সাহিত্য মহারথী পুরস্কার চালু হয়েছে গতবছর থেকে তবে বাংলার কপালে এই প্রথম জুটবে প্রাইজ। রাজধানী থেকে দেওয়া হচ্ছে বলেই নয়, রাজকীয় আয়োজনের কারণেই এই পুরস্কার নজর কেড়েছে। কুড়ি লাখ টাকার সাহিত্য পুরস্কার দেখা দূরে থাক, শুনেছে ক’জন ? হয়তো এত বেশি অর্থমূল্য বলেই এদের ছাঁকনি বড় প্রবল; ভাষা থেকে ভাষায় নিয়মকানুন আলাদা-আলাদা। মহারাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যেমন শিবাজি মহারাজকে নিয়ে লেখা কোনও বই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হবে না; কারণ শিবাজির নাম থাকলেই, বই যেমনই হোক, ‘জয় ভবানী’ বলে তাকেই পুরস্কৃত করে ফেলার একটা প্রবণতা দেখা যায়। তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে তামিল সিনেমা নিয়ে বই নৈব, নৈব চ। পশ্চিমবাংলার ক্ষেত্রে নিয়মটা আবার আলাদা। বাংলায় অসুস্থ কাউকে পুরস্কৃত করা যাবে না কারণ কর্তৃপক্ষের রিসার্চ টিম জানিয়ে দিয়েছে যে হামেশাই বইয়ের মেরিটের বদলে ক্রনিক ডিজিজ পুরস্কৃত হয়ে যায় এখানে। এইসব দেখেশুনে খানিক পিলে চমকে যাওয়া ঘনশ্যাম, কর্তৃপক্ষকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে ওঁরা এত লোক থাকতে ওঁকেই নির্বাচন করছেন কেন জুরিদের প্রধান হিসেবে। সাহিত্য-মহারথী পুরস্কারের আয়োজকরা জানিয়েছিলেন যে কবি-সাহিত্যিক মহলে সর্বাধিক অপ্রিয় লোকটিকেই ওঁরা খুঁজছিলেন আর ওঁদের সার্ভেতে ঘনশ্যামকে সাতানব্বইজন ‘শকুন’ বলেছেন যখন কি না ঘনশ্যামের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে ওই উপাধিতে ভূষিত করেছেন মাত্র বেয়াল্লিশজন।

মিটিং শুরু হবার সময় কথাটা মনে পড়ে যাওয়ায় সামান্য অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন ঘনশ্যাম। সেই সুযোগেই শ্রীমন্ত বলে উঠলেন, ঘনশ্যামদার কি কালকের ঘোর কাটেনি এখনও?

খোঁচা খাওয়া ঘনশ্যাম মুহূর্তকাল চুপ থেকে বললেন, ঘোর যার কেটে গেছে সে সাহিত্যের বিচারসভায় না থেকে শেয়ার কেনাবেচা করলেই ভাল।

শ্রীমন্ত সামলে নিয়ে বললেন, আপনি চুপ করে আছেন দেখে, ভাবলাম আমিই একটা নাম দিই বরং। অভিলাষ মজুমদার প্রাইজটা পেলে কেমন হয়?

ঘনশ্যাম বিড়বিড় করলেন, হাতিকে আন্ডারওয়্যার পরালে যেমন হয় তার কাছাকাছিই কিছু। গলা তুলে বললেন, কে পেলে কেমন হয় সেটা আমাদের বিচার্য নয়। কাকে দিলে সাহিত্যের প্রতি সুবিচার করা হবে সেটা খুঁজে বের করাই কাজ আমাদের।

-আমিও ঠিক এটাই বলতে চাইছিলাম। চুলে দু’বার হাত বুলিয়ে বলে উঠল কিঙ্কর।

প্রমীলা বেশ অনেকটা জল বোতল থেকে গলায় ঢেলে বললেন, অভিলাষের একটা কিশোর উপন্যাসের সঙ্গে চেকস্লোভাকিয়ার কোন সাহিত্যিকের একটা গল্পের মিল পাওয়া গিয়েছিল না তিন মাস আগে?

-চেকস্লোভাকিয়া বলে কোনও দেশ নেই আর। চেক আর স্লোভাকরা আলাদা হয়ে গেছে। শ্রীমন্ত রাগের গলায় জবাব দিলেন।

-কিন্তু টুকলি আর চুকলি তো আলাদা হয়নি তাই বলে। একটা করলে, আর একটা হবেই। ঘনশ্যাম নিচু গলায় বললেন।

-তা হলে, অভিলাষের চান্স নেই কোনও? যমুনেশ জানতে চাইলেন।

ঘনশ্যাম গলা তুললেন, আচ্ছা অভিলাষের সেই ক্যান্সারের ব্যাপারটা আমরা কি ভুলে গিয়েছি?

ব্যাপারটা কী হয়েছিল তাই নিয়ে বিস্তর ধোঁয়াশা থাকায় ঘনশ্যামের দিকেই তাকালেন সকলে।

ঘনশ্যাম শুরু করলেন, অভিলাষের ভিতরে যে প্রতিভার ছটা রয়েছে তা তো অল্প বয়স থেকেই বোঝা গিয়েছিল কিন্তু সন্ধিৎসার প্রেমে পাগল হয়ে বেচারি নিজের জীবন অনেকটাই ঘেঁটে ফেলেছিল।

-সে তো অনেক আগের কথা। শ্রীমন্ত ফোড়ন কাটলেন।

-আগের কথাই পরে আসে, বনের বাঘই ঘরে আসে। কিন্তু কথা সেটা নয়। কথা হল গিয়ে ক্যান্সার। টিভি সিরিয়ালের নায়িকা সন্ধিৎসাকে পাওয়ার জন্য উর মাটি চুর করেও যখন লাভ হল না, উলটে রাস্তায় অপমান করে দিল নায়িকা একদিন, তখনই ক্যান্সারের শরণাপন্ন হল অভিলাষ। সন্ধিৎসার সামনে গিয়ে বলল যে ওর ক্যান্সারের থার্ড স্টেজ, ডাক্তারের কথামতো, একেবারেই , ‘বাই বাই , যাই যাই” অবস্থা। এবার দাদু না ঠাকুরদা কেউ একজন ক্যান্সারে চলে গিয়েছিলেন বলে, কথাটা শুনেই রাতারাতি ভোলবদল ঘটে গেল সন্ধিৎসার।অভিলাষের সঙ্গে এক ছাদের তলায় থাকতে শুরু করে দিল। আর কয়েকদিনের ভিতরেই টের পেল, অভিলাষ একটা শিশি থেকে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খায়।

-এইগুলো কে খেতে বলেছে তোমায়? এতে ক্যান্সার সারে? সন্ধিৎসা জানতে চায়।

অভিলাষ জবাবে বলে যে ওটা হচ্ছে ক্যান্সারের অরগ্যানিক চিকিৎসা। অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ শুধু ছোটায় আর হোমিওপ্যাথি ফোঁটায়, ফোঁটায়…

-অভিলাষ আর ওই মেয়েটার দাম্পত্য কলহ শুনে আমরা কী করব? এখানে তো এসেছি লেখা নিয়ে কথা বলতে…

শ্রীমন্তকে হাত উঁচু করে থামিয়ে দেন ঘনশ্যাম, লেখার ভিতরেই খেলা থাকে ব্রাদার। একদিন শ্যুটিং ক্যান্সেল হওয়ায় দুপুর-দুপুর ফিরে আসার সময় সন্ধিৎসা যখন দেখল যে সামনে বৃষ্টিভেজা মাঠে দাপিয়ে ফুটবল খেলছে অভিলাষ, ওর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল যে আসলে কিছুই হয়নি লোকটার।

-কী করল নায়িকা তখন?

-একদম হি-ম্যান নায়করা যা করে। মাঠের মধ্যে নেমে গিয়ে হাই-হিল খুলে, “বল তোর কোথায় ক্যান্সার” বলতে বলতে বেধড়ক জুতোপেটা করল অভিলাষকে। ভাগ্যিস কয়েকবছর আগের কথা, স্মার্ট-ফোন তখনও ওঠেনি সেভাবে, নইলে…

-কিন্তু এই কারণে কি অভিলাষকে পুরস্কার থেকে বঞ্চিত করা যায়? শ্রীমন্ত হাল ছাড়ার পাত্র নন।

ঘনশ্যাম হাসলেন সামান্য, আমরা বঞ্চিত করার কে? জুতোপেটা করে অভিলাষের আর্থারাইটিস ধরিয়ে দেওয়া সন্ধিৎসা তো সেদিনের মাঠের কাদা মেইলেও ছিটিয়েছে। দেড়শোজনকে জানিয়েছে অভিলাষ ওকে ধোঁকা দিয়ে বিয়ে করেছে। ভাবুন একবার, ছেলেটার সত্যিই ক্যান্সার হলে কি ওর কিছু সুবিধা হত? কিন্তু সেই কথা কি আর বাইরের পৃথিবী বুঝবে? বেচারি অভিলাষ দিল্লির মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ানোর আগেই ওর গল্প উড়ে গিয়ে পৌঁছবে ওখানে। তখন কেন একজন ফ্রডের নাম আমরা পাঠালাম তাই নিয়ে…

-আমরা যদি বলি যে ও ফ্রড করেছে না করেনি, আমরা জানি না। যমুনেশ বললেন।

ঘোর বিরক্ত হলেও মুখের হাসি মেলাতে দিলেন না ঘনশ্যাম। গলা সামান্য খাদে নিয়ে গিয়ে বললেন, তবে তো প্রশ্ন আসতে পারে যে আমরা একজন ক্যান্সারাক্রান্তর নাম আদৌ পাঠালাম কেন?

-এত ঝামেলায় না গিয়ে অভিলাষের নামটা বাদ দিয়ে দিলে হয় না?

-ওভাবে বোলো না কিঙ্কর। বরং দ্বিতীয় নাম নিয়ে আলোচনার আগে আমরা লেখক অভিলাষকে একবার সবাই মিলে ধন্যবাদ জানাই, নায়িকা ছেড়ে গেলেও ও নায়ক হবার চেষ্টায় বিরতি দেয়নি বলে।


টি-ব্রেক’এর পর ঘনশ্যাম কিছু বলার আগেই প্রমীলা বলে উঠলেন, পয়মন্তী তলাপাত্রকে নিয়ে কথা বাড়াবার কোনও প্রয়োজন দেখছি না।

ঘনশ্যাম ফুঁসে উঠলেন শুনেই, শর্টলিস্টেড একজন ক্যান্ডিডেট সম্বন্ধে এভাবে কথা বলতে পারেন না আপনি আর তাছাড়া বইমেলা হোক বা কইমেলা সর্বত্রই আজ পয়মন্তী একটা সেনসেশনের নাম।

-মইমেলা বলে একটা মেলা চালু হয়েছে শুনেছি, সেখানে নাকি সেলিব্রিটিরা মইয়ে চড়ে সই দেওয়া শেখান। কিন্তু কইমেলা ব্যাপারটা ঠিক কী ঘনশ্যামদা? যমুনেশ মাহাতো জিজ্ঞেস করলেন।

ঘনশ্যাম হেসে ফেললেন, কইমেলা জানো না? সাইন্স সিটির বিশ মাইল দূরে গত তিন বছর ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জল-জমা ধানক্ষেত থেকে জ্যান্ত কই তুলে আনার প্রতিযোগিতা। যে যতগুলো কই তুলে আনতে পারবে সে পাবে ততগুলো সই করা বই।

-মানে কী এই সার্কাসের? শ্রীমন্ত ফ্যাঁচ করে নাক ঝাড়লেন।

-মানে হচ্ছে ধানে-ধানে, গানে-গানে, জ্যান্ত লেখা জন্ম নেয়, জ্যান্ত কইয়ের টানে। বাংলার সবচেয়ে জ্যান্ত সাহিত্যের জন্মদাত্রী হিসেবে পয়মন্তী পরপর দু’বার উদ্বোধন করেছে ওই…

-রাখুন তো যত আষাঢ়ে গপ্পো। প্রমীলা থামিয়ে দিলেন ঘনশ্যামকে।

-আষাড়ে নয়, আষাড়ে নয়, শ্রাবণের ধারার মতো। ইস আগে যদি বুঝতাম তবে কি আর পয়মন্তী আজ এত দূরে…

-কীরকম যেন রহস্যের গন্ধ পেলাম। শ্রীমন্ত সরখেল একটু সরু গলায় বললেন।

- একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার, জেনে কারও কোনও লাভ নেই। ব্যাপারটা হল, এই প্রাইজটা পয়মন্তীকে দেওয়া যায় কি না। আমার মত যদি চান তবে আমি বলব…

-আপনার মত জানার আগে আপনার আর পয়মন্তীর সম্পর্কের ব্যাপারটা তো জানতে হবে। নইলে প্রাইজের ছদ্মবেশে স্বজনপোষণ হয়ে যেতে পারে তো! প্রমীলা সান্নিগ্রাহি বেশ কড়া গলায় বললেন।

-দেখুন আপনি দাদার সঙ্গে ওইভাবে…

কিঙ্করকে হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ঘনশ্যাম, প্রমীলার প্রশ্ন করার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন কোরো না। কিন্তু ম্যাডাম, পয়মন্তী আমার স্বজন হবে, এমন ভাগ্য করে তো আমি আসিনি।

-কী বলছেন ঘনশ্যামদা? পয়মন্তীর সঙ্গে প্রেম ছিল আপনার? যমুনেশ মাহাতোর গলায় নিখাদ বিস্ময় জেগে উঠল।

-প্রেম-ট্রেম তো খেলা রে ভাই, পয়মন্তী আর আমার সাতপাকে ঘোরার ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছিল। আসলে পয়মন্তীর বাবা সেই সময়ের নামজাদা ডিভোর্স ল-ইয়ার ছিলেন বলে মেয়ের জন্য একটি ঘরজামাই খুঁজছিলেন। আর যতই লোকে খিল্লি করুক, ঘরজামাই কথাটার আসল মানে হল গিয়ে, বউয়ের চেয়ে যে ঘরকে বেশি ভালবাসে। তা, আমার হতে পারত শ্বশুরমশাই প্রসপেক্টিভ জামাইদের নিজের বাড়িতে এনে রাখতেন এক রাত করে। আমাকেও রেখেছিলেন, আর পরদিন সকালে উঠে আমি পয়মন্তীদের চকমিলানো বাড়ির সিঁড়ি ঝাঁট দিচ্ছি দেখেই, তলাপাত্রবাবু মনস্থির করে ফেলেন। ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসে আমায় বলেন যে জামাই যখন নির্বাচন করতে হবে তখন কেবল জামাইকেই নির্বাচন করতে হবে। জামাইয়ের সঙ্গে বাড়ি ফ্রি’তে পাচ্ছি কি না, গাড়ি ফ্রি’তে পাচ্ছি কি না দেখতে দেখতে শেষে জামাইয়ের সঙ্গে ফ্রি’তে লাঠি না মিলে যায়। প্রথমটা আমি বুঝতে পারিনি, উনি কী বলছেন। কিন্তু যখন টমিকে সরিয়ে দিয়ে চেয়ারের পায়ার কাছে আমায় এনে বসালেন তখনই টের পেলাম, লাঠি সমেত খোঁড়া জামাইয়ের বদলে হাতওয়ালা নিঃস্ব জামাইকেই প্রেফার করছেন।

-তা এমন জ্ঞানী ব্যক্তির জামাই হওয়া আপনার হল না কেন? শ্রীমন্ত খোঁচা দিলেন একটু।

-হবে আর কী করে? পয়মন্তী যে বেলা গড়াতেই আমায় নিজের ঘরে ডেকে বলল, আমার একটা গোপন অসুখের কারণেই বাবা ঘরজামাই খুঁজছেন, আপনি কি জানেন?

- আমার তখন চোখে ভাসছে পয়মন্তীদের বাড়ি, মনে হাসছে ওদের গাড়ি। আমি কুছ পরোয়া নহি গলায় বললাম, টাইফয়েড, জন্ডিস, ক্যান্সার, এইডস, আপনার যে অসুখই থাকুক না কেন, আমি পিছু হটব না। আমায় বিস্মিত করে পয়মন্তী বলল যে ওর সমস্যা একটু অন্যরকমের। শুনেই আমি খোঁচাতে থাকলাম, আর খোঁচাতে খোঁচাতে যখন কপালে ঘাম বিজবিজ করছে তখন গিয়ে শুনলাম যে পয়মন্তীর রাতে বিছানা ভিজিয়ে ফেলার সমস্যা রয়েছে।

-য়্যাঁ ? শ্রীমন্ত আর প্রমীলা একযোগে বলে উঠলেন।

-আজ্ঞে, হ্যাঁ। কিন্তু ওই কথাটা শুনেই আমি আমার নিজের কপাল পুড়িয়ে ফেললাম। আমার ভিতরকার সর্বনাশী কবিয়াল বলে উঠল, কোনও সমস্যা নেই। বরং এই ভাল হল যে, “ বিয়ে-শাদি শাস্ত্রমতে/ ফুলশয্যা অয়েল-ক্লথে”!

-বললেন আপনি কথাটা? যমুনেশ জিজ্ঞেস করল।

-হ্যাঁ ভাই, বললাম। কী করে জানব যে ওই নির্দোষ দু’লাইনে নিজের অসুখের প্রতি অপমান খুঁজে পেয়ে পয়মন্তী পাকা ঘুঁটি কাঁচিয়ে দেবে?

-স্রেফ, ওই ছড়ার কারণে বিয়ে করল না আপনাকে? এতটা যে নিষ্ঠুর তাকে কোনও প্রাইজ দেবার কথাই ওঠে না।

-উত্তেজিত হয়ো না কিঙ্কর, যোগ্যতার বিচারে, পয়মন্তীই মনে হয় এই তালিকায় সবার চেয়ে এগিয়ে।

-এগিয়ে থাকলেও, নয়; না থাকলেও নয়। প্রমীলা চেঁচিয়ে উঠলেন।

-কীসের ভিত্তিতে আপনি ‘না’ বলছেন প্রমীলা? ঘনশ্যামের গলা গম্ভীর।

-পুরস্কার-মূল্য অনেক হতে পারে কিন্তু ‘সাহিত্য মহারথী’র আয়োজকরা সব বিজেতাকেই টুইন-শেয়ারিং বেসিসে ফোর স্টার হোটেলে রাখবে। এবার রুমে যদি ডবল-বেড খাট থাকে আর তাতে কোনও মালয়ালি বা ওড়িয়ার সঙ্গে পালা পড়ে পয়মন্তীর, তা হলে বাংলার লজ্জা তো সর্বভারতীয় হয়ে যাবে।

-কিন্তু পয়মন্তীর অসুখ তো সেরে গিয়েও থাকতে পারে। ঘনশ্যাম একটু দুর্বল গলায় বললেন।

-মোটেই সারেনি। সারলে পরে ও গত শীতের সুন্দরবন সাহিত্য উৎসব থেকে দুপুর গড়াতেই কেটে পড়ত না। আমিই ছিলাম, সেদিন ওর রুম-পার্টনার। এখন মনে হচ্ছে ভাগ্যে পালিয়েছিল। নইলে সারা রাত ওই…

- ঘনশ্যামবাবুর পুরনো হৃদয়বেদনার কারণে আমরা এই মহারথী পুরস্কারের নিয়মকানুন অগ্রাহ্য করতে পারি না। তাছাড়া বাংলার সম্মান নিয়েও ছিনিমিনি খেলা যায় না। তার চাইতে দ্বৈপায়ন ধর ফার বেটার ক্যান্ডিডেট। তিনজনের মধ্যে একজনকে যখন দিতেই হবে তখন দ্বৈপায়নই আদর্শ । শ্রীমন্ত সরখেল নিদান দিয়ে দিলেন একপ্রকার।

-পয়মন্তীকে না দিতে চান দেবেন না। কিন্তু দ্বৈপায়ন ধরের কথা ভেবেচিন্তে তুলছেন? ঘনশ্যাম ঘরে উপস্থিত অন্যদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন।


-নিসর্গ আর দার্শনিকতা এই দুইয়ের মেলবন্ধন খুবই দুষ্প্রাপ্য। আর দ্বৈপায়ন নিজের কবিতায় ঠিক সেটাই ঘটাতে পারে। কিন্তু প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও ওর স্বীকৃতি মেলেনি। দু-একটা পুরস্কারের জন্য নাম উঠলেও শেষ মুহূর্তে ওর বদলে অন্য কেউ…

-নামটা কাঁচি হয়ে গেছে বলুন। ঘনশ্যামের কথার ভিতরেই বলে উঠলেন শ্রীমন্ত।

-কাঁচিও হয়নি, তলোয়ারই নয়। দ্বৈপায়ন বাইশ বছর ধরে গার্লস কলেজে পড়ায় বলে ওর প্রাইজ পাওয়া নিয়ে অনেকেরই একটা আপত্তি রয়েছে। তাদের বক্তব্য হল, যে লোকটা বাইশ বছর ধরে প্রতিদিন ভোর সাড়ে ছটায় একলপ্তে সাড়ে তিনশো কিশোরী আর যুবতীকে দেখতে পায় চোখ মেলে, তার আবার অন্য প্রাইজের কী প্রয়োজন?

-আমরাও কি এই ছেঁদো যুক্তিতে…

- সব ব্যাপারে চেঁচিয়ে ওঠার মানসিকতা ভাল নয়, শ্রীমন্ত! পয়মন্তীর প্রতি আমার যত মানুষী দুর্বলতাই থাকুক না কেন, আমার ভোট আমি দ্বৈপায়নকেই দেব। কিন্তু তারপর ওর আবার হার্ট অ্যাটাক হলে?

-হার্ট আট্যাক? পুরস্কার পেয়ে? যমুনেশ আকাশ থেকে পড়লেন।

-তিরস্কার নইলে পুরস্কার, এই দু’টো থেকেই তো হয়। তবে আজ এখানে চুপিচুপি বলি, দ্বৈপায়নের হার্ট অ্যাট্যাক হয়েছিল বিধবা বিবাহ করতে গিয়ে। না, ওভাবে আমার দিকে তাকিয়ে লাভ নেই, গার্লস কলেজে পড়িয়ে পড়িয়ে বিদ্যাসাগরের ব্রতে এমনই উদ্বুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল ছেলেটা যে এক বন্ধুর পরামর্শে, উইডো রি-ম্যারি ডট কমে গিয়ে নাম লেখায়।

-উইডো রি-ম্যারি ডট কম?

-চমকাবেন না প্রমীলা। পৃথিবীতে, আমার-আপনার জানার বাইরে অনেক কিছুই আছে। শুনেছি ওই ডট কম থেকে একজনের সঙ্গে কথা অনেকদূর এগিয়েও গিয়েছিল তবে ভদ্রমহিলা দাবি করেছিলেন যে উনি ব্যক্তিগত স্তরে সধবা হলেও, আইনি বিধবা থাকবেন। ভেবে দেখলে ভুল কিছুই বলেননি, শাঁসালো পেনশন হাতছাড়া করবেনই বা কেন? কিন্তু দ্বৈপায়ন ওই কাটাকুটির ডবল প্যাঁচে ঘোর অস্বস্তি বোধ করছিল তাই পিন্টু পালের কথায় ও যেন রামধনুর সন্ধান পায়।

-পিন্টু পাল আবার কে? কিঙ্কর জানতে চাইল।

- ঐত্রীর মামা। দ্বৈপায়নের পিসির পাড়ায় থাকা ঐত্রীকে ছোট থেকেই বড় পছন্দ ছিল দ্বৈপায়নের। তার মাত্রা এতটাই যে ঐত্রীর বিয়েতে নিমন্ত্রিত না হয়েও আট হাজার টাকার বালুচরি নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল ল্যাং ল্যাং করে। তারপরও বসে খেতে পেয়েছিল কি না তাই নিয়ে বিতর্ক আছে কিন্তু বিয়ের বছরখানেকের মাথায় বাসে সিট ছেড়ে দিতে পিন্টু পাল যখন বলল, “আর বোলো না হে, কপালটাই খারাপ! ভাগ্নিটার বিয়ে হল আর জামাইটাই গেল মরে”, দ্বৈপায়নের হৃদয়ে রসগোল্লা ফুটতে শুরু করল। জামাইই যখন নেই তখন ঐত্রী নির্ঘাত বাপের বাড়িতে, এই অঙ্ক কষে পরদিন বিকেলেই পিসির পাড়ায় চলে গেল দ্বৈপায়ন। ওর পিসির ছেলে এককালের বড় ওয়াগন-ব্রেকার, ইদানিং প্রোমোটারি করে। সে দ্বৈপায়নকে উৎসাহ দিয়ে বলল, “বাড়ির কোন ওয়াগনে আছে সেইটুকু শুধু বলে দিবি। তারপর বের করে আনার দায়িত্ব আমার”। তা আমাদের নিসর্গচেতনার কবি দ্বৈপায়ন ওইসব শুনে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিল কিন্তু ঐত্রীর বাড়ির সামনে গিয়ে দেখল, ওয়াগনে নয়, সামনের বারান্দায় চুল খুলে বসে আছে ঐত্রী আর বাড়ির পুরনো লোক চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ঐত্রীর মাথার উকুনগুলোকে টিপে মারছে। কিন্তু ঐত্রীর কপালে এত সিঁদুর লেপটে আছে কেন? ও কি ট্রমা থেকে বেরোতে পারেনি আজও? অপরিসীম মমতায় দ্বৈপায়ন তাই দু’টো সিঁড়ি টপকে বারান্দায় উঠে জিজ্ঞেস করল, “বরের জন্য মনকেমন করছে ঐত্রী?”

- বাবার শ্রাদ্ধে তিনদিনের ছুটি নিয়ে এসে এগারোদিন থেকে গেল তো। গত পরশু আবার কটকে ফিরেছে।

- তোমার বর কটকে? তোমার মামা যে বলল, জামাই মারা গেছে?

-আমার বাবা তো মামাদের জামাইই হয়। বাবার মারা যাওয়ার খবর পাননি?

ঐত্রীর সংলাপটা বলার পর সামান্য বিরতি নিয়ে ঘনশ্যাম বললেন, ওই কথাটা শুনেই দ্বৈপায়ন মাথা ঘুরে পড়ে যায় ঐত্রীদের বারান্দায়। ম্যাসিভ অ্যাটাক। তবে বাড়ির পুরনো কাজের লোক বুদ্ধি করে ঐত্রীর চুল থেকে সদ্য বাছা দু-তিনটে উকুন টিপে মেরে, দ্বৈপায়নের মুখে ঠুসে দিয়েছিল বলে ওই যাত্রা বেচারি রক্ষা পায়। যে ডাক্তার উকুনের এই অলৌকিক ক্ষমতা সম্বন্ধে আমায় জানিয়েছিলেন, তিনিই বলেছিলেন যে ভবিষ্যতে কখনও যেন ভাল-মন্দ কোনওরকম উত্তেজক খবর না দেওয়া হয় দ্বৈপায়নকে। এবার আপনারাই বলুন!

-বলার কিছু নেই। শর্টলিস্ট হওয়া তিনজনের একজনের নামও পাঠানো যাবে না। সেক্ষেত্রে ‘সমালোচনার সপ্তসিন্ধু’ গ্রন্থের জন্য ঘনশ্যাম ঘটকের নামটাই আমরা পাঠিয়ে দিই না কেন? উনি কমিটির প্রধান বলে পুরস্কার পেতে পারবেন না এমন কিছু তো লেখা নেই! কিঙ্কর বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল উত্তেজনায়।

-আপনারা তবে এই প্ল্যান করেই এসেছিলেন এখানে? শ্রীমন্তর তির্যক গলা বাতাসকেও কেটে গেল।

- কী বলতে চান আপনি? কীসের প্ল্যান? উপস্থিত সবাইকে অপমান করছেন এই কথাটার মধ্যে দিয়ে সেই খেয়াল আছে? ঘনশ্যাম চিৎকার করে উঠলেন।

-হ্যাঁ, সেটা আমিও মনে করছি। ঘনশ্যামবাবু তো নিজের জন্য পুরস্কার চাননি। পাকেচক্রে অন্য নামগুলো যদি বাতিল হয়ে যায় আর হাতে সময় না থাকে তবে উনি কী করবেন? যমুনেশ বললেন।

-ঠিকই বলেছেন যমুনেশ। পাঁচদিনের মাথায় পুরস্কার প্রদান। ডিক্লারেশন কাল। শ্রীমন্তও কি অসুস্থ নাকি যে এই ব্যাপারগুলো বুঝতে পারছেন না? প্রমীলাও জোয়ারে ভাসলেন।

-আমি নিজে কিন্তু নিজেকে ভোট দিতে পারব না। কেবল এটুকু বলতে পারি যে সূর্য আর চন্দ্র পৃথিবীর বাইরে থাকলেও যেমন তাদের আলোতেই দুনিয়া চলে, তেমন করেই কমিটির চেয়ারম্যানও পুরস্কার পেতেই পারে। অবশ্যই অন্যান্য সদস্যদের ঐকান্তিক আগ্রহে।

-অবশ্যই, অবশ্যই। কিঙ্কর, যমুনেশ এবং প্রমীলা বলে উঠলেন।

তখনই তারস্বরে বেজে উঠল ঘনশ্যামের মোবাইল, বাজতেই থাকল। সাইলেন্ট করতে গিয়ে ফোনটা ধরে ফেললেন ঘনশ্যাম, আর হাতের টোকায় স্পিকার-অন হয়ে গেল।

-স্যার, রয়াল ল্যাবরেটরি থেকে বলছিলাম। কাল যে আপনার সোয়াপ টেস্ট হল, রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। আপনার ভাইরাল লোড কিন্তু খুব হাই, আগামী সাত-দশদিন একদম কোয়ারান্টাইন হয়ে থাকবেন স্যার। রিপোর্ট হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফোনটা কেটে গেল।

-করোনা? করোনা আছে এখনও? ঘনশ্যাম বিস্ময় প্রকাশ করলেন।

- এবার যান, করোনা নিয়ে দিল্লি চলে যান প্রাইজ নিতে। জীবন্ত কোভিড হিসেবে, আপনাকে আরও একটা এক্সট্রা পুরস্কার দিয়ে দেবে। শ্রীমন্ত হেসে উঠলেন।

-এটা কী করলেন আপনি? ডেকে এনে আমাদেরও ফাঁসালেন? প্রমীলা আর যমুনেশের সঙ্গে কিঙ্করও গলা মিলিয়ে ফেলল।

ঘনশ্যাম ভেঙে গেলেও মচকালেন না, ম্যারাথন মিটিং করে একজন মহারথী খুঁজে পেলাম না আমরা আর দশ সেকেন্ড নাকে খোঁচা দিয়ে অত কিছু আবিষ্কার করে ফেলল? রিপোর্ট ভুলও তো হতে পারে।

-ইয়ার্কি মারছেন এখনও? রিপোর্ট সঠিক হলে কী হবে? শ্রীমন্ত বললেন।

-কী আবার হবে? অভিলাষ কিংবা পয়মন্তীর দরকার নেই, দ্বৈপায়নকেই পাঠিয়ে দেব দিল্লি। যে নির্দেশনামা মেনে কাজ করছি তাতে একজনের পুরস্কার আর একজন নিতে পারবে না, কোত্থাও বলা নেই।

-নিতে গিয়ে যদি হার্ট অ্যাট্যাক হয় লোকটার আবার? প্রমীলা জিজ্ঞেস করলেন।

-হবার চান্স নেই, তবু আপনি ভয় পেলে পরে ওঁর সফরসঙ্গী হয়ে যান। সেরকম পরিস্থিতি এলে আপনার চুল থেকে দু’টো জ্যান্ত উকুন তুলে নিয়ে খাইয়ে দেবেন নয়। ডাক্তারের মতে ওটা মহৌষধ, বললামই তো।

কথা শেষ হবার আগেই প্রমীলা সামনের পেপারওয়েট ছুঁড়ে মারলেন ওঁর দিকে। ঘনশ্যাম অবলীলায় সেটা ক্যাচ করে নিয়ে খুকখুক করে কেশে নিলেন একটু। তারপর বললেন, রেগে যাচ্ছেন কেন? মাথায় উকুন নেই আপনার? একটাও নেই?



Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page