top of page
Search

মনসুন আর মাদিকেরী..


অরিত্র ঘোষ



বাঙালী হয়ে জন্মাবেন আর পায়ের তলায় সর্ষে থাকবে না বা একটু পেটরোগা হবে‌ন না, তাই কি হয় মশাই? মওকা পেলেই অফিসের বসকে ঢপ দিয়ে বেরিয়ে পরেননি আর রাস্তাঘাটে ভুল-ভাল ভাজাভুজি খেয়ে চোঁয়া ঠেঁকুর তোলেননি এমন বাঙালী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এর মধ্যে এখন বর্ষাকাল, তার ওপর শ্রাবণে শিবঠাকুর সবার ঢালা জল সহ্য করতে করতে সর্দি বাঁধিয়েছেন। এদিকে উঠতি কবির কলম "শাওনের ধারায় হৃদয়ে লেগেছে দোলা" জাতীয় কবিতা লিখে ক্লান্ত, ওদিকে রান্নাঘরে মায়ের খুন্তি "সর্ষে ইলিশ" বানানোর ফাঁকে অবসর খুঁজছে আর পাশের বাড়ির বুল্টি ২২ শে শ্রাবণে স্কুলের প্রোগ্রামের জন্য হারমোনিয়াম নিয়ে প্যাঁ প্যাঁ করতে ব্যস্ত। বর্ষায় প্রেয়সীর ভিজে ঠোঁট আর কাজের ফাঁকে অফিসের নীচে চা-টাও বিস্বাদ লাগতে শুরু করেছে আর এটাই সময় যখন আপনি বিরক্ত হয়ে সব ছেড়ে টুক করে বেরিয়ে পরবেন একটা ট্রিপে। না থোড়-বড়ি-খাড়া ঐ দী-পু-দা নয় কিছুতেই…


এরকমই এক শ্রাবণের সকালে বুঝলাম মস্তিষ্ক সচল রাখতে ঘুরতে যেতে হবেই। বর্ষায় ঘুরতে যাওয়াও এক ঝকমারি, সব জায়গায় গিয়ে সুবিধে হয়ে ওঠে না। সব ভেবে ঠিক করলাম এবারের যাত্রা "কোডাগু"তেই। সে কি! চিনতে পারলেন না?

আচ্ছা, "কুর্গ" বললে নিশ্চয়ই চিনবেন? কর্ণাটকের মোহময়ী কুর্গ। তারপর আর কি! রইলো ঝোলা, চললো ভোলা। ইয়ে মানে আমি ঝোলা নিয়েই গেছিলাম যদিও। 


চটজলদি ব্যাঙ্গালোর অবধি ট্রেনের টিকিট, ব্যাঙ্গালোরের মাইশোর স্যাটেলাইট বাসস্ট্যান্ড থেকে কুর্গ যাওয়ার জন্য KSRTC এর "ঐরাবত ক্লাব ক্লাস" ভলভো বুক করে নেওয়া হলো। এরপরই সবচেয়ে কঠিন জিনিস, মাথা গোঁজার জায়গা খোঁজা। কুর্গে সবাই মোটামুটি কফি এস্টেটের ভেতরই থাকতে পছন্দ করেন, কিন্তু দাম দেখে তো চক্ষু চরকগাছ। অতঃপর আমার প্রিয় "Airbnb" ঘাঁটতে ঘাঁটতে সাধ্যের মধ্যে পেয়ে গেলাম "4C's Little Paradise" নামের একটি প্রপার্টি‌ আর এটাই বোধহয় আমার জীবনের সেরা সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটি। 

পরিকল্পনামাফিক রাতের বাস ধরে ভোর সাড়ে চারটেয় পৌঁছলাম মাদিকেরী বাসস্ট্যান্ডে। টিপ টিপ করে বৃষ্টির মাঝেই অটো করে হোমস্টের উদ্দেশ্যে যাত্রা। তখন ভোর পাঁচটা, সবে আধো আধো আলো ফুটেছে। ওয়াইল্ড রোবাস্টা কফি, এলাচের জঙ্গল পেরিয়ে হোমস্টেতে পৌঁছেই মনে হলো জীবনটা সার্থক। যতদূর অবধি চোখ যায় বৃষ্টিভেজা সবুজ, বাতাসে গাছপালার গন্ধ, সুয্যিমামা সবে সামান্য একটু চোখ ফাঁক করেছেন আর তার সাথে যোগ হয়েছে হাজার হাজার পাখির ডাক। মনে হচ্ছিলো যেনো ভুল করে কোন স্বর্গের উদ্যানে ঢুকে পরেছি।

চোখ বন্ধ করে পুরো ব্যাপারটা উপভোগ করে ঘরে গিয়ে একটু রেস্ট নিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে নীচে নেমে তো অবাক কমপ্লিমেণ্টারি ব্রেকফাস্টের আয়োজন দেখে। পুলিওগ্রে, কার্ড রাইস, পাপুটু ইডলি, সাম্বার, কোকোনাট চাটনি, টোস্টেড ব্রেড, হোমমেড জ্যাম, পুরি-সব্জি আর শো-স্টপার হিসাবে চকোলেট ব্রাউনি আর নিজেদের বাগানের কফি। আহা! সে কি স্বাদ।

এরপর টুক করে চিকলিহোল ড্যাম, কাবেরী নিসর্গধাম, হারাঙ্গি ড্যাম, দুবারে এলিফ্যান্ট ক্যাম্প এসব ঘুরে ঢোকা হয়েছিলো কুশলনগরের "দ্য ম্যাগনিফিক" রেস্তোরাঁয়। এদের কুর্গ স্টাইল মাটন ড্রাই ফ্রাইটা অসাধারণ। গেলে ট্রাই করতে ভুলবেন না যেন।

আমাদের মতো নির্ভেজাল খাইয়ে ভোজনরসিক মানুষ দেখে হোমস্টের হোস্ট বললেন স্পেশাল "শুক্কা মাটন পেপার ফ্রাই" খাওয়াবেন। সন্ধ্যাবেলা হোমস্টেতে কফি নিয়ে বসা হলো। চারদিকে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ, দূরের গাছপালা ঘোলাটে আলোয় ঝাপসা আর তার মাঝে আমরা তিন বন্ধু। সে এক মায়া! মাঝে মাঝে রেসিপির দিকেও চোখ রাখছিলাম বৈ কি!

নিজেদের বাগানের গোটা গরম মশলা দিয়ে শুরু করে ম্যারিনেটেড মাটন দিয়ে লোকাল বার্ডস'আই চিলি, নুন, হলুদ আর মশলার ব্লেন্ড (ধনে, জিরে, মৌরি, গোলমরিচ আর ডেসিকেটেড কোকোনাট রোস্ট করে গ্রাইন্ড করে নেওয়া) দিয়ে ব্যাপারটাকে কষানো হয়। প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট পর জল টেনে গেলে বেরেস্তা (বাদামী ভাজা পেঁয়াজ), মল্ট ভিনিগার, কারিপাতা আর পাথরের মর্টার অ্যান্ড পেশেলে হালকা করে ক্রাশ করে নেওয়া গোলমরিচ ছড়িয়ে টস করে নেওয়া। সান্ধ্যআড্ডায় কফি প্ল্যাটেশন ঘেরা মোহময়ী কুর্গের এক স্বর্গীয় হোমস্টেতে বসে এই মাটন ড্রাই ফ্রাই, এ বর্ণনা করার সাধ্য স্বয়ং কালিদাসেরও বোধহয় নেই আর এই অধম তো কোন ছাড়!

কথায় বলে, আলেকজান্ডার দি গ্রেট যখন ভারতে অনুপ্রবেশ করেন যখন তাঁর কিছু সৈনিক ভারতেই পাকাপাকিভাবে থেকে যান, আর সেখান থেকে কুর্গিদের উৎপত্তি। তো যাদের শিরা-ধমনীতে হালকা হলেও গ্রিক রক্ত বইছে, তাদের খাবার-দাবার থেকে ভোজনরসিক মানুষের যে একটু হটকে এক্সপেক্টেশন থাকবে, এতে আর আশ্চর্যের কি?

যাই হোক, পরদিন সকালে বেরিয়ে কাবেরী নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করে অ্যাবে ফলস, রাজা'স সিট, রাজা'স টম্ব ঘুরে আমরা সটান চলে গেলাম বিখ্যাত Big Cup Cafe তে। সেখানে ল্যাম্ব বার্গার সহযোগে বিশুদ্ধ কোডাগু ফিল্টার কফি, আইরিশ লাটে আর ভ্যানিলা ক্যাপুচিনো উপভোগ করতে করতেই নামলো বৃষ্টি। এখানে ক্যাফেগুলোর ইন-হাউস রোস্টারি গুলো অসাধারণ, নিজের মতো কাস্টোমাইজেশন করা যায়। কোন কফি বিন কতটা মেশাবেন, কতটা রোস্ট করবেন একদম আপনার ব্যাপার। তবে মাস্টার রোস্টার অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবেন। ফ্রেঞ্চ প্রেস, ফিল্টার কফি, এরো প্রেস যেখানে যেরকম দরকার একদম নিজের স্বাদ অনুযায়ী নেওয়া যায়। আমরাও আমাদের মতো অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা মিশিয়ে একটা প্যাকেট বানিয়ে নিয়ে চললাম আমাদের পরবর্তী আর মূল গন্তব্য মাদিকেরীতে "Coorg Cuisine" রেস্তোরাঁয়। ।

এখানে পাওয়া যায় কুর্গের আসল কুইজিন বা কোডাগু কুইজিনের ট্র্যাডিশনাল খাবার। একদম ট্যুরিস্ট স্পটের কাছে থাকলেও কোয়ালিটি অনুযায়ী কম দাম দেখে অবাকই হতে হয়। কুর্গে গেলে পর্ক কারি (পান্ডি কারি) আর মাটন/চিকেন পেপার ফ্রাই না খেলে যাওয়াই বৃথা। আমরা দশ মিনিট লাইন দেওয়ার পর জায়গা পেয়ে অর্ডার করলাম:-


Koli Nallamolu Barthad (চিকেন পেপার ফ্রাই), Pandhi Curry (কুর্গ স্টাইল পর্ক কারি), Akki Otti (ক্রিস্পি চালের আটার রুটি), Chapathi (নর্মাল ময়দার রুটি), Kadambattu (রাইস ডাম্পলিংস), Koli Curry (স্পাইসি চিকেন কারি), Chorange Rasa Neer (ফ্রেশ লাইম সোডা) । তিনজন পেট ভরে খেয়েও বিল হাজার টাকায় পৌঁছালো না। আর খেতে, সে একদম নাজুক, নাজুক! তবে পান্ডি কারিটার কথা আলাদা করে‌ না বললে এই লেখার প্রতি "পৈটিক জাস্টিস" করা হবে বলে আমি মনে করি না।

ও হ্যাঁ, ভালো‌ লাগলে মশলা, হ্যান্ডমেড চকোলেটস, হোমমেড ওয়াইনও কিনতেই পারেন কুর্গ থেকে। কেউ যদি চান, "Coorg Cuisine" রেস্তোরাঁ থেকে পান্ডি কারির মশলা আনতেই পারেন। তারপর এণ্টালি মার্কেট থেকে ভালো নদনদে (বড়লোকের ভাষায় মার্বলিং) কচি শুয়োর এনে গোলমরিচ আর মশলা মাখিয়ে পছন্দের পানীয় বা কুর্গি ওয়াইনের সঙ্গতে বন্ধুদের মেহফিল জমিয়ে বৃষ্টিভেজা মোহময়ী কুর্গের কোন এক বিকালের স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলতেই পারেন। কথা দিচ্ছি, কোন এক বর্ষণমুখর দুপুরে সর্ষে ইলিশের বদলে এই পান্ডি কারি আপনাকে কোন ভাবেই আশাহত করবে না। বরং আপনিও ভালোবেসে গেয়ে উঠতেই পারেন:-


আমার সারাটা দিন, মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি - তোমাকে দিলাম 

শুধু শ্রাবন সন্ধ্যা টুকু তোমার কাছে চেয়ে নিলাম।


আপাতত এই অবধিই, অলমিতি!



Comments


bottom of page