দেশ জুড়ে গণেশ বন্দনা | নানা স্বাদে মোদক | মেঘ পাহাড়ের আলিঙ্গনে ছত্তিশগড় | রবিবারের গল্প: এবং মধুসু্ন্দরী দেবী
Updated: Sep 12

দেশ জুড়ে গণেশ বন্দনা
ভারতের উৎসব-সংস্কৃতিতে এমন কিছু দেবতা আছেন, যাঁদের আরাধনা কোনও একটি অঞ্চল, ভাষা বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণেশ তাঁদেরই অন্যতম। কোথাও তিনি ‘গণপতি বাপ্পা’, কোথাও ‘বিনায়ক’, কোথাও ‘পিল্লাইয়ার’, কোথাও আবার ‘বিঘ্নেশ্বর’। নামের বদল ঘটেছে, আচার বদলেছে, ভোগের পদ বদলেছে, উৎসবের আয়োজনে এসেছে নানা আঞ্চলিক বৈচিত্র্য, কিন্তু বিশ্বাসের জায়গাটি একই। নতুন কাজের শুরুতে, নতুন ঘরে প্রবেশের আগে, পুজোর প্রথম অর্ঘ্যে কিংবা জীবনের কোনও শুভ মুহূর্তে তাই উচ্চারিত হয় তাঁরই নাম। বুদ্ধি, সিদ্ধি, সমৃদ্ধি ও শুভারম্ভের দেবতা হিসেবে গণেশ ভারতীয় লোকজীবনে এক গভীর ও সর্বজনীন উপস্থিতি।

ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে পালিত হয় গণেশ চতুর্থী বা বিনায়ক চতুর্থী। ২০২৬ সালে এই পবিত্র তিথি পড়েছে ১৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার। এ বছর চতুর্থী তিথি শুরু হবে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৬ মিনিটে এবং শেষ হবে ১৫ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টা ৪৪ মিনিটে। গণেশমূর্তি প্রতিষ্ঠা ও প্রধান পুজোর জন্য মধ্যাহ্নকালকে বিশেষ শুভ মনে করা হয়; প্রচলিত পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টা ২০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠা-মুহূর্ত রয়েছে। তবে স্থানভেদে সূর্যোদয় ও মধ্যাহ্নের সময় বদলানোর কারণে নির্দিষ্ট পুজোর সময় স্থানীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী মিলিয়ে নেওয়াই শ্রেয়। এবারের দশদিনের গণেশোৎসবের সমাপ্তি হবে ২৫ সেপ্টেম্বর, অনন্ত চতুর্দশীতে, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে।
গণেশকে ঘিরে যে পুরাণকথা সবচেয়ে বেশি প্রচলিত, তার কেন্দ্রে রয়েছেন মহাদেব ও পার্বতী। শিবপুরাণের বর্ণনায়, পার্বতী নিজের দেহের লেপ থেকে এক বালকের সৃষ্টি করে তাঁকে নিজের দ্বাররক্ষী হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। সেই সময় শিব সেখানে এসে প্রবেশ করতে চাইলে বালক তাঁকে বাধা দেন। নিজের মায়ের আদেশ পালন করতে গিয়ে তিনি স্বয়ং মহাদেবকেও ঘরে ঢুকতে দেননি। ক্রুদ্ধ শিবের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ হয় এবং একসময় শিব তাঁর মস্তক ছিন্ন করেন। পুত্রের এই পরিণতিতে পার্বতী প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ও শোকাহত হন। তাঁকে শান্ত করতে এবং বালককে পুনর্জীবিত করতে শিব দেবতাদের নির্দেশ দেন প্রথম যে জীবের মস্তক পাওয়া যায় তা নিয়ে আসতে। সেই মস্তক ছিল হাতির। সেই হাতির মস্তক বালকের দেহে স্থাপন করে তাঁকে পুনর্জীবন দেওয়া হয়। এরপর শিব তাঁকে নিজের গণের অধিপতি করেন এবং আশীর্বাদ করেন যে কোনও শুভ কাজের আগে তাঁরই পুজো হবে। এইভাবেই তিনি হয়ে ওঠেন গণপতি, গণেশ, গজানন, একদন্ত এবং বিঘ্নহর্তা। পুরাণের বিভিন্ন গ্রন্থে এই জন্মকাহিনির কিছু কিছু ভিন্ন রূপও পাওয়া যায়।

গণেশের একদন্ত রূপ নিয়েও রয়েছে নানা কাহিনি। তাঁর বড় কান যেন মন দিয়ে শোনার শিক্ষা দেয়, ছোট চোখ একাগ্রতার প্রতীক, বিশাল উদর জীবনের ভালো-মন্দ সবকিছুকে ধারণ করার ক্ষমতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তাঁর বাহন ইঁদুর যে অতি ক্ষুদ্র হলেও সর্বত্র প্রবেশ করতে পারে। তাই গণেশের মূর্তির প্রতিটি অঙ্গের মধ্যেই ভারতীয় দর্শন ও প্রতীকের এক গভীর অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়।
গণেশ চতুর্থীর আজকের যে বিশাল জনউৎসবের রূপ, তার সঙ্গে মহারাষ্ট্রের ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। গণেশের আরাধনা বহু শতাব্দী ধরেই চলে আসছে এবং রাজা-রাজড়া ও পরিবারকেন্দ্রিক পুজোর ঐতিহ্যও ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের শেষভাগে লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলক গণেশোৎসবকে বৃহত্তর জনসমাজের উৎসবে পরিণত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ১৮৯৩ সালের পর পুনেতে গণেশোৎসব নতুন সামাজিক ও জনসমাবেশের রূপ পায়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি গান, নাটক, বক্তৃতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সামাজিক মিলনমেলার মাধ্যমে উৎসবটি মানুষের মধ্যে ঐক্যের বার্তা বহন করতে শুরু করে।

আজকের দিনে সেই গণেশোৎসব মহারাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে গোটা দেশের অন্যতম পরিচিত উৎসব। বিশেষ করে মুম্বই ও পুনের রাস্তায় বিশাল বিশাল মণ্ডপ, শিল্পসম্মত প্রতিমা, আলোকসজ্জা, ঢাক-ঢোল, আরতির সুর এবং ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া’ ধ্বনিতে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবহ। কোথাও পুজো চলে দেড় দিন, কোথাও পাঁচ বা সাত দিন, কোথাও দশ দিন ধরে। শেষ দিনে বিসর্জনের শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
তবে মহারাষ্ট্রের গণেশোৎসবের জাঁকজমকই গোটা ভারতের গণেশ বন্দনার একমাত্র ছবি নয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গণেশপুজো যেন স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে একটি করে আলাদা রূপ নিয়েছে। কর্ণাটকে গণেশ চতুর্থীর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গৌরী হাব্বা। গণেশের আগমনের আগের দিন মা গৌরীর আরাধনা করা হয়। এরপর আসে গণেশের পুজো। কর্ণাটকের বিশেষ আচারগুলির মধ্যে ‘পত্রপূজা’ উল্লেখযোগ্য একুশ ধরনের পাতা দিয়ে গণেশের পুজো করার রীতি রয়েছে। ভোগের তালিকাতেও রয়েছে স্থানীয় স্বাদের ছাপ; মোদকের পাশাপাশি কদলেকাই উন্ডে, করিগাডুবু, পায়েস প্রভৃতি তৈরি হয়।
গোয়ায় এই উৎসব পরিচিত চভথ বা চোভথ নামে। এখানে গণেশ চতুর্থী অনেকটাই পারিবারিক উৎসবের আবহে পালিত হয়। বাড়ির উঠোনে বা ঠাকুরঘরে মাটির গণেশমূর্তি বসানো হয়। বিশেষ আকর্ষণ ‘মাতোলি’ গাছের পাতা, ফল, শস্য, সবজি ও বনজ উপাদান দিয়ে তৈরি এক ধরনের ঐতিহ্যবাহী সাজ, যার নীচে গণেশমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফলে গোয়ার গণেশ বন্দনায় প্রকৃতি ও পারিবারিক ঐতিহ্যের যোগটি বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলঙ্গানায় গণেশ চতুর্থী পরিচিত বিনায়ক চবিথি নামে। হায়দরাবাদের বিশাল গণেশমূর্তি এবং সর্বজনীন পুজো এই উৎসবকে বিশেষ মাত্রা দেয়। পুজোয় একুশ রকম পাতা বা ‘পত্রী’ অর্পণের রীতিও প্রচলিত। ভোগে থাকে উন্দ্রাল্লু, কুদুমুলু, লাড্ডু, মোদক, পানকম, ভাদাপাপ্পু প্রভৃতি। বিশেষত চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি বাষ্পে সিদ্ধ উন্দ্রাল্লু এই অঞ্চলের গণেশভোগের পরিচিত পদ।
তামিলনাড়ুতে তিনি পিল্লাইয়ার বা বিনায়গর নামে পরিচিত। সেখানে বাড়িতে মাটির ছোট গণেশমূর্তি তৈরি করে পুজো করার চল রয়েছে। ‘কোজুকাট্টাই’ অর্থাৎ তামিল ঘরানার মোদক গণেশের অন্যতম প্রিয় নিবেদন। কেরলেও গণেশপুজোর সঙ্গে দক্ষিণ ভারতীয় ঘরোয়া রন্ধনপ্রথার সুন্দর মেলবন্ধন দেখা যায়। অন্যদিকে উত্তর ও মধ্য ভারতের বহু অঞ্চলে গণেশ চতুর্থী মূলত বাড়ি, মন্দির, আবাসন ও স্থানীয় মণ্ডপকেন্দ্রিক পুজো হিসেবে পালিত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে মহারাষ্ট্রের সর্বজনীন গণেশোৎসবের আদলও সেখানে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়েছে।
বাংলায় গণেশপুজোর আবহ আবার কিছুটা আলাদা। এখানে দুর্গাপুজোর মতো গণেশ চতুর্থীকে ঘিরে সর্বত্র দশদিনের বিশাল উৎসব না হলেও কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় গণেশপুজো হয় বাড়িতে, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে, মন্দিরে এবং নানা ছোট-বড় মণ্ডপে। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে গণেশের সম্পর্কের কারণে নতুন দোকান, কার্যালয় কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে গণেশপুজোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শিল্পী, কারিগর, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ শুভ সূচনার দেবতা হিসেবে অনেকেই গণেশকে স্মরণ করেন।

গণেশপুজোর বিধিতেও রয়েছে সুন্দর এক ধারাবাহিকতা। প্রথমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে পুজোর স্থান প্রস্তুত করা হয়। চৌকির উপর পরিষ্কার বস্ত্র পেতে তার উপর গণেশমূর্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এরপর সংকল্প, আচার্য বা পুরোহিতের নির্দেশ অনুযায়ী আবাহন, আসন, পাদ্য, অর্ঘ্য, আচমন, স্নান, বস্ত্র, চন্দন, সিঁদুর, ফুল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। গণেশের পুজোয় দূর্বা ঘাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক পরিবারে একুশটি দূর্বার গুচ্ছ নিবেদন করা হয়। লাল ফুল, বিশেষ করে জবা, এবং সিঁদুরও তাঁর আরাধনায় বিশেষভাবে ব্যবহৃত হয়। পুজোর শেষে গণেশের আরতি ও প্রণাম করা হয়। আঞ্চলিক ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী মন্ত্র ও উপাচারের কিছু পার্থক্য থাকতেই পারে।
আর গণেশপুজো মানেই যেন মিষ্টির গন্ধ। তাঁর সবচেয়ে পরিচিত ভোগ মোদক। মহারাষ্ট্রে ‘উকাডিচে মোদক’ চালের গুঁড়োর আবরণে নারকেল ও গুড়ের পুর দিয়ে তৈরি ভাপে সিদ্ধ মোদকৎঅত্যন্ত জনপ্রিয়। কোথাও করঞ্জি, কোথাও পুরণপোলি, কোথাও লাড্ডু, কোথাও পায়েস কিংবা স্থানীয় মিষ্টি নিবেদন করা হয়। কর্ণাটকে কদুবু, গোয়ায় নেভরি, তামিলনাড়ুতে কোজুকাট্টাই, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলঙ্গানায় উন্দ্রাল্লু একই দেবতার ভোগে যেন ভারতের নানা প্রদেশের নিজস্ব রান্নার পরিচয় মিশে যায়।
গণেশ চতুর্থীর আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল বিসর্জন। যে মাটির মূর্তিকে কয়েকদিন ধরে পরিবারের সদস্যের মতো করে সেবা করা হয়, উৎসব শেষে তাঁকেই বিদায় জানাতে হয়। এই বিদায়ের মধ্যে রয়েছে একদিকে আবেগ, অন্যদিকে সৃষ্টির অনিত্যতার দর্শন। মাটি থেকে গড়া প্রতিমা আবার মাটিতেই ফিরে যায়। ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া, পুডচ্যা বর্ষী লৌকরিয়া’ ধ্বনিতে তাই আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে বিচ্ছেদের সুর। আজ পরিবেশ সচেতনতার কারণে মাটির প্রতিমা, প্রাকৃতিক রং, কৃত্রিম জলাধারে বিসর্জন এবং জলদূষণ কমানোর নানা উদ্যোগও গুরুত্ব পাচ্ছে। মহারাষ্ট্রের পর্যটন দফতরও পরিবেশবান্ধব গণেশোৎসবে মাটি ও প্রাকৃতিক রঙ ব্যবহারের উপর জোর দিচ্ছে।

গণেশ বন্দনার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য বোধহয় এখানেই, একটি উৎসব, অথচ তার কত রকম রূপ! মুম্বইয়ের ব্যস্ত রাস্তার উন্মাদনা থেকে গোয়ার শান্ত পারিবারিক উঠোন, কর্ণাটকের গৌরী-গণেশের নিবিড় সম্পর্ক থেকে তামিলনাড়ুর ঘরোয়া পিল্লাইয়ার পুজো, তেলঙ্গানার বিশাল সর্বজনীন মণ্ডপ থেকে বাংলার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ছোট্ট পুজো সবকিছুকে যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রাখেন সিদ্ধিদাতা গণেশ।
তিনি শুধু বিঘ্নহর্তা নন, তিনি শুভারম্ভের প্রতীক। তাই নতুন খাতা খোলার আগে, নতুন ব্যবসার প্রথম দিনে, নতুন বাড়িতে পা রাখার সময় কিংবা জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করার আগে ভারতীয় মন আজও বলে ওঠে ‘শ্রী গণেশায় নমঃ।’ দেশের বহুবর্ণ সংস্কৃতির মধ্যে এই একটি উচ্চারণই যেন বলে দেয়, ভক্তির ভাষা আলাদা হলেও প্রার্থনার আকাঙ্ক্ষা একই, জীবনের পথ থেকে সমস্ত বিঘ্ন সরে যাক, বুদ্ধি ও বিবেকের আলোয় পথ চলা হোক, আর ঘরে আসুক সিদ্ধি, শান্তি ও সমৃদ্ধি।
তথ্যসূত্র ঋনস্বীকার:
Incredible India, Ministry of Tourism, Government of India (গণেশ চতুর্থীর ইতিহাস, আচার, দেশজুড়ে উদ্যাপন ও বিসর্জন।)
Maharashtra Tourism (মহারাষ্ট্রের গণেশোৎসব ও লোকমান্য তিলকের উদ্যোগে সর্বজনীন গণেশোৎসবের প্রসার।)
The Economic Times, (২০২৬ সালের গণেশ চতুর্থীর তারিখ, তিথি ও বিসর্জনের দিন।)
Loksatta, (১৪ সেপ্টেম্বর গণেশ চতুর্থী এবং পুজোর শুভ সময় সংক্রান্ত পঞ্জিকা-ভিত্তিক তথ্য।)

নানা স্বাদে মোদক
গণেশ চতুর্থী মানেই ঘরে ঘরে সিদ্ধিদাতা গণেশের আরাধনা, আর সেই পুজোর অন্যতম প্রিয় নৈবেদ্য মোদক। পুরাণে মোদককে গণেশের প্রিয় মিষ্টি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই ভক্তি, বিশ্বাস আর উৎসবের আনন্দে মোদকের উপস্থিতি আজও অপরিহার্য। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে মোদকের স্বাদ ও রূপ, ঐতিহ্যবাহী নারকেল-গুড়ের মোদক থেকে শুরু করে ক্ষীর, খোয়া, চকোলেট কিংবা নানা অভিনব স্বাদের মোদক, তালিকাটি এখন বেশ দীর্ঘ। গণেশ চতুর্থীর পুজোর থালিতে এবার থাকুক একটু বৈচিত্র্য। রইল সেরা একডজন মোদকের রেসিপি, যেখানে মিলবে চেনা স্বাদের নস্টালজিয়া, উৎসবের ঐতিহ্য এবং নতুন স্বাদের মিষ্টি চমক।
উকদিচে মোদক

কী কী লাগবে
চালের গুঁড়ো ১ কাপ, জল ১ কাপ, ঘি অথবা Shalimar's Sunflower তেল ১ চা চামচ, নারকেল কোরানো ১ কাপ, গুড় ৩/৪ কাপ, এলাচ গুঁড়ো ১/৪ চা চামচ, নুন এক চিমটি।

কীভাবে বানাবেন
নারকেল ও গুড় জ্বাল দিয়ে পুর তৈরি করুন। জল, ঘি অথবা তেল ও নুন ফুটিয়ে চালের গুঁড়ো দিয়ে মেখে নরম মণ্ড তৈরি করুন। মণ্ড থেকে লেচি কেটে পাতলা করে বেলে নিন। পুর ভরে মোদকের আকার দিন। ভাপে ১০-১২ মিনিট সেদ্ধ করুন। ওপরে ঘি ছড়িয়ে নিবেদন করুন।
ফ্রায়েড মোদক

কী কী লাগবে
ময়দা ১ কাপ, সুজি ২ টেবিল চামচ, নারকেল কোরানো ১ কাপ, গুড় ¾ কাপ, এলাচ গুঁড়ো ১/৪ চা চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Sunflower তেল ভাজার জন্য।

কীভাবে বানাবেন
নারকেল ও গুড় জ্বাল দিয়ে পুর তৈরি করুন। ময়দা, সুজি ও ঘি দিয়ে মণ্ড তৈরি করে পুর ভরে মোদকের আকার দিন। মাঝারি আঁচে সোনালি করে ভেজে নিলেই তৈরি ফ্রায়েড মোদক।
চকলেট মোদক

কী কী লাগবে
খোয়া ২০০ গ্রাম, গুঁড়ো চিনি ১/৩ কাপ, কোকো পাউডার ২ টেবিল চামচ, দুধ ২ টেবিল চামচ, চকোলেট চিপস ১/৪ কাপ, ঘি অথবা Shalimar's Sunflower।

কীভাবে বানাবেন
অল্প ঘি অথবা তেলে খোয়া নেড়ে নিন। ওতে দুধ ও চিনি নাড়ুন। কোকো পাউডার ও চকোলেট চিপস মিশিয়ে ঘন করুন। ঠান্ডা করে ছাঁচে চেপে মোদক তৈরি করুন।
ড্রাই ফ্রুটস মোদক

কী কী লাগবে
কাজু ১/২ কাপ, আমন্ড ১/২ কাপ, পেস্তা ১/৪ কাপ, খেজুর ১ কাপ, ঘি/ Shalimar's Sunflower তেল ১ চা চামচ, এলাচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ।

কীভাবে বানাবেন
বাদাম হালকা ভেজে গুঁড়ো করুন। খেজুর কুচি ঘিতে নরম করে বাদাম ও এলাচ মেশান। মিশ্রণটি ভালো করে মেখে ছাঁচে দিয়ে মোদক তৈরি করুন। ইচ্ছে মতো সাজিয়ে পরিবেশন করুন।
মালাই মোদক

কী কী লাগবে
ছানা ২৫০ গ্রাম, কনডেন্সড মিল্ক ১/২ কাপ, দুধ ১/৪ কাপ, এলাচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, পেস্তা কুচি ২ টেবিল চামচ।

কীভাবে বানাবেন
ছানা মিহি করে কনডেন্সড মিল্ক ও দুধের সঙ্গে কড়াইয়ে নাড়ুন। ঘন হলে এলাচ ও পেস্তা মেশান। ঠান্ডা করে ছাঁচে দিয়ে মোদক গুলো গড়ে নিন। সুন্দর করে সাজিয়ে পরিবেশন করুন।
গোলাপের মোদক

কী কী লাগবে
খোয়া ২৫০ গ্রাম, গুলকন্দ ১/৪ কাপ, দুধ ২ টেবিল চামচ, এলাচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, কাজুবাদাম কুচি ১ টেবিল চামচ, পেস্তা কুচি ২ টেবিল চামচ।
কীভাবে বানাবেন
খোয়া ও দুধ অল্প আঁচে নাড়ুন। মিশ্রণটি শুকিয়ে এলে গুলকন্দ, এলাচ, কাজুবাদাম ও পেস্তা মেশান। ঠান্ডা করে ছাঁচে চেপে মোদক বানান।
মেঘ পাহাড়ের আলিঙ্গনে ছত্তিশগড়
বর্ষার দিনে পাহাড়ের রং বদলে যায়। শুকনো, ধূসর পাথরের গা বেয়ে যখন নেমে আসে বৃষ্টির ধারা, তখন পাহাড় যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। অরণ্যের সবুজ আরও গাঢ় হয়, নদী হয়ে ওঠে উচ্ছল, আর দূরের আকাশে জমে থাকা মেঘ এসে জড়িয়ে ধরে পাহাড়ের কাঁধ। এমনই এক বর্ষাস্নাত ভূখণ্ড ছত্তিশগড়—যেখানে প্রকৃতি তার আদিম, অনাড়ম্বর সৌন্দর্য নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে পথিকের জন্য।
ভারতের পর্যটন মানচিত্রে ছত্তিশগড় হয়তো এখনও অনেকের কাছে তুলনামূলক অপরিচিত। অথচ মধ্য ভারতের এই রাজ্যের বুকেই লুকিয়ে আছে ঘন অরণ্য, পাহাড়ি নদী, গুহা, অসংখ্য জলপ্রপাত এবং শতাব্দীপ্রাচীন আদিবাসী সংস্কৃতির নানা গল্প। বিশেষ করে বর্ষাকালে বস্তার অঞ্চল যেন একেবারে অন্য রূপ ধারণ করে। মেঘের ছায়া, অরণ্যের গন্ধ আর জলপ্রপাতের গর্জন মিলে তৈরি হয় এক অনন্য ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।
এই সফরের অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে জগদলপুর। বস্তার জেলার এই শহরকে কেন্দ্র করে সহজেই ঘুরে নেওয়া যায় ছত্তিশগড়ের বেশ কিছু অসাধারণ প্রাকৃতিক ঠিকানা।

চিত্রকোট—জলের মহাউৎসব
জগদলপুর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ইন্দ্রাবতী নদীর বুক চিরে তৈরি হয়েছে চিত্রকোট জলপ্রপাত। বর্ষায় তার রূপ দেখলে মনে হয় পাহাড়ের বুক থেকে যেন একসঙ্গে হাজার হাজার জলধারা ছুটে আসছে।
ঘোড়ার খুরের মতো বাঁক নিয়ে নেমে আসা এই জলপ্রপাতকে তার বিশালতা ও সৌন্দর্যের জন্য অনেকেই ‘ভারতের নায়াগ্রা’ বলে থাকেন। বর্ষার সময় ইন্দ্রাবতী নদীতে জলের পরিমাণ বেড়ে গেলে চিত্রকোটের জলধারা আরও প্রবল হয়ে ওঠে। সাদা ফেনায় আচ্ছন্ন জল নীচে আছড়ে পড়ে, চারপাশে তৈরি হয় জলকণার কুয়াশা। মেঘলা আকাশের নীচে সেই দৃশ্যের মধ্যে দাঁড়ালে মনে হয় প্রকৃতির নিজস্ব কোনও বিশাল মঞ্চে এসে পৌঁছেছেন।
বিকেলের দিকে আকাশ পরিষ্কার থাকলে জলকণার মধ্যে রামধনু দেখা দিতে পারে। আর সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে যখন পাহাড়ের গা ছুঁয়ে নামে, তখন চিত্রকোটের দৃশ্য আরও মায়াময় হয়ে ওঠে।
তীরথগড়—অরণ্যের অন্তরে জলধারার গান
ছত্তিশগড়ের বর্ষাভ্রমণে দ্বিতীয় যে নামটি অবশ্যই রাখতে হয়, সেটি তীরথগড়। জগদলপুর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে কাঙের উপত্যকার অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত এই জলপ্রপাত।
চিত্রকোট যেখানে বিস্তৃত ও মহিমান্বিত, তীরথগড় সেখানে অনেক বেশি বুনো এবং অন্তরঙ্গ। পাথরের ধাপ বেয়ে জল নেমে এসেছে একাধিক স্তরে। বর্ষার জলে সেই ধাপগুলি ভরে ওঠে সাদা ফেনায়। চারপাশে ঘন সবুজ অরণ্য, তার মধ্যে জলধারার অবিরাম শব্দ—শহুরে জীবনের কোলাহল থেকে অনেক দূরে এসে এই নৈঃশব্দ্যই হয়ে ওঠে ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
তীরথগড় যাওয়ার পথে কাঙের উপত্যকার অরণ্য নিজেই একটি অভিজ্ঞতা। রাস্তার দু’পাশে গাছপালা, কোথাও পাহাড়ের ঢাল, কোথাও অন্ধকার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে এগিয়ে চলা পথ। বর্ষার দিনে প্রকৃতি এখানে এতটাই সজীব থাকে যে গাড়ির জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকাও হয়ে ওঠে এক ধরনের দর্শন।

কাঙের উপত্যকা—সবুজের গোপন রাজ্য
বস্তারের প্রকৃত সৌন্দর্য বুঝতে হলে শুধু জলপ্রপাত দেখলেই হবে না। সময় নিয়ে ঢুকে পড়তে হবে কাঙের উপত্যকার অরণ্যে।
ঘন শাল, সেগুন ও নানা প্রজাতির গাছপালায় ঘেরা এই অঞ্চল জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। বর্ষায় অরণ্যের মাটিতে ভেজা পাতার গন্ধ, গাছের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া মেঘলা আলো আর দূরে পাখির ডাক—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক অন্য জগৎ।
এই অঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণ কুটুমসার গুহা। ভূগর্ভের অন্ধকারে চুনাপাথরের গঠন, সরু পথ এবং প্রকৃতির তৈরি নানা আকৃতি গুহাটিকে রহস্যময় করে তুলেছে। তবে বর্ষাকালে গুহা ও অরণ্যভ্রমণে স্থানীয় নির্দেশনা এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও নিরাপত্তা-নির্দেশ মেনে চলা জরুরি।
বস্তারের অরণ্যে প্রকৃতির পাশাপাশি মানুষের গল্প
ছত্তিশগড়কে শুধুমাত্র পাহাড়-জলপ্রপাতের রাজ্য হিসেবে দেখলে এই ভূখণ্ডের অর্ধেক সৌন্দর্যই দেখা হবে। বস্তারের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে এখানকার মানুষ ও তাঁদের সংস্কৃতির মধ্যে।
মুরিয়া, মারিয়া, ধুরভা-সহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা, হস্তশিল্প, উৎসব, নৃত্য ও লোকসংস্কৃতি এই অঞ্চলের নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছে। বস্তার ধাতুশিল্প, কাঠের কাজ, বাঁশের তৈরি সামগ্রী কিংবা ঐতিহ্যবাহী অলংকার—প্রতিটি শিল্পকর্মের মধ্যেই যেন এই মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের গল্প লুকিয়ে থাকে।
জগদলপুরের স্থানীয় বাজারে গেলে সেই সংস্কৃতির কিছুটা কাছ থেকে অনুভব করা যায়। পর্যটক হিসেবে ছবি তোলার আগে অবশ্যই স্থানীয় মানুষের অনুমতি নেওয়া উচিত। কারণ ভ্রমণ শুধু দেখার নয়, অন্যের জীবন ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখানোরও শিক্ষা।

জল, জঙ্গল আর পাহাড়ের বাইরে
জগদলপুর ও বস্তার অঞ্চলে আরও রয়েছে একাধিক ছোট-বড় জলপ্রপাত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ঠিকানা। তামড়া ঘুমর, মণ্ডবা কিংবা চিত্রধারার মতো জায়গাগুলি বর্ষায় আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
তবে এই সফরের আসল আকর্ষণ কোনও একটি নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্র নয়। বরং এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার পথটিই এখানে ভ্রমণের বড় অংশ। কখনও রাস্তার পাশে অরণ্য, কখনও পাহাড়ের গা বেয়ে নামা জলধারা, কখনও মেঘে ঢাকা দূরের পাহাড়—প্রকৃতি এখানে বারবার নিজের নতুন মুখ দেখায়।
কখন যাবেন?
ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চলের প্রকৃতি বর্ষায় বিশেষ সুন্দর হয়ে ওঠে। তবে অতিবৃষ্টির সময় জলপ্রপাত ও অরণ্যাঞ্চলের কিছু পথ নিরাপত্তার কারণে বন্ধ বা সীমিত থাকতে পারে। তাই যাওয়ার আগে স্থানীয় প্রশাসন, বন দফতর এবং পর্যটন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে রাস্তা ও দর্শনস্থলের বর্তমান পরিস্থিতি জেনে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
বর্ষা পেরিয়ে শীতের শুরুতেও বস্তার ভ্রমণের জন্য আরামদায়ক সময় হতে পারে। তখন আবহাওয়া তুলনামূলক মনোরম এবং দীর্ঘ সময় ধরে ঘোরাঘুরি করা সহজ।

কী ভাবে যাবেন?
জগদলপুরকে বস্তার ভ্রমণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে রাখা যায়। রেল ও বিমান—দুই পথেই সেখানে পৌঁছনোর সুযোগ রয়েছে। কলকাতা থেকে সরাসরি যাত্রার ক্ষেত্রে রেলপথের সংযোগ দেখে পরিকল্পনা করা যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে বিশাখাপত্তনম হয়ে সড়কপথেও জগদলপুর পৌঁছনো যায়।
জগদলপুরে পৌঁছে গাড়ি ভাড়া করে চিত্রকোট, তীরথগড়, কাঙের উপত্যকা এবং আশপাশের অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ঘুরে নেওয়া সুবিধাজনক।
পথের শেষে
ছত্তিশগড়ের বস্তার আসলে এমন এক ভ্রমণভূমি, যেখানে প্রকৃতি শুধু চোখে দেখা যায় না—তাকে অনুভব করা যায়। বৃষ্টিভেজা মাটির গন্ধে, অরণ্যের নৈঃশব্দ্যে, পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা মেঘে, জলপ্রপাতের গর্জনে কিংবা নদীর উচ্ছ্বাসে।
শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে কয়েক দিনের জন্য যদি এমন কোনও জায়গায় যেতে চান, যেখানে প্রকৃতি এখনও তার নিজস্ব ছন্দে বেঁচে আছে, তবে ছত্তিশগড়ের বস্তার হতে পারে সেই ঠিকানা। মেঘ যখন পাহাড়কে ছুঁয়ে থাকে, অরণ্য যখন বৃষ্টিতে আরও সবুজ হয়ে ওঠে, আর পাহাড়ের বুক চিরে নদী যখন জলপ্রপাত হয়ে নেমে আসে তখন ছত্তিশগড়কে মনে হয় প্রকৃতির নিজের আঁকা এক বিশাল জলরঙের ছবি। সেই ছবির ভিতর কয়েক দিনের জন্য হারিয়ে যাওয়ার নামই মেঘ পাহাড়ের আলিঙ্গনে ছত্তিশগড়।
এবং মধুসুন্দরী দেবী
শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়
হুড়মুড় করে বিছানা থেকে উঠে বসলাম আমি। ঘড়ির দিকে তাকালাম। সাতটা পাঁচ। আজ ভোর রাত থেকে একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম অমর জীবন এসে দাঁড়িয়েছে আমার সামনে। তাকে বর্ণনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় কারণ তারানাথের কাছে আমি কেবল অমর জীবনের কথা শুনেছি মাত্র। আমার স্বপ্নেও তার কোন স্পষ্ট মুখ প্রস্ফুটিত হয়নি। আমার স্বপ্নে সে দেখা দিয়েছিল কেবল একটা আবছা অবয়ব হিসাবে।
সে সর্বদা বলে চলেছিল মধুসুন্দরী দেবীর কথা। মধুসুন্দরী দেবীর নামটা বারংবার উচ্চারণ করছিল সে।
সেদিন সারাদিন অফিসের কাজকর্ম যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করে অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। ঠিক করলাম বাড়িতে গিয়ে একবার সোজা কিশোরীর বাড়ি যাব, ওখান থেকে ওকে সঙ্গে নিয়ে মঠলেনে তারানাথের বাড়ি যাব। আজ কেন জানি না তারানাথের গল্প খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।

বাড়িতে পৌঁছে দেখলাম আমার চিন্তাকে কাকতালীয় ভাবে সত্যি করে দিয়ে আমার ঘরে বসে আছে কিশোরী। আমার স্ত্রী আমাকে বলল,
“এই তো তুমি এসে গেছো। কিশোরী ঠাকুরপো অনেকক্ষণ থেকে এসে বসে আছে। আমি বলছিলাম যে একটু পরেই তুমি চলে আসবে। ঠাকুরপোকে বললাম চা খাবে না, কিন্তু ঠাকুরপো বলল চা খাবে না।”
আমি ঘরে ঢুকতেই কিশোরী আমাকে বলল,
“চলো হে, ঝটপট তৈরি হয়ে নাও। তারানাথের কাছে যাওয়া যাক। অনেক দিন তারানাথের বাড়ি যাওয়া হয়নি।”
আমি কিশোরীকে বললাম,
“তুমি আজকে আমার একদম মনের কথা বলেছ। আজকেও ভাবছিলাম তোমার বাড়ি যাব। গিয়ে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে তারানাথের বাড়ি যাব।”
বাড়ির সামনের মোড়ের মাথার তেলে ভাজার দোকান থেকে গরম গরম তেলেভাজা আর মুড়ি কিনে নিয়ে তারানাথের বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করলাম। তাড়াতাড়ি হাঁটার ফলে আধ ঘণ্টার রাস্তাটা কুড়ি মিনিটে শেষ করে তারানাথের বাড়ি পৌঁছে দেখলাম তারানাথের বাড়ির গেটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে চারি। আমাকে দেখে চারি এক গাল হাসল,
“আরে কাকাবাবু যে, আমার গ্রামোফোনের ক্যাসেটটা নিয়ে এসেছেন আপনি?”
জিভ কাটলাম আমি।
“এইরে, আমি একদম ভুলে গেছি। বাড়িতেই ওটা রাখা আছে। পরেরবার তোমার জন্য ঠিক নিয়ে আসব, কেমন?”
“আচ্ছা, এখন ভেতরে চলুন। বাবাকে ডেকে দিচ্ছি।”
আমি আর কিশোরী চারির পিছন পিছন ভেতরে গিয়ে বসলাম।
চারি বাবাকে খবর দিয়েছিল। বাবা বলল, “সান্ধ্য গায়ত্রী করছি। ওটা করেই আসছি।”
আমরা তারানাথের বৈঠকখানায় গিয়ে বসলাম। মিনিট পাঁচেক পরেই তারানাথ এসে ঘরে ঢুকল।
“শুভ সন্ধ্যা, কেমন আছো তোমরা?”
কিশোরী বলল,
“আমরা ভালো আছি তারানাথ। আজকে হঠাৎ তোমার কাছে গল্প শোনার খুব ইচ্ছে করছিল, তাই তোমার কাছে গল্প শুনতে এলাম।”
তারানাথ প্রসন্ন মুখে বলল,

“তা এসেছো যখন আগে কিছু খাওয়া-দাওয়া হোক, তারপর না গল্প শুরু হবে। দাঁড়াও, চারিকে তেল, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মুড়ি মেখে নিয়ে আসতে বলি।”
আমি তারানাথকে বারণ করলাম,
“তার আর দরকার নেই। আজকে আমরাই তোমার জন্য তেলেভাজা আর মুড়ি নিয়ে এসেছি।”
“তাই নাকি? তা বেশ করেছ।”
গরম তেলেভাজাতে কামড় দিয়ে তারানাথ বলল,
“তোমরা যখন এখানে এসেছো, বলো কী গল্প শুনতে চাও।”
আমি বললাম,
“তারানাথ, অনেকদিন মধুসুন্দরী দেবীর গল্প শোনা হয়নি। আপনি তো মধুসুন্দরী দেবীর সান্নিধ্যে এসেছিলেন। আজ একটা নয়, মধুসুন্দরী দেবীর গল্প হোক।”
আমার কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই তারানাথের চোখে-মুখে একটা বিস্ময় ফুটে উঠল। এক গাল হেসে এসে বলল,
“সমপাত মানে জানো তোমরা?”
কিশোরী বলল,
“হ্যাঁ জানি। সমপাত মানে হচ্ছে কো-ইনসিডেন্স বা যাকে আমরা বলি কাকতালীয়।”
“হ্যাঁ। তোমরা ঠিকই বলেছ। আজ সকাল থেকেই আমার মনে শুধুমাত্র মধুসুন্দরী দেবীর কথাই ঘুরে ফিরে আসছে। বলতে গেলে সারাটা দিনই আজকে আমি উনার চিন্তাতেই মগ্ন। আর দেখো, ঠিক আজই তোমরা গল্প শুনতে এলে আর এসে মধুসুন্দরী দেবীর গল্প শুনতে চাইলে। তাই এটাকে কি তোমরা সমপাত বলবে না? এটা সমপাত না হলেও ঈশ্বরের ইচ্ছা বলা যেতে পারে। ঠিক আছে, আজ যখন মধুসুন্দরী দেবীর চিন্তাই মাথায় আসছে আর তোমরাও যখন মধুসুন্দরী দেবীর কথাই তুললে, তাহলে ওনাকে নিয়ে একটা গল্প বলা যাক।”
হাতে ধরা বাটির মুড়ি আর তেলেভাজা খেয়ে তারানাথ কিশোরীর থেকে একটা পাসিং শো চেয়ে নিল। সেটা মুখে ধরিয়ে সুখ টান দিতে দিতে তারানাথ বলল,
“তোমরা তো জানোই, আমার জীবনের বেশিরভাগটাই কেটেছে ভবঘুরে জীবন হিসেবে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে। আজকে এখানে তো কালকে সেখানে। তবে খুব বেশিদিন এক জায়গায় থাকতাম না। বেশিদিন এক জায়গায় থাকলে ভবঘুরে জীবনের স্বাদ আর পাওয়া যায় না।
সে বার বীরভূমের একটা গ্রামে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে অতিথি হয়ে থেকেছিলাম বেশ কিছুদিন। সেখান থেকে যখন বিদায় নিলাম, তখন ঠিক করেছিলাম অনেক দিন হল, এবারে কিছুদিনের জন্য নিজের বাড়ি ফিরে যাব। মায়ের জন্য মনটা বড় ছটফট করছে।
একদিন ওই ব্রাহ্মণদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়িতে ফেরার জন্য সকালে স্টেশনে ট্রেনের জন্য বসে আছি। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে আমার ট্রেন। আমি তৈরি হয়ে নিয়ে উঠতে যাচ্ছি, হঠাৎ করে আমার সামনে এসে দাঁড়াল একজন বয়স্ক ভদ্রলোক। ভদ্রলোককে দেখে ভদ্র বাড়ির লোক বলে মনে হয়। তবে তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে তিনি কিছুদিন যাবৎ খুব কষ্টে জীবন অতিবাহিত করছেন। তার মানসিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। চোখের তলায় কালি পড়েছে, মুখটা যেন শুকিয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে মুখে একটা লালিত্য ছিল, কিন্তু সেই লালিত্যটা এই কদিনে হারিয়ে গেছে। গালে বেড়ে উঠেছে বড় বড় দাড়ি। কেবল পোশাকটা ভদ্র পরা আছে বলেই তাকে মনে হচ্ছে তিনি ভদ্র বাড়ির লোক।
ইতিমধ্যে আমার ট্রেনটা সামনে চলে এসেছে। ঠিক এই সময় ভদ্রলোক বলল,
“ঠাকুরমশাই, আমার বড় বিপদ। থাকুন মশাই, আপনি আমাকে উদ্ধার করুন।”
বিপদের কথা শুনে আমি আর ট্রেনে উঠতে পারলাম না। ট্রেনটা আমার সামনে দিয়ে শব্দ করতে করতে অজগর সাপের মতো বাঁকা রেললাইন দিয়ে সোজা গিয়ে দূরে ছোট হয়ে মিলিয়ে গেল।
ভদ্রলোক দুহাত জোড় করে বলল,
“আমার নাম দুর্গামোহন সমাদ্দার। বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি। আমি আপনাকে এখানে বসে থাকতে দেখি, আপনার কাছে দৌড়ে এলাম। আপনি যদি আমার উপকার করতে পারেন, আমার নিত্যদিন বয়ে চলা মানসিক যন্ত্রণা থেকে আমাকে মুক্তি দিতে পারেন, তার জন্য...”
“কী সমস্যা?”
দুর্গামোহনবাবু বললেন,
“আমার মেয়ের বড় বিপদ, ঠাকুরমশাই। সে মাঝে মাঝেই কয়েকদিন ধরেও উন্মাদের মতো আচরণ করছে। অনেক ডাক্তার বদ্যি দেখিয়েছি ঠাকুরমশাই। কিন্তু কেউই আমার মেয়ের আসলে কী রোগ হয়েছে বা এই রোগের চিকিৎসা কী, এই রোগ থেকে মুক্তির উপায় কী, সেটা কেউ বলতে পারেনি।”
“ঠিক আছে, চলুন। আপনার সাথে আপনার বাড়ি আমি যাচ্ছি। কিন্তু কত দূর, কী করে উঠতে পারব সেটা আমি বলতে পারছি না।”
“তাই চলুন ঠাকুরমশাই।”
দুর্গামোহনবাবু অদূরে হাত নাড়িয়ে একটা হাতে-টানা রিকশাকে ডাকলেন। তারপর আমরা দুজন এগিয়ে গিয়ে রিকশায় উঠে বসলাম। রিকশা চলতে শুরু করল। আমি বললাম,
“এবার আপনি আপনার মেয়ের সমস্যা থেকে শুরু করে যাবতীয় ঘটনা আমাকে বিস্তারিতভাবে নির্দ্বিধায় বলুন। কোন কিছু গোপন করবেন না। মানুষ যখন মোক্তার আর বদ্যিকে সমস্ত কথা বলে, ঠিক সে রকম।”
“বলছি ঠাকুরমশাই, আপনাকে সব বলছি। কোন রকম গুরুচন্দ্রিকা না করে সব বলব বলেই তো আপনার কাছে ছুটে এসেছি। আর বিধাতা ঠিক আজকেই আপনার সাথে আমার দেখা করিয়ে দিয়েছে।
আমার বাবা-মা খুব ছোটবেলায় মারা যায়। সেই থেকে আমি আমার মাসির কাছেই মানুষ। মাসি আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে। লেখাপড়া শিখে সওদাগরি অফিসে চাকরি পেয়েছি। আমার অফিস বঙ্গদেশের বাইরে। আমি সেখানেই চাকরি করছি। বেশ কিছুদিন চাকরি করতে করতে এখানে এসে একটা বাড়ি বানাই, বিয়ে-থা করি। তারপর এখানে আমার মেয়ে বৈদেহি জন্মায় এবং তারপর আবার মেয়েকে রেখে আমি চলে যাই ওখানে। আমার মেয়েটা আমার স্ত্রীর কাছেই মানুষ হয়। ওর এখন বয়স ১৯ বছর।
আমি বছরে দুবার বাড়িতে আসি। মোটা মাইনের চাকরি করি বলে সংসার আর মেয়ের পড়াশোনা আমি দিব্যি চালিয়ে ফেলতে পারি। মেয়ে পড়াশোনা শেষ করেছে, তাই এবার আমরা ওর বিয়ে চাই।
পাত্র আমাদের খুব পরিচিত। পাত্রের নাম সঞ্জয় চাকলাদার। পাত্র আমাদের দূর সম্পর্কের আত্মীয়র ভাইপো। ছোটবেলা থেকেই পাত্রের সাথে আমাদের পরিচয় আছে। খুব উজ্জ্বল ছাত্র। পড়াশোনার মান ও ফলাফল ভালো দেখে সরকার থেকে অনুদান দেওয়া হয়েছে ওকে। সে অনুদানের টাকা দিয়ে ও পড়াশোনা করছে। বাংলায় স্নাতকোত্তরের পড়াশোনা করছিল। এটার পরই ও চাকরি পেয়ে যাবে। চাকরিটা পেয়ে গেলেই ওর সাথে আমি বৈদেহির বিয়ে দিয়ে দেব।
ও প্রায় তিন মাস হল আমাদের বাড়িতেই আছে। আমাদের বাড়িতে ওর জন্য একটা ঘর বরাদ্দ করা হয়েছে। সেই ঘরেই থাকে। এরপর বিয়ের পর আমার মেয়েকে নিয়ে ও চলে যাবে ওর নিজের বাড়িতে, ওর বাবা-মায়ের কাছে।
কিন্তু কী থেকে যে কী হয়ে গেল, আমাদের এই সমস্ত সুন্দর পরিকল্পনা একেবারে ভেস্তে দিল আমাদের মেয়ের এই ধরনের অদ্ভুত আচরণ। ঠিক যেন উন্মাদ হয়ে গেছে। একেবারে সারাক্ষণ পাগলের মতো থাকে, বিড়বিড় করে কী সমস্ত বলে, নিজের মাথার চুল নিজে টানে। সারাক্ষণ গুম মেরে বসে থাকে। এক এক সময় ঠিক হয়ে যায়, আবার এক এক সময় এই মানসিক উন্মাদনাটা ওর ভেতরে ভর করে।”
রিকশাটা কেচ-ক্যাচ শব্দ করে আধ ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের দুর্গামোহনবাবুদের গ্রাম উজানতলিতে পৌঁছে দিল। এখানে এসে দেখলাম গ্রামের অবস্থা খুব শোচনীয়। দুর্ভিক্ষ গিলে খেয়েছে গোটা গ্রামটাকে। দেখে মনে হচ্ছে মানুষ অনাহার আর জলকষ্টে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে।
অবাক হলাম আমি,
“গ্রামের এমন অবস্থা কবে থেকে হল?”
দুর্গামোহনবাবু বললেন,
“বৈদেহী যখন মানসিকভাবে উন্মাদ হয়ে পড়ে, সেই সময় থেকেই গ্রামের এমন অবস্থা। বৈদেহী যখন মানসিক উন্মাদ হয়, তখন আমি এখানে ছিলাম না তো। আমি তাই কবে থেকে দুর্ভিক্ষ হয় সেটা ঠিকঠাক বলতে পারছি না। আমি এখানে আসার পর থেকেই দেখছি গ্রামে দুর্ভিক্ষ লেগেছে। আর বৈদেহির এমন অবস্থা।”
দুর্গামোহনবাবুদের বাড়িতে এসে দেখলাম, এখানে দুর্ভিক্ষ এলেও এই বাড়িটাকে দুর্ভিক্ষ একটুও স্পর্শ করতে পারেনি। কারণ একটাই। দুর্গামোহনবাবুর আর্থিক স্বচ্ছলতা।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে সান বাঁধানো উঠোনে দাঁড়াতেই দুর্গামোহনবাবুর স্ত্রী ললিতাদেবী এসে জল দিয়ে আমার দুটো পা ধুয়ে দিলেন।
অবাক হয়ে আমি বললাম,
“আরে, এ কী করছেন? এসবের আবার কী প্রয়োজন?”
দুর্গামোহনবাবুর স্ত্রী মাথা নিচু করে বললেন,
“আপনি আমাদের অতিথি, তার উপর আবার ব্রাহ্মণ। তাই এইটুকু অতিথিসেবা আমাকে করতে দিন ঠাকুরমশাই।”
“একটু বিশ্রাম নিন ঠাকুরমশাই। তারপর আপনাকে বৈদেহির ঘরে নিয়ে যাব।”
কথাটা বলে দুর্গামোহনবাবু একটা শতরঞ্চি বারান্দার উপর বিছিয়ে দিলেন। তারপর সেই শতরঞ্চির উপর আমরা দুজন বসলাম।
দুর্গামোহনবাবু বললেন,
“বৈদেহি এখন একটু শান্ত আছে, এখন ঘুমোচ্ছে। ঘুম থেকে উঠলে আপনাকে ওর ঘরে নিয়ে যাব।”
ইতিমধ্যে দুর্গামোহনবাবুর স্ত্রী ললিতাদেবী আমাদের দুজনের জন্য গরম গরম পরোটা, আলুভাজা আর চমচম নিয়ে এলেন। নিয়ে এলেন।
খেতে খেতে দুর্গামোহনবাবুকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
“আপনার হবু জামাইকে দেখছি না। তিনি কোথায়?”
দুর্গামোহনবাবু হাসলেন,
“সঞ্জয় ইউনিভার্সিটিতে গেছে। দুপুরেই চলে আসবে, তখন ওকে দেখতে পাবেন। ওর সাথে আপনার আলাপ করিয়ে দেবো।”
খেয়ে উঠে দুর্গামোহনবাবু আমাকে বৈদেহির ঘরে নিয়ে গেলেন। বৈদেহি ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। ঘরের মেঝের উপর কী যেন আঁকছে। দূর থেকে সেটা বোঝা যাচ্ছে না।
দুর্গামোহনবাবু বললেন,
“বৈদেহী ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসে। ইদানীং পড়াশোনার চাপে ছবি আঁকাটা বন্ধ ছিল, কিন্তু ওর এই মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হওয়ার পর আবার আঁকার ইচ্ছেটা চেপেছে। যখনই ও একটু শান্ত স্বাভাবিক থাকে, তখনই হাতে কোন কিছু পেলেই সেটা দিয়ে মেঝেতে বা খাতায় আঁকতে শুরু করে। জানি না হঠাৎ মেয়েটার কী হলো। যখন উন্মাদ অস্বাভাবিকের মতো আচরণ করে, তখন ওকে দেখে মনে হয় যেন ওর ভেতর কেউ ভর করেছে।”
দুর্গামোহনবাবু বৈদেহিকে ডাকলেন,
“মা, এদিকে একবার উঠে আয়। ঠাকুরমশাই এসেছে তোর সাথে দেখা করতে।”
দুর্গামোহনবাবুর কথা শুনে লক্ষ্মী মেয়ের মতো আমার কাছে এসে আমাকে প্রণাম করল। প্রণাম করে মুখটা তুলতেই ভালো করে দেখলাম তার মুখটা। সুন্দর চাঁদপানা মুখটা লালিত্যময় হয়ে রয়েছে। মানসিক উন্মাদনা গ্রাস করলেও লালিত্যটা তার মুখ থেকে কেড়ে নিতে পারেনি।
আমি বৈদেহির মাথায় দুই হাত রেখে বললাম,
“বেঁচে থাকো মা, বেঁচে থাকো। আপনার মেয়ের মুখখানা খুব সুন্দর দুর্গামোহনবাবু। একেবারে লক্ষ্মীমন্ত মুখখানা।”
আমি বৈদেহির দিকে তাকিয়ে হাসলাম,
“তুমি ছবি আঁকতে ভালোবাসো মা?”
“ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি।”
বৈদেহি স্বল্প বাক্যে উত্তর দিল। সাধারণত এই সময় মেয়েরা যখন শান্ত থাকে, তখন খুব একটা বেশি কথা বলে না। মানসিক উন্মাদনা মানুষকে স্বল্প বাক্যে পরিণত করে। বৈদেহির ক্ষেত্রেও এর কোন ব্যতিক্রম হয়নি।
আমি আমার ঝোলা থেকে এক ছোট খাতার পাতা বের করে বৈদেহির হাতে সেটা দিলাম।
“এর মধ্যে আমাকে একটা ছবি এঁকে দেখাও তো দেখি।”
বৈদেহি কাগজটার মধ্যে পেন্সিল দিয়ে মিনিট পনেরোর মধ্যেই একটা ছবি এঁকে ফেলল। পাতাটা আমার কাছে নিয়ে এসে আমার হাতে দিল সে। তারপর কোন কথা না বলে নিজের মতো আনমনে বিড়বিড় করতে লাগল।
ছবিটা ভালো করে দেখলাম আমি। একটি মহিলার ছবি। মহিলাটি বিধবা দেখতে কুৎসিত। মহিলাটির পাশে একটি কাক বসে আছে। মহিলাটির এক হাতে রয়েছে একটি কুলো ও অন্য হাতে বড়দা মুদ্রা। দেখে মনে হচ্ছে মহিলাটি কোন দেবী।
দুপুরবেলা খেতে বসার সময় সঞ্জয়ের সাথে দেখা হল। ছোকরাকে দেখে মনে হল হাট্টাকাট্টা যুবক। বয়স ২৫ কি ২৬ হবে। সঞ্জয়কে যেন আমার চেনা ঠেকল।
খাবারের পদ দেখে চোখ আমার রীতিমতো কপালে উঠল। চড়াই পাখির নখের মতো সরু তুলাই পাঞ্জি চালের ভাত। দু-রকম তরকারি। দুটো বড় বড় চিতল মাছের পেটি। কাঁসার জামবাটি ভর্তি মুরগির মাংস। আর পায়েস।
আমি দুর্গামোহনবাবুকে বললাম,
“আরে, করেছেন কী? এত কিছু একসাথে খাওয়া যায় নাকি?”
“এই কটা তো পদ মাত্র ঠাকুরমশাই। বেশি আর কী করতে পারলাম। সবই ঘরে ছিল।”
সঞ্জয়ও আমাদের সাথে দেখলাম খেতে বসেছে। সঞ্জয় খুব একটা বেশি কথা বলে না। তবুও আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“তা সঞ্জয়, তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?”
“ওই চলছে ঠাকুরমশাই।”
“তা এরপর তুমি কী করতে চাও?”
“আমি তো দুর্গা জ্যাঠামশাইকে বলেছিলাম যে আমাদের বিয়ে দিয়ে দিতে। পড়াশোনা তো বিয়ের পরও চালানো যেতে পারে। কিন্তু জ্যাঠামশাই বললেন আগে পড়াশোনাটা শেষ করে চাকরি পেয়েই তারপর বিয়ে করতে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই। আমার তো ব্যবসা করার ইচ্ছে। ভালো করে ব্যবসা করতে পারলে প্রচুর...”
সঞ্জয়ের কথাবার্তা আমার খুব একটা ভালো লাগল না। এত অল্প বয়সে বিয়ের জন্য এত তাড়া কিসের বাপু? একেই অন্যের উপর নির্ভর করে নিজের পড়াশোনা চালাচ্ছে, তার ওপর এরই মধ্যে বিয়ের তাড়া।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সঞ্জয় গ্রামীণ পাঠাগারে পড়তে চলে গেল। আমি আর দুর্গামোহনবাবু খেয়ে উঠে বারান্দায় বসে তামাক টানতে টানতে গল্পে-গুজবে মেতে উঠলাম।
কথা বলতে বলতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল। আর ঠিক তখনই বৈদেহির ঘরে সমস্ত জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে দেওয়ার শব্দ আসতে লাগল। আমি আর দুর্গামোহনবাবু সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেলাম বৈদেহির ঘরের দিকে। দুর্গামোহনবাবু দরজা খুলতেই দেখলেন বৈদেহি উন্মাদের মতো হাত-পা ছুড়ছে, ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র ছুড়ে ছুড়ে ফেলছে আর এদিক-ওদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
দুর্গামোহনবাবু আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন,
“দেখছেন ঠাকুরমশাই, বৈদেহিকে কি আপনি দেখছেন? দেখুন, মাঝে মাঝেই করে এইরকম অবস্থা হয় ওর। এই সময় আমরা ওর কাছে যেতে সাহস পাই না। ও কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই শান্ত হয়ে যাবে।”
আমি বৈদেহির সামনে গিয়ে শান্তভাবে ওর মাথায় একটা হাত রাখলাম। মনে মনে ঠাকুরের নাম জপ করলাম। সেকেন্ড কয়েকের মধ্যে ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে মাটির মধ্যে লুটিয়ে পড়ল বৈদেহি।
দুর্গামোহনবাবু এই ঘটনায় এতটাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন যে তার মুখ থেকে কোন কথা বের হচ্ছিল না। তাকে দেখে মনে হল তার মধ্যে যেন একটু আশার আলো দেখা গেছে। তিনি দৌড়ে এসে আমার হাত চেপে ধরলেন,
“দেখলেন ঠাকুরমশাই। আপনি মাথায় হাত দিতে ও কেমন শান্ত হয়ে গেল। আমার মনে হয় আপনিই পারবেন। আপনি একমাত্র পারবেন ওকে সুস্থ করে তুলতে, ওকে আবার আগের মতো স্বাভাবিক করে তুলতে।”
এক্ষেত্রে আমার ভূমিকাটা যে কোথায়, আমি সেটা বুঝলাম না। আমি কেবল ঠাকুরের নাম জপ করেছি, মাত্র তাতেই শান্ত হয়ে গেছে বৈদেহি। তবে দুর্গামোহনবাবুর আশা যাতে ভেঙে না যায়, তার জন্য আমি এই কথাটা দুর্গামোহনবাবুকে বলতে গিয়েও বললাম না।
সেদিন রাতে ঘুমের মধ্যে আমি মধুসুন্দরী দেবীর স্বপ্ন দেখলাম। আমি দেখলাম কোথাকার এক পাহাড়ের চূড়ার উপর আমি ঘুমিয়ে আছি। আমার মাথায় এসে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন মধুসুন্দরী দেবী। যেন হাত নয়, কোমল ফুলের পাপড়ি আমাকে স্পর্শ করছে। তার সারা গা থেকে জুঁই ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে।
আমি জেগে উঠেছি। দেখলাম মধুসুন্দরী দেবীকে চোখের সামনে অপূর্ব লাগছে। আমার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর হঠাৎ মধুসুন্দরী দেবী পিছন দিকে মুখ ফিরিয়ে হাঁটতে শুরু করলেন। পাহাড় থেকে নেমে এলেন তিনি। আমিও পাহাড় থেকে নেমে এসে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেলাম। জঙ্গলের গাছের ডাল থেকে মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে মধুসুন্দরী দেবীর ডাক আর নূপুরের শব্দ।
হঠাৎ আমার পিছন থেকে দুটো কোমল হাত আমার দু-চোখ চেপে ধরল। জুঁই ফুলের গন্ধটা যেন বেড়ে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে জানলার বাইরে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙল আমার। আর চোখ খুলতে বিছানায় উঠে বসে আমি আশ্চর্য হয়ে গেলাম। সমস্ত ঘরটা ম-ম করছে জুঁই ফুলের গন্ধ।
আমি দুর্গামোহনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম,
“আচ্ছা, আমার ঘর থেকে জুঁই ফুলের গন্ধ ভেসে আসছে কী করে। ঘরে জুঁই ফুল রেখেছেন কি আপনি?”
“কই না তো।”
আমি এ ব্যাপারে আর কথা বাড়ালাম না।
সকালে জলখাবার খেয়ে আমি আর দুর্গামোহনবাবুর সাথে গ্রামটা দেখতে বেরোলাম। কাল রাতে বৈদেহির আর কোন অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ্য করা যায়নি। গ্রামের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়েছে। দুর্ভিক্ষ যেন গোটা গ্রামটাকে শুষে নিয়েছে।
একটা পুকুরের সামনে এসে দাঁড়ালাম আমি আর দুর্গামোহনবাবু। দুর্গামোহনবাবু বললেন,
“এই পুকুরটা হল ভাসান পুকুর। এই পুকুরে কেবলমাত্র ঠাকুর ভাসান করা হয়।”
প্রথমবার পুকুরটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম তখন দেখলাম পুকুরটা জলে ভর্তি। দুর্গামোহনবাবুর সাথে কথা বলে আবার পুকুরটার দিকে তাকাতেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি। দেখলাম পুকুরের জল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অনেক কমে গেছে। অবাক হয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। আর বিশ্বাস করতে পারলাম না এই জন্য, কারণ আমার পাশে দুর্গামোহনবাবু বলে চলেছেন,
“দেখছেন ঠাকুরমশাই, পুকুরটা জলে ভরে আছে। বর্ষা না থাকলেও এই পুকুরের জল কখনো খালি হয় না।”
দুর্গামোহনবাবুর কথা শুনে মনে হল এই পুকুরের হঠাৎই জল কমে যাওয়ার দৃশ্যটা কেবলমাত্র আমার চোখেই পড়ছে, অন্য কারও চোখে পড়ছে না। এই ইঙ্গিত খুব একটা শুভ ইঙ্গিত নয়।
সেদিন সারাদিন আমি এই চিন্তাধারাটি কাটিয়ে গেলাম। দুর্গামোহনবাবুর সাথে কথা বলতে বলতে মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলাম। দুর্গামোহনবাবু একে দেখে মনে হচ্ছিল উনি আমার অন্যমনস্কতা ধরতে পারলেও এ ব্যাপারে আমাকে কিছু বলতে চাইছেন না।
আমার মস্তিষ্কে কিছু ঘটনা যেন একই সূত্রে গাঁথা হয়ে যাচ্ছে। দুর্গামোহনবাবুর মেয়ে বৈদেহির এমন মানসিক অবস্থা, তার আঁকা এই দেবীর ছবিটার রহস্য, গ্রামের এমন হঠাৎ দুর্ভিক্ষ নেমে আসা আর আজকে পুকুরে জল হঠাৎই কমে যাওয়া। এই সমস্ত ঘটনাগুলি কেন জানি না মনে হচ্ছে বারবার একই সূত্রে গাঁথা। যেন একটার জট ছাড়াতে পারলেই সবকটা জট নিজে থেকেই খুলে যাবে।
সেদিন রাতে আমি আবার মধুসুন্দরী দেবীর স্বপ্ন দেখলাম। ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি গোটা ঘরময় ম-ম করছে জুঁই ফুলের গন্ধ।
সেদিন আমি দুর্গামোহনবাবুকে জানিয়ে নিজেই একটু গ্রামটা দেখতে বেরোলাম। উদ্দেশ্য একটাই, সেই পুকুরটাকে গিয়ে দেখা। সেই পুকুরটার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমার মন আরো উৎকণ্ঠায় ভরে গেল। পুকুরের জল আরো নেমে এসেছে। যেন কয়েক দিনের মধ্যেই পুকুরটা একেবারে শুকনো খটখটে হয়ে যাবে।
দুর্গামোহনবাবুর বাড়িতে ফিরে এসে দেখলাম ললিতাদেবী রান্নাবান্না করছেন। উনাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম তা হবু জামাইকে নিয়ে ব্যাংকের কোন একটা কাজে গিয়েছে।
বৈদেহির ঘর থেকে তার আপন মনে বিড়বিড় করে চলার আওয়াজ আসছে। সেই ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করা। বুঝতে পারলাম যে বৈদেহির মানসিক উন্মাদনা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
কাউকে কিছু না বলে আমি সোজা চলে গেলাম সঞ্জয়ের ঘরে।
সঞ্জয় ঘরে রয়েছে একটা খাট। সেই খাটে বিছানা পাতা। বিছানার এক পাশে লম্বা করে থরে থরে সাজানো আছে বই। সমস্ত পড়াশোনার বই। ঘরের এক কোণে রাখা আছে একটা জলের কুঁজো। আর একটা পড়াশোনা করার জন্য টেবিল রয়েছে। এই টেবিলের সাথে রাখা চেয়ারে বসেই সঞ্জয় পড়াশোনা করে। খাটের তলায় রয়েছে একটা টিনের বড় বাক্স। কী একটা মনে হতেই আমি সেই বাক্সটা বার করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি সঞ্জয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
পরের দিন খুব ভোরবেলা উঠে আমি দুর্গামোহনবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। ফিরলাম যখন, তখন সকাল সাড়ে নটা বাজে।
ললিতাদেবী রান্না করছেন। দুর্গামোহনবাবু সকালবেলা বাড়ির তুলসীমঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে ইষ্ট নাম জপ করছেন। আর সঞ্জয় ইউনিভার্সিটিতে যাবে বলে তৈরি হচ্ছে। বারান্দায় বসেই নিজের হাতে ধরা বই-খাতাগুলো ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখছে।
আমাকে দেখে দুর্গামোহনবাবু বলল,
“আরে ঠাকুরমশাই, সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে দেখি আপনি নেই। সকাল সকাল বেরিয়েছেন কোথায়?”
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আমি উত্তর দিলাম,
“সুতানুটি গ্রামে।”
আমার কথায় সকলেই অবাক হল আর সব থেকে বেশি অবাক হল সঞ্জয়। তাকে দেখে মনে হল মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও বোধ হয় মানুষকে এত অবাক দেখায় না। আমি দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি সঞ্জয়ের সারা শরীর ঘেমে উঠেছে।
“সুতানুটি গ্রাম! সুতানুটি গ্রামে আপনি গিয়েছিলেন কেন?”
সঞ্জয় রীতিমতো থতমত খেয়ে আমাকে প্রশ্নটা করল।
“সুতানুটি গ্রামে গিয়েছিলাম কঙ্কাবতীর সাথে একটু আলাপ করতে।”
আমার কথা শুনে সাইকেল বা রিকশার টায়ার ফেটে গেলে যেমন অবস্থা হয়, সঞ্জয়েরও ঠিক তেমন অবস্থা হল। হোঁচট খেতে খেতে সঞ্জয়ের মুখ থেকে কথা বেরোল,
“ক ক... কঙ্কাবতী! কে কঙ্কাবতী?”
দুর্গামোহনবাবু বললেন,
“কে এই কঙ্কাবতী?”
“কঙ্কাবতী কে? সেটা আপনার হবু জামাইকে জিজ্ঞাসা করুন।”
“সঞ্জয়। সঞ্জয় কী করে জানবে কঙ্কাবতী কে? ও কি কঙ্কাবতীকে চেনে নাকি?”
আমি এবার সরাসরি সঞ্জয়ের চোখে চোখ রেখে বললাম,
“কী হে সঞ্জয়, তুমি তো কঙ্কাবতীকে চেনো, তাই না?”
সঞ্জয় আমতা আমতা করে বলল,
“কে কঙ্কাবতী? আমি কোন কঙ্কাবতীকে চিনি না।”
“তাই। সত্যিই তুমি কঙ্কাবতীকে চেনো না? ঠিক আছে, তাহলে কঙ্কাবতী নিজেই এসে বলুক যে সে তোমায় চেনে কি না। এসো মা, ভেতরে এসো। এসো, দেখে যাও তোমার শয়তান স্বামীকে।”
কঙ্কাবতী দুর্গামোহনবাবুদের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। দুর্গামোহনবাবুদের সমস্ত বাড়িখানা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বলে এতক্ষণ কারও চোখে পড়েনি তাকে। এবার কঙ্কাবতী পাঁচিলের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ির ভেতরে ঢুকে উঠোনে এসে দাঁড়াল।
এতক্ষণে ললিতাদেবীও রান্না বন্ধ করে বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন।
কঙ্কাবতীর চোখ দিয়ে রাগ ঠিকরে বেরোচ্ছে। সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে সে বলে চলেছে,
“তুমি মানুষ না জানোয়ার। আমাকে বিয়ে করে সংসার করার পর আমার বাপের বাড়ির সমস্ত সম্পত্তি নিজে কুক্ষিগত করে এখানে আরেকটা মেয়ের জীবন বিপন্ন করতে এসেছ। আমি আরেকটা মেয়ের জীবন নষ্ট করতে তোমাকে দেব না।”
দুর্গামোহনবাবু হতবাক হয়ে গেছেন।
“এসব কী হচ্ছে? সঞ্জয় তোমার স্বামী। ওর বিয়ে হয়ে গেছে! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
আমি দুর্গামোহনবাবুর দিকে এগিয়ে গেলাম,
“একটু দাঁড়ান। এক্ষুনি সবকিছু বুঝতে পারবেন।”
দেখলাম দুর্গামোহনবাবুর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ললিতাদেবী। আমি আমার ঝোলা থেকে একটা ছবি বের করে দুর্গামোহনবাবুর হাতে ধরিয়ে দিলাম। দুর্গামোহনবাবু ছবিগুলো দেখে বিস্মিত হয়ে গেলেন। তার মুখ থেকে যেন কথা বেরোনো বন্ধ হয়ে গেছে।
ছবিগুলো সঞ্জয় আর কঙ্কাবতীর বিয়ের ছবি। ইতিমধ্যে দুর্গামোহনবাবু ললিতাদেবীর হাতে ছবিগুলো ধরিয়ে দিলেন। ছবিগুলো দেখে তিনিও যেন নির্বাক, নিশ্চল হয়ে গেছেন।
সঞ্জয় বইপত্র বারান্দায় রেখে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। তাকে দেখে মনে হল সে পালাবার মতলব আঁটছে। কিছুক্ষণের মধ্যে আমার কথা সত্যি করে দিয়েই সঞ্জয় দৌড়ে পালাতে গেল, কিন্তু উঠোনের বাইরে গেটের সামনে আসা মাত্রই ছিটকে পড়ে গেল মাটিতে। যেন কোন এক অদৃশ্য দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে সে পড়ে গেল মাটিতে।
শো শো শব্দ করে হাওয়া বইছে। ঝড় ওঠার আগে যেমন থমথমে হয়ে যায় জায়গাটা, পরিবেশটা ঠিক এখন সেরকম মনে হচ্ছে। কোথা থেকে কয়েকটা কাক কিসে দুর্গামোহনবাবুর বাড়ির উঠোনে এসে বসল, তারপর তারস্বরে ডাকতে লাগল।
হঠাৎ বৈদেহির ঘরের দরজাটায় দরাম-দড়াম শব্দ হতে শুরু করল। দরজার ওপাশে ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসছে মেয়েলি হুংকার। মুহূর্তের মধ্যে প্রচণ্ড ধাক্কায় ভেঙে গেল তালাবন্ধ ঘরের দরজা এবং ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো বৈদেহি। কিন্তু এ কোন বৈদেহীকে দেখছি! আমি এবং বাকিরা সকলে দেখলেও বৈদেহির মাথার চুল ধবধবে সাদা, সেগুলো উড়ছে। পরনে একটা সাদা বিধবার পোশাক।
হুংকার দিতে দিতে সঞ্জয়ের উদ্দেশ্যে সে বলে চলেছে,
“পাপী, শয়তান, তোর পাপের ঘড়া আজ পূর্ণ হয়েছে। মৃত্যুই তোর একমাত্র শাস্তি। আমার শুধু মানসিক অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে সকলের অগোচরে তুই দিন পর দিন ভোগ করেছিস। শুধু আমি নয়, আরেকটা মেয়েরও তুই সর্বনাশ করেছিস। তোর মৃত্যু অবধারিত।”
সঞ্জয় যেন পাথরের মতো স্থির হয়ে গেছে। সে যেন কোন এক অদৃশ্য জাদুবলে নড়বার শক্তি হারিয়েছে।
বৈদেহি উঠোনের একপাশে রাখা নারকেল পাড়ার দা হাতে নিয়ে দৌড়ে গেল সঞ্জয়ের সামনে, তারপর সজোরে চালিয়ে দিল সেই দা-টা। চোখের সামনে ঘটে গেল এক ভয়াবহ কাণ্ড। এ হেন ঘটনার জন্য আমরা কেউ প্রস্তুত ছিলাম না। দা-এর এক কোপে সঞ্জয়ের ধর থেকে মাথাটা খসে পড়ল। কাটা কলাগাছের মতো সঞ্জয়ের ধরটা লুটিয়ে পড়ল মেঝেতে। রক্তে ভেসে গেল গোটা উঠোন।
কঙ্কাবতী আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দৌড়ে স্বামীর মৃতদেহের সামনে গিয়ে ধপ করে উঠোনে বসে পড়ল। তারপর ভেঙে পড়ল বুকফাটা কান্নায়। আমি এগিয়ে গিয়ে কঙ্কাবতীর মাথায় হাত রাখলাম, তাকে সান্ত্বনা দিলাম। ওকে বোঝালাম, বিপথগামী স্বামীর জন্য চোখের জল ফেলতে নেই।
কিন্তু আমি জানি, যতই খারাপ মানুষ ছিল না কেন সঞ্জয়, সে তো আসলে কঙ্কাবতীর স্বামী। কঙ্কাবতী তো তাকে স্বামী হিসেবে অস্বীকার করতে পারে না।
দুর্গামোহনবাবুর বাড়িতে যথারীতি হলো পুলিশের আগমন। মৃতদেহ সৎকার করে বৈদেহীকে তারা আদালতে উপস্থিত করল। দুর্গামোহনবাবু মেয়ের হাজতবাসের আশঙ্কায় শঙ্কিত ছিলেন। আমি তাকে আত্মস্থ করে বললাম,
“চিন্তা করবেন না। আপনার মেয়ে মুক্তি পেয়ে যাবে।”
বিধির বিধানের খেলায় আমার কথাটাই সত্য প্রমাণিত হলো। বৈদেহি মুক্তি পেয়ে গেল। একজন মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না কোনোমতেই।
এই সমস্ত ব্যাপার মিটে যাবার পর একদিন আমি বৈদেহিকে নিজের ঘরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে বসালাম। আমি খানিকক্ষণ পর কিছু মন্ত্র পড়া শুরু করতেই দেখলাম কিছুক্ষণ পর বৈদেহি উঠে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিমায় বসল, ঠিক যেমন বৈদেহি তার ছবিতে সেই দেবী যেভাবে বসেছিল, ঠিক সেরকম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তার দু-চোখ থেকে দুটো জ্যোতি বেরিয়ে তীব্র বেগে আমার শরীরের মধ্যে প্রবেশ করল। আমি দেখলাম চোখের সামনে বৈদেহির অচৈতন্য দেহটা মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল।
আমি পাঁজাকোলা করে বৈদেহিকে নিয়ে ঘরের বাইরে বের হলাম। বাইরে দুর্গামোহনবাবু, ললিতাদেবী মেয়ের জন্য ব্যাকুলভাবে চিন্তা করছিলেন। আমি ওদের সবাইকে আশ্বস্ত করে বৈদেহীকে নিজের ঘরের বিছানার মধ্যে শুইয়ে দিলাম।
দুদিনের মধ্যে বৈদেহি একেবারে স্বাভাবিক, সুস্থ হয়ে গেল। সুস্থ হওয়ার পর আর মাত্র এক সপ্তাহ আমি সেখানে ছিলাম। দুর্গামোহনবাবু ঠিক করেছিল আমি আর উনি একসাথে যাত্রা করব। আমি চলে যাব আমার নিজের বাড়ি আর দুর্গামোহনবাবু ফিরে যাবেন তার কর্মক্ষেত্রে।
যাওয়ার দিন ললিতাদেবীকে বিদায় জানিয়ে আমি আর দুর্গামোহনবাবু একটা হাতে-টানা রিকশায় স্টেশনে এসে পৌঁছালাম।
এই পর্যন্ত বলে থামল তারানাথ।
কিশোরী ব্যস্তবাগীশ হয়ে বলল,
“এই পুরো গল্পটা তো আপনাকে কেন্দ্র করেই হল। এতে মধুসুন্দরী দেবী কোথায়? মধুসুন্দরী দেবীকে নিয়ে আপনি যে বললেন গল্প বলবেন।”
“তোমাদের এই যুগের ছেলেদের হয়েছে এক সমস্যা। তোমরা একটুও ধৈর্য ধরতে জানো না। রোসো কিশোরী, রোসো।”
আমি বললাম,
“আপনি ওর কথা বাদ দিন তো, আপনি বলুন।”
তারানাথ আবার বলা আরম্ভ করল।
স্টেশনে পৌঁছতে পৌঁছতে আমি দুর্গামোহনবাবুকে রিকশায় সমস্ত ব্যাপারটা খুলে বললাম,
“দুর্গামোহনবাবু, আপনার মেয়ে বৈদেহি এ জন্মে অনেক পুণ্য করেছে। বা এটাকে ওর গত জন্মের পুণ্যের ফল বলতে পারেন। এটা আপনার মেয়ের মধ্যে যে অস্বাভাবিক আচরণগুলো দেখছিলাম, সেগুলো আসলেই দেবী ধূমাবতীর প্রভাব। আপনার মেয়ের শরীরে ধূমাবতীর একটা অংশ প্রবেশ করেছে।
এই দেবী ধূমাবতী দশমহাবিদ্যার এক দেবী। ইনি তান্ত্রিক হিন্দু দেবী। এই দেবীকে আমরা ছবিতে দেখি যে দেবী কাকের পিঠে বসে আছে, অর্থাৎ কাক হল দেবীর বাহন। এই দেবীর পরনে সাদা শাড়ি, অর্থাৎ এই দেবী বিধবা।
এই ধূমাবতী হল সপ্তম মহাবিদ্যা। এই দেবীর প্রভাব সকলের সহ্য হয় না। আপনার মেয়েরও তাই হয়েছে। যখনই ধূমাবতীর প্রভাবটা জেগে উঠত, তখনই আপনার মেয়ে উন্মাদের মতো আচরণ করত।
দেবী ধূমাবতীর প্রভাবেই গ্রামে দুর্ভিক্ষ নেমেছিল। কথিত আছে, দেবী ধূমাবতী যেখানে আসে, সেখানে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। আপনার মেয়ে বৈদেহি যে ছবিগুলো আঁকছিল, সেগুলো ধূমাবতীর ছবি। আমি প্রথমে এই দেবীকে চিনতে পারিনি, পরে চিনতে পারি এবং নিশ্চিত হই যে বৈদেহির শরীরে দেবী ধূমাবতীর একটা অংশ স্থাপিত হয়েছে।
সঞ্জয়ের হাবভাব আমার প্রথম থেকেই একটু অদ্ভুত লাগছিল। ওকে প্রথমে দেখি আমার চেনা চেনা মনে হয়েছিল। পরে মনে পড়ল, একবারও ওর বাড়ির আত্মীয় আমার কাছে ওর বিয়ের জন্য কুষ্ঠি বিচার করতে এসেছিল। সেই সময় আমি ওর ছবি দেখেছি। কঙ্কাবতীর সাথে ওর বিয়ে হওয়ার জন্য কুষ্ঠি বিচার করিয়েছিল। ওকে সন্দেহ করতে শুরু করি। আস্তে আস্তে আমার সন্দেহটা সত্যি হয়।
সঞ্জয় আপনার মস্ত বড় সম্পত্তি হাতানোর জন্য আপনার মেয়েকে বিয়ে করার নাটক করে। আপনি তাকে সুপাত্র ভেবে আপনার বাড়িতে আশ্রয় দেন। এমনকি তার পড়াশোনারও ব্যবস্থা করে দেন। আপনার মেয়ের সাথে সঞ্জয় দিনের পর দিন ঘনিষ্ঠ হয়।
আমি সেটার প্রমাণ পেয়েছি। সঞ্জয়ের সাথে কথা বলতে গিয়ে একদিন সঞ্জয়ের গা থেকে আপনার মেয়ের মাথার সুগন্ধি আতরের গন্ধ পেয়েছি। দুজনে দুজনে খুব ঘনিষ্ঠ হলে তবেই একজনের শরীরের আতরের গন্ধ অন্যজনের গায়ে লাগে।
সঞ্জয় বদমাইশটা আগে একটা বিয়ে করেছে। বউয়ের নাম কঙ্কাবতী।
একদিন সঞ্জয়ের ঘরে ঢুকে আমি একটা জিনিস খুঁজি। সৌভাগ্যবশত কিছুক্ষণ খোঁজার পরেই আমি সেই জিনিসটা খুঁজে পেতে সফল হই। জিনিসটা আর কিছু নয়, সঞ্জয় এবং তার স্ত্রী কঙ্কাবতীর একটা ছবি। আমি এমনই কিছু প্রমাণ খুঁজছিলাম।
ছবিটা বড় কায়দা করে তার টিনের ট্রাঙ্কের এমন একটা জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিল, যেখান থেকে খুঁজে পাওয়া খুব একটা সহজ নয়। আমি সেটা ভগবানের আশীর্বাদে পেয়েও যাই।
পরের দিন ভোরবেলায় আমি বেরিয়ে গিয়ে কঙ্কাবতীকে সবকিছু জানাই। কঙ্কাবতী হতবাক হয়ে যায়। নিজের স্বামীর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিল, কিন্তু আমি কঙ্কাবতীকে আমার সঙ্গে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে এসে জলজ্যান্ত প্রমাণ করে দিই। প্রমাণ করে দিই যে ওর স্বামী কতটা দুশ্চরিত্রের।
তারপরের সমস্ত ঘটনা তো আপনি সব কিছুই জানেন।”
আমার কথাগুলো সব কিছু বলে ফেলা সত্ত্বেও দুর্গামোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার শরীরে কোন পরিবর্তন নেই। তিনি একেবারে নির্বিকার, শান্ত হয়ে বসে আছেন।
রিকশা থেকে নেমে এসে স্টেশনে দাঁড়ালাম। দুর্গামোহনবাবু হঠাৎ একটা আঙুল তুলে ইশারা করলেন আর আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলাম। দেখলাম আমার চারিদিকের লোকজন হঠাৎ থেমে গেছে, দূরে একটা ট্রেন আসছিল, সেটা থমকে দাঁড়িয়ে গেছে। চারপাশের মানুষজন যে যেরকম অবস্থায় ছিল, সে যেন সেরকম অবস্থাতেই আটকে গেছে। সচল এবং জীবন্ত রয়েছে কেবল আমি আর দুর্গামোহনবাবু।
দুর্গামোহনবাবু বললেন, “আমায় তুমি চিনতে পারছো না তারানাথ?”
কথাগুলো উনি একদম আমার সামনে বলছেন, কিন্তু যেন মনে হচ্ছে কথাগুলো ভেসে আসছে বহু দূরে কোন পাহাড়ের পাথরের পাঁজর থেকে। কথাটা বারবার প্রতিফলিত হচ্ছে চারিদিকে।
আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।
“কে আপনি?”
আমার প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই দুর্গামোহনবাবুর শরীরটা দেখলাম বদলে যেতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে শরীরটা বদলে একটা স্ত্রীলোকের রূপ ধারণ করল।
এই স্ত্রীলোককে আমি সারা জীবন খুঁজে বেড়াচ্ছি। স্ত্রীলোকের জন্য আমি উন্মাদ। আমার সারাটা জীবনই এই স্ত্রীলোকের প্রভাব থেকে যাবে। ইনি আমার স্বপ্নচারিণী। ইনি আর কেউ নন, মধুসুন্দরী দেবী।
আমি যেন সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি। উনাকে এভাবে দেখতে পাবো, সেটা কল্পনাও করিনি কোনদিনও। আমার মুখ থেকে শুধুমাত্র একটা কথাই বেরোল,
“আপনি...”
দু-চোখ দিয়ে ঝরিয়ে পড়ছে অশ্রু।
মধুসুন্দরী দেবী আমাকে বলল,
“এতদিন আমি তোমার পরীক্ষা নিচ্ছিলাম তারানাথ। দেখছিলাম তোমার সাধনা কতটা সফল হয়েছে, তুমি কতটা তোমার তন্ত্রশক্তি দিয়ে মানুষের উপকার করতে পেরেছ। আজ আমার সমস্ত বিশ্বাস এক জায়গায় থেমেছে। আমি বুঝেছি তোমার দ্বারা মানুষের শুধু মঙ্গলই হবে। তুমি এই পৃথিবীতে মঙ্গল সাধনের জন্যই এসেছো।
বৈদেহির শরীরে দেবী ধূমাবতীর একটি অংশ প্রবেশ করেছিল। বৈদেহি তো সাধারণ মানুষ, তাই এই দেবীর অলৌকিক অপার্থিব ক্ষমতা সে সহ্য করতে পারেনি।
অলৌকিক ক্ষমতা সে সম্পূর্ণ নিতে পারেনি। সেই জন্যই বৈদেহিকে সুস্থ করার জন্য আমি তোমাকে খবর দিই। ভাবলাম এই সুযোগে তোমার পরীক্ষা নেওয়া হয়ে যাবে। আর সঞ্জয়ের অপরাধ তুমি খণ্ডন করবে।
যেদিন তোমার সাথে আমার স্টেশনে দেখা হল, সেদিন জানতাম যে তুমি স্টেশনেই দাঁড়িয়ে থাকবে ট্রেনে করে বাড়ি ফেরার জন্য। আমি তাই দুর্গামোহনবাবুর ছদ্মবেশে সোজা সেখানে গিয়ে হাজির হই।
সেদিন তুমি সঞ্জয়ের ঘরে ছবি খোঁজ করতে ঢুকেছিলে, সেটা সম্পূর্ণ আমার ইচ্ছায়। তুমি যাতে সঞ্জয়ের ঘরে ঢুকতে পারো, তার জন্য সেদিনই আমি সঞ্জয়কে আমার নিজের সঙ্গে করে নিয়ে গেছিলাম।
দুর্গামোহনবাবু আসলে আসলে তার কর্মক্ষেত্র থেকে এখানে এই কদিন এখানে আসেনি। তিনি তার নিজের জায়গাতেই আছে।
বৈদেহির এই অবস্থা দেখে যখন দুর্গামোহনবাবুর স্ত্রী ললিতাদেবীকে চিঠি লিখে পাঠান, তখন সেই চিঠিটা আসলে দুর্গামোহনবাবুর কাছে পৌঁছয়। কিন্তু আমার সেই সময় প্রয়োগ করা কিছু ক্ষমতায় দুর্গামোহনবাবুর মাথা থেকে চিঠির পড়া সমস্ত ঘটনার কথা সম্পূর্ণ উড়ে যায়। তিনি সম্পূর্ণ ভুলে যান চিঠির কথা।
দুর্গামোহনবাবু এখানে আসতেই ভুলে যান। তিনি তার নিজের কর্মক্ষেত্রেই আছেন। এই যে আমি এখন চলে যাব। আমি চলে যেতেই দুর্গামোহনবাবুর আবার সব কথা মনে পড়ে যাবে। কিন্তু এই কটা দিন আমি যেখানে কাটিয়েছি, দুর্গামোহনবাবুও সেখানে থাকলেও মনে হবে তিনি যেন এই কটা দিন এখানে কাটিয়ে গেছেন। এই কদিনের সমস্ত ঘটনা আসল দুর্গামোহনবাবুর মাথায় গেঁথে গেছে।”
আমার মুখ থেকে আবার কথা বেরোল,
“মধুসুন্দরী দেবী, আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই।”
মধুসুন্দরী দেবী আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল,
“আমি জানি তারানাথ, তুমি আমাকে কী বলতে চাও। তুমি আমায় ভালোবাসো। তোমার মতো স্বামী পেলে আমার জীবনটা ধন্য হয়ে যাবে। আমি যদি কোনদিনও মনুষ্যরূপে জন্মগ্রহণ করি, তবে তোমাকে আমার স্বামী হিসেবে গ্রহণ করব।”
আমি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লাম। বললাম,
“আমি আপনার জন্য আবার জন্ম নেব। আপনাকে আমি আমার স্ত্রী হিসেবে পূজা করতে চাই মধুসুন্দরী দেবী।”
“তোমার সেই ইচ্ছা পূর্ণ হবে তারানাথ। একদিন পূর্ণ হবেই। কারণ এটা তোমার ইচ্ছা নয়, এটাই তোমার সাধনা।”
কথা শেষ করে মধুসুন্দরী দেবী অদৃশ্য হয়ে গেল। একটা ধোঁয়ার মধ্যে যেন মিশে গেল সে। আমি দেখলাম আমার চারপাশে সবকিছু আবার আগের মতোই সচল হয়ে গেছে। মানুষজন যেন আগের মতোই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমার ট্রেন এসে পড়েছে সামনে। আমি ট্রেনে উঠে পড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
গল্প শেষ করে তারানাথ থামল।
আমি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত নটা বাজে।
তারানাথকে বললাম,
“এবার উঠতে হবে তারানাথ। কাল সকালে আবার অফিস আছে।”
আমি আর কিশোরী বাইরে বেরিয়ে এলাম। তারানাথ আমাদের ছাড়তে রাস্তায় এলো।
কিশোরী তার বাড়ির পথে হাঁটা দিল। আমি আমার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হতে যাচ্ছি, হঠাৎ আমার পিঠে হাত রাখল তারানাথ।
আমি ভীষণ ফিরে তাকিয়ে বললাম,
“তারানাথ, কী হল? তুমি কিছু বলবে?”
তারানাথ বলল,
“আজ সকালে তোমার স্বপ্নে অমর জীবন এসেছিল, তাই তো। সে বারবার মধুসুন্দরী দেবীর নাম করছিল। তাই তোমার আজকে মধুসুন্দরী দেবীর গল্প শোনায় তোমার এত আগ্রহ ছিল।”
আমি হতবাক হয়ে গেলাম,
“এই কথা তুমি কী করে জানলে তারানাথ? আমি তো এই কথা কাউকে বলিনি। এমনকি কিশোরীকেও পর্যন্ত নয়।”
তারানাথ একগাল হাসল।
“কী করে জানলাম? সবই আমার স্বপ্নচারিণী মধুসুন্দরী দেবীর কৃপায়।”








Comments