top of page

সুস্বাদু পথ্য | রূপ-টানে পদ্ম থেকে গোলাপ | শিশুদের 'মায়োপিয়া' | রবিবারের গল্প: বাঙালির কাটাছেঁড়া


সুস্বাদু পথ্য


নিজস্ব প্রতিনিধি


অসুখ হলে প্রথম যে কথাটা বাড়ির রান্নাঘরে শোনা যায়, তা হল ‘এখন আর কিছু খাওয়া যাবে না।’ তেল-মশলা বন্ধ, ঝাল বন্ধ, মিষ্টি বন্ধ, ভাজাভুজি বন্ধ শেষ পর্যন্ত রোগীর সামনে এসে দাঁড়ায় এক বাটি সেদ্ধ। অথচ পথ্য মানেই যে বিস্বাদ খাবার, এমনটা মোটেই নয়। বরং অসুস্থ শরীরের প্রয়োজন বুঝে খাবারের উপাদান, পরিমাণ ও রান্নার ধরন বদলে নিলে পথ্যও হতে পারে বেশ সুস্বাদু। রোগভেদে খাবারের প্রয়োজনও বদলায়। পেটের গোলমালে যেমন সহজপাচ্য খাবার দরকার, তেমনই ফ্যাটি লিভারে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ক্যালরি, কম চিনি ও স্বাস্থ্যকর চর্বি। ডায়াবেটিসে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ ও মান গুরুত্বপূর্ণ, আবার রক্তাল্পতায় চাই আয়রনসমৃদ্ধ খাবার। সর্দি-কাশি বা জ্বরে শরীরকে সবচেয়ে বেশি দরকার পর্যাপ্ত জল, বিশ্রাম ও পুষ্টি।



গ্যাস, অম্বল, বদহজম, পাতলা পায়খানা কিংবা বমিভাব, পেটের সমস্যার ধরন অনুযায়ী পথ্য বদলাতে হয়। তবে সাধারণভাবে একসঙ্গে অনেকটা না খেয়ে অল্প অল্প করে খাওয়া, খুব ঝাল-মশলাদার ও অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং শরীরের জল-লবণের ভারসাম্য বজায় রাখা উপকারী। পেট খারাপের সময়ে কারও দুধ বা নির্দিষ্ট কোনও খাবারে সমস্যা বাড়তে পারে, তাই নিজের শরীরের প্রতিক্রিয়াও খেয়াল রাখা জরুরি। এ সময় নরম ভাত, পাতলা ডাল, সেদ্ধ আলু বা সবজি, খিচুড়ি, কলা কিংবা সহজপাচ্য মাছের ঝোল অনেকের কাছেই আরামদায়ক হতে পারে। তবে ‘পেট খারাপ’ বলে দিনের পর দিন শুধু সাদা ভাত আর সেদ্ধ আলু খেয়ে থাকা ঠিক নয়। উপসর্গ কমলে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক সুষম খাবারে ফিরতে হবে।


সবজি-ডালের নরম খিচুড়ি: অল্প চাল ও মুগ ডালের সঙ্গে গাজর, লাউ, পেঁপে বা ঝিঙে দিয়ে ভালো করে সেদ্ধ করুন। সামান্য হলুদ, লবণ ও এক চা-চামচেরও কম তেল দিয়ে রান্না করুন। খুব ঝাল-মশলা না দিয়েও আদা বা অল্প জিরের গন্ধে খিচুড়ি হয়ে উঠতে পারে বেশ মুখরোচক।



ফ্যাটি লিভার অনেক সময় কোনও স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। অতিরিক্ত ওজন, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রক্তে অস্বাভাবিক চর্বি এবং বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই শুধু ‘তেল কম খেলেই লিভার ভালো থাকবে’ বিষয়টি এত সরল নয়। খাবারের মোট পরিমাণ, অতিরিক্ত চিনি, অস্বাস্থ্যকর চর্বি এবং শরীরের ওজন সবকিছুর দিকে নজর দিতে হয়। ফ্যাটি লিভারে শাকসবজি, সম্পূর্ণ শস্য, ডাল, মাছ, ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবারকে খাদ্যতালিকায় জায়গা দেওয়া যায়। মিষ্টি পানীয়, অতিরিক্ত চিনি, প্যাকেটজাত মিষ্টি খাবার এবং অতিরিক্ত ক্যালরির খাবার কমানো জরুরি। সাদা ভাত একেবারে নিষিদ্ধ এমন নয়; তবে পরিমাণ বুঝে খাওয়া এবং সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি ও প্রোটিন রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর ওজনের দিকে ধীরে ধীরে এগোনোও চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।


ওটস-সবজি উপমা: ওটস শুকনো ভেজে নিন। সামান্য তেলে জিরে, কাঁচালঙ্কা ও আদা ফোড়ন দিয়ে গাজর, বিনস, ক্যাপসিকাম বা অন্য সবজি দিন। জল দিয়ে নরম করে ওটস মিশিয়ে সামান্য লবণ দিয়ে রান্না করুন। চাইলে শেষে ধনেপাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করা যায়।


ডায়াবেটিস ধরা পড়লেই অনেকের মনে হয়, এবার থেকে প্রিয় সব খাবারের সঙ্গে বিচ্ছেদ। আসলে ডায়াবেটিসে খাবারের বৈচিত্র্য বজায় রেখেও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা সম্ভব। মূল কথা হল খাবারের পরিমাণ, কার্বোহাইড্রেটের ধরন এবং মোট খাদ্যতালিকার ভারসাম্য। চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের দেওয়া ব্যক্তিগত খাদ্যপরিকল্পনা থাকলে সেটিই অগ্রাধিকার পাবে। পাতে অর্ধেকটা জায়গা সবজি, এক-চতুর্থাংশ প্রোটিন এবং বাকি অংশে নিয়ন্ত্রিত পরিমাণে সম্পূর্ণ শস্য রাখার পদ্ধতি অনেকের জন্য কার্যকর একটি সাধারণ কাঠামো। মিষ্টি পানীয়, কোমল পানীয়, অতিরিক্ত চিনি দেওয়া চা-কফি ও ফলের রসের বদলে জল বেছে নেওয়া ভালো। ফল খাওয়া যাবে, কিন্তু ফলের রসের বদলে গোটা ফল এবং পরিমাণ বুঝে খাওয়াই শ্রেয়।



ডালিয়া সবজি খিচুড়ি: এক কাপ ডালিয়ার সঙ্গে মুগ ডাল, লাউ, গাজর, পালং বা বিনস দিয়ে রান্না করুন। সামান্য তেল, জিরে, আদা ও হলুদ ব্যবহার করুন। আলাদা করে চিনি বা বেশি ঘি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রোটিন বাড়াতে অল্প সেদ্ধ ডিম বা গ্রিল করা মাছ পাশে রাখা যায়।


জ্বর বা সর্দি-কাশির সময় খিদে কমে যেতে পারে। কিন্তু শরীর তখনও শক্তি ও পুষ্টি চায়। তাই একেবারে না খেয়ে থাকা নয়, বরং অল্প অল্প করে সহজপাচ্য খাবার খাওয়া দরকার। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ সর্দির ক্ষেত্রে বিশ্রাম ও প্রচুর তরল পান শরীরকে স্বস্তি দিতে পারে। এই সময়ে পাতলা ডাল, সবজি স্যুপ, মুগ ডালের খিচুড়ি, নরম ভাত-মাছের ঝোল, ডিমের ঝোল বা গরম স্যুপ ভালো বিকল্প হতে পারে। খুব ঝাল খাবার নাক বন্ধ খুলে দেবে এমন ধারণার চেয়ে নিজের সহনশীলতাকে গুরুত্ব দেওয়া ভালো। গলা খুসখুস করলে বয়স এক বছরের বেশি হলে মধু কিছুটা আরাম দিতে পারে; তবে এক বছরের কম শিশুকে মধু দেওয়া যাবে না।



মুরগি ও সবজির স্যুপ: অল্প চর্বিযুক্ত মুরগি, গাজর, লাউ, বিনস ও সামান্য আদা জলে সেদ্ধ করুন। প্রয়োজনমতো লবণ দিন। মুরগির মাংস নরম হয়ে গেলে কুচিয়ে আবার স্যুপে মিশিয়ে দিন। অতিরিক্ত গোলমরিচ বা ঝাল না দিয়েও এই স্যুপ বেশ সুস্বাদু। জ্বর চার দিনের বেশি থাকলে, শ্বাসকষ্ট বা ডিহাইড্রেশন হলে, কিংবা কিছুটা ভালো হওয়ার পর আবার জ্বর বা কাশি বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।


অবসাদ, দুর্বলতা, মাথাব্যথা, হাঁপিয়ে যাওয়া এসবের অন্যতম কারণ হতে পারে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তাল্পতা। তবে সব রক্তাল্পতার কারণ আয়রনের অভাব নয়। তাই পরীক্ষায় কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। আয়রনের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসার পাশাপাশি আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় যোগ করা যায়। পালং বা অন্যান্য গাঢ় সবুজ শাক, ডাল, ছোলা, রাজমা, সয়াবিন, বাদাম, শুকনো ফল এবং মাংস আয়রনের উৎস হতে পারে। উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীরে শোষণে সাহায্য করতে খাবারের সঙ্গে ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ লেবু, পেয়ারা, আমলকি বা অন্য ফল-সবজি রাখা যেতে পারে। আবার চা-কফি খাবারের সঙ্গে বা ঠিক পরেই না খাওয়াই ভালো, কারণ এগুলি আয়রন শোষণে বাধা দিতে পারে।



ছোলা-পালং চাট: সেদ্ধ ছোলার সঙ্গে হালকা সেদ্ধ বা কুচোনো পালং, টমেটো, শসা ও ধনেপাতা মিশিয়ে নিন। সামান্য লেবুর রস ও ভাজা জিরের গুঁড়ো দিয়ে পরিবেশন করুন। অতিরিক্ত নুন বা তেল প্রয়োজন নেই।


অসুস্থ মানুষের জন্য রান্না মানে শুধু নিষেধের তালিকা নয়। খাবার দেখতে সুন্দর, গন্ধে মন ভালো করা এবং স্বাদে গ্রহণযোগ্য হলে খাওয়ার ইচ্ছাটাও বাড়ে। তাই একই উপকরণকে কখনও স্যুপ, কখনও নরম খিচুড়ি, কখনও চাট, কখনও ঝোলের আকারে পরিবেশন করা যায়। রান্নায় অতিরিক্ত তেল-চিনি-নুন না দিয়ে আদা, জিরে, ধনেপাতা, লেবু, কারিপাতা বা মৃদু মশলার সাহায্যে স্বাদ বাড়ানো যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, ‘পথ্য’ কোনও একক তালিকা নয়। একজন ডায়াবেটিক রোগীর পথ্য আর পেটের সমস্যায় ভোগা মানুষের পথ্য এক হবে না; আবার কিডনি, লিভার, হৃদ্‌রোগ বা অন্য কোনও জটিলতা থাকলে খাবারের নিয়ম আরও বদলাতে পারে। তাই দীর্ঘদিনের অসুখ, ওষুধ সেবন, গর্ভাবস্থা, শিশু বা প্রবীণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত চিকিৎসা ও পুষ্টি-পরামর্শ জরুরি।


খাবার রোগ সারানোর একমাত্র উপায় নয়, কিন্তু সঠিক খাবার সুস্থ হয়ে ওঠার পথকে সহজ করতে পারে। আর সেই খাবার যদি হয় ঘরের পরিচিত উপকরণে তৈরি, হালকা, পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু তবে পথ্য খাওয়ার সময় মুখ ভার করে বসে থাকারও প্রয়োজন নেই। অসুখের দিনেও খাবারের টেবিলে একটু স্বাদ, একটু যত্ন, আর অনেকটা ভালোবাসা থাকুক সুস্বাদু পথ্যের আসল মন্ত্র বোধহয় এটাই।




রূপটানে পদ্ম থেকে গোলাপ


নিজস্ব প্রতিনিধি


ফুল মানেই সৌন্দর্য। রং, গন্ধ, কোমল পাপড়ি প্রকৃতির এই ছোট্ট সৃষ্টিগুলির মধ্যেই যেন সৌন্দর্যের সবচেয়ে সহজ সংজ্ঞাটি লুকিয়ে থাকে। তাই ফুল আর রূপচর্চার সম্পর্কও নতুন নয়। আধুনিক প্রসাধনীর ঝাঁ-চকচকে জগতের বহু আগে থেকেই ভারতীয় নারীর রূপটানের সঙ্গী ছিল প্রকৃতি। কখনও চন্দনের সঙ্গে গোলাপের পাপড়ি, কখনও দুধে ভেজানো কেশর, কখনও বা পদ্মের পাপড়ি—ঘরোয়া রূপচর্চার সেই সহজ উপকরণগুলির মধ্যে ফুলের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। সময়ের সঙ্গে রূপচর্চার ধরন বদলেছে। আজ ত্বকের যত্নে ব্যবহার হচ্ছে নানা ধরনের সিরাম, ক্রিম, মাস্ক ও টোনার। কিন্তু এত আধুনিকতার মধ্যেও প্রকৃতিজাত উপাদানের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমেনি। বরং ফুলের নির্যাস-সমৃদ্ধ প্রসাধনী নতুন করে জায়গা করে নিয়েছে সৌন্দর্যচর্চায়। গোলাপ, পদ্ম, জুঁই, গাঁদা কিংবা কেশরের মতো উপাদান এখন নানা প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে ফুলের নাম শুনলেই সরাসরি মুখে পাপড়ি বেটে লাগিয়ে ফেলাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রাকৃতিক উপাদান ত্বকের যত্নে সহায়ক হতে পারে ঠিকই, কিন্তু প্রত্যেকের ত্বকের ধরন এক নয়। তাই ফুলের রূপটানেও প্রয়োজন একটু জ্ঞান, একটু সংযম এবং যথেষ্ট সতর্কতা।



রূপচর্চার সঙ্গে গোলাপের সম্পর্ক সম্ভবত সবচেয়ে পুরনো এবং সবচেয়ে পরিচিত। গোলাপের পাপড়ি থেকে তৈরি গোলাপজল বহুদিন ধরেই ত্বককে সতেজ রাখার ঘরোয়া উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। গোলাপে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান ত্বকের যত্নে সহায়ক হতে পারে। গোলাপজলের শীতল ও সতেজ অনুভূতি ক্লান্ত ত্বককে কিছুটা প্রশান্ত করতে পারে। তাই স্নানের পরে কিংবা মুখ পরিষ্কার করার পর তুলোয় সামান্য গোলাপজল ব্যবহার করার চল আজও রয়েছে। ঘরোয়া ফেসপ্যাকেও গোলাপজল ব্যবহার করা যায়। বেসনের সঙ্গে গোলাপজল ও সামান্য মধু মিশিয়ে তৈরি করা যেতে পারে একটি সহজ ফেসপ্যাক। তবে বাজারচলতি সুগন্ধিযুক্ত কোনও তরলকে গোলাপজল ভেবে ব্যবহার না করে উপাদানতালিকা দেখে নেওয়া জরুরি। গোলাপের পরেই যদি কোনও ফুলের কথা আসে, তবে তা পদ্ম। ভারতীয় সংস্কৃতিতে পদ্ম শুধু একটি ফুল নয়, সৌন্দর্য ও পবিত্রতারও প্রতীক। জল থেকে উঠে আসা পদ্মের নির্মল সৌন্দর্য বহু যুগ ধরে কবিতা, চিত্রকলা ও সাহিত্যের অনুপ্রেরণা। সেই পদ্মের উপস্থিতি রয়েছে রূপচর্চাতেও। পদ্মের নির্যাসে বিভিন্ন উদ্ভিজ্জ যৌগ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা ত্বকের যত্নে সহায়ক হতে পারে। প্রাচীন ঘরোয়া রূপচর্চায় পদ্মের পাপড়ি বেটে নানা উপাদানের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করার কথা পাওয়া যায়। বর্তমানে অবশ্য পদ্মের নির্যাস বা শুকনো পদ্মের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি প্রসাধনী পাওয়া যায়, ফলে সেই পুরনো পদ্ধতিকে আধুনিক ব্যবহারের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া অনেক সহজ।



কেশর বা জাফরানের গল্প আবার একটু আলাদা। এটি সরাসরি একটি ফুলের পাপড়ি নয়, বরং Crocus sativus ফুলের গর্ভমুণ্ড থেকে পাওয়া যায়। ভারতীয় রূপচর্চায় কেশরের ব্যবহার বহু পুরনো। তার সোনালি রং যেমন রাজকীয়, তেমনই এর মধ্যে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানের কারণে ত্বকের যত্নেও এর ব্যবহার দেখা যায়। দুধ, মধু বা চন্দনের সঙ্গে অল্প কেশর মিশিয়ে ফেসপ্যাক তৈরির প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে উৎসবের আগে ত্বকে একটি সতেজ ও উজ্জ্বল অনুভূতি আনতে কেশরযুক্ত প্রসাধনীর ব্যবহার অনেকেরই পছন্দ। তবে কেশর যত দামি, তত বেশি ব্যবহার করতে হবে, এমন ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। অল্প পরিমাণই যথেষ্ট। ত্বকে কোনও অস্বস্তি দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করাই শ্রেয়। ফুলের সৌন্দর্য শুধু ত্বকের যত্নেই সীমাবদ্ধ নয়, মন ভালো রাখার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা রয়েছে। জুঁই তার সবচেয়ে সুন্দর উদাহরণ। ছোট্ট সাদা ফুল, অথচ তার গন্ধে যেন গোটা সন্ধে বদলে যায়। ভারতীয় উপমহাদেশে জুঁইয়ের সুগন্ধি তেল শরীরচর্চা, স্নান এবং সুগন্ধি ব্যবহারে বহুদিন ধরেই পরিচিত। জুঁইয়ের সুবাস প্রশান্তির অনুভূতি দিতে পারে এবং সন্ধ্যার রূপচর্চায় তার উপস্থিতি তৈরি করতে পারে অন্যরকম আবহ। তবে জুঁইয়ের এসেনশিয়াল অয়েল সরাসরি মুখে লাগানো উচিত নয়। এটি অত্যন্ত ঘন উপাদান হওয়ায় ত্বকে ব্যবহারের ক্ষেত্রে উপযুক্ত বাহক তেলের প্রয়োজন হতে পারে। সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা আরও জরুরি।



আমাদের অতি পরিচিত গাঁদা ফুলও রূপচর্চার জগতে একেবারে অপরিচিত নয়। পুজোর সাজ, বাড়ির দরজা কিংবা ঠাকুরের আসন, গাঁদা যেন বাঙালির উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সৌন্দর্যের ক্ষেত্রেও এই ফুলের কিছু প্রজাতির নির্যাস ব্যবহার করা হয়। গাঁদায় থাকা কিছু উদ্ভিজ্জ উপাদানের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহ-প্রশমক বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে। সেই কারণেই গাঁদার নির্যাস নানা প্রসাধনীতে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। তবে বাগান থেকে তুলে আনা গাঁদা ফুল সরাসরি মুখে বেটে লাগানো মোটেই নিরাপদ পদ্ধতি নয়। ফুলে থাকা পরাগকণা, ধুলোবালি কিংবা কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ ত্বকে সমস্যা তৈরি করতে পারে। ফুল দিয়ে রূপচর্চার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার সরলতা। কয়েকটি পাপড়ি, সামান্য জল, একটু মধু কিংবা বেসন এই সামান্য উপকরণেই একসময় তৈরি হত ঘরোয়া রূপটান। সেই ঐতিহ্য আজও মানুষের মন টানে। বিশেষ করে উৎসবের আগে, যখন ত্বককে একটু সতেজ ও উজ্জ্বল দেখানোর ইচ্ছে হয়, তখন প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার এই প্রবণতা আরও বাড়ে। পুজোর আগের বিকেলে জানলার ধারে বসে গোলাপজলের গন্ধ, চন্দনের মৃদু সুবাস কিংবা কেশরের রং, এইসবের মধ্যে যেন আমাদের পুরনো ঘরোয়া সৌন্দর্যচর্চার স্মৃতিও ফিরে আসে।


তবে এই নস্ট্যালজিয়ার সঙ্গে বাস্তব বোধটুকুও থাকা জরুরি। কোনও উপাদান প্রাকৃতিক হলেই যে তা প্রত্যেকের ত্বকের জন্য নিরাপদ, এমন নয়। ফুলের রেণু বা নির্যাস থেকেও কারও কারও অ্যালার্জি হতে পারে। তাই নতুন কোনও উপাদান মুখে ব্যবহারের আগে ত্বকের ছোট্ট একটি অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। ত্বকে জ্বালা, চুলকানি, লালচে ভাব বা অস্বস্তি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া একের পর এক ঘরোয়া উপাদান পরীক্ষা করা উচিত নয়। আরও একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, ঘরোয়া রূপচর্চায় ব্যবহৃত ফুলের মানও গুরুত্বপূর্ণ। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহৃত ফুল সরাসরি ত্বকে লাগানো উচিত নয়। একইভাবে বাজারে পাওয়া ফুলের নির্যাস বা গুঁড়ো ব্যবহার করার আগে তার উপাদান এবং প্রস্তুতকারকের তথ্য দেখে নেওয়া প্রয়োজন। সৌন্দর্যের তাড়াহুড়োয় ত্বকের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে ফেলা কখনওই কাম্য নয়।



আসলে ফুলের রূপটান কোনও জাদুকরী পদ্ধতি নয়। এটি প্রকৃতির সঙ্গে সৌন্দর্যচর্চার একটি সুন্দর যোগসূত্র। গোলাপের সতেজতা, পদ্মের নির্মলতা, জুঁইয়ের সুবাস, গাঁদার উজ্জ্বলতা কিংবা কেশরের সোনালি আভা, প্রতিটি ফুলই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য সবসময় জটিল হতে হয় না। কখনও কখনও তার সবচেয়ে সুন্দর রূপটি লুকিয়ে থাকে প্রকৃতির সবচেয়ে সহজ উপহারগুলির মধ্যেই। তাই পুজোর আগে যখন নতুন পোশাক, গয়না আর সাজগোজের প্রস্তুতি শুরু হবে, তখন রূপচর্চার তালিকাতেও একটু জায়গা থাকুক ফুলের জন্য। তবে অন্ধভাবে নয়, নিজের ত্বকের প্রয়োজন বুঝে। কারণ প্রকৃতির সৌন্দর্যকে নিজের যত্নের অংশ করে নেওয়ার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হল তাকে ভালোবাসার পাশাপাশি বুঝে ব্যবহার করা। পদ্ম থেকে গোলাপ, ফুলের এই রূপকথা তাই শুধু সৌন্দর্যের গল্প নয়, নিজের ত্বককে একটু সময় দেওয়ারও গল্প।


সারাক্ষণ স্ক্রিনে চোখ? শিশুদের মায়োপিয়া নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ!


নিজস্ব প্রতিনিধি


একসময় দূরের জিনিস ঝাপসা দেখার সমস্যা মূলত বড়দের মধ্যেই বেশি দেখা যেত। কিন্তু এখন ছবিটা বদলেছে। ছোট বয়সেই চশমা পরতে হচ্ছে বহু শিশুকে। পড়াশোনা, অনলাইন ক্লাস, মোবাইল গেম, কার্টুন দেখা কিংবা অবসর কাটানো—দিনের একটা বড় সময়ই কেটে যাচ্ছে কাছের কোনও বই, মোবাইল, ট্যাবলেট বা কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে। এর সঙ্গে বাইরে খেলাধুলা ও প্রাকৃতিক আলোয় কাটানো সময় কমে যাওয়ায় শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।



মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টি এমন একটি দৃষ্টিজনিত সমস্যা, যেখানে কাছের জিনিস তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার দেখা গেলেও দূরের বস্তু স্পষ্ট দেখা যায় না। চোখের গঠনগত কারণে দূরের কোনও বস্তুর ছবি রেটিনার ঠিক উপরে না পড়ে তার সামনে তৈরি হলে এমনটা হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে চোখের বৃদ্ধি ও বিকাশের সঙ্গে মায়োপিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। বংশগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মায়ের কারও মায়োপিয়া থাকলে সন্তানের ক্ষেত্রেও এর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে শুধুমাত্র বংশগত কারণ নয়, শিশুর দৈনন্দিন জীবনযাপনও এই সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। বর্তমান সময়ে শিশুদের মায়োপিয়ার অন্যতম আলোচিত কারণ হল দীর্ঘক্ষণ কাছের কাজ করা এবং বাইরে কম সময় কাটানো। বই পড়া বা পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল, ট্যাবলেট কিংবা কম্পিউটার ব্যবহার যোগ হয়, তাহলে চোখকে দীর্ঘ সময় ধরে কাছের দিকে ফোকাস করে থাকতে হয়। বিশেষ করে স্ক্রিন চোখের খুব কাছে নিয়ে ব্যবহার করার অভ্যাস একেবারেই স্বাস্থ্যকর নয়। তবে এটাও মনে রাখা জরুরি, শুধু মোবাইল ব্যবহার করলেই মায়োপিয়া হয় এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। শিশুর জেনেটিক প্রবণতা, কাছের কাজের পরিমাণ এবং বাইরে কাটানো সময়, সবকিছু মিলিয়েই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।



শিশুর মায়োপিয়া হয়েছে কি না, তা অনেক সময় বাবা-মা প্রথমে বুঝতেই পারেন না। কারণ ছোটরা নিজের দৃষ্টির পরিবর্তনকে অনেক সময় স্বাভাবিক বলেই ধরে নেয়। তাই কিছু লক্ষণের দিকে নজর রাখা জরুরি। দূরের লেখা পড়তে গিয়ে চোখ কুঁচকে তাকানো, স্কুলের বোর্ড দেখতে সমস্যা হওয়া, টেলিভিশনের একেবারে কাছে গিয়ে বসা, দূরের কোনও মানুষ বা বস্তুকে চিনতে সমস্যা হওয়া কিংবা বারবার চোখের ক্লান্তির কথা বলা, এসবই সতর্ক হওয়ার মতো লক্ষণ। কোনও শিশু পড়াশোনা বা স্ক্রিন দেখার সময় ঘন ঘন চোখ ঘষলে, মাথাব্যথার কথা বললে কিংবা দূরের জিনিস দেখতে গিয়ে চোখ ছোট করে তাকালে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। শিশুর দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখতে ঘরের পরিবেশের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। পড়াশোনা করার সময় পর্যাপ্ত আলো থাকা জরুরি। অন্ধকার ঘরে বা অত্যন্ত কম আলোয় মোবাইল কিংবা বই নিয়ে বসে থাকা ঠিক নয়। আবার স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে চোখে অস্বস্তি তৈরি হয়। শিশুর চোখ ও স্ক্রিনের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব রাখা এবং দীর্ঘক্ষণ একটানা স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়ে মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা দরকার।



এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাসগুলির একটি হল বাইরে সময় কাটানো। খেলাধুলা, হাঁটাহাঁটি কিংবা প্রাকৃতিক আলোয় কিছুটা সময় কাটানো শুধু শরীরের জন্য নয়, চোখের স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। শিশুদের প্রতিদিনের রুটিনে এমন সময় রাখা দরকার, যখন তারা বই বা স্ক্রিনের বদলে দূরের গাছপালা, আকাশ, মাঠ কিংবা চারপাশের পরিবেশের দিকে তাকাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের মায়োপিয়ার ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রে বাইরে কাটানো সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মায়োপিয়া ধরা পড়লে শুধু ঘরোয়া অভ্যাস বদল করলেই হবে না। শিশুর দৃষ্টিশক্তিতে কোনও পরিবর্তন চোখে পড়লে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী চোখের পাওয়ার পরীক্ষা করে চশমা দেওয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মায়োপিয়া দ্রুত বাড়তে থাকলে চিকিৎসক বিশেষ ধরনের চিকিৎসা বা মায়োপিয়া নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতির কথাও বিবেচনা করতে পারেন। কোন পদ্ধতি শিশুর জন্য উপযুক্ত, তা বয়স, চোখের অবস্থা এবং মায়োপিয়ার মাত্রার উপর নির্ভর করে।



মায়োপিয়া সবসময় সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে বংশগত প্রবণতা থাকলে ঝুঁকি থেকেই যায়। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুললে ঝুঁকি কমানো এবং সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব। শিশুর হাতে সারাক্ষণ মোবাইল তুলে দেওয়ার বদলে খেলাধুলা, বই পড়া, সৃজনশীল কাজ এবং বাইরে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেওয়া তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চোখের সমস্যা বোঝার জন্য শিশুর অভিযোগের অপেক্ষা না করাই ভালো। কারণ দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হলে শিশু নিজেও হয়তো বুঝতে পারে না যে সে আগের মতো পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না। নিয়মিত চোখ পরীক্ষা, স্ক্রিন ব্যবহারে সংযম, পর্যাপ্ত আলো, কাছের কাজের মাঝে বিরতি এবং প্রতিদিন কিছুটা সময় বাইরে কাটানো, এই অভ্যাসগুলিই হতে পারে শিশুর চোখের যত্নের সহজ ভিত্তি। আজকের ছোট্ট সচেতনতাই ভবিষ্যতে শিশুর চোখকে সুস্থ রাখার পথে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

রবিবারের গল্প: বাঙালির কাটাছেঁড়া


শেখর বসু


দশ দিনের সুন্দর একটা সফর শেষ। সফরসূচির অদলবদল হয়নি কোথাও, হোটেলগুলো সবারই বেশ পছন্দসই ছিল। ছ’জনের দল। একটা বড় গাড়ি ভাড়া করা হয়েছিল। ড্রাইভার বেশ হাসিখুশি, জোরে চালায় কিন্তু র‍্যাশ ড্রাইভিংয়ের দিকে যায়নি কখনও। তাছাড়া রাস্তাঘাটও ভালোভাবে চেনার দরুন দ্রষ্টব্য জায়গাগুলোর বেশির ভাগই দেখা হয়ে গিয়েছিল চটপট। আবহাওয়া ছিল চমৎকার। এবার ঘরে ফেরার পালা। মুম্বইয়ের ভিটি থেকে হাওড়া—দুটো রাত একটা দিনের লম্বা জার্নি। এক্সপ্রেস ট্রেনের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এই বগিটাও বেশ ঝকঝকে-তকতকে। একটা কুপে এই ছ’জনের দখলে। ওপাশের সাইডবার্থে মাঝবয়সি এক অবাঙালি দম্পতি। সফর শেষে ট্রেনে প্রথম রাত এই ছয় যাত্রীর কেটে গিয়েছিল গভীর ঘুমে। ট্রেন ছুটে চলেছে দ্রুতগতিতে, কিন্তু কামরার মধ্যে বিশেষ দুলুনি নেই। একটু আগেই ব্রেকফাস্ট খেয়েছে সবাই। এখন প্রত্যেকের হাতেই কফির কাপ। কাচে-মোড়া জানলা দিয়ে সকালের মৃদু আলো ছড়িয়ে পড়েছিল কুপের মধ্যে। বেড়ানোর জায়গাগুলো নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হওয়ার পরে গল্প ঘুরে গিয়েছিল পরনিন্দার দিকে। কেশে গলা পরিষ্কার করে সমরেন্দ্র বললেন, ‘বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু এটা তো একটা ঘটনা। সত্যি-মিথ্যে আমি অবশ্য যাচাই করতে যাইনি, তবে যাঁর মুখ থেকে শুনেছি, তিনি আজেবাজে কথা বলার মানুষ নন।’



গল্পের টানে একটু নড়েচড়ে বসেছিল এই কুপের বাকি পাঁচজন যাত্রী। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পরে আবার মুখ খুললেন সমরেন্দ্র। ‘এই এক্সপ্রেস ট্রেনের কেটারিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন একজন বাঙালি। শুনেছি, গোড়ার দিকে লোকটার সার্ভিস খুব ভালো ছিল। যাত্রীদের ভালো খাবারদাবার দিত, খাবারের পরিমাণও ছিল যথেষ্ট। মুম্বই থেকে হাওড়া—লম্বা জার্নি, তার মানে লোকটার ব্যবসার মাপও বেশ বড় ছিল। বড় ব্যবসা মানেই বড় লাভ। কিন্তু বাঙালি ব্যবসায়ী তো, রাতারাতি দ্বিগুণ লাভ না করলে চলবে কেন? ব্যস শুরু হয়ে গেল কোয়ালিটি কম্প্রোমাইজ। খাবারের মান বাজে হল। সার্ভিসের লোকজনও কমিয়ে দিয়েছিল। শুনেছি ওই বাঙালি মালিক শেষের দিকে নিজেও আর ব্যবসা দেখত না। রাতারাতি বেশি লাভের ধান্দা, তার ওপর লোক রেখে কারবার চালানো—ফল যা হওয়ার তাই হয়েছিল। অত বড় ব্যবসাটা অল্প কিছুদিনের মধ্যে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল ওই বাঙালি ব্যবসায়ীর।’


এবার কথার খেই ধরলেন বিজিত মৈত্র। বললেন, ‘আমি বাইপাসের ধারে ছোটখাটো একটা বাড়ি বানিয়ে বছর-কুড়ি ধরে আছি, যখন ওখানে প্রথম গিয়েছিলাম তখন চারপাশে ধু-ধু মাঠ, জলাজঙ্গল। সত্যি কথা বলতে কি, রাত্তিরে মাঝেমধ্যে একটু ভয়ই করত আমাদের। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই বেশ কয়েকটা বাড়ি উঠে গেল চারপাশে। এখন তো এলাকাটা রীতিমতো ঘিঞ্জি হয়ে গিয়েছে। কোথাও এক ছটাক জমি পড়ে নেই। বড় রাস্তার পাশে হাইরাইজ। ওখানে এখন ফ্ল্যাটের দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। চোখের সামনে আস্ত একটা বসতি গজিয়ে উঠতে দেখলাম। প্রথম দিকে ওখানে শুধু বাঙালিরাই ছিল। পরে দু-চারজন করে অবাঙালিও ঢুকতে থাকে, এখন ওদের সংখ্যাটা বেশ বেড়ে গিয়েছে। বাঙালির সংখ্যাও বেড়েছে। আর বাঙালির সংখ্যা বাড়লে কী বাড়ে বলো তো?’


‘কী?’



আগ্রহী শ্রোতাদের প্রশ্নের উত্তরে রহস্যময় একটা হাসি হাসলেন বিজিত, তারপর বললেন, ‘ক্লাব। কেলাবও বলতে পারো। দলের সংখ্যা একটু বাড়লেই ক্লাব তৈরি করে বাঙালিরা। কী হয় সেখানে? সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নাচ-গান-আবৃত্তি; থিয়েটার-টিয়েটারও হয়। ক্লাব চালায় পাড়ার শিক্ষিত বাঙালি বেকাররা। শিক্ষিত মানে কোনওমতে সেকেন্ডারি বা হায়ার সেকেন্ডারি ডিঙোনো। দু-চারটে পৌঁছেছে বি.এ.-র দোরগোড়া পর্যন্ত, ব্যস ওই পর্যন্তই। ওই বিদ্যেয় চাকরি জোটে না। ওদের সঙ্গে একেবারে গোড়ার দিকে আমি বন্ধুর মতো মিশতাম। বলতাম—ক্লাবঘরে বসে শুধু ক্যারম পেটালে আর গুলতানি মারলে একেবারে অকর্মা হয়ে যাবে। ওদের মধ্যে কেউ-কেউ তখন মিনমিন করে বলত, চাকরির জন্যে এদিক-ওদিক বিস্তর অ্যাপ্লিকেশন ছেড়েছি, কিন্তু একটারও তো জবাব আসে না। কারা চাকরি পায় কে জানে! শুনে ক্ষেপে গিয়ে বলতাম—তোমাদের বিদ্যের বহর তো জানি, আলাদা কোনো যোগ্যতাও নেই—কেন আসবে তোমাদের ইন্টারভিউয়ের চিঠি?’


‘কী বলত তার উত্তরে?’


‘কী আবার বলবে! বলার তো কিছু নেই। মায়াও হত। অনেক পরামর্শও দিয়েছিলাম। বলতাম—যোগ্য হয়ে কেউ জন্মায় না, যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। তোমরা যোগ্য হওয়ার চেষ্টা করছ না কেন? বলতাম, চাকরির বাজার দিনকে দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। তবে অন্য ধরনের কাজের সুযোগ বাড়ছে। একটু চোখকান খুলে চললেই ওই কাজগুলো তোমাদের নজরে পড়বে। দূর কোথাও যেতে হবে না, এই এলাকাতেই পেয়ে যাবে। এখানে তো লোকের সংখ্যা এখন অনেক বেড়ে গিয়েছে, কিন্তু বাজারঘাট বেশ দূরে। তোমরা এখানে দোকান দিতে পারো, নানা ধরনের দোকান। বাসিন্দাদের সুবিধে হবে, ঠেঙিয়ে দূরে গিয়ে বাজার করতে হবে না। তোমরাও দুটো পয়সা লাভের মুখ দেখবে।’



‘খুব ভালো পরামর্শ দিয়েছিলেন, শুনেছিল কেউ?’


‘বয়ে গিয়েছিল শুনতে! শুনলে তো পরিশ্রম করতে হবে। বললাম, কাজের কি অভাব আছে! ইদানীং গাড়ির সংখ্যা বেশ বেড়ে গিয়েছে, এখানে ছোটখাটো একটা গ্যারাজ বানাতে পারো তোমরা। প্রথম দিকে কাজ-জানা দু-একজন মেকানিক রাখো। তারপর ওদের কাছ থেকে আস্তে আস্তে কাজটা শিখে নাও। বিয়ে-থা, অন্নপ্রাশন, বিভিন্ন পার্টিতে অনেকেই গাড়ি ভাড়া করে। তোমরা দু-একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড গাড়ি কিনে ওই ধরনের ব্যবসাতেও নামতে পারো। কিছু লোকের গাড়ি আছে, কিন্তু প্রতিদিনের ড্রাইভার বলে কেউ নেই। কোথাও যেতে হলে ড্রাইভার ভাড়া করে নেয় কোনও সার্ভিস সেন্টার থেকে। তোমরা গ্যারাজের সঙ্গে সঙ্গে ওই রকম একটা সার্ভিস সেন্টারও খুলতে পারো। পার্টটাইম ড্রাইভারি করে অনেকে, তোমরা ওদের মোবাইল নম্বর তোমাদের কাছে রেখে দাও। ক্লায়েন্ট ড্রাইভার চাইলে ওদের কাউকে ফিট করে দেবে। তোমাদের বাড়তি কোনও ধকল নেই, ড্রাইভার-পিছু কমিশন পেয়ে যাবে। শুধুমাত্র এই কাজটা করেই অনেক সেন্টার ভালো রোজগারপাতি করে। ঘর, গ্যারাজ ভাড়া করার একটা ইনিশিয়াল ইনভেস্টমেন্ট আছে। কিন্তু তার জন্যে ঘাবড়াবার কোনও দরকার নেই। ব্যাঙ্ক থেকে এখন ভালো লোন পাওয়া যায়। খেটেখুটে ব্যবসা দাঁড় করাও, ব্যাঙ্কের কিস্তি মেটাতে কোনও অসুবিধে হবে না। ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলে বড় অঙ্কের লোন নাও। ব্যবসা আরও বড় করো। ব্যাপারটা একেবারেই কঠিন নয়, তবে হ্যাঁ, পরিশ্রম করতে হবে।’



‘ভালো পরামর্শ দিয়েছিলেন, তা কোনও কাজ হয়েছিল আপনার কথায়?’


‘কী করে হবে? ওরা তো সবাই বাঙালি--!’


বিজিতের ছুড়ে-দেওয়া এই কথাটায় হেসে উঠেছিল শ্রোতারা।


প্রবীণ মানুষটি কিন্তু হাসলেন না। বললেন, ‘বলতে সত্যিই খারাপ লাগে। কিন্তু এই ব্যাপারটা বুঝি বাঙালির রক্তের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে অনেকখানি। পরিশ্রম করবে না একদম। কর্মবিমুখ হলে যা হয়, সেই দোষগুলোও জুটে যায় এক-এক করে। হিংসুটে, পরশ্রীকাতর হয়ে ওঠে। লোকের নিন্দে করতে পারলে আর কিছু চায় না। সব সময় মুখেন মারিতং জগৎ। অথচ—।’


একটু দম নিয়ে আবার কথা শুরু করলেন বিজিত মৈত্র। ‘আমাদের পাড়ায় বিহার থেকে কয়েকটা ছেলেছোকরা এসে হাজির হয়েছিল। ঝুপড়িতে থাকে। লেখাপড়া জানে না, একেবারে দেহাতি। কিন্তু ওরা আস্তে আস্তে দিব্যি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। এখন তো ওদের রমরমা ব্যবসা।’


অবাক চোখে তাকিয়ে দিশা জিজ্ঞেস করল, ‘কিসের ব্যবসা?’


‘জামাকাপড় ইস্তিরি করার ব্যবসা। ফুটপাথের ধারে গাছের নীচে দু-তিনটে ঝুপড়ি বানিয়ে নিয়েছে। বাড়ি-বাড়ি গিয়ে কাচা জামাকাপড় নিয়ে আসে। তারপর ইস্তিরি করে হোম-ডেলিভারি। কী খাটে ছেলেগুলো! সেই ভোর থেকে রাত্তির পর্যন্ত সমানে ইস্তিরি চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ-কেউ আবার পান-সিগারেট, চা-বিস্কুট আর রকমারি খাবারদাবারের দোকানও দিয়েছে। কারবার বেশ ফুলেফেঁপে উঠেছে। এইসব কাজগুলো কি বেকার বাঙালি ছেলেগুলো করতে পারত না?’


‘তার তো আর দরকার নেই। ওদের হাতে তো এখন অনেক বড়-বড় কাজ। সব পাড়াতেই—।’ সমরেন্দ্র একটু বুঝি প্রতিবাদের গলাতেই কথাটা বলেছিলেন।


শ্রোতাদের পুরো মনোযোগ নিজের দিকে টেনে নেওয়ার পরে একটু উঁচু স্বরেই আগের কথার খেই ধরলেন সমরেন্দ্র। ‘পাড়ার বেকার বাঙালি ছেলেরা এখন তো আর বেকার নেই। যথেষ্ট কাজকর্ম করছে ওরা।’


‘কী কাজ?’


‘তোলাবাজি কি কম খাটুনির কাজ! কার কাছ থেকে কত পাওয়া যাবে—সেটা হিসেব করে ঠিক সময়ে আদায় করার পেছনে যথেষ্ট মেহনত থাকে। পাড়ায় পাড়ায় এখন এন্তার বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের কাজ হচ্ছে—সেখানে ওরা ইট-সিমেন্ট-বালি সাপ্লাই দেয়। মানে ওদের কাছ থেকেই নিতে হবে, না হলে বাড়ি বানানো যাবে না। এত চাপ সামলাতে গেলে মালের কোয়ালিটি একটু খারাপ হবেই। তা হোক, ওরাই তো পাশে দাঁড়িয়ে কাজ তুলে দিচ্ছে। সব লাভ একাও খাচ্ছে না। কত ভাগ-বাঁটোয়ারা। দাদাদের দিতে হয়। পার্টি ওদের ঘাঁটায় না। ওদের কোনও শুচিবায়ু নেই। যারা যখন আসে, ওরা তখন তাদের। একবার শুধু জামা পালটে নিতে হয় শুধু। কাজে ঝুঁকি আছে, তবে বড় কোন্ কাজেই বা ঝুঁকি নেই? পাড়ার বেকার বাঙালি ছেলেরা এখন আর বেকার নয়। রোজগারপাতি যথেষ্ট ভালো।’


রুমা হাসতে হাসতে বলল, ‘খুব ভালো, তবে এই কারবারও বাঙালির ছেলেরা বেশিদিন চালাতে পারবে না।’


‘কেন?’


‘এখানেও মাসলপাওয়ারওয়ালারা ঢুকে পড়েছে। মারদাঙ্গা, গুলিগোলা ছোড়ার ব্যাপারে বাঙালিরা এদের সঙ্গে পেরে উঠবে না।’


কুপের ছ’জন বাঙালি একমত হল বাঙালিরা ভিতু সম্প্রদায়ের লোক। ভিতু, কর্মবিমুখ, পরশ্রীকাতর এবং নিন্দুক। এই ব্যাপারে পরিষ্কার একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় এই দলটা যখন পৌঁছে গিয়েছিল তখন সাইড-বার্থের ওই অবাঙালি ভদ্রলোক আলোচনার মধ্যে ঢুকে পড়লেন--। কী বললেন ঠিক বোঝা গেল না। মুখভর্তি পানমশালা কিংবা খৈনি। উনি মুখের ওই বস্তুটাকে একদিকে ঠেলার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ঠিক সামলে উঠতে পারছিলেন না।


ভদ্রলোকের পরনে ডোরাকাটা একটা হাফপ্যান্ট, গায়ে পুলওভার, মাথায় চাপা পশমি টুপি কানের ওপর তোলা। একটু আগেই শেয়ারবাজার আর কারবারের নতুন চাল নিয়ে ঠেট হিন্দিতে মোবাইলে কথা বলছিলেন কার সঙ্গে। মুখের বস্তুটাকে অতিকষ্টে মুখের একপাশে ঠেলে দিয়ে মুখ খুললেন আবার। ‘কলকাত্তায় আমার অনেক বাঙালি বন্ধু আছে। কয়েকজনের দিমাগ খুব সাফ। ভালো কারবার বোঝে, কামাইও ভালো করে; কিন্তু স্রেফ দোদিনের জন্যে। আমি বলি, ভাই কী হল? রুকে গেলে কেন? তো বলে, বহুত কামাই হয়েছে, এখন দোঠো দিন আরাম করতে দাও। হাতে একটু পয়সা এলেই বাঙালিরা কাম করা ছেড়ে দেয়। তখন কী করে? একঠো হারমোনিয়াম কি একঠো মিউজিক সিস্টেম কেনে। বারান্দায় দো-চারঠো ফুলের টব লাগিয়ে দেয়—ব্যস!’


কথার শেষের দিকে একটা হাসির মতো শব্দ অবাঙালি ভদ্রলোকটির মুখ দিয়ে বেরোনোর উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু বাধ সেধেছিল বোধহয় মুখের ভেতরে জমা খৈনি বা পানমশালা। ভদ্রলোক হাত তুলে ‘আসছি’র ইঙ্গিত দিয়ে মুখ পরিষ্কার করার জন্যে ছুটলেন টয়লেটের দিকে।


কুপের এই ছ’জন বাঙালির মধ্যে প্রথমে চোখে চোখে তারপর চাপা গলায় কিছু কথাবার্তা হয়ে গেল। ছয় বাঙালির বাঙালিত্ব হঠাৎই বেশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। যে ব্যাপারে এরা চট করে একমত হয়ে গিয়েছিল সেটি এইরকমঃ আমরা বাঙালি, বাঙালিদের নিন্দেমন্দ করার অধিকার একমাত্র আমাদেরই আছে। তুমি অবাঙালি হয়ে এর মধ্যে নাক গলাচ্ছ কেন?


সাইডবার্থের হাফপ্যান্ট-পরা লম্বাচওড়া ওই মানুষটি মুখ কুলকুচি করে তোয়ালে দিয়ে ঠোঁটের কোণা মুছতে মুছতে এসে বললেন, ‘বঙ্গাল থেকে বড়-বড় কারবারিদের অনেকেই চলে গেছে অন্য স্টেটে। কেন কি, এখানে কারবার আর আগের মতো হচ্ছে না। এখন যদি বড়বাজারের শেঠরাও চলে যায়, বঙ্গালির ইকোনমি একদম ভেঙে যাবে। এখন বঙ্গালিদের কী করা উচিত জানেন? ওদের উচিত বড়বাজারের শেঠদের মদত করা। না হলে বঙ্গালিদের হালত আরও খারাপ হয়ে যাবে। এখন বঙ্গালিদের উঠে দাঁড়াতে হলে বড়বাজারের শেঠদের সঙ্গে মিলেজুলে কাম করতে হবে।’


লম্বাচওড়া মানুষটির গলার স্বর ভারী, বলার মধ্যে আত্মবিশ্বাসের ভাবও ছিল খানিকটা; কিন্তু কথাগুলোর কোনওরকম সায় এলো না কুপের ছ’জন বাঙালির কাছ থেকে। উনি চোখ ঘোরালেন চারদিকে। সবারই চোখমুখ কেমন যেন থমথমে। উনি আবার কী যেন বলার মুখে জোর একটা গলাখাঁকারি ভেসে এলো ওদিক থেকে। গলা পরিষ্কার করে কণ্ঠস্বর একটু ওপরে তুলে বিজিত ওই অবাঙালিটির দিকে তাকিয়ে খানিকটা ধমক দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, ‘আপনি বাংলাদেশের ইতিহাসটাই জানেন না। আজ থেকে এক-দেড়শো বছর আগে বাংলায় অন্য রাজ্যের লোক কত ছিল বলুন তো? খুব কম। কিন্তু বাংলার অর্থনীতি তখনই খুব মজবুত ছিল। শুধু এখানেই নয়, আশেপাশের কয়েকটি রাজ্যের ওপরেও এই রাজ্যের প্রভাব-প্রতিপত্তি বেশ জোরদার ছিল। বেশ কয়েকটা খনি ছিল বাঙালিদের। তখন ভারতে ব্রিটিশ-রাজ। ব্রিটিশরা বাঙালিদের খুব পছন্দ করত। পছন্দ করত তাদের বুদ্ধির জন্যে, লেখাপড়া জানার জন্যে। তখন শুধু বাংলায় নয়, গোটা হিন্দুস্থানেই বাঙালিদের সবাই মানত। বড়-বড় ব্যবসা ছিল বাঙালিদের হাতে। আর লেখাপড়ায় তো জবাব ছিল না। ভারতের সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিল বাঙালিরা। বড়-বড় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, শিক্ষাবিদ, বড়-বড় চাকুরেদের বেশির ভাগই ছিল বাঙালি।’


এই ধরনের একটা ধাক্কা আসবে ওই ভদ্রলোকটি বোধহয় একেবারেই ভাবেননি। একটু থতমত খেয়ে গিয়ে বললেন, ‘হাঁ, সেটা ঠিক আছে, কিন্তু আমি এখনকার বঙ্গালিদের কথা বলছি।’


বিজিতের গলার স্বর আর একটু ওপরে উঠেছিল। ‘কোনও একটা জাতকে বিচার করতে গেলে তার পুরোটাই দেখা দরকার। মডার্ন ইন্ডিয়ার প্রথম মানুষটি কে বলুন তো? রাজা রামমোহন রায়—এ গ্রেট বেঙ্গলি। উনি না থাকলে দেশ থেকে সতীদাহ প্রথা কি দূর হত? হত না। মৃত স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত বউকে পুড়িয়ে মারার মতো বর্বর প্রথা আর কী হতে পারে! ধর্মের নামে মানুষ খুন করা হত। শাস্ত্রের দোহাই পাড়া হত। রামমোহন দেখিয়ে দিয়েছেন শাস্ত্রে এসব লেখা নেই। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ সাহেবদের বুঝিয়ে সতীদাহ প্রথা বন্ধ করেছিলেন।’


বোধহয় সিংহদুয়ার খুলে দিয়েছিলেন বিজিত। ওই খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে আস্ত একটা পাহাড় বানিয়ে ফেলেছিলেন এই কুপের বাকি পাঁচজন বাঙালি। ওই পাহাড়ের উঁচু শৃঙ্গগুলো হল বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু, চিত্তরঞ্জন দাশ, শহিদ ক্ষুদিরাম, বাঘা যতীন প্রমুখ।


সুকেশ ওই অবাঙালি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে প্রায় গর্জন করে ওঠার ভঙ্গিতে বললেন, “নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আর তাঁর আই.এন.এ. না থাকলে ভারতবর্ষ স্বাধীন হত না। ব্রিটিশরা দয়া করে আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে যায়নি। ট্রান্সফার অব পাওয়ার ইজ আ বিগ হোক্স। আপনি পিটার ফে-র ‘দ্য ফরগটেন আর্মি’ বইটা পড়লেই আসল ব্যাপারটা জানতে পারবেন।’’


সাইডবার্থের ওই ভদ্রলোকটি কিছু বলার চেষ্টা করেছিলেন কয়েকবার, কিন্তু ওদিকের ওই প্রবল তোড়ের মুখে ওঁর মুখের টুকরো-টুকরো শব্দগুলো ভেসে গিয়েছিল। উনি ওঁর মাথার টুপিটা খুলে ফেলেছেন। হাতের ছোট তোয়ালে দিয়ে মুখ-চোখ-ঘাড়-কপাল মুছলেন বেশ কয়েকবার। এবার সুকেশ থামতেই উনি কেমন যেন আর্ত স্বরে বলে উঠলেন, ‘আমরা বাঙালিরা আগে কী ছিলাম আর এখন কী হয়েছি! এসব ভাবলে মনে বড় দুঃখ হয়।’


কথাটা শুনে একই সঙ্গে সংশয় আর বিহ্বলতা ছড়িয়ে পড়েছিল এই কুপের ছয় বাঙালির মধ্যে। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পরে শ্রুতি সামান্য থেমে থেমে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার মনের দুঃখের কারণটা কী?’


‘বাহ্! হবে না! কী ছিলাম, আর কী হলাম!’


এদিকের সংশয় এখনও কাটেনি। নিচু গলায় প্রশ্ন করল, ‘কী ছিলেন আপনারা?’


‘আরে! আজব কথা! আপনারাই তো এতক্ষণ বলছিলেন আমরা বাঙালিরা আগে কী ছিলাম, আর এখন কী হয়েছি! সত্যি, আমরা বাঙালিরা আগে কত ইজ্জতদার ছিলাম! এখনকার হাল দেখুন, দেখলে মনে দুঃখ হয় না?’


ঢোক গিলল শ্রুতি। ‘আপনি কি বাঙালি?’


‘তব্! পুরা বাঙালি।’


‘কী নাম আপনার?’


‘আমার? প্রদীপ ব্যানার্জি।’


‘প্রদীপ ব্যানার্জি।’


‘জি হাঁ।’


কুপের এদিকের ছ’জনের চেহারা এখন আবার আগের মতো ঝলমলে। সমরেন্দ্র একটু হেসে নিয়ে বললেন, ‘আপনার কথা শুনে বুঝতে পারিনি আপনি বাঙালি! অবশ্য আপনি বেশ ভালো বাংলা বলেন।’


প্রদীপ ব্যানার্জিও হাসলেন। ‘না, দাদা, আমার বাংলা একটু টুটাফুটা হয়ে গেছে। আমি লেখাপড়া হিন্দিতেই শিখেছি। তবে বাংলা বলি। আমার দাদা, পরদাদা বাংলা কিতাব পড়ত, লিখত। এখনও আমরা সবাই বাড়িতে বাংলায় কথা বলে থাকি।’


‘কোথায় বাড়ি আপনাদের?’


‘বেনারস।’


‘অনেকদিন আছেন?’


‘হাঁ দাদা, চার জেনারেশন।’


কাছের মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুর ফুটে উঠেছিল সমরেন্দ্রর গলায়। ‘চার জেনারেশন! তার মানে তো অনেক দিন। বেনারসে যাওয়ার আগে কোথায় ছিলেন আপনারা?’


‘নদিয়া। পরদাদা মন্দিরের কাজ নিয়ে চলে এসেছিলেন বেনারস। তারপরের জেনারেশন থেকে আমরা কারবারে চলে এসেছি। আমি তো কারবারের কাজেই মুম্বই গিয়েছিলাম। এখন যাচ্ছি কলকাত্তায়, তারপর জামশেদপুরের একটা কাজ সেরে বেনারসে ফিরব।’


তারিফ করার গলায় বিজিত বললেন, ‘ব্যবসার কাজে আপনাকে তাহলে খুব ছোটাছুটি করতে হয়—তাই না?’


‘না দাদা, আমি খুব বেশি যাই না। ইন্ডিয়ার কয়েকটা সিটিতে আমাদের মাল বেশি যায়, সেখানে আমাদের সার্ভিস সেন্টার আছে। ক্লায়েন্ট কমপ্লেন করলে সার্ভিস সেন্টারের লোকরা যায়। আমাদের রেগুলার ক্লায়েন্টদের কেউ কমপ্লেন করলে আমি সার্ভিস সেন্টারকে দায়িত্ব দিই না, নিজে যাই। একটু বাড়তি মেহনত হয় আমার, কিন্তু পুরানা ক্লায়েন্টরা খুশি হয়।’


কথাটা শুনে হো-হো করে হেসে উঠে সমরেন্দ্র বললেন, ‘তাহলে আপনি বাঙালি নন, বাঙালিরা এত খাটাখাটুনি করে না। শুনেছেন বোধহয়, একটু আগে এই এক্সপ্রেস ট্রেনের পুরনো এক বাঙালি কেটারারের গল্প বলছিলাম—। ওই বাঙালিটি কারবারের দায় এক ঠিকাদারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নিজে ফুর্তি করে বেড়াত। তার ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছিল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অত বড় কাজটা বাঙালি ব্যবসায়ীর হাত থেকে বেরিয়ে যায়।’


প্রদীপ ব্যানার্জির মুখে একটু দুঃখের ছাপ ফুটে আবার। ‘এই জন্যেই তো বলছিলাম আমরা বাঙালিরা কোথায় ছিলাম, আর এখন কোথায় আছি! পাঁচটা লোক যখন আমাদের নিয়ে মজা করে উলটাসিধা কথা বলে তখন মনে বড় দুঃখ হয়।’


ট্রেনের এই কুপে আর সাইডবার্থ মিলে এখন ছয়ের জায়গায় সাতজন বাঙালি। হালের বাঙালিদের অধঃপতন দেখে এই সাত বাঙালিই দুঃখে খানিকটা কাতর হয়ে পড়েছিল। কী ছিল বাঙালিরা! প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের কী সুনাম ছিল। গুণগত শিক্ষাদীক্ষা, অর্থ, প্রতিপত্তি কোনওটাই কম ছিল না। দেশকে নেতৃত্ব দিত নানা ক্ষেত্রে। আর এখন?


ট্রেন বেশ জোরে ছুটে চলেছিল, কিন্তু খুব একটা ঝাঁকুনি উঠছিল না। ট্রেনের নীলচে কাচ দিয়ে সকালের চমৎকার আলো ছড়িয়ে পড়েছিল কামরার মধ্যে। এমন সকালে বুঝি কথা বলতে একটু বেশি ভালো লাগে। সাত বাঙালিই গল্প জুড়েছিল। গল্পের একটাই বিষয়—তা হল আজকের বাঙালির দশা। কী ছিল আর কী হয়েছে! গুণগুলো সব গেছে, আর দোষগুলো বেড়ে উঠেছে বহু গুণ। এমন পরশ্রীকাতর, কলহপরায়ণ, অলস, নিন্দুক জাত আর কোথায় আছে? প্রবল উৎসাহে বাঙালির কাটাছেঁড়া শুরু করে দিয়েছিল সাত বাঙালি।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page