top of page
Search

চলো যাই ভূতের বাড়ি

 গৌতম মুখোপাধ্যায়, তপন বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণাঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়




দাওয়াইপানির আত্মা - গৌতম মুখোপাধ্যায়

দার্জিলিং এর ছোট পাহাড়ি জনপদ দাওয়াইপানি। প্রধান সড়ক থেকে ঘণ্টা দুই বন্ধুর চড়াই-উতরাই পথ পার হয়ে চল্লিশটা মতো পাথরের ছোট ছোট সিঁড়ি বেয়ে দাওয়াই পানি পৌঁছাতে হয়। পাহাড়ের ঢালে ছোট ছোট কাঠের বাড়ি। সর্বসাকুল্যে গোটা কুড়ি পরিবার বসবাস করে। এরই মধ্যে গোটা ছয়েক বাড়ি সামান্য একটু সাজিয়ে গুছিয়ে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রত্যেকটা বাড়ি থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা পরিষ্কার দৃশ্যমান। আকাশ পরিষ্কার থাকলে রাতের দার্জিলিং শহরকে মায়াবি রূপকথার শহর বলে মনে হয়। পাইনের জঙ্গলে ঘেরা গোটা জনপদ। আদ্যিকালের অভিভাবকের মতো পাইনের সারি এক রহস্যময় পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে। রাতে চাঁদের আলো প্রবেশ করা তো দূরের কথা, দিনে সূর্যের আলোও পাইনের জঙ্গলে প্রবেশের অধিকার পায় না। অনবরত ঝিঁঝির ডাক মাথায় ঝিম ধরিয়ে দেয়। সুসজ্জিত কাঠের ঘরের বারান্দায় বসে নাম-না-জানা অগণিত পাখিদের কিচির-মিচির শান্ত পরিবেশকে মাতিয়ে রাখে। সারা বছরই উত্তরের হিমেল হাওয়ায় ছোট্ট জনপদ ঠাণ্ডার মোড়কে আচ্ছাদিত হয়ে থাকে, শীতে ঠাণ্ডা বাতাস হাড়ে পর্যন্ত কাঁপন ধরিয়ে দেয়।

নেট দুনিয়ায় অগাধ স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ মৈনাকের। সেখান থেকেই ভাইরাল হয়ে যাওয়া এই ছোট্ট জনপদের সন্ধান পায় মৈনাক। ভাইরাল হওয়ার আগে পর্যন্ত এই ছোট্ট জনপদ নিজ অস্তিত্বকে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু কুমারীকে কোমার্য শহুরে মানুষের আগ্রাসী মনভাবের নিকট নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় অচিরেই, তবুও দুর্গম পথ হওয়ায় কুমারীর কৌমার্য অতটা কালিমালিপ্ত হয়ে ওঠেনি। লাজুক স্বভাবী গহীন পাইনের জঙ্গলে আপন মনে নিজেকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে রেখেছিল দাওয়াইপানি।

মৈনাকের নেতৃত্বে সতেরো জনের দল যখন দাওয়াইপানি পৌঁছায়, তখনও সূর্যের নরম আলো পাইনের জঙ্গলে আটকে আছে। কিষানজীরা দু’জনে নিজেদের মধ্যে কিছু একটা আলোচনা করবে বলে দলের অভিজ্ঞ সদস্য দেবদাসবাবুকে বলে- দাদা এটাই দাওয়াইপানি, এখানিই আপনাদের নামতে হবে।

গাড়ির ভিতর বসেই তুয়া বলে- মানে? এই জনমানবহীন প্রান্তরে আমাদের থাকতে হবে? অসম্ভব! আমি নামছি না।

কিষানজী গাড়ি থামাতেই মৈনাক গাড়ি থেকে নেমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মুহুর্তেই তুয়ার কথাটা কানে আসে।

বলে- নেমে দ্যাখ, চোখ জুড়িয়ে যাবে। থাকিস তো ঘিঞ্জি এলাকায়? চিৎকার, গাড়ির আওয়াজে কান পাতা দায়। দুদণ্ড ভাবার অবকাশ পাস না। জীবনটাই ওষ্ঠাগত হয়ে পড়ে। জীবনটাকে নিয়ে আমাদের ভাবার দরকার আছে- আর সেই জন্যই এখানে আসা। বুঝলি?



গাড়ির ভিতরে বসা শ্বেতা তুয়ার কানের কাছে মুখটা এনে বলে- দেখলি? ও কেমন জ্ঞান দিতে শুরু করল? আসলে জ্ঞান দেবার তো লোক পায় না, কি করবে বেচারা? তাই আমাদেরই জ্ঞান দিয়ে দিল। এরকম লোক পাবে কোথায়।

ইত্যাবসরে দেবদাসবাবু চারপাশটা ঘুরে এসে প্রথম গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে থাকে- নামো সবাই। ওই যে দেখছ ওপরের কটেজগুলো- ওখানেই উঠতে হবে। যে যার লাগেজ নিয়ে উঠতে শুরু কর। আর যারা পারবে না- ওখানেই রেখে দাও। ওদের লোক এসে তুলে দেবে।

দেবদাসবাবুর চিৎকারে বেশ হোমরা-চোমরা দুটো লোক ওপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসে। এদের মধ্যে একজন দেবদাসবাবুর দিকে এগিয়ে এসে বলে- আপনারা চলুন। আমরা সব লাগেজগুলো নিয়ে যাচ্ছি। সাবধানে উঠবেন কিন্তু। একদম খাড়াই সিঁড়ি। সবার আগে সাত বছরের রিভু উঠতে শুরু করে। বড়রা পিছন থেকে সমবেতভাবে চিৎকার করে বলে ওঠে- ওরে দাঁড়া! পড়ে যাবি! ওইভাবে কেউ ওঠে না। সমবেত আপনজনের কথায় কর্ণপাত না করে রিভু একাই উঠতে থাকে। সবার আগে ওপরে ওঠাটাই তার কাছে বেশি আনন্দের। আপনজনের আতঙ্কিত চিৎকার তার কাছে গুরুত্ব পায় না। রিভু কারোর কথা শুনছে না দেখে দেবদাসবাবু বয়সের শিথিলতাকে হার মানিয়ে রিভুর পিছু পিছু প্রায় একপ্রকার দৌড়ে উঠতে থাকে। পনেরোটা সিঁড়ির পর সামান্য একটু চাতালে পৌঁছে পিছন ফিরে বলতে থাকে- তোমরা সবাই আস্তে আস্তে এস। আমি ওকে নিয়ে ওপরে উঠছি। খুব সাবধানে। হাঁকপাক করবে না। তাড়াহুড়োর কিছুই নেই।

রিভুর মা নিচে থেকে বলে ওঠে- ঠিক আছে দেবুদা। আপনি ওকে লক্ষ্য রাখুন- আমরা ঠিক উঠছি। আমাদের নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না।

অবশেষে সবাই পাহাড়ের ওপরে ছোট্ট কটেজে উপস্থিত হয়। কটেজের সামনে একফালি খোলা জায়গায় সারি সারি পাতা চেয়ার সবাই বসে। অষ্টাদশী ঝিলিক বলে- বাব্বা! গাড়িতে আসতে আসতে কোমর একেবারে বেঁকে গিয়েছিল, এখন একটু হাত-পা ছড়িয়ে বসা যাবে। হাত দুটো মাথার ওপর তুলে আড়মোড়া ভেঙে নেয়।

ঝিলিকের পাশে বসা তুয়া বলে ওঠে- তুই যেভাবে আড়মোড়া ভাঙছিস, মনে হচ্ছে কুস্তি করে ফিরলি? ঝিলিক কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কটেজ মালিক এসে পড়ায় ঝিলিকের আর কিছু বলা হয় না। দেবদাসবাবুর সামনে দাঁড়িয়ে কটেজ মালিক জিজ্ঞাসা করে- দাদা চা, না কফি? কোনটা দেব?

চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ছিল প্রতাপ, চা-কফির নাম শুনে আবার চেয়ারে বসে পড়ে। প্রতাপও এটা মনে মনে ভাবছিল, কিন্তু বলার সাহস পাচ্ছিল না। কটেজ মালিকের কথাটা শুনে প্রতাপ হঠাৎ বলে ওঠে- আমার দু’কাপ কফি চাই। যা ঠাণ্ডা!

দেবদাসবাবু কটমট করে প্রতাপের দিকে তাকাতে প্রতাপ লজ্জায় পড়ে মাথা নিচু করে নেয়।

মিনিট দশেকের মধ্যে ছোট্ট দুজনকে বাদ দিয়ে প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত এক কাপ করে কফি নিয়ে কটেজ মালিক উপস্থিত হয়।

– নিন দাদা। এক্সট্রা লাগলে বলবেন? আর যদি কেউ চা খান, তাও হবে।

- না, না, চা লাগবে না। কফিটাই ঠিক আছে। মৈনাক মন্তব্য করে।

কফি কাপ হাতে নিয়ে দেবদাসবাবু বলেন

- দুপুরে কে কী খাবে একটা লিস্ট বানিয়ে ফেল মৈনাক। ওরা একটু পরে নিতে আসবে।

- টেকপুরে যা মেনু ছিল, এখানে ওটাই থাকবে না? আশা করি করোর কিছু অসুবিধা হবে না।

- তবু সবাইকে একবার জিজ্ঞাসা করা কি ভাল নয়?

দেবদাসবাবুর প্রশ্নের জবাবে মৈনাক বলে- ঠিক আছে, তাই হবে। আমি সবাইকে জিজ্ঞাসা করে ওনাকে জানিয়ে দিয়ে আসছি।

- আমি কিন্তু দুপুরে খাবার পর একটু শোব, সকাল থেকে যা জার্নি চলছে। একটু রেস্ট না নিলে শরীর আর চলবে না। ঝিলিক বলে।

- ঘুম তো সারাজীবন আছে। বেড়াতে এসে কেউ ঘুমোয়? তুয়া ফোড়ন কাটে।

- আমার প্রবলেমটা আমি বললাম, এতে অন্যের অসুবিধা কোথায় বুঝতে পারলাম না।

- ঠিক আছে। এত তর্কে যাবার কোনও কারণ নেই। যার ইচ্ছা- সে যাবে, আর যার ভাল লাগবে না, তাকে যেতে হবে না। মৈনাক বলে।

আরও কিছুক্ষণ হয়ত আলোচনা চলত, যদি না কটেজ মালিক উপস্থিত হত।

- দাদা এই ফোটাটা দেখুন। কটেজ মালিক মোবাইলে একটা ছবি দেখায়। কাউকে ডাকতে হয় না, সবাই হুড়মুড় করে মোবাইলের ওপর প্রায় একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ে। সমবেত স্বরে উচ্চারিত হয়- দেখি কি?

কটেজ মালিক মোবাইলের স্ক্রিনটা বড় করে সবাইকে দেখায়। দেখা যায় দুটো চিতাবাঘ গায়ে গা ঠেকিয়ে রোদে শুয়ে আছে।

- এটা কোথায়? মৈনাক জিজ্ঞাসা করে, এখান থেকে কত দূরে?

- দূরে মানে! এই যে সামনে দেখছেন- ওইখানে।

বিস্ফারিত চোখে কটেজ মালিকের দেখানো লনের দিকে চেয়ে থাকে মৈনাক।

- দাদা এটা কতদিন আগে?

- কতদিন মানে? এই তো দিন দশেক আগে। কটেজটা তৈরির সময় স্থানীয়দের মুখে শুনেছিলাম যে, এখানে মাঝে মাঝে দিনদুপুরে চিতাবাঘ বেরোয়, প্রথমে বিশ্বাস করিনি- পরে যখন নিজের চোখে দেখলাম- তখন আর কি বলার থাকতে পারে!

- আপনি খুব ভাগ্যবান দাদা! দেবদাসবাবুর প্রশংসনীয় উক্তি।

- তা যা বলেছেন! ভাগ্যবান বলে!

- আমাদের ভাগ্য হলে আমরাও দেখতে পাব- ঝিলিক বলে।

- তার জন্য আমাদের ফায়ার ক্যাম্প করতে হবে। তুয়া বলে।

- ফায়ার ক্যাম্প হতেই পারে- তার সব ব্যবস্থা আমি করে দেব। সেদিকে কোনও অসুবিধা নেই, কিন্তু...

- কিন্তু আবার কী? এক্সট্রা যা লাগবে আমরা দিয়ে দেব। ওটা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি ক্যাম্প ফায়ারের ব্যবস্থা করুন। দেবদাসবাবুর কথায় উৎসাহের জোয়ার বয়ে যায়।

কেবল সন্ধ্যা নামার অপেক্ষা- ব্যাস- কটেজগুলো ফাঁকা করে সবাই উপস্থিত সামনের লনে। কটেজ মালিক আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন, তাই উদ্বোধনটা তাড়াতাড়িই হয়ে গেল। গরম কফি সঙ্গে চিকেন তন্দুরি- লা জবাব! কাচের প্লেটে হাত বোলাতে বোলাতে দেবদাসবাবু বললেন- হ্যাঁ রে চার কেজি চিকেন এরই মধ্যে সাবাড়! তোদের পেটে সব কী আছে রে? চিবিয়ে খেয়েছিস তো সবাই? গিলিস নি তো?

- আর কেজি খানেক থাকলে ভাল হত? মনটা কেমন খুঁত খুঁত করছে। প্রতাপ প্লেটে পড়ে থাকা গুঁড়ো খেতে খেতে বলে।

- পেটটা খালি রাখ। রাতেও খেতে হবে। এটা তোর কলকাতা নয় যে রাত এগারোটায় খাবি? এখানে নটার মধ্যে খাবার খেতে হবে। সেদিকটা খেয়াল রাখিস। দেবদাসবাবুর অভিভাবকসুলভ উক্তি।

- ঠান্ডা ক্রমশ বাড়ছে। সবাই কটেজে চল। দুটো কটেজে চাবি দিয়ে বাকিটায় বসে সবাই মিলে গুলতানি করা যাবে। আবার সবার সঙ্গে কবে দেখা হবে? এই সুযোগটা মিস না করাই ভাল।

মোবাইলটা বের করে তাপমাত্রা দেখে নিয়ে তুয়া বলে- এখন চার ডিগ্রি, রাতে আরও নামবে।

কটেজগুলোর তিনদিকের দেয়ালগুলো কাঠের, সামনের দিকের দেওয়ালগুলো কাচের। কটেজে বসে যাতে সকালের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। মানুষ কত সুখ চায়!

কফি-তন্দুরির শ্রাদ্ধ করে সান্ধ্য আড্ডা ভালই জমে উঠেছে। সংসারের গল্প থেকে শুরু করে রাজনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা কোনওকিছুই আলোচনা থেকে বাদ যায় না। ফটাস-ফটাস গুড়ুম-গুড়ুম রাত্রির নিস্তব্ধতাকে মুহূর্তে খানখান করে দেয়।

- কিসের আওয়াজ? আতঙ্কিত প্রতাপ বলে।

- মনে হয় বাঘ বেরিয়েছে, তাই বাজি-পটকা ফাটাচ্ছে।

- বাঘ! ওরে বাব্বা রে! মেঝেতে বসে থাকা মৈনাক কম্বলটা নিয়ে এক লাফে বিছানায়। এবারের রিভুর মায়ের কোলে। সমস্ত কটেজে হাসির শোরগোল ভরে ওঠে।

কাচের জানলার দিকে মুখ করে বসেছিল ঝিলিক। হঠাৎই তার চোখ পড়ে কাচের জানলার ওপাড়ে সাদা পোশাক পরিহিত কেউ একজন ঘুরে বেড়াচ্ছে...

- কে? কে? ওখানে কে? ঝিলিক চেঁচিয়ে ওঠে।

- কে মানে? কোথায় কে? তুয়া জিজ্ঞাসা করে।

- ওই যে! আঙুল দিয়ে কাচের জানলার দিকটা দেখায় ঝিলিক।

- কই? কাউকে দেখতে পাচ্ছি না তো! দ্যাখ তোর চোখের ভুল। তুয়া বলে।

- মোটেই ভুল নয়, আমি স্পষ্ট দেখেছি! মিথ্যে বলে আমার কি লাভ?

- তা অবশ্য ঠিক। খামোকাও মিথ্যে বলতে যাবে কেন? প্রতাপ খাটের নিচে থেকে ফোড়ন কাটে।

- প্রতাপের অবস্থা দেখ। পুরুষ মানুষ কাকে বলে! কোথায় আমাদের সাহস জোগাবে তা নয়, নিজেই খাটের নিচে লুকিয়ে পড়েছে। ছিঃ ছিঃ।

মাথায়-গায়ে কম্বলে ঝুল মেখে খাটের নিচে থেকে প্রতাপ বেরিয়ে এসে দেবদাসবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে বলে- আমি ভীতু? কাপুরুষ? কী করতে হবে আমার বল?

কটেজের ভিতরে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। বাচ্চা দুটো কাঁদতে থাকে। চিৎকার-হুল্লোড়ের আওয়াজ শুনে কটেজ মালিক ও তার দুই সাগরেদ দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসে। কটেজের দরজা ভেজানোই ছিল, এক ঠেলাতেই খুলে যায়।

- কী হয়েছে দাদা? কী হয়েছে? কী সমস্যা? কটেজ মালিক প্রশ্ন করে চলে।

- কে একজন বারান্দায় ঘোরাফেরা করছিল। গোটা শরীরটা সাদা পোশাকে ঢাকা, কাচের পাল্লায় হাত বুলিয়ে চলছিল। আমরা চিৎকার করলে দৌড়ে পালিয়ে যায়। দেবদাসবাবু অভিভাবকসুলভ বোঝানোর দক্ষতা।

- কি বলছেন? আমরা তিনজন তো নিচে বসে আগুন পুঁইছি, কেউ তো এদিকে আসেনি! আর এলেও আমাদের সামনে দিয়ে তাকে ওপরে উঠতে হবে। তাহলে! কটেজ মালিক মাথা চুলকাতে থাকে। আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না! এত বৎসর কটেজ চালাচ্ছি কেউ তো এরকম রিপোর্ট করেনি। একটু দম নিয়ে পুনরায় বলে- ঠিক আছে দাদা? কোনও ভয় নেই, আপনারা নিশ্চিন্তে ঘুমোন, আমরা সারারাত পাহারা দিচ্ছি। আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন। আমরা আছি। বড় চার্জার নিয়ে কটেজের চারপাশে পাক দিয়ে কটেজ মালিক বলে, কই? না তো! তেমন কিছু চোখে পড়ল না, একটু থেমে পুনরায় কটেজ মালিক বলে, চোখে পড়ল না মানে এই নয় যে আমরা দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছি। আজ আমরা সারারাত জেগে থাকব- আপনারা নিশ্চিন্তে ঘুমোন।

মৈনাক উৎসুক করছিল কিছু বলার জন্য, কিন্তু তার আগেই দেবদাসবাবু বলে ওঠেন, এরপর তো আর কোনও কথাই চলে না। ঠিক আছে দাদা, আপনারা আসুন। যদি প্রয়োজন হয় ডেকে নেব।

সবাই ঘুমিয়ে পড়লেও মৈনাকের চোখে ঘুম আসে না। নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করে- এত জন ভুল দেখবে! অসম্ভব! কিছু একটা আছে। আমার মন তো তেমন কথাই বলছে। কম্বল গায়ে এপাশ-ওপাশ করে সময় অতিক্রান্ত হয়- তবুও ঘুমাতে পারে না মৈনাক।

- ঠিকই দেখছেন। আমি আপনাদের পাশেই আছি। আমি এখানেই থাকি, এখানেই থাকব। আমি কারুর কোনও ক্ষতি করিনি, আর করব না। আপনাদের কোনও ভয় নেই, আপনারা নিশ্চিন্তে থাকুন। আমি প্রতিদিনই আসি- কেউ দেখতে পায় না- কিন্তু আজ কেন কি জানি আমার সবাই দেখে ফেললাম- কেন যে এরকম হল আমি নিজেও বুঝতে পারিনি। আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন।



ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে মৈনাক। নিজের মনেই বলে- এটা আমি কি শুনলাম! এটা কি আমার মনের অচৈতন্য অবস্থা! না কি সত্যি! আমি কি আজগুবি কিছু ভাবছি! ঘুম না আসার ফলে কি এরকম চিন্তা হচ্ছে! প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমা হয় মৈনাকের মনে।

দেবদাসবাবু শোবার সময় বলেছিল- রাতে আলো নেভাতে হবে না, আলো জ্বললে ঘরটা গরম থাকবে। সবাই তো কম্বল মুড়ি দিয়ে শোবে- তাই আলো জ্বললেও কারোর কোনও অসুবিধা হবে না। আর একটা রাত্রি তো! সারাদিন যা পরিশ্রম হয়েছে এক ঘুমেই সকাল।

দেবাদাসবাবুর একটা বদ অভ্যাস আছে। রাতে একবার তাকে উঠতেই হয়, তা যত রাত্রিতেই ঘুমাক না কেন? তাই কিছুক্ষণ আগে সবাইকে উপদেশ দেবার পরই তার মনে পড়ে গিয়েছিল- সবাইকে তো বলালাম, নিজে পারব কি? তবুও দেখা যাক। ব্যতিক্রমও হতে পার!

গুরুদেবের নাম স্মরণ করে শুয়ে পড়ে দেবদাসবাবু। মনে মনে একটাই প্রার্থনা কর যেন রাতে ঘুম না ভাঙে। কিন্তু... অভ্যাসের ব্যাতিক্রম হয় না, ঘুম ভেঙে যায়। উঠে বসেই অবাক হন দেবদাসবাবু। দেখে মৈনাক কম্বল মুড়ি দিয়ে পাশের খাটে বসে! অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে- কি হল? ঘুম আসছে না?

- না।

- শরীর খারাপ লাগছে?

- না, না। শরীর খারাপ লাগবে কেন? আসলে কিছু কথা শুনে ভয় পেয়ে গেছি।

- কি এমন কথা যে ভয় পেয়ে গেলে? এত রাত্রে তোমার সঙ্গে কে কথা বলতে এল? সবাই তো অকাতরে ঘুমোচ্ছে। তাহলে কে কথা বলল? কি যা তা বকছ?

- যা তা কিছুই বকছি না- শুনেছি বলেই বলছি।

- কি শুনেছ? কম্বলটা গায়ে দিয়ে মৈনাকের কাছে আসে দেবদাসবাবু। খাটে বসেই মৈনাক ইতিপূর্বে যা শুনেছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেবদাসবাবুকে শোনান।

- অ্যাঁ! বল কি! মৈনাকের খাটে ধপাস করে বসে পড়ে দেবদাসবাবু।

- আপনি তো বাইরে যাবেন বলছিলেন না? চলুন আমিও যাব।

- যাবার জন্যই তো উঠে বসলাম- কিন্তু এখন ভাবছি আর যাব না।

- আরে চলুন- কোনও ভয় নেই জ্যোৎস্না রাতে পাহাড়ি প্রকৃতির অপরূপ রূপ দেখে আসবেন চলুন। শহরের রাত তো দেখেছেন- এবার পাহাড়ি রাত দেখবেন চলুন?

- ভাই তোমার যদি এই কনকনে ঠাণ্ডা রাতে কাব্য করারই ইচ্ছা থাকে তবে করবে, আমি শুতে চললাম। আগে শরীর, পরে কাব্য।

- ঠিক আছে। আপনি ঘুমোন। আমি কটেজের বারান্দায় একটু দাঁড়াই। আর তাছাড়া ভয় কিসের! নিচে তো ওরা জেগে আছে।

- মৈনাক সাহস ভাল, কিন্তু দুঃসাহসটা মোটেই ভাল নয়, আমার মনে হয় তোমার এখন বাইরে না যাওয়াই ভাল।

- আপনি কোনও চিন্তা করবেন না। ঘণ্টাখানের মধ্যেই ফিরে আসব। আপনি একটু জেগে থাকলেই হল। ব্যাস।

- বাইরে থেকে দরজাটা দিয়ে যেও। খাটে বসেই কথাগুলো বলে দেবদাসবাবু। পর্দা সরিয়ে দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে পড়ে মৈনাক। এক ঝাঁক ঠাণ্ডা বাতাসকে ঘরে ঢুকিয়ে দেয়।

- বারান্দার রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে সবে মাত্র দাঁড়িয়েছে মৈনাক এমন সময়- যাবেন, তবে আসুন।

একটা সাদা কাপড় উড়তে উড়তে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো মৈনাক তার পিছু পিছু নামতে থাকে। কটেজের লন পার হয়ে কটেজের ডান দিকে ছোট্ট একটা টিলার ওপর সাদা কাপড়টা ঘসতে ঘসতে ওপরে উঠতে থাকে- মৈনাক টিলার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ওপরে ওঠার কোনও উপায় খুঁজে পায় না। টিলার ওপরে উঠতে থাকা কাপড়ের দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে।

- দেখুন আপনার ঠিক বাম পাশে একটা পাথর পড়ে আছে- ওটাতে বসুন। কোনও ভয় নেই। আপনার কোনও ক্ষতি হবে না।

- বায়ুবাহিত কথার নির্দেশ মতো মৈনাক বামপাশের পাথরে বসে।

- এবার দেখুন, আপনার ঠিক সামনে একটা পাথর পড়ে আছে, ওটার গায়ে হাত দিয়ে দেখুন পাথরটা গরম। আমি ওই পাথরের নিচেই থাকি। আপনাদের মতো অতিথিরা যখন আসেন- তখন আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারি না, মনে হয় আনন্দ করি- খেলে বেড়াই- কিন্তু আমি তো আত্মা- তাই আপনাদের মতো মানুষের সঙ্গে মেশার ক্ষমতা আমার নেই। তবুও মাঝে মাঝে বেরিয়ে আসি- আজ যেমন আপনাদের দেখে গেলাম। এতেই আমার আনন্দ, কাউকে ভয় দেখানোর ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু কি করে যে আজ আপনারা আমায় দেখে ফেললেন- সেটা বুঝতে পারছি না।

মনে নিয়ন্ত্রণ এনে মৈনাক জিজ্ঞাসা করে, তবে আপনার পরিচয় কি?

- আমার বয়স যখন চোদ্দ, বাবা-মায়ের সঙ্গে বেড়াতে এসেছিলাম দার্জিলিং। দু’দিন থাকার পর আমাদের এক সঙ্গী বলল যে, চলুন কাছেই একটা সুন্দর স্পট আছে, এখনও সেভাবে প্রচার লাভ করেনি, ট্যুরিস্টদের আনাগোনাও খুব কম। ছোট্ট পাহাড়ি জনপদ দাওয়াইপানি- সুন্দর জায়গা- কয়েকদিন সেখানে কাটালে দেখবেন মন একেবারে চাঙ্গা। ওনার কথা মতো পরের দিনই আমরা সবাই দাওয়াইপানি পৌঁছালাম। সত্যি দারুণ জায়গা! এই একমাত্র কটেজ ছাড়া চারিদিক পাইনের জঙ্গলে ঢাকা। ঝরনার আওয়াজ আর পাখিদের ডাক ছাড়া কিছুই কানে আসছে না। দুপুরে খাবার পর সবাই একটু বিশ্রাম নিতে ব্যস্ত, তখন আমি বাবা-মায়ের অগোচরে কটেজ থেকে বেরিয়ে ঘুরতে যাই। একা-একাই ঘুরছিলাম, কিন্তু কখন যে বনমোরগটাকে তাড়া করতে গিয়ে ওই যে দূরে টিলাটা দেখছেন ওর একেবারে কিনারে চলে এসেছি বুঝতে পারিনি- পা দুটো পিছলে গেল আর কিছু মনে নেই।

- তার মানে আপনার আত্মা মুক্তি পায়নি? এইভাবে আপনি পাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকবেন? আমি কি আপনার কোনও মুক্তির ব্যবস্থা করতে পারি?

- একটা গরম নিঃশ্বাস মৈনাকের ওপর এসে পড়ে।

- ভয় পাবেন না। আপনার সামনেই আমি দাঁড়িয়ে- আপনাকে একটাই অনুরোধ আপনি চোখ খুলবেন না। আর আমার মুক্তি? কয়েক মুহূর্ত নিঃস্তব্ধ থাকার পর পুনরায় ধ্বনিত হয়- এই পৃথিবীতে আজই আমার শেষ রাত্রি। বারো বছরের অভিশাপ থেকে আজ মুক্ত হলাম। এত বছর ধরে আমি অশরীরি হয়ে এখানে আছি। কেউ আমায় দেখতে পায়নি, আজ আমার শেষদিন বলেই হয়ত আপনারা আমায় দেখতে পেয়ে গেলেন, এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন।

একটা চাপা কান্নার আওয়াজ শ্রুতিগোচর হয় মৈনাকের। চোখ বুজে নির্বাক জড়থুষ্টের মতো বসে থাকে মৈনাক।

এদিকে অনেকক্ষণ হয়ে গেছে কিন্তু মৈনাক কটেজে আসছে না দেখে দেবদাসবাবু, প্রতাপ ও তুয়াকে সঙ্গে করে নিচে নেমে আসে। সিঁড়িতে পায়ের আওয়াজে কটেজ মালিক বাইরের সব আলো জ্বেলে দেয়- ছোট একটা পিস্তল হাতে কটেজ থেকে বেরিয়ে আসে।– কী ব্যাপার? কী হয়েছে? প্রশ্নে একরাশ উৎকণ্ঠা।

দেবদাসবাবুই সবার পূর্বে বলে- না- আসলে আমাদের একজন সঙ্গী অনেকক্ষণ আগে বাইরে বেরিয়েছে- এখনও ফেরেনি-তাই...

- তার মানে! এত রাতে একা বেরিয়েছে! উঃ! কটেজ মালিক মাথা ঝাঁকায়। আপনারা একা তাকে ছেড়ে দিলেন! এখন কি করি আমি?

- আরে ওই তো মৈনাক বসে! ওই তো পাথরের ওপর! প্রতাপ চেঁচিয়ে ওঠে। - উপস্থিত সবাই এক দৌড়ে মৈনাকের কাছে পৌঁছায়। দেবদাসবাবু মৈনাকের হাত ধরে একটা হ্যাঁচকা টান দেয়- কী হয়েছে? এই ঠাণ্ডায় এখানে বসে আছ যে?

অবাক বিস্ময়ে মৈনাক দেবদাসবাবুর মুখের দিকে চেয়ে থাকে।


এলেভূতের সন্ধানে- তপন বন্দ্যোপাধ্যায়

নতুন খড় দিয়ে মরাই ছাইতে ছাইতে গল্পটা শুনিয়েছিল পঞ্চু ঘরামি৷ এলেভুূতের গল্প৷ এলেভূত যে কী জিনিস তখনও জানতাম না৷ কিন্তু পঞ্চু ঘরামির গল্প বলার ধরন এমনই যে ভূতপ্রেত সব জ্যান্ত হয়ে ঘোরে চোখের সামনে৷ শিরশির করে ওঠে গা–হাত–পা–শরীর৷

এখন ঘোর শীতকাল৷ ‘পোষের শীত মোষের গায়/ মাঘের শীত বাঘের গায়’ এরকম একটা প্রবচন আমাদের প্রায়ই বলতেন ঠাকমা৷ এখন পৌষের শেষে সেই শীত কাঁপ ধরিয়ে দিচ্ছে দুশো বত্রিশখানা হাড়ে৷ তার মধ্যে একটু আগেই এই সাতসকালে দু–গেলাস নলেন রসে পাটকাঠি ডুবিয়ে চোঁ চোঁ করে সাবাড় করেছি৷ তাতে শীতের দাঁত আরও ধারালো আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ফোটাচ্ছে সারা গায়ে৷ একটা ছোটমোটো শাল জড়িয়ে রেহাই পেতে চাইছি শীত থেকে৷ শালে কুলোচ্ছে না বলে বইখাতা ফেলে ছুটেছি পুকুলপাড়ে রোদ পোহাতে৷ পুকুরের চারপাশে নতুন চামরমণি ধানের গোছ ডাঁই হয়ে জমে আছে ক’দিন ধরে৷ একপাশে ঝাড়াই মাড়াই হচ্ছে সেই ধানের গোছ৷ তার খড় টাল হয়ে জমা হচ্ছে খামারের পাশে৷ আর সোনালি ধান মাথায় মাথায় চলে যাচ্ছে মরাইতে৷

পুকুরের চারপাশে তাই নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধ৷ সেই গন্ধের ওম নাকের লতিতে নিয়ে বসে পড়ি একগলা রোদের মধ্যে৷ মরাইয়ের ধার ঘেঁসে৷ নতুন মরাইটা বেশ বড়সড় করে বাঁধা হচ্ছে এবার৷ সেখানে পঞ্চু ঘরামি মরাইয়ের উপর বসে, আার নীচে থেকে নতুন খড় জোগান দিচ্ছে তার ছেলে ফড়িং৷

তার মধ্যেই আবার ভূতের গল্প তাতে তো শরীরের কাঁপ আরও বেড়ে যাওয়ার কথা৷ কিন্তু তা হল না পঞ্চু ঘরামির গল্প বলার ভঙ্গিতে৷ বরং রক্ত আরও চলকে ওঠে, গায়ের লোম খাড়া হয়৷

পঞ্চু ঘরামি এ তল্লাটের নামকরা ঘরামি৷ তার চেহারাটা যেমন দশাসই, তেমনি তার হাতের বাইসেপ৷ তার বুকটাই শুধু বিয়াল্লিশ ইঞ্চি৷ তার জন্যে পঞ্চু ঘরামিকে কখনও ডনবৈঠক দিতে হয়নি বা বার্বেল ভাঁজতে হয়নি৷ হাতে–পায়ের বেশ কিছু শিরা নারকেলের দড়ির মতো পাকিয়ে রয়েছে যা অনেক দূর থেকেই দৃশ্যমান৷



পঞ্চু ঘরামি সম্পর্কে নানা গল্প লোকমুখে প্রচারিত, তার মধ্যে একটা হল গাঁয়ে ডাকাত পড়া ও একচড়ে ডাকাত সর্দারের পঞ্চত্বপ্রাপ্তি৷ সেবার চারপাশে হইচই ফেলে ডাকাতরা যে–বাড়িতে ঢুকছে, লুটপাট করে নিঃস্ব করে দিচ্ছে মনের সুখে৷ তাদের বাধা দেবে তেমন পুরুষমানুষ কই গাঁয়ে৷ এক পঞ্চু ঘরামি আছে কিন্তু সে তো ঘুমিয়ে পাহাড়৷ পঞ্চু ঘরামি রাতে ঘুমোলে নাকি কেটে ফেললেও উঠতে পারে না৷ ডাকাত পড়ায় সেবার কীভাবে যেন তার কানের মধ্যে জল ঢ়েলে ডেকে তোলে গাঁয়ের মানুষ৷ পঞ্চু ঘরামির গায়ের জোর কত সে–গল্প পাঁচগাঁয়ের মানুষ জানে, জানে ডাকাতরাও৷ কিন্তু লোকে এও জানে তার কুম্ভকর্ণপ্রতিম ঘুমের গল্পও৷ ডাকাতরাও সেই কাহিনি সম্পর্কে সচেতন বলেই এ গাঁয়ে ডাকাতি করার সাহস পেয়েছে৷ কিন্তু তারা ভাবতে পারেনি পঞ্চু ঘরামি জেগে উঠবে মধ্যরাতে৷ পঞ্চু ঘরামি জেগে উঠে কিছুক্ষণ সময় নিল ব্যাপারটা বুঝতে৷ তারপর এক হুঙ্কার দিয়ে ছুটল সেই বাড়িটার দিকে যেখানে তখনও লুটপাট চলছে ঘোরতরভাবে৷ ডাকাতরা হঠাৎ ঘটনাস্থলে পঞ্চু ঘরামিকে আবির্ভূত হতে দেখে বেশ থতমত৷ নিজেদের মধ্যে কী যেন বলাবলি করে লুটপাটের মাল ফেলে ছুট লাগাল পড়িমরি করে৷ পঞ্চু ঘরামির চোখে তখনও কিছু ঘুম৷ নইলে ডাকাতদের ধরতে তার দু’মাইল ছুটতে লাগে শেষে ডাকাতদের সর্দারকেই জাপটে ধরতে পারল আর এমন একখানা থাপ্পড় লাগাল যে তাতেই স্বর্গলাভ হয়ে তার৷ তারপর থানা–পুলিশ হয়ে কী ছিরকুট্টি কাণ্ড

সেই গল্প আমাদের শোনাতে শোনাতে পঞ্চু ঘরামি হেসে বলে, সে সব কী দিনকাল ছেল, দা’ঠাকুর লোহা চিবিয়ে খেতে পারতাম৷

সেই পঞ্চু ঘরামির বয়স এখন কত হবে তা আর জিজ্ঞাসা করা হয়ে ওঠে না৷ কিন্তু এখনও তার চেহারা দেখে ডাকাত দল কেঁপে উঠবে নিশ্চিত৷

শুধু যে ডাকাত মারার গল্পই তার ঝুলিতে তা কিন্তু নয়৷ মাঝেমধ্যে কাজে বা অকাজে এসে কত যে গল্প শোনায় তার সীমাসংখ্যা নেই৷ কখনও শ্মশানকালিতলার মামদো ভূতের গল্প, কখনও সুন্দরবনে গিয়ে বাঘের মুখে পড়ার গল্প, কখনও কখনও বাজি ধরে এক ধামা নাড়ুএক আসনে বসে খাওয়ার গল্প, কখনও এক পাগলা ঘোড়ার পিঠে চড়ে বিপত্তির গল্প৷

সেই পঞ্চু ঘরামি আজ হঠাৎ মরাই ছাইতে ছাইতে বলতে শুরু করল এলেভূতের গল্প৷ তখন ভোরের শীত পেরিয়ে দিনের রোদ ঢুকে পড়ছে তার ফনা তুলে৷ শীত কমতে শুরু করেছে গা থেকে৷ তবু শালের ওম গায়ে নিয়ে আমি বলি, এলেভূত সে আবার কী?

–এলেভূত কী তা কি আমিই জানতাম? শুনেছিলাম আমাদের গাঁয়ের লক্ষ্মণখুড়োর কাছে৷

কে লক্ষ্ণণখুড়ো তা জিজ্ঞাসা করলে এখন আাবার সেই কাহিনি সাতকাহন শোনাতে বসবে পঞ্চু ঘরামি৷ তাতে এলেভূতের গল্পটা মাঠে মারা যাবে৷

কিন্তু পঞ্চু ঘরামি সে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে দিল না, বলল, কে লক্ষ্ণণখুড়ো তা জানতে চাইলে না তো, দা’ঠাকুর

বাধ্য হয়ে বলতে হল, কে ছিলেন তিনি?

–সে এক ভারী রগুড়ে লোক৷ থাকত আমাদের গাঁয়ে৷ অমাকে দেখলে বলত, পঞ্চু, তোর এরকম পাহাড়ের মতো শরীর তুই ঘর ছেয়ে নষ্ট করলি জেবনটা তোর হওয়া উচিত ছেল মস্ত ব্যায়ামবীর৷ রেবা রক্ষিতের মতো বুকে হাতি তুলতে পারতিস৷ তাতে তোর বাড়িতে পয়সা রাখার জায়গা হত না

রেবা রক্ষিত যে একজন শক্তিমতী মহিলা, সার্কাসে বুকের উপর হাতি তুলে শিহরিত, রোমাঞ্চিত করতেন দর্শককে সে কথা বহুবার শুনেছি আমাদের বাবা–কাকাদের মুখেও৷

রেবা রক্ষিতের প্রসঙ্গ তুললে হয়তো তাকে নিয়েই এখন দশকাহন ফাঁদতে বসবে পঞ্চু ঘরামি৷ তার চেয়ে এলেভূতেই ফিরে যাওয়া যাক এই ভেবে বলি, তারপর পঞ্চুদা, এলেভুূতের কী হল?

–তো লক্ষ্মণ খুড়োর কথা বলছিলাম না? আমার কাছে আর কী শোনছ তেনার কাছে গল্প শুনলে তিন জনম কেটে যাবে, বুঝলে, দা’ঠাকুর তিনি নাকি সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে একবার গোটা একটা বাঘ মেরে ছিলেন বলে খুব গর্ব ছিল তেনার৷

বাঘের গল্প আমার কাছে যদিও খুব প্রিয়, কিন্তু এখন এলেভূতটা আমাকে এমন উসকোচ্ছে যে, সুন্দরবনের বাঘকেও ঠেলে সরিয়ে দিই একপাশে৷ বলি, তুমি এলেভূতের গল্পটাই আগে বলো, পঞ্চুদা৷

–তো সেই লক্ষ্মণখুড়োর কাছেই শুনেছিনু এলেভূতের কথা৷ বলে পঞ্চু ঘরামি একটু থামে৷ তার গল্পে আবার সেই লক্ষ্মণখুড়োর কথাই ঘুরেফিরে আসে দেখে মুখ কিসমিস করে তাকিয়ে থাকি৷কার গল্প শুরু হবে এবার, লক্ষ্মণখুড়োর, না এলেভূতের

না, এল দুজনেই৷ একজনের পিঠে আর একজন চড়ে৷

–বুঝলে, দা’ঠাকুর, সেই লক্ষ্ণণখুড়ো বলেছিল এলেভূত নাকি জলের মধ্যে থাকে৷ এলোমেলো ঘুরে বেড়ায়, এক একবার ভুস করে ঠেলে ওঠে উপরে, দপ করে আগুন জ্বালায়, আবার আগুন নিবিয়ে ভুস করে ডুবে যায়৷ আগুনটা নাকি তার নিশ্বাস৷ কখনও জলের মধ্যে একলা মানুষ বাগে পেলে তার ঘাড় ঠেসে ধরে জলের তলায়৷ তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না৷

এতক্ষণে বুকের মধ্যে হাপিসটিপিস করতে থাকে৷ কী জানি কেমন সেই এলেভূত

–বুঝলে, দা’ঠাকুর, এলেভুূতের নাম জানতাম, কখনও চোখেও দেখিনি তাকে, সেই এলেভূতের পাল্লায় পড়ব তা স্বপনেও ভাবিনি৷

চমকে উঠে বলি, এলেভূতের পাল্লায় পড়লে? কী সর্বনাশ

–সব্বোনাশ বলে সব্বোনাশ যাকে বলে সাড়ে সব্বোনাশ

–তা কোথায় পেলে সেই এলেভূতকে?

–বুঝলে, সেবার লালতাকুঁড়ি গাঁয়ে গেছি ষাঁড়ের লড়াই দেখতে৷ সে যদি দেখতে ষাঁড়ের লড়াই, তুমি নিশ্চিত ভিরমি খেয়ে যেতে

এলেভূতের মধ্যে ষাঁড়ের লড়াই ঢুকে যাক তা আমি একেবারেই চাই না, কিন্তু পঞ্চু ঘরামির কাছে গল্প শুনতে গেলে মাঝেমধ্যে বেলাইন হবেই তার গল্প৷ আসলে গল্পের পেটে গল্প থাকে পঞ্চু ঘরামির ঝুলিতে৷ কিন্তু না, এবার ষাঁড়ের লড়াইকে রেহাই দিয়ে ফিরে এল এলেভূতের গল্পে৷

–ষাঁড়ের লড়াই দেখে ফিরতে অনেক রাত হয়ে গেল সেবার৷ অন্তত পাঁচক্রোশ পথ ফুরুতে হবে জোর পায়ে হেঁটে৷ হয়তো পৌঁছোতে ভোর হয়ে যাবে৷ তাই বড় রাস্তা দিয়ে নয়, সরাসরি মাঠ ভেঙে পেরোচ্ছি অতখান পথ৷ সঙ্গে গাঁয়ের আরও জনাছয়েক ছেলে৷ সবারই জোয়ান বয়স৷ হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যাই চেনাই দহের বিল৷ সেই বিলের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে কে যেন বলল, ‘পঞ্চুদা, এখেনে বাবলাঘাঁটি গাঁয়ের তিনু সর্দারের লাশ পাওয়া গিয়েছিল না? ’শুনে মনে পড়ে গেল গল্পটা৷ না, ঠিক গল্প নয়, সত্যি ঘটনা৷ পা–দুটো উপরে ভেসে আছে, মুণ্ডসহ শরীরটা নীচে৷

সেই তিনু সর্দারের লাশের গল্প শুরু হবে ভেবে আঁাঁতকে উঠি৷ যদিও জানি পঞ্চু ঘরামি যে–গল্পই শুরু করবে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত দম বন্ধ হয়ে থাকবে৷ কিন্তু তিনু সর্দারের লাশ থেকে গল্প ঘুরে গেল এলেভূতের দিকে৷

–বুঝলে, চেনাই দহের বিলের ধারে কতবার এসেছি দিনমানে৷ বিলের জলও আমাদের তন্নতন্ন চেনা৷ এর মধ্যে বড়বড় রুই আর কাৎলায় ভরা৷ এক একটার ওজন হবে পনেরো–কুড়ি কেজি৷ বিয়ের লগনশায় কত–কত যে জাল পড়ে বিলের জলে তার ইয়ত্তা নেই৷ সাতগাঁয়ের মানুষ চেনাই দহের মাছ খেয়ে ধন্য ধন্য করে৷

চেনাই দহ থেকে পঞ্চু ঘরামি কখন যে এলেভূতের গল্পে ঢুকবে আমি সেই প্রত্যাশায় অপেক্ষা করি৷ গল্প তখন ঘাই দিতে থাকে চেনাই দহের জলে৷ লাফিয়ে উঠতে থাকে সেই বিশাল আকারের মাছগুলো৷ শরৎচন্দ্রের কার্তিক আর গণেশদের দেখতে ইচ্ছে হয় মনে মনে৷ কিন্তু সেই লোভ সামলে আমি শুনতে থাকি পঞ্চু ঘরামির গল্প৷

–বুঝলে, তখন চারদিক জনমানবহীন৷ সুনসান করছে গোটা চত্বর৷ ঘুরঘুট্টি আঁাঁধারে কোথাও আলো বলতে নেই৷ হাওয়ায় শব্দ উঠছে শোঁ শোঁ করে৷ এক একটা হাওযা দমকা মেরে মিলিয়ে যাচ্ছে কোথায় না কোথায় বিলের জল তখন সমুদ্দুরের মতো৷ তার আদিন্ত কিছুই বোঝা যায় না আঁাঁধারে৷ চোখে দেখা যায় না তার জল৷ শুধু একটা কালো চাদরের মতো শুয়ে আছে সাত মাইল লম্বা হয়ে৷ আর বিলের ধার ঘেঁসে ফুটে আছে অজস্র নালফুল৷ তার বড় বড় পাতার মধ্যে থিকথিক করছে নালগুলো৷ কিন্তু অন্ধকারে দেখাই যাচ্ছে না তার রং৷ মেঠোপথ এক্কেবারে নির্জন৷ লোকজন দূরের কথা, একটা ঝিঁঝি পর্যন্ত রা কাড়ছে না কোনও দিগরে৷

বললাম, বেশ সংঘাতিক জায়গা, তাই না?

–বেজায় সাংঘাতিক৷ এ সব তল্লাটে সন্ধে হতে না হতে নিশুত৷ রাতে লোকজন চলাফেরা করে না৷ লোকে বলে সন্ধের পর চেনাই হদহের বিলের ধারে নিশি হাতছানি দেয়৷ ডেকে নিয়ে যাবে সুন্দরী মেয়ের রূপ ধরে৷

অধৈর্য হয়ে বলি, তারপর? এলেভূতের কী হল?

–সেইটে বলার জন্যিই তো এত তোড়জোড়৷

–তোমার ভয় করছিল না?

–ভয় পঞ্চু ঘরামি হেসে ওঠে আমার অজ্ঞতায়, বলে, ছোটবেলা থেকে আমার শরীলে ভয়ডর বলতে নেই৷ তা ছাড়া আমরা তো তখন সাতজন আমার একা যেতেও ভয় করত না৷ ভূতের ভয় তো নেইই৷ কতবার বাজি ধরে রেতের বেলা শ্মশানে গেছি মাঝরাতে৷ একবার বাজি ধরার লোকেরা বলল, ‘তুমি যাওনি৷ মিথ্যে বলছ৷’ বলি, ‘তাইলে একটা পাঁচটাকার নোট সই করে রেখে এসো চিতার উপর৷ দেখো ঠিক গে নে আসব’খনে৷’ ব্যস, যে কথা সেই কাজ৷ সই করা নোট নে এসে তাক লাগিয়ে দিছি সবাইকে৷ আর মানুষের ভয় মানুষও আমাকে দেখলে ডরায়৷

আমি শুধু একটা কথা বেফাঁস বলে ফেলতে অমনি আর একটা গল্প পেড়ে ফেলল পঞ্চু ঘরামি৷ তৎক্ষণাৎ গল্পের মুখ ঘুরিয়ে দিতে বলি, তারপর? এলেভূতের কী হল, ও পঞ্চুদা? এল নাকি তোমাদের পথের উপর?

–ওই দ্যাখো, এলেভূত পথের উপর আসবে কী করে? তেনারা তো থাকে জলের মধ্যি৷ তোমারে তো আগেই বললাম৷ তো এলেভূত সত্যিই এল৷

–এল আমার বুকের ভিতর কাঁপ ধরে৷

–হ্যাঁ৷ বিলের ধার দে সাতজনে জোর পায়ে হাঁটছি৷ হঠাৎ দেখি মাইলখানেক দূরে একটা আগুনের ডেলা দপ করে জ্বলে উঠল৷ আমাদের মধ্যে কে একজন বেশ বলল, পঞ্চুদা, ওই দ্যাখো–

আমি দম বন্ধ করে বলে উঠি, কী দেখলে?

–দেখি কি, আগুনের ডেলাটা ভাসছে জলের উপর৷ কিন্তু একসঙ্গে সবাই দেখছে আগুনর ডেলাটা৷ এ নিশ্চয় চোখের ভুল নয়৷ এত দূর থেকেও দেখতে পাচ্ছি আগুনের ডেলাটা ভেসে ভেসে এগোচ্ছে এদিকেই৷ বাকি সবাই তো ভয়ে আটখানা৷ ততক্ষণে জোর পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেছি বিলের মাঝ বরাবর৷ দলের অন্যেরা তখন দৌড় দে পালাতে চাইছে৷ কিন্তু আমি তাদের থামিয়ে বলি, রোসো, বেপারটা কী তা ভালো করে বুঝতি দে৷

একটু পরেই দেখি আগুনের ডেলাটা ভাসতে ভাসতে এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে৷ বেশ জোরেই এগোচ্ছে দপদপ করতে করতে৷ আামাদের পটলা ভয় পেয়ে গোঙাতে থাকে, কী হবে পঞ্চুদা? আজ রেতে নির্ঘাত আমাদর এলেভূতে ধরবে৷

তাদের বুক থেকে ভয় তাড়াতে বলি, অত ভয় কীসের? ভূত সমনে এলে কষে ধমক দিবি৷ যাক গিয়ে, এখন তাড়াতাড়ি পা চালা৷

–নিজের জন্য নয়৷ ভূতে আমাকে কখনও কাবু করতে পারবে না৷ ভূতদের যা হাড়গিলে চেহারা, তাতে আমার নিরানব্বই সিক্কার ঘুষি সামলাতে দম বেরিয়ে যাবে ব্যাটাদের৷ কিন্তু দলের বাকি ছ’জন এমন হুড়তাড় করছে যে জায়গাটা পার হতে পারলেই যেন বাঁচে৷ পা চালিয়ে ছুটছে সবাই ৷ উদ্দেশ্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এলেভূতের আওতা থেকে দূরে পালিয়ে যাওয়া৷ কিন্তু হল কি, হঠাৎ সাঁইসাই করে একটা দমকা হাওয়া লাফিয়ে চলে এল আমাদের ঘাড়ের উপর৷ তখন সামনে বিশাল জল কালো রং মেখে ভুষ হয়ে আছে, তার মধ্যে রাশ রাশ নালফুল ফুটে আছে, সেগুলোর রংও তখন মিশকালো, আমরা হাওয়া সামলে হাঁটছি এলোমেলো পায়ে, সে সময় দেখি কি আগুনের ডেলাটা ভুস করে নিভে গেল৷ যেই না হাঁপ ছেড়ে ভাবছি, যাক, বোধহয় নিস্তার পাওয়া গেল এলেভূতটার হাত থেকে৷ বোধহয় জানতে পেরেছে দলটার সঙ্গে পঞ্চু ঘরামি আছে৷ বেশি জারিজুরি খাটবে না৷ কিন্তু সে বোধহয় কিছুক্ষণ, হঠাৎই দেখি আগুনের ডেলাটা ভেসে উঠল আমাদের একেবারে কাছে৷ বলতে গেলে হাতার মধ্যে৷ তক্ষুনি বিশে নামের একটা ছেলে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠে প্রায় ভিরমি খাবার জোগাড়৷ তাকে এক ধমক গিয়ে বলি, চুপ, চুপ৷ যে–ছোঁড়া ভয় পাবে তার গা বেয়ে উঠে পড়বে এলেভূত৷

–কিন্তু তাতেও কারও ভয় ভাঙে না, কেউ কেউ অন্ধকারে দৌড় লাগাল বিলের পাশে পাশে চলতে থাকা মেটেপথ ধরে৷ কিন্তু এলেভূতের আওতা থেকে রেহাই পাওয়া যে অত সহজ কাজ নয় তারও প্রমাণ পাওয়া গেল পরক্ষণেই৷ আগুনের ডেলাটা নিভে গিয়ে যেদিকে ছেলেগুলো দৌড়োচ্ছিল সেখানেই গিয়ে ভেসে উঠল৷ তারা সে–দৃশ্যে এত ভয় পেয়ে গেল যে, পরক্ষণে যতটা এগিয়েছিল ততখানি পিছিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাইমাউ করে কাঁদতে শুরু করে, ‘পঞ্চুদা, বাঁচাও৷’ তখন বললাম, ‘ধুস, ভূতফুত বলে কিছু নেই৷ চল, আমরা এলেভূতটারে তেড়িয়ে ধরি৷ আয়, জলে নামি৷দেখবি পালিয়ে পথ পাবে না’৷ তাড়িয়ে ধরার প্রস্তাবে সবাই তো আরও থতমত৷ বলল, ‘তা কী করে হবে, পঞ্চুদা? এলেভূত তো গা বেয়ে ওঠে শুনেছি৷’ তাদের বুকে সাহস ভরতে বললাম, ‘একটা বুদ্ধি বার করেছি৷ সবাই মিলে রামনাম করবি৷ তাহলে আর এলেভুূত গা বেয়ে উঠতে পারবে না৷ রামের কাছে ব্যাটারা জব্দ৷ আর সেই ফুরসতে আমরা ভূতটারে ধরব৷ কাউকে ওর গায়ে হাত লাগাতে হবে না৷ সে কাজটা আমার৷’ তো যে কথা সেই কাজ৷ কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে সবাই মিলে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিলের জলে৷ নালফুল সরিয়ে পৌঁছে যাই আগুনের ডেলাটার কাছে৷ তাকে ঘিরে এগোতে থাাকি৷ সবাই তখন রামের পায়ে তেল মাখাচ্ছে৷ কিন্তু চোখে মুখে যেমন আতঙ্ক, তেমনই কৌতূহল৷ কী হবে আগুনের ডেলাটার কাছে গেলে তা ভেবে সবাই রুদ্ধশ্বাস৷ কিন্তু বরাত এমনই যে, যেই মাত্তর আগুনের ডেলাটার কাছে পৌঁছে গেছি, অমনি দপ করে নিভে গেল আগুনটা৷ আমরা বোকার মতো এ ওর দিকে তাকিয়ে থাকি৷ পরক্ষণে দেখি আর একটু দূরে ভেসে উঠেছে আগুনটা৷ বলি ‘দ্যাখ, কেমন ভয় পেয়েছে এলেভূত’ অমনি কে যেন বলল, ‘ঠিক বলেছ, পঞ্চুদা৷ কী’রম ঘাবড়ে দিয়েছি বলো?’ কথাটা সবার মনে ধরে৷ অমনি সবাই হইহই করে ঝাঁপিয়ে পড়ে তার চারদিক ঘিরে৷ এগোচ্ছি সবাই৷ গোল হয়ে ঘিরে ধরছি আগুনের ডেলাটাকে৷ ভয়ও কেটে গেছে৷ যেই না তার কাছে পৌঁছেছি, অমনি আবার নিভে গেল আগেরবারের মতো৷ ছেলেদের সাহস দিতে বলি, ‘দেখলি তো, কী ভয় পেয়েছে ব্যাটা?’ তখন সবাইকার মধ্যে একটা বিপুল উত্তেজনা৷ পরক্ষণে যেই না একটু দূরে জ্বলে উঠেছে আগুনটা, অমনি আবার এগোতে থাকি তার চারপাশ ঘিরে৷ বলি, আজ রেতে ধরবই ব্যাটাকে৷ চল্ রে, বিশে–

এই পর্যন্ত শুনে আমার আর ধৈর্য থাকে না, বলি, তারপর? ধরা পড়ল এলেভূত?

–কী আর বলি, দা’ঠাকুর? সে এক ভারী আজব গল্প৷

–কী আজব গল্প, পঞ্চুদা?

–সারারাত ক’জনে মিলে কী তাড়াই না করলাম এলেভূতটারে৷ তারপর বুঝলাম এলেভূতটা আমাদের চেয়েও ঢ়ের বুদ্ধিমান৷

–বুদ্ধিমান আমার ঠিক প্রত্যয় না পঞ্চুদার কথায়৷ ভূতের আবার বুদ্ধি থাকে নাকি?

পঞ্চু ঘরামি হাসে, থাকে না আবার? সাত–সাতটা ছেলেকে সারাটা রাত ধরে লণ্ডভণ্ড করে দিল ধোঁকা দিয়ে কী ঘোরানটাই না ঘোরাল তাইলে রগড়টা শোনো মন দে৷

বলে আবার শুরু হয় তার গল্প, বুঝলে, তো এরকম তেড়িয়ে নে যাচ্ছি তারে এক–একবার, আর এলেভূতটা পালিয়ে যাচ্ছে বারবার৷ তো আমার ছেলেরা তখন মরিয়া৷ ততক্ষণে ভোরের রং দেখা দিচ্ছে পুব আকাশে৷ ফরসা হয়ে আসছে পৃথিবী৷ কিন্তু এলেভূতটা তখনও চোর–পুলিশ খেলে যাচ্ছে একনাগাড়ে৷ শেষে এমন হল আমরা একেবারে এলেভূতের হাতার মধ্যে৷ আমার হাতদুটো তো প্রায় আঁাঁকশির মতো সিড়িঙ্গে৷ যেই না তারে বাগে পেয়েছি, অমনি একটা লম্বা লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম আগুনের ডেলাটার ঘাড়ে৷ আর–

–আর? তখন আমারও শ্বাস রুদ্ধ, পেলে এলেভূত?

পঞ্চু ঘরামি হাসে, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসল মিটিমিটি, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, সে এক রগড়ের কাণ্ড

–কী রগড়? আমারও তর সইছে না শেষটা জানতে৷

–আগুনের ডেলাটা নিভে গেল দপ করে৷ কিন্তু আমিও ছাড়বার পাত্র নই৷ আগুনটার সাথে সাথে আমিও দিলাম ডুব যাতে ফসকে না যায় ব্যাটা৷ কিন্তু হাতড়ে মাতড়ে কী পেলাম জানো?

–কী?

–একটু ফুটো মালসা৷

সারারাত এলেভূতের পিছনে এক কোমর জলে ছুটে বেড়িয়ে শেষে একটা ফুটো মালসা পেয়েছে শুনে আমার ঠিক মন ভরে না৷ এত কষ্ট শেষে সব বৃথা? পঞ্চু ঘরামি তখন মিটমিট করে হাসছে৷ বুঝলে দা’ঠাকুর, আসলে কী জানো, ভূতটুতকে যত ভয় পাবে তত সে চেপে বসবে গাড়ে৷ তারে যদি তুমি টুঁটি ধরে চেপে ধরতে চাও তো দেখবে লেজ গুটিয়ে চোঁ চাঁ দৌড় দেবে উল্টোমুখো৷

পঞ্চু ঘরামির গল্পটা শুনে ঠিক তৃপ্তি হয় না কেন যেন৷ পরদিন স্কুলে গিয়ে মাস্টারমশাইকে বলি গল্পটা৷ শুনে মাস্টারমশাই তো হেসে বাঁচেন না, বললেন, পঞ্চু ঘরামি বলেছে এই গল্প? আর তুমি তা বিশ্বাস করলে? ঠিক বিশ্বাস করিনি, আবার অবিশ্বাসও করিনি, কেন না পঞ্চুদা এর আগেও তার নির্ভীকতার গল্প আরও অনেক শুনিেেয়ছে৷ তা ছাড়া এলেভূতের কাণ্ডকারখানা শোনার পরেও তার পিছনে ধাওয়া করেছে, সেই ধরার মধ্যেও তো এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ৷ পরদিন মাস্টারমশাইয়ের কথা মতো পঞ্চুদাকে গিয়ে বলি, পঞ্চুদা, আসলে কী জানো, এলেভূত বলে কিছু নেই৷ আসলে ওটা মিথেন গ্যাস৷ অনেকদিনের জমে থাকা জলের মধ্যে এই গ্যাসের সৃষ্টি হয়৷ সেই গ্যাস বুদবুদ কেটে ওঠে জলের নীচে থেকে৷ সেই গ্যাস যখন জলস্তর পেরিয়ে উপরে বাতাসের সংস্পর্শে আসে তখনই জ্বলে ওঠে আগুন৷ গ্যাস ফুরিয়ে গেলেই আগুন নিভে যায়৷ তখন অন্য জায়গায় গ্যাস উঠতে থাকে৷ সেখানে আাবার আগুন ধরে৷ কথাটা শুনে অনেকক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে তাকে অমার দিকে৷ তার অভিব্যক্তি দেখে অনুমান করি কথাটা পছন্দ হয়নি পঞ্চু ঘরামির, বলল, তোমরা লেখাপড়া শিখে কী যে সব বলো, দা’ঠাকুর৷


শকুনতন্ত্র- তৃণাঞ্জন গঙ্গোপাধ্যায়

সুরতহাল হলে না পুলিশ পাতা করতে পারবে কী হয়েছিল, কি ঠিক বললাম তো আমি।

কথার শেষে গুটকা রঞ্জিত সবকটা দাঁত বের করে হাসল চমৎকারলাল।

ওর কথার উত্তরে লক্ষণ আর মুনিয়া দুজনেই পাথরের মতো তাকিয়ে রইলো, মানে চমৎকারলালের কথার বিন্দুবিসর্গ তারা বোঝেনি।

চমৎকারলাল তেমনই হাসল, বললো তু লোগ শালা গাওয়ার, কুছ নেহি সমাঝতা হ্যায়......, ক্ষনিকের বিরতি নিয়ে বললো, ও লবস পোস্টমর্টেম, কভি শুনহা হ্যায় ?

লক্ষণ আর মুনিয়া দুজনেই বোবা দৃষ্টিতে ঘাড় নাড়ল, না এই শব্দটা তারা কোনদিন শোনেনি

চমৎকারলাল গলা খাকারি দিলো, লক্ষ্মণ আর মুনিয়াকে বোঝানোর জন্য আবার মুখ খুললো, কথা কি হচ্ছে জানিস, কারুর মৃত্যু নিয়ে যদি পুলিশের সন্দেহ হয়, তবে তার ডেডবডি নিয়ে গিয়ে হাসপাতালের মুর্দাঘরে আবার কাটাছেড়া করে, বোঝার চেষ্টা করে কিস তারা উসকা মত্ হুয়া, কেউ তাকে খুন করেছে কি না, একে বলে সুরতহাল, মতলব পোস্টমর্টেম, সামঝা....

চমৎকারলাল দেখল তার এই কথার শেষে লক্ষণ আর মুনিয়ার চোখমুখ থেকে যাবতীয় রক্ত কে যেন শুষে নিলো,

চমৎকারলাল হাসলো, কিন্তু তার দাঁত দেখা গেলনা, সে ঠোঁটেও হাসলো না, হাসিটা দুই চোখে চকচকে ছুড়ির পাতের মতো অদ্ভুত কোন এক আলোয় ঝিকমিক করে উঠলো, বললো, ডরনে কা কেয়া বাত হ্যায় ! লাশ মিলেগি তব না সুরতহাল হোগি, লাশ পাওয়া না গেলে কিসের পোস্টমর্টেম ! এবার কথার শেষে শব্দ করে হাসল চমৎকারলাল, এবার ওর দাঁত দেখা গেল। আর দু চোখে মেখে গেল এক তীব্র রহস্য।

লক্ষ্মণ আর মুনিয়া তাই বুঝে গেছে যে লাশটা তারা পাহাড়ের ওপরে নিয়ে এসেছে সেটার কোন অস্তিত্ব থাকবেনা। কিন্তু কীভাবে অস্তিত্ব বিলোপ হবে ? জঙ্গলের শুকনো ডালপালা আর পাতার ওপরে লাশটা রেখে পেট্রল ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হবে? না কি কালাশনি পাহাড়ের উঁচু থেকে সামনের প্রকান্ড খাদের ভিতরে জমাট অরণ্যের মধ্যে দেহটা ছুঁড়ে ফেলা হবে?

না কি এসব কিছুই হবে না, হবে কোন যাদু। চমৎকারলাল এমন কোন যাদু করবে তাতে তাদের সামনে একটু দূরে পাথরের ওপরে শুইয়ে রাখা লাশটা একটু একটু করে ওপর দিকে উঠতে থাকবে, তারপর ধীরেধীরে মিলিয়ে যাবে আকাশে, যেমন একটা ধোঁয়া মিলিয়ে যায়, দেহটা আগে ধোঁয়ায় পরিণত করে নেবে চমৎকারলাল, এটা ও পারে, এমনই শুনেছে লক্ষ্মণ আর মুনিয়া।

কিন্তু চমৎকারলাল কখন তার জাদুটা করবে কিছুই বুঝতে পারছেনা । আসলে একটা একটা মুহুর্তও এখন বড় বড় পাথরের মতো চেপে বসছে তাদের বুকের মধ্যে।

গিরিধারীর ছেলের লাশটা কাঁধে করে নীচের রাস্তা থেকে এই পাহাড়ের মাথায় বয়ে এনেছে লক্ষ্মণ, সে গ্রামের ঠাকুরদের বাড়িতে অনায়াসে পঞ্চাশ কেজি’র গমের বস্তা পিঠের ওপরে চাপিয়ে নেওয়া মুনিষ, সেখানে গিরিধারীর ছেলে বুধুয়ার ওজন কত হবে! বাইশ কেজি, তেইশ কেজি, যাদা সে যাদা পচচিস কেজি, তাই পিঠে চাপাতে বেগ পেতে হয়নি লক্ষ্মণকে, শুধু দেহটা তোলার সময়ে রক্তের ভিতরে শীতল একটা জাল ছড়িয়ে পড়ছিল, বুধুয়ার গলার নলি গোল হয়ে অর্ধেকটা কাটা আর তার থেকে রক্তের স্রোত বেরিয়ে এসে ভাসিয়ে দিয়েছে ভৈরবাবার মন্দিরের চাতাল, মুরগি বা ভেড়া জবাই করার পরে রক্ত বেশ কিছুটা বেরিয়ে গেলে দেহাটাকে যেমন তুলে ধরা হয় তেমনি চমৎকারলাল মুনিয়াকে বলেছিল, আব কান্ধ মে উঠা লে ।

এতো চকিতে পেছন দিক থেকে তড়োয়ালটা চমৎকারলাল চালিয়ে ছিল যে এক মুহূর্তের জন্য বুধুয়া বুঝতে পারেনি ওর গলা কাটা হবে, তাই যেন বিস্ময়টা মৃত্যুর পরেও দু চোখে লেগেছিল,চমৎকারলাল লাশটা লক্ষ্মণকে কাঁধে তুলতে বলছে, প্রথমটায় পারছিল না লক্ষ্মণ , বুধুয়ার কাটা গলা খাদের মতো হাঁ হয়ে আছে, অথচ চোখ দুটো খোলা, খোলা চোখ বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিল লক্ষ্মণ, চমৎকারলাল ধমক দিলো, খুলা রহেনে দে, বলি দেওয়া বুধুয়ার চোখ যদি খোলা না থাকে তবে কাজ কিছুই হবেনা, তন্ত্রক্রিয়া করে যে শক্তিকে চমৎকারলাল দুনিয়ায় নিয়ে এসেছে সে বুধুয়ার সঙ্গে দৃষ্টি মেলাতে পারবেনা, আর যদি দৃষ্টি মেলাতে না পারে তবে বুধুয়াকে কাছে নেবে কি ভাবে ? আর কাছে নিতে না পারলে সে মুনিয়ার গর্ভে বুধুয়াকে নতুন করে জন্ম দেবে কি করে ? তা হলে লক্ষ্মণ আর মুনিয়ার বাবা মা হওয়ার স্বপ্ন পূর্ন হবে কী করে ?

তাই প্রবল ভয়ের মধ্যেও দু চোখ মেলে তাকিয়ে থাকা বুধুয়ার গলা কাটা দেহটা কাঁধে চাপিয়ে নিয়েছিল লক্ষ্মণ।কালাশনি পাহাড়ের পাকদন্ডি ধরে ওরা উঠছিল, বুধুয়ার দেহ লক্ষ্মণের কাঁধের ওপরে, গলার অর্ধেক হাঁ আর বাকি অর্ধেক গলার সামনের দিকে ঝুলে আছে, ঝুলে আছে ঠিক কাটা ভেড়ার মুন্ডুর মতো ।

পাহাড়ে উঠতে থাকা লক্ষ্মণের পিঠে ধপধপ করে বাড়ি খাচ্ছিল মুন্ডুটা, মনে হচ্ছিল তার ঝুপড়ির হেলে পড়া পুরনো কাঠের দরজায় কেউ একজন জোরে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে আর বলছে পানি লাও পানি লাও , বহত পিয়াস লাগা ।

বেশিক্ষন এসব কথা মাথার মধ্যে রাখেনি লক্ষ্মণ , যতোই ভয় পাক একটা কথা জানে চমৎকারলালের সঙ্গে একবার যদি পাহাড়ের মাথায় পৌঁছতে পারে তবে এই দেহের এমন ব্যবস্থা করবে চমৎকারলাল যে পৃথিবীর কেউ কেন , এই আসমান, নদীর জল, পাহাড় এরাই কোন খোঁজ দিতে পারবেনা।

শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের ওপরে চমৎকারলাল আর মুনিয়ার সঙ্গে পৌঁছে গেছে লক্ষ্মণ। তাই এত ঘটনার পরে আর সামান্য ধৈর্যও ধরতে পারছেনা। চরম অধৈর্য হয়ে এবার মুখ খুলতে যাচ্ছিল লক্ষ্মণ,তার আগেই চমৎকারলাল বলে উঠল, ও আরাহা হ্যায় দেখ, দেখ , ও আরাহা হ্যায়.....

দূরের দিকে প্রবল উৎসাহ নিয়ে তাকালো মুনিয়া আর লক্ষ্মণ। শুধু পৃথিবী পুড়িয়ে দেওয়া রোদ, বেজান পাহাড়, আর ধুঁকতে থাকা ঝর্ণা ছাড়া কিছুই নজরে এলো না। দুজনই অবাক হয়ে তাকাল চমৎকারলালের দিকে।

চমৎকারলাল বেশ রেগে গিয়ে বললো, অন্ধা হো গ্যায়া ! ও নেহি দেখ রাহা হ্যায় !

আবার দূরের দিকে দৃষ্টি ঘন করলো ওরা। দূর আকাশে কয়েকটা কালো বিন্দু দেখতে পেল আর এও লক্ষ্য করলো বিন্দুগুলো যত বড় হচ্ছে ততই আলো গাঢ় হচ্ছে চমৎকারলালের মুখে।

খুব শান্তির হাসি নিয়ে চমৎকারলাল তাকালো ওদের দিকে, বললো যে শক্তির পূজা করেছে বুধুয়াকে বলি দিয়ে, সেই শক্তি শকুনের পিঠে চেপে আসছে, ঐ শকুনগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে বুধুয়ার দেহ, দেহটা যদি শকুন খেয়ে ফেলে তবে পোস্টমর্টেমের ভয় থাকছেনা, আর খাওয়ার শেষে শকুনগুলো যখন ফিরে যাবে তখন সেই শক্তি বুধুয়ার আত্মা নিয়ে শকুনের পিঠে চেপে ফিরবে, আর আজ থেকে পনেরো দিন পরে যে অমাবস্যা আসছে সে দিন মুনিয়ার গর্ভে জন্ম নেবে বুধুয়া, লক্ষ্মণ বাবা হবে, মুনিয়া মা হবে, খুশিয়াই খুশিয়া, হাসছে আর বলছে চমৎকারলাল।

ওরা দেখল কালো বিন্দু গুলো ক্রমশ বড় হতে হতে ছ’টা শকুনের রূপ পেল। একসময় ওরা নেমে এলো। শকুনগুলো গোল হয়ে বেশ কয়েকবার ঘুরলো বুধুয়ার দেহ, ধারাল বাঁকানো ঠোঁট নিয়ে এল দেহর ওপরে, বেশ কয়েকবার এটা করলো,অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে ওরা, কিন্তু চরম হতাশ করলো শকুনের দল, একবারের জন্যেও এক টুকরো মাংস ছিঁড়লো না দেহ থেকে।

চরম হতাশ তিনজনের চোখ এবার যেন চোখের প্রকোষ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসবে বাইরে। শকুন ছ’টা উঠে বসেছে দেহের বুকের ওপরে, দূরের দিকে তাকিয়ে আছে অদ্ভুত ভাবে, যেন কারুর নির্দেশের অপেক্ষা করছে, ওদের দৃষ্টি দূর থেকে ফিরে এলো কাছে, মাথা নীচু করে দেহটা দেখলো, তারপর পায়ের নখ দিয়ে খিমচে ধরলো বুধুয়ার ছেড়া জামা, ছেড়া প্যান্ট, আর ঐ খিমচে ধরা অবস্থায় ওরা ওড়া শুরু করলো, নখ দিয়ে খিমচে ধরা বুধুয়ার দেহ নিয়ে এক সময় ওরা উড়তে উড়তে হারিয়ে গেল কালাশনি পাহাড়ের ওপাশে প্রকান্ড দিগন্তের গহব্বরে।

লক্ষ্মণ আর মুনিয়া শুধু অবাকই হয়েছে, কারণ এই ঘটনার অভিজ্ঞতা তাদের আগে কখনও হয়নি। কিন্তু চমৎকারলাল চান করে গেছে এক প্রবল ভয়ে, সামনের দিকে তাকিয়ে প্রলাপ বকার মতো বলেই চলেছে, এ্যায়সা তো কভি নেহি হুয়া পহেলে ! আজ কিঁউ হুয়া, কিঁউ....

এখন পাহাড়ের পাকদন্ডি ধরে নীচে ফিরছে তিনজন। চমৎকারলাল দাঁড়িয়ে পড়লো,বললো, আগে যা সাবধান করে ছিলাম, তার থেকে বেশি সাবধানে থাকতে হবে তোদের, এত দিন দেখেছি শকুনগুলো এই পাহাড়ে বসেই দেহটা খেয়ে ফেলে, আমি নিশ্চিন্ত হয়ে বাড়ি ফিরি, কিন্তু আজ দেহ নিয়ে ওরা উড়ে গেল, যদি ওদের পা থেকে দেহ কোথাও পড়ে যায়, কেউ যদি সেটা পায় তবে খুব বিপদ, তাই সাবধান, জিতনা বোলা থা উসসে যাদা সাবধানী সে রাহেনা.....

।। দুই ।।

চমৎকারলাল জানে তার ওপরে সেই অদৃশ্য বিশেষ শক্তির অপার কৃপা আছে। আর থাকবেই বা না কেন! কারণ এই অসীম শক্তি শুধু জানে চমৎকারলাল কোন খুন করেনা, সে মানুষকে শান্তি দেওয়ার জন্য আরেকটি মানুষকে শক্তির কাছে অর্পণ করে। আর এ তো জীবনেরই নিয়ম, একটা গাছ যখন মরে গিয়ে মাটিতে পড়ে যায়, মাটির মধ্যে সে মিশে গিয়ে মাটিকে আরও উর্বর করে, নতুন গাছের জন্ম দেয়। তার বলি চড়ানো যে এইরকমই। শক্তি তো তাকে কৃপা করবেই ।

কিন্তু এতটা কৃপা করতে পারে চমৎকারলাল কোনদিন স্বপ্নেও ভাবেনি।

লক্ষ্মণের কথা শেষ হতে চমৎকারলাল বললো তাহলে চিন্তার তো আর কিছু রইলো না! কেউ আমাদের আর কিছু করতে পারবে না, খুশিতে থাক, আনন্দে থাক, সামনের অমাবস্যায় মুনিয়ার গর্ভে সন্তান আসছে আর সে ভালোভাবেই ভূমিষ্ঠ হবে, কোন পরিশানি নেই, আর আমি তো আছিই, ঠিক আছে, যা এবার গাওঁ চলে যা.....

লক্ষ্মণ সুবোধ বালকের মতো ঘাড় নেড়ে ভৈরবাবার মন্দির থেকে বেরিয়ে গেল।

লক্ষ্মণ বেরিয়ে যেতেই বিছানায় ধপ করে শরীর ফেলে দিলো চমৎকারলাল। আজ সেই দিনের পরে প্রথম সে শান্তির ঘুম ঘুমবে। বুধুয়াকে বলি দেওয়ার পর থেকে এক মুহূর্তের জন্য স্থির থাকতে পারেনি। বলি তাকে বিশেষ ভাবায়নি, বলি তো সে কম দেয়নি, কিন্তু শকুনগুলো যদি তার চোখের সামনে বুধুয়ার দেহ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়ে নিতো তবে সে সেদিনই ঘরে ফিরে শান্তির ঘুমে ডুবে যেত।কিন্তু এ কদিনে যখনই চোখ বুজতে গেছে তার চোখের ওপরে ভেসে উঠেছে একটাই দৃশ্য। ছ’টা শকুন বুধুয়ার দেহটা পায়ের নখে বিধিয়ে উড়ে যাচ্ছে।

চমৎকারলালের ভয় ছিল যদি শকুনের পা থেকে দেহ পড়ে যায়, কেউ যদি তা খুঁজে পায় এবং তা নিয়ে যদি কোন তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা নির্মূল হয়ে গেছে।

যে মারা যায় তার পরিবারওলা পুলিশের কাছে গিয়ে হাজারবার আর্জি করে ,তখন পুলিশ তদন্তের জন্য একটু নড়ে।

চমৎকারলালের ভয় ছিল যদি বুধুয়ার পরিবার হারিয়ে যাওয়া ছেলেটার খোঁজ করে, ওর বাবা গিরিধারী, গিরিধারীর আরও দুই ছেলে যারা বুধুয়ার থেকে বড়ো, রামুয়া আর জিতুয়া, ওরা তো জোয়ান, শক্তসমর্থ, ওরা যদি নিজেরা খোঁজে, খোঁজার জন্য পুলিশকে বিরক্ত করে ?

কিন্তু তার আর বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। লক্ষ্মণ জানিয়ে গেল গিরিধারীর পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই।গিরিধারী, ওর বৌ গৌরী, দুই ছেলে রামুয়া আর জিতুয়া, ওদের বৌ - রা, রেখা আর ঝিমলি, ছ’জনে মিলে দৌলতগঞ্জে গিয়েছিল সোমবাবার মাথায় জল চড়াতে। ওদের যাওয়ার আগেই এই খবর চমৎকারলালের কাছে ছিল, আর সেই খবরটা সে সুন্দর ভাবে ব্যবহারও করেছে।

লক্ষ্মণ আর মুনিয়ার বিয়ে হয়েছে চোদ্দ বছর, কিন্তু তাদের কোন সন্তান নেই, চমৎকারলালের কাছে বছর খানেক আগে প্রথম আসে,চমৎকারলাল প্রথম দিনেই বলেছিল এ খুবই কঠিন সমস্যা, সহজে সমাধান হওয়ার নয়, হোম যজ্ঞ, পূজা পাঠ করে এই সমস্যার সুরাহা হবে না, তবুও লক্ষ্মণের পীড়াপিরিতে কয়েক বার চমৎকারলাল পূজা পাঠ, হোম যজ্ঞ করে, মুরগি বলি, পায়রা বলিও চড়ায়, কিন্তু কোন ফল হয়নি, তখন একদিন বলেছিল নরবলির ব্যবস্থা করতে পারবি, দেখ পারিস কি না, পারলে তোর স্বপ্ন পূর্ন হবে।

প্রথমটায় ভয় পেয়ে গিয়েছিল লক্ষ্মণ। তারপর তার স্বপ্ন একদিন ভয়টা কাটিয়ে দিলো। তখন এসে দাঁড়ালো অন্য সমস্যা। কোথায় পাবে বলি দেওয়ার জন্য আদমি ?

যাকেই পছন্দ হয় তার পেছনে কয়েক দিন ঘোরাঘুরি করে লক্ষ্মণ বুঝতে পারতো সমস্যা আছে, খোঁজাখুঁজি হবে, সে ধরা পড়ে যাবে। লক্ষ্মণ ধীরে ধীরে হতাশার এক অন্ধকার গুহায় হারিয়ে যাচ্ছিল।

সেই হতাশার গুহা থেকে লক্ষ্মণকে বের করে আনলো চমৎকারলাল। একদিন খুব সকালে লক্ষ্মণকে ডাকলো। দিলো সেই খবরটা। লক্ষ্মণের চার পাঁচ ঘর পরে রাস্তা যেখানে পাহাড়ের বাঁকে হারিয়ে গেছে সেখানে গিরিধারীর ঘর, সে তার পুরো পরিবার নিয়ে দৌলতগঞ্জে সোমবাবার মাথায় জল চড়াতে যাবে, শুধু ছোট ছেলে বুধুয়াকে রেখে যাবে ওর নানীর কাছে, সেই নানীর তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, বুড়ি না ভালো করে চোখে দেখে, না কিছু মনে রাখতে পারে, বুধুয়াকে তুলে নিয়ে এলে বুড়ি ঠিকঠাক কিছু দেখতেও পারবেনা, জিজ্ঞেস করলে তেমন কিছু বলতেও পারবেনা, এই সুবর্ণ সুযোগ, চমৎকারলাল লক্ষ্মণকে বলেছিল এই মৌকা তোকে কাজে লাগাতে হবে। কাজে লাগিয়েছে তারা। কিন্তু পরিকল্পনা সফল হওয়ার পরেও ভয়ের কাঁটা ফুটেছিল তাদের দিমাকে।

কিন্তু একটু আগে লক্ষ্মণের দেওয়া খবরটা দিমাকের ওপর থেকে সবকটা ভয়ের কাঁটা তুলে দিয়েছে । সোমবাবার থান থেকে বোরা গ্রামে ফেরার সময় সুতিয়া নদীর ওপরে দীর্ঘ ব্রিজ পেরতে হয়। যে বাসে করে গিরিধারী, গিরিধারীর পরিবার ফিরছিল সেটা ব্রিজ ভেঙে মাঝ নদীতে পড়ে গেছে। বাসের একজন যাত্রীও বাঁচেনি।

গিরিধারী তার পরিবার নিয়ে সোমবাবার মন্দিরে পুজো দিতে যাচ্ছে আর এরকম সময়ে তার সন্তানকে অপহরণ করে বলি দেওয়া হবে, এই ব্যাপারটা ঠিক মানতে পারছিল না লক্ষ্মণ, এই সময়ে এই ঘটনা ঘটালে তাদের ওপরে ঈশ্বরের প্রবল অভিশাপ নেমে আসতে পারে, তার স্বপ্ন তো সফল হবেই না উল্টে নেমে আসতে পারে ভয়ঙ্কর শাস্তি।

লক্ষ্মণের এই ভয়ের কথা শুনে চমৎকারলাল হো হো করে হেসে উঠেছিল। হাসতে হাসতে বলেছিল উন লোগো কা ভগবান সোমবাবা হ্যায় , তো কেয়া হুয়া ! মেরা ভৈরবাবা ভি ভগবান হ্যায়, ভৈর সোম কা দাদা হ্যায়, ওর ক্ষমতা সোমের থেকে বেশি, সোমবাবার পুজো করলে ছোটা মোটা বিমারি সারে, জমি জায়গা নিয়ে সমস্যা থাকলে তার সমাধান হয়, কিন্তু কাউকে খতম করে তাকে নতুন করে জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা শুধু ভৈরবাবার আছে, আমরা তিন পুরুষ ধরে ভৈরবাবার পূজারী আর তার শরণাপন্ন হয়ে তু্ই সোমবাবার ভয় পাচ্ছিস! চমৎকারলাল খুব তিরস্কার করেছিল লক্ষ্মণকে, ব্যঙ্গ করেছিল।

সেই মুহূর্তে চমৎকারলালের ঐ ব্যঙ্গ লক্ষ্মণের খুব খারাপ লাগলেও এই মুহূর্তে ঐ কথা মনে করে একটুও খারাপ লাগছে না। চমৎকারলালের কথা তো প্রমাণিত হয়ে গেছে। সোমবাবার থেকে ভৈরবাবার শক্তি অনেক বেশি। না হলে বুধুয়াকে বলি দেওয়ার ঠিক আগের রাতেই কেন গিরিধারীর পুরো পরিবারের সলিল সমাধি ঘটবে !

বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ঘরে ফিরছিল লক্ষ্মণ। কিন্তু ঘরের উঠনে পা দিতেই ছুটে এলো মুনিয়া, লক্ষ্মণ দেখলো এমন ঠান্ডা দিনেও মুনিয়ার কপাল থেকে নেমে আসছে ঘামের শ্রোত,ও কাঁপছে, কোন রকমে বললো বুধুয়ার দেহ পাওয়া গেছে।

---- কোথায় ?

---- মুর্দাঘরের ছাদে।

---- ওখানে ওর দেহ এলো কী করে ? শকুনগুলো তো ওর দেহ নিয়ে পাহাড়ের জঙ্গলের দিকে চলে গিয়াছিল !

---- মুঝে কেয়া মালুম, তুমি তো সকালে ঘুম থেকে উঠেই জঙ্গলে চমৎকারলালের ভৈরবাবার মন্দিরে চলে গেলে, দুপুরে পুলিশ গ্রামে এসেছিল, বুধুয়ার ব্যাপারে পুছতাছ করছিল।

---- তু্ই কী বললি

---- আমায় কিছু জিজ্ঞেস করেনি, আমিই জিজ্ঞেস করেছি ও বডি ক্যায়সি মিলি, জানলাম মুর্দাঘরের ছাদে কে যেন ওর দেহটা ফেলে গেছে।

ভয়ে মাথার চুল মুঠো করে ধরেছে লক্ষ্মণ। তার মানে বুধুয়ার বডির পোস্টমর্টেম হবে, পুলিশ তদন্ত করবে, তা হলে শেষ রক্ষা হলোনা ! কিন্তু এটা কী করে সম্ভব !তারা তো নিজের চোখে দেখলো শকুনের দল বুধুয়ার দেহ নিয়ে উড়ে গেল !

।। তিন ।।

অন্ধকার থাকতে থাকতে লক্ষ্মণ আর মুনিয়া বেরিয়ে পড়েছে ভৈরবাবার মন্দিরের উদ্দেশে। যতক্ষণ না বুধুয়ার দেহ খুঁজে পাওয়া, গ্রামে পুলিশ আসার খবরটা চমৎকারলালকে দিতে পারছে, তারা যে ভালো করে নিঃশ্বাস নিতে পারবেনা। কালাশনি পাহাড়ের পায়ের কাছে শুয়ে থাকা জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়েছে ওরা। কয়েক পা সবে গেছে, এক লোটা বরফ - পানি যেন মাথার ভিতর থেকে গড়িয়ে নামলো ওদের

বুকের মধ্যে। প্রবল এক ভয় নিয়ে লক্ষ্মণ আর মুনিয়া তাকালো পরস্পরের চোখের দিকে, একটু দূরে পাহাড়ের গা থেকে শিরিষ গাছের এক বিশাল ডাল ঝুলে পড়েছে সামনের খাদের ওপরে , আর সেই ডালে বসে আছে শকুন, সেই ছ‘টা শকুন।

প্রাথমিক ভয় কাটিয়ে লক্ষ্মণ বললো, এখানে তো কোন ভাগাড় নেই, শকুন আসবে কেন!তাহলে এখানে কি কেউ গরু বা ছাগল মরা ফেলে গেছে ?

এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে

দেখার চেষ্টা করলো,জোর নিঃশ্বাস টেনে বোঝার চেষ্টা করলো কোন মৃতদেহের দূর্গন্ধ আছে কি না। দূর্গন্ধ তো দূরের কথা, অদ্ভুত, অচেনা এক সুগন্ধ পেল লক্ষ্মণ। কি রকম নেশার মতো, সেই সুগন্ধ মাথা ভারী করে দিলো, শরীর অবশ হয়ে আসছে। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে আরো কিছু কথা আরো একটা ভয় গলার কাছে উঠে এলো,তার অবশতা কেটে গেল।

কথাটা মনের মধ্যে ভেসে উঠতেই কেঁপে গেল সে, এরকম সুগন্ধের কাছে শকুন তো আসেনা, ভাগাড়ের যে গন্ধে বমি উঠে আসে শকুন আসে সেখানে। তাহলে !

সামনের দিকে তাকাতে ভয় পাচ্ছিল লক্ষ্মণ, তবুও তাকালো, ছ’টা শকুন স্থির বসে আছে ডালের ওপর, শুধু স্থির বসে নেই, যেন তাকিয়ে আছে তার দিকে, নিষ্পলক তাকিয়ে আছে, কিন্তু মানুষের এত কাছে শকুন স্থির বসে থাকে? খেতিতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছে মাঠের ধারে পড়ে থাকা গরু মরা, ছাগল মরার দিকে লোক এগিয়ে গেলে ওরা উড়ে পালায়, লক্ষ্মণকে এত কাছে দেখেও ওরা উড়ে যাচ্ছেনা কেন!

ভয় পেয়ে পেছনে ঘুরে দৌঁড়তে যাচ্ছিল লক্ষ্মণ, ধাক্কা খেল মুনিয়ার সঙ্গে। কখন যে মুনিয়া এসে পেছনে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি । আর এই জোর ধাক্কা একটুও আঘাত দিতে পারল না মুনিয়াকে, মুনিয়াও কিসে যেন আবিষ্ট, বরফে জমে যাওয়া দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে, লক্ষ্মণ ককিয়ে উঠে বললো, কী দেখছিস ?

কোন এক পাতাল থেকে উঠে এলো মুনিয়ার স্বর, বললো, দেখ শকুনগুলোর মাথায় কি বড়ো বড়ো লোম !

মুনিয়ার কথার পিঠেপিঠে শকুনগুলোর দিকে তাকাল লক্ষ্মণ,দেখালো শকুনগুলোর মাথায় বড়ো বড়ো লোম, অনেক দিন না কাটা চুল মানুষের মাথায় যেমন দীর্ঘ হয়ে থাকে ঠিক তাই, আবার সেই বরফ গলা জল নামলো লক্ষ্মণের বুকের মধ্যে, এতো জল অথচ গলার ভিতরটা শুকিয়ে কাঠ, ওদের দিকে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করলো শকুনের মাথায় চুল থাকে কি না? আর মনে পড়তে ভিতরটা আরও শূন্য হয়ে গেল লক্ষ্মণের, স্মৃতি তাকে বললো শকুনের মাথায় চুল মানে লোম থাকেনা, যাকে টাক বলে ঠিক তাই থাকে।

লক্ষ্মণ মুনিয়ার দিকে, মুনিয়া লক্ষ্মণের দিকে তাকালো, কেউ কোন কথা বললো না, দুজন দুজনের দিকে হাত এগিয়ে দিলো, ধরলো পরস্পরের হাত, তারপর পেছন ফিরে দৌড়।

দৌড় দৌড় আর দৌড়।

একটা সময় দমে নয়, ভয় দৌড়চ্ছিল ওরা। মুনিয়া আর পারলোনা, লক্ষ্মণ এটা দেখেনি, ও দাঁড়িয়ে পড়লো অন্য কারণে। দূরের দিক থেকে হেঁটে আসছে চমৎকারলাল, আর ওর পাশে এক বৃদ্ধ লাঠি হাতে।

কাছে আসতে দুজন দুজনকে দেখে অবাক। চমৎকারলালকে থামিয়ে দিয়ে লক্ষ্মণ বুধুয়ার দেহ মুর্দাঘরের ছাদে খুঁজে পাওয়া, ছ’টা শকুনকে কিছুক্ষন আগেই খাদের ওপরে নেমে আসা দীর্ঘ ডালে বসে থাকতে দেখা, ওদের শরীর থেকে উঠে আসা শরীর অবস করে দেওয়া সুঘ্রাণ, ওদের মাথার দীর্ঘ লোমের কথা, এক নিঃশ্বাসে বলে গেল।

চমৎকারলালের দু চোখ ভয়ে তে ছিটকে উঠল কপালে, পাশে দাঁড়ানো বৃদ্ধ কিন্তু সামান্যও উত্তেজিত হলোনা এসব কথায়। চমৎকারলালের দিকে অদ্ভুত হাসলো, গাছের শুকনো পাতার মতো চোখের নীচেটা, দুটো চোখ যেন মরা মাছি, সেইখানে ভেসে উঠলো হাসিটা, চমৎকারলালের দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে বললো, এ সারে বাত তুমকো ম্যায় আতে আতেহি

বাতা দিয়া না. লক্ষ্মণ অবাক, এই সমস্ত কথা এই বৃদ্ধ এখনে আসার সময়ে চমৎকারলালকে বলেছে ! কিন্তু উনি এসব কথা জানবেন কি করে ! উনি তো লক্ষ্মণ আর মুনিয়ার সঙ্গে ছিলেন না !

চমৎকারলাল বৃদ্ধকে দেখিয়ে বললো তোরা যেমন আমায় গুরুদেব মানিস , এই বুড়ো আমার গুরুদেব, কালবাবা,যখন আমার দিমাক কাজ করেনা তখন আমায়

ওঁর কাছে যেতে হয়, আর তু্ই যা যা আমাকে জানালি, এই সব কথা কালবাবা আমাকে জানিয়ে দিয়েছে, দু রাত আগে এই সমস্ত ঘটনা কালবাবা নিজের চোখে দেখেছে , জেনেছে আমার খুব বিপদ, তাই আমাকে সাবধান করতে আসছিল, আর রাস্তাতেই দেখা হলো, বললো তোদেরও খুব বিপদ, তোদের সঙ্গেও মুলাকাত জরুরি....

কালবাবার কথা বলার সময়ে কন্ঠস্বর কেঁপে যায়, কেঁপে যাওয়া গলায় বললো, আচ্ছা বলতো এই যে তোরা দেখলি ছ ‘টা শকুন মিলে বুধুয়ার দেহটা নিয়ে উড়ে গেল এটা তোরা ঠিক দেখেছিস ?

এই প্রবল ভয়ের মধ্যেও একটা বিচ্ছিরি রকমের রাগ ভেসে উঠলো লক্ষ্মণের মধ্যে, কালবাবা মানুষটা কি পাগল আছে, ঠিক দেখেছে এটা জিজ্ঞেস করার মানে ! চমৎকারলাল তো বলেইছে, একজন নয়, দুজন নয়, তারা তিনজনই দৃশ্যটা দেখেছে।

লক্ষ্মণের রাগটা মুখের ওপরে প্রকট হয়ে ভেসে উঠেছে। সেই রাগের দিকে তাকিয়ে কালবাবা অদ্ভুত একটা হাসি হাসলো, লক্ষ্মণের চোখে চোখ রেখে বললো আমি জানি আমার কথায় তোর গুস্সা হচ্ছে, কিন্তু তোর গুস্সার আগুন এক্ষুণি বরফ গলা পানি হয়ে যাবে.....

লক্ষ্মণের ঠোঁটে এখন আর কথা নেই, দুটো ঠোঁট কে যেন আঠা দিয়ে জুড়ে দিয়েছে।

কালবাবা বললো শকুনের শরীরে সবচেয়ে দুর্বল অঙ্গ কোনটা বলতো।

লক্ষ্মণ মুহূর্ত আগের মতোই নির্বাক।

কালবাবা তেমনি হাসলো, বললো শকুনের শরীরে সবচেয়ে দুর্বল অঙ্গ হলো ওদের পা, এর আগে কোনদিন দেখেছিস শকুন কোন প্রাণীর মৃতদেহ নিয়ে উড়ে যাচ্ছে ? দেখবি কি করে ! ওদের পা দুর্বল হওয়ায় ওরা মৃতদেহ নিয়ে ওড়েনা, উড়তে পারেনা, ওরা মৃতদেহের কাছে আসে, যেটুকু খেতে পারে খায় তারপর মৃতদেহ ফেলে রেখে উড়ে যায়.......

কালবাবার কথা আর কানে নিতে পারছেনা লক্ষ্মণ। শুধু লক্ষ্মণই নয়, চমৎকারলাল বা মুনিয়া কেউই শুনতে পারছেনা এই কথা গুলো, তার কারণ কালবাবার কথাগুলো যে সত্যের থেকেও বেশি, এই কথাগুলো যে নিজের চোখে দেখেছে তারা ! কিন্তু সেদিন তারা কি দেখেছিল তাহলে ! এবার আর কোন বরফ গলা জল মাথার দিক থেকে বুকের গভীরে নামলনা, যেন বরফ গলা জলে স্নান করে গেল তিনজন।

কালবাবা হাসলো, বললো আমি বুঝতে পারছি তোরা কী ভাবছিস, তোরা ভাবছিস তা হলে সেদিন আমরা কী দেখেছিলাম, তাইতো ?

তিনজনেই এক সঙ্গে ঘাড় নেড়ে বললো, হ্যাঁ।

কালবাবা বললো, সেদিন তোদের ওপরে শকুনতন্ত্র হয়েছে....

----- শকুনতন্ত্র! শুধু ভয় নয়, বিস্ময় নয়, এর মধ্যে একটা রাগও ভেসে উঠল চমৎকারলালের বলা কথাটায়। মানে আমার মতো তান্ত্রিক থাকতে এই পাহাড়ে আর কে তন্ত্র প্রয়োগ করবে! শুধু তাই নয় সে নিজে তান্ত্রিক, তার ওপরে তন্ত্র প্রয়োগ !

কালবাবা বললো শকুনতন্ত্র কী জানিস ? আসলে ঘটনাটা ঘটবে না , কিন্তু মানুষ দেখবে সেটা ঘটছে , এটাই তন্ত্রের খেলা, এক ভয়ঙ্কর খেলা.....

এত ভয়ের মধ্যেও কোথা থেকে যেন একটু সাহস পেল মুনিয়া, বললো এ কথা যদি সাচ হয় তবে বুধুয়ার দেহ মুর্দাঘরের ছাদে পৌঁছল কী করে ।

মুহূর্তের জন্য নীরব রইলো কালবাবা, তারপর বললো নিয়ে গেছে অন্য কেউ, কিন্তু তোদের দেখাল শকুন নিয়ে যাচ্ছে, আসল কে আড়াল করে দিলো, এটাই তো তন্ত্রের খেলা,না হলে বললনা তোরা যা বললি সেটা হয় কখনো ! শকুনের মাথায় কখনো চুল দেখেছিস ? শকুনের গা থেকে সুগন্ধ পাওয়া যায় ? তোরাই তো বললি, এরপরেও বলবি ওগুলো শকুন ?

চমৎকারলাল, লক্ষ্মণ, মুনিয়া তিনজনেই পাথর হয়ে গেছে। তারা যে স্পষ্ট দেখেছে শকুন, অথচ জানতে পারছে ওগুলো শকুন নয়।

ভিতরে উঠে আসা কৌতূহলকে ভয় চেপে রাখতে পারলনা, মুনিয়া বলে উঠল, তা হলে ওরা কী ?

কালবাবার কপালের সব রেখাগুলো ভেঙেচুড়ে গেল, আমিও ঠিক বুঝতে পারছিনা।

এখন শুধু নীরবতা। সবাই সবার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে। একটা কথা কি জানিস, শকুন কিন্তু সবসময় খারাপ নয়, শকুন কতো গন্ধেগি সাফ করে বলতো, এই যে গরু ভেড়া ছাগল মরে গেলে লোকে মাঠে ফেলে দিয়ে যায়, ওর মধ্যে কতো বিমারি থাকে জানিস ? শকুন তো মরা খেয়ে বিমারির থেকে আমাদের বাঁচিয়ে দেয়।

কালবাবার এসব কথার কোন মানেই বুঝতে পারছেনা তারা। তারা তো জানে শকুন মানেই অশুভ, শকুন মৃত্যুর প্রতীক, সে এলে তার সঙ্গে মৃত্যুও আসে , কিন্তু শকুন যে ভালো এ কথা কালবাবা কেন বলছে ?

কালবাবা বললো আমার কি মনে হয় জানিস শকুনগুলো গন্ধেগি সাফ করতে এসেছে, মাঠে ক্ষেতে নদীর ধারে পড়ে থাকা গরু ছাগলের মৃতদেহতে যে নোংরা থাকে তা নয়, মানুষের মনের মধ্যে, দিমাকের মধ্যে যে নোংরা আছে সেটা পরিষ্কার করতে এসেছে......

এসব কথার মানে তিনজনের কেউই বুঝতে পারছেনা। শুনতে শুনতে সমস্ত শরীর শিরশির করছে। কালবাবা বললো, আমার কি মনে হচ্ছে জানিস বুধুয়ার দেহ যখন পুলিশ পেয়েছে তাহিকীকত শুরু হবে, খুঁজতে খুঁজতে পুলিশ ঠিক তোদের কাছে পৌঁছে যাবে, তোদের মনের মধ্যে যে নোংরা আছে তা ওরা পরিষ্কার করতে এসেছে। চুপ করে গেল কালবাবা, তারপর হাঁ করে নিঃশ্বাস নিলো, যেন দমে খুব কষ্ট হচ্ছে, বললো, আমাকেও ছাড়বে না জানিস।

চমৎকারলাল রাগ, ভয়, সব মিলিয়ে প্রচন্ড জোরে চিৎকার করে উঠলো, বাবা তুমি তো সব জানো, তুমি বলতে পারছনা কার এতো সাহস, কার এতো ক্ষমতা আমাদের ওপরে তন্ত্র প্রয়োগ করে, তুমি শুধু নামটা বলো, ওকে আমি আজ রাতেই বলি দেব .....

কালবাবা বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তার কাছে কোন উত্তর নেই।

মুনিয়া কালবাবার স্তব্ধ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বললো বুধুয়ার পুরো খানদান তো সোমবাবার মন্দিরে জল চড়াতে গিয়েছিল, ওখানে ওরা কোন তন্ত্র করেনি তো !

কালবাবা যেন বিষ্ময়ের কুয়োতে পড়ে গেল, আঁতকে উঠে বললো, কব্?

যে রাতে বুধুয়ার বলি হলো তার আগের রাতে। কালবাবা বললো, সোমবাবার মন্দিরেও তন্ত্রক্রিয়া হয়, তবে বলি হয় না, ওরা বলে আমরা বলি দিইনা, আমরা দুনিয়া থেকে গন্ধেগি হাটানোর জন্য তন্ত্র করি, যদি বলি দিই তবে দুনিয়া থেকে খারাপটা মুছবে কি করে। এত ভয়ের মধ্যেও চমৎকারলাল হেসে উঠলো,বললো তুমি তাহলে বলতে চাইছো দুনিয়া থেকে আমাদের মুছে দেওয়ার জন্য শকুনগুলো এসেছে ?কালবাবা বললো, তাই তো মনে হচ্ছে....চমৎকারলাল রাগে কালবাবাকে পাহাড় থেকে ঠেলে ফেলে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু লক্ষ্মণের একটা কথায় থেমে গেল।

লক্ষ্মণ বললো, ও হি খুসবু আ রাহি হ্যায়। রাগ কালবাবার দিক থেকে ঘুরে গেল লক্ষ্মণের দিকে, চমৎকারলাল রেগে গিয়ে বললো, কোনসা খুসবু !

---- ঐ যে কিছুক্ষন আগে শিরিশগাছের ডালে যখন শকুনগুলো বসেছিল, যে সুগন্ধ পেয়েছিলাম সেই সুগন্ধ পাচ্ছি।

চমৎকারলাল গভীর করে শ্বাস নিলো। অথচ কোন গন্ধ পেল না।

কালবাবা বললো, তু্ই গন্ধ পাবিনা, আমাদের মধ্যে তোর ভিতর নোংরা সবচেয়ে বেশি। ও দিকে তাকা, সব বুঝতে পারবি।

কালবাবার দৃষ্টি অনুসরণ

করে সামনের দিকে তাকালো চমৎকারলাল। দেখতে পেলো সামনের দীর্ঘ এক গাছের মাথায়

ছ’টা শকুন বসে আছে।

কালবাবা বললো, ক’টা শকুন দেখছিস?

চমৎকারলাল কোন রকমে ঠোঁট খুলে বললো, ছ’ টা। কালবাবা হাসলো, পাঁচটাও নয়, সাতটাও নয়, ঠিক ছ’টা, কেন বলতো ?

চমৎকারলাল কি বলবে, সে তো কিছুই বুঝতে পারছেনা।

ও কে নীরব থাকতে দেখে কালবাবা বললো, একটা শকুন গিরিধারী, একটা শকুন ওর বৌ গৌরী, একটা রামুয়া, একটা জিতুয়া, আর দুজন ওদের দুই বৌ রেখা আর ঝিমলি, ঠিক ছ’টা প্রাণ, ওদের পুরো পরিবারটা ফিরে এসেছে...., আমাদের পালানোর কোন পথ নেই।

কালবাবার কথা শেষ হলো কি হলোনা, দীর্ঘ গাছের ওপর থেকে ছ ‘ টা শকুন ডানা মেলে দিলো, উড়ে আসতে থাকলো তাদের দিকে।


bottom of page