top of page
Search

বটতলা থেকে বইমেলা, লিখলেন কমলেন্দু সরকার

বটতলা থেকে বইমেলা


আশির দশকের শেষদিকে প্রথিতযশা সঙ্গীতজ্ঞ এবং সমালোচক রাজ্যেশ্বর মিত্রের সঙ্গে পরিচয়। তিনি দীর্ঘদিন 'দেশ' সাপ্তাহিক পত্রিকায় 'শার্ঙ্গদেব' নামে সঙ্গীত সমালোচনা করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে তাঁর সঙ্গে আলাপ। এসব অন্য প্রসঙ্গ। উনি থাকতেন শোভাবাজারের আশপাশে। আমারই উৎসাহে উনি একদিন আমাকে নিয়ে গেছিলেন নিধুবাবু যে-গাছের নীচে বসে আড্ডা মারেতেন সেই জায়গাটি দেখাতে। তারপর 'বটতলা' অঞ্চলটি দেখানোর জন্য।




'বটতলা' শব্দটি শুনলেই প্রায় অধিকাংশ বাঙালিরই মুখে তাচ্ছিল্যের ভাব প্রকাশ পায়। বটতলা শব্দটি শুনলেই মনে হয় কেমন যেন ভদ্রলোকের মুখখারাপ বা সাদা বাংলায় খিস্তি করা। কিন্তু বটতলা হল আদতে এই বাংলারই এক ঐতিহ্য, কলকাতার ঐতিহ্য সঙ্গে বাংলা বই, প্রকাশনার ঐতিহ্য। বরং বলা ভাল, বটতলা ছিল সাধারণ পাঠক আর বাঙালির কাছে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মুক্ত বিদ্যালয়।


আগে দেখে নিই বটতলার ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে সুকুমার সেন কি বলেছেন বা লিখেছেন, 'সেকালে অর্থাৎ আজ থেকে দেড়শ বছরেরও বেশি কাল আগে শোভাবাজার কালাখানা অঞ্চলে একটা বড় বনস্পতি ছিল। সেই বটগাছের শানবাঁধানো তলায় তখনকার পুরবাসীদের অনেক কাজ চলত। বসে বিশ্রাম নেওয়া হত। আড্ডা দেওয়া হত। গানবাজনা হত। বইয়ের পসরাও বসত। অনুমান হয় এই বই ছিল বিশ্বনাথ দেবের ছাপা, ইনিই বটতলা অঞ্চলে এবং সেকালের উত্তর কলকাতায় প্রথম ছাপাখানা খুলেছিলেন, বহুকাল পর্যন্ত এই ‘বান্ধা বটতলা’ উত্তর কলকাতায় পুস্তক প্রকাশকদের ঠিকানা চালু ছিল... ব্যাঙের ছাতার মতো অসংখ্য ছোট সস্তার প্রেস গড়ে ওঠে। এগুলির চৌহদ্দি ছিল দক্ষিণে বিডন স্ট্রিট ও নিমতলা ঘাট স্ট্রিট, পশ্চিমে স্ট্র্যান্ড রোড, উত্তরে শ্যামবাজার স্ট্রিট এবং পূর্বে কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট”।

বটতলা কেবলমাত্র এসব অঞ্চলের মধ্যে আটকা পড়ে থাকেনি। বটতলা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা কলকাতায়। সেইসময় কলকাতা বলতে মূলত উত্তরকেই বোঝাত। আর সেকালে কলকাতার অলিগলিতে বিভিন্ন ফেরিওয়ালা ডেকে যেত তাদের সামগ্রী নিয়ে। এরই মধ্যে নানান ফেরিওয়ালার ডাক ছাপিয়ে ভেসে উঠত, 'বই লিবি গো বই।' একজনের মাথায় বইয়ের ঝাঁকা। আগে আর একজন চলেছে তার মুখে ওই ডাক, 'বই লিবি গো বই।'

বাড়ির অন্দর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন কর্তা। বললেন, 'নামা তোর ঝাঁকা। কী কী আছে দেখি।" বই বিক্রেতা খুব খুশি। গড়গড় করে বলতে শুরু করল, 'চোর পঞ্চাশৎ, পারস্য ইতিহাস, চন্দ্রকান্ত, অন্নদামঙ্গল, বিদ্যাসুন্দর, দেবীযুদ্ধ, লায়লা মজনু, দশ অবতার, কলকাতার গুপ্তকথা, সচিত্র রতিশাস্ত্র, রাজরানি, রসমঞ্জরী, বিয়েবাড়ি, পাশ করা মাগ, এলোকেশী-মোহন্ত।' বাবুর আর তর সয় না। ঝাঁকা থেকে ঘেঁটেঘুঁটে বার করে নিলেন 'সচিত্র রতিশাস্ত্র', সেকালের রসালো খবর নিয়ে 'এলোকেশী-মোহন্ত সংবাদ' আর একটাকা সিরিজের 'রাজরানি'। ক্রেতা-বিক্রেতা দু'জনেই মহাখুশি!

এখন বইমেলায় স্টলগুলো যেমন বই সাজিয়ে রাখে উৎসাহী ক্রেতার অপেক্ষায়, তেমনই বটতলার বই বিক্রি হত ফেরিওয়ালার মাথায় ঝাঁকা চাপিয়ে। সেইসময় তো বইমেলার ধারণাটাও গড়ে ওঠেনি। তাই বলা যেতে পারে বটতলায় শুরু বইমেলার! বটতলার বই কলকাতা শহরকে ব্যবহার করে অর্থাৎ কলকাতার বাবু এবং বাবুর চাকরবাকর মহলকেও একছাতার তলায় এনেছিল। বাবুদের অধস্তনেরা যে-বিষয়ের বইয়ের ওপর আগ্রহী ছিলেন, বাবুরাও সে বিষয় সম্পর্কে একেবারেই যে অনাগ্রহী ছিলেন তা কিন্তু নয়। তাঁরাও ইতিউতি উঁকি দিয়ে লুকিয়েচুরিয়ে ঝাঁকামুটের কাছ থেকে অমন বই কিনতেন। বাবুর বাড়ির কাজের লোকেরা বটতলা গিয়ে বই কিনে আনতেন। শহরের সাধারণ মানুষের বিশাল একটা অংশের বটতলার বইয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল। বটতলায় অনেকগুলো ছাপাখানা একসঙ্গে গড়ে উঠেছিল। বইয়ের জোগান মূলত ছাপাখানা থেকেই হত।




তাই ক্রেতারা একটি দোকানে পছন্দসই বই না-পেলে, অন্য দোকানে সহজেই চলে যেতে পারতেন। কাছাকাছি দোকানগুলো থাকার ফলে বইয়ের একটি বিশাল বাজার তৈরি করতে পেরেছিল বটতলা। ঠিক আজকের কলেজ স্ট্রিটের মতন। তবে তফাত একটা ছিল বা আছে। কলেজ স্ট্রিটের প্রকাশকেরা কখনওই তাঁরা বই নিয়ে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছন না। ক্রেতারাই আসেন। সে কলেজ স্ট্রিটের বইয়ের দোকান হোক বা বইমেলা, সর্বত্র ক্রেতারাই ভিড় করেন। বটতলা কিন্তু মানুষ কিংবা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যেত। ফলে, উভয় ক্ষেত্রেই সুবিধা পাওয়া যেত।সেকালের কলকাতায় যাতায়াতের অসুবিধে তো ছিলই। তাই ক্রেতারা বাড়তি সুবিধা বা উৎসাহ বোধ করতেন দুয়ারে বই পৌঁছে যাওয়াতে? সবচেয়ে বড় কথা হল, বটতলায় এতসব বিচিত্র বিষয় ছিল যা বর্তমান কলেজ স্ট্রিটেও নেই।

কোন বিষয়ে বই ছাপেনি বটতলা! একদিকে ভারতচন্দ্রের 'অন্নদামঙ্গল', 'বিদ্যাসুন্দর', 'রামায়ণ', 'মহাভারত', পুজো পুস্তিকা, চাণক্য শ্লোক, পাশাপাশি ছাপা হচ্ছে কলিকাতার গুপ্তকথা, 'পাশকরা মাগ', কেয়াবাৎ মেয়ে, 'সেনাপতির গুপ্তকথা', 'সচিত্র রতিশাস্ত্র'। 'সচিত্র রতিশাস্ত্র' বইটি দেখেছিলাম শ্রদ্ধেয় রাধাপ্রসাদ গুপ্তের কাছে। ছবিগুলো ছিল হাতে রং করা। একালের ঝকঝকে 'কামসূত্র'কে বলে বলে দশ গোল দিতে পারে রাধাপ্রসাদ গুপ্তের সংগ্রহে থাকা 'সচিত্র রতিশাস্ত্র'। ছোট্ট, সুরু মতো কাঠের বাক্সের মধ্যে এটি ছিল। অবাক হলাম, সেকালের প্রকাশকরাও কত আধুনিকমনস্ক ছিলেন! যাইহোক, একএটি এক অমূল্য সম্পদ। আমার সৌভাগ্য যে, সেই অমূল্য সম্পদ চাক্ষুষ করেছিলাম!


সেকালের গরম মুখরোচক এলোকেশী-মহান্ত ঘটনা নিয়ে প্রচুর পুস্তিকা-সহ মদ্যপান, লাম্পট্য, বেশ্যাসক্তি, স্ত্রীচরিত্র-সহ বহুরকম বিষয়ের বই প্রকাশিত হত বটতলায়। বটতলার বইয়ে বিষয়বৈচিত্র যেমন ছিল, তেমনই ছিল ছবির ব্যবহার! বইতে ছবি দিলে পাঠকদের যে বাড়তি আকর্ষণ করত তা বুঝেছিলেন বটতলার প্রকাশকেরা। ১৮১৬ সালে ফেরিস কোম্পানির ছাপাখানায় মুদ্রিত ভারতচন্দ্রের 'অন্নদামঙ্গল'-এ ছিল ছ'টি ছবি। এটিই হল প্রথম সচিত্র বাংলা বই।



প্রকাশক গঙ্গাকিশোর ভাট্টাচার্য। প্রথম বাঙালি প্রকাশক। ছবি এঁকেছিলেন বাঙালি শিল্পী রামচাঁদ রায়। এর অনেক পর বটতলায় ছাপা হয় 'অন্নদামঙ্গল', আহিরিটোলার চৈতন্য-চন্দ্রোদয় প্রেসে, মূল্য- দু'পয়সা। বটতলার বইতে ছবি আঁকতেন-- হীরালাল কর্মকার, বীরচন্দ্র দাস, নৃত্যলাল দত্ত, গোপীচরণ স্বর্ণকার প্রমুখ শিল্পী। এঁদের মধ্যে অনেকেই বাস করতেন বটতলাতেই। এমনকী, বটতলার বইয়ে দেখা গেছিল, কালীঘাট পট এবং কাঠখোদাইয়ের ছাপা ছবিও।

বটতলার বই আমজনতার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ ছিল ভাষা। যতটা সম্ভব চলতি ভাষা ব্যবহার করে আটপৌরে শব্দ এবং বাক্যগঠনকে ভর করে মেজাজটি ধরেছিল বটতলা। ফলে, তৎকালীন বিশাল এক পাঠকসমাজ ধরেছিল বটতলার লেখক-প্রকাশকেরা। এ-প্রসঙ্গে আরও একটি কথা বলা প্রয়োজন, বই বিক্রি করতে হলে বিজ্ঞাপন যে প্রধান শক্তি, তা বুঝেছিলেন বটতলার প্রকাশকেরা। তাই পঞ্জিকার পাতায় পাতায় আর বইয়ের দুই মলাট, সামনে আর পিছনে বইয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হত। 'লক্ষ্য পাঠক ধরা'। সবচেয়ে বেশি মানুষ পঞ্জিকা দেখেন বা বিভিন্নকাজে ব্যবহার করেন। আর পঞ্জিকার পাঠক শিক্ষিত এবং অল্প শিক্ষিত মানুষ-সহ সকলেই। সেইসব বটতলার বইয়ের বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল সর্বজনগ্রাহ্য

বটতলার বইয়ের বিপণনের কথা পূর্বেই বলা আছে। ঝাঁকামুটের মাথায় বই নিয়ে শহরের অলিগলিতে বাড়িতে বাড়িতে বই বিক্রি। সেকালে যা সম্ভব একালে তা হয়তো কখনওই সম্ভব নয়। তাই মেলা করে সারা পৃথিবীর বই পাঠকের সামনে তুলে ধরা। কলকাতা বইমেলা সেটাই করছে। জানা যায়, বটতলার বিভিন্ন বইয়ের দোকানে বই সাজিয়ে ছাড়ে বই বিক্রি করা হত বছরের কোনও একটা সময়। বটতলা যা শুরু করেছিল তারই চারণভূমি কলকাতা বইমেলা।

bottom of page