top of page

অক্ষয় তৃতীয়া এবং জগন্নাথদেবের চন্দন যাত্রা | সামার-কুল আই মেকআপ | কন্যাসন্তানের জন্য বিনিয়োগ | রবিবারের গল্প: না বলা কথা


অক্ষয় তৃতীয়া এবং জগন্নাথদেবের চন্দন যাত্রা


ভারতীয় সংস্কৃতিতে গ্রীষ্মকালীন ধর্মীয় উৎসবগুলির মধ্যে অক্ষয় তৃতীয়া একটি অত্যন্ত পবিত্র ও শুভ তিথি হিসেবে পরিচিত। এই দিনটি বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে পালিত হয় এবং হিন্দু ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ‘অক্ষয়’ শব্দের অর্থ হলো যা কখনও ক্ষয় হয় না অর্থাৎ এই দিনে করা যে কোনো শুভ কাজ, দান বা পূণ্য কর্ম চিরস্থায়ী ফল প্রদান করে বলে বিশ্বাস করা হয়।


অক্ষয় তৃতীয়া হিন্দু পঞ্জিকার বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া অর্থাৎ শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথি। এটি হিন্দু ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ তিথি। এই শুভদিনে বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম জন্ম নিয়েছিলেন, এ জন্য এই দিনটি পরশুরাম জয়ন্তী হিসেবেও পালন করা হয়। বেদব্যাস ও গণেশ এই দিনে মহাভারত রচনা আরম্ভ করেন। এদিনই সত্য যুগ শেষ হয়ে ত্রেতাযুগের সূচনা হয়। এদিনই রাজা ভগীরথ গঙ্গা দেবীকে মর্ত্যে নিয়ে এসেছিলেন। এদিনই কুবেরের তপস্যায় তুষ্ট হয়ে মহাদেব তাকে অতুল ঐশ্বর্য প্রদান করেন। কুবেরের এই দিন লক্ষ্মী লাভ হয়েছিল বলে, এদিন বৈভব-লক্ষ্মীর পূজা করা হয়।



অক্ষয় তৃতীয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পুরাণকথা। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই ভগবান পরশুরাম জন্মগ্রহণ করেন। আবার মহাভারতের সময়ে পাণ্ডবরা এই দিনে অক্ষয় পাত্র লাভ করেছিলেন, যা কখনও শূন্য হতো না। এছাড়াও, এই দিনেই গঙ্গা দেবী পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন বলে অনেকের বিশ্বাস। ফলে এই তিথি নতুন কাজ শুরু, সোনা কেনা, বা বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত শুভ বলে ধরা হয়। এই একই দিনে শুরু হয় চন্দন যাত্রা, যা জগন্নাথ মন্দির-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এটি মূলত ভগবান জগন্নাথ, বলভদ্র এবং সুভদ্রা-কে কেন্দ্র করে পালিত হয়। চন্দন যাত্রা গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপ থেকে দেবতাদের শীতলতা প্রদান করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত হয়।


চন্দন যাত্রা সাধারণত ২১ দিনব্যাপী একটি উৎসব, যা দুই ভাগে বিভক্ত—বাহার চন্দন এবং ভিতর চন্দন। প্রথম ২১ দিনে দেবতাদের মূর্তি মন্দিরের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং জলাশয়ে নৌকাবিহার করানো হয়। এই সময় দেবতাদের শরীরে চন্দন লেপন করা হয়, যাতে তারা শীতল থাকেন। এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো নৌকাবিহার। নরেন্দ্র পুষ্করিণী-তে দেবতাদের সুশোভিত নৌকায় ভ্রমণ করানো হয়। ভক্তরা এই দৃশ্য দেখতে ভিড় জমান এবং ভক্তিমূলক সঙ্গীত, কীর্তন ও আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পুরো পরিবেশ এক উৎসবমুখর আবহে ভরে ওঠে। চন্দন যাত্রার ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি এর সাংস্কৃতিক গুরুত্বও অপরিসীম। এটি ওড়িশার ঐতিহ্য, শিল্প এবং ভক্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এই উৎসবের মাধ্যমে মানুষ ভগবানের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন এবং একসঙ্গে মিলিত হয়ে আনন্দ উদযাপন করেন।



অক্ষয় তৃতীয়া এবং চন্দন যাত্রা এই দুটি উৎসব একসঙ্গে শুরু হওয়ার ফলে এর তাৎপর্য আরও বেড়ে যায়। একদিকে যেমন অক্ষয় তৃতীয়া নতুন সূচনা ও চিরস্থায়ী মঙ্গল কামনার প্রতীক, অন্যদিকে চন্দন যাত্রা ভক্তি, শীতলতা এবং ঐতিহ্যের প্রতিফলন।


বাংলা এবং ওড়িশা সহ ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এই দিনটি অত্যন্ত শ্রদ্ধা ও আনন্দের সঙ্গে পালিত হয়। অনেকেই এই দিনে দান-পুণ্য করেন, নতুন ব্যবসা শুরু করেন বা মূল্যবান জিনিস কেনেন। একই সঙ্গে জগন্নাথদেবের চন্দন যাত্রা দর্শনের জন্য অসংখ্য ভক্ত পুরীতে ভিড় করেন। অক্ষয় তৃতীয়া এবং জগন্নাথদেবের চন্দন যাত্রা আমাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসবগুলো শুধু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের বিশ্বাস, ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিকতার গভীর প্রকাশ। এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় ভক্তি, দান এবং শুভ কর্মের মধ্যেই নিহিত রয়েছে জীবনের প্রকৃত শান্তি ও সার্থকতা।



এবছর এই তিথি কবে?


বাংলা বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিটি অক্ষয় তৃতীয়া হিসেবে পরিচিত। এবছর ১৯ এবং ২০ এপ্রিল দুই দিনই পড়েছে তৃতীয়ার তিথি। বেণীমাধব শীলের পঞ্জিকা অনুযায়ী, ৫ বৈশাখ, রবিবার (১৯ এপ্রিল ২০২৬) দুপুর ১ টা ১৪ মিনিটের পর থেকে পরের দিন অর্থাৎ, ৬ বৈশাখ সোমবার (২০ এপ্রিল ২০২৬) সকাল ১০ টা ৫৩ মিনিট পর্যন্ত অক্ষয় তৃতীয়া।


বিশেষ আচার:

অক্ষয় তৃতীয়ার এই শুভ সময়ে গায়ে হলুদ, স্বাদ ভক্ষণ, আইবুড়োভাত খাওয়ান, নামকরণ, দেবতার মূর্তি তৈরি, নতুন ব্যবসা শুরু, গাড়ি ও বাড়ি কেনা, বাড়ি তৈরি করার মত কিছু শুভ কাজ করতে পারেন। কারণ, শাস্ত্রীয় মতে, এই বিশেষ দিনের প্রতিটি মুহূর্তই অত্যন্ত শুভ।


সামারকুল আই মেকআপ: গরমের দিনে চোখের সাজে শীতলতার ছোঁয়া


গ্রীষ্মকাল মানেই তীব্র রোদ, আর্দ্রতা এবং ঘামের অস্বস্তি। এই সময়ে ভারী মেকআপ যেমন অস্বস্তিকর লাগে, তেমনি তা দীর্ঘক্ষণ টিকেও না। তাই গরমের দিনে প্রয়োজন এমন একটি মেকআপ স্টাইল, যা হবে হালকা, আরামদায়ক এবং দীর্ঘস্থায়ী। সামারকুল আই মেকআপ ঠিক সেই চাহিদাকেই পূরণ করে। এটি এমন এক ধরনের চোখের সাজ, যা আপনার লুককে সতেজ, প্রাণবন্ত এবং স্বাভাবিক রাখে, এমনকি প্রচণ্ড গরমেও। সামারকুল আই মেকআপের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর রং এবং টেক্সচার। এখানে সাধারণত ব্যবহার করা হয় কুল টোনের হালকা রং—যেমন আকাশি নীল, মিন্ট সবুজ, ল্যাভেন্ডার, সফট পিঙ্ক কিংবা পিচ। এই রংগুলো চোখে এক ধরনের প্রশান্তির অনুভূতি এনে দেয় এবং গরমের তীব্রতা থেকে দৃষ্টিকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। গাঢ় ও ভারী শেডের বদলে এই হালকা রংগুলো ব্যবহারে লুক হয়ে ওঠে আরও ফ্রেশ এবং ট্রেন্ডি।



গরমের দিনে মেকআপ টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাইমার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আই মেকআপ শুরু করার আগে একটি ভালো আই প্রাইমার ব্যবহার করলে আইশ্যাডো দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয় এবং ক্রিজ পড়ে না। ঘাম বা তেল জমলেও প্রাইমার মেকআপকে জায়গায় ধরে রাখতে সাহায্য করে। তাই এটি সামার মেকআপের একটি অপরিহার্য ধাপ। আইশ্যাডোর ক্ষেত্রে গরমে কম ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। একটি বা দুটি শেড ব্যবহার করলেই সুন্দর লুক তৈরি করা যায়। দিনের বেলায় ম্যাট শেড বেশি উপযোগী, কারণ তা কম ছড়ায় এবং ন্যাচারাল দেখায়। তবে সন্ধ্যা বা পার্টির জন্য হালকা শিমার ব্যবহার করা যেতে পারে, যা চোখে আলাদা এক ঝলক যোগ করে।


আইলাইনার বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া জরুরি। গরমে সহজেই লাইনার ছড়িয়ে পড়তে পারে, তাই ওয়াটারপ্রুফ এবং স্মাজ-প্রুফ ফর্মুলা ব্যবহার করাই ভালো। কালো লাইনারের পাশাপাশি নীল, সবুজ বা ব্রাউন লাইনার ব্যবহার করলে লুকে নতুনত্ব আসে এবং তা সামার থিমের সঙ্গে ভালো মানিয়ে যায়। মাসকারা ব্যবহারে খুব বেশি ভারী লেয়ার না দিয়ে একটি বা দুটি কোট ব্যবহার করাই যথেষ্ট। ওয়াটারপ্রুফ মাসকারা ব্যবহার করলে তা ঘামে নষ্ট হয় না এবং চোখের নিচে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও কমে। যারা একদম ন্যাচারাল লুক পছন্দ করেন, তারা ক্লিয়ার মাসকারা ব্যবহার করতে পারেন।



কাজল ব্যবহার করতে গেলে একটু সাবধানতা দরকার। গরমে কাজল সহজেই স্মাজ হয়ে যেতে পারে। তাই ওয়াটারপ্রুফ কাজল ব্যবহার করা উচিত এবং খুব বেশি না লাগানোই ভালো। নিচের ওয়াটারলাইনে হালকা করে লাগালে চোখ বড় ও উজ্জ্বল দেখায়, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহার করলে তা উল্টো লুক নষ্ট করতে পারে। ভ্রু বা ব্রাউ মেকআপের ক্ষেত্রেও ন্যাচারাল লুক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। খুব বেশি ডার্ক বা শার্প ব্রাউ না করে হালকা ব্রাউ পাউডার বা জেল দিয়ে ভ্রুকে সেট করলে পুরো লুকটি আরও সফট এবং স্বাভাবিক দেখায়। গরমের দিনে অতিরিক্ত ডিফাইন করা ব্রাউ অনেক সময় কৃত্রিম দেখাতে পারে।


ত্বকের ধরন অনুযায়ী মেকআপ নির্বাচন করাও জরুরি। তৈলাক্ত ত্বকের ক্ষেত্রে অয়েল-ফ্রি এবং ম্যাট ফিনিশ প্রোডাক্ট ব্যবহার করা উচিত। শুষ্ক ত্বকের জন্য ক্রিম-বেসড আইশ্যাডো ভালো কাজ করে, কারণ তা সহজে ব্লেন্ড হয় এবং ত্বককে শুষ্ক দেখায় না। সংবেদনশীল ত্বকের জন্য হাইপোঅ্যালার্জেনিক প্রোডাক্ট ব্যবহার করা নিরাপদ।



ডেইলি লুক এবং পার্টি লুকের মধ্যে পার্থক্য রাখা উচিত। প্রতিদিনের জন্য হালকা একটি আইশ্যাডো, পাতলা আইলাইনার এবং সামান্য মাসকারাই যথেষ্ট। তবে বিশেষ কোনো অনুষ্ঠানে দুটি শেড ব্লেন্ড করে, সামান্য শিমার যোগ করে এবং একটু গাঢ় লাইনার ব্যবহার করলে লুকটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বর্তমানে সামার আই মেকআপে কিছু ট্রেন্ড বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যেমন মোনোক্রোম লুক, যেখানে একই রঙের বিভিন্ন শেড ব্যবহার করা হয়। আবার কালারফুল আইলাইনার ব্যবহার করেও সহজেই একটি স্টেটমেন্ট লুক তৈরি করা যায়। গ্লসি আইলিড বা নো-মেকআপ মেকআপ লুকও এই গরমে বেশ জনপ্রিয়।


সবশেষে মেকআপ সেট করার জন্য একটি ভালো সেটিং স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি মেকআপকে দীর্ঘস্থায়ী করে এবং গরমে ঘাম হলেও তা সহজে নষ্ট হয় না। পাশাপাশি কিছু সতর্কতাও মেনে চলা জরুরি—যেমন মেয়াদোত্তীর্ণ প্রোডাক্ট ব্যবহার না করা, অন্যের মেকআপ শেয়ার না করা, এবং প্রতিদিন মেকআপ তুলে ফেলা। সামারকুল আই মেকআপ এমন একটি স্টাইল যা কম প্রোডাক্টে বেশি সৌন্দর্য তুলে ধরে। সঠিক রং, হালকা টেক্সচার এবং সহজ কৌশল—এই তিনের সমন্বয়েই তৈরি হয় নিখুঁত গ্রীষ্মকালীন লুক। রোজকার অনন্যা ম্যাগাজিনের পাঠিকাদের জন্য এটি হতে পারে একটি আদর্শ গাইড, যা তাদের প্রতিদিনের সাজে এনে দেবে নতুন মাত্রা এবং স্বাচ্ছন্দ্য।


কন্যাসন্তানের জন্য বিনিয়োগ: নিরাপদ ভবিষ্যতের বুদ্ধিমত্তার পরিকল্পনা


বর্তমান সময়ে কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা শুধু একটি দায়িত্ব নয়, বরং একটি দূরদর্শী আর্থিক পরিকল্পনার অংশ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার এবং বিবাহ—সব ক্ষেত্রেই খরচ ক্রমশ বাড়ছে। তাই সময় থাকতে সঠিক বিনিয়োগ শুরু করা অত্যন্ত জরুরি। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ছোট ছোট সঞ্চয়ও ভবিষ্যতে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে।


কন্যাসন্তানের জন্য বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময়। যত তাড়াতাড়ি শুরু করা যায়, তত বেশি সময় পাওয়া যায় অর্থকে বাড়ানোর জন্য। এই দীর্ঘ সময়ে কম্পাউন্ডিং-এর সুবিধা পাওয়া যায়, যা বিনিয়োগের পরিমাণকে অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই শিশুর জন্মের পর থেকেই বিনিয়োগ শুরু করা হলে তা ভবিষ্যতে বড় আর্থিক সুরক্ষা দিতে পারে। ভারতে কন্যাসন্তানের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং নিরাপদ বিনিয়োগের একটি হলো সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনা। এই সরকারি প্রকল্পটি বিশেষভাবে কন্যাদের ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে তৈরি। এতে নির্দিষ্ট হারে সুদ পাওয়া যায়, যা সাধারণ সেভিংস স্কিমের তুলনায় বেশি। এই স্কিমে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে হয় এবং মেয়ের ১৮ বা ২১ বছর বয়সে তা ব্যবহার করা যায়—বিশেষত উচ্চশিক্ষা বা বিবাহের জন্য।



এর পাশাপাশি পাবলিক প্রভিডেন্ট ফান্ড (PPF) একটি নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যম। এতে ট্যাক্স ছাড় পাওয়া যায় এবং সুদের হারও তুলনামূলকভাবে ভালো। যদিও এটি সরাসরি কন্যাসন্তানের নামে না হলেও, অভিভাবক নিজের নামে খুলে ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারেন।

ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিট (FD)-ও একটি জনপ্রিয় অপশন। এটি ঝুঁকিমুক্ত এবং নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট রিটার্ন দেয়। যারা ঝুঁকি নিতে চান না, তাদের জন্য এটি একটি ভালো বিকল্প। তবে এতে রিটার্ন তুলনামূলকভাবে কম, তাই দীর্ঘমেয়াদে বড় লক্ষ্য পূরণে একে একমাত্র মাধ্যম হিসেবে রাখা উচিত নয়।



যদি একটু বেশি রিটার্নের লক্ষ্য থাকে, তাহলে মিউচুয়াল ফান্ড একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। বিশেষ করে SIP (Systematic Investment Plan) পদ্ধতিতে প্রতি মাসে অল্প অল্প করে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে ভালো রিটার্ন পাওয়া যায়। ইকুইটি মিউচুয়াল ফান্ডে ঝুঁকি থাকলেও, দীর্ঘ সময়ে তা অনেক বেশি লাভজনক হতে পারে। এছাড়াও শিশুদের জন্য বিশেষ কিছু ইনস্যুরেন্স প্ল্যান রয়েছে, যেগুলোকে চাইল্ড ইনস্যুরেন্স প্ল্যান বলা হয়। এতে সঞ্চয় ও বীমা—দুটিই একসঙ্গে পাওয়া যায়। কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই সুরক্ষা এই পরিকল্পনাগুলো দেয়।


তবে শুধু বিনিয়োগ করলেই হবে না, পরিকল্পনাও হতে হবে সঠিক। প্রথমেই লক্ষ্য নির্ধারণ করা জরুরি—আপনি কি সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য সঞ্চয় করছেন, নাকি বিবাহের জন্য? লক্ষ্য অনুযায়ী বিনিয়োগের মাধ্যম নির্বাচন করলে পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। ঝুঁকি ও রিটার্নের মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব টাকা নিরাপদ স্কিমে রাখলে রিটার্ন কম হবে, আবার সব টাকা ঝুঁকিপূর্ণ স্কিমে রাখলে অনিশ্চয়তা বাড়বে। তাই একটি ব্যালান্সড পোর্টফোলিও তৈরি করা উচিত—যেখানে কিছু টাকা নিরাপদ স্কিমে এবং কিছু টাকা উচ্চ রিটার্নের সম্ভাবনাময় স্কিমে বিনিয়োগ করা হবে।



নিয়মিত বিনিয়োগ এবং পর্যবেক্ষণও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাজারের অবস্থা, সুদের হার, এবং ব্যক্তিগত আর্থিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সময়ে সময়ে পরিকল্পনা পরিবর্তন করা উচিত। এতে করে বিনিয়োগ আরও কার্যকর হয়। কন্যাসন্তানের জন্য বিনিয়োগ শুধুমাত্র অর্থ সঞ্চয়ের বিষয় নয়, এটি তার স্বপ্ন পূরণের একটি শক্ত ভিত তৈরি করা। আজকের ছোট উদ্যোগই আগামী দিনের বড় সাফল্যের পথ তৈরি করে। তাই দেরি না করে এখনই একটি সুসংগঠিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা শুরু করা উচিত, যাতে আপনার কন্যা ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।

না বলা কথা

সুপ্তা আঢ্য


বিকেল ৪.১৫ নাগাদ হাওড়া স্টেশনে রাজধানী এক্সপ্রেসের ফার্স্ট ক্লাস কম্পার্টমেণ্টের নিজের কূপে গুছিয়ে বসলেন বিখ্যাত আইনজীবী সুরঞ্জন সেন। এসি কম্পার্টমেণ্টে ট্রেনের আওয়াজ বিরক্তির সঞ্চার করে না বলেই বোধহয় ট্রেনের দুলুনিতে একটা ঘুম ঘুম আমেজ আসে। জানালার পর্দাগুলো সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে আনমনা হতেই স্মৃতিগুলো পরপর জুড়ে মেঘমালার মতো সেজে উঠছিল।


কলকাতার ছেলে সুরঞ্জন গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে আইন পড়তে দিল্লীর ল কলেজে ভর্তি হয়েছিল; সে প্রায় বছর কুড়ি আগেকার কথা। আজকের স্বভাবগম্ভীর সুরঞ্জন সেদিন ছিল যৌবনের রঙে রঙিন উচ্ছ্বল এক যুবক। এলোমেলো একমাথা ঝাঁকড়া চুল,গালে হাল্কা দাড়ি আর টানা চোখের ফর্সা,প্রায় পাঁচ ফুট এগারোর ছেলেটা কলেজ, পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধব, আড্ডায় মেতে হেসে খেলে কাটাবে ভাবলেও থার্ড ইয়ারে অন্য কিছু অপেক্ষা করছিল।

ফার্স্ট ইয়ারের নতুন ক্লাস শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্টরা ফ্রেশার্সের প্রিপারেশন শুরু করে দিল। একদিন ফার্স্ট ইয়ারের ডিপার্টমেন্টে ওদের সাথে ইনট্রো শুরু করতে সিনিয়রদের আন্তরিকতায় খুব সহজেই মিশে গিয়েছিল ওরা। হঠাৎ সুরঞ্জনের চোখে পড়ল লাস্ট বেঞ্চের মেয়েটা চুপচাপ বাইরে তাকিয়ে আছে। একটু অবাক হয়ে ওর কাছে গিয়ে 'হাই' বলতেই মুখ ঘুরিয়ে মিষ্টি করে হাসতেই ওই চোখের গভীরে হারিয়ে গিয়েছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য; হঠাৎ পলাশের ডাকে যে অপ্রস্তুতের হাসি হেসেছিল,তা দেখে বন্ধুরা জোরে হেসে উঠতেই কপট রাগে বাইরে চলে এসেছিল। পলাশের প্রশ্নে প্রথমে এড়িয়ে গেলেও পলাশের জোরাজুরিতে স্বীকার করে নিল ওর সত্যিই ভালো লেগেছে; কিন্তু কী লাভ! হোয়্যার অ্যাবাউটস তো কিছুই জানেনা। পলাশ আশ্বস্ত করলেও মন কিছুতেই মানছিল না। হাজারো প্রশ্ন মাথায় ভিড় করে আসছিল।


প্রোগ্রামের প্রায় শেষে বন্ধুদের জোরাজুরিতে মাউথ অর্গ্যানটা নিয়ে স্টেজে উঠে ইতিউতি তাকাতেই খুঁজে পেয়ে গেল; ওর দিকেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সে। এই চাহনির সামনে বোবা হয়ে যাচ্ছিল সুরঞ্জন। মাউথ অর্গ্যানে মান্না দে'র একটা গানের সুর তুলেছিল ও।গান শেষে ওর দিকে তাকাতেই মনে হল ও চোখের না বলা ভাষা হাতছানি দিচ্ছে সুরঞ্জনকে। সুরঞ্জনের চোখেও একটা ঘোর! স্টেজ থেকে নামতে ফার্স্ট ইয়ারের অনেকে ঘিরে ধরলেও ওর চোখ যাকে চায় সে ভিড়ে গা না ভাসিয়ে চুপচাপ চলে যাচ্ছিল। সুরঞ্জনের ইচ্ছে করলেও মুখে সাড়া জোগাচ্ছিল না।

বেশ কিছুদিন পর পলাশ ওকে যার সামনে নিয়ে গেল তাকে দেখে সুরঞ্জন জাস্ট বোবা! পলাশ ওদের নিজেদের মতো করে থাকার সুযোগ করে দিয়ে কখন যে চলে গেছে ওদের হুঁশই হয়নি। হঠাৎ অপর দিকের মানুষটা বলে উঠল,আপ বহৎ আচ্ছে মাউথ অর্গ্যান বাজাতে হো। মুঝে অর একদিন শুননা হ্যায়… অকেলে।

জরুর শুনায়েঙ্গি।এক বাত কহুঁ?

ম্যায় তো কবসে ইন্তেজার কর রাহি হুঁ কুছ শুননে কে লিয়ে।



মানে?

আপ বাঙ্গালী হো?

হাঁ,কিঁউ! মুঝসে বাত নেহি করেঙ্গে?

আভি সে তো অওর জাদা বাত করেঙ্গে।

মেরি মা বাঙ্গালী হ্যায়।আমরা বেঙ্গলীতে কোথা বলতে পারি না?

তোমাকে কী নামে ডাকব?

হামার নাম সুনয়না আছে। অওর তুমি সু-র-ঞ্জ-ন দাদা।

অনেকক্ষণ থেকেই সুনয়নার নরম হাতটা ওর হাতের মধ্যেই ছিল।'দাদা' শুনে হাতটা এক ঝটকায় ছেড়ে বলল,কোই দাদা নেহি,ওনলি সুরঞ্জন।

লজ্জায় মুখ নামাতেই ও বলল,তুমি জানো,প্রথম দিনেই তোমার চোখে হারিয়ে গেছিলাম।

ইতনা টাফ বেঙ্গলী!

সুরঞ্জন হেসে বলল,ম্যায় খো গ্যয়া থা তুমহারে আঁখো মে।



ম্যায় ভি।

মতলব!

মুঝে ভি খোনা হ্যায় তুমহারে আঁখোমে।

স্থান, কাল ভুলে সুরঞ্জন জড়িয়ে ধরল ওকে।

সেদিন বলতে পারেনি,কিন্তু আজ বোঝেন,সুনয়না আজও ওনার ভালোবাসা। গরম জলে টি ব্যাগটা ডুবিয়ে আয়েস করে চায়ে চুমুক দিতেই পলাশের গলাটা বহুদূর থেকে শুনতে পেল।

সাম হো গ্যয়ি,ঘর নহি জায়োগি।

সুরঞ্জন ওর কপালে ভালোবাসার চিহ্ন আঁকতেই ওর বুকে মুখ লুকোলো সুনয়না।

কিছুক্ষণ পর সুনয়না চলে যেতেই একটা অদ্ভুত আবেশ সুরঞ্জনকে ঘিরে রইল।কাউকে ভালোবাসার আবেশ যে এতটা সুন্দর, সেটা জানা ছিল না ওর। এলোমেলো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে হস্টেলে ফিরে চোখে হাত চাপা দিয়ে শুয়ে পড়ল ও।

সুরঞ্জন বাঙালি হওয়ায় সুনয়নার মা একটু অন্য চোখেই দেখতেন ওকে। সু'র বাবা-মা ওদের সম্পর্কটা বেশ ভালোভাবে মেনে নিলেও সুরঞ্জন বাড়ীতে কাউকে কিছু জানায়নি।রাশভারী প্রকৃতির মানুষ সুরঞ্জনের বাবা ছিলেন কলকাতার বড় উকিল।বাড়ী হোক বা কোর্ট,কোথাও কারোর সাহস হত না ওনার মুখের ওপর কথা বলার।


হঠাৎ ট্রেনটা থামতে বাস্তবের মাটিতে ফিরে এলেন সুরঞ্জন সেন। কোনো একটা স্টেশনে ট্রেনটা থেমেছে।ঘড়ির কাঁটা এখন রাত দশটায়। ফয়েলে প্যাকড খাবারটা খেতে ইচ্ছে করছিল না একেবারেই। বদলে উইদাউট সুগার এককাপ ব্ল্যাক কফি পেলে বেশ হতো। প্যাণ্ট্রি কারের ছেলেটাকে ডেকে রিকোয়েস্ট করতে ও আনতে যেতেই সুরঞ্জনও বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়ে বাইরের অন্ধকার প্রকৃতিকে দেখতে লাগলেন। মাঝেমধ্যেই সিগারেটের স্ফুলিঙ্গ অন্ধকারে ছোট ছোট সোনার কুচির মতো জ্বলেই নিভে যাচ্ছিল। বেশ লাগছিল সুরঞ্জনের। খোলা হাওয়ায় এলোমেলো চুলগুলোর মতো ভাবনাগুলোও ছিল বড্ড এলোমেলো।

সিগারেটের ধোঁয়ার রিংটা ওপরে ছেড়ে বাকিটুকু ফেলে ব্ল্যাক কফিটা বানিয়ে একটা চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করতেই যোজন দূর থেকে সুনয়নার গলা…

কাল তুম চলা যায়েগা না? তুমহারে বিনা ক্যায়সে গুজারু ম্যায়!

মাথা নীচু করে বসেছিল সুরঞ্জন। সু'কে ছেড়ে যেতে বুকের ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছিল ওর। নিজের কষ্ট লুকোতে সুনয়নাকে বুকের মাঝখানে জড়িয়ে ধরেছিল।সুনয়নাও শেষবারের মতো ওর কবোষ্ণ বুকের ওমে নিজেকে ভরিয়ে নিচ্ছিল।



রঞ্জন,মুঝে ভুল তো নেহি যাওগি?

নিজের বুকের মাঝে একেবারে মিশিয়ে নিয়ে বলল,তুম মেরি শ্বাস হো সু। ম্যায় এভরি উইকমে চিটঠি ভেজুঙ্গা। আই উইল ওয়েট ফর ইউ।

জলদি জলদি পঢ়াই খতম করকে মেরে পাশ আনা রঞ্জন।

সুনয়নাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওর ঠোঁটে নিজের ঠোঁটটা মিশিয়ে দিল সুরঞ্জন। সেদিন প্রিয়ার চোখের জল অধরসুধার সাথে মিশে এক অন্য আস্বাদনের অনুভূতি এনে দিয়েছিল যা আজও চোখ বন্ধ করলেই অনুভব করতে পারে।

কফিটা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেলেও কষা ভাবটা জিভে এখনও লেগে আছে। হাতঘড়িতে দেখল মধ্যরাত পার হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগেই।কী অদ্ভুত ভাবে রাতের নীরবতা ভেদ করে আপন গতিতে ডেস্টিনেশনে এগিয়ে চলেছে ট্রেনটা। ঘষা জানালার কাঁচের ভেতর থেকে বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারে আলেয়ার আলোর বিন্দু ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।

আজকের রাতটা বহু বছর পর এসেছে সুরঞ্জনের জীবনে। প্রতিটা রাত একা থাকলেও সারাদিনের পরিশ্রমের পর দুচোখ জুড়ে ক্লান্তির ঘুম নেমে আসে। আজ ক্লান্তি থাকলেও চোখ ঘুমহীন। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই মায়ের মুখটা ভেসে উঠল।

কয়েকটাদিন পর কতদূর চলে যাবি। ইচ্ছেমতো আসতেও পারবি না।এর থেকে হস্টেলই ভালো।

তুমি এরকম করলে যাব কিকরে? তাহলে কী এখানেই বাবার জুনিয়র হিসেবে কাজ শুরু করব?

তোর বাবার স্বপ্ন তোকে ব্যারিস্টার হতে দেখা।

তোমার স্বপ্ন!


ভালো মানুষ হওয়া যে অন্যের ফিলিংসকে সম্মান দেবে।

কয়েকদিন পর থেকেই বাড়িতে মন টিকছিল না ওর। বাড়ীর ফোনে কলার আইডি থাকায় বুথ থেকেই ফোন করে সু'র গলাটা শুনতে হতো। হাতখরচটুকু ফোনেই চলে যেত, সিগারেটের পয়সাটুকুও থাকত না। এস টি ডি কলের চার্জ কখনোই ওদের প্রেমের সময়টা বুঝত না।

দিল্লীতে থাকতেই সব ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন ওর বাবা। সুরঞ্জনও এন্ট্রান্সে স্কলারশিপটা পেয়ে যেতে একমাসের মধ্যেই ওকে তল্পি গোটাতে হল লন্ডনের পথে।যাওয়ার আগের দিন মায়ের কাছে এক্সট্রা টাকা নিয়ে সুনয়নার সাথে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেছিল। ঠিক করেছিল, চিঠি লিখবে একে অপরকে। চিঠির পাতায় হাত বুলিয়ে উষ্ণ স্পর্শসুখ অনুভব করতে পারবে! যা দুজনের কেউই কল্পনা করেনি,ওটাই ওদের শেষ কথা।

লন্ডনে পৌঁছেই একটা লম্বা চিঠি লিখেছিল প্রিয় সু'কে।কয়েকদিনের মধ্যে উত্তরও পেয়েছিল। প্রায় বছর দেড়েক সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও হঠাৎ করেই চিঠির উত্তর আসা বন্ধ হয়ে গেছিল। শুধুমাত্র একটুকরো আশায় নিয়মিত চিঠি পাঠিয়ে সুরঞ্জন ছটফট করত সু'র কাছে যাওয়ার জন্য।


ব্যারিস্টারি পাশ করে ফিরে প্র্যাকটিস শুরুর আগে বাবার অনুমতি নিয়ে দৌড়ে গিয়েছিল সুনয়নার কাছে। কলিং বেল বাজাতে এক অপরাচিতা মহিলা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, বোলিয়ে,কেয়া চাহিয়ে আপকো?

বেশ অবাক হয়ে সুরঞ্জন সু'র কথা ওর বাবার কথা জিজ্ঞেস করতে কোনো সদুত্তর দিতে পারলেন না।

শুধু জানালেন, কাউকেই উনি চেনেন না।

দিশেহারা সুরঞ্জন মাথা নীচু করে চলে আসার উপক্রম করতেই ভদ্রমহিলা হঠাৎ বলে উঠলেন,আপকা শুভনাম সুরঞ্জন হ্যায় ক্যয়া?

চোখ ভরা আশা নিয়ে তাকাতেই ভদ্রমহিলা ভিতর থেকে একগোছা চিঠি ওকে দিয়ে বললেন,ইয়ে সারি খত্ আপনেহি ভেজা না?

আরও যে দুঃখ পাওয়ার আছে তা কল্পনাতেও আসেনি ওর। চিঠির গোছাটা নিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে দেখল,গত কয়েক বছরে ওর পাঠানো চিঠিগুলো না খোলা অবস্থাতেই রয়েছে। চিঠির প্রাপক কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে। নিজের লেখা চিঠির ভার যে এতখানি,তা কল্পনাতেও আসেনি ওর। কোনোরকমে চিঠিগুলো নিয়ে পরাজিত সৈনিকের মতো ফিরে এসেছিল সুরঞ্জন।

পলাশকে ফোন করে সবটা বলতে ও অনেক কথা বললেও সুরঞ্জনের কানে কিছুই যাচ্ছিল না। এই প্রশ্নের উত্তরগুলো ও নিজেও খুঁজছে। যে এই উত্তরগুলো দিতে পারত,সে কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। যে নিজে হারিয়ে যায় তাকে খুঁজে পাওয়া বড্ড কঠিন।

দিল্লী থেকে ফিরে এসে বহুদিন কাজে মন বসাতে পারেনি। এক লহমায় ওর জীবনটা থমকে গেছিল। তবে আস্তে আস্তে সময়ের স্রোতে পলি পড়ার মতো ওর মনেও পলি পড়ছিল। সময়ের সাথে সাথে সুনয়নার স্মৃতি থিতিয়ে এলেও সময়ের স্রোত তাকে মন থেকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে নি। যদিও শেষ পর্যন্ত মায়ের জেদের কাছে হার স্বীকার করে মাধুরীর সাথে জীবনটাকে জড়িয়েছে।তবে সম্পর্কে সেই উষ্ণতা ছিল না। তবে স্ত্রীর প্রতি কর্তব্যে কোনো অবহেলা ছিল না।

খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেও সম্মানের খিদে মেটেনি ওর।যতদিন এগোচ্ছে আরও বেশী বেশী করে কাজের নেশা পেয়ে বসছে ওকে।বেশ ছিল নিজের জগতে,কিন্তু গত সপ্তাহের পলাশের ফোন আর কলেজ রিইউনিয়নের ইনভিটেশন সবকিছু পাল্টে দিয়েছে। এতবছর পর পলাশের ফোন পেয়ে একটুও অবাক হয় নি ও।

রিইউনিয়ন মে তুম যায়োগে তো?

সব কাম ছোড় কর্ তু যায়েগা ?

কিঁউ নেহি?

ম্যায় নেহি যাউঙ্গা;ম্যায় উঁহা যানা নেহি চাহাতা।

পর তুমহে যানা চাহিয়ে। উঁহা সুনয়না আ সকতি হ্যায়।

উসসে ক্যয়া হোগা। জিস্ দিন্ মেরা লিকখা হুয়া সারে খত্ লেকর লট আয়া,উসহি দিন সে যো পল্ ম্যায় গুজারা,উসকা ক্যয়া হোগা!ম্যায় নেহি আউঙ্গা।

কুছ নাহি জাননা চাহোগি?

শেষ অব্দি পলাশের যুক্তির কাছে হার মেনে কলেজের রিইউনিয়নে যেতে রাজী হল সুরঞ্জন।

জানালার পর্দাগুলো টানা থাকায় কখন যে সকাল হয়ে গেছে বুঝতেই পারেনি ও। পর্দাটা সরাতেই ঘষা কাঁচের ভেতর দিয়ে বাইরের আলোয় ভরে উঠল ভেতরটা।গতরাতের ফ্লাস্কের জল দিয়ে সকালের প্রথম কফিটা বানিয়ে মি টাইমটা বেশ উপভোগ করছিল ও।

দিল্লী পৌঁছে একটা ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলের রুমে পৌঁছে যাকে দেখল, সেদিনের সেই লম্বা,রোগা ছেলেটার সাথে আজকের এই মাঝবয়সী মোটাসোটা স্বল্প চুলের ভদ্রলোকটিকে মেলাতেই পারত না যদি না হাসিটা দেখত।

তু ইতনা মোটা ক্যায়সে হো গ্যয়া?কিতনা দুবলা থা তু,ইয়াদ হ্যায় তুঝে!

আরে,পহলে অন্দর তো আ।

ঘরে ঢুকে দেখল পলাশ একটা স্যুইট বুক করেছে। ব্রেকফাস্ট আর চায়ের সাথে

দুজনে পুরোনো কথা শুরু করলেও সে আলোচনা শাখা বিছিয়ে দুপুরে; একসাথে লাঞ্চ সেরে পলাশ বিছানা দখল করল।আর সুরঞ্জন ব্যাগ খুলে একটা পার্সেল বের করে ছোট ব্যাগে রেখে সোফায় বসে মেল চেক করতে লাগলেও ওর মন যে কোন সুদূরে তার খোঁজ একমাত্র ওই জানে। সময় এগোনোর সাথে সাথে বেশ অস্থির হয়ে উঠছিল ও।

হোটেল থেকেই একটা ক্যাব বুক করে কলেজের সামনে পৌঁছে দেখল বন্ধু বান্ধবরা ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে নিজেদের মধ্যে গল্পে মেতে উঠেছে। নিউ জেনারেশনের কাছ থেকে পাওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা বেশ ভালোই লাগছিল। বন্ধুরা এগিয়ে যেতেই পাশের পায়ে চলা পথ দিয়ে কিছুটা এগিয়ে একসময়ের সুখ দুঃখের সঙ্গী গাছের বেদীটায় বসল সুরঞ্জন। স্টেডিয়ামের দিক থেকে অনুষ্ঠানের আওয়াজ ভেসে এলেও এই জায়গাটা অপেক্ষাকৃত শান্ত। এখানের আলো আঁধারি পরিবেশে একা বেশ ভালো লাগছিল ওর। হঠাৎ পাশে কারোর উপস্থিতি বুঝতে পেরে চমকে তাকিয়ে যাকে দেখল অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখে বেশ অবাকই হল সুরঞ্জন। সেদিনের ছিপছিপে চেহারার মেয়েটা আজ একটু পৃথুলা যা বয়স আর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই। কোমর ঘেরা চুলের বদলে আধুনিক ফ্যাশানের হেয়ার কাটিং কাঁধ ছুঁয়েছে। ক্যায়সে হো রঞ্জন? মুঝে মাফ কর পায়োগি?

তুমহে যো আচ্ছি লগি ওহিঁ তো কিয়া।ফির মাফি কিঁউ?

মুঝে মওকা নহি দোগি কুছ বোলনে কি?

ক্যয়া বোলোগি তুম! আজ ইতনে দিনো কি বাদ ক্যয়া করুঙ্গা মে উও সব শুনকর! ম্যায় উস্ পলকো জি লিয়া সুনয়না;অব কুছ শুননে সে উও পল্ মিট্ নহি যায়েগা।

একবার মেরে বাত শুনলো !ম্যায়নে ভি দর্দ সহা সুরঞ্জন!মেরি মজবুরি কিসকো বাতাউঁ ম্যায়?

কিসিকো নেহি…কুছ বাত,কুছ পল্,কুছ দর্দ সির্ফ আপনা হোতা হ্যায়।উসকো আপনে পাশ রাখো।

তুম মুঝে আপনে নামসে নেহি বুলাওঙ্গে? একবার বোলো না রঞ্জন, ম্যায় তরস খা গয়ি উস নাম শুননে কে লিয়ে।

সুনয়নার কথায় এমন কিছু ছিল যা শুনে এত বছর পরেও ভেতর থেকে শিহরিত হচ্ছিল ও।যতটা সম্ভব নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,তুমহারে কুছ চিজ্ মেরে পাশ হ্যায়।ইয়ে লো।

ক্যয়া হ্যায় ইস পার্সেল মে?

খুলকর দেখো।

কিছু না বলে পার্সেলটা খুলতেই একগোছা চিঠি উঁকি দিল ভেতর থেকে।কাঁপা হাতে চিঠিগুলো বের করে তারিখ দেখে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সুরঞ্জনের দিকে। আধো অন্ধকারে সুনয়নার জল ভরা চোখ দেখে গলার কাছে কষ্টটা দলা পাকিয়ে আসছিল সুরঞ্জনের। কাঁপা গলায় বলল,ক্যয়া হুয়া সু?

তুম লট কর ইঁহা আয়েথে?

হাঁ,ইয়ে সব থা উঁহা,সির্ফ তুম নেহি থি সু।

ম্যায় কুছ বোলনা চাহতি হুঁ।প্লিজ শুনো না রঞ্জন।

কওন সা বাত! কিঁউ চলি গ্যয়ি থি মুঝে ছোড় কর…তুমহারি মজবুরি …ইয়ে সব না? উস পল্ ইয়ে সব কিঁউ নহি সোচা?কিঁউ নেহি বাতায়া মুঝে?চিটঠি পে তো বোল সকতি থি?আজ শুনকর্ ক্যয়া করু ম্যায়?অব হম দোনোকা দুনিয়া অলগ;ম্যায় চহা করভি কুছ নহি কর পাউঙ্গা।ভালো থেকো সু।

তুমভি ভালো থেকো।

ম্যায় খুদকো লেকর জিলুঙ্গি আনেওয়ালা পল্।টেক কেয়ার।

সুনয়নার হাত থেকে নিজের হাতটা টেনে নিয়ে ওর চোখে একবার তাকিয়ে চলে এল সুরঞ্জন। পিছনে তখন সুনয়না চিঠিগুলো হাতে নিয়ে ওর যাওয়ার পথের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page