মেয়েদের জন্য গরমের ছুটিতে স্মার্ট ট্রাভেল টিপস! পথ্যের রান্না ,সুস্থ থাকতে মাছ, রবিবারের গল্প: দশম অধ্যায়
- রোজকার অনন্যা

- 1 day ago
- 16 min read
Updated: 8 hours ago

মেয়েদের জন্য গরমের ছুটিতে স্মার্ট ট্রাভেল টিপস!
টিম অনন্যা
গরমের ছুটিতে বেড়াতে যাওয়া মানেই আনন্দ, মুক্তি আর স্মৃতির ঝুলি ভরিয়ে ফেরা। তবে একা বা শুধুমাত্র মেয়েদের টিমে ট্রাভেল করলে কিছু সাবধানতা ও প্রস্তুতি থাকা জরুরি। সময়, জায়গা ও পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী একটু স্মার্ট প্ল্যানিং করলেই আপনার ভ্রমণ হতে পারে নিরাপদ, স্বস্তির এবং উপভোগ্য।
১.গন্তব্য বেছে নিন বুঝে-শুনে:
প্রথমেই এমন জায়গা বেছে নিন যা নিরাপদ, পর্যটকপ্রিয় এবং যাতায়াত সহজ। ট্রিপের আগে গন্তব্যের আবহাওয়া, নিকটবর্তী হাসপাতাল, থানা, ট্যুরিস্ট অফিস ইত্যাদির তথ্য জেনে নিন। ভ্রমণস্থানে নেটওয়ার্ক কভারেজ কেমন তা জেনে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

২.স্মার্ট প্যাকিং:
আপনার পোশাক হোক আবহাওয়া ও সংস্কৃতির উপযোগী। পাহাড়ে জ্যাকেট, রেইনকোট, স্কার্ফ সব রাখুন। ব্যক্তিগত ওষুধ, স্যানিটারি ন্যাপকিন, স্যানিটাইজার, পেপার সাবান, সেফটি পিন, ছোট টর্চ ও পাওয়ার ব্যাঙ্ক রাখতেই হবে। হালকা লাগেজ, ছোট ব্যাকপ্যাক এবং চেকলিস্ট মেনেই গুছিয়ে নিন।
৩.ফোনে থাকুক কিছু গুরুত্বপূর্ণ অ্যাপ ও তথ্য:
Google Maps, Cab Booking Apps, Hotel Booking Apps, SOS Alert Apps (Nirbhaya, Raksha) ইনস্টল রাখুন।
পরিবার ও বন্ধুদের ফোনে লাইভ লোকেশন শেয়ার করে রাখুন। মোবাইলে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়পত্র (আধার, টিকিট, হোটেল বুকিং)-এর ডিজিটাল কপি রাখুন।
৪.হোটেল বাছাইয়ে সতর্কতা:
রিভিউ পড়ে, পরিচিত বা বিশ্বাসযোগ্য অ্যাপ থেকে হোটেল বুক করুন। যদি সম্ভব হয় মহিলাদের জন্য উপযোগী হোটেল বা হোম-স্টে বেছে নিন। রাতে অচেনা জায়গায় একা বাইরে না যাওয়াই ভালো।
৫.স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপ সাবধানে:
অচেনা কারো সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বা তথ্য শেয়ার না করাই ভালো।বিপদে পড়লে স্থানীয় দোকান, পুলিশ স্টেশন বা হোটেলের রিসেপশনে সাহায্য চাইতে দ্বিধা করবেন না।
৬.টাকা ও গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র সামলে রাখুন:
ক্যাশ ও কার্ড ভাগ করে রাখুন। ছোট ব্যাগে রাখুন কিছু জরুরি টাকা। পাসপোর্ট, আইডি, টিকিট, টাকা আলাদা আলাদা জায়গায় রাখুন। ব্যাগে এক্সট্রা চেইন বা লক ব্যবহার করুন।

৭.নিজের শরীর ও মনকে প্রাধান্য দিন:
ভ্রমণে ক্লান্তি এড়াতে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিন। একটানা না ঘুরে ধীরে ধীরে গন্তব্য উপভোগ করুন। অজানা খাবার সাবধানে ট্রাই করুন, জল খাওয়া ভুলবেন না।
একজন নারী ভ্রমণপ্রেমী হলে বাধা নয়, সাহস আর সতর্কতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় সঙ্গী। একটু পরিকল্পনা আর সচেতনতায় আপনার ট্রিপ হয়ে উঠুক আনন্দদায়ক ও অনুপ্রেরণার উৎস।

পথ্যের রান্না
টেনিদার সিরিজে প্যালারামের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে? পেটরোগা বলে তাঁর কপালে জুটতো পটল দিয়ে শিঙ্গি মাছের ঝোল! বিষয়টা মোটেও মজার নয়! জ্বরের পর মুখের অরুচি হোক কি বদহজমের সমস্যা সবেতেই অব্যর্থ এ বস্তু।
পাড়াগাঁয়ে কথায় কথায় মুঠো মুঠো বড়ি খাওয়ার চল তখন'ও হয়নি। টুকটাক জ্বর জারি, সর্দি কাশি থেকে পেটের গোলমাল হলে ঘরোয়া টোটকাতেই অগাধ আস্থা করতেন তাঁরা। আর ছিল পথ্যের রান্না। যে রোগের, যে খাবার। পেটের সমস্যায় একগাদা সবজি দিয়ে কালোজিরা কাঁচালঙ্কা ফোড়নে জ্যান্ত মাছের ট্যালট্যালে ঝোল। জ্বর হলে কালোজিরা, রসুন, লঙ্কা বাটা, সর্ষের তেলসহ এক পেট গরমভাত। বহুদিন রোগভোগ শেষে সেরে উঠলে কোনো খাবারের স্বাদ ই যখন মুখে রোচে না, গন্ধলেবু দিয়ে মাখা মুরগীর ঝোল ভাত সে মুখে যেন অমৃত! হিঞ্চে শাক, নিম পাতা, পলতা পাতা, আমরুল শাক, আমসি, গাদাল পাতা; খাবার যে সুস্থ থাকার চাবিকাঠি একথার সার বুঝেছিলেন তাঁরা। এমনই কিছু অমূল্য রান্না নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। যা স্বাদে গন্ধে যেমন অতুলনীয়, তেমনি স্বাস্থ্যকর ও বটে! লিখেছেন রন্ধন বিশেষজ্ঞ শুভজিৎ ভট্টাচার্য।

পথ্যির ঝোল

কী কী লাগবে
৪ টুকরো কাতলা মাছ, ৭-৮ টুকরো আলু, ১টি কাঁচকলা টুকরো করা, ৬-৭ টুকরো পটল, ১টি ছোট পেঁপে টুকরো করা, আদা বাটা ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, গোটা জিরে ১ চা চামচ, মেথি ৪-৫ টি কাঁচা লঙ্কা, সরষের তেল
কীভাবে বানাবেন
মাছের নুন, হলুদ মাখিয়ে রাখুন কড়াতে তেল গরম করে মাছগুলো ভেজে তুলুন। ঐ তেলের মধ্যে দিন ১/২ চা চামচ মেথি। মেথি পুড়ে গেলে তুলে ফেলে দিন। একটি বাটিতে ১ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো ও ১ চা চামচ জিরে গুঁড়ো অল্প জল দিয়ে গুলে রাখুন। তেলে গোটা জিরে ফোড়ন দিন। সুগন্ধ বের হলে দিন গুলে রাখা মসলা এবং ৪-৫টি কাঁচা লঙ্কা। মসলা ভাজা হয়ে তেল ছাড়তে শুরু করলে তাতে দিন লম্বা করে কাটা আলু ও পটল আঁচ কমিয়ে সবজি কষাতে থাকুন। আদা বাটা জলে গুলে ছেঁকে নিন। সব সবজি কষানো হলে তাতে দিন পেঁপে ও কাঁচকলা। ৩-৪ মিনিট কষানোর পর পরিমাণ মতো জল ও নুন দিন। ঝোল ফুটে উঠলে আজ কমিয়ে ঢেকে রান্না হতে দিন। সমস্ত সবজি সিদ্ধ হলে তাতে দিন ভেজে রাখা মাছ। ২-৩ টেবিল চামচ আদার রস দিয়ে ৩-৪ মিনিট ফুটিয়ে নামিয়ে নিন। গন্ধরাজ লেবু সহ গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

সম্পূর্ণ বিনা তেলে আদা কমলার চিংড়ি

কী কী লাগবে
৭-৮ টি বাগদা চিংড়ি, কমলা লেবুর রস ৩০০ মি.লি. , ২টি পেঁয়াজ লম্বা করে কুচানো, আদা বাটা ১চা চামচ, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো দেড় চা চামচ, কাঁচালঙ্কা ৫-৬টি, ধনেপাতা কুচানো ১ বাটি, Shalimar's Chef Spices গরম মসলা গুঁড়ো ১ চা চামচ, গোটা গরম মসলা (ছোট এলাচ লবঙ্গ দারচিনি), নুন ও চিনি স্বাদ অনুসারে, কিসমিস একমুঠো

কীভাবে বানাবেন
প্রথমে কড়াইতে জল গরম করে তাতে পেঁয়াজ কুচি সেদ্ধ হতে দিন। গোটা গরম মসলা থেঁতো করে নিন। পেঁয়াজ সেদ্ধ হলে তুলে, জল ঝরিয়ে, ঠান্ডা হতে দিন। সেদ্ধ করা পেঁয়াজ ও ২টি কাঁচালঙ্কা, একসঙ্গে বেটে নিন। কড়াই গরম করে তাতে থেঁতো করা গোটা গরম মসলা দিয়ে অল্প আঁচে নাড়তে থাকুন। সুগন্ধ বেরোলে বেটে রাখা পেঁয়াজ আর কাঁচালঙ্কা তাতে ঢেলে দিন। এক চামচ আদা বাটা দিয়ে মাঝারি আঁচে কষুন। বাটা মসলায় হালকা রং ধরলে দিয়ে দিন কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো ও অল্প একটু জল। ভালো করে মসলা কষে তারপর তাতে দিয়ে দিন ২-৩ টে কাঁচালঙ্কা এবং এক মুঠো কিসমিস। এবার চিংড়ি মাছ ঐ মসলার সঙ্গে ভালো করে কষে কমলালেবুর রস দিয়ে দিন। স্বাদমতো নুন চিনি মিশিয়ে রান্না হতে দিন। ঝোল ঘন হলে একটি বাটিতে ১ চামচ আদা বাটা ও কিছুটা জল মিশিয়ে তার মধ্যে ঢেলে দিন। গরম মসলা গুঁড়ো ও ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

মুন্ডি
কী কী লাগবে
মুরগি ৭৫০ গ্রাম, রাইস নুডুলস ১ প্যাকেট, ২টি পেঁয়াজ কুচানো, আদা ও রসুন বাটা দেড় টেবিল চামচ করে, ধনেপাতা ১ আঁটি, কাঁচালঙ্কা ৬টি, ১টি গন্ধরাজ অথবা পাতিলেবু, তেঁতুলের ক্বাথ ৩ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো আড়াই চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো ১ চা চামচ, ২-৩টি তেজপাতা, গোটা গরম মসলা, নুন স্বাদ অনুসারে।

কীভাবে বানাবেন
রাইস নুডুলস সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। কড়াইতে দেড় লিটার জল দিয়ে গরম হলে দিন তেজপাতা, দেড় ইঞ্চি দারচিনি, ৩টে ছোট এলাচ, ৪-৫টি লবঙ্গ, ২টি কুচানো পেঁয়াজ, ১ চা চামচ রসুন বাটা, ১ চা চামচ আদা বাটা, ৫ চা চামচ গোল মরিচ গুঁড়ো, ১ চা চামচ হলুদ গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, কাঁচালঙ্কা ৩টি, মুরগির মাংস ও নুন। ভালো করে নেড়ে মিশিয়ে রান্নাটি ঢাকা দিয়ে হতে দিন। স্যালাডের ড্রেসিং এর জন্য ১ বড় চামচ রসুন, ১ বড় চামচ আদা, ৩টি কাঁচালঙ্কা এবং অল্প জল একসঙ্গে বেটে নিন। মাংস সেদ্ধ হলে স্যুপ থেকে তুলে আলাদা করে ঠান্ডা হতে দিন। ঠান্ডা হলে হাড় থেকে ছাড়িয়ে ছোট ছোট টুকরো করে নিন। এবার এতে দিন খুব অল্প পরিমাণে গোলমরিচ গুঁড়ো, দেড় চা চামচ লঙ্কা গুঁড়ো, ড্রেসিং সস, তেঁতুলের ক্বাথ, লেবুর রস, ধনেপাতা কুচি এবং নুন। সব একসঙ্গে হালকা হাতে মেখে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মুরগির স্যালাড। পরিবেশনের পাত্রে প্রথমে দিন মুরগির স্যুপ, এতে মেশান ৪ চা চামচ তেঁতুলের ক্বাথ, অল্প লেবুর রস এবং ধনেপাতা কুচি। ভালো করে মিশিয়ে নিন। এবার তার ওপর দিয়ে দিন আগে থেকে সেদ্ধ করা রাইস নুডুলস। উপরে সাজিয়ে দিন মুরগির টুকরো। পাশে অন্য বাটিতে মুরগির স্যালাড সহ পরিবেশন করুন চট্টগ্রামের জনপ্রিয় এই রান্না 'মুন্ডি'।

সুপ্রিয়া দেবীর বিনা মসলায় মুরগির মাংস

কী কী লাগবে
১ কেজি মুরগির মাংস, ২টো পেঁয়াজ ৪ টুকরো করে কাটা, ২টি টমেটো ৪ টুকরো করে কাটা, দেড় চামচ কুরে রাখা আদা, ৫টি বড় রসুনের কোয়া, ২টি বড় পাকা লঙ্কা, ৩-৪ টেবিল চামচ Shalimar's Sunflower তেল, স্বাদ অনুসারে নুন, ২ চা চামচ চিনি

কীভাবে বানাবেন
একটি ননস্টিক প্যানে সমস্ত উপকরণ একে একে দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে নিন। এবার কড়াই আঁচে বসিয়ে চড়া আঁচে রান্নাটি হতে দিন। মাংস এবং অন্যান্য সবজি থেকে জল ছাড়লে আঁচ মাঝারিতে নামিয়ে আনুন। ঢাকা দিয়ে রান্না হতে দিন।তেল ছাড়তে শুরু করলে আবার ভালো করে মিশিয়ে নিন। দু কাপ মত জল দিয়ে ঝোল ফুটতে দিন। মাংস সেদ্ধ হয়ে ঝোল একটু ঘন হলে নামিয়ে পাউরুটি অথবা ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
পানিফলের পালো

কী কী লাগবে
দুধ ১ লিটার, কনডেন্স মিল্ক ১ কাপ, চিনি ৫ টেবিল চামচ, কর্পূরের গুঁড়ো আধ চা চামচ, পানি ফল ১ কেজি।
কীভাবে বানাবেন
পানিফলের খোসা ছাড়িয়ে বেটে নিন। দুধ আধঘন্টা মাঝারি আঁচে জ্বাল দিন। কনডেন্স মিল্ক ও চিনি মেশান। অনবরত অল্প আঁচে নাড়তে থাকবেন। বেটে রাখা পানিফল এর মধ্যে দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। পাঁচ মিনিট পর কর্পূরের গুঁড়ো ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।
বিনা তেলে ডিম সর্ষে

কী কী লাগবে
সিদ্ধ ডিম ৪টি, দই ১৫০ গ্রাম, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো দেড় চা চামচ, চিনি ও নুন সাধ অনুসারে, অল্প ধনেপাতা কুচি, সরষে বাটা দু টেবিল চামচ।

কীভাবে বানাবেন
সেদ্ধ ডিম লম্বালম্বি আধখানা করে কেটে নিন। টক দই এর মধ্যে দিন কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, চিনি, নুন ও সরষে বাটা। সমস্ত উপকরণ একসঙ্গে ভালো করে ফেটিয়ে নিন। পরিবেশন করার পাত্রে কেটে রাখা ডিম গুলো সাজিয়ে নিন। দই সর্ষের মিশ্রণটি উপর থেকে ঢেলে দিন। উপর থেকে ছড়িয়ে দিন এক আধ ফোঁটা সরষে বাটা ও ধনেপাতা কুচি। পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত ডিম সর্ষে।
সুস্থ থাকতে মাছ
পুষ্টিবিদ জয়িতা ব্রক্ষ্ম
মাছে ভাতে বাঙালির পাতে রোজ মাছ থাকা চাই, না হলে যে খাওয়াটাই অসম্পূর্ণ রয়ে যায়। এমনটাই আপামর বাঙালির একমাত্র চাহিদা। রকমারি মাছের রকমারি পদের সাথে গরম ভাত যে ভীষণ রকম প্রিয়। কিন্তু মাঝে মাঝে বাধ সাধে কিছু অসুখ, আর ডাক্তারি পরোয়ানা। কি মাছ খাবো, কতটা খাবো ,কিভাবে রান্না করে খাবো এই সব প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে মাথার ভিতর। তাই আজকের আলোচনার মধ্যমনি বাঙালির সেরা মাছের গুনাগুন।

প্রথমেই বলি মাছ হলো প্রোটিন এর একটি উৎকৃষ্ট উৎস, সম্পূর্ণ প্রাণীজ প্রোটিন এর ১৭ শতাংশ প্রোটিন থাকে মাছে। এছাড়াও ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, পলি আনস্যাটুরেটেড ফ্যাটি অ্যাসিড,বিভিন্ন ভিটামিন এবং মিনারেল এ সম্মৃদ্ধ যেমন ভিটামিন এ, বি এবং বিশেষত ভিটামিন ডি এ ভরপুর যা সাম্প্রতিককালে অত্যন্ত আবশ্যিক একটি ভিটামিন যার ঘাটতির সমস্যায় ভোগেন প্রায় ৪০ শতাংশ ভারতীয়। তাই প্রতিদিন মাছ ও মাছের তেল যদি ডায়েট এ থাকে তবে আমাদের তা আমাদের শরীরে নানাবিধ উপকারে লাগে। যেমন মাছে রয়েছে DHA ও EPA এর মতো লং চেন ফ্যাটি অ্যাসিড যা আমাদের হার্ট কে সুস্থ রাখে, আমাদের মস্তিস্ক ও নাৰ্ভাস সিস্টেম কে ভালো রাখে,মাছে উপস্থিত জিংক,সেলেনিয়াম,আয়োডিন,ক্যালসিয়াম,ফসফরাস ইত্যাদি মিনারেল এবং ভিটামিন ডি, বি ১২, বি ৬ প্রভৃতি বিভিন্ন হরমোনের কার্যকারিতা বজায় রাখে এবং আমাদের ত্বক ও ভালো রাখে।১০০ গ্রাম টাটকা কাঁচা মাছে মোটামুটি ৮০ ক্যালোরি এনার্জি বর্তমান থাকে।এছাড়াও মাছে রয়েছে কিছু অপরিহার্য সালফার যুক্ত অ্যামিনো অ্যাসিড (লাইসিন, মিথিওনাইন, সিস্টিন। এছাড়াও বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে COPD, IBS, অ্যাজমা, আলঝেইমার ডিজিস ইত্যাদি জটিল অসুখে এই ফার্স্ট ক্লাস প্রোটিন যুক্ত মাছ খেলে উপকার মেলে।

এবার আসি কোন মাছ শরীরের জন্য ভালো , বড় মাছ না ছোট মাছ ? সবার আগে পুষ্টিবিদের কাছে বেশির ভাগ রুগীর এই প্রশ্নটাই থাকে। American Heart Association এর গাইডলাইন অনুযায়ী সপ্তাহে অন্তত ২ দিন ,৩.৫ আউন্স অর্থাৎ ৩/৪ কাপ ফ্যাটি ফিশ বা তৈলাক্ত সামুদ্রিক মাছ খাওয়ার কথা বলা হয়েছে। অবশ্যই ছোট মাছ শরীরের জন্য ভালো তবে বড় মাছ যদি খেতেই হয় তাহলে দেড় কেজির কম ওজনের মাছ খান, কারণ অতিরিক্ত বড় সাইজ এর পাকা মাছে চর্বি বেশি থাকে।মিষ্টি জলের মাছে যেমন ভালো পরিমানে প্রোটিন থাকে ঠিক তেমন সামুদ্রিক মাছে লবণের মাত্রা কিছুটা বেশি হলেও ফসফরাস ও ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে ভালো পরিমানে, তাই দু ধরণের মাছই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খান। বাঙালির পাতে থাকুক রুই, বাটা, চারাপোনা , মৌরলা , পুটি , ইলিশ ,পমফ্রেট, স্যামন ইত্যাদি মাছের সম্ভার। সারাদিনে ৭৫ - ১০০ গ্রাম মাছ খেতেই পারেন যদি না আপনার কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস এর মতো কোনো শারীরিক অসুস্স্থতা থেকে থাকে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে জাপান এবং গ্রিনল্যান্ড এর মানুষ অনেকদিন বেশি বেঁচে থাকেন মাছ খেয়ে,এবং সেটা অবশ্যই বাঙালিদের মতো করা মাছ ভাজা বা রসিয়ে সর্ষে দিয়ে ঝাল করে নয়। প্রতিটা খাদ্যের নির্দিষ্ট একটি বয়েলিং পয়েন্ট থাকে, তাই খুব বেশি তেল ব্যবহার করে অনেক্ষন ভেজে খেলে তার উপকারিতা ও পুষ্টিগত গুণমান অনেকাংশেই কমে যায়। তাই সুস্থ থাকতে গ্রীলড ফিশ, স্মোকড ফিশ , রোস্ট ফিশ এর মতো রেসিপি যোগ করুন ডায়েট এ।
তাহলে আপনি বলতেই পারেন মাছে তো এখন ফরমালিন দিয়ে সংরক্ষণ করা হয় যা শরীরের পক্ষে ভীষণই ক্ষতিকারক, আবার অনেক মাছে মার্কারির পরিমান থাকে বেশি মাত্রায়। তাহলে কি ট্রেন্ডি ভেগান ডায়েট ই কি ভালো? ভারতবর্ষে প্রতি বছর প্রায় ২৬.৬ শতাংশ মৃত্যু হয় হৃদরোগে যা খুব সহজেই আমরা আটকাতে পারি যদি সঠিক মাছ সঠিক পরিমানে ও সঠিক পদ্ধতিতে রান্না করে খাই। অবশ্যই ভালো বিশ্বস্ত জায়গা থেকে মাছ দেখে কিনুন যাতে ফরমালিনে চুবিয়ে রাখা বেশিদিনের বাসি মাছ না হয় এবং ক্যানড বিগ আই টুনা, সার্ক, কিং ম্যাকারেল, স্বৰ্ড ফিশ ইত্যাদি মাছে মার্কারি এর মাত্রা বেশি থাকে যা মস্তিস্ত ও নার্ভ এর ক্ষতি করে।
তাই পুষ্টিবিদের কাছে সঠিক তথ্য জেনে নিন এবং যেটাই খান ভালোবেসে তৃপ্তি করে খান। তাতেই শরীর ও মন দুই থাকবে বশে।

ভারতীয় মাছ পুষ্টিগুণের দিক থেকে অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসেবে পরিচিত। এতে প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের ভালো উৎস রয়েছে। নিচে ভারতীয় মাছের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. প্রোটিনের উৎস
মাছ উচ্চমানের প্রোটিনের চমৎকার উৎস, যা শরীরের কোষ গঠন ও মেরামত করতে সাহায্য করে। চিংড়ি, রুই, কাতলা, পাঙ্গাস ও তেলাপিয়া জাতীয় মাছ প্রচুর প্রোটিন সরবরাহ করে।
২. ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড
বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছ (যেমন ইলিশ, টুনা, সার্ডিন) ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডে সমৃদ্ধ, যা হৃদরোগ প্রতিরোধ, মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত করা এবং প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
৩. ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ
ভিটামিন ডি: মাছ সূর্যালোকের পাশাপাশি অন্যতম ভিটামিন ডি-এর উৎস, যা হাড় ও দাঁতের গঠনে সহায়ক।
ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স: মাছের মধ্যে ভিটামিন বি১২, বি৬ ও নিয়াসিন থাকে, যা স্নায়ুতন্ত্র ও বিপাক প্রক্রিয়ার জন্য জরুরি।
আয়রন ও জিঙ্ক: রক্ত তৈরিতে আয়রন গুরুত্বপূর্ণ, আর জিঙ্ক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
৪. হৃদরোগ প্রতিরোধ ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ
মাছের ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, কম স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও উচ্চ প্রোটিন হৃদরোগ প্রতিরোধে কার্যকর। এটি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করে।
৫. ওজন নিয়ন্ত্রণ ও হজমে সহায়ক
মাছ কম ক্যালোরিযুক্ত এবং সহজপাচ্য প্রোটিনের ভালো উৎস, যা ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ভারতীয় মাছ উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। নিয়মিত মাছ খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে, হাড় মজবুত হয় এবং শরীরের সামগ্রিক কার্যকারিতা উন্নত হয়।

দশম অধ্যায়
দীপঙ্কর ঘোষ
ট্রেন এসে মাধবপুর স্টেশনে থেমেছে। গত কুড়ি বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে স্টেশনের। শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদ গায়ে লাগছে। স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়ে একটু যেতেই অটো ড্রাইভারদের ডাকাডাকি শুনতে পেলাম। রেল আসার শব্দে তাদের মধ্যে যাত্রী টানার জন্য একটা হুড়োহুড়ি লেগেছে। আমাকে দেখে কম বয়সের এক অটো ড্রাইভার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, "কাকু, যাবেন কোথায়?"
"আখড়ায়।"
"নীলাম্বর ঠাকুরের আখড়া?"
"হ্যাঁ। যাবে?"
"দুশো টাকা দেবেন।"
"দুশো! তুমি কি আমাকে নতুন প্যাসেঞ্জার পেয়েছো। এই আখড়ায় আমি আগে বহুবার এসেছি।"
ছেলেটি এবার স্টেশনের দিকে একবার দেখল। ওদিক থেকে আসার মতো আর কোনো যাত্রী নেই। তাই বাধ্য হয়েই বলল, "ঠিক আছে, চলুন, কিন্তু রাস্তায় যদি কাউকে পাই তাহলে তুলে নেব।"
আমার এ প্রস্তাবে আপত্তি থাকার কোনো কারণ নেই। আমি তো আর পেছনের সিটে শুয়ে যাচ্ছি না, কেউ বসলেই কী যায় আসে।

ছেলেটা অটোতে স্টার্ট দিয়েই কানে হেডফোন গুঁজে দিল। পিচ রাস্তা ধরে কিছুদূর এগিয়ে অটোটা ডান দিকের মাটির রাস্তা ধরে নেমে গেল। দূর থেকে এক ভদ্রলোক অটোকে থামার জন্য হাত দেখাচ্ছেন। বয়স্ক লোক বলেই মনে হচ্ছে। গলার মাফলারটা দিয়ে কান মুখ ভাল করে ঢাকা। অটোওয়ালা কানের হেডফোনটা খুলে জিজ্ঞেস করল,
"কোথায় যাবেন কাকু?"
"আখড়া থেকে একটু এগিয়ে।"
"পঞ্চাশ টাকা লাগবে।"
ভদ্রলোক কোনো কথা না বলে আমার পাশে এসে বসলেন। আড়চোখে আমার দিকে দেখে বললেন, "মশায়ের গন্তব্য কোথায়?"
"নীলাম্বর ঠাকুরের আখড়া।"
ভদ্রলোক একটু কৌতুহল নিয়ে আমার দিকে তাকালেন, "আপনি কি নীলাম্বর ঠাকুরের দীক্ষিত?"
"আজ্ঞে না, আমার বাবা ছিলেন। উনি গুরুদেবের কাছ থেকে সরাসরি দীক্ষা নিয়েছিলেন।"
ভদ্রলোক এবার আস্তে আস্তে গল্পের ডানা মেললেন, "আমার নাম ডাঃ সমীরণ দত্ত। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার ছিলাম। দশ বছর হলো রিটায়ার করেছি।"
ডাক্তার শুনে ভদ্রলোকের প্রতি আমার একটা শ্রদ্ধাবোধ জন্মালো। ঘুরে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম, "অত্যন্ত নোবল প্রফেশন।"
"ছাই নোবল। আমি এই পেশাকে এখন ঘেন্না করি।"
বলেই কী লোকটা! নিশ্চয়ই কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে তার জীবনে।
"তবে রিটায়ারের পর এখন প্রায় দশ বছর থেকে ভোঁ ভোঁ করে ঘুরে বেড়াচ্ছি আর লেখালেখি করছি।"

তার মানে ভদ্রলোক একটু খেয়ালি প্রকৃতির লোক।
"আপনার লেখাগুলো কি মেডিক্যাল প্রফেশনের ওপর?"
আমার প্রশ্নে মনে হয় ভদ্রলোক খুব রাগ করলেন। তার কপালের রগগুলো কেঁপে ওঠল। আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
"বললাম না, ওসব আমার আর আগ্রহের বিষয় নয় এখন। আমার বইগুলো সব নিজের জীবন বৃত্তান্ত।"
"হুম। তারমানে একটা বর্ণময় জীবন ছিল আপনার।"
হো হো করে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক, "বর্ণময় নয়। কর্ম দুষ্কর্ম মিলিয়ে ঘটনাবহুল বলতে পারেন।"
ভদ্রলোক মাধবপুর গ্রামের আদি অন্ত বর্ণনা করে যাচ্ছেন। সূর্য আস্তে আস্তে পশ্চিমে হেলে যাচ্ছে। যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজেরই সুষমা। ফসলিমাঠ, আম জাম নারকেল গাছে ঘেরা গৃহস্থের শান্তির নীড়। কোথাও অকর্ষিত ভূমি, কোথাও জলাশয়। নিপুন হাতে আঁকা ছবির মতো সুন্দর ছায়া শীতল অবনী।
অটোটা আরেকটু এগিয়ে নীলাম্বর ঠাকুরের আখড়ার গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। আমি নেমে টাকাটা দিতেই সমীরণবাবু বললেন,
"এখানে থাকবেন কতদিন?"
"আপাতত দুদিন থাকার ইচ্ছে।"
"হুম। এখান থেকে আধমাইল পথ এগিয়ে গেলেই একটা পাঠশালা আছে। তার ডান পাশে ইট রঙা বাড়িটা আমার। গেটে নাম লিখা আছে, ডাঃ সমীরণ দত্ত। কাল একবার আসতে পারেন।"

অবশ্যই আসব, বলে আমি আখড়ার দিকে এগিয়ে গেলাম। সন্ধ্যা আরতির আয়োজন চলছে এখানে। আখড়ার পূর্ণকর্মীরা শ্বেতশুভ্র বসনে চরম ব্যস্ততায় চারদিকে ঘোরাঘুরি করছে। সেগুন কাঠের কারুকাজ মন্ডিত আসনে স্বর্ণালংকার সজ্জিত ভুবন আলোকিত যুগলরূপ। প্রণাম করে ব্যাগ হাতে নিয়ে প্রথমে মন্দিরের কার্যালয়ে গিয়ে একটা থাকার ব্যবস্থা করে ব্যাগটা রেখে আবার যখন মন্দিরে ফিরে এলাম তখন প্রার্থনা শুরু হয়ে গেছে। রাধাকৃষ্ণের মন্দিরের পাশের কোঠায় নীলাম্বর ঠাকুরের পাথরের মূর্তি রাখা। সেখানেও প্রদীপ জ্বলছে। দেখতে দেখতেই নীলাম্বর ঠাকুর পাথরের মূর্তি হয়ে গেলেন! আজও অবাক লাগে ভাবতে। প্রথম যেদিন বাবার সাথে এখানে এসেছিলাম তখন আমি সবে মাধ্যমিক দিয়েছি। বাবা শুধু গুরুদেবের শিষ্যই ছিলেন না, পরম আপনজনও ছিলেন। ঠাকুর বলতেন, "তুই আমার জনম জনমের সখা।" প্রতি সন্ধ্যায় কীর্তনের পর ঠাকুর অমৃত বচন শুনাতেন। ভক্তবৃন্দ পরিবৃত সৌম্যদর্শন ঠাকুর তখন সবার পরম আশ্রয়।
বাবা একবার এলে নেই করেও সপ্তাহ দশদিন থেকে যেতেন। আমি যখন ডিগ্রি ফাইনাল দিচ্ছি তখন হঠাৎ একদিন বাড়িতে খবর গেল নীলাম্বর ঠাকুর নাকি দেহত্যাগ করেছেন। খবর পেয়ে বাবা পাগলপ্রায় হয়ে আমাকে নিয়ে ছুটে এলেন এখানে। কিন্তু ঠাকুরের অন্তিম দর্শন আর করতে পারলেন না। শেষ রাতেই নাকি তাঁর নশ্বর দেহ সমাধিস্থ করা হয়ে গেছে। কী রোগে, কী ভাবে সবে পঞ্চাশ উত্তীর্ণ একজন সুস্থ সবল মানুষ দেহত্যাগ করলেন — এ প্রশ্ন নিয়ে বাবা পুরো আশ্রম চষে বেড়ালেন। সবারই এক কথা, ঠাকুর নাকি ধ্যানস্থ অবস্থাতেই ঈশ্বরে বিলীন হয়েছেন!
ভাঙামন নিয়ে বাবা বাড়ি ফিরে এলেন। এরপর থেকে কিছুদিন পর পরই ঠাকুরের আখড়ায় যেতেন। ফিরতে দেরি হলে আমি গিয়ে মাঝেমধ্যে বাবাকে বাড়ি নিয়ে আসতাম। নীলাম্বর ঠাকুরের দেহত্যাগের পর তাঁর ঘনিষ্ঠ শিষ্য মদনগোপাল বৈষ্ণব আখড়ার সেবাইত হলেন। এভাবেই দেখতে দেখতে কেটে গেল কয়েকটা বছর। আমি চলে গেলাম চাকরি সূত্রে শিবসাগরে। হঠাৎ একদিন বাড়ি থেকে ফোন এলো — বাবার শরীরটা নাকি খুব খারাপ। রাতের বাসেই বাড়ি ফিরে শুনি বাবা আখড়ার দীঘিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন। বাড়িতে এক শোকাবহ পরিবেশ। এমন আকস্মিক দুসংবাদে সবাই ভেঙে পড়েছে। নীলাম্বর ঠাকুরের আখড়ায় যাওয়ার জন্য আত্মীয় স্বজন সবাই আমার অপেক্ষা করছে।

আখড়ায় গিয়ে বুঝলাম শুনলাম বাবা ঘাটে পা পিছলে দীঘির জলে ডুবে গিয়েছিলেন। আখড়ার সেবাইত মদনগোপাল বৈষ্ণব ততদিনে মদনঠাকুর। আখড়ার তিনিই হর্তা-কার্তা। এই কয়েক বছরে তার চেহারায় ফোটে উঠেছে এক অপূর্ব দিব্যদ্যুতি। তিনি অবশ্য আমাকে স্নেহে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দিয়েছিলেন।
---
রাত এখন অনেক। পুরো আখড়া ঘুমের কোলে ঢলে পড়েছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর কিছু নাম না জানা পাখির অস্ফূট কথা শোনা যাচ্ছে। আমি এপাশ ওপাশ করে যাচ্ছি। কিছুতেই ঘুম আসছে না। দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। বিশাল বাগান সামনে। ফুলের কলিগুলো একটু একটু করে প্রস্ফুটিত হচ্ছে। অচেনা এক সুগন্ধে চারদিক ম-ম করছে। এ কোন ফুলের গন্ধ? দূরে এক বিশাল বটগাছের ঝুরি নেমেছে। তার তলায় বাঁধানো বেদিতে শ্বেত বসনে গৌরকান্তি এক বৃদ্ধ বিজনে বসে আছেন। একপা একপা করে এগিয়ে গেলাম সেদিকে। তাঁর দেহ থেকেই আসছে এই সুগন্ধ। এক অপার্থিব পরিবেশের আবেশে আমি এখন হারিয়ে যাচ্ছি। বৃদ্ধের মুখ দেখা যাচ্ছে না। তিনি হাতের ইশারায় আমাকে ডাকছেন। ঘোরের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে আমি তাঁর পায়ের কাছে বসলাম।
বৃদ্ধা প্রশ্ন করলেন, "আজই এসেছিস?"
"হ্যাঁ বাবা।"
"দীক্ষা নিয়েছিস?"
"না।"
"দীক্ষা ছাড়া দেহ অশুদ্ধ থাকে। আজই নিয়ে নে।"
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, "আজই? এই রাতে?"
"হ্যাঁ, আজ রাতেই। শুভ কর্মের রাতদিন হয় না রে। আকাশের দিকে চেয়ে দেখ, কালো মেঘ জমেছে। একটু পরেই ঝড় উঠবে।"
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম দক্ষিণের আকাশ চিরে রূপোলি বিদ্যুৎ খেলে যাচ্ছে।
বৃদ্ধ বললেন, "যা দেরি করিস নে। দিঘিতে চান করে আয়।"
আমি চাবি দেয়া পুতুলের মতো দিঘির বাঁধানো ঘাটের সিঁড়ি দিয়ে আস্তে আস্তে নামতে লাগলাম। প্রচুর শাপলা ফুল ইতিউতি ফুটে আছে। কাজল কালো দিঘিকে বাতাস চঞ্চলা করেছে। দিঘিতে চান করে উঠতে উঠতেই দেখলাম বাতাসে বাগানের বড় বড় গাছগুলো দুলছে।
ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দে কিছু পাখি ওড়াউড়ি করছে।
সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চাইলাম। কিন্তু উঠতে পারছি না কেন! কে আমাকে পেছন থেকে টানছে? ঘুরে দেখি সেই শ্বেত-শুভ্র বসনের বৃদ্ধ কোমর পর্যন্ত জলে দাঁড়িয়ে আমার হাত ধরে টানছেন। দানবের মতো শক্তি তার। বিদ্যুতের ঝলকে তার মুখটা দেখার চেষ্টা করলাম। ঠিকড়ে বেরিয়ে আসা দুটো চোখ ছাড়া আর কিছুই একঝলকে দেখতে পারলাম না। ভয়ে ঠান্ডায় সারা শরীর এখন কাঁপছে আমার। শরীরের সব শক্তি দিয়ে বৃদ্ধ আমাকে টানছেন। কিছুতেই আমি তার হাত ছাড়াতে পারছি না। হঠাৎ প্রকাণ্ড একটা গাছের ডাল ভেঙে আমাদের দুজনের হাতের মধ্যে পড়ল। অসহ্য ব্যথায় মনে হল আমার হাতটা ভেঙে গেছে। বৃদ্ধ ডাল হাতে পড়ায় হাতটা ছাড়িয়ে নিলেন। আমি প্রাণপণে চিৎকার করতে করতে সামনের দিকে ছুটতে লাগলাম।
দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আমি এখন ছুটছি। শো শো শব্দে বাতাসের সাথে ধুলো আর শুকনো পাতা উড়ে আসছে। গাছগুলো ঝড়ের দাপটে ধনুকের মতো বেঁকে যাচ্ছে। কড়কড় করে মাঝেমধ্যেই আকাশ কাঁপিয়ে পড়ছে বজ।
সামনের দিকে ছুটতে ছুটতে মনে হল আমি এখন যাব কোথায়? হঠাৎ খেয়াল হল ডাঃ সমীরণ দত্তের কথা। তিনি নিজেই তো আমাকে তাঁর বাড়িতে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু এত রাতে? রাত দেখে লাভ নেই। প্রাণ বাঁচাতে হলে তাঁর ঘরেই যেতে হবে।
ঝড়ের গতি বাড়ছে। সাথে বড় বড় দু-এক ফোটা বৃষ্টিও পড়তে শুরু করেছে। আমি উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়তে লাগলাম। কতক্ষণ দৌড়েছি তা খেয়াল নেই।
ওই তো পাঠশালাটা। তার ডানদিকে পুরনো আমলের একটা ঘর দেখা যাচ্ছে। ইট রঙেরই হবে মনে হয়। গেটের পিলারে কিছু একটা নাম লিখা আছে। অন্ধকারে পড়া সম্ভব নয়। দরজার সামনে এসে দুবার সজোরে কড়া নেড়ে আস্তে আস্তে অবশ শরীরে বারান্দায় বসে পড়লাম।
দরজা খুলে ডাঃ সমীরণ দত্ত বেরিয়ে এলেন। এত রাতে আমাকে দেখে প্রশ্ন করলেন, "আপনি! এত রাতে?"
কাঁপা কাঁপা স্বরে বললাম, "আমাকে দয়া করে একটু ভেতরে আসতে দিন। সব বলছি।"
সমীরণবাবু সব শুনলেন। কিন্তু আশ্চর্য হলেন না। ভয়ও পেলেন না।
"বসুন," বলে চুপচাপ পাশের ঘরে গিয়ে দু কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এলেন। ভদ্রলোক মনে হয় একাই এই বাড়িতে থাকেন। চায়ে চুমুক দিতে দিতে বললেন, "এই ঝড়ের রাতে একটু চা না হলে গল্পটা জমবে না। আপনার কথায় আমি একেবারেই অবাক হইনি। আগে আমি ভূত প্রেতে বিশ্বাস করতাম না। কিন্তু এখন করি। না করে তো উপায় নেই। বাস্তবকে তো আর অস্বীকার করা যায় না।"
ভদ্রলোক এত স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন কেন? সব! তিনিও কি ভূতের পাল্লায় পড়েছিলেন?
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত প্রায় একটা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। সমীরণবাবু আমাকে বসিয়ে রেখে আবার পাশের ঘরে চলে গেলেন। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চারপাশটা ভালো করে দেখলাম। ঘরটা পরিপাটি করে গোছানো। টেবিলের ওপর দু-তিনটে ডায়রি পড়ে আছে। আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে ডায়রিগুলো দেখতে লাগলাম। সম্ভবত বই প্রকাশের জন্য ডায়রিতে লিখে সব গুছিয়ে রেখেছেন। একটায় লেখা, "নীলাম্বর ঠাকুরের আশ্রম বৃত্তান্ত।" আগ্রহের সাথে আমি পাতা উল্টে যেতে লাগলাম। এক-দুই করে দশ অধ্যায়। দশম অধ্যায় হচ্ছে মৃত্যু রহস্য। এটাই আমার জানা দরকার। মাত্র আটটি পাতা। কিন্তু পড়তে পড়তে আমার সারা শরীর থর থর করে কাঁপতে শুরু করেছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। আমি এখন বনের বাঘের হাতে এসে পড়েছি।
সমীরণবাবু ডায়রিতে অকপটে লিখেছেন তার সব অপকর্মের কথা। আখড়ার বর্তমান সেবাইত মদনঠাকুরের সাথে মিলে এই এস্টেটের সব সম্পত্তি নিজেরা ভাগ করার লোভে প্রতিদিন তিনি নীলাম্বর ঠাকুরকে সিডেটিভ দিতেন। নীলাম্বর ঠাকুরের ঝিমুনিকে তারা পরমাত্মার সাথে মিলনের জন্য ধ্যানস্থ হওয়া বলতেন। উলুধ্বনি শঙ্খনাদ আর ভক্তদের কীর্তনের আওয়াজে রোজ রাতেই চাপা পড়তো নীলাম্বর ঠাকুরের বাঁচার আকুতি। মদনঠাকুরের নির্দেশে একটু একটু করে বাড়াতেন নেশার ডোজ। এভাবেই একদিন অত্যধিক সিডেটিভে যখন নীলাম্বর ঠাকুর সংজ্ঞাহীন, তখন প্রাণ থাকতেই তাঁকে মৃত ঘোষণা করলেন ডাঃ সমীরণ দত্ত। তড়িঘড়ি সামান্য কিছু আখড়ার আবাসিকের উপস্থিতিতে সমাধিস্থ করা হলো তাঁকে।
কিন্তু তারপর? আর কিছু লিখেননি সমীরণবাবু। দুটো খালি পাতা ছেড়ে শেষ পাতায় লিখেছেন, "সমাপ্ত।" আরও কি কিছু লেখার বাকি?
"হ্যাঁ বাকি।" আমার পেছন থেকে ভারী গলায় কে যেন বলল কথাটা। আঁতকে উঠলাম আওয়াজটা পেয়ে। আতঙ্কে বিস্ময়ে চোখ ঘুরিয়ে দেখি সমীরণবাবু আমার পেছনে দাঁড়িয়ে! সেই ঠিকড়ে বেরিয়ে আসা চোখ। থলথলে মুখ। সারা শরীর যেন বিষে নীল।
কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, "আ-আ, আপনি কি একটু আগে আমাকে জলে ডুবিয়ে..."
"হ্যাঁ, আমিই রে।"
"ক্কী ক্কী... কিন্তু কেন!"
"তুই তোর বাপের মৃত্যু রহস্য খোঁজতে এসেছিস, তাই না?"
"না, মানে আমি..."
"তাহলে শোন, 'আমি তোর বাপকেও মেরেছি। কারণ তোর বাপ নীলাম্বর ঠাকুরের মৃত্যু রহস্য জেনে গিয়েছিল। কিন্তু তোর বাপকে মারার সময় আমি জীবিত ছিলাম, এখন আমি মৃত। মদনঠাকুর আমাকে ঠকিয়েছে। সব কাজ আমাকে দিয়ে করিয়ে আমাকেই গলা টিপে মেরে ফেলেছে। মুখে বালিশ চাপা দিয়ে এখানেই, এই বিছানায়, যেখানে তুই বসে আছিস। দেখ, বালিশটা এখনো কুঁচকে আছে।"
অবাক বিস্ময় দেখলাম বিছানাটা এলোমেলো! বালিশটা ছেঁড়া। ভেতরের তুলো সব বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
সমীরণবাবু বললেন, "তোর বাপের মরার কথাটা লিখে বইটা শেষ করবো ভেবেছিলাম। কিন্তু তার আগেই ওই ক্রিমিনাল মদনটা আমাকে মেরে ফেলেছে। তাই আর লিখতে পারিনি। রোজ চেষ্টা করছি। পারছি না। তবে আমি লিখবই। পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মরা মানুষের লেখা বই ছাপবে।"
বলে সমীরণবাবু পাগলের মতো ছুটে গিয়ে একটা কলম নিয়ে এলেন। একটানে ডায়রিটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে কিছু লেখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলেন। সমীরণবাবুর দিকে এখন আর তাকানো যাচ্ছে না। ধীরে ধীরে এক বীভৎস রূপ নিচ্ছেন তিনি। হাতে তার এক চিমটি মাংসও এখন অবশিষ্ট নেই। সমস্ত হাড় বেরিয়ে এসেছে। ফ্যালাঞ্জ থেকে কলম ফস্কে যাচ্ছে। বিকট শব্দে চিৎকার করছেন সমীরণবাবু। তার চিৎকারে ঘরটা প্রায় ফেটে যাচ্ছে।
সমীরণবাবুর এই অন্যমনস্কতার সুযোগে আমি এক দৌড়ে উঠোনে চলে এলাম। তারপর শুধু প্রাণের ভয়ে দৌড়েই গেলাম। চিতা আর হরিণের দৌড়। কতক্ষণ, কতদূর দৌড়েছি মনে নেই। ছুটতে ছুটতে কখন জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়লাম তাও মনে নেই।
সকালে যখন চোখ মেললাম তখন আমি রেলস্টেশনে, স্টেশন মাস্টারের রুমে। আমাকে চোখ মেলতে দেখে ভদ্রলোক শুধু বললেন, "গ্রামের দুজন লোক স্টেশনের পাশে আপনাকে পড়ে থাকতে দেখে এখানে এনে রেখে গেছে। একটু পরেই কামরূপ ডাউন আসছে। চোখে-মুখে জল দিয়ে একটু গরম চা খেয়ে নিন।








Comments