top of page
Search

২টি জমজমাট ভূতের গল্প

বিশ্বজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়



ফুলমনির উপাখ্যান

সময়টা গত শতকের শেষভাগ হবে। কাটোয়া লাইনে তখনও কয়লার ইঞ্জিন। কু - ঝিক ঝিক  করে ছুটে চলে রেলগাড়ি। সন্ধ্যার পর স্টেশনগুলো প্রায় জনশূন্য। টিমটিমে তেলের বাতি, ঢং ঢং করা গাড়ি আসার ঘোষণা, সবুজ পতাকার সংকেত,এসব নিয়ে কাটোয়া লাইনের কুন্তীঘাট, ডুমুরদহ, জিরাট, বলাগড় প্রভৃতি স্টেশনগুলি ছিল গা ছম ছম করা পরিবেশ। অন্ধকার নামলেই অদূরে শিয়ালের ডাক কানে আসতো। সেই শব্দে কুকুরগুলোও ডেকে  উঠতো।


           শীতের শুরুতেই মিস্টার ঢালী স্টেশন মাস্টার রূপে ডুমুরদহ স্টেশনের চার্জে এলো। হালকা পাতলা রোগাটে চেহারা ছোট্ট মুখ আন্দাজে আশুতোষ মার্কা গোঁফ তার উপর কালো মোটা ফ্রেমের চশমা সবমিলিয়ে বেশ অদ্ভুত দেখতে। প্রশংসা করতেই হবে তার সমুদ্রতটে উল্টেথাকা সোনালী কচ্ছপের মত চকচকে ইয়া টাক। আর তার চারদিকে হাতে গোনা কয়েকটা দুধসাদা চুল। অফিসের সকলেই কমবেশি রোজই বলে - ঢালীবাবু, কি হবে ঐ কটা চুলের মায়া করে। বরং ভগবান মাথার উপর যে সৌন্দর্য্য সৃষ্টি করেছেন, তাকে সযত্নে লালন করুন। রোজ দুবেলা নিয়ম করে জবাকুসুম মাখুন তাতে ঝিলিক মারবে।




        ঢালীবাবু এসব কথায় কান দেয় না। বরং বন্ধুদের হালকা রসিকতায় আনন্দ পায়। কিন্তু এই ঢালীবাবু দুদিন হল ডুমুরদহ স্টেশনে এসেছেন,এর মধ্যে রাতের ঘুম ছুটে গেছে। স্টেশনের অদূরে তামলিপাড়ার সিগন্যাল ;- সেখানে রোজ রাত্রে কামরুপ এক্সপ্রেস আচমকা দাঁড়িয়ে যায়। সিগন্যাল লাল হয়ে যায়। অথচ ব্যান্ডেল থেকে কালনার মাঝখানে এক্সপ্রেস ট্রেনটির আর কোনো স্টপেজ নেই।


         অদ্ভুত এই ঘটনা রেলদপ্তরে অনেকদিন থেকেই জানে। অথচ মফস্বল এলাকা বলে উদাসীন থাকে। ঢালীবাবু স্টেশন মাস্টার হয়ে আসার পূর্বে তারকেশ্বরে থাকাকালীন ডি.জি.এম সরাসরি টেলিফোনে মিস্টার ঢালীকে তামলিপাড়ার সিগন্যালের কেসটা দেখতে বলেছেন। এমনকি প্রশাসনিক সবরকম সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন। ঢালীর কাছেও বিষয়টা খুব সিরিয়াস।


         


                             পর্ব -২



 শীতকালে অন্ধকার নামে ঝুপ করে। রেললাইনের দুধারে কাঁটা ঝোপঝাড়ে তখনও দু-একটা গাঙশালিক চেঁচায়, কুবোপাখি ডাকছে। আকাশ ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। কৃষ্ণ দ্বাদশীর মোমফালি চাঁদ দূরে আমবাগানের মাথায় দেখা যাচ্ছে। ঢালীবাবু একটা সিগারেট ধরিয়ে কেবিনম্যান ভিকনকে  নিয়ে প্লাটফর্মে এসে দাঁড়ায়।


        সবে সন্ধ্যে হয়েছে। স্টেশনে এই মুহূর্তে লোকজন নেই বললেই চলে। ঢালীবাবু সিগারেটে লম্বা একটা টান দিয়ে দূরে তামলিপাড়ার সিগন্যাল-টা দেখে। এক্ষুনি  আজিমগঞ্জ প্যাসেঞ্জার যাবে। তারপর কাটোয়া লোকাল,তারপর কামরূপ এক্সপ্রেস, হাতে বেশ কিছুটা সময় আছে। তাই গল্প শুরু করে -


- এই ভিকন তুই তো শুনলাম প্রায় চার বছর ডুমুরদহে পোস্টিং। সিগন্যালে কি সব ট্রেন দাঁড়ায় ?


-  না না ঢালীদা এক্সপ্রেস, লোকাল রাতের সব ট্রেনেই সিগন্যাল গ্রীন থাকে। কিন্তু কামরূপ এলেই লাল হয়ে যায়।


- কতক্ষণ লাল থাকে।




- বেশিক্ষণ না। গাড়ি কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই সিগন্যাল গ্রীন হয়ে যায়।


- কিন্তু তুই তো কেবিনম্যান। তুই বল সিগন্যাল ডাউন করে লক করা থাকলে, লাল হয় কি ভাবে?


- সেটাই তো স্যার রহস্য।


- ঠিক আছে বুঝলাম। কিন্তু সিগন্যালে কাউকে কোনো দিন রাতে ওঠানামা করতে দেখেছিস।


- সন্ধের পর ভয়েতে ওখানে কেউ যায় না। কথা বলতে বলতে ভিকন চিৎকার করে - এই বাবুরাম, একবার এদিকে আয় তো, ঢালীদা ডাকছে।


- ও কে ? কেবিনের লাইটম্যান ?


- হ্যাঁ ঢালীদা তামলিপাড়ার সিগন্যালে বাবুরামই তেললণ্ঠন রেখে আসে।


         একটু পরেই বাবুরাম কাছে আসতেই ভিকন বলে - এই বাবু ইনি হলেন আমাদের নতুন স্টেশনমাস্টার, বাবুরাম হাতের তেলকুপি গুলো রেখে নমস্কার করে। ঢালীবাবু ভনিতা না করে সরাসরি বলে- বাবুরাম তুমি কতোদিন সিগন্যালে তেলবাতি দিচ্ছো ?


- তা স্যার, বারো তেরো বছর হবে।


- ডাউন কামরুপ কেন ওখানে রাত্রে বেলায়  দাঁড়িয়ে পড়ে ? তুমি কিছু জানো ?


- সবাই তো বলে লখাই ভূতের কান্ড। ও নাকি ট্রেন এলে তাকিয়ে থাকে। ট্রেন দাঁড়িয়ে যায়।


- কি বাজে কথা বলছো ? ট্রেনকে ভূত দাঁড়  করাবে ?


- জানিনা স্যার। আমিতো দুপুর থাকতে তেলকুপি দিয়ে আসি। উঁচু সিগন্যালে উঠলে হাত পা কাঁপে। কে যেন পা টেনে ধরে। গোঙানির শব্দ ভেসে আসে।


           বাবুরামের কথার রেস টেনে ভিকন বলে- শুনেছিলাম একবার সিগন্যাল এমন লক হয়েছিল, যে ছঘন্টা সব ট্রেন দাঁড়িয়ে যায়। তারপর রেলের স্টাপ সকলে মিলে মশাল নিয়ে সিগন্যালে যায়। দেখে দাড়িওয়ালা এক কোটপড়া লোক তরতর করে নেমে পাশের জঙ্গলে চলে যাচ্ছে।




- তাহলে ঐ লোকটাই  গিল্টি। ব্যাটাকে ধরলেই প্রবলেম সলভ হয়ে যাবে।


- এর মধ্যে ভিতরে ফোন বেজে ওঠে। ঢালীবাবু ভিতরে যায়। ভেতর থেকে চিৎকার করে ভিকন, গেট ফেলো, আপ আজিমগঞ্জের খবর হয়েছে। আর একটা কথা, কামরূপের টাইমে তুমি অফিসে থেকো। আমি একটু বেরোবো।


- ঠিক আছে ঢালীদা, আমি আসছি।



                              পর্ব -৩


 পাঁচব্যাটারির টর্চ নিয়ে ঢালীবাবু গুটি গুটি পায়ে তামলিপাড়ার সিগন্যালের পাশে এসে দাঁড়ায়। ধনুকের মতো রেললাইনটা বাঁক নিয়ে জঙ্গলের ভিতরে ঢুকেছে। চারিদিকে ঘোলাটে অন্ধকার। পাশে অশ্বত্থ গাছে অজস্র বাদুর ডানা ঝাপটাচ্ছে। ঢালীবাবু লক্ষ করে সিগন্যালটা বেশ উঁচু। অনেকটা টিলার মতো। আসলে রেললাইন অনেকটা বাঁক নেওয়াতে গাছপালায়  সিগন্যালের আলো দূর থেকে দেখা যায় না। 


         ঢালীবাবু টর্চের আলো চারিদিকে ঘোড়ায়। না, কাছাকাছি কোনো জনপ্রাণী নেই। জমির আল পেরিয়ে বাঁদিকে অনেকটা দূরে কয়েক  ঘর আদিবাসীদের বাস। ওখান থেকে টিমটিমে আলো দেখা যাচ্ছে। দেখা যাক ভুত প্রেত কে এসে ট্রেন থামায়।


         হঠাৎ ঢালীবাবু লক্ষ্য করে দূরের জঙ্গলের মধ্যে একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। একটু অবাক হয়। কিছুইতো ছিল না। হঠাৎ করে ধোঁয়া উঠছে কোথা থেকে। দুপা এগিয়ে যেতে দেখে বিরাট সেগুন গাছের নিচে একটা ঝুপড়ি।ধোঁয়াটা সেখান থেকেই উঠছে।


        ঢালী পাঁচ ব্যাটারির টর্চ এ ফোকাস মারে। তীক্ষ্ণ আলোর রেখা সোনালী হরিণছানার মতো  পলকে ছুটে বেড়ায়। এইবার রহস্যের সমাধান হবে, সেই কৌতূহলে ঢালীবাবু সন্তর্পনে কাছে যায়। খুব কাছ থেকে দেখে, না কোনো লোকজন কাছেপিঠে নেই। বহুদূরে রামানুজদের বাঁশবাগানে শেয়াল ডাকছে। হাড়হিম করা একটা বাতাসের ফালি মুহূর্তে ঢালীবাবুর সারাশরীর অবশ করে দেয়। হঠাৎ অশ্বথগাছে বাদুরের পাল বিকট ডানা ঝাপটে উড়ে যায়। জঙ্গলের গভীরে অবিরাম ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। সজাগ দৃষ্টিতে ঢালীবাবু পাতাঝোপের ঘরটায় উঁকি মারে। ভিতরে অন্ধকার। উনুনে মাটির হাড়ি বসানো। নিচে টিমটিমে আগুন জ্বলছে। কিন্তু কেউ তো ঘরে নেই।


           ঢালীবাবু চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। একবার ভাবে টর্চ জ্বালিয়ে দেখবে। কেউ আছে কিনা। পরোক্ষনে ভাবে, না থাক বদমাশ লোকটি লুকিয়ে ট্রেন থামলে ঠিক ধরে ফেলবে। ব্যাটাকে ধরতেই হবে।


           হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল। কয়লার বিশালায়তন ইঞ্জিনটি বিকট শব্দে ক্রা..এ.. এ..চ... শব্দে দাঁড়িয়ে যায়। মুহূর্তে  ঢালীবাবু পিছন ঘোরে। অবাক বিস্ময় দেখে কামরূপ দাঁড়িয়ে পড়েছে। সিগন্যাল লাল হয়ে আছে।


            কিন্তু একি ? লতাপাতার ঘর থেকে এক আলুথালু ছেঁড়াখোঁড়া কাপড়পড়া বুড়ি ছুটে বেরিয়ে যায়। রেল লাইনের ধার দিয়ে ছুটতে থাকে। ঢালীবাবু দেখে, বুড়িটা নেচে নেচে বলছে দাঁড়িয়েছে দাঁড়িয়েছে এবার আসবে। লখা  এবার আসবে। বলে ছুটতে থাকে।


            ঢালীবাবু কাছে এগোয়। আরো কাছে। কামরুপ এক্সপ্রেস হুইসেল দিতে দিতে বেরিয়ে  যায়। ঢালীবাবু সিগন্যাল দেখে, ঐতো গ্রীন হয়েছে। ঘড়ির টাইমটা দেখে রাখে। ভিকনের  কাছে জানতেই  হবে কখন সিগন্যাল ডাউন করলো। কিন্তু বুড়িটা ওই ভাবে ট্রেন দেখে  ছোটা ছুটি করছিল কেন ? ঢালীবাবুর মনের গভীরে একে একে প্রশ্নগুলো সাজিয়ে রাখে। টর্চ জ্বালিয়ে লাইন ধরে হাঁটতে থাকে। সামনেই  ডুমুরদহ স্টেশন।


   


                             পর্ব - ৪



 আজ রোববার ট্রেনের সংখ্যা এমনিতেই কম। তার উপর ডেলি প্যাসেঞ্জারের চাপ নেই। টিকিট বিক্রি কম। ঢালীবাবু একটা সিগারেট ধরিয়ে লম্বা সুখটান দেয়। মনের মধ্যে ট্রেনের সিগন্যাল  বুড়ির ছোটাছুটি, এবার লখা ফিরে আসবে,- এসব পাক খেতে থাকে। ওদিকে ভিকন একটা বুড়োকে নিয়ে এসে বলে- ঢলীদা এনার নাম বলাই সোরেন, তামলিপাড়ার মোড়ল। লখাইএর  মৃত্যু, আর পাগলীর ব্যাপারে অনেক কিছু জানে।


- বসুন বসুন, বলে ঢালী চেয়ার এগিয়ে দেয়।


ভিকন, চা আনতে যায়। ঢালীবাবু জিজ্ঞেস করেতে বলাইবাবু বলতে শুরু করে -


 প্রায় চল্লিশ বছর আগে লক্ষণ যাদব নামে এক কেবিনম্যান এসেছিল ডুমুরদহে। হঠাৎ একদিন সন্ধ্যাবেলায় শুনি লক্ষণ কামরূপে কাটা পড়েছে। আমরা ছুটে গিয়ে দেখি ঐ সিগন্যালের পাশে ছিন্নভিন্ন হয়ে কেবিনম্যান পড়ে আছে। কয়েকদিন পর নতুন কেবিনম্যান আসে। কিন্তু লক্ষণ যাদবের বউ পাগল হয়ে ঐ ডুমুরদহে ঘুরে বেড়ায়। বিহার থেকে ওর আত্মীয়রা নিতে এলেও যায় না।


- তাহলে কি ঐ পাগলী বুড়িটাই লক্ষনের  স্ত্রী।


- ঠিক ধরেছেন স্যার। লতাপাতার ঘর করে ওখানেই পড়ে আছে। ও ভাবে লক্ষণ সিগন্যালের উপরে আছে।


- অদ্ভুত কান্ড কিন্তু সিগন্যাল কি ভাবে লাল হচ্ছে ?


 এর মধ্যে ভিকন এসে চা দেয়। বলে- স্যার  লক্ষণ ভুত হয়ে ট্রেন থামায়। ওর রাগ, ট্রেন হুইসেল না দেওয়াতেই ও কাটা পড়েছে। তাই রোজ সিগন্যাল লাল করে কামরূপ দাঁড় করায়।


          কথা শুনে ঢালী বিরক্ত হয় - আরে ধূত। এভাবে কি ভূত ট্রেন দাঁড় করতে পারে নাকি ?সব আজগুবি গল্প। কথা বলেও ঢালীবাবু মনে মনে ভাবে,তাহলে পরশু রাত্রে ট্রেন কেন দাঁড়ালো। কিন্তু এসব বাদ দিয়ে ঢালীর মাথায় একটা প্রশ্ন আসে, লক্ষণের মারা যাওয়ার পর রেল যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছিল,সেটা কোথায় গেল।


           দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে ঢালীবাবু কলকাতায় অফিসে মিস্টার গুপ্তকে ফোন করে। উনিশশো সাতাত্তর-এ কেবিনম্যান লক্ষণের কেস হিস্ট্রি নেয়। না, কেউ সে টাকা ক্লেম করেনি।ওটা  রেল বোর্ডের কাছেই আছে। ঢালীর মাথায় প্ল্যান খেলে যায়।


           সেদিন সন্ধ্যেবেলায় ঢালী ভিকনকে  নিয়ে কিছু শুকনো খাবার আর ফল বিস্কুট নিয়ে ঐ  ফুলমনি বুড়ির কাছে যায়। প্রথমটা  পাগলামী করলেও, পরে খাবারগুলো নেয়।


           এইভাবে ঢালীবাবু রোজ দুবেলা নিয়মকরে ভিকনকে দিয়ে বুড়ির খাবার পাঠায়। আস্তে আস্তে ফুলমণি ঢালীর অফিসে আসতে আরম্ভ করে। ঢালীবাবুর মায়া হয়। শত হলেও রেল কর্মীর বৌ কিনা। তাই ডাক্তার দেখানো,ওষুধ পথ্য দেওয়া কাপড়-চোপড় দেওয়া, ঢালীবাবুর  যত্নে ছমাসের মধ্যে ফুলমণি ভালো হয়ে ওঠে।


          তার কিছুদিন পরে ঢালীর অফিসে মিস্টার গুপ্তের ফোন আসে, লক্ষণ যাদবের সব টাকাপয়সা সেঙশান হয়েছে। ওনার স্ত্রী যেন দেখা করে।


           ওদিকে ফুলমণির এক বাপের বাড়ির আত্মীয়র খোঁজ পাওয়া যায় হাওড়ার  রামরাজাতলায়। ঢালীবাবু ভিকন মারফত তাকেও ডাকে। ঠিক হয় আগামী রবিবার ফুলমণি পাকাপাকি ভাবে চলে যাবে হাওড়ায়। স্বামীর পাওনা গন্ডা নিয়ে ছোট একটা ফ্ল্যাট কিনে থাকবে। পেনশন আর বাকি জমানো টাকার সুদে ফুলমণির চলে যাবে।


           দেখতে দেখতে রবিবার চলে আসে। ঢালী নতুন পোশাক কিনে দিয়েছে। ফুলমণি সেজেগুজে ঠিক সকাল নটায় অফিসে হাজির। বয়স ষাট পেরিয়ে গেলও এইকদিনের সেবাযত্নে অনেকটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে।


-  এই ভিকন ফুলমণি দিদির ব্যাগ এনেছিস ?


- হ্যাঁ ঢালীদা ঐ তো ব্যাগ। কিন্তু ফুলমণি মাসি কোথায় ? ট্রেনের টাইম হয়ে গেছে।


           বলতে বলতে সাফাইকর্মী বাসুদেব বলে ওঠে, ওই তো ফুলমণি আসছে। সবার পিছনে তাকায়, ফুলমণি কাছে আসে। ঢালীবাবু ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে - কোথায় গেছিলে ? আমারা  টেনশন করছি।


 - মাস্টারবাবু, আমি ঐ  সিগন্যালটায় পেন্নাম  করতে গেছিলাম, আর যে  যাওয়া হবেনি। তাই গড় করে এলাম।


- মানে ? ওখানে কি আছে ? ট্রেন যদি চলে যেত?


   ফুলমণি লাজুক মুখে ঘোমটাখানা আরেকটু সামনে টেনে বলে - কি যে কন মাষ্টার,ঐ সিগন্যালেই তো লখা আছে। স্বামীরে পেন্নাম করে এলাম। আর তো দেখা হবে না।


         ঢালীবাবু ফুলমণির কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলো না। শুধু মনের গভীরে তৃপ্তির হাসি সকালের সোনারোদ হয়ে খেলে বেড়াতে লাগলো।


           ফুলমণিকে নিয়ে ভিকন ট্রেনে ওঠে। ঢালীবাবুর মনে কিছুটা কষ্ট বর্ষার মেঘের মতো  জমাট বাঁধলেও তার ফাঁকে রোদের ঝিলিকও  উঁকি মারে। ঢালীবাবু কোয়াটারে ঢোকে।


           সন্ধ্যের আগে হঠাৎ পশ্চিমদিকে ঘনকালো মেঘ ওঠে। দমকা বাতাসে জানালার কপাট জোরে বন্ধ হয়। ঢালীবাবু বিছানা থেকে ধড়ফড় করে ওঠে। ক্রমশ চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। হঠাৎ ঝড় ওঠে, তার সঙ্গে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। ভিকন ফিরে এসে অফিস সামলাচ্ছে। তাই ঢালীবাবু কোয়াটারে। ছাতা নিয়ে ধীর পায়ে স্টেশনে আসে। হু হু  করে বাতাস বইছে। তার মধ্যে কালো মেঘের বুক চিরে বিদ্যুতের ঝলক। ঢালীবাবু শেডের তলায় এসে দাঁড়ায়। হঠাৎ ঝমঝম করে কয়লার ইঞ্জিন সমেত একটা মেল ট্রেন নিমেষে স্টেশন ক্রস  করে। ঢালীবাবু ঘড়ি দেখে। আরে ছটা চল্লিশ এতো, কামরুপ এক্সপ্রেস। তাহলে কি  সিগন্যাল গ্রীন ছিল ? 


 জানা যায়, ফুলমণি চলে যাওয়ার পর আর কোনোদিন তামলিপাড়ার সিগন্যালে কামরূপ দাঁড়ায়নি । 

____________________________________

সাহেব ডাঙার বন্দীকালী


সময়টা গত শতাব্দীর আটের দশক। রহস্যময় এলাকা সাহেবডাঙা।গঙ্গার ওপাড় চরকৃষ্ণবাটি। সেখানে বিডিও হয়ে কাজে যোগ দিলেন কলকাতার আরিন বোস। ভীষণ ছটফটে, আধুনিক। তার সার্ভিস জীবনের এক রহস্যময় ঘটনা নিয়ে আজকের কাহিনী।

 শান্ত ভাগীরথীর বুকে ছলাত ছলাত করে এগিয়ে চলেছে ছোট্ট ডিঙি।জোয়ারের টানে পাল তুলেছে মাঝি। সন্ধের আগে আরিনকে চরকৃষ্ণবাটি পৌঁছাতে হবে। নদী ভাঙন সরজমিনে তদন্ত করতে ভাগীরথীর দুই পাড় ঘুরে দেখা। কিন্তু গল্প কথায়  আরিন বুঝতে পারে,অনেকটা পথ চলে এসেছে। মাঝিকে সুধায়, ও তিনু ভাই, আমরা এখন কোথায়?

- বিডিও স্যার, আমরা সাহেবডাঙা আর মিলনগড়ের মাঝে আছি। নদীর মাঝ বরাবর নাউ টানতে হবে। নয়তো ভয় আছে।

আরিন একটা সিগারেট ধরায়। পাড়ের দিকে তাকায়,, মাথা সমান পাটের ক্ষেতে অন্ধকার নামছে,পূবের আকাশে ছানা কাটা ধূসর মেঘের সারি, মাঝে এক ফালি সিঁদুরে মেঘ। আকাশ পথে পাখিদের ঘরে ফেরা। গাঙ শালিকের চিৎকার আর নদীর বুকে জোয়ারের স্নিগ্ধ বাতাস আরিনকে একা থাকার দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।

 এর মধ্যে সাহেবডাঙার খুব কাছ থেকে কয়েকটা শেয়াল ডেকে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে দূরে দূরে আরো শেয়াল ডাকে। আরিন লক্ষ করে পাড় দিয়ে সাদা জন্তুগুলো ছোটাছুটি করছে।ধূসর অন্ধকারে সাদা শেয়াল দেখে আরিন বলে, তিনু ভাই, ওপাড়ে অনেক শেয়াল আছে দেখছি।

- হ্যা স্যার, সাদা শেয়াল নদীর পাড়ে আসে, কাঁকড়া ধরে।তবে দিনের বেলায় ওপাড়ে কেউ যেতে সাহস পায়না।সাদা শেয়াল ছিঁড়ে খাবে।

- এতো হিংস্র? কিন্তু একটু আগে যে দেখলাম মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে,আরতি হচ্ছে।

- ওটা হোলো বন্দী কালী। নিত্য মায়ের পুজো হয়। শনি মঙ্গলে দূর গ্রাম থেকে পুজো দিতে যায়। মানত করে। ভীষণ জাগ্রত।

- কিন্তু নামটা অদ্ভুৎ,বন্দী কালী।কবে প্রতিষ্ঠা হোলো, অদ্ভুৎ নাম কেন? তুই জানিস?

তিনু হালের মাথা ধরে একটা পান মুখে দেয়,বলে, আমাগো তিন পুরুষ মাঝি । খুরার  কাছে শুনছি, বিপ্লবীরা মায়ের কাছে আসতো, ঘন জঙ্গল,তাই লুকায়ে থাকতো। তারাই মারে বসাইছে।

- তারমানে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা পায়।

দেখতে দেখতে চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে।নদীর বুকে দূরে দূরে নৌকার টিমটিম আলো জ্বলে ওঠে।জেলেরা মাছ ধরতে বেরিয়েছে। আরিন সিগারেট ধরায়। সুখ টান দেয়। চরকৃষ্ণবাটি অঞ্চলে সার্ভিস নেওয়ার পর থেকেই ওর মনে নদী, নদীর পাড়ে গ্রাম,জেলে পরিবার,চাষীদের কাজকর্ম,মেয়ে বউদের গরু ছাগল হাস মুরগি প্রতিপালন,, এক অদ্ভুত সহজ সরল জীবন কলমী ডগার বেয়ে যায় ।

আরিন নিজের এলাকা মানিকতলা কাঁকুরগাছি, ব্যাস্ত শহর দেখতে দেখতে হাঁপিয়ে যেতো। এখানে এসে মনের শান্তি।

একটা সুখ টান দিয়ে আরিন জিজ্ঞেস করে, এই তিনু, ভাবছি আগামী মঙ্গলবার বন্দী কালী দেখতে আসবো।তুই আনবি তো?

- সে আসতে পারি,তবে রাত করলি হবে না। বেলা বেলায় বাড়ি ফিরতে হবে।

-  ঠিক আছে। কিন্তু কখন পুজো হয়?

- বন্দী মায়ের পুজো দুপার কালে।

এর মধ্যে আরিন বাঁদিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে,, এই তিনু,দূরে ওই মানুষটা কি করে? এক্ষুনি শিয়াল খাবে।

- স্যার, ঐতো সেই সাহেব। শিয়ালের বন্ধু। রাত হলি ঘুরে বেড়ায়।

- কিন্তু দিনে থাকে কোথায়?

- ওকে পাবেন কই? সাহেব ডাঙার রাত সাহেব।

পর্ব,,২

দেখতে দেখতে মঙ্গলবার চলে এলো। গঙ্গার পার ভাঙন নিয়ে চুঁচুড়া সাদরে দুবার মিটিং সেরে কাগজপত্র জমা দিয়েছে।এবার জেলার বড়বাবু,আর সরকারী লোকজন নিয়ে সরজমিনে আসবে। কিন্তু তার মধ্যে আরিনের মনে, বন্দীকালী,রাত সাহেব, সাহেবডাঙার সাদা শেয়াল ,যেনো সারাক্ষণ বুরবুরি কাটছে। হাল্কা টিফিন করে ঘড়ি দেখলো, বারোটায় তিনু আসবে চাঁদ্রা ঘাটে। আরিন রেডি হয়ে রিক্সা ধরে। ঘাটে আসতেই অনেক নিচে জল থেকে তিনু হাঁক দেয়, বাবু, আমি এখানে।

আরিন ধীরে ধীরে নিচে নামে।বালির পাড়, তাই হরকে যাওয়ার ভয়।তিনু হাত ধরে, আরিন ডিঙিতে ওঠে। ছই এর পাশে বসে। তিনু লোগি দিয়ে পাড়ে ঠেলা মারতেই ডিঙি গভীরে চলে যায়।

- এই তিনু,আমি ফুল মিষ্টি এনেছি, মায়ের কাছে যাচ্ছি, পুজো দেবো কিন্তু।

- সেতো বুঝলাম,কিন্তু সঙ্গে দড়ির টুকরো এনেছেন? 

- দড়ি! সেটা কি পুজোয় লাগে?

- হ্যা বাবু, এক ফালি দিতেই হবে।মা দড়িতে বন্দী ছিলো।তাই কেতন ঠাকুরের আদেশ।

- অদ্ভুৎ সব নিয়ম। আচ্ছা, ওখানে পাওয়া যাবে না? কিনে নিতাম।

- ঠিক আছে বাবু, আমি দেখছি। অনেকে বড়ো আনে, একটু কেটে নেবো।

নদীতে ডিঙি তরতরিয়ে এগিয়ে চলে। এখন ভাঁটা, তাই দাঁড় বাইতে হয় না। শুধু হাল ধরে রাখে। সূর্য ঠিক মাথার উপর। তিনু বিড়ি ধরায়।প্রায় এক ঘন্টা পর আরিন, সাহেবডাঙা পৌঁছালে তিনু ডিঙি বেঁধে উপরে ওঠে। সামনে বিরাট জনশূন্য প্রান্তর। ঘরবাড়ি চোখে পড়ছে না। বাঁদিকে পাট ক্ষেত, ডানদিকে বাবলাবন, মাঝে সরু আলপথ। দুজনা হেঁটে চলেছে। আরিন টুপি নিয়েছে। তিনু লাঠি নিয়ে পাশে। যে কোনো মুহুর্তে শেয়াল আসতে পারে। অনেকটা পথ পেরিয়ে ঘন জঙ্গল,তার মাঝে সরু রাস্তা দিয়ে একটু এগোতেই সামনে বন্দী কালীমন্দির। কিন্তু এতো ভক্ত এলো কোথা থেকে?আরিন জিজ্ঞেস করে। তিনু বলে, এরা অনেক আগেই চলে আসে। পুজো শেষের দিকে। আরিন এগিয়ে যায়, বিরাট চাতাল, চারিদিক খোলা ।গাছের গুঁড়ির উপর টিনের ছাউনী। ভীষণ নির্জন জায়গা। যারা পুজো দিচ্ছে তারাও চুপচাপ।শুধু ঠাকুরমশাই মায়ের সামনে মন্ত্র পড়ছে।

আরিন মায়ের মুখ দেখে। চোখ লাল টানা, মনিদুটো পাথরের গুলির মতো, কপালে সিঁদুর লেপা। লালপার সাদা শাড়ী, দুটো মাত্র হাত। কিন্তু মুণ্ডু, খাঁড়া কিছুই নেই। বদলে কাঠের বন্দুক আর এক হাতে দড়ির গোছা।

কেতন ঠাকুরের মন্ত্র,ধূপের গন্ধ,ধুনোর ধোঁয়া, মন্দির চত্বর যেনো দেবভূমি। আরিন ইতস্তত করছে, এখনও মায়ের পুজো দেওয়া হলো না, কি করবে। তিনুও চুপ। হঠাৎ ভিতর থেকে চিৎকার,, পুজোর ডালী হাতে কেনো, এদিকে আয়।

আরিন ধীর পায়ে এগিয়ে যায়। কেতন ঠাকুর ইশারায় বসতে বলে। হাত বাড়িয়ে ডালা নেয়। তারপর আবার পুজো শুরু করে।

পর্ব,,৩

পুজো পাঠ শেষ হলে সকলে মায়ের কাছে আশির্বাদ নেয়। বাটার দড়ি মায়ের পায়ে রাখে। প্রণাম করে। কেতন ঠাকুর চরণামৃত দেয়, একে একে চলে যায়। আরিন চুপ করে চাতালে বসে দূর থেকে কালী মূর্তি দেখে। অতীত যেনো মনের গভীরে বিলি কাটে। তিনু বলেছিলো ওই কেতন ঠাকুর সাহেবডাঙার ইতিহাস,বন্দী কালীর গল্প জানে। আজ শুনতেই হবে।

অবশেষে প্রসাদ নিয়ে ঠাকুর নিজেই কাছে আসে।বলে, কিছু জানার বাসনায় এখানে পদার্পণ। তার আগে প্রসাদ নে। এখন বসতে হবে। আমি শেয়ালদের প্রসাদ দিয়ে তারপর আসবো।

আরিন বোবা হয়ে যায়।ছোট্ট বেঁটে গাট্টাগোট্টা চেহারা,মুখে সাদা দাড়ি, কপালে বিরাট তিলক, গলায় রুদ্রাক্ষ র চার ফেত্তি মালা। বয়স নব্বুই ছুঁই ছুঁই হবে।লাল শালুর বসন।

আরিনের ভয় হয় না, বরং ভক্তি আসে। কিন্তু শেয়ালকে প্রসাদ দিয়ে কখন আসবে,কে জানে। জিজ্ঞেস করে, এই তিনু, কেতন ঠাকুর কখন আসবে?

- তা জানে কেডা। তবে আমরা কিন্তু বেলা বেলা নাওতে উঠবো।

 আরিন মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। অদ্ভুৎ এক শান্তি বিরাজ করছে। কেনো বন্দীকালী নাম হলো সেই রহস্য জানতেই হবে। এর মধ্যে ফোন বেজে ওঠে। বাড়ি থেকে মা ফোন করেছে।,, হ্যালো মা, এইতো, আমি এখন সাহেব ডাঙা, বন্দী কালী মন্দিরে। তোমরা কেমন আছো?

- ভালো, কিন্তু ঐসব কালী বাড়ি কেনো?

- চলে এলাম, খুব জাগ্রত কালী। অনেক ভক্ত এসেছিল, ঠাকুর মশাই একটু বেরিয়েছে। তাই বসে আছি।

- সকাল সকাল বাড়ি ফিরিস। একে গ্রাম, তারপর নদীর পাড়। এই দাঁড়া,বাবা কথা বলবে।

- হ্যালো বাবা, এই বন্দীকালী দর্শনে এসেছি। সাহেব ডাঙা।তোমাদের একদিন আনবো।

- আমি অফিস স্টাফদের সাথে একবার গেছিলাম।বিপ্লবীদের আখড়া ছিল।

আরিন চমকে যায়, জিজ্ঞেস করে, এখানে ?

- শুনেছি নিশাচর এক সাধু, মন্দিরে পুজো করে। এখন আছে কিনা জানিনা।

হ্যালো, হ্যালো,কথা কেটে কেটে যায়।টাওয়ারে ডিস্টার্ব। বাবা আমি রাখছি। কিচ্ছু শোনা যাচ্ছে না।

- বিডিও স্যার, ঠাকুর তো এলো না, কি করবেন? শীতের বেলা,সূয্যি নামুপানে। ঝুপ করে অন্ধকার নামে। এখানে থাকা ঠিক নয়।

তিনুর চোখে মুখে উৎকণ্ঠা। আরিন হেসে বলে, তুই এতো ভীতু কেনো? আরে আমি আছি। কেতন ঠাকুর আসুক।

ওদিকে পূবের মাঠে আলো কমে আসছে। আকাশ পুরস্কার।আশেপাশের জঙ্গল থেকে পাখিদের ঘরে ফেরার কোলাহল।দূর থেকে মিলের সাইরেন বেজে ওঠে। আরিন কি করবে? চলে যাবে? নাকি আর একটু অপেক্ষা করবে।

আরো মিনিট কুড়ি পর কেতন ঠাকুর এলো। আরিনকে বসিয়ে রেখে মন্দিরে ঢোকে,কলাপাতায় প্রসাদ নিয়ে আরিন কে দেয়। আরিন কিছু বলতে গেলে কেতন ঠাকুর মুখে হাত দিয়ে বলে,মায়ের আরতির সময়। প্রদীপ জ্বালিয়ে আসি।

আরিন প্রসাদ খায়।এর মধ্যে আশেপাশে তিনুকে দেখতে না পেয়ে ডাক দেয়।না, আসছে না। কোথায় গেলো? ঘাটে ডিঙি বাঁধা। যাবে কোথায়।

মন্দিরের ভিতরে তখন আরতি হচ্ছে। আরিন প্রসাদ শেষ করে মায়ের সামনে যায়। অদ্ভুৎ এক নীরবতা,প্রদীপের আলো কেঁপে কেঁপে উঠছে। মায়ের চোখ শান্ত। কেতন ঠাকুরের অনেক বয়স, তবু দুলে দুলে ঘণ্টা হাতে আরতি করছে।

কিন্তু তিনু মাঝি কোথায় গেলো? অনেকক্ষণ নেই।মনের মধ্যে শঙ্কা তৈরী হলেও আরিন ওসব না ভেবে চাতালে বসে। সন্ধ্যে হয়ে আসে। তিনু হয়তো চলে গেছে। কিন্তু এখন কি করবে। ফোনে অফিস পিয়ন বুদ্ধি কে ধরে,, এই বুদ্ধি, আমি সাহেব ডাঙায় বন্দীকালি বাড়ি।পুজোয় এসেছি। কিন্তু তিনু মাঝি কোথায় গেছে। আলাদা কোনো নৌকো পাঠাতে পারবি ?

- স্যার, আপনি সাহেব ডাঙায় গেছেন? কেতন ঠাকুর কিন্তু ভয়ঙ্কর বুড়ো। মস্ত বড়ো গুণীন। সাবধানে থাকুন। আমি নৌকো নিয়ে যাচ্ছি।

এর মধ্যে কেতন ঠাকুর আরিনের সামনে আসে। হাতে প্রদীপ। সামনে বসে।

- কি হলো? মাঝি ভাই চলে গেছে? যাকগে, মা আছেন, রক্ষা করবে।

আরিন আশ্বস্ত করে বলে, না না, ভয় নেই, আমি শুধু ভাবছি, আপনি একা থাকেন কি করে।

-ঠাকুর রক্ষা করেন। এবার বলো, তুমিকি শুধু পুজো দিতে এসেছ,নাকি মণে আরো কৌতুহল আছে।

- আমি শহরের ছেলে, ভয়ডর নেই। কিন্তু তিনু মাঝির মুখে সাহেবডাঙার সাহেব,সাদা শেয়াল, বন্দীকালী,, এসব নিয়ে অনেক রহস্য কথা বললো।সেই ব্যাপারে যদি বলেন।

কেতন ঠাকুর একটা টুলে বসে। সামনে প্রদীপের আলোয় মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বাইরে তখন গাঢ় অন্ধকার। কেতন ঠাকুর কমন্ডুলু থেকে মাথায় জল ছিটিয়ে শুরু করলেন।,, তখন ইংরেজ রাজত্ব।ভাগীরাথির পাড়ে এইসব এলাকায় তখন ভয়ঙ্কর জঙ্গল। হিংস্র জীব জন্তুর বাস। চরকৃষ্ণবাটি থেকে দিনের বেলায় কিছু ধীবর চাষাবাদে আসতো। তারাই নদীর জলে বালি থেকে বন্দীকালী পাথরের মূর্তি পায়। এখানে প্রতিষ্ঠা করে। ক্রমে সেখানে বিপ্লবীদের আনাগোনা শুরু হয়।

আরিন মন দিয়ে শুনছিল। জিজ্ঞেস করে, তখন কি সাহেবডাঙা নাম ছিল?

- না না, তখন উলুবন।নাম হয় অনেক পরে। এলাকা নিরাপদ,নির্জন বলে, বিপ্লবীরা বাইরে অপারেশন করে রাতে এখানে গা ঢাকা দিত। ব্রিটিশ পুলিশ ও ধুরন্দর। এক জেলেকে গুপ্তচর করে পাঠায়।ব্যাস, পরদিন রাত্রে চারজন বিপ্লবী ধরা পরে।

হঠাৎ পিছনে খস খস আওয়াজ। আরিন ঘুরে দেখে। এক পাল সাদা শেয়াল দাঁড়িয়ে। চোখ জ্বলছে। আরিনের কথা বন্ধ হয়ে যায়। প্রদীপ শিখায় সে শুধু কেতন ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে থাকে।ঠাকুর বলে, বন্দী চার বিপ্লবী কে গাছে বেঁধে, সাহেব সেপাই কে বসিয়ে অন্ধকারে নৌকার খোঁজে নদীতে যায় । ফিরে এসে দেখে, বিপ্লবীরা কেউ নেই, শুধু মায়ের হাত দুটো বাঁধা।

আরিন মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে।তারপর ঠাকুর?

- সেই রাত্রেই বিপ্লবীরা মায়ের সামনে সাহেবকে বলী চড়ায়।তারপর দূরে একটা গর্ত করে পুঁতে দেয়।শোনা যায়,মা কালি নিজেই বিপ্লবী সন্তানদের হাত খুলে দিয়ে,নিজে বন্দী হয়।

- তাহলে কি ওই সাদা শেয়াল গুলো,,,

কথা শেষ হয়না,এর মধ্যে কেতন ঠাকুর প্রদীপ নিভিয়ে বলে, দূরে কিছু দেখতে পাচ্ছো? 

- না ঠাকুর,কিছুই তো নেই।

কেতন ঠাকুর এবার আরিনের চোখে চোখ রেখে, বলে আমার দিকে তাকাও। এবার দেখো,,

এবার আরিন পরিষ্কার দেখে,,এক সাহেব বন্দুক নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, পিছনে সাদা শেয়াল।মুহূর্তে বিস্ফারিত চোখে ঠাকুরকে দেখে। কেতন ঠাকুর মাথায় জল ছেটায়। আরিন প্রণাম করে। বলে,আপনি কে ?

-আমিই যোগী তান্ত্রিক কেতন ঘোষাল। আমার গুরু বিভূতিভূষণ।

- মানে লেখক বিভূতিভূষণ? উনাকে পেলেন কোথায়?

- আমি তখন খুব ছোটো,জঙ্গিপুর স্কুলে এলেন বিভূতিস্যার ।আমাদের হেড মাস্টার।আমরা প্রতি শনিবার  রাতে স্কুল ছাদে যেতাম। সেখানেই স্যার আমাদের তন্ত্রমন্ত্র,প্ল্যানচেট শেখাতেন।

আরিন অবাক বিস্ময়ে কেতন ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে থাকে। কি অলৌকিক ক্ষমতা ঠাকুরের।অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে কতক্ষন বসে ছিল আরিন জানে না।হঠাৎ তিনু মাঝির ডাক,স্যার যাবেন না। সকাল হয়ে গেছে। আরিন চোখ মেলে তাকায়,দেখে কেতন ঠাকুর মায়ের পুজো করছে।

Comentários


bottom of page