নারী নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় এ.আই., আদিবাসী জনজীবনের গন্ধমাখা ছোটনাগপুর, কর্মক্ষেত্রে সোশ্যাল অ্যাংজাইটি, অওয়াধি খানাপিনা, রক্তের দোষ (অন্তিম পর্ব)..
- রোজকার অনন্যা

- Jul 12, 2025
- 19 min read
Updated: Jul 13, 2025
নারী নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় এআই-এর ভূমিকা

বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হল নারী নির্যাতন, যৌন হেনস্তা ও সহিংসতার মতো ঘটনা। প্রযুক্তির অগ্রগতির যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) নানা ক্ষেত্রেই বিপ্লব ঘটাচ্ছে। নারী নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার প্রশ্নেও AI এখন সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এই প্রতিবেদনে আমরা দেখব কীভাবে AI আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করছে এবং নারীদের জন্য নিরাপদ ও সচেতন সমাজ গঠনে সাহায্য করছে।
AI কীভাবে নারী সুরক্ষায় সহায়ক?

১. নিরাপত্তা অ্যাপস ও ইমারজেন্সি রেসপন্স
অনেক মোবাইল অ্যাপে এখন AI ইন্টিগ্রেটেড সেফটি ফিচার আছে যা বিপদের মুহূর্তে দ্রুত সাহায্য চায়।
উদাহরণস্বরূপ: Safetipin: AI ব্যবহার করে শহরের বিভিন্ন এলাকাকে "নিরাপদ" ও "অসুরক্ষিত" হিসেবে চিহ্নিত করে। My Safetipin বা Raksha: AI ভিত্তিক অ্যালগরিদম ব্যবহার করে লোকেশন ট্র্যাক করে এবং নির্দিষ্ট নম্বরে এলার্ট পাঠায়।
২. CCTV এবং স্মার্ট সারভেইল্যান্স
এআই-চালিত স্মার্ট ক্যামেরা এখন সন্দেহজনক গতিবিধি শনাক্ত করে রিয়েল টাইমে পুলিশ বা নিরাপত্তা রক্ষা বাহিনীকে সতর্ক করতে পারে। AI-ভিত্তিক ভিডিও অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে হেনস্তা, উত্ত্যক্ততা বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ সনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।
৩. ডেটা অ্যানালিটিক্স ও ভবিষ্যদ্বাণী
AI ব্যবহার করে বিশাল পরিমাণ অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে কোথায় কী ধরনের নারী-সহিংসতার সম্ভাবনা বেশি তা আগেই অনুমান করা যায়। এর ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় আগে থেকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা সম্ভব।
৪. ডিজিটাল হেনস্তা ও সাইবার সুরক্ষা
অনলাইনে নারীরা নানাভাবে হেনস্তার শিকার হন। AI এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সোশ্যাল মিডিয়া বা মেসেজিং অ্যাপগুলিতে AI এখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপমানজনক শব্দ, ছবি, ভিডিও শনাক্ত করে ব্লক করতে পারে। Meta, Google, Twitter-এর মতো সংস্থাগুলি AI ব্যবহার করে ঘৃণাবাচক ও হেনস্তামূলক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করছে।

৫. চ্যাটবট ও কাউন্সেলিং সিস্টেম
AI-চালিত চ্যাটবটের মাধ্যমে নির্যাতিত নারীরা গোপনে কাউন্সেলিং, আইনি পরামর্শ ও মানসিক সাপোর্ট পাচ্ছেন। এসব চ্যাটবট ২৪ ঘণ্টা অ্যাকটিভ থাকে, ফলে যেকোনও সময়ে সাহায্য পাওয়া যায়। iCall, SNEHA ইত্যাদি প্ল্যাটফর্মে AI চ্যাটবটের মাধ্যমে সাইকোলজিকাল সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
ডেটা প্রাইভেসি ও নিরাপত্তা: AI ভিত্তিক প্রযুক্তিতে অনেক ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষিত থাকে, যা কখনও কখনও হ্যাক বা ডেটা লিকের ঝুঁকিতে থাকে।
বৈষম্যপূর্ণ অ্যালগরিদম: অনেক সময় AI সিস্টেম লিঙ্গভিত্তিক পক্ষপাত দেখায় যদি প্রশিক্ষণ ডেটা ঠিকভাবে ব্যালান্সড না হয়।
সবার জন্য অ্যাক্সেস নয়: অনেক নারী এখনও প্রযুক্তি বা স্মার্টফোন ব্যবহার করতে পারেন না; ফলে AI ভিত্তিক সুবিধাগুলি সীমিত হয়ে পড়ে।

নারী সুরক্ষায় AI একটি বিপ্লব ঘটাতে পারে, তবে এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে গেলে চাই আরও সচেতনতা, তথ্যের সুরক্ষা, এবং সবার জন্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতা। AI-এর সঙ্গে মানবিক সংবেদনশীলতা ও আইনি কাঠামোর সমন্বয় ঘটলে ভবিষ্যতের সমাজ হতে পারে আরও নিরাপদ, সহনশীল এবং সমতাভিত্তিক।
আদিবাসী জনজীবনের গন্ধ মাখা ছোটনাগপুর

ভারতের মানচিত্রে এক অলক্ষ্য কিন্তু অপরূপ অঞ্চল হল ছোটনাগপুর মালভূমি। ইতিহাস, প্রকৃতি ও সংস্কৃতির নিঃশব্দ মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলটি মূলত ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাংশ, ওড়িশা এবং বিহারের কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত। তবে ছোটনাগপুর শুধু পাহাড়-জঙ্গল বা খনিজসম্পদের জন্যই নয় এখানে মিশে আছে হাজার বছরের পুরনো আদিবাসী জনজীবনের টান, ছন্দ, গান আর লড়াইয়ের ইতিহাস।

এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হল সেই সবুজ বনাঞ্চলের বুকে ঘেরা মানুষের গল্প, যেখানে প্রকৃতি আর সংস্কৃতি একে অপরের হাত ধরে চলে। পাহাড়, ঝরনা, লালমাটি আর সবুজ বন ছোটনাগপুরের প্রকৃতি যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা। লোহদাগা, গুমলা, সিমডেগা কিংবা সরাইকেলা-খারসাওয়ান এই সব জায়গাগুলি এখনও শহুরে চিৎকারে দূষিত নয়। বর্ষায় পাহাড়ি নদী খরস্রোতা হয়ে ওঠে, গ্রীষ্মে সলান (মাধুই ফুল) ফুটে ওঠে, আর শীতকালে চা খেতে খেতে দেখা যায় ধোঁয়ায় মুড়ে থাকা আদিবাসী গ্রাম।

ছোটনাগপুরের প্রধান আদিবাসী গোষ্ঠীগুলি হল সাঁওতাল, মুন্ডা, ওরাঁও, খরিয়া, হো প্রভৃতি। এদের জীবনযাত্রা প্রকৃতির সঙ্গেই নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। বাঁশ, কাদা, খড় ও আলপনায় সাজানো দেওয়াল প্রতিটি বাড়িই যেন একটি শিল্পকর্ম।
চুয়ানি (চাল থেকে বানানো স্থানীয় মদ), মাছ, শিকারের মাংস, কুঁড়ি, বনজ শাক-সবজি এবং লাল চাল এখানকার সাধারণ খাদ্য। সরনা ধর্ম ও প্রকৃতিপূজা এখানে প্রধান। ‘জাহের থান’ বা গ্রামের বনভূমিতে পূজার স্থান, যেখানে সিধু-কানুর, বিরসা মুণ্ডার স্মরণে চলে নানা উৎসব। উৎসব ও সংস্কৃতি ছোটনাগপুরের সবচেয়ে রঙিন দিক তার আদিবাসী উৎসব। বিশেষ করে সরহুল, করম, মাঘ পরব, এবং বন্ধনা। বসন্তে পালিত এই উৎসবে সাদা ফুল (সরহুল) গাছ থেকে এনে ‘জাহের থান’-এ পূজা হয়। এই ফুল প্রকৃতি ও মানুষের মিলনের প্রতীক। ভাইবোনের সম্পর্ক এবং প্রাকৃতিক জীবনের প্রতীক এই পরবে গানের সঙ্গে চলে করম গাছকে ঘিরে নৃত্য।
এখানকার নাচ-গান শুধুই বিনোদনের জন্য নয়, বরং সমাজ, ধর্ম ও ঐক্যের প্রতিচ্ছবি। বাঁশের মাদল, ঢোল আর তিরিওর তালে এক অনন্য সুর সৃষ্টি হয়। আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল রাঁচি থেকে। এরপর পথ গিয়েছে খুঁটি, তামার, সিমডেগা, আর শেষে সুন্দর গিরিডি ও নেতারহাট। সরু রাস্তায় বাইকের পিছনে বসে আদিবাসী গ্রামে প্রবেশের সময় যে শান্তি অনুভব করি, তা শহুরে জীবনে অকল্পনীয়। এক সন্ধ্যায় মুন্ডা পরিবারে অতিথি হয়ে খেয়েছিলাম চিড়েভাজা, পাটপাতার চাটনি আর চুয়ানি। এক কিশোরী শিখিয়েছিল তাদের ভাষায় 'ধন্যবাদ' "জুহার"। সে মুহূর্তে নিজেকে ছোটনাগপুরেরই একজন বলে মনে হয়।

ছোটনাগপুর কেবল এক ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, এক গভীর সংস্কৃতি ও মানবিকতার বুনন। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে, অথবা ভারতবর্ষের মাটির গন্ধ শোঁকার জন্য এই আদিবাসীভূমি এক অনন্য গন্তব্য। এখানে গিয়ে আমরা শুধু প্রকৃতি দেখি না, অনুভব করি এক জাগ্রত ইতিহাস, এক চলমান লড়াই, এক নির্ভেজাল জীবনযাপন। আর এই কারণেই ছোটনাগপুরে যাওয়া মানে হৃদয়ে একটি জীবন্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসা।
কর্মক্ষেত্রে সোশ্যাল অ্যাংজাইটি: নীরব এক যন্ত্রণা

কর্মক্ষেত্র মানেই চ্যালেঞ্জ, দক্ষতা আর প্রতিযোগিতার এক জায়গা। কিন্তু সব কর্মী কি সমানভাবে আত্মবিশ্বাসী, সংবেদনশীল এবং সামাজিক? অনেকে কর্মজীবনে এক প্রকার অদৃশ্য দেওয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন যেখানে একলা বোধ, ভয়, নিজের ভাব প্রকাশে সংকোচ ও সমালোচনার আতঙ্ক মিলে তৈরি হয় সোশ্যাল অ্যাংজাইটি বা সামাজিক উদ্বেগ। এটি শুধু ব্যক্তিগত অস্বস্তি নয়, কর্মক্ষমতা ও মানসিক সুস্থতার দিক থেকেও গভীর প্রভাব ফেলে।

সোশ্যাল অ্যাংজাইটি কী?
সোশ্যাল অ্যাংজাইটি হল এমন এক মানসিক অবস্থা, যেখানে ব্যক্তি সামাজিক পরিস্থিতিতে নিজেকে অপমানিত, অদক্ষ বা বিচারের শিকার মনে করেন। কর্মক্ষেত্রে এর প্রকাশ ঘটে:
মিটিং বা প্রেজেন্টেশনে অংশ নিতে ভয়
সহকর্মীর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে অস্বস্তি
বস বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে অকারণে উদ্বিগ্ন হওয়া
টিমে কাজ করার সময় নিজেকে আলাদা রাখা
সাফল্য বা প্রশংসা পেলেও প্রকাশে সংকোচ

কর্মক্ষেত্রে সোশ্যাল অ্যাংজাইটি অনেক কারণে তৈরি হতে পারে:
অতীতের ব্যর্থতা বা সামাজিক অপমানের স্মৃতিপারিবারিক শিক্ষা ও কমিউনিকেশন স্কিলে ঘাটতি
পারফেকশনিজম বা সবকিছু নিখুঁতভাবে করতে চাওয়ার মানসিক চাপ
অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ও রুক্ষ অফিস পরিবেশ
সহকর্মীদের মধ্যে গসিপ, তুলনা বা মানসিক বুলিং

কীভাবে প্রভাব ফেলে কর্মজীবনে?
দক্ষতা অনুযায়ী নিজেকে প্রমাণ করতে না পারা
প্রমোশন, রেসপন্সিবিলিটি বা নেতৃত্ব নেওয়া থেকে পিছিয়ে থাকা
নিজের আইডিয়া বা মত প্রকাশ করতে না পারা
মানসিক অবসাদ, ক্লান্তি ও চাকরি থেকে বিরক্তি তৈরি হওয়া
করণীয় ও সমাধান?
১. নিজেকে বোঝা ও গ্রহণ করা
নিজের দুর্বলতা এবং সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার না করে, ধীরে ধীরে সেই স্থান থেকে এগোনো দরকার। আত্ম-সমালোচনার বদলে আত্ম-মমতা প্রয়োজন।
২. ছোট ছোট পদক্ষেপ
সোশ্যাল অ্যাংজাইটি রাতারাতি দূর হয় না। ছোট ছোট পদক্ষেপ যেমন একজন সহকর্মীর সঙ্গে চা খাওয়া, গ্রুপ আলোচনায় একটি বাক্য বলা এসব ধাপে ধাপে সাহায্য করে।
৩. সাহায্য নেওয়া
কাউন্সেলর, থেরাপিস্ট বা ওয়ার্কশপে অংশ নিয়ে আত্মবিশ্বাস তৈরি করা যায়। Cognitive Behavioral Therapy (CBT) অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর।
৪. সহানুভূতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মপরিবেশ
অফিস পরিবেশে যদি সহকর্মীরা সহানুভূতিশীল হন, সকলে মত প্রকাশে উৎসাহ দেন, তাহলে সোশ্যাল অ্যাংজাইটি অনেকটাই হ্রাস পায়।

৫. ম্যানেজমেন্টের ভূমিকা
HR বিভাগ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে উদ্যোগ নেন যেমন “mental health day”, “open feedback culture” তাহলে কর্মক্ষেত্র অনেক মানবিক হয়ে ওঠে।
সোশ্যাল অ্যাংজাইটি এক গভীর মানসিক বাস্তবতা, যার মুখোমুখি আমরা অনেকেই হই, অথচ অনেক সময় তা প্রকাশ করি না। কর্মক্ষেত্রের মতো স্পর্ধাপূর্ণ জায়গায় এই সমস্যা আরও স্পষ্ট ও তীব্র হয়ে ওঠে। কিন্তু সচেতনতা, সহানুভূতি, এবং একে অপরকে বোঝার অভ্যেস আমাদের কর্মজীবনকে আরও সহজ, আনন্দময় এবং সহযোগিতাপূর্ণ করে তুলতে পারে।


অওয়াধি খানাপিনা: নবাবি স্বাদের নিবেদন

ভারতের রান্নার ইতিহাসে অওয়াধি রন্ধনশৈলী এক অনন্য অধ্যায়। নবাবি রুচির ছোঁয়া, ধীর আঁচে রান্নার নিখুঁত কৌশল, সুগন্ধি মশলার ভারসাম্য আর অপূর্ব পরিবেশন এই সব মিলেই অবধি খাবারের বৈশিষ্ট্য। উত্তর ভারতের লখনউকে কেন্দ্র করে জন্ম নেওয়া এই রন্ধনপ্রণালী শুধু একটি রান্না নয়, বরং এক রাজকীয় সংস্কৃতি। ‘রোজকার অনন্যা’-র এই বিশেষ সংকলনে আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চলেছি সেই অওয়াধি খানাপিনার বহুমাত্রিক রূপ কাবাব, বিরিয়ানি, কোরমা, নেহারি থেকে শুরু করে শিরমাল ও জর্দা পর্যন্ত। প্রতিটি রেসিপির মধ্যে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং স্বাদের নিখাদ মেলবন্ধন। আসুন, শব্দের পাতা উল্টে একবার ছুঁয়ে দেখি সেই রাজসিক রন্ধনশৈলী যেখানে প্রতিটি পদে জড়িয়ে আছে অওধের গল্প, নবাবদের ভোজনরুচি, আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের সুবাস।

গালৌটি কাবাব (Galouti Kebab), এটি একটি খাস ও সুস্বাদু নবাবি পদ, যা মূলত লক্ষ্ণৌ শহরের নবাবি রন্ধনশৈলীর অংশ। নামটি এসেছে 'Galouti' শব্দ থেকে, যার অর্থ "মুখে গলে যায়" এবং এই কাবাবটির ঠিক সেই বৈশিষ্ট্যই।
কী কী লাগবে
কিমার জন্য:
মাটনের কিমা – ৫০০ গ্রাম (চর্বিহীন, ভালোভাবে গুছিয়ে নেওয়া)
আদা রসুন বাটা – ২ চা চামচ
কাঁচা পেঁপে পেস্ট – ২ টেবিল চামচ (Tenderizer হিসেবে)
পেঁয়াজ – ২টি (ভেজে বেরেস্তা করে নেওয়া)
চানা ডাল – ২ টেবিল চামচ (সেদ্ধ করে গুঁড়ো করে নেওয়া)
লবণ – স্বাদমতো
ঘি – ২ টেবিল চামচ
মসলার জন্য (গালৌটি মসলা):
গোলমরিচ – ১ চা চামচ
এলাচ (সবুজ) – ৪টি
দারচিনি – ১ ইঞ্চি
লবঙ্গ – ৪টি
জয়ত্রী – ১ টুকরো
জায়ফল – ১/২ টুকরো
শুকনো লঙ্কা – ২টি
Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো – ১ চা চামচ
কাবাব চিনি / পাউডার চিনি – ১ চা চামচ (ঐচ্ছিক)

কীভাবে বানাবেন
কাঁচা পেঁপে, আদা-রসুন বাটা, লবণ, এবং বেরেস্তা দিয়ে কিমা ভালোভাবে মেখে নিন। অন্তত ১ ঘন্টা ম্যারিনেট করে রাখুন।
ম্যারিনেট করা কিমাতে ভাজা চানা ডাল গুঁড়ো এবং প্রস্তুত করা গালৌটি মসলা মিশিয়ে দিন। ভালোভাবে মাখিয়ে নিন।
সবশেষে ২ টেবিল চামচ ঘি মিশিয়ে আবার ভালোভাবে মেখে নিন যাতে কিমা মোলায়েম ও সুগন্ধিযুক্ত হয়।
হাতে ঘি মাখিয়ে ছোট ছোট পাতলা টিকিয়া আকারে গড়ে নিন।
নন-স্টিক প্যানে হালকা ঘি গরম করে অল্প আঁচে টিকিয়াগুলি সোনালি করে ভেজে নিন। দু’পিঠেই ভালোভাবে ভাজা হলে নামিয়ে নিন।
উলটা পরোটা, রুমালি রুটি, বা শীরমাল রুটির সঙ্গে পরিবেশন করুন। সঙ্গে দিন পুদিনা চাটনি ও লেবুর টুকরো।

কাকোরি কাবাব হল লখনউর কাকোরি শহরের একটি ঐতিহ্যবাহী ও কিংবদন্তি মোগলাই কাবাব। এটি তৈরি করা হয়েছিল নবাব সৈয়দ মোহাম্মদ হায়দার কাকোরভির নির্দেশে, ব্রিটিশ অতিথিদের মন জয় করতে। গালৌটি কাবাবের মতোই এটি মুখে গলে যায়, তবে এটি কাঠিতে সেঁকা হয় ও মাটনের স্নিগ্ধতা ও মসলার নিখুঁত মিশ্রণে তৈরি এক অনন্য পদ।
কী কী লাগবে
মূল উপাদান:
মাটনের কিমা (চর্বি ছাড়া) – ৫০০ গ্রাম
কাঁচা পেঁপে পেস্ট – ২ টেবিল চামচ
আদা-রসুন বাটা – ১ টেবিল চামচ
ভাজা পেঁয়াজ (বেরেস্তা) – ২টি মাঝারি পেঁয়াজ
কাবাব চিনি – ১ চা চামচ (ঐচ্ছিক, মৃদু মিষ্টতা আনার জন্য)
লবণ – স্বাদমতো
ঘি – ১ টেবিল চামচ
কাকোরি মসলা:
গোলমরিচ – ১ চা চামচ
দারচিনি – ১ ইঞ্চি
এলাচ – ৩টি
লবঙ্গ – ৩টি
জায়ফল – ১ চিমটি
জয়ত্রী – ১ ছোট টুকরো
Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices কসুরি মেথি – ১ চিমটি (হাতের তালুতে ঘষে ব্যবহার করুন)

কীভাবে বানাবেন
মাটনের কিমা, কাঁচা পেঁপে, আদা-রসুন বাটা, বেরেস্তা, কাবাব চিনি, লবণ ও কাকোরি মসলা একসঙ্গে ভালো করে মেখে নিন। ঢেকে রেখে দিন ৬–৮ ঘণ্টা বা রাত্রিবেলা ফ্রিজে ম্যারিনেট করতে (এই ধাপে গন্ধ ও গলনশীলতা আসবে)।ম্যারিনেট করা কিমা মিশ্রণকে একটি ফুড প্রসেসরে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে পেস্টের মতো মসৃণ করে নিন। হাত ঘি মাখিয়ে লম্বা শিকে বা কাঠিতে কিমা মিশ্রণ দিয়ে সাবধানে চেপে চেপে গড়ে নিন। কয়লার আগুন বা গ্রিল প্যানে ঘি ব্রাশ করে কাবাবগুলো সেঁকে নিন, যতক্ষণ না দু’পাশে সুন্দর বাদামি রং আসে (প্রতি পাশে প্রায় ৩–৪ মিনিট)। চাইলে ওভেন বা তাওয়া-গ্রিলেও করা যায়। পরোটা বা রুমালি রুটির সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করুন, সঙ্গে দিন পুদিনা ধনে চাটনি, লেবুর রস ও কাঁচা পেঁয়াজ।

মুর্গ মসাল্লাম এক রাজকীয় মোগলাই পদ, যার নাম শুনলেই ভোজনরসিকদের জিভে জল এসে যায়! "মুর্গ" মানে মুরগি আর "মসাল্লাম" মানে সম্পূর্ণ বা গোটা।এই খাবারটি মূলত গোটা মুরগির মধ্যে নানারকম মশলা, কিমা, ডিম ইত্যাদি ভরে ধীরে ধীরে রান্না করা হয় সুগন্ধি গ্রেভিতে। এটি মুঘল আমলে রাজা-নবাবদের পছন্দের খাবার ছিল এবং আজও বিবাহ, উৎসব ও স্পেশাল ওকেশনগুলোতে পরিবেশিত হয় রাজকীয়ভাবে।
কী কী লাগবে
গোটা মুরগির জন্য:
গোটা মুরগি (skinned and cleaned) – ১টি (১.২ থেকে ১.৫ কেজি)
দই – ১ কাপ
আদা-রসুন বাটা – ২ টেবিল চামচ
লেবুর রস – ২ টেবিল চামচ
Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো – ১ চা চামচ
লবণ – স্বাদমতো
পুর ভরার জন্য:
সিদ্ধ ডিম – ২টি
কিমা (মুরগির বা মাটনের) – ২০০ গ্রাম
পেঁয়াজ কুচি – ১টি
আদা-রসুন বাটা – ১ চা চামচ
কাঁচা লঙ্কা কুচি – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
ধনে-পাতা কুচি – ২ টেবিল চামচ
ঘি বা Shalimar's sunflower তেল – ১ টেবিল চামচ
লবণ – স্বাদমতো
গ্রেভির জন্য:
পেঁয়াজ – ৩টি (স্লাইস করে ভাজা)
টমেটো পেস্ট – ১ কাপ
আদা-রসুন বাটা – ১ টেবিল চামচ
কাজু বা বাদাম বাটা – ২ টেবিল চামচ
দই – ½ কাপ (ফেটানো)
Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো – ১ চা চামচ
জায়ফল ও জয়ত্রী গুঁড়ো – এক চিমটি
ঘি ও Shalimar's sunflower তেল – পরিমাণমতো

কীভাবে বানাবেন
গোটা মুরগিতে হালকা কাটা দিন। দই, আদা-রসুন বাটা, হলুদ, লেবুর রস ও লবণ মিশিয়ে ম্যারিনেট করুন। ঢেকে রেখে দিন ৩–৪ ঘণ্টা (রাত্রিবেলা রাখলে ভালো)। কড়াইতে তেল দিয়ে পেঁয়াজ, আদা-রসুন ভেজে কিমা দিন। নুন, গরম মশলা, কাঁচা লঙ্কা ও ধনে পাতা দিয়ে ভালো করে ভেজে নিন। ঠান্ডা হলে তার মধ্যে সিদ্ধ ডিম ভরে মিশ্রণটি গোটা মুরগির ভিতরে পুর হিসেবে ঢুকিয়ে দিন। একটি বড় কড়াইতে বা কুকারে ঘি ও তেল গরম করে ম্যারিনেট করা গোটা মুরগিটি চারপাশ থেকে হালকা ভেজে নিন। আলাদা প্যানে গ্রেভি তৈরি করুন পেঁয়াজ বেরেস্তা, আদা-রসুন, টমেটো পেস্ট, বাদাম বাটা, দই, মশলা সব মিশিয়ে কষান যতক্ষণ না তেল ছাড়ে। ভাজা মুরগিকে গ্রেভির মধ্যে দিয়ে দিন।ঢেকে দিন এবং অল্প আঁচে ৩০–৪০ মিনিট রান্না করুন। চাইলে প্রেশার কুকারেও ১ হুইসেল দিয়ে তারপর আঁচ কমিয়ে ১০ মিনিট রান্না করা যায়। মুর্গ মসাল্লাম পরিবেশন করুন জাফরানি পোলাও, নান, বা পার্সিয়ান রুটি দিয়ে। উপর দিয়ে ছড়িয়ে দিন কাঁচা পেঁয়াজ, ধনে পাতা ও সোনালি বেরেস্তা।

নেহারি (Nihari) এটি উপমহাদেশের এক ঐতিহাসিক ও রাজকীয় মাংসের ঝোল জাতীয় পদ, যার শিকড় মুঘল আমলে এবং লখনউ ও দিল্লির নবাবি রন্ধনশৈলীতে। "নেহার" শব্দটি এসেছে আরবি "নাহার" থেকে, যার অর্থ 'দিন'।নেহারি মূলত ভোরবেলা (ফজরের নামাজের পরে) খাওয়ার জন্য তৈরি হত নবাবদের জন্য ধীরে ধীরে রাতভর রান্না হতো এবং সকালে পরিবেশন করা হতো পরোটা বা নান দিয়ে। আজও এটি মুসলিম সমাজে বিশেষ করে ঈদ, শীতকাল ও শুভ অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে রান্না করা হয়।
কী কী লাগবে
মাংসের জন্য:
মাটনের হাড়সহ পিস – ১ কেজি (শঙ্ক পিস বা নলি পিস থাকলে ভালো)
ঘি – ৪ টেবিল চামচ
পেঁয়াজ – ২টি (পাতলা স্লাইস)
আদা-রসুন বাটা – ২ টেবিল চামচ
দই –১/২ কাপ
গমের আটা – ২ টেবিল চামচ (গোলা করে নেওয়া)
মসলা:
লবঙ্গ – ৪টি
দারচিনি – ১ টুকরো
এলাচ (সবুজ ও বড়) – ৩টি করে
জয়ত্রী – ১ টুকরো
জায়ফল – ½ টি
গোলমরিচ – ৮–১০টি
শুকনো লঙ্কা – ২টি
জিরে – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো – ১+১/২ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
লবণ – স্বাদমতো
Shalimar's Chef Spices গরম মশলা – ১ চা চামচ
গার্নিশের জন্য:
পাতলা আদা কুচি
ধনে পাতা
লেবুর টুকরো
ভাজা পেঁয়াজ (বেরেস্তা)

কীভাবে বানাবেন
বড় কড়াই বা হাঁড়িতে ঘি গরম করে পেঁয়াজ সোনালি করে ভেজে তুলে রাখুন। ওই ঘিতে আদা-রসুন বাটা দিয়ে কিছুক্ষণ ভাজুন। তারপর মাংস দিয়ে ভালোভাবে ভাজুন যতক্ষণ না রং ধরে। সব গুঁড়ো ও গোটা মসলা দিয়ে দিন। নেড়েচেড়ে দই মেশান। ঢেকে অল্প আঁচে কষান যতক্ষণ না তেল ছাড়ে। প্রয়োজনমতো গরম জল দিয়ে দিন (সুপের মতো ঝোল চাইলে বেশি)।এরপর চাপা দিয়ে ধীরে ধীরে রান্না করুন কমপক্ষে ১.৫–২ ঘণ্টা (বা কুকারে ৪–৫ হুইসেল)। শেষে আটা গোলা দিয়ে দিন ঝোল ঘন করার জন্য। আরো ১০–১৫ মিনিট অল্প আঁচে রান্না করুন।রান্না শেষে হাঁড়ির মুখ ময়দা দিয়ে সিল করে দিতে পারেন এটি আসল "ডাম্পুক" স্টাইল। গরম গরম নেহারি পরিবেশন করুন খামিরি রুটি, নান বা পরোটার সঙ্গে। উপর থেকে আদা কুচি, ধনে পাতা, বেরেস্তা ও লেবুর রস ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

রেশমি কাবাব নাম শুনেই বোঝা যায়, এটি এক মোলায়েম, কোমল ও মসৃণ স্বাদের কাবাব, ঠিক যেন রেশমের মতো গলে যায় মুখে! মোগলাই রান্নার অন্যতম বিখ্যাত পদ রেশমি কাবাব মূলত উত্তর ভারতের নবাবি রন্ধনশৈলী থেকে উঠে আসা এক অপূর্ব ডিশ। এটি সাধারণত চিকেন দিয়ে তৈরি হয় এবং এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হল কম ঝাল, দই-মালাই-বাদাম ভিত্তিক ম্যারিনেশন যা কাবাবটিকে অতুলনীয়ভাবে কোমল ও রিচ করে তোলে।
কী কী লাগবে
ম্যারিনেশনের জন্য:
বোনলেস চিকেন (থাই বা ব্রেস্ট পিস) – ৫০০ গ্রাম
টক দই – ১/২ কাপ
মালাই / ফ্রেশ ক্রিম – ৩ টেবিল চামচ
কাজু বাটা – ২ টেবিল চামচ
আদা-রসুন বাটা – ১ টেবিল চামচ
কাঁচা লঙ্কা পেস্ট – ১ চা চামচ
লেবুর রস – ১ টেবিল চামচ
Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
সাদা মরিচ গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ (ঐচ্ছিক)
ঘি / মাখন – ২ টেবিল চামচ
লবণ – স্বাদমতো

কীভাবে বানাবেন
চিকেন পিসগুলোকে পাতলা ও সমান আকৃতির করে কেটে নিন যাতে ম্যারিনেশন ভালভাবে ঢুকে পড়ে। সব উপকরণ (দই, মালাই, কাজুবাটা, আদা-রসুন, লঙ্কা, লেবুর রস, মশলা, লবণ, ঘি) একসঙ্গে মিশিয়ে চিকেনের সাথে মেখে নিন।ঢেকে রেখে দিন ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা, তবে সেরা রেজাল্ট পেতে রাতভর ম্যারিনেট করুন। স্কিউয়ারে গেঁথে কাঠ-কয়লার আগুনে, গ্রিল বা ওভেনে (১৮০°C তে ২০–২৫ মিনিট) সেঁকে নিন। মাঝে মাঝে ব্রাশ করে মাখন দিন যাতে রঙ ও টেক্সচার ভালো হয়।তাওয়া ব্যবহার করলেও অল্প ঘি দিয়ে ঢেকে হালকা আঁচে সেঁকে নেওয়া যায়। রেশমি কাবাব পরিবেশন করুন পুদিনা চাটনি, পেঁয়াজ লাচ্ছা ও লেবুর সঙ্গে।রুমালি রুটি বা নানের সঙ্গেও দারুণ মানিয়ে যায়।

চিকেন কোরমা একটি সমৃদ্ধ, ঘন, সুগন্ধি ও মশলাদার গ্রেভি পদ যা ভারতের নবাবি রান্নার অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী পদ। এটি পাঞ্জাবি, লখনউ এবং হায়দরাবাদি কিচেনে খুব জনপ্রিয়। "কোরমা" শব্দটির উৎপত্তি ফারসি "قورمه" থেকে, যার অর্থ ধীরে ধীরে মাংস রান্না করা। চিকেন কোরমা একটি দই-বাদাম-কেশর-মশলা-ঘি নির্ভর ঝোল জাতীয় পদ, যা বিশেষ অনুষ্ঠান, উৎসব বা অতিথি আপ্যায়নে আদর্শ।
কী কী লাগবে
চিকেন ম্যারিনেশনের জন্য:
বোন ইন চিকেন – ৭০০ গ্রাম
টক দই – ১/২ কাপ
আদা-রসুন বাটা – ১ টেবিল চামচ
লবণ – স্বাদমতো
লেবুর রস – ১ টেবিল চামচ
কোরমার জন্য:
পেঁয়াজ – ২টি (স্লাইস করে ভেজে বেরেস্তা করা)
আদা-রসুন বাটা – ১ টেবিল চামচ
টক দই – ১/২ কাপ (ফেটানো)
কাজু/বাদাম/পোস্ত বাটা – ২ টেবিল চামচ
খোয়া ক্ষীর – ২ টেবিল চামচ (ঐচ্ছিক)
Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো – ১ চা চামচ (রঙের জন্য)
জয়ত্রী-জায়ফল গুঁড়ো – এক চিমটি
কেশর দুধ – ২ টেবিল চামচ (ঐচ্ছিক)
ঘি – ২ টেবিল চামচ
Shalimar's sunflower তেল – ২ টেবিল চামচ
লবণ – স্বাদমতো

কীভাবে বানাবেন
চিকেন, দই, আদা-রসুন বাটা, লবণ, লেবুর রস একসঙ্গে মেখে ১–২ ঘণ্টা ম্যারিনেট করুন। কড়াইতে ঘি ও তেল দিয়ে বেরেস্তা করে তুলে রাখুন। ওই তেলে আদা-রসুন বাটা দিয়ে ভাজুন, তারপর ম্যারিনেট করা চিকেন দিয়ে ৫–৬ মিনিট ভাজুন। তারপর বাদাম বাটা, ফেটানো দই, লঙ্কা গুঁড়ো, গরম মশলা দিন। হালকা আঁচে নেড়ে কষাতে থাকুন যতক্ষণ না মশলার তেল ছেড়ে দেয়। প্রয়োজনমতো গরম জল দিন (ঝোলের ঘনত্ব অনুযায়ী)। খোয়া ক্ষীর, কেশর দুধ ও ভাজা পেঁয়াজ (একটু গুঁড়ো করে) মিশিয়ে দিন। ঢেকে ২০–২৫ মিনিট অল্প আঁচে রান্না করুন যতক্ষণ না চিকেন সম্পূর্ণ নরম হয় ও ঝোল ঘন হয়। চিকেন কোরমা পরিবেশন করুন গরম নান, লাচ্ছা পরোটা, জিরা রাইস, বা বাগদাদি পোলাওর সঙ্গে।উপর দিয়ে ছড়িয়ে দিন কেশর-দুধ, বেরেস্তা ও কিছু কাজু-কিশমিশ।
রবিবারের গল্প: রক্তের দোষ (অন্তিম পর্ব)
এক গভীর চিন্তায় ডুবে গেল রূপসা।
চকোলেট মুস আমার খুবই প্রিয়।
অনেকদিন বাদে খেলাম। মেনি থ্যাংকস এটার জন্য। আগে তাও মাঝেমধ্যে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে যাওয়া হত। এখন তো নানা চাপের মধ্যে যাওয়া হয় না। কাকাইয়ের অনুপস্থিতিতে কারখানার অল্পস্বল্প দায়িত্বও পালন করতে হয়।
সম্বিত ফিরে পেয়েছে ইতিমধ্যে রূপসা। কথাগুলো শুনে সে সমর্থনে মাথা নাড়ল।
আচ্ছা শানু, সেদিন কতক্ষণ পড়েছিলে মনে আছে?

ঘণ্টাখানেক পড়িয়ে ছেড়ে দেয়।
সেদিন বাবা, মা, দিদি কেউই থাকবে না বলে আমি পাড়াতেই টুকাইয়ের বাড়িতে দুপুরটা কাটাব বলে প্ল্যান করে রেখেছিলাম। তো ঋতেশদার পড়ানো শেষ হলেই আমি বইখাতা গুছিয়ে চলে যাই।
ঋতেশদা তখন তোমার সঙ্গে বেরিয়ে
যায়নি?
হ্যাঁ বেরিয়ে গেছিল, কিন্তু সামনে পান-বিড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট কিনতে আমি দেখেছিলাম।
বেশ, তুমি ফিরেছিলে কখন?
ফেরার তো কথা ছিল সন্ধেবেলা।
কিন্তু তার আগেই তো। জানেনই তো। নতুন করে কি আর বলব। মাথা নাড়ল রূপসা।
করার আছে?

আর কিছু কি জানার বা জিজ্ঞেস
না। আপাতত নেই। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ শানু। শানু, তোমার কাছে শেষ
প্রশ্ন- তোমার ভাল নাম কি?
মনসিজ।
সুন্দর নাম। পরে কোনও প্রয়োজন হলে তোমাকে ফোন করব। এই বলে মাথা নাড়ল রূপসা। শানুও মাথা নেড়ে ক্যাফে থেকে নিষ্ক্রান্ত হল।
(৫)

রূপাকে ফোন করল।
রূপা, কতেশ বলে কাউকে কি তুমি চেনো? তোমার ফেসবুক প্রোফাইলে আমি ওকে তোমার বন্ধু তালিকায় দেখেছি।
ঋতেশ তো আমার দেওর।
তাই নাকি। তা ওর মুখে কখনও শোননি যে ও যেখানে পড়াতে যেত সেখানে এরকম একটা খুন হয়ে গেছে।
কই মনে তো পড়ছে না। তা ছাড়া ও তো খুব করিতকর্মা ছেলে। আমার বরের মতো না। আমার কর্তার কোনওকিছুতে গা নেই। কিন্তু ঋতেশ বিয়ের আগেই ফ্ল্যাট কিনে রেডি ছিল। বিয়ে করে বউ নিয়ে ফ্ল্যাটেই উঠেছে। আমার শ্বশুরবাড়িতে অত জায়গাও সত্যি ছিল না। ঋতেশ বউ নিয়ে থাকলে অসুবিধেই হত। সে দিক দিয়ে দেখলে ভালই হয়েছে। তা সেইজন্যে ওর সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ নেই।
দেওর-বউদির যে একটা মিষ্টি সম্পর্ক হয়, সেরকম কিছু ছিল না?
না ও ঠিক ওরকম ছিল না। প্রথম থেকেই খুব কেরিয়ারিস্টিক।
হুম বুঝলাম। আচ্ছা কালকে আমি একটু মলয়ের সঙ্গে কথা বলতে যাব। তারপর বর্ধমানের পুলিশ ইন্সপেক্টর রক্ষিতবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করব। রূপসার ফ্ল্যাটের নীচেই থাকেন পুলিশ ইন্সপেক্টর, বিশ্বজিতবাবু যার উদ্যোগেই তার এই গোয়েন্দাগিরিতে নামা। ওঁকেও ফোন করে সবটা জানাতে হবে। যথা সময়ে কাজকর্ম সেরে রূপসা তৈরি হল দমদম সেন্ট্রাল জেলে যাবে বলে।
তলব করাতে একটু বাদে অশেষ মহন্ত ওরফে মলয় এসে হাজির হল।
আমি দুটো খুব জরুরি কথা জানতে এসেছি। আপনি কি জানতেন যে কেয়া দেবীর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে ব্যাঙ্কে এসে সব গয়না তুলে নিয়ে গেছিলেন।

গেল কোথায়?
কই না তো। তবে সেইসব গয়না
আমারও একই প্রশ্ন। গেল কোথায়? কোনও চুরির ডায়রিও তো করা হয়নি তাই না।
বাড়ি ফিরে এসে রূপসা সবকিছু পরপর সাজিয়ে ভাবতে লাগল। কোথাও একটা আলোর রেখা দেখতে পেল। কিন্তু একটা দুটো খটকা যা আছে তা রূপা আর মলয়ই একমাত্র সমাধান করতে পারবে। সে দ্রুত
না। জানিই তো না। তাহলে আর করব কেন? তার পরেই এমন সব কাণ্ডকারখানা পরপর হয়ে গেল যে কিছু
ভাববার তো সময়ই পেলাম না। জীবনটাই বদলে গেল সম্পূর্ণভাবে।
এই চুরির রিপোর্ট আপনার বাড়িত কেউ তো করতেই পারে তাই না।
তা পারে।

-আরেকটা কথা। আপনি যে বলছিলেন যে আপনার মা ফোন করে আপনাকে বলে পালিয়ে যেতে তা এই ফোনটা আপনি কি অবস্থায় রিসিভ করেন?
আমি বাজারে ছিলাম তখন।
চারিদিকে অনেক হইহট্টগোল ছিল নিশ্চই সেইসময়?
- হ্যাঁ, বাজার এলাকা হলে যা হয়। প্রচুর হাঁকাহাঁকি আর ডাকাডাকি।
স্পষ্ট করে মায়ের গলা বুঝতে পেরেছিলেন?
এখন এতদিন বাদে তো ভাল করে মনেও করতে পারছি না।
আপনি পালালেন কেন?
ওই যে বলল লোহার বাঁটে তোমার হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। যেটা মানে মার্ডার ওয়েপন ছিল।
- আপনার মা আপনাকে তুমি করে সম্বোধন করত।
বিশেষ বিশেষ সময়। এমনিতে না।

সেক্ষেত্রে কি অন্য কেউও ফোনটা করতে পারে?
একটু ভেবে মলয় বললেন,
করতে পারে। জানেন। কারণ প্রথমে
মা হাউহাউ করে কেঁদে বলল,
মলা রে, ওরা বলছে ওটাতে তোর হাতের ছাপ পাওয়া গেছে।
তখন তুই বলেছিলেন?
- যতদূর মনে পড়ছে, প্রথমে তো তুই বলেছিলেন। তারপর-
তারপর কি গলাটা স্টেডি দেখলেন? হ্যাঁ। পরের কথাগুলো সব স্পষ্টই
শুনতে পেয়েছিলাম।
এরকম কি হতে পারে যে প্রথমে আপনার মা সত্যিই ফোনটা ধরেছিলেন এবং তারপর অন্য কেউ কথা বলেছিলেন।
মানে আপনি বলতে চাইছেন, মৈত্রদার স্ত্রী মানে ঋজুলাবউদি পালানোর প্রস্তাবটা আমাকে দিয়েছিল?
সেটা যুক্তি দিয়ে ভেবে আপনি আমাদের বলুন, এর সম্ভাবনা কতটা?উপন্যাস
তখন অত তলিয়ে ভাবিনি, এখন মনে হচ্ছে আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। পরের দিকে গলাটা স্পষ্টই শুনতে পাচ্ছিলাম। তখন মানসিক অবস্থা এমন যে কার গলা-কে বলছে এই নিয়ে মাথা ঘামাইনি। হতে পারে কেন, তাই হয়েছিল বলেই আমার অনুমান।
আচ্ছা ঋজুলা ম্যাডামের স্বামী কি করেন?
ওঁরও ব্যবসা। বড়বাজারে
শাড়ির দোকান।
-কি নাম দোকানের?
'অঙ্গসজ্জা'
আচ্ছা। অনেক ধন্যবাদ। আমি আর একদিনের মধ্যেই আপনাকে কিছু খবর দিতে পারব বলে আশা করছি। একটু চুরির রিপোর্টটা আপনি আপনার দাদাকে বলুন থানায় ডায়রি করতে।
-বলছি। সেটুকু হয়তো করবে। রূপসা ওখান থেকে বেরিয়ে মিলিকে ফোন করল। নাগের বাজারের ক্যাফেতেই আসতে বলল মিলিকে।
মিলি ঢুকেই জিজ্ঞেস করল,
পারলেন ধাঁধাটা সলভ করতে?
ইতিবাচকে মাথা নাড়ল রূপসা। এক্ষুনি বলব না। কাল বিকেলে তোমাদের বাড়িতে জমায়েত হব। সেখানেই খোলসা করে সব বলব। কিন্তু তার আগে আমি তোমার থেকে একটা সত্যি কথা জানতে চাইছি।
-কি বলুন?
তোমায় কি পালিয়ে যেতে
বলেছিল কেয়া?
মাথা নাড়ল মিলি।
সেটা কি ঋতেশ জানত? হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল মিলি। তারপর ছুট্টে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রূপসা।
যথা সময়ে উপস্থিত হয়েছে সকলেই মিলিদের বাড়িতে। রূপসাও এসে পড়েছে সময়মত। চোখ বুলিয়ে নিল রূপসা একবার সকলের ওপর। শানু, মিলি, তাদের বাবা, মা, রূপালি এবং
তার দেওর ঋতেশ, কজুলা মৈত্র এবং তার স্বামী সরোজ মৈত্র, ইন্সপেক্টর রক্ষিত এবং পুলিশ ইন্সপেক্টর
বিশ্বজিতবাবু। যাদের যাদের বলেছিলেন সবাই তার কথার মান রেখে এসেছেন। স্পেশাল পারমিশান নিয়ে মলয় এবং এক কনস্টেবলও উপস্থিত হয়েছেন। ঋজুলা বউদি ইতিমধ্যে সকলকে কফি এবং পকোড়া পরিবেশন করেছেন। কফিতে একটা চুমুক দিয়ে রূপসা শুরু করল,
প্রথমেই আমি সকলকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই যে নিজেদের মূল্যবান সময় ব্যয় করে আপনারা এখানে আসতে রাজি হয়েছেন। ভূমিকা পর্ব বিলম্বিত না করে আমি সোজাসুজি বিষয়ে চলে আসি। আমার বাঁপাশে বসে আছে রূপালি। তিনি খবরের কাগজে দেখেন যে মলয় দে যিনি ফেরার ছিলেন স্ত্রী খুনের অভিযোগে, তাকে এক আশ্রম থেকে আটক করা হয়েছে। অশেষ মহন্ত নাম নিয়ে সন্নাসীর ভেক ধরে বসেছিলেন।
প্রথমেই বলে রাখা প্রয়োজন যে, আশ্রমে কেউ কিন্তু অশেষ মহন্তর আচারবিচারে কোনও উদগ্র বা নৃশংস কিছু খুঁজে পায়নি। রূপালি ওরফে রূপাও স্নেহধন্য ছিলেন অশেষ মহন্ত বাবাজির। ওই আশ্রমে ওঁর যাতায়াত ছিল, সেবা করেছিলেন মহন্তর একসময়। শুনে ওঁর মনে খটকা লাগে বলে উনি দমদম সেন্ট্রাল জেলে গিয়ে দেখা করেন অশেষ মহন্তর সঙ্গে। উনি খুব দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে উনি খুনি নন। রূপালি আমার কাছে আসে কেসটা নিয়ে। নিরপরাধ কাউকে জেলে রাখার মতো অপরাধ বোধহয় আর কিছু নেই।
আমি অশেষ মহন্ত অর্থাৎ মলয়বাবুর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি কিছু ব্যাঙ্ক ট্রানজাকশনের ব্যাপারে। নাগের বাজারে স্টেট ব্যাঙ্কে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি মলয়বাবু তার দাদার অ্যাকাউন্টে পঞ্চাশ হাজার টাকা ট্রান্সফার করা ছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল যেটার উল্লেখ কিন্তু কেউ করেনি। সেটা হচ্ছে মলয়বাবুর স্ত্রী কেয়া
দেবী ওঁর সমস্ত গয়না লকার থেকে তুলে নেন। কেউ উল্লেখ যখন করল না তাহলে কি কেউ জানত না। প্রথমেই আমার এটা মনে হয়। পরক্ষণেই মনে হয়, কেউ নিশ্চয়ই জানত যে হাপিশ করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে? কিন্তু সে
ব্যাক্তিটি কে? উদ্দেশ্যই বা কি? তা ছাড়া কেয়া দেবী হঠাৎ ওঁর স্ত্রীধন তুলেই বা ফেললেন কেন? এটাও একটা বিরাট প্রশ্ন। তখনই মনে হয়েছিল, তবে কী উনি কাউকে দিতে চান কোনও বিশেষ উদ্দেশ্যে নাকি ব্যবসার কোনও কাজে লাগাবার জন্য প্রয়োজন? অথবা আর কি উদ্দেশ্যে তা সত্যিই জানা নেই। তবে মলয়বাবুর ব্যবসার কাজে যে নয়, তা স্পষ্ট। তাহলে অন্তত মলয়বাবু সেটা জানতে পারতেন। ওঁর সেক্স প্রেফেরেন্স সম্বন্ধে আমরা সবাই জানি, তাই নতুন করে কিছু বলার নেই। তাই আমার কেমন সন্দেহ হয় যে কোনও পালাবার প্রস্তাব কি তিনি দিয়েছিলেন মিলিকে। তখন হয়তো এই গয়না এবং তার বিক্রির পয়সা কাজে লাগবে। এই সন্দেহ যাতে দূর হয় তাই বলেছিল বাপেরবাড়ি যাচ্ছে। এবার যদি মিলি আমাদের একটু এই ব্যাপারে আলোকপাত করে? এইরকম কোনও কথা কি হয়েছিল মিলি?
হ্যাঁ হয়েছিল। আমার কথা ছিল দমদম থেকে ট্রেন ধরে ব্যারাকপুরে যাওয়ার। কিন্তু আমি দমদম স্টেশন যাইনি। আপনি আমার বন্ধুদের জিজ্ঞেস করতে পারেন।
- আমিও জানি তুমি যাওনি। কিন্তু এই প্রস্তাবটা তোমার মাথায় কে দেয়? কে বলে গয়না তুলে কেয়া দেবীকে প্ররোচিত করতে? মিলি মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।
বরং আমি বলি, মিলির বাড়ির লোকেরা ঋতেশের সঙ্গে মিলির সম্পর্ককে সহজেই ছাড়পত্র দেয়। এবং যথেষ্ট সঙ্গত কারণ আছে তার জন্যে। ঋতেশ প্রেমের অভিনয় করতে থাকে সুনিপুণভাবে। কিন্তু ঋতেশের এই বাড়িতে ঢোকার আকর্ষণ ছিল অন্য। সেটার ব্যাপারে মিলিকে কেয়া দেবী!..
নিশ্চিতভাবে অবহিত করেছিলেন। কিন্তু মিলি তখন হয়তো ঋতেশের ক্যারিশমায় বিমোহিত। সে এরকম কিছু চিন্তাই করতে পারছে না। ঋতেশের ম্যাচো ফিগার আধ মনোমুগ্ধকর কথাবার্তায় তখন ও মজে আছে। বিদেশে গাড়ি দিয়ে এক স্বপ্নিল জীবনের হাতছানি তার সামনে। তার জন্য টাকার প্রয়োজন। কে মেটাবে? কে মেটাবে। মগজধোলাই করে ঋতেশ মিলিকে বুঝিয়েছিল কেয়া দেবী মেটাবে। ঋতেশের মগজধোলাই করেছিল অন্য আরেকজন। শুধু একটু। কৌশলের প্রয়োগ তাকে শিখিয়ে দিয়েছিল।
অত্যাশ্চর্য হয়ে মিলি বলল,
আপনি এতকিছু কি করে জানলেন? ওই ডায়রিটা পড়ে আন্দাজ করলাম।
হয়তো ঈর্ষার কারণেই উনি তোমাদের দুজনের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করতেন। আর তারপর সাহায্য করল ডায়রির পাতার ওই ধাঁধা।
বক্র নয় কিন্তু সোজাও নয়
বন্ধু কিন্তু মিত্র নয়।
পরোপকারী সেজে ফাঁদ
পাতে
প্রাণ জুড়োয় যদি ধরা পড়ে হাতেনাতে। এখানে খেয়াল করুন কজুলা বউদির সন্ধান খুব সন্তর্পণে কেয়া বউদি দিয়ে গেছেন। বক্র নয় কিন্তু সোজাও নয় অর্থাৎ নামটা ঋজু হলে এই কথাটা বলতেন না। নামটা 'ঋজুলা' বলে এইভাবে তুলে ধরেছেন। আর এসে থেকে আমিও দেখছি পরোপকারের একটা ইমেজ ওঁর রয়েছে। বা যে কোনওকিছুতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। কিন্তু এর অন্তরালে থাকে অন্য অভিসন্ধি। তাইজন্যে শেষের দুটি লাইন পরোপকারী সেজে ফাঁদ পাতে/প্রাণ জুড়োয় যদি ধরা পড়ে হাতেনাতে। এই যে এখানে ঋজুলা মৈত্রর যে একটা পরিকল্পনা লুকিয়ে ছিল, সেটা কি তুমি বুঝতে পেরেছিলে মিলি? এই ঘটনাটার ব্যাপারে তুমি অন্ধকারে ছিলে কিন্তু কেয়া দেবী যথেষ্ট ম্যাচিয়োরড ছিলেন তাই তিনি ঋতেশ আর ঋজুলা বউদির সম্পর্কটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তোমাকে আভাস দিতে গিয়েও হয়তো তুমি মনে ব্যথা পাবে ভেবে আর বলেননি। কিন্তু তোমাকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেছিলেন। তুমি চলে যেতে চাও শুনে তাই মনে সন্দেহ জাগলেও শুধুমাত্র তুমি বলেছিলে
বলে ভরসা করে গেছিলেন কেয়া দেবী মনে আশা নিয়ে। হাজির হয়েছিলেন দমদম স্টেশনে তোমার দেখা পাবে ভেবে। সেখানে অপেক্ষা করে তোমাকে না-পেয়ে হয়তো যোগাযোগ করে থাকবেন। একসময় বুঝেছিলেন তুমি আর আসবে না। বাড়ি ফিরে এসেছিলেন।
ওই সময়ই ফোন করে আমাকে ডায়রির কথাটা বলেছিল কাকিমা। লুকিয়ে রেখেছিল বাথরুমের লফটে। আমাকে বাড়ি ফিরতে বারণও করেছিল। হয়তো ভেবেছিল দুজনকে হাতেনাতে ধরবে।
কিন্তু জানত না যে সেখানেই লুকিয়ে ছিল তার মরণবাণ। খেয়াল করুন সেদিন বাড়িতে কেউ নেই। আর ঋজুলা দেবীর সঙ্গে মলয়বাবুর মায়ের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। ঋজুলা বউদি মাকে ঘরে নিয়ে আসেন গল্প করতে। এই ফাঁকে ঋতেশ তাকে একলা পেয়ে গয়না হাতানোর চেষ্টা করে। এরপর আমরা না-হয় বাকিটা ঋজুলা বা ঋতেশের মুখ থেকে শুনব। কে বলবে ঝজুলা না কতেশ? ঋজুলাই থাকতে না-পেরে গর্জে উঠল,
আমার সঙ্গে ঋভেশের সম্পর্ক ছিল এ কথা আপনি কি করে বলতে পারলেন? আমি এখানে কোথাও নেই। হ্যাঁ, আমার সঙ্গে মাসিমার সুসম্পর্ক ছিল। গল্প করার জন্য ডাকতেই পারি। তাতে কি প্রমাণিত হয়?
তাতে কি প্রমাণিত হয়? চীৎকার করে উঠল ঋতেশ। গয়নার অর্ধেক তুমি নাওনি? আর কেয়া বউদি প্রথম থেকেই আমাদের সন্দেহ করত। মিলিই আমাকে বলেছিল। গয়না নিলেও খুন তো আর আমি করিনি।
হ্যাঁ, আমি তো সুপারি কিলার ছিলাম। পুরো পরিকল্পনা বানিয়ে, কারখানার চাবির সন্ধান দিয়ে, এমনকী কি দিয়ে মার্ডার করলে তাতে মলয়কাকার হাতের ছাপ পাওয়া যাবে এবং কৌশলে ফোনে তাকে পালাতে বললে কীভাবে সন্দেহ তার ওপর গিয়ে পড়বে এবং আর কেস অন্যদিকে ঘুরে যাবে তার ব্লুপ্রিন্টও কি আমি করেছিলাম?
মুখে বললেই তো আর হল না। তার জন্য প্রমাণ লাগে।
- আপনি যে গয়না বিক্রি করেছিলেন বউবাজারের দোকানে তার প্রমাণ আমরা
পেয়েছি। পুলিশ ইন্সপেক্টর বিশ্বজিতবাবু
বললেন।

বাকি নিশ্চয়ই ঋতেশ আমাদের সবিস্তারে বলবে। তাহলেই প্রমাণ পেয়ে যাব এবং মলয়বাবু বেকসুর খালাস হয়ে যাবেন। কিন্তু আমার এই প্রশ্নটা রক্ষিতবাবুর প্রতি, আপনি সম্প্রতি অশেষ মহন্তর গোঁজ পেলেন কি করো
আমাদের খানার ল্যান্ডলাইনে কেউ একজন ফোন করে খবর দিয়েছিল।
আমারও এরকমই সন্দেহ হয়েছিল। যাকগে কে সে নিয়ে আর ঘাটালাম না কারণ এটাই শাপে বর হয়ে গেছে মলয়বাবুর ক্ষেত্রে। কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়েছে। হাতকড়া পরিয়ে দুই অপরাধীকে নিয়ে গেলে ঋজুলা মৈত্রর স্বামী বললেন,
খবরটা আমি দিয়েছিলাম যাতে কোর্টে কেসটা ওঠে এবং কেস চলাকালীন যাতে আস্তে আস্তে সত্যিটা জানা যায়। মলয়কে মিথ্যেভাবে ফাঁসানোর জন্য আমি কেমন আত্মগ্লানিতে ভুগতাম। প্রকাশ না করলেও ঋজুলার ভূমিকা সম্বন্ধে আমার ধারণা ছিল। কিন্তু আপনি সিনে চলে আসায় ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে গেল।
তাহলে কেয়া দেবীর ডায়রিটা
তোলপাড় করে কে খুঁজেছিল?
যখন শুনলাম লকার থেকে গয়না তুলেছিল কেয়া, তখন গয়নাগুলো মিলিকে দিয়ে গেছিল কিনা জানার জন্যে ওর ঘরটা আমি খুঁজেছিলাম। মিলির মা একটু লজ্জিত হয়েই জানালেন। মেয়েরা বড় হলে তো অনেক কথাই মাকে বলে না। তাই আর কী। বিদায় নেওয়ার বেলায় রূপালি হাত দুটো ধরল রূপসার,
আমার যে কি উপকার করলেন আপনি তা জানেন না। কিন্তু আমার কপাল দেখুন রক্ত বলে একটা জিনিস আছে আপনাকে বললাম না। জন্মদাতা খুনি না হলেও সমাজে যে বংশের পরিচয় সে বহন করে চলবে সেই বংশে সত্যিই খুনির দেখা মিলে গেল।
রূপসা তার হাত দুটো ধরে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল। তবে অশেষ মহন্তর খোলস থেকে বেরিয়ে মলয়ের দু'জোড়া চোখের ভেতর যে রূপা সান্ত্বনা এবং ভালবাসা দুটোই খুঁজে পাবে তা বলাই বাহুল্য।








Comments