গুরু দত্ত: নিঃসঙ্গ এক আলোকজীবন, বয়স রোখার বিপদ, বাহারি নোনতা, র্যাম্প থেকে রাস্তায়: হালফিলের পোশাকি ট্রেন্ড, রবিবারের গল্প: ফাদার ইমানুয়েল..
- রোজকার অনন্যা

- Aug 2, 2025
- 23 min read
শতবর্ষে গুরু দত্ত: নিঃসঙ্গ এক আলোক জীবন

২০২৫ সালে আমরা ভারতীয় সিনেমার এক অসামান্য শিল্পীর জন্মশতবর্ষ পালন করছি গুরু দত্ত। যাঁর চলচ্চিত্র শুধু বিনোদন নয়, বরং জীবনের গভীরতম বোধ ও বেদনাকে চিত্ররূপ দিয়েছে। গুরু দত্তকে মনে রাখার কারণ শুধু তাঁর সিনেমা নয়, তাঁর জীবনও এক নিঃসঙ্গ, আলো-ছায়ায় মোড়া অধ্যায়। একদিকে যেমন তিনি চলচ্চিত্র জগতের নতুন ভাষা গড়ে তুলেছিলেন, তেমনই অন্যদিকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছিল বিষণ্ণতা, অতৃপ্তি ও নিঃসঙ্গতায় আচ্ছন্ন। এই শতবর্ষে ফিরে দেখা যাক সেই শিল্পীর আলোকোজ্জ্বল অথচ করুণ জীবনকথা।

গুরু দত্তের জন্ম ১৯২৫ সালের ১০ জুলাই, বেঙ্গালুরুর এক বাঙালি পরিবারে। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল বৃষিকেশ পণ্ডিত। পিতা ছিলেন ব্যাংকের কর্মচারী, মা ছিলেন স্কুলশিক্ষিকা ও সংস্কৃতজ্ঞ। গুরু দত্তের শৈশব কেটেছে কলকাতা ও পরে পুনেতে। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। নৃত্য ও নাটকের প্রতি ঝোঁক তাঁকে নিয়ে যায় কলকাতার উড়িষা নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের ইনস্টিটিউটে, যেখান থেকে তিনি শিল্পচর্চার মূল অনুপ্রেরণা পান।
গুরু দত্তের চলচ্চিত্র জীবনের শুরু হয়েছিল প্রখ্যাত নির্মাতা অমিয় চক্রবর্তীর সহকারী পরিচালক হিসেবে। ১৯৫১ সালে ‘বাজি’ চলচ্চিত্র দিয়ে পরিচালনায় আত্মপ্রকাশ। এরপর একে একে এল ‘জাল’, ‘বাহার’, ‘আর পার’, কিন্তু তাঁর প্রকৃত পরিচিতি আসে ‘পেয়াসা’ (১৯৫৭) ও ‘কাগজ কে ফুল’ (১৯৫৯)-এর মাধ্যমে। তিনি শুধু পরিচালকই নন, প্রযোজক ও অভিনেতা হিসেবেও ছিলেন সমান দক্ষ। গুরু দত্ত ছিলেন সেই কজন চলচ্চিত্র নির্মাতার মধ্যে একজন যিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রে ‘রূপকধর্মী বাস্তববাদ’-এর ভিত্তি স্থাপন করেন।

গুরু দত্তের চলচ্চিত্রে বাস্তব জীবনের প্রতিফলন যেমন ছিল, তেমনই ছিল দর্শনের গভীরতা। ‘পেয়াসা’ এক অবহেলিত কবির সমাজবিরোধী অবস্থান ও অভিমানকে তুলে ধরে। ‘কাগজ কে ফুল’ শিল্পী জীবনের এক অসহায় ট্র্যাজেডি, যা অনেকাংশেই গুরু দত্তের নিজের ভবিষ্যতের পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়ায়। ‘সাহিব বিবি অউর গুলাম’-এ নারীর মানসিক নিঃসঙ্গতা ও সামাজিক গণ্ডির ভিতর তাঁর সংগ্রাম, গুরু দত্তের ক্যামেরায় এক অসাধারণ দৃষ্টিকোণ পায়। তাঁর ছবির এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল আলো ও ছায়ার খেলা, যেটি তিনি ব্যবহার করতেন চরিত্রের মানসিক অবস্থা বোঝাতে। সিনেমার ভাষায় এমন দার্শনিক গভীরতা সেসময় বিরল ছিল।
চলচ্চিত্রজগতের উজ্জ্বল আলোয় যাঁকে দেখা যেত, সেই মানুষটি ব্যক্তিজীবনে ছিলেন একান্ত একা। তাঁর ও গায়িকা গীতা দত্তের বিয়ে ছিল চাঞ্চল্যকর, প্রেমে ভরা কিন্তু অশান্তিতে জর্জরিত। গীতার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, প্রেমিকা ও অভিনেত্রী ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে দূরত্ব, ও পেশাগত চাপ গুরু দত্তকে ক্রমশ ভেতর থেকে গিলে ফেলতে থাকে। তিনি ছিলেন নিখুঁততায় বিশ্বাসী। তাঁর ছবিতে প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি সংলাপ, এমনকি আলোর প্রক্ষেপণও ছিল বারংবার চিন্তা ও পরীক্ষিত। এই চূড়ান্ত পারফেকশনিজমের জন্য অনেক সহকর্মীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়। তবে তিনিই একমাত্র ছিলেন যিনি ভারতীয় সিনেমাকে ইউরোপীয় চলচ্চিত্র ভাষার সঙ্গে এক গভীর সংলাপে বসিয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে গুরু দত্তের মৃত্যু ঘটে। অফিসিয়ালি এটি ছিল দুর্ঘটনাজনিত ওভারডোজ, কিন্তু ঘনিষ্ঠ মহলে অনেকেই বিশ্বাস করেন, এটি আত্মহত্যা ছিল। তিনি এর আগেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। মানসিক বিষণ্ণতা, সম্পর্কের ব্যর্থতা, শিল্পের প্রতি এক অমোচনীয় দায়বদ্ধতা সব মিলিয়ে তিনি ধীরে ধীরে এক নিঃসঙ্গ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

গুরু দত্তের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি মূল্যায়ন আরও গভীর হয়েছে। 'কাগজ কে ফুল' মুক্তির সময়ে দর্শক-সমালোচকরা তাঁর কাজের মর্ম বুঝতে পারেননি। কিন্তু কয়েক দশক পরে এই ছবিই ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিনেমা হিসেবে স্বীকৃত হয়। বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্র বিশারদদের কাছে গুরু দত্ত আজও এক অমূল্য রত্ন। ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন সহ একাধিক দেশে তাঁর কাজ নিয়ে আলোচনা, গবেষণা ও প্রদর্শনী হয়। গুরু দত্ত ভারতীয় সিনেমার ভাষা বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর ফ্রেম কম্পোজিশন, ডিপ ফোকাস, নাটকীয় আলো-ছায়ার ব্যবহার, ক্যামেরা মুভমেন্ট সবই ছিল যুগান্তকারী। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সিনেমা কেবল গল্প বলার মাধ্যম নয় এটি এক শিল্প, এক দার্শনিক অনুসন্ধান। তাঁর সিনেমায় ব্যবহৃত গানগুলোও আলাদা করে বিশ্লেষণযোগ্য। সাহির লুধিয়ানভি ও শ্যামা মোহন ও অনেকে তাঁর ছবির গানে এমন কিছু রচনা করেছিলেন যা একেকটা কবিতা। 'জানে কয়া তুনে কাহি', 'ও দুনিয়া কে রখওয়ালে', 'চৌধবী কা চাঁদ' আজও কালজয়ী।

আজ যখন গুরু দত্তের জন্মশতবর্ষ পালিত হচ্ছে, তখন আমরা কেবল তাঁর সৃষ্টি নয়, তাঁর যন্ত্রণাময় অথচ আলোকোজ্জ্বল জীবনকেও স্মরণ করি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন শিল্প শুধু আনন্দ নয়, তা এক গহন বেদনার ফল, যেখানে এক শিল্পী নিজের সত্তা বিসর্জন দেন। তাঁর জীবন ছিল ছোট, কিন্তু সৃষ্টি বিশাল। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন “একটি সত্য ছবি মানুষের হৃদয়ে গিয়ে পৌঁছয়, এবং সেই হৃদয়কে চিরকাল নাড়িয়ে দেয়।”
গুরু দত্তের শতবর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্যিকারের শিল্প কখনো হারায় না। তাঁর নিঃসঙ্গতার মধ্যেও যে আলো ছিল, তা আমাদের আজও পথ দেখায়। একজন শিল্পী হিসেবে, মানুষ হিসেবে, পরিচালক হিসেবে তিনি ছিলেন অনন্য।
এই শতবর্ষে আমরা তাঁকে শুধু শ্রদ্ধা জানাই না, বরং প্রতিজ্ঞা করি শিল্প ও মানবিকতার মেলবন্ধনে আমরা তাঁর মত করেই সামনে এগিয়ে যাব।

বয়স রোখার বিপদ
আয়নায় মুখের ভাঁজটা একটু চোখে পড়তেই চিন্তা “বুড়িয়ে যাচ্ছি না তো?”
তখনই শুরু হয় নানা রকম চেষ্টার পালা কেউ ঘরোয়া টোটকায় বিশ্বাস করেন, কেউ দৌড়ে যান বিউটি ক্লিনিকে, কেউ আবার অস্ত্রোপচারের ঝুঁকিও নিতে দ্বিধা করেন না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘বয়স রোখা’র চেষ্টায় আমরা কী হারাচ্ছি? শুধু যৌবন নয়, কী হারাচ্ছি আত্মবিশ্বাস, স্বাভাবিকতা, এমনকি স্বাস্থ্যের ঝুঁকি? এই প্রতিবেদনে আমরা দেখব বয়স রোখার পিছনে লুকিয়ে থাকা সামাজিক চাপ, বাণিজ্যিক স্বার্থ, এবং মানসিক ও শারীরিক বিপদের চিত্র।

বিশ্বজুড়ে সৌন্দর্যের যে মাপকাঠি, তা আজও প্রবলভাবে ‘তরুণ’ চেহারাকে গুরুত্ব দেয়। বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে সমাজে চিরকালই একটি ধারণা চালু যৌবন মানেই সৌন্দর্য, মধ্যবয়স মানেই অপ্রাসঙ্গিকতা। এই ধারণাই জন্ম দিয়েছে ‘anti-aging’ শিল্পের। ফলাফল? ত্বক মসৃণ করার সিরাম, চুল ঘন করার ট্রিটমেন্ট, মুখ টানাটানির অস্ত্রোপচার, ফিলার, বোটক্স ইত্যাদি। বলা হয় এগুলো “self-care” বা “confidence booster” কিন্তু আদতে তা কি নয় আত্মসম্মানহীনতার এক লুকোনো কাহিনি?
বাজারে এখন ‘anti-aging’ প্রোডাক্টের বান ডাকছে। কোলাজেন ক্রিম, রেটিনল সিরাম, ভিটামিন ইনজেকশন, স্কিন টাইটেনিং থেরাপি সবই মুখে বলে “নিরাপদ”, কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘমেয়াদে এসব পণ্যের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক।
ফিলার ব্যবহারে পেশির স্বাভাবিক গতিবিধি ব্যাহত হতে পারে, মুখের অভিব্যক্তি হয়ে পড়ে কৃত্রিম।
স্কিন লেজার বা RF থেরাপি প্রাথমিকভাবে কার্যকর হলেও ত্বকের গভীর কোষে ক্ষতি করতে পারে।
ফেয়ারনেস ইনজেকশন বা গ্লুটাথিয়োন ব্যবহার লিভার ও কিডনির ক্ষতি ঘটাতে পারে।
বহু অজানা কসমেটিক ওষুধের কারণে হরমোন ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও আছে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো এই সব কিছু করার পরেও বয়স থামে না, বরং আসল বয়স আর মুখের বয়সের বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
বয়স মানে অভিজ্ঞতা, পরিণত বোধ, আত্মবিশ্বাস। কিন্তু আমরা যখন বারবার নিজেকে ‘বয়স্ক’ নয় প্রমাণ করতে চাই, তখন নিজের মধ্যেই জন্ম হয় এক অসন্তোষ। বয়সকে অস্বীকার করার এই প্রবণতা বহু নারীর মনে গোপন হতাশা, দুঃখ ও অবসাদ সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই চিরযৌবনের চাপ থেকে জন্ম নিচ্ছে:

কম আত্মবিশ্বাস
সারাক্ষণ নিজেকে নিয়ে উদ্বেগ
নিজের শরীরকে অপছন্দ করা (body dysmorphia)
সামাজিক বিচ্ছিন্নতা
এই ধরনের মানসিক সমস্যা ধীরে ধীরে একটি আত্মপরিচয় সংকটে রূপ নেয়, যেখানে মানুষ নিজের প্রকৃত রূপটাকেই অস্বীকার করতে শুরু করে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে ‘salt and pepper’ বা একটু পরিণত বয়সকে অনেক সময় ‘আকর্ষণীয়’ বলা হয়। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে?
৩০ পেরোতেই প্রশ্ন—“তোমার স্কিন কেন এমন রুক্ষ দেখাচ্ছে?”
৪০ এ—“বিয়ে করনি এখনও? এবার তো বয়স হচ্ছে।”
৫০ এ—“চুল রং করো না? বুড়িয়ে যাচ্ছো তো!”
এই সমাজই একদিকে বলে ‘age gracefully’, আবার অন্যদিকে নারীকে ঠেলে দেয় কৃত্রিম ‘যৌবন’ ধরে রাখার প্রতিযোগিতায়।

যৌবন চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু সুস্থতা হতে পারে। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে যদি আমরা সুস্থ বার্ধক্যের দিকে এগোই, তবে আত্মবিশ্বাসও থাকবে, সৌন্দর্যও ঝলমল করবে। কীভাবে সম্ভব?
সুষম খাদ্য: বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বক ও চুলের জন্য প্রোটিন, ভিটামিন, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট যুক্ত খাদ্য অত্যন্ত জরুরি।
ব্যায়াম: রোজের হালকা স্ট্রেচিং, যোগা, হাঁটা রক্তসঞ্চালন ভালো রাখে, মনও ফুরফুরে থাকে।
ঘুম ও জলপান: পর্যাপ্ত ঘুম ও জল শরীরের ভেতর থেকে সতেজতা এনে দেয়।
মানসিক শান্তি: ধ্যান, বই পড়া, নিজের সময় তৈরি করা এসব মন ভালো রাখে, আর মন ভালো থাকলে তার প্রতিফলন পড়ে চেহারাতেও।

সবচেয়ে বড় কথা, বয়স মানে সব কিছুর শেষ নয়, বরং অন্য এক অধ্যায়ের সূচনা। সত্যি বলতে কি, মুখের রেখা, চুলের রঙ, চোখের কোণে কিছু ভাঁজ এসবই জীবনের চিহ্ন। প্রতিটি রেখা বলে কোনো না কোনো গল্প। বয়স আমাদের কাছে কেবল সংখ্যা নয়, তা আমাদের চরিত্র, অভিজ্ঞতা, সহানুভূতি ও পরিণতির প্রতিফলন। যারা বয়সকে হাসিমুখে গ্রহণ করেন, তাঁরা নিজেদের ভেতর থেকে জ্বলে ওঠেন। তাঁদের সৌন্দর্য প্রচলিত সৌন্দর্যের সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে দাঁড়ায় এক অন্য উচ্চতায়।

বয়স রোখা নয়, বরং বয়সকে সম্মান জানানোই হওয়া উচিত আমাদের চেতনার অঙ্গ। আজকের দিনে যখন ‘anti-aging’ পণ্যের বাজার ছেয়ে যাচ্ছে, তখন দরকার নিজেকে নতুনভাবে বোঝার, গ্রহণ করার সাহস। যৌবন সুন্দর, কিন্তু বার্ধক্য সম্মানীয়। সেই সম্মানের পথে এগিয়ে চলা মানেই জীবনের প্রতিটি অধ্যায়কে পূর্ণতা দেওয়া।
চিত্র ও রেফারেন্স: WHO Healthy Ageing Reports, The Guardian (Lifestyle), Indian Dermatology Journal
র্যাম্প থেকে রাস্তায়: হালফিলের পোশাকি ট্রেন্ড

এক সময়ে ফ্যাশন শো ছিল শুধু অভিজাত সমাজের খেলার মাঠ। ক্যাটওয়াকে হাঁটতেন মডেলরা, গায়ে থাকত পরীক্ষামূলক পোশাক, যেগুলোর স্থান কেবল ফ্যাশন ম্যাগাজিনের পাতায়। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। ফ্যাশন শুধু ক্যামেরার ফ্ল্যাশ নয়, রাস্তাতেও নেমে এসেছে সেই ঝলক। আজকের ফ্যাশন মানেই ব্যক্তিত্বের প্রকাশ, আরাম ও আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। আর এই নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড যা র্যাম্প থেকে রাস্তায় এসে পৌঁছেছে তা দেখে স্পষ্ট, পোশাক এখন কেবল শরীর ঢাকার উপায় নয়, বরং মত প্রকাশের ভাষা।
ট্রেন্ডের নতুন সংজ্ঞা: আরাম, অন্তর্ভুক্তি ও আত্মপ্রকাশ
আজকের পোশাকি ট্রেন্ড শুধু সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে মাপা যায় না। বরং, এতে দেখা যায় সামাজিক বার্তা, সংস্কৃতির সংমিশ্রণ এবং নিজের মতামত জানানোর স্পষ্ট সাহস।
কমফর্ট ফ্যাশন: স্ট্রাকচার্ড ফিট নয়, বরং ওভারসাইজড জামা, ব্যাগি প্যান্ট, ঢিলেঢালা সালোয়ার এখন নতুন ‘কুল’।
বডি-পজিটিভিটি: সব ধরনের শরীরের জন্য ফ্যাশন তৈরি হচ্ছে। কোনো ফর্মে বাঁধা নয় যা খুশি পরো, যতক্ষণ না তুমি তাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছো।
জেন্ডার নিউট্রাল ফ্যাশন: ছেলেমেয়ের পোশাকের সীমানা মুছে দিচ্ছে নতুন ডিজাইন আন্তরিক পোশাক, ফ্লুইড সিলুয়েট, উভয়ের জন্য উপযোগী জামাকাপড়।

র্যাম্প থেকে উঠে আসা কিছু উল্লেখযোগ্য ট্রেন্ড:
Oversized Everything
আগে যেটা হতো “বড়ো জামা”, এখন সেটা ফ্যাশনের দাবি। ওভারসাইজড টি-শার্ট, শার্ট, ব্লেজার, কুর্তি—সবকিছুতেই স্বস্তি আর স্টাইল একসঙ্গে। র্যাম্পে Balenciaga থেকে Zara পর্যন্ত সবাই এই লুককে জনপ্রিয় করেছে।
Co-ord Sets
মিলিয়ে পড়া জামাকাপড় কখনও ফুল হ্যান্ড প্রিন্ট, কখনও প্যাস্টেল শেডে কটন বা লিনেন। কলেজগার্ল থেকে ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার, সবার ওয়ারড্রোবে জায়গা করে নিয়েছে এই ‘মিনিমাল ফ্যাশন’।
Layering & Mixed Textures
একই পোশাকে একাধিক স্তর এবং ভিন্ন উপাদানের ব্যবহার (যেমন: ডেনিমের ওপর শিফন, বা কটনের সঙ্গে লেদার অ্যাকসেন্ট) এখন র্যাম্প ছেড়ে সাধারণ পথেও জনপ্রিয়। অফিস, ক্যাফে, বা সাপ্তাহিক আড্ডায় এমন লুক বার্তা দেয় আত্মবিশ্বাসের।
Indian Fusion
শাড়ির সঙ্গে বেল্ট, কুর্তির সঙ্গে স্নিকার্স, ধুতি-স্টাইল স্কার্ট এইসব র্যাম্পের ফিউশন ট্রেন্ড এখন শহরের স্ট্রিট ফ্যাশনে জায়গা করে নিয়েছে।
Gender Fluid Styling
র্যাম্পে যেমন পুরুষ মডেল পড়ছেন কুর্তা বা স্কার্ট, তেমনই নারীরা ট্রাই করছেন ফর্মাল ব্লেজার বা মেন-স্টাইল শার্ট। রাস্তায়ও এই স্টাইল ঝড় তুলছে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।

রঙের রাজত্বেও এসেছে পরিবর্তন
আগে যেখানে ফ্যাশন মানেই ছিল চকচকে বা গাঢ় রং, এখন সেই জায়গা নিয়েছে Earth Tone, Neutrals ও Pastels। ক্যাফে ব্রাউন, অলিভ গ্রিন, মাটির রং এইসব শেড এখন শহুরে ফ্যাশনের মূর্ত রূপ। প্যাস্টেল পিঙ্ক, মিন্ট গ্রিন, বাটার ইয়েলো স্নিগ্ধ, নরম রঙের আধিপত্য ছড়িয়ে পড়েছে র্যাম্প থেকে ইনস্টাগ্রাম অবধি।
স্টাইল শুধু পোশাকে নয়: অ্যাকসেসরিজও ট্রেন্ড-সেটার
Mini Bags & Crossbody Pouch: ছোট ব্যাগ, বড়ো স্টেটমেন্ট।
Chunky Sneakers & Combat Boots: ফ্যাশনের সঙ্গে ফাংশন রাস্তায় হেঁটে চলাও সহজ।
Statement Earrings: রুপার বড়ো দুল বা হাতের তৈরি পোড়ামাটির গয়না গ্রামীন ছোঁয়াও আধুনিক লুকে যুক্ত হচ্ছে।
Bucket Hats & Headscarves: ফ্যাশনের পাশাপাশি সান প্রোটেকশন, দুই-ই একসঙ্গে।

র্যাম্পের বাইরেও এখন ফ্যাশন ছড়িয়ে পড়ছে ইনস্টাগ্রামের রিল, ইউটিউব লুকবুক, এবং Pinterest moodboard-এ। ইনফ্লুয়েন্সাররাই আজ ফ্যাশন ট্রেন্ডের মুখ। তাঁরা নিজের মতো করে সাজেন, সেটাই ফলো করে হাজার হাজার মানুষ। এখন আর ডিজাইনার নাম নয়, “real people in real clothes” হচ্ছে ফ্যাশনের আসল মুখ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা ফ্যাশন এখন কাউকে অনুকরণ করার বিষয় নয়। নিজের মতো করে মিশিয়ে নেওয়া, পুরনোকে নতুনভাবে তুলে ধরা, বা একেবারে সাদামাটা কিছুকে কনফিডেন্স দিয়ে ক্যারি করাটাই আজকের ট্রেন্ড।

যেমন:
পুরোনো শাড়িকে বানিয়ে নেওয়া লং স্কার্ট
দাদার পুরোনো পাঞ্জাবি দিয়ে ওভারশার্ট
ধুপধাপে না গিয়ে সাদামাটা কুর্তি ও ফ্ল্যাট জুতোতেই রাজকীয় লুক
আজকের ফ্যাশন মানে র্যাম্পের আলো নয়, রাস্তার বাস্তবতা। সে এক অদ্ভুত মেলবন্ধন স্টাইল আর সাদামাটা স্বাচ্ছন্দ্যের, আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের। ফ্যাশন এখন ঘরে ঘরে, শহরের রাস্তায়, কলেজের করিডরে, কফি শপে বা ট্রেনের জানালার ধারে সবার মধ্যেই। আর তাই, র্যাম্প থেকে রাস্তায় যে ফ্যাশনের পথ, তাতে হাঁটছেন আমরা সবাই নিজের মতো করে, নিজের ছন্দে।

বাহারি নোনতা– স্বাদে, স্মৃতিতে ও সংস্কৃতিতে
নোনতা শব্দটা শুনলেই যেন কানে বাজে চায়ের কাপের পাশে রাখা খুস্কুসে নিমকির শব্দ, কিংবা বৃষ্টিভেজা বিকেলে পেঁয়াজির ঘ্রাণ। মিষ্টির দেশে জন্ম নিয়েও, বাঙালির হৃদয়ে নোনতার আসন কিন্তু একেবারে আপন। খিদের চটজলদি উপশম হোক বা অতিথি আপ্যায়নের বাহারি আয়োজন নোনতার ব্যবহার বহুপ্রাচীন, বহুরকম এবং বহুস্বাদের।

এই সংকলনে আমরা তুলে ধরতে চলেছি সেই চিরচেনা, চিরআপন, আর এখন আবার নতুন করে আবিষ্কৃত 'নোনতা' রান্নার গল্প। এখানে আছে মা-ঠাকুমার পুরনো রেসিপি, আছে নতুন প্রজন্মের হেলদি সংস্করণ, আর আছে গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ মাখানো কিছু অনন্য রান্নার ধারা। সিঙ্গারা, পেঁয়াজি, কাটলেট, ঘুগনি, ঝালমুড়ি কিংবা আলুর চপ প্রতিটি পদ একেকটি স্বাদের গল্প বলে। কখনও তা স্মৃতির পাতা থেকে উঠে আসে, কখনও আধুনিক শহুরে কিচেন থেকে।
এই সংকলন শুধু রান্নার রেসিপির তালিকা নয় এ এক স্বাদের যাত্রা, যেখানে প্রতিটি পদ মনে করিয়ে দেয় বাঙালির অন্তরের সম্পর্ক, ঘরোয়া পরিবেশ আর আন্তরিকতার রন্ধনসংস্কৃতি। চলুন, এই বাহারি নোনতার জগতে পা রেখে আমরা আবার খুঁজে পাই হারিয়ে যাওয়া সেই চেনা স্বাদ, ঘরোয়া ভালবাসা আর বৈচিত্র্যের মেলবন্ধন।

মাংসের সিঙ্গারা
চায়ের কাপ, বিকেলের আড্ডা আর ঝাল-মশলাদার মাংসের সিঙ্গারা এর চেয়ে জমজমাট কম্বিনেশন আর কী হতে পারে! যেখানে সাধারণত সিঙ্গারার পুর হয় আলু বা সবজি দিয়ে, সেখানে মাংসের সিঙ্গারা একদম আলাদা। বাইরে খাসা, ভেতরে ঝরঝরে কষানো মাংস এক কামড়েই যেন পরিপূর্ণ তৃপ্তি। পুজো, অতিথি আপ্যায়ন কিংবা মন খারাপের বিকেল মাংসের সিঙ্গারা মানেই খুশির ছোঁয়া।
কী কী লাগবে
🔸 পুরের জন্য:
কিমা (খাসি বা মুরগির) – ২৫০ গ্রাম
পেঁয়াজ – ১টি (মিহি কুচি)
আদা-রসুন বাটা – ১ টেবিল চামচ
কাঁচা লঙ্কা – ১–২টি (কুচি করা)
Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices গরম মসলা গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
নুন – স্বাদমতো
Shalimar's সরষের তেল – ২ টেবিল চামচ
ধনে পাতা – সামান্য (কুচি)
🔸 ময়দার খামির:
ময়দা – ২ কাপ
Shalimar's soyabean তেল বা ঘি – ২ টেবিল চামচ
নুন – ১ চিমটে
জল – প্রয়োজন মতো

কীভাবে বানাবেন
🔹 পুর তৈরি:
কড়াইয়ে তেল গরম করে পেঁয়াজ ভাজুন।
তাতে আদা-রসুন বাটা, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে কষান।
এরপর কিমা, ধনে-জিরে গুঁড়ো ও নুন দিয়ে ৮–১০ মিনিট কষান।
জল শুকিয়ে গেলে গরম মসলা ও ধনে পাতা দিয়ে ঠান্ডা করুন।
🔹 খামির তৈরি:
ময়দার মধ্যে নুন ও তেল মিশিয়ে অল্প জল দিয়ে মেখে একটু শক্ত ডো বানান।
ঢেকে ২০ মিনিট রেখে দিন।
🔹 সিঙ্গারা বানানো:
ডো থেকে লেচি কেটে পাতলা বেলে নিন, মাঝখানে কেটে দুটি অর্ধচন্দ্র বানান।
একপাশে কিমার পুর দিয়ে অন্যপাশ মুড়ে কোণের মতো করে জোড়া দিন।
সবগুলো বানিয়ে গরম তেলে হালকা আঁচে সোনালি করে ভাজুন।
গরম গরম মাংসের সিঙ্গারা পরিবেশন করুন টক চাটনি বা ঝাল কসুন্দি সঙ্গে।

খাস্তা কচুরি
ঝরঝরে, খাস্তা বাইরের খোল আর মশলাদার পুর, কচুরি যেন শুধু খাবার নয়, একরাশ সুখের স্মৃতি।
কী কী লাগবে
🔸 ময়দার খামিরের জন্য:
ময়দা – ২ কাপ
ঘি বা Shalimar's soyabean তেল – ৩ টেবিল চামচ
নুন – ১/২ চা চামচ
জল – প্রয়োজন মতো (নরম খামিরের জন্য)
🔸 পুরের জন্য:
ডাল – ১/২ কাপ (ভিজিয়ে বেটে নেওয়া)
আদা কুচি – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spicesশুকনো লঙ্কা গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices হিং – এক চিমটে
লবণ – স্বাদমতো
Shalimar's Mustard তেল – ১ টেবিল চামচ (পুর ভাজার জন্য)

কীভাবে বানাবেন
🔹 খামির তৈরি:
ময়দার মধ্যে নুন ও ঘি দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন যাতে গুঁড়ো ময়দা চটকে যায়।
অল্প অল্প করে জল দিয়ে নরম ও মসৃণ খামির মেখে রাখুন। কাপড় ঢেকে ৩০ মিনিট রেখে দিন।
🔹 পুর বানানো:
কড়াইয়ে তেল গরম করে হিং ও আদা কুচি দিন।
বাটা ডাল, জিরে গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো, নুন দিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে শুকনো পুর তৈরি করুন।
ঠান্ডা করে রাখুন।
🔹 কচুরি বানানো:
খামির থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে বল বানান।
প্রতিটি বল হালকা বেলে পুর ভরে মুড়ে আবার বলের মতো করে নিন।
এবার ধীরে ধীরে বেলে দিন – খুব পাতলা নয়, মাঝারি মোটা রাখুন।
গরম তেলে একে একে কচুরিগুলো ছাড়ুন। মিডিয়াম আঁচে ফুলে উঠা ও দুইপিঠ সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
খাস্তা কচুরি পরিবেশন করুন আলুর ঝোল সঙ্গে। পাশে টক চাটনি থাকলে একদম জমে যাবে।

তিনকোনা নিমকি
বিকেলের আড্ডা, অতিথি আপ্যায়ন বা পুজোর নকশি পাতে – তিনকোনা নিমকি তার ঝরঝরে উপস্থিতি দিয়ে মন জয় করে নেয়।
কী কী লাগবে
ময়দা – ২ কাপ
কালোজিরে – ১/২ চা চামচ
নুন – স্বাদমতো
ঘি বা সাদা তেল – ২ টেবিল চামচ (ময়দায় মিশানোর জন্য)
জল – প্রয়োজনমতো (খামির মাখার জন্য)
ভাজার জন্য Shalimar's Sunflower তেল – প্রয়োজন মতো

কীভাবে বানাবেন
🔹 খামির তৈরি:
ময়দার মধ্যে নুন, কালোজিরে ও ঘি দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন যাতে মোয়া তৈরি হয়।
তারপর অল্প অল্প করে জল দিয়ে শক্ত খামির মেখে ঢেকে ২০–৩০ মিনিট রেখে দিন।
🔹 তিনকোনা নিমকি বানানো:
খামির থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে পাতলা করে বেলে নিন।
বেলা রুটিগুলো মাঝখান থেকে দুইভাগ করে একেকটা আধবৃত্ত করুন।
আধবৃত্তের এক পাশ ভাঁজ করে ত্রিভুজের মতো আকৃতি দিন (একটি কোণ তৈরি করে দুই পাশ ভালোভাবে জোড়া দিন যাতে খুলে না যায়)।
কাঁটার চামচ দিয়ে মাঝখানে হালকা ফুটো করে দিন, যাতে ভাজার সময় ফুলে না ওঠে।
🔹 ভাজা:
কড়াইয়ে তেল গরম করে মিডিয়াম আঁচে নিমকি বাদামি ও খাস্তা হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
টিস্যু পেপারে তুলে ঠান্ডা করে রাখুন।
তিনকোনা নিমকি পরিবেশন করুন চায়ের সঙ্গে বা ঘরে তৈরি কাসুন্দি-আচার দিয়েও খেতে চমৎকার। লম্বা দিনগুলোতে একমুঠো নিমকি মানেই মন ভালো!

ছোলে বাটুরে
মশলাদার ছোলে আর ফুলকো, খাস্তা বাটুরে – শুধু খাওয়া নয়, এ এক উৎসবের অভিজ্ঞতা।
কী কী লাগবে
🔸 ছোলে (ছোলা) বানানোর জন্য:
কাবুলি ছোলা – ১ কাপ (রাতভর ভিজিয়ে রাখা)
পেঁয়াজ – ১টি (কুচি)
আদা-রসুন বাটা – ১ টেবিল চামচ
টমেটো – ১টি (পেস্ট বা কুচি)
Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো – ১ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices চাট মশলা – ১/২ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices গরম মসলা – ১/২ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices হলুদ, লঙ্কা গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ করে
Shalimar's Chef Spices আমচুর গুঁড়ো / লেবুর রস – ১ চা চামচ
নুন – স্বাদমতো
তেল – ২ টেবিল চামচ
কাঁচা লঙ্কা ও ধনে পাতা – সাজানোর জন্য
🔸 বাটুরে বানানোর জন্য:
ময়দা – ২ কাপ
টক দই – ১/২ কাপ
বেকিং সোডা – ১/৪ চা চামচ
চিনি – ১ চা চামচ
লবণ – স্বাদমতো
Shalimar's sunflower তেল – ১ টেবিল চামচ (ময়দায় মিশানোর জন্য)
জল – প্রয়োজন মতো
ভাজার জন্য Shalimar's sunflower তেল

কীভাবে বানাবেন
🔹 ছোলে রান্না:
ভিজিয়ে রাখা ছোলা প্রেসার কুকারে ৪–৫ সিটি দিয়ে সিদ্ধ করুন।
কড়াইয়ে তেল গরম করে পেঁয়াজ ভাজুন, তারপর আদা-রসুন বাটা দিয়ে কষান।
টমেটো, সব গুঁড়ো মশলা দিয়ে ভালো করে কষান যতক্ষণ না তেল ছাড়ে।
সিদ্ধ ছোলা দিয়ে দিন, সামান্য জল দিয়ে কষিয়ে নিন। শেষে চাট মশলা, আমচুর গুঁড়ো, গরম মসলা দিন।
🔹 বাটুরে বানানো:
ময়দার সঙ্গে দই, বেকিং সোডা, চিনি, লবণ ও তেল দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে জল দিয়ে শক্ত খামির বানান।
ঢেকে ২ ঘণ্টা রেখে দিন।
লেচি কেটে বেলে নিন ও গরম তেলে ফুলিয়ে ভাজুন।
ছোলে ও বাটুরে গরম গরম পরিবেশন করুন পেঁয়াজ, লেবু আর কাঁচা লঙ্কা দিয়ে।চাইলে সঙ্গে রাখতে পারেন মিষ্টি তেঁতুল চাটনি।

ব্রেড পকোড়া
বাইরে খাসা, ভিতরে নরম আলুর পুর – এক কাপ চায়ের সঙ্গে এই ক্লাসিক স্ট্রিট ফুড মন ভালো করার জন্য যথেষ্ট!
কী কী লাগবে
🔸 বাইরের লেয়ারের জন্য:
বেসন – ১ কাপ
Shalimar's Chef Spices হলুদ – ১/৪ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
আজওয়াইন – ১/২ চা চামচ
বেকিং সোডা – এক চিমটে (ঐচ্ছিক, খাস্তা করার জন্য)
নুন – স্বাদমতো
জল – প্রয়োজন মতো (মিশ্রণ তৈরি করতে)
🔸 পুরের জন্য (আলু পুর):
সেদ্ধ আলু – ২টি (মিহি করে চোখানো)
আদা কুচি – ১ চা চামচ
কাঁচা লঙ্কা কুচি – ১ চা চামচ
ধনে পাতা কুচি – ১ চা চামচ
ভাজা জিরে গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো – ১/২ চা চামচ
নুন – স্বাদমতো
Shalimar's Chef Spices চাট মশলা – ১/২ চা চামচ (ঐচ্ছিক)
🔸 অন্যান্য:
পাউরুটি – ৪টি (চকচকে করে মাঝখান থেকে কাটা)
ভাজার জন্য Shalimar's sunflower তেল

কীভাবে বানাবেন
1️⃣ আলুর পুর তৈরি করুন:
একটি বাটিতে সেদ্ধ আলু চোখান। তাতে আদা, কাঁচা লঙ্কা, ধনে পাতা, লঙ্কা গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, চাট মশলা ও নুন মিশিয়ে ভালো করে মেখে রাখুন।
2️⃣ বেসনের মিশ্রণ বানান:
বেসনের সঙ্গে হলুদ, লঙ্কা গুঁড়ো, আজওয়াইন, নুন, বেকিং সোডা দিয়ে অল্প অল্প করে জল মিশিয়ে ঘন ব্যাটার তৈরি করুন। ব্যাটার যেন খুব পাতলা না হয়।
3️⃣ ব্রেড পকোড়া তৈরি করুন:
পাউরুটির এক টুকরোয় আলুর পুর দিয়ে আরেকটি টুকরো দিয়ে ঢেকে দিন (স্যান্ডউইচের মতো)। মাঝখান থেকে ত্রিভুজ বা আয়তক্ষেত্র করে কেটে নিন।প্রতিটি টুকরো বেসনের ব্যাটারে ডুবিয়ে গরম তেলে সোনালি করে ভাজুন।
টমেটো সস, ধনে পাতার চাটনি বা মিষ্টি তেঁতুল চাটনির সঙ্গে গরম গরম ব্রেড পকোড়া পরিবেশন করুন।

নাচোস
ঝাল-মশলাদার, ক্রিস্পি ও চিজি – নাচোস শুধু খাবার নয়, এক মজাদার অভিজ্ঞতা।
কী কী লাগবে
🔸 নাচোস:
প্যাকেটজাত কর্ন নাচোস (তরতরিয়ে পাওয়া যায়, বিভিন্ন ফ্লেভারে)
কর্নফ্লাওয়ার – ১ কাপ
গমের আটা – ১/২ কাপ
নুন – ১/২ চা চামচ
জল – প্রয়োজন মতো
ভাজার জন্য Shalimar's sunflower তেল
🔸 টপিং / সার্ভ করার জন্য:
গ্রেট করা চিজ – ১/২ কাপ
টমেটো – ১টি (কুচি)
কাঁচা লঙ্কা বা জালাপেনো – ১ চা চামচ (চেরা)
পেঁয়াজ – ১টি (কুচি)
সেদ্ধ রাজমা বা কিডনি বিনস – ১/২ কাপ
টক দই / সাওর ক্রিম – ২ টেবিল চামচ (ঐচ্ছিক)
ধনে পাতা – কুচি (সাজানোর জন্য)
Shalimar's Chef Spices চাট মশলা / লেবুর রস – পরিমাণমতো
কীভাবে বানাবেন
কর্নফ্লাওয়ার ও গমের আটা, নুন মিশিয়ে জল দিয়ে শক্ত খামির মেখে নিন।
পাতলা করে বেলে, ত্রিভুজাকারে কেটে গরম তেলে ভাজুন।
ক্রিস্পি হলে তুলে রাখুন।
পরিবেশন টিপস:
একটি প্লেটে নাচোস চিপস ছড়িয়ে দিন।
তার উপর ছড়িয়ে দিন টমেটো, পেঁয়াজ, রাজমা, জালাপেনো বা কাঁচা লঙ্কা।
উপরে দিন চিজ (মাইক্রোওয়েভে ৩০ সেকেন্ড গরম করে গলিয়ে নিতে পারেন)।
শেষে ছড়িয়ে দিন টক দই/সাওর ক্রিম, ধনে পাতা, আর হালকা চাট মশলা।
ফাদার ইমানুয়েল
সন্মাত্রানন্দ

"ঘষে মেজে রূপ আর ধরে বেঁধে পিরিত কি হয়? হয় না। যার সঙ্গে পিরিত হয়, তার সঙ্গেই। হয়। কার সঙ্গে হয়, কখন হয়, কীভাবে হয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর কেউ জানে না। পিরিত বা প্রীতি বা প্রেম নিয়ে বন্ধুবিধ তত্ত্বনির্ণয় বেকার। কারণ ও একটা আকস্মিক, অব্যাখ্যাত ব্যাপার। হওয়ার হলে হয়, না হওয়ার হলে হয় না। কেউ জানে না কেন হয়, কেমনে হয়। বুদ্ধির চৌষট্টি খোপের শতরজে অনুরাগ ঘটনাটি এসে কখনও বসে না। অথচ ঘটলে ও ঘটনা, ব্যাখ্যা করবার জন্য অনেক মাছি ছুটে আসে।
সে যা হোক, বলবার কথা এটাই যে, ফাদার ইমানুয়েল ছিলেন আমার সেই পিরিতের লোক। তবে শুধু আমার একারই নয়। আমি, মলয়, প্রিয়াংশু, ওসমান-আমাদের চারজনেরই ভারি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার মানুষ ছিলেন ফাদার ইমানুয়েল। আমাদের তখন বয়েস কম; হবে এই পঁচিশ কি ছাব্বিশ। চেন্নাইতে চাকরি করতে এসে আমাদের চার বাঙালির দেখা। চারজন চার জায়গায় চাকরি করি। আমি চেন্নাইতে এসেছিলাম লাইব্রেরিয়ানের কাজ নিয়ে। তা কোথাও তো একটা থাকতে হবে। হোটেলে আর থাকব কদ্দিন? মাথাগোঁজার একটা ঠাঁই চাই। সেই ঠাঁই যখন খুঁজছি, তখনই বাকি তিন মূর্তির সঙ্গে দেখা হল। তিনের সঙ্গে এক যোগ দিয়ে হলাম চার; বিচ রোডের এক ভাড়াবাড়িতে চার মূর্তিতে মিলে মেস করে থাকতে শুরু করে দিলাম।
রান্নাবান্না বাজারহাট নিজেদের মধ্যেই ভাগাভাগি করে চালাতে লাগলাম। ওসব কাজের জন্য অন্য লোক রাখার মতো সামর্থ্যও ছিল না কারও। যা হোক দুটি ভাতে ভাত নাকেমুখে গুঁজে দশটার মধ্যে বেরিয়ে পড়ি চারজনাই অফিসে। সারাদিন অফিসে কাজকাম সেরে সকলে ফিরে এসে আবার মেসবাড়িতে জুটতে সেই বিকেল সাড়ে পাঁচটা। চা-ফা খেয়ে, তাস পিটিয়ে, দাবা খেলে কাঁহাতক আর ঘরবন্দী হয়ে বসে থাকা যায়? অতএব এদিক-সেদিক বেরিয়ে পড়তাম চেন্নাই শহর হাঁটকাতে। আমাদের চোখে সে-শহর তখনও আনকোরা; স্নেক-পার্ক, কপালীশ্বর, পার্থসারথি, মেরিনা বিচ, আইস হাউস, পাখিরালয়। ইত্যাদি যা কিছু দর্শনীয় ছিল, মাসখানেকের মধ্যে সেসব দেখাশোনা শেষ। তখন একদিন বিকেলে বসে বসে ভাবছিলাম, কোথায় যাওয়া যায়? বিকেল-সন্ধে কাটানোর কী উপায়?

প্রিয়াংশু আমাদের মধ্যে বয়েসে সামান্য বড়ো। আমরা কেউ কোনো উপায় বাতলাতে পারছি না দেখে, সে-ই প্রথম মুখ খুলল। বলল, 'স্যান্থোম তো যাইনি আমরা এখনও। চলো, যাবে আজকে?'
ওসমান জিজ্ঞেস করল, 'স্যান্থোম মানে কি ওই সেন্ট থমাস চার্চ? মেরিনা বিচের কাছেই ওই যে খুব পুরোনো
গির্জা?
প্রিয়াংশু জবাব দিল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ। যাহা সেন্ট গমাস, তাহাই স্যান্ধোন। খুব পুরোনো বলেই শুনেছি।
প্রিয়াংশুর কথায় সায় দিয়ে মলয় বলল, 'হবে না? যিশুর প্রথম শিষ্যের একজন যে এই সেন্ট থমাস। তিনিছ ভারতে এসে এই ভাঙটা স্থাপন করেন।
আমি বললাম, 'তা নিয়ে কিন্তু বিতর্ক আছে, মলয়। কেউ কেউ তোমার কথা সমর্থন করেন। কিন্তু কেউ কেউ আবার বলেন, এ সেন্ট থমাস যিশুর সেই শিষ্য থমাস নন। ইনি একজন সাধারণ ব্যবসায়ী ছিলেন।'
আমার কথার প্রতিবাদ করে মলয় কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তাতে বকাবাদ্য, তর্কাতর্কি আরম্ভ হয়ে যায় দেখে আমাদের দুজনকেই থামিয়ে দিয়ে দুহাত তুলে প্রিয়াংশু বলল, 'ব্যস, ব্যস। এ থমাস সেই থমাস হোক আর না হোক, চার্চটা যে অনেক পুরোনো, সেটাতো তোমরা মানবে? এখন বলো, এই ঘরে বসে সারা সন্ধে ভেরেন্ডা ভাজবে, নাকি আমার সঙ্গে স্যান্থোম যাবে তোমরা? কী মতলব?'

বিচ রোডের মেসবাড়িতে তালা ঝুলিয়ে বাসে করে স্যান্থোম পৌঁছাতে সময় বেশি লাগল না। গির্জার চত্বরে ঢুকতেই দেখলাম, নীল নিরস্ত্র আকাশে স্যান্থোম
চার্চের শাঙ্কব চূড়া মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। গথিক স্থাপত্যরীতিতে গ্রানাইট পাথরে নির্মিত চার্চটির প্রাঙ্গণ বেজায় পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। ভেতরে গিয়ে দেখলাম, গির্জার অর্ধগোলাকার ছাদটা কত যে উপরে। ঝিলিমিলি কাচের জানালায় রঙিন সব ছবি আঁকা- যিশুজীবনের নানা পর্বের ঘটনা সেসব ছবির বিষয়বস্তু। দরজা দিয়ে ঢুকেই প্রথমে বাঁদিকে কনফেশন বক্স। তারপর দুপাশে সারি সারি মেহগনি কাঠের হাতলওলা বেঞ্চ। দুই সারির মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গিয়ে সামনে পালপিট; সেখানে মাস কন্ডাক্ট করা হয়। এরই ডানদিকে কাচের ঘেরাটোপে আওয়ার লেডি অব মায়লাপুর' অর্থাৎ শিশু যিশু কোলে মেরিজননীর মূর্তি। পালপিটের পেছনে দুপাশে দুহাত ছড়ানো যিশুখ্রিস্টের প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতিটির দুপাশে আবার দুটি পাথরের তৈরি ময়ূর। ময়ূর দুটো একটু অস্বাভাবিক লাগল ক্যাথলিক চার্চের পক্ষে। শুনলাম, এই জায়গাটার পুরোনো নাম মায়লাপুর; তামিল ভাষায় 'ময়ীল' মানে ময়ূর। তারই
স্মারক হিসেবে যিশুর দুপাশে ময়ূরের আয়োজন। ইতিহাস যাই হোক, গির্জাটি যে বহুত পুরোনো, তা এর গঠনকাঠামো, সাজসরঞ্জাম দেখেই মালুম হয়।
ঘুরেফিরে সব দেখেশুনে আমরা চারজন বেরিয়ে আসছি, এমন সময় দেখি, বছর চল্লিশেকের পাদ্রিসুলভ সাদা জোব্বা, গলায় ক্রশ পরা একজন ফাদার গেটের কাছে দাঁড়িয়ে। আমাদের দিকে তাকিয়ে তিনি কেন জানি মৃদু হাসলেন।

আমরাও ফিরে হাসলাম। ধীরে ধীরে পরিচয়-বিনিময় হল।
তাঁর উচ্চারণের টান থেকে বুঝতে অসুবিধে হল না যে, তিনি কেরলের লোক অর্থাৎ কিনা মালয়ালি। নাম ইমানুয়েল। বছর দশেক হল, স্যান্থোম চার্চে আছেন।
আমরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে চেন্নাইতে চাকরিসূত্রে এসেছি শুনে ফাদার আমাদের খুব উৎসাহ দিলেন। বললেন, 'এই তো বয়েস। এখনই তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে সারা দেশটা ঘুরে নিতে হবে। দ্যাখো না, আমিও ঘর ছাড়লাম, কিন্তু কেমন এই চেন্নাইতেই দশটি বছর আটকে গেছি। ইউ অল আর ইয়ং মেন, ডোন্ট স্ট্যাগনেট ইন দ্য সেম জব হিয়ার অ্যাট চেন্নাই। কিছুদিন এখানে চাকরি করে আবার অন্য কোথাও চলে যাও। নানা জায়গা দ্যাখো। নানা লোকের সঙ্গে মেশো।' তারপরেই সেই 'গড়ানে পাথরে শ্যাওলা জমে না' প্রবাদটির চিরপরিচিত প্রয়োগ।
কে কোথায় কী কাজ করি, সব এক এক করে জানতে চাইলেন ফাদার। আমরা সবাই একত্রে মেসে থাকি শুনে বেশ খুশি হলেন। অফিস থেকে ফিরেই স্যান্থোম চার্চ দেখতে এসেছি শুনে তিনি বললেন, 'দেন ইউ মাস্ট বি ভেরি হাংরি। কখন বেরিয়েছিলে খেয়ে মেসবাড়ি থেকে অফিসে? দশটায়? দুপুরে কিছু খেয়েছ? সেও তো অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। দেন কাম উইথ মি। চলো, চলো, আমার সঙ্গে চলো।'
প্রিয়াংশু বলল, 'ফাদার! আমরা তো একখুনি মেসে ফিরে হালকা কিছু খেয়ে নিয়ে রান্না চাপাব। আপনি ব্যস্ত হবেন না।'
বাকি তিনজন আমরাও প্রিয়াংশুর কথায় সায় দিলাম। কিন্তু কোনো ওজর-আপত্তিতে কান না দিয়ে তিনি আমাদের মনাস্ট্রির দিকে টেনে নিয়ে চললেন। মনাস্ট্রির বাইরের দিকে ছোটো একটি কামরায় একটা ডাইনিং টেবলের চারপাশে গদি-অটা কতগুলো চেয়ার পাতা। ফাদার আমাদের চেয়ারে বসতে বলে সম্ভবত কিচেনের দিকে গেলেন। কফি এল, স্যান্ডউইচ এল, ফ্রুটজ্যাম এল, খোসা-ছাড়ানো কলা এল, আর এল কতগুলো ডিমসেদ্ধ। জলখাবারটা জমে গেল দিব্যি। ফাদার কিন্তু নিজে শুধু এককাপ চা আর কয়েকটা বিস্কুট নিলেন। অফিস-ফেরত আমাদের পেট জ্বলছিল সত্যিই। কাজেই জলখাবারের সদ্ব্যবহার করতে মোটেই বেশি সময় লাগল না আমাদের। তবু এরই মধ্যে ফাদার ইমানুয়েল টুকটাক কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। বাড়িতে কে কে আছে, ছুটিছাটা কেমন পাই আমরা, ইত্যাদি ছোটোখাটো প্রশ্ন। প্রথম আলাপটা এভাবেই হয়েছিল ফাদার ইমানুয়েলের সঙ্গে। সেদিন মেসে ফিরতে ফিরতে আমরা ফাদারের সদাশয়তা, আন্তরিকতা নিয়ে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলাম, মনে আছে।
সেই প্রথম দিনই ফিরে আসবার আগে গির্জার ফটক অবধি পৌঁছে দিতে এসে ফাদার ইমানুয়েল আমাদের বলেছিলেন, আমরা যেন এভাবেই বিকেলের দিকে চার্চে আসাযাওয়া করি। তিনি আগেভাগেই নিমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলেন।
আজ একথা লিখতে লজ্জাই লাগছে যে, সেদিন রাত্রে মেসে ফিরে এসে রাতের খাওয়াদাওয়ার পরে আমরা চারজন কিন্তু বেশ কিছুটা সন্দিহানই হয়ে পড়েছিলাম ফাদার ইমানুয়েলের এ জাতীয় অযাচিত আপ্যায়নের নিহিত কারণ খুঁজতে গিয়ে।
আমাদের মধ্যে কেউ কেউ এসবের পেছনে কোনো অভিসছি আছে কি না, ভাবতে বসেছিল। তেমন ভাবাটাও খুব অস্বাভাবিং নয়, কেননা খ্রিশ্চান পাদ্রিদের কনভার্ট করার চেষ্টা ভুবনবিসিং, হয়তো এভাবেই তাঁরা তরুণদের প্রভাবিত করে শেষে প্রিলিব্য ছত্রছায়ায় টেনে নেন। তবু কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আমরা যেত। পৌঁছোতে পারিনি। শেষে, ব্যাপারটাকে আরও কাল্টিভেট কর হবে, এই সিদ্ধান্ত টেনে যে যার বিছানায় ঘুমোতে গেছিলাম কয়েকদিনের মধ্যেই এক বিকেলে আমরা চারমূর্তি আবার স্যাঙ্কোম চার্চে হানা দিলাম। সেদিনও দেখা হল ফাদারের সভতিনি আমাদের সঙ্গে বেশ অন্তরঙ্গ গল্পোগাছা করলেন সেদি মনাস্ট্রির লাগোয়া একটা হলঘরে সেদিন তিনি আমাদের নিয়ে গেছিলেন। বেশ আলোটালো জ্বালা ঝলমলে হলঘর। তার একদিকে একটা টেবিলটেনিসের বোর্ড পাতা। ফাদার ইমানুজে জিজ্ঞেস করলেন আমাদের, 'টিটি আসে? খেলবো
এতদিন পরে টিটি-বোর্ড দেখে আমরা তো বেজায় খুশি। সেই কবে খেলেছি কলেজলাইফে। ফাদারের প্রস্তাবে আমরা সারছে সম্মতি দিলাম। দেখলাম, ফাদারের উৎসাহ আমাদের দেকের বেশি। খেলতে নেমে বুঝলাম, আরে বাবা। ফাদার ইমানুয়েল তো অত্যন্ত দক্ষ খেলুড়ে। একদিকে আমি আর মলয়, অন্যদিরে তিনি আর ওসমান। কখনও বা আরেকদিকে তিনি আর প্রিয়াগ একেবারে বলে বলে আমাদের হারাতে লাগলেন।
বেশ রোখ চেপে গেল। বারবার সাইড চেঞ্জ করে খেলতে জোয় সারাদিনের অফিসের ক্লান্তিটাও যেন ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেল। খুব ভালো লেগেছিল সেদিন। আর সেদিনও খেলাধুলার পর বেদ। জম্পেশ রিফ্রেশমেন্টস।
স্যান্থোম চার্চের মনাস্ট্রি বেশ বড়ো। মনাস্ট্রির পাশেই একটা সেকেন্ডারি স্কুল চালান এঁরা। সেই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, ছাত্র-ছাত্রীদের জন্যেই এসব ইন্ডোর গেমস, বাইরের মাঠে ভলি বাস্কেট বল, ব্যাডমিন্টন প্রভৃতি আউটডোর গেমসের ব্যবস্থা আছে। আমরা অবশ্য যখন যেতাম, তখন স্কুল ছুটি হয়ে যেত। তার ফলেই এই সব কটা খেলা ফাদার ইমানুয়েলের দৌলতে তখন আমাদের!
মনাস্ট্রিতে সাকুল্যে পাঁচ-ছয়জন মাত্র পাত্রি বাস করেন। ফাদার ইমানুয়েলের তুলনায় বাকিরা সকলেই বয়স্ক। এছাড়াও অন্যান অতিথিদের যাওয়াআসা আছে মনাস্ট্রিতে। আমার মনে হল, এঁদের মধ্যে ফাদার ইমানুয়েল যেন একটু একা পড়ে গেছেন। হয়তো সেই জন্যেই তিনি আমাদের সঙ্গে এতটা বন্ধুত্ব করেছেন। কথাটা আমি মেসে ফিরে অন্যদের বলেছিলাম। ওরা আমার কথ্য সায়ও দিল দেখলাম সবাই।
কিছুদিনের মধ্যেই প্রত্যহ বিকেলে স্যান্থোম চার্চে যাওয়া আমাদের। নিয়মিত রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেল। ফাদার ইমানুয়েল
আমাদের সঙ্গে কোনোদিন টিটি খেলতেন, কোনোদিন ব্যাডমিন্টন খেলতেন। খেলার পরে মাঠে বসেই গল্পগাছা করতেন আমাদের সঙ্গে। সেসব গল্পগাছা সাধারণ আড্ডা বলতে যা বোঝায়, তাই। আমরা ফাদারকে কোনোদিন ধর্মের কথা বলতেই শুনিনি। মনে হত, তিনি আমাদের থেকে সামান্য বয়স্ক একজন বন্ধু ছাড়া আর গল্প
কিছুই নন। তবে তিনি আমাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করলেও আমরা কিন্তু কেউ কোনোদিন সৌজন্যের সীমা ছাড়াইনি। যতই হোক, তিনি ক্যাথলিক সন্ন্যাসী। আর আমরা সাধারণ চাকুরীজীবী ফুর্তিবাজ যুবক।
কখনও কখনও বিশেষ কোনো উপলক্ষ্যে আমরা ফাদারের জন্যে এটা ওটা উপহার নিয়ে যেতাম। খুবই সাধারণ কিছু। উপহার নিতে ফাদার আপত্তি করতেন। তবে কখনই একেবারে ফিরিয়ে দেননি আমাদের। ধীরে ধীরে আমাদের বন্ধুত্ব, আমাদের ভালোবাসা গভীর হয়েছিল। মাঝে মাঝে আরেকজন বয়স্ক ফাদারকে দেখতাম আমরা। তিনি অবশ্য কখনই আমাদের সঙ্গে বান্ধিনিময় করেননি। ওই সৌজন্য-নমস্কার পর্যন্তই। এই বুড়ো ফাদারের কেমন যেন একটু রাগী রাগী চেহারা। ভাবলাম, নিশ্চয়ই এটা আমার মনের ভুলই হবে।
এই বয়স্ক পাদ্রিটির নাম ফাদার জেবেডি। ফাদার
ইমানুয়েল বলেছিলেন, জেবেডির অধীনেই তিনি স্যাছোমে আছেন। অর্থাৎ ফাদার জেবেডি হচ্ছেন ফাদার ইমানুয়েলের মেন্টর।
সাত-আট মাস পরের কথা। একদিন মনাস্ট্রিতে গিয়ে ফাদার ইমানুয়েলের সঙ্গে দেখা করে মনে হল আমাদের, তাঁর যেন সেদিন মনটা বিষণ্ণ। বললেন, শরীর খারাপ। সেদিন খেলাটেলা কিছুই হল না। এমনিই দু-চার কথা কয়ে ফাদার আমাদের বিদায় দিলেন। এই ব্যাপারটা মাঝে মাঝেই ঘটতে লাগল তারপর থেকে। বেশ ক-দিন দিব্যি আছেন ফাদার ইমানুয়েল। হাসছেন, খেলছেন, আড্ডা দিচ্ছেন। তারপর হঠাৎ একদিন মুখ ভার, চুপচাপ। দু-চার কথাবার্তার পরেই বিদায়।
ব্যাপারখানা কী? একদিন মেসে ফিরে প্রিয়াংশু বলল আমাদের, 'দ্যাখো, স্থির বিশ্বাস, ফাদার ইমানুয়েলের কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে।'
আমি আর মলয় দুজনেই হাঁ-হাঁ করে উঠলাম, 'ঝামেলা? কী ঝামেলা?'
ওসমান বলল, 'কী ঝামেলা, সে-কথা আর কী করে বলবে প্রিয়াংশু? কেউই কি আমরা জানি ওঁদের মনাস্ট্রির ভেতরের ব্যাপার? তবে যাই হোক, ফাদার ইমানুয়েলের ভালোমন্দ তেমন কিছু হলে সত্যিই খুব খারাপ লাগবে আমাদের।'
প্রিয়াংশু বলল, 'এগজ্যাক্টলি। ঠিক এই কথাটাই আমিও বলতে চাইছিলাম।'
আমার আর মলয়ের কিন্তু কথাটা বিশ্বাস হল না। খানিক তর্কাতর্কি করে সকলেই চুপ মেরে গেলাম।
কিছুদিন পর পোঙ্গল উৎসবের ছুটি। অফিস বন্ধ। সেদিন একটু আগেভাগেই স্যান্থোম চার্চে গেছি। মেরিনা বিচের বালি তখনও দিনের শেষ রোদ মেখে চিকচিক করছে। নিত্যদিনের মতই চার্চে একবার ঘুরেফিরে মনাস্ট্রির দিকে গেলাম। অন্যদিন ভিজিটরস রুমে ফাদার ইমানুয়েল আগে
থাকতেই বসে থাকতেন আমাদের জন্যে। সেদিন কিন্তু দেখলাম, তিনি সে-ঘরে নেই। ভিজিটরস রুম থেকে বেরিয়ে আমরা পায়ে পায়ে করিডোর দিয়ে ফিরে আসছি, হঠাৎ কীসের শব্দ পেয়ে প্রিয়াংশু ঠোঁটে আঙুল দিয়ে আমাদের চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়তে ইশারা করল। সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ে কান পেতে শুনবার চেষ্টা করলাম। করিডোরের একপাশে কাঠের পার্টিশনের ওদিকে দুজন মানুষের কথাবার্তা আমাদের শ্রুতিগোচর হল। একটু খেয়াল করতেই বুঝতে পারলাম, একটা কণ্ঠস্বর ফাদার জেবেডির। অন্যজন অবশ্যই ফাদার ইমানুয়েল। তাঁদের কথাবার্তা ইংরেজিতেই হচ্ছিল। এখানে অবশ্য বাংলাতেই কথাগুলো লিখলাম, দুয়েকটা কথা শুধু ইংরেজিতেই রাখছি।
'তুমি ঠিক কী স্থির করেছ বলো তো, ইমানুয়েল? তুমি কি
এখনও তোমার ভুল বুঝতে পারছ না?' জেবেডির গলা। ইমানুয়েল বললেন, 'না, বুঝতে পারছি না, ফাদার। সত্যিই বুঝতে পারছি না। আপনি কি আমাকে একটু বুঝিয়ে বলবেন?'
'অগণ্যবার বুঝিয়ে বলেছি, ইমানুয়েল, অগণ্যবার। এই
যে তুমি ওদের সঙ্গে রোজ এতটা করে সময় কাটাচ্ছ,
কেন? কী উদ্দেশ্য? প্রিচিং? মোটেই না। আমি জানি, মাস কন্ডাক্ট করা ছাড়া অন্য সময়ে তুমি আমাদের ধর্মের কথা, জিসাসের কথা কাউকে বলই না। তাহলে? ওদের সঙ্গে কথা বলে তুমি কি তোমার নিজের জন্যে স্পিরিচুয়াল ইন্সপিরেশন গ্যাদার করছ? দ্যাট টু ইজ ইম্পসিবল। একে তো ওরা আমাদের কমিউনিটির লোকই না, তার উপর দে আর জাস্ট ভ্যাগাবন্ড ইয়ং মেন। তোমাকে ইন্সপায়ার করার মতো কোনো গুণ ওদের নেই। ভালো করে ভেবে বলো তো, ইমানুয়েল, হোয়াটস ইয়োর পারপাস?' 'কিন্তু ফাদার। মানুষের সঙ্গে মানুষ মিশবে, তাতে কোনো-না-কোনো পারপাস কি থাকতেই হবে?'
'থাকতে হবে, ইমানুয়েল। যদি কোনো পারপাস না-ই থাকে, তাহলে আয়াম স্যরি টু সে, তুমি কিন্তু ইন্ডালজ করছ নিজেকে....!
ফাদার ইমানুয়েল সকাতরে বলে উঠলেন, 'ইন্ডালজ? মি? গুড হেভেন্স! তা কীসে আমি নিজেকে ইন্ডালজ করছি ফাদার?'
'তোমার অতীতের স্মৃতি... তুমি ছিলে কলেজ-লাইফে স্পোর্টস চ্যাম্পিয়ন। তোমার সেই দিনগুলোর প্রতি এখনও আসক্তি রয়ে গেছে। ওদের সঙ্গে মেশামিশি করে, খেলাধুলো করে তুমি মনে মনে তোমার সেই যৌবনের 'সেটা কি বিরাট কিছু অন্যায়, ফাদার?' দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাইছ। তাই নয় কি?'
'তুমি সাধারণ লে-ম্যান হলে বলতাম, অন্যায় নয়। কিন্তু তুমি তো মঙ্ক। অতীতের স্মৃতিচারণ একজন সন্ন্যাসীর পক্ষে অন্যায় না হলেও অনুচিত বই-কী। এই পথ দিয়েই
গল্প
তো আসবে যাবতীয় প্রলোভন... দ্যাখো, ইমানুয়েল, আমি তোমার ওয়েল-উইশার। তোমার ভালোর জন্যেই বলছি। তুমি এই ছেলেগুলোর কম্প্যানি পরিত্যাগ করো।'
কিন্তু ফাদার। একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। মঙ্কের কোনো ভাও বা প্রতিজ্ঞা আমি কি ভেঙেছি এদের সঙ্গে দিশে? চেস্টিটি? পিওরিটি? ভেঙেছি কিছু?'
জেবেডি বলে উঠলেন মাঝপথেই, আর ওবিডিয়েন্স? প্রবিডিয়েন্সের কী হবে? আমি তোমার সিনিয়র। আমি তোমাকে বারবার নিষেধ করছি, এদের সঙ্গে মিশতে। অথচ আমার কথায় কান দিচ্ছ তুমি? এটা ডিস-ওবিডিয়েন্স নয়? হোয়াট দ্য হেল ইউ আর ক্রিয়েটিং অ্যারাউন্ড ইয়োরসেলফ। আই ডোন্ট লাইক ইয়োর হবনবস উইদ দিজ রেয়েড হেদেন ফেলোজা'
আপনি আমার বন্ধুদের সম্পর্কে এ জাতীয় কথা বলতে পারেন না, ফাদার।' ইমানুয়েলের কন্ঠস্বর খর প্রতিবাদে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। কিন্তু সেকথার উত্তরে কী বললেন জেবেডি, সেসব আর শুনতে দিল না প্রিয়াংশু। কনুইয়ের গুঁতো মেরে বলল ফিসফিসিয়ে, চলো, চলো, এখান থেকে চলে যাই। আর এখানে নয়।
মেসে ফিরে এসে সকলেই খুব বিষণ্ণ। আমাদেরই জন্যে ফাদার ইমানুয়েলকে এতগুলো কথা শুনতে হচ্ছে। সত্যিই তো। কে আমরা? বাপে-খেদানো মায়ে-তাড়ানো কতগুলো ভ্যাগাবন্ড ছেলেপুলে দুটি ভাতকাপড়ের জন্যে চেন্নাইতে পড়ে আছি। আমরা
তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকও নই, তাঁদের দরের মানুষও নই। কী জানি, কোন বিপথে নিয়ে যাচ্ছি আমরা একজন ভালোমানুষ ক্রিশ্চান সন্ন্যাসীকে। আমি বললাম, 'আসলে আমাদেরই উচিত হয়নি, এতটা মেশামেশি করার ফাদার ইমানুয়েলের সঙ্গে।' প্রিয়াংশু ঝেঁঝে উঠে বলল, 'চুপ কর তো। আমরা কি যেচে মিশেছি? আর ফাদার ইমানুয়েলও কিচ্ছু ভুল করেননি আমাদের সঙ্গে মিশে। এই ব্যাটা জেবেডি... এই ব্যাটাই আসল শয়তান। ও এখন ফাদার ইমানুয়েলকে ওবিডিয়েন্স শেখাচ্ছে। আরে ব্যাটা, তোর ওই সোলেন ইগোর কী হবে রে? তুই যে একটা ভালোমানুষ সাধুকে শাসন করে নিজের অহংকারের আগুনে ঘি ঢালছিস, তার কী প্রায়শ্চিত্ত করবি?'
ওসমান চুপ করে শুনছিল সব। ধীরে ধীরে বলল একসময়, আমি দেখেছি, জানো? প্রত্যেকটা কমিউনিটিতে, প্রত্যেকটা অরগানাইজেশনে এরকম কয়েকটা করে লোক থাকে, যাদের কাজ শুধু অন্যের পেছনে লাগা। অন্যকে সন্দেহ করা। কোনো একটা গোটা অরগানাইজেশনের বিরুদ্ধে কখনই আমার আঙুল উঠবে না। অনেক ভালো লোক আছে প্রতিটা কমিউনিটিতেই। কিন্তু ওই যে দুটো চারটে মাতব্বর ঘুরে বেড়ায়... তেলবাজ, ধান্দাবাজ, সন্দেহবাজ, ক্ষতিকর কতগুলো লোক... এদের জন্যেই ধর্মীয়, রাজনৈতিক, করপোরেট প্রতিটা গ্রুপ একেবারে ঘুঘুর বাসা হয়ে উঠছে।'
মলয় বলে উঠল, 'সে যাই বলো, ভাই, আর আমাদের ওখানে। যাওয়া ঠিক হবে না। আমাদের জন্যে একটা ভালো লোক নাকাল হবে, এটা মেনে নেওয়া যায় না।'
আমরা আর কেউ কিছু বললাম না। মনগুলো সত্যিই ভেঙে গেছে
আজকের ঘটনায়। তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে নিজেদের মনের ঝুি যেন ঢুকে পড়লাম চুপচাপ। অন্যদিন আড্ডা হয়। আজ রাতে আর পরস্পর কথা বলতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না। জিতে কেমন যে তিতকুটে স্বান।
পরের দিন থেকে আমরা প্রত্যেকেই অনেক দেরি করে যেনে ফিরতে আরম্ভ করলাম। রাত্রি আটটা। সাড়ে আটটা। যে খার নিজের মতো থাকি। অফিসের পরে যে যার নিজের মতো ঘুরে বেড়াই। ফাদার ইমানুয়েলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়ে নিজেদের মধ্যেও দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়ে গেছে।
স্যান্থোম চার্চে আর যাই না। ওপাড়াও মাড়াই না আর। বাপ রে কে যাবে ওখানে আরা
সময় কারও জন্যেই থেমে থাকে না। তবু এর মধ্যেই প্রিয়ান্ড একদিন নাকি বিকেলে স্যান্থোম চার্চে ভিজিট দিয়েছিল। ফাদার ইমানুয়েলের সঙ্গে দেখাও হয়েছিল ওর। ফাদার নাকি জিজ্ঞেস করেছেন, আমরা কেন যাই না ওখানে আর। প্রিয়াংশু অফিসে কাজের চাপটাপ প্রভৃতি ভুজুংভাজুং কিছু একটা বলে চলে এসেঃ মাস ছয়েকের মধ্যে আমাদের চারমূর্তির মধ্যে দু-জন-ওসমান আর মলয় কেটে পড়ল। ওসমান গেল ত্রিবান্দ্রম, মলয় ব্যাঙ্গালোর। বেটার অফার পেয়েছে। কে আর এত কম স্যালারিতে চেন্নাইয়ে পড়ে থাকবে?
বাকি রইলাম আমি আর প্রিয়াংশু। আমারও দিন শেষ হয়ে এল কিছুদিন পর। কলকাতায় ফেরার সুযোগ পেলাম আমি একটা। চেন্নাই ছেড়ে চলে আসার আগে একদিন শেষবারের মতো স্যাছেন। চার্চে গেছলাম। খোঁজ নিয়ে জানলাম, ফাদার ইমানুয়েল নাকি ট্রান্সফার হয়ে গেছেন মেঘালয়ে।
মনাস্ট্রির চারদিকে ঘুরে বেড়ালাম খানিক উদ্দেশ্যহীনভাবে। সেই টিটি খেলার হল, ব্যাডমিন্টনের কোর্ট, ভিজিটরস রুম... সবই আছে অথচ সবই শূন্য।
তারপর থেকে আজ অবধি ফাদার ইমানুয়েলের সঙ্গে আমার কোথাও কোনোদিন দেখা হয়নি।
তিরিশ বছর আগের কথা সব। ধীরে ধীরে বুড়ো হচ্ছি, আজকাধ বুঝতে পারি। নানা উপসর্গ, নানা অসুখ এসে বাসা বাঁধছে শরীরে। প্রিয়াংশু, ওসমান কিংবা মলয়... কারও সঙ্গেই এখন আর যোগাযোগ নেই। জীবনের দাবিতে কে কোথায় যে খসে গেছি। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি।
বিকেলের পথে রোজ একা একা হাঁটি সূর্যাস্তের পথে। কোনে কোনোদিন বিকেলবেলায় সেই অস্তরাগ মেখে হেঁটে যেতে যেতে মনে পড়ে প্রথম যৌবনের সেই বন্ধু ফাদার ইমানুয়েলের কথা। কোথায় তিনি আছেন এখন কে জানে! কোথাও কি আছেন আজও? কিছুই জানি না। তবু ভুলতে পারি না তাঁকে। আমাদের প্রথম যৌবনে পাওয়া সেই এক ভালো মানুষ ফাদার ইমানুয়েল। নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব, ভালোবাসা কখনও ভুলে যাওয়ার জিনিস নয়। বাইরে থেকে দেখলে সেসব ঘটনা খুবই সাধারণ। অথচ ভেতরের পরিচয়ে ওই অভিজ্ঞতাগুলোই অমূল্য। জীবনের সত্যিকারের অবলম্বন এই সব আপাততুচ্ছ অথচ হিরণ্ময় ভালোবাসার স্মৃতি..







Comments