top of page

বাসন্তী পুজো, রাম নবমী এবং অন্নপূর্ণা মাহাত্ম্য |স্বাদে গুণে কেশর | অতিথি আপ্যায়নে নোনতা মিষ্টি | রবিবারের গল্প:তীর্থযাত্রা


বাসন্তী পুজো, রামনবমী এবং অন্নপূর্ণা মাহাত্ম্য


সনাতন ধর্মে চৈত্র নবরাত্রির বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। অবাঙালিদের কাছে চৈত্র নবরাত্রি থেকেই শুরু হয় নতুন বছর। আদ্যাশক্তি মহামায়ার নয় রূপের আরাধনা করা হয় এই সময়। চৈত্র মাসের শুক্লপক্ষের প্রতিপদ তিথি থেকে শুরু হয়ে নয় রাত ধরে চলে আরাধনা। এই নবরাত্রির সপ্তমী থেকে নবমী, এই তিন দিন ধরে চলে বাসন্তী পুজো। শরৎকালের দুর্গাপুজোর মতোই সব নিয়ম আচার মেনে বাসন্তী পুজো করা হয়।

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই পুজো?

দেবী দুর্গার প্রথম পূজারী হিসাবে শ্রী শ্রী চন্ডীতে রাজা সুরথের নাম উল্লেখ রয়েছে। যোদ্ধা হিসাবে রাজা সুরথ ছিলেন খুব দক্ষ। কোনো যুদ্ধে নাকি তিনি কখনও হেরে যাননি। একবার এক প্রতিবেশী রাজ্য তাকে আক্রমণ করলে তিনি পরাজিত হন, এই সুযোগে তার সভাসদরা লুঠপাঠ চালায়। নিজের কাছের লোকেদের এমন আচরনে তিনি অবাক হয়ে যান। এই সময় তিনি ঘুরতে ঘুরতে ঋষি মেধসের আশ্রমে পৌঁছান। ঋষি তাকে সেখানেই থাকতে বলেন। কিন্তু রাজা মনের শান্তি পান না। এর মধ্যে একদিন তার সঙ্গে সমাধি নামে একজনের দেখা হয়। তিনি জানতে পারেন সমাধিকে তার স্ত্রী ও ছেলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে, তবুও তিনি বউ ছেলের ভালো-মন্দ এখনও ভেবে চলেছেন। তারা দুজনেই বিস্মিত হলেন যে, যাদের কারণে তারা আজ সব হারিয়েছে, এখনও তারা তাদের ভালো চেয়ে যাচ্ছেন। ঋষিকে এ কথা জানানো তে তিনি বলেন যে, এসবই মহামায়ার ইচ্ছা। এরপর ঋষি মহামায়ার কাহিনী বর্ণনা করেন। ঋষির পরামর্শ মতই রাজা কঠিন তপস্যা শুরু করেন। পরে মহামায়ার আশীর্বাদ পেতেই রাজা বসন্তকালের শুক্লপক্ষে দেবী দুর্গার পুজো শুরু করেন। সেই সময় থেকে শুরু হয়েছিল বাসন্তী পুজো।


বাসন্তী পুজোর ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি:

চলতি বছরে বাসন্তী পুজো মহাষষ্ঠী পড়েছে ২৪ মার্চ মঙ্গলবার। মহাষষ্ঠীর এই তিথি শুরু হচ্ছে, ২৩ মার্চ রাত ৯ টা ৩৭ মিনিট থেকে। এই তিথি থাকবে ২৪ মার্চ পর্যন্ত। ২৪ মার্চ মঙ্গলবার, সন্ধ্যা ৭ টা ১৩ মিনিটে তিথি ছেড়ে যাবে।


এই বাসন্তী পুজো শুধু নিয়মমাফিক আচার নয় এ এক আত্মিক যাত্রা। যখন আমরা জীবনের নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ি, যখন আপনজনের আচরণে মন ভেঙে যায়, তখন এই পূজা আমাদের শেখায় সবকিছুই এক বৃহৎ শক্তির লীলা। সেই শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করলেই মন খুঁজে পায় শান্তি। বসন্ত যেমন পুরনো পাতাকে ঝরিয়ে নতুন কুঁড়ির জন্ম দেয়, তেমনই এই পূজা আমাদের পুরনো দুঃখ ঝরিয়ে নতুন আশার আলো দেখায়। এই নবরাত্রির নবমীতেই উদ্‌যাপিত হয় শ্রী রামচন্দ্রের জন্মতিথি রামনবমী। রামায়ণ-এর সেই চিরন্তন চরিত্র রাম কেবল এক দেবতা নন, তিনি এক আদর্শ একটি পথ, যা সত্য, ন্যায় আর কর্তব্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর জন্ম যেন এই নবরাত্রির সাধনাকে পূর্ণতা দেয় শক্তির আরাধনার সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্মের শিক্ষা। মানুষের জীবনে শুধু শক্তি থাকলেই হয় না, সেই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজন নৈতিকতা এই শিক্ষা দেয় রামনবমী।


হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে কাশী বিশ্বনাথ মন্দির-এর অধিষ্ঠানভূমি অবিমুক্তকাশী ধাম, অর্থাৎ তীর্থরাজ্ঞী বারাণসী যার প্রাচীন নাম কাশী, অর্থ ‘ঔজ্জ্বল্য’। গঙ্গার দুই শাখা বরুণা নদী ও অসি নদী-র মিলনভূমিতে গড়ে ওঠা এই নগরীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পুরাণকথা ও লোকগাথা। এখানকার অন্যতম পবিত্র স্থান দশাশ্বমেধ ঘাট যেখানে পুরাণ মতে ব্রহ্মা দশটি অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করেন শিব-কে স্বাগত জানাতে। বিশ্বাস, এখানে স্নান করলে সেই যজ্ঞেরই পুণ্যলাভ হয়। কাশীর আরেক মহাপবিত্র তীর্থ মণিকর্ণিকা ঘাট যাকে ঘিরে রয়েছে সতীপীঠের আখ্যান। মতে, সতীর কানের কুন্ডলের মণি এখানে পতিত হয়েছিল। আবার বিষ্ণু-র তপস্যা ও শিবের কুন্ডল পতনের কাহিনিও এই স্থানের সঙ্গে জড়িত। তাই এটি একাধারে পীঠ ও মোক্ষক্ষেত্র।


বিশ্বনাথ মন্দিরের সন্নিকটে অবস্থান অন্নপূর্ণা মন্দির যেখানে অন্নপূর্ণা দেবী বিশ্বকে অন্নদাত্রী রূপে পালন করেন। লোককথা ও মঙ্গলকাব্যে বর্ণিত আছে, দারিদ্র্যে ক্লিষ্ট শিবকে অন্ন প্রদান করে তিনিই বিশ্বসংসারকে অন্নে পরিপূর্ণ করেন। চৈত্র মাসের শুক্ল অষ্টমীতে এই অন্নপূর্ণা পূজার বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে, যা আজও কাশী থেকে বাংলার ঘরে ঘরে অন্নকূট উৎসবের মাধ্যমে বেঁচে আছে। বিশ্বাস, কাশীতে কেউ অভুক্ত থাকে না মায়ের ভাণ্ডার সর্বদা উন্মুক্ত। এইভাবেই পুরাণ, তন্ত্র, লোককথা ও সাহিত্যের মেলবন্ধনে কাশী শুধু একটি শহর নয়, এক চিরন্তন আধ্যাত্মিক অনুভব মুক্তি, ভক্তি ও অন্নপূর্ণ জীবনের প্রতীক।


বাসন্তী পুজো, রামনবমী আর অন্নপূর্ণা পূজা এই তিনটি উৎসব যেন জীবনের তিনটি স্তম্ভকে একসঙ্গে দাঁড় করায়। শক্তি, ধর্ম আর অন্ন এই তিনের সমন্বয়েই তো জীবন পূর্ণ হয়। শুধু শক্তি থাকলে তা পথভ্রষ্ট হতে পারে, শুধু ধর্ম থাকলে তা কঠোর হয়ে উঠতে পারে, আর অন্ন ছাড়া তো জীবনই অসম্ভব। তাই এই ত্রিবেণীর আরাধনা আমাদের শেখায় কীভাবে জীবনের প্রতিটি স্তরে ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়। আজকের ব্যস্ত জীবনে, যেখানে আমরা প্রতিনিয়ত ছুটে চলেছি, সেখানে এই পূজাগুলি আমাদের একটু থামতে শেখায়। নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়। মনে করিয়ে দেয় আমরা শুধু দেহ নয়, আমরা মন, আমরা আত্মা। আর সেই আত্মার শান্তির জন্যই প্রয়োজন এই ভক্তি, এই আরাধনা। তাই বাসন্তী পুজো করবেন শুধু নিয়ম মানার জন্য নয়, শুধু ঐতিহ্য রক্ষার জন্য নয় নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য, নিজের মনকে শান্ত করার জন্য, আর জীবনের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করার জন্য। বসন্তের এই পবিত্র সময়ে, মা মহামায়ার চরণে আত্মসমর্পণ করে যদি একটুখানি শান্তি পাওয়া যায় তবে সেই পূজাই তো সার্থক।

স্বাদে গুণে কেশর

সুদেষ্ণা ঘোষ


কেশর, রান্নাঘরের ছোট্ট এক কৌটোর ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল ইতিহাস। কেশর, জাফরান বা ইংরেজিতে Saffron। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি মশলা হিসেবে যার খ্যাতি বিশ্বজোড়া, তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবু কেশরকে ঘিরে কৌতূহল যেন কখনও ফুরোয় না। তার রং, গন্ধ, স্বাদ, ঔষধি গুণ সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি মশলা নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং স্বাস্থ্যরক্ষার প্রাচীন সহচর।


কেশর আসলে এক বিশেষ ফুলের গর্ভদণ্ড ও স্ত্রীকেশর। বৈজ্ঞানিক নাম Crocus sativus, বাংলায় যাকে বলা হয় জাফরান ক্রোকাস। শরৎকালে ফুটে ওঠা বেগুনি রঙের এই ফুলের ভেতরে থাকে তিনটি লালচে-কমলা তন্তু। সেই তন্তুগুলিই অত্যন্ত যত্নে হাতে তুলে এনে শুকিয়ে তৈরি করা হয় জাফরান। এই প্রক্রিয়াটি শ্রমসাধ্য। এক কেজি জাফরান পেতে প্রায় দেড় লক্ষ ফুলের প্রয়োজন হয়। প্রতিটি ফুল থেকে হাতে করে তন্তু আলাদা করতে হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এর দাম আকাশছোঁয়া। “Saffron” শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে মতভেদ আছে। ধারণা করা হয়, দ্বাদশ শতাব্দীর প্রাচীন ফারসি শব্দ ‘সাফরান’ থেকেই এর জন্ম। সেখান থেকে ল্যাটিন ‘safranum’, আরবি ‘জাফরান’, পরে আবার ফারসি ‘জার্পারান’ অর্থাৎ ‘সুবর্ণ পাপড়ি যুক্ত ফুল’। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি “কেশর” নামেই পরিচিত, বিশেষত উত্তর ভারতে। দক্ষিণ ভারতে এর নাম ‘কুঙ্কুমাপ্পু’ বা ‘কুমকুমাপু’। নাম বদলেছে, কিন্তু মর্যাদা নয়।


জাফরানের ইতিহাস চার থেকে পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো। এর জন্মস্থান নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ গবেষক মনে করেন ইরানই এর আঁতুড়ঘর। বর্তমানে বিশ্বের মোট উৎপাদনের প্রায় নব্বই শতাংশই আসে Iran থেকে। কেউ কেউ গ্রিস ও মেসোপটেমিয়াকেও সম্ভাব্য উৎপত্তিস্থল হিসেবে দেখান। অনেকে মনে করেন Crocus cartwrightianus নামের বুনো প্রজাতির এক ত্রয়ী রূপ থেকেই Crocus sativus-এর জন্ম। খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে অ্যাসেরিয়ার রাজা Ashurbanipal-এর উদ্ভিদ তালিকাতেও জাফরানের উল্লেখ ছিল। মিশরীয়রা রূপচর্চায়, রোমানরা সুগন্ধি হিসেবে, পারসিকরা ঔষধ হিসেবে এবং ভারতীয়রা পূজা ও রান্নায় এর ব্যবহার করতেন। ভারতে কাশ্মীর অঞ্চল বিশেষভাবে প্রসিদ্ধ কেশর চাষের জন্য। পাম্পোরের কেশরক্ষেত আজও ঐতিহ্যের প্রতীক।


এর ইতিহাস ও ভারী চমকপ্রদ। আনুমানিক৫০,০০০ বছর আগেকার প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রে জাফরান-রঙে রঙিন পশুদের ছবি পাওয়া গেছে বর্তমান ইরাকে, পারস্য সাম্রাজ্যের উত্তরপূর্বে। সুমেরীয়রা তাদের ওষুধ ও জাদুবিদ্যায় জাফরান ব্যবহার করতেন বলা জানা যায়। এছাড়াও টলেমি-পরবর্তী যুগে ক্লিওপেট্রা মিশরে জাফরান মিশ্রিত উষ্ণ জলে স্নান করতেন এবং প্রসাধনী হিসেবেও জাফরান ব্যবহার করতেন; মিশরীয় চিকিৎসায় অন্ত্রের অসুখ ও রক্তস্রাবে এর প্রয়োগ ছিল। প্রাচীন গ্রিক ও রোমানরা জাফরানকে সুগন্ধি, প্রসাধন ও দেবতার অর্পণে ব্যবহার করত। নেরো-র সময় রোমে জাফরান মেশানো জলে স্নান ঐশ্বর্যের নিদর্শন ছিল।

খ্রিস্টপূর্ব যুগে পারস্যে ক্রোকাস স্যাটিভাস চাষ হত; রং, সুগন্ধ ও ঔষধিগুণের জন্য তা কার্পেট, বস্ত্র, চা ও স্নানের জলে ব্যবহৃত হতো। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ও সাইরাস দ্য গ্রেট জাফরানের ঔষধিগুণে বিশ্বাসী ছিলেন। পারস্য থেকে ভারতেও জাফরান আসে এবং কাশ্মীর বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। কাশ্মীরি লোককথায় সুফি সাধক খাজা মসুদ ওয়ালি ও হজরত শেখ শরিফুদ্দিন-এর মাধ্যমে জাফরান চাষের প্রচলনের কথা বলা হয়। চৈনিক গ্রন্থ বেঙ্কাও গাঙ্মু তেও জাফরানের ভেষজগুণের উল্লেখ রয়েছে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর উদ্যোগে আফগানিস্তানে পোস্তের বিকল্প হিসেবে জাফরান চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।


জাফরানের হালকা মতো সুবাস ও অনন্য স্বাদের পেছনে রয়েছে তিনটি প্রধান জৈব যৌগ ক্রোসিন, পিক্রোক্রোসিন ও সাফরানাল। ক্রোসিন, যা সোনালি-হলুদ রং তৈরি করে। পিক্রোক্রোসিন, যা সামান্য তেঁতো স্বাদের উৎস। আর থাকে সাফরানাল, যা বিশেষ সুবাসের জন্য দায়ী। এই তিন উপাদানই জাফরানকে অনন্য করে তুলেছে। বিরিয়ানি, পোলাও, শাহী টুকড়া, রসমালাই, পায়েস এইসব বিশেষ পদে কেশর না থাকলে যেন পূর্ণতা আসে না। সামান্য কয়েকটি তন্তু গরম দুধ বা জলে ভিজিয়ে রেখে ব্যবহার করলে খাবারের রং ও গন্ধ বদলে যায়। এককালে মুঘল দরবারে জাফরান ছিল ঐশ্বর্যের প্রতীক। আজও উৎসব-অনুষ্ঠানে কেশরের ব্যবহার সম্মান ও সমৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।


তবে এর চড়া দামের জন্যই বাজারে নকল জাফরানের ছড়াছড়ি। তাই কেনার আগে কয়েকটি সহজ পরীক্ষা করা জরুরি। কীভাবে বেছে নেবেন সঠিক জাফরান, জেনে নিন।

১.জলের পরীক্ষা:

সাধারণ তাপমাত্রার জলে আসল জাফরান ধীরে ধীরে সোনালি রং ছড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে গাঢ় লাল রং ছাড়লে বুঝতে হবে ভেজাল আছে।

২.গন্ধ পরীক্ষা:

আসল জাফরানের গন্ধ মিষ্টি ও ফুলেল। রাসায়নিক গন্ধ থাকলে সন্দেহজনক।

৩.স্বাদ পরীক্ষা:

সামান্য তেঁতো স্বাদই আসল পরিচয়। অতিরিক্ত মিষ্টি হলে সতর্ক হন।

৪.শুকনো অবস্থার রং:

গাঢ় লাল বা কালচে লাল, ডগায় হালকা কমলা আভা থাকবে। অস্বাভাবিক উজ্জ্বল লাল হলে সন্দেহ।

৫.স্পর্শ পরীক্ষা:

তন্তু স্থিতিস্থাপক হবে, সহজে গুঁড়ো হবে না।

৬.বেকিং সোডা পরীক্ষা:

বেকিং সোডা মেশানো জলে আসল জাফরান হলুদ রং ধারণ করে।


সবসময় বিশ্বস্ত দোকান বা ব্র্যান্ড থেকে কিনুন। অত্যন্ত কম দামে জাফরান বিক্রি হলে তা সন্দেহজনক। বর্তমানে ভারতে ভালো মানের কাশ্মীরি জাফরানের দাম প্রতি গ্রাম প্রায় ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা বা তারও বেশি। অর্থাৎ প্রতি কেজি ২.৫ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ইরানি বা আফগানি জাফরান তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম দামে, ১৫০ থেকে ৩৫০ টাকা প্রতি গ্রাম। সাম্প্রতিক সময়ে কাশ্মীর সীমান্তে অস্থিরতার কারণে দাম আরও বেড়েছে বলেও শোনা যায়। তবে বাজারভেদে দাম ওঠানামা করে। কেশর শুধু রং বা স্বাদের জন্য নয়, স্বাস্থ্যরক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ।


১.অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট সমৃদ্ধ: ক্রোসিন ও ক্রোসেটিন কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করে।


২.মানসিক স্বাস্থ্যে উপকারী: গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত সীমিত পরিমাণে জাফরান গ্রহণ করলে মানসিক চাপ ও অবসাদ কমতে পারে।


৩.স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি: মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা উন্নত করতে সহায়ক বলে মনে করা হয়।


৪.রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।


৫.বিপাকক্রিয়া বৃদ্ধি: মেটাবলিজম বাড়িয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।


৬.ঋতুস্রাবের যন্ত্রণা উপশম: কেশর জল অনেকের ক্ষেত্রে পেটের ব্যথা কমাতে সহায়ক।


৭.ত্বকের যত্ন: অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ত্বককে উজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে, টক্সিন দূর করে।


অনেকে উষ্ণ দুধে কেশর মিশিয়ে খান। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, রাতে অল্প কেশর জলে ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে সেই জল পান করলে উপকার বেশি হতে পারে। অতিরিক্ত কেশর গ্রহণ ক্ষতিকর হতে পারে। প্রতিদিন ৩-৫টি তন্তুই যথেষ্ট। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যবহার করা উচিত নয়। ভারতে কেশর কেবল মশলা নয়, পবিত্রতার প্রতীক। পূজার তিলক, প্রসাদ, আয়ুর্বেদিক ওষুধ, সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার আছে। কাশ্মীরি কাহিনিতে কেশর প্রেম, ঐশ্বর্য ও আত্মিক পবিত্রতার প্রতীক। এ আসলে এক আশ্চর্য উপাদান, যার ভেতরে মিশে আছে ইতিহাস, শ্রম, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি। ছোট্ট কয়েকটি তন্তু শুধু রান্নার রং বদলায় না, বদলে দেয় মন ও অনুভূতিও। তাই অমূল্য এ সম্পদ যত্নে কিনুন, সচেতনভাবে ব্যবহার করুন, আর উপভোগ করুন তার অনন্য জাদু।

অতিথি আপ্যায়নে নোনতা-মিষ্টি

সুতপা দে


অতিথি আপ্যায়ন বাঙালির সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে আন্তরিকতার সঙ্গে পরিবেশন করা হয় নানান স্বাদের পদ। নোনতা ও মিষ্টির সঠিক সমন্বয় অতিথিকে দেয় পরিপূর্ণ তৃপ্তি ও আনন্দের অনুভূতি। একদিকে ঝাল-নোনতা খাবার মুখে আনে রুচি, অন্যদিকে মিষ্টি শেষপাতে এনে দেয় প্রশান্তির ছোঁয়া। এই দুই স্বাদের মেলবন্ধনেই তৈরি হয় এক স্মরণীয় আপ্যায়নের অভিজ্ঞতা।



মাটন কিমা ঘুগনি


কী কী লাগবে

দেড় কাপ হলুদ মটর(৬ থেকে ৮ ঘন্টা ভেজানো), ২০০ গ্রাম মাটন কিমা, ১ কাপ পেঁয়াজ কুচি, ৮ থেকে ১০ কোয়া রসুনের কুচি, ২ চা চামচ আদা বাটা, কাঁচালঙ্কা কুচি স্বাদমতো, ১/২ কাপ টমেটো কুচি, ১ কাপ ডুমো করে কাটা আলু, ১ চা চামচ Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো, দেড় চা চামচ Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো, ১ চা চামচ Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লাল লঙ্কার গুঁড়ো, ১/২ চা চামচ Shalimar's Chef Spices আমচুর পাউডার, ১/২ চা চামচ Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো, ১ চা চামচ মিট মশলা, ৪ টেবিল চামচ Shalimar's Sunflower তেল, ১ টেবিল চামচ ঘি, ১/২ চা চামচ Shalimar's Chef Spices গরম মশলা, সামান্য ধনেপাতা কুচি, ১ চা চামচ চিনি, নুন স্বাদমতো, জল পরিমাণ মতো, ২ টো শুকনো লঙ্কা, ১টা তেজপাতা, ১/২ চা চামচ গোটা জিরে, ২ টো গোটা এলাচ।

কীভাবে বানাবেন

প্রথমে ভেজানো মটর, নুন, তেজপাতা, এলাচ ও পরিমাণ মতো জল দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে। অন্য একটি পাত্রে মাটন কিমা, নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো, এক চিমটে হলুদ গুঁড়ো আর পরিমাণ মতো জল দিয়ে সেদ্ধ করে নিতে হবে।

সব সেদ্ধ হয়ে গেলে কড়াই গরম করে তাতে তেল দিয়ে শুকনো লঙ্কা ও গোটা জিরে ফোড়ন দিয়ে একে একে পেঁয়াজ কুচি, রসুন কুচি ও আদা বাটা দিয়ে ভেজে নিতে হবে। এবার আলু গুলো দিয়ে নুন ও হলুদ গুঁড়ো দিতে হবে। কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে নিয়ে টমেটো কুচি, কাঁচালঙ্কা কুচি, জিরে গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, কাশ্মীরি লাল লঙ্কার গুঁড়ো দিয়ে ভালো করে কষিয়ে নিতে হবে। মশলা কষে এলে মটন কিমা দিয়ে আবার কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে সেদ্ধ করে রাখা মটর দিয়ে দিতে হবে। কিমার সাথে মটর ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে চিনি, আমচুর পাউডার, মিট মশলা, গরম মশলা গুঁড়ো এবং একটু জল দিয়ে কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নিতে হবে। সব শেষে ধনেপাতা কুচি ও ঘি দিয়ে নামিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মাটন কিমা ঘুগনি।



ড্রাগন চিকেন


কী কী লাগবে

বোনলেস চিকেন (লম্বা করে কাটা), লাল হলুদ, সবুজ বেলপেপার, আদা+রসুন+কাঁচালঙ্কা কিমা, ভিনিগার, টমেটো কেচাপ, চিলি সস, সয়া সস এবং শুকনো লঙ্কার বীজ বার করে নিয়ে পেস্ট করা, কর্নফ্লাওয়ার, কাজুবাদাম, ডিম, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো, স্প্রিং অনিয়ন কুচি ও পেঁয়াজকুচি, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, নুন, Shalimar's Sunflower তেল ভাজার জন্য

কীভাবে বানাবেন

প্রথমে চিকেন ভিনিগার, নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো দিয়ে ম্যারিনেট করে আধঘন্টা রেখে দিতে হবে। তারপর ডিম, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, কর্নফ্লাওয়ার মাখিয়ে চিকেন গুলো ভালো করে ভেজে তুলে রাখতে হবে। এবার সস বানানোর জন্য প্রথমে বীজ বার করা শুকনো লঙ্কার পেস্ট, টমেটো কেচাপ, চিলি সস, সয়া সস ও ভিনিগার একটা বাটিতে গুলে রাখতে হবে। তারপর প্যানে সাদা তেল দিয়ে তাতে মৌরি, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিয়ে ওর মধ্যে আদা রসুন কাঁচালঙ্কার কিমা, পেঁয়াজকুচি দিয়ে নেড়ে, আগে থেকে তৈরী করা সস দিয়ে এবার ওর মধ্যে সমস্ত বেলপেপার কুচি, ফ্রায়েড চিকেন, গোটা কাজু দিয়ে টস করে নামিয়ে নিলেই তৈরী। এবার গার্নিশিং এর জন্য ওপর থেকে স্প্রিং অনিয়ন ছড়িয়ে দিন।



ফিস ক্রকেট


কী কী লাগবে :

ভেটকি মাছ ২৫০ গ্রাম, আলু সেদ্ধ ২ টি, পেঁয়াজ কুচি ১ টি, আদা রসুন বাটা ২ চা চামচ, লঙ্কা কুচি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, ভাজা মশলা ২ চা চামচ, লবন স্বাদমতো, চিনি সামান্য, Shalimar's সর্ষের তেল।


ভাজা মশলা বানানোর জন্য: (জিরে ১ চামচ, ধনে ১ চামচ, দারচিনি ১ টি, লবঙ্গ ৪টি, ছোট এলাচ ২ টি, গোলমরিচ ৫ টি, তেজপাতা ১ টি ছোট)


অন্যান্য উপকরণ:

বেসন ১ কাপ, চালের গুঁড়ো ৪ চামচ, খাবার সোডা ১ চিমটি, বিস্কুটের গুঁড়ো, Shalimar's Sunflower তেল।


কীভাবে বানাবেন

প্রথমেই ভাজা মশলার উপকরণ গুলো শুকনো খোলায় হালকা করে ভেজে গুঁড়িয়ে রাখুন। মাছের পিস গুলো কে সামান্য হলুদ ও লবন দিয়ে সেদ্ধ করে রাখুন। ঠান্ডা হলে মাছের ছাল কাঁটা ফেলে চটকে রাখুন। কড়াই এ সর্ষের তেল দিয়ে তাতে পিয়াজ কুঁচি হালকা ভাজুন। এবার একে একে আদা রসুন বাটা, হলুদ, লঙ্কা কুচি, ভাজা মশলা, লবন দিয়ে অল্প আঁচে কষুন। চটকে রাখা মাছ দিয়ে আবার ও ভালো করে ভাজুন। এবারে এতে সেদ্ধ করে রাখা আলু মিশিয়ে নামিয়ে ঠাণ্ডা হতে দিন। পছন্দমত আকৃতিতে চপগুলো গড়ে নিন।বেসন, চালের গুঁড়ো, সোডা, অল্প লবন আর পরিমাণ মতো জল দিয়ে ব্যাটার তৈরি করে রাখুন। আরেকটা প্লেটে বিস্কুটের গুঁড়ো ঢেলে রাখুন। একটা করে চপ নিন, বেসনের ব্যাটার এ ডুবিয়ে বিস্কুটের গুঁড়ো মাখিয়ে অন্য আরেকটা প্লেটে রাখুন। এই ভাবে বাকি চপ গুলোও বানিয়ে ১ ঘন্টা ফ্রিজে রাখুন। তেল গরম করে ডুবো তেলে চপ গুলো বাদামি করে ভেজে সালাদ ও কাসুন্দির সাথে গরম গরম পরিবেশন করুন।



ছানার জিলাপি


কী কী লাগবে

ছানা ২৫০ গ্রাম, ময়দা ১ চা চামচ, সুজি ২ চা চামচ, চিনি ২০০ গ্রাম, জল ১/২ কাপ, এলাচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, ঘি বা Shalimar's Sunflower তেল ভাজার জন্য, লেবুর রস ১/৩ চা চামচ


কীভাবে বানাবেন

ছানাকে মসৃণ করে ময়দা ও সুজি মেশান। তেল/ঘি গরম করে নিন। ছানার মিশ্রণ থেকে লেচি কেটে জিলাপির মতো আকারে বানিয়ে নিন। অল্প আঁচে ভাজুন। চিনি ও জল দিয়ে সিরা তৈরি করে এলাচ গুঁড়ো ও লেবুর রস মেশান। ভাজা জিলাপি সিরাতে ৫ মিনিট ডুবিয়ে রাখুন। ঠান্ডা হলে পরিবেশন করুন।



শাহী ক্ষীর


কী কী লাগবে

ছানা ২০০ গ্রাম, ফুল ক্রিম মিল্ক ১ লিটার, পাউডার মিল্ক ছোট এক বাটি, চিনি ৫ টেবিল চামচ, গোবিন্দভোগ চাল ৩ টেবিল চামচ (আধভাঙ্গা), Shalimar's Sunflower তেল/ঘি ১ টেবিল চামচ, ড্রাই ফ্রুটস পছন্দমত, জাফরান এক চিমটি।


কীভাবে বানাবেন

ঘি গরম করে ড্রাই ফ্রুট ভেজে তুলে রাখুন। সেই ঘিতে ছানা একদম হালকা করে ভেজে নিন। দুধে আধভাঙ্গা গোবিন্দ ভোগ চাল দিয়ে সেদ্ধ হতে দিন। সেদ্ধ হলে অল্প দুধে পাউডার মিল্ক ভালো করে গুলে ঢেলে দিন। ঘন হয়ে এলে এবার এর মধ্যে ছানা, চিনি, ড্রাই ফ্রুটস, জাফরান মিশিয়ে নিন। নামিয়ে পরিবেশন করুন ভিন্ন স্বাদের শাহী ক্ষীর।



স্ট্রবেরি সন্দেশ


কী কী লাগবে

ছানা ২৫০ গ্রাম, স্ট্রবেরি পিউরি ১০০ গ্রাম, চিনি গুঁড়ো ২-৩ টেবিল চামচ, দুধ ২ টেবিল চামচ, এলাচ গুঁড়ো ১/৪ চা চামচ, Shalimar's Sunflower তেল/ঘি ১ চা চামচ


কীভাবে বানাবেন

ছানা হাতের সাহায্যে মসৃণ করে নিন। স্ট্রবেরি পিউরি, গুঁড়ো চিনি ও এলাচ গুঁড়ো মেশান। প্রয়োজনে দুধ দিয়ে নরম করুন। ননস্টিক প্যানে ঘি দিয়ে এই মিশ্রণ খুব অল্প আঁচে নেড়েচেড়ে নামিয়ে নিন। মিশ্রণ থেকে পছন্দ মতো আকারে গড়ে নিন। ৩০ মিনিট ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা হলে পরিবেশন করুন।

তীর্থযাত্রা

স্বপ্নময় চক্রবর্তী


একটা কালো পাঁঠা ব্যাঁ-ব্যাঁ করছে। গলায় জবা ফুলের মালা। পাঁঠাটার গায়ে সকালের আলো পড়েছে। ১৯৮০-র এক শারদ প্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জির। সেন বাবুর নাতনি ধোঁয়া ওগরানো ধূপদানি রেখে গেল উঠানে।

বলি হবে। নবমী। কালো পাঁঠাটাকে সামনের পুকুরে পানা সরিয়ে স্নান করিয়ে আনা হয়েছে। এই পুকুরেই সেন বাড়ির বাসন কোসন মাজা হয়, হেগে কাপড় ধোয়া হয়, ফলত, এই জল ততটা পবিত্র নয়, তাই গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেয়া হল, জবা ফুলের মালা পরানো হল, এবার হাঁড়ি কাঠের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

যে বলি দেবে, তার রঙ ফর্সা, গোলগাল মুখ। মসৃণ ত্বকে কী পেলবতা, মনেই হবে না লোকটা বলি দিতে পারে।

প্রতি বছর এই লোকটাকেই বলি দিতে দেখে আসছে তিমির বরণ। কেউ কি বিশ্বাত করবে এই লোকটার একটা নাচের ইস্কুল আছে?

এই আদর বাবু নাকি নাচও শেখান। সেন পরিবার বাঙাল। আদরকে সেন বাড়ির কর্ত্তা মশাই 'আদইরগা' বলে ডাকেন। যে পাঁঠার ঠ্যাং ধরেছে আশ্চর্য্য, ওর গলায় তুলসীর মালা। মানে লোকটা বৈষ্ণব।

শাক্ত-বৈষ্ণবদের সমন্ব্য ঘটেছিল বাংলায় হয়তো শ'চারেক বছর আগে, কৃষ্ণ-কালী মূর্তির ধারণাও তৈরি করা হয়েছিল, কিন্তু চাক্ষুষ এই অভিজ্ঞতা তিমিরের অদ্ভুত লাগল। এই লোকটাকে আগে দেখেনি তিমির। ঢাক বেজে উঠলো। আদর পাঁঠাটার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে আদর করল। পাঁঠার গলাটা হাঁড়ি কাঠের উপর সেট করে হুড়কো লাগিয়ে দিল। তিমিরের স্কুলে শেখা ছড়া মনে পড়ল- 'নবদ্বীপের গঙ্গার ঘাটে শ্রী চৈতন্য পাঁঠা কাটে নিত্যানন্দ ধরে পাঁঠার ঠ্যাং রে...।' ঢাক বাজছে। দশ বারো জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে 'পূণ্য হউব' পোজ-এ। হঠাৎ একজন রোগা, হিলহিলে চেহারার ছেলে এসে হাঁড়ি কাঠের কাছাকাছি একটা কালো রঙের চ্যাপ্টা আয়তকার টেপ রেকর্ডার পেতে দিল। ***** রুমাল বের করে যত্ন করে টেপ রেকর্ডারের গায়ে ছিটকে পড়া রক্ত মুছতে লাগলো। তারপর টেপ রেকর্ডটাকে আদর করার মত গায়ে হাত বুলিয়ে দিল। তিমির দেখল- ছেলেটার উপরের ঠোঁটা কাটা। জোড়েনি। পুরোহিত মশাই কোমরে হাত রেখে এগিয়ে এসে বলল- এটা কী হ'ল?

ছেলেটা বলল এঁকর্ডিং।

- মানে কী?

- এই যে আওয়াজগুলো, এঁকর্ডিং করলাম

- অনুমতি নিয়েছো আমার।

তুলসীমালা গলায় দেয়া চৌকো মুখের লোকটা বলল- ও আমার ভাগ্নে মতন হয়, কর্তামশাইকে বলা আছে।

সেন কর্তা কাছেই ছিলেন। উনি হাতটা সামনে মেলে ধরলেন। মানে- ঠিক আছে।

তিমিরদের উল্টোদিকের বাড়িটাই হ'ল সেন বাড়ি। বেশ কিছুটা জমি নিয়েই ওই বাঙালা বাড়িটা। দশ বারো কাঠা তো হবেই। ওদের ঘরগুলো ছড়ানো ছিটানো। মাঝখানে বড় উঠোন। একটি মাত্র পাকাবাড়ি, যার ছাদ ঢালাই করা, বাকি দু'তিনটে বাড়ি টিনের। চারিদিকে সুপুরি গাছ। সেনবাবুদের আদি বাড়ি ছিল বরিশাল জেলায়। প্রতিবার দুর্গাপুজোয় নবমীর দিন তিমিরদের বাড়ির সবার নিমন্ত্রণ থাকে। তিমিররা যায়। উঠোনে তালপাতার আসন আর কলাপাতা বসিয়ে লম্বা সারি তৈরি করা হয়। প্রতিটি সারির মধ্যে ফাঁকা জায়গা রাখা থাকে। একটা সারি ব্রাহ্মণদের দ্বিতীয় সারিটা বৈদ্য এবং কায়স্থদের। এরপর একটু বেশি ফাঁকা জায়গা রেখে অন্যান্য জাতির লোকজন। সাহা বাড়ি, পাল বাড়ি, ঢাকি, ঢুলীরা সবাই একসারিতে। তিমির কিছু মনে করে না। ওরা তো সিডিঊল কাস্ট, এই ১৯৭৮ সালেও ভেদাভেদটা রয়েই গেছে। তিমির নিজেও তো এস. সি. কোটাতেই চাকরিটা পেয়েছে। কী করা যাবে। অফিসেও তো ওকে শুনতে হয় গরমেন্টের সোনার চাঁদ ছেলে। সেন কর্ত্তার বড় নাতি তিমিরের বন্ধু। বলে- কিছু মনে করিস না, দাদু যত দিন আছেন, এই নিয়মটা চালাতেই হবে। ওর কাছেই শুনেছিল সেন কর্তা নাকি চেয়েছিলেন বদ্যিরা আর ব্রাহ্মণরা এক পংকতিতেই বসবেন। কারণ বদ্যিদেরও উপনয়ণ হয়। বদ্যিরা অথর্ববেদ জ্ঞানী। কিন্তু ওদের গুরুদেব স্বয়ং আপত্তি করেছেন। তিমির দেখল এলাকার সিপিএম নেতা ও ওদের সারিতেই বসেছে। গত বছর বামফ্রন্ট সরকার হয়েছে। এই সিপিএম নেতা বিকাশ হালদার ক্ষমতায় থাকা দলের কাউন্সিলার।

এই মাংসের ধোঁয়া ওঠা ঝোলটার জন্যই এই প্রতীক্ষা 'নিরামিষ মাংস'। পেঁয়াজ-রসুন ছাড়াই এই মাংস রান্না হয়। মাংসটা যেন আমিষ নয়, পেঁয়াজ-রসুনটাই আমিষ। এই দুনিয়ায় কত যে রগড় ছড়ানো ছেটানো। তিমির দেখল তুলসীমালা গলায় দেয়া যুবকটি, যে পাঁঠার ঠ্যাং ধরেছিল, সে বামুনদের সারিতেই বসে খাচ্ছে। গোঁসাই বলে তুলসীমালা গলায় থাকলেই ওই সারিতে বসা যায় না। ওই তো ঢাকি দু'জন, গলায় তুলসীমালা। তিমিরদের সারিতেই বসেছে। ওই ছেলেটিকে দেখা গেল যে পাঁঠার মুন্ডচ্ছেদের আর্তনাদ রেকর্ড করেছিল। ওকে নিশ্চয়ই খেতে বলেনি ওরা। সেন কর্তা যতটা পারেন বরিশাল টিকিয়ে রেখেছেন এখনো। শুকতো, মোচার তরকারি, মানকচুর তরকারির পর সেই ধোঁয়া ওঠা মাংস-ঝোল। মাংস মাত্র দু'টুকরোই পাতে পড়ল, কিন্তু ঝোলটাই তো অপূর্ব। বেশ ঝাল হয়েছে, চোখে জল। এই চোখের জলটাই তো আনন্দাশ্রু।

খাওয়াদাওয়ার তদারকি করেছিলেন সেনকর্তা নিজে। 'অর পাতে আরও দুই হাতা কচু দ্যাও'। 'আরে এক্কারে হুগনা ভাত, দুই হাতা ঝুল দ্যাও'। এসব করছেন। মাংস দিতে বলছেন না কিন্তু যদি বেঁচে যায় পরদিন নাতি-নাতনিরা খাবে। সেন কর্তা তিমিরকে বলল- শোনলাম আকাশবাণীতে চাকরি পাইছো। খোব আনন্দের কথা। যাবার আগে একটু কথা কমু।

আঁচিয়ে এসে তিমির সেন কর্ত্তার কাছে গেল। সেন কর্ত্তার বয়স হয়তো আশির কাছাকাছি হবে।

সেন কর্তা বললেন- আকাশবাণীতে কি কর তিমু? তুমি গান বাজনা জানো বইলা তো জানতাম না। তিমির বলল- না, গান বাজনা নয়। অন্য কাজ।

- তবে কি কথা ফুঁক? মানি, গান টানের আগে পরে যে বলা হয় অমুকের গান শুনবেন, অমুকের গান শুনলেন- এয়া কর?

- না, নিজে করি না, যারা এসব বলেন, ওদের বলে অ্যানাউসার। আমার কাজ ওদের তদারকি করা যেন ঠিক করে সব প্রোগ্রামগুলি ব্রডকাস্ট হয় সেটা দেখা। আমাদের বলে ট্রান্‌সমিশন এগ্‌জিকিউটিভ। ডিউটি অফিসারও বলে।

এসব বলার সময় বেশ গর্ব হচ্ছিল তিমিরের। তিমির দেখল- ওদের সেই আদরবাবু, তুলসীমালা গলায় রাখা লোকটা মানে যে বলি দিয়েছিল এবং যে পাঁঠার ঠ্যাং ধরেছিল, ওরাও দাঁড়িয়েছে এসে। সেন কর্তা বললেন- ডিউটির অফিসার? খুব তো বড় পদ।

- না, বড় পোস্ট নয়। নামটাই ওরকম।

- নিশ্চই বড় পোস্ট, নয়তো কেঊ মাস্টারী ছাইড়া জয়েন করে? আমার এক খান রিকুয়েস্ট আছে আমি তো রেডিও শুনি, খুব রেডিও শুনি। শোনালাম সব দুর্গাপূজার বৃত্তান্ত। গত চাইর দিন ধইর্যাণ দুফরবেলা শুনি। আমার বাড়ির দুর্গাপূজাও খুব প্রাচীন এবং ঐতিহ্যপূর্ণ, বোজছো। আগে আমার গ্রামে দুর্গাপূজা হইত। আমার পূর্বপুরুষ ছিলেন লাকুটিয়া জমিদার বাড়ির রাজ বৈদ্য। তিরিশ কানি নিষ্কর জমি ছিল, বোজছো। সেই দুর্গাপূজাটা আমি, ভূপতি স্যান শত কষ্ট, বিপর্যয়, অনটন সত্বেও আমি আজও ধইরা রাখছি, এইডা সুললিত কণ্ঠে ব্যাতার তরঙ্গে কইয়া দিবার ব্যাবস্থা কইরো। রিকুয়েস্ট করলাম, বোজছো...।

তিমির কিছু বলে না। কী বলবে? এরকম তো কত দুর্গা পুজোই হচ্ছে। হাজার হাজার। তবে উনি ঠিকই বলেছেন। জমিদার বাড়ি, বনেদি বাড়ির পুজো টুজো নিয়ে তো প্রোগ্রাম হয়েছে। তিমির কি করে বলবে- ওসব তো হাই ফাই পুজো দাদু, আপবার পুজোটা তো হাইফাই নয়, আপনার বাড়ির পুজোয় তো সিনেমা আর্টিস্ট আসে না, মল্লিক বাড়িতে রনজিত মল্লিক আছে, লাহা বাড়ি, দেব বাড়ি, সাবর্ণ চৌধুরীদের কত বড় দুর্গা দালান- আপনার কী আছে দাদু?... তবে করা কি যায় না একেবারে? অ্যাঙ্গেল পাল্টালেই হয়। যেমন 'দুর্গার ভোগে কচুর তরকারি'। কিন্তু তিমিরের তো প্রোগ্রাম তৈরীর ক্ষমতা নেই। ও হ'ল সুপারভাইজার ধরনের কর্মী। একটা প্রমোশন হ'লে প্রোগ্রাম এগ্‌জিকিউটিভ হবে। কী তীমু, কিছু কও না ক্যান? তিমির বলে- আমি তো এই সবে জয়েন করেছি দাদু, আমি চেষ্টা করে দেখবো। এ বছরটা তো হয়ে গেল।


- হ হ। আগামী বছরে কইয়া দিবার ব্যবস্থা কইরো, সুললিত মধুর কণ্ঠে যদি নিলীমা সান্যালের কণ্ঠে হয়, তবে তো উত্তম...।

- নিলীমা স্যন্যাল তো খবর পড়েন। দিল্লী থেকে।

- আইছা, নিলীমা সান্যালের দরকার নাই দেবদুলাল?

- উনিও তো খবর পড়েন। নিউজ তো আলাদা সেকশন।

- তো কী হইছে তয়?

- ওখানে হবে না। আমাদের প্রোগ্রাম অপশন আলাদা। আমাদের আলাদা অ্যানাউন্সার আছে।

- আইচ্ছা। সেইডা তোমার যা ভালো মনে করো। তাইলে নেক্‌স্ট বার রেডিওতে শোনা যাইবে। আরও একটা বছর বাঁইচ্চা য্যান যাহি হে মা দুর্গা।

তিমির জানে, মিছে কথা বলল। ও তো নিজে প্রোগ্রাম করতে পারে না। ডিউটি অফিসাররা যে একেবারেই প্রোগ্রাম বানাতে পারে না তা নয়, প্রস্তাব মানে প্রোপোজাল দিয়ে অ্যাপ্রুভাল নিতে হয় বসদের থেকে। এটায় অ্যাপ্রুভাল পাওয়া যাবে না, শিওর।

যখন সেন কর্তার সঙ্গে এইসব কথাবার্তা হচ্ছিল, তখন আরও দু'চার জন জড়ো হয়ে গিয়েছিল। বিনুনিতে ফিতে বাধা গদ্য শাড়ি পরা একটি মেয়ে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তিমিরকে দেখছিল। সেই দু'জনও ছিল,

- যে পাঁঠার ঠ্যাং ধরেছিল, এবং যে কোপ মেরেছিল। আদইরা গা নামের কোপ মারার লোকটা বলল- হেমন্ত সন্ধ্যা, মান্না দে, শচীন দেববর্মন সবাইকে দেখেছেন! তিমির পাঞ্জাবি পরে গিয়েছিল। পাঞ্জাবির কলার ছিল না। তিমির বেশ বুঝতে পারছিল এবার ঘাড়ের কাছ থেকে ডানা গজাচ্ছে দু'পাশে। বলল- দেখা শুধু? হেমন্তদা, সন্ধ্যাদি এদের সঙ্গে কথাও বলেছি। আর মান্না দে গান রেকর্ডিং করতে আসেন না, উনি অডিশনে ফেল করেছিলেন কিনা, দ্বিতীয়বার আর অডিশন দেন নি। তবে ওঁর রেকর্ড বাজাই আমরা আর শচীন দেববর্মন তো বম্বে থাকেন। সেই আদইরগা নামক নামক লোকটার চোখে বিস্ময়। বলে- বলেন কী? মান্না দে ফেল করেছিলেন?

বিজ্ঞের মত ঘাড় নাড়ায় তিমির। বিনুনিতে ফুল আঁটা মেয়েটা বলে- শুক্লা ব্যানার্জীকে দেখেছেন?

তিমির বলে হ্যাঁ কেন দেখবো না?

- শোভনলাল মুখার্জি? গৌতম চক্রবর্তী?

- হ্যাঁ তো, শোভনদার সঙ্গে তো একসাথে চা খাই।

- কী দারুণ অভিনয় করেন, তাই না?

- হ্যাঁ। আর জগন্নাথ বসুর সঙ্গেও কথা কন?

- কেন কইব না।

এবার ঠ্যাং ধরা লোকটা বলল- আমি কর্তাল, খঞ্জনি এসব বাজাই। ঢোলও পারি। রেডিওতে ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধারানীদের কীর্ত্তন শুনি। ওঁদের সঙ্গে যদি বাজাতে পারতাম...। আমার নিজেরও একটা কীর্ত্তনের গুরুপ আছে। শ্রাদ্ধ বাড়িতে বায়নে নিয়ে গায়ন করি। এই যে আমার কার্ড। রাখেন। যদি জীবনে একবার রেডিওতে কিছু করতে পারি, জীবন সার্থক হয়। তিমির দেখল কার্ডে লেখা আছে 'বিষ্ণুপ্রিয়া কীর্ত্তন সমাজ। প্রোঃ শ্রী গোকুলানন্দ গোস্বামী। যে কোন অনুষ্ঠানে, মঞ্চে, মন্দিরে, আত্মামুক্তি কর্মে কীর্ত্তন গাওন করা হয়।'

তিমির কার্ডটাকে দেখলো। গেরুয়া রঙের কার্ড। এবার লোকটাকে ভালো করে দেখলো- যাকে বলে পর্য্যবেক্ষণ। অনেকটা চৌকো মতন মুখ। চওড়া চোয়াল পেশি বহুল চেহারা। বৈষ্ণবদের মধ্যে এমন চেহারা কমই দেখা যায়। এজন্যই বোধহয় পাঁঠার ঠ্যাং ধরার জন্য আদর বাবু একে ধরে এনেছিলেন। নিত্যানন্দ ও বেশ বলশালী ছিলেন, এ জন্যই শাক্তদের ব্যাঙ্গ ছড়াটায় বলাছিল- নিত্যানন্দ ধরে পাঁঠার ঠ্যাং। এর পরের লাইন ক'টিও বেশ মজার।

...তারপরে জগাই এসে

মাংস চাহিল হেসে

নিত্যানন্দ মারে তারে ল্যাং।

জগাইয়ের মত গুন্ডাকেও লেঙ্গি মারার ক্ষমতা দেখানো হয়েছে সেই ছড়ায়।

নিত্যানন্দের সময়েই শাক্ত-বৈষ্ণব সমন্বয়ের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। নিত্যানন্দ তাঁর ছাপ্পান্ন বছর বয়সে বিবাহ করেছিলেন। খড়দহে আশ্রম করেছিলেন। উনি দুর্গাপূজাও চালু করে দিয়েছিলেন। যদিও পাঁঠাবলির পরিবর্তে চালকুমড়ো বলি হয়। খড়দহে এদের আশ্রমে আজও দুর্গাপূজা হয়। নিমতা অঞ্চলে থাকার সুবাদে তিমির এসব জানে। তিমির জিজ্ঞাসা করল- গোস্বামীবাবু, একটা কৌতূহল হচ্ছে। আপনার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে এক্সারসাইজ করেন। অথচ খঞ্জনি বাজান, করতাল বাজান, কীর্ত্তন করেন...

লোকটি বলে আমার কি তবে ড্রাম বাজানো উচিত ছিল? কীর্ত্তন না গেয়ে কাউবয় সং গাওয়া উচিত ছিল? বডি বিল্ডিং করলে কীর্ত্তন গাওয়া যায়।

তিমির বলে ঠিকই, ঠিক কথা, কিন্তু কীর্ত্তন তো একটা কোমল রস...

গোস্বামী বলেন- ওটা তো ভিতরে। আর ছাগল তো বাইরে। দেহ আর মন তো আলাদা। পৃথিবী কি বিচিত্র। তিমির ভাবে। সঙ্গে সঙ্গেই ওর মনে হয় সমীরদাকে এই লোকটার কথা বলবে। সমীর ঘোষ। সমীরদা 'নানা রঙের মানুষ' নামে একটা অনুষ্ঠান করে। সপ্তাহে একদিন করে হয়। বিচিত্র সব মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার ভিত্তিক অনুষ্ঠান। রাস্তার কুকুরদের খাওয়ানো মানুষ, রেলের প্ল্যাটফর্মে মাদুর বিছিয়ে বিনে পয়সায় অঙ্কের মাস্টারমশাইগিরি করেন এমন মানুষ, পকেটমারদের ট্রেনিং দেয়া মানুষ, কুকুর ট্রেনার, রেসের মাঠের জকি, গরুর দালাল, বাঁদর খেলা দেখায় এমন লোক, এদের নিয়ে অনুষ্ঠান করেছে। তিমিরও এমন দু-তিনটে ইন্টারভিউ নিয়েছে। গোস্বামী মশাই বলছেন- আসলে কি জানেন, আমাদের পূর্বপুরুষ শাক্ত ছিল, এখন আর বলতে লজ্জা কি, আমার ঠাকুরদাদার বাবা নাকি ছিল ডাকাত। আমার ঠাকুরদাদাও নাকি মুগুর ভাঁজতেন।

ঠাকুরদাদাই হরি মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিলেন। তায় বাবা-মা দু'জনই কীর্ত্তন গাইজেন। আমার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড আছে স্যার। রেডিওতে যদি...। সঙ্গীত শিল্পী হিসেবে ঢোকানোর চেয়ে ওই নানা রঙের মানুষে নিয়ে নেয়া বরং অনেক সহজ।

তিমির বলে- কীর্ত্তনের জন্য তো অডিশন দিতে হয়। অডিশনে পাশ করতে হয়।

- সে পাশ করে যাবো। আপনি আছেন তো। ব্যাকিং। ব্যাকিং থাকলে পাশ করতে কী অসুবিধে?

- ব্যাকিং এ অডিশনে পাশ ফেল হয় না। আমাদের হাত থাকে না। বাইরের এক্সপার্ট থাকে।

- তাহলে নয় খোলই বাজাবো। বাজনদারদের নামও অ্যানাউন্‌স করে তো।

এই তো। এক্কেবারে ফিচারের ক্যারেক্টার। কীর্ত্তনে মধুর পদ গায়, আবার বারবেল তোলে। পাঁঠাবলিতে সাহায্যকারী রাধা বিরহে কাঁদে, আবার নিজে নামটুকু প্রচারের জন্য পাগল।

তিমির বলল- ঠিক আছে, আমি অন্য একটা প্রোগ্রামে আপনাকে ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা করব। আপনার নাম বলা হবে, একবার নয়, বারবার। গানও গাইবেন দু-চার কলি। বলতে বলতেই তিমিরের মাথায় তৈরি হয়ে গেছে নানা রঙের মানুষ এর নতুন একটি পর্ব। 'আজ আপনাদের সামনে আর একজন রঙীন মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি। শ্রী গোকূলানন্দ গোস্বামী। কীভাবে পরিচ্য করাই?- ব্যায়ামবিদ? ঠিক আছে। প্রত্যেকদিন বারবেল এবং মুগুর নিয়ে দেহ চর্চা করেন। তালবিদ নামে কোন গ্রাহ্য শব্দ হয় কিনা জানিনা, তবে ইনি ঢোল, খোল, খঞ্জনী, করতাল ইত্যাদি তাল বাদ্য বাদনে পটু। শুধু তাই নয়...'

গোস্বামী মশাই নিজের আঙুল মটকে বললেন স্যার, তাহলে আপনার ঠিকানাটা... যদি কার্ড থাকে...।

তিমির বলে- আমার কোনও ভিজিটিং কার্ড নেই। আপনার কার্ড তো রইলই। আমিই যোগাযোগ করে নেব।

সমীর ঘোষ দীর্ঘদিনের প্রোগ্রাম এগ্‌জিকিউটিভ। রোগা মানুষটা, গাল ভাঙ্গা, কিন্তু প্রচণ্ড কড়া লোক। চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলে দেন। স্টেশন ডিরেক্টারের ঘরেও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখের দিকে চেয়ে কথা বলেন, আবার দরকার হ'লে দিলীপ ঘোষ বা অমিয় চট্টোপাধ্যায়ের মত ব্যক্তিত্বময় খ্যাতিমান অ্যানাঊন্সারদের কোনও ভুল কানে এলে সোজা বলে দেন। এই আকাশবাণীতে নাকি আগে খুব স্যার ট্যার বলার রেওয়াজ ছিল, এখন শুধু টপ বসদের স্যার বলা হয়। ডিউটি অফিসাররা প্রমোশোন পেয়ে প্রোগ্রাম এগ্‌জিকিউটিভ হয়। তারপর অ্যাসিস্ট্যান্ট স্টেশন ডিরেক্টর, তারপর স্টেশন ডিরেক্টর। এছাড়া আছেন প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং প্রডিউসার। পুরোদস্তুর সরকারী কর্মচারী বলতে যা বোঝায়, এঁরা তা নন। এঁদের বলা হয় স্টাফ আর্টিস্ট। অ্যানাউন্সার, মানে ঘোষকরাও স্টাফ আর্টিস্ট। ওঁরা আন্দোলন শুরু করে দিয়েছেন পুরোদস্তুর সরকারী কর্মচারী হিসাবে গণ্য হবার দাবীতে, তাহ'লে ওঁরাও প্রমোশন পেয়ে স্টেশন ডিরেক্টার হ'তে পারবেন।

তিমির যখন সমীর ঘোষের ঘরে ঢুকলো, তখন ওখানে জটলা। বিভাস বসু, সুহাস চৌধুরী, অতীন চ্যাটার্জীরাও রয়েছেন। এনারা সব জাঁদরেল অফিসার। তিমির সমীর ঘোষকে বলল- স্যার, একটা প্রপোজাল ছিল...

সমীর ঘোষ বললেন- তোমাকে বলেছি স্যার বলবে না, সমীরদা বলবে। পরে এসো। এখন জরুরী মিটিং চলছে।

মিটিং এর বিষয়টা তো জানে তিমির। যদি স্টাফ আর্টিস্টরাও প্রোমশনের অধিকারটা আদায় করে নিতে পারে, তাহলে ইউ.পি.এস.সি/এস.এস.সি পরীক্ষা দিয়ে চাকরি পাওয়া রেগুলার স্টাফদের প্রমোশনের সুযোগ কমে যাবে। সুতরাং দিল্লীতে প্রতিবাদ পত্র লিখতে হবে। তিমিরও রেগুলার স্টাফ। তবে নতুন বলে এত ভাবে না এইসব নিয়ে।

পরে সমীর ঘোষের সঙ্গে কথা বলে অনুমতি পেল। একটা নোটও লিখল এবং সেটার অ্যাপ্রুভাল হ'ল। গোকূলানন্দ গোস্বামীকে স্টুডিওতে ডাকা হবে।

* * **

এই আকাশবাণী ভবনের আশপাশ দিয়ে অনেকবারই যাতায়াত করেছে গোকূলানন্দ, কিন্তু সেভাবে দেখেনি, যাকে বলে অবলোকন। শ্রীরাধিকার অষ্টসখীর এক সখী ইন্দুলেখা খেদ করছিল- হেরিব না কৃষ্ণমুখ শুধু বাড়ে জ্বালা। ঘোর অঙ্গে কভূ নাহি ধরা দিবে কালা। যে কৃষ্ণকে পাবো না, কেন বৃথা তার দিকে তাকানো। গোকূলানন্দ ও কোনও দিন আকাশবাণী ভবনটার দিকে ভালো করে তাকায় নি। আজ রাস্তার ওপার থেকে হাঁ করে দেখতে লাগলো বাড়িটা। বাড়ির থাম, দোতলার রেলিং। সামনে লেখা আকাশবাণী ভবন। লালচে পাথরের তৈরি। এই বাড়ি থেকেই ভোরের সূচনা হয়। ভোরবেলা বেজে ওঠে শ্রীরাধার হ্লাদিসী। তারপর বন্দেমাতারম। তারপর মহাপুরুষের কথা। তারপর দেশ বন্দনা। দুপুরে অনুরোধের আসর শুনতে গিয়ে বাবার কানমলা খাওয়া। এই বাড়িতেই ছবি বন্দ্যোপাধ্যায়, আবার এই বাড়িতেই মনোহর আইচ, এই বাড়িতেই নীলমণি দাস। এই বাড়িতেই তরজা গান, এই বাড়িতেই মহিষাসুরমর্দিনী। গোকূলানন্দের সঙ্গে র‍য়েছে আর একটি রোগা পাতলা ছেলে। ওর নাম বিপদ ভঞ্জন রুজ। ওর কাঁধে একটা শান্তিনিকেতনী ঝোলা, তার ভিতরে তোয়ালে মোড়ানো ফিলিপ্‌স এর চ্যাপ্টা টেপ রেকর্ডার। এই ছেলেটাই গোকূলানন্দ্র সঙ্গে সেন বাড়ির দুর্গাপুজোয় এসেছিল, এবং বলির পাঁঠার মৃত্যুকালীন আর্তনাদ রেকর্ড করেছিল।

গোকূলানন্দ ভিতরে ঢোকে। শ্বেতপাথরের মেঝে। ঢুকতেই বাঁদিকে একটা ছোট টেবিল। সেখানে কোথায় যাবে জিজ্ঞাসা করা হয়। গোকূলানন্দ সগর্বে বলে রেকর্ডিং আছে। ওর কাছে কনট্রাক্টের চিঠি আছে কিনা জিজ্ঞাসা করা হয়। গোকূলানন্দ খাকি খামের ভিতরে যত্নে রাখা কাগজটা দেখায়। ওটাই কনট্রাক্ট ফর্ম। এই কাগজে ভারতের রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে গোকূলানন্দ গোস্বামীকে অনুরোধ করা হয়েছে একটা ইন্টারভিউ দেবার জন্য, সেটার অমুক তারিখ রেকর্ডিং এবং অমুক তারিখে ব্রডকাস্ট। এই সঙ্গে আর একটা কাগজ ছিল, সেখানে ছাপাই করা ছিল যে এই পনের মিনিটের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানের জন্য দুশো পঞ্চাশ টাকা পাবো এই শর্তে আমি রাজি। সেখানে সই করে স্টেশন ডিরেক্টারকে আগেই পাঠিয়ে দিয়েছে পোস্টে। সব ইংলিশ চিঠি। কে সম্মানের ব্যাপার। বাড়ি থেকে বের হবার সময় মা যখন সাবধানে যাস বলেছিল, গোকূলানন্দ বেশ চিৎকার করেই বলেছিল, যেন পাঁচ জনে শোনে- আরে রেডিও অফিসে যাবো, এতে আর সাবধানে যাবার কী আছে। বাসে উঠবো, আর এক্কেবারে রেডিও অফিসে গিয়ে নামবো। আকাশবাণী বললেই কন্ডাক্টার থামিয়ে দেবে। বাক্যরচনাগুলো এমন ভাবে করছিল গোকূল, যেন প্রতিটি বাক্যেই রেডিও অফিস, বা আকাশবাণী শব্দটা বেশ পোক্ত ভাবে থাকে। শুনুক পাড়ার লোক। জানুক ও এলিতেলি লোক নয়।

রিসেপশনে থেকে বলে দেয় বাঁ দিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলায় চলে যান, সমীর ঘোষের ঘরে। সাহেবের নাম লেখা আছে বাইরে।

বাঁ দিকে একটা শ্বেতপাথরের সিঁড়ি দেখতে পেল গোকূলানন্দ। সিঁড়ির দিকে যাবার আগেই সামনের দিকে দেখতে পেল বিকট সবুজ দু'ভাগ করা দরজা খুলে এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া নিয়ে একজন কর্মী মত মহিলা বেরিয়ে এলেন, যেন জ্যান্ত সরস্বতী। হাতে ফাইল। ওর পিছন পিছন আরও দু'জন। এরকম সরস্বতির মত নারীটাই বুঝি রেডিও দিদিমণি। হংসরাজ সিনেমাটা এসেছিল মায়াপুরী হলে। ওই গান থেকে উঠে এসেছে যেন এই দিদিমণি। গানের রানী।

ও দিদিমণি

গানের রানী

দাও গাইতে আমায় রেডিও ইষ্টিশনে

আমি যে অনেক আশায়

ঘুরে ঘুরে এসেছি এইখানে।

কত সব গুনী গায়েন হেথায় করেন গান

ওঁনাদের পায়ের তলে দাও না আমায় স্থান।

দু'ভাগ করা সবুজ দরজাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে গোকূলানন্দ। শ্বেতপাথরের সিঁড়িটা কেমন ঘোরানো। সিঁড়ির পাশে রেলিঙ। গোকূলানন্দ দোতলায় উঠছিল। ওর পিছনে পিছনে বিপদভঞ্জন। গোকূল এখন সত্যি সত্যিই তীর্থস্থানের দিকে চলেছে। যেন গোকূল। কৃষ্ণ-বলরামের লীলাক্ষেত্র। ওখানে পৌঁছে যাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। স্বপ্নে গোকূল দেখেছে ও, কিন্তু এ বাড়ির ভিতরটা দেখেনি কখনো। যে সিঁড়ি দিয়ে উঠেছে বীরেন ভদ্র, বাণীকুমার, পঙ্কজ কুমার, ইন্দিরাদি, বেলাদি এই সিঁড়ি দিয়েই তো উঠেছেন, নেমেছেন। আহা! তাঁদের পাদরেনু রয়েছে এখানেই।

ধুলো মাথায় নিতে সাধ হয়, কিন্তু ওকে গেঁয়ো ভাবতে ওখানে দাঁড়ালো দিদিমণিরা। যাক। এখন উপরে উঠছে। সিঁড়িতে। বৈকুন্ঠধামের সিঁড়ি।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page