top of page

চিরায়ত ঐতিহ্য মুর্শিদাবাদ সিল্ক| সুস্বাদু আবার স্বাস্থ্যকর ও!| রান্নাঘরের টুকিটাকি| রবিবারের গল্প: ছবির ভূত


চিরায়ত ঐতিহ্য: মুর্শিদাবাদ সিল্ক


জাহির রায়হান


ময়ূরকণ্ঠী নীল জমিন আর তার সোনালি পাড়। কিংবা রানি রঙের ঢালে নিপুণ কালোর ছোঁয়া। আর তার আঁচল বেয়ে নেমে এসেছে রঙিন ঝুমকো অথবা নির্ঝরা লতাপাতার আলঙ্কারিক রূপটান। কটনের মাঝেই রেশমি সুতোর স্বভাবসিদ্ধ নিবিড় বুনন। কোনো কোনো শাড়িতে আবার রেশমি সুতোর ভিড়ে সোনালি জরির ফুল-পাখি। আঁচল বেয়ে ঢালাও স্বর্ণালি জরির কারুকাজ। কিংবা অফ-হোয়াইট শাড়িতে লাল, নীল ও হলুদের বুটি-বাহার, আর আঁচলের ধার বরাবর লতিয়ে উঠেছে হরেক ফুলের নকশা। এসবই চিরন্তন মুর্শিদাবাদ সিল্কের বৈশিষ্ট্য, যে সিল্ক ‘বুনোটের রাণী’ বা ‘রাণীর বুনোট’ নামে জগদ্বিখ্যাত।



মুর্শিদাবাদ সিল্কের খ্যাতি ভুবনময়, জগৎজোড়া। প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে চীনে রেশম উৎপাদনের সূচনা হয়। এরপর প্রায় দুই হাজার বছর ধরে চীন রেশম চাষ ও উৎপাদনের গোপনীয়তা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বজায় রাখে। পরবর্তী কালে সিল্ক রোডের মাধ্যমে চীনের বেইজিং থেকে ভূমধ্যসাগরের উপকূল বেয়ে প্রথমে গ্রিস এবং পরে রোমান সাম্রাজ্যে রেশম ব্যবসার প্রসার ঘটে। তারও পরে দক্ষিণে ইয়েমেন, বার্মা ও ভারতবর্ষে বিস্তৃত হয় সিল্ক রুট। উপমহাদেশে প্রথম তিব্বত থেকে হিমালয়ের পাদদেশে রেশম চাষের বিস্তার ঘটে।



মুর্শিদকুলি খাঁর হাত ধরে ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করে বালুচরী। সে সময় নবাবি জীবনযাত্রার নানা অনুষঙ্গ রঙবেরঙের সুতোর বুননে ফুটিয়ে তোলা হতো বালুচরীর মসৃণ আঁচলে। অচিরেই এই শিল্প দিল্লির মুঘল শাসকদের হৃদয় জয় করে। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে মুঘল সম্রাটদের সর্বাঙ্গীন পৃষ্ঠপোষকতায় তৎকালীন অবিভক্ত বাংলায় রেশম শিল্প ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহী জেলা এবং ভারতের মালদা ও মুর্শিদাবাদ বেঙ্গল সিল্কের প্রধান উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। রাজশাহী ও মালদা আজও সেই ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। রাজশাহীর রেশম ও রেশমশাড়ি তৈরির কারখানাগুলি এখনও ইতিহাসের সিল্ক যুগের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। বেঙ্গল সিল্ক বলতে মূলত রাজশাহী, মালদা ও মুর্শিদাবাদের সিল্ককেই বোঝানো হতো।



কথিত আছে, রেশম চাষের পদ্ধতি, সিল্ক উৎপাদন ও ব্যবসায় হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য টিপু সুলতান সুদূর মহীশূর থেকে শিক্ষানবিশদের অবিভক্ত বাংলায় পাঠিয়েছিলেন। বেঙ্গল সিল্কের টানে ভারতবর্ষের অন্যান্য রাজা-মহারাজারাও বাংলায় পাইক-পেয়াদা ও পণ্ডিত পাঠিয়ে রেশম চাষের দীক্ষা নিতেন। পরবর্তী সময়ে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে সমগ্র দক্ষিণ ভারত জুড়ে রেশম চাষের প্রসার ঘটে এবং শিল্পটির ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। বলা যায়, বাংলা থেকেই উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে গুটি পোকার বিস্তার ঘটে এবং রেশম চাষ ছড়িয়ে পড়ে আসমুদ্র হিমাচল।



রেশমসহ নানা বাণিজ্যিক পণ্যের আকর্ষণ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারত আগমনের অন্যতম কারণ ছিল। রেশম বাণিজ্যে দখলদারিত্ব থেকেই পরবর্তীকালে তারা ঔপনিবেশিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। যদিও বাংলায় রেশমের ইতিহাস আরও দীর্ঘ। ১৬৬০-এর দশকে মুর্শিদাবাদ একটি পরগনার সদর দপ্তর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই সময়েই মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজারে ইউরোপীয়রা কুঠি স্থাপন করে। কারণ, ইউরোপের বাজারে বেঙ্গল সিল্কের চাহিদা ছিল অত্যন্ত বেশি। এ অঞ্চল থেকে তখন প্রচুর পরিমাণে রেশম ও রেশমজাত দ্রব্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিয়মিত রপ্তানি হতো। সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিপুল পরিমাণ বেঙ্গল সিল্ক ব্রিটেনে রপ্তানি করে।

রেশম কাপড়ের সেই সোনালি দিন আজ আর নেই। নেই মসলিন, জামদানি, বালুচরী কিংবা বুটিদার শাড়ির সেই রমরমা। কালের কঠোর নিয়মে হারিয়ে গেছে বাংলার নবাব, দিল্লির সম্রাট, ইংরেজ বণিক এবং কাশিমবাজার কুঠি। কিন্তু চারশো বছরে সবকিছুই কি একেবারে বিলীন হয়েছে? হয়তো হয়নি। তাই মুর্শিদাবাদের গ্রামে গ্রামে আজও চাষ হয় তুঁতগাছ, পালন করা হয় রেশমগুটি। খোশবাগ থেকে রোশনিবাগ যাওয়ার পথে এখনও চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ তুঁতক্ষেত। সচরাচর তুঁতগাছের সঙ্গে আমাদের পরিচয় নেই। তাই রাস্তার দুই ধারে সারি সারি তুঁতগাছ স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল জাগায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কেজিপ্রতি ৩১০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হয় তুঁতপাতা। খরচ বাদে লাভও মন্দ নয়। ব্যবসায়ীদের কাছে সরাসরি বিক্রির সুবিধা থাকায় দামও ভালো পাওয়া যায়। মুর্শিদাবাদ জেলায় এখনও এরকম ছোট-বড় বহু তুঁতক্ষেত রয়েছে।



জিয়াগঞ্জ মুর্শিদাবাদ জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। শহর পেরিয়ে একটু এগোলেই দেখা মেলে তাঁতিপাড়ার। এখানেই তৈরি হয় সিল্কের শাড়ি। অনেকে একে ‘সিল্ক সিটি’ বলেও অভিহিত করেন। নামে তাঁতিপাড়া হলেও বর্তমানে এখানে তাঁতি পরিবারের সংখ্যা হাতে গোনা, মাত্র কয়েকটি। কারখানার মালিকেরাই মূলত এই কাজ পরিচালনা করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যরাই কর্মী হিসেবে কাজ করেন। আলাদা করে কর্মচারী নিয়োগ করলে লাভ থাকে না। ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি সহায়তাও প্রায় নেই বললেই চলে। সরকার খাদি শিল্পে অনুদান দিলেও সিল্ক শিল্পে সেই পরিমাণ সহায়তা মেলে না। শাড়ির ধরন অনুযায়ী কারখানা-মালিকেরা ৮০০ থেকে ১,২০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক পান। অনেক সময় মহাজন সুতা সরবরাহ করেন, সেক্ষেত্রে পারিশ্রমিক আরও কমে যায়। তবুও বাপ-দাদার পেশা বলে এই শিল্পকে আঁকড়ে ধরে আছেন তাঁরা। তাঁতিপাড়ার প্রায় সকলেরই একই বক্তব্য—আর দশ বছর পর হয়তো বর্তমান রূপে মুর্শিদাবাদ সিল্কের অস্তিত্বই থাকবে না। রেশম শিল্পের সূত্রে এ পাড়ার অনেক পরিবারেরই বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো না কোনো যোগসূত্র রয়েছে। কারও পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছিল বাংলাদেশে, কেউ আবার শৈশবে সেখান থেকে এসেছেন। সময়ের প্রবাহে তাঁরা স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন এপার বাংলায়।



সমৃদ্ধ গ্রাম মির্জাপুরে সহস্রাধিক পরিবারের বাস। একসময় এখানকার অধিকাংশ মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল তাঁত বোনা। গ্রামে প্রায় ছয়শো তাঁত ছিল, বর্তমানে যা অর্ধেকের কাছাকাছি। কারণ, মির্জাপুরে যে মানের গরদ সিল্ক তৈরি হয়, সেই তুলনায় তার বাজার ও প্রচার অত্যন্ত সীমিত। অথচ বর্তমান যুগে ব্যবসার প্রসারে প্রচারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সেই জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে মির্জাপুরের। ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে, যখন অনলাইন বিপণন ক্রমবর্ধমান, তখনও মির্জাপুর অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। অথচ সঠিক প্রচারকৌশল এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে মুর্শিদাবাদ সিল্ক আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।



মির্জাপুর মূলত গরদ সিল্কের জন্য বিখ্যাত। আগে গরদের শাড়িতে সীতাহরণ, জটায়ু বধ কিংবা শকুন্তলার মতো পৌরাণিক কাহিনি স্থান পেত। এখন সেই জায়গা দখল করেছে আধুনিক নকশা। সাদা সিল্কের সুতোকে বিভিন্ন রঙে রাঙিয়ে তৈরি হচ্ছে রঙিন জাকার্ড শাড়ি। কোনোটি সিঙ্গল জাকার্ড, কোনোটি ডাবল, আবার কোথাও যুক্ত হয়েছে থার্ড জাকার্ড প্রযুক্তির ছোঁয়া। জাকার্ড ব্রোকেডের বিভিন্ন নকশার শাড়ি এখন বাজারের বড় অংশ দখল করে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বর্ণচরী ব্রোকেড, স্বর্ণচরী ঘিচা, স্বর্ণচরী স্ট্রাইপ, স্বর্ণচরী ট্র্যাডিশনালসহ নানা বৈচিত্র্য। সিল্কের উপর জাকার্ড মেশিনে তৈরি ব্রোকেডের কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জরির সূক্ষ্ম নকশা। আগে এসব কাজ বাইরের কারিগরদের দিয়ে করাতে হতো, এখন তার অধিকাংশই স্থানীয়ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে। এসব শাড়ির মূল্য সাধারণত পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার টাকার মধ্যে। দাম তুলনামূলক বেশি হলেও বাজারে এর চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।



আধুনিক তাঁতশিল্পীদের মতে, উৎকৃষ্ট মানের শাড়িতে হাতের কাজ যতটা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, অপেক্ষাকৃত কমদামি শাড়িতে তা সম্ভব হয় না। কোরিয়াল শাড়ির সাদা জমিনের দুই পাশে পাঁচ থেকে সাত ইঞ্চি পাড় বুনতে প্রায় সাত দিন সময় লাগে। রঙিন জাকার্ড শাড়ি তৈরিতেও প্রয়োজন হয় প্রায় আট দিন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এসব শাড়ির দাম কিছুটা বেশি। তবে আশার কথা, ক্রেতারা এখন আর শুধু সস্তা শাড়ির দিকে ঝুঁকছেন না। গুণমানসম্পন্ন শাড়ির প্রতিও তাঁদের আগ্রহ বাড়ছে। আবার অনেকেরই আক্ষেপ, বর্তমান ই-যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনলাইন বিপণনে দক্ষ হতে পারলে মুর্শিদাবাদ সিল্ক জেলা ছাড়িয়ে দেশ-বিদেশের বাজারেও অতীতের মতো সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারত।



এক সময় মুর্শিদাবাদ ‘পূর্ব ভারতের সিল্ক মক্কা’ নামে পরিচিত ছিল। দেশ-বিদেশে মুর্শিদাবাদ সিল্কের কদর ছিল ঈর্ষণীয়। এখনও বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে এই সিল্কের প্রতি ভালোবাসা ও চাহিদা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সহজে পাওয়া যায় না উৎকৃষ্ট মানের মুর্শিদাবাদ সিল্ক। সিল্ক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারিগরদের অভিযোগ, প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণেই আজ এই শিল্পের এমন দুরবস্থা। কারিগরদের কল্যাণে যেমন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, তেমনই বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। যে সিল্কের খ্যাতি বিশ্বজনীন, সেই সিল্কের কারিগরেরাই আজ অস্তিত্বের সংকটে। অনিশ্চিত এই পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বহু শিল্পী। কেউ কেউ অন্য পেশার পাশাপাশি এখনও ধরে রেখেছেন এই ঐতিহ্যকে। কিন্তু আর কতদিন তা সম্ভব হবে, তা নিয়ে রয়েছে গভীর সংশয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার অভাবে কি তবে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে ঐতিহ্যবাহী মুর্শিদাবাদ সিল্ক? সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আজ এই প্রাচীন শিল্প এক গভীর সংকটের মুখোমুখি।



সুস্বাদু আবার স্বাস্থ্যকর ও...


সুস্বাদু খাবার মানেই যে শরীরের জন্য ক্ষতিকর, আর স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই যে স্বাদহীন, এই ধারণা আজ আর সত্য নয়। সঠিক উপকরণ, পরিমিত মশলা এবং উপযুক্ত রান্নার পদ্ধতির মাধ্যমে এমন অনেক পদ তৈরি করা যায়, যা যেমন পুষ্টিকর, তেমনই রসনাতৃপ্তিকর। এই সংকলনে তুলে ধরা হয়েছে এমন কিছু রান্নার রেসিপি, যেগুলি দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সহজেই স্থান পেতে পারে। এখানে রয়েছে বিভিন্ন স্বাস্থ্যকর উপাদানে তৈরি নানা পদ, যা শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি জোগানোর পাশাপাশি খাবারের স্বাদও বাড়িয়ে তুলবে। পরিবারে ছোট থেকে বড়, সকলের কথা মাথায় রেখেই বেছে নেওয়া হয়েছে এই রেসিপিগুলি।



স্বাস্থ্য ও স্বাদের এই মেলবন্ধন আপনাদের রান্নাঘরে নতুন অনুপ্রেরণা যোগাবে, এই আশা রাখি। আসুন, সুস্থ থাকার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাই, আর উপভোগ করি স্বাস্থ্যকর অথচ দারুণ সুস্বাদু সব রান্নার সম্ভার।



স্টিমড ক্যাবেজ রোল


নাজিয়া ফারহানা



কী কী লাগবে

বাঁধাকপির পাতা ৬টি, মুরগির কিমা ২ কাপ, গাজর আধা কাপ, কাঁচালঙ্কা কুচি ১ চা-চামচ, সয়া সস ১ টেবিল চামচ, অলিভ অয়েল ১ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মসলা গুঁড়ো আধা চা-চামচ, জায়ফল-জয়ত্রী গুঁড়ো সামান্য, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো সিকি চা-চামচ, লবণ স্বাদমতো।



কীভাবে বানাবেন

বাঁধাকপির পাতাগুলো আলাদা করে সামান্য লবণ মেখে রাখুন। গাজর কুচি করে নিন। একটি পাত্রে মুরগির কিমার সঙ্গে গাজর কুচি, অলিভ অয়েল, কাঁচালঙ্কা কুচি, সয়া সস, গরম মসলা গুঁড়ো, জায়ফল-জয়ত্রী গুঁড়ো এবং গোলমরিচ গুঁড়ো দিয়ে ভালোভাবে মেখে নিন। এরপর বাঁধাকপির প্রতিটি পাতার মধ্যে কিমার মিশ্রণ ভরে রোল তৈরি করুন। রোলগুলো স্টিমারে সাজিয়ে ভাপে সেদ্ধ করুন। ভালোভাবে সেদ্ধ হয়ে গেলে নামিয়ে নিন। গরম গরম পরিবেশন করুন।



স্টিমড কোফতা


নাজিয়া ফারহানা



কী কী লাগবে

মুরগি কিংবা খাসির কিমা ৪০০ গ্রাম, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ বাটা ৩ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা বাটা আধ টেবিল চামচ, টক দই ১ টেবিল চামচ, ধনেপাতা কুচি আধ টেবিল চামচ, গাজর কুচি আধা কাপ, Shalimar's Chef Spices জিরা গুঁড়ো আধা চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচের গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ কুচি আধা কাপ, দুধে ভেজানো পাউরুটি ১ টুকরা, Shalimar's Sunflower তেল ৩ টেবিল চামচ এবং লবণ স্বাদমতো।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে একটি ব্লেন্ডারে মাংসের কিমা, আদা বাটা, রসুন বাটা, পেঁয়াজ বাটা, পেঁয়াজ কুচি, টকদই, কাঁচালঙ্কা বাটা, লঙ্কা গুঁড়ো, দুধে ভেজানো পাউরুটি ও জিরা গুঁড়ো দিয়ে ভালোভাবে ব্লেন্ড করে নিন। তবে মিশ্রণটি খুব বেশি পাতলা করবেন না এবং একেবারে মিহিও করবেন না। এরপর মিশ্রণটি একটি বাটিতে নিয়ে তাতে লবণ, ধনেপাতা কুচি, গাজর কুচি, গোলমরিচের গুঁড়ো ও তেল দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। এবার হাত দিয়ে ছোট ছোট কোফতার মতো বল তৈরি করুন। স্টিমারের ট্রেতে কোফতাগুলো সাজিয়ে অন্তত ১৫ মিনিট ভাপে সেদ্ধ করুন। কোফতা ভালোভাবে সেদ্ধ হয়ে গেলে নামিয়ে নিন। গরম গরম স্টিমড কোফতা পছন্দের সসের সঙ্গে পরিবেশন করুন।



ওটস প্যানকেক


নাজিয়া ফারহানা



কী কী লাগবে

কলা ১টি, ডিম ২টি, ওটস আধা কাপ, বেকিং পাউডার আধা চা-চামচ, নুন ১ চিমটি, ভ্যানিলা এসেন্স কয়েক ফোঁটা, Shalimar's Sunflower তেল ভাজার জন্য, মধু পরিবেশনের জন্য।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে কলার খোসা ছাড়িয়ে ভালোভাবে ম্যাশ করে নিন। একটি পাত্রে ডিম দুটি ফেটিয়ে ম্যাশ করা কলার সঙ্গে মিশিয়ে নিন। এরপর ওটস, বেকিং পাউডার, নুন এবং ভ্যানিলা এসেন্স দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে ব্যাটার তৈরি করুন। ব্যাটারটি ১০–২০ মিনিট ঢেকে রেখে দিন, যাতে কিছুটা ঘন হয়ে আসে। এবার একটি তাওয়া বা ননস্টিক প্যান গরম করুন। তেল ব্রাশ করে গোল হাতা বা ছোট বাটির সাহায্যে পরিমাণমতো ব্যাটার তাওয়ার ওপর ঢেলে দিন। এক পিঠ সোনালি-বাদামি হয়ে এলে উল্টে দিয়ে অন্য পিঠও একইভাবে সেঁকে নিন। প্যানকেক তৈরি হয়ে গেলে নামিয়ে উপরে মধু ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।



ফ্রুটস সালাদ


নাজিয়া ফারহানা



কী কী লাগবে

কলা ২টি (মাঝারি), আনারস ২ কাপ, কমলা ২টি (মাঝারি), কিউই ২টি, বিচিবিহীন লাল আঙুর ১ কাপ, স্ট্রবেরি ১ কাপ, অরেঞ্জ জুস আধা কাপ, অরেঞ্জ জেস্ট আধা চা-চামচ, লেবুর রস ১/৪ কাপ, ব্রাউন সুগার এক-চতুর্থাংশ কাপ, লেবুর খোসা কুচি আধা চা-চামচ, কাঁচালঙ্কা কুচি ১টি, পুদিনাপাতা কুচি ১ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices চাট মশলা ১ চা চামচ, সরষে গুঁড়ো আধ চা-চামচ এবং লবণ সামান্য।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে একটি ছোট কড়াইয়ে অরেঞ্জ জুস, অরেঞ্জ জেস্ট, লেবুর রস, লেবুর খোসা কুচি এবং ব্রাউন সুগার একসঙ্গে মিশিয়ে উনুনে বসান। মাঝারি আঁচে ৫–৮ মিনিট রান্না করুন, যতক্ষণ না মিশ্রণটি কিছুটা ঘন হয়ে সিরাপের মতো হয়। তারপর নামিয়ে ঠান্ডা হতে দিন। এদিকে সব ফল সমান আকারে কেটে নিন। আনারসের টুকরোগুলো সামান্য চিনি দিয়ে হালকা ভেজে ক্যারামেলাইজড করে নিন। এরপর একটি বড় সার্ভিং বোলের মধ্যে কলা, আনারস, কমলা, কিউই, লাল আঙুর ও স্ট্রবেরি নিন। এর সঙ্গে তৈরি করা সস, পুদিনাপাতা কুচি, কাঁচালঙ্কা কুচি, সরিষা গুঁড়া এবং সামান্য লবণ দিয়ে আলতোভাবে মিশিয়ে নিন। ফ্রিজে কিছুক্ষণ রেখে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন। ঠান্ডা ঠান্ডা ফ্রুটস সালাদ খেতে সবচেয়ে ভালো লাগে।


ওটসের স্যুপ


নাজিয়া ফারহানা



কী কী লাগবে

ওটস ২ টেবিল চামচ, দুধ ১ কাপ, পেঁয়াজ কুচি ১টি, রসুন কুচি ২ কোয়া, ধনেপাতা কুচি সামান্য, গোলমরিচ গুঁড়ো সামান্য, তেল পরিমাণমতো এবং লবণ স্বাদমতো।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে একটি প্যানে তেল গরম করে এতে পেঁয়াজ কুচি এবং রসুন কুচি দিয়ে ভাজতে থাকুন। বাদামি হয়ে গেলে আঁচ থেকে নামিয়ে রাখুন। অন্য একটি ‌প্যানে জলের মধ্যে ওটস সিদ্ধ করুন। ঘন হয়ে গেলে এর মধ্যে দুধ দিয়ে পাঁচ মিনিট রান্না করুন। এবার এতে ভাজা পেঁয়াজ ও রসুন দিয়ে নাড়ুন। সবশেষে লবণ ও গোলমরিচের গুঁড়ো দিয়ে নেড়ে, নামিয়ে ফেলুন। ধনেপাতা কুচি দিয়ে সাজিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন দারুণ সুস্বাদু ওটসের স্যুপ।


এগ সালাদ


নাজিয়া ফারহানা



কী কী লাগবে

আলু ৫টি (সিদ্ধ), ডিম ৩টি (সিদ্ধ), পেঁয়াজ কুচি আধা কাপ, আপেল ১টি, বেদানা আধা কাপ, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো ১ চা-চামচ, মেয়োনিজ আধ কাপ এবং লবণ স্বাদমতো।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে সিদ্ধ আলুর খোসা ছাড়িয়ে ছোট কিউব করে কেটে নিন। সিদ্ধ ডিমও ছোট টুকরো করে কেটে রাখুন। আপেলের খোসা ছাড়িয়ে কিউব করে কেটে নিন। এরপর একটি বড় বাটিতে আলু, ডিম, পেঁয়াজ কুচি, আপেল ও বেদানা একসঙ্গে নিন। এর মধ্যে মেয়োনিজ, গোলমরিচ গুঁড়ো এবং স্বাদমতো লবণ দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। পরিবেশনের আগে কিছুক্ষণ ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে নিন। ঠান্ডা ঠান্ডা এগ সালাদ পরিবেশন করুন।

রান্নাঘরের টুকিটাকি


নিজস্ব প্রতিনিধি


১.রান্নাঘরে নিমপাতা বা বকুল ফুল রাখলে পোকামাকড় হবে না। ছোট আরশোলার উপদ্রপ কমবে।


২.প্রেসার কুকারে রান্নার সময় ভেতরে একটা স্টিলের চামচ দিয়ে ঢাকনা আটকালে হুইসেলের সময় উথলে উঠবে না।


৩.সর্ষে বা পোস্ত পেস্ট করার সময় সবার আগে যদি শুকনো অবস্হায় দুবার মিক্সিতে ঘুরিয়ে, তারপর অল্প জল দিয়ে বাটা হয় তাহলে খুব মসৃণ হবে।


৪.রান্নায় দই ব্যবহার করার সময় অল্প ময়দা বা বেসনে গুলে রান্নায় দিলে ফেটে যাবে না।


৫.মাছের ডিম ভাজার সময় খই মিশিয়ে চটকে মেখে ভাজলে, ভাজার পর ঠাণ্ডা হলেও শক্ত হয়ে যাবে না।


৬.যে কোনো রান্নায় বেশী ঝাল হলে একটু দুধ মিশিয়ে জ্বাল দিলে ঝাল কমে যাবে।


ছবির ভূত


শেখর বসু


রিনির পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরদিনই ওর বাবা ওর জন্যে তিনটে ড্রয়িং খাতা আর অনেকগুলো রং পেনসিল কিনে এনেছিল। বাবার হাতের প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে রিনি জিজ্ঞেস করল, ‘এর মধ্যে কী আছে বাবা ?’

‘খুলে দেখ।’

রিনি একটানে প্যাকেট খুলতেই নানা রঙের একগাদা পেনসিল ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। বাবা হাসতে হাসতে মেয়েকে বলল, ‘এই সব রঙিন পেনসিল দিয়ে তুমি ছবি আঁকবে খাতায়।’

‘কিসের ছবি?’

‘যে ছবি আঁকতে তোমার ইচ্ছে হয় সেই ছবি ।’

কাঁধ পর্যন্ত নেমে আসা একমাথা কোঁকড়ানো চুল ঝাঁকিয়ে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ছবি আঁকতে বসে গিয়েছিল রিনি।

শিল্পীকে ছবি আঁকার সুযোগ দিয়ে বাবা চলে গিয়েছিল অন্য ঘরে।

ঘণ্টাখানেক বাদে একটা খাতা বুকে জড়িয়ে ধরে বাবার কাছে ছুটে এসেছিল রিনি । ‘এই দেখ কয়েকটা ছবি এঁকে ফেলেছি।’



‘এর মধ্যেই ! কই দেখি ।’

বাবা ছবির খাতার পাতা ওলটাতে ওলটাতে বলল, ‘বাহ্‌ ! এ তো দেখছি সব ভূতের ছবি । তুমি তো দারুণ দারুণ সব ভূতের ছবি আঁকতে পারো !’

ঠোঁট উলটে রিনি বলে উঠল, ‘ভূতের ছবি কোথায় ! এই দেখ, এটা হচ্ছে বাঘ। এই দেখ বাঘের গোঁফ, আর এটা হচ্ছে লেজ । এটা পাখি, আকশে উড়ছে। আর একে চিনতে পারলে না ? রোজ সকালে থেকে পাঁচিল টপকে আমাদের বাড়িতে আসে। সেই সাদা-কালো বেড়ালটা। নাকের নীচে কালো রঙ, ঠিক গোঁফের মতো দেখায়। পা মুড়ে নিচু হয়ে বসে আছে,তাই তুমি ওকে চিনতে পারছ না। ’

মেয়ের প্রতিটি কথায় গম্ভীর মুখে সায় দিয়েছিল বাবা । ‘ ঠিক,সব ছবিই খুব সুন্দর ! আমি প্রথমে তাড়াহুড়ো করে দেখেছিলাম তো, তাই মনে হয়েছিল সব ছবিই ভূতের।’

রিনির চোখ আবার বড় বড় হয়ে উঠেছিল । ‘ ভুতদের চেহারা কি অনেক রকম হয় ?’

‘হ্যাঁ, অনেক রকম। কোনও ভূত তালগাছের মতো লম্বা, কোনও ভূত এইটুকু। কেউ খুব রোগা, কেউ খুব মোটা। কারও গলা এতখানি লম্বা, কারও মাথা ঠিক ঘাড়ের ওপর বসানো। পেত্‌নিরা একগলা ঘোমটা দেয় মাঝে মাঝে, নারকেল গাছের ডাল দিয়ে উঠোন ঝাঁট দেয় । কখনো কখনো মাঝরাত্তিরে মাছ ধরতে যায় পুকুরে । ভূত-পেত্‌নিরা আবার নিজেদের চেহারা পালটেও ফেলতে পারে যখনতখন।’



ব্যস, ভূতের গল্প শোনাবার বায়না জুড়ল রিনি। দু-একটা ভূতের গল্প সবাই জানে, কিন্তু দুটো গল্প শোনাবার পরেও রেহাই পেল না রিনির বাবা । ‘ আরও গল্প বলো।’ কিছুটা কষ্ট করে মনে করে, কিছুটা বানিয়ে আরও দুটো গল্প শোনাবার পরে তখনকার মতো ছাড় পেয়েছিল বাবা । কিন্তু ভূত-পেত্‌নির গল্প শোনার ইচ্ছেটা রিনির মনের মধ্যে কেমন যেন শেকড় ছড়িয়ে বসেছিল।

পরদিন বাবা অফিস যেতেই মায়ের কাছে ছুটেছিল রিনি। ‘ভূতের গল্প বলো’। মা এক কথায় ওকে ভাগিয়ে দেওয়ার গলায় বলল, ‘ভূতের গল্প জানি না ।’ সরালেই সরে যাওয়ার মেয়ে নয় রিনি, মায়ের আঁচল টেনে ধরে বলল, ‘তাহলে পেত্‌নির গল্প বলো।’

পেত্‌নির গল্পটা খুব একটা জমাটি হয়নি, কিন্তু মেয়ের আবদারে মাকে বলতে হয়েছিল শেষ পর্যন্ত। গল্প শেষ হতেই রিনি বলল, ‘আর একটা বলো।’

মা এবার ওকে ভাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা না করে নরম গলায় বলল, ‘হাতের কাজটা শেষ করে নিই, তারপর তোকে আর একটা গল্প বলব।’

তখনকার মত রেহাই পেয়েছিল মা, কিন্তু হাতের কাজ শেষ হওয়ার পরেই রিনি এসে টান লাগিয়েছিল মায়ের আঁচলে—‘এবার বলো।’

মা বলল, ‘বলছি বলছি, একটু জিরোতে দে । এক কাজ কর, যে পেত্‌নিটার গল্প বললাম তোকে, তার একটা ছবি এঁকে ফেলত চট করে।’ অমনি ছবি আঁকতে ছুটেছিল রিনি। বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পরেই আবার শুরু হয়েছিল ওর বায়না—‘ আর একটা ভূতের গল্প বলো।’

কয়েকদিনের মধ্যে বাবা-মায়ের ভূতের গল্পের ভাঁড়ার শেষ। গল্প বানাবার দমও ফুরিয়ে গেছে প্রায়, কিন্তু রিনির গল্প শোনার আগ্রহে টান পড়েনি একটুও। বাবা সেদিন রিনিকে একটু বেশি মাত্রায় আদর করার পরে বলল, ‘‘তোমাকে আমরা এই ক’দিনে কতরকম ভূত-পেত্‌নির গল্প শুনিয়েছি। কতরকম চেহারা তাদের । তুমি এক কাজ করো এবার। সবার ছবি এক-এক করে এঁকে ফেল । আঁকা শেষ হলে আবার তোমাকে ভূতের গল্প বলব। ’’

কাঁধ পর্যন্ত লম্বা কোঁকড়ানো চুল আচ্ছা করে ঝাঁকিয়ে নেওয়ার পরে রিনি ‘ঠিক আছে’ বলে ছুট লাগিয়েছিল ওর পড়ার ঘরে।

গল্পের সেই ভূতগুলোর ছবি আঁকতে শুরু করে দিয়েছিল রিনি। ভূতের ছবিগুলো সত্যিই ভূতের মতো । কত রকমের ভূত ! কোনও ভূত রোগা, হাড্ডিসার, কেউ বেজায় মোটা, কারও কপালে চোখ, কারও হাত-পাগুলো ইয়া লম্বা-লম্বা।

ভূতের ছবিগুলো আঁকার পরেই রিনি খাতা নিয়ে ছুটেছিল বাবার কাছে। ছবি দেখে বাবা অবাক । কয়েকটা ভূতকে চিনতেও পেরেছিল। বলল, ‘এটা তো মামদো ভূত। তাই না ?’

ঘাড় নেড়েছিল রিনি।

ছবির নীচে ভূতেদের নাম লিখে দিয়েছিল বাবা। মেছো ভূত, গলাকাটা ভূত, ব্রহ্মদত্যি, আলেয়া ভূত । কিছু-কিছু ভূতের নাম রিনিও বলে দিয়েছিল, এগুলো ওর বানানো । বাবা জিজ্ঞেস করল, ‘আরে ! এই ভূতগুলো তুই পেলি কোথায়?’

গম্ভীর ভাবে রিনি উত্তর দিয়েছিল, ‘ওরা নিজে থেকে এসেছে।’

সায় দিয়েছিল বাবা, ‘ভূতদের এই স্বভাব, দু-চারজনকে ডাকলে সঙ্গে আরও অনেকে চলে আসে।’

রিনি এখন শুধুই ভূতের ছবি আঁকে—নানা ধরনের ভূত। ভূতের ছবি এঁকে এঁকে ওর ড্রয়িং খাতাগুলো ফুরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু ছবি আঁকা থামেনি । স্কুলের খাতার শেষের দিকের কয়েকটা পাতা ভূতের ছবিতে ভর্তি, বাবার অফিসের ডায়েরির মাঝখানের পাতায় ভূতের ছবি । মায়ের হিসেবের খাতায় ভূতের ছবি। ভূতের ছবি ক্যালেন্ডারে,পত্রিকার পাতায় । সব জায়গাতেই বিচিত্র সব ভূতের ছবি।

বাড়ির চারদিকে ভূতের এই উত্পাতের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বাবা এবার ওকে পাঁচটা ছবি আঁকার খাতা, দু প্যাকেট রঙ পেনসিল, জল রঙ কিনে দিয়ে বলল, ‘যত খুশি তোমার ভূতের ছবি আঁকো, কিন্তু শুধু খাতায় আঁকবে। এগুলো শেষ হলে আবার খাতা-রঙ এনে দেব, তবে খাতা ছাড়া আর কোথাও আঁকবে না ।’

ঘাড় নেড়ে রং-তুলি আর খাতা নিয়ে ভূতের ছবি আঁকতে বসে গিয়েছিল রিনি। নতুন-নতুন সব ভূত ! কী তাদের চেহারা ! আঁকার পরে রিনিই খানিকক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত তাদের দিকে । এই ভাবে দিনদুয়েক চলার পরে ঘটল সেই অদ্ভুত সেই ঘটনাটা। কোণের ঘরে মেঝের ওপরে বসে একমনে ছবি আঁকছিল রিনি, তারপরেই ও আঁ-আঁ করে চেঁচিয়ে উঠেছিল।

চিত্কার শুনে ছুটে গেল মা । কী ব্যাপার ?

রিনি মেঝের ওপরে বসে ঠকঠক করে কাঁপছিল।

মা ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করার পরে কাঁপুনি কমেছিল মেয়ের। শেষে অনেক কষ্টে কান্না থামিয়ে রিনি বলল, ‘ভূত।’

টিউবলাইটের আলো ঝকঝক করছিল চারদিকে । একটু আগেই সন্ধে হয়েছে। ঘুগনিওয়ালা ঘুগনি ফেরি করতে ঢুকেছে গলিতে । তার মজার গলার স্বর ভেসে আসছে বাতাসে। মা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় ভূত ! ভূত কোথায় ?’

রিনি ভয়ে ভয়ে কাগজের ওপরে ওর আঁকা ভূতের ছবিটা দেখাল মাকে । ছবি দেখে মায়ের সে কী হাসি ! হাসি আর থামেই না । শেষে কোনও মতে হাসি থামিয়ে বলল, ‘ বোকা মেয়ে কোথাকার ! ভূত কোথায় ? এ তো ভূতের ছবি । আর ভূতের এই ছবিটা তো তুমিই এঁকেছ । তাই না?’

মায়ের কথা শুনে রিনির ভয় একটুখানি কমেছিল। ও আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে জানাল, ভূতের ছবিটা ওই এঁকেছে ।

ওর জবাব পেয়ে মা আর একবার হেসে উঠেছিল। তারপর বললেন, ‘কী বোকা মেয়ে তুমি ! নিজের আঁকা ভূতের ছবি দেখে কেউ কি ভয় পায়? তুমিই বলো না?’ এবার একটু লজ্জা পেয়ে গিয়েছিল রিনি। ‘কিন্তু মা, ও তো—। ’

‘কী ও ?’

‘ও তো একটা ভূত ।’ গলা ছড়ে হেসে উঠেছিলেন মা । ‘ভূত তো বটেই । কিন্তু ওই ভূতটা তো আঁকা ভূত । ওই ভূতটাকে এঁকেছে আবার আর একটা ভূত—সেই ভূতটার নাম রিনি। না-না, ভূত না, পেত্‌নি । তাই তো?’

মায়ের কথা শুনে রিনি এবার মুখ লুকলো মায়ের কাঁধে ।

বাবা অফিস থেকে বাড়ি ফিরলে মেয়ের এই কাণ্ডের কথা বাবাকে শোনাল মা । শুনে বাবা হাসল হো হো করে । ব্যাপারটা কিন্তু ওখানেই শেষ হল না ।

ভূতের ছবি আঁকা থামল না রিনির। আগের মতোই ও খাতার ওপর মাথা গুঁজে একমনে ভূতের ছবি আঁকে। আঁকা শেষ হয়ে গেলেই ও নিজের আঁকা ভূতের ছবির দিকে তাকিয়া আঁ আঁ করে ওঠে। অমনি ওখানে ছুটে যায় ওর মা। বাবা থাকলে বাবা।

কত করে রিনিকে বোঝানো হয়েছে তুমি আর ভূতের ছবি এঁকো না । অনেক ভূতের ছবি এঁকেছ, এবার অন্য কিছুর ছবি আঁকো ।

পাঁচখানা ছবির বই মেয়েকে কিনে দিয়েছে বাবা। কোনো বইতে শুধুই পাহাড়, গাছপালা আর ফুলের ছবি । কোনও বইতে কেবল জন্তু-জানোয়ার—বাঘ, সিংহ, হাতি, বাঁদর, হরিণ, শেয়াল—এই সব। কোনও বইতে গ্রামের ছবি—আমবাগান, ধানক্ষেত ; পুকুরে হাঁস চরছে। কোনও বইতে শহরের রাস্তাঘাট, বাড়িঘর, পার্ক আর মেলার ছবি। সঙ্গে ছবি আঁকার খাতা, রং-তুলি।

রিনিকে আদর করে বাবা বলেছিল, ‘কী সুন্দর সব ছবির বই ! এই সব ছবিই তুমি তোমার খাতায় আঁকবে। প্রথমে পেনসিল দিয়ে আঁকবে, তারপর রঙ লাগাবে ছবিতে। খুব মন দিয়ে আঁকবে,তাহলে দেখবে বইয়ের ছবির চাইতেও তোমার ছবি সুন্দর হয়ে উঠেছে। কী, পারবে তো?’

জবাবে লক্ষ্মী মেয়ের মতো একদিকে লম্বা করে মাথা কাত করেছিল রিনি। ছবির বইগুলো খুব পছন্দ হয়েছিল ওর। ঘুরিয়েফিরিয়ে অনেকক্ষণ ধরে দেখল ছবিগুলো । বাবা-মা ভাবল, যাক, বিপদ কেটে গেছে, এবার থেকে রিনির খাতায় অন্য রকমের ছবি দেখা যাবে।

কিন্তু তা হল না । নতুন ড্রয়িং খাতায় ছবি আঁকতে গিয়ে রিনি আবার বিচ্ছিরি চেহারার এক ভূতের ছবি আঁকল । তারপর ভয় পেয়ে ফের আঁ আঁ করে উঠল ।

একদিন নয়, দুদিন নয়, পর পর তিনদিন ঠিক একই ধরনের ঘটনা ঘটল । ভূতের ছবি এঁকে ভয় পেয়ে চিত্কার করে ওঠে রিনি। মা এবার রাগ-রাগ মুখ করে বলল, ‘তোমার আর ছবি আঁকার দরকার নেই । ছবি আঁকতে গেলে শুধুই ভূতের ছবি--। তারপর নিজের আঁকা ছবি দেখে নিজেই আঁতকে উঠবে । লোকে শুনলে বলবে কী ?’

মায়ের কাছে বকুনি খেয়ে মুখ ভার করে বসেছিল রিনি। তবে বেশিক্ষণ নয়, ছোটদাদু ওদের বাড়িতে আসতেই মুখে হাসি ফুটেছিল রিনির। ছোটদাদু পাশের পাড়ায় থাকেন, মাঝে মাঝেই ওদের বাড়িতে চলে আসেন। এলেই মজার মজার কত গল্প শোনান ওকে। রিনির সঙ্গে দারুণ ভাব ছোটদাদুর। ওঁর গল্পের ঝুড়ি খালি হয় না কখনো। শুনতে চাইলেই নতুন নতুন গল্প শোনান । মায়ের বকুনির কথা একদম ভুলে গিয়ে একলাফে ছোটদাদুর কোলে উঠে বসে রিনি বলল, ‘গল্প বলো দাদু ।’

‘বেশ, কিসের গল্প শুনবে বলো ?’

সঙ্গে সঙ্গে রিনির জবাব—‘ভূতের গল্প ।’

রিনির মা ওখানে ছিলেন, একটু বুঝি ভয়-পাওয়া গলাতেই বলে উঠল, ‘না-না, কক্ষনো ওকে ভূতের গল্প বলবেন না। কী হয়েছে জানেন--। ’ এই না বলে রিনির গাদা গাদা ভূতের ছবি আঁকা আর সেই সব ছবি দেখে ভয় পাওয়ার গল্প শুনিয়ে দিল ওঁকে।

সব শুনে দাদু বললেন, ‘রিনির কী দোষ ! বিচ্ছির চেহারার ভূতগুলো খুব বিচ্ছিরি স্বভাবের হয়। আমার ছেলেবেলায় ওরা আমাকে কম জ্বালিয়েছে নাকি ! শেষে ওদের একদিন আচ্ছা করে জব্দ করে দিলাম--।’

চোখ বড় বড় করে ছোটদাদুর গল্প শুনছিল রিনি । ‘কী করে ওদের জব্দ করলে?’

‘দাঁড়াও ! জব্দ করার কায়দাটা তোমাকে শিখিয়ে দিচ্ছি। তুমি তোমার ড্রয়িং খাতা, রঙ-পেনসিল নিয়ে এসো তো— ।’

রিনি একছুট্টে ওর ছবি আঁকার ব্যাগটাই নিয়ে এলো।

ছোটদাদু ড্রয়িং খাতার পাতা উলটে রিনির আঁকা ভূতের ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিক, ঠিক এই ভূতগুলোই আমার ছেলেবেলায় আমার ড্রয়িংখাতার পাতায় এসে জুটেছিল । যেমন বিচ্ছিরি চেহারা, তেমনি বিচ্ছিরি স্বভাব । বিচ্ছিরি ভূত ! তখন আমি করলাম কি--। ’

‘কী? কী করলে?’

‘এইরকম একটা কালো রঙ-পেনসিল নিয়ে বিচ্ছিরি ভূতগুলোর ওপর হিজিবিজি দাগ কাটতে লাগলাম । ব্যস, আস্তে আস্তে হিজিবিজি দাগের আড়ালে বিচ্ছিরি ভূতগুলো একদম চাপা পড়ে গেল । তারপর--। ’

‘তারপর?’

ছোটদাদু লাল রঙের একটা পেনসিল তুলে নিলেন হাতে, তারপর ড্রয়িংখাতার সাদা পাতায় খুব মজার চেহারার একটা ভূত এঁকে ফেললেন । ভূতটার এত বড় একটা হাঁ । মুখে দু-তিনটে মোটে দাঁত । কিন্তু ফোকলা মুখের হাসিটা বড় মিষ্টি। মুখ হাঁ-করা অত বড় হাসি তো, চোখদুটো তাই ছোট হয়ে গেছে। ভূতের হাতে এত বড় একটা পেয়ারা। দাদু বললেন, ‘ ভূতটা এত হাসছে কেন বলো তো ?’

‘কেন?’

‘তুমি ওর সঙ্গে একটু ভাব করো, তাহলেই জানতে পারবে।’

‘না-না, তুমি বলো ।’ রিনি ওর ছোটদাদুর হাত ধরে ঝুলে পড়েছিল।

‘ঠিক আছে, বলছি । ভূতটা বুড়ো ভূত তো । দাঁত আছে মোটে তিনটে, তাও নড়বড়ে । ওর হাতের পেয়ারাটা ডাঁশা । খেতে ভয় পাচ্ছে, খেতে গিয়ে যদি ওই তিনটে দাঁতও পড়ে যায় !

এদিকে ভয় পাচ্ছে, ওদিকে আবার লোভও হচ্ছে খুব। অমন ডাঁশা পেয়ারার লোভ কি ছাড়া যায় ! নিজের এই দোনামনা ভাব দেখে ওর নিজেরই খুব হাসি পেয়ে গেছে । এরা হল মজার ভূত । মজার ভূতরা খুব ভালো বন্ধু হয় । মজার মজার গল্প শোনায় শুধু।’

ছোটদাদু অনেকক্ষণ ধরে এই সব গল্প শোনাবার পরে চলে গেলেন । আর উনি চলে যাওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ড্রয়িংখাতার ওপর ঝুঁকে পড়েছিল রিনি। প্রথমেই কালো রঙের পেনসিল বাগিয়ে হিজিবিজি দাগ টানল বিচ্ছিরি চেহারার দুটো ভূতের ওপর। কালো দাগের নীচে চাপা পড়ে গেল বিচ্ছিরি ভূত। তারপরেই সাদা পাতায় মজার চেহারার কয়েকটা ভূত এঁকে ফেলল চটপট। ভূতগুলো এমন যে দেখলেই হাসি পেয়ে যায়। ফিক করে হেসেও ফেলেছিল রিনি।

ব্যস, শুরু হয়ে গেল রিনির মজার ভূতের ছবি আঁকা।

হিজিবিজি দাগের নীচে চাপা পড়ে যায় বিচ্ছিরি ভূতগুলো, আর মজার মজার সব ভূতের ছবি ফুটে ওঠে সাদা পাতায়। এরা সবাই বন্ধু ভূত। মজার ভূত । এদের সঙ্গে কত গল্প হয় রিনির। আড়াল থেকে মেয়ের ওপর নজর রেখেছিলেন ওর মা। এখন নিশ্চিন্ত । জব্বর এক পথ বাতলে দিয়েছেন ওর ছোটদাদু। ভয় পাওয়ার বদলে এখন শুধু হাসি আর গল্প। ভূতের ছবি এঁকে আর কখনও ভয় পায়নি রিনি।

সেদিন ওর মা বাইরে থেকে শুনল ঘরের মধ্যে রিনি কার সঙ্গে বকবক করে যাচ্ছে সমানে।

কে এলো সাতসকালে ? ঘরে ঢুকে দেখে কেউ তো নেই, রিনি মেঝেতে দু-পা ছড়িয়ে বসে খাতার দিকে তাকিয়ে কথা বলে যাচ্ছে সমানে । অবাক হয়ে মা বলল, ‘কী বলছ তুমি তখন থেকে?’

একটু হেসে উত্তর দিল রিনি, ‘গল্প করছি, এর সঙ্গে।’

মা উঁকি মেরে দেখল, খাতার ওপর মজার চেহারার একটা ভূতের ছবি এঁকেছে রিনি । হাসতে হাসতে মা জিজ্ঞেস করল, ‘তা, কী গল্প হচ্ছিল তোমার ভূত বন্ধুর সঙ্গে?’

রিনি এবার একটু চটে উঠে বলল, ‘তুমি এখন যাও তো। তুমি থাকলে ও আমার সঙ্গে কথাই বলবে না ।’

রিনির আঁকা এই ভূতটার লম্বা-লম্বা হাত, লম্বা-লম্বা ঠ্যাং। মাথা প্রকাণ্ড, তবে মুখটা বেশ হাসি-হাসি। সেদিকে তাকিয়ে মা বলল, ‘তোমার এই ভূত-বন্ধুটা খুব লাজুক,না ?’

‘আহ্‌ ! তুমি যাও তো মা।’

মা আর কী করবে ? গল্পের সময় বিরক্ত করা ঠিক নয় ভেবে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে ।

একটু বাদেই রিনি আবার প্রাণের গল্প জুড়ে দিয়েছিল মজার চেহারার ওই বন্ধু-ভূতের সঙ্গে।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page