বাংলায় বৃষ্টির ব্রত, পুণ্যি-পুকুর| ঘর ঠাণ্ডা রাখতে ঘাসের পর্দা| কাঁচা আমের ৬ পদ| রবিবারের গল্প: পথের বাঁকে রহস্য
- রোজকার অনন্যা

- Apr 25
- 13 min read

বাংলায় বৃষ্টির ব্রত, পুণ্যি-পুকুর
"পুণ্যিপুকুর ব্রতমালা
কে করে গো সকালবেলা।
আমি সতী,লীলাবতী
সাতভায়ের বোন, ভাগ্যবতী।
হবে পুত্র, মরবে না
ধান সে গোলায় ধরবে না।
পুত্র তুলে স্বামীর কোলে
আমার মরণ হয় যেন এক গলা গঙ্গাজলে…"

পুণ্যিপুকুর ব্রত বাংলার হিন্দু সমাজের একটি প্রাচীন মেয়েলি কুমারী-ব্রত। গ্রামীণ বাংলায় পাঁচ থেকে নয় বছর বয়সী কুমারী মেয়েরা চৈত্র সংক্রান্তি থেকে বৈশাখ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় এক মাস ধরে এই ব্রত পালন করে।বৈশাখের তীব্র গরমে যখন নদী-নালা শুকিয়ে যায়, সেই শুষ্ক সময়েও আজ নদিয়া, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূমের কিছু গ্রামে এই ব্রতের প্রচলন দেখা যায়। যেখানে এখনও পুকুরের জলই প্রধান পানীয় উৎস, সেখানে পর্যাপ্ত জলের জন্য প্রার্থনা জানাতেই এই ব্রত পালিত হয়। বাড়ির উঠোনে ছোট গর্ত খুঁড়ে জল ভরে নেওয়া হয়, যা ভরন্ত পুকুরের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। সাধারণত সকাল বা সন্ধ্যায় এই ব্রত করা হয়, তাই ছড়ার মধ্যেই প্রশ্ন তোলা হয়, “এই দুপুরবেলা কে পুজো করছো?”

গ্রামবাংলার মেঠো আঙিনা, মেঝে, পুকুরপাড় বা বাগানে এই ব্রত পালিত হয়। এটি সম্পূর্ণরূপে মেয়েদের ব্রত হওয়ায় এখানে কোনও মন্ত্র বা পুরোহিতের প্রয়োজন হয় না। পুণ্যিপুকুর ব্রতের তিনটি প্রধান পর্যায় রয়েছে আহরণ, ক্রিয়া ও ছড়া। প্রথম পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করা হয়, যেমন সাদা ফুল, চন্দন, দুর্বা ঘাস, তুলসী গাছ, পাতাসহ বেলগাছের ডাল, কয়েকটি কড়ি এবং একঘটি জল। দ্বিতীয় পর্যায়ে আলপনার মাধ্যমে ব্রতের মূল প্রতীকী রূপটি নির্মিত হয়। চৌখুপি নকশার মধ্যে একটি পুকুরের আকার আঁকা হয় এবং চারপাশে পান-সুপারির নকশা দিয়ে নদী-জল ভরপুর থাকার ইঙ্গিত রাখা হয়। চারটি ঘাটসহ একটি চৌকো পুকুরের প্রতিরূপ তৈরি করে প্রতিটি ঘাটের দুপাশ কড়ি দিয়ে সাজানো হয়। পুকুরের মাঝখানে ফুলের মালা দিয়ে সজ্জিত তুলসী গাছ বা বেলগাছের ডাল স্থাপন করা হয়। তৃতীয় পর্যায়ে চার থেকে ছয় পংক্তির ছড়া আবৃত্তি করতে করতে ঘটির জল গাছের উপর ঢালা হয়। ব্রতের শেষে তিনবার চন্দন সহযোগে সাদা ফুল ও দুর্বা ঘাস পুকুরে অঞ্জলি দিয়ে গলবস্ত্র হয়ে প্রণাম করা হয়।

এই পুজোর মন্ত্রের মধ্যে দশটি শ্লোক আছে। যথা সীতার মত সতী হবে, দশরথের মত শ্বশুর হবে, কৌশল্যার মত শ্বাশুড়ী হবে, রামের মত পতি হবে, লক্ষণের মত দেওর হবে, কুন্তীর মত পুত্রবতী হবে, দুর্গার মত সৌভাগ্যবতী হবে, দ্রৌপদীর মত রাঁধুনী হবে, গঙ্গার মত শীতল হবে, পৃথিবীর মত ধৈর্য্য হবে। পরপর চার বৎসর ব্রতপালনের শেষে হয় ব্রত উদযাপন। ব্রত উদযাপনের সময় ব্রাহ্মণ ভোজন করিয়ে ষোড়শদান দক্ষিণার সঙ্গে ব্রাহ্মণকে দিতে হয় সোনার বেল (অভাবে কাঞ্চন-মূল্য)। কোথাও কোথাও চারজন ব্রাহ্মণকে খাওয়ানোর বিধিও আছে। এই ব্রত শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে জলের অমূল্য সম্পর্ক এবং প্রকৃতির প্রতি প্রার্থনার এক সুন্দর সাংস্কৃতিক প্রকাশ।

ব্রতকথা:
একটি গ্রামে এক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী বাস করতেন। তাঁদের একমাত্র কন্যার নাম ছিল কলাবতী। ছোটবেলা থেকেই কলাবতীর মনে তুলসী গাছের প্রতি গভীর ভক্তি ছিল। সে যেখানে তুলসী গাছ দেখত, সেখানকার চারপাশ পরিষ্কার করে প্রতিদিন নিষ্ঠাভরে তুলসীগাছে জল দিত। এইভাবেই শান্তভাবে তাঁদের দিন কাটছিল। সময়ের স্রোতে কলাবতী যখন বারো বছরে পা দিল, একরাতে সে এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখল। স্বপ্নে এক বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তার শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, “তুলসী গাছের প্রতি তোমার এই ভক্তি ও ভালোবাসা দেখে আমি অত্যন্ত সন্তুষ্ট। আগামীকাল চৈত্র সংক্রান্তি। সেই দিন থেকে শুরু করে সমগ্র বৈশাখ মাস প্রতিদিন এক ঘটি জল তুলসীগাছে অর্পণ করবে দেখবে তোমার সমস্ত মনোবাসনা পূর্ণ হবে।” ঘুম ভেঙে কলাবতী তার বাবা-মাকে স্বপ্নের কথা জানাল। পরদিন চৈত্র সংক্রান্তির পবিত্র দিনে সে উঠোনে একটি ছোট পুকুর কেটে সেখানে তুলসী গাছ রোপণ করল। গলায় কাপড় জড়িয়ে প্রতিদিন নিয়ম করে সে সেই তুলসীগাছে জল দিতে লাগল। এভাবে টানা চার বছর তার ব্রত পালিত হতে থাকল।

চতুর্থ বছরের বৈশাখ সংক্রান্তির দিনে, যখন কলাবতী প্রতিদিনের মতো তুলসীগাছে জল দিতে গেল, তখন হঠাৎ এক দেবী তার সামনে আবির্ভূতা হলেন। স্নিগ্ধ হাস্যে দেবী বললেন, “আমায় চিনতে পারছো না? আমিই সেই, যিনি তোমার স্বপ্নে ব্রাহ্মণের বেশে এসেছিলাম। আজ তোমার ব্রত সম্পূর্ণ হয়েছে। তোমার নিষ্ঠা ও ভক্তির জন্য এই ব্রত জগতে প্রচার লাভ করবে। এখন তুমি আমার কাছে একটি বর প্রার্থনা করো।” কলাবতী ভক্তিভরে দেবীকে প্রণাম করে বলল, “মা, আমার একমাত্র ইচ্ছা আমার বাবা-মা যেন সর্বদা সুখে-শান্তিতে থাকেন।”
কলাবতীর এই নিঃস্বার্থ প্রার্থনায় দেবী অত্যন্ত প্রসন্ন হলেন। তিনি তাকে আশীর্বাদ করে বললেন, “তোমার বাবা-মা চিরকাল সুখে থাকবে, আর তুমি নিজেও শুভ বিবাহে আবদ্ধ হয়ে সুখী গৃহস্থ জীবন লাভ করবে।” দেবীর আশীর্বাদে কিছুদিনের মধ্যেই কলাবতীর বিবাহ এক জমিদার-পুত্রের সঙ্গে সম্পন্ন হয়। পরবর্তীকালে তার এই ব্রতকথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষের জীবনে ভক্তি ও আস্থার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।

ঘর ঠাণ্ডা রাখতে ঘাসের পর্দা: ঐতিহ্য, বিজ্ঞান ও আধুনিকতার মেলবন্ধন
গরমের দাবদাহে যখন শহর থেকে গ্রাম সব জায়গাতেই জীবন কার্যত অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, তখন শীতলতার সন্ধানে মানুষ নানা উপায় খোঁজে। এয়ার কন্ডিশনার, কুলার কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির নানা যন্ত্র থাকলেও, আমাদের ঘরোয়া সংস্কৃতিতে বহু আগে থেকেই এমন কিছু সহজ ও কার্যকর পদ্ধতি প্রচলিত ছিল যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তারই একটি হল ঘাসের পর্দা, যা অনেকের কাছে ‘খসখসের পর্দা’ নামেও পরিচিত। এই পর্দা কেবল একটি ব্যবহারিক বস্তু নয়, বরং এটি গ্রামীণ জীবনযাপন, প্রাকৃতিক উপাদান ও পরিবেশবান্ধব চিন্তার এক অনন্য নিদর্শন।
ঘাসের পর্দা কী?
ঘাসের পর্দা মূলত এক ধরনের বিশেষ সুগন্ধি ঘাস খাসখাস বা ভেটিভার (Vetiver) দিয়ে তৈরি। এই ঘাসের শিকড় শুকিয়ে বুনে তৈরি করা হয় মোটা ও জালের মতো পর্দা। এটি সাধারণ কাপড়ের পর্দার মতো নয়; বরং এর গঠন এমন যে, বাতাস চলাচল করতে পারে, আবার একই সঙ্গে ঠাণ্ডা অনুভূতি তৈরি করে। গ্রামবাংলায় বহুদিন ধরেই এই পর্দা ব্যবহার হয়ে আসছে, বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে। শহুরে জীবনে এর ব্যবহার কিছুটা কমে গেলেও, পরিবেশ সচেতনতার যুগে এটি আবার নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

কীভাবে কাজ করে এই পর্দা?
ঘাসের পর্দার কার্যকারিতা মূলত ‘বাষ্পীভবন প্রক্রিয়া’র উপর নির্ভর করে। যখন এই পর্দায় জল ছিটিয়ে দেওয়া হয় বা ভিজিয়ে রাখা হয়, তখন এর মধ্যে দিয়ে যে গরম বাতাস প্রবাহিত হয়, তা জলের সংস্পর্শে এসে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। এই প্রক্রিয়াকে বলে Evaporative Cooling বা বাষ্পীভবনজনিত শীতলীকরণ। ফলে ঘরের তাপমাত্রা কিছুটা কমে, বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ে, শীতল ও স্নিগ্ধ অনুভূতি তৈরি হয়। এই একই নীতি অনুসরণ করে আধুনিক ‘এয়ার কুলার’ কাজ করে। তবে ঘাসের পর্দা তার প্রাকৃতিক ও সরল রূপ।
একসময় গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এই পর্দার ব্যবহার দেখা যেত। মাটির বাড়ি, খোলা জানালা, আর সেই জানালায় ঝোলানো ভেজা ঘাসের পর্দা এ যেন গ্রীষ্মের এক পরিচিত ছবি। বিশেষ করে দুপুরের গরমে লু হাওয়া থেকে রক্ষা পেতে, ঘরের ভেতর শীতলতা বজায় রাখতে এই পর্দা ছিল অতি প্রয়োজনীয়। অনেক জায়গায় আবার এই পর্দায় গোলাপ জল বা কেওড়ার জল ছিটিয়ে দেওয়া হত, যাতে ঘরে সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এটি শুধু শীতলতাই নয়, এক ধরনের আরামদায়ক পরিবেশও তৈরি করত।

আধুনিক জীবনে ফিরে আসা:
বর্তমান সময়ে যখন বিদ্যুতের খরচ বাড়ছে এবং পরিবেশ দূষণ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন অনেকেই বিকল্প পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। সেই জায়গা থেকেই ঘাসের পর্দা আবার নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। শহরের ফ্ল্যাটে বা বাড়িতে, বারান্দায়, জানালায়, দরজার সামনে এই পর্দা ব্যবহার করে সহজেই তাপমাত্রা কিছুটা কমানো সম্ভব!
ঘাসের পর্দার সুবিধা :
১. পরিবেশবান্ধব
এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি। ফলে পরিবেশের উপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না।
২. বিদ্যুৎ খরচ নেই
এটি ব্যবহার করতে কোনো বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। ফলে বিদ্যুৎ বিলও বাড়ে না।
৩. সহজলভ্য ও সস্তা
এটি তুলনামূলকভাবে কম খরচে পাওয়া যায় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায়।
৪. সুগন্ধি পরিবেশ
খাসখাস ঘাসের নিজস্ব একটি মিষ্টি গন্ধ আছে, যা ঘরকে স্নিগ্ধ করে তোলে।
৫. স্বাস্থ্যকর
এসি-র মতো শুষ্ক বাতাস তৈরি না করে, এটি আর্দ্রতা বজায় রাখে। ফলে ত্বক বা শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা কম হয়।

যদিও এই পর্দা অনেক দিক থেকেই উপকারী, তবুও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
নিয়মিত জল দিতে হয়
অতিরিক্ত আর্দ্রতা কিছু ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর হতে পারে
খুব বেশি আর্দ্র অঞ্চলে এর কার্যকারিতা কমে যায়
পরিষ্কার না রাখলে ছত্রাক বা গন্ধ তৈরি হতে পারে
তবে সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এই সমস্যাগুলি সহজেই এড়ানো যায়।
কীভাবে ব্যবহার করবেন?
ঘাসের পর্দা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলা প্রয়োজন:
১. সঠিক জায়গায় লাগান
যেখানে বাতাস ঢোকে সেই জানালা বা দরজায় এটি লাগান।
২. নিয়মিত জল দিন
দিনে অন্তত ২-৩ বার জল ছিটিয়ে ভেজা রাখুন।
৩. পরিষ্কার রাখুন
মাঝে মাঝে পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে নিন, যাতে ধুলো জমে না।
৪. রোদে শুকান
কখনও কখনও রোদে শুকিয়ে নিলে দুর্গন্ধ বা ছত্রাকের সম্ভাবনা কমে।

শহুরে সাজে ঘাসের পর্দা:
আজকের দিনে অনেকেই ঘর সাজানোর ক্ষেত্রেও এই পর্দাকে ব্যবহার করছেন। এটি কেবল একটি উপযোগী বস্তু নয়, বরং এক ধরনের ‘ডেকর এলিমেন্ট’ হিসেবেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বোহেমিয়ান বা ন্যাচারাল থিমের ঘরে এটি বেশ মানানসই
কাঠের আসবাবের সঙ্গে এর সমন্বয় খুব সুন্দর লাগে
বারান্দা বা টেরেস গার্ডেনে এটি আলাদা মাত্রা যোগ করে
টেকসই জীবনের পথে এক পদক্ষেপ:
আজকের দিনে ‘সাসটেইনেবল লিভিং’ বা টেকসই জীবনযাপন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে ঘাসের পর্দা একটি চমৎকার বিকল্প। এটি প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার শেখায়, বিদ্যুৎ নির্ভরতা কমায়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।
ঘাসের পর্দা শুধুমাত্র একটি প্রাচীন কৌশল নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানের এক সুন্দর সমন্বয়। আধুনিক প্রযুক্তির ভিড়ে আমরা অনেক সময় এই সহজ ও কার্যকর পদ্ধতিগুলিকে ভুলে যাই। অথচ সামান্য সচেতনতা ও প্রয়োগেই এগুলি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি এনে দিতে পারে। এই গ্রীষ্মে, যখন সূর্যের তাপ ক্রমশ বাড়ছে, তখন একবার ভেবে দেখতেই পারেন আপনার ঘরের জানালায় একটি ঘাসের পর্দা ঝুলিয়ে দিলে কেমন হয়? হয়তো তাতেই ফিরে আসবে সেই হারিয়ে যাওয়া স্নিগ্ধতা, যা একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরের অঙ্গ ছিল।প্রকৃতির কোলে ফিরতে চাইলে, এমন ছোট ছোট পদক্ষেপই হয়ে উঠতে পারে বড় পরিবর্তনের সূচনা।

কাঁচা আমের ৬ পদ
গ্রীষ্মের দাবদাহে বাঙালির রান্নাঘরে এক বিশেষ স্বস্তির নাম কাঁচা আম। টক, সতেজ আর স্নিগ্ধ স্বাদের এই ফলটি শুধু শরীরকে ঠান্ডা রাখে না, বরং নানা পদে এনে দেয় এক অনন্য স্বাদবৈচিত্র্য। বাংলার ঘরোয়া রান্নায় কাঁচা আমের ব্যবহার বহু পুরনো ডাল, তরকারি, চাটনি, শরবত থেকে শুরু করে মাছের ঝোল সবেতেই এর উপস্থিতি যেন ঋতুর এক অনিবার্য ছাপ।
কাঁচা আম দিয়ে রান্নার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর টক স্বাদ, যা গরমকালে খিদে বাড়ায় এবং খাবারকে করে তোলে আরও রুচিকর। গ্রামীণ বাংলায় বাড়ির উঠোনের আমগাছ থেকে পাড়া কাঁচা আম দিয়েই তৈরি হয় নানা পদ, যা শুধু স্বাদের জন্য নয়, বরং ঐতিহ্য ও স্মৃতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই সংকলনে আমরা কাঁচা আম দিয়ে তৈরি বিভিন্ন সুস্বাদু ও বৈচিত্র্যময় রান্নার দিকগুলি তুলে ধরব, যেখানে সহজ উপকরণে তৈরি পদেও লুকিয়ে থাকে বাঙালির রসনাবিলাসের চিরন্তন রূপ।

কাঁচা আম আর নারকেল দিয়ে ডিম
রিঙ্কু মিত্র

কী কী লাগবে
ডিম ৪টি, গ্রেট করা কাঁচা আম ১ চা চামচ, নারকেল বাটা আধ কাপ, সরষে বাটা ২ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা বাটা ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, নুন চিনি স্বাদমতো, Shalimar's সরষের তেল ২ টেবিল চামচ
কীভাবে বানাবেন
ডিম সেদ্ধ করে খোসা ছাড়িয়ে অর্ধেক করে কেটে নিন। সব উপকরণ একসাথে ভালো করে মিশিয়ে নিন। স্টিলের টিফিন বক্সে ঢেলে উপর থেকে একটু সরষের তেল ছড়িয়ে স্টিমারে বা ভাপে ১৫–২০ মিনিট রান্না করুন। হয়ে গেলে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
আম কাতলার রসা
রিঙ্কু মিত্র

কী কী লাগবে
কাতলা মাছ ৫-৬ টুকরো, কাঁচা আম লম্বা করে কাটা ১টি বড়, কালোজিরে ১/২ চা চামচ, কাঁচালঙ্কা ৩-৪টি চেরা, সর্ষে বাটা ২ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১ চা চামচ (ঐচ্ছিক), Shalimar's সরষের তেল ৪ টেবিল চামচ

কীভাবে বানাবেন
কড়াইতে তেল গরম করে নুন, হলুদ দিয়ে মাখিয়ে রাখা কাতলা মাছগুলি হালকা করে ভেজে নিন। এবার মাছগুলি তুলে নিয়ে সেই তেলেই কালোজিরে ও কাঁচালঙ্কা ফোঁড়ন দিন। লম্বা টুকরো করে কেটে রাখা আম কড়াইতে দিয়ে দিন। স্বাদ মতো নুন, হলুদ দিয়ে নাড়াচড়া করুন। সামান্য জল দিয়ে কড়াই ঢেকে দিন। আম ভাল করে সেদ্ধ হয়ে গেলে ভাল করে ঘেটে নিন। সর্ষে বাটা দিয়ে ভাল করে কষিয়ে নিন। মশলা তেল ছেড়ে এলে পরিমাণ মতো জল দিয়ে দিন। স্বাদ মতো চিনি দিন। ঝোল ফুটে উঠলে ভেজে রাখা মাছগুলি দিয়ে মিনিট পাঁচেক ঢাকা দিয়ে রান্না করুন। তারপর ঢাকা খুলে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন আম কাতলার রসা।
হাতে মাখা আম চিংড়ি
সুচরিতা মুখার্জি

কী কী লাগবে
চিংড়ি মাছ ২৫০ গ্রাম (খোসা ছাড়ানো ও ধোয়া), কাঁচা আম ১টি মাঝারি (টুকরো করা), Shalimar's সরষের তেল ২ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪–৫টি চেরা, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো আধ চা চামচ, পেঁয়াজ কুচি ২ টেবিল চামচ, আদা-রসুন বাটা ১ চা চামচ, সরষে বাটা ১ চা চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি আধ চা চামচ

কীভাবে বানাবেন
চিংড়ি ভালো করে ধুয়ে সব উপকরণ একসাথে মেখে নিন। একটি প্যানে বা কড়াইতে ঢেলে ঢেকে হালকা আঁচে ১০ মিনিট রান্না করুন। মাঝে একবার নেড়ে দিন। মাখা মাখা হলে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
কাঁচা আম দিয়ে মুরগি
সুচরিতা মুখার্জি

কী কী লাগবে
মুরগির মাংস ৫০০ গ্রাম, কাঁচা আম ১টি (কুচি করা), পেঁয়াজ কুচি ১ কাপ, টমেটো কুচি ২টি, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, জিরে বাটা ১ চা চামচ, গোটা জিরে আধ চা চামচ, তেজপাতা ২টি, শুকনো লঙ্কা ২-৩টি, কাঁচালঙ্কা ৪-৫টি চেরা, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরী লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি বা মধু ১ চা চামচ, Shalimar's সরষের তেল ৪ টেবিল চামচ, জল ১ কাপ, ধনেপাতা কুচি ২ টেবিল চামচ

কীভাবে বানাবেন
কড়াইতে তেল গরম করে গোটা জিরে, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। মুরগি দিয়ে ২-৩ মিনিট ভেজে নিন। পেঁয়াজ দিয়ে নেড়ে আদা, রসুন, জিরে বাটা, হলুদ, লঙ্কা, নুন দিয়ে কষান। টমেটো দিয়ে ঢেকে ৩ মিনিট রান্না করুন। কাঁচা আম ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে তেল ছাড়া পর্যন্ত কষান। জল ও চিনি দিয়ে ঢেকে সিদ্ধ করুন। মাখামাখা হলে ধনেপাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।
কাঁচা আম, কাঁচালঙ্কা বাটায় পার্শে
সুচরিতা মুখার্জি

কী কী লাগবে
পার্শে মাছ ৪-৫টি, কাঁচা আম ১টি (টুকরো করা), কাঁচালঙ্কা ৫-৬টি, সাদা সরষে ১ টেবিল চামচ, পোস্ত ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, লবণ স্বাদমতো, পাতিলেবুর রস ১ টেবিল চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৪ টেবিল চামচ, কালোজিরে আধ চা চামচ, চিনি আধ চা চামচ (ঐচ্ছিক), জল ১ কাপ, ধনেপাতা কুচি ২ টেবিল চামচ

কীভাবে বানাবেন
কাঁচা আম, নুন, হলুদ, কাঁচালঙ্কা বেটে নিন। সরষে-পোস্ত আলাদা করে বেটে রাখুন। মাছ নুন, হলুদ, লেবুর রস মেখে তেলে ভেজে নিন। একই তেলে কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে আমের বাটা ও সরষে-পোস্ত বাটা দিয়ে নেড়ে সামান্য জল দিন। কাঁচালঙ্কা ও চিনি দিয়ে ফুটিয়ে ভাজা মাছ ছেড়ে ঢেকে রান্না করুন। শুকনো মাখামাখা হলে ধনেপাতা ছড়িয়ে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
আম কাসুন্দি এঁচড়
সুচরিতা মুখার্জি

কী কী লাগবে
এঁচড় ৩০০ গ্রাম (টুকরো করা), কাঁচা আম ১টি (টুকরো করা), ছোট চিংড়ি ২০০ গ্রাম (ঐচ্ছিক), Shalimar's সর্ষের তেল ৪ টেবিল চামচ, তেজপাতা ২টি, কালোজিরে আধ চা চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪–৫টি চেরা, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, লবণ স্বাদমতো, পাতিলেবুর রস ১ টেবিল চামচ, কালো ও সাদা সর্ষে বাটা ২ টেবিল চামচ, কাসুন্দি ১ টেবিল চামচ, চিনি ১ চা চামচ, জল আধ কাপ
কীভাবে বানাবেন
এঁচড় নুন, হলুদ মেখে নিন। তেজপাতা, কাঁচালঙ্কা ফোড়নে হালকা ভেজে কুকারে ১–২ টি সিটি দিন। চিংড়ি লেবুর রস, নুন, হলুদ মেখে রাখুন। কড়াইতে তেলে কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে চিংড়ি ও আম ভেজে নিন। কাঁচালঙ্কা দিয়ে সরষে বাটা ও সেদ্ধ এঁচোড় মিশিয়ে কাসুন্দি, জল, নুন, চিনি দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। বেশ মাখামাখা হলে নামিয়ে পরিবেশন করুন।

পথের বাঁকে রহস্য
জয়দেব দত্ত
তখন সবেমাত্র ভারতীয় রেলওয়ের ইষ্টার্ন জোনে চাকরি পেয়েছি। অফিস থেকে চার বন্ধু মিলে ঠিক করলাম যে, আমরা পাহাড়ি পথে ট্রেকিং করে সাঁন্দাক-ফুঁ ও ফালহুট বেড়াতে যাব। সেটা সম্ভবত ১৯৮৫ সালে চৈত্রের মাঝামাঝি কোন একটা সময়। সেই মত টিকিট হাতে গরমের এক সন্ধ্যায় দার্জ্জিলিং মেলে চেপে বসলাম।
পরদিন সকালে নিউ জলপাইগুড়ি ষ্টেশনে পৌঁছালাম। আগেই কোলকাতা থেকে টয়ট্রেনের টিকিট কেটে রেখে ছিলাম, তাই টিকিট কাটার ঝামেলা এড়ান গেল। ষ্টেশনের লাগোয়া রেস্তরায়র সামান্য প্রাতঃরাস সেরে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবী খ্যাত পাহাড়ি মূষিক- টয়ট্রেনে চড়ে বসলাম। মহানন্দে টয়ট্রেন তার মাথা-লেজ দুলিয়ে দুলকি চালে জঙ্গল ফুঁড়ে বেশ এগিয়ে চলল। সারাদিন ধরে স্থানীয় বহু হাসিখুসি মুখ ইচ্ছামত তার ধীর গতির দেহ বেয়ে কাজের ফাঁকে যোগে ইতিউতি প্রয়োজনে নামছে আর উঠছে। অজানাকে জানার মাদকতায় আচ্ছন্ন হয়ে সারাদিন পাহাড়ি সৌন্দর্যের বুক চিরে চিরে ডুব দিয়ে সন্ধ্যায় ঘুম ষ্টেশনে এসে উঠলাম। ক্লান্ত শরীরে ব্যাগ-পত্তর নিয়ে উপযুক্ত হোটেল খোঁজা কষ্টকর ও ব্যয় সাপেক্ষ, তাই বাধ্য হয়েই কাছের একটা সরাইখানায় রাতটা থেকে গেলাম।

পরদিন সকালে ট্যাক্সি ধরলাম পাহাড়ি গ্রাম মানেভঞ্জনের উদ্দেশ্যে। সেখানে পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। কাছাকাছি পাহাড়ি ঢালে এক গৃহস্থের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া হল। সেখানে জমিয়ে আড্ডা, রাতের খাওয়া-দাওয়া ও রাত্রিবাস সেরে, পরদিন সকালে গৃহকর্তার দেওয়া কিছু পথ নির্দেশিকা মেনে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে যাত্রা শুরু করলাম। সে পথে সারাদিন হেঁটে টুলুঙ হয়ে টুংলুঙে সন্ধ্যায় পৌঁছালাম। সেখানে ট্যুরিষ্ট লজে রাত্রিবাস। পরদিন সকালে রুকস্যাক পিঠে, হাতে লাঠি- আবার যাত্রা শুরু হল। মেঘমাতে দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম নিলাম।
মেঘমা অঞ্চলটা প্রায় সারা বছরই কুয়াসা আর জলভরা মেঘে আচ্ছন্ন থাকে। সেই মেঘের মধ্যেই পথ চলা। চারিদিকের পাহাড়ে কিংবা পাদদেশে লাল-সাদা-গোলাপী রডোডেনড্রনের পাপড়ি আপন খেয়ালে যেন ফুলসজ্জা সাজিয়েছে। কোথাও ক্যামেলিয়া, ম্যাগনেলিয়া কোথাও বা পাহাড় ফুঁড়ে ডেইজি হাসছে। বিকালে যখন জৌবাড়ী গ্রামের কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন চারিদিক মেঘে মেঘে ঢেকে গেছে, যেন গায়ের ওপরে মেঘমালা খেলা করছে। আর গায়ে, মুখে ঝিরি ঝিরি তুষারকণা পেঁজা তুলোর মত জড়িয়ে যাচ্ছে। এমন পাহাড়ি নকশীকাঁথার নয়নকাড়া দৃশ্যে বিভোর হয়ে আছি। এদিকে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে পড়ন্ত সূর্যের রক্তছটা পাহাড়ি বনের চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। এই এলাকার বিশেষত্ব এই যে, এটা প্রায় চীন সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা। পাশেই চীনের যৌগ্রাম। ট্রেকিং এর সময় দু-জন সহযাত্রী আমাদের দু-জনকে পিছনে ফেলে কিছুটা এগিয়ে চলেছে। এখানকার ভৌগলিক অবস্থান সম্পর্কে আমাদের অনভিজ্ঞতার কারণে ভয় হচ্ছিল- যদি ভুল করে চীনা অঞ্চলের দিকে উত্তুরের রাস্তা বড়াবড় এগিয়ে যাই। তাই সতর্কভাবেই পথনির্দেশগুলো অনুসরণ করছিলাম। এদিকে আলো-আধাঁরির মাঝেই শুরু হল গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকলো।

ভিজতে ভিজতে ব্যস্ত হয়ে যখন তুমলিঙ এলাকা পেড়িয়ে যাচ্ছি, এমন সময় হঠাতই আমাদের চোখে পড়ল- বিশাল দেহী দুটো কালো দৈত্যের মত আপদমস্তক আলখাল্লায় ঢাকা কী যেন মেঘের আড়ালে পাশের জঙ্গল রাস্তায় হেঁটে চলেছে। হঠাৎ কানের পাশেই একটা খটাখট শব্দ বাজতে লাগল। মনে হল- কেউ বুঝি আমাদের গায়ের পাশেই হাঁটছে। এই বুঝি আমাদের ধরে ফেলবে।
ভয়ে আমাদের গায়ে কাঁটা দিয়ে রক্ত হিম হয়ে গেল। মুহূর্তে এ জনমানব শূন্য এলাকায় ভয়ে বেশ কুঁকড়ে গেলাম, জোরে জোরে নিশ্বাস পড়তে লাগল। আমরা দু-জন অজানা গভীর আশঙ্কায় রাস্তা ছেড়ে পাশের ঘনজঙ্গলে টুপ করে লুকিয়ে পড়লাম। খানিক বাদেই সেই অস্পষ্ট বিশাল দেহী পাহাড়ের কোলে মেঘের আড়ালে মিশে গেল।
কিছুক্ষণ পরে তুষারপাত খানিক দুর্বল হলে চারিদিক স্পষ্ট হল। আমরাও স্বাভাবি হয়ে জঙ্গল ছেড়ে রাস্তায় উঠে এলাম। কিন্তু মুযলধারে বৃষ্টি হতেই লাগল। রেইন কোটে সারা শরীর মুড়ে বৃষ্টির মধ্যেই কঠিন পাহাড়ি পথে হাঁটতে হাঁটতে গৌরীবাসের ট্যুরিষ্ট লজে কোন ভাবে এসে পৌঁছালম। পৌঁছিয়েই অন্য বন্ধুদের সেই আশ্চর্যজনক অস্বাভাবিক ঘটনার বিস্তারিত জানালাম। তারাও সেই অতিমানবীয় ঘটনা শুনে বিস্মিত হল। গৌরীবাসের ট্যুরিষ্ট লজেই সেই রাত্রিটা থেকে গেলাম। সেখানে কেয়ার টেকার অত্যন্ত ব্যস্ততার সাথে লণ্ঠনের আলোয় অতি যত্নসহকারে আমাদের জন্য সুপ্ ও রুটি-মাংস-ভাজা প্রস্তুত করলেন। খাওয়া দাওয়া সেরে সবাই মিলে আড্ডা মারতে বসলাম। কেউ কেউ চুরুট সেবনে ব্যস্ত হল। সারা রাত ধরে মুষল ধারায় শিলাবৃষ্টি হয়েই চলল। এমন আকাশ-ভাঙা বৃষ্টি আমার জীবনে কখনও দেখিনি। চারিদিক নিস্তব্ধ, ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার। বজ্র-বিদ্যুতের আলোয় মাঝেমধ্যে পাহাড়ের বীভৎস মুখ দেখে রোমাঞ্চিত হচ্ছি। অনেক রাত্রি পর্যন্ত আমরা ঐ আশ্চর্য ঘটনার বিষয়ে নানা আলোচনা করতে করতে রাতের নৈঃশব্দভাঙ্গা বৃষ্টিপাতের ছন্দ-তালে গাছে গাছে পাহাড়ি পোকার কিন্ কিন্ ঝিন্ ঝিন্ উৎকট সঙ্গীতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম- মনে নেই।
ভোরের দিকে হয়তো বা বৃষ্টি থেমে গেছে। পরদিন সকালে আকাশ পরিষ্কার। আমরা স্নান সেরে ট্রেকিং এর উদ্দেশ্যে পোশাক পড়ে নিলাম। তারপর রুকস্যাক কাঁধে, হাতে লাঠি নিয়ে পরবর্তি যাত্রার জন্য বেড়িয়ে পড়লাম। পাশেই পাহাড়ের ঢালে একটা ছোট্ট খাবারের দোকান। দোকানি আছে, কিন্তু কোন খরিদ্দার নেই। আমরাই একমাত্র খাবারের অর্ডার দিলাম। সেখানে বসে সবে রুটি-সবজি খাচ্ছি, এমন সময় দেখি- বিশাল দেহী দুটো কালো লোমশ বন্য ইয়াকের উপরে সওয়ারি সুঠাম দেহের দুই সুপুরুষ যুবক আমাদের কাছে এসে দাঁড়াল। তারা মাথায় এক ধরনের লম্বা চোঙা টুপি ও জমকালো লোমশ পোশাক পড়ে আছে- দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। গোর্খা ভাষায় আমাদের নমস্কার জানিয়ে জিজ্ঞাসা করল- আমাদের যাত্রাপথ। আমরা জানালাম- সাঁন্দাক ফুঁর কথা। সব শুনে তাঁরা জানাল- সামনের রাস্তা খুবই চড়াই-উৎরাইয়ে ভরা। এ রাস্তায় আপনাদের যাওয়া খুবই কঠিন হবে। তাই লোক পিছু ৮০ টাকা ক’রে দিলে, তারা আমাদেরকে আপাত শান্ত বিশাল ইয়াকের পিঠে চড়িয়ে “সাঁন্দাক ফুঁ” তে পৌঁছে দিতে পারে। কিন্তু আমরা তাঁদের প্রস্তাবে রাজি হতে পারলাম না, কারণ আমরা ট্রেকিং করে সাঁন্দাক ফুঁ যাব, এটা স্থির করাই আছে। তাই খুব কষ্ট হলেও পায়ে হেঁটেই যাব- এমনটা তাঁদের জানিয়ে দিলাম।
এদিকে পরিষ্কার আকাশ আমাদের অজান্তেই কখন মেঘে মেঘে ঢেকে গেছে, খেয়ালই নেই। এখানকার প্রকৃতি বুঝি- রহস্যে ঘেরা এমনি ভয়ঙ্কর সুন্দর। ধীরে ধীরে গায়ের আশেপাশে মেঘ আর কুয়াসায় ঢেকে গেল। ঠিক আগের দিনের বিকালের মতই মাঝে মধ্যে পূবের আকাশে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে নরম সূর্যের আলো চারিদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। আর বৃষ্টিভেজা তুষারের স্ফটিক কণায় সে আলো ফেঁটে ফেঁটে পড়ছে। এদিকে ইয়াক সওয়ারি দু-জন আমাদের নমস্কার জানিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ি পথে সমনের দিকে এগিয়ে চললো। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই বন্য অতিকায় ইয়াক সওয়ারিরা ক্রমে ক্রমে আলো-আঁধারে মাখা ঘন জলভরা মেঘের মধ্যে প্রবেশ করলে, আমরা পিছন থেকে দেখছি- ইয়াক দুটোকে আর তেমন ভাবে বোঝা যাচ্ছে না। দুই যুবকের দেহও লম্বা-চওড়ায় খানিকটা বিবর্ধিত হয়ে পড়েছে, অনেকটা অস্পষ্ট প্রতিরূপের মত। যা মেঘে মেঘে ভেসে থাকা অসংখ্য জলকণায় আলোর বিক্ষিপ্ত প্রতিসরণে সম্ভব। আর দূর থেকে লোমশ ইয়াক দুটোকে মনে হচ্ছে- তাঁদের পরিহিত লম্বা-চওড়া কালো আলখাল্লা পোশাক। সেই আতিমানবীয় ভয়ংকর মূর্তি দুটো পাহাড়ের খাঁজে হারিয়ে গেল। ঠিক আগের দিনে সন্ধ্যার মতই- মুষলধারা বৃষ্টিতে পাথরে খুঁরের শব্দ জঙ্গল ভেদ করে এমন দ্রুত তীক্ষ্নভাবে কানে বাজছিল, ঐ অতিকায় জীব বীভৎসভাবে ঠিক আগের দিনে যেমনটা বুঝেছিলাম- ঝোড়ো তুষারের ভিতর থেকে আমাদের কাছেই ধেয়ে আসছিল। সব মিলিয়ে আগের দিনের সেই অতিমানবীয় ভয়ঙ্কর মূর্তি পুনরায় দৃশ্যমান। এভাবেই প্রকৃতির পরতে পরতে কত সম্ভাব্য ঘটনার ভূতড়ে জ্ঞান মানুষের অজানা থেকে যায়। এমন আলো-আঁধারি রহস্যে হতবাক হয়ে, গৌরীবাস পিছনে রেখে দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেড়িয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চললাম সাঁন্দাক-ফুঁর পথে ……………।








Comments