top of page

বাইকে সারান্ডা ও বাংরিপোসি| নববর্ষের ভুরিভোজ প্রতিযোগিতার সেরা ২৬| রবিবারের গল্প: কথাকলি


বাইকে সারান্ডা ও বাংরিপোসি ভ্রমন কাহিনী

সরোজ মজুমদার

বাঙালির প্রিয় পলাশ ফুলের ‘রাঙা হাসি রাশি রাশি’ দেখতে যাওয়ার প্রিয় জায়গা হল পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া। তাই প্রতিবার একি জায়গায় যাবার একঘেয়েমি কাটাতে এবারে ঠিক করলাম পার্শ্ববর্তী রাজ্য ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডে যাবার। মার্চের চতুর্দশতম দিনে দোলযাত্রার শুভ লগ্নে ভোর তিনটেয় বাইক নিয়ে কলকাতার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। কোলাঘাট, খড়্গপুর পেরিয়ে লোধাশুলি ফরেস্টে ঢোকার পর আবছা দিনের আলো আসতে শুরু করল। সেই স্বল্প আলোতেই বোঝা যাচ্ছিল অরণ্যে কচি পাতার বাহার এসেছে। ৪৯নং জাতীয় সড়ক ধরে সুবর্ণরেখা নদীর জামশোলা সেতু পার হয়ে ঝাড়খন্ড থেকে ওড়িশায় প্রবেশ করলাম। এরপর বাংরিপোসির দিকে যতই এগোতে থাকলাম রাস্তার দুপাশে লাল পলাশের মেলা শুরু হয়ে গেল। সামনে সুউচ্চ পাহাড়ের রেখা। ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলায় ঠাকুরানী পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ছোট্ট এক অফবিট জায়গা বাংরিপোসি যা কলকাতা থেকে ২২৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।


পলাশের নেশায় বার বার বাইক রেখে রাস্তার দুপাশের মাঠে নেমে পড়ছিলাম। পাহাড়ের কোলে লাল পলাশের সারি আর বাতাসে ভাটি ফুলের আবেগী গন্ধ মনকে আবিষ্ট করে তোলে। আস্তে আস্তে সমতলের রাস্তা ছেড়ে বাংরিপোসির পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে উঠে পড়লাম। শুরুতেই পাহাড়ি পথের একদম বাঁকে পেলাম অপূর্ব সুন্দর মা দ্বারশুনি মন্দির যা ভগবান শিবের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। গাছে ছাওয়া এ পথে যেতে প্রচুর বানরের দেখা মেলে। বেলা বাড়তেই রোদের প্রখরতা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছিলো। পথে একটি কচি সবুজ পাতার শালবনে একটু জিরিয়ে নিয়ে চম্পুয়া, বারবিল হয়ে ৩৯৫কিমি পথচলা শেষ করে ওড়িশার কিরিবুরু হিল টপের হোমস্টেতে পৌছলাম। লাঞ্চ সেরে, একটু ঘুমিয়ে নিয়ে বিকেলে বাইক নিয়ে ঝিঁকরা ওয়াটারফল দেখতে চললাম। পুরোটাই পাহাড়ি পথ এবং শেষ অংশটুকু লালমাটির মেঠো পথ। ঘন সবুজ বনের ছাউনির মধ্যে প্রায় ৭০ ফুট উচ্চতা থেকে জলপ্রপাতটি নেমে আসছে। আজ দোলযাত্রার দিন হওয়ায় ঝর্ণার আশেপাশে অনেক মানুষজন পিকনিক করছিলো, অনেককে আবার ঝর্ণার জলে স্নান করতেও দেখা গেল। এরপর মেঘাহাতুবুরু সানসেট পয়েন্টে পৌঁছে দেখি স্থানটি লোকসমাগমে মুখরিত। পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আভায় সামনে দিগন্ত বিস্তৃত ঢেউয়ের মত সবুজ পাহাড়ের চূড়ার শ্রেণী দৃশ্যমান; যার জন্য সারান্ডাকে সাতশো পাহাড়ের দেশ বলা হয়। বানরের দল এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছিল। আকাশকে কমলা ও গোলাপী রঙের ছায়ায় পরিণত করে পাহাড়ের আড়ালে সূর্য ডুব দিল। ওড়িশার কেওঁনঝার ডিসট্রিক্টের কিরিবুরু ও ঝাড়খণ্ডের সিংভূম ডিসট্রিক্টের মেঘাহাতুবুরু পাশাপাশি দুটি পাহাড়ি অঞ্চল।



সারান্ডায় থাকার জায়গা খুবই কম, কিছু হোমস্টে আর স্টিল অথরিটি অব ইন্ডিয়া সেইলের দুটি গেস্ট হাউস আছে। সারান্ডা ফরেস্টের মধ্যে থাকার জন্য আছে থলকোবাদ ফরেস্ট রেস্ট হাউস।


পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে চলে এলাম কিরিবুরু হিলটপের সান রাইস পয়েন্টে। আকাশে তখনও মস্ত বরো রুপোলি চাঁদ ছিল।


মহুল, শাল, পিয়ালের ঘন জঙ্গলের ভিতর থেকে দূরে পাহাড় ও সমতলের শহর দেখা যায়। সকালে সূর্য ওঠা ছাড়াও এখান থেকে রাতের দৃশ্যও খুব সুন্দর। এরপর বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম পাচেরী ওয়াটারফলের উদ্যেশে। জঙ্গলের মধ্যে একটি জায়গায় বাইক রেখে হাঁটা শুরু করলাম। শাল, পিয়াল, মহুয়ার ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে মহুয়া গাছগুলির নিচে প্রচুর মহুয়া ফল পরে আছে দেখলাম। সকালবেলা নিস্তব্ধ নির্জন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রোমাঞ্চকর তিন কিমি পথ হেটে পাচেরী জলপ্রপাতে পৌছলাম। জনমানব শুন্য, কোলাহল মুক্ত প্রকৃতির মাঝে শুধু জলপ্রপাতের গর্জন আর পাখিদের কলরব। জঙ্গলের পথে ফিরে বাইক নিয়ে আবারো শুরু হলো এক রোমাঞ্চকর যাত্রা। শালের বনের মধ্যে দিয়ে শাল পাতায় মোড়া মাটির উপর দিয়ে রাস্তাহীন পথে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে পৌছলাম জঙ্গলের মধ্যে নিঃসঙ্গ পুন্ডুল শিব মন্দিরে। মন্দিরের পাশে বাইক রেখে মন্দির দর্শন সেরে জঙ্গলের সরু পথে হাঁটা শুরু করলাম পুন্ডুল জলপ্রপাত দেখার জন্য। চারিদিকে বড় বড় পাথুরে বোল্ডারের মধ্যে দিয়ে পুন্ডুল ওয়াটারফলসের জল বয়ে এসে একটি লেকে পড়ছে। জঙ্গলের এই ঠান্ডা ও রহস্যময় পরিবেশের মধ্যে মানুষজন চড়ুইভাতি করতে আসেন। এখান থেকে কিরিবুরু হিল টপে ফেরার পথে দেখে নিলাম পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত মা গিরি রাজেস্বরী মন্দির, যেখান থেকে চারিপাশে পাহাড়ের দৃশ্য খুব মনোরম। হোমস্টেতে ঢোকার পূর্বে বন বিভাগের অফিস থেকে অনুমতি পত্রটি সংগ্রহ করে নিলাম। কিছুক্ষন পরে আমার গাইড এসে হাজির হল।



সারান্ডা ফরেস্টে বাইক নিয়ে যেতে হলে বন বিভাগের অনুমতি পত্র এবং একজন গাইড অবশ্যই সঙ্গে নিতে হবে। গাইডকে বাইকের পিছনে বসিয়ে পাহাড়ি পথে, শালের জঙ্গলের মধ্যেদিয়ে এগিয়ে চললাম ঘাগরিতা ওয়াটারফলসের উদ্যেশে। পেইড পার্কিংএ বাইক রেখে, হেঁটে তারের ঝুলন্ত সেতু পেরিয়ে পৌছেগেলাম ঘন সবুজ অরণ্যের মধ্যে কয়েকটি ধারায় সশব্দে বয়েচলা ঘাগরিতা জলপ্রপাতের একদম কাছে। জলপ্রপাত থেকে ছিটকে আসা জল গায়ে মেখে ফেরার পথে জলপ্রপাতটির নিচে অনেক পর্যটককে স্নান করতে দেখা গেল। নিকটেই একটি ওয়াটার পাম্পিং স্টেশন রয়েছে। বাইক নিয়ে আবার চলা শুরু। মধ্য দুপুরের নির্জন শালের বনে শুকনো পাতার আরণ্যক গন্ধে সারান্ডায় শিহরণ অনুভূত হতে থাকল। অরণ্যের মধ্যে কিরিবুরু রেলওয়ে স্টেশনটি ঘুরে সারান্ডা ফরেস্টের কোর এরিয়ার চেক পোস্টে পৌছলাম। আমার গাইড দৌড়ে গিয়ে অনুমতি পত্র দেখানোর পর এগিয়ে যাবার নির্দেশ পেলাম।


সারান্ডা এশিয়ার সর্ববৃহৎ শালবন। বনে কিছু অতিসুন্দর ফল কালারের গাছের দেখা পেলাম। শুকনো শালের পাতা বিছান পথে জঙ্গলের মধ্যে একটি ওয়াচ টাওয়ারের নিকট পৌছালাম। বাইক রেখে এখান থেকে কিছুটা হেঁটে চলে এলাম ভালু গুহার কাছে। বড় একটা পাথুরে অংশের নিচ দিয়ে গিয়ে গুহায় প্রবেশের পথ। চারদিকে জঙ্গল; বেশ একটা গা ছম ছমে ব্যাপার আরকি। এর পাশ দিয়ে একটু উপরে গেলে আরেকটি গুহা দেখা যায়। এখানে ভাল্লুককের দেখা না পেলেও, আছে বলে শোনা যায়। এরপর পৌছলাম থলকোবাদ ফরেস্ট রেস্ট হাউসে চা পানের বিরতির জন্য। এখানে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও আছে। পরবর্তী গন্তব্য কিরিবুরু লৌহ আকরিক খনিতে যাওয়ার পথে সারান্ডা ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে হুইসেল বাজিয়ে একটি পণ্যবাহী ট্রেনকে যেতে দেখলাম। পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলোয়, লালচে বাদামী বর্ণের লৌহ খনিতে কর্মব্যস্ততা চোখে পড়ল। কোথাও বরো বরো ট্রাক সারিবদ্ধভাবে আকরিক ভরে নিয়ে গন্তব্যের পথে; আবার কোথাও লোহার বেল্টে আকরিক চূর্ণ নির্দিষ্ট জায়গায় চলে যাচ্ছে। সূর্যাস্ত দেখার জন্য আবারো পৌছলাম মেঘাহাতুবুরু সানসেট পয়েন্টে।



ভ্রমণের তৃতীয় দিনে ভোর সাড়ে চারটেয় অন্ধকারের মধ্যেই কিরিবুরু হিল টপ থেকে পাহাড়ি পথে বাইক নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম এবং একি পথে চম্পুয়া, বাংরিপোসি, কোলাঘাট হয়ে কলকাতার বাড়িতে ফিরলাম।

------------------- ---------- ------------------

রাত্রিবাস / রাতঠিকানা:

রাতঠিকানা: হোটেল অশোক হোমস্টে; কিরিবুরু হিল টপ, ওড়িশা-৭৫৮০৪০. দূরাভাষ: ৯৪৩৭৪৬০৫০১


প্রয়োজনীয় :

রুম, গাড়ি বুকিং ও খাবার ব্যবস্থার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন ভ্রমণ সহায়ক সোনু কুমারের সাথে; দূরভাষ: +৯১৮৬৫৮৫৬২১২৩


'নববর্ষের ভুরিভোজ' প্রতিযোগিতার সেরা ২৬


নতুন বছরের শুরু মানেই নতুন স্বাদ, নতুন সম্ভার, আর রান্নাঘরের ভেতরে-বাইরে এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস। সেই আনন্দকেই আরও রঙিন করে তুলতে ‘রোজকার অনন্যা’ আয়োজন করেছিল এক বিশেষ প্রতিযোগিতা ‘নববর্ষের ভুরিভোজ’। আর এই আয়োজনে প্রাণ জুগিয়েছেন 'বাবুর্চিহাট' গ্রুপের অসংখ্য প্রতিভাবান রাঁধুনি, যাঁদের হাতের জাদু প্রতিটি পদে এনে দিয়েছে বৈচিত্র্য, ঐতিহ্য আর অভিনবত্বের এক অনন্য মেলবন্ধন। তার মধ্যে সেরা ২৬টি রান্না রইলো এই সংকলনে।


আদা বাটা রুই ঝাল

শ্রাবণী নেগেল



কী কী লাগবে

রুই মাছ ৫০০ গ্রাম, আলু ২টি (বড়), মটরশুঁটি আধ কাপ, টমেটো ১টি, কাঁচা লঙ্কা ৪–৫টি, সর্ষের তেল ১ কাপ, নুন স্বাদমতো, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, জল পরিমাণমতো, গোটা জিরে ১/৪ চা চামচ


কীভাবে বানাবেন

মাছ ধুয়ে নুন-হলুদ মাখিয়ে রাখুন। আলু কেটে নিন। তেলে মাছ ভেজে তুলে আলু ভেজে নিন। একই তেলে জিরে ফোড়ন দিয়ে টমেটো ভাজুন, আদা বাটা ও সব গুঁড়ো মশলা দিয়ে কষান। আলু দিয়ে কষে জল দিন। ফুটলে মটরশুঁটি ও কাঁচা লঙ্কা দিন। আলু সেদ্ধ হলে মাছ দিয়ে ঢেকে দিন। ঝোল মিশে এলে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।



ঢাকাই মাটন পোলাও

ঝুমা চক্রবর্তী



কী কী লাগবে

মাটন ৫০০ গ্রাম, বাসমতি/গোবিন্দভোগ চাল ২ কাপ, পেঁয়াজ ২টি (পাতলা কাটা), আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, টক দই ১/২ কাপ, দুধ ১/২ কাপ, চিনি ১.৫ টেবিল চামচ, ঘি ৪ টেবিল চামচ, সাদা তেল ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, তেজপাতা ২টা, দারুচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৪-৫টা, লবঙ্গ ৫-৬টা, শাহি জিরা ১/২ চা চামচ, জয়ত্রী অল্প, জয়ফল গুঁড়ো এক চিমটি, কেওড়া জল ১ চা চামচ, গোলাপ জল ২-৩ ফোঁটা, বেরেস্তা ১/২ কাপ


কীভাবে বানাবেন

মাটন দই, আদা, রসুন, লবণ দিয়ে মেরিনেট করে প্রেসারে সেদ্ধ করে স্টক আলাদা রাখুন। চাল ধুয়ে ভিজিয়ে জল ঝরিয়ে নিন। পেঁয়াজ ভেজে বেরেস্তা তৈরি করুন। ঘি-তেলে গোটা মসলা ফোড়ন দিয়ে মাটন কষান। চাল দিয়ে হালকা ভেজে, স্টক ও দুধ দিয়ে লবণ-চিনি দিন। বেরেস্তা ছড়িয়ে কেওড়া ও গোলাপ জল দিন। ঢেকে অল্প আঁচে ১৫-২০ মিনিট দমে রাখুন। হয়ে গেলে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।



বাদাম রাবড়ি

সুছন্দা রায়



কী কী লাগবে

ফ্যাটযুক্ত দুধ ২ লিটার, খোয়া ক্ষীর ১৫০ গ্রাম, আমন্ড ১০০ গ্রাম, কাজুবাদাম ১০০ গ্রাম, এলাচ গুঁড়ো ২ চা চামচ, গুঁড়ো দুধ ১৫০ গ্রাম, চিনি স্বাদমতো


কীভাবে বানাবেন

দুধ জ্বাল দিয়ে খোয়া ক্ষীর মিশিয়ে নিন। গুঁড়ো দুধ ও এলাচ গুঁড়ো দিন। সর উঠলে পাত্রের গায়ে লাগিয়ে রাখুন। দুধ ঘন হয়ে এলে বাদাম ও চিনি দিন। জমা সর কেটে ক্ষীরের মধ্যে মিশিয়ে নিন। নামিয়ে আমন্ড-কাজু কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।



মাংসের গড়গড়া

শর্মিষ্ঠা মিত্র



কী কী লাগবে

খাসির মাংস ৫০০ গ্রাম, পেঁয়াজ ১টি বড়ো, আদা ১/২ ইঞ্চি, রসুন ৫-৬ কোয়া, টকদই ২ টেবিল চামচ, কিসমিস ১ টেবিল চামচ, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, লঙ্কার গুঁড়ো ১ চা চামচ, গরম মসলার গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, দারুচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৩টি, লবঙ্গ ২টি, চিনি ১ চা চামচ, সরষের তেল ২ টেবিল চামচ, তেজপাতা ২টি, লবণ স্বাদমতো


কীভাবে বানাবেন

মাংস ধুয়ে আদা-রসুন বাটা, দই, হলুদ, লঙ্কা, তেল ও লবণ দিয়ে মেখে রেখে দিন। কড়াইতে তেল গরম করে পেঁয়াজ ভেজে বেরেস্তা করে তুলে নিন। বাকি তেলে চিনি গলিয়ে তেজপাতা ও গোটা গরম মসলা দিয়ে মাংস কষান। বেরেস্তা ও কিসমিস পেস্ট দিয়ে আবার কষে নিন। মশলার জল দিয়ে প্রেসারে ২-৩টি হুইসেল দিন। সেদ্ধ হলে গরম মসলা ছড়িয়ে গরম ভাত বা পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।


মাছের মাথা ও চিংড়ি দিয়ে ভাঙাচোরা সুক্তা

বর্ণালী সাহা



কী কী লাগবে

কাতলা মাছের মাথা ১টি, চিংড়ি ২০০ গ্রাম, ঝিঙে ৫টি, বেগুন ১টি বড়, ডাটা ১ আঁটি, মুলো ৪টি ছোট, রাধুনী ১/২ চা চামচ, তেজপাতা ২টি, আদা বাটা ২ চামচ, চিনি ২ চামচ, লবণ স্বাদমতো, হলুদ পরিমাণমতো, সর্ষের তেল পরিমাণমতো, আটার পিটুলি সামান্য


কীভাবে বানাবেন

মাছের মাথা ও চিংড়ি নুন-হলুদ মাখিয়ে রাখুন। সব সবজি ছোট করে কেটে নিন। মুলো ও ডাটা হালকা সেদ্ধ করে নিন। তেলে মাছের মাথা ও চিংড়ি ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে রাঁধুনী, তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে ঝিঙে, বেগুন, নুন, হলুদ দিয়ে ঢেকে দিন। জল বেরোলে ডাটা, মুলো, ভাজা মাছ ও চিংড়ি দিয়ে কষান। সবজি ঘেঁটে এলে আটার পিটুলি, আদা বাটা ও চিনি দিয়ে আরও নেড়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই ভাঙাচোরা সুক্তা স্বাদে একেবারে অতুলনীয়।



মৌরি-কাতলা কাঁচা আম বাটা দিয়ে

মধুছন্দা দে



কী কী লাগবে

কাতলা মাছের গাদা ৩০০ গ্রাম, মৌরি বাটা ২ চা চামচ, শুকনো খোলায় ভেজে গুঁড়ো করা মৌরি ২ চা চামচ, আদা বাটা ২ চা চামচ, পেঁয়াজ বাটা ৬ চা চামচ (জল ঝরানো), কাঁচা লঙ্কা বাটা ১টি, চেরা কাঁচা লঙ্কা ২টি, কাঁচা আম বাটা ৩ চা চামচ, হলুদ বাটা ১ চা চামচ, গুঁড়ো হলুদ ১/২ চা চামচ, মিছরি গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, গোটা মেথি ২ চিমটি, সর্ষের তেল ৮ চা চামচ, উষ্ণ গরম জল ১৭৫ মিলি লিটার, নুন স্বাদমতো


কীভাবে বানাবেন

মাছ নুন-হলুদ মাখিয়ে ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে মেথি ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ বাটা কষান। হলুদ বাটা দিয়ে কষে আদা-মৌরি-কাঁচা লঙ্কা বাটা ও নুন দিন। উষ্ণ জল দিয়ে ফুটে উঠলে কাঁচা আম বাটা দিন। মাছ দিয়ে ঢেকে ৫ মিনিট রান্না করুন। শেষে ভাজা মৌরি গুঁড়ো ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই টক সুগন্ধি মৌরি কাতলা অসাধারণ স্বাদ।



আলু, পটল দিয়ে আড় মাছের ঝোল

শর্মি



কী কী লাগবে

আড় মাছ ৩ পিস, পটল ৪টি, আলু ২টি, টমেটো ১টি, পিঁয়াজ ১/২ টি, আদা ১/২ ইঞ্চি, রসুন ৪ কোয়া, জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, সরষের তেল ভাজার জন্য, কাঁচালঙ্কা ৩-৪টি, লবণ স্বাদমতো, হলুদ পরিমাণমতো, ঘি ১ চা চামচ, লেবুর রস ১ চা চামচ


কীভাবে বানাবেন

মাছ নুন-হলুদ মাখিয়ে ভেজে নিন। একই তেলে আলু ও পটল ভেজে নিন। পিঁয়াজ, আদা, রসুন, টমেটো পেস্ট করে তেলে কষান। তেল ছাড়লে জল দিয়ে ফুটতে দিন। ফুটলে কাঁচালঙ্কা ও ভাজা মাছ দিন। আরেকবার ফুটে উঠলে ঘি ও লেবুর রস ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই পাতলা ঝোল গরমের দিনে একেবারে পারফেক্ট।



ডাবের শাঁসের পায়েস

শ্রাবন্তী দত্ত



কী কী লাগবে

দুধ ১/২ লিটার, ডাবের শাঁস বাটা ১ কাপ, ডাবের শাঁস কুচি ১/২ কাপ, চিনি ১/৪ কাপ, কনডেন্সড মিল্ক ৩ টেবিল চামচ, ছোট এলাচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, গোলাপ জল ১/২ চা চামচ



কীভাবে বানাবেন

দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন হলে ডাবের শাঁস বাটা ও কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে নাড়ুন। চিনি মিশিয়ে আরও ঘন করুন। এলাচ গুঁড়ো ও গোলাপ জল দিয়ে নামিয়ে নিন। শেষে ডাবের শাঁস কুচি মিশিয়ে ফ্রিজে ঠাণ্ডা করে পরিবেশন করুন। ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ডাবের শাঁসের পায়েস গরমে একেবারে প্রশান্তির স্বাদ।



চিতল মাছের কালিয়া

শ্রীলেখা বণিক



কী কী লাগবে

চিতল মাছ ৪ পিস, আলু ১টি, টমেটো ১টি, কাঁচা লঙ্কা ৪টি, ধনেপাতা ২ চামচ, সর্ষের তেল ৫-৬ চামচ, আদা ১ টুকরো, পেঁয়াজ ১টি, জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, কাশ্মিরী লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, হলুদ পরিমাণমতো, নুন স্বাদমতো, গরম জল ১ কাপ, চিনি এক চিমটি, গরম মশলা গুঁড়ো ১ চা চামচ, ঘি ১ চা চামচ



কীভাবে বানাবেন

মাছ নুন-হলুদ মাখিয়ে রাখুন। টমেটো-আদা-জিরে-ধনে-কাশ্মিরী লঙ্কা একসাথে বেটে নিন, তেলে মাছ ও আলু ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে কাঁচালঙ্কা ও পেঁয়াজ বাটা দিয়ে কষে বাটা মশলা দিন। আলু দিয়ে নুন-হলুদ দিয়ে কষে গরম জল দিন। আলু সেদ্ধ হলে চিনি, ভাজা মাছ, ঘি ও গরম মশলা দিয়ে ঢেকে দিন। শেষে ধনেপাতা ও চেরা কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই চিতল কালিয়া স্বাদে একেবারে ঐতিহ্যের ছোঁয়া।



মটর ডালের বড়া দিয়ে পাকা তেঁতুলের চাটনি

নীতা দত্ত



কী কী লাগবে

মটর ডাল ১০০ গ্রাম, পাকা তেঁতুল ১০ গ্রাম (প্রায় ৪টি), কালো সর্ষে এক চিমটি, নুন স্বাদমতো, চিনি প্রায় ৭৫ গ্রাম, আখের গুড় ২ চামচ, লঙ্কা গুঁড়ো আধ চামচ, হলুদ ১ চা চামচ (ঐচ্ছিক), শুকনো লঙ্কা ৩–৪টি, সর্ষের তেল ১ টেবিল চামচ, সাদা তেল ২ টেবিল চামচ, জল ২–২.৫ কাপ



কীভাবে বানাবেন

তেঁতুল গরম জলে ভিজিয়ে ক্বাথ বের করে ছেঁকে নিন। ভেজানো মটর ডাল বেটে নুন-চিনি-লঙ্কা দিয়ে ফেটিয়ে নিন। তেলে ছোট বড়া ভেজে তুলে রাখুন। সর্ষের তেলে শুকনো লঙ্কা-সর্ষে ফোড়ন দিয়ে তেঁতুলের ক্বাথ ও জল দিন। নুন-হলুদ-চিনি-গুড় মিশিয়ে ফুটে উঠলে বড়া দিয়ে কয়েক মিনিট রান্না করুন। ঘন হওয়ার আগেই নামিয়ে নিন। গরম ভাত হোক বা পান্তা এই টক চাটনির সঙ্গে খেলে তৃপ্তি দ্বিগুণ।


থোড় গোবিন্দ

প্রিয়দর্শিনী নেগেল চক্রবর্তী



কী কী লাগবে

থোড় ১টি মাঝারি, গোবিন্দভোগ চাল ১০০ গ্রাম, সর্ষের তেল ২ টেবিল চামচ, তেজপাতা ২টি, শুকনো লঙ্কা ২টি, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, জিরে গুঁড়ো আধ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো আধ চা চামচ, চিনি ১ চা চামচ, ঘি ১ চা চামচ, গরম মসলা গুঁড়ো আধ চা চামচ, গোটা গরম মসলা ১ চা চামচ, আস্ত জিরে এক চিমটি, আদা বাটা ১ টুকরো, কাঁচা লঙ্কা ৪–৫টি, জল পরিমাণমতো, লবণ স্বাদমতো


কীভাবে বানাবেন

থোড় কুচি করে নুন-হলুদ জলে ভিজিয়ে সেদ্ধ করে চটকে নিন। তেলে জিরে-তেজপাতা-শুকনো লঙ্কা-গরম মসলা ফোড়ন দিন। চাল ভেজে সেদ্ধ থোড় মিশিয়ে নাড়ুন। নুন-হলুদ-জিরে-ধনে-চিনি-আদা বাটা দিয়ে কষান। অল্প জল দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। জল শুকোলে ঘি-গরম মসলা-কাঁচা লঙ্কা দিয়ে নেড়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই থোড় গোবিন্দ, সাবেকি স্বাদের অপূর্ব নিদর্শন।



বাঙালি শুক্তো

যুথী চক্রবর্তী



কী কী লাগবে

করলা/উচ্ছে ১টি, কাঁচকলা ১টি, রাঙা আলু ১টি, বেগুন ১টি, সজনে ডাঁটা ৪–৫টি, কাঁচা পেঁপে ১ ফালি, বরবটি ৬–৭টি (ঐচ্ছিক), মুলো ১টি (ঐচ্ছিক), সর্ষে ১ টেবিল চামচ, পোস্ত ২ টেবিল চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, কাঁচা লঙ্কা ২টি, সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, ঘি ১ চা চামচ, রাধুনি আধ চা চামচ (না হলে পাঁচফোড়ন), তেজপাতা ১টি, শুকনো লঙ্কা ১টি, দুধ আধ কাপ, চিনি ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, বিউলির বড়ি ৮–১০টি



কীভাবে বানাবেন

সর্ষে-পোস্ত ভিজিয়ে কাঁচা লঙ্কা দিয়ে বেটে নিন। সব সবজি কেটে ধুয়ে রাখুন। তেলে বড়ি ও করলা ভেজে তুলে রাখুন। বাকি সবজি হালকা ভেজে নিন। তেলে তেজপাতা-লঙ্কা-রাধুনি ফোড়ন দিয়ে আদা বাটা ও সর্ষে-পোস্ত বাটা কষান। সবজি দিয়ে জল দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। সেদ্ধ হলে করলা-বেগুন-বড়ি দিন। দুধ ও সামান্য ময়দা গোলা দিয়ে ফুটিয়ে নিন। শেষে ঘি ছড়িয়ে ঢেকে রাখুন। গরম ভাতের সঙ্গে প্রথম পাতে পরিবেশন করুন।



গন্ধরাজ সরষে ইলিশ

রুমকি দাস


কী কী লাগবে

ইলিশ মাছ ৪টি পিস, গন্ধরাজ লেবুর রস ২–৩ টেবিল চামচ, পোস্ত বাটা ১ টেবিল চামচ, সাদা সরষে বাটা ২ টেবিল চামচ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৩টি, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, সর্ষের তেল পরিমাণমতো


কীভাবে বানাবেন

মাছ নুন-হলুদ-গন্ধরাজ লেবুর রস দিয়ে ১৫–২০ মিনিট মেরিনেট করুন। তেলে আদা বাটা, কাঁচা লঙ্কা, পোস্ত ও সরষে বাটা কষান। হলুদ-নুন দিয়ে মশলা ভেজে মাছ দিয়ে আলতো করে কষান। সামান্য জল দিয়ে ঢেকে ৫–৭ মিনিট রান্না করুন। ঝোল ঘন হলে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই গন্ধরাজ সরষে ইলিশ, সুগন্ধে ও স্বাদে একেবারে অতুলনীয়।


মান কচু বাটা

রত্না বল্লরী গোস্বামী



কী কী লাগবে

কাঁচা মান কচু ৫০০ গ্রাম, নারিকেল কোরা অর্ধেক টি ছোট নারকেল, কাঁচা লঙ্কা ৭–৮টি, কালো সর্ষে ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, মিষ্টি স্বাদমতো, সর্ষে তেল প্রয়োজনমতো


কীভাবে বানাবেন

মান কচুর খোসা ছাড়িয়ে কুরিয়ে নিয়ে রস চিপে ফেলুন। কচুর পাল্পের সঙ্গে নারিকেল, নুন, মিষ্টি, কাঁচা লঙ্কা ও সর্ষে একসঙ্গে মিহি করে বাটুন। মসৃণ হলে পাত্রে তুলে কাঁচা সর্ষের তেল মেখে নিন। উপর থেকে কাঁচা লঙ্কা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন। গরম ভাতের সঙ্গে এই মান কচু বাটা সাবেকি স্বাদের একেবারে অমলিন স্মৃতি।



মুসুর ডালের পাকন পিঠা

টুম্পা বোস



কী কী লাগবে

মুসুর ডাল আধ কাপ (ভেজানো), চালের গুঁড়ো ২ কাপ, লবণ ১ চিমটি, পাটালি গুড় ১ কাপ (বা চিনি), সাদা তেল ভাজার জন্য, ঘি ২ চামচ


কীভাবে বানাবেন

ভেজানো ডাল অল্প জলে ভালো করে সিদ্ধ করে নিন। তাতে ১ কাপ চালের গুঁড়ো মিশিয়ে ঢেকে রাখুন। ঠান্ডা হলে মেখে ডো তৈরি করুন (প্রয়োজনে আরও চালের গুঁড়ো দিন)। শেষে ঘি মিশিয়ে নিন। ডো থেকে লেচি কেটে পছন্দমতো আকার দিন। গরম তেলে মাঝারি আঁচে ভেজে নিন। গুড় ও জল সম পরিমাণে জ্বাল দিয়ে রস তৈরি করে ভাজা পিঠা তাতে ডুবিয়ে রাখুন।

রস টেনে নিলেই তৈরি সুস্বাদু মুসুর ডালের পাকন পিঠা। নববর্ষের মিষ্টি হিসেবে একেবারে অনন্য।



রুই মাছের কাটলেট

যমুনা প্রধান


কী কী লাগবে

রুই মাছের পেটি ৩ পিস, চালের গুঁড়ো ১ চামচ, কর্ন স্টার্চ ৩ চামচ, বেসন ১ চামচ, লঙ্কা গুঁড়ো আধ চামচ, জিরে-ধনে গুঁড়ো ১ চামচ, পেঁয়াজ বাটা ১ চামচ, রসুন বাটা আধ চামচ, আদা বাটা ১ চামচ, গোলমরিচ গুঁড়ো সামান্য, লেবুর রস ১ চামচ, ডিম ১টি, নুন ও হলুদ পরিমাণমতো, বিস্কুটের গুঁড়ো ২ কাপ, সাদা তেল ভাজার জন্য


কীভাবে বানাবেন

মাছ নুন, হলুদ, লেবুর রস ও গোলমরিচ দিয়ে মাখিয়ে রেখে দিন। আদা-পেঁয়াজ-রসুন-লঙ্কা দিয়ে মাখান। বেসন, চালের গুঁড়ো, কর্নস্টার্চ মিশিয়ে ব্যাটার তৈরি করুন। আলাদা করে ডিম ফেটিয়ে রাখুন। মাছ ব্যাটারে ডুবিয়ে ডিমে ডুবিয়ে বিস্কুটের গুঁড়ো মেখে নিন। গরম তেলে ডুবো তেলে লাল করে ভেজে তুলুন। গরম গরম টমেটো সস ও কাসুন্দির সঙ্গে পরিবেশন করুন।



শাপলা চিংড়ি

নবনীতা মণ্ডল



কী কী লাগবে

শাপলা ১ কেজি, নোনা চিংড়ি ২৫০ গ্রাম, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, লঙ্কার গুঁড়ো ১ চা চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৫টি, কালোজিরা আধ চা চামচ, সরষে বাটা ১ টেবিল চামচ, সর্ষের তেল আধ কাপ, নুন স্বাদমতো, চিনি আধ চা চামচ, লেবুর রস ১ চা চামচ


কীভাবে বানাবেন

শাপলা পরিষ্কার করে টুকরো করে ধুয়ে নিন। নুন-হলুদ মাখানো চিংড়ি আলাদা রাখুন। শাপলা নুন জলে ভাপিয়ে জল ঝরিয়ে নিন। চিংড়ি হালকা ভাপিয়ে নিন। তেলে কালোজিরা ফোড়ন দিয়ে হলুদ-লঙ্কা কষান। শাপলা, চিংড়ি, কাঁচা লঙ্কা দিয়ে মিশিয়ে নুন-চিনি দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। শেষে সরষে বাটা, লেবুর রস ও কাঁচা তেল ছড়িয়ে নেড়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই শাপলা চিংড়ি গ্রামবাংলার এক অসাধারণ স্বাদ।



আম দই

সমাপ্তি দে



কী কী লাগবে

দুধ ১ লিটার, পাকা আম ১টি, সাজা (দইয়ের স্টার্টার) অল্প, চিনি আধ কাপ, মিল্কমেড ৩ টেবিল চামচ, ড্রাই ফ্রুটস কুচি পরিমাণমতো


কীভাবে বানাবেন

দুধ জ্বাল দিয়ে অর্ধেক করে নিন। তাতে চিনি ও মিল্কমেড দিয়ে আরও কিছুক্ষণ ফুটিয়ে নামিয়ে হালকা গরম অবস্থায় আমের পাল্প মিশিয়ে নিন। হাতে সহ্য হয় এমন গরমে সাঁজা মিশিয়ে ভালো করে নেড়ে ঢেকে সারা রাত রেখে দিন। সকালে দই জমে গেলে ফ্রিজে ৪–৫ ঘণ্টা ঠান্ডা করুন। উপর থেকে ড্রাই ফ্রুটস, আম কুচি ও গোলাপের পাঁপড়ি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন। ঠান্ডা ঠান্ডা আম দই, গরমের দিনে একেবারে স্বর্গীয় স্বাদ।



তিল লাউয়ের নাড়ু

অনন্যা মন্ডল



কী কী লাগবে

লাউ (ছোট, কুরানো) ১টি, লবণ সামান্য, দুধ আধ লিটার, গুঁড়ো দুধ ১ প্যাকেট, এলাচ ৪টি, মিল্কমেড ৪ টেবিল চামচ, চিনি ৪ টেবিল চামচ, চিনাবাদাম ৪ টেবিল চামচ, কাজুবাদাম কুচি ২ টেবিল চামচ, গোটা কাজু পরিমাণমতো, সবুজ ফুড কালার এক চিমটি, তিল ৪ টেবিল চামচ (হালকা ভাজা), নারকেল কোরা ৪ টেবিল চামচ, জল আধ কাপ, ঘি ২ টেবিল চামচ


কীভাবে বানাবেন

দুধ ফুটিয়ে নারকেল কোরা দিন‌। অন্য পাত্রে ঘি দিয়ে কুরানো লাউ হালকা ভেজে দুধে মিশিয়ে দিন। গুঁড়ো দুধ, মিল্কমেড, চিনি, বাদাম ও এলাচ দিয়ে নেড়ে নিন। ফুড কালার দিয়ে মিশিয়ে শুকনো হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। মিশ্রণ নামিয়ে সামান্য ঠান্ডা হলে নাড়ুর আকার দিন। ভাজা তিলে গড়িয়ে নিয়ে কাজুবাদাম দিয়ে সাজান। মিষ্টি সুগন্ধি এই তিল লাউয়ের নাড়ু নববর্ষের ভুরিভোজে একেবারে অনন্য।



চিংড়ির রস বড়া

জয়া দাস



কী কী লাগবে

চিংড়ি মাছ ৩০০ গ্রাম (মিহি বাটা), নারকেলের দুধ ২ কাপ, সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ কুচি ২ টেবিল চামচ, পেঁয়াজ বাটা ২ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ২ টেবিল চামচ, আদা বাটা ২ চা চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৪–৫টি, গোলমরিচ গুঁড়ো ১ চা চামচ, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো ২ চা চামচ, জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো ২ চা চামচ, গোটা গরম মসলা (এলাচ-দারুচিনি-লবঙ্গ), গরম মসলা গুঁড়ো আধ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, গরম জল দেড় কাপ, ধনেপাতা সামান্য


কীভাবে বানাবেন

চিংড়ি বাটা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, গুঁড়ো মশলা, নুন দিয়ে মেখে রেখে দিন। তেলে গোটা গরম মসলা ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ কুচি ভেজে, পেঁয়াজ, রসুন, আদা বাটা কষান। গুঁড়ো মশলা দিয়ে কষে অল্প জল দিন। নারকেলের দুধ ও জল দিয়ে ফুটতে দিন। ফুটলে চিংড়ির মিশ্রণ থেকে ছোট বল বানিয়ে ঝোলে ছাড়ুন। ঢেকে ৮-১০ মিনিট রান্না করুন। শেষে গরম মসলা ও ধনেপাতা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাত বা পোলাওয়ের সঙ্গে এই চিংড়ির রস বড়া, স্বাদে একেবারে রাজকীয়।



মৌরি তেলাপিয়া

সর্বাণী দত্ত



কী কী লাগবে

তেলাপিয়া মাছ ৪ টুকরো, মৌরি ১ চা চামচ, মৌরি বাটা ১ চা চামচ, পেঁয়াজ বাটা ২ চামচ, আদা-রসুন বাটা ১ চামচ, টমেটো বাটা ২ চামচ, হলুদ গুঁড়া আধ চা চামচ, লঙ্কা গুঁড়া ১ চা চামচ, ধনে গুঁড়া ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, সর্ষের তেল ৩ চামচ, কাঁচা লঙ্কা ২–৩টি, ধনেপাতা কুচি পরিমাণমতো


কীভাবে বানাবেন

মাছ নুন-হলুদ মেখে রেখে হালকা ভেজে তুলুন। একই তেলে মৌরি ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ বাটা ভাজুন। আদা-রসুন বাটা দিয়ে কষান। টমেটো বাটা ও গুঁড়া মশলা দিয়ে ভালো করে কষে অল্প জল দিন। ফুটলে মাছ দিয়ে ঢেকে ৫–৭ মিনিট রান্না করুন। শেষে কাঁচা লঙ্কা ও ধনেপাতা ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই মৌরি তেলাপিয়া সুগন্ধি ও হালকা মশলার অপূর্ব স্বাদ।



মাছের মৌলি

মমতাজ বেগম



কী কী লাগবে

মাছ ৫ টুকরো, পেঁয়াজ বাটা ১টি বড়, রসুন ৩ কোয়া (থেঁতো), হলুদ গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, জিরে বাটা ১ চা চামচ, লাল লঙ্কা বাটা আধ চা চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৩টি, দুধ ১ কাপ, গরম মশলা ১/৪ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, গরম জল ১/২ কাপ, সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, তেজপাতা ১টি, ঘি ১ টেবিল চামচ


কীভাবে বানাবেন

মাছ নুন-হলুদ মেখে হালকা ভেজে তুলুন। তেলে তেজপাতা-এলাচ ফোড়ন দিয়ে পেঁয়াজ, জিরে, হলুদ, লঙ্কা বাটা কষান। তেল ছাড়লে দুধ দিয়ে ফুটিয়ে ভাজা মাছ ও কাঁচা লঙ্কা দিন। ঢেকে অল্প আঁচে রান্না করুন। শেষে ঘি ও গরম মশলা দিয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই মাছের মৌলি, সাবেকি স্বাদের অপূর্ব পরিবেশন।



মটন লহুদার

স্বাগতা বিশ্বাস



কী কী লাগবে

খাসির মাংস ৫০০ গ্রাম, নুন স্বাদমতো, তেল ও ঘি পরিমাণমতো, টমেটো সেদ্ধ ২টি, সাদা জিরে ১ টেবিল চামচ, গোলমরিচ প্রায় ২০টি, রসুন ২০ কোয়া, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো ১ টেবিল চামচ, কারিপাতা ১০টি, ধনেপাতা এক মুঠো, আদা ২ টুকরো, শুকনো লাল লঙ্কা ১০টি (ভিজানো), পেঁয়াজ ২টি (স্লাইস করে বেরেস্তা), তেজপাতা ২টি, সবুজ এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৪টি, দারুচিনি ১ ইঞ্চি, বড় এলাচ ১টি


কীভাবে বানাবেন

মাংস ধুয়ে নিন। তেলে পেঁয়াজ ভেজে বেরেস্তা তৈরি করে রাখুন। একই তেলে গোটা মসলা ফোড়ন দিয়ে মাংস ভেজে নিন। টমেটো, জিরে, গোলমরিচ, রসুন, আদা, লঙ্কা, ধনেপাতা দিয়ে পেস্ট বানিয়ে মাংসে দিয়ে নুন-হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করুন। মাংস নরম হলে বেরেস্তা মিশিয়ে নেড়ে নামিয়ে নিন।



রুই মাছের ঝোল (ঠাকুরবাড়ি স্টাইল)

সুপর্ণা মণ্ডল



কী কী লাগবে

রুই মাছ ৩–৪ পিস, আলু ২টি (ডুমো কাটা), পটল ৪–৫টি, বড়ি ৬–৭টি, ডাঁটা ১টি (ঐচ্ছিক), আদা বাটা আধ চা চামচ, জিরে-কাঁচালঙ্কা বাটা ১/৩ চা চামচ, তেজপাতা ১–২টি, পাঁচফোড়ন সামান্য, সর্ষের তেল পরিমাণমতো, নুন ও চিনি স্বাদমতো


কীভাবে বানাবেন

মাছ, আলু, পটল ও বড়ি ভেজে তুলে রাখুন। তেলে নুন-হলুদ-ধনে বাটা জল দিয়ে ফুটিয়ে নিন। ফুটলে সবজি ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে সেদ্ধ করুন। সবজি সেদ্ধ হলে মাছ দিন। শেষে আদা বাটা ও অল্প জিরে-লঙ্কা বাটা দিয়ে ফুটিয়ে নিন। আলাদা করে তেলে পাঁচফোড়ন, তেজপাতা ফোড়ন দিয়ে ঝোলে মিশিয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে এই ঠাকুরবাড়ি স্টাইলের রুই মাছের ঝোল একেবারে ঘরোয়া ও তৃপ্তিদায়ক।




ছানার পায়েস

অঞ্জুশ্রী মান্ডি মুর্মু



কী কী লাগবে

দুধ ২ লিটার (১ লিটার ছানার জন্য, ১ লিটার পায়েসের জন্য), পেস্তা ৭–৮টি, ছোট এলাচ ২টি, চিনি আধ কাপ (স্বাদমতো), নুন ১ চিমটি, ভিনিগার ২ টেবিল চামচ, গোলাপ জল ১/৪ চা চামচ, গোলাপের পাপড়ি সাজানোর জন্য


কীভাবে বানাবেন

১ লিটার দুধে ভিনিগার দিয়ে ছানা কেটে নিয়ে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। বাকি দুধ ফুটিয়ে এলাচ দিন। অর্ধেকের কম হলে চিনি-নুন মিশিয়ে নিন। গ্যাস বন্ধ করে ছানা চটকে মিশিয়ে দিন। পেস্তা ও গোলাপ জল দিন। আবার একবার ফুটিয়ে নামিয়ে ঠান্ডা করুন। ফ্রিজে ৪ ঘণ্টা রেখে পরিবেশন করুন। উপর থেকে পেস্তা কুচি ও গোলাপ পাপড়ি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন। ঠান্ডা ঠান্ডা ছানার পায়েসে ভোজ হোক আরও মিষ্টি।

ঝুমুর বিশ্বাস


ডুমুরের পাতুরি

ঝুমুর বিশ্বাস



কী কী লাগবে

ডুমুর ২০০–২৫০ গ্রাম (হালকা সেদ্ধ), নারকেল কোরা আধ কাপ, সরষে বাটা ২ টেবিল চামচ, পোস্ত বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪–৫টি, সরষের তেল ৩–৪ টেবিল চামচ, হলুদ ও নুন পরিমাণমতো, কলা পাতা কয়েকটি


কীভাবে বানাবেন

ডুমুর কেটে নুন-হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে নিন। নারকেল, সরষে, পোস্ত, কাঁচালঙ্কা, তেল দিয়ে মেখে নিন। কলা পাতা সেঁকে নিয়ে মিশ্রণ ভরে মুড়ে বেঁধে নিন। প্যানে ঢেকে কম আঁচে দু’পিঠে ১০–১২ মিনিট করে রান্না করুন।

পাতা হালকা পোড়া গন্ধ বেরোলেই তৈরি, গরম ভাতের সঙ্গে ডুমুরের পাতুরি একেবারে অপূর্ব।

কথাকলি

সুপ্তা আঢ্য


দীর্ঘ স্কুলজীবনের আজ ইতি কথাকলি ভট্টাচার্যের। সেই কবে বছর ছাব্বিশের এক তরুণী, কোনো এক সকালে তপোবনের মতো এই স্কুল চত্বরে অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট লেটার হাতে দুরুদুরু বুকে এসে দাঁড়ালে, সেদিন বড়দি প্রতিভা বসুর স্নেহে সব দ্বিধা কেটে গেছিল নিমেষেই। বড়দি হয়ে গেছিলেন অতি আপন জন।

বছর পনেরো আগে এরকমই একটা দিনে বড়দি নির্দ্বিধায় ওর হাতে ব্যাটনটা ধরিয়ে বলেছিলেন, বটবৃক্ষ না অশ্বত্থগাছ হয়ে ওঠো, শেষ বেলায় শিকড় উপড়ালে কোনো ঝুরি শিকড় তৈরী করতে না পারে।

শুরুর দিনের মতোই আজ কথাকলি নীরবে যেতে চাইলেও স্কুল হতে দিল না। সহকর্মীরা, স্কুল কমিটি বেশ ঘটা করেই বিদায় সম্বর্ধনার আয়োজন করেছেন। সকলের স্মৃতিচারণে পুরোনো পাতাগুলো ঝোড়ো হাওয়ায় বড়ো ওলটপালট হচ্ছে। চশমার আড়ালের চোখদুটো বারেবারেই ঝাপসা হয়ে আসছে।

শেষ দুপুরের নরম রোদের আভা পাতার ফাঁক দিয়ে পায়ে জড়িয়ে আজ পিছন পায়ে টানছে কথাকলিকে। শেষবেলার সময় ঘড়ির কাঁটা ধীরে সুস্থে পেরোচ্ছিল; কোথাও কোনও তাড়া নেই। পড়ন্ত বিকেলের আলোয় স্কুল বাড়িটাকে একবার দেখে পায়ে পায়ে গেট পেরিয়ে এসে পিছনে তাকিয়ে হাত নেড়ে গাড়িতে উঠলেন মণিমালা উচ্চ বিদ্যালয়ের সদ্য প্রাক্তন হেড মিস্ট্রেস কথাকলি ভট্টাচার্য। সামনের সিটে নতুন টিচার রহমান। বারণ করলেও শোনেনি ছেলেটা। এই কয়মাসে হাসিখুশি স্বভাব মিশুক ছেলেটার সকলের স্নেহ আদায় করতে বেশী সময় লাগেনি।

- কী ব্যাপার রহমান, এতো চুপচাপ?

- আপনাকে ভীষণ মিস করব দিদি।

- আমিও মিস করব। তোমরা কাজে থাকবে, আর আমি কর্মহীন; তোমাদের মনে করাই কাজ এখন থেকে।

- কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে আবার স্কুলে আসুন না দিদি।

চেয়ারের সম্মানটাই শেষ কথা কর্মক্ষেত্রে। মিষ্টি হেসে বললেন, অনেকদিন চাকরী করলাম; এবার একটু নিজের মতো করে কাটাই বরং।

বড়দির কথার অন্যথা হবে না বুঝে সামনে তাকিয়ে রইল রহমান, আর কথাকলি সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করলেন। অপরাহ্নবেলার এই দিনটা আয়না ধরতেই উনিও ভাবনায় হারাতে সময় নিলেন না।

- এরপর কোন দিকে যেতে হবে দিদি? হঠাৎই রহমানের প্রশ্নে একটু ধাতস্থ হয়ে ঠিকানা বলে চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন, বিদায় উপহারে ভরে গেছে গাড়ি। কোনদিনই কিছু নেওয়ার ইচ্ছে হয়নি কথাকলির, কিন্তু শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সম্মান মিলেমিশে এগুলো সেতুবিহীন এক সেতু।

বাড়ির সামনে এসে গাড়ি দাঁড়াতেই রহমান দরজা খুলে নামতে সাহায্য করল। এখন বাড়িতে কেউ নেই। দাদা বৌদি ছেলের কাছে মুম্বইতে। গেটের তালা খুলে রহমানকে ডাকার জন্য তাকিয়ে দেখলেন, ও উপহারগুলো নামাতে ব্যস্ত। সব উপহার বসার ঘরে রেখে ওনাকে প্রণাম করে চলে যেতে উদ্যত হলে চায়ের কথা বলতেই ও হেসে বলল, আজ থাক দিদি। আপনি বিশ্রাম নিন।

রহমান বেরিয়ে যেতেই দরজায় দাঁড়িয়ে কথাকলি দেখলেন প্রায় ছ'ফুট হাইটের ছেলেটা লম্বা পা ফেলে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িটায় উঠে হাত নাড়তে নাড়তে চলে গেল।

এই মুহূর্তে বাড়িতে কথাকলি একা। বৌদি থাকলে বলার আগেই দু'কাপ চা নিয়ে গল্প জমাতো। এদিকে চায়ের তেষ্টাও বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। সব আলসেমি ছেড়ে এক কাপ কড়া চা বানিয়ে সোফায় বসতেই ফোন জানান দিল।

ফোনটা রিসিভ করে বলল, এরকম ভাবে তাকিয়ে আছ কেন?

- তুই ঠিক আছিস তো?

- কথা, মনখারাপ করবে না। দেখবে সব সয়ে যাবে।

- হ্যাঁ পিপি, এতদিন তো স্কুল নিয়েই কাটালে। এবার নিজের মতো করে থাকবে। এটা নতুন জার্নি পিপি, এনজয় দ্য জার্নি।

- তোমার জন্য অনেক বই কিনেছি। বাই ট্রেন না প্লেন, কোনটা পছন্দ বলো সেটাই হবে।

- কিছু বল, চুপ করে আছিস কেন?

দাদার প্রশ্নে হাসতে হাসতে বলল, তোমাদের শেষ না হলে আমি শুরু করি কী করে! আমি ঠিক আছি দাদা। প্রথম প্রথম একটু তো মনখারাপ হবেই; এতদিনের অভ্যেস, তবে এটাও অভ্যেস হয়ে যাবে। তোমাদের কথামতো নতুন জার্নি। তবে এবার তিন বুড়োবুড়ি মিলে এনজয় করব। ট্রেনেই যাব রে। সময় নিয়ে ধীরে সুস্থে যাব।

- ঠিক আছে পিপি, তাই হবে। কী গিফট পেলে? গিফটগুলো দেখেছ!

- একা একা গিফট দেখতে ইচ্ছে করে !

- নাও,আগে চা খাও; তারপর গিফট দেখি।

ওঃ বৌদি! তুমি পারোও বটে।

মোবাইলটা ফুলদানির গায়ে রেখে র‌্যাপ খুলতেই বেরোতে লাগল পেন, বই, ঘড়ি, শাল, শাড়ি।

ডোডো মৌ তো বলেই দিল, সত্যি পিপি,আমরাও বোধহয় এতটা ভালো বাসি না। অ্যাজ আ টিচার, এটাই গ্রেট অ্যাচিভমেণ্ট।

নারে, সবটুকু দায়িত্ববোধ, ডেডিকেশন দাদার কাছে শেখা। দাদাই আমার টিচার; সব কৃতিত্ব দাদারই।

বোনের কথায় হেসে কল্লোলবাবু বললেন, আমি শুধু পথ দেখিয়েছি, দীর্ঘ পথ হেঁটেছিস তুই একা।

দাদার কথায় চোখে জল এসে গেল কথাকলির। আরও কিছুক্ষণ কথার শেষে গিফটগুলো রেখে বই নিয়ে বসল ও।

রিটায়ারমেণ্টের কিছুদিন পর ব্যস্ত সময় পেরিয়ে এসে এক অখণ্ড অবকাশ। প্রথম প্রথম ব্যস্ততার সময়ে ঘড়ির কাঁটা পৌঁছলে মনটাও ছটফটিয়ে উঠত। এখন সেখানে পলি জমতে শুরু হয়েছে। মাঘের শেষের শীত বছরভোরের অপেক্ষা রেখে যাওয়ার আগে আরেকবার জাঁকিয়ে পড়েছে। সামনের দক্ষিণমুখো গোল বারান্দাটায় শেষবেলা অব্দি রোদ্দুরটা যাব যাব করেও থেকে যায়। শেষ দুপুরের সোহাগী রোদ্দুরে গায়ে শাল জড়িয়ে বারান্দার ইজিচেয়ারে শরীরটাকে হেলিয়ে বই হাতে বসেন কথাকলি। কুয়াশা মোড়া বিষণ্ণ বিকেলকে নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নেন শরীর মনে।

প্রায় দিন দশেক পর মুম্বই যাওয়ার টিকিটটা ডোডো পাঠালেও অলসতা ভেঙে আর যেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু ওদের উৎসাহ দেখে এ কদিনে জাঁকিয়ে বসা আলসেমিকে সরিয়ে ব্যস্ত হতেই হল।

যদিও বেড়াতে যাওয়া খুব বেশী হয়ে ওঠেনি, তবুও রাতের জার্নিই পছন্দ করেন কথাকলি। অন্ধকারের বুক চিরে এগিয়ে যাওয়া এক ঘুমন্ত পুরীতে অন্য অনুভূতি ; নিস্তব্ধ কামরায় নির্ঘুম চোখে ট্রেনের দুলুনিতে ঘুমের আবেশ। নামার তাড়া না থাকলে বেশ আয়েস করে আধোঘুমে অলসতায় অনেকখানি সময় আড়মোড়া ভেঙে নিজের মতো করে কাটানো যায়। আর এটাতো লম্বা জার্নি! কোনও ব্যস্ততা নেই, একটা অলস দিন শুয়ে বসে জানালা দিয়ে বাইরের কর্মব্যস্ত মানুষ, ছুটে চলা প্রকৃতি দেখতে দেখতে একটা বার্থে একদিনের খেলনাবাটির সংসারে বেশ ভালোই কাটে।

হাওড়া থেকে সন্ধ্যের ট্রেন, সেইমতো দুপুরের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে গাড়ির অপেক্ষা করতে লাগলেন। এখন আর নতুন করে দৌড়ঝাঁপ করতে ইচ্ছে করে না বলেই কাজের মাসী শোভা'র ভাই বরুণকে বলেছেন।

তাই ট্রেন ছাড়ার ঘণ্টাখানেক আগেই স্টেশনে পৌঁছে গেছেন কথাকলি। শোভার ভাই বেশ যত্ন করেই নিয়ে এসেছে ; অল্প বয়স হলেও বেশ দায়িত্বশীল। স্টেশনে পৌঁছে ওকে ফিরে যাওয়ার কথা বলতেই বলল,ও নিয়ে আপনি ভাববেন না দিদি। আপনাকে ট্রেনে উঠিয়ে আমি ফিরব।

- তোমার দেরী হয়ে যাবে, আমি ঠিক উঠে পড়ব, তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না।

- আমাকে বাধা দেবেন না দিদি।

এরপর আর কিছুই বলার ছিল না। স্টেশনে ঢুকে একটা চেয়ারে কথাকলি বসলে ব্যাগপত্তরগুলো রেখে চা আনতে চলে গেল বছর ছাব্বিশের ছেলেটা। স্টেশনে বসে অপেক্ষা করতে বেশ লাগছিল। কত মানুষের কতরকমের ব্যস্ততা; কারো ট্রেন ধরার ব্যস্ততা,কেউ ব্যস্ত ট্রেন থেকে কাছের মানুষকে খুঁজে নিয়ে স্বস্তির হাসি হাসতে আবার কেউ গন্তব্যে পৌঁছতে ব্যস্ত। আর এখন পাখিদের নীড়ে ফেরার সময়; কয়েকদিন আগে পর্যন্ত স্কুল শেষে বাগান ঘেরা বাড়িটায় ফেরার ব্যস্ততায় ছটফট করত মনটা। দিন শেষে একান্ত নীড়ে ফিরতে চাওয়া মানুষগুলোকে দেখে অদ্ভুত তৃপ্তির স্বাদ পাচ্ছিলেন।

স্টেশনে বসে মানুষের আনাগোনা, কথাবার্তা শুনতে শুনতে সময়ের একঘেয়েমি বুঝতেই পারেননি কথাকলি। একুশ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ট্রেন অ্যানাউন্স হতে বরুণই লাগেজ নিয়ে প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে বার্থ, সিট খুঁজে ট্রলিটা সিটের নীচে রেখে হাসিমুখে বলল, সাবধানে যাবেন দিদি। আমি এবার আসি।

কথাকলি জানেন কোনো কিছুর বিনিময়েই এই আন্তরিকতার ঋণ শোধ হওয়ার নয়। মিষ্টি হেসে ওর মাথায় হাত রেখে বললেন, সাবধানে যেও। ফিরে আসি, তারপর এসো একদিন।

বরুণ চলে গেলে নিজের সিটে বসে ট্রেন ছাড়ার আগে উদ্বিগ্ন মুখগুলোর দৌড়োদৌড়ি দেখতে দেখতে ভাবছিলেন, বরুণ না থাকলে বেশ মুশকিল হত।

সি অফ করতে আসা কাছের মানুষগুলোর উৎকন্ঠিত সাবধানবাণী বেশ লাগছিল কথাকলির। মায়ের সন্তানের জন্য, স্ত্রীর স্বামীর জন্য, বন্ধুর বন্ধুকে নিয়ে, প্রেমিকার প্রেমিককে নিয়ে চিন্তা… কতরকমের চিন্তা পরিজনদের। এদের শুভকামনাই ড্রাইভার সাহেবকে একরাশ আত্মবিশ্বাসে ভরিয়ে তোলে। নিজের বার্থে গুছিয়ে বসে এসব আকাশ পাতাল ভাবছিলেন কথাকলি। হঠাৎ শেষ মুহূর্তে একটি মেয়ে সামনের বার্থে নিজের সেটআপ ঠিক করে নিশ্চিন্তে বসতেই জানালার পাশের ভিড়ে একটা মুখ চমকে দিল কথাকলিকে। এক অজানা কৌতুহল ঘিরে ধরছিল। হঠাৎই দেখলেন, মেয়েটি জানালার সামনে হাত নাড়িয়ে বলল, ডোন্ট ওয়ারি, আমি পৌঁছে খবর দেব।

জানালার বাইরের উদ্বিগ্ন, মনখারাপের বাতাসকে সঙ্গী করা মানুষটা বললেন, সাবধানে যাবি। অচেনা এড়িয়ে চলবি।

গলাটা শুনে আরও একবার জানালার বাইরে তাকিয়ে চেহারাটা একঝলক দেখতেই ট্রেন গতি নিয়ে চলতে শুরু করল। মেয়েটা হাসিমুখে হাত নাড়ছিল শেষ ছায়াটুকু অব্দি। প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই মেয়েটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জিনিসগুলো একপাশে সরিয়ে কানে ইয়ার বাডস্ নিয়ে আধশোয়া হয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। এতক্ষণে মেয়েটাকে সোজাসুজি দেখার সুযোগ পেয়েছে কথাকলি। বড়জোর বছর পঁচিশ বয়স হবে, গায়ের রঙ চাপা হলেও মুখশ্রী ভারী মায়াবী। স্টেপ কাট চুল কাঁধ ছাড়িয়েছে। পরনে জিন্স টপ, পায়ে স্নিকার। মায়াবী মুখটার সাথে একটু আগে স্টেশনে দেখা মুখের অদ্ভুত মিল! ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দেবেন না ভাবলেও ঝেড়ে ফেলতেও পারছিলেন না। মেয়েটার দিকে তাকালেই দীর্ঘসময় চাপা থাকা গল্পগুলো হেঁটে দৌড়ে চেতনে এসে জীবন পেতে চাইছে। একদিন যা ছিল জীবন, আজ সেটাই গল্প; কী অদ্ভুত জীবনবৃত্ত। মেয়েটা ততক্ষণে উঠে বসে ফোনে নিভৃতালাপ করছে বুঝতে পেরে আড়চোখে দেখে চোখ বন্ধ করতেই গল্পগুলো চোখের পাতায় ভিড় করে এল।

আজকের কথাকলি সেদিন ছিল অষ্টাদশী। সুন্দরী না হলেও শ্যামলা মেয়েটাকে সুশ্রী বলাই যেত। পুরো চেহারায় মন কেড়ে নিত ঝকঝকে সরল হাসিটা। ওর জগৎ বই ছিল বলেই কলেজে গিয়েও বন্ধুসঙ্গ তৈরি হয়নি, কিন্তু বসন্ত কখন কার হৃদয়ে সুর তোলে সেটা মদনদেবই জানেন। ছোট থেকেই হাই পাওয়ারের চশমা। ফার্স্ট বেঞ্চে রোজ বসলেও একদিন একটু দেরীতে কলেজ পৌঁছে দেখল শুধুমাত্র লাস্ট বেঞ্চের কোণের সিটটাই ফাঁকা। দূরের কিছু দেখতে ওর অসুবিধেই হয়, সেদিনও হচ্ছিল। বোর্ডে লেখাগুলো একটু ঝাপসা লাগছিল বলে বারবার চশমাটা ওড়না দিয়ে মুছছিল। পাশে বসা ছেলেটার দৃষ্টি এড়ায়নি ব্যাপারটা। ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, তোর কী বোর্ড ফলো করতে অসুবিধে হচ্ছে? সেক্ষেত্রে আমার খাতাটা দেখতে পারিস।

- থ্যাঙ্কস, ভীষণ উপকার করলেন আপনি। ওর মুখে আপনি শুনে একটু চমকেই গিয়েছিল ছেলেটা আর বাকিরা ঘাড় ঘুরিয়ে মুখ টিপে হাসছিল।

- আমরা একসাথে পড়ি ইয়ার, আপনি বলছিস কেন?

- সামনের বেঞ্চের মেয়েটা বলল, আপনি বুঝি মঙ্গল গ্রহ হইতে আসিয়াছেন!

বড্ড অস্বস্তি হচ্ছিল কথাকলির। পাশে বসা ছেলেটা ওদের থামিয়ে বলল, ঘুরে বস, স্যার দেখতে পাবেন।

- ওদের কথায় পাত্তা দিস না। তুই লেখ।

সেই বন্ধুত্বের শুরু চয়নের সাথে। এরপর সময়ের সাথে ওদের বন্ধুত্ব আরও গভীর হয়েছে। চয়নের অনেক বন্ধু থাকলেও কথাকলির চয়ন ছাড়া কোনো বন্ধু ছিল না। চয়নের ওপর অনেকখানি নির্ভরতা কখনো বুঝতেই দেয়নি। চয়ন প্রায়ই কলেজ বাঙ্ক করে খেলতে চলে যেত আর কথাকলি ওকে ক্লাস নোটস দিয়ে ধন্য হত।

দিনগুলো প্রত্যেকটা দিনের মতোই কাটছিল; কোনো আলাদা রকমের সুবাস ছিল না তাতে। কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটির গিয়েও বন্ধুত্ব একরকম ভাবেই রয়ে গেছিল ওদের। চয়নের ওপর এক দুর্বোধ্য রকমের অধিকার জন্মালেও প্রকাশ করেনি কখনও। এত বছরের বন্ধুত্বের পরেও চয়ন কথাকলির মন বোঝেনি। কবে কোন মেয়েকে ভালো লেগেছে, কাকে ছাড়া জীবন অচল সব কথাকলিকে না বলা অব্দি শান্তি পেত না। ভেতরে ভেতরে রক্তক্ষরণ হত কথাকলির। চয়ন যে কখনোই ধরা দেবে না এটা বুঝতে পারলেও মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে পারত না মেয়েটা। আসলে চয়নের কাছে ও বন্ধু হলেও চয়নই যৌবনের প্রথম পুরুষ যার সংস্পর্শে ওর হৃদয় মুকুল পাপড়ি মেলেছে। এসব চয়নের অজানা হলেও এটাই দিনশেষের সত্য।

টেস্ট এক্সামের সপ্তাহখানেক আগে চয়ন বেশ কয়েকদিন ইউনিভার্সিটি না আসায় অবাকই হচ্ছিল কথাকলি, সাথে একটু চিন্তাও হচ্ছিল। চার পাঁচদিন পরেও যখন চয়ন এলো না, এক শনিবার ক্লাস শেষে সাহসে ভর করে চয়নের বাড়ি গেছিল ও। বেশ বড়ো বাড়ি চয়নদের; সামনে কেয়ারি করা ফুল বাগানের মাঝখান দিয়ে নুড়ি বিছানো পথ। দোতলা তিনতলার ছাদ বারান্দা সুন্দর করে সাজানো। নীচ থেকেই ফুলের সমারোহ বেশ বোঝা যাচ্ছিল। পায়ে পায়ে বাগান পেরিয়ে দরজার কাছে এসে দ্বিধাভরে বেলটা বাজাতে গিয়েও হাত সরিয়ে ফিরে আসছিল কথাকলি। বাগানের মাঝামাঝি আসতেই শুনতে পেল, কে তুমি? বাড়ীতে না এসেই ফিরে যাচ্ছ?

শান্ত, মুখচোরা কথাকলি দাঁড়িয়ে গেল স্থানুবৎ। পিছনে পায়ের আওয়াজে জড়োসড়ো হয়ে গেল অস্বস্তিতে।

- এই ভরদুপুর বেলায় ভেতরে না এসে ফিরে যাচ্ছ। কে তুমি?

স্নেহশীল কণ্ঠে অস্বস্তি খানিকটা কাটিয়ে বলল, আমি কথাকলি।

ও তাইতো! তুমি কথাকলি, চয়নের বন্ধু। ফিরে যাচ্ছিলে কেন?

- আসলে, চয়ন কিছুদিন ক্লাসে আসছে না তাই নোটস দিতে, মানে…

- ঠিক আছে, তুমি বন্ধুর বাড়ি এসেছ। এত কিছু বলার প্রয়োজনই নেই। ভেতরে এস।

বাড়ির ভেতরে আসতেই উনি বললেন, আমি কে বলতো!

চয়নের মা বলেই মনে হচ্ছিল কথাকলির। তবু ভয়ে ভয়েই বলল, আপনি কাকীমা…মানে…চয়নের মা!

- একেবারে ঠিক বলেছ। তুমি তো ইউনিভার্সিটি থেকে আসছ; রোদ্দুরে মুখটা শুকিয়ে গেছে। তিনতলায় চলে যাও, চয়ন ওখানেই আছে। আমি টিফিনের ব্যবস্থা করছি।

- কিছু খাব না কাকীমা, একটু জল খাব শুধু।

ওমা, তাইতো! দুপুর রোদে এসেছ, আমারই তো বলার কথা।

চয়নের মা জল আনতে গেলে একরাশ বিস্ময়ে বাড়িটা দেখতে লাগল ও।

কী অপূর্ব শৌখিনতায় সাজানো। জল খেতে খেতে শুনল চয়ন কদিন ধরেই জ্বরে ভুগছে। ওপরে গিয়ে দেখল, চয়ন আপাদমস্তক চাদর চাপা নিয়ে ঘুমোচ্ছে। একটু ইতস্তত বোধ করছিল ওকে জাগাতে; হয়ত চয়ন জেগেই ছিল বা আধোঘুমে, তাই ওর লঘু পায়ের আওয়াজে মুখ থেকে চাদর সরিয়ে চমকে জিজ্ঞেস করল, তুই! হঠাৎ!

- ক'দিন ধরে ইউনিভার্সিটি আসছিস না। কয়েকদিন পরেই তো টেস্ট, নোটসগুলো তো প্রয়োজন। তাই…

- ঠিক আছে রে বাবা, এত বলতে হবে না। বোস এখানে। মায়ের সাথে দেখা হয়েছে?

- হ্যাঁ,কাকীমা নীচেই ছিলেন।

চয়নকে নোটসগুলো বুঝিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ বসেই চলে এসেছিল কথাকলি। চয়ন যে এতটা বড়লোক ভাবতেই পারেনি ও। চয়ন যদিও ভীষণই মনখোলা তবু একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। তবে কাকীমা মানে চয়নের মাকে বেশ পছন্দ হয়েছিল; ভারী ভালো, যেমন রূপ তেমনই মিষ্টি ব্যবহার। চয়ন মায়ের মতোই দেখতে হয়েছে।

কথাকলির অস্বস্তি চয়নের সামনে ধোপে টেকেনি। চয়নের মা মাঝেমধ্যেই ডেকে পাঠাতেন আর চয়নও জোর করে নিয়ে যেত; কোনও ওজর আপত্তিই চলত না। তবে আস্তে আস্তে অনেকখানি সহজ হয়ে গিয়েছিল কথাকলি। ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিন চয়ন বলেছিল, মা তোকে আজ যেতে বলেছেন। যাবি তো?

- না রে,আজ না। কদিন পর যাব, কাকীমাকে বলিস।

- যো আপকি মর্জি! তো…না যাওয়ার কারণ কী বলব আপনার কাকীমাকে।

- রাগ করিস না, ভীষণ টায়ার্ড লাগছে।

চয়ন ঠোঁট উল্টে বলল, সে তুই ইচ্ছেমতো যাস। আমার কাজ খবরির, চলি রে। পরে দেখা হবে।

পরীক্ষার পর চয়নদের বাড়ি যাওয়ার কথা ভুলেই গেছিল ও। হঠাৎই একদিন দুপুরে পুরোনো পত্রিকায় উপন্যাসের নায়ক চয়ন মনে পড়িয়ে দিল, কাকীমা যেতে বললেও আর যাওয়া হয়ে উঠেনি আলসেমিতে। পরীক্ষা শেষ হয়ে গেছে, চয়নের সাথে দেখা হয় না বলে মনে পড়ানোরও কেউ নেই।

পরের দিন অবশ্যই যাব। গেলে চয়ন লেগপুলিং করবেই; ওসবে পাত্তা না দিয়ে কাল যাবোই।

পরের দিন দুপুর থাকতেই রোদ মাথায় বেরিয়ে পড়ল কথাকলি। চয়নদের বাড়ি যখন পৌঁছলো, তখনও শেষ দুপুরের গরম হাওয়ায় তেতে উঠছিল চোখ মুখ। রিকশার ভাড়া মিটিয়ে বাগানে ঢুকতেই দেখল কেয়ারি করা গাছগুলোও রোদ্দুরের তেজে ঝিমিয়ে আছে। বাগান পেরিয়ে দরজা পর্যন্ত আসতেই হাঁফিয়ে উঠল কথাকলি। বেলটা না বাজিয়ে দরজায় কয়েকবার ধাক্কা দিয়ে পাশের দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে হারানদা ওকে দেখেই বলল, ওমা দিদি! তুমি এই রোদ্দুরে! ভেতরে এস।

- ভালো আছ হারানদা?

- হ্যাঁ দিদি, ভালো আছি।

- একটু জল খাওয়াবে? কাকীমা কোথায়? কথাকলির গণ্ডির সীমানার কথা মাথায় রেখেই বলল, সবাই ওপরে আছে, তুমি যাও। আমি শরবত নিয়ে আসছি।

সিঁড়ি বেয়ে লঘু পায়ে তিনতলায় পৌঁছে বারান্দা পেরিয়ে চয়নের ঘরের কাছাকাছি পৌঁছতেই কথাবার্তার আওয়াজ শুনতে পেল ও। হাল্কা মনে আরও কিছুটা এগোতেই শুনতে পেল, তোর তো মাস্টার্স কমপ্লিট। চাকরী খোঁজার গরজ তো নেই

এবার বিয়ে করে আমায় শান্তি দে। কথাকলি জানে এটা চয়নদের পার্সোনাল ব্যাপার। ওর এসব শোনার অধিকার নেই,আর কথাকলি নিজেও কারোর ব্যাপারে থাকতে চায় না। তবে আজ পা দুটো এগোচ্ছিল না; এক অদম্য কৌতুহল চেপে ধরছিল।

চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনতে লাগল, বিয়ে করে বৌকে হাওয়া খাওয়াব?

- হাওয়া খাওয়াতে যাবি কেন? তুই তো অফিস জয়েন করবি? আর এসব কিছু তো তোরই। আমি তাহলে এগোই; কী বলো তোমরা?

- তুমি মেয়ে পছন্দ করে ফেলেছ মা!

- একরকম, সে মেয়েকে তোমাদেরও পছন্দ হবে।

- কে সে!

- কথাকলি, ভারী মিষ্টি মেয়ে। শান্ত, ভদ্র, ভালো বংশ আর কী চাই।

- জাস্ট অ্যা মিনিট! তুমি চয়নের বান্ধবীর কথা বলছ না তো!

- হ্যাঁ, ওর কথাই বলছি। তোমার পছন্দ না ওকে!

কাকীমার মুখে নিজের নাম শুনে এক অদ্ভুত উত্তেজনা হচ্ছিল ভেতরে ভেতরে। চয়নকে মনে মনে অনেকখানি ভালোবাসলেও মুখ ফুটে বলতে পারেনি কখনও। তাই চয়নের উত্তর শোনার অমোঘ আকর্ষণে স্থির দাঁড়িয়ে রইল ও।

- আমার কথা থাক। আগে চয়নের কথা শুনি। কী রে, তোর পছন্দ? কথা এগোব?

- না মা, কথাকে স্ত্রী হিসেবে আমার পছন্দ না।

- কেন চয়ন? অত ভালো একটা মেয়েকে কেন পছন্দ নয়? তাছাড়া, ও দেখতেও খারাপ নয়।

- বেশ তো, কথাকলির জন্য অন্য কোনো ভালো ছেলের সন্ধান করো। আমি হেল্প করব। কিন্তু,আমি নই।

- কারণ না বললে কথাকলির সাথেই বিয়ে হবে তোমার।

- তুমি কী একাই সিদ্ধান্ত নেবে? ছেলের অমতে কিছু করবে না তুমি।

ভীষণ অপমানিত লাগছিল নিজেকে। তবু শেষটা না শুনে যেতে পারছিল না কথাকলি।

মা, আমি জানি ওকে, কিন্তু আমার চাওয়ার সাথে মেলে না।

- তোমার কোন চাওয়ার সাথে মেলে না!

- থাক না মা, ও আমার খুব ভালো বন্ধু। ওর সম্বন্ধে এগুলো আমি বলতে চাই না।

- মা হয়ে বুঝতে পারছ না ছেলের কথা!

- না পারছি না। তুমি বুঝলে বলে দাও।

- মেয়েটার গায়ের রঙ দেখেছ! এমন দুধে আলতা ছেলের পাশে মানাবে? ওর গুণ আছে মানছি কিন্তু রূপটাও দরকার। নিজের দিকে তাকিয়ে তো বউ আনবে নাকি?

এই অপমানটাই যথেষ্ট ছিল ওর জন্য। তবু চয়নের উত্তরের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইল কথাকলি।

- কী রে, কিছু বলবি?

তুমি যখন শুনতেই চাইছ! কথাকলি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড, ভীষণ ভালোবাসি আমি ওকে। কিন্তু ওকে বিয়ে করার কথা ভাবিনি কখনও। হয়তো কমপ্লেকশনটাই কারণ।

এরপর আর কিছু শোনার অবস্থায় ছিল না; পরাজিত সৈনিকের মতো ফিরে এসেছিল নিজের ঘরে। ফেরার সময় সিঁড়ির মুখে হারানদার হাতে শরবতে তেষ্টাটা আর বাড়েনি। শুকনো হেসে পাশ কাটিয়ে চলে এসেছিল। বাড়ি ফিরে আরও গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। নিজের রঙ রূপ নিয়ে যে ভাবেইনি কখনও, আজ হঠাৎই বড্ড কষ্ট হচ্ছিল সেই মেয়েটার। নিজেকে সামলাতে অনেক সময় লেগেছিল। ভেতরে ভেতরে পুড়ে এক অন্য মানবী হয়ে উঠেছিল ও। চয়ন আর আসেনি, হারানদার কাছে কথাকলির যাওয়া আর ফিরে আসার কথা জেনেই হয়তো বুঝেছিল সবটা।

- আণ্টি…

আলতো ছোঁয়া আর ডাকে চমকে তাকিয়ে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বললেন, কিছু বলবে?

- টি টি সাহেব এসেছেন।

ওর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে বাঁ দিকে তাকাতেই কথাকলি টিকিট চেকারকে দেখে টিকিটটা ওনার হাতে দিয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে বসলেন। হঠাৎ করে ভাবনার জাল ছিঁড়ে যাওয়ায় অতীত বর্তমান এক হয়ে যাচ্ছিল।

টিকিট চেকার ভদ্রলোক হঠাৎই মুখ তুলে বললেন , দারুণ ব্যাপার…দু'জনেই কথাকলি! হ্যাভ অ্যা গ্রেট জার্নি টু বোথ অব ইউ।

উনি চলে যেতেই মেয়েটি বলল, আপনার নামও কথাকলি?

- হ্যাঁ, আমার সময় এই নাম চলত, কিন্তু এই জেনারেশনে তোমার এরকম নাম হবার কারণ!

- একটা গল্প

- ওওও!

কথাকলি চুপ করে গেলেও জানা অজানায় মেশা একটা কৌতুহল মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। জোর করে তা দমিয়ে বসে রইলেন কোনও এক মুহূর্তে আর এক কথাকলির গল্প শোনার আশায়।

- এরকম আদ্যিকালের নাম একেবারেই পছন্দ ছিল না আমার, কিন্তু যখন ঠাম্মির কাছে গল্প শুনলাম, সেদিন থেকে এই নামই আমার প্রিয়।

নামটা আমার বাবার দেওয়া। বাবার প্রিয় বান্ধবী কথাকলির নামে। শুনেছি,বাবা নিজের উন্নাসিকতায় তাঁকে হারিয়েছেন। এখনও অনুশোচনা করেন। তাঁকে মনে রাখতেই এই নাম। জানেন আণ্টি, যে কারণে বাবার উন্নাসিকতা, সেখানেই বাবার হার হয়েছে।

- বুঝলাম না।

- ঠাম্মি বলে, উনি নাকি শ্যামাঙ্গী ছিলেন। শুধুমাত্র শ্যামলা বলেই বাবা বন্ধুত্বের বেশী এগোতে রাজী হননি।

- এটা তো হতেই পারে, কিন্তু হার জিতের ব্যাপার কোথায়?

- আমার মা সুন্দরী, ভদ্র; যেমন সবার ইচ্ছে ছিল। এতদূর পর্যন্ত ঠিকঠাক চলছিল। বাবা হেরে গেলেন আমার জন্মের পর; আদ্যন্ত ফর্সা পরিবারে শ্যামলা মেয়ে পেয়ে। মা একটু কষ্ট পেলেও বাবা আমাকে বুকে জড়িয়ে মুহূর্ত না ভেবে ডেকে উঠেছিলেন কথাকলি বলে।

-:হুমমম বুঝলাম। তোমার বাবা তোমাকে ভীষণ ভালোবাসেন, তাই না!

- হ্যাঁ,আমি ছাড়া বাবা চলতেই পারেন না। অফিসের কাজে যাচ্ছি,তাও ছাড়ছেন না একা। নেহাতই কিছু জরুরি কাজ আছে তাই! আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি।

- হ্যাঁ বলো।

- আপনিই কি বাবার সেই হারিয়ে যাওয়া বান্ধবী!

এমন একটা প্রশ্নে অপ্রস্তুত হলেও সেই ভাবটা আড়াল করেই বললেন, না গো,আমি সে নই।

- বড্ড চাইছিলাম আণ্টি, আপনাকেই সেই হারিয়ে যাওয়া কথাকলি ভাবতে।

ওর কথায় মুচকি হেসে বাইরে তাকালেন কথাকলি।

সেদিকে তাকিয়ে আর এক কথাকলি ভাবল, তুমি যতই গোপন করো, আমি সিওর তুমিই সে। বাবা ঠিকই বলেন, যে হারাতে চায় তাকে হারিয়েই থাকতে দিতে হয়। তুমিও হারিয়েই থাকো আণ্টি। কথাকলি ঠোঁটের কোলে অল্প হেসে কানে ইয়ার বাডস নিয়ে চোখ বন্ধ করতেই প্রবীণা কথাকলি ওকে চোখ ভরে ভালো করে দেখে ছবিটা মনে গেঁথে চোখ বন্ধ করলেন শীতল হেমন্তের বসন্ত বাতাস বুকে নিয়ে।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page