top of page

শাড়িতে সাবেকি থেকে ফিউশন | বিনা নোটিসে বাড়িতে অতিথি? কীভাবে সামলাবেন! | সবজিতে বাজিমাত! | রবিবারের গল্প: সংকোচ

Updated: Aug 17


লাল শাড়িতে সাবেক সাজ থেকে আধুনিক ফিউশন লুক!


নিজস্ব প্রতিনিধি


লাল শাড়ি বাঙালি নারীর সাজের এমন এক চিরন্তন অধ্যায়, যার আবেদন সময়ের সঙ্গে কখনও ম্লান হয় না। বিয়েবাড়ি হোক, পুজোর অষ্টমী, সিঁদুরখেলা হোক কিংবা কোনও বিশেষ সন্ধ্যার অনুষ্ঠান—লাল শাড়ি পরলেই সাজে যেন আপনিই একটি আলাদা ভাষা তৈরি হয়ে যায়। এই রংয়ের মধ্যে আছে একসঙ্গে আবেগ, ঐতিহ্য, উষ্ণতা, আত্মবিশ্বাস এবং উৎসবের উচ্ছ্বাস। একসময় লাল শাড়ি মানেই ছিল সাবেক বাঙালি সাজ—লাল পাড় সাদা শাড়ি, সিঁথিতে সিঁদুর, কপালে বড় লাল টিপ, গলায় সোনার হার, হাতে শাঁখা-পলা এবং খোঁপায় জুঁই বা রজনীগন্ধা। সেই সাজ আজও তার নিজস্ব মহিমায় অমলিন। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে সাজের ভাষা। আজকের প্রজন্মের নারী লাল শাড়িকে শুধু ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দেখছেন না; বরং সেই চিরচেনা শাড়িকেই নতুনভাবে স্টাইল করে তৈরি করছেন সাবেক ও আধুনিকের এক অনন্য মেলবন্ধন।



লাল শাড়ির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হল, এটি একই সঙ্গে খুব ঐতিহ্যবাহী এবং ভীষণ সমকালীন হয়ে উঠতে পারে। একই শাড়ি একজন নারী একদিন পরতে পারেন বড় লাল টিপ, সোনার গয়না ও খোঁপা দিয়ে একেবারে সাবেক বাঙালি সাজে, আবার অন্যদিন সেই শাড়ির সঙ্গে পরতে পারেন স্লিক বান, স্টেটমেন্ট কানের দুল, মিনিমাল মেকআপ এবং আধুনিক ব্লাউজ। অর্থাৎ বদলটা আসলে শাড়িতে নয়, বদলটা আসে তার স্টাইলিংয়ে। আর এখানেই লাল শাড়ির বহুমুখী ক্ষমতা। শাড়ির রং এবং বুনন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার সঙ্গে কোন ব্লাউজ, কী ধরনের গয়না, কেমন চুল, কী মেকআপ এবং কীভাবে শাড়ি পরা হচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।



সাবেক বাঙালি সাজের কথা উঠলেই প্রথমে মনে আসে লাল পাড় সাদা শাড়ি। যদিও আজকের ফ্যাশনে লাল শাড়ির নানা শেড জনপ্রিয়, তবু উজ্জ্বল সিঁদুরে লাল, গাঢ় মেরুন, রুবি রেড, ওয়াইন কিংবা বারগান্ডির মতো রংও যথেষ্ট নজর কাড়ে। ঐতিহ্যবাহী লাল শাড়ির সঙ্গে সোনালি জরির কাজ, চওড়া পাড় কিংবা কাঁথা বা বুটির কাজ থাকলে সাজ আরও রাজকীয় হয়ে ওঠে। সাবেক লুকের ক্ষেত্রে শাড়ির আঁচলটিও গুরুত্বপূর্ণ। পরিপাটি করে কাঁধে রাখা আঁচল, সামনের দিকে স্পষ্ট ভাঁজ এবং কোমরে সুন্দর করে গোঁজা শাড়ি বাঙালি সাজের পরিচিত সৌন্দর্যকে আরও ফুটিয়ে তোলে। এর সঙ্গে যদি থাকে সোনার চুড়ি, ঝুমকো, হার এবং নাকে ছোট নথ, তাহলে সাজ হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ।



সাবেক সাজের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ব্লাউজ। লাল শাড়ির সঙ্গে কালো বা সাদা ব্লাউজের সংমিশ্রণ যেমন চিরকালীন, তেমনই লাল শাড়ির সঙ্গে লাল বা সোনালি ব্লাউজও তৈরি করে রাজকীয় আবহ। গোল গলা, হাফ স্লিভ কিংবা সামান্য পাফ স্লিভের ব্লাউজ সাবেক বাঙালি সাজের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে যায়। আরও একটু পুরনো দিনের আবহ চাইলে উচ্চ গলার ব্লাউজও বেছে নেওয়া যায়। বিশেষ করে টিস্যু, বেনারসি বা সিল্কের লাল শাড়ির সঙ্গে গলার কাছ পর্যন্ত বন্ধ ব্লাউজ সাজে এনে দিতে পারে জমকালো অথচ মার্জিত অনুভূতি।


চুলের সাজেও সাবেকিয়ানা ধরে রাখা যায় খুব সহজেই। মাঝখানে সিঁথি করে চুল আঁচড়ে নিচু করে খোঁপা বাঁধা, আর সেই খোঁপায় গুঁজে দেওয়া জুঁই বা রজনীগন্ধা—এই সাজের কোনও বিকল্প নেই। চাইলে খোঁপার চারপাশে ফুলের মালা জড়িয়ে নিতে পারেন। বড় লাল টিপ, চোখে মোটা করে কাজল, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক এবং গালে হালকা ব্লাশ—এই মেকআপ লুক লাল শাড়ির সঙ্গে অসাধারণ মানায়। তবে সাবেক সাজ মানেই যে অত্যধিক মেকআপ করতে হবে, এমন নয়। বরং ত্বকের স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে বজায় রেখে চোখ ও ঠোঁটের উপর সামান্য জোর দিলে সাজ আরও পরিণত দেখায়।



গয়নার ক্ষেত্রেও সাবেক বাঙালি সাজের নিজস্ব ব্যাকরণ রয়েছে। লাল শাড়ির সঙ্গে সোনার গয়না যেন স্বাভাবিকভাবেই একে অপরের পরিপূরক। সীতাহার, চন্দ্রহার, ঝুমকো, চুড়ি, বালা কিংবা কানের দুল—সবই লাল শাড়ির সঙ্গে মানিয়ে যায়। তবে একসঙ্গে সব গয়না পরার পরিবর্তে সাজের ধরন বুঝে গয়না বেছে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। শাড়ি যদি খুব ভারী হয়, তাহলে গয়না কিছুটা সংযত রাখা যায়। আবার একেবারে সাধারণ লাল শাড়িকে বড় হার বা স্টেটমেন্ট কানের দুল দিয়ে সহজেই উৎসবের সাজে পরিণত করা যায়।


তবে ফ্যাশনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তনটি এসেছে যখন সাবেক লাল শাড়ির সঙ্গে আধুনিক উপাদানের সংযোজন শুরু হয়েছে। আজকের ফিউশন লুকের মূল কথা হল—ঐতিহ্যকে বাদ দেওয়া নয়, বরং তাকে নতুনভাবে উপস্থাপন করা। তাই লাল শাড়ির সঙ্গে ক্রপড ব্লাউজ, অফ-শোল্ডার ব্লাউজ, স্লিভলেস ব্লাউজ, হল্টার নেক, কাঁচুলি-অনুপ্রাণিত ব্লাউজ কিংবা জ্যাকেট স্টাইলের ব্লাউজ যথেষ্ট জনপ্রিয়। একটি ঐতিহ্যবাহী লাল শাড়ির সঙ্গে সম্পূর্ণ সমকালীন কাটের ব্লাউজ পরলে মুহূর্তেই সাজের চরিত্র বদলে যায়।



আধুনিক ফিউশন লুকের ক্ষেত্রে ব্লাউজকে বলা যায় সাজের ‘স্টেটমেন্ট পিস’। লাল শাড়ির সঙ্গে কনট্রাস্ট ব্লাউজ ব্যবহার করলে পোশাকে নতুন মাত্রা আসে। কালো ব্লাউজ লাল শাড়িকে দেয় সাহসী ও নাটকীয় চেহারা। সাদা বা অফ-হোয়াইট ব্লাউজ এনে দেয় পরিশীলিত সৌন্দর্য। গোল্ডেন ব্লাউজ সাজকে করে তোলে উৎসবমুখর। আবার সিকুইন, মেটালিক বা টেক্সচার্ড ব্লাউজ ব্যবহার করলে ঐতিহ্যবাহী শাড়িও হয়ে ওঠে পার্টি-রেডি। যারা আরও সাহসী ফিউশন লুক পছন্দ করেন, তারা লাল শাড়ির সঙ্গে বেল্টও ব্যবহার করতে পারেন। কোমরে একটি মিনিমাল মেটাল বা কালো বেল্ট শাড়ির ড্রেপকে ধরে রাখার পাশাপাশি পুরো লুকটিকে সমকালীন করে তোলে।


শাড়ি পরার ধরনেও আসতে পারে পরিবর্তন। প্রচলিত ড্রেপের বদলে একটু কম পলি, খোলা আঁচল বা কাঁধে আলগা করে রাখা আঁচল আধুনিকতার ছোঁয়া দেয়। কেউ চাইলে আঁচলটি এক কাঁধ থেকে অন্য দিকে এনে এক ধরনের গাউন-সদৃশ ড্রেপ তৈরি করতে পারেন। আবার প্রি-ড্রেপড শাড়ি ব্যবহার করেও তৈরি করা যায় সহজ অথচ স্টাইলিশ লুক। বিশেষ অনুষ্ঠানে লাল শাড়ির সঙ্গে কেপ বা লম্বা জ্যাকেট পরলে সাজে নাটকীয়তা বাড়ে। শাড়ির উপরে এমব্রয়ডারি করা জ্যাকেট বিশেষ করে শীতের সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে দারুণ মানায়।



চুলের ক্ষেত্রেও আধুনিক ফিউশন লুকের জন্য বিকল্পের অভাব নেই। সাবেক খোঁপার বদলে করা যেতে পারে স্লিক লো বান, মেসি বান কিংবা পনিটেল। লম্বা খোলা চুলের সঙ্গে লাল শাড়ির লুকও বেশ আকর্ষণীয়। বিশেষ করে হালকা ওয়েভি চুল শাড়ির ঐতিহ্যবাহী ভাবকে কিছুটা নরম ও আধুনিক করে তোলে। চাইলে সামনের চুলে হালকা ভলিউম রেখে পিছনে খোলা চুলও রাখা যায়। আর একেবারে মিনিমাল সাজ চাইলে মাঝখানে সিঁথি করে সোজা চুল রেখে কানের দুলটিকেই সাজের মূল আকর্ষণ করা যেতে পারে।


আধুনিক ফিউশন লুকে গয়নার ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। সাবেক সোনার হার ও চুড়ির বদলে এখন অনেকেই বেছে নিচ্ছেন অক্সিডাইজড সিলভার, জিওমেট্রিক কানের দুল, স্টেটমেন্ট নেকপিস কিংবা মিনিমাল গোল্ড জুয়েলারি। লাল শাড়ির সঙ্গে বড় সিলভার ঝুমকা একটি অসাধারণ কনট্রাস্ট তৈরি করতে পারে। আবার কেবল একটি বড় কানের দুল এবং হাতে একটি স্টেটমেন্ট কাফ পরেও সাজ সম্পূর্ণ করা যায়। যাঁরা ‘লেস ইজ মোর’ নীতিতে বিশ্বাসী, তাঁদের জন্য একটি জোড়া ঝলমলে কানের দুল, একটি ঘড়ি এবং একটি আংটিই যথেষ্ট।



মেকআপেও সাবেক ও আধুনিকের পার্থক্য স্পষ্ট। সাবেক লুকে চোখে গাঢ় কাজল, আইলাইনার, বড় টিপ ও লাল ঠোঁট বেশি গুরুত্ব পায়। আধুনিক লুকে বরং বেছে নেওয়া যায় ডিউই বেস, ন্যাচারাল ব্রাউজ, সফট ব্রাউন আইশ্যাডো, সূক্ষ্ম আইলাইনার এবং লাল বা নিউড লিপ। তবে লাল শাড়ির সঙ্গে লাল লিপস্টিকের আকর্ষণ কখনও পুরনো হয় না। বিশেষ করে শাড়ির রঙের সঙ্গে ঠোঁটের রঙের সঠিক টোন মিলিয়ে নিতে পারলে পুরো মুখে একটি ভারসাম্য আসে। গাঢ় লাল শাড়ির সঙ্গে ওয়াইন বা বেরি টোন, উজ্জ্বল লালের সঙ্গে ক্লাসিক রেড এবং মেরুন শাড়ির সঙ্গে ডিপ রেড বা ব্রাউনিশ রেড লিপস্টিক দারুণ মানাতে পারে।


লাল শাড়ির ফিউশন লুকের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জুতো ও ব্যাগ। সাবেক সাজে সোনালি বা লাল স্যান্ডেল, পাটের ব্যাগ কিংবা ছোট কাপড়ের পোটলি ভালো মানায়। কিন্তু আধুনিক সাজে যোগ করা যায় মেটালিক ক্লাচ, স্ট্রাকচার্ড ব্যাগ কিংবা মিনিমাল স্লিং ব্যাগ। পায়ের সাজেও স্টিলেটো, ব্লক হিল কিংবা অলঙ্কৃত মিউল ব্যবহার করা যায়। তবে শাড়ির সৌন্দর্যকে ছাপিয়ে যায় এমন কোনও অ্যাকসেসরি না বেছে সাজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখাই ভালো।



শুধু উৎসবের অনুষ্ঠান নয়, লাল শাড়িকে এখন বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের জন্যও নতুনভাবে সাজানো যায়। দিনের বেলায় একটি হালকা লাল তাঁত বা কটন শাড়ির সঙ্গে ছোট কানের দুল, টানটান খোঁপা এবং সাদামাটা মেকআপ হতে পারে মার্জিত অফিস-ফেস্টিভ লুক। বিকেলের নিমন্ত্রণে সিল্ক বা হ্যান্ডলুম লাল শাড়ির সঙ্গে কনট্রাস্ট ব্লাউজ এবং স্টেটমেন্ট কানের দুল বেশ মানানসই। সন্ধ্যার পার্টিতে বেনারসি বা সিকুইন-ওয়ার্ক করা লাল শাড়ির সঙ্গে স্লিক বান, গ্লোইং মেকআপ এবং মেটালিক ক্লাচ তৈরি করতে পারে একেবারে আধুনিক গ্ল্যাম লুক।


বিয়ের অনুষ্ঠানে লাল শাড়ির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। বাঙালি কনের ঐতিহ্যবাহী লাল বেনারসি, সোনার গয়না, মুকুট, চন্দনের সাজ এবং লাল টিপ—এই ছবি আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু আজকের কনেরা সেই ঐতিহ্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত স্টাইলকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন। কেউ বেছে নিচ্ছেন ডিপ রেড শাড়ির সঙ্গে মিনিমাল গয়না, কেউ আবার ভারী বেনারসির সঙ্গে সমকালীন ব্লাউজ। কেউ শাঁখা-পলার সঙ্গে স্টেটমেন্ট রিং পরছেন, আবার কেউ সাবেক সোনার গয়নার সঙ্গে আধুনিক কানের কাফ জুড়ে দিচ্ছেন। এই মিশ্রণই আসলে ফিউশন ফ্যাশনের সবচেয়ে সুন্দর দিক।



লাল শাড়ির ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—রঙের ভারসাম্য। শাড়ি যদি খুব উজ্জ্বল হয় এবং তাতে ভারী কাজ থাকে, তাহলে ব্লাউজ ও গয়না একটু সংযত রাখা ভালো। আবার শাড়ি যদি একেবারে সাদামাটা হয়, তাহলে ব্লাউজ বা গয়নায় স্টেটমেন্ট তৈরি করা যায়। একইভাবে মেকআপও শাড়ির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। চোখ এবং ঠোঁট—দুই জায়গাতেই একসঙ্গে অতিরিক্ত জোর দিলে সাজ ভারী হয়ে যেতে পারে। তাই একটি জায়গাকে প্রধান করে অন্য জায়গায় নরম রাখলে সৌন্দর্য আরও ফুটে ওঠে।


শেষ পর্যন্ত লাল শাড়ির সৌন্দর্য কোনও নির্দিষ্ট ফ্যাশন ট্রেন্ডে আটকে নেই। সাবেক বাঙালি সাজের লাল টিপ, সোনার গয়না, ফুলের খোঁপা যেমন এই শাড়িকে যুগ যুগ ধরে ভালোবাসার পোশাক করে রেখেছে, তেমনই আধুনিক ব্লাউজ, বেল্ট, স্লিক হেয়ারস্টাইল, স্টেটমেন্ট জুয়েলারি এবং মিনিমাল মেকআপ তাকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। আসলে লাল শাড়ি এমন একটি ক্যানভাস, যেখানে নিজের ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী সাজের গল্প আঁকা যায়। কখনও সেই গল্পে ফিরে আসে ঠাকুমা-দিদিমার সময়ের সাবেকিয়ানা, কখনও সেখানে থাকে শহুরে আধুনিকতার ছোঁয়া, আবার কখনও দুয়ের মিলনে তৈরি হয় সম্পূর্ণ নিজের একটি স্টাইল। ফ্যাশন বদলায়, ট্রেন্ড বদলায়, পোশাকের কাট বদলায়। কিন্তু কিছু কিছু জিনিস সময়ের সঙ্গে আরও সুন্দর হয়ে ওঠে। লাল শাড়ি তেমনই এক চিরকালীন সৌন্দর্য। আজকের নারী ঐতিহ্যকে আঁকড়ে ধরে থাকেন, কিন্তু তার নিজের মতো করে। তাই লাল শাড়ির সঙ্গে সাবেক সাজ হোক কিংবা আধুনিক ফিউশন—মূল কথা একটাই, পোশাক যেন শুধু শরীরকে না সাজিয়ে ব্যক্তিত্বকেও প্রকাশ করে। কারণ লাল শাড়িতে সত্যিকারের সৌন্দর্য তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন তার লাল রঙের সঙ্গে মিশে যায় আত্মবিশ্বাসের নিজস্ব দীপ্তি।


বিনা নোটিসে বাড়িতে অতিথি? কীভাবে সামলাবেন সবটা?


নিজস্ব প্রতিনিধি


বাঙালি বাড়িতে অতিথি আসা মানেই যেন একটা ছোটখাটো উৎসব। কিন্তু সেই অতিথি যদি আসেন একেবারে বিনা নোটিসে, তখন উৎসবের আনন্দের সঙ্গে খানিকটা অস্থিরতাও এসে জুড়ে বসে। ফোনে হঠাৎ খবর এল—“এই তো, কাছাকাছি এসেছি, ভাবলাম তোমাদের বাড়িতে একটু ঘুরে যাই।” কিংবা কোনো ফোনই এল না, হঠাৎ দরজার ঘণ্টা বাজতেই দেখা গেল বহুদিনের পরিচিত কেউ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। ঘড়ির কাঁটা হয়তো দুপুরের খাবারের সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, রান্নাঘরে দু’-একজনের মতো খাবার রয়েছে, ফ্রিজও বিশেষ ভরতি নয়, আর বাড়িটাও ঠিক অতিথি আপ্যায়নের মতো করে গোছানো নেই। মাথার মধ্যে তখন একসঙ্গে ঘুরতে থাকে হাজারটা প্রশ্ন—কী খাওয়াব? ঘরটা কীভাবে গুছোব? চা দেব, না জলখাবার? অতিথি যদি খেয়ে যেতে চান, তাহলে কী হবে?



আসলে এই পরিস্থিতিতে প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ হল নিজেকে শান্ত রাখা। অতিথি যখন হঠাৎ এসেছেন, তখন তিনি সম্ভবত আপনার বাড়ির মেনু দেখতে আসেননি, এসেছেন আপনাকে দেখতে। তাই মুখে বিরক্তি বা অস্বস্তি ফুটিয়ে না তুলে হাসিমুখে তাঁকে স্বাগত জানানোটাই প্রথম সৌজন্য। “আগে জানালে ভালো হত”, “বাড়িতে কিছুই নেই”, “আজ একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না”—এই কথাগুলি বারবার বলতে থাকলে অতিথিও অস্বস্তিতে পড়বেন। তার বদলে সহজভাবে বসতে বলুন, এক গ্লাস জল দিন এবং স্বাভাবিক কথাবার্তা শুরু করুন। আপনি যত স্বাভাবিক থাকবেন, পরিস্থিতিও তত সহজ হয়ে যাবে।


বাড়িতে অতিথি ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পুরো বাড়ি পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই। অনেকেই হঠাৎ অতিথি আসার খবর পেয়ে একদিকে রান্নাঘরে ছুটছেন, অন্যদিকে বিছানা গুছোচ্ছেন, সোফার কুশন ঠিক করছেন, টেবিলের ওপরের জিনিসপত্র সরাচ্ছেন। এতে নিজেরই অস্থিরতা বাড়ে। বরং অতিথি যে ঘরে বসবেন, সেই জায়গাটুকু দ্রুত গুছিয়ে নিন। সোফায় বা চেয়ারে পড়ে থাকা জামাকাপড় সরিয়ে রাখুন, টেবিলটি পরিষ্কার করে দিন, জানলা একটু খুলে আলো-বাতাস ঢুকতে দিন। ঘরে যদি কোনো হালকা সুগন্ধি বা ফুল থাকে, সেটিও পরিবেশটাকে সতেজ করে তুলতে পারে। বাড়িকে একেবারে নিখুঁত করে তোলার চেষ্টার চেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং স্বস্তিদায়ক পরিবেশ তৈরি করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।



অতিথি বাইরে থেকে এলে প্রথম আপ্যায়ন হিসেবে এক গ্লাস জল দেওয়া আমাদের চিরন্তন অভ্যাস। এর পরে সময় এবং আবহাওয়া অনুযায়ী চা, কফি, লেবুর জল বা কোনো ঠান্ডা পানীয় দেওয়া যেতে পারে। গরমের দিনে বরফ দিয়ে লেবুর শরবত, আবার বর্ষার দিনে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা—দুটিই অতিথিকে স্বস্তি দিতে পারে। বাড়িতে বিশেষ কিছু না থাকলেও সুন্দর কাপ বা গ্লাসে পরিপাটি করে পরিবেশন করলে সাধারণ পানীয়ও বেশ আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অতিথি আপ্যায়নে খাবারের পাশাপাশি পরিবেশনের এই ছোট ছোট বিষয়গুলিরও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে।


এরপর একটু সময় নিয়ে রান্নাঘরের দিকে নজর দিন। হঠাৎ অতিথি এলে প্রথমেই মনে হয়, “বাড়িতে তো কিছুই নেই।” অথচ একটু খুঁজে দেখলে দেখা যায়, আলু, ডিম, পেঁয়াজ, ব্রেড, মুড়ি, চিঁড়ে, সুজি, ডাল, কিছু সবজি, নুডলস বা পাস্তার মতো বেশ কিছু উপকরণই বাড়িতে রয়েছে। ফ্রিজটাও একবার ভালো করে দেখে নিন। অনেক সময় আগের দিনের রান্না, কিছু সেদ্ধ সবজি বা অব্যবহৃত উপকরণ পড়ে থাকে। সেগুলিকে একটু নতুনভাবে ব্যবহার করে সহজেই অতিথির জন্য খাবার তৈরি করা যায়। তবে আগের দিনের খাবার ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অবশ্যই খাবারটি নিরাপদ অবস্থায় আছে কি না, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।


হঠাৎ অতিথি এলে চা-বিস্কুটকে কখনও ছোট করে দেখবেন না। এক কাপ ভালো চায়ের সঙ্গে বিস্কুট, চানাচুর, মুড়ি বা বাড়িতে থাকা কোনো নোনতা খাবারই যথেষ্ট হতে পারে। মুড়ি থাকলে তার সঙ্গে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, ধনেপাতা, সামান্য সর্ষের তেল এবং চানাচুর মিশিয়ে ঝটপট ঝালমুড়ি তৈরি করা যায়। চিঁড়ে থাকলে অল্প সময়ে চিঁড়ের পোলাও বা চিঁড়েভাজা বানানো সম্ভব। ডিম থাকলে ডিমভাজা, ডিমের ঝুরি কিংবা পোচও হতে পারে সহজ সমাধান। ব্রেড থাকলে ডিমের স্যান্ডউইচ বা সবজি স্যান্ডউইচ তৈরি করা যায়। অর্থাৎ রান্নাঘরে উপকরণ কম থাকলেই যে অতিথিকে আপ্যায়ন করা যাবে না, তা নয়। একটু বুদ্ধি খাটালেই সাধারণ উপকরণ দিয়েও সুন্দর জলখাবার তৈরি করা যায়।


অতিথি যদি দুপুর বা রাতের খাবার খেয়ে যেতে চান, তখনও মেনু নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। বরং বেশি পদ রান্না করার চেষ্টা না করে দু’-তিনটি ভালো পদ তৈরি করাই বুদ্ধিমানের কাজ। ভাতের সঙ্গে ডাল, আলুভাজা এবং ডিমের ঝোল—এমন সাধারণ মেনুও অত্যন্ত তৃপ্তিদায়ক হতে পারে। বাড়িতে সবজি থাকলে একটি সহজ তরকারি করা যায়। পনির থাকলে পনিরের ঝোল, ডিম থাকলে ডিমের কারি, আর মাছ বা চিকেন থাকলে সেটিকে কেন্দ্র করে একটি পদ তৈরি করলেই খাবারের আয়োজন সম্পূর্ণ হয়ে যেতে পারে। অতিথি বেশি হলে মেনু আরও সহজ রাখুন। রান্নাঘরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ার চেয়ে অল্প সময়ে সহজ, সুস্বাদু খাবার তৈরি করে অতিথির সঙ্গে বসে খাওয়াই অনেক বেশি আনন্দের।


এই ধরনের পরিস্থিতিতে প্রেসার কুকার এবং কড়াই হয়ে উঠতে পারে বাড়ির সেরা সহায়ক। ডাল, আলু বা বিভিন্ন সবজি দ্রুত সেদ্ধ করে নিয়ে অল্প মশলায় কষিয়ে নেওয়া যায়। আবার এক হাঁড়িতে খিচুড়ি, সঙ্গে ডিমভাজা বা আলুভাজা—এমন মেনু তো আকস্মিক অতিথি আপ্যায়নের জন্য আদর্শ। বিশেষ করে বর্ষার দিনে গরম খিচুড়ির সঙ্গে ভাজা বা ডিমের পদ অনেকেরই পছন্দ। একদিকে রান্নার সময় কম, অন্যদিকে খাবারেও থাকে বাড়ির স্বাদ।



ফ্রিজে থাকা আগের দিনের খাবারকেও নতুন রূপ দেওয়া যায়, যদি তা নিরাপদে সংরক্ষিত থাকে। আগের দিনের ভাত দিয়ে ফ্রায়েড রাইস বা মশলা ভাত তৈরি করা যায়। রুটি থাকলে তৈরি হতে পারে রুটি রোল বা সবজি র‍্যাপ। সেদ্ধ আলু দিয়ে আলুর পরোটা, চপ বা ঝটপট আলুর দম হতে পারে। তবে খাবারকে নতুন রূপ দেওয়ার আগে সেটি কতক্ষণ সংরক্ষিত হয়েছে এবং খাবারের গন্ধ, স্বাদ বা অবস্থায় কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। অতিথি আপ্যায়নের ক্ষেত্রে খাবারের নিরাপত্তার সঙ্গে কোনো আপস করা উচিত নয়।


অতিথির সংখ্যা যদি বেশি হয় এবং বাড়িতে খাবার পর্যাপ্ত না থাকে, তাহলে কাছের বাজার থেকে কয়েকটি প্রয়োজনীয় জিনিস আনিয়ে নেওয়া যায়। তবে এই সময় বড়সড় বাজারের তালিকা তৈরি করার দরকার নেই। ডিম, সবজি, পনির, মাছ বা চিকেন, দই কিংবা কোনো সহজ মিষ্টি—এই ধরনের কয়েকটি জিনিস দিয়েই মেনু সম্পূর্ণ করা সম্ভব। আর একেবারেই সময় না থাকলে পরিচিত ও ভালো কোনো খাবারের দোকান বা রেস্তোরাঁ থেকে খাবার আনিয়ে নেওয়াও এখন খুব স্বাভাবিক বিষয়। অতিথি আপ্যায়নের অর্থ যে সমস্ত খাবার বাড়িতে রান্না করতেই হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। বরং রান্নার চাপ কমিয়ে অতিথির সঙ্গে সময় কাটাতে পারাটাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


অতিথি আসার পর তাঁদের পছন্দ-অপছন্দটাও একটু জেনে নেওয়া ভালো। কেউ ঝাল খান না, কেউ নিরামিষ খাবার পছন্দ করেন, কেউ আবার নির্দিষ্ট কিছু খাবার খান না। তাই রান্না শুরু করার আগে হেসে জিজ্ঞেস করতে পারেন, “কী খাবেন?” বিশেষ করে বাড়িতে যদি শিশু বা বয়স্ক অতিথি থাকেন, তাঁদের খাবারের বিষয়টি একটু বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। ছোটদের জন্য ব্রেড, ডিম, ফল, দুধ, কলা বা হালকা নুডলসের মতো সহজ খাবার রাখা যেতে পারে। তবে শিশুকে জোর করে নতুন কোনো খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা না করাই ভালো।


বাঙালি অতিথি আপ্যায়নে শেষে মিষ্টিমুখের একটা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু বাড়িতে মিষ্টি নেই বলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। ফল কেটে সুন্দরভাবে পরিবেশন করা যায়। দই থাকলে চিনি বা গুড় দিয়ে পরিবেশন করা যায়। সুজি থাকলে অল্প সময়ে সুজির হালুয়া তৈরি হতে পারে। কলা, বিস্কুট ও দুধ থাকলেও সহজ কোনো ডেজার্ট তৈরি করা সম্ভব। আবার কিছুই না থাকলে এক কাপ চা দিয়েই শেষ হতে পারে আপ্যায়ন। কারণ অতিথির কাছে শেষ পর্যন্ত খাবারের পরিমাণের চেয়ে আপনার আন্তরিকতাটাই বেশি মনে থাকবে।


হঠাৎ অতিথি সামলানোর একটা বড় কৌশল হল রান্নাঘরে নিজেকে বন্দি না করে তাঁদের সঙ্গে সময় কাটানো। অনেক সময় আমরা অতিথিকে খুশি করার জন্য একের পর এক পদ রান্না করতে থাকি, আর অতিথি একা বসে থাকেন। এতে আপ্যায়নের আনন্দটাই কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অতিথি যদি বহুদিন পর এসে থাকেন, তাহলে তাঁদের সঙ্গে গল্প করুন, পুরনো দিনের কথা বলুন, ছবি দেখুন, হাসিঠাট্টা করুন। খুব সাধারণ খাবারও তখন অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ অতিথি আপনার বাড়ি থেকে শুধু পেট ভরে ফিরবেন না, সঙ্গে নিয়ে যাবেন কিছু সুন্দর সময়ের স্মৃতি।


তবে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি সহজে সামলাতে রান্নাঘরে কিছু ‘ইমার্জেন্সি স্টক’ রাখা যেতে পারে। মুড়ি, চিঁড়ে, সুজি, নুডলস, পাস্তা, ডাল, ডিম, ব্রেড, বিস্কুট, চানাচুর, আলু, পেঁয়াজ, চা, কফি এবং কয়েকটি প্রয়োজনীয় মশলা থাকলে হঠাৎ অতিথি এলে অনেকটাই সুবিধা হয়। ফ্রিজে কিছু ডিম, কয়েকটি সাধারণ সবজি ও দই থাকলেও দ্রুত জলখাবার বা খাবার তৈরি করা যায়। এগুলি শুধু অতিথির সময় নয়, নিজের ব্যস্ত দিনেও যথেষ্ট কাজে আসে।


আর একটা বিষয় মনে রাখা দরকার—অতিথি এসেছে মানেই নিজেকে ‘পারফেক্ট হোস্ট’ প্রমাণ করতে হবে না। বাড়ি হয়তো পুরোপুরি গোছানো নেই, রান্নাঘরে হয়তো সব উপকরণ নেই, খাবারের মেনুতেও হয়তো বৈচিত্র্য নেই। তাতে কী? বাড়ি তো বাড়িই। সেখানে জীবনের ব্যস্ততা থাকবে, অগোছালো মুহূর্ত থাকবে, কখনও রান্না হবে, কখনও হবে না। অতিথির সামনে নিজের এই স্বাভাবিকতাকে লুকিয়ে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং হাসিমুখে বলা যায়, “হঠাৎ এসেছ, তাই বেশি কিছু করতে পারলাম না।” এই সরল কথাটির মধ্যেই অনেক সময় আন্তরিকতার উষ্ণতা থাকে।


তবে কিছু বিষয় এড়িয়ে চলাই ভালো। অতিথির সামনে বাড়ির অন্য সদস্যদের সঙ্গে বাজার বা রান্না নিয়ে ঝগড়া করা, কে কী করবে তা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি করা কিংবা বারবার খাবারের অপ্রতুলতার কথা বলা একেবারেই উচিত নয়। “এইটুকুই আছে”, “কিছুই বানাতে পারিনি”, “খাবারটা ভালো হয়নি”—এই কথাগুলি বারবার বললে অতিথি নিজের অজান্তেই অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। খাবার সাধারণ হলেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরিবেশন করুন। খাবার নিয়ে নিজেরই যদি অনিশ্চয়তা থাকে, অতিথিরও তা ভালো লাগবে না।


সবচেয়ে বড় কথা, অতিথি আপ্যায়নকে কখনও প্রতিযোগিতা বানাবেন না। পাঁচ রকম ভাজা, চার রকম তরকারি, তিন রকম মিষ্টি না থাকলে আপ্যায়ন সম্পূর্ণ হয় না—এমন ধারণা আমাদের নিজেদেরই তৈরি। বাস্তবে একটি গরম ভাত, ডাল, আলুভাজা, ডিমের ঝোল আর শেষে এক কাপ চা দিয়েও এমন একটি দুপুর তৈরি করা যায়, যার স্মৃতি বহুদিন থেকে যায়। কারণ খাবারের স্বাদ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ খাবারের সঙ্গে মিশে থাকা মানুষের ভালোবাসা।


বিনা নোটিসে অতিথি আসা তাই শুধুই একটি ‘জরুরি পরিস্থিতি’ নয়। বরং ব্যস্ত জীবনে হঠাৎ পাওয়া একটু আড্ডা, একটু গল্প, পুরনো স্মৃতিতে ফিরে যাওয়া এবং একসঙ্গে বসে খাওয়ার একটি অপ্রত্যাশিত সুযোগও হতে পারে। রান্নাঘরে তখন হয়তো আলু আর ডিম ছাড়া কিছু নেই, ঘরও হয়তো পুরোপুরি গোছানো নয়, তবু সেই অপ্রস্তুত দুপুরটাই কখনও কখনও হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে আপন। শেষ পর্যন্ত অতিথি মনে রাখবেন না আপনার টেবিলে কতগুলি পদ ছিল। মনে থাকবে দরজা খুলে আপনি তাঁকে কীভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন, বসিয়ে এক গ্লাস জল দিয়েছিলেন কি না, তাঁর সঙ্গে মন খুলে গল্প করেছিলেন কি না, আর বিদায়ের সময় বলেছিলেন কি না “আবার এসো।” কারণ সুন্দর অতিথি আপ্যায়নের আসল উপকরণ রান্নাঘরে থাকে না। থাকে মানুষের ব্যবহারে, আন্তরিকতায় এবং সেই চিরচেনা বাঙালি উষ্ণতায় “কিছু নেই তো কী হয়েছে, আগে বসো… চা দিই।”

সবজিতে বাজিমাত!


তনিমা ব্যানার্জি


প্রতিদিনের রান্নায় সবজি থাকলেও একঘেয়ে একই পদ খেতে অনেকেরই ভালো লাগে না। অথচ পরিচিত সবজিই একটু অন্যভাবে রান্না করলে তৈরি হতে পারে একেবারে নতুন স্বাদের পদ। কখনও মশলার পরিবর্তন, কখনও রান্নার পদ্ধতিতে সামান্য বদল, আবার কখনও দুই-তিন রকম সবজির অভিনব মেলবন্ধন, এভাবেই সাধারণ সবজিও হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ। তাই আজকের রান্নাঘরে স্বাস্থ্যকর ও পুষ্টিকর সবজিকে নতুন স্বাদ, নতুন রূপ এবং নতুন পরিবেশনের মাধ্যমে সাজিয়ে তোলার পালা। পরিচিত উপকরণে একটু সৃজনশীলতার ছোঁয়াতেই তৈরি হতে পারে এমন কিছু পদ, যা রোজকার ভাতের থালা থেকে অতিথি আপ্যায়ন সবেতেই এনে দেবে নতুনত্বের স্বাদ।


মিষ্টি কুমড়োর ধোঁকা



কী কী লাগবে

মিষ্টি কুমড়ো ২০০ গ্রাম, ছোলার ডাল ৩০০ গ্রাম, কাঁচালঙ্কা ৪টি, Shalimar's সর্ষের তেল ১ কাপ, নুন ১ চামচ, আলু ১টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ ১ চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১ চামচ, চিনি ২ চামচ, গোটা জিরে ১ চামচ, তেজপাতা ২টি, গোটা গরম মশলা অল্প, Shalimar's Chef Spices হিং অল্প।



কীভাবে বানাবেন

ছোলার ডাল ভিজিয়ে কাঁচালঙ্কা দিয়ে শুকনো করে বেটে নিন। কুমড়ো ধুয়ে কুরিয়ে নিন। কড়াইতে তেল গরম করে হিং ফোড়ন দিয়ে ডাল বাটা, কুমড়ো, নুন ও চিনি দিয়ে ভালো করে নাড়তে থাকুন। মিশ্রণটি কড়াই ছেড়ে এলে তেল মাখানো থালায় ঢেলে ঠান্ডা করে টুকরো করে কাটুন। কড়াইতে তেল গরম করে ধোঁকার পিসগুলি ভেজে তুলে রাখুন। ওই তেলেই গোটা জিরে, তেজপাতা ও গোটা গরম মশলার ফোড়ন দিয়ে আলু ভেজে নিন। এরপর হলুদ, ধনে গুঁড়ো, জিরে গুঁড়ো, লঙ্কা গুঁড়ো, নুন ও চিনি দিয়ে কষিয়ে জল দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। আলু সেদ্ধ হয়ে এলে ভাজা ধোঁকার পিস দিয়ে ফুটিয়ে নামিয়ে নিন। তৈরি মিষ্টি কুমড়োর ধোঁকা।


মালাই লতি উইথ স্টাফ বেগুন



কী কী লাগবে

কচুর লতি ১ আঁটি, বেগুন ১টি, কাজুবাদাম ১০টি, কিশমিশ ১৫টি, দুধ আধ কাপ, দুধের মালাই ১ কাপ, সাদা তিল ২ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪টি, নুন ১ চামচ, চিনি ১ চামচ, সাদা সরষে ২ টেবিল চামচ, টকদই ২ টেবিল চামচ, Shalimar's Sunflower তেল পরিমাণমতো।



কীভাবে বানাবেন

কচুর লতি ছোট করে কেটে ধুয়ে নিন। কাজুবাদাম, কিশমিশ, সাদা তিল, কাঁচালঙ্কা ও দুধের মালাই একসঙ্গে বেটে নিন। কড়াইতে তেল গরম করে লতি অল্প ভেজে বাটা মশলা, নুন ও চিনি দিয়ে নেড়ে দুধ দিন। দুধ শুকিয়ে গেলে নামিয়ে রাখুন। বেগুন লম্বা করে কেটে ভিতরের শাঁস বের করে মালাই লতি দিয়ে ভরে নিন। সাদা সরষে ও টকদই বেটে নিন। টিফিন বাটিতে তেল, সরষে-দইয়ের মিশ্রণ, কাঁচালঙ্কা, নুন ও চিনি মিশিয়ে তার মধ্যে লতি-ভরা বেগুন রাখুন। ঢেকে ১০ মিনিট ভাপে রান্না করুন। নামিয়ে উপর থেকে মালাই ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।


পুরভরা ক্যাপসিকাম



কী কী লাগবে

ক্যাপসিকাম ৩টি, সয়াবিন ১ প্যাকেট, হলুদ ১ চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১ চামচ, নুন ১ চামচ, চিনি ১ চামচ, Shalimar's Sunflower তেল আধ কাপ, Shalimar's Chef Spices গরম মশলা আধ চামচ, সাদা তিল অল্প।



কীভাবে বানাবেন

সয়াবিন গরম জলে সিদ্ধ করে ভালো করে বেটে নিন। ক্যাপসিকামের মুখ কেটে বীজ বের করে নুন ও চিনি মাখিয়ে অল্প আঁচে হালকা ভেজে তুলে রাখুন। কড়াইতে তেল গরম করে বেটে রাখা সয়াবিন, হলুদ, জিরে গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো ও লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে ভালো করে নাড়ুন। কিছুটা শুকিয়ে এলে নুন ও চিনি দিয়ে মিশিয়ে গরম মশলা দিয়ে নামিয়ে ঠান্ডা করুন। এবার ভাজা ক্যাপসিকামের মধ্যে সয়াবিনের পুর ভরে উপর থেকে সাদা তিল ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।


আমড়া দিয়ে কচুর লতি



কী কী লাগবে

কচুর লতি ১ আঁটি, ছোট দেশি আমড়া ৬টি, কাঁচালঙ্কা ৪টি, সাদা সরষে ১ চামচ, কালো সরষে ১ চামচ, পোস্ত ৩ চামচ, নারকেল কোরা ৪ চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ১ কাপ, নুন আধ চামচ, চিনি আধ চামচ, কালোজিরে অল্প, Shalimar's Chef Spices হলুদ আধ চামচ।



কীভাবে বানাবেন

কচুর লতি ছাড়িয়ে ছোট করে কেটে ধুয়ে নিন। সাদা ও কালো সরষে, পোস্ত, নারকেল কোরা ও কাঁচালঙ্কা একসঙ্গে বেটে নিন। লতির সঙ্গে বাটা মশলা, নুন, হলুদ, চিনি ও সরষের তেল ভালো করে মেখে রাখুন। আমড়া ছোট টুকরো করে কেটে নিন। কড়াইতে সরষের তেল গরম করে কালোজিরের ফোড়ন দিন। এরপর মাখানো লতি ও আমড়া দিয়ে ঢেকে অল্প আঁচে রান্না করুন। লতি সেদ্ধ হয়ে মশলা মিশে গেলে উপর থেকে আরও সামান্য সরষের তেল ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। তৈরি টক-ঝাল আমড়া দিয়ে কচুর লতি।


বাটি চাট



কী কী লাগবে

পাঁপড় ৩টি, শসাকুচি ২ চামচ, পেঁয়াজকুচি ১ চামচ, ঝুরিভাজা ২ চামচ, ডালিমের দানা ২ চামচ, টমেটোকুচি ১ চামচ, টকদই ২ চামচ, তেঁতুলের চাটনি ২ চামচ।



কীভাবে বানাবেন

প্যান গরম করে পাঁপড়টি অল্প গরম করুন। নরম থাকতেই একটি ছোট বাটির উপর পাঁপড়টি বসিয়ে বাটির আকার দিন। ঠান্ডা হলে সাবধানে পাপড়ের বাটি তুলে নিন। এবার পাপড়ের বাটির মধ্যে শসাকুচি, পেঁয়াজকুচি, টমেটোকুচি, ঝুরিভাজা ও ডালিমের দানা দিন। উপর থেকে টকদই ও তেঁতুলের চাটনি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।


এঁচড়ের পাতুরি



কী কী লাগবে

এঁচড় ২৫০ গ্রাম, সাদা তিল ২ চামচ, সাদা সরষে ১ চামচ, কালো সরষে ১ চামচ, পোস্ত ২ চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৮ চামচ, নুন ১ চামচ, কাঁচালঙ্কা ৮টি, কিশমিশ ২ চামচ, কলাপাতা ৪ টুকরো, চিনি আধ চামচ।


কীভাবে বানাবেন

এঁচড় ছোট করে কেটে অল্প নুন দিয়ে সিদ্ধ করে নিন। সরষে, পোস্ত, সাদা তিল ও কয়েকটি কাঁচালঙ্কা অল্প জল দিয়ে বেটে রাখুন। এঁচড় ঠান্ডা হলে হাত দিয়ে ভালো করে মেখে তার সঙ্গে বাটা মশলা, নুন, চিনি ও সরষের তেল মিশিয়ে নিন। কলাপাতা সেঁকে নরম করে নিয়ে সামান্য সরষের তেল মাখিয়ে তার উপর এঁচড়ের মিশ্রণ দিন। উপরে একটি কাঁচালঙ্কা, কয়েকটি কিশমিশ ও সামান্য সরষের তেল দিয়ে পাতা মুড়ে সুতো দিয়ে বেঁধে নিন। কড়াইতে অল্প তেল দিয়ে কম আঁচে দু’পিঠ ভালোভাবে ভেজে নিন। তৈরি অতি পুরাতন রান্নার এঁচড়ের পাতুরি।

রবিবারের গল্প: সংকোচ


রবীন বসু


আর মাত্র সাতদিন পর অয়নের বিয়ে। অথচ তিস্তার মতিগতি তার ভালো ঠেকছে না। ওকে কেমন বিষণ্ণ আর অন্যমনস্ক দেখায় আজকাল। গতকাল যখন দেখা হয়েছিল অয়ন জানতে চেয়েছিল, নিমন্ত্রণের কার্ড সব বন্ধুদের দেওয়া হয়েছে কি না? তিস্তা থতমত খেয়েছিল। তারপর জানতে চেয়েছিল, কিসের কার্ড?


বিয়ে ব্যাপারটা বোধহয় ওর মাথাতেই নেই। আজ সাত বছর ওদের সম্পর্ক। বইমেলার ধুলোর মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিল তিস্তা। এক পলক দেখেই ভালো লেগেছিল অয়নের। তারপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক বন্ধুকে ধরে শেষমেশ মার্চের এক মরা বিকেলে কল্যাণীর ঘোষপাড়া স্টেশনে রাজকুমারীর মন পেয়েছিল। তিস্তা তখন হস্টেলে থেকে কল্যাণী ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স করছে। সেই রিলেশন আজ বিয়ের দোরগোড়ায়। মাস্টার্স কমপ্লিট করে তিস্তা চাকরিতে জয়েন করে। অয়ন অবশ্য তার এক বছর আগেই একটা নিউজ চ্যানেলে জয়েন করেছিল। তারপর তিস্তাই একদিন কথাপ্রসঙ্গে বলল, চাকরি যখন পেয়ে গেছি, আর দেরি কেন? বাড়িতে মা বিয়ের জন্য তাড়া দিচ্ছে।


অগত্যা অয়নকে বিয়ের ব্যবস্থা শুরু করতে হয়। কিন্তু তিস্তার এই ভাবান্তর তাকে ধন্দে ফেলেছে। বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসছে তিস্তা ততই মনমরা হয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। দেখে মনে হয় কিছু একটা বলবে। শেষ পর্যন্ত আর বলে উঠতে পারে না। তখন অয়নই বলে, তিস্তা, যদি কিছু মনে না কর তাহলে একটা কথা বলি?


—কী কথা? তিস্তা জানতে চায়।


—বলছিলাম, মনে হয় বিয়েতে তোমার আপত্তি আছে। যদি কোনও কথা বলার থাকে, আমাকে বলতে পার বিনা দ্বিধায়।


তিস্তা কিছুক্ষণ মুখ নিচু করে চুপ করে থাকল, তারপর বলল, কী বলব? এতদিন পর এসে এসব কথা বলছ কেন? আমি কী বলেছি বিয়ে করব না?


—না, তা বলনি ঠিকই। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, তুমি একটা মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে আছো।


প্লিজ তিস্তা, তেমন কিছু থাকলে আমাকে বল।


—কিচ্ছু নেই। আসলে বিয়ের দিনটা এত তাড়াতাড়ি এসে গেল।


সাধারণত মেয়েরা বিয়ের ব্যাপারে বেশি আগ্রহ দেখায়। কিন্তু তিস্তার এই ‘তাড়াতাড়ি এসে গেল’-এর মধ্যে অয়ন অন্য রহস্যের গন্ধ পেল। বেশ কিছুদিন ধরে তিস্তার মধ্যেকার এই পরিবর্তন তাকে ভাবাচ্ছে। আর এই ভাবনাটা শুরু হয়েছিল, যেদিন প্রথম ও তিস্তাকে একটা ছেলের সাথে কফিশপে দেখেছিল।


ধর্মতলায় যে অফিসে তিস্তা চাকরি করে তার দুটো বিল্ডিং পরে একটা পত্রিকার অফিস। লেখা জমা দেওয়ার জন্য অয়ন ওই অফিসে গিয়েছিল। একবার মনে হয়েছিল, এত কাছে এসেছি যখন দেখা করে যাই। তারপর নিজেকে সামলে নিয়েছিল। এভাবে না জানিয়ে হুট করে চলে গেলে তিস্তা কিছু ভাবতে পারে। ও হয়তো ব্যাপারটা সহজভাবে নেবে না। তখন অয়নের খারাপ লাগবে। সাতপাঁচ ভেবে যাওয়া থেকে বিরত হয়ে ও যখন সল্টলেকে যাওয়ার বাস ধরতে আসছিল, ঠিক সেই সময় রাস্তার পাশের একটা কফিশপে তিস্তাকে দেখল। প্রথমে ভেবেছিল চোখের ভুল। তারপর বুঝল না, কফিশপের কাঁচের দেওয়ালের অপর পারে তিস্তা সত্যিই একটা ছেলের সাথে কথা বলায় মশগুল। উলটো দিকের চেয়ারের ছেলেটাকে অয়ন চেনে না। এর কথা তিস্তা বলেওনি কোনওদিন।


তাহলে কি সেই না-চেনা ছেলেটির সঙ্গে তিস্তার অন্যমনস্কতার কোনও সম্পর্ক আছে? অয়ন কোনও কূল-কিনারা করতে পারে না। তিস্তাকে সে অবিশ্বাস করে না। কিন্তু কিছু একটা তো হয়েছে।


পরদিন রবিবার ছুটির দিন। অয়ন খুব সকালে শিয়ালদা থেকে কল্যাণী সীমান্ত লোকালে চেপে বসল। তিস্তার একসময়ের রুমমেট বনশ্রী কল্যাণীর ঘোষপাড়ার সেন্ট্রাল পার্কে থাকে। ওদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব। ফেসবুকে প্রতিদিন ওদের কথা হয়। অয়নের সাথে বনশ্রীর পরিচয়ও করিয়ে দিয়েছিল তিস্তা। আজ অয়ন ডুবন্ত মানুষ। খড়কুটোর সন্ধানে সে বনশ্রীকেই আঁকড়ে ধরতে চায়। যদি তিস্তার এখনকার কোনও খবর তার জানা থাকে?


ট্রেন থেকে নেমে একটা রিকশা নিয়ে খুব সহজেই অয়ন পৌঁছে গেল বনশ্রীদের বাড়ি। ডোরবেল বাজাতে বনশ্রীই দরজা খুলল। অয়নকে দেখে অবাক। পরিচয় দিতে গেলে ওকে থামিয়ে বনশ্রী বলে, তার আর দরকার নেই। ভেতরে আসুন।


ঘরের মধ্যে গিয়ে সোফাতে বসে অয়ন বলে, একটা বিশেষ প্রয়োজনে আপনার কাছে এসেছি। আপনার সাহায্য দরকার, বলুন না করবেন না?


—আগে তো শুনি কী সাহায্য।


—ব্যাপারটা গোপনীয়। অয়ন একটু ইতস্তত করে।


বনশ্রী উঠে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দেয়।


—এবার বলুন।


—দেখুন বনশ্রী, আপনি তো তিস্তার বেস্ট ফ্রেন্ড। ওর সব খবর নিশ্চয়ই আপনি রাখেন?


—তা রাখি। কিন্তু কেন?


—দেখুন, আমাদের রিলেশনের কথা আপনি জানেন। কয়েকদিন পর আমাদের বিয়ে। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে তিস্তার কিছু বলার আছে, যেটা ও আমাকে বলে উঠতে পারছে না। আপনি কী এ-ব্যাপারে কিছু জানেন?


বনশ্রীর এবার বিপদ বাড়ে। কয়েকদিন আগে তিস্তাই তার কাছে এসেছিল পরামর্শের জন্য। আসলে অফিসে জয়েন করার পর কিছুদিনের মধ্যে সহকর্মী বিনায়কের সঙ্গে তিস্তার একটা রিলেশন তৈরি হয়। আর সে রিলেশন এই অল্প কয়েকদিনের মধ্যে বেশ গভীরতায় পৌঁছে গেছে। তিস্তা একদিকে যেমন তার এতদিনের ভালোবাসাকে অস্বীকার করতে পারছে না, তেমনই বিনায়ক তার সমস্ত বর্তমানকে অধিকার করে নিয়েছে। কিন্তু সেকেলে ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী বাবা-মাকে, এমনকি অয়নকেও সে সংকোচে কিছু বলে উঠতে পারেনি। যতবার অয়নকে বলার চেষ্টা করেছে, ওর বিষণ্ণ মুখ আর স্বপ্নভঙ্গের কথা ভেবে বলতে পারেনি।


বনশ্রীকে চুপ করে থাকতে দেখে অয়ন আবার তাড়া লাগায়।


—প্লিজ, চুপ করে থাকবেন না। যদি সত্যিই তেমন কিছু ঘটে আমাকে বলুন। দেরি হলেও আয়ত্তের বাইরে যায়নি। আমি কথা দিচ্ছি, আপনার বন্ধুর কোনও ক্ষতি বা স্বপ্নভঙ্গ হবে না।


—আসলে কী জানেন অয়ন, তিস্তার মনটা খুব নরম। ও কাউকে কষ্ট দিতে চায় না। বিশেষ করে আপনাকে। তাই সংকোচে ও বলতে পারছে না, ওর জীবনে আর একটা প্রেম এসেছে। ওরই অফিস কলিগ বিনায়ককে ও ভালোবেসে ফেলেছে। আর সে ভালোবাসা এতটাই গভীর যে, আপনার মুখটা এখন কুয়াশাঢাকা অস্পষ্ট দূরের হয়ে গেছে। না বলতে পারার লজ্জা আর সংকোচে ও দিনকে দিন নিজের মধ্যে ক্রমাগত মরে যাচ্ছে। আপনিই একমাত্র এখন ওকে বাঁচাতে পারেন।


—ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করব। আপনাকে ধন্যবাদ।


বনশ্রীদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে অয়ন যেন একটা অন্য পৃথিবীতে প্রবেশ করল। আলোহীন, শব্দহীন এক নিরালম্ব পৃথিবী। এ-পৃথিবী তার চেনা না। এতদিনের পরিচিত প্রিয় যে পৃথিবী, তার থেকে অনেক দূরের অন্যকোনও ছায়াপথের পৃথিবী। এখানে সূর্য নেই, খুশি নেই, শুধুই মন খারাপ। বিষণ্ণ বাতাস আর না-পাওয়ার জলছবি। কতক্ষণ সে ওই অন্ধকার পৃথিবীর অলিগলিতে ঘুরেছিল খেয়াল নেই—কে একজন তার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিতে তার চটক ভাঙল।


—কী দাদা, সাবধানে রাস্তা পেরোবেন তো? আর একটু হলেই গাড়ির ধাক্কা খাচ্ছিলেন।


অয়ন ততক্ষণে বাস্তবে ফিরে এসেছে। লজ্জিতভাবে লোকটাকে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে সে ঘোষপাড়া স্টেশনের দিকে হাঁটা শুরু করল।


এই সেই কল্যাণীর ঘোষপাড়া স্টেশন। এখানেই একদিন তিস্তা আর তার প্রেম শুরু হয়েছিল। রাজকুমারী হ্যাঁ বলেছিল, রাজকুমার সাতরাজার ধন এক মানিক পেয়েছিল। তারপর সাত বছর পক্ষীরাজ ঘোড়ার পিঠে চড়ে কত দেশ—কত প্রান্তর, সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আজ থামার পালা।


অয়ন দেখল সূর্য ডুবে যাচ্ছে। দূরে দূরে মাঠের দিক থেকে লোকজন সব ঘরে ফিরছে। স্টেশনটা ফাঁকা। বোধহয় একটু আগে কলকাতা যাওয়ার ট্রেন চলে গেছে। এদিকে আবার এক ঘণ্টা পর পর ট্রেন। অয়ন একটা ফাঁকা সিমেন্টের বেঞ্চ দেখে বসল। আসার পথেই রিটার্ন টিকিট কেটে এনেছে। পকেট থেকে সেলফোনটা বের করে একটা মেসেজ টাইপ করতে শুরু করল।


মেসেজটা তিস্তার নাম্বারে সেন্ড করে অয়ন উঠে দাঁড়াল। প্ল্যাটফর্মে লোকজন জড়ো হয়েছে। এবার বোধহয় কলকাতা যাওয়ার ট্রেন আসবে।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page