শ্রাবণী পূর্ণিমা এবং রাখী বন্ধন মাহাত্ম্য | ভাইয়ের জন্য ভুরিভোজ | রাখীর উপহার | রবিবারের গল্প: অদৃশ্য ত্রিকোণ
- রোজকার অনন্যা

- 1 day ago
- 34 min read
Updated: 10 hours ago

শ্রাবণী পূর্ণিমা ও রাখী বন্ধন মাহাত্ম্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা। বর্ষার স্নিগ্ধতা তখন প্রকৃতির শরীরে, আকাশে মেঘের আনাগোনা, চারদিকে উৎসবের আবহ। এই পূর্ণিমার দিনটিই ভারতীয় সংস্কৃতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে রাখীবন্ধন বা রাখী পূর্ণিমা নামে। এক টুকরো সুতো, তার সঙ্গে সামান্য ফুল, চন্দন, মিষ্টি কিংবা ভালোবাসার উপহার—এই সামান্য আয়োজনের মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে এক গভীর প্রতিশ্রুতি। ভাইয়ের কবজিতে বোনের বাঁধা রাখী শুধু অলংকার নয়, এটি স্নেহ, মঙ্গলকামনা, পারস্পরিক আস্থা এবং রক্ষার প্রতীক। যুগের পরিবর্তনে রাখীবন্ধনের আচার বদলেছে, বদলেছে উদ্যাপনের ধরন, কিন্তু সম্পর্কের ভিতরে ভালোবাসা ও নিরাপত্তার যে আকাঙ্ক্ষা, তা আজও একই রয়ে গেছে।

‘রাখী’ শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘রক্ষা’ শব্দটি। অর্থাৎ যে বন্ধন রক্ষার অঙ্গীকার বহন করে, তাকেই বলা হয় রাখীবন্ধন। প্রচলিত রীতিতে বোন ভাইয়ের হাতে রাখী পরিয়ে তার দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। ভাইও বোনকে স্নেহ, সম্মান ও নিরাপত্তার আশ্বাস দেন। তবে এই উৎসবকে কেবলমাত্র ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে এর বিস্তৃত সাংস্কৃতিক তাৎপর্যটি ধরা পড়ে না। ভারতীয় ঐতিহ্যে রাখী বহু সময়ে বন্ধুত্ব, সামাজিক সংহতি, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা এবং বিপদের সময় একে অপরের পাশে থাকার প্রতীক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। তাই রাখীবন্ধনের মূল দর্শন রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বড়—এটি বিশ্বাসের সম্পর্ককে দৃঢ় করার এক প্রতীকী আচার।
রাখীবন্ধনের ইতিহাসের সঙ্গে বহু পৌরাণিক কাহিনি জড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কাহিনিগুলির একটি মহাভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত। কথিত আছে, একবার শ্রীকৃষ্ণের আঙুলে আঘাত লেগে রক্তপাত হয়েছিল। সেই সময় দ্রৌপদী নিজের শাড়ির আঁচল থেকে এক টুকরো কাপড় ছিঁড়ে কৃষ্ণের আঙুলে বেঁধে দিয়েছিলেন। দ্রৌপদীর এই স্নেহ ও মমতাকে কৃষ্ণ অত্যন্ত মূল্য দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে কুরুসভায় দ্রৌপদীর অপমানের সময় কৃষ্ণ তার মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন—এই কাহিনিকে অনেকেই সেই স্নেহবন্ধনের প্রতিদান হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। যদিও প্রাচীন মহাভারতের মূল বর্ণনায় আধুনিক অর্থে রাখীবন্ধনের আচারটি সরাসরি প্রতিষ্ঠিত নয়, লোকবিশ্বাস ও পরবর্তী সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যায় কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর এই সম্পর্ক রাখীবন্ধনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে গেছে।

আরও একটি বহুল প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনি জড়িয়ে আছে দেবরাজ ইন্দ্র ও তাঁর পত্নী শচীর সঙ্গে। পুরাণকথা অনুযায়ী, দেবতা ও অসুরদের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ চলছিল। অসুরদের শক্তির সামনে দেবরাজ ইন্দ্র এবং দেবতারা বিপন্ন হয়ে পড়েছিলেন। সেই সময় ইন্দ্রের স্ত্রী শচী দেবতার কাছে স্বামীর মঙ্গল ও বিজয়ের জন্য প্রার্থনা করেন। কথিত আছে, তিনি মন্ত্রপূত একটি পবিত্র সুতো ইন্দ্রের হাতে বেঁধে দেন। সেই পবিত্র বন্ধন ইন্দ্রকে মানসিক শক্তি ও আত্মবিশ্বাস দেয় এবং পরবর্তীতে তিনি যুদ্ধে বিজয়ী হন। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে পবিত্র সূত্রের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহারের একটি প্রাচীন ধারণা সামনে আসে। পরবর্তী কালে সেই পবিত্র সূত্রের ভাবনা রাখীর সঙ্গে সাংস্কৃতিকভাবে যুক্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়।

রাখীবন্ধনের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক কাহিনি রয়েছে রাজা বলি ও দেবী লক্ষ্মীকে ঘিরে। বিষ্ণু যখন বামন অবতারে অসুররাজ বলির কাছে তিন পা জমি চেয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে বলির প্রতিশ্রুতির কারণে তাঁকে পাতালে অবস্থান করতে হয়েছিল, তখন বিষ্ণু বলির রাজ্যে থাকার প্রতিশ্রুতি দেন—এমন একটি পুরাণপ্রচলিত কাহিনি রয়েছে। বৈকুণ্ঠে বিষ্ণুর অনুপস্থিতিতে দেবী লক্ষ্মী উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি একদিন ব্রাহ্মণীর ছদ্মবেশে বলির কাছে যান এবং তাঁর হাতে একটি পবিত্র সূত্র বাঁধেন। বলি সেই বন্ধনের মর্যাদা দিয়ে লক্ষ্মীকে নিজের বোন হিসেবে গ্রহণ করেন। পরে লক্ষ্মী তাঁর স্বামী বিষ্ণুকে ফিরে পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে বলি সেই অনুরোধ মেনে নেন। এই কাহিনিতেও রাখী রক্তের সম্পর্কের বাইরে আত্মীয়তার এক নতুন বন্ধন তৈরি করার প্রতীক হয়ে ওঠে।
ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যে পবিত্র সূত্র বাঁধার রীতি অবশ্য রাখীবন্ধনের চেয়ে অনেক প্রাচীন। বৈদিক ও পরবর্তী ধর্মীয় আচারে মন্ত্রপূত সূত্র, রক্ষাসূত্র বা মঙ্গলসূত্রের ব্যবহার ছিল। পূজা, যজ্ঞ কিংবা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পুরোহিতের দ্বারা হাতে পবিত্র সুতো বাঁধার রীতি আজও বহু স্থানে প্রচলিত। এই রক্ষাসূত্রের ধারণার সঙ্গে ‘রক্ষা’ ও ‘মঙ্গল’-এর যে সম্পর্ক, তা পরবর্তী সময়ে রাখীবন্ধনের সামাজিক ও পারিবারিক রীতির সঙ্গে একাত্ম হয়েছে বলে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণে মনে করা হয়। অর্থাৎ আধুনিক রাখী উৎসবটি কোনো একটি নির্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; বরং বহু শতাব্দী ধরে চলে আসা পবিত্র সূত্র, মঙ্গলকামনা ও পারিবারিক বন্ধনের নানা ঐতিহ্য একে ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র উৎসবের রূপ দিয়েছে।

রাখীবন্ধনের ইতিহাসের আরেকটি জনপ্রিয় অধ্যায় জড়িয়ে আছে রাজপুতানা ও মুঘল যুগের কিংবদন্তির সঙ্গে। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, চিতোরের রানি কর্ণাবতী মুঘল সম্রাট হুমায়ূনের কাছে একটি রাখী পাঠিয়ে তাঁকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং বিপদের সময় তাঁর সাহায্য চেয়েছিলেন। কথিত আছে, হুমায়ূন সেই রাখীর মর্যাদা রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। এই কাহিনি ইতিহাসের নির্ভুল দলিল হিসেবে সর্বসম্মত নয় এবং এর বিভিন্ন সংস্করণ রয়েছে। তবু ভারতীয় লোকস্মৃতিতে এটি রাখীবন্ধনের একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে রয়েছে। কারণ এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে রক্তের সম্পর্কের বাইরে বিশ্বাস ও দায়িত্বের বন্ধন। একটি রাখী কীভাবে অপরিচিত দুজন মানুষকেও ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ করার প্রতীক হতে পারে, এই কাহিনি তারই একটি চিত্র।

বাংলার ইতিহাসে রাখীবন্ধনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নিলে বাংলার সমাজজীবনে প্রবল প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখীবন্ধন উৎসবকে ব্যবহার করেছিলেন হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য এবং বাংলার মানুষের পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি মানুষকে একে অপরের হাতে রাখী বেঁধে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। সেই রাখী ছিল কেবল ভাইয়ের হাতে বোনের বাঁধা সুতো নয়; তা হয়ে উঠেছিল বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যের প্রতীক। বাংলার মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতিকে বিভক্ত করা যায় না—এই বার্তাই সেই রাখীবন্ধন উৎসবের অন্তর্নিহিত শক্তি হয়ে উঠেছিল।
রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনার ফলে রাখীবন্ধন বাংলায় একটি নতুন সামাজিক ও মানবিক অর্থ লাভ করে। ধর্ম, জাতি, সম্প্রদায় কিংবা সামাজিক পরিচয়ের বিভেদ ভুলে একে অপরকে আপন করে নেওয়ার যে আহ্বান, তা রাখীর সুতোকে আরও অর্থবহ করে তোলে। কবিগুরুর কাছে বন্ধন মানেই বন্দিত্ব নয়; ভালোবাসার বন্ধন মানুষকে কাছাকাছি আনে। তাই রাখীবন্ধনের এই ঐতিহাসিক ব্যবহার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃত রক্ষা কেবল শারীরিক নিরাপত্তা নয়, বরং মানুষের মর্যাদা, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক বিশ্বাসকে রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাখীবন্ধনের সঙ্গে শ্রাবণ পূর্ণিমার সম্পর্কও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্ষার এই সময়ে প্রকৃতি নতুন প্রাণে সজীব হয়ে ওঠে। কৃষিজীবী সমাজে এটি ছিল বছরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। প্রাচীন ভারতীয় জীবনযাত্রায় ঋতুচক্র, কৃষিকাজ, ধর্মীয় আচার এবং সামাজিক উৎসব পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। শ্রাবণ পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নানা ধরনের আচার পালিত হয়। কোথাও এটি রাখী পূর্ণিমা, কোথাও নারলী পূর্ণিমা, কোথাও ঝুলন পূর্ণিমা কিংবা উপাকর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। অঞ্চলভেদে আচার আলাদা হলেও পূর্ণিমাটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সর্বত্রই বিশেষ।
ভারতের পশ্চিম উপকূলবর্তী অঞ্চলে এই দিনটি নারলী পূর্ণিমা নামে পরিচিত। সমুদ্রনির্ভর মৎস্যজীবী সমাজে এই উৎসবের সঙ্গে সমুদ্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং নিরাপদ যাত্রার প্রার্থনা জড়িত। নারকেল নিবেদন করে সমুদ্রদেবতার কাছে মঙ্গলকামনা করার রীতি রয়েছে। ফলে একই পূর্ণিমা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সামাজিক অভিজ্ঞতা ও জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। কোথাও ভাই-বোনের সম্পর্ক, কোথাও সমুদ্র ও জীবিকার সম্পর্ক, কোথাও ধর্মীয় শিক্ষার সূচনা—এই বহুমাত্রিকতা ভারতীয় সংস্কৃতির বৈচিত্র্যের এক অনন্য উদাহরণ।

রাখীবন্ধনের সবচেয়ে আবেগময় মুহূর্ত নিঃসন্দেহে রাখী বাঁধার আচার। সাধারণত বোন ভাইয়ের কপালে চন্দনের ফোঁটা বা তিলক দেন, প্রদীপ বা আরতি করেন, মিষ্টিমুখ করান এবং তারপর ভাইয়ের কবজিতে রাখী বাঁধেন। ভাইও বোনকে উপহার দেন এবং তাঁর মঙ্গল ও সুখের জন্য আশীর্বাদ করেন। অনেক পরিবারে ছোটবেলা থেকেই এই রীতি চলে আসছে। শিশুকাল থেকে কৈশোর, কৈশোর থেকে যৌবন, তারপর সংসার—জীবনের নানা পর্যায় পেরিয়ে গেলেও রাখীর দিন ভাই-বোনের সম্পর্ক যেন ফিরে যায় শৈশবের সেই নির্ভেজাল দিনগুলিতে।
রাখীর সুতো তাই স্মৃতিরও বাহক। একসময় যে বোনটি ভাইয়ের হাত ধরে স্কুলে যেত, যে ভাইটি বোনের জন্য মেলার খেলনা কিনে আনত, বড় হয়ে তাদের জীবনের ব্যস্ততা আলাদা হয়ে গেলেও রাখীর দিনে সেই পুরনো সম্পর্ক আবার সামনে আসে। দূরত্ব তখন আর বাধা থাকে না। কেউ ফোনে, কেউ ভিডিও কলে, কেউ ডাকযোগে রাখী পাঠিয়ে, আবার কেউ বহু দূর থেকে ছুটে এসে এই সম্পর্ককে উদ্যাপন করেন। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা সম্পর্কগুলিকে সময়ের অভাবে দূরে সরিয়ে দিলেও রাখীবন্ধন যেন বছরে একবার সবাইকে মনে করিয়ে দেয়—সম্পর্কের যত্নও জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

আজকের দিনে রাখীর রূপও অনেক বদলেছে। একসময়ের সাধারণ সুতো বা হাতে তৈরি তুলোর রাখীর পাশাপাশি এখন দেখা যায় নানা ধরনের নকশা, ফুল, পুঁতি, কাঠ, মাটি, কাপড়, ধাতু কিংবা পরিবেশবান্ধব উপাদানে তৈরি রাখী। শিশুদের জন্য কার্টুন চরিত্রের রাখী যেমন জনপ্রিয়, তেমনই প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নকশাদার, হাতে তৈরি কিংবা ব্যক্তিগত বার্তাযুক্ত রাখীর চাহিদাও রয়েছে। কিন্তু বাহ্যিক চাকচিক্য যতই বাড়ুক, রাখীর আসল সৌন্দর্য তার উপাদানে নয়, তার অর্থে।
রাখীবন্ধনের আরেকটি বিশেষত্ব হল উপহারের আদানপ্রদান। আগে সাধারণত ভাই বোনকে উপহার দিতেন; এখন অনেক পরিবারেই ভাই-বোন উভয়েই পরস্পরকে উপহার দেন। বই, পোশাক, মিষ্টি, গয়না, প্রিয় খাবার, হাতে লেখা চিঠি কিংবা ছোট্ট কোনো স্মারক—উপহারের ধরন বদলেছে, কিন্তু উদ্দেশ্য একই। প্রিয় মানুষটির জন্য নিজের অনুভূতি প্রকাশ করা। অনেক ভাই-বোন আবার উপহারের পরিবর্তে একসঙ্গে সময় কাটান। কেউ পুরনো ছবি দেখেন, কেউ শৈশবের গল্প করেন, কেউ একসঙ্গে খেতে যান। অর্থাৎ উৎসবের মূল আনন্দ বস্তুগত উপহারে নয়, সম্পর্কের পুনর্মিলনে।

সময়ের সঙ্গে রাখীবন্ধনের সামাজিক পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে। আজ অনেক মানুষ ভাই-বোনের সম্পর্কের বাইরেও এই দিনটিকে বন্ধুত্ব, মানবিকতা ও সামাজিক সংহতির প্রতীক হিসেবে দেখেন। কিছু ক্ষেত্রে বোন ভাইকে রাখী বাঁধেন, আবার কোথাও ভাইও বোনের হাতে প্রতীকী বন্ধন পরিয়ে দেন। কোথাও বন্ধু বন্ধুকে রাখী দেন, কোথাও শিক্ষার্থী শিক্ষককে, কোথাও মানুষ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে সম্প্রীতির বার্তা বিনিময় করেন। এর ফলে উৎসবটির কেন্দ্রে থাকা ‘রক্ষা’ ধারণাটি আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে—আমি তোমার পাশে থাকব, তুমিও আমার পাশে থাকবে।
এই ‘পাশে থাকার’ প্রতিশ্রুতিই রাখীবন্ধনের প্রকৃত মাহাত্ম্য। জীবনে বিপদ আসবেই, সম্পর্কের মধ্যে মতভেদও থাকবে, দূরত্বও তৈরি হবে। কিন্তু সম্পর্কের ভিত যদি বিশ্বাসের হয়, তবে সেই বন্ধন অনেক ঝড় সামলে নিতে পারে। রাখী সেই বিশ্বাসের একটি দৃশ্যমান প্রতীক। একটি সূক্ষ্ম সুতো আসলে মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও যত্ন, সম্মান ও দায়িত্বের সুতোয় বাঁধা। সুতোটি দেখতে দুর্বল হলেও তার প্রতীকী শক্তি অসীম।

রাখীবন্ধনের মধ্যে ভারতীয় নারীর মঙ্গলকামনার ঐতিহ্যও প্রতিফলিত হয়। বোন ভাইয়ের দীর্ঘ জীবন, সুস্বাস্থ্য ও সাফল্যের জন্য প্রার্থনা করেন। তবে আধুনিক সময়ে এই প্রার্থনার অর্থ আরও সমানতাভিত্তিক হয়েছে। এখন ভাইও বোনের সুখ, নিরাপত্তা, সম্মান, স্বাধীনতা ও সাফল্যের জন্য অঙ্গীকার করেন। ফলে রাখী কেবল ‘ভাই বোনকে রক্ষা করবে’—এই একমুখী ধারণায় আটকে নেই। বরং এটি হয়ে উঠেছে পারস্পরিক যত্ন ও সম্মানের উৎসব। ভাই যেমন বোনের পাশে থাকবে, বোনও তেমন ভাইয়ের শক্তি ও আশ্রয় হয়ে থাকবে—এই ভাবনাই সম্পর্ককে আরও সুন্দর করে।
রাখীবন্ধনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মিষ্টিরও এক বিশেষ ভূমিকা। বাংলায় রাখীর দিনে সন্দেশ, রসগোল্লা, লাড্ডু, পায়েস কিংবা নানা ঘরোয়া মিষ্টি দিয়ে ভাইকে মিষ্টিমুখ করানোর রীতি বহু পরিবারের আনন্দের অংশ। অনেক বাড়িতে আবার রাখীর দিন বিশেষ রান্না হয়। বোনের হাতে তৈরি প্রিয় খাবার, মায়ের রান্না, ভাইয়ের পছন্দের মিষ্টি—সব মিলিয়ে উৎসবটি খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গেও মিশে যায়। ফলে রাখীবন্ধন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি পারিবারিক স্মৃতি ও স্বাদেরও উৎসব।
বাংলার ঘরে রাখীবন্ধনের আবহে একসময় ছিল বিশেষ আন্তরিকতা। উঠোনে আলপনা, ধূপের গন্ধ, থালায় চন্দন ও মিষ্টি, নতুন পোশাক, বাড়ির বড়দের আশীর্বাদ—সব মিলিয়ে উৎসবের দিনটি হয়ে উঠত পারিবারিক মিলনের উপলক্ষ। শহুরে জীবনযাত্রায় সেই আয়োজনের অনেকটাই বদলে গেছে। ব্যস্ততা, দূরত্ব, কর্মজীবন এবং প্রযুক্তিনির্ভর যোগাযোগের কারণে এখন অনেক ভাই-বোন একই বাড়িতে থেকেও আলাদা সময়সূচিতে জীবন কাটান। তবু রাখীর দিন একটি ছোট্ট থালা, একটি রাখী আর কয়েক মুহূর্তের আন্তরিকতা তাদের আবার কাছাকাছি নিয়ে আসে।

রাখীবন্ধনের বিশেষত্ব এখানেই—এটি বড় আয়োজনের উৎসব না হয়েও গভীর আবেগের উৎসব। দুর্গাপুজোর মতো বিশাল মণ্ডপ নেই, দীপাবলির মতো অসংখ্য প্রদীপ নেই, বড় কোনো শোভাযাত্রাও নেই। তবু একটি ছোট্ট রাখী একটি পরিবারের আবেগকে জাগিয়ে তুলতে পারে। কারণ এই উৎসবের কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ এবং তার সম্পর্ক। বাহ্যিক আড়ম্বর যত কম, অন্তরের অনুভূতির গুরুত্ব তত বেশি।
রাখীর সঙ্গে স্মৃতির সম্পর্কও অত্যন্ত গভীর। অনেকের কাছে রাখী মানেই ছোটবেলার বাড়ি, পুরনো কাঠের আলমারি, মায়ের হাতে সাজানো থালা, বাবার কেনা নতুন জামা, ভাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া, বোনের অভিমান, আবার কয়েক মিনিট পরেই মিল হয়ে যাওয়া। বড় হয়ে মানুষ যত দূরেই চলে যাক, রাখীর দিন সেই স্মৃতিগুলি ফিরে আসে। তাই রাখী অনেকের কাছে শুধু উৎসব নয়, শৈশবে ফিরে যাওয়ার একটি দরজা।

প্রবাসী ভারতীয়দের মধ্যেও রাখীবন্ধন অত্যন্ত জনপ্রিয়। পৃথিবীর নানা দেশে বসবাসকারী ভারতীয় পরিবারগুলি এই উৎসবের মাধ্যমে নিজেদের সাংস্কৃতিক শিকড়ের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখেন। ডাকযোগে রাখী পাঠানো, অনলাইনে উপহার পাঠানো, ভিডিও কলে রাখী বাঁধার প্রতীকী আচার—প্রযুক্তি উৎসবের ধরন বদলে দিয়েছে। কিন্তু দূরত্ব যতই হোক, অনুভূতির দূরত্ব কমিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখীর এখনও রয়েছে।
পরিবেশ সচেতনতার যুগে রাখীবন্ধনও নতুন এক বার্তা বহন করতে শুরু করেছে। প্লাস্টিক, অতিরিক্ত কৃত্রিম উপাদান কিংবা একবার ব্যবহারযোগ্য সাজসজ্জার পরিবর্তে এখন অনেকেই হাতে তৈরি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব রাখী বেছে নিচ্ছেন। বীজযুক্ত রাখী, কাগজ, কাপড়, পাট কিংবা প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি রাখীর ব্যবহারও বেড়েছে। এমন রাখী মাটিতে পুঁতে দিলে গাছ জন্মাতে পারে—এই ধারণা উৎসবের সঙ্গে পরিবেশরক্ষার বার্তাকে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ ‘রক্ষা’ শব্দটির অর্থ এখানে আরও বিস্তৃত—শুধু মানুষকে নয়, প্রকৃতিকেও রক্ষা করতে হবে।
রাখীবন্ধনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর অন্তর্নিহিত সমতার বার্তা। ইতিহাসে নানা সময়ে সামাজিক বিভাজন মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করেছে। কিন্তু রাখীর প্রতীকী শক্তি বলে, সম্পর্ক কেবল জন্মসূত্রে নির্ধারিত নয়; ভালোবাসা, বিশ্বাস ও দায়িত্বের মাধ্যমেও মানুষ আপন হয়ে উঠতে পারে। রবীন্দ্রনাথের বঙ্গভঙ্গবিরোধী রাখীবন্ধন উৎসব সেই ভাবনার এক ঐতিহাসিক উদাহরণ। আজও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সামাজিক ঐক্য এবং মানবিকতার বার্তা ছড়াতে রাখীবন্ধন ব্যবহার করা যায়।

এই কারণে রাখীবন্ধনকে শুধুমাত্র ‘ভাইয়ের হাতে বোনের রাখী বাঁধার দিন’ হিসেবে দেখলে তার সাংস্কৃতিক গভীরতা অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। এটি আসলে সম্পর্ককে নতুন করে স্বীকার করার দিন। আমরা যাদের ভালোবাসি, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে—এই সহজ অথচ গভীর সত্যটি মনে করিয়ে দেয় রাখী। একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, রক্ষা মানে অধিকার প্রতিষ্ঠা নয়; রক্ষা মানে সম্মান করা, পাশে থাকা, দুর্বল সময়ে শক্তি দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
পুরাণের ইন্দ্র-শচী, কৃষ্ণ-দ্রৌপদী কিংবা বলি-লক্ষ্মীর কাহিনি, রাজপুতানার লোককথা, রবীন্দ্রনাথের বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন কিংবা আধুনিক পরিবারের ছোট্ট ঘরোয়া অনুষ্ঠান—সবকিছুকে এক সূত্রে বাঁধে একটি সাধারণ ধারণা। সেই ধারণা হল বন্ধন। কিন্তু এই বন্ধন কোনো শৃঙ্খল নয়। এটি এমন এক বন্ধন, যেখানে মানুষ নিজের ইচ্ছায় অন্য মানুষের সুখ, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতি দায়বদ্ধ হয়। এই কারণেই রাখী একটি সুতো হয়েও এত শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে সম্পর্কের সংজ্ঞাও বদলাচ্ছে। মানুষ কাজের কারণে এক শহর থেকে অন্য শহরে চলে যাচ্ছে, দেশান্তরী হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। অনেক সময় একই পরিবারের মানুষও একে অপরের সঙ্গে পর্যাপ্ত সময় কাটাতে পারেন না। এই পরিস্থিতিতে রাখীবন্ধনের মতো উৎসবগুলির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ এগুলি আমাদের থামতে শেখায়, প্রিয় মানুষটির দিকে তাকাতে শেখায়, সম্পর্কের মূল্য মনে করিয়ে দেয়।
রাখীর আসল সৌন্দর্য তাই তার বাহ্যিক সাজে নয়, তার অদৃশ্য অর্থে। কবজিতে বাঁধা একটি সুতো হয়তো কয়েক দিন পর খুলে যাবে, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি থেকে যাবে অনেক বছর। বোনের মঙ্গলকামনা, ভাইয়ের প্রতিশ্রুতি, শৈশবের হাসি, পুরনো অভিমান, দূরত্ব পেরিয়ে দেখা হওয়া, মায়ের হাতে সাজানো মিষ্টির থালা—সব মিলিয়ে রাখীবন্ধন হয়ে ওঠে একটি পরিবারের আবেগের দিন।
শ্রাবণ পূর্ণিমার আকাশে তাই যখন পূর্ণ চাঁদ ওঠে, তখন তার আলোয় শুধু একটি ধর্মীয় উৎসবের ছবি দেখা যায় না। দেখা যায় ভারতীয় সমাজের বহু শতাব্দীর স্মৃতি, পুরাণ, লোককথা, ইতিহাস, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং মানবিকতার এক দীর্ঘ যাত্রা। একটি রাখী কখনও ভাই-বোনের ভালোবাসা, কখনও বন্ধুত্ব, কখনও সম্প্রীতি, কখনও সামাজিক ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাপন বদলেছে, উৎসবের সাজসজ্জা বদলেছে; কিন্তু ভালোবাসার প্রয়োজন বদলায়নি।
রাখীবন্ধনের প্রকৃত মাহাত্ম্য তাই এই একটি কথায় ধরা যায়—সম্পর্ককে রক্ষা করার অঙ্গীকার। যে মানুষটি আপনার পাশে আছে, তার পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি। যে মানুষটি আপনার সুখে হাসে, তার দুঃখে হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সংকল্প। আর যে সম্পর্ক রক্তের নয়, তবু হৃদয়ের কাছে আপন, তাকেও ভালোবাসার বন্ধনে গ্রহণ করার মানসিকতা। এই কারণেই রাখী একটি সুতো হয়েও যুগের পর যুগ ভারতীয় সংস্কৃতিতে তার জায়গা ধরে রেখেছে।
রাখীবন্ধন শেষ পর্যন্ত আমাদের শেখায়, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী বন্ধন সবসময় দৃশ্যমান নয়। কখনও একটি সুতোতেই লুকিয়ে থাকে অগণিত স্মৃতি, প্রার্থনা, বিশ্বাস ও ভালোবাসা। ভাইয়ের কবজিতে বাঁধা সেই ছোট্ট রাখী যেন নীরবে বলে—জীবনের পথ যত দীর্ঘই হোক, সময় যতই বদলাক, দূরত্ব যতই বাড়ুক, ভালোবাসার এই বন্ধন যেন অটুট থাকে। আর সেই অটুট বন্ধনের মধ্যেই নিহিত রাখীবন্ধনের চিরন্তন সৌন্দর্য, মাহাত্ম্য ও বিশেষত্ব।
ভাইয়ের জন্য ভুরিভোজ
সুস্মিতা মিত্র
রাখী মানে শুধুই ভাই-বোনের হাতে সুতো বেঁধে দেওয়া নয়, বরং ঘরজুড়ে উৎসবের আমেজ, আপনজনের সঙ্গে একসঙ্গে বসে গল্প করা আর সেই গল্পের ফাঁকে মন ভরে খাওয়া-দাওয়া। ছোটবেলার রাখীর স্মৃতির সঙ্গে তাই খাবারের গন্ধ, মায়ের রান্নাঘর আর বাড়ির তৈরি নানা পদের স্বাদ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। এই দিনটিকে ঘিরে বাড়ির রান্নাঘরও যেন একটু বেশি ব্যস্ত হয়ে ওঠে, কখনও প্রিয় ভাইয়ের পছন্দের পদ, কখনও বোনের আবদার, আবার কখনও পরিবারের সবার জন্য তৈরি হয় একেবারে উৎসবের মেনু।
এবছর রাখীর দুপুরের পাতে থাকুক বাঙালিয়ানার চেনা স্বাদ, সঙ্গে থাকুক কিছু নতুনত্বের ছোঁয়া। ভাত, ডাল, ভাজা থেকে শুরু করে মাছ-মাংসের জমকালো পদ, প্রতিটি রান্নাতেই ফুটে উঠুক আপন করে খাওয়ানোর উষ্ণতা। এই সংকলনে থাকল এমন কিছু রান্নার ভাবনা, যা সহজেই ঘরোয়া উৎসবের মেনুকে করে তুলতে পারে আরও আনন্দময় ও স্মরণীয়। কারণ উৎসবের আসল স্বাদ শুধু রান্নায় নয়, সেই রান্না ঘিরে একসঙ্গে বসার মুহূর্তে, প্রিয়জনের মুখে তৃপ্তির হাসিতে এবং ভালোবাসা দিয়ে পরিবেশন করা প্রতিটি পদে। এই রাখীতে তাই রাখীর সুতোয় যেমন বাঁধা থাকুক সম্পর্ক, তেমনই খাবারের টেবিলেও জুড়ে থাকুক ভালোবাসার স্বাদ।
কাশ্মীরি মুর্গ পোলাও

কী কী লাগবে
বাসমতি চাল ২ কাপ, মুরগি ৫০০ গ্রাম, পেঁয়াজ ২টি পাতলা করে কাটা, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, টক দই ১/২ কাপ, দুধ ১/২ কাপ, ঘি ৩ টেবিল চামচ, Shalimar's Sunflower তেল ২ টেবিল চামচ, কাজুবাদাম ১০-১২টি, কিশমিশ ২ টেবিল চামচ, কাঠবাদাম ৮-১০টি, কেওড়া জল ১ চা চামচ, গোলাপ জল ১ চা চামচ, জাফরান ১/২ চা চামচ, গরম দুধ ২ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১ চা চামচ, দারচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৪টি, তেজপাতা ২টি, গোলমরিচ ৬-৮টি, জয়িত্রী ১ টুকরো, জায়ফল গুঁড়ো ১/৪ চা চামচ, শাহি জিরে ১/৪ চা চামচ

কীভাবে বানাবেন
প্রথমে বাসমতি চাল ভালো করে ধুয়ে ২০-৩০ মিনিট জলে ভিজিয়ে রাখুন। জাফরান গরম দুধে ভিজিয়ে রাখুন। মুরগির টুকরোগুলির সঙ্গে টক দই, আদা বাটা, রসুন বাটা, নুন ও সামান্য জায়ফল গুঁড়ো মিশিয়ে অন্তত ৩০ মিনিট মাখিয়ে রাখুন। একটি ভারী তলার পাত্রে তেল ও ১ টেবিল চামচ ঘি গরম করে পেঁয়াজ ভেজে সোনালি করে তুলে রাখুন। একই পাত্রে দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, তেজপাতা, গোলমরিচ, জয়িত্রী ও শাহি জিরে দিয়ে সুগন্ধ বের হওয়া পর্যন্ত ভাজুন। এবার মেরিনেট করা মুরগি দিয়ে মাঝারি আঁচে ৮-১০ মিনিট কষিয়ে নিন। মুরগি প্রায় সেদ্ধ হয়ে এলে দুধ ও চিনি দিয়ে আরও ২-৩ মিনিট রান্না করুন। অন্য পাত্রে পর্যাপ্ত জল ফুটিয়ে তাতে সামান্য নুন ও গোটা গরম মশলা দিয়ে ভেজানো চাল দিন। চাল প্রায় ৭০ শতাংশ সেদ্ধ হলে জল ঝরিয়ে নিন। এবার মুরগির উপর অর্ধেক ভাত ছড়িয়ে দিন। তার উপর ভাজা পেঁয়াজ, কাজুবাদাম, কিশমিশ ও কাঠবাদাম দিন। বাকি ভাত দিয়ে ঢেকে দিন। উপর থেকে বাকি ঘি, জাফরান মেশানো দুধ, কেওড়া জল ও গোলাপ জল ছড়িয়ে দিন। পাত্রের মুখ ভালোভাবে ঢেকে প্রথমে ২-৩ মিনিট মাঝারি আঁচে এবং পরে একেবারে কম আঁচে ১৫-২০ মিনিট দমে রাখুন। গ্যাস বন্ধ করে আরও ১০ মিনিট ঢাকনা না খুলে রেখে দিন। এরপর আলতো হাতে ভাত ও মুরগি মিশিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।
পিস পোলাও

কী কী লাগবে
বাসমতি চাল ২ কাপ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, ঘি ৩ টেবিল চামচ, Shalimar's Sunflower তেল ২ টেবিল চামচ, কাজুবাদাম ১০টি, কিশমিশ ২ টেবিল চামচ, দারচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৪টি, তেজপাতা ২টি, জয়িত্রী ১ টুকরো, শাহি জিরে ১/২ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ ১/২ চা চামচ, চিনি ১ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, গরম জল ৪ কাপ, কেওড়া জল ১ চা চামচ।

কীভাবে বানাবেন
চাল ভালো করে ধুয়ে ২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। কড়াইয়ে তেল ও ঘি গরম করে দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, তেজপাতা, জয়িত্রী ও শাহি জিরে ফোড়ন দিয়ে আদা বাটা দিন। এবার ভেজানো চাল দিয়ে ২–৩ মিনিট ভালো করে ভাজুন। নুন ও চিনি দিয়ে গরম জল ঢেলে দিন। আঁচ কমিয়ে ঢেকে রান্না করুন। চাল প্রায় সেদ্ধ হয়ে এলে কাজুবাদাম, কিশমিশ ও কেওড়া জল দিয়ে আরও ৫ মিনিট দমে রাখুন। ঘি ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।
মুরগির লাল ঝোল
কী কী লাগবে
মুরগি ৭৫০ গ্রাম, আলু ৩টি, পেঁয়াজ ৩টি বাটা, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, টমেটো ১টি বাটা, শুকনো লঙ্কা ৪টি, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো দেড় টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ ১/২ চা চামচ, জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, টক দই ২ টেবিল চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৫ টেবিল চামচ, দারচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৩টি, লবঙ্গ ৩টি, তেজপাতা ১টি, চিনি ১/২ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, গরম জল ৩ কাপ।
কীভাবে বানাবেন
মুরগির সঙ্গে নুন, হলুদ, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো ও টক দই মাখিয়ে ৩০ মিনিট রেখে দিন। আলু বড় টুকরো করে নুন-হলুদ মাখিয়ে সর্ষের তেলে লাল করে ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে শুকনো লঙ্কা, দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও তেজপাতা ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ বাটা দিয়ে ভালো করে কষিয়ে আদা ও রসুন বাটা দিন। এরপর টমেটো বাটা, জিরে ও ধনে গুঁড়ো দিয়ে মশলা থেকে তেল ছাড়া পর্যন্ত কষাতে থাকুন। মেরিনেট করা মুরগি দিয়ে মাঝারি আঁচে ১০–১২ মিনিট ভালো করে কষিয়ে নিন। ভাজা আলু, চিনি ও নুন দিয়ে মিশিয়ে গরম জল ঢেলে দিন। ঢেকে মাঝারি আঁচে মুরগি ও আলু সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। ঝোলটি পাতলা ও টকঝাল-মশলাদার রাখাই এই রান্নার বৈশিষ্ট্য। শেষে গরম মশলা ছড়িয়ে আরও ২ মিনিট ফুটিয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাত বা পিস পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
ট্যাংরা স্টাইল চিলি ফিশ

কী কী লাগবে
ভেটকি মাছ ৫০০ গ্রাম, পেঁয়াজ ১টি বড়, ক্যাপসিকাম ১টি, কাঁচালঙ্কা ৪–৫টি, রসুন কুচি ১ টেবিল চামচ, আদা কুচি ১ টেবিল চামচ, স্প্রিং অনিয়ন ২টি, কর্নফ্লাওয়ার ৪ টেবিল চামচ, ময়দা ২ টেবিল চামচ, সয়া সস দেড় টেবিল চামচ, চিলি সস ১ টেবিল চামচ, টমেটো সস ১ টেবিল চামচ, ভিনিগার ১ চা চামচ, চিনি আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো আধ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, জল ১ কাপ, Shalimar's Soyabean তেল ভাজার জন্য।

কীভাবে বানাবেন
প্রথমে ভেটকি মাছ কাঁটা ছাড়িয়ে মাঝারি টুকরো করে নিন। মাছের সঙ্গে নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো, ২ টেবিল চামচ কর্নফ্লাওয়ার ও ১ টেবিল চামচ ময়দা মিশিয়ে অল্প জল দিয়ে ঘন মিশ্রণ তৈরি করুন। ১০–১৫ মিনিট রেখে দিন। কড়াইয়ে তেল গরম করে মাছের টুকরোগুলি মাঝারি আঁচে সোনালি ও মুচমুচে করে ভেজে তুলে রাখুন। এবার অন্য কড়াইয়ে ২ টেবিল চামচ তেল গরম করে রসুন ও আদা কুচি দিয়ে দ্রুত ভাজুন। কাঁচালঙ্কা, পেঁয়াজ ও ক্যাপসিকাম দিয়ে উচ্চ আঁচে ২–৩ মিনিট নাড়াচাড়া করুন, যাতে সবজিগুলি সামান্য মুচমুচে থাকে। এবার সয়া সস, চিলি সস, টমেটো সস, ভিনিগার, চিনি ও সামান্য নুন দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন। ১ কাপ জলের মধ্যে বাকি ২ টেবিল চামচ কর্নফ্লাওয়ার গুলে কড়াইয়ে ঢেলে ক্রমাগত নাড়তে থাকুন। সস ঘন ও চকচকে হয়ে এলে ভাজা মাছ দিয়ে আলতো হাতে মিশিয়ে ১–২ মিনিট রান্না করুন। শেষে স্প্রিং অনিয়ন ছড়িয়ে নামিয়ে নিন।
আম কাসুন্দি কাতলা

কী কী লাগবে
কাতলা মাছ ৬ টুকরো, কাঁচা আম ১/৪ টি, কাসুন্দি ৩ টেবিল চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৪ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪টি চেরা, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কার গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, কালোজিরে ১/২ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১ চা চামচ, জল দেড় কাপ।

কীভাবে বানাবেন
কাতলা মাছ ধুয়ে নুন ও সামান্য হলুদ মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। কাঁচা আমের খোসা ছাড়িয়ে পাতলা করে কেটে রাখুন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে মাছের টুকরোগুলি দু’পিঠ হালকা লাল করে ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে কালোজিরে ও দু’টি কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিন। কাঁচা আমের টুকরোগুলি দিয়ে ২–৩ মিনিট ভাজুন। এবার হলুদ, লঙ্কার গুঁড়ো ও নুন দিয়ে অল্প জল দিয়ে রান্না করুন। আম কিছুটা নরম হয়ে এলে কাসুন্দি ও চিনি দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে নিন।
এবার ভাজা মাছের টুকরোগুলি ঝোলে দিয়ে বাকি কাঁচালঙ্কা ছড়িয়ে দিন। ঢেকে কম আঁচে ৫–৭ মিনিট রান্না করুন, যাতে মাছের মধ্যে আম-কাসুন্দির ঝাঁঝালো-মিষ্টি স্বাদ ঢুকে যায়। ঝোল খুব বেশি ঘন করবেন না। শেষে উপর থেকে ১ চা চামচ কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে আম কাসুন্দি কাতলা পরিবেশন করুন।
বরিশালি ইলিশ

কী কী লাগবে
ইলিশ মাছ ৪ টুকরো, সর্ষে বাটা ২ টেবিল চামচ, পোস্ত বাটা দেড় টেবিল চামচ, নারকেল বাটা ১ টেবিল চামচ, টকদই ১ টেবিল চামচ (ফেটানো), Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা-চামচ, Shalimar's Chef Spices লাল লঙ্কার গুঁড়ো আধ চা-চামচ, কালোজিরে আধ চা-চামচ, কাঁচালঙ্কা ৫টি (চেরা), লবণ স্বাদমতো, জল আধ কাপ।

কীভাবে বানাবেন
ইলিশ মাছ ধুয়ে আধ চা-চামচ হলুদ ও সামান্য লবণ মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। একটি পাত্রে সর্ষে বাটা, পোস্ত বাটা, নারকেল বাটা, ফেটানো দই, বাকি হলুদ, লাল লঙ্কার গুঁড়ো, লবণ এবং সামান্য জল মিশিয়ে মসৃণ মিশ্রণ তৈরি করুন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে মাছের টুকরোগুলো হালকা ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে তৈরি মশলার মিশ্রণ ঢেলে ৩–৪ মিনিট অল্প আঁচে কষিয়ে নিন। এরপর প্রয়োজনমতো জল দিয়ে ফুটে উঠলে ভাজা ইলিশ মাছ ও চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে ঢেকে ৫–৬ মিনিট রান্না করুন। ঝোল মাখা-মাখা হয়ে তেল ওপরে ভেসে উঠলে নামিয়ে নিন। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
দই মুরগি

কী কী লাগবে
মুরগি ৭৫০ গ্রাম, টক দই ১ কাপ, পেঁয়াজ ৩টি পাতলা করে কাটা, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৪টি চেরা, কাজুবাদাম বাটা ২ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কার গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো আধ চা চামচ, দারচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৩টি, লবঙ্গ ৩টি, তেজপাতা ১টি, চিনি ১ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, গরম জল ১ কাপ।
কীভাবে বানাবেন
মুরগির সঙ্গে আধ কাপ দই, নুন, হলুদ ও লঙ্কার গুঁড়ো মাখিয়ে ৩০ মিনিট রেখে দিন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল ও ঘি গরম করে দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ ও তেজপাতা ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ দিয়ে হালকা সোনালি করে ভাজুন। আদা ও রসুন বাটা দিয়ে কাঁচা গন্ধ চলে যাওয়া পর্যন্ত কষিয়ে নিন। এবার মেরিনেট করা মুরগি দিয়ে মাঝারি আঁচে ১০–১২ মিনিট ভালো করে কষান। ধনে ও জিরে গুঁড়ো দিয়ে অল্প জল ছিটিয়ে আরও কিছুক্ষণ রান্না করুন। কাজুবাদাম বাটা ও বাকি দই সামান্য ফেটিয়ে নিয়ে কড়াইয়ে দিন। দই দেওয়ার সময় আঁচ একেবারে কম রাখবেন, যাতে দই না কেটে যায়।
ভালোভাবে মিশিয়ে গরম জল, নুন, চিনি ও কাঁচালঙ্কা দিয়ে ঢেকে ১২–১৫ মিনিট রান্না করুন। মুরগি সেদ্ধ হয়ে ঝোল ঘন ও মসৃণ হলে গরম মশলা ছড়িয়ে আরও ২ মিনিট দমে রেখে নামিয়ে নিন। উপর থেকে সামান্য ঘি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন। গরম ভাত, পোলাও, রুটি বা পরোটার সঙ্গে দই মুরগি দারুণ মানায়।
মাটন কষা

কী কী লাগবে
খাসির মাংস ৭৫০ গ্রাম, আলু ৩টি, পেঁয়াজ ৩টি কুচি, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, রসুন বাটা দেড় টেবিল চামচ, টকদই আধ কাপ, টমেটো ১টি কুচি, কাঁচালঙ্কা ৪টি চেরা, শুকনো লঙ্কা ২টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কার গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো ১ চা চামচ, দারচিনি ২ টুকরো, এলাচ ৪টি, লবঙ্গ ৪টি, তেজপাতা ২টি, গোলমরিচ ৬টি, চিনি আধ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৬ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, গরম জল ২ কাপ।
কীভাবে বানাবেন
মাটন ভালো করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে টক দই, ১ চা চামচ আদা বাটা, ১ চা চামচ রসুন বাটা, হলুদ, সামান্য লঙ্কার গুঁড়ো ও নুন দিয়ে মাখিয়ে অন্তত ১ ঘণ্টা রেখে দিন। আলু বড় টুকরো করে নুন-হলুদ মাখিয়ে সর্ষের তেলে লাল করে ভেজে তুলে রাখুন। কড়াইয়ে বাকি সর্ষের তেল গরম করে দারচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, তেজপাতা, গোলমরিচ ও শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দিন। পেঁয়াজ দিয়ে ধীরে ধীরে গাঢ় সোনালি করে ভাজুন। এবার বাকি আদা-রসুন বাটা দিয়ে ভালো করে কষিয়ে টমেটো দিন। টমেটো নরম হলে লঙ্কার গুঁড়ো, জিরে ও ধনে গুঁড়ো দিয়ে অল্প জল ছিটিয়ে মশলা থেকে তেল ছাড়া পর্যন্ত কষাতে থাকুন। মেরিনেট করা মাটন দিয়ে মাঝারি আঁচে ১৫–২০ মিনিট ধৈর্য ধরে কষাতে হবে। মাংস থেকে জল বেরিয়ে গেলে আঁচ কমিয়ে আবার কষান। মশলা মাংসের গায়ে ভালোভাবে লেগে তেল ছাড়লে ভাজা আলু, কাঁচালঙ্কা ও চিনি দিয়ে মিশিয়ে নিন। এবার অল্প অল্প করে গরম জল দিয়ে ঢেকে কম আঁচে রান্না করুন। মাটন নরম হতে প্রায় ৪৫–৬০ মিনিট লাগতে পারে। মাংস সেদ্ধ হয়ে গেলে ঢাকনা খুলে আঁচ বাড়িয়ে অতিরিক্ত জল শুকিয়ে গাঢ়, তেল-ছাড়া কষা মশলা তৈরি করুন। শেষে গরম মশলা ছড়িয়ে আরও ২–৩ মিনিট দমে রেখে নামিয়ে নিন। গরম ভাত, লুচি, পরোটা বা বাসন্তী পোলাওয়ের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
রাখীর উপহারে বাজেটের সঙ্গে থাকুক ভালোবাসার ছোঁয়া
নিজস্ব প্রতিনিধি
রাখী মানেই শুধু হাতে রঙিন সুতো বাঁধা নয়, রাখী মানে শৈশবের স্মৃতি, খুনসুটি, অভিমান, নির্ভরতা আর ভালোবাসার এক অদৃশ্য বন্ধনকে আরও একবার নতুন করে উদ্যাপন করা। ভাই-বোনের এই বিশেষ দিনে উপহারেরও থাকে আলাদা গুরুত্ব। উপহার যত দামি হবে, ভালোবাসা তত বেশি—এমন নয়। বরং প্রিয় মানুষটির পছন্দ, প্রয়োজন, স্বভাব এবং সম্পর্কের স্মৃতিকে মনে রেখে বেছে নেওয়া একটি ছোট্ট উপহারও হয়ে উঠতে পারে অমূল্য। তাই রাখীর উপহার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বাজেটের মধ্যে থেকে এমন কিছু খুঁজে নেওয়া, যা উপহার গ্রহণকারীর মুখে সত্যিকারের হাসি ফুটিয়ে তুলবে।
বর্তমান সময়ে উপহারের বাজার এতটাই বৈচিত্র্যময় যে অল্প বাজেটেও সুন্দর এবং অর্থবহ উপহার পাওয়া যায়। আবার একটু বেশি খরচ করতে চাইলে ব্যবহারিক জিনিস থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত স্মৃতিবাহী উপহার, সাজসজ্জার সামগ্রী, প্রযুক্তিপণ্য কিংবা পোশাক—সবই বেছে নেওয়া সম্ভব। শুধু দরকার একটু ভাবনা এবং নিজের প্রিয়জনকে বোঝার চেষ্টা। রাখীর উপহার তাই মূলত দামের নয়, যত্নের গল্প।
যাঁদের বাজেট খুব বেশি নয়, তাঁদের জন্য পাঁচশো টাকার মধ্যে উপহার বেছে নেওয়ার সুযোগও কম নয়। এই বাজেটে সুন্দর একটি মগ, পছন্দের নকশার জলপাত্র, ছোট্ট সুগন্ধি, চাবির রিং, মানিব্যাগ, ছোট্ট গাছ, ডায়েরি কিংবা কলমের সুন্দর সেট দেওয়া যেতে পারে। ভাই যদি বই পড়তে ভালোবাসেন, তাঁর পছন্দের লেখকের একটি বই হতে পারে দারুণ উপহার। বোনের পছন্দ যদি লেখালেখি বা আঁকাআঁকি হয়, তবে সুন্দর একটি ডায়েরি, স্কেচবুক বা রঙের বাক্সও হতে পারে যত্নের পরিচয়। এই ধরনের উপহারের সঙ্গে নিজের হাতে লেখা একটি ছোট্ট চিঠি বা শুভেচ্ছাবার্তা যোগ করলে তার মূল্য আরও বেড়ে যায়।
পাঁচশো থেকে এক হাজার টাকার মধ্যে বাজেট হলে উপহারের পরিধি আরও খানিকটা বাড়ে। এই বাজেটে ভালো মানের সুগন্ধি, প্রসাধনসামগ্রী, চামড়ার মানিব্যাগ, ছোট ব্যাগ, বইয়ের সংগ্রহ, ঘড়ি, গৃহসজ্জার সামগ্রী বা ব্যক্তিগত ব্যবহার্য নানা জিনিস বেছে নেওয়া যায়। ভাই যদি কর্মজীবী হন, তাঁর জন্য একটি সুন্দর কলম, কার্ড রাখার বাক্স, অফিসে ব্যবহারের সামগ্রী কিংবা পরিপাটি একটি মানিব্যাগ উপযোগী হতে পারে। অন্যদিকে বোনের জন্য সুন্দর ওড়না, ছোট ব্যাগ, প্রসাধনসামগ্রী বা পছন্দের বই দেওয়া যেতে পারে। এই বাজেটে উপহারের ক্ষেত্রে রুচি এবং ব্যবহারিকতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা সহজ।
এক হাজার থেকে দুই হাজার টাকার বাজেট হলে উপহারকে আরও ব্যক্তিগত করে তোলা যায়। ভাইয়ের জন্য পছন্দের পোশাক, সুন্দর ঘড়ি, মানসম্মত সুগন্ধি, বইয়ের বিশেষ সংস্করণ, কাজের ব্যাগ কিংবা দৈনন্দিন ব্যবহারের কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস বেছে নেওয়া যেতে পারে। বোনের জন্য শাড়ি, কুর্তি, পোশাক, ব্যাগ, প্রসাধনসামগ্রী অথবা গয়নার ছোট্ট কোনো উপহার হতে পারে যথার্থ। তবে পোশাক বা সাজসজ্জার জিনিস কেনার আগে তাঁর পছন্দের রং, নকশা এবং ব্যবহারিক অভ্যাস সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। শুধু নিজের পছন্দে কেনা উপহার অনেক সময় যতটা সুন্দর মনে হয়, ব্যবহারকারীর কাছে ততটা পছন্দের নাও হতে পারে।
দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার বাজেট হলে একটু বিশেষ ধরনের উপহারের কথা ভাবা যায়। ভাই বা বোনের শখকে কেন্দ্র করে উপহার বেছে নেওয়া এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত। কেউ যদি ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাঁর জন্য আলোকচিত্রের সরঞ্জাম বা আনুষঙ্গিক সামগ্রী দেওয়া যেতে পারে। গান শোনার অভ্যাস থাকলে ভালো মানের শ্রবণযন্ত্র বা সঙ্গীতসংক্রান্ত কোনো উপহার হতে পারে আকর্ষণীয়। বইপ্রেমীর জন্য একটি সুন্দর বইয়ের সংগ্রহ, ভ্রমণপ্রিয় মানুষের জন্য ভ্রমণের ব্যাগ, আর রান্না করতে ভালোবাসেন এমন কারও জন্য রান্নাঘরের প্রয়োজনীয় কোনো বিশেষ সামগ্রী দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ এই বাজেটে উপহারকে ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগ অনেক বেশি।
পাঁচ হাজার টাকা বা তার বেশি বাজেট থাকলে উপহারটি আরও স্মরণীয় করে তোলার চেষ্টা করা যায়। ভালো মানের ঘড়ি, বিশেষ পোশাক, মূল্যবান ধাতুর গয়না, পছন্দের কোনো প্রযুক্তিপণ্য, ভ্রমণের ব্যবস্থা কিংবা দীর্ঘদিনের কোনো ইচ্ছা পূরণ করার মতো উপহার দেওয়া যেতে পারে। তবে দামি উপহার দেওয়ার সময়ও মনে রাখা দরকার, শুধু মূল্য বেশি হলেই উপহার বিশেষ হয়ে ওঠে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে ভাই বা বোন যে জিনিসটি কিনতে চাইছেন কিন্তু কোনো কারণে কিনে উঠতে পারেননি, সেটি উপহার হিসেবে দেওয়া অনেক বেশি অর্থবহ হতে পারে।
আজকের দিনে ব্যক্তিগত স্মৃতিকে উপহার হিসেবে দেওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। পুরনো ছবি দিয়ে তৈরি অ্যালবাম, ছোটবেলার স্মৃতি নিয়ে সাজানো ছবির বই, একসঙ্গে কাটানো বিশেষ মুহূর্তের ছবি দিয়ে তৈরি ফ্রেম কিংবা স্মৃতির বাক্স—এসব উপহার খুব বেশি অর্থব্যয়ের নয়, কিন্তু আবেগের দিক থেকে অত্যন্ত মূল্যবান। ছোটবেলার একটি ছবি, স্কুলের কোনো পুরনো স্মৃতি, একসঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার মুহূর্ত কিংবা পরিবারের কোনো বিশেষ দিনের ছবি দিয়ে সাজানো উপহার রাখীর দিনে আলাদা আবেগ তৈরি করতে পারে। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া সম্পর্কের মধ্যে এই ধরনের উপহার মনে করিয়ে দেয়, কতটা পথ একসঙ্গে পেরিয়ে এসেছে দুই ভাই-বোন।
রাখীতে হাতে বানানো উপহারেরও বিশেষ আবেদন রয়েছে। নিজের হাতে তৈরি শুভেচ্ছাকার্ড, ছবি আঁকা, হাতে লেখা চিঠি, ছোট্ট স্মৃতির খাতা, হাতে সাজানো উপহারের বাক্স কিংবা নিজের হাতে বানানো কোনো খাবার—এসব উপহার খুব অল্প খরচে তৈরি করা সম্ভব। বরং এই ধরনের উপহারের মূল্য অনেক সময় বাজার থেকে কেনা দামি সামগ্রীর থেকেও বেশি হয়ে ওঠে। কারণ এতে থাকে নিজের সময়, শ্রম এবং অনুভূতি। ব্যস্ত জীবনে কারও জন্য নিজের হাতে কিছু তৈরি করে দেওয়া আসলে ভালোবাসারই অন্যরকম প্রকাশ।
খাবারও হতে পারে রাখীর দারুণ উপহার। ভাই বা বোনের প্রিয় মিষ্টি, চকোলেট, শুকনো ফল, বিশেষ কোনো খাবারের বাক্স কিংবা বাড়িতে তৈরি পছন্দের পদ দিয়ে সাজানো উপহার হতে পারে উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মানানসই। ছোটবেলার সেই রাখীর দিনের মতো যদি একসঙ্গে বসে প্রিয় খাবার খাওয়া যায়, তাহলে আলাদা কোনো দামি উপহারের প্রয়োজনও অনেক সময় থাকে না। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে খাওয়া, গল্প করা এবং পুরনো স্মৃতি মনে করা রাখীর আসল আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
উপহার বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বয়সের কথাও মাথায় রাখা দরকার। ছোট ভাই বা বোনের জন্য বই, আঁকার সামগ্রী, খেলনা, শিক্ষামূলক সামগ্রী কিংবা পছন্দের কোনো সৃজনশীল উপহার দেওয়া যেতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে তাঁদের শখ এবং বর্তমান আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়া ভালো। তরুণ প্রজন্মের জন্য পোশাক, ব্যাগ, বই, প্রযুক্তির আনুষঙ্গিক সামগ্রী বা ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিস উপযোগী হতে পারে। আবার বয়সে বড় ভাই-বোনের ক্ষেত্রে ব্যবহারিক এবং আরামদায়ক উপহার বেশি পছন্দের হতে পারে। বাবা-মায়ের মতো বড় ভাই বা দিদির জন্য উপহার বাছাই করলে তাঁদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
রাখীর উপহারে ব্যক্তিগত যত্নের ছোঁয়াও রাখা যায়। যিনি নিজের যত্ন নিতে ভালোবাসেন, তাঁর জন্য সুগন্ধি, ত্বক ও চুলের পরিচর্যার সামগ্রী, স্নানের উপকরণ বা আরামদায়ক পোশাক বেছে নেওয়া যেতে পারে। আবার যিনি কাজের চাপে নিজের জন্য সময় পান না, তাঁর জন্য এমন কিছু দেওয়া যায় যা তাঁকে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ করে দেবে। প্রিয় বই, পছন্দের গান, একটি সুন্দর কাপড়, আরামদায়ক বালিশ কিংবা ছোট্ট ঘরসজ্জার সামগ্রী—উপহারটির মধ্যে যেন থাকে, “তোমার যত্নের কথাও আমি ভাবি।”
অনেকেই রাখীর উপহার কেনার সময় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। ফলে তাড়াহুড়ো করে এমন কিছু কিনে ফেলেন, যা হয়তো প্রিয়জনের খুব একটা প্রয়োজন নেই। তাই আগে থেকেই বাজেট ঠিক করে নেওয়া ভালো। মোট কত টাকা খরচ করা হবে, তার একটি সীমা নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী কয়েকটি বিকল্প দেখা উচিত। একই সঙ্গে উপহারের সঙ্গে রাখী, মিষ্টি এবং শুভেচ্ছার খরচও হিসাবের মধ্যে রাখা দরকার। বাজেট সীমিত হলে উপহারের দাম কমিয়ে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত কোনো স্মৃতি বা হাতে লেখা বার্তা যোগ করা যেতে পারে।
অনলাইনে কেনাকাটার সুযোগ বাড়ার ফলে উপহার বাছাই এখন অনেক সহজ হয়েছে। কিন্তু অনলাইনে কেনার সময় পণ্যের গুণমান, বিক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা, ফেরত দেওয়ার নিয়ম এবং পৌঁছানোর সম্ভাব্য সময় দেখে নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে উৎসবের সময় শেষ মুহূর্তে অর্ডার করলে দেরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই রাখীর কয়েক দিন আগেই উপহার কেনা ভালো। দোকান থেকে কিনলেও একই কথা প্রযোজ্য। ভিড়ের মধ্যে তাড়াহুড়ো করে কেনার বদলে আগে থেকেই পছন্দের জিনিস ঠিক করে রাখলে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হয়।
উপহার মোড়ানোর ক্ষেত্রেও একটু সৃজনশীলতা দেখানো যায়। সাধারণ মোড়কের বদলে পরিবেশবান্ধব কাগজ, কাপড় বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য বাক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। উপহারের সঙ্গে একটি ছোট্ট কার্ডে নিজের হাতে কয়েকটি কথা লিখে দেওয়া যেতে পারে। খুব বড় কোনো বক্তব্যের দরকার নেই। ছোটবেলার কোনো মজার ঘটনা, প্রিয়জনের কোনো বিশেষ গুণ অথবা শুধু “সবসময় পাশে থেকো”—এই কয়েকটি শব্দও উপহারকে অন্যরকম করে তুলতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রাখীর উপহার যেন প্রতিযোগিতার বিষয় না হয়ে ওঠে। কে কত দামি উপহার দিলেন, কার উপহার কত বড়, কে কত টাকা খরচ করলেন—এসবের মধ্যে রাখীর মূল অনুভূতিটা যেন হারিয়ে না যায়। ভাই-বোনের সম্পর্কের সৌন্দর্য আসলে অর্থমূল্যে মাপা যায় না। কখনও পাঁচশো টাকার একটি বই, কখনও একশো টাকার একটি হাতে লেখা কার্ড, আবার কখনও শুধু একসঙ্গে কাটানো কয়েক ঘণ্টাই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় উপহার।
আজকের ব্যস্ত জীবনে ভাই-বোনের দেখা হওয়া, একসঙ্গে বসে কথা বলা, পুরনো দিনের গল্প করা কিংবা শৈশবের সেই নির্ভেজাল হাসিটুকু ফিরিয়ে আনা নিজেই এক বিরাট প্রাপ্তি। তাই রাখীতে উপহার বেছে নেওয়ার সময় বাজেট অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হল সম্পর্কের গভীরতা। অল্প বাজেটের উপহারও যদি প্রিয়জনের কথা ভেবে বেছে নেওয়া হয়, তবে সেটিই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে দামি স্মৃতি।
রাখীর উপহার তাই হতে পারে পাঁচশো টাকার মধ্যে ছোট্ট কোনো প্রয়োজনীয় জিনিস, এক হাজার টাকার মধ্যে পছন্দের বই বা পোশাক, দুই হাজার টাকায় বিশেষ কোনো সামগ্রী, পাঁচ হাজার টাকায় শখের উপহার, কিংবা তারও বেশি বাজেটে বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত কোনো জিনিস। আবার বাজেট একেবারেই না থাকলেও ভালোবাসার অভাব হয় না। নিজের হাতে বানানো কার্ড, একটি পুরনো ছবি, প্রিয় খাবার আর কয়েক ঘণ্টা একসঙ্গে থাকা—এসবের মূল্য কোনো বাজারে নির্ধারণ করা যায় না।
শেষ পর্যন্ত রাখীর উপহারের আসল সৌন্দর্য তার দামে নয়, তার ভাবনায়। উপহারটি হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্তে যেন প্রিয় ভাই বা বোনের মনে হয়—“আমাকে মনে রেখে, আমার কথা ভেবেই এই জিনিসটি বেছে নেওয়া হয়েছে।” সেই অনুভূতিই রাখীর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কারণ রাখীর সুতো হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে পুরনো হয়ে যায়, উপহারের মোড়ক খুলে ফেলা হয়, কিন্তু ভালোবাসা, যত্ন আর একসঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো থেকে যায় বহুদিন। আর সেই কারণেই বাজেট যতই হোক না কেন, রাখীর সেরা উপহার শেষ পর্যন্ত একটাই—ভাই-বোনের অটুট ভালোবাসা ও পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি।
রবিবারের গল্প: অদৃশ্য ত্রিকোণ
আবীর গুপ্ত
(এক)
প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর রাজ বাড়িতে বসে অ্যালেস্টেয়ার ম্যাকলিনের একটা উপন্যাস “নাইট উইদাউট এন্ড” পড়ছিল, স্মার্টফোনটা বেজে উঠল। সময় সকাল দশটা। ফোনটা ধরতেই উল্টোদিক থেকে একজন মহিলার উত্তেজিত গলা শুনতে পেল –
— সকালে বেডরুমে আমার স্বামীর ডেডবডি পাওয়া গেছে। পুলিশের সন্দেহ এটা খুন। আপনি যত তাড়াতাড়ি পারেন চলে আসুন।
— সে-যাচ্ছি, আপনি কে কথা বলছেন? কোথা থেকে বলছেন? এগুলো না জানালে যাব কীভাবে?
— সরি, আসলে মাথার ঠিক নেই। আমি শর্মিলা রায়, যাদবপুর সেন্ট্রাল রোড থেকে কথা বলছি। আমার ঠিকানা হল —
রাজ ঠিকানাটা লিখে নিয়ে বই বন্ধ করে উঠে পড়ল। প্রায় এক মাস বাদে হাতে কেস এল – খুনের কেস। দেখা যাক কী হয়।
ঠিকানা খুঁজে বাড়িতে পৌঁছে অবাক হয়ে গেল। টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পাশে বিশাল কম্পাউন্ডে ঘেরা এই বাড়িটাকে যাতায়াতের পথে কতবার দেখেছে, প্রতিবারই সতৃষ্ণ নয়নে দেখেছে আর ভেবেছে – এরকম একটা বাড়ি যদি ওদের হত। গেটের কাছে মানুষের ভিড়। ঠেলে ভিতরে ঢুকতে যেতেই একজন পুলিশকর্মী আটকালো, নিজের পরিচয় দেওয়া সত্ত্বেও ভিতরে ঢুকতে দিল না। রাজের অনুরোধে ভিতর থেকে যাদবপুর থানার ওসিকে ডেকে নিয়ে এল। ওসি সুশান্ত তালুকদার রাজের অত্যন্ত পরিচিত এবং বহু কেসে রাজের সহযোগিতা পেয়েছেন। রাজ ওকে জানাল শর্মিলা রায়ের অনুরোধে ও এই কেসে তদন্ত করতে এসেছে। উনি রাজকে নিয়ে বাড়ির একতলার একটি ঘরে ঢুকে জানালেন, এই ঘরেই শর্মিলা রায়ের স্বামী শান্তনু রায়ের ডেডবডি পাওয়া গেছে। অস্বাভাবিক মৃত্যু – তাই বডি পোস্টমর্টেমের জন্য পাঠানো হচ্ছে। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের থেকে এসে ফিঙ্গারপ্রিন্ট থেকে শুরু করে যা যা ওদের করণীয় সব করেছে। ওরা চলেও গেছে। ফটোগ্রাফারের ছবি তোলাও হয়ে গেছে। তাই, এখন রাজ ডেডবডিতে হাত দিয়ে দেখতে পারে, কোন অসুবিধা নেই।
রাজ তালুকদারবাবুর কথা শুনতে শুনতে ঘরটা খুঁটিয়ে দেখছিল। এই ঘরটা ছোটখাটো একটা লাইব্রেরি। মেঝে থেকে ছাদ অবধি আলমারি আর তাতে বই ঠাসা। ঘরটা বিশাল বড়ো হওয়ায় মাঝে বড়ো রাইটিং টেবিল, তাতে রাখা ল্যাপটপ, প্রিন্টার আর বই এবং দুপাশে চেয়ার থাকা সত্ত্বেও জায়গার অভাব আছে বলে মনে হচ্ছে না। রাইটিং টেবিলের পিছনে একটা রিভলভিং চেয়ারে মিস্টার শান্তনু রায়ের ডেডবডিটা রয়েছে। মাথাটা বিসদৃশভাবে সামনের টেবিলের উপর ঝুঁকে পড়েছে। ভদ্রলোকের বয়স বত্রিশ-তেত্রিশ বছর হবে। ডান হাতে একটা কাপ ধরা। হাতটা টেবিলের উপর রাখা। রাজ খুঁটিয়ে ডেডবডি দেখতে দেখতে এগিয়ে গেল। কাপটা দু-আঙুলে ধরে তুলে দেখল। ভিতরে অল্প একটু লালচে কিছু লেগে আছে। দ্রুত টেবিলের ওপর দেখে প্রিন্টারের পাশ থেকে একটা কাফ সিরাপের বোতল বার করে ভিতরের তরল পদার্থের রং দেখে নিল। দুহাতে মাথাটা তুলতে ওকে বেশ কষ্ট করতে হল। মুখের কাছে নাক নিয়ে গন্ধ শুঁকে বলল –
— দেখা হয়ে গেছে। আপনি পারমিশন দিলে শর্মিলা রায় আর বাড়ির বাকি লোকেদের সঙ্গে কথা বলব।
— কী বুঝলেন?
— রিগর মর্টিস শুরু হয়ে গেছে কারণ ঘাড়ের মাংসপেশি বেশ শক্ত। তাই মনে হয়, গতকাল রাতে রাত বারোটার আগে মৃত্যু হয়েছে। মুখে একটা মৃদু বাদাম তেলজাতীয় গন্ধ পেলাম। সম্ভবত সায়ানাইডজাতীয় বিষ। বাকিটা বলবে আপনাদের ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট। কে প্রথম মৃতদেহ আবিষ্কার করেন?
— দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। সকালে কাজের মেয়েটি চা দিতে এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে সাড়া না পেয়ে ম্যাডামকে ডাকে। তারপর, দরজা ভেঙে দেখা যায় এই অবস্থা। আপনাকে যিনি নিয়োগ করেছেন তার সঙ্গে কথা বলবেন তো? চলুন, যাওয়া যাক।
লাইব্রেরির দরজার উপর একটা হরিণের মাথা ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। বারবার করে ওটাই দেখতে দেখতে ঘর থেকে বেরোল।
(দুই)
দোতলায় একটা বিশাল ড্রইংরুম। একজন ২৮-২৯ বছর বয়সি মহিলা সোফার একদিকে বসে আছেন। একজন পুলিশকর্মী তাঁর বয়ান লিখে নিচ্ছেন। ভদ্রমহিলার চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। রাজদের দেখে হঠাৎ একটু জোরে কেঁদে উঠে বললেন –
— আমার স্বামীকে যে খুন করেছে তাকে প্লিজ ধরে দিন। ওঁকে ছাড়া কীভাবে বাঁচব জানি না।
রাজ এগিয়ে গিয়ে দুহাত জড়ো করে নমস্কার করে বলল –
— আমি রাজ। আপনি আমাকে আপনার স্বামীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তের ভার দিয়েছেন তাই এসেছি। ডেডবডি দেখা হয়ে গেছে। এখন আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করব।
— আমি আপনাকে তদন্তের ভার দিয়েছি! কই না তো। আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে।
— আপনি আমাকে আজ সকাল দশটা নাগাদ, সম্ভবত আপনার বাড়ির ল্যান্ডলাইন নম্বর থেকে, ফোন করেননি?
— না। আমাদের ল্যান্ডলাইনটা তো গতকাল রাত থেকে খারাপ হয়ে আছে। আর সকাল দশটা নাগাদ আমি এই ঘরে ওসি সাহেবের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম, বিশ্বাস না হয় ওঁকেই জিজ্ঞাসা করুন।
রাজ তালুকদারবাবুর দিকে তাকাতেই উনি সমর্থন করে বললেন –
— উনি ঠিকই বলেছেন। মোটামুটি নটা পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশে আমি ওঁর স্টেটমেন্ট নেওয়া শুরু করি। সাড়ে দশটা অবধি ছিলাম। আপনি এসেছেন নিচ থেকে এসে বলাতে আমি অধীনস্থ অফিসারকে দায়িত্ব দিয়ে নিচে আপনার সঙ্গে কথা বলতে যাই।
রাজ নিজের স্মার্টফোনটা খুলে কললিস্টের ইনকামিং নম্বর বার করে তালুকদারবাবুকে দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল –
— নম্বরটা দেখে মনে হচ্ছে যাদবপুর অঞ্চলের, তাই তো? নম্বরটা কোন বাড়ি থেকে করা হয়েছে বলা যাবে? পাশেই তো টেলিফোন এক্সচেঞ্জ।
তালুকদারবাবু ফোন তুলে কাকে ফোন করে নম্বরটা বললেন। তারপর, ফোনটা কানে ধরে মিনিট তিনেক থাকার পর “হ্যালো” বলে আবার চুপ করে গেলেন। উল্টো দিকের কথাগুলো মন দিয়ে শুনে, ফোনটা কেটে দিয়ে হঠাৎ হেসে ফেললেন। বললেন –
— আগে লোকাল কলের জন্য কলকাতা টেলিফোন এক্সচেঞ্জ জায়গায় জায়গায় ফোন রাখত, এক টাকার কয়েন ঢুকিয়ে ফোন করতে হত। এখন সেগুলো মোবাইল ফোনের দৌলতে উঠে গেলেও দু-এক জায়গায় এখনও রয়েছে। পাশে যাদবপুর টেলিফোন এক্সচেঞ্জেও এরকম দুটি ফোন আছে, তার একটি থেকে ফোনটা করা হয়েছে।
রাজ একটু চিন্তিত হয়ে বলল –
— কেউ একজন, এবং তিনি মহিলা, আমাকে এই কেসে জড়াতে চাইছেন। তাই, শর্মিলা রায়ের নাম করে ফোন করেছিলেন। তিনি জেনে বুঝেই ফোনটা করেছেন। তিনি জানতেন, শর্মিলা রায় ফোন করেননি এটা সহজেই জেনে যাব এবং আমি ইন্টারেস্টেড হয়ে কেসটা হাতে নেব। অর্থাৎ, উনি চাইছেন, যদি এটা খুন হয়, তাহলে খুনি ধরা পড়ুক। ইন্টারেস্টিং।
(তিন)
রাজ আর শর্মিলা রায় বসে আছেন ড্রয়িংরুমের সোফায়। ঘরে তালুকদারবাবুও আছেন। ডেডবডি পোস্টমর্টেমে পাঠানো হয়েছে। তালুকদারবাবু জানিয়েছেন পোস্টমর্টেম আর ফরেনসিক রিপোর্ট পরদিন বিকালে পাওয়া যাবে। তালুকদারবাবু রাজকে এই কেসে তদন্ত চালিয়ে যেতে অনুরোধ করায় রাজ ঠিক করেছে প্রথমে শর্মিলা রায়ের সঙ্গে কথা বলে তারপর বাকিদের সঙ্গে কথা বলবে।
রাজ শর্মিলা রায়কে জিজ্ঞাসা করল –
— আপনার স্বামী শান্তনু রায় কী করতেন?
— উনি বিখ্যাত মানুষ ছিলেন। লেখক, কবি, ক্রিটিক এবং সিনেমা পরিচালক। ওঁর ডিরেকশনে বহু সিনেমা হয়েছে যার মধ্যে কয়েকটি তো হিট সিনেমা। আপনি ওঁর নাম শোনেননি!
— আমি সিনেমা জগতের খবর রাখি না। সিনেমা পরিচালক হিসাবে ওঁর শেষ কোন সিনেমা রিলিজ করেছে?
— কেন নিউজপেপারে দেখেননি? ওর শেষ সিনেমা ক্ষমা। এখনও হলে চলছে। নতুন নায়ক-নায়িকা নিয়ে সিনেমা করতে পছন্দ করলেও এই সিনেমায় অবশ্য ওঁরই আবিষ্কার ওঁর খুব পছন্দের নায়িকাকে নিয়েছেন।
— কে সে?
— কাবেরী সেন। অসাধারণ অভিনেত্রী।
— ওঁর লাইব্রেরি কাম স্টাডি রুমে প্রচুর বই – প্রচুর পড়াশোনা করতেন?
— হ্যাঁ, তা করতেন। প্রায় মাঝরাত অবধি লেখালেখি করতেন।
— আপনার সঙ্গে কেমন সম্পর্ক ছিল?
— খুব ভালো। উনি আদর্শ স্বামী ছিলেন।
— আপনিও কি অভিনয় জগতের সঙ্গে যুক্ত?
— আগে ছিলাম। ওঁর প্রথম সিনেমায় আমাকে সুযোগ দেন। তারপর, ঘনিষ্ঠতা হয়, আমরা বিয়ে করি। বিয়ের পর ওঁর ইচ্ছা ছিল না আমি অভিনয় করি, তাই ছেড়ে দিতে বাধ্য হই।
— খারাপ লাগে নি?
— তা লেগেছিল।
— আজ সকালে ঠিক কী কী ঘটেছিল যদি একটু খুলে বলেন।
— আমি সকাল ছটা নাগাদ ঘুম থেকে উঠি। কাজের মেয়ে নির্মলা আসে সাড়ে ছটা নাগাদ। ও আসার পর চা করে। চা নিয়ে সাতটার আগেই শান্তনুকে ডাকতে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিয়েও সাড়াশব্দ না পেয়ে আমায় ডাকে। আমি ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে দেখি এই অবস্থা। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে ফোন করি। এই হলো পুরো ঘটনা।
— ঘরের দরজায় ইয়েল লক ছাড়াও ভিতর থেকে ছিটকিনি লাগানো যায় দেখেছি। উনি ছিটকিনি লাগাতেন না?
— না। শুধু ইয়েল লক। কখনও তা লক করতেন, কখনও করতেন না।
— আপনাদের বেডরুমটা দেখানো যাবে?
— অবশ্যই। আমার বেডরুম দোতলায় আর শান্তনুরটা নিচে।
— আচ্ছা বুঝেছি। যদি অসুবিধা না থাকে দুটোই দেখতে চাই।
শান্তনু রায়ের বেডরুমটা ছোট, বাড়ি আর লাইব্রেরি কাম স্টাডিরুমের তুলনায় বেমানান। ঘরে ঢুকেই রাজ থমকে গেল কারণ মেঝে, চেয়ার, টেবিল সবকিছুর উপর একটা ধুলোর আস্তরণ। এমনকি বিছানার উপরেও ধুলো – অর্থাৎ বেশ কিছুদিন বা সপ্তাহ এই ঘরটিতে কেউ ঢোকেনি।
(চার)
রাজ পুরো ঘরটা প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে সার্চ করে ড্রেসিং টেবিলের উপর রাখা একটি ফটোফ্রেমে একজন মহিলার ছবি খুঁটিয়ে দেখল তারপর ফ্রেমটা নিয়ে ঘরের বাইরে এসে শর্মিলা রায়কে জিজ্ঞাসা করায় জানতে পারল এই মহিলাই অভিনেত্রী কাবেরী সেন। এর মধ্যে কাজের মেয়েটি অর্থাৎ নির্মলাকে পুলিশ ডেকে নিয়ে এসেছে। ও নির্মলার সঙ্গে গোপনে কথা বলতে চাইছিল তাই ওকে নিয়ে শান্তনু রায়ের বেডরুমে ঢুকে পড়ল। সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করল –
— তোমার দাদাবাবু এই বাড়িতে থাকতেন? নাকি থাকতেন না?
— না, সেভাবে থাকতেন না। আসলে মাঝে মাঝে আসতেন, লাইব্রেরিতে রাত এগারোটা সাড়ে এগারোটা অবধি থেকে চলে যেতেন। দু-এক সময় অবশ্য আরও বেশি রাত অবধি পড়ালেখা করলে রাতে থেকে ভোরে আটটা নাগাদ চলে যেতেন।
— ডিনার এখানেই করতেন?
— হ্যাঁ। আমিই রাত দশটা নাগাদ দিয়ে আসতাম।
— এলে কখন আসতেন?
— সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাড়ে সাতটা নাগাদ। স্টুডিও থেকে সোজা চলে আসতেন।
— গতকাল রাত দশটা নাগাদ ওঁর ডিনার দিয়ে এসেছিলে?
— হ্যাঁ। তারপর, সাড়ে দশটা নাগাদ খাবার খাওয়া হয়ে গেলে ফাঁকা থালা-বাটিগুলো নিয়ে এসে কিচেনে রেখে বাড়ি চলে যাই।
— তাহলে তুমিই শেষ ওঁকে দেখেছ?
— হ্যাঁ।
— গতকাল রাতের আগে শেষ কবে সারা রাত ছিলেন?
— তা, বেশ কয়েক দিন আগে, ১৪-১৫ দিন, না-না, আরও বেশি। সপ্তাহ তিনেক আগে এক রাতে ছিলেন।
— এই বাড়িতে না থাকলে কোথায় থাকতেন?
— কেন, টালিগঞ্জের ফ্ল্যাটে। কাবেরী দিদিমনির কাছে। ওই ফ্ল্যাটটা তো ওঁকেই থাকতে দিয়েছেন।
রাজ বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা উবের ধরে চলে গেল টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়ায়। সিনেমা পরিচালক সোমক রায় রাজের পূর্বপরিচিত। রাজকে খুবই স্নেহ করেন। কাবেরী সেন এবং শান্তনু রায় সম্বন্ধে অনেক তথ্য ওঁর কাছে পেল। কাবেরী সেনের ঠিকানা নিয়ে বেরিয়ে এল স্টুডিও চত্বর থেকে। একটা খটকা ওর মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল, শর্মিলা রায়ের বেডরুম সার্চ করতে করতে আলমারির মধ্যে একটা কন্ট্রাসেপটিভের অর্ধেক খাওয়া স্ট্রিপ দেখেছিল, পুরোনো, নাকি এখনও উনি খাচ্ছেন? স্ট্রেঞ্জ!
একটা দশতলা অ্যাপার্টমেন্টের আটতলায় কাবেরী সেন থাকেন। এটা আসলে শান্তনু রায়ের ফ্ল্যাট, কাবেরী সেনকে থাকতে দিয়েছিলেন। পরে বছরখানেক আগে, উনি নিজেও এসে থাকা শুরু করেছেন। অর্থাৎ, সবার মতে উনি লিভ টুগেদার করছেন। ফ্ল্যাটের দরজায় নেমপ্লেটে দুজনের নামই লেখা আছে। বেল টেপার পর যে কাবেরী সেনই দরজা খুলবেন এটা রাজ এক্সপেক্ট করে নি। কাবেরী সেনের চোখ-মুখ দেখে মনে হল কান্নাকাটি করছিলেন। রাজের যেটা আশ্চর্য লাগল সেটা হলো রাজের মনে হলো উনি যেন রাজকে এক্সপেক্ট করছিলেন! কারণ, রাজকে পরিচয় দিতে হল না, নিজেই দরজা খুলে রাজকে কোনও কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ড্রয়িংরুমে বসিয়ে রাজের মুখোমুখি বসে বললেন –
— বলুন, কী জানতে চান।
(পাঁচ)
ভদ্রমহিলা এতটা স্মার্ট, রাজের ধারণার বাইরে ছিল। সিনেমা অভিনেত্রীরা বোধ হয় এরকমই স্মার্ট হয়। রাজ একটু ভেবে কোনওরকম ভনিতা না করে সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করল –
— আজ সকাল দশটা নাগাদ যাদবপুর টেলিফোন এক্সচেঞ্জের পাবলিক টেলিফোন থেকে ফোনটা তো আপনিই করেছিলেন?
— হ্যাঁ।
— কেন?
— আমি শান্তনু রায়কে ভালোবাসি, ওঁর টাকা বা পরিচিতির জন্য নয়, ওঁর গুণের জন্য। আমাকে সিনেমায় সুযোগ দিয়েছে বলেও নয়। ওঁর স্ত্রী যে কতটা শয়তান আর মিথ্যাবাদী সেটা আমরা দুজনে যেমন জানতাম সেরকম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অনেকেও জানেন। শর্মিলা শান্তনুর লাইফটা শেষ করে দিয়েছে। ও শান্তনুকে বিয়ে করেছিল টাকা আর খ্যাতির লোভে। বিয়ের পরেও সিনেমায় শুটিংয়ের নাম করে সুজন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিল। শান্তনু জানতে পেরে শর্মিলার অভিনয় করা আটকে দেয়। তাতে সুজনের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এতে ও শান্তনুর উপর মানসিক নির্যাতন শুরু করে। শান্তনু বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে এখানে এসে ওঠে। হ্যাঁ, আমরা লিভ টুগেদার করছিলাম কারণ ডিভোর্স না হওয়া অবধি আমাকে বিয়ে করা ওঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। মাসখানেক আগে শর্মিলাকে উকিল ডিভোর্সের চিঠি পাঠায়। তারপর থেকে শর্মিলা পাগলের মতো হয়ে ওঠে। ও যা মেয়ে, যা খুশি করতে পারে।
— আপনি আমার ফোন করেছিলেন যাতে আমি শান্তনু রায়ের মৃত্যুর তদন্ত করি। কেন? আপনার কি ধারণা ওকে খুন করা হয়েছে?
— মৃত্যুটা রহস্যজনক তো বটেই। খুন করা হয়েছে কিনা, কে খুন করেছে – সেসব আপনারা বার করবেন।
— আপনি কখন এই দুঃসংবাদটা পেলেন? কে ফোন করেছিল?
— লাইব্রেরিতে দরজা খুলে ঢুকে ডেডবডি দেখে শর্মিলা যখন পুলিশকে ফোন করছিল তখন নির্মলা আমাকে ফোন করে জানায়।
— ওদের ল্যান্ডলাইন থেকে?
— না, নির্মলার একটা পার্সোনাল সেলফোন আছে, শান্তনু ওকে কিনে দিয়েছিল দরকারে যাতে ফোন করতে পারে তার জন্য।
— শান্তনু রায়ের মৃত্যুতে আপনার তো ক্ষতি হয়ে গেল?
— হ্যাঁ। আর্থিক ক্ষতি পূরণ হয়, কিন্তু মানসিক ক্ষতি?
রাজ কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ল। আবার স্টুডিও পাড়া। সুজন চট্টোপাধ্যায়কে পেল শুটিংয়ের ফ্লোরে। প্রায় ঘণ্টাখানেক বসার পর শুটিং শেষ করে সুজন এলেন। রাজ সোজাসুজি জিজ্ঞাসা করল –
— গতকাল রাতে আপনি শর্মিলা রায়ের সঙ্গে কটার সময় দেখা করতে গিয়েছিলেন?
সুজন চট্টোপাধ্যায় একটু থতমত খেয়ে সামলে নিয়ে বললেন –
— হ্যাঁ, রাত সাড়ে নটা নাগাদ গিয়েছিলাম। সারা রাত ওর ঘরে কাটিয়ে পরদিন মানে আজ সকাল ছটা নাগাদ বেরিয়ে যাই।
— এত সকালে কেন?
— নির্মলা এসে দেখলে বড্ড প্রবলেম ক্রিয়েট করে, তাই।
— আপনি গতকাল রাতে যখন এলেন তখনই তো দেখেছে?
— না, দেখে নি। দারোয়ান দেখেছে অবশ্য। আমি পিছন দিক দিয়ে জমাদারের সিঁড়ি দিয়ে সোজা ওর বেডরুমে ঢুকি। রোজই এরকম করি।
— আপনি কি জানেন, শান্তনু রায় ডিভোর্সের চিঠি পাঠিয়েছেন?
— হ্যাঁ জানি। ও যখন দশ মাস আগে প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ে, অ্যাবরশন করায়, তখনই ওকে বলেছিলাম ডিভোর্স চাইতে। ও শোনে নি। তারপর অবশ্য ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে।
রাজ এত নির্লজ্জ মানুষ দেখে নি। ফ্লোর থেকে বেরিয়ে এল।
(ছয়)
শান্তনু রায়ের বাড়ির দারোয়ান রাজকে ঢুকতে দেখে একটু হেসে জিজ্ঞাসা করল –
— উপরে যাবেন?
রাজ হেসে বলল –
— না, একটু পিছন দিকটা দেখে চলে যাব।
বাড়ির পিছনে জমাদারের সিঁড়িটা সিমেন্টের বাঁধানো সিঁড়ি এবং বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। পিছনে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে সবটা দেখল। সামনে এসে দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করল –
— গতকাল রাতে সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ বা তার আগে কে কে এসেছিলেন?
— স্যার, আমি সাড়ে ছটা থেকে সাড়ে সাতটা অবধি গেটে ছিলাম না।
— কেন?
— ম্যাডাম আমাকে বাজারে কয়েকটা জিনিস কিনতে পাঠিয়েছিলেন। আসলে সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো আছে তো।
— কোথায়?
— এই গেটের উপরে। কেউ জানে না, এমনকি ম্যাডামও নয়। বাবু মাসখানেক আগে লাগিয়েছিলেন।
— ওর ছবি কোথায় দেখা যাবে?
— উনি ওঁর মোবাইলে দেখতেন। বাবু আমাকে বলতে না করেছিলেন, তবুও বললাম। যদি ওঁর খুনি ধরা পড়ে। বড্ড ভালো মানুষ ছিলেন।
রাজ তালুকদারবাবুকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করল –
— ফরেনসিকের লোকেরা টেবিলের উপর রাখা কাফ সিরাপের বোতলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিয়েছেন? আপনার সলিসিটারের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে?
— হ্যাঁ। সলিসিটার ভদ্রলোক সব ডকুমেন্টসের কপি দিয়েছেন।
— কাফ সিরাপ কি কেমিক্যাল টেস্টে পাঠানো হয়েছে?
— আপনার কথামতো সকালেই পাঠিয়ে দিয়েছি। আগামীকাল রিপোর্ট পাব।
— শান্তনু রায়ের স্মার্টফোন আর ল্যাপটপ?
— পুলিশ স্টেশনে আছে। আমরা দেখেছি, কিছু পাইনি।
— আমি এখুনি যাচ্ছি থানায়। আপনি যদি একটু কাউকে বলে দেন। ওগুলো দেখতে চাই। আচ্ছা, যে চারজনের ফোন কল ডিটেলসের কথা বলেছিলাম, ওগুলো পেয়েছেন?
— হ্যাঁ।
— ঠিক আছে। মনে হচ্ছে আগামীকাল সন্ধ্যার সময় এই কেস সলভ করে দিতে পারব। একটু জট পাকানো প্রথমে মনে হলেও সোজা কেস।
রাজ থানায় পৌঁছে সোজা তালুকদারবাবুর চেম্বারে ঢুকল। উনি একজনকে চা আনতে বলে একটা ল্যাপটপ আর দুটো স্মার্টফোন রাজকে দিয়ে বললেন –
— দেখুন, যদি কোনও সূত্র পান। আমরা কিছু পাইনি।
রাজ প্রথমে ফোন কল ডিটেলসটা নিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। এতে গত তিন দিনের কল ডিটেলস আছে। চারজনের মধ্যে তিনজনের ফোনে পরস্পরের সঙ্গে কথা হত। গতকাল বিকাল থেকে রাত বারোটার পরেও ফোনে কথা হয়েছে। এমনকি একবার কনফারেন্স কলও হয়েছে। চতুর্থ জনের সঙ্গে এই তিনজনের মধ্যে একজনের সঙ্গে রেগুলার কথা হয়েছে কিন্তু গতকাল রাত আটটার পর কোনও রকম কথা হয় নি। রাজ পড়তে পড়তে মুচকি হাসছিল। ওর সন্দেহ তাহলে সঠিক। এবারে ল্যাপটপ খুলল। রাজ নিজে কম্পিউটারে বি.টেক. ইঞ্জিনিয়ার শুধু নয়, যাদবপুরের ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট অর্থাৎ গোল্ড মেডালিস্ট। ও কী খুঁজছে জানে, তাই দু-তিন মিনিটের মধ্যেই পেয়ে গেল। হার্ডডিস্কে সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ স্টোরড আছে। গতকাল বিকাল থেকে রাত দুটো অবধি দুটো ক্যামেরার ফুটেজ ভালো করে দেখল। মোক্ষম প্রমাণ হাতে এসে গেছে। এবারে ফরেনসিক আর পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেয়ে গেলেই কিস্তিমাত।
(সাত)
পরদিন রাজের অনুরোধে তালুকদারবাবু শান্তনু রায়ের বাড়িতেই একটা মিটিংয়ের ব্যবস্থা করেছেন। মিটিংয়ে উপস্থিত সদস্যরা হলেন শর্মিলা রায়, কাবেরী সেন, সুজন চট্টোপাধ্যায়, নির্মলা, দারোয়ান, তালুকদারবাবু এবং তাঁর সঙ্গে পাঁচ জন অস্ত্রধারী পুলিশকর্মী। এছাড়াও রাজের বিশেষ অনুরোধে মিটিংয়ে উপস্থিত হয়েছেন বিখ্যাত সিনেমা পরিচালক সোমক রায়। তালুকদারবাবু রাজকে অনুরোধ করলেন শুরু করার জন্য। রাজ সবাইকে একবার দেখে নিয়ে শুরু করল –
— আপনারা সম্ভবত শুনেছেন শান্তনু রায়ের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়, ওঁর পাকস্থলীতে পোস্টমর্টেম রিপোর্টে পটাশিয়াম সায়ানাইড পাওয়া গেছে। উনি কি আত্মহত্যা করেছেন? নাকি এটা খুন? আমাদের হাতে যা প্রমাণ এসেছে তাতে আমরা নিশ্চিত এটা খুন। এটা একটা প্ল্যান্ড মার্ডার। এই মার্ডারের প্ল্যান করা হয়েছিল বহু আগে। এবারে আসল প্রসঙ্গে আসি। শান্তনুবাবু বেশ কয়েকজন নতুন অভিনেত্রীকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন তার ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য। শর্মিলা দেবী, কাবেরী সেন ছাড়াও আরও হয়তো বেশ কয়েকজন আছেন। ফিল্মি দুনিয়ায় খোঁজ নিয়ে জানতে পারা গেছে কাবেরী সেন, শর্মিলা দেবী এবং আরও একজন অভিনয় জগতে প্রবেশের আগে অসম্ভব ভালো বন্ধু ছিলেন। তৃতীয়জনের নাম এই মুহূর্তে বলছি না, পরে দরকার মতো জানাব। শান্তনুবাবু শর্মিলা দেবীকে বিয়ে করলেন। বিয়ের বেশ কিছুদিন পর জানতে পারলেন শর্মিলা দেবীর অন্য একজন অভিনেতার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক আছে। সিনেমার শুটিংয়ের নাম করে বাইরে ওঁর সঙ্গে রাত কাটাচ্ছেন। এটা বন্ধ করার জন্য উনি শর্মিলা দেবীকে অভিনয় বন্ধ করতে বললেন, সঙ্গে এটাও জানালেন অভিনয় বন্ধ করে বাড়িতে না থাকলে উনি ওর সমস্ত সম্পত্তি অনাথ আশ্রমে দিয়ে যাবেন আর ওকে ডিভোর্সও করবেন।
শর্মিলা রায় রাজকে থামিয়ে বললেন –
— কী সব আজেবাজে আষাঢ়ে গল্প শোনাচ্ছেন! কোনও প্রমাণ আছে?
— হ্যাঁ আছে। শান্তনু রায়ের লেখা চিঠি যা তিনি পাঠিয়েছিলেন তরফদার সলিসিটার ফার্মকে। এই সলিসিটার ফার্ম থেকে আমরা ওঁর উইলও জোগাড় করেছি। বিয়ের পর প্রথমে উইল করে ওঁর স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি শর্মিলাকে দিয়ে গিয়েছিলেন। তারপর শর্মিলা রায়ের কাণ্ডকারখানায় বিরক্ত হয়ে যখন কাবেরী সেনের সঙ্গে লিভ টুগেদার শুরু করেন তখন আবার নতুন উইল করেন। এই উইলে ওঁর মৃত্যুর পর ওঁর সমস্ত সম্পত্তির অর্ধেক পাবে কাবেরী সেন আর বাকি অর্ধেক শর্মিলা রায়। যাই হোক, ওঁর মৃত্যুর ঘটনায় আসি। আগেই বলেছি এটা প্ল্যান্ড মার্ডার। দুপুরবেলায় শর্মিলা দেবী ফোন করেন কাবেরী সেনকে, সময় তখন ঠিক তিনটে পঁয়ত্রিশ। কাবেরী সেন ঠিক পাঁচটা পঞ্চাশে চলে আসেন এই বাড়িতে। বাইরে গেটের কাছে দারোয়ান রয়েছে দেখে ফোন করেন শর্মিলা দেবীকে। সময় তখন ছটা। শর্মিলা দেবী দারোয়ানকে বাজার থেকে জিনিস আনতে বলে গেট থেকে সরিয়ে দিলেন। দারোয়ান সাড়ে ছটা নাগাদ চলে গেল। ছটা সাইত্রিশ মিনিটে কাবেরী দেবী বাড়ির ভিতরে ঢুকে সোজা চলে গেলেন লাইব্রেরিতে। ঠিক ছটা ছেচল্লিশে উনি টেবিলের উপর রাখা কাফ সিরাপের বোতলের ঢাকনা খুলে ছ-ফোঁটা পটাশিয়াম সায়ানাইড ঢেলে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেলেন। ঘরের দরজার ডুপ্লিকেট চাবি সম্ভবত শর্মিলা দেবী বা তৃতীয় একজনের থেকে পেয়েছিলেন। এরপর, সাতটা বেজে দশ মিনিটে শান্তনুবাবু এলেন। নিজের লেখালেখির কাজ শুরু করলেন। ঠিক রাত দশটা তিন মিনিটে ওঁকে ডিনার দিয়ে নির্মলা চলে গেল। উনি ডিনার সেরে রাত দশটা বেজে চল্লিশে কাফ সিরাপের বোতল থেকে ১০ মিলিলিটার ছোট্ট মেজারমেন্টের কাপে নিয়ে সেটা টেবিলের উপর থাকা কাপে ঢেলে মেজারমেন্ট কাপটা ওষুধের বোতলের ঢাকনার উপর বসিয়ে বোতলটা টেবিলের কোনায় রাখলেন। হাতে ধরা কাপটা থেকে ওষুধটা খেলেন। পটাশিয়াম সায়ানাইড ভয়ঙ্কর বিষ, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মৃত্যু হয়। কাপ হাতে ধরা অবস্থাতেই মৃত্যু হল। সময় তখন দশটা বেয়াল্লিশ মিনিট। এরপর ঠিক এগারোটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে শর্মিলা দেবী একজন পুরুষ মানুষকে নিয়ে লাইব্রেরিতে ঢোকেন। ডেডবডি দেখে পুরুষ মানুষ ওঁকে দুহাতে জড়িয়ে ধরে আনন্দে চুমুও খান। তারপর, ওঁরা দুজনে দ্রুত কাফ সিরাপের বোতলটি সরিয়ে একই ব্র্যান্ডের অন্য একটি অর্ধেক খালি বোতল রেখে কাপড় দিয়ে চেয়ার, টেবিল থেকে শুরু করে সমস্ত কিছু ভালো করে মুছে দেন যাতে কোনও ফিঙ্গারপ্রিন্ট না পাওয়া যায়। এই কারণে ফরেনসিক রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। ওঁরা যখন ঘর থেকে বেরিয়ে যান তখন ঠিক রাত একটা বেজে পাঁচ মিনিট হয়েছে। এরপরের ঘটনা আমরা সবাই জানি।
(আট)
কাবেরী সেন এবং শর্মিলা রায় দুজনেই প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে বললেন –
— এসব কী যা-তা আষাঢ়ে গল্প করছেন! কী প্রমাণ আছে?
রাজ হেসে বলল –
— ম্যাডাম, আপনারা দুজন আমাকে এর মধ্যে ইনভলভ না করলেই পারতেন। মারাত্মক দুটো ভুলের মধ্যে এটা একটা। আর দ্বিতীয় ভুল, সমস্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট মুছে দেওয়া। এতে দরজার হাতলে শান্তনুবাবুর আঙুলের ছাপও মুছে গেছে, নেই।
দরজার বাইরে শব্দ, একজন বৃদ্ধ মানুষ ঘরে ঢুকলেন। রাজ সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল –
— উনি তরফদার সলিসিটার ফার্মের কর্ণধার মিস্টার কল্যাণ তরফদার। ওঁকে আমি আসতে বলেছিলাম। উনি বেশ কিছু এমন জিনিস এনেছেন যা ইন্টারেস্টিং। প্রথম উইল আর দ্বিতীয় উইলের কথা আগেই বলেছি। শান্তনুবাবুর মনে সম্ভবত কোনও সন্দেহ দেখা দিয়েছিল তাই কল্যাণবাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে কলকাতার একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে হায়ার করেন দুজনের গতিবিধির ওপর নজর রাখার জন্য। মাস দেড়েক আগে ওরা যে ছবি-সহ রিপোর্ট দেয় তা দেখে শান্তনুবাবুকে কল্যাণবাবু বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা গোপনে লাগাতে বলেন। একমাত্র দারোয়ান ছাড়া আর কেউ এটা জানতেন না। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট কল্যাণবাবুর সঙ্গেই আছে। দ্বিতীয় উইলের কথা আপনারা সবাই আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু, মাস দেড়েক আগে শান্তনুবাবু বুঝতে পারলেন ওঁকে মার্ডারের প্ল্যান করা হচ্ছে। তাই তড়িঘড়ি তৃতীয় একটি উইল করলেন। এই উইলে পরিষ্কার লেখা আছে তাঁর মৃত্যুর পর সমস্ত সম্পত্তি পাবে কলকাতার একটি অনাথ আশ্রম এবং দেখাশোনার ভার থাকবে কল্যাণবাবুর উপর। কী সুজনবাবু, এত প্ল্যান-ট্যান করে প্রথমে শর্মিলা দেবীকে পরে কাবেরী সেনকে কাজে লাগিয়েও শান্তনুবাবুর সম্পত্তির নাগাল পেলেন না! বেচারা সুজনবাবু। আপনি ভাবছেন, সমস্ত প্ল্যান, সব কিছুর পিছনে আপনি অথচ আপনার থেকেও চালাক একজন আছেন। দারোয়ানের গেটের এক কোনায় আর লাইব্রেরিতে দরজার উপর হরিণের মাথার চোখের মধ্যে বসানো লুকানো ক্যামেরায় সব কিছু ধরা আছে, যা সেভ করা আছে ওর ল্যাপটপে। তাই শাস্তি পাবেনই। শুধু, শেষ কথাটা শুনে যান। সব কিছুর পিছনে মাস্টার প্ল্যান আপনার নয়, যদিও সেরকমটাই আপনি ভাবেন। আসল হলেন কাবেরী সেন। আপনি প্রথমে ভেবেছিলেন শর্মিলাকে বিয়ে করে সব সম্পত্তি দখল করে তারপর ওকে সরিয়ে দেবেন। পরে কাবেরী সেনকে বিয়ে করবেন। কারণ উঁই তো আপনার আসল প্রেমিকা। শর্মিলার সঙ্গে তো প্রেমের অভিনয় করছিলেন। আপনি এটা কি জানেন যে কাবেরী সেন বিবাহিতা?
চার বছর আগে ওঁর বিয়ে হয়েছিল। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ঢুকবেন বলে সেটা লুকিয়ে ছিলেন। ওঁর স্বামী বর্তমান এবং স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ না করে উনি কোনও কিছু করেন না। ওঁর স্বামীকে অলরেডি পুলিশ অ্যারেস্ট করেছে। কাবেরী সেনের বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন সোমকবাবু, এই কারণেই ওঁকে আমি আজ আসতে বলেছিলাম।
তালুকদারবাবুকে হ্যান্ডকাফ হাতে এগোতে দেখে রাজ ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ পুলিশের।







Comments