শঙ্করের দেশে যাত্রা | বাঙালির রসনা রুচিতে ডিম |ট্রাভেল অ্যাংজ়াইটি’ নাকি ‘হোডোফোবিয়া'? |রবিবারের গল্প: উর্দি পুরাণ
- রোজকার অনন্যা

- Aug 8
- 27 min read

শঙ্করের দেশে যাত্রা...
সরোজ মজুমদার
বম বম ভোলে... অমরনাথ যাত্রা করতে হলে শারীরিক সক্ষমতার যে ডাক্তারি শংসাপত্র নিতে হয়, আমার বাড়ির কাছে সাগর দত্ত হাসপাতাল থেকে তিন দিন ঘুরে অবশেষে সেটি সংগ্রহ করলাম। এরপর অমরনাথ শ্রাইন বোর্ডের ওয়েবসাইটে ডাক্তারি শংসাপত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে অনলাইন যাত্রার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হল। এ বছর অমরনাথ যাত্রা চলবে তেসরা জুলাই থেকে ৯ই আগস্ট পর্যন্ত। যাত্রার জন্য ডাক্তারি শংসাপত্র নেওয়ার কাজ এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এবং অনলাইন পার্মিট রেজিস্ট্রেশনের কাজ এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয়ে যায়। যাওয়া-আসার জন্য ফ্লাইটের টিকিট কেটে নিয়ে প্রতীক্ষায় রইলাম সেই নির্ধারিত দিনের জন্য।

একটি পিঠব্যাগে দরকারি সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ২৪শে জুলাই ভোর তিনটেয় কলকাতার বাড়ি থেকে দমদম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। সকাল সাড়ে পাঁচটায় ইন্ডিগোর ফ্লাইটে দিল্লি হয়ে সকাল এগারোটায় শ্রীনগর পৌঁছলাম। এরপর এয়ারপোর্ট থেকে একটি শেয়ার গাড়ি করে কাশ্মীরের অপরূপ উপত্যকার রসাস্বাদন করতে করতে পহেলগাঁওর নুনওয়ান বেস ক্যাম্পে পৌঁছে নির্ধারিত কাউন্টারে অমরনাথ যাত্রার পার্মিট দেখিয়ে আর-এফ-আইডি কার্ড সংগ্রহ করলাম। ক্যাম্পের ভাণ্ডারাতে হরেকরকম সুস্বাদু খাবার সহযোগে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নিলাম। লিডার নদীর পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেল। পথের ধারে বিভিন্ন জায়গায় অমরনাথ যাত্রার সুদৃশ্য ব্যানার ও বোর্ড চোখে পড়ছিল। পহেলগাঁওর মেইন মার্কেট এলাকার একটি হোটেলে আজকের রাতের জন্য আস্তানা গাড়লাম।

পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে রাস্তায় গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। ভোর পাঁচটায় ভোরের আবছা আলোয় গাড়ি ছাড়া শুরু হলে একটি শেয়ার গাড়ি করে চন্দনবাড়িতে পৌঁছলাম। চেক পোস্টে আর-এফ-আইডি কার্ড দেখিয়ে ও ব্যাগের সিকিউরিটি চেক সেরে স্থানীয় একটি ভাণ্ডারাতে অল্প কিছু খেয়ে নিয়ে হর হর মহাদেবের নাম স্মরণ করে যাত্রা শুরু করলাম। যেহেতু পায়ে হেঁটে পুরো পথ যেতে হবে, তাই পিঠের ব্যাগের ভার বেশি বাড়াইনি। কিছুটা পথ যেতেই বৃষ্টি শুরু হওয়ায় অগত্যা ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটতে থাকলাম। পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে যত উপরে উঠছিলাম, নিচে চন্দনবাড়িতে যাত্রীদের থাকার নানা রঙের সুদৃশ্য টেন্টগুলো দেখতে দারুণ লাগছিল।
মনোরম সবুজ পাহাড়ি উপত্যকার চড়াই পথে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম এগারো হাজার ফুট উচ্চতার পিসু টপে। এখানকার ভাণ্ডারাতে খাবার ব্যবস্থা অতি উত্তম। কী নেই খাদ্য তালিকায়—রুটি, পরোটা, ইডলি, ধোসা, পোলাও, সরবত, চা, বিভিন্ন প্রকারের মিষ্টি, মোরব্বা—সবকিছু। আমিও অল্প করে কিছু খেয়ে প্রাতরাশ সেরে নিলাম। পেট পুরে খেলে হাঁটতে কষ্ট হবে, আর তা ছাড়া অমরনাথের এই যাত্রাপথে বিভিন্ন জায়গায় ভাণ্ডারাতে বিনা মূল্যে খাওয়া-দাওয়ার সুব্যবস্থা আছে।

সবুজ গালিচায় মোড়া পাহাড়ের বুক চিরে প্রবাহিত লিডার নদীর শোভা অতুলনীয়। স্থানীয় ঘোড়সওয়ারদের ঘোড়া নিয়ে যাত্রী প্রতীক্ষায় থাকতে দেখা যায়। এখানে কিছু জায়গার ভূপ্রকৃতির গঠন গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কথা স্মরণ করাবে। যোজিপল পেরিয়ে নাগাকোটিতে পথের পাশে একটি সুন্দর জলপ্রপাতের সামনে তীর্থযাত্রীদের ছবি তোলার ভিড় দেখা গেল। চড়াই পথে কিছুটা এগিয়ে একটি নদীকে ছুটে গিয়ে পান্না সবুজ রঙের জলের শেষনাগ হ্রদে মিশতে দেখলাম। এখান থেকেই বিশাল শেষনাগ হ্রদের একচিলতে প্রথম দর্শন মেলে। আরও কিছুটা এগোলে ১২,৮০০ ফুট উচ্চতায় মায়াবী সবুজ পাহাড়ে মোড়া পুরো শেষনাগ হ্রদটি চোখের সামনে সম্পূর্ণ রূপে উন্মুক্ত হয়; কী অপূর্ব তার শোভা! পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায় শ্বেতশুভ্র মেঘপুঞ্জ বাসর জমিয়েছে।

অমরনাথ যাত্রা করার জন্য পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়াও ঘোড়া, পালকি, পিট্টুর ব্যবস্থা আছে। পথে বিভিন্ন স্থানে যাত্রীদের জন্য শৌচালয়েরও ব্যবস্থা আছে। শেষনাগ বেস ক্যাম্পে অমরনাথ যাত্রীদের রাত্রিযাপনের জন্য থাকা-খাওয়ার সুবন্দোবস্ত আছে। দুপুর দুটোর মধ্যে এখানে পৌঁছতে পারলে তবেই আগে এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি মেলে; অন্যথায় যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য শেষনাগেই থেকে যেতে হয়। আমি অনেক আগে পৌঁছে যাওয়ায় আর্মি চেক পোস্টে আর-এফ-আইডি কার্ড দেখিয়ে ও ব্যাগের সিকিউরিটি স্ক্যান করে নিয়ে শেষনাগ বেস ক্যাম্পকে ডান পাশে রেখে শেষনাগ হ্রদ থেকে নির্গত নদীর উপরে সেতু পেরিয়ে এগিয়ে চললাম। কিছুটা পথ চলে একটি স্ফটিকস্বচ্ছ জলের পাগলপারা ঝরনার সঙ্গে দেখা হল। এখানকার পাহাড়ের রূপ লাদাখের ন্যাড়া পাহাড়ের কথা মনে করিয়ে দেবে। ওয়াবল টপ হয়ে খাড়া আরোহণে কঠিন চড়াই পথে পৌঁছে গেলাম অমরনাথ যাত্রার ১৪,৮০০ ফুট উচ্চতার সর্বোচ্চ স্থান মহাগুনা টপ বা এম.জি. টপ, যা গণেশ টপ নামেও পরিচিত। এখানকার হাড়-হিম করা শীতল বায়ুপ্রবাহ শরীর অবশ করে দেয়। বিকেল সাড়ে তিনটেয় পোষপাথরি পৌঁছলাম।

এখানকার ভাণ্ডারা তীর্থযাত্রীদের কাছে তার সুস্বাদু হরেকরকম লোভনীয় খাবারের জন্য খুব জনপ্রিয়। এখানে তীর্থযাত্রীদের রাত্রিবাসেরও ব্যবস্থা করা হয়। চন্দনবাড়ি থেকে সকাল ৫:৫৫ মিনিটে যাত্রা শুরু করে পিসু টপ, শেষনাগ, গণেশ টপ, পোষপাথরি হয়ে ৩২ কিমি পথ পায়ে হেঁটে সন্ধ্যা ৭:৩০ মিনিটে পঞ্চতরনীতে পৌঁছাই। পঞ্চতরনীর লাদাখি পাহাড়ের বাহুপাশে আবদ্ধ সবুজ গালিচার তৃণভূমি পথের কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছিল। পঞ্চতরনী বেস ক্যাম্পের একটি টেন্টে রাত্রিবাসের ব্যবস্থা হল। রাতে কাঁপুনি ধরা ঠান্ডা অনুভূত হল। ভোরে উঠে দেখি চারপাশের পাহাড়ের মাথা নতুন তুষারপাতে ঢেকে গেছে। বালতি প্রতি একশো টাকা দরে গরম জল কিনে, স্নান সেরে ভোর পাঁচটায় যাত্রাপথের গেট খুললে ভোলেবাবার নাম নিয়ে পথে বেরিয়ে পড়লাম। তীর্থযাত্রীদের মধ্যে আনন্দ, উৎসাহ চোখে পড়ার মতো ছিল।
পঞ্চতরনী নদীর পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সঙ্গম টপে এলাম। আগের দিন রাতে বৃষ্টি হওয়ায় রাস্তার অধিকাংশ স্থান ভেজা ছিল। এখান থেকে পবিত্র অমরনাথ গুহার দিকে প্রবাহিত হওয়া অমরাবতী নদীর বেশিরভাগ স্থানের জল জমে বরফ হয়ে আছে। এরপর কিছুটা এগোতেই সারা শরীরে শিহরণ জাগিয়ে দেখা পেলাম ১৩,৫০০ ফুট উচ্চতায় সেই বহু প্রতীক্ষিত পবিত্র শৈবতীর্থ অমরনাথ গুহার। আনন্দে আবেগে চোখে জল চলে এল। অমরাবতী নদীতে তীর্থযাত্রীদের স্নান সারতে দেখা গেল। সকাল আটটায় একটি ক্লক রুমে ব্যাগ, মোবাইল এবং নির্দিষ্ট স্থানে জুতো রেখে খালি পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে গুহার দিকে এগিয়ে চললাম। গুহার মুখের কাছে এক জোড়া পায়রাকে উড়ে যেতে দেখলাম। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, শিব ও পার্বতীর ‘অমর কথা’ শোনা পায়রা দুটি অমরত্ব লাভ করেছিল। আজ শ্রাবণ মাসের দশম দিন। গুহায় প্রবেশ করে শিবলিঙ্গ ও মন্দির দর্শন সেরে অনেকটা সময় এখানে কাটালাম। দেহ ও মন এক অনাবিল আনন্দে শিহরিত হয়ে গেল। প্রসাদ সংগ্রহ করে গুহা থেকে নেমে এসে বালতালের পথে হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তার পাশের হিমবাহের কাছে যেতেই দমকা ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছিল। পথে কয়েকটি প্রকাণ্ড আকৃতির পাহাড়ি মূষিকের দেখা পেলাম। সিন্ধু নদীর নৈসর্গিক রূপ আস্বাদন করতে করতে একটি লঙ্গরে এসে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নিলাম। ডোমেইল হল অমরনাথ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বা চেকপয়েন্ট, যেখানে এসে আমার আর-এফ-আইডি কার্ডটি কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দিতে হল।

অমরনাথ যাত্রার পুরো পথটির সুরক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর জওয়ানেরা। অমরনাথ শ্রাইন বোর্ডের তত্ত্বাবধানে এই তীর্থযাত্রার ব্যবস্থাপনা ছিল প্রশংসনীয়। আজ সকালে পঞ্চতরনী থেকে যাত্রা শুরু করে সঙ্গম টপ হয়ে পবিত্র অমরনাথ গুহার দর্শন সেরে ডোমেইল হয়ে সর্বমোট ২৪ কিমি পথ পায়ে হেঁটে বালতাল বেস ক্যাম্পে পৌঁছাই বিকেল সাড়ে তিনটেয়। আজকের পথে চড়াই-উতরাই উভয়ই থাকলেও কঠিন উৎরাইয়ের ভাগই বেশি ছিল। বালতাল থেকে একটি শেয়ার গাড়ি করে সোনমার্গে পৌঁছাই, যেখানে আজকের রাত্রিবাস।
পরদিন সকাল নটায় একটি শেয়ার গাড়ি করে অপরূপ সোনমার্গ ভ্যালির দৃশ্য উপভোগ করতে করতে কঙ্গনে এসে গাড়ি বদল করে শ্রীনগরের ডাল লেকের ৭ নং গেটে পৌঁছাই। পরবর্তী দুদিনের জন্য ডাল লেকের একটি হাউসবোটে আস্তানা গাড়ি। শিকারা করে অপরাহ্নের আলোয় ঝলমলে পাহাড়ে ঘেরা ডাল লেকের জলে ভেসে একে একে সবকটি দর্শনীয় স্থানগুলি দেখে নিলাম। বিকেলে হুড খোলা দোতলা বাসে করে ডাল লেক পরিক্রমা মনের মনিকোঠায় ঠাঁই করে নিল। পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাউসবোটের বারান্দায় বসে ডাল লেকের জলে ভাসমান জীবনযাত্রা দেখতে দেখতে একজন চা বিক্রেতার কাছ থেকে কাশ্মীরের বিখ্যাত কাওয়া চায়ের স্বাদ আস্বাদন করলাম।

কাশ্মীরে আসব আর গুলমার্গে যাব না, এ তো হয় না; তাই পাড়ি জমালাম অপরূপ গুলমার্গ ভ্যালিতে। এখানকার দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে রয়েছে গন্ডোলা রোপওয়ে, মহারাজা হরি সিংহ প্যালেস, মহারানী জি মন্দির, আপেল বাগান ইত্যাদি। গুলমার্গ থেকে ফেরার পথে একটি রেস্তোরাঁতে কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী, বহু-কোর্সযুক্ত রাজকীয় ভোজ কাশ্মীরি ওয়াজওয়ানের আস্বাদ নিলাম। সন্ধ্যায় এলাম শ্রীনগরের সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র লাল চকে, যা তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব, জমজমাট বাজার এবং রাজনৈতিক তাৎপর্যের জন্য পরিচিত। এখানে বিখ্যাত ঘড়ির টাওয়ার, ঘণ্টাঘর রয়েছে, যা তখন পর্যটক সমাগমে মুখরিত। নিকটেই রয়েছে ঝিলম নদী।
ভ্রমণের ষষ্ঠ দিনে হাউসবোট ছেড়ে ডাল লেকের কাছে একটি হোটেলে চেক-ইন করে সকাল সকাল চলে এলাম শ্রীনগরের গোপাদ্রি পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত ভগবান শিবকে উৎসর্গীকৃত শ্রী শঙ্করাচার্য মন্দিরে, যেখান থেকে ডাল লেক এবং পুরো উপত্যকার মনোরম প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায়। এর পর সারাদিন ধরে একে একে ডাল লেক সংলগ্ন চশমে শাহী গার্ডেন, পরী মহল, বোটানিক্যাল গার্ডেন, নিশাত বাগ, শাহ কাশ্মীর আর্টস এম্পোরিয়াম ইত্যাদি ঘুরে নিলাম। রাতে আলোয় উদ্ভাসিত ডাল লেক আর তাতে ভাসমান শিকারা এবং হাউসবোটগুলিকে দেখতে দারুণ লাগছিল।

ভ্রমণের সপ্তম তথা শেষ দিনে বাড়ি ফেরার জন্য, বিকেলে পৌঁছে গেলাম ‘শেখ উল আলম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’, যা শ্রীনগর বিমানবন্দর নামেও পরিচিত।
---
রাত্রিবাস / রাতঠিকানা
রাতঠিকানা: নিউ ইন্ডিয়া হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্ট, মেইন মার্কেট, পহেলগাঁও, জম্মু ও কাশ্মীর-১৯২১২৬।
দূরাভাষ : ০১৯৩৬ ২৪৩৩৬৫
রাতঠিকানা: পঞ্চতরনী ক্যাম্পগ্রাউন্ড, অমরনাথ ট্রেক, ফরেস্ট ব্লক, জম্মু ও কাশ্মীর-১৯২১২৬।
রাতঠিকানা: এফ এস গেস্ট হাউস, ফরেস্ট ব্লক, সোনমার্গ, জম্মু ও কাশ্মীর-১৯১২০২।
দূরাভাষ : ৯৬২২৭৭৩৩৩৫
রাতঠিকানা: ইয়ং শাগু প্যালেস হাউজবোট, ডাল লেক গেট নং ৭, শ্রীনগর, জম্মু ও কাশ্মীর-১৯০০০১।
দূরাভাষ : ৯৯০৬৮৯৯২৪০
রাতঠিকানা: হোটেল আল হামযাহ, ডাল গেট ব্রিজ, রায়নাবাড়ি, শ্রীনগর, জম্মু ও কাশ্মীর-১৯০০০১।
দূরাভাষ : ৯১০৩২১১৭৬৬

জরুরি কথা
অমরনাথ যাত্রার রেজিস্ট্রেশন সহ অন্যান্য যাবতীয় তথ্য পাওয়া যাবে শ্রী অমরনাথ জি শ্রাইন বোর্ডের ওয়েবসাইট https://jksasb.nic.in/ থেকে। শারীরিক সক্ষমতার পরীক্ষা ও ডাক্তারি শংসাপত্র নিতে হবে বোর্ডের দ্বারা নির্ধারিত নির্দিষ্ট হাসপাতাল থেকে। অনলাইন পার্মিট তথা রেজিস্ট্রেশনের কাজ বোর্ডের ওয়েবসাইটে করা যায়। অফলাইনে রেজিস্ট্রেশন, বোর্ডের দ্বারা নির্ধারিত নির্দিষ্ট কিছু ব্যাঙ্ক শাখা থেকে করা যাবে। অমরনাথ যাত্রা পহেলগাঁও-চন্দনবাড়ি বা বালতাল-ডোমেইল উভয় রুটেই করা যায়। যাত্রা শুরুর আগে বেস ক্যাম্প থেকে প্রত্যেক যাত্রীকে আর-এফ-আইডি বা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন কার্ড নেওয়া বাধ্যতামূলক।
বাঙালির রসনা রুচিতে ডিম
সুস্মিতা মিত্র
ছোটবেলার সেই পিকনিক গুলোর কথা মনে আছে? সেই শীতের কুয়াশা ঢাকা সকালে একদিন ভোর ভোর করে গুচ্ছের টুপি, মোজা সব চাপিয়ে বেড়িয়ে পড়া হতো! পাড়ার সব্বাই মিলে, বাসে চেপে। গন্তব্য কোনো আমবাগান অথবা নদীর ধারে কোনো নিরিবিলি জায়গা। যাতে গেলেই সবার প্রথমে একখানা সুন্দর কাগজের বক্সে থাকতো রঙিন মোরব্বা দেওয়া গোল মিষ্টি বান রুটি, কলা, কমলালেবু, গুড়ের সন্দেশ আর একখানা ডিম সেদ্ধ! স্কুলের স্পোর্টস ডে থেকে পাড়ার রক্তদান শিবির, সব জায়গাতেই এর অবাধ বিচরণ। এমনকি জলখাবার হালকা হয়েছে সাথে একখানা ডিম খেয়ে নাও, বাড়িতে কিচ্ছু নেই একটা ডিমের পোচ খেয়ে নাও, হঠাৎ করে কোনো অতিথি এসেছে চায়ের সঙ্গে একখানা অমলেট ভেজে দাও; এসব তো হামেশাই ঘটে। এই কয়েকবছর আগেও, কারোর ব্লাড প্রেশার কম শুনলেই পাড়ার বিজ্ঞ শ্রেণীর জনতা নিদান দিতেন ওসব ডাক্তার বদ্যি করে কি হবে, রোজ সকালে একখানা করে হাফ-বয়েল দেশী মুরগীর ডিম খাও বরং। ডিম মানেই বাঙালি রান্নাঘরে বিপদের সঙ্গী, মুশকিল আসান।

তবে এতেই শেষ নয়, আরো আছে। কেউ যখন নতুন রান্না শেখে প্রথম কি রেঁধেছিল জিজ্ঞেস করলে ৮০% আমজনতা ডিমের ঝোলের কথাই বলবে। পাড়ার বন্ধুদের সাথে ডিমের ঝোল, ভাত ফিস্ট করেননি এমন লোকজন ও হাতে গোনা। আমাদের ছোটবেলায় ৫ মিনিটের অনলাইন শপিং অ্যাপ গুলোর বার বাড়ন্ত ছিল না, আর বলে কয়ে বাড়িতে অতিথি আসবে সে রেওয়াজ ও ছিল না। মাকে দেখেছি হয়তো বাড়িতে কেউ না বলে এসেছে, অথচ তেমন বাজার নেই, এবেলার মতো কাজ চালিয়ে নিতে পারলে ওবেলায় সব আসবে এইরকম বিষয়। এহেন পরিস্থিতিতে তাড়াহুড়োতে ডিম আর আলু দিয়ে কিছু একটা করে ফেলেছে। আবার ডিমের সংখ্যা কম, অথচ লোকসংখ্যা বেশি হলে অমলেট বানিয়ে তার ছোট ছোট টুকরো করে ঝোল। সবাই সেসব খেয়ে সুখ্যাতি ও করেছে প্রচুর। অথবা খিদে পেটে ডিম সেদ্ধ, আলু সেদ্ধ, ঘি দিয়ে মাখা গরম ভাত এর কি কোনো বিকল্প আছে? আর আসল সুগৃহিনী তো সেই, যে যেকোনো পরিস্থিতিতে হাসিমুখে সামলে নিতে পারে।

কিন্তু মাথায় আসতেই পারে ডিমের সঙ্গে বাঙালির এহেন মধুর সম্পর্ক কবে থেকে শুরু হলো? আজকের আধুনিক রান্নাঘরের সানি সাইড আপ, চিজ অমলেট, এগ বেনেডিক্টের পাশাপাশি রয়েছে মায়ের হাতের বড় বড় আলু দেওয়া ডিমের ঝোল, ঝাল ঝাল ডিম কষা, সরষে বাটা দিয়ে ডিম পাতুরি ও। এই বিবর্তনের পথচলা বড়ই চমকপ্রদ। বাঙালির হেঁশেলে ঢু মারার আগে জানতে হবে গোটা পৃথিবীর মনুষ্য প্রজাতি ডিম খেতে শিখলো কীভাবে? আনুমানিক ছয় মিলিয়ন বছর আগে থেকে ডিম খাওয়ার প্রচলন শুরু হয়। তখন অবশ্য সরাসরি পাখির বাসা থেকে ডিম তুলে নিয়ে কাঁচা ই খাওয়া হতো। পরবর্তীতে চীন ও মিশরের মানুষ প্রথম গৃহপালিত মুরগির ডিম খাওয়া শুরু করে। এছাড়াও বিভিন্ন প্রাচীন লেখায় পাওয়া যায়, ৩২০০ বিসিই-তে ভারতের অনেক জায়গাতেই গৃহপালিত জঙ্গলী মুরগি ছিল। এরপর মোটামুটি ১৪৯৩ সাল নাগাদ যখন ক্রিস্টোফার কলম্বাস নতুন বিশ্বে ফিরে আসেন তখন তাঁর জাহাজে মুরগি ছিল বলে জানা যায়। সেই মুরগি ডিম দিলে তিনি খেয়ে দেখেন এবং এরপর থেকেই ডিম খাওয়ার প্রচলন হয়। পেজ স্মিথ ও চার্লস ড্যানিয়েলের লেখা 'দ্য চিকেন বুক'-এ ও বলা হয়েছে, মানুষের ইতিহাসের প্রথম দিকের কিছু সময়ে মাংস ও ডিমের মূল উৎস বলতে ছিল পাখি। বাঙালির রসনায় ডিমের আগমন প্রসঙ্গে আসা যাক এবার। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, প্রাচীনকালে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে মুরগির মাংস বা ডিমের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। বাঙালি বাড়িতে মাংস বলতে ছিল পাঁঠার মাংস। তাছাড়া ধর্মীয় আচার, জাতিগত সঙ্কোচ, দেশ গাঁয়ের সামাজিক রীতিতে ডিম এককালে ছিল কিছুটা
বিলাসিতা’র খাদ্য।অভিজাত পরিবারে এবং বিদেশিদের টেবিলে ডিমের নানা পদ থাকলেও সাধারণ মানুষের রোজকার হেঁশেলে ডিমের আনাগোনার শুরু হয় বহুকাল পড়ে।

মূলতঃ মুঘল আমলে রাজকীয় রান্নাবান্নায় ডিম নানা রেসিপির সঙ্গী হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। এরপর এদেশে পর্তুগিজদের আগমনের সাথে সাথে কেক, পুডিং ইত্যাদি নানা পদের মাধ্যমে ডিম আরও জনপ্রিয় হয় জনসাধারণের মধ্যে। ব্রিটিশদের আমলে ডিম ‘নার্সারি ফুড’ বা স্বাস্থ্যকর খাদ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ব্রিটিশ ঘরানার খাবার আর এদেশের খানসামাদের বিদেশি রান্নায় দেশী মশলার ব্যবহারের থেকে জন্ম নেওয়া অ্যাংলো ইন্ডিয়ান রান্না থেকেই মূলত হইহই করে ডিমের ব্যবহার শুরু হয়। সেকালে ব্রিটিশ সেনাদের থাকার জন্য তৈরি হওয়া ডাকবাংলোগুলোতে রান্না করা হতো এক বিশেষ পদ, যাতে ডিমের ব্যবহার ছিল অনস্বীকার্য। ডাক ব্যাবস্থা শুরুর দিকে, ঘোড়ায় চেপে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় চিঠি পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতো, ফলে তাদের থাকার জন্যই ডাকবাংলো গুলো তৈরি করা হয়। সাহেবদের জন্য তৈরি এই সার্কিট হাউসগুলোতে গরু, হাঁস, মুরগি ও পালন করা হতো, ফলে ডিম দুধ মাংসের যোগানের অভাব ছিলো না। বহু দূর থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ পেয়ে রান্না চাপানো হতো। এদিকে কতজন যে আসছেন তা তো জানা সম্ভব ছিল না কোনোভাবেই। তাই মাংসের সঙ্গে হাঁস মুরগির ডিম ও দেওয়া হতো এতে, যাতে খাবার কম না পড়ে! পরিস্থিতির কারনে সৃষ্ট আজ এই রেসিপিই বিভিন্ন রেস্তোরাঁর জনপ্রিয় পদ। তাছাড়াও বিভিন্ন রকম কেক, পেস্ট্রি, পুডিং, স্টুতে হাঁস মুরগির ডিমের ব্যবহার হতো সেকাল থেকেই। এরপর স্বাধীনতার পরে খাদ্য সংকটের সময় প্রোটিনের সস্তা উৎস হিসেবে সরকারিভাবে ডিমের ব্যবহার প্রচলিত হয়।

এবার আসি বাঙালির হেঁশেলে। প্রথম দিকে ডিম রান্নায় পেঁয়াজ রসুন পড়তো না। হতো বড় বড় আলু আর আদা জিরা লঙ্কা বাটা দিয়ে হিং ফোড়নে ডালনা। মুরগির ডিম তো বহু পরে এসেছে। প্রথমে ডিম বলতে শুধু হাঁসের ডিম'ই খাওয়া হতো। এবার মনে হবে তাহলে কোনটা বেশি ভালো, হাঁসের ডিম নাকি মুরগির? মুরগির ডিমের তুলনায় হাঁসের ডিম আকারে বড় এবং খোসাটাও বেশি শক্ত। ফলে এটি ফাটাতে একটু অসুবিধা হলেও দীর্ঘদিন, প্রায় ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত সংরক্ষণ করে খাওয়া যায়। তবে স্বাস্থ্যের জন্য সবসময় টাটকা ডিম খাওয়াই সর্বোত্তম। পুষ্টিগত দিক থেকে হাঁসের ডিম অনেক বেশি সমৃদ্ধ। বড় কুসুম থাকার কারণে এতে চর্বি ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ মুরগির ডিমের তুলনায় বেশি প্রোটিন এবং ওমেগা ৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বেশি থাকে। তাই যাঁরা উচ্চ চর্বিযুক্ত ডায়েট গ্রহণ করেন, তাঁদের জন্য এটি ভালো বিকল্প। হাঁসের ডিমে ভিটামিন বি ১২, ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বেশি পরিমাণে উপস্থিত থাকে। ভিটামিন বি ১২ স্নায়ু, রক্তকণিকা এবং ডিএনএ গঠনে সহায়ক। পাশাপাশি সেলেনিয়াম ও রিবোফ্লাভিনের মতো অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং হৃদরোগ ও বিভিন্ন স্নায়ুজনিত সমস্যা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এছাড়া হাঁসের ডিমের সাদা অংশে থাকা বিশেষ পেপটাইড হজম শক্তি বাড়ায়, হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। সব মিলিয়ে, পুষ্টিগুণে হাঁসের ডিম মুরগির ডিমের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে বলা যায়। তবে যারা কোলেস্টেরল সংক্রান্ত সমস্যায় ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে পরিমিত খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

সত্যি বলতে কি, ডিমকে ঘিরে বাঙালির এই যে এত আলাপ, এতো উত্তেজনা, এত ভালবাসা তা শুধু খাবো বলে নয়। এতে মিশে আছে আমাদের শৈশব, সহজ সরল স্মৃতিমাখা দিন, হঠাৎ করে আসা অতিথির হাসিমুখ, মায়ের আঁচলে হলুদের দাগ আর ব্যস্ততার গল্প। বাড়িতে ডিম আছে মানে ও ঠিক কিছু একটা হয়ে যাবে, আর পেটের পাশাপাশি মনও ভরবে সকলের। আজ নতুন যুগের ঝাঁ চকচকে পাঁচতারা রান্নাঘরে বিদেশি রেসিপির দাপট যতই বাড়ুক, কাঁসার থালায় গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের পাশে আলু দেওয়া ডিমের রগরগে ঝোলের সেই প্রথম প্রেমকে কি কেউ ভুলতে পারে? এ যেন হুল্লোড়ে মাতা উইক-এন্ড পার্টির পর কালোজিরা কাঁচালঙ্কা দেওয়া মাছের পাতলা ঝোলের মতোই মায়ামাখা এক পদ। হিমঘরের তাকে রাখা একটা ডিম যেন হাজারো অনুভূতির স্মৃতি। ডিম থাকুক, হেঁশেলের অলিন্দে, স্মৃতিগুলোর মতোই চিরচেনা, চির সঙ্গী হয়ে।
ট্রাভেল অ্যাংজ়াইটি’ নাকি ‘হোডোফোবিয়া’?
নিজস্ব প্রতিনিধি
ভ্রমণ মানেই কারও কাছে মুক্তির স্বাদ, কারও কাছে অচেনা পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কারের আনন্দ। পাহাড়, সমুদ্র, জঙ্গল কিংবা কোনও অচেনা শহরের পথে বেরিয়ে পড়ার পরিকল্পনাতেই অনেকের মন ভালো হয়ে যায়। অথচ এমন মানুষও রয়েছেন, যাঁদের কাছে ভ্রমণের কথা শুনলেই আনন্দের বদলে তৈরি হয় অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা কিংবা অজানা এক ভয়। কোথায় থাকবেন, কী খাবেন, পথে কোনও সমস্যা হবে কি না, অসুস্থ হয়ে পড়লে কী করবেন, যানবাহন ঠিকমতো চলবে তো—এমন নানা প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে। যাত্রার দিন যত এগিয়ে আসে, উদ্বেগও যেন তত বাড়তে থাকে। কিন্তু এই ভয় কি শুধুই ‘ট্রাভেল অ্যাংজ়াইটি’, নাকি এর পিছনে থাকতে পারে ‘হোডোফোবিয়া’?

ভ্রমণের আগে বা ভ্রমণের সময় অস্বস্তি, দুশ্চিন্তা, ভয় কিংবা অস্থিরতা তৈরি হওয়াকে সাধারণভাবে Travel Anxiety বলা হয়। এটি নিজে কোনও নির্দিষ্ট মানসিক রোগের নাম নয়; বরং ভ্রমণকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া উদ্বেগের একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা। যেমন, প্রথমবার বিমানে উঠছেন, মনে হচ্ছে বিমান ঠিকমতো নামবে তো? নতুন কোনও শহরে যাচ্ছেন, হোটেলটি নিরাপদ হবে তো? একা ট্রেনে যাচ্ছেন, সামানপত্র ঠিকমতো সামলাতে পারবেন তো? বিদেশে গেলে ভাষা বুঝতে পারবেন তো? এই ধরনের চিন্তা অনেকেরই হতে পারে। এমনকী নিয়মিত ভ্রমণ করেন এমন ব্যক্তিরও কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে Travel Anxiety হতে পারে।
ভ্রমণের আগে সামান্য উদ্বেগ থাকা আসলে খুব অস্বাভাবিক নয়। নতুন কোনও পরিস্থিতির জন্য আমাদের মস্তিষ্ক স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হয়। কিন্তু সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই উদ্বেগ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে ভ্রমণের আনন্দ তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় যাত্রাটুকুও কঠিন হয়ে যায়। এখানেই এসে পড়ে Hodophobia-র প্রসঙ্গ।
‘Hodophobia’ শব্দটির উৎস গ্রিক ভাষা। ‘Hodos’ অর্থ পথ বা যাত্রা এবং ‘phobos’ অর্থ ভয়। সহজ ভাষায়, ভ্রমণ বা যাত্রার প্রতি তীব্র ও অস্বাভাবিক ভয়কে Hodophobia বলা হয়। তবে শুধু ভ্রমণ করতে ইচ্ছা না করা, ভ্রমণের আগে নার্ভাস হয়ে পড়া কিংবা বাড়িতে থাকতে বেশি ভালো লাগা মানেই Hodophobia নয়। কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রে ভ্রমণের চিন্তাই যদি তীব্র ভয় বা আতঙ্ক তৈরি করে এবং সেই ভয় কাটানোর জন্য তিনি নিয়মিত ভ্রমণ এড়িয়ে চলেন, প্রয়োজনীয় যাত্রাও বাতিল করেন অথবা ভ্রমণের কথা ভাবলেই তীব্র শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

Travel Anxiety এবং Hodophobia-র মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হল ভয় ও উদ্বেগের তীব্রতা এবং দৈনন্দিন জীবনে তার প্রভাব। Travel Anxiety সাধারণত পরিস্থিতিনির্ভর। ভ্রমণের আগে কিছুটা চিন্তা হচ্ছে, নানা প্রশ্ন মাথায় আসছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যাত্রা করা সম্ভব হচ্ছে—এটি তুলনামূলকভাবে সাধারণ অভিজ্ঞতা। অন্যদিকে ভ্রমণের ভয় যদি এতটাই প্রবল হয় যে কোনও ব্যক্তি প্রয়োজনীয় যাত্রাও এড়িয়ে যাচ্ছেন, বারবার ভ্রমণের পরিকল্পনা বাতিল করছেন অথবা ভ্রমণের কথা উঠলেই তীব্র আতঙ্ক অনুভব করছেন, তখন সেটি ফোবিয়ার পর্যায়ে পড়তে পারে। সহজ করে বললে, Travel Anxiety-তে মনে হতে পারে, “যাত্রাটা নিয়ে একটু চিন্তা হচ্ছে।” আর তীব্র ভ্রমণভীতির ক্ষেত্রে অনুভূতিটা হতে পারে, “যাত্রার কথা ভাবলেই ভয় হচ্ছে এবং সেই ভয় আমাকে যাত্রা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।”
এই ধরনের ভয় বা উদ্বেগের পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় অতীতের কোনও খারাপ ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যাত্রাপথে দুর্ঘটনা, অসুস্থ হয়ে পড়া, হারিয়ে যাওয়া, ছিনতাই, বিমানে তীব্র ঝাঁকুনি কিংবা অন্য কোনও ভয়ঙ্কর ঘটনা মনের মধ্যে গভীর ছাপ ফেলতে পারে। পরবর্তীকালে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাতেই তৈরি হতে পারে উদ্বেগ।

আবার অনেকের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হতে পারে নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়। ভ্রমণের সময় সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বিমান, ট্রেন, বাস কিংবা জাহাজ চালাচ্ছেন অন্য কেউ। কখন কোথায় থামবেন, কখন পৌঁছবেন, পথে কী পরিস্থিতি তৈরি হবে—অনেক কিছুই নিজের হাতে থাকে না। যাঁদের নিরাপত্তাবোধ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের অনুভূতির উপর নির্ভরশীল, তাঁদের কাছে এই অনিশ্চয়তা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে।
অচেনা পরিবেশও অনেকের ভয়ের কারণ হতে পারে। পরিচিত বাড়ি, পরিচিত রাস্তা, পরিচিত মানুষ এবং পরিচিত পরিবেশের বাইরে গেলেই কারও কারও নিরাপত্তাবোধ কমে যায়। নতুন জায়গা, অপরিচিত মানুষ, নতুন ভাষা কিংবা নতুন খাবার—সবকিছু মিলিয়ে মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা একা ভ্রমণ করছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই অনুভূতি আরও তীব্র হতে পারে।
স্বাস্থ্য নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাও Travel Anxiety-র অন্যতম কারণ। “হঠাৎ শরীর খারাপ হলে কী করব?”, “কাছাকাছি কোনও ডাক্তার পাব তো?”, “প্রয়োজনীয় ওষুধ সঙ্গে আছে তো?”—এই প্রশ্নগুলি স্বাভাবিক সতর্কতার অংশ হতে পারে। কিন্তু যখন এই চিন্তাগুলি বারবার মাথায় ঘুরতে থাকে এবং সম্ভাব্য প্রতিটি পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক বলে মনে হতে শুরু করে, তখন উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।

কখনও আবার Panic Attack-এর অভিজ্ঞতার সঙ্গেও ভ্রমণভীতি জড়িয়ে যেতে পারে। কোনও ব্যক্তি যদি আগের কোনও যাত্রায় তীব্র আতঙ্ক, বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট বা মাথা ঘোরার মতো অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যান, তাহলে পরবর্তী সময়ে তাঁর মনে হতে পারে, আবার যদি একই ঘটনা ঘটে? এই ‘আবার হবে’ আশঙ্কাই ধীরে ধীরে ভ্রমণ এড়িয়ে চলার প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
ভ্রমণ নিয়ে উদ্বেগ শুধু মনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। উদ্বেগ বেড়ে গেলে শরীরেও তার নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বুক ধড়ফড় করা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, হাত-পা কাঁপা, মাথা ঘোরা, শ্বাস নিতে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব, পেটের সমস্যা কিংবা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। কারও ঘুম নষ্ট হতে পারে, কেউ আবার যাত্রার কয়েক দিন আগে থেকেই বারবার একই বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে পারেন। তীব্র আতঙ্কের সময় কারও মনে হতে পারে, “আমার কিছু একটা হয়ে যাচ্ছে।” এই অনুভূতিও আবার ভয়কে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে ভ্রমণের আগে সামান্য নার্ভাস হওয়াকে রোগ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং প্রশ্ন হল, সেই ভয় আপনার জীবনকে কতটা প্রভাবিত করছে। ভ্রমণের পরিকল্পনা করলেই যদি তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়, প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও যদি বারবার যাত্রা এড়িয়ে যান, ভয় বা উদ্বেগের কারণে কাজ কিংবা সামাজিক জীবন ব্যাহত হয়, অথবা ভ্রমণের কথা ভাবলেই তীব্র শারীরিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। নিজের ক্ষেত্রে Hodophobia হয়েছে কি না, তা নিজে থেকে নির্ণয় না করে প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়াই সঠিক পথ।
তবে ভ্রমণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলে প্রথমেই নিজেকে ‘ভীতু’ বলে দোষারোপ করার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং নিজের ভয়কে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। কোথায় ভয়টা বেশি হচ্ছে, কোন পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি তৈরি করছে এবং সেই ভয় বাস্তব কোনও অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত কি না—এসব বোঝা জরুরি। ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা করে রাখাও উদ্বেগ অনেকটা কমাতে পারে। কোথায় থাকবেন, কীভাবে যাবেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পরিচয়পত্র, গুরুত্বপূর্ণ ফোন নম্বর—এসব আগে থেকে গুছিয়ে রাখলে অনিশ্চয়তা কমে।
যাঁদের ভ্রমণ নিয়ে ভয় রয়েছে, তাঁরা একেবারে দীর্ঘ বা কঠিন যাত্রা দিয়ে শুরু না করে ছোট দূরত্বের ভ্রমণ দিয়ে শুরু করতে পারেন। ধীরে ধীরে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ফলে আত্মবিশ্বাস বাড়তে পারে। তবে ভয় যদি তীব্র হয়, এই ধরনের ধাপে ধাপে মোকাবিলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েই করা ভালো।
উদ্বেগের সময় অতিরিক্ত ‘Worst Case Scenario’ ভাবার প্রবণতাও অনেকের থাকে। “যদি দুর্ঘটনা হয়?”, “যদি হারিয়ে যাই?”, “যদি অসুস্থ হয়ে পড়ি?”—এই প্রশ্নগুলি মাথায় আসতেই পারে। কিন্তু প্রতিটি সম্ভাবনাকে যেন নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে কল্পনা না করি। বরং প্রশ্নটা বদলে করা যেতে পারে—“সমস্যা হলে আমি কীভাবে সামলাব?” সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার বদলে বাস্তবসম্মত প্রস্তুতি নেওয়া অনেক বেশি কার্যকর।
ভ্রমণের সময় কাছের মানুষ বা ভ্রমণসঙ্গীকে নিজের উদ্বেগের কথা জানিয়ে রাখাও উপকারী হতে পারে। প্রয়োজনের সময়ে পাশে একজন পরিচিত মানুষ থাকলে নিরাপত্তাবোধ বাড়ে। পাশাপাশি ধীরে, গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া, শরীরকে শিথিল করার চেষ্টা, নিয়মিত relaxation বা mindfulness অনুশীলনও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।
তবে ভয় যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তাহলে পেশাদার সাহায্য নেওয়া জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত থেরাপির পরামর্শ দিতে পারেন। Cognitive Behavioural Therapy বা CBT-র মতো থেরাপি উদ্বেগ ও ভয়ের সঙ্গে যুক্ত চিন্তাভাবনা এবং আচরণের ধরন বুঝতে ও ধীরে ধীরে পরিবর্তন করতে সাহায্য করতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসক ওষুধের কথাও বিবেচনা করতে পারেন। তবে নিজের থেকে কোনও উদ্বেগনাশক বা ঘুমের ওষুধ খাওয়া উচিত নয়।
ভ্রমণ আমাদের পরিচিত গণ্ডির বাইরে নিয়ে যায়। নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন প্রকৃতি আর নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কিন্তু প্রত্যেক মানুষের কাছে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা এক রকম নয়। কারও কাছে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা রাস্তা রোমাঞ্চকর, আবার কারও কাছে সেই পথই উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তাই “এত সামান্য ব্যাপারে ভয় পাচ্ছ কেন?” বলে কাউকে ছোট না করে তাঁর অনুভূতিটিকে বোঝার চেষ্টা করাই জরুরি।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, Travel Anxiety মানেই Hodophobia নয়। আবার তীব্র ভ্রমণভীতিকেও শুধুমাত্র ‘নার্ভাসনেস’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। ভয়কে চিহ্নিত করা, তার কারণ বোঝা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াই হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ। কারণ ভ্রমণ শুধু এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছনো নয়—এটি নিজের সীমারেখা পেরিয়ে নতুন কিছু আবিষ্কারেরও নাম। সেই যাত্রার পথে যদি ভয় এসে দাঁড়ায়, তবে ভয়কে অস্বীকার নয়, তাকে বুঝে ধীরে ধীরে জয় করাই হতে পারে সবচেয়ে সুন্দর যাত্রা।
রবিবারের গল্প: উর্দি পুরাণ
বেদ বন্দ্যোপাধ্যায়
- মা বাবার'কি হয়েছে বলোতো ? সারাটা দিন তিনতলার গোলঘরে জানলার দিকে তাকিয়ে কি অতো ভাবে ?
- আমি তো তাই ভাবছি শেষ পর্যন্ত মাথাটাই না খারাপ হয়ে যায়।
- ধুত, কি যে বলো মা, জাদরেল পুলিশ অফিসার কিনা মেন্টাল পেশেন্ট ? একসময় বাবার ভয়েতে এক ঘাটে বাঘে-গরুতে জল খেয়েছে।
- তবুও, বাবা তো বাড়ি বসার লোক নয়। স্টেশন পাড়ায় অতবড় সূর্য সেন ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, পেনশন এ্যাসোসিয়েশনের কনভেনার। ভাই বোন রিলেটিভ সব বাদ দিয়ে শেষে কিনা গোলঘরে মৌনব্রত। তুমি একটু খোঁজ নাও মা কিছুতো একটা হয়েছে ।
- ভালোইতো ছিল বিতান। তুই মিশন স্কুলে ট্রান্সফার হয়ে এলি ব্যাস, তোকে দেখার পর...
- মানে ? কি বলছো তুমি ? তিনবছর চেষ্টা করে নর্থবেঙ্গল থেকে এখানে এলাম, তার আগে মিশনে মিশনে কম কষ্ট করিনি, আর আজ যখন বাড়ি এলাম বাবার এই বিহেবিহার।
- সেটা তো আমিও মানুষটাকে বুঝিয়েছি। রামকৃষ্ণ মিশনে স্কলারশীপ পেয়ে তোমার ছেলে যে সম্মান আমাদের ফিরিয়ে দিলো, তার কপালে কি এই ছিল ? বিতান তুই রাগ করিস না।
- রাগে নয় মা । আমি ভাবি আমি বাড়ি এলাম, আর বাবা আমার থেকে দূরে চলে গেল। এভাবে আমি এখানে থাকতে পারবোনা মা, আমি আবার চলে যাব, আমি ট্রানস্ফার নিয়ে নেবো।
মা ছেলের কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে - রাগ করিসনা বিতান, মানুষটা সারা জীবন চোর ধরে, ডাকাত ধরে, পুলিশের ডিউটি করে গেছে। নিজের সুখ ভাবেনি। আর আজ তুই মুখ ফেরালে সংসারটা ভেসে যাবে। আমি তোর বাবাকে বাঁচাতে পারবো না। বলতে বলতে জয়াদেবী আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মোছে।
দীর্ঘ বিয়াল্লিশ বছর পুলিশে কর্মরত শিহরণ বসু, এই একবছর হল রিটায়ার্ড করেছেন। কাঁধে উজ্জ্বল থ্রিস্টার রেড গ্রীন ব্যাচ, বুকে রাজ্যপালের দেওয়া বীরসৈনিক মেডেল, ফেয়ারওয়েল এর দিন, শিহরণ বসুর উর্দিতে শোভা পেয়েছে, ব্যাটালিয়নে শুধু নয়, গুন্ডাদমন শাখায় এমনকি অপরাধজগতেও তাকে জাদরেল পুলিশ অফিসার বলে সমীহ করতো।
তারই একমাত্র ছেলে বিতান বসু রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরের প্রধান শিক্ষক। মা জয়া বসু উচ্চশিক্ষিত হাউস ওয়াইফ। স্বামীর ব্যস্ত জীবনে ছেলেকে হীরের টুকরো করার প্রধান কারিগর।
এহেন সুন্দর সংসার শিহরণবাবুর হঠাৎ করে ছেলের মুখোমুখি না হওয়া, গোলঘরে নিজেকে বন্দী করে রাখা, সত্যিই অস্বাভাবিক। অথচ এইতো সেদিনের কথা, তিন চারটে ব্যাগ ঝুলিয়ে বুলেট হাকিয়ে হরিবাবুর মাছের বাজারে এসে শিহরণবাবু হাঁক দিয়েছে - এই বিপুল বড় দুটো ইলিশ বের কর। ভেজে ছেলের কাছে পাঠাবো। আমি ওদিকটা দেখি অন্য কি মাছ আছে ।
- দিচ্ছি স্যার শাঁখাফালি করে রাখছি।
ইলিশ অর্ডার দিয়ে শিহরণবাবু রতনের থেকে এককেজি সোনালী ট্যাংরা, ডাবুর দোকান থেকে কালো গরুর ঘি, নগেন্দ্র বস্ত্রালয় থেকে দুটো ছহাতি বসিরহাটের গামছা- দু ব্যাগ বাজার নিয়ে যখন বাড়ির সামনে বুলেট দাঁড় করায় , পাশে ডাক্তার বাড়ির পারুল বৌদি বলে -ঠাকুর পো, ছেলের সম্বন্ধ আসছে বুঝি ?
উত্তরে ব্যালকনি থেকে পুলিশ গিন্নি বলে - আর বোলোনা পারুলদি, ঠাকুরপো রাতে কাঞ্চনজঙ্ঘা ধরে ছেলের কাছে যাবে। তাই ব্যাগ ভর্তি বাজার।
বৌ এর কথায় শিহরনবাবু লজ্জা পায়। মুচকি হেসে ব্যাগ নিয়ে ভিতরে ঢোকে।
কিন্তু ছমাস পর সেই লোকটির এই পরিবর্তনে মা ছেলে অশনি সংকেত দেখতে পাচ্ছে।
ঘড়িতে ঢং ঢং করে দশটা বাজলো। বিতান ডাক দেয় - মা ব্যাগ দাও, টোটো এসে গেছে।
-যাই বিতান, বলে জলের বোতল ভরে ছেলের ব্যাগে দেয়। এক মুহূর্তে কি ভেবে আবার ছুটে মায়ের কাছে আসে। বলে, মা আজ দুপুরে নার্ভের ডাক্তার কিংশুক গুপ্ত বাবাকে দেখতে আসবে। বাবা না নামলে ডাক্তার বাবুকে বাবার ঘরে নিয়ে যেও। আমি ফোনে বাকি কথা শুনে নেবো।
- দেখ বাবা, মানুষটা যদি আগের মত হয়। ভগবান আমার কি পরীক্ষায় ফেললো, ভয় হচ্ছে ডাক্তার দিয়ে কি এই রোগ সারবে ?
- মানে ! একটা মানুষ খাচ্ছে দাচ্ছে, কথা বলছে, কাগজ পড়ছে, অথচ নিচে নামবে না, কারো সাথে কথা বলবে না - এটা কি ধরনের রোগ ? আমার উপর রাগ থাকলে বলুক, কালই চলে যাবো।
- তুই রাগ করছিস কেন বিতান, সে কি বলেছে ? তুই সাবধানে যা,
বিতান দৌড়ে টোটোতে ওঠে। জয়া দেবী মাথায় হাত ঠেকিয়ে বলে দুগ্গা দুগ্গা। টোটো চলে যায়।
পর্ব -২
- কি ব্যাপার জগন্নাথ বাবু, বালিখাদান বন্ধ হয়ে গেছে, তবু মগরা থেকে বালি যাচ্ছে কিভাবে?
- স্যার দামোদরের বালি এখানে স্টোর হয়। তারপর ট্রাক লোড করে বাইরে যায়।
পাশ থেকে শিবু হোমগার্ড ফোড়ন কাটে - হ্যাঁ স্যার, মানে মগরার নামডাক আছে, তাই মগরা ব্র্যান্ড।
শিহরণ বাবু টেবিলে রাখা গ্লাস থেকে একঢোক জল খেয়ে গলাটা খেকিয়ে বলে ওঠে, বুঝলাম কিন্তু এই ব্যাপারটা এখন থেকে কৌশিক তুমি দেখবে। আর জগন্নাথবাবু আপনি ট্রাফিক ব্যবস্থা দেখুন। কথা শেষ করে শিহরনবাবু সিগারেট ধরায়। জগন্নাথবাবু একটু আমতা আমতা করে বলে, কিন্তু আমি গতমাসে বলেছিলেন বালির ব্যাপারটা
- মালকড়ি তারমানে ভালই আছে? আরে বাবা বলেছিলাম তো, কিন্তু ষাট-সত্তর হাজারে জলগরম হবে না।
- এভাবে আমাকে সরালে সেটিং নষ্ট হবে স্যার।
- আপনি কি চান আপনার নামে হায়ার অথরিটিকে কমপ্লেন করি? কথা না শুনলে ঝাড়গ্রাম ট্রানস্ফার করিয়ে দেবো।
- না,না, স্যার আপনি দায়িত্ব দিয়েছিলেন...
- থানার ইনচার্জ আমি না আপনি?
শিহরণ বাবুর ধমকে জগন্নাথবাবু কেঁচো হয়ে যান। কৌশিক গোঁফের তল দিয়ে ফিক করে হাসে, আই সি হরিসাধন বলে ওঠে - স্যার ওয়াগন থেকে কয়লাচোর দুজনকে ধরেছি , লক আপে আছে।
- গুড কিন্তু কয়লা কতোটা পেলি ?
- তা ত্রিশ চল্লিশ বস্তা হবে।
- বেশ করেছিস। কয়লার বস্তা রেখে ওদের ছেড়ে দে।
হঠাৎ ঘরে ঢোকে সেকেন্ড অফিসার তপন হোড়। চারিদিকে একবার তাকিয়ে শিহরণ বাবুর কাছে এসে বলে কনফিডেনসিয়াল স্যার।
- ওকে বলো।
- স্যার ফ্লাডের জন্য দু ট্রাক কম্বল এসেছে ব্লকে, সেগুলো ভানুর গোডাউনে নামিয়েছি.
- শিহরণবাবু এক মুহূর্ত ভেবে নেয়, ঘরের সবাইকে বাইরে যেতে ইশারা করে। তারপর তপনবাবুকে বলেন
- আজকে ওয়েট কারো, আমাদের চোখে ধুলো দেওয়া?
- ওকে স্যার।কিন্তু স্যার দু নম্বরি ব্যাপার কিছু আছে?
- একটাই প্ল্যান, কম্বলের সাইট থেকে আট ইঞ্চি কাটপিস বের করে নেবো।
- রাতে রফিজুল গাড়ি নিয়ে রেডি থাকবে। সকাল হওয়ার আগেই বর্ধমান কার্জনগেটে বিনোদের গোডাউনে পৌঁছে দেবে। ওখানে ঝন্টু শেখ থাকবে।কিন্তু তার আগেই আমাদের অভিযান শুরু করতে হবে.
- স্যার ঐ কাটপিস কি কাজে লাগবে?
এবার শিহরণবাবু মুচকি হেসে বলেন - এই বুদ্ধি নিয়ে পুলিশের চাকরী করছো ? আরে গাধা ওগুলো এ-ওয়ান কোয়ালিটির মাফলার।
মিনিমাম হান্ড্রেড রুপিস। মানে হানড্রেড ইন্টু টেনথাউজেন্ট - টোটাল কতো,
- তা প্রায় লাখ খানেক ।
- গুড, ম্যাথে ভালোই ছিলে। কিন্তু সেটা আজ হবে না।
- ওকে স্যার.
- এক নাইটে পকেট গরম.
- আপনি জিনিয়াস স্যার।
হঠাৎ শিহরণবাবুর মোবাইল বেজে ওঠে, হ্যালো, কে বলছেন ? কে ? ফেকু ? বসন্ত বাউড়ীর লোক? কি হয়েছে ? পশ্চিম পাড়ার রেল কলোনিতে মার্ডার হয়েছে ? ঠিক আছে তোরা পাড়ায় থাক। আর বসন্তকে বল আমায় ফোন করতে ।
ফোন রেখে শিহরনবাবু জগন্নাথ বাবুর দিকে তাকায়। বলে - তুমি এখুনি চারটে ফোর্স নিয়ে সেন পাড়া থেকে ফেকুকে তুলে আনো।
- কিন্তু স্যার, ফেকু তো বসন্ত বাউড়ীর লোক।
- আগে ছাগলকে খোয়ারে ঢোকাই, তারপর মালিককে দৌড় করাবো।
- স্যার, বসন্তের শত্রু গোকুল আপনার কাছে এলো বলে। ওর লোক মার্ডার হয়েছে, ছেড়ে দেবে।
- ব্যাটা আসুক এক পার্টিতে থেকে খুনোখুনি? কথায় আছে বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর পুলিশে ছুঁলে বত্রিশ ঘা, এমন দমদম দাওয়াই দেবো, আসুক থানায়। দক্ষিণা নেব গঙ্গাজলও ছেটাবো।
কথা শেষ হতেই ফোন বেজে ওঠে, হ্যালো, না থানাতেই আছি,কত টাকা? কত টাকা? ষোলো হাজার, ঠিক আছে। বিতানকে বলো কোচিং, এ ভর্তি হতে। টাকাটা ফ্যাক্টর না। কি,? তোমার মায়ের পেসমেকারের ব্যাপার? হয়ে যাবে, এতো টেনশন নিচ্ছ কেন? অপারেশন আর মেশিন নিয়ে লাখ দেড়েক যথেষ্ট। ওটা এ মাসেই জোগাড় করে নেবো। না-না দুপুরে রেড আছে। তোমরা খেয়ে নাও। কথা শেষ করে শিহরণ বাবু ফোন রাখে। জগন্নাথ বাবু গদগদ হয়ে বলে, স্যার শুনেছি আপনার ছেলে ব্রিলিয়ান্ট, বরাবর ফার্স্ট হয়ে এসেছে। আপনার মতোই বড় অফিসার হবে।
না না ও টিচার হতে চায়। মিশনের পড়াশুনো, খাঁটি রত্ন তৈরি হয়েছে। অবশ্য তার পিছনে খরচ তো কম হয়নি। সারা জীবনের ডানহাত বাঁহাতের সবটাই ছেলের পিছনে গেছে।
কথা শেষ করে শিহরণ বাবু সিগারেট ধরায়। লম্বা একটা সুখ টান দিয়ে বাতাসে ধোঁয়া ছাড়ে। মুড ভালো দেখে জগন্নাথবাবু আমতা আমতা করে বলে, স্যার উপপ্রধানের কেসটা আবার কোর্টে উঠেছে। এবারও কি ড্রপ দেবো ?
- ওরা কি সেটেলমেন্ট করেছে? কত দেবে?
- চল্লিশ বলছে। কথা শুনে শিহরণবাবু নড়ে বসে।
- মানে, ইম্পসিবল। কুড়ি লাখের ঘাবলা, ওদের বলো ফরর্টি সিক্সটি। নয়তো নেক্সট ডেটে তুমি কোটে হাজির দাও, কেস যা সাজানো আছে, তাতে পাঁচবছর ঘানি টানবেই। আর যদি মেনে নেয়, তুমি অ্যাবসেন্ট থাকবে, তাতে বেল পেয়ে যাবে। রফা হলে ফাইল চেঞ্জ করে দেবো, তুমি কেসটা নলেজে রেখো।
- ওকে স্যার, সেটেল করে দিচ্ছি।
- তাহলে নেক্সটমাসে ছেলের বাইক কিনতে পারবে। আর শখ আহ্লাদ পরের পয়সাতেই করতে হয়।
জগন্নাথের মুখে হাসি রেখা ফুটে ওঠে। শিহরণ বাবু ওর কাধে হাত রেখে বলে- যাও কাজে মন দাও, বি সিরিয়াস। আর টমকে গাড়ি বের করতে বলো, কারখানার বস্তিতে যেতে হবে। রোজ জুয়ার ঠেক বসছে।
- ওকে স্যার বলে দিচ্ছি।
পর্ব -৩
সকাল থেকেই মিশন বিদ্যামন্দিরে সাজো সাজো রব। আজ বিবেকানন্দের জন্মদিন। খুব ভোরে বারোশো স্টুডেন্ট নিয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিতান বাবু বর্ণাঢ্য প্রভাত ফেরি দিয়ে অনুষ্ঠান সূচনা করে। স্বামী বিবেকানন্দের নানারূপের কাটআউট, শিকাগো ধর্মসভা, বেলুড় মঠ, বিবেকানন্দ রক,- এসব ছবির পাশাপাশি গেরুয়া টুপি পাগড়ি সেইসঙ্গে স্বামীজীর লেখা কবিতা গান নিয়ে বিভিন্ন জনপদ পরিক্রমা করে স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা। অপূর্ব শোভাযাত্রা দেখতে রাস্তার দুধারে মানুষের ঢল নামে। জানালায়, ছাদে,গাছের ডালে উপচে পরা ভিড়, এলাকার সকলে একবাক্যে স্বীকার করে, নতুন হেডমাস্টার আসার পর স্কুলের সবকিছু বদলে গেছে।
শোভাযাত্রা শেষে একদল ছাত্রছাত্রী ফল,মিষ্টি, শুকনো খাওয়ার নিয়ে হাসপাতালে রোগীদের বিতরণ করতে যায়। এদিকে শিক্ষক শিক্ষিকারা ছাত্র-ছাত্রীদের আলাদা ঘরে রিহার্সাল শুরু করে। আজ সকল ছাত্রছাত্রী, শিক্ষকদের স্কুলেই খাওয়া দাওয়া। সবাই খুব খুশি। একদল ছাত্রকে নিয়ে পলাশ স্যার রান্না শুরু করে দিয়েছে। ছজন রাঁধুনী। মেনুতে ভাত, মাছ, আলুপটলের দোড়মা, বেগুনী, আর শেষ পাতে দরবেস।
অন্যান্য শিক্ষকেরা কমনরুমে গল্পে মশগুল। ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপে সকালের শোভাযাত্রা নিমেষে, বিশ্বময় হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ হেডস্যার ঢোকেন। ধুতির উপর সাদা সিপন সুতোর কাজ করা গরদের পাঞ্জাবী ভিজে চুপচুপ।
- আপনারা যখন সকলে আছেন, তখন বিকালের অনুষ্ঠানের হোমওয়ার্ক সেরে ফেলি। তার আগে দীপেনবাবু বলুন, বিবেকানন্দের মূর্তি বসানোর কাজ কমপ্লিট ?
- হ্যাঁ বিতান, তুমি একবার দেখে আসতে পারো।
- না-না ঠিক আছে, আসলে শিক্ষামন্ত্রী আসছেন,সবটাই যেন সুন্দর হয়। পাশ থেকে ইতিহাসের প্রবীণ শিক্ষক অভয় স্যার বলেন, বিতান যাই বলো, শিল্পীর হাতের কাজ খুব সুন্দর আর নিখুঁত। বিশেষ করে চোখ দুটো, শান্ত নির্মল, তেজদীপ্ত, সেই সঙ্গে বৈরাগ্যের অপূর্ব প্রকাশ। একবার তাকালেই মন পবিত্র হয়ে যাবে।
সহ শিক্ষকরাও সকলে সাপোর্ট করে। বিতান স্বস্তি বোধ করে, মুখে এক নির্মল হাসি ফুটে ওঠে। বলে সব কিছুই সম্ভব হয়েছে আপনাদের এবং স্টুডেন্টদের জন্য। অনুষ্ঠানকে সফল করার জন্য প্রায় দু'মাস ধরে আপনাদের পরিশ্রম - কথা শেষ না হতেই বাংলার শিক্ষক সৌমজিৎ বাবু বলেন - তুমি যাই বলো বিতান, তোমার শিক্ষারত্ন পাওয়ার পরই আমাদের আগ্রহটা বেড়ে গেছে। স্কুলের নাম সকলের মুখে মুখে। আদর্শ শিক্ষক না হলে ভালো ছাত্রছাত্রী গড়ে উঠবে কি করে ? তুমি আমাদের গর্ব।
বিতান নিজের নাম শুনে লজ্জিত হয়। বিনয়ের সঙ্গে বলে - আমার পুরস্কারের ষোলআনা কৃতিত্বই আপনাদের, ছাত্র-ছাত্রীদের। পুরস্কারটা প্রধান শিক্ষক রুপে পেয়েছি। যেখানে স্কুলের অসামান্য সাফল্য বড় কথা। ব্যক্তি নয় স্কুলই বড়। অনুষ্ঠান শেষ করে কাল আমরা সকলে বসবো, আগামী একবছরের পঠন- পাঠন ডেভেলপমেন্ট রূপরেখা তৈরী করবো।
সবাই সম্মতি জানায়। জগদীশবাবু বলেন, আমিতো আর ছমাস আছি, তারপর রিটায়ার্ড করবো, শেষ বেলায় এসে তোমাকে প্রধান শিক্ষক রূপে পেয়ে আমি সত্যিই আনন্দিত।
বিতান সস্নেহে বলে - স্বামীজীর কথাটা আজ বড় বেশি করে মনে পড়ছে জগদীশবাবু। তিনি বলেছিলেন - সমাজের অনুমোদন ও প্রশংসা পেলে নির্বোধ ব্যক্তিও বীরোচিত কাজ করতে পারে। কিন্তু কারো স্তুতি প্রশংসা না চেয়ে অথবা সেদিকে আদৌ দৃষ্টি না দিয়ে সর্বদা সৎকাজ করাই প্রকৃতপক্ষে সর্বশ্রেষ্ঠ স্বার্থত্যাগ।
অবশেষে পশ্চিমের আকাশ লাল থাকতে থাকতেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। একটু আগেই শিক্ষামন্ত্রী বিবেকানন্দের আবক্ষমূর্তির আবরণ উন্মোচন করে গেছেন। রাজনৈতিক ব্যস্ত মানুষ তবু কথার দাম রেখেছেন। সবুজ প্রশস্ত স্কুল মাঠ। তার উত্তর ও পশ্চিমদিকে সারিবদ্ধ গাছপালা। কৃষ্ণচূড়া, আকাশমণি, শিমুল, কদম, রাধাচূড়া যেন হাত ধরাধরী করে গুডবয়ের মতন দাঁড়িয়ে আছে। দক্ষিণ কোণে বিরাট স্টেজ তৈরী হয়েছে। সামনে গাদা চেন সাজানো, পিছনের ব্যাক স্ক্রিনে রজনীগন্ধার বিনুনী। মেরুন কাপড়ে ফুলের সমারোহ। রজনীগন্ধার থোকা লাগানো ঠিক মাঝখানে লন্ডনের আলফ্রেড এলিশ স্টুডিওতে ১৮৯৬ তে তোলা গেরুয়া বসন পড়া স্বামীজীর বিখ্যাত ছবি, হাত দুটো সামনে ভাজ করা। নিচে দুটো লাইন - দেশের একটি কুকুর পর্যন্ত যতক্ষণ অভুক্ত থাকবে, ততক্ষণ আমার ধর্ম হবে তাকে খাওয়ানো এবং তার সেবা করা। এই লাইনটা হেডস্যার সিলেক্ট করে দিয়েছে।
মাঠের চারিদিকে বিবেকানন্দের জীবনের নানা মুহূর্তের কাট আউট দাড় করানো হয়েছে, নিচে স্বামীজীর বাণী। স্টেজের সামনে হাজার খানের চেয়ার। সবই ভরে গেছে। অভিভাবকরা মাঠের চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। অতিথিরা একে একে বিবেকানন্দের ক্যানভাসে মালা চড়ায়। ভাব-গম্ভীর পরিবেশ, প্রথমেই স্কুল পরিচালন কমিটির সভাপতি ডা: সৌরেন সেন বিবেকানন্দের মহান আদর্শের কথা তুলে ধরেন। তিনি স্বামীজীর কোমল হৃদয়ের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে একটি গল্প শোনালেন । জনৈক প্রিয়জনের মৃত্যু সংবাদ শুনে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ অঝোর নয়নে কাঁদছিন । পাশ থেকে একজন মন্তব্য করলেন, সন্ন্যাসীর পক্ষে শোকপ্রকাশ অনুচিত। তৎক্ষণাৎ স্বামীজী চোখের জল মুছে উত্তর দিলেন, সন্ন্যাসী হইয়াছি বলিয়া হৃদয়টা বিসর্জন দেব? সন্ন্যাসীর হৃদয় বরং বেশি কোমল হওয়া উচিত।
সাথে সাথে ছাত্রছাত্রীরা করতালি দিয়ে উঠলো, সৌরেন সেন এক মুহুর্ত থেকে আবার স্বামীজীর উক্তি শুরু করলেন। যে সন্ন্যাসে হৃদয় পাষাণ করতে উপদেশ দেয়, আমি সেই সন্ন্যাস গ্রহণ করি না।
উপস্থিত অতিথি সকল বাহ ! বাহ ! করে ওঠে। হঠাৎ বিতানের ফোন বেজে ওঠে, হ্যাঁ মা বলো, বাবা আমার অনুষ্ঠানে এসেছে? খুব ভালো, না- না তুমি টেনশন করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমরা সাবধানে বাড়ি ফিরো। আমার যেতে রাত হবে। শোনো মা, আমি আর মোবাইল ধরতে পারবোনা। রাখছি।
একে একে নাচ গান পুরস্কার বিতরন শেষ করে ঘোষক অবনীবাবু বলেন - সম্প্রতি আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিতান বসু রাজ্য সরকারের 'শিক্ষারত্ন' সম্মানে ভূষিত হয়েছেন, সবার প্রিয় হেডস্যারের জন্য সমগ্র স্কুল আজ গর্বিত। স্বামীজীর এই জন্মদিনে বিতানবাবুকে কিছু বলার জন্য মঞ্চে ডেকে নিচ্ছি ।
বিতান মোবাইল সাইলেন্ট করে লাউড স্পিকারের সামনে আসে, সামনে মাঠভর্তি ছাত্রছাত্রীদের নির্মল সুন্দর কচিকাঁচা মুখ, দুদিকে সারিবদ্ধ অভিভাবক, দূরে সবুজ গাছের ধ্যান মগ্ন রূপ আর চারিদিকে নানারূপে বিবেকানন্দের কাটাআউট দেখে মনের গভীরে একটাই জিজ্ঞাসা, মাত্র উনচল্লিশের এক যুবক বিশ্ববাসীকে যে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তিনিই প্রকৃত হেডমাস্টার। তাঁর উদ্দেশ্যে প্রণাম করে বিতান শুরু করে - আমার পিছনে এক মহাসন্ন্যাসী আর সামনে অসংখ্য বিলে যারা কেউ শান্ত, কেউ দুরন্ত তাতে কি? বিবেকানন্দও ঠিক তোমাদের মতোই ছিলেন। বরং একটু বেশি দুরন্ত। তাইতো বিলের মা বলেছিলেন, চেয়েছিলাম শিবকে, পেলাম ভূতকে।
উপস্থিত ছাত্রছাত্রীরা হো-হো করে হেসে ওঠে। মজা পায়। বিতান দুহাত তুলে শান্ত হতে বলে। বিনম্রগলায় আবার বলা শুরু করে - শিক্ষা মানুষকে মনুষ্যত্বের রূপ দেয়। ঈশ্বর আমাদের শরীর দিয়েছেন। বাকি সবাটাই হল জ্ঞান উপলব্ধি যা শিক্ষা থেকে প্রাপ্ত। তাই তো বিবেকানন্দ বলেছেন - তোমরা তুচ্ছ নও; দুর্বল নও, তোমরা অমৃতের সন্তান, তোমরা আনন্দ শক্তির অধিকারী।
উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রী অভিভাবক, শিক্ষক সকলেই চুপ করে শোনে। বিতানের ফর্সা গোল মুখমন্ডল, ছোট করে কাটা চুল, দোহারা চেহারা সেই সঙ্গে দীপ্ত কণ্ঠে- সকলেই যেন হেডস্যারের মধ্যে স্বামীজীর আদর্শকে খুঁজে পায়। মাত্র একবছর এসেই স্কুলের পরিবেশ পঠনপাঠন পাল্টে দিয়েছে। চারদিকে ফুলের গাছ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন স্কুল, ডিসিপ্লিন, রোজ মেরিটেশন, শরীরচর্চা, এক কথায় তার আদর্শ যেন স্কুলের প্রতিটি ছাত্রছাত্রীদের শিরা উপশিরায় প্রবাহিত হচ্ছে। স্কুল টাইমের পর দুর্বল স্টুডেন্টদের স্পেশাল ক্লাস নেওয়া, খেলাধুলা, গানবাজনা, নাটক, আবৃত্তি, অভিনয় আলাদা গ্রুপ করে তাদের উৎসাহিত করা এমনকি সন্ধ্যের পর দুঘন্টা অভাব অভিযোগ শোনা - এসব কর্মকান্ড দেখে এলাকার লোকজন এক বাক্যে স্বীকার করে, বাবা দারোগা হলেও ছেলেকে আদর্শবান রূপে গড়ে তুলেছেন ।
পর্ব -৪
রাত্রি দশটা কুড়ি, অনুষ্ঠান অনেকক্ষণ শেষ হয়েছে। উপস্থিত সকলে বাড়ি চলে গেছে। কমনরুমে বিতান জগন্নাথ বাবু আর ঘন্টা বাজায় সুনীল কথা বলছে। জগন্নাথবাবু তাহলে আপনি রাতে থাকছেন ?
হ্যা বিতান এ ছাড়া উপায় কি ? পায়রাডাঙ্গার শেষ খেয়া দশটায়, তারপর বাস। সুতরাং বাড়ি পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ওকে, তাহলে সুশীল, তুমি ল্যাবরেটরী রুমে স্যারের শোয়ার ব্যবস্থা করে দাও ।
সুশীল ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়।
জগন্নাথবাবু বলেন, তাহলে দাঁড়িয়ে রইলি কেন? চট করে যা। তবু সুশীল দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু একটা বিতানকে বলতে যাবে। বিতান বলে ওঠে - কি, সুশীল কিছু বলবে ?
-রাত হচ্ছে স্যার, মেয়ের কলেজে ভর্তির ব্যাপারটা...
ওহো, কালতো টাকা লাগবে। কত যেন?
-ছ হাজার স্যার ।
- ঠিক আছে, তুমি কাল সকাল আটটায় আমার বাড়ি চলে এসো । আমি না থাকলেও আমার মায়ের কাছে টাকা রাখা থাকবে।
- ঠিক আছে স্যার। ধান উঠলেই - সুশীলের কথা শেষ হয় না। বিতান বলে ওঠে, শোধ কেন ? ওটা তো আমি বনানীকে গিফট করলাম । কতো ভালো রেজাল্ট করেছে। তিনটেতে লেটার মার্কস। আমাদের স্কুলের গর্ব। ওর জন্য এইটুকু করতে পারবো না?
কথা শুনে সুশীল আনন্দে চোখ মুছতে মুছতে দ্রুত চলে যায়। জগন্নাথবাবু টিপ্পুনি দেয়, বিতান তুমি কিন্তু এইসব শ্রেণীর লোকদের চেনো না। এরা তোমার টাকা কোনদিন শোধ দেবে না।
- সেতো আমি আশা করিনি। আর আমার গচ্ছিত টাকা যদি সমাজের কাজে লাগে, তাতে তো সমাজের মঙ্গল।
- এবার জগন্নাথবাবু বেশ কর্কস স্বরে বললেন, দেখো বিতান অর্থ সাহায্য করে কোনদিন সমাজের উপকার হয় না,তুমি বরং
- আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি কিন্তু যে দেশে ষাট শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে সেখানে অর্থনৈতিক সহযোগিতা একটা বড় দায়। আর টাকাতো পেট চালানোর জন্য দিচ্ছি না শিক্ষার জন্য দিচ্ছি।
- সেকি তুমি দেখতে গেছো ?
- কেন দেখবোনা, ওতো ফর্ম দেখিয়েছে। আর কালনা কলেজের ওয়েবসাইট আমিই দিয়েছি।
জগন্নাথ বাবু হেরে যাওয়া বেড়ালের মতো অন্য দিকে তাকিয়ে ফুসতে থাকে। বলে তোমার টাকা তুমি যা পারো করো। দানছত্র বেশি ভালো না। বিতান আলতো হেসে বলে, জগন্নাথবাবু বিবেকানন্দই বলেছেন - যারা ভালো হতে কিংবা ভালো কাজ করতে চেষ্টা করছে, তাদের সাহায্য কর। জগতের ঘৃণা ও উপহারের দিকে আদৌ লক্ষ্য না রেখে অকুতোভয়ে নিজ কর্তব্য করে যেতে হবে।
হঠাৎ বিতানের খেয়াল হয় মোবাইলটা সাইলেন্ট হয়ে আছে। নরমালে আনে। কিন্তু বাড়ি থেকে আটটা মিসকল, কি ব্যাপার। বুকের ভিতরটা কু ডাক দেয়, বাবা মা কারো শরীর খারাপ হলো? পরক্ষণেই ভাবে না-না রাত হয়েছে আমাকে পায়নি বলে মা বার বার ট্রাই করেছে। জগন্নাথ বাবু বলে, তাহলে বিতান আমি ল্যাবে যাই, তুমি বাড়ি গিয়ে রেস্ট নাও।
বিতান বারান্দায় আসে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বাড়িতে ফোন করে। এনগেজড পায়। বাইক বের করে স্টার্ট দেয়। মাত্র দশ মিনিটের পথ। হুস করে চলে আসে। গেটে ঢুকতেই দেখে উঠোনে জটলা, বিপুল কাকা, মধুজ্যাঠা, গুপি সকলে বিতানকে দেখে কাছে আছে। বাইকের শব্দ পেয়ে মা ঘর থেকে ছুটে এসে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। তোর বাবাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় আবার চলে গেলো। রাস্তায় কি বিপদ ঘটাবে।
- ঠিক আছে কান্নার কি আছে ? আশে পাশে কোথায় গেছে, চলে আসবে।
- দিব্যি সন্ধ্যেবেলার স্কুলের অনুষ্ঠান দেখছিল। নাচ-গান শুনলো। তোর বক্তৃতা শুরু হতে উঠে পাশে দাঁড়াল। আমি ভাবলাম অতক্ষণ বসে তাই হয়তো দাঁড়িয়েছে। আমি চেয়ারে বসেছিলাম ।
- তারপর। তুমি কখন বুঝতে পারলে ? বিতান জিজ্ঞেস করে।
- তোর কথা শেষ হতেই আমি বেরিয়ে খোঁজাখুঁজি করি। না পেয়ে বাড়ি আসি।
- বিতান ব্যস্ত হয়ে জানতে চায়, বাবা কি বাড়ি এসেছিল?
- হ্যা মনে হয়। কারণ সদর খোলা, গোলঘরে বাবার আলমারিও লন্ডভন্ড। আলনার জামা প্যান্ট এলোমেলো।
পাশ থেকে মধুজ্যাঠা বলে - মাথা খারাপ হলে যা হয়। গুপী,সায় দেয়। আগেই ডাক্তার দেখানো উচিত ছিল ।
বিতান কিছু না বলে মাকে নিয়ে সোজা ঘরে চলে যায়। যেতে যেতে বলে, জ্যাঠা তোমরা একটু দাঁড়াও, আমি আসছি। মা ছেলেতে তিনতলায় যায়। গোলঘরটা একসময় দাদু দিদুন
থাকতো।
দিদুন মারা যাওয়ার পর দাদু একাই থাকতো। কিছু বইপত্র, রামকৃষ্ণ সারদা বিবেকানন্দের বাঁধানো ফটো। আর দিদুনের শখের মেহগুণী কাঠের ড্রেসিং টেবিল। এই ছিল গোল ঘরের আসবা. ব , আর ছিল দাদুর শিকার করা দুটো হরিণের শিং।
বিতান ঘরে একবার চোখ বুলিয়ে বুঝতে পারে বাবা ঘরে এসেছিল এবং জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করেছে। মা ধপ করে খাটে বসে। বিতান টেবিল, আলমারি আলনা ভাল করে দেখে। কিছু বুঝে উঠতে পারে না। জিজ্ঞাসা করে - মা,বাবার আটপৌরে জামা কাপড় ঠিক আছে?
- হ্যাঁ ঐ তো আলনায়।
- এবার দেখো, আলমারিতে তোলা জামাকাপড় ঠিক ঠাক?
- মা উঠে দেখে বলে, এইতো ছটা সার্টের চারটে আছে। প্যান্ট পাঁচ-ছয়টা ছিল, দুটো আছে, গেঞ্জি গুলো নেই।
- তার মানে বাবা জামাকাপড় নিয়ে কোথাও - কথা শেষ হয় না মা চেঁচিয়ে ওঠে -ও বিতান টুরিস্ট ব্যাগটা সকালে বাবা উপরে আনে, দুপুরে আমি এই খাটের কোনায় দেখেছি এখন নেই।
বিতান খোলা জানালায় চোখ রাখে। বাইরে চারদিক অন্ধকার। দূরে ডাক্তারবাবুদের আমবাগানে বিশাল গাছগুলো দৈত্যাকারে দাঁড়িয়ে। অনুদের বাড়ির কুপির আলো তির তির করে কাঁপছে। রাত জেগে মা বেটিতে বিড়ি বাঁধে। নিতাই গয়লার গাইটা সমানে ডাকছে। বিতানের এই প্রথম মনের গভীরে একটা চাপা ভয় উঁকি মারে। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে শিশুর মতো কেঁদে ওঠে। শুধু অশ্রুজল বাইরে আসে না। চোখ ভেজে না। ভেজা বসনের মতো ধীরে ধীরে বাষ্পায়িত হয়। হঠাৎ একটা ভাঁজ করা কাগজ দিয়ে বলে, দেখতো বিতান বালিশের নিচে থেকে পেলাম। বিতান ভাঁজ খোলে। বাবারই হাতের লেখা। তবে লাইন বেঁকে গেছে, মা সুধায় বাবার চিঠি জোরে পড়
- শ্রীমান বিতান, আজ স্কুল মাঠে তোমার বক্তৃতা শোনার পর নিজের প্রতি ঘৃনায় স্থির থাকতে পারলাম না। তোমার সততা, শিক্ষার প্রতি দায়িত্ব কর্তব্য এবং শিক্ষারত্ন সম্মান গর্বিত পিতা হিসেবে আমিই ষোলআনা অংশীদার।
কিন্তু পরক্ষণেই যখন মনে পড়ল আমার অসৎ পথের উপার্জিত অর্থে তোমার এই গৌরবময় বর্তমান, তখন লজ্জায় ঘৃণায় আমি তোমার সামনে দাঁড়াতে পারছিলাম না। তাইতো তুমি নর্থ বেঙ্গল থেকে ট্রান্সফার আসার এখানে আসার পরে আমি গোল ঘরে গৃহবন্দি হয়ে গেলাম। জীবনের সব বিলাসিতার পর নিজের মিথ্যে মর্যাদা সম্মান নিয়ে যখনই তোমার সামনে দাড়িয়েছি তখন লজ্জায় মাথা হেট হয়ে গেছে। - বিতান থামে
পাশে দাঁড়ানো মা ডুকরে কাঁদছে। বিতান চিঠি পড়ে চলে, আজ বুঝতে পারি, কালো টাকার মিথ্যে বেসাতি করে কোনদিন প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। আর যখন সেই কথাটা মাইকে তুমি সবাইকে বলছিলে, তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম এক মুহূর্তে আর এখানে থাকা যাবে না। প্রথমে ভেবেছিলাম আত্মহত্যা করবো, কিন্তু তোমার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত বদল করলাম। আমি চলে যাচ্ছি বিতান, মাকে দেখো। আমি বেঁচেই থাকবো. কিন্তু আমার খোঁজ কোরো না।
বিতান ধপ করে বসে পরে । মা চোখের জল মুছে বিতানের মাথায় হাত বোলায়। বলে, শরীর খারাপ লাগছে ?
বলেই মা অঝোরে কাঁদতে থাকে। বিতান বাকরুদ্ধ হয়ে যুগনায়কের মুখটা একবার দেখে, বুকের গভীর থেকে জগদ্দল পাথরটা এক নিমেষে সরিয়ে জিজ্ঞেস করে - হে সন্ন্যাসীী, তোমার আদর্শ কেন মায়ের চোখে জল এনে দিল ?







Comments