top of page

PCOS নয়, এখন PMOS | মাছে-ভাতে | তারুণ্য ফেরাতে ফেস যোগা | রবিবারের গল্প: দেবাংশী কন্যা


PCOS নয়, এখন PMOS: বদলেছে শুধু নাম, নাকি বদলাচ্ছে নারীর স্বাস্থ্য-ভাবনাও?


নিবেদিতা সাহা (রিসার্চার)


সকাল সাতটা। অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছাড়তে মন আর চায় না ,অফিসে যেতে হবে, সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হবে, নয়তো ঘরের কাজ সামলাতে হবে। কিন্তু শরীর যেন নিজের মতো চলছে না। ক্লান্তি, হঠাৎ করে ওজন বেড়ে যাওয়া, অনিয়মিত মাসিক,কিন্তু এত ব্যস্ততার মধ্যে নিজের শরীরের কথা ভাবার সময় কোথায়? তার মধ্যেই ঘন ঘন মেজাজের পরিবর্তন—এসবকে অনেক নারীই ব্যস্ত জীবনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বলে ধরে নেন।



কিন্তু যদি এই লক্ষণগুলোর পেছনে লুকিয়ে থাকে আরো অনেক কিছু যা অজান্তেই শরীরের ক্ষতি করছে বহু বছর ধরে আমরা এই অবস্থাকে চিনতাম PCOS বা Polycystic Ovary Syndrome নামে। আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসেছে নতুন নাম—PMOS (Polyendocrine Metabolic Ovarian Syndrome)।দীর্ঘদিন ধরে PCOS বা Polycystic Ovary Syndrome নারীস্বাস্থ্যের অন্যতম আলোচিত একটি বিষয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা উপলব্ধি করেছেন যে এই নামটি রোগটির প্রকৃত জটিলতা এবং ব্যাপ্তিকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরে না। সেই কারণেই বর্তমানে PMOS বা Polyendocrine Metabolic Ovarian Syndrome নামটি সামনে এসেছে। নতুন নামের প্রতিটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে রোগটির প্রকৃত পরিচয়। "Polyendocrine" নির্দেশ করে শরীরের একাধিক হরমোন-নিয়ন্ত্রণকারী গ্রন্থির সম্পৃক্ততা, "Metabolic" বোঝায় বিপাকীয় বা মেটাবলিক সমস্যার উপস্থিতি এবং "Ovarian" ডিম্বাশয়ের সঙ্গে এর সম্পর্ককে নির্দেশ করে। অর্থাৎ PMOS কেবল ডিম্বাশয়ের একটি সমস্যা নয়; এটি পুরো শরীরের হরমোন এবং বিপাকীয় ব্যবস্থার একটি জটিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘটনা বলেই মনে করা হয় PMOS-এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো হরমোনের ভারসাম্যহীনতা। আক্রান্ত নারীদের শরীরে প্রায়শই অ্যান্ড্রোজেন বা তথাকথিত "পুরুষ হরমোন"-এর মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। এর ফলে মুখে বা শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানো, ব্রণ, মাথার চুল পাতলা হয়ে যাওয়া কিংবা চুল পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে ডিম্বস্ফোটনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় মাসিক অনিয়মিত হয়ে যায় অথবা দীর্ঘ সময় মাসিক বন্ধও থাকতে পারে।


তবে PMOS-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং উদ্বেগজনক দিক হলো ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স। অনেক ক্ষেত্রে শরীর ইনসুলিন হরমোনকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয় এবং ধীরে ধীরে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ এবং ফ্যাটি লিভারের মতো সমস্যার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়। এই কারণেই আধুনিক চিকিৎসকেরা PMOS-কে শুধু প্রজননস্বাস্থ্যের রোগ হিসেবে নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ মেটাবলিক ডিসঅর্ডার হিসেবেও বিবেচনা করেন।



বর্তমান যুগের জীবনযাত্রা PMOS-এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া, অনিয়মিত ঘুম এবং ক্রমাগত মানসিক চাপ এই অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষত কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায়, ব্যস্ততার কারণে তাঁরা নিজের স্বাস্থ্যের প্রতি পর্যাপ্ত মনোযোগ দিতে পারেন না। ফলস্বরূপ উপসর্গগুলো ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং অনেক সময় রোগ নির্ণয়ে দেরি হয়ে যায়।



PMOS-এর প্রভাব শুধু শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়; মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ওজন বৃদ্ধি, চুল পড়া, ত্বকের সমস্যা কিংবা সন্তান ধারণে জটিলতার কারণে অনেক নারী আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। উদ্বেগ, হতাশা, মানসিক চাপ এবং বিষণ্নতার হারও আক্রান্ত নারীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। তাই বর্তমানে PMOS-এর চিকিৎসায় শুধু ওষুধ নয়, মানসিক স্বাস্থ্যকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়।



চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে PMOS সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও এটি সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। নিয়মিত ব্যায়াম, সুষম খাদ্যাভ্যাস, ওজন নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে উপসর্গ অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। অনেক ক্ষেত্রে মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমানোই হরমোনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে এবং মাসিক নিয়মিত করতে সাহায্য ।


আজকের কর্পোরেট জগতে কর্মরত নারীরা এক অনন্য দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে কর্মক্ষেত্রে নিরন্তর প্রতিযোগিতা, নির্ধারিত সময়সীমার চাপ, দীর্ঘ মিটিং, লক্ষ্যপূরণের দায়িত্ব; অন্যদিকে পরিবার, সন্তান, সমাজ এবং নিজের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই বহুমাত্রিক চাপের মাঝে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত হয় নিজের শরীর। অথচ PMOS-এর মতো হরমোন ও বিপাকীয় সমস্যার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে।



অনেক কর্মজীবী নারীর দিন শুরু হয় এক কাপ চা বা কফি দিয়ে, কিন্তু সকালের পুষ্টিকর নাশতা আর খাওয়া হয় না। অফিসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর, তারপর দীর্ঘ মিটিংয়ের ফাঁকে তাড়াহুড়ো করে খাওয়া, সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফেরা এবং রাত জেগে মোবাইল বা ল্যাপটপে কাজ—এই চক্র ধীরে ধীরে শরীরের জৈবিক ঘড়িকে বিঘ্নিত করে। ফলস্বরূপ ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, ওজন বৃদ্ধি, ক্লান্তি এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা আরও প্রকট হতে পারে।


তবে সুসংবাদ হলো, ব্যস্ততার মধ্যেও কিছু ছোট কিন্তু সচেতন অভ্যাস PMOS নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সাহায্য করে প্রথমত, খাবারের সময়সূচি নিয়মিত রাখা জরুরি, ডিম, ওটস, ফল, দই বা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার দিনের শুরুতে শক্তি জোগায় এবং রক্তে শর্করার ওঠানামা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, দ্বিতীয়ত, দীর্ঘক্ষণ একটানা বসে থাকা এড়াতে হবে। প্রতি এক ঘণ্টা অন্তর অন্তত পাঁচ মিনিট হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা বা ডেস্কের পাশে হালকা স্ট্রেচিং শরীরের বিপাকীয় কার্যকলাপ সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে, তৃতীয়ত, ঘুমকে বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন হিসেবে দেখতে হবে। অনেক নারী মনে করেন কাজ শেষ করাই অগ্রাধিকার, ঘুম পরে হবে। কিন্তু PMOS-এর ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে কর্টিসল ও ইনসুলিনের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো এবং অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।চতুর্থত, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য। কর্পোরেট জীবনের চাপ পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়, কিন্তু তা সামলানোর পদ্ধতি শেখা যায়।



সবচেয়ে বড় কথা, কর্মজীবী নারীদের বুঝতে হবে যে নিজের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া কোনো স্বার্থপরতা নয়। বরং সুস্থ শরীর ও সুস্থ মনই দীর্ঘমেয়াদে কর্মক্ষেত্রে সাফল্য, পারিবারিক দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। PMOS আমাদের সেই কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়—নিজের যত্ন নেওয়া মানে শুধু অসুস্থতা এড়ানো নয়, বরং নিজের সম্ভাবনাকে দীর্ঘস্থায়ী করা।

মাছে-ভাতে


বাঙালির রসনাতৃপ্তির কথা উঠলেই প্রথমেই মনে আসে—মাছ আর ভাত। এই দুইয়ের মিলনেই গড়ে উঠেছে বাংলার চিরন্তন খাদ্যসংস্কৃতি। নদী-নালা, খাল-বিলের অফুরন্ত মাছ আর ধানের সোনালি শস্য বাঙালির রান্নাঘরকে যুগে যুগে সমৃদ্ধ করেছে। তাই মাছের প্রতিটি পদ শুধু স্বাদের নয়, বহন করে ঐতিহ্য, স্মৃতি এবং ঘরের উষ্ণতা।


এই সংকলনে রয়েছে মাছের ছয়টি নির্বাচিত রান্না। প্রতিটি পদই স্বাদে, গন্ধে এবং রান্নার ধরনে স্বতন্ত্র। কখনও দৈনন্দিন ভাতের সঙ্গী, কখনও আবার বিশেষ দিনের পাতে পরিবেশনের উপযুক্ত—এই ছয়টি রেসিপি বাঙালি রন্ধনঐতিহ্যের বৈচিত্র্যেরই পরিচয় বহন করে।



আশা করি, এই সংকলনের রান্নাগুলি আপনার রসনাকে তৃপ্ত করবে এবং ঘরোয়া রান্নার চিরচেনা স্বাদকে নতুন করে উপভোগ করার সুযোগ করে দেবে। আয়োজনে, সঞ্চিতা দাস।


মৌরলা মাছের বাটি চচ্চড়ি



কী কী লাগবে

মৌরলা মাছ ৩০০ গ্রাম, আলু ১টি (সরু করে কাটা), বেগুন ১টি (লম্বা করে কাটা), কুমড়ো ১০০ গ্রাম, কাঁচালঙ্কা ৪-৫টি, কালোজিরা আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো।



কীভাবে বানাবেন

মৌরলা মাছ ধুয়ে নুন ও হলুদ মাখিয়ে নিন। একটি স্টিলের বাটিতে মাছ, আলু, বেগুন, কুমড়ো, কাঁচালঙ্কা, কালোজিরা, হলুদ, নুন ও সর্ষের তেল দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। বাটিটি ঢেকে ভাত বসানো হাঁড়িতে বা স্টিমারে ২৫-৩০ মিনিট ভাপে রান্না করুন। রান্না হয়ে গেলে আলতো করে মিশিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।


গন্ধরাজ ইলিশ



কী কী লাগবে

ইলিশ মাছ ৬ টুকরো, গন্ধরাজ লেবুর রস ২ টেবিল চামচ, গন্ধরাজ লেবুর খোসার কুচি সামান্য (ঐচ্ছিক), কাঁচালঙ্কা ৫-৬টি, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, নুন স্বাদমতো।



কীভাবে বানাবেন

ইলিশ মাছ ধুয়ে নুন ও হলুদ মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে মাছের টুকরোগুলি হালকা ভেজে তুলে নিন। একই তেলে সামান্য জল, চেরা কাঁচালঙ্কা ও নুন দিয়ে ফুটিয়ে তার মধ্যে মাছ ছেড়ে দিন। ঢেকে ৫-৬ মিনিট রান্না করুন। আঁচ বন্ধ করে গন্ধরাজ লেবুর রস ও চাইলে সামান্য খোসার কুচি ছড়িয়ে দিন। ২ মিনিট ঢেকে রেখে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন। গন্ধরাজের সুগন্ধ বজায় রাখতে লেবুর রস কখনও ফুটিয়ে রান্না করবেন না।


সর্ষে বাটা চিংড়ি



কী কী লাগবে

চিংড়ি মাছ ৫০০ গ্রাম, সাদা-কালো সর্ষে ৩ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৫-৬টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো।



কীভাবে বানাবেন

সর্ষে ও ২-৩টি কাঁচালঙ্কা সামান্য নুন দিয়ে মিহি বেটে নিন। চিংড়িতে নুন ও হলুদ মাখিয়ে হালকা ভেজে তুলে রাখুন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে সর্ষে বাটা, সামান্য জল, হলুদ ও নুন দিয়ে ফুটিয়ে নিন। এরপর ভাজা চিংড়ি ও চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে ৪-৫ মিনিট রান্না করুন। ওপর থেকে সামান্য কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।


দই ইলিশ



কী কী লাগবে

ইলিশ মাছ ৬ টুকরো, টকদই ১ কাপ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৫-৬টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লাল লঙ্কার গুঁড়ো আধ চা চামচ (ঐচ্ছিক), চিনি আধ চা চামচ, নুন স্বাদমতো।



কীভাবে বানাবেন

ইলিশ মাছ ধুয়ে নুন ও হলুদ মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। টক দই ভালোভাবে ফেটিয়ে তাতে নুন, চিনি ও সামান্য হলুদ মিশিয়ে নিন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে আঁচ কমিয়ে দইয়ের মিশ্রণ ঢেলে নাড়তে থাকুন যাতে দই না ফেটে যায়। এরপর ইলিশের টুকরো ও চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে ঢেকে ৮–১০ মিনিট রান্না করুন। শেষে ওপর থেকে সামান্য কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।


তন্দুরি ভেটকি



কী কী লাগবে

ভেটকি মাছের ফিলে ৫০০ গ্রাম, টক দই আধ কাপ, আদা-রসুন বাটা ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লাল লঙ্কার গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১/৪ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মশলা গুঁড়ো আধ চা চামচ, লেবুর রস ১ টেবিল চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ১ টেবিল চামচ, নুন স্বাদমতো, মাখন সামান্য।



কীভাবে বানাবেন

ভেটকি মাছের ফিলেতে হালকা চিরে দিয়ে লেবুর রস ও নুন মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। এরপর টক দই, আদা-রসুন বাটা, কাশ্মীরি লাল লঙ্কার গুঁড়ো, হলুদ, গরম মশলা, সর্ষের তেল ও নুন মিশিয়ে মেরিনেড তৈরি করে মাছে ভালোভাবে মাখিয়ে অন্তত ১ ঘণ্টা মেরিনেট করুন। প্রি-হিট করা ওভেন বা এয়ার ফ্রায়ারে ২০০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ১২–১৫ মিনিট রান্না করুন। মাঝপথে সামান্য মাখন ব্রাশ করে আরও ৩–৫ মিনিট গ্রিল করুন। পুদিনার চাটনি, পেঁয়াজের রিং ও লেবুর টুকরোর সঙ্গে গরম গরম পরিবেশন করুন।


আলু দিয়ে বাটা মাছের ঝোল



কী কী লাগবে

বাটা মাছ ৫০০ গ্রাম, আলু ২টি (লম্বা করে কাটা), কাঁচালঙ্কা ৪-৫টি, কালোজিরা আধ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, Shalimar's সর্ষের তেল ৪ টেবিল চামচ, জল পরিমাণমতো।



কীভাবে বানাবেন

বাটা মাছ ধুয়ে নুন ও অল্প হলুদ মাখিয়ে হালকা ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে কালোজিরা ফোড়ন দিয়ে আলু ভেজে নিন। এরপর হলুদ, নুন ও সামান্য জল দিয়ে আলু সেদ্ধ হতে দিন। আলু সেদ্ধ হয়ে এলে ভাজা মাছ ও চেরা কাঁচালঙ্কা দিয়ে আরও ৫-৭ মিনিট ফুটিয়ে নিন। শেষে ওপর থেকে সামান্য কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।

তারুণ্য ফেরাতে ‘ফেস যোগা’


নিজস্ব প্রতিনিধি


বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখের ত্বকে তার ছাপ পড়া স্বাভাবিক। গালের টানটান ভাব কমে যাওয়া, চোখের নীচে ফোলাভাব, কপালে সূক্ষ্ম বলিরেখা কিংবা চোয়ালের নীচে ডাবল চিন—এসবই বয়সের স্বাভাবিক লক্ষণ। তবে শুধু বয়স নয়, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, দূষণ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বা কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাসও মুখের পেশিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে মুখ অনেক বেশি ক্লান্ত, নিষ্প্রাণ এবং বয়সের তুলনায় বয়স্ক দেখাতে শুরু করে। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই দামি প্রসাধনী, ফেসিয়াল কিংবা কসমেটিক ট্রিটমেন্টের দিকে ঝোঁকেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সৌন্দর্যচর্চার জগতে একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক পদ্ধতি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে—ফেস যোগা।



শরীরকে সুস্থ রাখতে যেমন নিয়মিত ব্যায়াম প্রয়োজন, তেমনই মুখের পেশিগুলিরও প্রয়োজন নিয়মিত নড়াচড়া। আমাদের মুখ, গলা ও ঘাড়ে প্রায় ৫০টিরও বেশি পেশি রয়েছে। প্রতিদিন আমরা কথা বলি, হাসি, খাই, অভিব্যক্তি প্রকাশ করি—তবুও মুখের অনেক পেশিই পর্যাপ্তভাবে সক্রিয় থাকে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পেশিগুলি শিথিল হয়ে পড়ে, যার প্রভাব সরাসরি ত্বকের উপর পড়ে। ফেস যোগা হল এমন কিছু নির্দিষ্ট ব্যায়ামের সমষ্টি, যা এই পেশিগুলিকে সচল ও শক্তিশালী রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি এটি মুখে রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি করে এবং ত্বকে অক্সিজেন ও পুষ্টির সরবরাহ উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।


গত এক দশকে বিশ্বজুড়ে ফেস যোগা নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বিশেষত যাঁরা কসমেটিক সার্জারি, বোটক্স বা ফিলারের মতো পদ্ধতি এড়িয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে ত্বকের যত্ন নিতে চান, তাঁদের কাছে এটি একটি আকর্ষণীয় বিকল্প। কারণ এই অনুশীলনের জন্য কোনও দামি যন্ত্র, প্রসাধনী বা বিশেষ পরিকাঠামোর প্রয়োজন হয় না। বাড়িতে বসেই প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ২০ মিনিট সময় দিলেই এটি করা সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, ফেস যোগা কোনও অলৌকিক চিকিৎসা নয়। এটি একটি নিয়মিত অভ্যাস, যার সুফল ধীরে ধীরে পাওয়া যায়।



বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও ফেস যোগা নিয়ে ইতিবাচক কিছু তথ্য উঠে এসেছে। কিছু গবেষণায় দেখা গিয়েছে, দীর্ঘদিন নিয়মিত অনুশীলনের ফলে মুখের কিছু পেশির টোন উন্নত হতে পারে এবং গাল কিছুটা ভরাট ও টানটান দেখাতে পারে। একই সঙ্গে ত্বকে রক্তসঞ্চালন বাড়ার কারণে মুখে একটি স্বাভাবিক উজ্জ্বলতাও আসতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, যা বলে যে ফেস যোগা স্থায়ীভাবে বলিরেখা দূর করে বা বার্ধক্য রোধ করতে পারে। তাই বাস্তবসম্মত প্রত্যাশা রাখা অত্যন্ত জরুরি।


ডাবল চিন কমানোর ক্ষেত্রেও ফেস যোগার ভূমিকা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ডাবল চিনের কারণ শুধুমাত্র মুখ ও ঘাড়ের পেশির শিথিলতা হয়, তাহলে কিছুটা উন্নতি দেখা যেতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত ওজন বা শরীরে চর্বি জমার কারণে যদি ডাবল চিন তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে শুধুমাত্র ফেস যোগা যথেষ্ট নয়। সেক্ষেত্রে নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।



ফেস যোগা শুরু করার আগে মুখ পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত। হাতও ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। চাইলে অল্প পরিমাণ ফেস অয়েল বা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে ত্বকে অপ্রয়োজনীয় টান না পড়ে। সব সময় আয়নার সামনে বসে ব্যায়াম করলে নিজের ভঙ্গি ঠিক আছে কি না, তা সহজেই বোঝা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কোনও ব্যায়াম করার সময় মুখের ত্বকে অতিরিক্ত চাপ বা টান দেওয়া যাবে না।



ডাবল চিন কমানোর জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যায়ামগুলির মধ্যে একটি হল 'চিন লিফট'। এতে মাথা সামান্য পিছনের দিকে হেলিয়ে ছাদের দিকে তাকাতে হয় এবং ঠোঁট সামনে বাড়িয়ে চুম্বনের ভঙ্গি করতে হয়। কয়েক সেকেন্ড ধরে রেখে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে হয়। এই ব্যায়াম ঘাড় ও চোয়ালের পেশিকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। একইভাবে 'ফিশ ফেস' ব্যায়ামে গাল ভিতরের দিকে টেনে মাছের মুখের মতো করে কয়েক সেকেন্ড ধরে রাখতে হয়। এটি গালের পেশিকে সচল রাখতে সাহায্য করতে পারে।


চোখের চারপাশের পেশির জন্যও বিশেষ কিছু ফেস যোগা রয়েছে। ভ্রুর উপরে হালকা চাপ দিয়ে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ ও খোলার অনুশীলন করলে চোখের আশপাশের পেশিগুলি সক্রিয় থাকে। আবার 'লায়ন পোজ'-এ জিভ যতটা সম্ভব বাইরে বার করে চোখ বড় করে খুলে শ্বাস ছাড়তে হয়। এতে মুখের প্রায় সব পেশিরই একসঙ্গে ব্যায়াম হয়।



তবে শুধু ব্যায়াম করলেই হবে না। সুন্দর ত্বকের জন্য পর্যাপ্ত জল পান করা, প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুম, পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিন সি, ভিটামিন ই, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টসমৃদ্ধ খাবার ত্বকের কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করে। অন্যদিকে ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ত্বকের বার্ধক্যকে অনেকটাই ত্বরান্বিত করতে পারে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় দিন অন্তত ১৫ মিনিট করে ফেস যোগা করলে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কিছু পরিবর্তন চোখে পড়তে পারে। তবে ফল ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হয়। কারও ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন দেখা যায়, আবার কারও ক্ষেত্রে আরও বেশি সময় লাগতে পারে। নিয়মিত অনুশীলনই এখানে সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।



ফেস যোগা সকলের জন্য সমানভাবে উপযোগী নয়। যাঁদের মুখে সম্প্রতি অস্ত্রোপচার হয়েছে, মুখের স্নায়ুর সমস্যা রয়েছে, ত্বকে সংক্রমণ বা খোলা ক্ষত রয়েছে কিংবা চোয়ালের গুরুতর সমস্যা রয়েছে, তাঁদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তবেই এই ব্যায়াম শুরু করা উচিত। ফেস যোগা কোনও ম্যাজিক নয়, তবে এটি একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। নিয়মিত অনুশীলন, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক ত্বকচর্চার সঙ্গে ফেস যোগাকে যুক্ত করতে পারলে মুখের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা ও সতেজতা দীর্ঘদিন বজায় রাখা সম্ভব। তারুণ্য ধরে রাখার আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে নিয়মিত যত্ন, ধৈর্য এবং সুস্থ জীবনযাপনের মধ্যেই।

রবিবারের গল্প: দেবাংশী কন্যা


মল্লিকা ব্যানার্জী


গঙ্গার জলটা আস্তে আস্তে কালো হয়ে যাচ্ছে----সামনের ওই অন্ধকারটা যেন ঠিক ওর ভবিষ্যৎ!

কী যেন বলে গেল উত্তরাদি –ভীতু!

জন্মের পর থেকেই তো ওকে ভীতু বানিয়ে ছেড়েছে এই সমাজ! নিম্ন মধ্যবিত্তের আবার স্বপ্ন! বাপের পেনশনের জোরটুকু আছে তাই কাল কী হবে ভাবতে হচ্ছে না উত্তরাদিকে—তাইতেই বড় বড় কথা বলা যায়।

ঘর-বর জোটেনি রূপের অভাবে, তবে চাকরিটা আছে উত্তরাদির। তাই বয়সকালেও সঙ্গী জোটার আশা আছে --- ওর তো সবটাই শালা ফক্কা!

ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ছিল বাপ, ওর যখন দশ বছর শক খেয়েই পটল তুলল। লোকের বাড়ি রান্না করে মা পড়াল। মাথা ছিল, সরকারি স্কুলে প্রায় বিনা বেতনে পড়াটা চালাতে পেরেছিল – ট্রেনিং নিয়ে দশটা-পাঁচটার চাকরি তো হল না।

ধুস! শালা! গঙ্গার ধারে এসে ঠান্ডা হাওয়ায় মাথাটা যেন আরও দপদপ করছে। কতবার মনে হয়েছে ওই কালো জলের সঙ্গে নিজের কালো শরীরটা মিশিয়ে দিই। বেকার লেবেলটা যেন গায়ের সঙ্গে সেঁটে গেছে সমীরের। উত্তরাদি যে কাজটা করতে বলছে তাতে টাকা ভালই কিন্তু রিস্কও কিছু কম নেই।

মেয়েটাকে দু-এক বার এই গঙ্গার ধারেই দেখেছে সমীর, কোথায় থাকে জানে না, অতি সাদামাটা চেহারা। ওই মেয়েটিকেই নাকি চাই উত্তরাদির বসের, তার জন্য পঞ্চাশ হাজারও খরচ করতে আপত্তি নেই। চেনে না, শোনে না, একটা মেয়েকে ফুঁসলিয়ে বসের ঘরে ঢোকাতে হবে। তবে বসটাও বলিহারি, অমন ক্ষয়াঘষা চেহারার মেয়ের জন্য কেউ দেয় অত টাকা?



একটাই কাজ সমীরের ----একটু প্রেম-প্রেম খেলে মেয়েটার বিশ্বাস জয় করে নিয়ে উত্তরাদির অফিসে সঙ্গে করে পৌঁছে দেওয়া। দেখতে গেলে কোনো রিস্ক নেই, তবু বস লোকটা যে ঠিক কেমন সেটা এক দর্শনে ঠাহর করতে পারেনি সমীর।

রাজীব খৈতান একসঙ্গে অনেক ব্যবসা করেন, সুটবুট পরা লোকটার যে ওই মেয়েটাকে কেন দরকার বুঝতে পারছে না সমীর। চেহারা, রূপ কোনোকিছুই তো নেই, অর্গ্যান পাচার চক্র হলে তো ফেঁসে যাবে – ওদিকে উত্তরাদি বলেছে কাজটা ঠিকঠাক করতে পারলে মাসে হাজার দশেক মাইনের একটা চাকরিও হয়ে যেতে পারে।

“আপনি কি আমায় খুঁজছেন?” শান্ত মেয়েলি গলার স্বরে চমকে পেছন ফিরে আঁতকে ওঠে সমীর।

“আ-আপনি মানে আপনি কী করে জানলেন?” কাঁপা কাঁপা গলায় বলে সমীর।

“আমি তো রোজ এসময় শ্মশানঘাটে বসি, তারপর গঙ্গায় ডুব দিয়ে বাড়ি গিয়ে দুমুঠো ভাতে ভাত ফুটিয়ে বাবাকে খাওয়াই। আজ মা যেন বলল আমাকে আপনি খুঁজছেন!” সলজ্জভাবে বলে মেয়েটি। আধো অন্ধকারে মেয়েটির ঘাড় নিচু করা ভঙ্গিটা বেশ লাগল সমীরের।

গলাটা ঝেড়ে বলে ওঠে সমীর, “আপনার মা শ্মশানে থাকেন?”

“উনি তো আপনারও মা! শ্যামা মা আমাদের! জন্মের সময়ই মা মারা গেছেন, বাবাই একা হাতে বড় করেছেন। এখন প্যারালিসিসে শয্যাশায়ী। আমি ছাড়া ওনার কেউ নেই। দেরি হলে চিন্তা করবেন। কী চান বলুন?” গলায় তাড়া মেয়েটির।

“নাম কী আপনার? চলুন আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসি।” বলে সমীর।

“আমি বিদ্যুৎলতা। বললেন না তো আপনি কেন আমায় খুঁজছিলেন।” মৃদুস্বরে বলে ওঠে মেয়েটি।

“আপনি শিওর যে আমি আপনাকেই খুঁজছিলাম? আপনার শ্যামা মা আর কী বললেন?” হাসিমুখে ঠাট্টাচ্ছলে জানতে চায় সমীর।

“তা তো জানি না। কেউ যেন টেনে এনে আপনার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিল আমায়। যখন এমন হয় সারা শরীর ভারী লাগে, গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায়। আপনি বা আমি হয়তো জানি না, কিন্তু মা যখন টেনে আনলেন তখন কিছু তো কারণ হবে।” বিড়বিড় করে বলে ওঠে বিদ্যুৎলতা।

রাস্তার আলোতে মুখটা ভালো করে দেখে সমীর। রংটা ফর্সাই, ঘামে জবজবে একখানা অতি সাধারণ মুখ। তবে চোখ দুটো বেশ বড়। বয়স কুড়ির ঘরের শেষের দিকেই হবে। কালো চুলের বেণিটা সাপের মতো কোমরের কাছে ঝুলছে। শাড়িটা বোধহয় কোনো কালে বেগুনি রঙের ছিল, এখন ভালো বোঝা যায় না। ব্লাউজটাও খসখসে কালো রঙের। দারিদ্র্যের চিহ্ন চেহারায় সুস্পষ্ট। এমন একজনকে কেন যে মিঃ খৈতানের দরকার, সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছে না সমীর।

বেশি খোঁজাখুঁজি না করতেই যখন চিড়িয়া উড়ে এল, তখন সাতপাঁচ না ভেবে জয় মা বলে কাজে নেমে পড়াই শ্রেয়, ভাবে সমীর। তবে মেয়েটার সঙ্গে ভাব করতে হলে বাড়িটা চিনতে হবে, সঙ্গে বাড়ির লোকজন কতজন জানতেও তো হবে। রাতারাতি মেয়েটা গায়েব হলে আর বাড়ির লোক থানাপুলিশ করলে সবার আগে তো ফাঁসবে সমীর।

অনেকটা পথ হেঁটে রেললাইন পেরিয়ে মেয়েটা থমকে একটা বিশাল বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই অবাক হয়ে সমীর বলে, “এই এত বড় বাড়িটা আপনাদের? ভেঙে পড়ছে তো! আগে কোনোদিন লাইনের এপারে এত দূরে আসা হয়নি। এমন জঙ্গুলে পরিবেশে থাকেন অসুস্থ বাবাকে নিয়ে, ভয় করে না?”

“চৌধুরী ভিলা এককালে সবাই চিনত। সাবধানে আসুন, সাপখোপ আছে। বাবা আর আমি দোতলার ওই কোণের ঘরে থাকি। শুনেছি এককালে এ বাড়িতে দুশো লোকের পাত পড়ত। এখন বাবার পেনশনের টাকায় চলে। তবে বড় বাড়ির মেয়ে হওয়ায় ঝিগিরি তো আর করতে পারি না। দাদার বন্ধু পাড়ার চায়ের দোকানের হারুদা খুব ভালো মানুষ, বিপদে পাশে থাকে। বউদি, মানে হারুদার বউ, মায়ের মতো ঘিরে থাকে। ওরাই আমায় দিয়ে কেক, ঘুঘনি বানিয়ে হারুদার দোকানে রাখে। বিক্রি হলে দুটো পয়সা আসে। আমার গল্প তো শুনলেন, তবু খুঁজছিলেন কেন সেটা কিন্তু বলেননি।” বলতে বলতেই আধখাওয়া সদর দরজার তালা খুলতে থাকে বিদ্যুৎ।

হঠাৎ বুদ্ধি খেলে গেল সমীরের। বলে ওঠে, “আমরা এমনই একটা বাড়ি খুঁজছি, শুটিং করার জন্য। ভালো টাকা পাবেন কিন্তু।”

এবার সমীর বুঝে গেছে রাজীব খৈতান মেয়েটা নয়, বাড়িটাই খুঁজছেন। নিশ্চয় প্রোমোটিং করতে চান। শরিকি বাড়ি, এই মেয়েটা হয়তো গাঁইগুঁই করেছে, তাই হুকুম হয়েছে মেয়েটাকে তোলার।

তালা-চাবি হাতে একটু থমকে থেকে বলে ওঠে বিদ্যুৎলতা, “আপনার নাম কী? কোথায় থাকেন? কী কাজ করেন আপনি? আপনি না বললেও বুঝতে পারছি মিথ্যে কথা বলছেন।”

থতমত খেয়ে বলে ওঠে সমীর, “আমি সমীর, সমীর চক্রবর্তী। বি.এ. পাশ করে আপাতত বেকার।”

এবার খিলখিল করে হেসে বলে ওঠে বিদ্যুৎ, “আমি দেবাংশী কন্যা! মানে জানেন? জানতে চাইলে কোনোদিন সকালে আসুন। ভয় পাবেন না, মা শ্বেতকালী আপনার মঙ্গল করবেন।”

পিছন থেকে ভেসে আসে কোনো বৃদ্ধের গলা, “এলি নাকি মা! একটু কাছে আয় মা, ওরা দুটোতে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছে যে! কখন থেকে যেতে বলছি, সরছে না ওখান থেকে। তুই না এলে নড়বে না!”

“এ বাড়িতে কে কে থাকেন আপনারা?” মরিয়া গলায় জানতে চায় সমীর।

অদ্ভুত একটা হাসি হেসে বলে ওঠে বিদ্যুৎ, “বাবা আর আমিই থাকি। তবে ইহজগতের বাসিন্দা নয় এমন কয়েকজনও আছেন। তাঁরা আষ্টেপৃষ্ঠে চৌধুরী ভিলা জাপটে থাকেন। বাইরের লোক তাঁদের পছন্দের নয়। কাল আসুন, কথা হবে এখন।”

দ্রুত সমীরের মুখের ওপরই দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভিতরে ঢুকে যায় মেয়েটি।

বাড়ি ঢুকতেই সমীরের মা বলে ওঠেন, “আর তো পারি না রে! কোনো কাজের খবর পেলি?”

“হচ্ছে কথা, মনে হয় লেগে যাবে। তুমি ভাত বাড়ো, আমি আসছি।”

গামছা টেনে কলঘরে ঢুকে ঝপাঝপ জল ঢালতেই গন্ধটা নাকে ঝাপটা দিল। চন্দনের গন্ধ না ধূপের গন্ধ, ধরতে পারল না সমীর। খেতে বসতেই মা বলে উঠলেন, “কী সাবান মাখলি রে, খুব সুন্দর গন্ধ তো!”

কে জানে চৌধুরী ভিলার গন্ধ কিনা!

সাতপাঁচ ভেবে ফোনটা উত্তরাদিকে করেই বসল সমীর, “তোমার পাঠানো ছবির মেয়েটাকে পেয়েছি। লাইনের ওপারের চৌধুরী ভিলায় তো থাকে, আগে বলবে তো? ঝেড়ে কাশো তো বস! ঠিক কী চাই তোমাদের রাজীববাবুর, মেয়েটাকে না বাড়িটা? আমার তো মনে হয় ওই পোড়ো বাড়িটাই। প্রোমোটিং করবে, তাই কিনা বলো?”

“দ্যাখ, সমীর! বেশি খোঁজখবর করতে যাস না। ইচ্ছে করে ঠিকানা দিইনি, জানলেও। তুই কী ভাবছিস, আর কেউ বাড়ি হাতাবার চেষ্টা করেনি? ও বাড়ি চারদিক দিয়ে তন্ত্রমতে বাঁধা। বিদ্যুৎ না চাইলে কারও ঢোকার ক্ষমতাই নেই। হয় মাথায় চাঙড় ভেঙে পড়বে, না হয় সাপে কাটবে। বাড়াবাড়ি করলে অপঘাতে মৃত্যু অবধারিত। তাই তুই শুধু তোর প্রেমিক-প্রেমিক ইমেজ কাজে লাগিয়ে মেয়েটাকে ফুঁসলিয়ে বের করে আন। বাকিটা ছাড় রাজীববাবুর ওপর। চাকরিটা চাই তো নাকি?” গম্ভীর স্বরে বলে উত্তরাদি।

ফোনটা রেখে সিগারেটে দুটো টান মেরে মনে হল, সত্যিই তো মায়ের শরীর ভাঙছে। বড্ড দরকার চাকরিটা।

ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখল বিশাল কালীপুজো হচ্ছে চৌধুরী ভিলায়। ওর পাশে ঘোমটা মাথায় দিয়ে অল্পবয়সি কেউ দাঁড়িয়ে। ধবধবে ফর্সা শাঁখাপলা পরা হাত দুটি অল্প অল্প দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ আলোয় চকচক করে উঠল একটা ছুরি মেয়েটির এক হাতে, অন্য হাতে রুপোর ঝকঝকে বাটি ভর্তি রক্ত। একটানে সমীর ঘোমটা খুলতেই দেখতে পেল বিদ্যুৎলতা হাসছে, মুখভর্তি রক্ত, মাথাভর্তি সিঁদুর! কে যেন বলছে, “মা শ্বেতকালীকে প্রণাম করো!”

ঘুমটা ভেঙে গেল সমীরের। জানলা দিয়ে এসে পড়ছে নরম ভোরের আলো।

সকাল সকাল দুটো বাসি রুটি চায়ের সঙ্গে খেয়ে নিয়ে “মা আসছি” বলে বেরিয়ে সোজা রেললাইন পেরিয়ে চৌধুরী ভিলার সামনে পৌঁছল সমীর। বিশাল বাড়িটা কাল যেমন গা-ছমছমে লাগছিল, আজ দেখে সাধারণ পুরোনো ভাঙা বাড়ি মনে হচ্ছে। সুযোগ পেলেই রাজীববাবুরা পায়রার খোপের মতো ফ্ল্যাটবাড়ি তুলবে। অবশ্য শপিং মলও বানাতে পারে—তবে আয় বেশি প্রথমটায়। গঙ্গা কাছেই, স্টেশনও নাকের ডগায়। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে কখন যেন চায়ের দোকানের সামনে চলে এসেছে। মধ্য চল্লিশের ভদ্রলোক হয়তো হারুদাই হবেন। ব্যস্ত হাতে চা বসাচ্ছেন, ঘুঘনির ডেকচি ঢাকছেন। কে জানে বিদ্যুৎলতাই বানিয়েছে হয়তো। কী মনে করে এক বাটি অর্ডার দিয়ে হারুদার সঙ্গে ভাব জমাতে বসল সমীর।


“কিছু মনে করবেন না, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব? ওই সামনের পোড়ো বাড়িটা কি খালি?” জানতে চায় সমীর।


সন্দিগ্ধ চোখে সমীরকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে কাঁধের গামছায় হাত মুছতে মুছতে বলে হারু, “আমার বোন আর জ্যাঠা থাকে, কেন বলুন তো?”


কালকের মিথ্যেটাই অবলীলায় বলে, “না, ওই ফিল্মের জন্য এমন বাড়ি খুঁজতে বলেছেন কিনা!”


ঝাল ঝাল ঘুঘনি খেতে খেতে সমীরের মনে হয় মেয়েটার রান্নার হাত আছে বটে। এদিকে হারুদা প্রচণ্ড উৎসাহে একঝাঁক প্রশ্ন ছুড়ে দিতে থাকে, “তাই নাকি? সিনেমার নাম কী ভাই? কে কে থাকবে? বাড়ি পছন্দ হলে বলবেন, আমি নিজে বিদ্যুৎকে বলব। ও আমার নিজের বোনের মতো। ওর দাদা তন্ময় আর আমি একসঙ্গে পড়তাম। আমার মাথা না থাকায় বেশিদূর এগোতে পারিনি, আর তন্ময় তো অকালে চলে গেল। জেঠু শয্যাশায়ী, মাথাও কাজ করে না। তাই বিদ্যুৎ যা বলবে তাই হবে। ভালো টাকা দেবেন তো?”


উত্তরাদির বলা টাকার অঙ্কগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, তাই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল, “সে আর বলতে! লাখখানেক হবেই।”


ঘুঘনির দাম দিতে দিতে ভাবল সমীর, ভুল কিছু বলেনি। ফ্ল্যাট তো দেবেই, সঙ্গে থোক টাকা।


“আপনি ব্যস্ত দোকান নিয়ে, আমিই বাড়িটা ঘুরে দেখি। আর কী যেন নাম বললেন, বিদ্যুৎ, তাই না? ওনাকেও মিট করে আসি। রাজি না হলে আপনি তো আছেনই।” বলে সমীর চৌধুরী ভিলার দিকে এগোতেই পিছন থেকে ভেসে এল হারুদার গলা, “ভুলেও জোর করতে যাবেন না যেন! ক্ষতি হয়ে যাবে। আগেও বহুবার বাড়ি কিনতে লোক আসলেও বাড়ি বিক্রি করতে চায়নি বিদ্যুৎ। তবে গায়ের জোর ফলাতে গিয়ে অনেকেই আঘাত পেয়েছে। সাবধানে যান। শুটিং করতে দিতে তো মানা করা উচিত নয়।”


বিদ্যুৎ দরজা খুলতেই গতকালের চন্দনের গন্ধটা ভক করে নাকে এল সমীরের। চান সারা মেয়েটার খোলা ভিজে চুল থেকে টপটপ করে জল পড়ছে। মেয়েটা আজ একটা চাঁপা রঙের সুতির শাড়ি পরেছে, লাল ব্লাউজের সঙ্গে। বেশ মায়াবী মুখখানি। একটু বেশিক্ষণ হয়তো তাকিয়ে ফেলেছিল সমীর। কিছু না বলে লজ্জায় মুখ নামিয়ে দরজা ছেড়ে দাঁড়াল বিদ্যুৎ। অস্বস্তি কাটাতে বলে ওঠে সমীর, “ঘুঘনিটা কিন্তু দারুণ বানিয়েছেন।”


“হারুদার দোকানে গিয়েছিলেন বুঝি? আসুন, এই ঘরটা একটু ঠিক আছে, বসুন ওই চেয়ারটায়। দেখছেন তো বাড়ির হাল। ছশো বছরের পুরোনো। ইটগুলোর চেহারা দেখলেই বুঝবেন। বাবা রাতে ঘুমের ওষুধ খান তো, তাই বেলা হয় উঠতে। আপনি আসবেন বলেছিলেন, তাই সকাল সকাল ঘুঘনি বানিয়ে দোকানে পাঠিয়ে চান, পুজো সেরে রেখেছি। চা খাবেন?”


“না, না, চা খেয়ে এসেছি। আপনার বলা দুটো কথা খুব টানছে—দেবাংশী আর শ্বেতকালী। বিশ্বাস করে বলবেন নাকি? অবশ্য যদি আপত্তি না থাকে।” নড়বড়ে চেয়ারটায় বসতে বসতে বলে সমীর।

কাছেই মোড়াটা টেনে নিয়ে বসে বিদ্যুৎ।


“মনে হয় সব কথা খুলে কাউকে বলার জন্যই মা গতকাল আমাকে আপনার কাছে নিয়ে গেলেন। এ বাড়ি বহু প্রাচীন, শাক্ত বাড়ি। শুনেছি কালীপুজোর সময় মূর্তি এনে বিশাল পুজো হত, পাঁঠাবলি হত, সারা পাড়া ভোজ খেত—এককথায় এখানকার বর্ধিষ্ণু পরিবার ছিলাম এককালে।


ঠাকুরদা ছিলেন নামকরা ডাক্তার। বাবারা চার ভাই এক বোন। বাবার বিয়ের পরই জ্যাঠামশায় বাড়িতে স্ত্রী-পুত্র রেখে কর্মসূত্রে নেপালে গেলেন। সে সময় কোনোভাবে এক তান্ত্রিক বহু পুরোনো একটি ছোট মূর্তি দেখান ওনাকে। একজন নারীর মুখ দিয়ে ছোট ছোট সাপ বেরিয়ে আসছে। তান্ত্রিক বলেছিলেন, ওই মূর্তি ছোঁয়ালে দূরারোগ্য ব্যাধি সেরে যায়, কিন্তু উপাচারে ভুল হলে নির্বংশ হয়ে যাবে। লোভে পড়ে সেটি জ্যাঠামশায় লুকিয়ে নিয়ে পালিয়ে আসেন। সম্পূর্ণ দোষও দেওয়া যায় না, কারণ পিসির এক দূরারোগ্য ব্যাধি ছিল।


বোনকে বাঁচাতে চুরি করেন, তবে সঠিক প্রয়োগ না হওয়ায় লাভ হয়নি। উল্টে শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। পিসি, দাদু, ঠাকুমা, দুই কাকা—সব শেষ। পুজো বাধা পেয়ে বন্ধ হয়ে যায়। মায়ের বারবার গর্ভপাত হয়ে যেত!


এদিকে বাড়িতে মড়ক লেগেছে দেখে বাবা ছুটলেন বেনারসে যোগীবাবার আশ্রমে। ধ্যানস্থ অবস্থাতেই বাবাকে বলেছিলেন, “শ্বেতকালীর পুজো শুরু কর! তোমার স্ত্রীর গর্ভসঞ্চার হবে। দেবাংশী কন্যা আসবে, তবে নরবলি তো নেবেন তিনি! জানি না তোমার স্ত্রী বাঁচবেন কিনা! ভয়ংকর এক শক্তিকে এনেছ বাড়িতে, সরানো বড় মুশকিল। মা শ্বেতকালীই একমাত্র রক্ষা করতে পারবেন। গঙ্গামাটি দিয়ে দ্বিভূজা মূর্তি বানাও। এক হাতে ছুরি, অন্য হাতে রুধিরপূর্ণ পাত্র থাকবে। প্রতি বছর অক্ষয় তৃতীয়ায় পুজো করবে। কন্যার বয়স নয় বছর হলে তাকে দিয়ে পুজো করিয়ো!”


একনাগাড়ে এত কথা বলে থামে বিদ্যুৎ।


শুনতে শুনতে মুখটা হাঁ হয়ে যায় সমীরের। তারপর বলে ওঠে, “আপনার সত্যিই অলৌকিক কোনো ক্ষমতা আছে নাকি?”


ঘোরলাগা গলায় বলে বিদ্যুৎ, “সেভাবে বুঝি না! আমার মায়ের পেটে যখন আমি আসি, তখন মা বাবাকে বলেছিলেন স্বপ্নে একটা ধবধবে ফর্সা বাচ্চা মেয়ে বলেছিল—‘মা এসেছি রে! মা তো! চিনতে পারছিস না! রক্ত দে!’”


আসতে আসতে বলে বিদ্যুৎ, “মাকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে জ্যাঠু, জ্যাঠিমা আর বাবা মিলে। কিন্তু পারল না!


জ্যাঠু রেগে নাকি বাগানের মাটির নিচে পুঁতে দিয়েছিলেন মূর্তিটা। মাকে দেখিনি। জ্যাঠিমাই বড় করল আমায়। শ্বেতকালীর পুজো কিছুতেই করতে দিতেন না। বাবাকে বলতেন, ‘এসব গাঁয়ে রটলে মেয়ের বিয়ে দিতে পারবে না ঠাকুরপো!’”


“আপনি কখনও কিছু অনুভব করেননি?” জিজ্ঞেস করে সমীর।

ঘোরলাগা গলায় বলে বিদ্যুৎ, “অনেক কিছু ঘটলেও প্রথমে ভাবতাম কাকতালীয়। যেমন বাড়ির পাশে হারুদার বোন মিলিদিকে দেখে মনে হল—ও বোধহয় আর বড় হবে না! কদিন পরেই সকালে স্টোভে চা করতে গিয়ে আঁচলে আগুন লেগে মিলিদি শেষ হয়ে গেল। এমন কত ঘটনা ঘটার আগেই বলে দিতাম। সবাই জানতে আসত পরীক্ষায় কী প্রশ্ন আসবে, বলতাম, মিলেও যেত। তবু কই, আর দাদাকে বাঁচাতে পারলাম! বারবার দাদাকে বলেছিলাম, আজ বেরোস না! শুনল না। জ্যাঠা, জ্যাঠিমাকে নিয়ে দুর্গাপুরে মেয়ে দেখতে যাওয়ার পথে গাড়ি কন্ট্রোল হারায়, ব্রিজ থেকে গঙ্গায় পড়ে সবাই শেষ! খবরটা শুনেই ব্রেন স্ট্রোক হয় বাবার। সেই থেকে বাঁ দিকে সাড় নেই। তখন থেকে পড়া ছেড়ে দিই আর রোজ সন্ধ্যা হওয়ার আগে শ্মশানে গিয়ে শ্বেতকালিকার পুজো শুরু করি। এভাবেই চলছে। তবে কোনো বিপদ আমায় কেন জানি না ছুঁতে পারে না, তাই ভয় পাই না কিছুতেই। আজকাল মৃত আত্মীয়দের অস্তিত্বও টের পাই। এ বাড়ির মায়া কাটাতে পারেননি হয়তো, দু-হাতে আগলে রাখেন আমাকে! লোকে ভাবে আমি ডাকিনী-যোগিনী পুষি।” বলে হেসে ফেলে মেয়েটা। হাসলে বেশ লাগে মেয়েটাকে। এত অল্প আলাপেই কেমন মায়া পড়ে যায় মেয়েটার ওপর।


“এত বড় বাড়িটা নিয়ে কী করবেন ভেবেছেন? ওই আত্মাদের ভরসায় কাটাবেন নাকি বাকি জীবনটা?” না বলে পারে না সমীর।


“কদিন ধরে বাবার খুব শরীর খারাপ, তাই এরপর কী হবে ভেবে ভেবে সারা। তখনই মা আপনার কাছে টেনে আনলেন। তাই নিশ্চিত ভালো কিছুই করবেন আপনি।” মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বলে বিদ্যুৎ।


বিদ্যুতের বাড়ি থেকে বেরিয়েই কলকাতা যাওয়ার ট্রেন ধরে সমীর। ডালহৌসির চত্বরে বেশি সময় লাগে না রাজীব খৈতানের অফিস খুঁজে পেতে। উত্তরাদি বোঝে, সমীর আজ মরিয়া। রাজীববাবুর সঙ্গে দেখা না করে ছাড়বে না।


তাড়াতাড়িই ডেকে পাঠালেন ভদ্রলোক। এবার ভণিতা না করেই বলে ফেললেন রাজীববাবু, “মানছি, চেষ্টা করেছি ভয় দেখাতে, লোক দিয়ে উঠিয়ে আনার চেষ্টাও করেছি। প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছি। স্থানীয় লোকেরা বলে ডাকিনী-যোগিনী বাড়ি পাহারা দেয়। আমার লোকেরা আহত হয়েছে, সাপের কামড় খেয়েছে। মেয়েটার কিছু অলৌকিক ক্ষমতা আছে। তবে এটা বুঝেছি, স্বেচ্ছায় না এলে ওকে দিয়ে কিছু করানো যাবে না। আমি ব্যবসা করতে চাই ঠিকই, তবে ওকে আপনি আনুন। আমি সরাসরি কথা বলতে চাই। ওর অমতে কিছু হবে না। আপনিও নিশ্চিন্তে থাকুন।”


পরের ঘটনাগুলো যে এত তাড়াতাড়ি, সহজভাবে ঘটবে, ভাবতেও পারেনি সমীর। বিদ্যুৎ আর সমীরের সঙ্গে রাজীববাবু অফিসে বসে অনেক কথাই বললেন। এক কথায় রাজি হলেন হাসপাতাল তৈরি করতে চৌধুরী ভিলার জমিতে। মোটা অঙ্কের চেক দিয়ে দিলেন বিদ্যুৎকে। টাকা সমীরও কম পায়নি। সবকিছু ঘটে গেল মসৃণভাবে।


ঠিক হল, বাবাকে নিয়ে রাজীববাবুর কলকাতার খালি ফ্ল্যাটে কিছুদিন থাকবে বিদ্যুৎ। পরে হাসপাতালের পাশেই ছোট কোয়ার্টারে থাকবে বিদ্যুৎরা। সমীরের কাজ হল হাসপাতালের কাজের তদারকি। পয়সা আসায় নিজের, সঙ্গে সঙ্গে বাড়িরও ভোল পাল্টেছে সমীর। মা-ও সুযোগ বুঝে বউ আনার কথা ভাঙা রেকর্ডের মতো বাজাচ্ছে। ‘বউ’ শব্দটা শুনলেই চন্দনের গন্ধটা ঝাপটা মারে আর দুটো মায়াবী চোখ ভেসে আসে। নিজেকেই গালি দেয়—বামন হয়ে চাঁদে হাত!


এর পরে বেশ কয়েক মাস এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকায় বিদ্যুৎদের খবর নেওয়া হয়নি। হঠাৎ সেদিন স্বপ্নে দেখল শুকনো মুখে বিদ্যুৎ দাঁড়িয়ে, সম্পূর্ণ সাদা কাপড় পরে।

সেদিন ছুটি নিয়ে সমীর সোজা হাজির বিদ্যুৎদের ফ্ল্যাটে। শুনল বিদ্যুতের বাবা আর নেই। অবাক হয়ে ভাবল, রাজীববাবু খবরটা জানানোরও প্রয়োজন মনে করেননি। ওদিকে ফ্ল্যাটের দরজার সামনে চটির পাহাড়, বাইরের ঘরে উপচানো ভিড়।


অপেক্ষারত লোকেদের মুখে শুনল, মা বিদ্যুৎলতা ত্রিকালদর্শী, যা বলেন অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়। বুঝতে বাকি রইল না, চৌধুরী ভিলা থেকে সরিয়ে এনে মেয়েটাকে নিয়ে ব্যবসা করে ভালোই টাকা লুটছেন রাজীব খৈতান।


জোর করেই বিদ্যুৎকে ফাঁকা ঘরে একান্তে নিয়ে আসে সমীর।


“ছি! ছি! বিদ্যুৎ! এভাবে নিজেকে বিকিয়ে দিলে!”


“কে আছে আমার! কী-ই বা করতাম! জানো না তুমি, দেবাংশী কন্যাকে লোকে বিয়ে করতে ভয় পায়! নিজেকে বুঝিয়ে নিয়েছি মানুষের সেবা করছি। রাজীববাবু লোভী হলেও খারাপ মানুষ নন! চৌধুরী ভিলা ভেঙে হাসপাতাল বানাচ্ছেন, বাবাকে শেষ দিন অবধি দেখাশোনা করেছেন—আমি কৃতজ্ঞ! যদি উনি আমাকে ভাঙিয়ে পয়সা করেন, তাতে আমি কেন আপত্তি করব! বেকারত্বের জ্বালায় তুমিও একদিন আমাকে রাজীববাবুর কাছে নিয়ে গিয়েছিলে। বিয়ে-থা করে সুখে সংসার করো!” বলতে বলতে গলা বুজে আসে বিদ্যুৎলতার।


“দালালই ভাবলে, বিদ্যুৎ! তাই কি মেসোমশাই যাওয়ার খবরটুকুও দিলে না। টাকার দরকার ছিল ঠিকই, তবে খোঁজ নেব না ভেবে নিলে। তুমি কত বড় বাড়ির মেয়ে, আমি সামান্য ইলেকট্রিক মিস্ত্রির ছেলে। তোমার পাশে দাঁড়ানোর যোগ্যতা কি আমার আছে? তবু বলব, পারলে ফিরে চলো। হারুদাদের সঙ্গে থাকবে না হয়। ব্যবসায়ী রাজীববাবু তোমায় নিংড়ে নেবে?” রুদ্ধ গলায় বলে সমীর।


“তা হয় না! রাজীববাবু আমাকে যেতেও দেবেন না। দেবী বানিয়ে ফেলেছেন আমাকে! রোজ শ্বেতকালী পুজো করি আর বলি—নিয়ে নে মা! এ ক্ষমতা তুই নিয়ে নে আমার কাছ থেকে!” বলতে বলতে দরজা খুলে বেরিয়ে যায় বিদ্যুৎলতা।


---


বছর দশেক পর, চণ্ডীগড়ে…


“আজও কিন্তু বললে না, রাজীব খৈতানকে আটকেছিলে কী করে তোমরা?” বিছানা ঝাড়তে ঝাড়তে বলে বিদ্যুৎলতা। “অমন রমরমা ব্যবসা চলছিল আমায় নিয়ে। সেখানে এক কথায় আমাকে তোমার সঙ্গে ছেড়ে দিলেন?”


মনে পড়ে যায় সমীরের…


সেদিন কীভাবে ক্ষ্যাপার মতো ছুটেছিল উত্তরাদির কাছে।


উত্তেজিত সমীর বলেছিল, “উত্তরাদি! বিদ্যুৎকে বাঁচাতে হবে! তুমি রাজীববাবুকে বোলো যে, চৌধুরী ভিলা খোঁড়াখুঁড়ির সময় সমীর বিদ্যুতের জ্যাঠুর সেই অভিশপ্ত মূর্তি পেয়েছে। বিদ্যুৎকে না ছাড়লে মূর্তিটা ওনার বাড়িতে পৌঁছে দেবে। আর ওই মূর্তি আসা মানেই কিন্তু মৃত্যুমিছিল আসা। নির্বংশ হওয়ার ভয় কার নেই!”


উত্তরাদি ভয়ার্ত চোখে বলে উঠেছিল, “সত্যি কি কোনো মূর্তি পেয়েছিস তুই? ওই মূর্তি নাকি দূরারোগ্য রোগ সারায়, বিদ্যুৎ বলেছিল আমায়। ওর জ্যাঠু চুরি করে এনেছিলেন, তাই বোনকে সারাতে পারেননি! এখন তো তুই খুঁজে পেয়েছিস, দিবি আমাকে? ভিক্ষে চাইছি রে তোর কাছ থেকে! তোরা হয়তো ভাবিস রূপের অভাবে আমার বর জোটেনি! আসলে ছোট থেকে আমার রক্তের রোগ। মাসিক বন্ধ থাকে মাসের পর মাস, আবার হলে থামে না। সারা গায়ে লাল চাকা চাকা কী সব বেরোয়। কত ডাক্তার দেখিয়েছি। দিদিটাকে দিবি না ভাই?”


শেষের দিকে এমন করুণ স্বরে বলল উত্তরাদি, সমীর চাইলেও বলতে পারল না যে আদপে কোনো মূর্তিই সে পায়নি। এদিকে ধর্মভীরু খৈতানকে আটকাতে হলে ছলনার আশ্রয় না নিলেও নয়। সাতপাঁচ ভেবে মরিয়া গলায় বলে সমীর, “বিদ্যুৎ তো এও বলেছে, ওই মূর্তি নাকি নির্বংশ করে। তবু তুমি চাইছ?”


“আমার তো এমনিই বংশ শেষ। তবু যদি জীবনের বাকি কটা দিন ভালোভাবে কাটাতে পারি? দিবি না রে দিদিটাকে?” কাকুতি ঝরে পড়ে উত্তরার গলায়।


“তোমায় দিলাম না হয়, কিন্তু তার আগে বলো দেখি, খৈতানের হাত থেকে বিদ্যুৎকে উদ্ধার করতে কীভাবে সাহায্য করবে আমায়?” জানতে চায় সমীর।


“খৈতানের বউ, মা আমায় খুবই পছন্দ করে। আমি ওই মূর্তির ছবি দেখিয়ে বলব, মাটি খুঁড়ে বিদ্যুতের জ্যাঠুর পাওয়া মূর্তি বেরিয়েছে। সমীর মূর্তিটা বিদ্যুৎকে দিতেই বিদ্যুৎ গোপনে পুজো শুরু করেছে। খৈতানদের নির্বংশ হওয়ার যোগ প্রবল, কারণ বিদ্যুৎ তো এখন ওদের বাড়িরই মেয়ের মতো। সঙ্গে বলব, আগের মতো শ্বেতকালী পুজো করলেও গভীর রাতে বিদ্যুৎ ওই মূর্তির নিষিদ্ধ সাধনা করছে গোপনে। সে পুজো দেখলেও বিশাল ক্ষতি!” বলে উত্তরাদি।


“মানবে রাজেশের মা, বউ? এত টাকার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে যে! প্রমাণ চাইলে?” জানতে চায় সমীর।


“চিন্তা নেই। অল্পমাত্রায় পেটব্যথার কিছু মিষ্টি দেব বিদ্যুতের পাঠানো প্রসাদ বলে! হপ্তা তিনেক শরীর খারাপ হলেই ওদের সন্দেহ দৃঢ় হবে। তবে বাড়াবাড়ির আগেই তোকে পাখি নিয়ে পালাতে হবে। নাহলে বিদ্যুৎকে পৃথিবী থেকেও সরিয়ে দিতে পারে। তবে ব্যবসায়ী লোক তো! যখন বুঝবে পুরো সম্পত্তির দাবিদার আর কেউ নেই, তখন মনে হয় বিদ্যুৎ আর তোর ইলোপ নিয়েও মাথা ঘামাবে না। তোর তো বিদ্যুৎকে চাই, ওর সম্পত্তি তো নয়!”


“একটা চাকরি, মা, আর বিদ্যুৎকে নিয়ে ছিমছাম সংসার, উত্তরাদি—ব্যস, ওইটুকুই চাওয়া।” ভাঙা গলায় বলে সমীর।


চণ্ডীগড়ের চাকরির খবরটা আসতেই ছক কষে ফেলে সমীর। কিউরিও শপ থেকে পুরোনো একটা মূর্তি এনে ধরিয়ে দেয় উত্তরার হাতে। কীভাবে যেন মানসিক বল পেয়ে উত্তরাও নিজেকে সুস্থ ভাবতে শুরু করে।


রাজেশের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে মাকে নিয়ে চণ্ডীগড় চলে আসে সমীর। তলে তলে চলে বিদ্যুৎকে না জানিয়ে কীভাবে সরানো হবে তার ছক কষা। কীভাবে যেন উত্তরাদির শরীর উত্তরোত্তর ভালো হতে থাকে, আর এদিকে প্রায়ই অভিযোগ আসতে থাকে, রাজেশবাবুর ত্রিকালদর্শী মায়ের প্রসাদ খেয়ে গা বমি বমি করে, পেটব্যথা করে—তবে সব সময় নয়, কখনো কখনো।


উত্তরাদির চেষ্টায় ভুলভাল খবর রটতে থাকে। রাজেশবাবুর কানেও পৌঁছায় ওই নিষিদ্ধ মূর্তি-পুজোর গল্প। বিদ্যুতের পুজোর জায়গায় মা শ্বেতকালীর আসনের পাশে মূর্তি রেখে ছবি তুলে রাজেশবাবুর মা, বউ সবাইকেই দেখায় উত্তরাদি। একদিকে নির্বংশ হওয়ার ভয়, অন্যদিকে প্রসাদ খেয়ে শরীর খারাপের খবর মৃদু তালে হলেও ছড়াচ্ছে। ঘাঘু ব্যবসায়ী রাজেশবাবু খানিক বিপাকেই পড়েন। বিদ্যুৎলতাকে ফেলতেও পারছেন না, গিলতেও যেন আর পারছেন না। এই ত্রিকালদর্শী মায়ের চক্করে রাজনৈতিক দলের টিকিটও হাতছাড়া হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা, কারণ জনরোষ দাবানলের মতো ছড়ালেই বিপদ।


সময় এসে গেছে বুঝে উত্তরাদিই প্রস্তাব দেয় রাজেশবাবুকে, “কয়েকদিন চেম্বার বন্ধ রেখে বিদ্যুৎকে নিয়ে কামাখ্যা ঘুরে আসি স্যার? লোকেও জানবে ত্রিকালদর্শী মা গুপ্ত সাধনায় গেছেন। আর শ্বেতকালীর উপাসিকা মেয়েটাও কামাখ্যা গেলে খুশিই হবে। কম বয়স থেকে দারিদ্র আর নিত্য পুজো ছাড়া জীবনে তো আর কিছুই নেই মেয়েটার। আমার সঙ্গেই চলুক না হয়, আমাদের মেয়েদের গ্রুপে ওর ভালোই লাগবে।”


আপত্তি করেননি রাজেশবাবু। সেই সুযোগেই চণ্ডীগড় থেকে সমীর পৌঁছে যায় হাওড়া স্টেশন। উত্তরাদি গৌহাটি এক্সপ্রেস ধরলেও সমীর বিদ্যুৎকে নিয়ে সোজা রাজধানী ধরে দিল্লি, সেখান থেকে চণ্ডীগড়।


হপ্তাখানেক পরে কামাখ্যা থেকেই ফোন করে উত্তরাদি জানায়, গুপ্ত কামাখ্যায় এক ভৈরবী মা বিদ্যুৎকে দেখে দেবাংশী কন্যা বলে চিনতে পেরে নিজের সঙ্গে নিয়ে উধাও হয়ে গেছেন।

---


সেদিনও ফোনে উত্তরাদি সমীরকে বলেছে, “ভাগ্যিস ওই মূর্তি দিলি ভাই, আমি সম্পূর্ণ সুস্থ এখন।”


ফোনের এপাশ থেকে সমীরও বলে, “তুমি ছিলে বলেই বিদ্যুৎ আজ আমার ঘরণী। মাকে পেয়ে, নিজের সংসার পেয়ে সে আর দেবাংশী কন্যা বা ত্রিকালদর্শী দেবী নয়—আমার মানসপ্রতিমা।”


কিউরিও শপের মূর্তি পেয়ে উত্তরাদির সুস্থ হওয়ার কথা ভাবলেই সমীরের হাসি পায়।


মুচকি হেসে বিদ্যুৎকে বলে সমীর, “কী হবে জেনে?” তারপর কী ভেবে বলে, “আচ্ছা, অভিশপ্ত মূর্তি কি সত্যি বাগানে পুঁতেছিলেন জ্যেঠু?”


বিদ্যুৎ অবাক হয়ে বলে, “তোমায় বলিনি, জ্যাঠুরা তো সেদিন মূর্তি নিয়েই বেরিয়েছিল গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে বলে। কিন্তু তার আগেই সব শেষ…


আচ্ছা, উত্তরাদির অসুখ সেরে গেছে? আমি কিন্তু আমার শ্বেতকালী মাকে বলেছিলাম সারিয়ে দিতে!”


কেমন হিমেল স্রোত বয়ে যায় সমীরের মেরুদণ্ড বেয়ে।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page