তিনদিনে ত্রিভুবন | সবুজে ভরা বর্ষার রান্না | আধুনিক সুপারফুড | রবিবারের গল্প: কনে দেখা আলো
- রোজকার অনন্যা

- Jul 10
- 19 min read

তিনদিনে ত্রিভুবন
বাণীব্রত গোস্বামী
চারদিকে এখন ইঁদুর দৌড়। সবেতেই একটা প্রতিযোগিতা। ফাঁকে ফুরসৎ পাওয়াটাই দুষ্কর। কিন্ত মন তো আইঢাই! কতদিন হয়ে গেল, এই শহর ছেড়ে কোথাও বেরতে পারিনি। এ’বছর ছাব্বিশে জানুয়ারি শুক্রবার পড়েছে। যদি কোনভাবে শনিবারটা ম্যানেজ করা যায়, তাহলেই পুরো তিনটে দিন মুক্তির আনন্দ। কিন্ত মাত্র তিনদিনে যাব কোথায়? সমাধান করল ঘরের মানুষ। ও ক’দিন ধরেই গুগলে নানারকম ঘাঁটছিল। আমাকে অবাক করে দিয়ে বলল, তিনদিনেই নাকি সমুদ্র, পাহাড়, অরণ্য সব স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে। বলে কী! এটাও সম্ভব! কিন্ত না! ঘুরে এসে বুঝলাম, কোলকাতা থেকে সপ্তাহান্তে সব স্বাদ একমাত্র এখানে এলেই এই ঝটিকা ভ্রমণেই পাওয়া যায়। এবার তাহলে পুরো বর্ণনাটাই লিখে ফেলি।

সকাল ছ’টা দশে হাওড়া থেকে পুরী যাওয়ার ‘বন্দে ভারত’ ধরে নিলাম। আগে কোনদিন চড়িনি এই ট্রেনে। এক যাত্রায় রথ দেখা, সঙ্গে কলা বেচা। ভেতরে সব এলাহি ব্যাপার! বেশ একটা বিদেশি ছাপ। ট্রেন ছাড়তেই ধোঁয়া ওঠা কফি। তারপর মনে লেগে থাকা জলখাবার। সঙ্গে সেবাবন্ধুদের মিষ্টি ব্যবহার, উপরি পাওনা। মাত্র দুশো একত্রিশ কিলোমিটারের পথ। নেমে পড়লাম বালোসোরে, ঠিক সকাল ন’টায়। নেমেই একটি ছোট্ট গাড়ি নিয়ে নিলাম। গন্তব্য চাঁদিপুর পান্থনিবাস। এটি উড়িষ্যা সরকারের। অনলাইনে আগেই বুকিং করা ছিল। ভাড়া সাধ্যের মধ্যেই।

বেশিক্ষণ লাগল না। আধঘন্টা মত। গিয়ে নামলাম একেবারে পান্থনিবাসের দোরগোড়ায়। ফুলের বাগান দিয়ে ঘেরা নয়নাভিরাম হোটেল। কিন্ত ছবিতে যে দেখলাম, একদম সমুদ্র সৈকতের ধারে এর অবস্থান। কিন্ত সমুদ্র কোথায়! পান্থনিবাসের সিঁড়ি থেকেই তো বালি শুরু। যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু ধু-ধু বালি। মরুভূমির মত মনে হচ্ছে। তাহলে তো আর কিছু বাকি থাকল না। মরুভূমির স্বাদ-ও যেন পাওয়া হয়ে গেল এই বিস্তৃত ভেজা বালুকাবেলাতে। হোটেলে ঢুকতেই দেখি, নিচে খাওয়ার জায়গাটি বেশ পরিচ্ছন্ন। ঘরটাও যথেষ্ট পছন্দসই।

ওখানে শুনলাম, অনেকে নাকি সৈকত বরাবর পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে গিয়েও সমুদ্রের দেখা পায়নি। মনটা খারাপ হয়ে গেল। তবে দেখলাম, প্রচুর রঙবেরঙের ঝিনুক, শাঁখ পড়ে রয়েছে বালির ওপর। সময় হাতে কম। সমুদ্র না দেখতে পাওয়ার মন খারাপ দূরে সরিয়ে গাড়ি নিয়ে আশেপাশের জায়গাগুলো দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।
পান্থনিবাস থেকেই দেখা যাচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র। ভেতরে ঢোকার কোনো অনুমতি নেই। কিন্ত সচক্ষে দেখলাম মিসাইল পরীক্ষার প্রান্তর। তারপর গাড়ির ড্রাইভার নিয়ে গেল একটি ফিসিং হারবারে। প্রচুর রঙবেরঙের ট্রলার দাঁড়িয়ে রয়েছে। নানা ধরণের রুপোলি মাছ শুকোচ্ছে ঝোলানো তার থেকে। এখান থেকে নাকি সারা পৃথিবীতে শুঁটকি মাছ রপ্তানি হয়। এরপর আমার গেলাম বুড়িবালাম নদীর তীরে। যেখানে বাঘযতীন ও তার দলবলের সঙ্গে ব্রিটিশদের সরাসরি যুদ্ধ হয়েছিল। বেশ একটা ঐতিহাসিক অনুভূতি হল। তারপর মূল আকর্ষণ ক্ষীরচোরা গোপীনাথের মন্দির। এই মন্দিরের স্থাপত্য ও ঐতিহ্য প্রাচীন উড়িষ্যার ইতিহাসকে মনে করিয়ে দিল। মন্দিরের ভেতর মনোমুগ্ধকর কিছু মাটির মূর্তি। রাধা কৃষ্ণের প্রেমলীলা সেই মৃৎশিল্পের সম্ভারে বন্দী। এবার কিন্তু পেটে ছুঁচোয় ডন-বৈঠক দিচ্ছে।

ফিরে এলাম পান্থনিবাসে। লাল কাঁকড়ার ঝোল দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না। ওটা দিয়েই তাই গুছিয়ে মধ্যাহ্নভোজ সারলাম। অনেক ভোরবেলা উঠেছি। এবার চোখ জড়িয়ে আসছে। টেনে একটা ঘুম লাগালাম। ঘুম ভাঙতেই দেখি, সূর্য ইতিমধ্যেই ডুব দিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ কানে একটা গর্জনের আওয়াজ এল। অবাক হলাম! জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখ বিস্ফারিত! পান্থনিবাসের সিঁড়িতে বঙ্গোপসাগরের বিপুল জলরাশি অবিরাম আছড়ে পড়ছে। এ তো পুরো ম্যাজিক। তৈরি হয়ে নিচে সৈকতের ধারে ক্যাফেটেরিয়াতে বসলাম।
সকালে যার দেখাই ছিল না, সন্ধেবেলা সে একেবারে দুয়ারে এসে হাজির। চাঁদের আলো খেলা করছে ঢেউয়ের শুভ্র সফেনের মাথায়। অপরূপ সেই দৃশ্য! সামুদ্রিক মাছভাজা আর কফি সহযোগে সেই দৃশ্য উপভোগ করতে লাগলাম। এই মোহময় পরিবেশ ছেড়ে উঠতেই ইচ্ছে করছিল না। কিন্ত কাল সকালে তাড়াতাড়ি বেরনো আছে। গন্তব্য সিমলিপাল অভয়ারণ্য। কিন্ত ঘুরতে এলে বাঙালি একটুও শপিং করবে না, এ অসম্ভব। তার ওপর যদি হাতের কাছেই সমুদ্র সৈকতের ওপরেই নানা পসরার দোকান থাকে। বেশিরভাগই সব ঝিনুক, শাঁখের তৈরি নানারকম নজরকাড়া বস্তু। বেশি না হলেও সামান্য কিছু কেনাকাটা হল। প্রয়োজনের থেকেও স্মৃতি ধরে রাখাটাই কেনার প্রধান উদ্দেশ্য। তবে চাঁদিপুরে এই পর্যটক বাজারের পরিবেশটা বেশ গ্ৰামীন। খুব ভালোই লাগছিল ঘোরাঘুরি করতে, তবুও বেশি রাত করা যাবে না। তাই ন’টার মধ্যেই ফিরে, হালকা খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

সকাল আটটার মধ্যেই ব্রেকফাস্ট প্যাক্ করে নিয়ে সমস্ত মালপত্র গুছিয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সমুদ্র তখন আবার ধীরে দূরে সরে যাবার প্রস্ততি নিচ্ছে। মানে ভাঁটা আসছে। যাত্রার আধঘন্টা পর থেকেই রাস্তা ক্রমে লালাভ কাঁকুরে হতে শুরু করল। বুঝলাম, আমরা ময়ূরভঞ্জ জেলায় পা দিলাম। দু’পাশের সমতল ক্রমশ ঢেউ খেলছে। এবার শুরু হল উঁচু নিচু ভূমি। কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো পাহাড়ি পথ শুরু হবে। তারই আগাম সংকেত। তবে অরণ্যের আভাস ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। শাল পিয়াল আর কৃষ্ণচূড়ার সমারোহ। পথ ক্রমশ বন্ধুর হতে শুরু করল। অরণ্য ক্রমাগত গভীর। রাস্তার গা ঘেঁষে ছোট বড় পাহাড়ের উঁকিঝুঁকি। মোটামুটি ঘন্টা আড়াই মত লাগল, সিমলিপাল জাতীয় অভয়ারণ্য ও উদ্যানে পৌঁছতে। আলাদা গাড়ি ভাড়া করে জঙ্গলের ভেতর প্রবেশ করতে হয়। এই জঙ্গলের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। এখানে বন্যপ্রাণ আর আদিবাসী সম্প্রদায়ের একই সঙ্গে সহাবস্থান। এখানে বন্যপ্রাণের মধ্যে বাঘ, লেপার্ড্, হাতি, ভাল্লুক, হরিণ ও নানা প্রজাতির সরীসৃপ। তবে তাদের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। আমরা অবশ্য প্রচুর হরিণ, নানা প্রজাতির পাখি, ও কিছু বিচিত্র রঙের গোসাপ, গেকো দেখেছি।

তবে আসল চমক তখনও বাকি ছিল। কিছু পাহাড়ি পথ পেরিয়ে আমরা ক্রমশ এগোতে লাগলাম। অরণ্য গভীর থেকে গভীরতর হতে লাগল। প্রথমেই মুগ্ধ হলাম একটি অসাধারণ জলপ্রপাত দেখে। নাম জোরান্ডা। বেশ মনোরম দৃশ্য। গাড়ির ড্রাইভার বলল, “ইয়ে স্রিফ্ ট্রেলার হ্যায়! পিকচার আভি পুরা বাকি!” আমরা শুনে অবাক হলাম। কিছুণের মধ্যেই ও গাড়ি নিয়ে গিয়ে দাঁড় করাল আর একটি জলপ্রপাতের ভিউ পয়েন্টের সামনে। সত্যিই আমরা বাকরূদ্ধ হয়ে গেলাম। উড়িষ্যাতে এরকম জলপ্রপাত! সারা হিমালয় চ’ষেও তো এরকমটি চোখে পড়েনি। জলপ্রপাতটি দু’ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে অনেক উচ্চতা থেকে বিপুল জলরাশি ঝাঁপিয়ে পড়ছে এক পাথরের চাতালে। তারপর সেখানে সামান্য কিছুটা পথ প্রবাহিত হয়েই আবার স্রোত শূন্যে নিম্নগামী। ছিটকে গিয়ে পড়ছে নিচের পাহাড়ি উপত্যকায়।

সৃষ্টি হচ্ছে বুধবালাঙ্গা নদী। সত্যিই অবিস্মরণীয় মনোমুগ্ধকর সেই দৃশ্য।একটি বিষয় বেশ অবাক করল আমাদের যে ভারতবর্ষের আর কোনও অভয়ারণ্যের ভেতরে গ্ৰামের সরল সাধাসিধে আদিবাসী মানুষগুলোকে অবলীলায় এরকম হেঁটে যেতে দেখিনি। ওরাও যেন এই জঙ্গলের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। এবার আলোর তেজ ক্রমশ পড়ে আসছে। আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে জঙ্গল থেকে। যত দূরে যাচ্ছি পিছনে জলপ্রপাতের কুলকুল শব্দ বুকের ভেতর বাজছে। বিদায় নিচ্ছি সিমলিপাল থেকে। গাড়ি আমাদের পৌঁছে দেবে সোজা পঞ্চলিঙ্গেশ্বর। সেভাবেই কথা হয়েছে গাড়িওয়ালার সঙ্গে। আজকের রাতের বুকিং আছে আমাদের পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের পান্থনিবাসে। গাড়িতে ঘন্টাতিনেক লাগবে। তবে একটানা নয়। মাঝখানে দাঁড়াব নীলগিরি পাহাড়ের কোলে এক প্রাচীন জগন্নাথ মন্দিরে। তারপর নীলগিরি পাহাড়ের গা ঘেঁষেই আমরা গিয়ে উঠব পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে।

নীলগিরি পাহাড়ের পাদদেশের জগন্নাথ মন্দিরটি সত্যিই খুব প্রাচীন। স্থাপত্য দেখলেই তা আন্দাজ করা যায়। তার উল্টোদিকেই একটি হোটেল আছে। ভাতের। যদিও বিকেল গড়িয়ে গেছে। তবুও সেই জলখাবারের পরে আর সারাদিন কিছু খাওয়া হয়নি। হোটেলের মালিক ছেলেটি খুব ভালো। খাবার সব শেষ। তবুও আমাদের বসতে বলে মিনিট পনেরোর মধ্যেই ভাত ডাল আলুভাজা আর ডিমের অমলেট বানিয়ে দিল। কেন এই কথাটা এই কাহিনীতে লিখলাম, কারণ সেদিন সেই খিদের মুখে বুঝেছিলাম অমৃত কাকে বলে। আড়ম্বরহীন ঐ খাবারের মেনু সেদিন ফাইভ্ স্টারকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল। আসলে, ‘হাঙ্গার ইজ্ দা বেস্ট্ সস্’।
পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পৌঁছে আমাদের মনে ভয় ধরে গেল। চারদিকে আলকাতরার মত চটচটে অন্ধকার। নিঝুম জঙ্গল। দানবের মত সব কালো পাহাড় চারদিকে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের গায়ে ঘন অরণ্যের কালো ছায়া। শব্দ বলতে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। খুব ক্ষীণ একটা কুলকুল শব্দ পাওয়া যাচ্ছে কান পাতলে। এইখানে রাত কাটাতে হবে! ভেবেই ভয় লাগছে। অবশেষে ধড়ে প্রাণ এল পান্থনিবাসের আলো দেখে। দারুণ ঘর। তার থেকেও জমজমাট খাওয়ার জায়গা। চিলি ফিস আর চিকেন কষা দিয়ে রাতের ডিনার সারলাম। বাইরে রাতে না বেরোনোই ভালো। হাতি, লেপার্ড, ভাল্লুক, সাপ, সব কিছুরই ভয় আছে। বিষাক্ত পোকামাকড় তো অজস্র প্রজাতির। খানিকক্ষণ টিভি দেখেই শুয়ে পড়লাম। সারা দিনের ক্লান্তি। কাল সকালে আবার ভোরে ওঠা। স্নান সেরেই পুজো দিতে হবে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের মন্দিরে।

সকালে উঠে কাচের জানলা সরাতেই চোখের সামনে বিশ্বের বিস্ময়। দৃষ্টি আগলে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল সবুজ পাহাড়। একদম হাত বাড়ালেই আদিম প্রকৃতি। তার মাথায় পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের জাগ্ৰত মন্দির দৃশ্যমান। সিঁড়ি বেয়ে ওখানেই উঠব আমরা।

আধঘন্টা মত লাগল নিচে থেকে মন্দিরে পৌঁছতে। পুজোর ডালা নেওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে পূজারীদের দক্ষিণার সেরকম কোনো জোর জবরদস্তি নেই। যা প্রাণে চায়, দিলেই ওরা সন্তুষ্ট। তবে তীব্র বেগের ঝর্নার ভেতর পিছল পথে পাঁচটি শিবলিঙ্গ স্পর্শ করা কিন্তু বেশ বিপজ্জনক। যথেষ্ট সাবধান হওয়া জরুরী। না হলে মৃত্যু অনিবার্য। নির্বিঘ্নেই পুজোপর্ব মিটল। এবার আবার আমাদের নিচে নামার পালা। মনে গেঁথে রইল এই পাহাড় আর তাকে ঘিরে থাকা সবুজের সমারোহ।

আমাদের আজকেই ফেরার পালা। বিকেলবেলা পাঁচটা নাগাদ ধৌলি এক্সপ্রেস ধরব বালাসোর থেকে। হাতে গোটা দিনটাই আছে। জায়গাটা গুছিয়ে ঘুরে দেখা যাবে। শুনলাম ক’দিন আগে হাতির একটি পাল এসে এখানে মাসখানেক ছিল। তারপর বাচ্ছাকে একটু বড় করে নিয়ে আবার জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেছে। সেই সময় পর্যটকদের স্বাভাবিক ঘোরাফেরায় বিধিনিষেধ ছিল। এখন সেরকম কিছু নেই। তবু হাতির দল যে জায়গাটায় ছিল, চাক্ষুষ করলাম। পাহাড়ের গা বেয়ে ঝরে পড়া পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের ঝর্নার কথা কোনদিন ভুলতে পারব না। মন্দির ছাড়িয়ে পাহাড়ি পথে বেশ খানিকটা ট্রেক করলাম। দর্শন হল এক গুহার। গাইডের মুখে শুনলাম এই গুহার গোপন পথ নাকি পাহাড় জঙ্গল ফাটিয়ে অনেক দূর চলে গেছে। যুদ্ধের সময় রাজারা এই পথ দিয়েই নাকি নিরাপদ স্থানে পালাত। গুহার ভেতরে বেশি এগোবার সাহস পেলাম না। কারণ শ্বাপদসঙ্কুল হওয়াটাই স্বাভাবিক।

দুপুরবেলা জমিয়ে খাওয়াদাওয়া করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বিদায় নীলগিরি… বিদায় সেই পাহাড় অরণ্য আর ঝর্নার মিলিত অনাবিল সৌন্দর্য। পথে ড্রাইভার দেখাল ইমামী জগন্নাথের মন্দির। একদম পুরী মন্দিরের আদলেই তৈরি। অবিকল যেন সেই একই স্থাপত্য। ট্রেন আসার সঠিক সময়ের অনেক আগেই গাড়ি আমাদের পৌঁছে দিল বালাসোর স্টেশনে। এবার ফেরার পালা। শুধু মনের ভেতর রয়ে গেল গত তিনদিনের কিছু চিরস্থায়ী স্মৃতি। এত অল্প সময়ে এত বেশি প্রাপ্তি আর কোনও ভ্রমণে এই জীবনে আর কখনও হয়নি।
সবুজে ভরা বর্ষার রান্না
বর্ষা মানেই শুধু টুপটাপ বৃষ্টি নয়, সঙ্গে নিয়ে আসে প্রকৃতির অফুরন্ত সবুজের সম্ভার। এই সময় বাজার ভরে ওঠে টাটকা লাউ, ঝিঙে, পটল, ঢেঁড়স, কচু, কাঁকরোল, উচ্ছে, মোচা-সহ নানা মৌসুমি সবজিতে। সহজ উপকরণে, ঘরোয়া মশলার ছোঁয়ায় এই সবজিগুলোই হয়ে ওঠে বাঙালির বর্ষার পাতে অনন্য স্বাদের পদ। সেই বর্ষার সেরা সবজি আর তাদের সুস্বাদু রান্নার রেসিপি নিয়েই আমাদের এই বিশেষ সংকলন। আশা করি, প্রতিটি পদ আপনার বর্ষার দুপুর কিংবা রাতের খাবারকে করে তুলবে আরও তৃপ্তিদায়ক ও স্মরণীয়।
স্টাফড কাঁকরোল
শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি

কী কী লাগবে
কাঁকরোল ৮-১০টি, চিংড়ি মাছ ২৫০ গ্রাম, নারকেল কোরা ১/২ কাপ, পোস্ত ২ টেবিল চামচ, সর্ষে ১ টেবিল চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৪–৫টি, পেঁয়াজ কুচি ১টি, রসুন কুচি ১ টেবিল চামচ, বেসন ১/২ কাপ, চালের গুঁড়ো ২ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১/২ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল পরিমাণমতো।

কীভাবে বানাবেন
কাঁকরোল অর্ধেক করে কেটে হালকা ভাপিয়ে ঠান্ডা করে ভেতরের বীজ বের করে নিন। সেই বীজের সঙ্গে পোস্ত, সর্ষে, নারকেল কোরা ও কাঁচা লঙ্কা বেটে পেস্ট তৈরি করুন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে পেঁয়াজ ও রসুন ভেজে নুন-হলুদ মাখানো চিংড়ি দিন। এরপর নারকেল-সর্ষের পেস্ট, শালিমার হলুদ ও লঙ্কা গুঁড়ো, নুন ও চিনি দিয়ে কষিয়ে শুকনো পুর তৈরি করুন। ঠান্ডা হলে কাঁকরোলের ভেতর পুর ভরে নিন। বেসন, চালের গুঁড়ো, নুন, হলুদ ও লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে মাঝারি ঘন ব্যাটার বানিয়ে পুরভরা কাঁকরোল ডুবিয়ে সর্ষের তেলে সোনালি করে ভেজে পরিবেশন করুন।
কচুপাতা চিংড়ি
বিনীতা হাজরা গুপ্ত

কী কী লাগবে
চিংড়ি ২০০ গ্রাম, কচুপাতা ২০টি (পরিষ্কার করে কুচি করা), সাদা সর্ষে ১ চা চামচ, কালো সর্ষে ১ চা চামচ, পোস্ত ১ চা চামচ, কোরানো নারকেল ৩–৪ টেবিল চামচ, কাঁচালঙ্কা ৩–৫টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, পাঁচফোড়ন ১/২ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল পরিমাণমতো, নুন স্বাদমতো, চিনি স্বাদমতো।

কীভাবে বানাবেন
চিংড়ি পরিষ্কার করে নুন ও হলুদ মাখিয়ে সর্ষের তেলে হালকা ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে পাঁচফোড়নের ফোড়ন দিয়ে কুচি করা কচুপাতা, নুন ও হলুদ দিয়ে নেড়ে সামান্য জল দিয়ে ঢেকে নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। এদিকে সাদা ও কালো সর্ষে, পোস্ত, কোরানো নারকেল ও কাঁচা লঙ্কা একসঙ্গে বেটে পেস্ট তৈরি করুন। কচুপাতা সেদ্ধ হলে ভালোভাবে মেখে পেস্টের মতো করে নিন। এরপর সর্ষে-পোস্তের পেস্ট, ভাজা চিংড়ি, স্বাদমতো চিনি ও ২ টেবিল চামচ সর্ষের তেল মিশিয়ে ঢেকে কম আঁচে ৫ মিনিট রান্না করুন। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
পটলের রসা
সোমা রায়

কী কী লাগবে
পটল ৫০০ গ্রাম, টমেটো ২টি, আদা ১ ইঞ্চি, কাঁচালঙ্কা ৪–৫টি, দুধ ১ কাপ, Shalimar's সর্ষের তেল ২ টেবিল চামচ, কালোজিরে ১/২ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হিং এক চিমটি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মসলা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি স্বাদমতো, ঘি ১ চা চামচ (ঐচ্ছিক)।

কীভাবে বানাবেন
পটল হালকা ভেজে তুলে রাখুন। আদা, টমেটো ও কাঁচা লঙ্কা একসঙ্গে বেটে নিন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরে ও হিংয়ের ফোড়ন দিন। এরপর বাটা মসলা, নুন ও হলুদ দিয়ে ভালো করে কষে তেল ছাড়লে ভাজা পটল মিশিয়ে দিন। দুধ ঢেলে ঢেকে দিন এবং পটল নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। শেষে গরম মসলা গুঁড়ো ও ইচ্ছেমতো ঘি মিশিয়ে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।
লাউপাতায় মাছ ভাপা
রিঙ্কু মিত্র

কী কী লাগবে
কাতলা মাছ ৬ টুকরো (প্রায় ৫০০ গ্রাম), লাউপাতা ৬–৮টি, সর্ষে ২ টেবিল চামচ, পোস্ত ১ টেবিল চামচ, কোরানো নারকেল ২ টেবিল চামচ (ঐচ্ছিক), কাঁচালঙ্কা ৫–৬টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, Shalimar's সর্ষের তেল ৩ টেবিল চামচ।

কীভাবে বানাবেন
কাতলা মাছ নুন ও হলুদ মাখিয়ে ১০ মিনিট রেখে দিন। সর্ষে, পোস্ত, কোরানো নারকেল ও কাঁচা লঙ্কা বেটে তার সঙ্গে নুন, হলুদ ও সর্ষের তেল মিশিয়ে মসলা তৈরি করুন। মাছের টুকরোগুলো সেই মসলায় ভালোভাবে মাখিয়ে নিন। লাউপাতা হালকা গরম জলে ডুবিয়ে নরম করে প্রতিটি পাতায় একটি করে মাছের টুকরো রেখে মসলা ও একটি কাঁচা লঙ্কা দিয়ে ভালোভাবে মুড়ে সুতো দিয়ে বেঁধে নিন। স্টিমারে বা ঢাকা কড়াইয়ে ১৫–২০ মিনিট ভাপিয়ে নিলেই তৈরি সুগন্ধি লাউপাতায় কাতলা মাছ ভাপা। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
কুমড়ো পাতায় মুসুর ডাল পাতুরি
ছবি দত্ত

কী কী লাগবে
মুসুর ডাল বাটা ১ কাপ, কুমড়ো পাতা ৮-১০টি, কাঁচালঙ্কা কুচি ২-৩টি, আদা কুচি ১ চা চামচ, পেঁয়াজ কুচি ২ টেবিল চামচ, কালোজিরে ১/২ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১/২ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ২-৩ টেবিল চামচ।

কীভাবে বানাবেন
কুমড়ো পাতাগুলো ভালো করে ধুয়ে নুন দেওয়া গরম জলে ১–২ মিনিট ভাপিয়ে নরম করে নিন। মুসুর ডাল বাটার সঙ্গে কাঁচা লঙ্কা, আদা, পেঁয়াজ কুচি, কালোজিরে, হলুদ, নুন, চিনি ও সামান্য সর্ষের তেল মিশিয়ে ভালোভাবে মেখে নিন। এবার প্রতিটি কুমড়ো পাতায় পরিমাণমতো ডালের মিশ্রণ দিয়ে ভালো করে মুড়ে নিন। অল্প সর্ষের তেলে কম আঁচে দুই দিক সোনালি ও মুচমুচে হওয়া পর্যন্ত ভেজে নিন। গরম গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
কাঁঠাল বীজামৃত পটল
মৌসুমী দাস

কী কী লাগবে
মাঝারি পটল ৮টি, কাজুবাদাম ১২–১৫টি (৩০ মিনিট ভিজিয়ে বাটা), কিশমিশ ২ টেবিল চামচ (ভিজিয়ে বাটা), সেদ্ধ কাঁঠাল বীজ বাটা ২ টেবিল চামচ, গ্রেট করা চিজ ১/২ কাপ, ফ্রেশ ক্রিম ১/৪ কাপ, নারকেলের গুঁড়ো ৩ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices গোলমরিচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, চিনি ১/২ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, ঘি / Shalimar's Sunflower তেল ১ চা চামচ।

গ্রেভির জন্য:
ফ্রেশ ক্রিম ১/২ কাপ, দুধ ১ কাপ, কাজুবাটা ২ টেবিল চামচ, নারকেলের গুঁড়ো ২ টেবিল চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, সাদা গোলমরিচ গুঁড়ো ১ চা চামচ, চিনি ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, ঘি ১ টেবিল চামচ, তেজপাতা ১টি, এলাচ ২টি, দারুচিনি ১ ইঞ্চি, জয়ত্রী গুঁড়ো এক চিমটি, গোলাপ জল ১ চা চামচ।
কীভাবে বানাবেন
পটলের খোসা হালকা ছাড়িয়ে ভেতরের বীজ বের করে নুন দিয়ে ৪–৫ মিনিট সেদ্ধ করে জল ঝরিয়ে রাখুন। ঘিতে কাজুবাটা, কিশমিশ বাটা, কাঁঠাল বীজ বাটা ও নারকেলের গুঁড়ো হালকা কষে চিজ, ফ্রেশ ক্রিম, নুন, চিনি ও গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে পুর তৈরি করুন। ঠান্ডা হলে সেই পুর পটলের মধ্যে ভরে নিন। অন্য কড়াইয়ে ঘি গরম করে তেজপাতা, এলাচ ও দারুচিনির ফোড়ন দিয়ে আদা বাটা কষে কাজুবাটা, নারকেলের গুঁড়ো ও দুধ মিশিয়ে ফুটিয়ে নিন। এরপর নুন, চিনি, সাদা গোলমরিচ ও জয়ত্রী গুঁড়ো দিয়ে গ্রেভি সামান্য ঘন হলে গোলাপ জল ও ফ্রেশ ক্রিম মিশিয়ে স্টাফ করা পটলগুলো দিয়ে ঢেকে কম আঁচে ৮–১০ মিনিট রান্না করুন। শেষে সামান্য ফ্রেশ ক্রিম, গ্রেট করা চিজ, ভাজা কাজুবাদাম ও কিশমিশ ছড়িয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
মালাই পটল
শানিয়া ময়রা

কী কী লাগবে
পটল ৫০০ গ্রাম, নারকেল কুচি ১/২ কাপ, আদা কুচি ১ চা চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৩–৪টি, গুঁড়ো দুধ ২ টেবিল চামচ, কাজুবাদাম ১০–১২টি, কিশমিশ ২ টেবিল চামচ, টমেটো ১টি, দুধ ১ কাপ (জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করা), গোটা গরম মসলা (দারুচিনি ১ ইঞ্চি, এলাচ ২টি, লবঙ্গ ৩টি), শুকনো লঙ্কা ২টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১ চা চামচ, Shalimar's Sunflower তেল ২–৩ টেবিল চামচ, ঘি ১ চা চামচ।

কীভাবে বানাবেন
পটলের খোসা ছাড়িয়ে হালকা চির দিয়ে তেলে ভেজে তুলে রাখুন। নারকেল কুচি, আদা কুচি, কাঁচা লঙ্কা, গুঁড়ো দুধ, কাজুবাদাম ও কিশমিশ সামান্য জল দিয়ে মিহি পেস্ট করে নিন। টমেটো আলাদা করে বেটে রাখুন। কড়াইয়ে তেল গরম করে গোটা গরম মসলা ও শুকনো লঙ্কার ফোড়ন দিয়ে টমেটো বাটা কষুন। এরপর নারকেলের পেস্ট, নুন, চিনি, হলুদ, কাশ্মীরি লঙ্কা, ধনে ও জিরে গুঁড়ো দিয়ে তেল ছাড়া পর্যন্ত কষিয়ে নিন। ভাজা পটল মিশিয়ে অল্প জল ও দুধ দিয়ে ৫–৭ মিনিট ফুটিয়ে নিন। শেষে ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে গরম ভাত, রুটি বা পরোটার সঙ্গে পরিবেশন করুন।
খাট্টা মিঠা আচারি কচুর লতি
মিঠু মল্লিক

কী কী লাগবে
কচুর লতি ২ আঁটি, বড় পেঁয়াজ ১টি (কুচি), রসুন ৫–৬ কোয়া (থেঁতো করা), লঙ্কা বাটা স্বাদমতো, পাতিলেবুর রস বা ভিনিগার ১ টেবিল চামচ, শুকনো লঙ্কা ২টি, মেথি ১/২ চা চামচ, মিক্সড আচার বা যেকোনো তেলের আচার ১ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি স্বাদমতো, Shalimar's সর্ষের তেল ৪–৫ টেবিল চামচ।

কীভাবে বানাবেন
কচুর লতি গরম জলে পাতিলেবুর রস বা ভিনিগার দিয়ে হালকা ভাপিয়ে ভালোভাবে জল ঝরিয়ে নিন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে শুকনো লঙ্কা ও মেথির ফোড়ন দিন। এরপর পেঁয়াজ লাল করে ভেজে রসুন দিয়ে ভাজুন। ভাপানো কচুর লতি দিয়ে মাঝারি আঁচে ভালোভাবে ভাজুন। তারপর হলুদ, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো, লঙ্কা বাটা, নুন ও চিনি দিয়ে ৫–৭ মিনিট ঢেকে রান্না করুন। শেষে আচারের তেল মিশিয়ে আঁচ বন্ধ করে পাতিলেবুর রস ছড়িয়ে ৩–৪ মিনিট ঢেকে রাখুন। গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন সুস্বাদু খাট্টা-মিঠা আচারী কচুর লতি।
ভাঙ্গাচোরা শুক্তো
শুভ্রা সাহা

কী কী লাগবে
ঝিঙে ২টি, আলু ২টি, বেগুন ১টি, কাতলা মাছের মাথা ১টি, তেজপাতা ২টি, সর্ষে ১/২ চা চামচ, মেথি ১/৪ চা চামচ, রাধুনী ১/২ চা চামচ, আদা বাটা ১ টেবিল চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ৩–৪ টেবিল চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১/২ চা চামচ, আটা বা ময়দা ১ চা চামচ (প্রয়োজন হলে)।
কীভাবে বানাবেন
কাতলা মাছের মাথায় নুন ও হলুদ মাখিয়ে সর্ষের তেলে ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে তেজপাতা, মেথি, সর্ষে ও রাধুনীর ফোড়ন দিয়ে আদা বাটা কষে নিন। এরপর ঝিঙে, আলু ও বেগুন, নুন ও হলুদ দিয়ে নেড়ে কম আঁচে ঢেকে রান্না করুন। আলাদা করে জল দেবেন না; সবজি থেকে বের হওয়া জলেই সেদ্ধ হবে। সবজি অর্ধেক সেদ্ধ হলে ভাজা মাছের মাথা মিশিয়ে আবার ঢেকে দিন। সবকিছু নরম হয়ে এলে সামান্য চিনি দিন। প্রয়োজনে ঝোল বেশি পাতলা হলে সামান্য আটা বা ময়দা গুলে মিশিয়ে নিন। শেষে অল্প আদা বাটা ও কাঁচা সর্ষের তেল ছড়িয়ে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
ডাল বড়া দিয়ে শশার শুক্তো
সুপর্ণা মন্ডল

কী কী লাগবে
বড় শসা ২টি (কুচি করা), আলু ১টি (কুচি করা), মটর ডাল ১/৩ কাপ (বা বিউলি/ছোলার ডাল), পাঁচফোড়ন ১ চা চামচ, রাধুনী ২ চা চামচ, কালো সর্ষে বা রাই ২ চা চামচ, পোস্ত ২ চা চামচ, আদা ১/২ ইঞ্চি, কাঁচালঙ্কা ২টি, দুধ ১/৪ কাপ, ঘি ১ চা চামচ, মৌরি ১ চা চামচ, হিং ১ চিমটি, Shalimar's সর্ষের তেল পরিমাণমতো, নুন ও চিনি স্বাদমতো।

কীভাবে বানাবেন
ডাল ভিজিয়ে বেটে ভালোভাবে ফেটিয়ে তাতে মৌরি, নুন, চিনি ও সামান্য কাঁচা লঙ্কা কুচি মিশিয়ে বড়া ভেজে নিন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল ও অল্প ঘি গরম করে হিং ও ১ চা চামচ রাধুনীর ফোড়ন দিন। আদা বাটা কষে আলু ও শসা দিয়ে নুন মিশিয়ে ঢেকে সেদ্ধ করুন। পাঁচফোড়ন, বাকি রাধুনী, সর্ষে, পোস্ত ও কাঁচা লঙ্কা হালকা ভেজে মিহি বেটে নিন। সবজি সেদ্ধ হলে সেই বাটা মশলা, বড়া, সামান্য জল ও দুধ দিয়ে ফুটিয়ে নিন। শেষে চিনি ও ঘি মিশিয়ে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
পাত পোড়া ঝিঙ্গা মুসুর
রাখী মজুমদার

কী কী লাগবে
ঝিঙ্গা ৫টি (মিহি কুচি করা), মুসুর ডাল ১/২ কাপ (ভিজিয়ে বাটা), আদা বাটা ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, কাঁচা লঙ্কা ৪টি, নারকেল কোরা ১/২ কাপ, নুন স্বাদমতো, চিনি ১/২ চা চামচ, Shalimar's সর্ষের তেল ২ টেবিল চামচ, কলাপাতা ১–২টি।

কীভাবে বানাবেন
ঝিঙ্গা ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে মিহি করে কুচিয়ে নিন। এর সঙ্গে ভেজানো মুসুর ডাল বাটা, আদা বাটা, জিরে গুঁড়ো, নারকেল কোরা, কাঁচা লঙ্কা, নুন, চিনি ও কাঁচা সর্ষের তেল মিশিয়ে ভালোভাবে মাখুন। ফ্রাইপ্যানে সামান্য তেল ব্রাশ করে কলাপাতা বিছিয়ে মিশ্রণটি সমান করে ছড়িয়ে দিন এবং ওপর থেকে ঢেকে মাঝারি আঁচে রান্না করুন। মাঝে একবার আলতো করে নেড়ে দিন। শেষে ওপর থেকে কাঁচা লঙ্কা ও সামান্য সর্ষের তেল ছড়িয়ে মিশ্রণ শুকনো হলে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
থোর গোবিন্দ
শম্পা দাস

কী কী লাগবে
সেদ্ধ থোর ১ বাটি (নুন ও হলুদ দিয়ে সেদ্ধ), গোবিন্দভোগ চাল ১ মুঠো (ধুয়ে ভিজিয়ে রাখা), আলু ১টি (চৌকো কাটা), আদা বাটা ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices ধনে গুঁড়ো ১ চা চামচ, কাঁচালঙ্কা ২টি, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি স্বাদমতো, ঘি ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices গরম মসলা গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, আস্ত জিরে ১/২ চা চামচ, তেজপাতা ১টি, শুকনো লঙ্কা ১টি, Shalimar's সর্ষের তেল ২ টেবিল চামচ।

কীভাবে বানাবেন
কড়াইয়ে তেল গরম করে নুন-হলুদ মাখানো আলু ভেজে তুলে রাখুন। একই তেলে শুকনো লঙ্কা, তেজপাতা ও আস্ত জিরের ফোড়ন দিয়ে ভেজানো গোবিন্দভোগ চাল হালকা ভেজে নিন। এরপর আদা বাটা কষে আদার কাঁচা গন্ধ চলে গেলে ভাজা আলু, ধনে গুঁড়ো, হলুদ ও নুন দিয়ে সামান্য জল ছিটিয়ে কষুন। সেদ্ধ থোর হাত দিয়ে হালকা কচলে মিশিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন। প্রয়োজনমতো গরম জল দিয়ে ঢেকে চাল ও সবজি সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। শেষে চিনি, ঘি ও গরম মসলা গুঁড়ো মিশিয়ে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন।
সর্ষে পোস্ত দিয়ে কচুর লতি
নবনীতা ব্যানার্জি বোস

কী কী লাগবে
কচুর লতি ১ আঁটি, সর্ষে–পোস্ত বাটা ১/৪ কাপ, কাঁচালঙ্কা বাটা ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, পেঁয়াজ কুচি ১টি, রসুন কুচি ১ চা চামচ, কালোজিরে ১/২ চা চামচ, শুকনো লঙ্কা ১টি, নুন স্বাদমতো, চিনি স্বাদমতো, Shalimar's সর্ষের তেল পরিমাণমতো।
কীভাবে বানাবেন
কচুর লতির আঁশ ছাড়িয়ে টুকরো করে কেটে নিন। কড়াইয়ে সর্ষের তেল গরম করে কালোজিরে ও শুকনো লঙ্কার ফোড়ন দিন। এরপর কাঁচা লঙ্কা বাটা, পেঁয়াজ কুচি ও রসুন কুচি দিয়ে ভেজে নিন। নুন ও হলুদ দিয়ে কচুর লতি মিশিয়ে ভালোভাবে ভেজে কম আঁচে ঢেকে নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। এরপর চিনি ও সর্ষে–পোস্ত বাটা মিশিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন। তেল ছাড়তে শুরু করলে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
চিংড়ি দিয়ে লাউ শাকের ঝোল
সিনাত্রা সেন

কী কী লাগবে
লাউ শাক ১ আঁটি, মাঝারি চিংড়ি মাছ ১৫০ গ্রাম, কুমড়ো ১ ফালি, ঝিঙে ২টি, আলু ১টি, কাঁচা লঙ্কা ২–৩টি, পাঁচফোড়ন ১ চা চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, Shalimar's Chef Spices জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, গোবিন্দভোগ চাল বাটা দেড় চা চামচ, দুধ দেড় চা চামচ, নুন স্বাদমতো, চিনি স্বাদমতো, ঘি ১ চা চামচ।

কীভাবে বানাবেন
লাউ শাক কেটে ধুয়ে জল ঝরিয়ে রাখুন। চিংড়ি মাছ নুন ও হলুদ মাখিয়ে হালকা ভেজে তুলে রাখুন। গোবিন্দভোগ চাল ভিজিয়ে মিহি বেটে দুধের সঙ্গে গুলে রাখুন। কড়াইয়ে তেল গরম করে পাঁচফোড়ন ও কাঁচা লঙ্কার ফোড়ন দিন। এরপর আলু, কুমড়ো, আদা বাটা, হলুদ, জিরে গুঁড়ো ও নুন দিয়ে কষে অল্প জল দিয়ে ঢেকে দিন। কিছুক্ষণ পর ঝিঙে ও লাউ শাক মিশিয়ে রান্না করুন। সবজি নরম হলে চাল-দুধের মিশ্রণ ও সামান্য চিনি দিয়ে নেড়ে নিন। শেষে ভাজা চিংড়ি দিয়ে ১–২ মিনিট ফুটিয়ে ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
ঠাকুমার শরবতের গ্লাস থেকে আধুনিক সুপারফুড
সঙ্গীতা তালুকদার
গরমের ছুটির দুপুর। বাইরে রোদ ঝাঁঝালো, মাঠে খেলা করে ঘামে ভিজে বাড়ি ফেরা। সেই সময় মা বা ঠাকুমা এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত হাতে ধরিয়ে দিতেন। শরবতের মধ্যে ভেসে বেড়াত ছোট ছোট কালো দানা। তখন কে আর জানত, সেই দানাগুলিই একদিন "সুপারফুড" নামে পরিচিত হবে! ছোটবেলায় আমরা শরবতের স্বাদ বুঝতাম, কিন্তু তার উপকারিতা নিয়ে ভাবতাম না। আজ যখন স্বাস্থ্যসচেতনতা বেড়েছে, তখন বুঝতে পারি আমাদের আগের প্রজন্ম কত অজান্তেই কত মূল্যবান খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করতেন। সেই পুরনো দিনের শরবতের অন্যতম উপাদান ছিল সবজা বীজ।

সবজা বীজ আসে সুইট বেসিল বা মিষ্টি তুলসী গাছ থেকে। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ocimum basilicum। ভারত, বাংলাদেশ, পারস্য, আরব দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার খাদ্যসংস্কৃতিতে বহু শতাব্দী ধরে এর ব্যবহার হয়ে আসছে। বিভিন্ন ভাষায় এর বিভিন্ন নাম রয়েছে। বাংলায় সবজা বীজ, হিন্দিতে তুকমারিয়া, গুজরাটিতে তকমরিয়া, উর্দুতে তুখমে বালাঙ্গু, ইংরেজিতে Basil Seeds বা Falooda Seeds, আরবিতে হাব্ব আল-রাইহান।
সবজা বীজের সবচেয়ে বড় শক্তি লুকিয়ে আছে এর পুষ্টিগুণে। এতে রয়েছে প্রচুর খাদ্যআঁশ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, সামান্য উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। শরীরের জন্য এর উপকারিতা অনেক। এটি পেট দীর্ঘক্ষণ ভরা রাখতে সাহায্য করে, ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। খাদ্যআঁশ হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সহায়তা করতে পারে।
গরমকালে শরীরের জলের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। অনেকেই বিশ্বাস করেন, এটি শরীরের অতিরিক্ত উষ্ণতা কমাতে সহায়ক। আয়ুর্বেদিক মতে, সবজা বীজের প্রকৃতি শীতল। তাই সাধারণভাবে এটি শরীর গরম করে না। বরং গ্রীষ্মকালে শরবত, লস্যি, দই কিংবা ফলের পানীয়ের সঙ্গে এটি খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।
কখন খাওয়া যায়?
সকালে খালি পেটে, দুপুরে স্মুদির সঙ্গে, বিকেলে শরবতে, ইফতারে অথবা রাতে হালকা ডেজার্টের সঙ্গে।
কীভাবে খেতে হয়?
এক থেকে দুই চা-চামচ সবজা বীজ ১৫ থেকে ২০ মিনিট জলে ভিজিয়ে রাখুন। বীজ ফুলে উঠে জেলির মতো আবরণ তৈরি করলে তা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত। লেবুর শরবত, বেলের শরবত, ফালুদা, লস্যি, দই, ফলের সালাদ, স্মুদি, কুলফি কিংবা আইসক্রিমেও এটি ব্যবহার করা যায়।
আজ বিজ্ঞান যেসব পুষ্টিগুণের কথা বলছে, আমাদের মা-ঠাকুমারা হয়তো সেই ভাষা জানতেন না। কিন্তু তাঁরা জানতেন, গরমের দিনে শরবতে একটু সবজা দিলে শরীর ভালো থাকে। হয়তো আধুনিক পৃথিবী নতুন কিছু আবিষ্কার করছে না। বরং পুরনো জ্ঞানকে নতুনভাবে চিনতে শিখছে। একটি ছোট্ট বীজ। অথচ তার মধ্যে লুকিয়ে আছে ইতিহাস, পুষ্টি, ঐতিহ্য এবং অসংখ্য স্মৃতির গল্প।
রবিবারের গল্প: কনে দেখা আলো
দেবব্রত সাহা
অফিসে প্রায় চার বছর পাশাপাশি টেবিলে বসে কাজ করার সূত্রে নীলমণি ও পলাশের সখ্যতা বেশ গভীর হয়ে উঠেছিল। বয়সে নীলমণি পলাশের থেকে বছর তিনেকের বেশি হলেও হয়তো মানসিকতার মিল মিশ হয়েছিল। গত দু'বছর ধরে নীলমণির বাবা ছেলের বিয়ের জন্য পাত্রীর সন্ধানে থেকে বিফল মনোরথ হয়ে একদিন পলাশকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে বললেন "বাবা, পলাশ তুমি তো আমার ছেলে নীলমণির বিশেষ বন্ধু। আমি ছেলের পাত্রীর সন্ধানে আছি বছরখানেক ধরে। মনমতো পাত্রী পাওয়া দুষ্কর। আবার দু একটা পাত্রী পছন্দ হলেও পাত্রীপক্ষ নানান ওজোর আপত্তির বাহানা করে নাকচ করে দিচ্ছে। এখন তোমাকে অনুরোধ করি তোমার বন্ধুর বিয়ের পাত্রীর ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবনা চিন্তা করো।"
নীলমণির বাবার কথাগুলো শুনে চেহারায় ঝকঝকে ও কথাবার্তায় চৌখস পলাশের বুঝতে দেরি হলো না যে সরকারি চাকুরে ছেলে পাত্র হলেও বর্তমানে পাত্রীপক্ষের নাকচ করে দেওয়ার মূলে পাত্রীর নিজস্ব কিছু পছন্দ কাজ করে। আসলে বন্ধু হলে কি হবে, নীলমণি খর্বকায় ও একটু নাদুস-নুদুস চেহারার। সেইসঙ্গে বয়স জনিত একটা ছাপ ইদানিং চোখে মুখে পড়তে শুরু করেছে।এটাই হয়তো নাকচ করে দেবার আসল কারণ।
পলাশ আরো জানত সবচেয়ে কঠিন ও বিপদজনক কাজ এই পাত্র-পাত্রী খুঁজে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের অংশীদার হওয়া। তাই প্রথমে পলাশ রাজি হলো না। পরে নীলমণির বাবার একান্ত অনুরোধে অনেকটা নিমরাজী হয়ে বলল "ঠিক আছে মেসোমশাই আমি দেখব, তবে পুরো কথা দিতে পারছি না।"
যাইহোক পলাশ রবিবার বাংলা দৈনিক কাগজগুলিতে দেওয়া পাত্র-পাত্রী কলমে নজর রাখতে শুরু করল। যত রবিবার যায় পলাশ তত হতাশ হয়ে পড়ে। আসলে পাত্রীপক্ষেরও যে এত সব দাবি থাকতে পারে তা পলাশের জানা ছিল না। পলাশ জানতো পাত্র সরকারি চাকরি করে এটাই আসল গুন।
বেশ কিছুদিন পর একসময় এক রবিবারের দৈনিক বাংলা কাগজে পাত্র পাত্রী কলমের বিজ্ঞাপনে দেখলো, পাত্র-পাত্রী বায়োডাটার সঙ্গে আলাদা দুটি লাইন আন্ডারলাইন করে জুড়ে দেওয়া আছে"পাত্রী নিজে আগে পাত্রীপক্ষের অভিভাবকদের সঙ্গে পাত্র পক্ষের বাড়ি যাবে পাত্র নির্বাচন করতে এবং পাত্রীর নির্বাচনই একমাত্র বিবেচ্য।"
পলাশ বিজ্ঞাপনটা পড়ল আর ওই আন্ডারলাইন
অংশটা দু তিনবার পড়লো। তারপর সমস্ত ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পেরে পৌরুষে যেন একটু ঘা পড়লো। পাত্রীটির প্রতি একটু ঔৎসুক্যও জন্মালো।
পরদিন পলাশ নীলমনির বাবাকে এই পাত্রীর কথা বললে নীলমণির বাবা সামান্য হেসে বললেন "তুমি বুদ্ধিমান ছেলে তোমাকে দায়িত্ব দিয়েছি, এখন তুমি যা ভালো বোঝো।"
অতঃপর নির্দিষ্ট দিনে বিকেলের দিকে পাত্রী অভিভাবক হিসাবে দাদা বৌদি সহযোগে নীলমণির বাড়িতে পৌঁছল, পলাশ প্রস্তুতই ছিল। সাদর অব্যর্থনা করে ভেতরের ঘরে সোফায় বসালো।
পলাশ নিজের পরিচয় দিয়ে নীলমণির মায়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। পাত্রীর দাদা নিজের পরিচয় দিলেন ও পাশে বসা মহিলাকে নিজের স্ত্রী ও পাত্রীর বৌদি হিসেবে পরিচয় করে দিলেন। তারপর বৌদির পাশে বসা যুবতীকে দেখিয়ে বললেন "ইনিই পাত্রী এবং আমার একমাত্র বোন নাম 'কনিষ্ঠা'।"
"কনিষ্ঠা"শব্দটা শুনেই পলাশ পাত্রীর দিকে দৃষ্টিপাত করলো। ঠিক সেই মুহূর্তে পাত্রীও পলাশের দিকে এক পলক তাকিয়েই না দেখার ভান করে উপস্থিত সবার দিকে চেয়ে রইল। এবার জলোযোগ পর্ব শেষ হলে পলাশ বন্ধু নীলমণিকে ডেকে এনে সোফায় বসিয়ে পরিচয় করিয়ে দেবার ফাঁকে পাত্রের গুণাবলী সবিস্তারে বলতে শুরু করল। এসব কথায় পাত্রীর কোন ভাবান্তর হলো না। পাত্রী কনিষ্ঠা কেবল পলাশের কথা বলা ও ভাবভঙ্গিমা গভীরভাবে লক্ষ্য করছিল। এখন পাত্রকে দেখে কনিষ্ঠার মনে একরাশ বিরক্তি জন্মালো। কনিষ্ঠা বলল "ইনিই যে পাত্র, সরকারি অফিসে চাকুরীরত কি করে বুঝবো?"
কথাগুলো মুহূর্তের মধ্যে পলাশের আঁতে ঘা মারলো। উপযুক্ত প্রত্যুত্তর দিতে হবে। তাই মোলায়েম স্বরে থেমে থেমে বলল"ঠিক যেভাবে আমরা বুঝবো আপনি পাত্রী এবং ইংরেজিতে এমএ"
এরকম প্রত্যুত্তরের যে সম্মুখীন হতে হবে তা কনিষ্ঠা ভেবে উঠতে পারেনি। তাই প্রথমে একটু থতিয়ে গেলো ,পরক্ষণে বলল "সেটা তো পাত্রীপক্ষের বাড়িতে গেলেই বুঝতে পারবেন। এবং সার্টিফিকেট গুলো দেখিয়ে দেওয়া যাবে।"
এবার পলাশ আবার ঘা মারলো"আর তখন যদি কোন জল মেশানো দেখা যায়, তবে?"
কনিষ্ঠা অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলল "তার মানে?"
পলাশ বলল "দেখুন কনিষ্ঠা দেবী, অনেক আগে পাত্র-পক্ষের বাবা-মা এবং অন্য দু-একজন পাত্রী দেখতে যেতেন। তাদের পছন্দ হলে পাত্র বন্ধুবান্ধবসহ পাত্রী পছন্দ করতে যেত। এখন আমরা একটু আধুনিক হয়েছি। এখন বন্ধু-বান্ধব নয়, প্রথমেই পাত্র বাবা-মা বা অন্য কোন বয়স্ক নিকট আত্মীয় সহযোগে পাত্রী পছন্দ করতে যায়। আপনি এখন এই চলমান প্রক্রিয়ার মূলে কুঠারাঘাত করতে চাইছেন। আমার মনে হয় অতটা আধুনিক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখিনা। আর সবার উপরে পারস্পরিক বিশ্বাস কাজ করে।"
এই কথাগুলো শুনে কনিষ্ঠা আর একবার যুবক পলাশের দিকে তাকালো। মনে মনে পলাশ নামক এই যুবকের বাচনভঙ্গির তারিফ করল।
কিন্তু কনিষ্ঠার দাদা বৌদি বুঝতে পারলেন ব্যাপারটা একটা তিক্ততার দিকে এগোতে পারে। তাই ব্যাপারটার ইতি টানতে কনিষ্ঠার দাদা বললেন "পলাশ বাবু, আপনার কথা মেনে নিয়ে বলি আমাদের বোন যে এমন প্রসঙ্গের অবতারণা করবে তা আগে থাকতে বুঝে উঠতে পারিনি। যাইহোক আমরা দাদা বৌদি পাত্র দেখে গেলাম। আপনাদের মোবাইল নাম্বার দিন, যা মতামত হয় জানিয়ে দেবো।"
দাদা বৌদির সাথে ফিরবার পথে সব বাদানুবাদ ভুলে কনিষ্ঠা কেবল ভাবতে লাগলো--এটাতো ফাল্গুন মাস পলাশ ফুল ফোটে, প্রকৃতিকে রঙে রঙে ভরিয়ে তোলে। তার মনেও কি পলাশের রঙের ছোঁয়া লেগেছে? পলাশের নেশা তার মনে লাগছে কি?
এমন সময় বৌদি বললেন "এখানে এসে আমার বাপু একটা আলাদা অভিজ্ঞতা হলো"
কনিষ্ঠার দাদা এতক্ষণ নীরবতা অবলম্বন করে ছিলেন। এবার মনের গুমোট ভাবটা কাটাবার জন্য স্ত্রীর কথার পৃষ্ঠে বললেন "কি রকম অভিজ্ঞতা?"
বৌদির সামান্য হেসে ননদকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগলেন "বন্ধুত্ব সবসময় সমানে সমানে হয় না। দেখো না আমাদের পাত্র আর ওর বন্ধু পলাশ বলে ছেলেটা সব দিক দিয়ে একদম অন্যরকম। বেমানান বন্ধুত্ব। একজন বেটে নাদুস নুদুস কথাবার্তায়ও তেমন পারদর্শী বলে মনে হল না। কিন্তু পাত্রের বন্ধু পলাশ কেমন ঝকঝকে চেহারার এবং কইয়ে বলিয়ে, আমাদের কনিষ্ঠাকে তো একেবারে চুপ করিয়ে দিয়েছে।"
কনিষ্ঠা এতক্ষন অন্য জগতে বিচরণ করছিল। এবার বৌদির কথায় হুঁশ ফিরলো। বৌদির হাসির সাথে কনিষ্ঠার অধর জোড়া হাসি মিলে বৌদির কথার মান্যতা দিতে গিয়ে মুখমন্ডল জুড়ে 'গোধূলির কনে দেখা আলো ' ছড়িয়ে পড়লো।।







Comments