top of page

তিন রথে লুকিয়ে থাকা রহস্য | নীলাচলের ভোগের পদ | কালিকানন্দ অবধূত | রবিবারের গল্প: আরও এক হাসুলী বাঁক


তিন রথে লুকিয়ে থাকা রহস্য

-নিজস্ব প্রতিনিধি


রথের প্রতিটি কাঠ, চাকা, পতাকা ও রশির আড়ালে লুকিয়ে আছে আধ্যাত্মিক দর্শনের এক অনন্ত কাহিনি। আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথি এলেই সমগ্র ভারতবর্ষ যেন এক অনন্য উৎসবের আবহে মেতে ওঠে। পুরীর শ্রীজগন্নাথধামে তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল। আকাশে ধ্বনিত হয়—‘জয় জগন্নাথ’। বিশাল তিনটি সুসজ্জিত রথ ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে শ্রীমন্দির থেকে গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে। এই দৃশ্য শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ভারতীয় সংস্কৃতি, ভক্তি, দর্শন ও মানবতার এক মহামিলন।


রথযাত্রা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। কিন্তু এই তিনটি রথ—নন্দীঘোষ, তালধ্বজ ও দর্পদলনের প্রতিটি কাঠ, প্রতিটি চাকা, প্রতিটি পতাকা কিংবা প্রতিটি রশির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য, পুরাণ, প্রতীকতত্ত্ব ও গভীর আধ্যাত্মিক রহস্য। তাই রথযাত্রাকে কেবল দেববিগ্রহের ভ্রমণ বললে ভুল হবে; এটি আসলে জীবনের চলার পথ, আত্মার যাত্রা এবং ঈশ্বরের কাছে মানুষের অবারিত আহ্বানের এক মহামহিম প্রতীক।


প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়েছে—“রথস্থ বামনং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে।” অর্থাৎ রথে আরোহী জগন্নাথদেবের দর্শন করলে পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ হয়। এই বিশ্বাসেই প্রতি বছর অসংখ্য ভক্ত রথের দড়ি স্পর্শ করতে কিংবা একবার রথটিকে টানতে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। কারণ তাঁদের বিশ্বাস, ভক্তিভরে রথ টানা মানে নিজের জীবনের সমস্ত পাপ, অহংকার ও অশুভ শক্তিকে পিছনে ফেলে ঈশ্বরের পথে এগিয়ে যাওয়া।



পুরীর রথযাত্রার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হল, প্রতিবছর নতুন করে তিনটি রথ নির্মাণ করা হয়। অক্ষয় তৃতীয়ার শুভ দিনে নির্দিষ্ট বনাঞ্চল থেকে বিশেষ প্রজাতির কাঠ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই নির্মাণকাজ। বহু প্রজন্ম ধরে নির্দিষ্ট পরিবারভুক্ত বিশ্বকর্মা সম্প্রদায়ের কারিগরেরাই এই গুরুদায়িত্ব পালন করে আসছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একই নিয়ম, একই আচার, একই পরম্পরা অক্ষুণ্ণ রয়েছে। আধুনিক যন্ত্রের যুগেও এই নির্মাণে ঐতিহ্যই শেষ কথা।


তিনটি রথের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল শ্রীজগন্নাথের নন্দীঘোষ। প্রায় পঁয়তাল্লিশ ফুট উচ্চতার এই বিশাল রথ দূর থেকেই ভক্তদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রথটির গায়ে হলুদ ও লাল বস্ত্রের অপরূপ সাজ, মাথায় ত্রৈলোক্যমোহিনী পতাকা এবং সামনে সারিবদ্ধ ষোলোটি বিশাল চাকা যেন এক অনন্য স্থাপত্যশিল্পের নিদর্শন। এই রথ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় আটশোরও বেশি কাঠের খণ্ড। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এত বিশাল কাঠামো তৈরি হলেও রথের প্রতিটি অংশের মাপ, বিন্যাস ও নির্মাণপদ্ধতি শতাব্দীর পর শতাব্দী একই রয়ে গেছে।


নন্দীঘোষের ষোলোটি চাকা নিয়েও রয়েছে নানা ব্যাখ্যা। অনেকের মতে, এই ষোলো চাকা মানুষের ষোলোটি সংস্কার, আবার কেউ বলেন চাঁদের ষোলো কলা কিংবা মানবজীবনের পূর্ণতার প্রতীক। অর্থাৎ জগন্নাথের রথ যেন সম্পূর্ণতার পথে মানুষের অগ্রযাত্রার প্রতিচ্ছবি। জীবনের অসম্পূর্ণতা থেকে পরিপূর্ণতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানই এই চাকার ঘূর্ণনে প্রতিফলিত হয়।



জগন্নাথের রথের আর একটি বিস্ময়কর দিক হল তার রশি। এই রশির নাম শঙ্খচূড়া নাগুনি। হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে এই রশি ধরে রথ টানেন। সমাজে ধনী-গরিব, জাত-পাত, বর্ণ বা ধর্মের কোনও ভেদাভেদ এখানে থাকে না। একই রশিতে হাত রাখেন রাজা, সাধারণ মানুষ, বিদেশি পর্যটক, সন্ন্যাসী, শ্রমিক—সকলেই। যেন এই রশিই মানবসমাজকে একসূত্রে বেঁধে রাখার প্রতীক।


রথের সামনে থাকে চারটি শুভ্র অশ্ব। পুরাণবিদদের মতে, এই চারটি ঘোড়া মানুষের চারটি শক্তির প্রতীক—মন, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকার। আর সারথি সেই শক্তিগুলিকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন। মানুষের জীবনও ঠিক এমনই। ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করেই ঈশ্বরের পথে এগিয়ে যেতে হয়। তাই রথযাত্রা কেবল একটি উৎসব নয়, এটি জীবনের গভীর দর্শনেরও প্রতীক।


জগন্নাথের সঙ্গে একই দিনে যাত্রা করেন তাঁর জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলরাম এবং ভগিনী সুভদ্রা। বলরামের রথ তালধ্বজ উচ্চতায় প্রায় চুয়াল্লিশ ফুট। এই রথে থাকে চৌদ্দটি চাকা। লাল ও সবুজ বস্ত্রে সজ্জিত তালধ্বজ শক্তি, স্থিতি এবং ন্যায়ের প্রতীক। বলরামকে কৃষিশক্তি ও মানবসমাজের রক্ষাকর্তা হিসেবেও দেখা হয়। তাই তাঁর রথের চলা যেন পৃথিবীর স্থিতিশীলতারও প্রতীক।



অন্যদিকে সুভদ্রার রথ দর্পদলন, যার অর্থ অহংকার বিনাশকারী। প্রায় তেতাল্লিশ ফুট উচ্চতার এই রথে রয়েছে বারোটি চাকা। লাল ও কালো বস্ত্রে সজ্জিত এই রথের নাম পদ্মধ্বজও বলা হয়। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় সুভদ্রা হলেন আদ্যাশক্তির প্রতীক। তাঁর রথের নামই যেন মানুষকে শিক্ষা দেয়—অহংকার ত্যাগ করেই ঈশ্বরলাভ সম্ভব।


এই তিনটি রথের নির্মাণেও রয়েছে আশ্চর্য সামঞ্জস্য। প্রতিটি রথের নির্দিষ্ট রং, নির্দিষ্ট পতাকা, নির্দিষ্ট সারথি, নির্দিষ্ট রক্ষক দেবতা এবং নির্দিষ্ট সহচর দেবদেবী রয়েছেন। কোনও কিছুই আকস্মিক নয়। প্রতিটি বিষয়ের পিছনেই রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন আচার এবং প্রতীকী ব্যাখ্যা।


রথযাত্রার আর একটি অনন্য দিক হল ছেড়া পাহাড়া। এই অনুষ্ঠানে গজপতি মহারাজ স্বর্ণঝাড়ু দিয়ে তিনটি রথ পরিষ্কার করেন। একজন রাজা নিজ হাতে রথ ঝাড়ু দিচ্ছেন—এই দৃশ্য বিশ্বের অন্য কোথাও দেখা যায় না। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, ঈশ্বরের সামনে সকলেই সমান। ক্ষমতা, ঐশ্বর্য কিংবা সামাজিক মর্যাদা—সবই তাঁর চরণে তুচ্ছ।


রথযাত্রা উপলক্ষে পুরী যেন এক বিশাল মানবসমুদ্রে পরিণত হয়। লক্ষ লক্ষ মানুষের কণ্ঠে জয়ধ্বনি, শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টাধ্বনি আর কীর্তনের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা শহর। কিন্তু এই উৎসবের আসল শক্তি রয়েছে মানুষের বিশ্বাসে। শত কষ্ট, শত বাধা পেরিয়ে একবার রথযাত্রায় অংশ নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা বহু ভক্তের আজীবনের সাধ।



অনেকেই মনে করেন, রথযাত্রা মানে জগন্নাথের মাসির বাড়ি যাওয়া। কিন্তু এর মধ্যেও লুকিয়ে আছে গভীর তত্ত্ব। গুণ্ডিচা মন্দিরকে অনেকেই মানুষের হৃদয়ের প্রতীক বলে ব্যাখ্যা করেন। অর্থাৎ জগন্নাথ স্বয়ং ভক্তের হৃদয়ে আগমন করেন। তাই রথযাত্রা আসলে ভক্ত ও ভগবানের মিলনের উৎসব।


আজকের প্রযুক্তিনির্ভর যুগেও পুরীর রথযাত্রা কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে একইরকম আবেগ সৃষ্টি করে। কারণ এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ভারতীয় ঐতিহ্যের জীবন্ত দলিল। প্রতি বছর নতুন রথ নির্মাণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবন পরিবর্তনশীল, শরীর নশ্বর, কিন্তু আত্মা ও বিশ্বাস চিরন্তন।


জগন্নাথের রথ তাই কেবল কাঠ, চাকা কিংবা রঙিন কাপড়ের সমষ্টি নয়। এটি মানবসভ্যতার এক চলমান দর্শন, যেখানে প্রতিটি কাঠের গাঁথুনি ভক্তির ভাষায় কথা বলে, প্রতিটি চাকার ঘূর্ণন সময়ের চক্রকে স্মরণ করায়, প্রতিটি রশি মানুষে মানুষে ঐক্যের বন্ধন তৈরি করে এবং প্রতিটি যাত্রা শেখায়—ঈশ্বর কখনও দূরে নন, তিনি মানুষের কাছেই আসেন। আর সেই কারণেই যুগের পর যুগ ধরে পুরীর রথযাত্রা শুধু একটি উৎসব নয়, হয়ে উঠেছে বিশ্বাস, ভক্তি ও মানবতার এক অবিনশ্বর প্রতীক।

নীলাচলের ভোগের পদ



জগন্নাথের ভোগ এই দুটি শব্দের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে ভক্তি, ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ রন্ধনসংস্কৃতি এবং মহাপ্রভুর প্রতি নিবেদনের অনন্ত অনুভব। পুরীর শ্রীমন্দিরের মহাপ্রসাদ শুধু একটি খাদ্য নয়, এটি বিশ্বাস, সমতা ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য প্রতীক। এখানে রাজা থেকে সাধারণ মানুষ, সকলেই একই প্রসাদ গ্রহণ করেন, যেখানে ভেদাভেদের কোনো স্থান নেই।



শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শ্রীজগন্নাথদেবের ভোগের পদগুলি ওড়িশার রন্ধনঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে। অন্ন, ডাল, শাক, নানা রকম তরকারি, খিচুড়ি, পিঠা, পায়েস থেকে শুরু করে অসংখ্য মিষ্টান্ন; প্রতিটি পদই সাত্ত্বিক, পবিত্র এবং সহজ উপকরণে প্রস্তুত। মাটির হাঁড়িতে কাঠের আগুনে রান্না করা এই ভোগের স্বাদ যেমন অনন্য, তেমনি তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু অলৌকিক কাহিনি, আচার এবং বিশ্বাস।



এই সংকলনে আমরা তুলে ধরেছি জগন্নাথদেবের ভোগে নিবেদিত কয়েকটি জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী পদ। প্রতিটি রেসিপির সঙ্গে রয়েছে ভক্তির আবেশ, প্রাচীন রন্ধনপ্রণালীর ছোঁয়া এবং ঘরোয়া উপায়ে সেই স্বাদ পুনর্নির্মাণের প্রয়াস। উদ্দেশ্য একটাই, মহাপ্রভুর প্রসাদের ঐশ্বর্যকে আরও কাছ থেকে জানা, অনুভব করা এবং নিজের রান্নাঘরেও সেই পবিত্রতার স্পর্শ এনে দেওয়া। আসুন, ভোগের প্রতিটি পদে খুঁজে নিই ভক্তির স্বাদ, ঐতিহ্যের সুবাস এবং শ্রীজগন্নাথের অশেষ আশীর্বাদ।


খাজা

অঞ্জুশ্রী মান্ডি মুর্মু


কী কী লাগবে

ময়দা ১০০ গ্রাম, নুন সামান্য, ঘি ১–২ টেবিল চামচ (ময়ানের জন্য), জল পরিমাণমতো, কর্নফ্লাওয়ার প্রয়োজনমতো, ঘি ১ টেবিল চামচ (লেয়ার করার জন্য), সাদা তেল পরিমাণমতো (ভাজার জন্য)।


রসের জন্য:

চিনি ১০০ গ্রাম, জল আধ কাপের কম, ছোট এলাচ ৩টি।



কীভাবে বানাবেন

ময়দায় নুন ও ঘি দিয়ে ময়ান মিশিয়ে অল্প অল্প জল দিয়ে শক্ত ডো তৈরি করে ১৫–২০ মিনিট ঢেকে রাখুন। এদিকে চিনি, জল ও এলাচ দিয়ে হালকা ঘন সিরা তৈরি করুন। ডো চার ভাগ করে খুব পাতলা রুটি বেলে প্রতিটি স্তরে ঘি ও কর্নফ্লাওয়ার মেখে একটির উপর আরেকটি সাজিয়ে রোল করুন। রোলটি ১–১½ ইঞ্চি টুকরো করে কেটে হালকা বেলে নিন। হালকা গরম তেলে সোনালি করে ভেজে সঙ্গে সঙ্গে চিনির রসে ২–৩ মিনিট ডুবিয়ে রেখে তুলে অতিরিক্ত রস ঝরিয়ে পরিবেশন করুন।



ছানা পোড়া

সোমা রায়



কী কী লাগবে

দুধ ১ লিটার, সুজি ২ টেবিল চামচ, চিনি ২ টেবিল চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ, ড্রাই ফ্রুটস (ঐচ্ছিক)।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে দুধ গরম করে ভিনিগারের সঙ্গে জল মিশিয়ে দুধে দিয়ে নাড়ুন, যাতে ছানা তৈরি হয়। এবার ছানা জল ঝরিয়ে নিয়ে ঠান্ডা জলে ধুয়ে নিন। খুব বেশি জল ঝরানোর দরকার নেই। এরপর ছানার মধ্যে সুজি, চিনি, ঘি আর ড্রাই ফ্রুটস মিশিয়ে ভালো করে মেখে নিন। এবার এই মাখা ছানা যেকোনো ওভেন-প্রুফ পাত্রে বাটার পেপার বিছিয়ে তার উপর দিয়ে ১৮০° তে ৪০–৫০ মিনিট বেক করুন। তাহলেই আপনার সুন্দর ও নরম ছানা পোড়া রেডি হয়ে যাবে।



রসাবলি

রূপসা বসু কর



কী কী লাগবে

ছানার জন্য: ফুল-ফ্যাট দুধ ১ লিটার, লেবুর রস বা ভিনেগার ২ টেবিল চামচ, সুজি ১ টেবিল চামচ, চিনি ১ চা চামচ।

দুধের জন্য: ফুল-ফ্যাট দুধ ১ লিটার, চিনি ৪–৫ টেবিল চামচ (স্বাদমতো), এলাচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, জাফরান (ঐচ্ছিক), কুচানো পেস্তা বা কাজু প্রয়োজনমতো (সাজানোর জন্য)।



কীভাবে বানাবেন

দুধ কেটে ছানা তৈরি করে জল ঝরিয়ে নিন। ছানার সঙ্গে সুজি ও চিনি মিশিয়ে ভালো করে মেখে চ্যাপ্টা টিকিয়া বানিয়ে সোনালি করে ভেজে নিন। অন্যদিকে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে তাতে চিনি, এলাচ গুঁড়ো ও জাফরান মিশিয়ে নিন। ভাজা টিকিয়াগুলো গরম দুধে দিয়ে ১৫–২০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। উপর থেকে কুচানো পেস্তা বা কাজু ছড়িয়ে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।



গোটি বাইগুন মরিচ পানি

শম্পা দাস



কী কী লাগবে

ছোট বেগুন ৩টি, নারকেল কোরা ৩ টেবিল চামচ, ছোট এলাচ ১০টি, কালো এলাচ ১টি, জিরা ১/২ চা চামচ, মৌরি ১/২ চা চামচ, গোলমরিচ প্রয়োজনমতো, আদা ১ টুকরো, হিং ১ চিমটি, গুড় সামান্য, ঘি ১ টেবিল চামচ, হলুদ সামান্য, নুন পরিমাণমতো, জল প্রয়োজনমতো।



কীভাবে বানাবেন

বেগুনের বোটা রেখে যোগ চিহ্নের মতো চিরে নিন। নারকেল, জিরা, মৌরি, গোলমরিচ, আদা, এলাচ ও হলুদ একসঙ্গে বেটে নিন। বাটা মশলার সঙ্গে নুন, গুড় ও হিং মিশিয়ে বেগুনের চিরে রাখা অংশে ভরে দিন। একটি পাত্রে বেগুন সাজিয়ে বাকি মশলা, ঘি ও সামান্য জল দিয়ে ঢেকে দিন। বেগুন নরম হওয়া পর্যন্ত রান্না করে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন বা ভোগে নিবেদন করুন।



কর্পূর কেলি

মৌসুমী দাস


কী কী লাগবে

আটা ১ কাপ, ছানা ১ কাপ, চিনি পরিমাণমতো, নুন এক চিমটি, ঘি প্রয়োজনমতো (ভাজার জন্য), দুধ ১ লিটার, কর্পূর সামান্য, জল পরিমাণমতো।



কীভাবে বানাবেন

প্রথমে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে তাতে চিনি মিশিয়ে মালাই তৈরি করুন। অন্যদিকে আটা, ছানা, চিনি, নুন ও পরিমাণমতো জল দিয়ে ভালো করে মেখে মসৃণ ডো তৈরি করুন। ডো থেকে ছোট ছোট লেচি কেটে গোল আকারে গড়ে ঘিতে সোনালি করে ভেজে নিন। ভাজা গোলাগুলো ঘন দুধের মালাইয়ে দিয়ে ২–৩ মিনিট ফুটিয়ে গ্যাস বন্ধ করুন। শেষে সামান্য কর্পূর মিশিয়ে ভালো করে নেড়ে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।


কাঁকড়া পিঠা

মিঠু মল্লিক


কী কী লাগবে

সুজি ২০০ গ্রাম (১ কাপ), নারকেল কোরা ৩–৪ কাপ, চিনি স্বাদমতো, এলাচ গুঁড়ো ১/৪ চা চামচ, মৌরি গুঁড়ো ২ টেবিল চামচ, গোলমরিচ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, কাজুবাদাম, আমন্ড ও কিসমিস কুচি ১ মুঠো, ঘি ৫০০ গ্রাম (ভাজার জন্য), নুন ১ চিমটি, জল ২–৩ কাপ।



কীভাবে বানাবেন

জল ফুটিয়ে তাতে নুন, ১ টেবিল চামচ ঘি, মৌরি গুঁড়ো ও এলাচ গুঁড়ো দিয়ে সুজি মিশিয়ে নেড়ে শক্ত ডো তৈরি করুন। ৫–৭ মিনিট ঢেকে রেখে হালকা ঠান্ডা হলে ভালো করে মেখে নিন। অন্যদিকে নারকেল কোরা, চিনি, এলাচ গুঁড়ো এবং কাজু, আমন্ড ও কিসমিস মিশিয়ে নেড়ে শুকনো পুর তৈরি করে ঠান্ডা করুন। সুজির ডো থেকে লেচি কেটে বাটির মতো আকার দিয়ে পুর ভরে মুখ বন্ধ করে হালকা চ্যাপ্টা করুন। গরম ঘিতে সোনালি করে ভেজে তুলুন। সুগন্ধি ও মুচমুচে কাঁকড়া পিঠা পরিবেশন করুন বা ভোগে নিবেদন করুন।


ভোগের পায়েস

মৈত্রেয়ী মুখার্জি


কী কী লাগবে

দুধ ৪ প্যাকেট, গোবিন্দভোগ চাল ১/২ কাপ (বা প্রয়োজনমতো), পাটালি গুড় পরিমাণমতো, তেজপাতা ২টি, এলাচ ৩–৪টি, দারুচিনি ১ টুকরো, ঘি ১ চা চামচ, কিশমিশ ২ টেবিল চামচ, কাজুবাদাম কুচি ২ টেবিল চামচ, পেস্তা কুচি ১ টেবিল চামচ, গুড়ের বাতাসা প্রয়োজনমতো।


কীভাবে বানাবেন

গোবিন্দভোগ চাল ধুয়ে ১৫–২০ মিনিট ভিজিয়ে জল ঝরিয়ে সামান্য ঘি মাখিয়ে রাখুন। একটি ভারী তলার পাত্রে দুধ ফুটিয়ে তাতে তেজপাতা, এলাচ ও দারুচিনি দিন। দুধ সামান্য ঘন হলে চাল দিয়ে কম আঁচে নাড়তে নাড়তে সেদ্ধ করুন। চাল সিদ্ধ হয়ে গেলে সামান্য গরম দুধে গুলে নেওয়া পাটালি গুড় ও গুড়ের বাতাসা মিশিয়ে আরও ৮–১০ মিনিট ফুটিয়ে নিন। শেষে কিশমিশ, কাজুবাদাম ও পেস্তা কুচি দিয়ে ১–২ মিনিট রান্না করে গ্যাস বন্ধ করুন। কিছুক্ষণ ঢেকে রেখে গরম বা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।



টিপস:

ফুল-ফ্যাট দুধ ব্যবহার করলে পায়েস আরও ঘন ও সুস্বাদু হয়। গোবিন্দভোগ চালে আগে সামান্য ঘি মাখিয়ে নিলে পায়েসের স্বাদ ও সুগন্ধ আরও বেড়ে যায়।



পানিফলের পায়েস

রিঙ্কু মিত্র


কী কী লাগবে

দুধ ১ লিটার, কনডেন্সড মিল্ক ১৫০ গ্রাম, খোয়া ক্ষীর ৫০ গ্রাম, পানিফল ৪০০ গ্রাম (ধুয়ে কুরিয়ে নেওয়া), ছোট এলাচ গুঁড়ো ১ চা চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ, চিনি অল্প (স্বাদমতো), পেস্তা বা মাখানা প্রয়োজনমতো (সাজানোর জন্য)।



কীভাবে বানাবেন

দুধ জ্বাল দিয়ে হালকা ঘন করে তাতে খোয়া ক্ষীর ও এলাচ গুঁড়ো মিশিয়ে নামিয়ে রাখুন। অন্য একটি পাত্রে ঘি গরম করে কুরোনো পানিফল হালকা ভেজে নিন। এরপর ঘন দুধ ঢেলে অনবরত নাড়তে থাকুন যাতে তলায় না ধরে। পানিফল সেদ্ধ হয়ে সুগন্ধ বেরোলে অল্প চিনি ও কনডেন্সড মিল্ক মিশিয়ে আরও কয়েক মিনিট রান্না করুন। শেষে মাখানা বা পেস্তা ছড়িয়ে গরম বা ঠান্ডা পরিবেশন করুন।



কণিকা ভোগ (কণিকা ভাত)

নীতা দত্ত


কী কী লাগবে

বাসমতি বা গোবিন্দভোগ চাল ১ কাপ (২০০ গ্রাম), কাজু ও কিশমিশ ২–৩ টেবিল চামচ, নুন সামান্য, গুড় (গুঁড়ো) পরিমাণমতো, ঘি আড়াই টেবিল চামচ, গোলমরিচ ৮টি, লবঙ্গ ৫টি, দারুচিনি ১ টুকরো, বড় এলাচ অর্ধেক টি, ছোট এলাচ ৪টি, জায়ফল গুঁড়ো ১ চিমটি, জয়িত্রী ১ টুকরো, তেজপাতা ২–৩টি, গরম জল ২ কাপ (চালের দ্বিগুণ)।



কীভাবে বানাবেন

চাল ধুয়ে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে জল ঝরিয়ে নিন। ফোড়নের জন্য কিছু গোটা গরম মশলা আলাদা রেখে বাকি মশলাগুলো হালকা ভেজে গুঁড়ো করে নিন। কড়াইতে ১ টেবিল চামচ ঘি গরম করে কাজু ও কিশমিশ ভেজে তুলে রাখুন। বাকি ঘিতে তেজপাতা ও গোটা গরম মশলার ফোড়ন দিয়ে চাল হালকা ভেজে গরম জল ও সামান্য নুন দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। চাল ৮০% সিদ্ধ হলে গুড়, ভাজা কাজু-কিশমিশ, গুঁড়ো মশলা ও বাকি ঘি মিশিয়ে আরও ৫ মিনিট কম আঁচে রান্না করুন। গ্যাস বন্ধ করে ১০ মিনিট ঢেকে রেখে তুলসী পাতা সহযোগে মহাপ্রভু জগন্নাথদেবকে নিবেদন করুন।


কর্মাবাই খিচুড়ি

সিনাত্রা সেন


কী কী লাগবে

আতপ চাল বা গোবিন্দভোগ চাল ১ কাপ, মুগ ডাল আধ কাপ, তেজপাতা ২টি, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, গোলমরিচ গুঁড়ো দেড় চা চামচ, ধনে গুঁড়ো ২ চা চামচ, হিং আধ চা চামচ, নারকেল কোরা আধ কাপ, ঘি ২ টেবিল চামচ, সৈন্ধব লবণ বা নুন স্বাদমতো, জল ৫ কাপ।



কীভাবে বানাবেন

চাল ৩০ মিনিট এবং মুগ ডাল প্রায় ১ ঘণ্টা ভিজিয়ে জল ঝরিয়ে নিন। একটি পাত্রে জল ফুটিয়ে তাতে চাল ও ডাল দিয়ে ১০ মিনিট রান্না করুন। এরপর তেজপাতা, হলুদ, গোলমরিচ গুঁড়ো, ধনে গুঁড়ো, হিং ও নুন দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে আবার ঢেকে রান্না করুন। প্রয়োজনে সামান্য গরম জল দিয়ে নাড়তে থাকুন। চাল-ডাল সেদ্ধ হয়ে এলে নারকেল কোরা ও ঘি মিশিয়ে আরও ২–৩ মিনিট রান্না করে নামিয়ে নিন। তুলসী পাতা সহযোগে মহাপ্রভু জগন্নাথদেবকে নিবেদন করুন।


মালপোয়া

সুতপা বৈদ্য


কী কী লাগবে

ময়দা ১ কাপ, সুজি ১/৪ কাপ, চিনি আধ কাপ, দুধ দেড় কাপ (প্রয়োজনমতো), মৌরি আধ চা চামচ, এলাচ গুঁড়ো আধ চা চামচ, ঘি ১ টেবিল চামচ, সাদা তেল বা ঘি প্রয়োজনমতো (ভাজার জন্য)।


কীভাবে বানাবেন

ময়দা, সুজি, চিনি, মৌরি ও এলাচ গুঁড়ো একসঙ্গে মিশিয়ে অল্প অল্প দুধ দিয়ে মাঝারি ঘন ব্যাটার তৈরি করুন। শেষে ঘি মিশিয়ে ২০–৩০ মিনিট ঢেকে রাখুন। এরপর কড়াইয়ে তেল বা ঘি গরম করে বড় চামচে ব্যাটার ঢেলে দুই পাশ সোনালি-বাদামি হওয়া পর্যন্ত ভেজে নিন। গরম গরম মালপোয়া তুলসী পাতা সহযোগে মহাপ্রভু জগন্নাথদেবকে নিবেদন করুন বা পরিবেশন করুন।


ভোগের খিচুড়ি

জয়িতা বর্মন


কী কী লাগবে

গোবিন্দভোগ চাল ১ কাপ, ভাজা মুগ ডাল আধ কাপ, আদা বাটা ১ চা চামচ, তেজপাতা ২টি, জিরে আধ চা চামচ, ঘি ২ টেবিল চামচ, হলুদ সামান্য, লবণ স্বাদমতো, চিনি সামান্য, গরম জল ৪ কাপ।


কীভাবে বানাবেন

মুগ ডাল হালকা ভেজে ধুয়ে নিন। কড়াইয়ে ঘি গরম করে তেজপাতা ও জিরের ফোড়ন দিন। আদা বাটা কষিয়ে চাল ও ডাল দিয়ে কয়েক মিনিট নেড়ে নিন। এরপর হলুদ, লবণ, চিনি ও গরম জল দিয়ে ঢেকে মাঝারি আঁচে সিদ্ধ করুন। খিচুড়ি মাখা মাখা হয়ে এলে ওপরে সামান্য ঘি ছড়িয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন বা ভোগে নিবেদন করুন।



বালুসাহী

সুতপা দে


কী কী লাগবে

ময়দা ২ কাপ, বেকিং সোডা ১/৪ চা চামচ, বেকিং পাউডার ১/২ চা চামচ, ঘি ১/২ কাপ, টক দই ১/৪ কাপ, নুন ১ চিমটি, জল প্রয়োজনমতো, সাদা তেল বা ঘি ভাজার জন্য।


রসের জন্য:

চিনি ২ কাপ, জল ১ কাপ, এলাচ ৩–৪টি, লেবুর রস আধ চা চামচ।


কীভাবে বানাবেন

ময়দার সঙ্গে বেকিং সোডা, বেকিং পাউডার, নুন ও ঘি মিশিয়ে ঝুরঝুরে করে নিন। টক দই ও অল্প জল দিয়ে নরম ডো তৈরি করে ২০ মিনিট ঢেকে রাখুন। ছোট ছোট লেচি কেটে মাঝখানে হালকা চাপ দিয়ে বালুসাহীর আকার দিন। অল্প গরম তেলে বা ঘিতে কম আঁচে ধীরে ধীরে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভেজে নিন। অন্যদিকে চিনি, জল, এলাচ ও লেবুর রস দিয়ে একতারের হালকা সিরা তৈরি করুন। ভাজা বালুসাহী গরম অবস্থায় ৫–৭ মিনিট সিরায় ডুবিয়ে তুলে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।


নারকেলি কুমড়ো

সায়নী নন্দী


কী কী লাগবে

কুমড়ো ৫০০ গ্রাম (ডুমো করে কাটা), আলু ২টি, সেদ্ধ ছোলা ১/২ কাপ, নারকেল কোরা ১ কাপ, কাঁচা লঙ্কা বাটা ১/২ চা চামচ, আদা বাটা ১ চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো ১/২ চা চামচ, হিং ১ চিমটি, তেজপাতা ২টি, গোটা জিরে ১/২ চা চামচ, ঘি ২ টেবিল চামচ, লবণ স্বাদমতো, চিনি সামান্য, গরম জল প্রয়োজনমতো।


কীভাবে বানাবেন

কড়াইয়ে ঘি গরম করে হিং, গোটা জিরে ও তেজপাতার ফোড়ন দিন। এরপর আলু ও কুমড়ো হালকা লাল করে ভেজে তুলে রাখুন। একই কড়াইয়ে আদা বাটা, হলুদ, কাঁচা লঙ্কা বাটা, লবণ, চিনি ও জলে গুলে রাখা হিং দিয়ে মশলা কষিয়ে তাতে অল্প নারকেল কোরা মিশিয়ে নিন। এবার ভাজা আলু, কুমড়ো ও সেদ্ধ ছোলা দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে সামান্য গরম জল দিয়ে ঢেকে রান্না করুন। সবজি সেদ্ধ হয়ে এলে বাকি নারকেল কোরা ও ঘি ছড়িয়ে নামিয়ে গরম গরম পরিবেশন করুন বা ভোগে নিবেদন করুন।



কাঁঠালের রসাবলী

বিনীতা হাজরা গুপ্ত


কী কী লাগবে

কাঁঠালের পাল্প ২ কাপ, ময়দা আধ কাপ, সুজি আধ কাপ, নারকেল কোরা আধ কাপ, নুন ১ চিমটি, চিনি পরিমাণমতো, সাদা তেল প্রয়োজনমতো (ভাজার জন্য)।


রসের জন্য:

চিনি ২ কাপ, জল ২ কাপ, এলাচ ২টি।


কীভাবে বানাবেন

কাঁঠালের পাল্পের সঙ্গে ময়দা, সুজি, নারকেল কোরা, নুন ও চিনি মিশিয়ে ভালোভাবে মেখে ২০ মিনিট ঢেকে রাখুন। অন্যদিকে চিনি, জল ও ফাটানো এলাচ দিয়ে ফুটিয়ে হালকা সিরা তৈরি করুন। এরপর কড়াইয়ে তেল গরম করে কাঁঠালের মিশ্রণ থেকে ছোট ছোট বড়া তৈরি করে সোনালি হওয়া পর্যন্ত ভেজে নিন। ভাজা বড়াগুলো গরম সিরায় ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে ঠান্ডা করে পরিবেশন করুন।

টঙ্কা তরানি

সুপর্ণা মন্ডল


কী কী লাগবে

কারি পাতা ২টি, লেবু পাতা ৪–৫টি, আম আদা আধ ইঞ্চি, কাঁচা লঙ্কা ২টি, পান্তা ভাতের জল ২ গ্লাস, টক দই ২ টেবিল চামচ, লেবুর স্লাইস ১টি, ভাজা জিরে গুঁড়ো ১ চা চামচ, নুন স্বাদমতো।


কীভাবে বানাবেন

হামানদিস্তায় আম আদা, কয়েকটি কারি পাতা, ২টি লেবু পাতা ও কাঁচা লঙ্কা হালকা থেঁতো করে নিন। আগের রাতের ভিজিয়ে রাখা পান্তা ভাত চটকে তার জল ছেঁকে নিন। সেই জলে টক দই, নুন, ভাজা জিরে গুঁড়ো, লেবুর স্লাইস, বাকি লেবু পাতা, কারি পাতা এবং থেঁতো করা মিশ্রণটি ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। ঠান্ডা ঠান্ডা টঙ্কা তরানি পরিবেশন করুন।

কালিকানন্দ অবধূত - বর্ণময় এক সাধকের জীবনদর্শন

রাজু পারাল


বাংলা সাহিত্যের চলার পথে মাঝে মাঝে এমন কিছু আগন্তুকের আবির্ভাব হয়, যাঁরা শুধুমাত্র নিজের অস্তিত্বের উপস্থিতির জোরেই সাহিত্যের বাঁক পরিবর্তন করেন। বাংলা কথাসাহিত্যে 'অবধূত' বা 'কালিকানন্দ অবধূত' এরকমই একজন আগন্তুক। যিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে বাঙালি পাঠকদের দিয়েছিলেন নতুনত্বের স্বাদ। সাহিত্য, সমাজ, আইন এবং বিজ্ঞানের ঊর্ধ্বে তিনি তৈরি করেছিলেন নিজস্ব এক ধারা। তাঁর বলিষ্ঠ লেখনীতে বাংলা সাহিত্য জেনেছিল তন্ত্রসাধনার সাহিত্যদর্শন। এক জীবনে তিনি বিপ্লবী, সন্ন্যাসী, তন্ত্রসাধক আবার ঔপন্যাসিক। তাঁকে যে কোনো এক পরিচিতির গণ্ডিতে বাঁধা কঠিন। তাঁর সাহিত্যে মৃত্যু হয়ে ওঠে এক চরিত্র। তাঁর লেখা কাহিনিগুলির বিষয়বস্তু বিস্ময়কর। শ্মশান, মঠ-মন্দির, কখনও বা লোকালয়ে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার স্বরূপ বর্ণনা করেছেন বর্ণময় অবধূত।


তাঁর লেখা বিস্ময়কর রচনাগুলি পাঠকদের মনে শিহরণ ও রোমাঞ্চ জাগায় প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু রচনাশৈলীর গুণে এবং উপাদান-বিন্যাসের বৈচিত্র্যে কাহিনির নিটোল বুনন পাঠককে কোথাও থামতে দেয় না, সম্মোহিত করে রাখে শেষ পৃষ্ঠাটি পর্যন্ত। কালিকানন্দ অবধূতের প্রকৃত নাম দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। জন্ম কলকাতার ভবানীপুরে। পুত্র অমল মুখোপাধ্যায়ের জন্মের পর প্রথমা স্ত্রী সুখময়ী দেবীর মৃত্যু হলে শোকাহত দুলালচন্দ্র সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সন্ন্যাসজীবনে তাঁর নাম হয় কালিকানন্দ অবধূত। কিন্তু সাংসারিক বন্ধন থেকে মুক্তি পেতে চাইলেও তিনি বাঁধা পড়েছিলেন বিশ্বসংসারের বাঁধনছাড়া বন্ধনে।



১৯৩০ সালের কথা। পোর্ট কমিশনে তখন স্টোরকিপারের চাকরিতে কর্মরত তিনি। ঐ সময়ে তিনি গোপনে বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বন্দর পার হয়ে জার্মানি থেকে পিস্তল আসত। বেনামে তিনি সেগুলি পাস করাতেন। উপনয়নের সময় গোপনে তাঁর একটা নাম রাখা হয়েছিল 'রেবতীমোহন'। স্টোরে কাজ করার সময় তিনি ঐ 'রেবতীমোহন' নামেই একটা অ্যাকাউন্ট খোলেন। বিপ্লবীদের অস্ত্র পাচার করতে থাকেন ঐ নামেই। কিন্তু সত্যিটা বেশিদিন চাপা থাকেনি। চাকরি থেকে বরখাস্ত হলেন শেষপর্যন্ত। কলকাতায় থাকা সে সময়ে বিপদজনক হয়ে উঠল তাঁর কাছে। পুলিশ পিছনে লেগে গেল। বর্ষায় উত্তাল সেই সময়ে পদ্মার জলরাশি। সেই সময়ে নদী পেরোনো মানে নিশ্চিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করা। এ দিকে অন্য কোনো পথও খোলা নেই, পিছনে পুলিশ। তাদের হাতে ধরা পড়া মৃত্যুর চেয়েও খারাপ। অগত্যা আগুপিছু না ভেবে জলে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুলালচন্দ্র। পাড় থেকে ক্রমাগত গুলি বর্ষণ করতে থাকল ব্রিটিশ পুলিশ। কিন্তু তিনি তখন তাদের নাগালের বাইরে। কিছু দিন তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ হাল ছেড়ে দিল। ধরে নেওয়া হল, তিনি মৃত। অথচ তাঁর দেহের চিহ্ন কোথাও পাওয়া যায়নি। সে সময়ে বাংলাদেশে যে বন্ধুর আশ্রয়ে তিনি ছিলেন, সেই বৃন্দাবনচন্দ্র দাস রটিয়ে দিলেন দুলালচন্দ্রের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর পরিবারের সকলেই ধরে নিল, তিনি মৃত।

যখন পরিবারের লোকেরা দুলালচন্দ্রের খোঁজ পেলেন, তখন তিনি 'কালিকানন্দ অবধূত'। মাঝের দু'দশক কেটে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে একসময় বরিশালে ফিরে আসেন। জড়িয়ে পড়েন সরোজিনী নামের এক মহিলার সঙ্গে। আবদ্ধ হন বিবাহবন্ধনে। বিয়ের পর সরোজিনীও সন্ন্যাস নিয়ে ভৈরবী হন। দু'জনে বেরিয়ে পড়েন কামাখ্যা, নবদ্বীপ, আরও নানা স্থানে। শুরু হয় তাঁদের বৈচিত্র্যময় ভবঘুরে জীবন। ঘুরতে ঘুরতে একদিন পৌঁছান উজ্জয়িনীতে। সেখানেই এক গুরুদেবের কাছে দীক্ষা নেন। কিছুদিন কাশীর কালীমন্দিরে পূজারি হিসেবেও কাজ করেন। তখন তিনি আর 'দুলালচন্দ্র' নন। হয়ে উঠেছেন 'কালিকানন্দ অবধূত'। এই সময়েই তিনি নাকি আনন্দময়ী মায়ের সাক্ষাৎ পান। অস্থির, ভবঘুরে জীবনে খুঁজে পান নতুন এক দিশা। ভৈরবীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন হিংলাজের পথে। সেই রোমহর্ষক যাত্রাপথের কথা লিখেছিলেন,


'লোকে সংসারের জ্বালায় অস্থির হয়ে শান্তির মুখ দেখবার আশায় তীর্থযাত্রায় পা বাড়ায়। আমরাও চলেছি হিংলাজ, উদ্দেশ্য ওই শান্তিলাভ।'


কথিত আছে, হিংলাজ যাত্রার আগে তিনি ঘাঁটি গেড়েছিলেন উদ্ধারণপুরের ঘাটের মহাশ্মশানে। কান্না-হাসির সেই ঘাটে তিনি যে কটাদিন কাটিয়েছিলেন, তার নিখুঁত বর্ণনা মেলে তাঁর লেখায়—



'মুর্শিদাবাদ জেলার যে অংশটুকু গঙ্গার পশ্চিম তীরে পড়েছে, সেখানকার আর বীরভূম জেলার প্রায় ষোলো আনা মড়া আসে উদ্ধারণপুর ঘাটে.... শ্মশান গঙ্গার কিনারায়—দক্ষিণে উত্তরে লম্বা। পশ্চিমে বড় সড়ক। সড়ক থেকে নেমে শ্মশানে ঢুকলে দেখা যাবে, গঙ্গার জল পর্যন্ত সমস্ত স্থানটুকুময় ভাঙা হাঁড়ি, কলসি, পোড়া কাঠ, বাঁশ, চাটাই, মাদুর, দড়ি আর হাড়গোড় ছড়িয়ে পড়ে আছে। ইয়া হামদা হামদা শিয়ালগুলো আধপোড়া মড়া নিয়ে টানা-হেঁচড়া করছে। ওদের চক্ষুলজ্জা বলতে কোনও কিছুর বালাই নেই একেবারে। শ্মশানের উত্তর দিকের শেষ সীমায় একটি উঁচু ঢিবি। ঢিবির পিছনেই আকন্দ গাছের জঙ্গল। সেই ঢিবির ওপরেই ছিল আমার গদি। তোশকের ওপর তোশক, তার ওপর আরও তোশক, তার ওপর অগণিত কাঁথা, লেপ, কম্বল চাপাতে চাপাতে আমার সুখাসনটি মাটি থেকে দু'হাত ওপরে উঁচুতে উঠে গিয়েছিল।'


শ্মশানে মৃতদেহের সঙ্গে আসা লেপ, কম্বল, তোশক, কাঁথা—সবই নিজের কাজে লাগাতেন কালিকানন্দ অবধূত। শ্মশানেই মৃতদেহের ওপর বসে তিনি মগ্ন থাকতেন তন্ত্রসাধনায়। মদ দিয়ে চলত যজ্ঞের আয়োজন। অধিকাংশ সময়েই তিনি গাঁজা আর মদে চুর হয়ে থাকতেন।


দিকে দিকে অগণিত ভক্ত, শিষ্য ছড়িয়ে ছিল তাঁর। শোনা যায়, খুব ভালো কোষ্ঠী বিচার করতেন তিনি। গণনা করে তিনি নাকি সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুর তারিখ বলে দিয়েছিলেন।অর্থাভাব থেকেই একসময় লেখালেখি শুরু করেন অবধূত। কবি সুবোধ রায়ের বাড়িতে সাহিত্যের আসরে যেতেন। সেই সূত্রে সেখানেই সাহিত্যিক তারাশঙ্করের সঙ্গে তাঁর আলাপ জমে ওঠে। অবধূতের লেখাগুলি পড়ে শিহরিত হয়ে ওঠেন তারাশঙ্কর। তিনি ঠিক করেন অবধূতের সমস্ত লেখাগুলি ছাপাবেন। শেষ পর্যন্ত ছাপা হয়। বাকি সবটাই ইতিহাস। এরপর থেকে বিভিন্ন জায়গায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকলে তিনি ধীরে ধীরে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।


অবধূতের রচিত কালজয়ী উপন্যাসগুলি— মরুতীর্থ হিংলাজ, হিংলাজের পরে, বশীকরণ, উদ্ধারণপুরের ঘাট, নীলকণ্ঠ হিমালয়, ভোরের গোধূলি, সুমেরু কুমেরু, কলিতীর্থ কালীঘাট, মায়ামাধুরী, একটি মেয়ের আত্মকাহিনী, নিরাকারের নিয়তি, টপ্পা ঠুংরি, অনাহত আহুতি... ইত্যাদি।


এই সময় একটা লেখার সঙ্গে অবধূতের ছবি ছাপা হওয়ায় পরিবারের লোকজন নিশ্চিন্ত হন যে তিনি বেঁচে আছেন।


দুঃখের বিষয়, তাঁর রহস্যময় জীবনের অনেক অংশই আজ বিস্মৃত। তার জন্য হয়তো তিনি নিজেও খানিকটা দায়ী। অসম্ভব উন্নাসিক ছিলেন। কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের তল পাওয়া যায় না। অবধূত ছিলেন সেই গোত্রের।


১৯৫০–৫২ সাল নাগাদ ভৈরবীকে নিয়ে অবধূত ফিরে আসেন চুঁচুড়ায়। সেখানেই গঙ্গার ধারে একটি বাড়ি বানিয়ে বসবাস করতে থাকেন তাঁরা। বাড়িতে ভৈরবী তৈরি করেছিলেন রুদ্রচণ্ডীর মঠ। ১৯৭৮ সালে এই রুদ্রচণ্ডীর মঠেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অবধূত। তার আগেই মারা গিয়েছিলেন ভৈরবী।


রুদ্রচণ্ডীর মঠ অবহেলায়, অনাদরে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে আজও, সে বড় একলা। পাশ দিয়ে গঙ্গার জল ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বয়ে চলেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো জানতেও পারবে না, অবধূতের ওই বাড়িটি অর্থাৎ রুদ্রচণ্ডীর মঠটির ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাহিত্যমূল্য কতখানি।

আরও এক হাসুলী বাঁক

সুদর্শন দত্ত


একটাই এই ছোট্ট জীবনে কত ছোট ছোট মুহূর্তেরা মনের ক্যামেরায় বন্দী হয়ে যায়। অনেক ঘটনা স্মৃতির অতলে হারিয়ে যায় অনাদরে অবহেলায়, আবার কত ঘটনা মহাসমারোহে ঘটা করে জানিয়ে দেয় সে কতটা প্রোজ্জ্বল! কতটা মধুময়! তেমনই এক চমৎকার ঘটনা অনেকটা আচমকাই ঘটে গেল চলচ্চিত্র শিল্প নির্দেশক উত্তম গুহর জীবনে। সেটাই তার মনের ক্যামেরায় বন্দী হয়ে রইল চিরকালের জন্য।


বাংলাদেশের যশোর জেলার ভৈরব নদীর তীরে ছিমছাম সুন্দর ও মনোরম এক গ্রাম ভুগীলহাট। এই গ্রামেই হয় তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত 'লালন' চলচ্চিত্রের শুটিং। সেই ভৈরব নদীর তীরে শ্মশান-সংলগ্ন একটা জায়গায় শিল্প নির্দেশনার জন্য সেট নির্মাণের সময় অন্য অনেকের সঙ্গে প্রায় দুই মাস তাঁবু খাটিয়ে থাকতে হয়েছিল তার দুই সহকারী চিশতী ও মাহবুবসহ উত্তম গুহকে। এই দুই মাস সময়ে থাকা-খাওয়ার কাজে প্রতিদিন রান্নার জন্য এই গ্রামেরই একজন মেয়েকে রাখা হল। নাম হাসুলী। বয়স উনিশ-কুড়ি হবে। মাঝারি গড়নের, শ্যামলা গায়ের রং। পিঠভর্তি দীঘল কালো চুল। মিষ্টি মুখের মেয়েটিকে ঝকঝকে সাদা দাঁতে হাসলে ভারি সুন্দর লাগে দেখতে। তার নিষ্পাপ সরল চোখে অদ্ভুত এক মায়া জড়ানো। রান্না ও খাওয়ানোর ফাঁকে সারাক্ষণ সে খুঁটিনাটি কাজকর্ম, ফাইফরমাশ খেটে দিত হাসিমুখে। কখনও কখনও তদারকিও করতে দেখা যেত তাকে। বিশেষ করে উত্তমকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে দাদা দাদা করে তার মনের যত জমানো দুঃখ-বেদনা, হাসি-আনন্দ, কষ্ট-ব্যথা উজাড় করে দিত। যেন কতকালের, কত জন্মের তার নিজের দাদা।


একদিন সেই দিনের মতো শুটিং শেষ। প্যাক-আপ হয়েছে অনেকক্ষণ। সন্ধ্যা নেমেছে মাত্র। তাঁবুতে ফিরে ক্লান্ত শরীরটাকে একটু আরাম দিতে ক্যাম্প-খাটে আধশোয়া অবস্থায় বিশ্রাম নিচ্ছিল উত্তম। বাঁ হাতটা ভাঁজ করে কপালের ওপর রাখা। হয়তো পরবর্তী কাজের সুচিন্তিত পরিকল্পনায় নিমগ্ন থাকতে থাকতে তন্দ্রাভাব এসেছিল মাত্র। এমন সময় তাঁবুর বাইরে থেকে হাসুলীর গলা, 'দাদা কি ঘুমায় আছেন?'


তন্দ্রাভাব কেটে যায় উত্তমের। আধশোয়া অবস্থানেই বলে, 'কে? হাসুলী নাকি? আসো, ভেতরে আসো।' আলো জ্বেলে দিতেই তাঁবুর পর্দা তুলে হাসুলী ভেতরে প্রবেশ করে। মুখে তার সেই নির্ভেজাল হাসি। একটা হাতে তার ব্যাগ, আর একটা হাতে কলাই-করা বাসনে ঢেকে আনা কিছু খাদ্যসামগ্রী। সেদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, 'ওগুলোতে কী, হাসুলী?'


প্রথমে ডান হাত দেখিয়ে হাসুলী বলে, 'আজ বাড়িত পাটিসাপটা আর চসি পিঠা হইছিল, আপনের লাইগ্যা আনছি।' বাঁ হাত তুলে দেখিয়ে বলে, 'আর এই যে ব্যাগত! আমাগো গাছের সফেদা। এক্কেরে গাছপাকা। খাইবেন, দ্যাখবেন কী মিষ্টি, ইস্! য্যান মধু!'


'আবার এসব কেন, হাসুলী? এভাবে বাড়ি থেকে বয়ে আনার কোনো প্রয়োজন ছিল কি?'


উত্তমকে বাধা দিয়ে বলে ওঠে সে, 'কি যে বলেন না দাদা! দাদার জন্য আনতাম তয় আবার এভাবে আর সেভাবে কী? কিন্যা তো আর আনি নাই। এই সবই আমাগো বাড়ির গাছের আর খ্যাতের!'


বেশি কিছু আর বলতে পারে না উত্তম। যখন কেউ একজন ছোট বোনের মতো ভালোবেসে শ্রদ্ধাশীল হয়ে বড় দাদার হাতে কিছু তুলে দিতে চাইছে, তার কাছে নত না হয়ে উপায় কী? তা নইলে ছোট-বড়, উচ্চ-নীচের ভেদাভেদে সব সম্পর্ক তুচ্ছ হয়ে পড়ে। তাই সেও পরম স্নেহময় শ্রদ্ধার সেই দান হাতে তুলে নেয়। বলে, 'ও, তাই বুঝি! বেশ তো, নিলাম। এই তোমার সামনেই মুখে নিচ্ছি, এই দ্যাখো।' বলে সেই কলাই-করা বাটি থেকে এক চামচ চসি পিঠে আর একটা পাটিসাপটা তুলে পরম তৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করে চিবিয়ে বলে, 'বাহ্, কী চমৎকার সুস্বাদু! আহা!'

তাঁর আনা পিঠের স্বাদ যে তাঁর এই দাদা পরম তৃপ্তিতে রসিয়ে খাচ্ছে, সেটা দেখেই তখন হাসুলীর চোখে আনন্দাশ্রু চিকচিক করে উঠল। আঁচলের খুঁটে চোখের কোল মুছে অনতিদূরে দাঁড়িয়ে সে বলে, 'আর একটা পাটিসাপটা খান দাদা!'


চোখ খুলে উত্তম বলে, 'এখন না। রাতে খাবো'খন। বোনের দেওয়া দাওয়াত তো। এ যে পরম পাওয়া!'


'তো একটা সফেদা খান! ধুইয়া দেই!' আবদারের সুরে বলে হাসুলী।


'দিবি? দে তবে!'


স্নেহ অতি বিষম বস্তু। আর সেটা যদি অপ্রত্যাশিত, অযাচিতভাবে এসে উপস্থিত হয়, তবে যে তা কতখানি মধুর হয়ে হৃদয়ের প্রকোষ্ঠে পরশমণি হয়ে বসে যায়, তার তুলনা বুঝি জগতের কোনো কিছুর সঙ্গে চলে না। এই যেমন উত্তমের হঠাৎ করে 'তুই' সম্বোধন হাসুলীকে আরও আহ্লাদী করে তুলল। খুশি খুশি হাসিমুখে একটা বেশ বড় সাইজের সফেদা ধুয়ে উত্তমের হাতে তুলে দিল। ওদিকে উত্তম নিজেও তার এই 'তুই' করে বলায় ততটাই চমকিত হল। তারপর থেকে কতদিন, কতবার হাসুলী এই দাদার স্নেহের প্রশ্রয়ে তার বাড়ি থেকে নারকেল, আতা, সফেদা আরও নানান রকম ফলফলাদি তো এনে দিতই। কোনো কোনো দিন রান্না করা নানান পদ এনে হাজির করত। কয়েকবার উত্তম মানা করলেও তার সেই বারণ উপেক্ষা করে শুটিংয়ের সেই প্রায় দুই মাস হাসুলীর এই অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় রইল না।


তারপর একদিন 'লালন' ছবির শুটিং শেষ হলে ভৈরব নদীতীর ও ভুগীলহাট ত্যাগ করার সময় উপস্থিত হয়। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে হাসুলী সারাক্ষণ সেদিন তার যা যা করণীয় কাজ করে গেল। দুটো আলাদা ধর্মের মানুষের মধ্যে ভাইবোনের যে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তার অবশ্যম্ভাবী বিচ্ছেদের সময় সমাগত হলে অত্যন্ত অভিমানী মনের হাসুলী বারবার চোখের কোলে চলে আসা অযাচিত অশ্রু মুছে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখে। কতবার উত্তমের মুখোমুখি হলেও মুহূর্তে মুখ ফিরিয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করে। একসময় জোর করে উত্তম তার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, 'কিরে হাসুলী, কথা বলবি না? আজ হোক কি কাল, যেতে যে আমায় হবেই। এটাই আমাদের কাজের ধারা, নিয়ম। আজ এখানে, কাল সেখানে! এভাবেই কত জায়গায় কত মানুষের সঙ্গে চেনাজানা হল। কিন্তু কই? তোর মতো করে হৃদয়ের এত আপন আর কেউ তো হয়ে ওঠেনি! তুই আমার আপন মায়ের পেটের বোনের চেয়েও আপন। রক্ত যে সব সম্পর্কের বড়, তা কিন্তু নয়। তবে তো কত মানুষের কত সময়ে রক্তের প্রয়োজন হয়, তখন কি কেউ জানে কার রক্ত তার শরীরে প্রবেশ করছে? আর জানলেও, কই, তারা তো আপনার হয়ে উঠতে পারে না কখনও! তাই হৃদয়ের সম্পর্কই এই পৃথিবীতে সব চাইতে বড়, আজ তুই সেটা আবার প্রমাণ করে দিলি।'


উত্তমের কথা শেষ হয়েছে কি হয়নি, হাসুলী ওই অতজনের সমক্ষে উত্তমকে জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। উপস্থিত যারা ছিল সেখানে, সকলে তারা একবাক্যে স্বীকার করে নেয়, 'হ্যাঁ, এই হল প্রকৃত ভাইবোনের মধুর সম্পর্ক ও ভালোবাসা।'

এই ঘটনার বাইশ বছর পরে চলচ্চিত্র পরিচালক তানভীর মোকাম্মেল, উত্তম গুহ ছাড়াও আরও কয়েকজন মিলে সেই ভুগীলহাট গ্রামে ভৈরব নদীর তীরে তাদের নতুন ছবি 'সোজন বাদিয়ার ঘাট' চলচ্চিত্রের জন্য লোকেশন রেইকি করতে গিয়েছিল। তার অনতিদূরের মাঠে হাসুলী তখন তার গরু চরাতে ব্যস্ত ছিল। আশ্চর্য এই যে, তাদের উপস্থিতির কথা কিভাবে যেন হাসুলীর কানে চলে যায়। তাই সে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে সেই জায়গায় উপস্থিত হয়, যেখানে উত্তম ওরা লোকেশন জরিপে ব্যস্ত ছিল। পৌঁছেই সে 'আমার দাদা, আমার দাদা' বলে জাপটে ধরে উত্তমকে। সে ভুলে গেছে তখন তার ছিন্ন, মলিন বসন! তখন সে একজন গরু চরানিয়া। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয়নি তার আর উত্তমের মধ্যে এক যোজনের তফাত! সে তখন অশ্রুসজল ছলছল চোখে অপলক তাকিয়ে আছে তার দাদার চোখের দিকে। তার হৃৎপিণ্ডের ধকধক শব্দ যেন উত্তম নিজেও অনুভব করতে পেরে সেও পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরে তার বোনকে। তার চোখেও জল। উভয়ে উভয়ের দিকে কিছু সময় অপলক তাকিয়ে।


খানিকটা স্মৃতিকাতর উত্তম। পুরনো স্মৃতি হাতড়ে লক্ষ্য করল, সময়ের সঙ্গে সেই ডানপিটে স্বভাবটা আর নেই হাসুলীর মধ্যে। তুলনায় অনেকটা শান্ত, ধীর! হয়তো সংসার জীবনের চাপে পড়েই আজ তার এই বদল। তারপর অনেক অনুনয়-বিনয় করে বলে, 'আজ দুপুরের খাওয়াটা আমার কাছেই নাহয় খায়্যা গেলা!'


উত্তম বলে, 'আজ না রে হাসুলী, অন্য কখনও।'


'হ, তুমি আর আইছো! এই বিশ-বাইশ বচ্ছরে তো একবারও আইলা না এই বইনের বাড়ি!' সে যখন তার দাদার ওপর এই অভিমানের বর্ষণ ঘটাতে ব্যস্ত, তখন পাশ থেকে কেউ একজন বলে, 'এই, এত বছরেও তুই তোর দাদার কথা ভুলিসনি, হাসুলী! আজও তোর দাদার কথা মনে আছে?'


দুচোখে গভীর বিশ্বাস, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা মিশিয়ে হাসুলী বলে, 'দাদা সে তো দাদা! এক জীবনে তাকে কি ভোলা যায়?'


একজীবনে এরকম নিঃস্বার্থ ভালোবাসা সত্যিই অমূল্য। জীবন, তুমি বড়ই সুন্দর... ভালো থেকো হাসুলী, ভালো থাকুক হাসুলীর মতো এরকম চিরকালের বোনেরা!


(তথ্য সৌজন্যে : বিশিষ্ট শিল্প নির্দেশক উত্তম গুহ, বাংলাদেশ।)


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page