top of page

বর্ষায় উইক-এন্ড ট্রিপ (২০টি সেরা গন্তব্য) | ট্রেন্ডে ওভার সাইজড সানগ্লাস | আমের নামে ইতিহাসের স্বাদ | রবিবারের গল্প: গল্পগুলো সাদাকালো


বর্ষায় উইক-এন্ড ট্রিপ


বর্ষার দু'দিনের ছুটিতে যদি শহরের কোলাহল থেকে একটু সবুজের কাছে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, তাহলে কলকাতার আশপাশে এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেখানে প্রকৃতি বর্ষায় যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। নদী, জঙ্গল, পাহাড়ের আভাস, সমুদ্র, ম্যানগ্রোভ কিংবা গ্রামবাংলার শান্ত পরিবেশ, সব মিলিয়ে সপ্তাহান্তের ছোট্ট ভ্রমণের জন্য এই গন্তব্যগুলি হতে পারে আদর্শ। দূরত্বও খুব বেশি নয়, তাই শুক্রবার রাত বা শনিবার সকালে বেরিয়ে রবিবার সন্ধ্যায় ফিরে আসা সম্ভব।



বর্ষায় উইকেন্ড ট্রিপে কলকাতার কাছেপিঠে ২০টি সেরা গন্তব্য:


১. তাজপুর : কলকাতা থেকে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তাজপুর বর্ষার সপ্তাহান্তের ভ্রমণের জন্য অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য। কালো মেঘে ঢাকা আকাশ, উত্তাল সমুদ্র, ঝাউবন আর লাল কাঁকড়ায় ভরা সৈকত, সব মিলিয়ে এখানে বর্ষার প্রকৃতি অন্যরকম অনুভূতি দেয়। কলকাতা থেকে গাড়িতে জাতীয় সড়ক ধরে কাঁথি হয়ে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। এছাড়া হাওড়া থেকে দীঘাগামী ট্রেনে রামনগর বা দীঘা পৌঁছে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করেও তাজপুর যাওয়া যায়। থাকার জন্য সমুদ্রসংলগ্ন নানা রিসর্ট, কটেজ ও সরকারি পর্যটন আবাস রয়েছে। স্থানীয় রেস্তোরাঁয় টাটকা চিংড়ি, ভেটকি, পার্সে, পমফ্রেট ও কাঁকড়ার নানা পদ অবশ্যই চেখে দেখবেন। কাছেই শঙ্করপুর ও মন্দারমণিও ঘুরে নেওয়া যায়।


২. মন্দারমণি : কলকাতা থেকে প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দূরের মন্দারমণি বর্ষাকালে এক অন্যরকম সৌন্দর্যে ধরা দেয়। সমুদ্রের গর্জন, বৃষ্টিভেজা সৈকত এবং দীর্ঘ বিচে হাঁটার অভিজ্ঞতা মন ভালো করে দেয়। ধর্মতলা থেকে বাস কিংবা হাওড়া থেকে ট্রেনে দীঘা পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতে মন্দারমণি যাওয়া যায়। এখানে বাজেট থেকে বিলাসবহুল, সব ধরনের রিসর্ট রয়েছে। স্থানীয় হোটেলগুলিতে সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি, লবস্টার এবং কাঁকড়ার অসাধারণ পদ পরিবেশন করা হয়। বর্ষায় সমুদ্রে নামার আগে অবশ্যই প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলবেন।


৩. বকখালি : কলকাতা থেকে মাত্র চার ঘণ্টার পথ বকখালি। ধর্মতলা থেকে সরাসরি বাস বা নিজস্ব গাড়িতে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। শান্ত সমুদ্র, ঝাউবন আর নিরিবিলি পরিবেশের জন্য এটি বর্ষার আদর্শ গন্তব্য। এখানে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের লজ ছাড়াও বহু ব্যক্তিগত হোটেল রয়েছে। স্থানীয় বাজারে টাটকা ইলিশ, চিংড়ি, পার্সে ও ভেটকির স্বাদ নিতে ভুলবেন না। কাছেই ফ্রেজারগঞ্জ ও হেনরি আইল্যান্ড ঘুরে দেখা যায়।



৪. হেনরি আইল্যান্ড : বকখালি থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে হেনরি আইল্যান্ড প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে স্বর্গের মতো। ম্যানগ্রোভ অরণ্য, কাঠের ওয়াচ টাওয়ার, নির্জন সমুদ্র এবং পাখির কোলাহলে ভরা এই দ্বীপ বর্ষায় আরও সবুজ হয়ে ওঠে। এখানে পশ্চিমবঙ্গ মৎস্য উন্নয়ন নিগমের কটেজে থাকা যায়। দুপুরে টাটকা সামুদ্রিক মাছের ঝোল-ভাত এই ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।


৫. সুন্দরবন : কলকাতা থেকে নামখানা পর্যন্ত গাড়ি বা বাসে পৌঁছে সেখান থেকে লঞ্চে সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপে যাওয়া যায়। বর্ষায় নদী, খাঁড়ি ও ম্যানগ্রোভ জঙ্গলের রূপ অতুলনীয়। বিভিন্ন ইকো রিসর্টে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় রান্নায় চিংড়ি, কাঁকড়া, ভেটকি ও দেশি মুরগির পদ অত্যন্ত জনপ্রিয়। নৌকাভ্রমণ, ওয়াচ টাওয়ার এবং গ্রামের জীবনযাপন কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।



৬. রায়চক : কলকাতা থেকে মাত্র ৫৫ কিলোমিটার দূরের রায়চক একদিন বা দু'দিনের ভ্রমণের জন্য আদর্শ। ডায়মন্ড হারবার রোড ধরে গাড়িতে সহজেই পৌঁছানো যায়। হুগলি নদীর ধারে বিলাসবহুল রিসর্ট, পুরনো দুর্গ এবং নিরিবিলি পরিবেশ মন ছুঁয়ে যায়। এখানে নদীর টাটকা মাছ, চিংড়ি মালাইকারি এবং ভেটকির বিভিন্ন পদ খুবই জনপ্রিয়।


৭. গাদিয়াড়া : হাওড়া থেকে সড়কপথে কিংবা ট্রেনে বাগনান হয়ে গাদিয়াড়া পৌঁছানো যায়। রূপনারায়ণ, দামোদর ও হুগলি নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত এই ছোট্ট শহর বর্ষায় অপূর্ব লাগে। পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের লজসহ বেশ কিছু ভালো হোটেল রয়েছে। নদীর ধারে বসে বৃষ্টি দেখা, লঞ্চে চড়া এবং ইলিশের ঝোল দিয়ে দুপুরের খাবার এই সফরকে স্মরণীয় করে তোলে।


৮. টাকি : কলকাতা থেকে হাসনাবাদ লোকালে টাকি রোড স্টেশন পৌঁছে সহজেই টাকি যাওয়া যায়। ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরে বর্ষার সবুজ অন্য মাত্রা পায়। নদীতে নৌকাভ্রমণ, জমিদারবাড়ি দর্শন এবং সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। থাকার জন্য ছোট-বড় হোটেল রয়েছে। টাটকা ইলিশ, চিংড়ি এবং দেশি রান্নার স্বাদ অসাধারণ।



৯. পিয়ালি আইল্যান্ড : কলকাতা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে পিয়ালি আইল্যান্ডে গাড়িতে সহজেই পৌঁছানো যায়। ম্যানগ্রোভ অরণ্য, শান্ত নদী এবং পাখির আনাগোনায় ভরা এই এলাকা বর্ষাকালে যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। ইকো রিসর্টে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় মাছ ও কাঁকড়ার রান্না এখানে বিশেষ জনপ্রিয়।


১০. ডায়মন্ড হারবার : কলকাতা থেকে সড়কপথ বা ট্রেনে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় ডায়মন্ড হারবারে। বর্ষায় হুগলি নদীর বিশাল জলরাশি ও মেঘলা আকাশ মন কেড়ে নেয়। নদীর ধারে বেশ কিছু ভালো হোটেল রয়েছে। ইলিশ, ভেটকি এবং চিংড়ির নানা পদ এখানকার বিশেষ আকর্ষণ।


১১. ঝাড়গ্রাম : কলকাতা থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে ঝাড়গ্রাম বর্ষার সময় যেন সবুজের চাদরে ঢেকে যায়। হাওড়া থেকে ঝাড়গ্রামগামী একাধিক এক্সপ্রেস ট্রেন রয়েছে। এছাড়া জাতীয় সড়ক ধরে গাড়িতেও সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায়। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি, কণকদুর্গা মন্দির, ডুলুং নদী এবং চিল্কিগড়ের জঙ্গল এই সফরের প্রধান আকর্ষণ। থাকার জন্য পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগমের পর্যটন আবাস, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি হেরিটেজ হোটেল এবং বিভিন্ন বাজেট হোটেল রয়েছে। দুপুরের খাবারে দেশি মুরগির ঝোল, পোস্ত, বাঁশকোঁড়ার তরকারি এবং স্থানীয় নদীর মাছের স্বাদ নিতে ভুলবেন না।



১২. বেলপাহাড়ি : ঝাড়গ্রাম থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে বেলপাহাড়ি। বর্ষাকালে পাহাড়, জঙ্গল, ছোট ছোট ঝরনা আর লাল মাটির রাস্তা এক অপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি করে। কলকাতা থেকে গাড়িতে সরাসরি অথবা ঝাড়গ্রাম পৌঁছে গাড়ি ভাড়া করে এখানে আসা যায়। থাকার জন্য বনবাংলো, হোমস্টে এবং ছোট রিসর্ট রয়েছে। স্থানীয় নানাপদ, মহুয়া, শালপাতায় দেশি মুরগি ও নদীর মাছ এখানে বিশেষ জনপ্রিয়। ঘাঘরা জলপ্রপাত, তারাফেনি ব্যারাজ এবং কাঁকরাঝোড় জঙ্গল অবশ্যই ঘুরে দেখার মতো।


১৩. গড়পঞ্চকোট : পুরুলিয়ার পাদদেশে অবস্থিত গড়পঞ্চকোট ইতিহাস ও প্রকৃতির এক অনন্য মেলবন্ধন। কলকাতা থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে এই গন্তব্যে গাড়িতে বা আসানসোল পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে গাড়িতে পৌঁছানো যায়। বর্ষায় পাঞ্চেত পাহাড় সবুজে ভরে ওঠে, আর প্রাচীন দুর্গের ধ্বংসাবশেষ কুয়াশার আবরণে যেন রহস্যময় হয়ে ওঠে। থাকার জন্য পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনের লজ, রিসর্ট ও হোমস্টে রয়েছে। স্থানীয় ধাবায় গরম ভাত, মাটন, দেশি মুরগি ও পোস্তর পদ বিশেষ জনপ্রিয়।



১৪. অযোধ্যা পাহাড়, পুরুলিয়া : কলকাতা থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরে অযোধ্যা পাহাড় বর্ষার সময় প্রকৃতির এক অনন্য রূপ ধারণ করে। হাওড়া থেকে পুরুলিয়া পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে গাড়িতে অযোধ্যা পাহাড় পৌঁছানো যায়। বামনি ফলস, মার্বেল লেক, মুরুগুমা ড্যাম এবং পাহাড়ি রাস্তার সৌন্দর্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। থাকার জন্য পর্যটন লজ, বনবাংলো ও ব্যক্তিগত রিসর্ট রয়েছে। স্থানীয় ধামসা-মাদলের সংস্কৃতির পাশাপাশি দেশি মুরগির ঝোল, চচ্চড়ি ও লাল চালের ভাতের স্বাদ উপভোগ করতে পারেন।


১৫. বিষ্ণুপুর : টেরাকোটার মন্দিরের শহর বিষ্ণুপুর বর্ষায় আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। কলকাতা থেকে ট্রেন বা সড়কপথে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টায় পৌঁছানো যায়। রাসমঞ্চ, জোড়বাংলা মন্দির, মদনমোহন মন্দির এবং বালুচরী শাড়ির গ্রাম এই সফরের অন্যতম আকর্ষণ। থাকার জন্য সরকারি পর্যটন লজ ও একাধিক ভালো হোটেল রয়েছে। এখানে মুড়ি-ঘুগনি, মিষ্টি, পোস্তর বড়া এবং স্থানীয় নিরামিষ খাবারের সুনাম রয়েছে।



১৬. শান্তিনিকেতন : বর্ষার শান্তিনিকেতন মানেই লাল মাটির পথ, সবুজ গাছপালা আর রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত পরিবেশ। হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে বোলপুরগামী ট্রেনে সহজেই পৌঁছানো যায়। উত্তরায়ণ, ছাতিমতলা, কলাভবন এবং সোনাঝুরি হাট ঘুরে দেখা যায়। থাকার জন্য নানা ধরনের রিসর্ট, হোমস্টে ও হোটেল রয়েছে। খেজুরগুড়ের মিষ্টি, কোপাইয়ের ধারে চা এবং বাঙালি খাবারের স্বাদ ভ্রমণকে আরও আনন্দময় করে তোলে।


১৭. শিমুলতলা : একসময় বাঙালির প্রিয় স্বাস্থ্যনিবাস ছিল শিমুলতলা। কলকাতা থেকে হাওড়া-দিল্লি রুটের বিভিন্ন ট্রেনে শিমুলতলা স্টেশনে পৌঁছানো যায়। বর্ষায় পাহাড়, জঙ্গল ও কুয়াশার মেলবন্ধনে এই এলাকা অপরূপ হয়ে ওঠে। পুরনো বাংলো, পাহাড়ি পথ এবং নির্জন প্রকৃতি এই সফরের মূল আকর্ষণ। থাকার জন্য সরকারি লজ, ব্যক্তিগত বাংলো ও হোমস্টে রয়েছে। স্থানীয় ধাবায় গরম লিট্টি-চোখা, দেশি মুরগি এবং দুধের তৈরি মিষ্টি পাওয়া যায়।


১৮. জয়পুর বন : বাঁকুড়ার জয়পুর শালবন বর্ষায় সবুজের রাজ্যে পরিণত হয়। কলকাতা থেকে বিষ্ণুপুর হয়ে সহজেই এখানে পৌঁছানো যায়। শাল, সেগুন ও পিয়ালের ঘন অরণ্যের মধ্যে নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য এটি আদর্শ। বনবাংলো ও কয়েকটি রিসর্টে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। স্থানীয় রান্নায় দেশি মুরগি, পোস্ত, শাকসবজি ও মাছের পদ বিশেষ জনপ্রিয়।



১৯. দেউলটি : হাওড়া থেকে মাত্র দেড় ঘণ্টার ট্রেনযাত্রায় পৌঁছে যাওয়া যায় দেউলটিতে। সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাসভবন, রূপনারায়ণ নদীর তীর এবং গ্রামীণ বাংলার পরিবেশ এই ভ্রমণকে বিশেষ করে তোলে। এখানে কয়েকটি হোমস্টে ও ছোট হোটেলে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। নদীর টাটকা মাছ, ইলিশ এবং দেশি রান্না অবশ্যই চেখে দেখার মতো।


২০. গেঁওখালি : হাওড়া থেকে কোলাঘাট বা তমলুকের দিক ধরে গাড়িতে সহজেই পৌঁছানো যায় গেঁওখালিতে। রূপনারায়ণ, হুগলি ও দামোদর নদীর মিলনস্থলের অপরূপ দৃশ্য বর্ষায় আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। নদীর ধারে পর্যটন লজ ও ব্যক্তিগত রিসর্ট রয়েছে। ইলিশ, চিংড়ি, ভেটকি এবং নদীর তাজা মাছের স্বাদ এখানকার অন্যতম আকর্ষণ। বিকেলের বৃষ্টিভেজা নদীতীরে বসে সূর্যাস্ত দেখা এই সফরের সেরা স্মৃতি হয়ে থাকবে।



ভ্রমণের আগে মনে রাখবেন: বর্ষাকালে ভ্রমণে বেরোনোর আগে অবশ্যই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে নিন। সঙ্গে রেইনকোট, ছাতা, অতিরিক্ত পোশাক, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জলরোধী ব্যাগ রাখুন। পাহাড়ি বা সমুদ্র এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশ মেনে চলুন। ভ্রমণস্থলে প্লাস্টিক বা আবর্জনা না ফেলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখুন। নিরাপদ ভ্রমণই আনন্দের ভ্রমণ। বর্ষা প্রকৃতিকে নতুন রঙে সাজায়। তাই শহরের ব্যস্ততা থেকে মাত্র দু'দিনের অবকাশেই কলকাতার আশপাশের এই গন্তব্যগুলি আপনাকে উপহার দিতে পারে সবুজ, নদী, পাহাড়, সমুদ্র আর অজস্র স্মরণীয় মুহূর্ত।

ট্রেন্ডে ওভার সাইজড সানগ্লাস


প্যারিস, মিলান, নিউ ইয়র্ক থেকে শুরু করে কলকাতার রাস্তাঘাট—এখন সর্বত্রই এক নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ডের রাজত্ব। সেটি হল ওভারসাইজড সানগ্লাস। শুধু চোখকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করাই নয়, ব্যক্তিত্বে আনে আলাদা মাত্রা, লুকে যোগ করে গ্ল্যামারের ছোঁয়া। একসময় যে বড় ফ্রেমের সানগ্লাসকে কেবল হলিউড তারকাদের অনুষঙ্গ বলে মনে করা হত, আজ তা হয়ে উঠেছে প্রতিদিনের স্টাইল স্টেটমেন্ট। ফ্যাশনপ্রেমী তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে কর্মজীবী নারী-পুরুষ—সবাই এখন এই ট্রেন্ডে শামিল।


ওভারসাইজড সানগ্লাসের জনপ্রিয়তার ইতিহাস অবশ্য নতুন নয়। ষাট ও সত্তরের দশকে অড্রে হেপবার্ন, জ্যাকলিন কেনেডি এবং সোফিয়া লোরেনের মতো আন্তর্জাতিক ফ্যাশন আইকনরা বড় ফ্রেমের সানগ্লাসকে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। পরে নব্বইয়ের দশকে এই ট্রেন্ড কিছুটা ম্লান হলেও সাম্প্রতিক কয়েক বছরে তা নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ভিন্টেজ ফ্যাশনের পুনরাগমন এবং সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে এই স্টাইল আবারও বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।



ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, ওভারসাইজড সানগ্লাসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল এটি প্রায় সব ধরনের মুখের গঠনের সঙ্গে মানিয়ে যায়। গোল মুখে বড় চৌকো ফ্রেম মুখকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ দেখায়, আবার লম্বাটে মুখে গোলাকার বা ক্যাট-আই ওভারসাইজড ফ্রেম এনে দেয় কোমলতা। ফলে মুখের গঠন নিয়ে বেশি চিন্তা না করেই নিজের পছন্দের ডিজাইন বেছে নেওয়া যায়।


এই সানগ্লাসের আর একটি বড় সুবিধা হল চোখের পাশাপাশি মুখের অনেকটা অংশ সূর্যের ক্ষতিকর ইউভি রশ্মি থেকে সুরক্ষিত থাকে। বিশেষ করে গরমের দিনে বা সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে গেলে বড় ফ্রেম চোখের চারপাশের সংবেদনশীল ত্বককে রোদে পোড়া থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। তাই এটি কেবল ফ্যাশনের উপকরণ নয়, স্বাস্থ্যসচেতনতারও একটি অংশ।


বর্তমানে বাজারে ওভারসাইজড সানগ্লাসের নানান ধরন দেখা যাচ্ছে। ক্লাসিক স্কোয়ার, রাউন্ড, বাটারফ্লাই, ক্যাট-আই, অ্যাভিয়েটর কিংবা জিওমেট্রিক—প্রতিটি ডিজাইনের নিজস্ব আবেদন রয়েছে। কালো বা বাদামি ফ্রেমের পাশাপাশি এখন স্বচ্ছ অ্যাক্রিলিক, টর্টয়েসশেল, প্যাস্টেল শেড কিংবা রঙিন ফ্রেমও সমান জনপ্রিয়। লেন্সেও এসেছে বৈচিত্র্য—গ্রেডিয়েন্ট, মিরর, পোলারাইজড কিংবা হালকা রঙিন টিন্টেড লেন্স এখন ট্রেন্ডে।



ওভারসাইজড সানগ্লাসের জনপ্রিয়তার পেছনে সেলিব্রিটিদের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। বলিউডে দীপিকা পাড়ুকোন, আলিয়া ভাট, করিনা কাপুর খান কিংবা সোনম কাপুরকে প্রায়ই বড় ফ্রেমের সানগ্লাসে দেখা যায়। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক তারকাদের মধ্যে হেইলি বিবার, বেলা হাদিদ, জেনিফার লোপেজ বা রোজির মতো ফ্যাশন আইকনরা নিয়মিত এই স্টাইল অনুসরণ করেন। তাঁদের বিমানবন্দর লুক থেকে শুরু করে ক্যাজুয়াল স্ট্রিট স্টাইল—সব ক্ষেত্রেই ওভারসাইজড সানগ্লাস একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ।


সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ইনস্টাগ্রাম, পিন্টারেস্ট কিংবা ফ্যাশন ব্লগগুলিও এই ট্রেন্ডকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে। একটি সাধারণ টি-শার্ট, ডেনিম এবং স্নিকার্সের সঙ্গে শুধু একটি বড় ফ্রেমের সানগ্লাস যোগ করলেই গোটা লুক মুহূর্তে হয়ে ওঠে আকর্ষণীয়। তাই ফ্যাশন ইনফ্লুয়েন্সারদের কাছেও এটি অন্যতম প্রিয় অ্যাকসেসরি।


পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে ওভারসাইজড সানগ্লাস বেছে নেওয়াও এখন একটি শিল্প। ফরমাল পোশাকের সঙ্গে কালো বা বাদামি স্কোয়ার ফ্রেম দারুণ মানায়। আবার গ্রীষ্মের ফ্লোরাল ড্রেস বা কটন শাড়ির সঙ্গে রাউন্ড বা ক্যাট-আই ওভারসাইজড ফ্রেম এনে দেয় নরম, পরিশীলিত লুক। সমুদ্রসৈকতের ছুটিতে বড় হ্যাট, কফতান এবং ওভারসাইজড সানগ্লাস—এই ত্রয়ী যেন নিখুঁত স্টাইলের সংজ্ঞা।



ভারতীয় পোশাকের সঙ্গেও এই ট্রেন্ড অনায়াসে মানিয়ে যায়। শাড়ি, কুর্তা, পালাজো কিংবা ফিউশন ড্রেসের সঙ্গে একটি বড় ফ্রেমের সানগ্লাস যোগ করলে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সুন্দর মেলবন্ধন তৈরি হয়। বিশেষ করে সাদা তাঁতের শাড়ি, অক্সিডাইজড গয়না এবং কালো ওভারসাইজড সানগ্লাস—এই লুক এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ জনপ্রিয়।


তবে শুধু ট্রেন্ড দেখে সানগ্লাস কেনা উচিত নয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সানগ্লাস কেনার সময় অবশ্যই ইউভি-৪০০ সুরক্ষা রয়েছে কি না, তা দেখে নেওয়া জরুরি। কারণ শুধু গাঢ় রঙের লেন্স থাকলেই চোখ সুরক্ষিত থাকবে, এমন নয়। ভালো মানের লেন্স ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধ করে চোখের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি কমায়।


ফ্রেমের ওজনও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ভারী ফ্রেম দীর্ঘক্ষণ ব্যবহার করলে নাক ও কানে চাপ পড়তে পারে। তাই এমন ফ্রেম বেছে নেওয়া উচিত যা দেখতে আকর্ষণীয় হলেও পরতে আরামদায়ক। নোজ প্যাড এবং ফ্রেমের ফিটিং ঠিক আছে কি না, সেটিও খেয়াল রাখা প্রয়োজন।


সানগ্লাসের যত্ন নেওয়াও সমান জরুরি। ব্যবহারের পরে নরম মাইক্রোফাইবার কাপড় দিয়ে লেন্স পরিষ্কার করা উচিত। সাধারণ কাপড় বা টিস্যু দিয়ে ঘষলে লেন্সে আঁচড় পড়তে পারে। ব্যবহার না করলে সবসময় হার্ড কেসে রেখে দিলে সানগ্লাস দীর্ঘদিন ভালো থাকে।



ফ্যাশন বিশ্লেষকদের মতে, ওভারসাইজড সানগ্লাস এমন একটি অ্যাকসেসরি যা খুব সহজেই আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়। কখনও মেকআপ না থাকলেও বড় ফ্রেমের একটি সানগ্লাস মুহূর্তে মুখে এনে দেয় পরিপাটি ও স্টাইলিশ উপস্থিতি। তাই অনেকেই একে "ইনস্ট্যান্ট স্টাইল আপগ্রেড" বলে থাকেন।


বর্তমানে পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের দিকেও নজর দিচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ড। পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক, বায়ো-অ্যাসিটেট কিংবা টেকসই উপাদান দিয়ে তৈরি ওভারসাইজড সানগ্লাসও বাজারে আসছে। ফলে স্টাইলের পাশাপাশি পরিবেশ সচেতনতার বার্তাও তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক বছরেও ওভারসাইজড সানগ্লাসের জনপ্রিয়তা কমার সম্ভাবনা খুবই কম। বরং নতুন নতুন রং, ফ্রেমের আকার এবং প্রযুক্তিনির্ভর লেন্সের সংযোজনে এই ট্রেন্ড আরও বৈচিত্র্যময় হবে। ফ্যাশনের জগতে এমন কিছু অ্যাকসেসরি রয়েছে, যা সময়ের সঙ্গে বদলালেও কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। ওভারসাইজড সানগ্লাস সেই তালিকারই অন্যতম।



সবশেষে বলা যায়, ওভারসাইজড সানগ্লাস এখন আর শুধু রোদ থেকে চোখ বাঁচানোর উপকরণ নয়; এটি ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং আধুনিক রুচির প্রতীক। দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ পোশাক হোক বা বিশেষ কোনও অনুষ্ঠানের সাজ—একটি সঠিক ওভারসাইজড সানগ্লাস মুহূর্তে বদলে দিতে পারে পুরো লুক। তাই ফ্যাশনের বর্তমান অভিধানে এটি নিঃসন্দেহে একটি 'মাস্ট-হ্যাভ' অ্যাকসেসরি, যা স্টাইল ও সুরক্ষার নিখুঁত সমন্বয় ঘটায়।

আমের নামে ইতিহাসের স্বাদ


ফলের রাজা আম শুধু তার অতুলনীয় স্বাদ, গন্ধ বা রসালতার জন্যই বিখ্যাত নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের এক দীর্ঘ পরম্পরা। হাজার হাজার বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশে আমের চাষ হয়ে আসছে। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে আম মানুষের খাদ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। আজও বিশ্বের মোট আম উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই হয় ভারতে।


'ম্যাঙ্গো' শব্দটিরও রয়েছে আকর্ষণীয় ইতিহাস। দক্ষিণ ভারতে আমকে বলা হতো 'মাঙ্গা' বা 'আমকায়'। ১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিকেরা ভারতে এসে এই ফলের সঙ্গে পরিচিত হন এবং স্থানীয় উচ্চারণ থেকেই 'মাঙ্গা' শব্দটি পরবর্তীকালে ইংরেজি ভাষায় 'Mango' রূপে পরিচিতি লাভ করে। তারপর ধীরে ধীরে এই নাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।



ভারতের রাজদরবারেও আমের বিশেষ মর্যাদা ছিল। বিশেষ করে মোগল আমলে আম ছিল সম্রাট ও অভিজাতদের প্রিয় ফল। সম্রাট আকবর বিহারের দরভাঙ্গায় লক্ষাধিক আমগাছ লাগিয়ে বিখ্যাত 'লাখ বাগ' প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। সেই সময় থেকেই বিভিন্ন জাতের আমের উন্নয়ন ও সংরক্ষণের কাজ আরও গুরুত্ব পায়।


ভারতে বর্তমানে এক হাজারেরও বেশি জাতের আমের সন্ধান পাওয়া যায়। তার মধ্যে ল্যাংড়া, হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, ফজলি, চৌসা, দশেহরি, কেশর, আলফানসো, তোতাপুরী, বাঙ্গানাপল্লি, মল্লিকা, অম্রপালি—প্রতিটি জাতেরই রয়েছে নিজস্ব স্বাদ, গন্ধ ও বৈশিষ্ট্য। অনেক ক্ষেত্রেই এই নামগুলির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোনও অঞ্চল, ব্যক্তি বা ঐতিহাসিক ঘটনার স্মৃতি।


সবচেয়ে কৌতূহল জাগায় 'ল্যাংড়া' আমের নাম। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী, উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর এক শারীরিক প্রতিবন্ধী কৃষক প্রথম এই বিশেষ জাতের আমের পরিচর্যা ও প্রসার ঘটান। স্থানীয় মানুষ তাঁকে 'ল্যাংড়া' নামে চিনতেন। পরবর্তীকালে তাঁর বাগানের সেই সুস্বাদু আমও একই নামে পরিচিত হয়ে যায়। যদিও এর পক্ষে নির্ভুল ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই, তবুও এই লোককথাই আজ সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাখ্যা।


অন্যদিকে 'চৌসা' আমের নামের পেছনে রয়েছে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৫৩৯ সালে বর্তমান বিহারের চৌসা অঞ্চলে মোগল সম্রাট হুমায়ুন ও আফগান শাসক শেরশাহ সুরির মধ্যে এক ঐতিহাসিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। সেই যুদ্ধে শেরশাহ সুরির জয়লাভের পর তিনি ওই অঞ্চলের একটি অসাধারণ স্বাদের আমের প্রশংসা করেন। বিজয়ের স্মৃতিকে অমর করে রাখতেই সেই আমের নাম রাখা হয় 'চৌসা'। এরপর ধীরে ধীরে এই জাতের আম গোটা উত্তর ভারতে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।



বাংলার আমের ইতিহাসও সমান সমৃদ্ধ। মালদহ ও মুর্শিদাবাদ বহু শতাব্দী ধরে উৎকৃষ্ট মানের আম উৎপাদনের জন্য খ্যাত। হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, ফজলি, গোপালভোগ, বৃন্দাবনী, মোহনভোগ—প্রতিটি জাতই বাংলার কৃষি ও খাদ্যসংস্কৃতির গর্ব। বিশেষ করে ফজলি আমের নামকরণ নিয়েও নানা লোককথা প্রচলিত রয়েছে।


আম শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; ভারতীয় সাহিত্য, শিল্প, ধর্মীয় আচার এবং লোকসংস্কৃতিতেও এর বিশেষ স্থান রয়েছে। সংস্কৃত সাহিত্য থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখাতেও আম ও আম্রকুঞ্জের উল্লেখ বারবার এসেছে। বসন্তের আম্র মুকুল, গ্রীষ্মের পাকা আম কিংবা আমপাতার শুভ ব্যবহার—সব মিলিয়ে ভারতীয় জীবনের সঙ্গে আমের সম্পর্ক গভীর ও চিরন্তন।


আজকের দিনে আমের অসংখ্য জাত বাজারে এলেও প্রতিটি নামের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কোনও না কোনও ইতিহাস, ভৌগোলিক পরিচয় অথবা মানুষের স্মৃতি। তাই আমের স্বাদ যেমন রসনাকে তৃপ্ত করে, তেমনই তার ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় ভারতীয় ঐতিহ্যের বহু শতাব্দী পেছনে। একটি আম হাতে নিলেই যেন ধরা পড়ে ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রকৃতি আর মানুষের সম্মিলিত উত্তরাধিকার।


রবিবারের গল্প:


গল্পগুলো সাদাকালো


রাইপারমিতা আইচ


দাওয়ার বাঁশটায় হেলান দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে হা-ক্লান্ত মুখে বসে আছে পরব বাউরি। বহু কথনের পর উত্তাল সমুদ্র যখন একেবারে স্থির হয়ে আসে, তখন সব কথার পাহাড় নিঃশব্দে ভাঙে সমুদ্রের বুকে। কেউ টের পায় না ধিকিধিকি উত্তাপটা। পরবকে দেখলে যে কেউ মিলিয়ে নিতে পারবে এ অনুভব।


কঙ্কালসার উপোসী শরীরটা এখন গরমের তাঁতে ক্লিষ্ট। সারা গা-ময় ঘামাচির দাপাদাপি। নখের আঁচড়ের চোট সারাগায়ে। আরাম করে চুলকেছে কিনা! সেখান থেকে রক্তরস বেরিয়ে আসছে কিছুটা করে। আর বেরিয়ে আসছে আক্রোশ, বিরক্তি। এর কিছুটা আবার সেখানেই শুকিয়ে গেছে। মনে শান্তি নেই একদণ্ড। ঘরেরও অবস্থা তথৈবচ।


পরবের শরীরটার মতো রোদের তাপে দাওয়ার মাটিও ফুটিফাটা। তার কঙ্কালসার বেঁচে থাকা শুধু কাঠামোর মতো, সে দাওয়াও ল্যাপা হয়নি বহুদিন। দাওয়ার ফাটলের হাঁ-মুখগুলো যেন পরবের কাছে রাক্ষসের জ্বালাময় ক্ষুধার্তের বহিঃপ্রকাশ লাগে। সেদিকে তাকালে বুকটা হু হু করে ওঠে। নিজের মনেই বিরবির করে কত কী। দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার সঙ্গে বেরিয়ে আসে না-বলা ফুলকারি আলপনা। সব কথা কি সবাইকে শোনাতে আছে? দরকারটাই বা কী! কিন্তু ভ্রুর বাঁকা ভঙ্গি, বলিরেখার কাটাকুটি দেখে অনুমান করা যায়, তাতে নেই রঙের প্রশান্তির প্রলেপ। আছে জ্বালাময়ী আঁচ।



পরব নিজের গা-ময় শুঁকে দেখে, এখনো তো তার শরীর জুড়ে লেগে আছে মেহনতী মেঠোগন্ধ। তবে!


"কুতো কইষ্টে জনকইল্যান সমিতির গাদা ট্যাকা ধার লিয়ে তুলা ঘরডারও এইক্যেবারে হকুচ্ছিত দশা। ট্যাকাও এহনো পুরা সুধে লাই। তারমইধ্যে এই অবস্থা!"


"শারাবণও যাতিছ্যে, কুতোদিন হইল্যো জল নাই। হা ঠাউর জমি ফুটিফাটা। নদী শুখা। গাছপালাগুলান আধামরা হলদেপারা হইয়ে ধ্যুঁইকছে। তু কি কানা বঠেক! এখুন কি ঠান্ডা মারি বইসবার সময়! তবে আর উনানের গোটা হাঁড়ির ফুটলাগা গন্ধটু নাকে লিবো কবেক?" আকাশের দিকে তাকিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে। দলা কান্নার ডেলাটা গলা ঠেলে উঠে আসে তার।


পরবের চোখে ভেসে উঠছে উপোসী মনে এক বোকনো ভিজেভাত-আলুচচ্চড়ি, গোটা দুই টসটসে কাঁচালঙ্কা আর পিঁয়াজ। পরব জিভ দিয়ে ঠোঁটটা ভেজাবার চেষ্টা করে। কিন্তু পোড়া থুতুও যেন কাঠশুকনো হয়ে গেছে। চোখ ফেটে জল আসে পরবের।


মাওবাদী সক্রিয়তায় একে জঙ্গলমহল উত্তপ্ত। গ্রামকে গ্রাম পুড়ে ছারখার হচ্ছে রাতের অন্ধকারে। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া থেকে শুরু করে অনাহার-মৃত্যু রোজকার সংবাদ শিরোনামে। এমন উত্তাল পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজনীতিকদের মাথায় হাত। পরের পর আলোচনা চলছে, খবরে শোনা যাচ্ছে। কথার পাহাড় সিলিং ছুঁয়ে ফেলেছে, কিন্তু সমাধানসূত্র তবু কিছু বেরোচ্ছে না। ইচ্ছে-অনিচ্ছে শিকেয় তুলে কুরকুট খেয়ে কোনোমতে প্রাণ বাঁচিয়ে রেখেছে একদল মানুষ।

"মাটির কুপির ত্যাল শ্যাষ। পরীইক্ষা আমার, না আইনলে...!" বাপের প্রতি তির্যক মন্তব্য বর্ষণ করে ফুলি।



কথাটা শোনা মাত্র চ্যাড়চ্যাড়াইয়ে (হুটোপুটি করে) উঠে একটা কঞ্চি ভেঙে ফুলির দিকে রাগত চোখে ছুটে যায় পরব।


"পড়া! প্যাটে ইট্টু দানাপানির খুঁজ নাই। উনানে দি গ্যা বইপত্তর।"


ঘটনার আকস্মিকতায়, অভিমানে ফুলির চোখ জলে ভরে আসতে চায়। গলার কাছে কী যেন দলা পাকায়। স্বপ্ন-স্বপ্ন দামি সাতনরী হারটা এক লহমায় ছিঁড়ে বহুমূল্য পাথর যেন এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল নিমেষে। রাগের বশে ধপধপিয়ে আসা পায়ের আওয়াজ ফিরে নিজের কানেই বাজে তার।


"কুনমতে দশকেলাসটু পাশ দ্যেতি পারল্যে সরকারী যোজনায় একটা কামকাজ হবেক। বুঝিস ল্যা! ঘরের সুসার হবেক। দিদিমণি তো তুকে বইল্যেক, পরব, উয়ার মাথা ভালো। উয়ারে পড়াও ক্যানে। ছাড়ান দিও না।" চিৎকার করে ওঠে ফুলি।


এই দুপ্রহরের বেলায় সে ফিরল কেবল। সকাল থাকতে বালতিটা নিয়ে লাইনে ছিল। সরকার থেকে একটি টিউকল করে দিয়েছে, সারা গ্রামের লোক সেই টিউকল থেকে জল নেয়। টিউকলের হাতলের হাওয়া-ভরা আওয়াজ দুপুরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে বেশ কিছুদূর। কেবল আওয়াজই সার। কত গুন ঠুকলে তবে এক বালতি জল বেরোয়, তা কেউ জানে না।


জলের লাইনে চেনা-অচেনা মুখগুলোর সঙ্গে একটু-আধটু কথা বিনিময় হয়। ওদের কেউ জাল বোনে, কেউ ঝুড়ি বাঁধে, কেউ ঢাক ও নানা বাদ্য বাজায়, বাকিরা চাষাবাদ ও অন্যান্য কাজ করে। জোলা, বাগদি, মাহালি, কেওট—ক্ষুধা-তৃষ্ণার সময় সব জাত এক। সুখা মাটির জন্য বাউরি-বাগদি সবার চোখ বেয়ে যায় এক নোনাজল।


"আমারও তো প্যাট ভত্তি খুধা! কিছুর জুগার লাই। খাবার দিতে লাচার বাপ।"


অভিমানে মনে-মনে বাপকে গাল দিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে জলুইয়ে ঝোলানো পুরনো ঝোলার ভেতর কোণগুলো ইঁদুর খোঁজার মেনির মতো আঁজুরে-পাঁজুরে খোঁজে মেয়েটা, একটুনু খাবার যদি মেলে। শুধু হাতে লাগে কুঁচকানো চিলিমিলি, কাগজের প্যাকেট, পুরনো কানিচুনি। অসহ্য হয়ে এনামেলের গেলাসটাতে ঘোলাটে জলই এক গেলাস খায় ফুলি।


পরব ক্লান্ত শরীরটা বয়ে নিয়ে দূরের মনসা চাতালটাতে গিয়ে বসে, গামছা দিয়ে চোখের কোণ মোছে। পিছনে ঠেস দেয় বড্ড পছন্দের অমলতাস গাছটায়। এ সময় প্রতিবছর হলদে ফুলে-ফুলে ভরে যায় গাছটা। মনসার থানে ধুমধামে পুজো হয়। গ্রামময় চলে পান্তা খাওয়া। সবার মুখে হাসি ফোটে। পরবের কেমন স্বপ্ন-স্বপ্ন ঠেকে। আধাপোড়া বিড়িটা খাটো ধুতির খুঁট থেকে বার করে। আঙুলে রগড়ে কানের পাশে গোঁজে পরব।


"মাচিসটা কুনহানে রাখিনু!"


বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে বিরক্তিতে বিড়বিড় করতে করতে পরব শুয়ে পড়ে চাতালের এক কোণে। একটু যদি বাতাস আসে। গুম মেরে আছে ধরিত্রী মা। যেন কোনো অনুযোগ, অভিযোগ বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে। পরনের চিটচিটে ময়লা গামছা দিয়েই একটু হাওয়া খায় পরব। চোখ লেগে আসে একসময়।

"বাপ চাইছ্যিল পইরবেক সে। নিজের মা মইল্যো রাক্ষুসী মা'টা আসল্যে পড়ার ইচ্ছেটু শ্যাষ হইলো। মা তাকে জুড়ে দিল জমিনে।" সেই চাষাবাদ শুরু। সেটাও কইত্যে দিলে লাই মাও অইত্যাচার। ইরপর পরব পারিবারিক প্যেশা ছাড়ি দিল।


বন্ধুর সাথে যুক্তি কইরে বে করা চাঁদমণিকে লিয়ে পাড়ি দিল ঝিনাইদহ। নতুন বৌয়ের ল্যাগে একটা উন্নো কাজ ধইরল্যো। কাজটু বেশ কঠিন বঠেক! লালশো পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ কইরে বিক্রি। ইয়াই জীবিকা।" চোখের জলে আবছা স্মৃতি প্রকট হচ্ছে...


"শান্তির এট্টা পেসাদ বানাবে ইচ্ছা ছ্যাল। কষ্ট ছ্যাল বঠেক, তবু কি সব সুখের দিন গ্যাছে।"


ভোর থাকতে চাঁদমণির নরম হাতের মারভাত আর লালআলুভাতেটা ত্যাবড়ানো শানকিটাতে বেঁধে মারাংবুরুর নাম নিয়ে ওরা দল বেঁধে বেরিয়ে পড়তো। সাথে নিত জীবনযুদ্ধের হাতিয়ার—লম্বা বাঁশ কতকগুলো, আর থলে, দড়ি, আরো কতো কী।


ওরা ছড়িয়ে পড়তো ঝিনাইদহের কোণায় কোণায়। শৈলকুপা উপজেলা, মির্জাপুর, রাজনগর—সব তার হাতের তালুর মতো চেনা ছিল...। রাজনগর গোরস্থানের পাশে সার দিয়ে ছিল রইনা, মেহগনি গাছ। সেখানেই পিঁপড়ার বাসা দেখে চকচকিয়ে উঠতো ওদের চোখ। যেখানে মিলতো প্রচুর পরিমাণ সাদা রঙের চালের মতো টসটসে ডিম। এই পিঁপড়ার ডিমই যে তার জীবিকা নির্বাহের হাতিয়ার।


গাছগুলো তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফিরতো ওরা। কারণ সব বাসায় তো হবে না। চাই ডোল পিঁপড়ার বাসা। কমলারঙা এই পিঁপড়ার দল গাছের মগডালে লালা ব্যবহার করে কয়েকটি পাতা সেলাই করে থলির মতো তৈরি করে বাসা। এ থলি যেমন মজবুত, তেমন দেখতে সুন্দর। ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে বাসার মধ্যেই রেখে দেয় এরা। বর্ষার শুরুর দিকে সেখানেই পাড়ে ডিম, অর্থাৎ ‘কুরকুট’।


"জলদি এইদিকে আয় হো পরব!" চিৎকার করে ডাক পারে কামাল হোসেন।


"আনকাই চাপ লিছিস ক্যানে! আসি হো, আসি।"


পরব ছুটে গিয়ে দেখে, কামাল লালশো পিঁপড়ার বাসার খোঁজ করতে করতে হাত চেপে গড়াচ্ছে মাটিতে।


আম, লিচুসহ দেশীয় গাছগুলোতেই লাল পিঁপড়ার বাসা পাওয়া যায়। কপাল জোর থাকলে বড় বাসা থেকে একশো থেকে দেড়শো গ্রাম ডিম পাওয়া যায়।


"বড়নুক হবার নোভে কামাল বাঁশের বদলি হাত মারিছিলি ওই সিলানো পাতার মধ্যে। লীলচে শরীলটা নিয়ে সক্কলে ছুটেছ্যেল উঝা হরতকি পীরের কাছে।"


কামাল বোধহয় বলতে চেয়েছিল ওর ছোট চারটে বাচ্চা, সংসারটা ভেসে যাওয়ার আশঙ্কা...। কিন্তু গলা দিয়ে একটা শব্দও তার বেরোয়নি। চোখের কোল বেয়ে গিয়েছিল কয়েক ফোঁটা গরম জল।


পরব তো শুইনেছ্যিল জোর বাঁধন দিয়্যা তবে বিষ উখারতে হয়। কিন্তু পীর...!


সে সাহস করি বাঁধনও দিয়েছিল, কিন্তু ক্ষতে দাঁত ফুঁড়াতেই "ক্যান লুতন বৌডার মুখ ভেসে উঠলো।" ঝাড়ফুঁক, কতো কী হইল্যো, সহ্য না কইত্যে পেরে মইরলো কামাল। "হুই গোরস্থানেই মাটি দিয়া হলো ওকে।"

আশ্বিন-কার্তিক মাসের দিকে শহরে এই ডিমের চাহিদা থাকে বেশি। সব থেকে বেশি ডিম পাওয়া যায় বর্ষায়। শীতের শেষের দিকে কিছুটা। কিন্তু সেই সময় ডিমের চাহিদা তেমন একটা থাকে না। "তাই বর্ষার সাপখোপ... এত্তো ভাবলে হবেক লাই। গরিব মানুষ মোরা। প্যাটের দায়, বয় দায়। এ কাজে পুঁঞ্জিও কুন লাগে না।"


"গরম ধুঁয়া ওঠা ভাত আর মেঠো ইঁদুর পোড়া, সাথে এই কুরকুটের টক লয়তো পিঁয়াজ, রুসুন, একটুনু কাঁচাত্যাল দিয়া মাইখ্যে শালপাতায় জড়াইয়ে সেঁকা। তারপর চাঁদমণির সাথে এক থালে মেখে খেয়ে ছেঁড়া কাঁথায় শুয়া..." সে জড়াজড়ির আশ্লেষে আকাশের চাঁদোয়া তলে তাদের সুখের স্বর্গ বোনা হবে...। জড়িকাজের শব্দে বোনা হবে রূপকথা। বৌয়ের মতো আকাশের নাক-বিঁধানো তারারা পিটপিটিয়ে ওদের ভালোবাসার সাক্ষী থাকবে। এমন সুখস্বপ্ন ভেবেই জিভ লকলকিয়ে উঠল পরবের। মন ভরে গেল চাঁদমণির ছোঁয়ায়।


"সূয্যিটা যখন হাত-পা মেইলে আরামের জুগার করে, উয়ারা ঘরকে যায়। কাজ কি কম! এই ডিম সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজটু খুব সতর্কের সাথে কইত্তে হয়।"


এটি সাধারণত মাছের খাবার হিসেবে বিক্রি হয়। "আস্ত না রাখতি পাল্লে মাছে খায়না। মহাজনও কিনবেক লাই। পয়সাও ফুটা। পরিশ্রম জলে। লতুবা ভোরের পরথম বাসে শহর গেলে দুখুরের মধ্যি মহাজন ঘর পৌঁছ্নো যায়। কেজি ডিমের দর মহাজন ভালোই দেয়—সাতশো থেকে বারশো।"


দিনের মনে দিন বয়ে গেছে। নদীর জল বেড়েছে-কমেছে। "পরব কখন যে দুটা ছেলে-মেইয়ের বাপ বনেছে, খেয়াল নাই।" মনে ভেবে নিজেই হাসে। ছোট ছা দুটাকে রেখে শহরে আসতে মন কেমন করে। তাই দিনশেষে ফিরবার পারা কিছু লিয়া যায়।


ঘন দুর্যোগের সে রাত পরব আজও মনে করতে চায় না। মনসার পুজাতে তো সে ফাঁক রাখেনি কোনদিন, তবে কেন যে এত্তোবড় সব্বনাশ তার হলো!


"পান্তার সাথে ধেনোর লেশাটা দমে চড়েছিল হু দিন। হয়তু চাঁদমণি চ্যাঁচ্যাঁয়ছিল দমে শরমটু বাঁচাতে। অপদাথ্থ!"


পরব সব খুইয়ে পরের দিন বৌয়ের বস্ত্রহীন, খামচানো, খুবলানো শরীরটা খালের ধারে পেয়েছিল।


"রিপোর্ট লিখাইছিলম। গরিপের শরীলই শরীল লয়, কে লিবে উয়ার মান বাঁচাবার দায়!"


তাই কেউ ধরা পড়েনি সেদিন।


এরপর ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে পরব আবার চলে এসেছে সেই পুরনো চেনা গ্রাম। পুরনো জায়গায়। ভত্তি করেছে সরকারী ইস্কুলে। সে পইড়তে পারে নি, তাই ছাদুটোকে পড়াবেক। ছেলেটা ততদিনে কিছুটা বেড়েছে।


"এরমদ্যি কার যে লজর লাগল্যো! এমন শনি ঘনায়েচে!


মরদের আবার বয়স কি!"


ছেলেটা তাই বাবার মুখের শোনা বৃত্তির হাকুপাকু খোঁজ করেছে। অরণ্যের সন্তানদের কাছে কুরকুট এক ভরসার নাম। মিলেও গেছিল। কিন্তু এবার...!

ছেলেটা ক্লান্ত শরীরটা ধপ করে ফুটিফাটা দাওয়াটাতেই এসে বসে বাঁশ, ঝোলা ও সামগ্রী সমেত। আঙারার মতো রোদে পোড়া শরীরটা থেকে ঘাম বেয়ে নামছে। সেই গতকাল বেরিয়েছিল। রোদের তেজ গেলে কী হবে, মাটির ভাপের গরমের সাথে ক্ষিদের অনিশ্চয়তা, ক্ষোভে আকাশে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, "মা বিষহরি, জল দ্যা মা, লয় তুলে লে।" ফুলি বড় আশা করেছিল, দাদা হয়তো কিছু ব্যবস্থা করে আনবে। চুপটি করে পাশে এসে বসে একগ্লাস জল নিয়ে।


নড়বড়ে শরীরে প্রশ্নচোখে এগিয়ে আসে পরব। একটু চুলগুলো ঘেঁটে দেয়। না-বলা শব্দের আদর সবটুকুই।


"কাল থ্যেইকে বনবাদার একসার কছ্ছি, জলের অভাবে পিঁপড়ার আকাল রে বাপ! কেউ ধার দিলেক লাই পয্যন্ত। কুপারটিভবাবুরা মুখ ফিরাইছিলেন, লোনও হবেক লাই। আগের সুদ বাকি। ঝাড়খণ্ডের বাঁশপোঁতার ভয়াল জঙ্গলে টহল মারি কিছু ডিম নিয়ে মহাজন বাড়ি ছুট্যছিলম। ভাঙা, সুখা ডিম। দাম দিলেক লাই।"


চোখ বুজে হাঁপায় ছেলে। ঘন চোখের জলও যেন বুকের ভারী বাতাস হয়ে আটকে আছে। শব্দগুলো কথা হয়ে বেরোতে চাইছে। কিন্তু চার দেওয়ালে মাথা কেটে মরছে।


"কদিনভর কারো প্যাটে কিছু পরে লাই। বাঁধের পারা খিদ্যে।" বিড়বিড় করে ছেলেটা। তবু বাপকে স্বান্তনা দেয়, "তু আনকাই চাপ লিছিস ক্যানে! কুনো ব্যবস্থা ঠিক হবেক।" চোখগুলোতে শুধুই দিশেহারা চাহনি।


হঠাৎই যেন মাথার উপর দিয়ে আকাশের বুক ফুঁড়ে একটা সরু সোনালি উজ্জ্বল সুতোর রেখা এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে মিলিয়ে গেল।


পরব বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ঢাক, ঢোল, ধামসা, বহু মৃদঙ্গ যেন একসাথে উদ্দাম শব্দ-প্রতিযোগিতায় নেমেছে। পরব সমেত সমস্ত গ্রাম খুশিতে ডগমগ। একে অপরের পাশে এসে গা ঘেঁষে দাঁড়াচ্ছে। খালি দৃষ্টিগুলোতে একটু করে ভরাট হওয়ার আশ্বাস।


"পইচ্ছিম দিকে ভাল্। ম্যাঘ রে ফুলি, জল টুলটুলে ম্যাঘ্। দেখি যা।"


ছেলেমেয়ে দুটো বিস্ময়ে পশ্চিমদিকে দেখতে না দেখতেই একটা-দুটো করে বড় বড় আকাঙ্ক্ষিত মোতি যেন কত অনুভূতি জড়িয়ে নিয়ে ফোঁটা হয়ে পড়তে লাগল জ্বলনক্লিষ্ট শরীরগুলোতে। পরব, ফুলি—ওদের নাকে ধীরে ধীরে ভেসে আসতে লাগল চেনা বুনো ঝোপঝাড়ের সোঁদা গন্ধ। সে গন্ধ ছাপিয়ে মন ভরে যাচ্ছে কুরকুটের গন্ধ। জীবন, জীবিকা, সাদা মোটাভাতের ফুটলাগা গন্ধে স্বপ্নের ওপার থেকে জলভরা পোয়াতি মেঘ অজস্র আবেগে ভেঙে পড়ছে বৃষ্টিআকুল মানুষগুলোর উপর।।


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page