top of page

কোচবিহারের মনসা-পট | মেঘের আড়ালে মাওফ্লাং | ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে! | রবিবারের গল্প: চুড়ুইটিপির মাঠে


কোচবিহারের মনসা-পট


নিজস্ব প্রতিনিধি


বাংলার লোকশিল্পের কথা উঠলে আমাদের চোখের সামনে যে ছবিগুলি ভেসে ওঠে, তার অনেকগুলিই আজ পরিচিতির আলোয় উজ্জ্বল। কোনওটি জাদুঘরে জায়গা করে নিয়েছে, কোনওটি শহরের শিল্পমেলায় সমাদৃত, কোনওটি আবার ঘরের দেওয়াল সাজানোর নান্দনিক উপকরণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলার শিল্পভাণ্ডারের এমন কিছু রত্ন এখনও রয়েছে, যাদের অস্তিত্ব জানা যায় মূলত তাঁদের শিল্পীদের ঘরে, গ্রামের কোনও নিরিবিলি পাড়ায় কিংবা কোনও বিশেষ তিথিকে ঘিরে অনুষ্ঠিত লোকাচারের মধ্যে।

কোচবিহারের ভেটাগুড়ি বালাডাঙ্গার মনসা পট তেমনই এক শিল্পঐতিহ্য। এর পরিচিতি এখনও সীমিত। অথচ একটি পটের শরীরে এখানে মিলেমিশে আছে দেবী মনসার উপাখ্যান, মনসামঙ্গল কাব্যের স্মৃতি, সাপের প্রতীক, নদী ও কৃষিনির্ভর জীবন, বাঙালি নারীর লোকায়ত অবয়ব এবং উত্তরবঙ্গের নিজস্ব শিল্পরীতি।

এই শিল্পের সবচেয়ে আশ্চর্যের দিক হয়তো তার সরলতা। দামি রং, নিখুঁত কারিগরি সরঞ্জাম কিংবা বড় কোনও কর্মশালা নয়—সাধারণ শোলা, কাগজ, রং আর শিল্পীর হাতের সূক্ষ্ম দক্ষতাই তৈরি করে এই পট। তার মধ্যেই জন্ম নেয় দেবী, তাঁর বাহন, নাগমালা, মহাদেব, বেহুলা, চাঁদ সওদাগর কিংবা লখিন্দরের মতো চরিত্র।

ভেটাগুড়ির মালাকার পাড়ায় এই কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন কয়েকটি পরিবার। একসময় যে শিল্পের প্রধান উপকরণ ছিল শোলা, ক্রমবর্ধমান খরচের কারণে সেই শোলার জায়গা নিয়েছে আর্ট পেপার। পরিবর্তন এসেছে উপকরণে, কিন্তু বদলায়নি শিল্পের স্মৃতি।



এই ধারার শিল্পী লক্ষ্মণ মালাকারের গল্পটি যেন এই শিল্পেরই প্রতিচ্ছবি। মাত্র ন’বছর বয়সে বাবার কাছ থেকে হাতে-কলমে কাজ শেখা। সেই শিক্ষাই পরে হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের অবলম্বন। এখন বয়স ৫৬। একটি হাত অকেজো হওয়ার পরেও তিনি থামেননি। বরং প্রতিদিনের শ্রমের মধ্যে দিয়ে নিজের শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন।


মনসা পট তাঁর একমাত্র কাজ নয়। শোলায় তিনি তৈরি করেন কালিমুখা, মাসান ঠাকুর, টোপর, দেবদেবীর অলংকার, ফুলসহ নানা সামগ্রী। তাঁর তৈরি পট কোচবিহারের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছয় শিলিগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি এবং অসমেও। বছরে প্রায় দু’হাজার পট তৈরি করার কথা জানান তিনি। সংখ্যাটি শুনলে বোঝা যায়, এর পিছনে কতখানি শ্রম রয়েছে। আর সেই শ্রমের বড় অংশই আসে পরিবারের সদস্যদের সম্মিলিত সহযোগিতা থেকে।তবে এই শিল্পের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সংখ্যার মতো উজ্জ্বল নয়।

একদিকে বিপুল পরিমাণে পট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে শিল্পীরা এখনও বৃহত্তর বাজারের নাগাল পাচ্ছেন না। শোলার দাম বেড়েছে, বাজারের চাহিদা সীমিত, নতুন প্রজন্ম অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। ফলে শিল্পটি বেঁচে থাকলেও তার উত্তরাধিকার কতদিন টিকে থাকবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।



মনসা পটকে বুঝতে গেলে শুধু ছবিটির দিকে তাকালে হবে না। তার সঙ্গে যুক্ত লোকবিশ্বাসটিকেও বুঝতে হবে।

মা মনসা বাংলার লোকজীবনে কেবল একজন দেবী নন। সাপ, উর্বরতা, রোগ-ব্যাধি, কৃষিজীবন এবং মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তার সঙ্গে তাঁর বিশ্বাসের সম্পর্ক বহু পুরনো। মনসামঙ্গলের কাহিনিতে দেবীর সঙ্গে চাঁদ সওদাগরের সংঘাত যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে বেহুলার অবিচল যাত্রা। সেই কাহিনির নানা চরিত্র ও প্রতীকই লোকশিল্পের শরীরে নতুন জীবন পেয়েছে।ভেটাগুড়ির পটে সেই কাহিনি কখনও সরাসরি, কখনও প্রতীকের মাধ্যমে উপস্থিত হয়।


বিষহরি পটের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে তার ত্রিকোণ বিন্যাস। কেন্দ্রে দেবী মনসা। মাথার ওপর মহাদেব, পাশে হাঁস, হাতে সাপ এবং অভয় মুদ্রা। মাথার শীর্ষে আবার শোলায় তৈরি সাপ। দেবীর মুখের গড়নে কোনও অলৌকিক, দূরবর্তী দেবীমূর্তির বদলে যেন দেখা যায় পরিচিত এক বাঙালি নারীর মুখ। মাতৃত্ব, মমতা ও শক্তি একই সঙ্গে ধরা পড়ে সেই অবয়বে।এই পটের আর একটি পরিচয়ও আছে—পদ্মা পট। বছরের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে তার চাহিদা থাকাও প্রমাণ করে, এটি কেবল একটি পুজোর সামগ্রী হয়ে সীমাবদ্ধ নেই।

কানি বিষহরি পটে আবার দেবীর উপস্থাপন ভিন্ন। মুখটি সম্পূর্ণ নয়, পাশ ফিরে থাকা মুখের রেখায় ধরা পড়ে দেবীর অবয়ব। ঘোমটা দেওয়া বাঙালি বধূর মতো তাঁর উপস্থিতি। হাতে পদ্ম, নীচে হাঁস, সিঁথির কাছে ফণা তোলা সাপ। চোখের দৃষ্টিতে শান্তি, মুখে এক ধরনের স্থিরতা।

এই ছবির দিকে তাকালে দেবী ও গ্রামবাংলার নারীর মধ্যে দূরত্বটা যেন কমে আসে। মনসা এখানে কেবল পূজিত দেবতা নন; তিনি হয়ে ওঠেন লোকসমাজের চেনা নারীরই এক শক্তিশালী প্রতিরূপ।



আর একটি পটে আবার ফিরে আসে মনসামঙ্গলের বিস্তৃত কাহিনি। চাঁদ সওদাগর ও তাঁর সহযোগীরা বাণিজ্যতরীতে, অন্যদিকে লখিন্দরকে ফিরে পাওয়ার প্রার্থনায় বেহুলা। তাদের মাঝখানে পদ্মের ওপর দেবীর আবির্ভাব। তাঁকে ঘিরে অষ্টনাগ। মাথার ওপর মহাদেব। এই একটিমাত্র পটের মধ্যে যেন একটি সম্পূর্ণ আখ্যানকে ধরে রাখা হয়েছে।এখানেই লোকশিল্পের শক্তি।

যে মানুষ হয়তো মনসামঙ্গল কাব্যের দীর্ঘ কাহিনি পড়েননি, তিনিও ছবির পর ছবি দেখে গল্পটির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। পট তাই এক অর্থে দৃশ্যমান লোকসাহিত্য। লিখিত শব্দের বদলে রেখা, রং, প্রতীক ও চরিত্রের মাধ্যমে গল্পটি পৌঁছে যায় মানুষের কাছে।

এই পাড়ার প্রবীণ শিল্পী ধীরেন্দ্র মালাকারের জীবনের সঙ্গেও এই শিল্পের দীর্ঘ সম্পর্ক। ৬৪ বছর বয়সেও নিজের ছোট্ট ঘরে বসে তিনি মনসার পট তৈরি করে চলেছেন। কোচবিহারের মদনমোহন মন্দিরে শ্রাবণ সংক্রান্তির মনসা পুজোর জন্যও তাঁর তৈরি পট ব্যবহৃত হয়।

মন্দিরের জন্য তৈরি পটের আকারও সাধারণ পটের তুলনায় অনেক বড়। সর্বোচ্চ উচ্চতা প্রায় সাড়ে সাত ফুট পর্যন্ত হয়। বছরের শুরুতেই মন্দির কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজের চুক্তি হয়, তারপর শুরু হয় নির্মাণ।

কিন্তু এত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত শিল্পীর জীবনযাপন খুব স্বচ্ছল নয়। সরকারি শিল্পীভাতা তাঁর পাওয়া হয়নি, বার্ধক্যভাতাও জোটেনি। তার থেকেও বড় দুঃখ—পরবর্তী প্রজন্ম এই পেশায় থাকতে চায়নি।

এই একই সংকটের কথা উঠে আসে এই পাড়ার প্রবীণ শিল্পী জ্ঞানেন্দ্রচন্দ্র মালাকারের কথাতেও। তাঁর শোলা শিল্পকর্মের জন্য ১৯৯৩ ও ১৯৯৫ সালে জাতীয় পুরস্কার এসেছে। তাঁর শিল্পকর্ম দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছেছে। শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। একসময় কলকাতার হস্তশিল্প মেলাতেও তাঁর তৈরি শোলার কাজ প্রদর্শিত হয়েছে।



২০২৩ সালে শেষবার মনসা পট তৈরি করেছেন তিনি। এখন বার্ধক্যের কারণে শিল্পচর্চা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।

তাঁর অভিজ্ঞতায় ভেটাগুড়ির লোকশিল্পের জগৎ আরও বিস্তৃত। মনসা পটের পাশাপাশি এখানে তৈরি হয় করণ্ডি, মঞ্জুষ, সাইটোল এবং নানা ধরনের শোলার শিল্পকর্ম। কালিমুখাও এই অঞ্চলের একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্য। নতুন ধান ঘরে ওঠার সময় কালী মুখোশ পরে নৃত্যের যে লোকাচার প্রচলিত, তার সঙ্গেও এই শিল্পের যোগ রয়েছে।

অর্থাৎ ভেটাগুড়ির শোলা কোনও একটি দেবতার প্রতিমা বা পট তৈরির উপকরণ মাত্র নয়। এটি একটি সম্পূর্ণ লোকজ সংস্কৃতির অংশ।

এই শিল্পের ইতিহাসে পূর্ববঙ্গের স্মৃতিও রয়েছে। এই পাড়ার বহু মালাকার পরিবারের আদি নিবাস রংপুর। সীমান্ত বদলেছে, মানুষ স্থানান্তরিত হয়েছে, জীবন বদলেছে। কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে আসা শিল্পের স্মৃতি রয়ে গেছে। নতুন ভূখণ্ডে এসে সেই স্মৃতিই ধীরে ধীরে নতুন রূপে বেঁচে থেকেছে।

আজও এই পটের বাজার রয়েছে। দুলাল মালাকারের তৈরি পট যায় রায়গঞ্জ, ইসলামপুর, কালিয়াগঞ্জ, মালদহ, কোচবিহার, ধূপগুড়ি, মাথাভাঙ্গা ও জলপাইগুড়িতে। অর্থাৎ চাহিদা একেবারে নেই, এমন নয়। সমস্যা হল সেই চাহিদাকে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকাঠামো এখনও তৈরি হয়নি।

লোকশিল্পের ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা অনেক সময় শিল্পের মানের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে প্রচার, বিপণন, সংগ্রাহক, প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর। সেই জায়গাতেই কোচবিহারের মনসা পট এখনও পিছিয়ে।

পিংলার নয়াগ্রামের পটচিত্র আজ বাংলার লোকশিল্পের অন্যতম পরিচিত নাম। বিষ্ণুপুরের দুর্গাপটও নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করেছে। সেই তুলনায় ভেটাগুড়ির মনসা পট এখনও অনেকটা অচেনা। অথচ এর শিল্পভাষা কোনও অংশে কম সমৃদ্ধ নয়।

বরং এর বিশেষত্ব অন্যত্র। এই পটের সঙ্গে শিল্পীর ঘর, পারিবারিক পুজো, গ্রামীণ বিশ্বাস এবং স্থানীয় উৎসব একসঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। ফলে এটি গ্যালারির জন্য তৈরি কোনও বিচ্ছিন্ন শিল্পকর্ম নয়; এটি এখনও মানুষের জীবনের মধ্যে ব্যবহৃত একটি জীবন্ত ঐতিহ্য।তবু সেই জীবন্ত ঐতিহ্যই ধীরে ধীরে বিপন্ন হচ্ছে।

একজন শিল্পী যখন বার্ধক্যে পৌঁছে কাজ ছেড়ে দেন এবং তাঁর সন্তান সেই কাজ গ্রহণ করেন না, তখন শুধু একটি পরিবারের পেশা বদলায় না—একটি শিল্পরীতির ধারাবাহিকতাও দুর্বল হয়ে পড়ে। আর্থিক নিশ্চয়তা না থাকলে তরুণ প্রজন্মের কাছে এই পেশা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে না। ফলে শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে কয়েকজন প্রবীণ শিল্পীর হাতে।



কোচবিহারের মনসা পটের গল্প তাই কেবল অতীতের গল্প নয়। এটি বর্তমানেরও গল্প—একটি শিল্প কীভাবে এখনও বেঁচে আছে, অথচ বেঁচে থাকার জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করছে।

শোলার পাতলা শরীরের ওপর আঁকা দেবীর মুখ হয়তো খুব সহজেই কোনও গ্রামীণ পুজোর পর বিসর্জিত বা সরিয়ে রাখা হয়। কিন্তু সেই ছবির পেছনে থাকে বহু প্রজন্মের স্মৃতি। থাকে বাবা থেকে ছেলের হাতে পৌঁছে যাওয়া রেখার ভাষা। থাকে নদী, কৃষি, লোকবিশ্বাস ও মঙ্গলকাব্যের উত্তরাধিকার।

তাই ভেটাগুড়ির মনসা পটকে শুধু ‘প্রান্তিক লোকশিল্প’ বলে দেখলে তার আসল গুরুত্ব ধরা পড়ে না। এটি বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতির এমন এক অধ্যায়, যার পাতাগুলি এখনও লেখা হচ্ছে।

শিল্পীরা যতদিন তুলিতে রং তুলবেন, ততদিন সেই অধ্যায়ও বেঁচে থাকবে। কিন্তু তাঁদের হাতের পরবর্তী হাতটি যদি আর এগিয়ে না আসে, তবে একদিন হয়তো পটটি থেকে যাবে, দেবীর মুখটিও থেকে যাবে—শুধু হারিয়ে যাবে সেই মুখ আঁকার মানুষটি।

আর তখন সাপের ফণায়, পদ্মের পাপড়িতে, বেহুলার প্রার্থনায় কিংবা মনসার অভয় মুদ্রায় যে উত্তরবঙ্গের বহু শতকের লোকস্মৃতি জমে আছে, তার অনেকটাই হয়তো আর পড়ে নেওয়া যাবে না।


মেঘের আড়ালে মাওফ্লাং


নিজস্ব প্রতিনিধি


মেঘালয়ের পাহাড়ে এমন কিছু জায়গা আছে, যেখানে পৌঁছনোর পর মনে হয়, মানচিত্রের একটি বিন্দুতে নয়, বরং বহু পুরনো কোনো গল্পের ভিতরে এসে দাঁড়ানো গেছে। পাহাড়ের গায়ে মেঘ নেমে আসে, বৃষ্টির জল পাথর ভিজিয়ে দেয়, অরণ্যের ভিতর দিনের আলোও কেমন ম্লান হয়ে থাকে। আর সেই প্রকৃতির মাঝেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকে কিছু বিশ্বাস, কিছু নিষেধ, কিছু কিংবদন্তি।

মাওফ্লাং তেমনই এক জায়গা। শিলং থেকে মাত্র প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরের এই পাহাড়ি জনপদকে প্রথম দেখায় খুব সাধারণ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু যত গভীরে যাওয়া যায়, ততই খুলে যায় তার অন্য পরিচয়। খাসি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, তাদের প্রকৃতিনির্ভর বিশ্বাস, শতাব্দীপ্রাচীন পবিত্র বনভূমি, প্রাচীন পাথরের স্মৃতি আর ইতিহাসের পুরনো পথ—সব মিলিয়ে মাওফ্লাং যেন একই সঙ্গে একটি গ্রাম, একটি জীবন্ত সংস্কৃতির ভাণ্ডার এবং একটি রহস্যময় ভূখণ্ড।


শিলং থেকে মাওফ্লাংয়ের পথে খুব বেশি সময় লাগে না। অথচ শহরের কোলাহল পেরিয়ে পাহাড়ি রাস্তায় যত এগোনো যায়, ততই বদলে যায় চারপাশ। ব্যস্ততা কমে আসে। সবুজ বাড়তে থাকে। পাহাড় আর মেঘ একে অপরের কাছাকাছি চলে আসে। আবহাওয়াও এখানে নিজের খেয়ালে বদলায়। কখনও রোদ, কখনও হঠাৎ বৃষ্টি, আবার কিছুক্ষণ পরেই মেঘের আস্তরণ। মাওফ্লাংয়ের জীবনও যেন সেই প্রকৃতির ছন্দেই চলে। এখানে কোনো বাড়িতে অনুষ্ঠান থাকলে সেটি শুধু সেই পরিবারের ব্যক্তিগত আয়োজন থাকে না। আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার রীতি রয়েছে গোটা গ্রামের মধ্যে। আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি প্রতিবেশী এবং অতিথিরাও সেই আয়োজনে অংশ নেন। এমনকি বিশেষ অনুষ্ঠানের দিনে অন্য বাড়িগুলিতে উনুন না জ্বালানোর রীতিও রয়েছে—কারণ সেদিন গ্রামের মানুষ একসঙ্গে খাবার ভাগ করে নেন।



খাসি পরিবারের ঘরোয়া রান্নার মধ্যে দিয়ে সেই সংস্কৃতির আরেকটি পরিচয় পাওয়া যায়। জাদোহ, দোহ খলিহ, টুং রিম্বাইয়ের মতো স্থানীয় খাবার শুধু রসনার বিষয় নয়; এগুলির মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের নিজস্ব ইতিহাস। কিন্তু মাওফ্লাংয়ের সবচেয়ে আশ্চর্য পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে গ্রামের কাছের সেই অরণ্যে। মাওফ্লাংয়ের পবিত্র বন। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই বনভূমি লাবাসার অধিষ্ঠানস্থল। প্রায় ১৯২ একর বিস্তৃত এই অরণ্য আটশো বছরেরও বেশি পুরনো বলে পরিচিত। এখানে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে প্রাচীন অখণ্ড পাথরের সারি। খাসি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সামাজিক ইতিহাসের সঙ্গে এই পাথরগুলির সম্পর্ক গভীর। এই বন অন্য সাধারণ জঙ্গলের মতো নয়।

এখানে প্রকৃতির নিজস্ব একটি আইন রয়েছে—যে আইন লেখা নেই কোনো সরকারি ফলকে, অথচ স্থানীয় মানুষের কাছে যার গুরুত্ব অপরিসীম। বনের ভিতর থেকে কিছুই বাইরে নিয়ে যাওয়া যাবে না। একটি পাতা নয়। একটি ফুল নয়। এমনকি মাটিতে পড়ে থাকা কোনো প্রাকৃতিক উপাদানও নয়। আবার বাইরের পৃথিবীর কোনো জিনিসও অরণ্যের ভিতরে ফেলে রাখা নিষিদ্ধ। এই নিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লাবাসাকে ঘিরে স্থানীয় বিশ্বাস। কেউ সেই নিষেধ অমান্য করলে তার ওপর লাবাসার অভিশাপ নেমে আসতে পারে—এমন ধারণা বহুদিন ধরে প্রচলিত।

আধুনিক মানুষের কাছে এই বিশ্বাস হয়তো লোককথার অংশ। কিন্তু মাওফ্লাংয়ের অরণ্যের ভিতর দাঁড়িয়ে বিষয়টির অন্য একটি অর্থও ধরা পড়ে। এই বিশ্বাসই প্রকৃতিকে রক্ষা করার এক অদৃশ্য সামাজিক ব্যবস্থা হয়ে উঠেছে। অরণ্যের ভিতরে গাছের বয়স যেন চোখেই বোঝা যায়। বিশাল বৃক্ষের ডালপালা একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে উপরে তৈরি করেছে ঘন ছাদ। ফলে দিনের আলো মাটিতে এসে পৌঁছয় ক্ষীণ হয়ে। বাতাসে মিশে থাকে ভেজা মাটি, শ্যাওলা, পচা পাতার গন্ধ। বৃষ্টিভেজা পরিবেশে বনভূমির প্রতিটি কোণ আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে।



এখানে পাওয়া যায় নানা দুর্লভ ভেষজ উদ্ভিদ। রয়েছে রুদ্রাক্ষের গাছও। বাইরে যার ফল সংগ্রহ করতে মানুষ আগ্রহী, এই অরণ্যে সেই রুদ্রাক্ষ গাছের নীচেই পড়ে থাকতে দেখা যায় ফল। তবু সেগুলি সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা নেই। কারণ বন থেকে কিছু নিয়ে বেরিয়ে যাওয়াই নিষিদ্ধ। অরণ্যের আরও গভীরে রয়েছে আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত পাথরের বেদি। স্থানীয় ইতিহাস ও বিশ্বাস অনুযায়ী, অতীতে রাজা এবং গোষ্ঠিপ্রধানদের উপস্থিতিতে এখানে বলির প্রথা ছিল। এখনও বিশেষ কিছু দিনে স্থানীয় মানুষ এই পবিত্র স্থানে একত্রিত হয়ে প্রার্থনা করেন। খাসি জনগোষ্ঠীর প্রকৃতিনির্ভর বিশ্বাসের সঙ্গে এই বনভূমির সম্পর্ক তাই নিছক ধর্মীয় নয়। প্রকৃতি তাঁদের সংস্কৃতির অংশ, তাঁদের সামাজিক স্মৃতির অংশ।

অরণ্যের অন্যত্র দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল মনোলিথগুলিও সেই অতীতের সাক্ষ্য বহন করে। পূর্বপুরুষদের স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত এই পাথরগুলি বছরের পর বছর ধরে বৃষ্টি, কুয়াশা আর আর্দ্রতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। শরীরে জমেছে শ্যাওলা, বদলেছে রং, কিন্তু তাদের অস্তিত্ব মুছে যায়নি। দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কোনো হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার অবশেষ ছড়িয়ে রয়েছে জঙ্গলের মধ্যে। কিন্তু এ সভ্যতা হারিয়ে যায়নি। তার স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে মানুষের বিশ্বাসে, আচার-অনুষ্ঠানে এবং প্রকৃতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে।

পবিত্র বনভূমির পাশেই রয়েছে খাসি হেরিটেজ ভিলেজ। খাসি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ও স্থাপত্যকে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে তৈরি এই সাংস্কৃতিক পরিসরে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী খাসি বাড়ির আদলে তৈরি কাঠামো, মনোলিথ, পুরনো সভাস্থল এবং লোকজ সংস্কৃতির নানা নিদর্শন। বিকেলের দিকে এই জায়গাটির চেহারাই বদলে যায়।



পাহাড়ের গায়ে সন্ধের আলো নেমে আসে। স্থানীয় মানুষজন জড়ো হন। কেউ গল্প করেন, কেউ নিজেদের মধ্যে সময় কাটান। ছোটরা তীর-ধনুক নিয়ে খেলায় মেতে ওঠে। তারপর অন্ধকার ঘনিয়ে আসার আগেই ধীরে ধীরে সবাই বাড়ির পথে ফিরে যায়। পাহাড়ি গ্রামের দিন যেন অন্ধকারের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। আর তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অরণ্য তখন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। মাওফ্লাংয়ের গল্প অবশ্য শুধু এই বনেই শেষ হয় না।

এই অঞ্চলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ ডেভিড স্কট ট্রেইল। প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাহাড়ি পথের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে উনিশ শতকের ইতিহাস। ব্রিটিশ প্রশাসক ডেভিড স্কটের নামের সঙ্গে যুক্ত এই পুরনো পথ একসময় বাণিজ্যিক যাতায়াতের কাজে ব্যবহৃত হতো। ঘোড়া ও খচ্চরের সাহায্যে মালপত্র পরিবহণের জন্য তৈরি হয়েছিল পথটির বিভিন্ন অংশ।

আজ সেই পুরনো পথ ট্রেকারদের আকর্ষণ করে অন্য কারণে। পাহাড়ি ঢাল, নদী, উপত্যকা, পাইনবন এবং পুরনো পাথরের সেতু—সব মিলিয়ে এই পথ একই সঙ্গে প্রকৃতি এবং ইতিহাসের অভিজ্ঞতা দেয়। কোথাও বর্তমানের সবুজ পাহাড়, কোথাও আবার পুরনো পাথরের কাঠামো মনে করিয়ে দেয় বহু দশক আগের যাতায়াতের কথা। তবে ডেভিড স্কট ট্রেইলের পাশেই এমন কিছু পথ রয়েছে, যেখানে পর্যটকদের ভিড় প্রায় নেই।


একটি মেঠো রাস্তা মূল ট্রেইল থেকে আলাদা হয়ে চলে গেছে জঙ্গলের দিকে। প্রথমে দু-একটি বাড়ি, সব্জির বাগান, নানা ধরনের ফুলগাছ। তারপর ধীরে ধীরে মানুষের বসতির চিহ্ন হারিয়ে যায়। পথটি ঢুকে পড়ে আরও নির্জন অঞ্চলে। ঝোপঝাড় আর বুনো গাছপালার মাঝ দিয়ে এগোতে এগোতে একসময় চোখে পড়ে চারটি সমাধি। তিনটি ছোট। একটি তুলনায় বড়। চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে নাম না জানা ফুল। কোনো ব্যস্ত পর্যটনস্থানের চিহ্ন নেই সেখানে। নেই মানুষের ভিড়, নেই দোকান, নেই কোনো পরিচিত শব্দ। পথের ধারে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা সেই সমাধিগুলি যেন অচেনা কোনো অতীতের পাহারাদার। তাঁরা কারা ছিলেন, কেন এই নির্জন জায়গায় তাঁদের সমাধি—তার উত্তর সহজে মেলে না। আর সেই অজানাটুকুই জায়গাটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে।



আরও কিছুটা এগিয়ে পথ উঠে যায় একটি উঁচু জায়গার দিকে। সেখান থেকে খুলে যায় পাহাড়ি উপত্যকার বিস্তৃত দৃশ্য। নিচে সবুজে ঢাকা পাহাড়। তার মাঝখানে বয়ে চলেছে অদ্ভুত রঙের একটি নদী।

দূরে মেঘের ছায়া কখনও পাহাড় ঢেকে দিচ্ছে, কখনও আবার রোদ এসে সবুজকে উজ্জ্বল করে তুলছে। এমন দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়, মাওফ্লাংকে কেবল একটি ভ্রমণস্থানের তালিকায় রেখে দেওয়া যায় না। এই অঞ্চলের সৌন্দর্য তার দৃশ্যের মধ্যে যেমন আছে, তেমনই আছে তার নীরবতার মধ্যে। তবে এই অচেনা পথের আকর্ষণের সঙ্গে সাবধানতার প্রয়োজনও রয়েছে। অনেক অংশে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। পর্যটকদের আনাগোনাও কম। ফলে পথ চিনে চলা এবং স্থানীয়দের পরামর্শ মেনে চলা জরুরি।

মাওফ্লাংয়ের আসল সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—এটি নিজেকে একবারে সম্পূর্ণ প্রকাশ করে না। একদিকে রয়েছে অতিথিকে আপন করে নেওয়া খাসি পরিবারগুলির উষ্ণতা। অন্যদিকে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন পবিত্র অরণ্যের নীরবতা। কোথাও পূর্বপুরুষের স্মৃতিবাহী পাথর, কোথাও পুরনো বাণিজ্যপথ, আবার কোথাও অচেনা সমাধি ঘেরা মেঠো রাস্তা।

সবকিছু মিলিয়ে মাওফ্লাং যেন সময়ের কয়েকটি স্তরকে পাশাপাশি রেখে দিয়েছে। আধুনিক পর্যটক সেখানে যায় পাহাড় দেখতে। কিন্তু পাহাড়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগেই তার সামনে এসে দাঁড়ায় একটি সংস্কৃতি। অরণ্যে প্রবেশ করলে দেখা যায় প্রকৃতির প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা। পুরনো পথ ধরে হাঁটলে সামনে আসে ইতিহাস। আর নির্জন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সমাধিগুলি মনে করিয়ে দেয়—প্রতিটি পাহাড়ি ভূখণ্ডেরই কিছু গল্প থাকে, যার সবকটি হয়তো কখনও জানা যায় না।



মেঘালয়ের মেঘ হয়তো একদিন সরে যাবে। রোদ এসে ভিজে পাথর শুকিয়ে দেবে। পর্যটকেরা আসবে, ছবি তুলবে, আবার ফিরে যাবে। কিন্তু মাওফ্লাংয়ের পবিত্র বন তার নিজের নিয়মেই থেকে যাবে। গাছের পাতায় বৃষ্টির শব্দ হবে। শ্যাওলা আরও ঘন হবে। রুদ্রাক্ষ ঝরে পড়বে মাটিতে। প্রাচীন পাথরগুলি দাঁড়িয়ে থাকবে একইভাবে। আর স্থানীয় মানুষের বিশ্বাসে লাবাসা হয়তো এখনও পাহারা দেবেন তাঁর অরণ্য। সেই কারণেই মাওফ্লাং শুধু মেঘে ঢাকা পাহাড়ের একটি সুন্দর গ্রাম নয়। এটি এমন এক জায়গা, যেখানে প্রকৃতি, ইতিহাস, লোকবিশ্বাস এবং মানুষের জীবন একে অপরের থেকে আলাদা নয়। আর সেই অরণ্যের সবচেয়ে পুরনো, সবচেয়ে নীরব নিয়মটি হয়তো আজও একই, বন থেকে কিছু নিয়ে যেও না। ফিরে যাও শুধু তার গল্পটা সঙ্গে নিয়ে।

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে!


নিজস্ব প্রতিনিধি


বর্ষা নামলেই একদিকে যেমন প্রকৃতি নতুন রূপে সেজে ওঠে, অন্যদিকে বাড়তে থাকে মশাবাহিত নানা রোগের আশঙ্কা। তার মধ্যে ডেঙ্গু অন্যতম। জমে থাকা জল, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিস্থিতির কারণে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হল সচেতনতা এবং নিয়মিত সতর্কতা।

ডেঙ্গু ছড়ায় মূলত আক্রান্ত এডিস মশার কামড়ে। এই মশা সাধারণত দিনের বেলাতেই বেশি সক্রিয় থাকে এবং বাড়ির আশপাশে জমে থাকা অল্প পরিমাণ পরিষ্কার জলেও বংশবিস্তার করতে পারে। ফুলের টবের নিচের পাত্র, ফেলে রাখা বোতল, বালতি, টায়ার, নারকেলের খোলা, ছাদের পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা এমন কোনও জায়গা যেখানে বৃষ্টির জল জমে থাকতে পারে—সবই হয়ে উঠতে পারে এডিস মশার প্রজননস্থল। ফলে শুধু নোংরা নর্দমা পরিষ্কার করলেই হবে না, বাড়ির ভিতর ও চারপাশে কোথাও জল জমে আছে কি না, তা নিয়মিত খেয়াল করা প্রয়োজন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রথম ধাপ তাই শুরু হোক নিজের বাড়ি থেকেই। কোনও পাত্রে জল জমে থাকলে তা ফেলে দিতে হবে এবং পাত্রটি ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। যে সমস্ত জলাধার খালি করা সম্ভব নয়, সেগুলি যথাযথভাবে ঢেকে রাখা জরুরি। ফুলের টব, ফ্রিজ বা অন্য কোনও পাত্রের নিচে জমে থাকা জলও নিয়মিত সরিয়ে ফেলতে হবে। ছাদ, বারান্দা, উঠোন এবং বাড়ির আশপাশে বৃষ্টির জল জমছে কি না, সেদিকেও নজর রাখা দরকার।



ধু বাড়ির বাইরে সতর্ক হলেই চলবে না। দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা প্রয়োজন। শরীরের যতটা সম্ভব অংশ ঢাকা পোশাক পরা, জানলা-দরজায় মশারি বা জাল ব্যবহার করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশু, প্রবীণ এবং যাঁরা দিনের বেশিরভাগ সময় বাড়িতে থাকেন, তাঁদের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি।

ডেঙ্গুর উপসর্গ অনেক সময় হঠাৎ করেই দেখা দিতে পারে। উচ্চ জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পিছনে ব্যথা, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব, দুর্বলতা কিংবা ত্বকে লালচে দাগ—এসব উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। তবে শুধু উপসর্গ দেখে ডেঙ্গু নিশ্চিত করা যায় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোই সঠিক পদ্ধতি।

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং শরীরে জলশূন্যতা না হতে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জল ও অন্যান্য তরল গ্রহণ করতে হয়। জ্বরের সময় নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ খাওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে কিছু ব্যথানাশক ওষুধ রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই জ্বর বা ডেঙ্গুর সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুধু জ্বর কমলেই যে বিপদ কেটে গেল, এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। জ্বর কমার সময় বা তার পরেও কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, বমি বা পায়খানায় রক্ত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা শরীরে তরল জমার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু ব্যক্তিগত দায়িত্ব নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। একটি বাড়ির পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি পাড়ার পরিত্যক্ত জমি, নির্মীয়মাণ বাড়ি, ছাদ, নর্দমা বা অন্যান্য জায়গায় জল জমে আছে কি না, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন ও পুরসভা মশা নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ নিলেও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া সেই উদ্যোগ সম্পূর্ণ কার্যকর করা কঠিন।



বিশেষ করে উৎসবের মরসুমে বাড়িঘর পরিষ্কার করার সময় ডেঙ্গু প্রতিরোধের বিষয়টিও মাথায় রাখা দরকার। পুজোর প্রস্তুতির পাশাপাশি একবার বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র এবং আশপাশের জায়গাগুলি ভালোভাবে দেখে নেওয়া যেতে পারে। সামান্য কয়েক মিনিটের সতর্কতাই মশার বংশবিস্তার রোধে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল মশার জন্মানোর সুযোগ কমিয়ে দেওয়া এবং মশার কামড় এড়িয়ে চলা। তাই জ্বরকে অবহেলা নয়, আবার অযথা আতঙ্কও নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, পরিচ্ছন্নতা এবং সময়মতো চিকিৎসা। নিজের বাড়ি থেকে শুরু হোক প্রতিরোধের এই ছোট ছোট উদ্যোগ। কারণ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সুরক্ষা কোনও একটি ওষুধ নয়, বরং সম্মিলিত সচেতনতা।

রবিবারের গল্প: চুড়ুইটিপির মাঠে


জয়ন্ত মাহাত


যেদিন জগতে সৃষ্টি হয়েছিল সেই দিন থেকে সূর্যদেব তাঁর আলোকরশ্মি দিয়ে এই ধরিত্রীকে লালন-পালন করছে। তাঁদের (সূর্য ও পৃথিবী) আয়ুকাল আমরা কেবলমাত্র অনুমানই করতে পারি, তাঁদের সঠিক বয়স আন্দাজ করবার ক্ষমতা মানবজাতির পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁদের কাছে মানুষের আয়ুকাল হল মাটিতে পড়ে থাকা ওই ক্ষুদ্র নুড়ির মতো। তবুও এই ক্ষুদ্র জীবনে মহাপুরুষেরা যে রূপ কর্ম করে গেছেন তা অতুলনীয় এবং তাঁদের কর্মের জন্য শতাব্দীর পর শতাব্দী আমরা তাঁদের স্মরণ করে থাকি।


এই ক্ষুদে জীবনে মানুষ না-জানি কত অদ্ভুত অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছে, কত নতুন স্থানে পাড়ি দিয়েছে, হয়তো স্বয়ং সূর্যরশ্মির কাছেও তা অজানা। অভিজ্ঞতাকে এখানে অদ্ভুত বললাম, কারণ বিশ্বের কোনো কোনো স্থানে এমন এমন সব ঘটনা ঘটে থাকে যা মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাদের কাছে এই ঘটনাগুলো বোধগম্যহীন, আবার কেউ কেউ যদি স্বচক্ষে এইসব ঘটনা দেখে থাকে তাহলে, সেই ঘটনাকে অবিশ্বাস্য, অলৌকিক ইত্যাদি বিশেষণ যুক্ত করে হৃদকোঠরে যেখানে তাদের উজ্জ্বল স্মৃতিগুলো বিরাজমান ঠিক তার উল্টো দিকে এই ঘটনাগুলোকে নিক্ষেপ করে। আর কালক্রমে এই ঘটনাগুলো মানুষের হৃদয়ে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সুতোর মধ্যভাগে ঝুলতে থাকে। যাই হোক যে যেখানে পারে ঝুলিয়ে রাখুক, আমি আর কথার পাঁচিল গড়ে ঘটনাটিকে প্রাসাদ বানাতে চাই না। তাই সোজাসুজি ঘটনাটার দিকে যাওয়া যাক।



মানবজাতি যাকে অলৌকিক বা অদ্ভুত ঘটনা বলে থাকে, সেইরকম ঘটনার সঙ্গে আমার একবার পরিচয় হয়েছিল। প্রাচীন ভগ্নাংশ অট্টালিকাকে, অশ্বত্থ বৃক্ষ যেমন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে এই ঘটনাটি সেইরকম আমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। জড়িয়ে আছে বলছি কারণ এখনও আমার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর এমনভাবে জড়িয়ে আছে যার জন্য আমাকে ইহলোক ত্যাগ করতে হয়েছে এবং পরলোক এসেও এর থেকে নিস্তার নেই।


নমস্কার, আমার নাম স্বর্গীয় শ্রী বীরেন্দ্রমোহন ঘোষ, নিবাস চুড়ুইটিপি নামক গ্রামে। একবার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে পালাশডিহি নামক এক গ্রামে গিয়েছিলাম, চুড়ুইটিপি থেকে আট-নয় ক্রোশ হবে। বলা বাহুল্য আমি সেখানে পায়ে হেঁটেই গিয়েছিলাম। সেখানে ভোজনের পরিমাণটা একটু বেশিই হয়ে গেছিল মানে গলা অব্দি খেয়েছিলাম। এতটা পথ হাঁটায় ক্লান্তিতেও ভুরিভোজের ফলে নিদ্রাদেবী আমার দুই চোখে ভর করেছিলেন এবং আমিও তাঁর নাম জপ করে নিদ্রা-সাগরের একেবারে গভীরে তলিয়ে গিয়েছিলাম। ঘুম ভাঙলে দেখি সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে আর আকাশ-বক্ষে দু-একটা মেঘ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। তাই আর বিলম্ব না করে শীঘ্রই বিদায় নিয়ে বাড়ির দিকে যাত্রা করলাম।


বেশ কিছুটা আসার পর প্রকৃতি তার চণ্ডাল রূপ ধারণ করল, শুরু হল প্রবল ঝড়-বৃষ্টি। সে কী ভীষণ বৃষ্টি আর তার সমানে পাল্লা দিয়ে ঝড় আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। সকালের রৌদ্রালোকিত পৃথিবী স্বপ্ন মনে হল। পৃথিবীর এই বিভীষিকাময় রূপ দেখে মনে হল আজ সমস্ত প্রাণীকুল পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এইরকম পরিস্থিতিতে পথ হাঁটাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়ল। এইবার বুঝি আমাকেও উড়িয়ে দেয় এইরকম ভাবনাও অন্তস্থলে উদয় হল। কিন্তু উপায় নেই দেখে ওইরকম অবস্থায় পথ চলতে লাগলাম। কিছুটা আসার পর দেখি একটা জীর্ণ পোড়া বাড়ি, কোনোরকমভাবে মাথাটা বাঁচানো যাবে। তাড়াতাড়ি সেই ভগ্ন বাড়িতে আশ্রয় নিলাম। ইতিমধ্যে মেঘ আরও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি ও গর্জন, যেন আমার এই পরিস্থিতিকে দেখে তর্জনী তুলে উপহাসের অট্টহাসিতে কাঁপিয়ে তুলছে পুরো দুনিয়া। এদিকে আমার সারা শরীর ভিজে শপশপ করছে, মাথা থেকে জলের ফোঁটা গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে। হঠাৎ এমন সময় মাটি কাঁপিয়ে পাশেই প্রচণ্ড গর্জনে একটি বাজ ভূমিতে অন্তর্ধান হল এবং সঙ্গে সঙ্গে আরও দু-তিনটি বাজ কানের পর্দা কম্পিত করে পাতালে প্রবেশ করল। মনে হল পৃথিবীকে আজ খণ্ড খণ্ড করে ফেলবে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় আমি এক কোণে আড়ষ্ট হয়ে ভয়কম্পিত চিত্তে হরিনাম শুরু করলাম। মেঘের গর্জন ও ঝড়ের তাণ্ডব মনে হল বাইরে দেবরাজ ইন্দ্র ও বৃত্রাসুরের ভয়ংকর যুদ্ধ বেঁধেছে। তারপর বেশ কিছুক্ষণ এই তাণ্ডব চলল। ঘণ্টা-দুই তুমুল এই যুদ্ধ চলার পর বৃত্রাসুর বধ হল। কিন্তু ইন্দ্রের রাগ তখনও কমেনি মাঝে মাঝে হুংকার দিচ্ছে। তবু বেরিয়ে পড়লাম...



দু মাইল হাঁটার পর পৌঁছালাম মহুলতলা গ্রামে, কাঁচা-পাকা বাড়ির মাঝে ফুট চারেক চওড়া আঁটেল মাটির পিচ্ছিল রাস্তা। জুতাগুলির ওজন ক্রমশ বেড়ে গেল এবং পথ চলা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ল। কাদাকে বল জুতোর তলায় থাকল না, প্রতি পদক্ষেপে একটুএকটু করে ক্রমশ পুরো পিঠ কাদার ফোঁটায় ভরে গেল। অতি কষ্টে গ্রামটি যখন অতিক্রম করলাম তখন আকাশে মেঘ কেটে গিয়ে শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশীর চাঁদ উঠেছে। আহা! কী অপরূপ জ্যোৎস্না। বৃষ্টির পর জ্যোৎস্নার রূপোলি আলোয় গাছপালা, মাঠ-ঘাট ও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক পরিবেশকে মায়াবী জগতে পরিণত করেছে। ওহ কী রূপ! যেন ছোটবেলায় দিদিমার কাছে শোনা রূপকথার গল্পের কোনো এক অজানা পথে দাঁড়িয়ে আছি। নিদ্রিত জগতের, নিস্তব্ধ পরিবেশে, নির্জন প্রকৃতির কোলে কে যেন দিব্য আলো ঢেলে দিয়ে কালের চক্রও যেন থেমে দেখে বৃষ্টিভেজা শিমুল, অর্জুন ও তাল বৃক্ষের সারি, দেখছে জ্যোৎস্নালোকিত ঘাটুপাতা, দূর্বাঘাসের বন, সর্পন্যায় বক্রপথ।


নিস্তব্ধ পথ চলতে চলতে নীরবতা ভেঙে মাঝে মাঝে একটা অজানা নিশাচর পাখি ডাকছে, আর প্রায়ই একটা কীটের আওয়াজ কানে আসছে, টুকরো টুকরো মেঘ চাঁদের সাথে লুকোচুরি খেলছে। এই সকল উপভোগ করতে করতে কখন যে নদীর তীরে এসে পড়লাম। নদীতে জল একটু বেড়েছে ধুতিটা একটু তুলে হাঁটু অব্দি জল পেরিয়ে পার হলাম চুড়ুইটিপির মাঠে। আর পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মনের ভেতর থেকে কে যেন ফিসফিস করে বললো, ‘ওহে পথিক, জ্যোৎস্নালোকিত নিঝুম, নিস্তব্ধ রাত্রিতে জনপ্রাণহীন চুড়ুইটিপির মাঠে তুমি একলা দাঁড়িয়ে, তুমি একলা দাঁড়িয়ে।’ এবার শিউরে উঠলাম।


চুড়ুইটিপির মাঠ হল প্রকাণ্ড জনমানবহীন বিস্তীর্ণ এলাকা। না সেইজন্য শিউরে উঠিনি। শিউরে উঠবার কারণ, আমাদের এলাকার সবচেয়ে বড়ো শ্মশান হল এটি। তিন-চারটি গ্রাম থেকে মৃতদেহ আসে এই চুড়ুইটিপির মাঠে। গ্রামবাসীরা কালে ভদ্রে এই পথ মাড়ায়, কেউ কেউ তো জীবিত অবস্থায় এখানে পা রাখেনি, একবারেই মৃত্যুর পর শব এখানে এসে থাকে; এমনই বদনাম জায়গাটার।



একবার এক বর্ষার সন্ধ্যায় চৌধুরী মশাইদের পুরোনো বাড়ির বারান্দার আড্ডায় বেশ কিছু এই শ্মশানকথিত গল্প শুনেছিলাম, বেশ লেগেছিল শুনতে। কিন্তু এখন, এখন তো আমি নিজে শ্রী বীরেন্দ্র ঘোষ নিস্তব্ধ পৃথিবীর জনমানবশূন্য এই চুড়ুইটিপির মহাশ্মশানে ন্যাড়া বাবলা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে। হঠাৎ যেন মনে হল কেউ বাবলা গাছ থেকে লাফ দিয়ে আমার কাঁধে বসল। ভয়ে কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমল, হাঁটুগুলো একটুএকটু কাঁপতে শুরু করল। হঠাৎ একটা পেঁচা মাথার উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে দূরে তেঁতুল গাছটায় মিলিয়ে গেল। দ্রুত পা চালাতে লাগলাম। তাড়াতাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে হবে, গতিক সুবিধার মনে হচ্ছে না। এখনো প্রায় দু মাইল পথ বাকি। কপাল ভালো এদিকে একফোঁটা ও বৃষ্টি না হওয়াতে শুকনো বালির উপর হনহনিয়ে হাঁটছি। হাঁটছি... হাঁটছি...


এমন সময় মনে হল এখানে যেন কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব নেই, কোনো কীটের কোনো রকম শব্দ নেই, বায়ু চলাচলও যেন বন্ধ, যেন বিশ্বের পরিবর্তনের গতি এখানে থেমে গেছে। জায়গাটা কেন আবছা অন্ধকারময়, জ্যোৎস্না যেন প্রবেশ করতে অক্ষম। পৃথিবীর বাস্তব জগতটা কুয়াশায় ঢাকা এখানে, যেন এখান থেকে শুরু হয়েছে প্রেতপুরীর জগৎ আর আমি সেই অজানা প্রেতপুরীর দ্বারে দাঁড়িয়ে।



হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দু-পা গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম, সঙ্গে সঙ্গে হৃদস্পন্দনও কিছুক্ষণ থেমে গেল, চোখের মণিগুলো একজায়গায় স্থির, নড়ছে না এতটুকু। কারণ মণির মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে অদূরে তেঁতুল গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা ধবধবে সাদা ধুতি পরিহিত এক মূর্তি। এবার ভয়ের মেঘ এসে আমার অবশিষ্ট সাহসটুকু ঢেকে দিল। একেবারে অকস্মাৎ মূর্তিটাকে দেখে আমিও অজান্তেই সেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে পড়লাম এবং সারা শরীর ভয়ে শিউরে উঠল, পাগুলো যেন অবশ হয়ে গেল। মূর্তি এখনও দাঁড়িয়ে, একটুও নড়চড় নেই, কিন্তু সেই নিস্পন্দ, নিশ্চল, প্রাণহীন মূর্তির তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আমার ওপর। সে কী চোখের দৃষ্টি! সেই দৃষ্টির বর্ণনা করার ভাষা আমার জানা নেই। মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে, কী করব কিছু বুঝতে পারছি না। আর বেশিক্ষণ এই মূর্তির দিকে তাকাতে পারছি না, মাথা ঝিমঝিম করছে। একবার মনে হল দিই দৌড়, কিন্তু ভাবিলাম দৌড়ে একে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব। উঃ... তার চোখ। না চোখ বললে ভুল হবে, যেন গুহার ভেতরে জ্বলন্ত অগ্নেয়পিণ্ড, যা আমার অবশিষ্ট সাহস, জ্ঞান, বুদ্ধি পুড়িয়ে ছাই করে ফেলছে।



এবার ত্রয়োদশীর জ্যোৎস্নায় চুড়ুইটিপির মাঠে তেঁতুল গাছটির তলায় স্পষ্ট দেখলাম মূর্তির পা যেন একটু নড়ল। না, কোনো ভুল নেই, সত্যিই নড়ল। একি! সর্বনাশ। মন্থরগতিতে দুটি জ্বলন্ত অগ্নেয়পিণ্ড ক্রমশ নিস্তব্ধে এগিয়ে আসছে আমার দিকে। আমার সারা শরীর অবশ, চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসছে, জ্ঞান হারাতে চলেছি বুঝলাম। কিন্তু না। এই দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে আগন্তুক একটা অতি গম্ভীর, কম্পিত ও ভাঙা ভাঙা গলায় কী একটা বলল যা আমার কানে পৌঁছানোর আগেই মিলিয়ে গেল। আমি কম্পিত গলায় বললাম—


—আজ্ঞে?


আবার ওদিক থেকে ভাঙা ভাঙা ও খনখনে গলায় বলল—


—কেঁবীরু নাঁ কি?


আমি অবাক হয়ে ভয়ে ভয়ে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটিকে দেখলাম। লোকটির পা থেকে মাথা পর্যন্ত সাদা ধুতিতে মোড়া। মুখের পুরো অংশটা ঢাকা কেবল ওই আগুনের ভাটার মতো চোখগুলি বাদে। আমার নাম আগন্তুকের মুখে শুনে খুব আশ্চর্য হলাম। কিছু বলবার আগেই আবার ধীরে ধীরে খনখনে ভারী গলায় বলল—


—আয়, আমার সাথে।


এই বলে লোকটি হাঁটতে শুরু করল। জিজ্ঞাসা করলাম—


—আজ্ঞে কোথায়? আর মশাই, আপনি আমার নাম কী করে জানলেন?


কোনো উত্তর নেই। শ্বেতবর্ণ পরিহিত মূর্তিটি, জ্যোৎস্নার রহস্যময় রাত্রিতে, বিক্ষিপ্ত জটাময়ী বিকট রাক্ষুসীর মতো থমকে থাকা বাবলা গাছদের তলা দিয়ে রূপোলি বালুকাময়ের উপর দিয়ে নিঃশব্দে হাঁটছে। লক্ষ্য করলাম লোকটির চালচলন, কথাবার্তা যেন কেমন কেমন। যে কেউ এই ব্যক্তিকে দেখে অত্যন্ত ভয় পাবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু কি জানি আমার কেন এই অজ্ঞাত, কুজ্ঝটিকায় মোড়া লোকটির প্রতি একটা অজানা কৌতূহল হচ্ছে।


কিছু দূর যাওয়ার পর লোকটি এবার বললেন—


—যাইতে হইবে একটা মড়া আছে সৎকার করিবার কেহ নাই, শীঘ্রই চল।

মঁড়া! কোথায় মঁড়া? কার মঁড়া?


এক রাশ প্রশ্ন মনে ভিড় করল। কিন্তু এই অকস্মাৎ উদীয়মান রহস্যময় লোকটি চুপচাপ কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা চলতে লাগল। অগত্যা মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমিও চললাম তার পিছু পিছু। তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, আমার মুখ থেকে কথাগুলো যেন ওই লোকটার মতো নাকি সুরে বের হল। হয়তো ভয়ে তার মতো আমারও ওইরকম কথাগুলো শোনা যাচ্ছে, কিন্তু একে তো আমার ভয় করছে না, তাহলে ..... কী যে হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ মনে হল, আরে, আমায় তো বাড়ি ফিরতে হবে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল আমার বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা করছে না, কী একটা অদৃশ্য বলের জন্য আমি আর বাড়ির প্রতি কোনো টানই অনুভব করছি না।


গন্তব্যে পৌঁছে লোকটি তার মাথা থেকে কাপড় নামিয়ে বললেন—


—ওঁইখান টাঁই বোস্। এঁদিকে দেঁকি কঁদ্দুর কিঁকঁরে চে এঁরা।


দেখলাম লোকটার মাথাটা পাকাতালের মতো টাক, শরীরে মাংস নেই বললেই চলে, যেন কঙ্কালের উপর কেউ চামড়া জড়িয়ে দিয়েছে। তাঁর বয়স তো আন্দাজ ৮০'র নিচে হবে না। তবে এবার আর তাঁর চোখের দিকে তাকাতে ভয় করছে না। কিন্তু জানি না কেন বৃদ্ধকে আমার চেনা চেনা মনে হল, এ মুখ যেন কোথায় দেখেছি। তবে কোথায় দেখেছি, কোথায় দেখেছি তা আর মনে করতে পারছি না।


বৃদ্ধ আমায় বাবলা তলায় বসিয়ে একটি বেঁটে মত লোকের সঙ্গে কোথায় চলে গেল। ইতিমধ্যে দু-জন যেন শূন্য থেকে উদয় হয়ে চিতা সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর ঠিক চিতার কাছে ছোট্ট খাটের উপর একটা শব রাখা আছে দেখলাম। আরেকজন একটু দূরে গামছা পেতে খৈনি মলছে আর আমার দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে ওকে জিজ্ঞাসা করলাম—


—আজ্ঞে আপনি কী শবদাহ করতে এসেছেন?


মুখে খৈনিটা পুরে বলল—


—হ্যাঁ।


—আপনার কে হন যিনি মারা গেছেন?


এবার লোকটা কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল—


—কেউ না।


—তাহলে?


—তাহলে আবার চক্কোতি মশাই বললেন যে যেতে হবে তাই এলুম।


বুঝলাম ওই বৃদ্ধই চক্কোতি মশাই। তারপর আরেকটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, এদের কারোর কাছে কোনো আলো নেই, জ্যোৎস্নার ওই আবছা আলোতেই সকলে কাজ করছে। যাই হোক এতকিছু অদ্ভুত ব্যাপার দেখার ফলে এখন এগুলোকে স্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে।


কিছুক্ষণ পর চক্কোতি মশাই আরও ৪-৫ জন নিয়ে ফিরে এসে তাদের কী যেন বোঝাতে লাগল এবং তারা মাঝে মাঝে বাতাসে দোদুল্যমান ঘাসফুলের মতো মাথা নাড়তে লাগল। এদিকে মাথার উপর দ্বিজরাজ তাঁর সিংহাসন থেকে এই কার্যক্রম খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে, উত্তরাকাশে সপ্তর্ষিমণ্ডল আজ যেন একটু বেশিই উজ্জ্বল, নদীর ওপার থেকে কামিনী ও স্বর্ণচাঁপা ফুলের সুবাস মাঝে মাঝে বাতাসে ভেসে আসছে, পশ্চিমদিক থেকে মাঝে মাঝে একটা পেঁচার ডাক শোনা যাচ্ছে, পূর্ব আকাশ থেকে মেঘগুলো কখন যেন অন্যত্র পাড়ি দিয়েছে। এই রূপথার স্বপ্নরাজ্যে নক্ষত্র-পূর্ণ আকাশের নিচে জ্যোৎস্নামাখা বালির ওপর দাঁড়িয়ে আমি বাস্তব দুনিয়ার কথা একেবারেই ভুলে গিয়েেছি।


একসময় চক্কোতি মশাই ডাকলেন—


—আয় বীরু শোন এদিকে।


—বলুন।


—শোন বাবা।


বলে বাঁশপাতার মতো তাঁর আঙুলগুলি শবদেহের দিকে মেলে ধরে বলল।


—এর মুখাগ্নি তোকে ই করতে হবে। তুই ছাড়া ওঁর আর কেউ নাই।


বলে কী লোকটা! একটুরাগের মাথায় বললাম—


—এ আপনি কী বলছেন, আমি...


—শোন বীরু, আমি জানি এখন তোর মনে অনেক প্রশ্ন, বলব বলব তোকে পরে সব বলব, এখন তুই কাজটা সেরে দে বাবা।


অগত্যা রাজি হলাম। ভাবলাম সৎকর্মটা করে যদি কিঞ্চিৎ পুণ্য লাভ হয় ক্ষতি কী। চক্কোতি মশাই এবার আগুনের দণ্ডটা জ্বেলে আমার হাতে দিয়ে বললেন—


—এ অনেক পুণ্যের কাজ বীরু।


আর তখনই সেই জ্বলন্ত অগ্নিশিখায় পরিষ্কার দেখলাম বৃদ্ধের মুখখানি। জ্যান্ত মানুষের মুখ এইরকম হতে পারে না, মুখখানা দেখে একটু ভয় পেলেও আমি আশ্চর্যই হলাম বেশি, কারণ তার মুখখানা আমার ভীষণ চেনা চেনা লাগছে। তবে এখনও ঠিকঠাক মনে করতে পারলাম না। ভাবতে ভাবতে আগুন নিয়ে চিতার কাছে আসতেই মনে পড়ে গেল বৃদ্ধের মুখখানা। আর সঙ্গে সঙ্গেই ভয়ে আমার সারা শরীর শিহরিত হয়ে উঠল। হাত পাঁচেক পিছনে যে সাদা ধুতি মোড়া কঙ্কালসার বৃদ্ধ মূর্তি দাঁড়িয়ে, তিনি হলেন আমাদের গ্রামের ঘোশাল পাড়ার উমাপতি চক্রবর্তী, বছর তিন আগে কলেরায় গত হয়েছেন।


এইবার পেছন দিক থেকে ঠনঠনে চাপা হাসি কানে প্রবেশ করল, পেতলের ওপর হাতুড়ি পেটালে যেমন শব্দ হয় অনেকটা ওইরকম। জ্ঞানবুদ্ধির বাইরে কোথা থেকে জানি না কেউ যেন ফিসফিস করে বলে গেল—‘ওহে তুমি জনমানবহীন চুড়ুইটিপির মহাশ্মশানে বিভীষিকাময় মধ্যরাত্রিতে একাদের সাথে দাঁড়িয়ে?’


মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। এমন সময় আমার চোখ গিয়ে পড়ল চিতায় শায়িত শবের ওপর; এ কে শুয়ে আছে চিতার ওপর! আমার হাত থেকে অগ্নিদণ্ড খসে পড়ল। এবার আতঙ্কে সারা দেহ থরথর করে কেঁপে উঠল, আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। ঠিক চোখ বুজবার আগে দেখলাম, চিতা থেকে যে মড়াটা উঠে বসল, সে আর কেউ না, আমি স্বয়ং বীরেন্দ্রমোহন ঘোষ।


ঠিক জানি না কতক্ষণ বা কতদিন হবে, চক্কোতি মশাইয়ের ডাকে চোখ খুলল, চোখ খুলে দেখি ঘন অন্ধকারে চুড়ুইটিপির মাঠে তেঁতুল গাছটির তলায় বসে আছি, দেহখানি তখন কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। আমি কিছু বলবার আগেই চক্কোতি মশাই বললেন—


—এই প্রেতপুরীতে স্বাগতম বীরু।


—মানে?


—মানে বুঝলি না? (মৃদু হেসে) তুইও ভূত আর আমিও। বলে একটা বিটকেল হাঁসাআরে কী ভূত ভূত বলচে, আর আমি এখানে কী করছি?


তারপর চক্কোতি মশাই আমার দিকে কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার পর বললেন—


—শোন তবে।


বলে যে ঘটনাটা শোনালেন তা শুনবার পর মুখে আর কোনো কথা ফুটল না।


বৃদ্ধ যা বললেন তা হল আমি যেদিন নিমন্ত্রণ রক্ষা করে এই মাঠ দিয়ে বাড়ি ফিরছিলাম তখন যাবার সময় আমি আগেই বলেছিলাম সেই বাবলা গাছের তলায় আমার মনে হয়েছিল কেউ যেন আমার কাঁধে লাফিয়ে পড়েছে, কিন্তু ব্যাপারটা তা ছিল না। আসলে চক্কোতি মশাই আমার কাঁধে চড়ে আমার ঘাড় মটকে দিয়েছিল এবং আমার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হয়েছিল। তখন থেকেই আমি ভূত এবং ওই জন্যই তারপর থেকেই আমারও কথাগুলো এঁনাদের মতো (নাকি সুর)। এইসব শুনবার পর আমি যখন বিশ্বাস করলাম না, তখন চক্কোতি মশাই আমাকে নিয়ে শূন্যে ভেসে সোজা উঠে গেল তেঁতুল গাছটার উপর, তারপর গাছের মধ্যে এপার-ওপার হয়ে আরও কয়েকটি কায়দা দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে আমি এঁনাদের দলের। সবকিছু শুনে আমার তাঁর ওপর ভারি রাগ হল, মনে মনে বললাম, ‘ব্যাটা খিটখিটে ব্রহ্মদত্যি আমাকে এই পেল ঘাড় ভাঙার জন্য।’


যাই হোক রাগ চেপে জিজ্ঞাসা করলাম—


—আচ্ছা তাহলে তখন আমি অজ্ঞান হলুম কীভাবে? ভূত অজ্ঞান হয় জানতাম না তো।


মৃদু হেসে বললেন—


—বলি শোন তবে, সদ্য মরে কেউ ভূত হলে তখন তার আক্কেল হয় না যে সে ভূত, তখন ওই ভূত মানুষের মতোই হাবভাব করে বুঝলি। এই তো সেবার নৃপেনের ছেলে কেষ্টা মরে গিয়েও ব্যাটা তার স্ত্রীর আঁচল ছাড়তে পারেনি। নয় দিন পরে ব্যাটা বুঝতে পারে সে ভূত।


—আর আমি অজ্ঞান হওয়ার সময় চিতা থেকে আমার মড়াটা উঠে বসতে দেখলাম যে?


এবার চক্কোতি মশাই খনখনে হাসি হেসে বললেন—


—ও তো ন্যাপলা, তুই যখন মাটিতে লুটিয়ে পড়লি তখন ন্যাপলা তো র মড়াটার মধ্যে ঢুকে তোর মড়াটাকে নদীর ওপারে ফেলে দিয়ে আসে আর মড়ার ওপর একটা গাছ ভেঙে ফেলে দেয় যাতে মানুষ ভাবে তুই গাছ চাপা পড়ে মরেছিস।


—তারপর? (অবাক হয়ে)


বৃদ্ধের কাছে শুনলাম পরের দিন সকালবেলা এক রাখাল দেহটি দেখতে পায়, তারপর গ্রাম থেকে লোক এসে দেহটি গ্রামে নিয়ে যায় এবং বিকেল নাগাদ আবার মড়া শ্মশানে এনে সৎকার করা হয়। আমি আরও কিছু জিজ্ঞাসা করতে যাচ্ছিলাম এমন সময় কোথা থেকে একটা বেঁটে কৃষ্ণবর্ণ ভূত এসে প্রণাম করে বলল—


—ঠাকুর মশাই সব জোগাড় করে ফেলেছি, নারান খুড়ো সেগুন গাছের ছাল নিয়ে এলো বলে।


আমি বললাম—


—কী ব্যাপার চক্কোতি মশাই?


—আরে বাপু সব বলব আগে যাঁ নদী থেকে দুটো ডুব দিয়ে আয়, আজ তোর প্রথম অমাবস্যা।


কিছুই বুঝলাম না। প্রথম অমাবস্যা মানে, আর আমি এতদিন অচৈতন্য অবস্থায় ছিলাম যে দিন জীবিত ছিলাম সে দিন মনে হয় ত্রয়োদশী ছিল, যাই হোক তা গেলাম ডুব দিতে।


ঘন অন্ধকার রাত যেন পৃথিবীকে কালো চাদর দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে মুড়ে দিয়েছে আর এই ঘন অন্ধকারময় রাত্রিতে আলোকবর্ষ দূরে জ্বলতে থাকা নক্ষত্রপুঞ্জের মতো কিছু জোনাকির দল এদিক-ওদিক উড়ে বেড়াচ্ছে। রাত্রির নির্জনতা চিরে ওপারের শালবন থেকে এক অজানা পাখির কর্কশ ডাক মাঝে মাঝে ভেসে আসছে। ডুব দিয়ে এসে দেখি ইতিমধ্যে বেশ কিছু ভূত জমা হয়েছে, ওদিকটায় চক্কোতি মশাই দুটো ভূতকে কী যেন নির্দেশ দিয়ে আমার কাছে এলেন।


—শোন বীরু এখন কিছু প্রশ্ন করিসনে। ক্রিয়াকর্ম আগে সেরে নে, সব বলব।


এই বলে আমাকে বেশ কিছু কাজ করবার নির্দেশ দিল যা শুনে আমি অবাক হলাম তো বটেই, কিন্তু সেই সঙ্গে বেশ একটা আলাদা অনুভূতি হল। বৃদ্ধের মতানুযায়ী কোনো ব্যক্তির দেহ সৎকারের পর প্রথম যে অমাবস্যা তিথি আসে সেই তিথিতে ওই ব্যক্তির যে জায়গায় সৎকার হয়েছে ওইখানে সেই রাত্রির তৃতীয় প্রহরে এক ঘোর কৃষ্ণবর্ণের ছত্রাক জন্মায়। সেই মৃত ব্যক্তির আত্মাকে জলে ডুবিয়ে গাত্রশুদ্ধি করে কোনো একটি পুরুষ প্রাণীর বলিদান করতে হয় এবং সেই অর্ঘ্য ওই ছত্রাককে নিবেদন করতে হয়। ওই কার্য সম্পন্ন হবার পর রক্তমাখা ছত্রাকটি কাঁঠাল পাতায় মুড়ে শ্মশানের পোড়া কাঠের আগুনে শকুনের পালক, শিয়ালের লেজ, ছয়টি শুষ্ক অশ্বত্থ বৃক্ষের পত্র, তিনটি শালিকের কাটা মুন্ডু, শুকনো গোবর, ও মহিষের লেজের চুল এইসব নৈবেদ্যগুলো আগুনে দিয়ে ছত্রাকটি পোড়াতে হয়। তারপর সেগুন গাছের ছাল বাঁ হাতে ধারণ করে একটা মন্ত্র আওড়াতে আওড়াতে পাঁচবার শ্মশানে প্রদক্ষিণ করে পোড়া ছত্রাকটি তেঁতুল গাছের ছালের উপর সমান ভাগে ভাগ করতে হয়। তারপর একটা ভাগ নিজে খেয়ে অপরটি কোনো নদীতে বা জলাশয়ে ভাসিয়ে দিতে হয়। বলা বাহুল্য এগুলো সব তৃতীয় প্রহরের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে তা না হলে ঘোর বিপদ। তবে বিপদটা যে কী তা ব্রহ্মদত্যি মহাশয়ও সঠিক বলতে পারলেন না।


কথা মতো বনে গিয়ে একটা বুনো খরগোশ ধরে আনলাম এবং চক্কোতি মশাই একটা জবা পাতার মতো খাঁজকাটা ছুরি এগিয়ে দিলেন। উক্ত কার্য সম্পন্ন করবার পর শুরু হল মহাযজ্ঞ। একের পর এক অদ্ভুত সব নৈবেদ্য দিয়ে চক্কোতি মশাই খনখনে গলায় কী সব যে মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগলেন তার মাথা-মুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না। তবে উপস্থিত ভূতগুলো মাঝে মাঝে হাততালি দিয়ে চুড়ুইটিপির নিস্তব্ধ শ্মশান তোলপাড় করে তুলছে, কেউ কেউ মাটির কলসি এনে তবলার মতো বাজাতে ব্যস্ত, কেউ কেউ আবার এসব গাহ্য না করে শ্মশানের ছেঁড়া কাঁথা পেতে মহানন্দে তাস খেলছে, দু-একটি বাচ্চা কঙ্কাল দেখলাম একেবারে কাছে এসে লোলুপ দৃষ্টিতে যজ্ঞকুণ্ডের পাশের শালিকের কাটা মুন্ডুগুলোর দিকে চেয়ে আছে। চারিদিকে তাকিয়ে মনে হল যেন প্রেতমেলা বসেছে।


চতুর্থ প্রহরের আগেই কার্য সম্পন্ন করে, একে একে সব নবাগত ভূতেদের বিদায় দিয়ে চক্কোতি মশাই আমাকে নিয়ে নদীর তীরের দিকে চলল। তীরে গিয়ে একটা বাবলা গাছে পা ঝুলিয়ে একটা ক্লান্তির হাই তুলে বলল—


—আয় বস ওইখানটায়।


বসলাম, তারপর তিনি বললেন—


—তুই শ্রী শ্রী ভূতীয় ত্রিকালজ্ঞ ভূতেশ্বর নলখাগড়া মহাশয় বিরচিত মহাভূতপুরাণ এর নাম শুনেছিস কখনো?

—শোন তবে...


এই বলে শুরু করলেন মহাভূতপুরাণের গল্প। তা তো মা-দেড় যদি আমি সেটা বলি তাহলে বিরাট উপন্যাসে পরিণত হবে। তাই যেটুকু প্রয়োজন বোধ করছি ততটুকু বলে এটা শেষ করছি।


শোনো, মানুষের মতো ভূতদেরও একটি পুরাণ আছে। এই পুরাণে ভূতদের নিয়ম-কানুন, আচার-ব্যবহার, মন্ত্র, যাগযজ্ঞ, বিবাহ, মুক্তি, জীবনযাত্রা সব লিখিত আছে। এই মহাপুরাণ রচনা করেছেন শ্রী শ্রী ভূতীয় ত্রিকালৌজ্ঞ ভূতেশ্বর নলখাগড়া। বলা হয় পয়ার ছন্দে রচিত এই পুরাণেতে ত্রিশ হাজার শ্লোক বর্তমান। তবে এই মহাপুরাণ কবে রচিত তা ঠিক কেউ জানে না। এই পুরাণ থেকে জানা যায় হিন্দু শাস্ত্রে যেমন ষড়রিপু অর্থাৎ ছয়টি রিপু তেমনি মহাভূতপুরাণে কথিত আছে দুটি রিপু। ভূতলোকে এই দুটি রিপু হল লোভ ও ক্রোধ। ভূতেদের মধ্যে এই দুটি রিপু বর্তমান, বাকি রিপুর অস্তিত্ব এই লোকে নেই।


এই কিছুক্ষণ আগে আমি যে যজ্ঞ চক্কোতি মহাশয়ের সঙ্গে করলাম তা হল সং অহিলাং ভূত্যং প্রেতঃ ত্রাণায়ং যজ্ঞ। এই মহাযজ্ঞ করলে সেই ভূতের লোভ ও ক্রোধ ক্রমশ ক্ষয় হয়ে থাকে। প্রতি মাসে এই যজ্ঞ করলে দুই বছরের মধ্যেই মোক্ষ লাভ করে স্বর্গলোকে প্রস্থান যায়। তবে এটা মাসে মাসে করা খুব কঠিন। তবে বছরে অন্তত তিনবার করলেই হবে। কিন্তু কেউ কেউ আছে যারা বছরে তিনবার তো দূর, এসবের ধার ঘেঁষে না, তাদেরকে ভূতসমাজে ছিঁচকে বা পাষণ্ড ভূত বলা হয়। এদের লোভ ও ক্রোধ চরম মাত্রায় থাকে। এরা লোভ সামলাতে না পেরে মানুষের জগতে গিয়ে গোরু, বাছুর, ছাগল, ভেড়া এমনকি মানুষের রক্ত পর্যন্ত খেয়ে তাদের চাহিদা পূরণ করে। আবার কারও ক্রোধ এমন সাংঘাতিক হয় যে ভূতলোক ছেড়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং সেই মানুষটিকে হত্যা পর্যন্ত করে থাকে। এটি ভীষণ বিপজ্জনক কারণ এভাবে নিজের ক্রোধ সংবরণ করতে না পেরে বহু মানুষের নৃশংসভাবে প্রাণ নিয়ে থাকে।


পরে চক্কোতি মশাই একবার বলেছিলেন তিনি এই মহাযজ্ঞ বেশকিছুবার করলেও লোভ থেকে সম্পূর্ণ নিষ্কৃতি পাননি, যদিও তিনি এই মহাযজ্ঞ দ্বারা ক্রোধমুক্ত হয়েছেন। একটু মৃদু হেসে বলেছিলেন—


—সেদিন অনেকক্ষণ অবধি লোভ সংবরণ করে ছিলুম, তারপর আর থাকতে না পেরে দিলুম তোর ঘাড় মটকে হি... হি... হি... হি...


Comments


ssss.jpg
sssss.png

QUICK LINKS

ABOUT US

WHY US

INSIGHTS

OUR TEAM

ARCHIVES

BRANDS

CONTACT

© Copyright 2025 to Debi Pranam. All Rights Reserved. Developed by SIMPACT Digital

Follow us on

Rojkar Ananya New Logo.png
fb png.png

 Key stats for the last 30 days

bottom of page